এক খন্ড রাষ্ট্র এবং ভালোবাসা

চন্দ্রাহত বালক

(আমি প্রেমের গল্প লিখতে পারি না।আসলে একটা ভালোবাসাবাসির সম্পর্ক ঠিক কেমন হয়,সেই সম্পর্কের রঙ গুলো কীভাবে জোছনার সাথে খেলা করে তা আমার জানা নাই।তবে আমি মাঝেমাঝে প্রেমে পরি।সেই সময় আমি অনেক অনেক স্বপ্ন দেখি।সেই স্বপ্নের সুতায় বেধে এইবার ভালোবাসায় মাখামাখি একটা গল্প লেখার চেষ্টা করেছি।বরাবরের মত আমার অখাদ্য গল্পের ভূবনে পাঠকদের আমন্ত্রণ)

রাফি মুগ্ধ নয়নে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে।ছেলেটা এত তৃপ্তি করে খাচ্ছে দেখেই চোখে পানি চলে আসছে।জায়েদের খুব ইচ্ছা করছে তাকে হাতে তুলে খাইয়ে দেবে।কিন্তু এই ভরা হোটেলে এটা সম্ভব না।তাছাড়া আবির কী মনে করবে?তার সাথে জায়েদের তেমন কোন সম্পর্ক নেই।ওদের পরিচয়টা হয়েছিলো খুব অন্যভাবে।রাফি চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলো।এমন সময় ছিপছিপে দেখতে এক ছেলে আসলো।দেখতে শ্যামলা।মাথা ভর্তি বড় বড় চুল।কবি কবি ভাব মারার বৃথা চেষ্টা আর কি।ছেলেটা এসে একটা রুটি নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছিলো।একটু পর চায়ের দোকানের মামাকে জিজ্ঞেস করলো,”মামা,কলা কত কইরা?

”দশ টাকা”

ছেলেটা পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগ বের করলো।তারপর মানিব্যাগটা খুলে কী একটা ভেবে আবার পকেটে রেখে দিলো।চায়ের দোকানের মামা জিজ্ঞেস করলো,”কলা দিমু?”

ছেলেটা বললো,”না থাক।এক গ্লাস পানি দাও”

বিষয়টা রাফির একদম ভালো লাগেনি।তার কেনো যেনো মনে হচ্ছিলো,”ছেলেটার কাছে বোধহয় টাকা নেই একটা কলা খাবার।তাই বেচারা শুকনা একটা রুটি পানি দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে।একবার ভাবলো,”ছেলেটাকে ডেকে বলে তুমি একটা কলা খাও।আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি।পরে আবার ভাবলো।না থাক,কী না কী মনে করে।এমন সময় একটা বাচ্চা মতন মেয়ে এসে বেছে বেছে সেই ছেলের শার্ট ধরেই বললো,”একটা রুডি দিবেন ভাই?”

সে বিন্দু মাত্র বিরক্ত না হয়ে নিজের হাতের বাকি রুটিটা মেয়েটাকে দিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।তারপর গ্লাসের পানিটা চুমুক দিয়ে খেয়ে মামাকে রুটির টাকা দিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে গেলো।এমন সময় হুট করেই রাফি তাকে ডাক দিলো।

”এক্সকিউজ মি ভাইয়া।একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না।“

সে ভ্রু দুটো হালকা কুঞ্চিত করে বললো,”হ্যা,বলেন।“

”ইয়ে মানে।আপনি বোধহয় টাকা নিয়ে বের হতে ভুলে গেছেন।তাই কিছু খেতে পারলেন না।আপনার বেশি ক্ষুধা লাগলে কিছু খেয়ে নিতে পারেন।আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি।পরে না হয় আপনি দিয়ে দিবেন”

ছেলেটা ঠোট টিপে একটা হাসি দিলো।তারপর বললো,”পরে আপনারে পাবো কই?”

”আরে পেয়ে যাবেন।“

ছেলেটা বেশ সহজ ভংগীতেই দোকানে ঢুকে একটা রুটি,একটা কলা আর এক কাপ চা নিলো।তার খাওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে যথেষ্ট ক্ষুধার্ত।রাফি তাকে জিজ্ঞেস করলো,”আপনি কি আর কিছু খাবেন?

ছেলেটা একটু ইতস্তত করে বললো,”আমি একটা সিগারেট নিতে পারি?”

”অবশ্যই পারেন।আপনার নামটা জানা যাবে?”

”নামের বিনিময়ে সিগারেট?”

”আরে নাহ।এমনি জিজ্ঞেস করলাম”

”নাম বলতে ইচ্ছা করছে না।সিগারেট নিবো?”

”নিবেন না কেনো?নেন।

ছেলেটা একটা গোল্ডলিফ নিয়ে টানতে টানতে দোকান থেকে বের হয়ে গেলো।রাফি ভেবেছিলো ছেলেটা একবার হলেও পেছনে তাকাবে।কিন্তু ছেলেটা তাকায় নি।

ঠিক তার পরের দিন একই জায়গায় ছেলেটার সাথে রাফির দেখা হলো। তার গতকালের আচরণে রাফি যারপণাই বিরক্ত।তাই তাকে দেখে না দেখার একটা ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো।ছেলেটাই সেধে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলো,”মহাশয় ভালো আছেন?”

”হুম ভালো আছি।আপনি?”

”ভালো আছি।তবে প্রচন্ড ক্ষুধা লাগসে।ক্ষুধার্ত অবস্থাকে যদি ভালো বলা যায় তবে ভালো আছি।“

”আপনি কি প্রতিদিনই ক্ষুধার্ত থাকেন?”

”হুম।তা থাকি।কিছু খাওয়াবেন?

”খাওয়াবো।তবে আজকে নামের বিনিময়ে খাদ্য।নাম ধাম বললে খাওয়াবো।নাইলে খাওয়াবো না।“

”নাম আবির।ধাম পরিবাগ”

”ভালো।এইবার বলেন কী খাবেন?এই দূপুরে চা রুটি খাবেন?না অন্য কিছু খাবেন?

”ভাত খাবো।চিকন চালের ভাতের।কালিজিরা ভর্তা।শুটকি ভর্তা।বিশাল বড় সাইজের দুইটা চিংড়ি মাছ।ইলিশ মাছের ডিম ভাজি।ঘন করে রান্না করা ডাল।ভাতের শেষের এক গ্লাস লাচ্ছি।তারপর দুইটা গোল্ডলিফ সিগারেট।পারবেন খাওয়াতে?”

রাফি একটু চিন্তা করলো।তারপর বললো,”ইলিশ মাছের ডিমটা ঝামেলা করে ফেললো।আচ্ছা,চলেন।ঘন্টা খানেক ওয়েট করতে পারবেন তো?”

”তা পারবো”

এরপর ঠিক পঞ্চাশ মিনিটের মাথায় রাফি তার এক পরিচিত হোটেলে নিয়ে এসে সব ব্যবস্থা করে আবিরকে খাওয়াচ্ছে।আবির কোন দিকে না তাকিয়ে ডাল মেখে ভাতের লোকমা দিচ্ছে

“হ্যালো,আসসালামু আলাইকুম’

”ওয়ালাইকুম আসসালাম।এটা রাফির নাম্বার না?’

”হ্যা বলছি।“

”ও মা।আপনার কণ্ঠ দেখি ফোনে পুরাই মাইয়া মাইয়া লাগতেসে।আমি তো ভাবসি আপনার আম্মা ফোন ধরসে’

”আবির বলছেন নিশ্চয়?আপনি ছাড়া আর কেউ এইভাবে অপ্রিয় সত্য কথা বলতে পারবে না মুখের ওপর।যাই হোক,কেমন আছেন?”

”ভালো আছি।আপনি কোথায় এখন?”

”অফিসে।অফিস চুলায় যাক।আপনে এখনি একটু খামারবাড়ি আসবেন।“

”আজিব।আমি শুধু শুধু আপনার কথায় খামারবাড়ি যাবো কেন?আর তাছাড়া অফিসে আমার জরুরি কাজ আছে।“

”থাকুক।আমি আসতে বলসি তাই আসবেন”

”আমি মোটেই আসবো না”

“আমি এত কিছু জানি না।আমি ৪ টা বাজে মোড়ে অপেক্ষা করবো।আপনি আসবেন”

এই বলে আবির ফোন কেটে দিলো।রাফি মনে মনে ভাবলো,কী জ্বালায় পরলাম রে।তার যাওয়ার কোন যৌক্তিক কারণ না থাকলেও সে বিকেল তিনটায় একটা কারণ দেখিয়ে অফিস থেকে ছুটি নিলো।তারপর একটা সিএনজিকে ডেকে বললো,”যাবেন?খামারবাড়ি মোড়?”

সাড়ে চারটা বাজতে চললো।আবিরের কোন দেখা নেই।এইদিকে আকাশে প্রচুর মেঘ দেখা যাচ্ছে।বাতাসেও বৃষ্টির ঘ্রাণ।যে কোন মূহূর্তে বৃষ্টি আসতে পারে।আবিরের ফোন ও বন্ধ।রাফির নিজের ওপর চরম মেজাজ খারাপ লাগছে।এইভাবে না আসলেও হতো।কী দরকার ছিলো। ৫ টা দশে রাফি আবিরকে ফোনে পেলো।

‘এই আপনার কী অবস্থা বলেন তো।আমাকে আসতে বলে নিজেই আসলেন না।“

”আজিব।আপনিই তো বললেন আসবেন না।তাই আমিও আসি নাই।শুধু শুধু এসে কী করবো বলেন?”

”উফফ,আমিও একটা গাধা।আমি যে আসবো আপনাকে জানানো উচিত ছিলো।যাই হোক ভুল হয়ে গেসে।আপনি কি আসবেন এখন?না আমি চলে যাবো?”

“আমি এখন কেনো আসবো?আপনি চলে যান।আপনারে ঝামেলা দেওয়ার জন্য দুঃখিত”

রাফি ফোন কেটে দিয়ে সংসদ ভবনের ওইদিক দিয়ে হাটা শুরু করলো।তার প্রচন্ড মন খারাপ হচ্ছে।কেন হচ্ছে সে নিজেই জানে না।আচ্ছা আবির ছেলেটার প্রতি কি সে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে?ছিহ,কী লজ্জা।কত ছোট একটা ছেলে।তাকে নিয়ে এই ধরনের কিছু ভাবাও তো ঠিক না।এমন সময় প্রচন্ড বর্ষন শুরু হলো।বৃষ্টির নিয়ম হচ্ছে প্রথমে বড় বড় কয়েক ফোটা দিয়ে সে পৃথিবীবাসীকে জানাবে আমি আসছি।তোমরা প্রস্তুত হও।তারপর ঝুম বৃষ্টি শুরু হবে।কিন্তু এই বৃষ্টি জানান দেওয়ার ঝামেলায় গেলো না।প্রথমেই সগৌরবে বর্ষিত হলো।রাফি কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো কাকভেজা হয়ে গেলো।তারপরেও ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করতে গেলো এমন সময় পাশে আবির এসে দাঁড়ালো।মুখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললো,”ছাতাটা বের করার কোন প্রয়োজন নেই।বৃষ্টির আলাদা একটা মর্জাদা আছে। ছাতা বের করে তাকে স্পর্শ না করা মানে তাকে অপমান করা।বৃষ্টিকে অপমান করা কি ঠিক?

রাফি এই কথার আগামাথা কিছুই বুঝলো না।শুধু মাথা নেড়ে বললো,না ঠিক না।

”গুড।এই তো আপনি বুঝেছেন।এইবার আমরা কী করবো জানেন?”

”না বললে জানবো কেমনে?”

”এখন আমরা বৃষ্টিতে ভিজবো”

”আমরা তো বৃষ্টিতে ভিজছিই।দুইজনেই ভিজে গেছি।আবার ভিজার কী আছে?

”অনেক কিছুই আছে।আবার কিছুই নেই।আমরা এখন হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজবো।আমাদের ভেজাতেই আজকের এই বৃষ্টি।কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি যখন একটু কমে আসবে তখন আমি গান শোনাবো।যদি ডেকে বলি এসো হাত ধরো চলো ভিজি আজ বৃষ্টিতে।“

”ও আচ্ছা।চলো তাইলে ভিজি”

”তুমি চাইলে আমার কোমর ও জড়িয়ে ধরতে পারো”

”আজব।আমি আপনার কোমর জড়িয়ে ধরবো কেন?”

”আচ্ছা থাক।আপনার কিছুই করা লাগবে না।আপনার বৃষ্টিতেও ভিজা লাগবে না।আপনি মারা খান”

”মারা খাওয়া মানে কী?”

”সহজ বাংলা ভাষায় চোদা খান”

‘ছিহ।কি অশ্লীল কথা।“

”অশ্লীল কথা আরো না শুনতে চাইলে চলে যান।আমি এইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজবো।আপনি সামনে থাকলেই অশ্লীল কথা বলবো।‘

রাফি বললো,”আচ্ছা চলে যাচ্ছি।আপনি ভালো থাকবেন”

এই বলে রাফি সামনের দিকে হাটা শুরু করলো।গালের দিকের পানিগুলোকে গরম মনে হচ্ছে।সে কি কাদছে?কেনো কাঁদছে?

রাফি বেশ উদ্বিগ্ন হয়েই আবিরকে ফোন দিয়ে যাচ্ছে কাল রাত থেকে।ফোনটা সেই সন্ধ্যা থেকে বন্ধ।এই ছেলেকে নিয়ে পারা যায় না।কখন যে কী করে তার নাই ঠিক।এইবারের কলে রিং শুনে রাফির কলিজায় বোধহয় পানি আসলো।

”ওই,তোমারে সেই কাল রাত থেকে ফোন দিচ্ছি।ফোন বন্ধ কেন?”

”ইয়ে মানে।কাল অভির সাথে ছিলাম রাতে।রাতে ফোন খোলা রাখা ওর পছন্দ না।“

রাফির মনটা আবার কেন যেন খারাপ হয়ে গেলো।“অহ,ভালোই তো।খুব ভালো লাগলো শুনে।আমার তো বোধহয় তোমাকে আর ফোন টোন দেবার দরকার নাই।ওই ভাইয়াই তোমার খেয়াল রাখবে”

”সেইটাই ফোন না দেওয়াই ভালো”

”আচ্ছা রাখি”

এই বলে রাফি ফোন রেখে দিলো।তারপর ফেসবুকে লগ ইন করেই দেখলো অভি আর আবিরের রিলেশন স্ট্যাটাস।

কী যেন মনে করে রাফি আবিরকে আরেকটা ফোন দিলো।

”সরি আবার ডিস্টার্ব করার জন্য।তোমাকে কয়েকটা কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছি”

‘বলো’

“আমার না কোনদিন কাউরে কোন কিছু নিয়া হিংসা লাগে নাই।কারো কোন কিছু নিয়ে জলে না।কিন্তু আজকে জলতেসে।ভীষণ জলতেসে।“

”তাই নাকি? হা হা হা?’

”ওই তোমার হাসি বন্ধ করো তো।তোমার এই ঢঙের হাসি শুইনা অন্য পোলা মাইয়ারা পাগল হয়।আমি হই না।“

‘আসলেই হও নাই?”

’জানি না।তোমার সাথে আমি কোন কিছু নিয়া তর্ক করবো না।আমি একটু পর কান্না করবো।তার আগে তোমারে কিছু কথা বলে যাই।সিগারেট কম খাবা।আর ঐ ভাইয়ারে বলবা তোমার খাওয়া দাওয়ার দিকে নজর রাখতে।আর গাঁজা একদমই খাবা না।ঠিক আছে?”

“না কিচ্ছু ঠিক নাই।তুমি একটু সংসদের এইখানে আসো তো।আমি আসতেসি।“

“আমারে আর জালাবা না তো।তোমার জ্বালানোর লোক আছে।তার কাছে যাও”

‘আমি কিন্তু সকাল থেকে এখনো কিচ্ছু খাই নাই”

রাফি চোখ মুছতে মুছতে বললো,”আচ্ছা আসতেসি”

”কী খাবা?”

”তোমার মাথা খাবো।চুপ করে বসে থাকো।।“

“ওই তুমি গাঁজা খেয়ে আসছো?তোমার সারা শরীর দিয়ে ভুরভুর করে গাঁজার গন্ধ বের হচ্ছে।তোমারে না কইসি এইগুলা আর না খাইতে।“

আবিরের কেনো যেন আজ গাঁজা খেয়ে খুব ভালো লাগছে।সে রাফিকে কিছু কথা বলবে।সুস্থ মাথায় সব গুছিয়ে বলা হয়তো সম্ভব না।তাই গাঁজা খেয়ে এসেছে।

’শোন রাফি তুমি সেদিন জিজ্ঞেস করসিলা যে আমার ফ্যামিলিটা এমন কেন?কারো প্রতি কারো টান নাই।আজ তোমারে আমি বলবো।“

”বলো’

‘তোমারে খুব সংক্ষেপে বলি।আমি যখন বেশ ছোট তখন আমার বাবা মারা যায়।মা বাধ্য হয়ে মানুষের বাসায় কাজ নিলো।সেই সময়টায় আমরা যে কী পরিমাণ কষ্টে ছিলাম তুমি চিন্তা করতে পারবা না।তোমারে একটা ঘটনা বলি।আমার তখন ৬/৭ বছর বয়স।মা যেই বাড়িতে দূপুরে কাজ করতে সেই বাড়িতে দুপুরে তার খাবার ব্যবস্থা ছিলো।কিন্তু তার কোন সন্তানের খাবার ব্যবস্থা নাই।বড় আপার তখন বিয়ে হয়ে গেসে।ভাইয়াও বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেসে।রইলাম বাকি আমি।আমার মা কী করতো জানো? সেই ৬ তলা থেকে খাবার পলিথিনে ভরে নিচে ছুড়ে দিতো।সামনের দরজা দিয়ে দিলে যদি কেউ দেখে ফেলে তাই।কাটাকুটা যাই দিত আমি অমৃতের মজা নিয়ে খেতাম।এমন অনেক সময় হয়েছে পলিথিনটা ধরতে পারিনি।নিচে পরে ফেটে গেছে।উঠিয়ে খাবার অবস্থা ছিলো না।কী আর করা।সেদিন খাইনি।এইভাবেই আমি বড় হয়েছি।কিন্তু ঝামেলা লাগলো কোথায় জানো?যখন পেটের ক্ষুধা আর সহ্য করতে না পেরে খারাপ পথে চলে যাই।তখন তো অনেক ছোট কিছুই বুঝতাম না।এলাকার এক আংকেল বললো রমনায় অনেক টাকা পয়সাওয়ালা মানুষ যায়।ওদেরকে ম্যাসাজ করে দিলে টাকা পাওয়া যাবে।উনি ম্যাসাজ শিখিয়েও দিলো।কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর যে ম্যাসাজের সাথে আরো কত কিছু করতে হয়েছে তুমি জানো না।একটা সময় মা জেনে যায় বিষয়টা।এরপর থেকে মা কোনদিন আমার সাথে কথা বলে না।নিজের চেষ্টায় পড়াশুনা করলাম।একটা পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স ও পেলাম।ইচ্ছা করলে কিন্তু দু তিনটা টিউশনি করে আমার দিব্যি চলে যায়।কিন্তু এই জীবনটাকে টানতে খুব কষ্ট হচ্ছে।যখন খুব শরীর খারাপ হয় ইচ্ছা করে কেউ এসে বলুক।কীরে আবির খুব খারাপ লাগছে?কিছু খেতে ইচ্ছা হয়? আসলে না খেয়ে থাকার কষ্ট তো পরের বেলা খেলেই চলে যায়।কষ্ট লাগে এইটা ভেবে যে আমি খেলাম কি না খেলাম তাতে পৃথিবীর কারো কিছু এসে যায় না।“

রাফি অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে।আবির একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বললো,”মাইজ্ঞামি বন্ধ করো তো”

রাফি চোখ মুছতে মুছতে বললো,”তুমি কালকেই শরীর খারাপ করবা।তারপর আমারে বলবা।আমি তোমার বাসায় আপেল কমলা হরলিক্সের ডিব্বা নিয়া তোমাকে দেখতে যাবো।তোমার মাথায় পানি ঢেলে দিবো।ঠিকাসে?”

”না।একদমই ঠিক নাই।শোন রাফি তুমি অতি সাধু প্রকৃতির একজন মানুষ।আর আমি প্রচন্ড নোংরা একটা ছেলে।এই শরীরটা যে কত নোংরা তুমি জানো না।“

“আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি শরীরের প্রতি আমার কোন আকর্ষণ নেই।তাছাড়া এই কথাগুলা আসতেসে কেনো?তুমি তো অভি নামের ভাইয়াটাকে ভালোবাসো।আমি নাহয় বন্ধু হয়েই তোমার পাশে থাকলাম।“

“ঢং কইরো না তো।অভির সাথে আমার কোনদিন যাবে না।যেই ভালোবাসার উৎস ত্রিশ মিনিটের শারিরীক ঘর্ষন সেইটা কোন ভালোবাসা না।তবে তোমারেও আমার ভালোবাসা লাগবে না।আমি আগামী পরশু কানাডা যাচ্ছি।তুমি তো জানোই আমি আবার বেশি ভালো স্টুডেন্ট।স্কলারশিপ পাইসি কানাডা গভমেন্টের।“

”ওহ তাই।খুব ভালো খবর।আমারে আগে জানাও নাই কেন?”

”হুদাই।এখন কথা হচ্ছে তুমি যদি বলো আমাকে থেকে যেতে আমি কিন্তু থেকে যাবো”

”কী আচানক!তোমার এত ভালো ফিউচার নষ্ট করে আমি তোমাকে বলবো থেকে যেতে?আমি এত সার্থপর?”

কিছুক্ষণ আগে আবিরের ফ্লাইট হয়েছে।রাফি এয়ারপোর্টে এসেছিলো তাকে পৌছে দিতে।আবির তার দিকে তাকিয়ে একটা কথাও বলে নি।শুধু এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলেছে ভালো থেকো।

রাফি এয়ারপোর্টের রাস্তা ধরে হাটছে।তার খুব একটা খারাপ লাগছে না।রাস্তার দুপাশের লাইটগুলো এইখানের সবার সুখ দুঃখের সাক্ষী।কত মানুষ কাঁদতে কাঁদতে যায়।আবার মুখ ভরা হাসি নিয়ে ফিরে আসে।হঠাত করে পিছন থেকে কে যেন এসে হাতটা ধরলো।চমকে গিয়ে রাফি পেছনে তাকালো।দেখে আবির মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে।পেছনে ঘুরতেই আবির হামলে তার বুকে ঝাপিয়ে পরলো।কাদছে আর তার বুকে মুখ ঘষছে।রাফি কী করবে কী বলবে খুজে পেলো না।আবিরের মাথায় হাত রাখলো।আবির অবশেষে মুখ উঠিয়ে বলল,’ভালো ফিউচারের মায়রে বাপ।আমি তোমারে ছাড়া একদমই থাকতে পারবো না।তোমার বুকটাই আমার সব।আমার দেশ,আমার মা,বাবা,সব।এইটাই আমার এক টুকরো রাস্ট্র।

রাফি হালকা একটা হাসি দিয়ে বললো, আর অভি?

আবির রাফির বুকে মুখ লুকিয়ে বললো,”থাক না কিছু ভুল”

পরিশিষ্ট

পাঠকবৃন্দ।ভালোবাসায় মাখামাখি একটা গল্প বলেই মিলনের দৃশ্যের মাধ্যমে গল্প শেষ হয়েছে।বাস্তব কিন্তু এমনটা হয় না।বাস্তবে আবিররা ফিরে আসে না।রাফিদের মুখে হাসি ফোটে না।বাস্তবে অনেক অভি আছে।তবে তারা পত্রপল্লবে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আবিরদের ভালোবাসে না।জগতের সবার জীবন ভালোবাসাবাসিতে ভরে থাক।

সমপ্রেমের গল্প July 16, 2016

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.