ত্যাগ

ঘাসফড়িং

বিকট শব্দে হর্ণ দিয়ে যেতে লাগল একটা প্রাইভেট কার।

প্যাঁ প্যাঁ করে আওয়াজ এসে কান ভেদ করছে আমার ।

হকচকিয়ে পেছন ঘুরে দিকে তাকিয়ে দেখলাম দু তিনটে গাড়ি আটকে আছে আমার থমকে থাকার ফলে।

একটা ড্রাইভার এসে নেমে বলতে লাগল,

-এই মিয়া , কান নাই নাকি?গাড়ি দিয়া চাপা দিলে খুশি হ্ইবেন ? যত্তসব পাগলের দেখা।রাস্তার মধ্যিখান দিয়া হাটঁতেছে।তাও কৈ ! হাটঁতেছে না। থাইমা আছে।

বলেই হনহন করে গিয়ে গাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল লোকটা।

আমার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।

আমি একপাশ হয়ে রাস্তা খালি করে দিলাম।

অরণ্যের সাথে কিছু দিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা মনে পড়তেই শরীরটা শিউরে উঠে। প্রতিনিয়ত।

আপাদমস্তকে এক বিষাক্ত যন্ত্রণার ব্যথা নাড়া দিয়ে যায়।

স্বাভাবিকতা ফিরে পেয়ে আমি ভার্সিটির দিকে পা বাড়ালাম।

ক্যাম্পাসে আসার পর আমরা তিন-চার জন একত্র হলাম।

আমার অন্যমনস্কতা দেখে

আমাদের মধ্য হতে রিফাত বলে উঠল,

-কি রে!এভাবে মনমরা হয়ে আছিস ক্যান?

আমি ‘কিছু না’ বলে বিষয়টা কাটিয়ে উঠলাম।

ভার্সিটির থার্ড ইয়ারে লেখাপড়া চলছে আমার। বাবা একজন দিনমজুর।বড় ভাই নেই আমাদের।একটা বোন আছে ছোট। আমাদের পরিবারটা ছোট হলেও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আয় হীন পরিবারে যা হয়।

আমার লেখাপড়ার খরচ আমি নিজে থেকেই চালিয়ে নিতে সক্ষম হই।কিন্তু পরিবারের দিকেও দেখতে হয়।দু তিনটে টিউশনি করে আর কি-ই বা করা যায়।

বন্ধুদের সাথে আড্ডা শেষে আমি ব্লাড কেন্দের দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

সেখানে পৌছানোর পর সিরিয়াল ধরলাম।

প্রতি দু মাসে বা তিন মাসে আমি রক্ত বিক্রি করি। এই উপার্জনটাও আমাদের অভাবী পরিবারে কিছুটা প্রভাব ফেলে।

লম্বা একটা সিরিয়াল বাঁধিয়ে আছে সবাই। আমার পেছনেও দাঁড়িয়ে বেশকিছু লোক।

অনেকক্ষণ লাগবে।

হঠাত্ করে কোথা থেকে যেন একটা ছেলে দৌড়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল।

আমাদের টপকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।

কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে হরগোল শোনা গেল। লোকজনের ভীড়ে ভেতরে কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

একের পর একজন লোক শেষ হওয়ার পর আমার সিরিয়াল আসল। আমি ভেতরে ঢুকতেই দেখি রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে।

অবশ্য এটা দৈনন্দিনের কাজ।কিন্তু আজ বিশেষ ভাবে করা হচ্ছে।বিশেষ কারণটা হল যে ছেলেটা কিছুক্ষণ আগে ভেতরে ঢুকেছিল প্রবল অস্থিরতা নিয়ে।

আমার রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ।সেটা রিপোর্টে আসতেই ছেলেটা ঝট করে আমার কাছে এগিয়ে এসে বলতে লাগল,

-আপনার রক্তের গ্রুপ ও-পজিটিভ? থ্যাংকস গড!

আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম ছেলেটার কথাগুলো।

-আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি আমার সাথে আসুন।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম,

– কোথায় যাব আপনার সাথে?

-আহা সব জানতে পারবেন।আপনি আগে চলুন প্লিজ।

আমার হাত ধরে আমাকে টেনে নিয়ে গেল ছেলেটা।

আমি চুপচাপ হয়ে ছেলেটার সাথে হেঁটে চলছি।অবশ্য আমি কিছুটা গোমরা প্রকৃতির।কথা কম বলি ।

তাই কি হচ্ছে তা দেখে যাচ্ছি।

ছেলেটার সাথে ওর জীপে উঠলাম।

গাড়ি স্টার্ট করেই বলতে লাগল,

-আপনি রক্ত বিক্রি করতে এসেছেন? তাই না?

আমি ভারি গলায় বললাম,

-হুম।

-আমার ভাইয়ার ও-পজিটিভ গ্রুপের রক্ত।খুব ইমারজেন্সি একটা অপারেশন করাতে হবে।এই গ্রুপের ব্লাড পাচ্ছিলাম না কোথাও। শেষে এখানে এসেই মিলল।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম,

-কি হয়েছে আপনার ভাইয়ার?

ছেলেটা চুপ করে আছে। এরপর গম্ভীর কণ্ঠে বলতে লাগল,

-আমার ভাইয়ের একটা কিডনি অকেঁজো হয়ে গেছে প্রায়। অন্য একটাও যাবার পথে ।ধরা পড়েছে কিছু দিন আগে। হঠাত্ করেই আজ কেমন যেন অসুস্থ হয়ে পড়ে। গত দু তিন যাবতই এমন অবস্থা হয়ে ছিল। বিষয়টাকে আমরা গায়ে মাখিনি। পরে মারাত্মক ভাবে দূর্বল হয়ে পড়াতে আমরা হসপিটালে ভর্তি করিয়েছি। এখন অপারেশন করাতে হবে।কিডনি প্রতিস্থাপন করার জন্য।

আমি চরম বিস্ময়ে বিস্মিত হয়ে ছেলেটার কথা শুনছিলাম।আমাকে শেষমেশ কিডনি বিক্রি করতে হবে মনে হচ্ছে!

তারপরও বিস্ময় প্রকাশ করলাম না।বিক্রি করতেই দোষের কী!এই মূল্যহীন জীবন আর দুদিন টিকলেই বা কী!

-কি করে আপনার ভাই ?

আমার প্রশ্নের সাথে সাথেই গাড়ি হাসপাতালের সামনে পৌছে।

গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল,

-ইঞ্জিনিয়ার । আপনি এসব জিজ্ঞাসা করে সময় নষ্ট করবেন না প্লিজ। আমার সাথে চলুন।

ছেলেটার মুখ থেকে ইঞ্জিনিয়ার শব্দটা শোনা মাত্রই তিন দিন আগের সেই ঘটনাটা আবারও মনে পড়তে লাগল।

যতোই চাচ্ছি ব্যাপারটা একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। আমি ভুলে যাচ্ছি না কেন। কিন্তু ততোই তার উল্টো হচ্ছে ।

কিছু কিছু স্মৃতি হৃদয়ে দাগ কেটে রাখে এবং অম্লান হয়ে থাকে আজীবন। আর সেরকম কিছু স্মৃতিই আমি ভুলতে বৃথা চেষ্টা করছি।

-আসুন।আমার সাথে ভেতরে আসুন।

ছেলেটা আকুতিজড়িত কণ্ঠে আমাকে সাথে করে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশ করল।

ডাক্তার আমাকে দেখামাত্রই দাঁড়িয়ে গিয়ে বলতে লাগলেন

-পেয়েছেন?

ছেলেটা বলল হ্যাঁ।

ডাক্তার আমাদের দুজনকে ইশারায় তার পেছনে করে নিয়ে গেলেন।

একটা কেবিনে ঢুকার পর দেখলাম বেডে একটা ছেলে।আমি ধীর পায়ে সামনে এগোলাম।বেডে শুয়ে থাকা মানুষটার মুখ দেখতেই আমি চমকে উঠলাম।

কিন্তু এই মুহূর্তটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না কখনও।

আমার মাথা ঘুরে গেল।ঘূর্ণনের ফলে আমি পড়ে যাচ্ছিলাম।আমাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাল ছেলেটা।

ডাক্তার হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করল

-একি মিস্টার রাজ?আপনি এটা কাকে এনেছেন?ওনি তো দেখছি নিজেই রোগী।

রাজ নামের ছেলেটা আমার দিকে অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকাল।

আমি হৃষ্ট গলায় বললাম

-আমার কিচ্ছু হয়নি।আপনি যত দ্রুত সম্ভব আমার থেকে কিডনি নিন।কোনও রকম দ্বিধা ছাড়াই।আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।

ডাক্তার আর কথা না বাড়িয়ে বেডে শুইয়ে দিলেন আমাকে।

হাতে ইনজেকশনের একটা সুচ বিধে দিল।প্রকৃতি আমাকে অগভীর এক কষ্টের কল্পনার জগতে পিছিয়ে নিয়ে গেল।

-এই কে আছো!একটু এদিকে তাকাও প্লিজ।

রাস্তার ফুটপাথ ধরে হাঁটার সময় সেদিন এমন একটা চিত্কার শুনতে পাই।

চারিদিকে তাকাতে থাকি।বাতাসের গতিতে একের পর এক গাড়ি রাস্তা দিয়ে আসছে যাচ্ছে।কিন্তু চিত্কার করছে কে?

একটু খেয়াল করতেই দেখলাম পায়ের মাটির দিক থেকে আওয়াজ আসছে। ভয় পেয়ে বসি।

ধীরে ধীরে দুয়েক পা সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি একটা ছেলে ম্যানহলে পড়ে আছে।

ভূত না মানুষ তা আমি ঠাওর করতে পারছিলাম না।কর্দমাক্ত মুখ।

ছেলেটা সাহায্যের দৃষ্টিতে উপরের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল

-একটু টেনে তুলো প্লিজ।খুব গভীর এই ম্যানহলের রাস্তা।আমি উঠতে পারছিনা।

আমি দুহাতে ছেলেটাকে উপরে টেনে তুললাম।তাল সামলাতে না পেরে হ্যাঁচকা টানে ছেলেটা এসে আমার উপর পড়ল।

কিছুক্ষণ নীরবতার সাথে চোখে চোখ রাখা।

ছেলেটা ধপাস করে উঠে দাঁড়ায়।

আমি বললাম

-আপনি এখানে পড়লেন কি করে?

-কি বলব আর!ঢাকনা দেওয়া ছিলনা।আর নিচের দিকে তাকিয়ে কেই বা আর হাঁটে বল?

ছেলেটা তুমি করে বলছিল আমাকে। অবশ্য বলতেই পারে।আমার থেকে কমসেকম তিন বছরের বড় হবে।

ছেলেটার সংস্পর্শে আমার শার্টও ময়লায় জমে গেছে।

-ইশ!তোমাকেও তো নোংরা করে দিলাম?

আমি বললাম,

-না না।ঠিকাছে।

ছেলেটা ধন্যবাদ দিয়ে আমাকে ছোট করতে চাইলনা।বলল

-কোথায় যাবে?

-এই সামনেই যাব।ভার্সিটিতে পড়ছি।

-বল কি?তুমি এই ভার্সিটিতে পড়ো? অথচ আমি তোমাকে চিনিই না। অবশ্য চিনার কথাও নয়।এত স্টুডেন্টসদের মাঝে কীভাবে কি হয়!

-তাহলে চলো।একসাথেই যাই। আমিও ওদিকে যাব।

ছেলেটা একটা রিকশা ডাকল।

উঠে পড়লাম।জিজ্ঞাসা করলাম ওনাকে

-আপনিও কি এখানে পড়েন?

-হ্যাঁ।কিছু দিন আগে বেরলাম।এখন একটা জব করছি।

আমি অবাক চিত্তে জিজ্ঞাসা করলাম,

-আপনি কি ইঞ্জিনিয়ার?

ছেলেটা মুচকি হেসে উত্তর দিল

-হুম।

ছেলেটা জিজ্ঞেস করল

-তুমি কোন ইয়ারে পড়ছ?

-ফার্স্ট ইয়ারে।

-বাবা মার সাথে থাক এখানে?

-না।আমি গ্রামের।এখানে একটা মেসে কষ্টে শিষ্টে দিন কাটিয়ে দেই।

ছেলেটা করুণ একটা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকাল।

ততক্ষণে রিকশা ভার্সিটির সামনে পৌছে গেছে।

আমি নেমে গেলাম।ছেলেটা পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে ভাড়া দিল। এতগুলো টাকা হাল্কা ভিজে রয়েছে।

-রাস্তার ওপাশেই আমাদের ফ্ল্যাট।তোমার নাম্বারটা হবে?

আমি আমার মোবাইল নাম্বার ওর ফোনে তুলে দিয়ে চলে গেলাম ভার্সিটিতে।

এভাবেই পরিচয় হয় আমার অরণ্যের সাথে।

আমাকে নিয়মিত ভার্সিটিতে ড্রাইভ করে দিত।মেসে পৌছে দিত।

শহরের বাইরে অনেক জায়গায় ঘুরাতেও নিয়ে গিয়েছিল ওর গাড়িতে করে।

আমার পরিবারের অসচ্ছলতা সম্বন্ধে সে সব কিছু ধারণা করেই বোঝে নিতে পারে।

আমার প্রতি অনেক ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল।আমি গ্রহণ করিনি। পরে একদিন প্রশ্ন করে

-তুমি আমার কাছ থেকেও এসব সাহায্য মনে কর?

-এটাই স্বাভাবিক নয় কি?আপনি কে হন আমার বলবেন প্লিজ।আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছে।ভাল একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।সেরফ এতুটুকুই। আপনি আমার খুব আপন কেউ?!

নিশ্চুপে সব শুনে গেল অরণ্য।চোখে মুখে কাঠিন্যের একটা ছাপ রেখা তুলে দিয়েছে।চোখগুলো একটা হিংস্র দৃষ্টির হয়ে গেছে।

আমি বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারলাম না।হনহন করে চলে এসেছিলাম।কথাগুলো সত্য বলছি বটে কিন্তু মন সায় দেয়নি।

আমার জন্য সবকিছু করতে পারত অরণ্য তা আমি বুঝে গিয়েছিলাম।

কিন্তু ওর পরিবারের বিরুদ্ধে যেয়ে ও আমার হাত ধরে এমন একটা নামহীন নিষিদ্ধ সম্পর্কে আসতে বিমুখ ছিল।

অরণ্যের পরিবার ছিল উচ্চ শিক্ষিত।যথেষ্ট প্রভাব শালী।

আর ও কিনা আমার সাথে যায়?এটা তো অস্বাভাবিক।আমাকেও ছেড়ে থাকতে পারেনি;পরিবারের থেকেও আলাদা হতে চায়নি।

তাই সবটুকু রাগ ঝেরেছিলাম ওর উপর সেদিন।আরও নানান কটু কথাও শোনাই।ওর এসব প্রাপ্য ছিল।আমি ওকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম জীবন থেকে।

পরে একদিন ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে অরণ্য আমাকে একপ্রকার জোর পূর্বক গাড়িতে ঢুকায়।সিট বেল্ট লাগিয়ে দিয়ে অরণ্য গাড়ি স্টার্ট দেয়। আমি ভয়ার্ত গলায় বারবার প্রশ্ন করি কোথায় যাচ্ছি?

খিপ্ত গতিতে গাড়ি চালিয়েই যেতে থাকে অরণ্য।

আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়েই।আমি মিথ্যা রাগ দেখিয়ে অরণ্যকে বলতে থাকি,

-শুনুন,এখানে গুন্ডামি করলে ফল কিন্তু খুব খারাপ হবে।আপনি গাড়ি থামান।আমি নেমে যাব।

কিন্তু সেদিকে কোনও রকম ভ্রুক্ষেপই যেন নেই ওর!

কিছু দূর যাওয়ার পর একটা ফ্ল্যাটের সামনে এসে থামে।

আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকে।

দরজা খোলে ভেতরে প্রবেশ করে অরণ্য।

ফ্ল্যাটের ভেতরটা দেখেই যে কেউ বিস্মিত হবে।

আমি কিছু বোঝে উঠার আগেই অরণ্য আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। হাতে একটা আংটি জ্বলজ্বল করছে।

কাতর কণ্ঠে বলতে থাকে,

-উইল ইউ মেরি মি?

আমার মুখ থেকে কিছু বের হলনা।

নির্বাক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছি।

অরণ্য আমার হাত টেনে নিয়ে আঙুলের মধ্যে পড়িয়ে দেয়।

আমি কিছু মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

প্রকৃতিতেও স্তব্ধতা।

অরণ্য আলতো করে আমার হাতে একটা চুমু খেয়ে বলতে থাকে,

-আমি তোমাকে নিজের জীবনের চাইতে ও বেশি ভালবাসি।তোমাকে ছাড়া আমার একমুহূর্তও চলবেনা। তুমি জানো,তোমার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি নির্দ্বিধায়।আমার সবটা জুড়ে তুমি ছিলে,আছো,থাকবে।

পলকহীন আমার দুচোখ।

গাল বেয়ে চোখের কয়েক ফোটা জল পড়ল।

অরণ্য উঠে এসে জল মুছে দাও।

খুব কাছে টেনে নিল।চোখের ভাষায় প্রেমিকযুগল একে অপরের হৃদয়াবেগ বুঝে নিচ্ছে।

বুক ফেটে দমিয়ে রাখা সবটুকু চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল।

অরণ্যকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম বুকে।একদম মিশিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল।

অরণ্যের বুকে মাথা গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠলাম।

অরণ্য আমাকে বুক থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলতে লাগল,

-তুমি কি ভেবেছিলে নিজেকে? সবকিছু তুমি একাই ত্যাগ করতে জান?আমি জানিনা।তুমি সেদিন আমাকে ত্যাগ করে দূরে ঠেলে দিতে চাইলেও পারনি।তোমার চোখের ভাষাটাই তো আমার আয়ত্তে।যাকে ভালবাসি তার এটুকু আমার আওতায় থাকবে না?

তাই সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আমি আমার ভালবাসার আশ্রয়ে এসেছি।ফিরিয়ে দেবে নাকি ভালবাসায় ভরিয়ে দেবে এই তৃষ্ণার্ত হৃদয় সেটা এখন আপনার ব্যাপার?

দুষ্টুমির ভঙ্গিতে কথাটা বলল অরণ্য।

আমি নীরবতা কাটিয়ে বললাম,

-আমার ভালবাসা আমারই হবে সেই বিশ্বাস আমার ছিল।আমি তো এই অপেক্ষাতেই ছিলাম।আমার অরণ্য বাবুটার সাথে একসাথে জীবন কাটাব।

আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে পুরো ফ্ল্যাটের দিকে ইশারায় বলতে লাগল অরণ্য,

-এই যে এই পুরো ফ্ল্যাটে তোমার আর আমার বিস্তরণ হবে শুধু।আমি অফিসে যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট চুমু আর অফিস থেকে ফেরার পর আরেকটা।আমার বিনিময় জাস্ট এটুকুই।

আমি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম আমার অরণ্যের দিকে।হতবাক চিত্তে বললাম,

-এত ভালবাস?

-হুম।কিছুই তো প্রকাশ পায়নি এখনও।

সত্যিই।

আমি তখনও উপলব্ধি করতে পারিনি যে আমার জন্য কি কি করতে পারে অরণ্য।

চারিদিকে চোখ বুলিয়ে অরণ্যের পায়ের পাতার উপর আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে ডুবে গেলাম তার ঠোঁটে।

আমাকে জড়িয়ে ধরল অরণ্য পরম ভালবাসায়।একে অপরের ওষ্ঠদ্বয় পান করে গেলাম কিছুক্ষণ।

এরপর অরণ্য আমাকে কোলে তুলে নিল।

আমার চোখের দিকে তার চোখ রেখে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল।

একটা বিছানায় নিয়ে আমাকে শুইয়ে দিল।

অরণ্যের তীব্র পৌরুষত্ব আমাকে মাতাল করে দিল।আমার ঘাড়ের কাছে তার লালা যুক্ত দুটি ঠোঁট ছুঁয়ে যেতে থাকল।

ধীরে ধীরে সীমানা বাড়তে বাড়তে নেমে এল আমার বুকে,আমার নাভীতে আমার দেহের প্রতিটি স্পর্শকাতর কোণায় কোণায়।

আমি বারবার শিউরে উঠে নিমজ্জিত হলাম ভালবাসা গভীর এক অনুভূতির জগতে।পৌছে গেলাম ভালবাসার সর্বোচ্চ শিখরে।

মিশে গেলাম একে অপরের মাঝে।

———-

আমাকে টিউশন করাতে দিতনা অরণ্য।আমি ওর কথার অবাধ্য হওয়ায় ধমকে আমাকে একদম জমিয়ে ফেলেছিল একদিন।পরে আবার রাগ কমিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-মাস শেষে সরকার আমাকে ষাট হাজার টাকা কি জন্য দেয়?

আমি ঘাড় নুইয়ে চুপচাপ তার কথা শোনে যাচ্ছিলাম।আমার থুতনিতে হাত রেখে বলল,

-হৃদয়! তোমার পরিবার,তোমার চাওয়া পাওয়া সবকিছুই তো আমার।

আমি না বলতেই অরণ্য কীভাবে যেন বলে দিল আমার ভেতরে যা চলছে।

অরণ্য বলল,

-তুমি কী ভাব?আমি কিচ্ছু টের পাইনা?আমি তোমার আত্মায় মিশে গেছি যে সেটা তো নিশ্চয়ই জানো। সুতরাং ……

আজ থেকে আমি আমার হৃদয় বাবুর পরিবারকে একদম আপন করে নিলাম।

আনন্দে আমার চোখ ফেটে অশ্রু বেরতে শুরু করল।আমি বিস্মিত হয়ে অরণ্যকে জড়িয়ে ধরলাম।

———–

অরণ্য যেদিন তার বাবা মাকে সময় দিত সেইদিন গুলো খুব কষ্টে কাটত। বাবা মায়ের খুব আদরের ছেলে অরণ্য।তাই মুখের উপর কঠিন কথা বলতে সক্ষম ছিলনা সে।আর আমিও চাইনি এমন কিছু হোক যাতে অরণ্যের মধ্যে যন্ত্রণা দায়ক বস্তুটা বসত করে নিতে পারে,অরণ্যের বাবা মা ওকে ঘৃণিত চোখে দেখে।

গ্রামে বাবা মার মুখে হাসি ফুটে উঠল। আমার আর কোনও রকম মানসিক কষ্ট রইলনা।

অরণ্যের সাথে গাড়িতে করে মাসে একবার গ্রামে যেতাম।সেখানে গিয়ে একনজর আমার পরিবারকে দেখে আবার চলে আসতাম।

একদিন অরণ্য অফিস থেকে ফেরার পর ছাদে গিয়ে বসে রইল।

আমি পুরো ফ্ল্যাটে ওকে না পেয়ে ছাদে উঠি।

দেখি কপালে হাত রেখে ঘাড় ঝুঁকিয়ে বসে রয়েছে অরণ্য।

চোখেমুখে দুঃশ্চিন্তার স্পষ্ট ছাপ উঠে রয়েছে।

আমি কাছে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখতেই ও বাচ্চাদের মত কাঁদতে কাঁদতে আমার বুকে মাথা গুঁজে দেয়।

অরণ্যের এমন আচরণে আমি যার পর নাই অবাক হলাম।

কখনও কাঁদতে দেখিনি ওকে।কি হল এমন?

প্রশ্ন করতেই কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

-বাবা আমার বিয়ে দিতে চাইছে।

আমি কিছু বললাম না।

চারিদিকে সুনসান নীরবতা।আমি বললাম,

-কেঁদো না।ভাবো,তোমার যা ভাল মনে হয় তাই করো।

আর কিছু না বলে একরাশ কষ্ট নিয়ে রুমে এসে শুয়ে পড়ি।

সকালে ঘুম থেকে উঠার পর অরণ্যকে খুব স্বাভাবিকই দেখতে পেলাম।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,

-কি সিদ্ধান্ত নিলে?

অরণ্য স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দিল,

-সিদ্ধান্ত নেওয়ার কি আছে?যাকে ভালবাসি তাকে ছেড়ে আবার কোথায় যাব!

সেদিন নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে সুখী মানুষ মনে হয়েছিল।

কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়না।আমার ক্ষেত্রেও হলনা।

বেশকিছু দিন পর অরণ্য বদলে যেতে যেতে একদম পুরোপুরি বদলে গেল।

আমাকে এখন আর ওর ভাল লাগেনা।

ও বিয়ে করতে চায়।সংসার করে সুখী হতে চায়।

আমাকে ত্যাগ করে দিয়েছে অরণ্য।

আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অরণ্যকে যেন ছেড়ে দেই।

আরও যত্রতত্র কথা শোনাল।

ওর মুখ থেকে এসব কথা খুব স্বাভাবিক ভাবেই বেরল।আমি সেদিন একদম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।মরাকাঠের ন্যায় শরীর জমে গিয়েছিল।হিমশীতল হয়ে আসছিল প্রপাতিত রক্ত।

আমি জ্ঞান হারাই সেদিন অরণ্যের এমন আচরণে।জ্ঞান ফেরার পর ভাবি আত্মহত্যা করব।

তখনই বাড়ি থেকে ফোন আসে। মায়ের গলাটা শোনার পর সেদিকে এগোতে সাহস পাইনি।ভেবে নিয়েছিলাম এসব দুঃস্বপ্ন। ভুলে যাব সময়ের সাথে।

তাই গুটিয়ে নিয়ে পথ চলতে শুরু করেছিলাম।

কিন্তু আবারও আটকে গেছি জীবন নামক পথে।আমার ধারণা ভুল ছিল তবে?অরণ্যের ভালবাসা উপলব্ধি করার ক্ষমতা আমার ছিলনা।তাই হয়তো ওর চোখে জল আর মুখে নাটকীয় কথা শুনতে পেয়েই আমি ভেঙে পড়েছিলাম।

অরণ্যের বাবা মা এসে দেখে চিত্কার জুড়ে দিয়েছিল খানিকক্ষণ বাদে।ওর বাবা এসে কিডনির বিনিময়ে আমাকে একটা চেক দিতে চেয়েছিল।আমি না করে দেই।

আমার থেকে কিছুক্ষণ আগে কিডনি নেওয়া হয়েছে।অথচ আমি ভীষণ সুস্থতা বোধ করছি-মানসিক ভাবে।

তবে শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছে।আমি তো মানসিক ভাবেই একদম দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিলাম।এ কোন দৃশ্যের সম্মুখীন হলাম আমি।

বাহির থেকে ডাক্তারের কথোপকথন শুনতে পেলাম,

-হ্যাঁ।স্বাভাবিক ভাবেই আপনাদের অরণ্য সুস্থ থাকতে পারবে। তবে প্রতি ছ’মাসে ওর শরীরে রক্ত প্রদান করতে হবে।কিন্তু দুর্ভাগ্য যে অরণ্যর গ্রুপের রক্ত খুব কমই পাওয়া যায়।

গভীর এক স্বস্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম আমি।ধন্য হলাম।ভালবাসার ত্যাগ-আত্মত্যাগের এই দাড়িপাল্লায় আমার পাল্লাটাই যে ভীষণ হাল্কা।শোধ করতে হবে তো সেসব।সেই সুযোগটা স্রষ্টা আমাকে দিয়েছে এটুকুই অনেক।আমার অরণ্যকে আমি বাঁচিয়ে রাখব যতদিন এ দেহে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্তও থাকে।

কেবিনে আমি ছাড়া আর কেউ নেই।জ্ঞান ফিরেনি এখনও অরণ্যর।আমি কাপা কাপা শরীরে ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে অরণ্যের বেডে গিয়ে বসলাম।

প্রকৃতিতে পীণপতন নীরবতা।

শব্দ নেই কোনও রকম।

বুকের ভেতরে দলাপাকানো সমস্ত কষ্টের ঝঞ্জাট অশ্রু হয়ে চোখ দিয়ে অনবরত বেরচ্ছে।

আমি একদম ঝুঁকে গিয়ে অরণ্যের বুকে আমার মাথা গুজঁলাম।ঢিবঢিব করা শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি অরণ্যের।এই নিশ্বাসটাকে আজীবন সতেজ রাখতে হবে সেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞিত হলাম।

ভালবাসায় ত্যাগ কি শুধু এক তরফাই হয়ে যাবে?অরণ্য কি শুধু নিজেই জিতে যাবে?

না।আমারও রয়েছে।

‘তোমাকে আমার দ্বারা বাঁচিয়ে রাখতে পারাতেই আমার স্বার্থকতা।অনেক ত্যাগ করেছ তুমি।বিজয়ী হয়েছ অনেক।এবার আমার পালা।’

অরণ্যের কানের কাছে মুখ ঘেঁষে বললাম।জ্ঞানহীন অরণ্য সেসব শুনতে পেলনা।

____________

সমাপ্ত

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.