আকাশের যত রঙ

এক
সকালে ঘুম ভাঙলো মায়ের চিৎকারে । আপু কে বকছে আর ধুমধাম করে মারছে মা। আপুর দোষ সে সাজগোজ করে লাল শাড়ি পরে কলেজে যাচ্ছে। আজকে নাকি বিশ্ব ভালবাসা দিবস। তাই সবাই নাকি লাল শাড়ি পরে যাবে। আপু কে মারার আর বকার ইতিহাস এটাই।
আমাদের বাসা অন্য সব বাসার মত নয়। আমার বাবা একদম চুপচাপ শান্তশিষ্ট মানুষ। কারো সাতে পাঁচে থাকে না। আমাদের কে মারধোর তো দুরের কথা একটা বকাও দেন না। আর মা হচ্ছে উল্টা। মারধোরের রানি। আমাকে তো মারেই। আপুকেও ছাড়ে না। বাজারে গেলে গলা ফাটায় ঝগড়া করে মাছওলার সাথে এক টাকা কমানোর জন্য।
আমার স্কুলে ছুটি চলছে ।ক্লাস টেনে পড়ি ।স্কুলে যাওয়া লাগছে না। কিন্তু সকাল সকাল ঠিক উঠতে হয়। মা বলে কথা। মা চিৎকার করছে
– এই যে নবাবজাদা , বলি ঘুম কি ভাংবে না? কতক্ষণ নাস্তা নিয়ে বসে থাকবো।
– মা তুমি না! এখন আমার ছুটি চলছে। একটু ঘুমাতে দাও
– বাহ ! সকাল ৭ টা বাজে এখনো নবাবজাদা ঘুমাবেন? স্কুল ছুটি হয়েছে বলে কি বাড়ির সব নিয়ম কানুন বিসর্জন দিতে হবে?
এরপর না উঠলে মার খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। উঠে দেখি আপু বাথরুমের দরজা বন্ধ করে কাঁদছে। কি মুশকিল। আমি বেশ কয়েকবার দরজা ধাক্কানোর পর আপু দরজা খুলে বের হল। চোখ মুখ ফুলে আছে। বোঝা যায় কেঁদে কেটে একাকার করেছে।
নাস্তার টেবিলে এসে দেখি আপু নাই। সে কোনমতে কিছু নাকে মুখে গুঁজে নিজের ঘরে চলে গিয়েছে। মা গজগজ করছে
– আরেকজনের উঠার নাম নেই। বাজারটা কে করবে শুনি। আমি বাবা পারবো না।
বুঝলাম বাবা এখনো ঘুম থেকে উঠে নাই।
ঘরে গিয়ে দেখি আপু মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। বায়নোকুলার দিয়ে জানালা দিয়ে কি জানি দেখছে। এই হল আমার আপু। সুন্দর ছেলে দেখলে আর কিছু মাথায় থাকে না। নিশ্চয় পাশের বাড়ির ছাদের ঘরে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। পাশের বাড়ির কাকুর ছাদের ঘরটা সাধারণত ব্যাচেলাররাই ভাড়া নেয়। আমি বললাম
– আপু কি দেখছো?
– দেখ না কি হ্যান্ডসাম ছেলে। আমি তো ফিদা হয়ে গেলাম।
আমার আপু এমনই এসব ব্যাপার নিয়ে আমার সাথেও আলোচনা করবে। কোন ছেলে হ্যান্ডসাম। কোন ছেলে আবার প্রপোজ করেছে এই সব আর কি।
আমাদের শহরটা ছোট। শহরের নাম অচিনপুর।ময়ূরাক্ষী নদীর পারে অবস্থিত। পাহাড়ও আছে। ঢাকা শহর থেকে অনেক দূরে। কিছুটা দুর্গম বলা চলে। তাই লোক সংখ্যা কম।আর এই শহরের ডাকসাইটে সুন্দরী আমার আপু লুবনা। আমি বললাম
– দেখি বায়নকুলারটা
– দেখ দেখ
আমি তাকালাম । একদম বড় একটা ধাক্কা খেলাম। আসলেই হ্যান্ডসাম। এত সুন্দর ছেলে খুব কম দেখা যায়।ছেলেটা বারান্দায় ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করছে।
চুপি চুপি বলে রাখি আমি কিন্তু সমকামী।আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন তা বুঝতে পারি। কিন্তু কাউকে বলি নাই। আমি একটু আঁতেল টাইপের। সারাক্ষণ বই পড়ি।পড়তে পড়তে চোখে চশমাউ নিয়েছি।স্কুলের লাইব্রেরির অর্ধেক বই পড়ে ফেলেছি। একটা বই পড়তে গিয়ে আমার সমকামিতা সম্পরকে ধারণা হয়। নিজের সাথে মিলিয়ে বুঝলাম আমিও সমকামী। প্রথমে খুব ভয় পেয়েছিলেম।আমি সবার থেকে আলাদা এটা ভেবে। কিন্তু পরে জানলাম পৃথিবীর প্রায় দশ ভাগ মানুষ এমন। তাহলে নিশ্চয় আমার শহরেও আমার মত অনেকেই আছে। একদিন নিশ্চয় কারো না কারো দেখা পাবো।আর এই অনুসন্ধান এখনো চলছে। আমার বন্ধুবান্ধব খুব কম । হাতে গোনা কয়েকজন। কিন্তু তাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব খুব দৃঢ়।এমন কি তাদের কেও আমি বলি নাই আমি সমকামী। আমাদের সমাজে সমকামী হওয়া খুব অন্যায়। তাই বলে ফেললে যদি কোন সমস্যা হয়?
আমাদের বাড়ি টা দোতালা। ছাদ টা শুধু আমার আর আপুর। যখন মন খারাপ হয় তখন আমরা ছাদে সময় কাটাই ।আপু কে দেখলাম দৌড়ে ছাদে উঠছে । আমি একটু পর ছাদে উঠলাম। আপু কি করছে তা তো আমার দেখতেই হবে। দেখলাম দুজনের মাঝে চোখের ইশারায় ভাব বিনিময় হয়ে গিয়েছে। আপু আমাকে দেখে চোখ পাকিয়ে বলল যে ,
– এখানে কি?যা পড়তে যা
আপু আমাকে চোখের ইশারায় চলে যেতে বলল। বুঝলাম আপু প্রাইভেট সময় কাটাবে ওর সাথে।
কিছুক্ষণ পর দেখলাম আপু খুশি মনে নিচে নামছে। মানে মিশন সাকসেসফুল। আপু খুশি হবেই বা না কেন কারণ ছেলেটা আসলেই অনেক ড্যাশিং। আপু আমাকে ডেকে বলল
– যা পিঠা গুলো ঐ বাড়িতে দিয়ে আয়।
– মানে কি বলতেছ তুমি?
– যা বলছি বুঝে শুনেই বলছি।
এদিকে মা চিৎকার করছে
– কার বাসায় পিঠা পাঠাচ্ছিস ?
– কার বাসায় আবার সালেহ কাকুর বাসায়। যা যা দিয়ে আয়।
আমাকে জোর করে ঘর থেকে বের করে দিল পিঠা দিয়ে আসার জন্য। আমার যে কি বিব্রত লাগছে । চিনি না জানি না পিঠা নিয়ে যাবো।
ছেলেটা সালেহ কাকুর বাসার দোতালায় থাকে।যাই হোক পিঠা নিয়ে সালেহ কাকুর বাসার সিঁড়ি দিয়ে উঠছি আর ভাবছি পিঠা দেখে ছেলেটার চেহারা কেমন হয়। অবশ্য এত সুন্দর ছেলের সংস্পর্শে আসা যাবে। এটাই বা মন্দ কি? কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলল ছেলেটা …।আমাকে দেখে হেসে বলল
– লুবনা পাঠিয়েছে না?
আমি তো থ। তার মানে আমার জানার আগেই তাদের মাঝে কথাও হয়ে গিয়েছে। এত স্পাইং করেও এটা আমি ধরতে পারলাম না। নাহ এটা কোন কথা হল। আমি ঘরে এসে ঢুকলাম। বাহ সুন্দর করে সাজানো ঘর। সাধারনত ব্যাচেলর দের ঘর এত সুন্দর সাজানো হয় না। আমি বেশ অবাক হয়ে বললাম
– আপনি আপু কে চিনেন?
– চিনবো না কেন? না চিনলে পিঠা পাঠাবে কেন?সে আমার বন্ধু।তুমি লুবনার ছোট ভাই লাবু তাই না?
– হম
– তোমার আপু কে বল আজকে শাড়ি পরে বের হতে পারে নাই তো কি হয়েছে? পরে কোন দিন বের হওয়া যাবে।মন খারাপ যেন না করে।
ও এই ব্যাপার তাহলে এর সাথে শাড়ি পরে বের হওয়ার কথা ছিল। কলেজ টলেজ সব বানানো কথা। আমি বললাম
– আচ্ছা বলবো
– এখন তোমার কথা বল। সিগারেট খাবে?
এই প্রথম আমার থেকে কোন বয়স্ক লোক আমাকে সিগারেট অফার করলো যেন আমরা বন্ধু।আমি বললাম
– না
– হুম সিগারেট না খাওয়া ভাল। কর্কট রোগ হয়।চা তো খাবে?
– হ্যাঁ চা খাওয়া যায়।
আমি একটা বেতের চেয়ার টেনে বসলাম। আর লোকটা খাটে। তারপর এটা সেটা নানা কথা হল। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম লোকটা ব্যবসার কাজে আমাদের শহরের এসেছে আর উনার বাড়ি ঢাকায়।উনার নাম পিয়াল।প্রায় আধা ঘণ্টা গল্প করলাম।
যখন বাড়ি ফিরছি মাথায় নানা চিন্তা খেলা করছে। আপুর সাথে কি লোকটা প্রেম করছে?কিন্তু লোকটা খুব সুন্দর করে কথা বলে। লোকটা সমকামী হলে আমি প্রেম করতে চাইতাম।
বাড়ি ফিরে দেখি আপু অধৈর্য হয়ে বসে আছে।
– এতক্ষণ এ আসলি? কি করলি এতক্ষণ ?
– কি করবো গল্প করছিলাম। আর তোমাকে বলেছে শাড়ি পরে বের হতে পারো নাই দেখে মন খারাপ না করতে। আরেকদিন সে তোমাকে নিয়ে বের হবে
এইবার আপুর মুখে লজ্জা।ভয় ও রয়েছে।
– এই তুই কিন্তু খবরদার বাসায় কিছু বলবি না। বললে তোর খবর আছে।
আমি হেসে বললাম
– তাহলে ১০০ টাকা দাও আইস্ক্রিম খাবো।
– যা ফোট এত টাকা লাগে নাকি আইস্ক্রিম খেতে। এই ধর ৫০ টাকা । এ দিয়ে যা খুশি খেয়ে নেয়।
সেইদিন পড়তে বসার পর মনোযোগ দিতে পারছি না। বার বার পিয়াল ভাইয়ার চেহারা চোখে ভেসে আসছে। কি মায়া কাড়া মুখ। ৬ ফিট লম্বা। ফরশা গায়ের রঙ। ইশ আমার যদি এমন একটা বয়ফ্রেন্ড থাকতো। তার উপর কি সুন্দর করে কথা বলে।
দুই
হটাত করে আপু আজকে আমাকে নিয়ে বের হবে। কই যেন যাবে। কিছুই বলছে না। মা কে বলছে বন্ধুর বাসায় যাবে। আমাকে সাথে নিয়ে গেলে মা কিছু বলে না। কিন্তু আমার একটুও ইচ্ছা করে না। আপুর বান্ধবী রা বসে গল্প করে আর আমি বহিরাগতদের মত চুপ করে বসে থাকি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হচ্ছে। না গেলে মা দিবে বকা। বের হতে দেখলাম বাবা বসে টিভিতে টক শো দেখছে। সে কোন সাতেও থাকে না পাঁচেও থাকে না। আপু বেশ সেজেগুজে বের হয়েছে। রিকশা নিয়ে বলল
– পুরাতন মন্দির চলেন
আমি তো অবাক। পুরাতন মন্দির এলাকাতে তো আপুর কোন বান্ধবী থাকে না। আমরা মন্দির এলাকায় ঢুকে দেখি পিয়াল হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে এই ব্যাপার ?প্রেম করতে আসা হয়েছে।মন্দিরটা বেশ বড়। সামনে একটা বড় দীঘি আছে।চারপাশে অনেক গাছ।দীঘির জলে গাছের ছায়া। আমাকে মন্দিরের সামনে বসিয়ে তারা দুইজন দীঘির একটা গাছের আড়ালে চলে গেলো।আধা ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে। তাও আসে না। অবশেষে একঘন্টা পর দুইজন হাসি মুখে হাসছে। আপু কে দেখলেম একটা খাম জোর করে পিয়ালের পকেটে ঢুকিয়ে দিল। কিসের প্যাকেট।
এইবার পিয়াল হেসে বলল
– অনেক বিরক্ত হয়েছ নিশ্চয় । আসলে তোমার আপুর তো কথাই শেষ হয় না।
মনে মনে ভাবলাম তা আমার চেয়ে বেশি কে জানবে।পিয়াল পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করলো।
– লাবু খাবে? অহ তুমি তো সিগারেট খাও না। তোমার জন্য আগামী দিন চকলেট নিয়ে আসবো
আমার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেলো
– আমি এত ছোট না যে চকলেট খাই
– ও তাই বুঝি? কিন্তু আমি তো এখনো খাই।
আপু মাঝখান থেকে বাধা দিল।
– এখন যেতে হবে। এর বেশি দেরি করলে আম্মু বিরক্ত হবে।
আমরা পিয়াল কে বিদায় জানিয়ে রিকশায় উঠলাম। দেখছি আপু গুন গুন করে গান গাইছে।
আমারও পরানও যাহা চায়…।।
আমার হাসি পাচ্ছে। আপু কি তাহলে আসলেই প্রেম পড়ে গেলো ?
তিন
আজকাল খুব বিরক্ত লাগে। রাত হতেই মোবাইল টা কানে নিয়ে গুজুর গুজুর করতেই থাকে আপু। আপুর এই প্রেম আমাকে ভীষণ প্যারা দিচ্ছে। আপু ডেট করতে গেলে আমাকেও যেতে হয়। পিয়াল কে দেখলে অবশ্য ভালই লাগে। কিন্তু আরও ভাল লাগে তার কথা শুনলে কত কিছু জানে।
মাঝে মাঝে আমি পিয়ালের বাসায় যাই । আপু পাঠায় এই কাজে সেই কাজে।একটা ব্যাচেলর মানুষ এত টিপটপ হয় কি করে। আসবাব তেমন নাই। তারপরও যা আছে তাও সুন্দর করে সাজানো।বিছানার চাদর আর পর্দার রঙ পর্যন্ত ম্যাচ করা। পিয়ালের বাসায় গেলে অনেক গল্প হয়। সে অনেক কিছু জানে। একজন ব্যবসায়ী মানুষ এত কিছু জানে ভাবতেই অবাক লাগে। ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা কথা বলেছি। ভাইয়া র প্রেমে পরে যাচ্ছি। আপুর বয়ফ্রেন্ডের সাথে প্রেম। খুব খারাপ। আমি এসব চিন্তা জোর করে মাথা থেকে সরিয়ে দেই।
পিয়াল খুব সুন্দর ছবি আঁকে । আমার একটা পোট্রেট নাকি আঁকবে। আমি বললাম
– আমার ছবি না এঁকে আপুর ছবি আঁকেন
– আরে ও তো সব সময় আছে। যে কোন সময় আঁকা যাবে।
– কেন আমি কি হারিয়ে যাবো নাকি ?
– কে জানে? এমন কি আমিও হারিয়ে যেতে পারি।
পিয়াল ভাইয়ার এসব দার্শনিক কথা ভাল লাগে না।

চার
আজকাল আপুর বিয়ের কথা খুব বলছে মা। কিন্তু আপু চিন্তিত না। কারণ পিয়াল ভাইয়া যথেষ্ট উপযুক্ত পাত্র।মা , বাবার পছন্দ না করার কোন কারণ নাই। আপু পিয়াল ভাইয়া কে বলেছে পিয়াল ভাইয়ার বাবা মা কে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে। কিন্তু ভাইয়ায় গা করছে না। এটা নিয়ে আপু আর পিয়ালের প্রচন্ড কথা কথা কাটাকাটি হয়। শেষ পিয়াল রাজি হল বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে।
কিন্তু আজ সকাল থেকেই আপু মন মরা হয়ে বসে আছে। ফোনটা হাতে নিয়ে শুধু বার বার টিপছে। এদিকে আজকে আপু কে পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে। আমার মায়ের ধারণা হয়েছে এটাই বিয়ের আসল সময়।নাহলে মেয়ে কার না কার সাথে প্রেম করে!প্রেম করে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলে আরও বড় সমস্যা।তাই এখনই বিয়ে দিতে হবে।এখন কি হবে সেই চিন্তায় আমি আর আপু দুইজনেই ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু পিয়াল কে বিয়ের কথা বলে প্রস্তাব পাঠানোর কথা বলতেই পিয়াল কালকে থেকে আর ফোন ধরছে না। আমি বললাম
– আপু আমি কি একবার পিয়াল ভাইয়ার বাসায় যাবো।
– হ্যাঁ হ্যাঁ যা না ভাই একবার । আমারও তাই মনে হচ্ছিল যে তোকে বলবো পিয়ালের বাসায় যেতে।
আমি বের হয়ে গেলাম। বেলা বাজে ১২ টা । বিকেল ৩ টায় আসবে আপু কে দেখতে। আমি পিয়াল ভাইয়ার ঘরের সামনে এসে দেখি দরজায় তালা মারা। আমি যেয়ে নিচে সালেহ কাকুর বাসায় গেলাম।কাকু বসে বসে চা খাচ্ছেন আর পেপার পড়ছেন ।আমাকে দেখে বলে উঠলেন
– কি ব্যাপার লাবু কেমন আছ?
– কাকু ভাল আছি
– তোমার বাবা কেমন আছেন। অনেকদিন যাওয়া হয় না এদিকে। এত কাছে থাকি তারপরও । আসলে বয়স হলে যা হয়। কোমরের ব্যথা আর পায়েয় ব্যথায় কোথাও নড়তে ইচ্ছা করে না।বস লাবু পেঁপে খাও।আমার বাগানের পেঁপে । খুব মিঠা।
আমি পেঁপে মুখে দিলাম। আসলেই মিষ্টি। এইবার আসল কথা পারলাম আমি।
– কাকু পিয়াল ভাইয়ের ঘরে তালা দেখলাম
– হ্যা পিয়াল তো বেশ কয়েক দিনেরজন্য কোথায় জানি গিয়েছে।
– কোথায় গিয়েছে ?
– তা তো বলে যায় নাই বাবা। কিন্তু পিয়াল কে দরকার কেন?
– না একটু পড়া বুঝতাম তো
– হ্যা পিয়াল খুব বুদ্ধিমান ছেলে। যাই হোক কিছু দিন পর তো চলেই আসবে। তখন এসো ।
– আচ্ছা কাকু আমি আসি।
আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো । আপু কে কি বলবো আমি বাসায়্ যেয়ে। বাসায় যেয়ে দেখলাম আপু কে সাজানোর সব প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। আপুর চোখে পানি। সে বিয়ে করবে না। বুঝলাম মা ধুমধাম মাইর দিয়েছে। পাত্র ভাল পুলিশ ইন্সপেক্টর। পছন্দ হলে বিয়ে হয়েও যেতে পারে।আমি সব কথা খুলে বললাম আপু কে এক ফাঁকে। আপু চোখে আরও পানি। মোবাইল নাকি আর ওপেনই করেনাই পিয়াল। তাহলে কি পিয়াল আপুর সাথে গেম খেলল। প্রেম করলো কিন্তু বিয়ে করলো না। আপু কে শাড়ি পরিয়ে পারলারে নিয়ে গেল মা। আপু মোবাইল ফেলে গিয়েছে। আমি পিয়ালের মেসেজ গুলো পড়ার কৌতূহল সংবরণ করতে পারলাম না। অনেক মেসেজ। প্রথম মেসেজ পড়লাম ।
“ কালকে আমাকে ১০০০ টাকা দিতে পারবে লুবনা? আমি খুব বিপদে আছি”
ওহ তাহলে এই ব্যাপার আপু কে ভাঙ্গিয়ে খেয়েছে পিয়াল। কিন্তু বিয়ে করার সময় ভয়ে পালিয়েছে। আমার আপুটা এত বোকা ।
পাঁচ
পারলার থেকে সাজিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে আপু কে।ঠিক বান্দরনির মত লাগছে আমার এত সুন্দর আপু কে। আসলে মন ভাল না থাকলে চেহারাতেও প্রভাব পড়ে। আপু শুধু চোখের জল ফেলছে আর টিস্যু দিয়ে মুচ্ছে।
বিকেলের মাঝেই পাত্রপক্ষ চলে আসলো । পিয়ালের ফোন অফ। বুঝলাম পিয়ালের আশা ছেড়ে দিতে হবে।পিয়াল একটা সোনার রঙ করা আংটি দিয়েছিল আপু কে। আপু রাগের চোটে সেটা ছুড়ে ফেলে দিল।
পাত্রপক্ষ ড্রয়িং রুমে বসেছে।আমি পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখে আসলাম।পাত্র দেখতে ভালই। ৫-৮। শ্যামলা , স্লিম। কিন্তু পিয়ালের মত সুন্দর নয়। পাত্রের নাম তপন। সাথে পাত্রের বাবা আর বড় ভাই এসেছে। পাত্রের পোস্টিং ঢাকায়। বাবা বাড়ি ও ঢাকায়। বিয়ে হলে আপু কে ঢাকা চলে যেতে হবে।
পাত্র উঠেছে শহরের সবচেয়ে নামকরা রেস্ট হাউজে। বোঝা যায় ভাল টাকা পয়সা আছে। আমার সুন্দরি আপুর আজকের বান্দরনি চেহারা দেখে পাত্র পছন্দ করবে কিনা সেই ব্যাপারে বেশ সন্দেহ আছে।
কিন্তু আশ্চর্য পাত্র কেন সবার আপু কে খুব পছন্দ হয়ে গেলো। সাথে সাথে পাত্রের বাবা আপুর আঙ্গুলে আংটি পরিয়ে দিলেন।
আপু আংটি পরে এসে খুব কান্নাকাটি করছে। আজকে নাকি বিয়েও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সে নাকি পিয়াল কেই বিয়ে করবে। মা , বাবা এগুলো জানেন না। জানলে তুলকালাম কাণ্ড হবে।আমি বললাম
– আপু পালিয়ে যাবে?
– তোর মাথা! কোথায় পালিয়ে যাবো ? পিয়ালেরই তো খবর নেই। ও আমার সাথে এমন ধোঁকাবাজি করতে পারলো। আমি থাক আর কাঁদবো না।ওই বল্টুটার গলাতেই মালা পরাবো।
পাত্র কেই আপু বল্টু বলছে। একটা মেয়ে পরিস্থিতির চাপে পড়ে যে কত শক্ত হতে পারে তা আপু কে দেখে বুঝলাম। আপু রাজি হল বিয়েতে শেষ পর্যন্ত । আমার দাদি আবার বেশি বুঝে। তিনি বলা শুরু করলেন
– শুভ কাজে দেরি করে লাভ কি? আজকেই বিয়ে পড়ান হোক । নাত জামাইয়ের মুখ দেখে যাই। নাহলে মরেও তো শান্তি পাবো না।
দেখা গেলো বরপক্ষ আগে থেকেই তৈরি হয়ে এসেছে। আজকেই বিয়ে পড়ান হবে। পরে সুবিধামত সময় রিসেপশন আর গায়ে হলুদ করা হবে। আমার মা তো মহাখুশি। ফোন করে করে আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশী , আত্মীয়স্বজন কে ডেকে আনছে বাসায়। বাসায় বিসমিল্লাহ খানের সানাইয়ের সুরের ডিভিডিও ছেড়ে দিয়েছে কে যেন । মা আমাকে ডাকছে
– তোর কি কোন কাণ্ড জ্ঞান হবে না।
– কেন কি হয়েছে?
– বাসর ঘর সাজানোর ব্যবস্থা কর। বাসর তো এখানেই হবে।
আপুর ঘরে বাসর হবে বুঝলাম। আমি আলপনা আঁকতে বসলাম। এক গাদা ফুল কিনে এনেছি বাসর ঘর সাজাবো । আপু দেখলাম চোখ মুখ শক্ত করে বউ সেজে আমার কাজ দেখছে। আপু কে এত টা চুপ হয়ে যেতে কক্ষনো দেখি নাই। এত বক বক করে আপু। অথচ আজ কোন কথা নেই। রান্না ঘর থেকে বিরিয়ানির ভুর ভুর গন্ধ আসছে। উৎসব মুখর পরিবেশ চারিদিকে। কাজ শেষে গোসল করে আমিও একটা পাঞ্জাবি পরে নিলাম। হাজার হোক আপুর বিয়ে বলে কথা। যদিও বিয়েটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। কিন্তু পিয়াল তো ভাল না। এর থেকে বরং এটাই তো ভাল হচ্ছে। রাত ৮ টা সময় কাজি ডেকে বিয়ে পড়ান হল।৫ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হল। আপু একবারে কবুল বলে দিল। একবারও কাঁপলো না গলা। চোখ থেকেও এক ফোঁটা পানি আর পড়লো না। এটাই বাস্তবতা। আর আপু খুব সহজে বাস্তবতা মেনে নিয়েছে।
বিয়ের পর দুলাভাই রা থাকলো ৪ দিন। শেষ দিন আমরা পাহাড়ি ঝর্ণা দেখতে গেলাম একদিন। আপু প্রথম দুইদিন চুপচাপ থাকলেও এখন ধীরে ধীরে দুলাভাই এর সাথে সহজ হয়ে উঠেছে। হাসি ঠাট্টাও করছে।দুলা ভাই কে বল্টু বলে ডেকে মজা করছে। আমি অবাক হয়ে ভাবছি কিভাবে পারছে আপু। মেয়েরা বোধ হয় এমনই হয়। বিয়ে হয়ে গেলে আর বিয়ের পূর্ববর্তী সম্পর্ক গুলো আর মনে রাখে না। অবশ্য দুলাভাইও খুব ভাল মানুষ। আমরা সারাদিন খুব মজা করলাম। বিকেলের দিকে বৃষ্টি নামবে নামবে । আমরা গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম তাড়াতাড়ি। আমি আপুর একপাশে বসে আছি। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই একটা পরিচিত অবয়ব চোখে পড়লো।পিয়াল। দেখলাম আপুও খেয়াল করেছে। আপুর চোখে মুখে কেমন ভয়ের ছাপ। আমার দিকে তাকিয়ে কেমন ইশারা দিল। বুঝলাম আপু চায় না তার এই পুরাতন প্রেমের কথা প্রকাশ পাক। আমিও চোখের ইশারা দিয়ে অভয় দিলাম।
বাড়ি ফিরে ভাবছি পিয়ালের কথা। পিয়াল আবার ফিরে এসেছে। আপু যতই না চাক এই বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি না হোক আমি বিষয়টা ছাড়বো না। আপু ঢাকা চলে গেলেই আমি পিয়ালের সাথে দেখা করবো। এটা একটা বোঝাপড়া করে ছাড়বো । মগের মুল্লুক পেয়েছে???প্রেম করবে আর বিয়ের সময় ছুড়ে ফেলে দিবে!!
আপু চলে যাবে কালকে । ব্যাগ গুছচ্ছে। আমাকে ডেকে আপু ফিস ফিস করে বলছে
– দেখ আমি চাই না পিয়ালের ব্যাপারটা কেউ জানুক। আমি আমার মত ভাল আছি।সে তার মত থাকুক, এটা নিয়ে আর জল ঘোলা করার দরকার নাই।
এমই সুবোধ বালকের মত হ্যাঁ বললাম। কিন্তু এমই মনে মনে ঠিক করেছি আমি অবশ্যই যাবো পিয়ালের সাথে দেখা করতে।
যাওয়ার সময় যা ভেবেছিলাম তার থেকে কম কান্নাকাটি করলো বাবা মা আর আপু ট্রেন ছাড়বে। আপু রা ট্রেনে উঠে পড়লো। ট্রেন ছাড়লও। জানালা দিয়ে শেষ বারের মত বিদায় জানালো আপু। ট্রেন একসময় চোখের সীমানার বাইরে চলে গেল।
বাড়ি ফিরে ভাবছি কি করবো ? যাব পিয়ালের বাসায়? কৈফিয়ত চাবো ? কেন আপুর সাথে এমন করা হল?যদিও আপু বিষয় টা নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে না করেছে।
অনেক চিন্তা করে শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম যাবো পিয়ালের বাসায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল।রেডি হয়ে বাসা থেকে বের হলাম। সালেহ কাকুর বাড়ির সিঁড়ি কোঠার বাতি জ্বালানো হয় নাই। অন্ধকার হয়ে রয়েছে সিঁড়ি কোঠা। উপরে উঠছি । কিন্তু কেমন ভয় ভয় লাগছে। কি করতে চাইছি আসলে আমি। লোকটা যদি আমারর কোন ক্ষতি করে। ভয় পাচ্ছি আমি ? না এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে দিলাম। এই লোকটা কে অবশ্যই আমার কিছু বলা উচিৎ। পারলে মুখোশ খুলে দিতাম যাতে আরেকটা মেয়ের জীবন নিয়ে খেলা করবার আগে ২ বার ভাবে।
আমি দরজায় নক করলাম। কোন সারা নেই। আবার নক করলাম। এইবার দরজা খুলল পিয়াল। চোখ লাল। মনে হয় ঘুম থেকে উঠেছে। আমাকে দেখে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলো। আমি যে কখনো ওর বাসায় আসতে পারি সে হয়তো ভাবেই নাই। সে কোন রকম ক্ষীণ কণ্ঠে বলল
– লাবু তুমি?
– কেন আশা করেন নাই?নাকি আপনি চান না আমি আসি?
– না না তা হবে কেন?ছি ছি ভিতরে এসে বস।
– বসতে আসি নাই।
– তাহলে?
– কথা বলতে এসেছি।
– কথা বলতে হলেও তো ভিতরে আসতে হবে।
এমই ভিতরে ঢুকলাম । সিঁড়ি ঘরে বসে কথা বললে সালেহ আংকেল শুনতে পেতে পারে। আমি চাই না এসব কথা সালেহ আঙ্কল জানুক।এবার একটা বেতের চেয়ার টেনে বসলাম। আর পিয়াল বসলো বিছানা তে।পিয়াল বলল
– আমি জানি তোমরা মানে তুমি আর লুবনা খেপে আছো।কিন্তু এরকম করার কারন কি থাকতে পারে ।তুমি মনে কর আমি এমনি এমনি করেছি? বাধ্য হয়ে এই অন্যায় কাজটা করেছি। আজকে তোমাকে আমি সব খুলে বলবো ।
– আপনি হিপক্রেট, মিথ্যাবাদী এবং প্রতারক।
– তুমি যা অভিযোগ করেছো সব আমি মাথা পেতে নিচ্ছি।কিন্তু আমার কিছু বলার আছে
– এরপর আর কি বলার থাকতে পারে?
– বলছি শুনো 

পিয়ালের কথা
আমি পিয়াল। আমার জীবন টা আর দশটা সাধারণ ছেলের মত নয়।আমার মা ছোট বেলায় মারা গিয়েছিলেন।একদম ছোট বেলায় যখন আমি স্কুলেও ভর্তি হই নাই।আমি বড় হয়েছি সৎ মা এর ঘরে। ঠিক রূপকথার গল্পগুলো তে যেমন নিষ্ঠুর সৎমা থাকে আমার সৎমাউ ঠিক তেমন।আর রূপকথার গল্প গুলোর মত আমার বাবা দেশের বাইরে থাকতেন। তিনি থাকতেন মিডল ইস্টে।সেখানেই চাকুরী করতেন। মাঝে মাঝে যখন দেশে আসতেন তখন সৎমা এমন আচরণ করতেন যেন তিনি আমাকে অনেক ভালবাসেন। কিন্তু বাকি টা সময় খুব অত্যাচার করতেন। বাবাউ ভাবতেন আমি খুব ভাল আছি। আমি তাকে মা ডাকতাম। কিন্তু তিনি আমাকে কক্ষনোই নিজের ছেলে মনে করতেন না। খেতে বসলে আমার সৎভাই বোন রা যা খেত তার কিছুই আমাকে খেতে দিতেন না।সাধারণত মাছ , মাংস আমার কপালে জুটতো না।হয়তো ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে যেতাম। ছেঁড়া ইউনিফর্ম পরে আমি স্কুলে যেতাম। বাসার সব কাজ আমাকেই করতে হত।বাজার করা থেকে শুরু করে কাপড় কাঁচা পর্যন্ত। কিন্তু যখন এত অত্যাচারের পরেও গোল্ডেন এ প্লাস পেলাম তখন আমার সৎমা বাধ্য হয়ে খুশি হবার ভাণ করলেন সবার সামনে। পত্রিকায় তার সাথে আমার ছবি ছাপা হল।সাক্ষাৎকারে বললেন তিনি আমাকে কত ভালবাসেন। এরপর তিনি আমাকে বাসার কাজ কর্মের হাত থেকে রেহাই দিয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনার বাইরে এক পয়সা হাত খরচ তিনি আমাকে দিতেন না। আমি আবার ইন্টারমিডিয়েট এ গোল্ডেন এ প্লাস পেলাম। এইবার তিনি আরও খুশি হবার ভাণ করলেন কিন্তু কিন্তু ভিতরে ভিতরে হলেন বিরক্ত। তবে এটা ভেবে খুশি হলেন যে আমাকে হলে পাঠিয়ে এই পরিবার থেকে বিতারিত করবেন। কিন্তু এভাবে আমাকে বিদায় করতে হল না। তার আগেই একটা সংবাদ আসলো মিডল ইস্ট থেকে। আমার বাবার মৃত্যু সংবাদ।আমার বাবা হটাত করেই হার্ট এটাকে মারা গিয়েছেন।
আমার জীবন টা স্থবির হয়ে গেল। আমি তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছি।আমি আমার বাবার মৃত্যুর শোক ভুলবার সময় পেলাম না। তার আগেই বাস্তবতার তীব্র কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে পরলাম। মেডিক্যালে পড়াশোনার খরচ অনেক। আমার সৎ মা এক অর্থে বাবার মৃত্যুর পর আমাকে ঘর থেকে বের করে দিলেন। এবং সকল প্রকার খরচ দেয়া বন্ধ করে দিলেন। আমি যেয়ে উঠলাম হলে।আমি অনেক কষ্টে ২ – ৩ টা টিউশানি যোগার করে কোন মতে চলতে লাগলাম। কিন্তু যখন বোন্স(কঙ্কাল) কিনতে হবে তখন মাথায় হাত। এত গুলো টাকা কই পাবো ? অথচ বোন্স না কিনলে এনাটমি কিভাবে পড়বো। বন্ধু দেরটা ধার করে পড়া যায়। কিন্তু সেটা কত দিন।
ততদিনে আমি পরিণত যুবক। আমি যে সমকামী তা ছোটবেলায় বুঝতে পেরেছিলেম। কলেজের লাইব্রেতি তে অনেক বই পড়তাম ।এর মধ্যে একটা বই এ সমকামিতার কথা জেনেছিলেম। আর নিজের সাথে মিলিয়ে বুঝতে পারলাম আমি সমকামী। কিন্তু পড়াশোনা , টাকা পয়সার চিন্তা এত কিছুর চাপে আমি আমার এই আইডেন্টিটি নিয়ে ভাবার সময় পেতাম না। কিন্তু রাস্তায় সুন্দর ছেলে দেখলে ঠিকই চোখ সেদিকে যেতো।
আমি যে বাসায় টিউশানি করতাম সেই পরিবারের কর্তা মানে আমার ছাত্রের বাবা প্রায় আমার সাথে নানা ছুতায় কথা বলতেন।আমি ততদিনে বুঝে গিয়েছি আমি সুন্দর। রাস্তা দিয়ে চলতে গেলে সবাই একবার অন্তত আমার দিকে তাকাবেই।ক্লাসের সব মেয়ে রা আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়।আমি আমার ছাত্রের বাবা কে সবুজ আঙ্কেল বলে ডাকতাম।আমি একটা জিনিস কিছুদিনের মাঝে খুব ভাল বুঝে গেলাম তিনি আমাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখেন। পুরুষের এই চাহনি আমি চিনি। একদিন বাড়ি গিয়ে দেখলাম ছাত্র নেই ছাত্রের মাও নেই। শুধু মাত্র সবুজ আঙ্কেল রয়েছেন।মাসের প্রথম দিন। সেদিন আমার বেতন নেবার দিন। সবুজ আঙ্কেল বললেন
– তুমি এসেছ।কিন্তু আজকে তো বাপ্পা তার মায়ের সাথে নানা বাড়ি গিয়েছে।
আমার ছাত্রের নাম বাপ্পা। আমি বললাম
– আঙ্কেল তাহলে আজকে আমি চলে যাই।
– না না বেতন নিয়ে যাও।ভিতরে এসে বস।
আমি উনাদের ড্রইং রুমে বসলাম। সবুজ আঙ্কেলের বিশাল ব্যবসা। তার বাড়িও সেরকম সুন্দর করে সাজানো। জাপানি পুতুল থেকে শুরু করের ক্রিস্টালের ফুলদানি, ইরানের কার্পেট কি নেই! আমি ড্রয়িং রুমে বসলে সব সময় ঘুরে ঘুরে এই সকল সৌখিন জিনিস গুলো দেখতাম। আমার খুব ভাল লাগতো।সবুজ আঙ্কেল ভিতরের ঘর থেকে বেতন নিয়ে আসলেন। বেতন হাতে দিয়ে বললেন
– বস। তোমার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করি। বাসায় একা তো ভাল লাগছে না।
– জি আঙ্কেল
– আমারও ছোট বেলায় জানো ডাক্তার হবার শখ ছিল। কিন্তু অত মেধা নিয়ে তো জন্মাই নাই।
– জি আঙ্কেল।
আমি সকল কথায় জি জি বলে যাচ্ছি। উঠতে পারলে বাঁচি সেরকম। আমার পরের দিন এক গাদা আইটেম। হলে যেয়ে পড়া দরকার। হটাত সবুজ আঙ্কেল একটা কথা জিজ্ঞেস করলেন
– মেডিক্যালে পড়ার তো অনেক খরচ জানি। কক্ষনো টাকার দরকার লাগলে আমাকে বল। আমি ব্যবস্থা করে দিব।
আমার হটাত মনে পড়লো বোন্স কেনার কথা। আচ্ছা সবুজ আঙ্কেল কে বলবো নাকি। এতগুলো টাকা কি তিনি আমাকে দিবেন। অনেক সংকোচ হচ্ছিলো তাও বলে ফেললাম।কথায় বলে না, যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। পাইলেও পাইতে পারো মানিক রতন। তিনি বললেন
– এতো অনেক টাকার ব্যাপার।আচ্ছা এসো শোবার ঘরে বসে একটু রিল্যাক্স করি। আর চিন্তা করি কি করা যায়।
কথা টা শুনে আমার শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হল। এটা কি কোন ইঙ্গিত।শোবার ঘরের কথা কেন বলবে? এর আগে কক্ষনোই আমি কারো সাথে সেক্স করি নাই। আর সবুজ আঙ্কেল কে আঙ্কেল বল্লেও তিনি দেখতে আঙ্কেল দের মত নয় মোটেও। ৪০ এর মত বয়স হবে। মেদ ভূরি নেই। আর মাথা ভর্তি ঘন কালো চুল। তাকে বয়সের তুলনায় অনেক কম লাগে। আমি ভাবলাম আমার শরীর এত টা পূত পবিত্র না যে কেউ আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। আর সবুজ আঙ্কেল কে আমার খারাপ লাগে নাই। শরীরের বদলে যদি টাকা পাওয়া যায় মন্দ কি! আমার বোন্স কেনার টাকা উঠে যাবে। আমি বললাম
– চলুন
শোবার ঘরটাও যথেষ্ট সুন্দর করে সাজানো। পর্দার রঙের সাথে বিছানার চাদর ম্যাচ করা। হাল্কা নীল রঙের পর্দা আর চাদর। ঘরে ঢুকেই সবুজ আঙ্কেল যা করলেন তা হল পর্দা গুলো দিয়ে জানালা ঢেকে দিলেন যাতে কেউ বাইরে থেকে কিছু না দেখতে পারে। কারন পাশের বাসার জানালা থেকে এই ঘরটা দেখা যায়। আমি পরিস্কার বুঝলাম আমার ধারণাই সঠিক। সবুজ আঙ্কেলের উদ্দেশ্য শরীর । আঙ্কেল আলমারি থেকে এক গোছা টাকা বের করে টেবিলের উপর রাখলেন। এরপর তিনি বিছানার উপর শুয়ে আমাকে ডাক দিলেন
– আসো একসাথে রিল্যাক্স করি
সরাসরি সেক্সের অফার। এটা যে কোন বাচ্চা ছেলেও বুঝবে। আমার হটাত মনে হল এক দৌড়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাই। আবার টাকা গুলোর উপরেও চোখ গেলো।অনেক টাকা। এত গুলো টাকা কক্ষনো এক সাথে পাই নাই। আমি লোভী হয়ে গেলাম। সবুজ আঙ্কেল আমার চোখ দেখেই বুঝলেন আমি লোভী হয়ে গিয়েছি। এবার তিনি হাত ধরে আমাকে বিছানায় নিয়ে গেলেন। প্রথম পুরুষের স্পর্শ পেলাম। খারাপ লেগেছে কক্ষনোই বলবো না। বরং আমি মনে হয় উপভোগ করলাম। তারপর যাবার সময় এত গুলো টাকা নিয়ে গেলাম।
কিন্তু হলে যেয়ে আমার কেমন অনুতাপ লাগলো।একি করলাম।বেশ্যা বৃত্তি করলাম।না আর এমন করা যাবে না। আবার ওই বাসায় যাওয়া ঠিক হবে না।আমি ইচ্ছা করলেই আরেকটা টিউশানি যোগাড় করতে পারবো। আমি ওই টিউশানিটা ছেড়ে দিলেম। কিন্তু কিছুদিন যেতেই আবার বই কিনতে হবে টাকা লাগবে বেশ কিছু। কই পাই। এখন আর সবুজ আঙ্কেলের বাসায় যাওয়া সম্ভব না। কিন্তু বাঘ একবার মাংসের স্বাদ পেলে তা কক্ষনো ভুলে না। আমিও যে মাংসের স্বাদ পেয়ে গিয়েছি। আবার শরীর বেঁচে টাকা যোগাড় করবো। আমি তো সুন্দর আমাকে যে কেউ কামনা করবে। কিন্তু খদ্দের পাবো কই? তখন তো ইন্টারনেট তেমন ভাবে এভেইলেবল ছিল না। কিন্তু এটুকু জানতাম রমনা পার্কে সন্ধ্যায় অনেকেই এই উদ্দেশ্যে যায়। আমিও কি যাবো ? যাওয়া কি ঠিক হবে? কেমন ভয় ভয় লাগছে। আবার ইচ্ছাউ করছে। আচ্ছা যেয়েই দেখি না। শুক্রবার সন্ধ্যায় যাবো ঠিক করলাম। আমার সবচেয়ে দামী যে শার্ট ছিল সেটা পরলাম। গায়ে সেন্ট মেখে সন্ধ্যায় রওনা দিলাম রমনা পার্কের উদ্দেশ্যে।
সন্ধ্যাবেলাতেও রমনা পার্কে প্রচুর মানুষ। কিন্তু দেখলাম যে কেউ কেউ গ্রুপে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু কথা বলা , বডি ল্যাঙ্গুয়েজে প্রচুর মেয়েলি ভাব। এবং গ্রুপের সবাই আমার দিকে কিভাবে তাকাচ্ছে। বুঝলাম আমার উদ্দেশ্যে মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছে তারা। আমি সেখান থেকে সরে গেলাম। একটু দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি। চলে যাবো ভাবছি। তিনটা ছেলে নাকি হিজড়া বুঝলাম না আমার পাশ কেটে চলে গেলো। না এখানে আর থাকা যাবে না। চলে যাবো ঠিক এই সময় আমার পাশে একজন বয়স্ক লোক এসে দাঁড়ালেন।কোট টাই পরা। আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। বুঝলাম সেক্সের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমিও চোখ টিপলাম। তিনি আমাকে ইশারা করলেন। আমি তাকে অনুসরণ করলাম। তিনি গেট দিয়ে বের হয়ে গেলেন। আমিও বের হয়ে আসলাম। লোক টাকে বেশ টাকাপয়সাওয়ালা মনে হচ্ছে । দেখা যাক। তিনি একটা পার্ক করে রাখা সিল্ভার কালারের টয়োটা করলা গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি এগিয়ে আসলাম। তিনি গাড়িতে উঠতে ইশারা করলেন। তিনি ড্রাইভিং সিটে বসলেন। আমি তার পাশে বসলাম। তিনি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললেন
– এখানে কত দিন? আগে তো দেখেছি বলে মনে হয় না
– এইতো আজকেই প্রথম এলাম।
– দেখে তো ভদ্র ঘরের সন্তান মনে হয়। কি কর?
– জি মেডিক্যাল পড়ি।
তিনি বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন
– তুমি কেন এখানে আসো ? তোমার জায়গা তো এখানে নয়।
– মানে টাকার খুব দরকার
– আমি সে কথা বলি নি। আমি বলতে চেয়েছি পার্কে কেন আসো ?তুমি চাইলেই বড় বড় বিজনেসম্যান, ফরেনার দের সাথে …। বুঝোই তো
– কিন্তু তাদের খোঁজ পাবো কোথায় ?
– আমার কাছে। আজ তোমাকে আমি একটা হোটেলে নিয়ে যাবো। তোমার প্রথম কাস্টোমার।
গাড়ি গিয়ে ঢুকলো একটু অভিজাত হোটেলে। আমাকে নিয়ে রিসেপশনে গেলেন ভদ্রলোক। আমার খুব নার্ভাস লাগছে।হোটেল টা খুব সুন্দর। বড় বড় ঝাড়বাতি ছাদ থেকে ঝুলছে। আয়নার চেয়ে চকচকে মেঝে। এত বড় হোটেলে কক্ষনো আসি নাই। কোন বিপদ হবে না তো। ভদ্রলোক রিসেপশনে কথা বলে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন
– আজকে তুমি ৩১২ নম্বর কক্ষে যাবে । সেখানে তোমার জন্য একজন অপেক্ষা করছে।
– আপনি?
– আমি কেন যাবো। আমার কাজ হল পার্ক থেকে তোমার মত ছেলে খুঁজে বের করা। এবং হোটেল গুলো তে নিয়ে যাওয়া। আর আমার নাম্বার রাখো। আমাকে ব্রাউন আঙ্কেল বলে ডাকবে। আজকে কেমন কাটলো জানিয়ে অবশ্যই ফোন দিবে।
আমি একটা কার্ড হাতে নিলাম। হেনরি ব্রাউন। নিচে মোবাইল নাম্বার লেখা। ব্রাউন আঙ্কেল বললেন
– আচ্ছা তাহলে যাও। সি ইউ।
ব্রাউন আঙ্কেল আমাকে রিসেপশনে রেখে চলে গেলেন। আমি যেন অথৈ সাগরে পরে গেলাম। যাবো ৩১২ নম্বর রুমে? কোন বিপদ হবে না তো ? বুকে সাহস নিয়ে লিফটে উঠলাম। ৩১২ নম্বর রুমে দরজা নক করলাম। একজন ড্রেসিং গাউন পরা লোক দরজা খুলল। বয়স ৫০ এর মত হবে। বাঙালি। তিনি আমাকে ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। সেই আমার শুরু। আমার বেশ্যাবৃত্তির শুরু।

পিয়ালের কথা- চলছে
সেদিনের পর থেকে আমার লোভ বাড়তে লাগলো। ব্রাউন আঙ্কেলের সাথে প্রতি সপ্তাহে দেখা করতে লাগলাম।আর প্রতি সপ্তাহেই নতুন কাস্টমার। ফরেনার থেকে শুরু করে অনেক বড় বড় বিজনেসম্যান এর সাথে আমার সেক্স হয়ে গিয়েছে। আর আমি বিছানায় যথেস্ট ভাল। কেউ আমাকে নিয়ে কোন ধরণের অভিযোগ করে না। কিন্তু আমার আগের মত পড়তে আর ইচ্ছা করে না। পড়াশোনায় ফাঁকি দিতে লাগলাম।আইটেম সব জমে যাচ্ছে। সামনে ফার্স্ট প্রফ। কিন্তু পড়া একদমই হচ্ছে না। সারাদিন শুধু সিনেমা দেখা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া আর শপিং । হাতেও টাকা প্রচুর। আগে কক্ষনো এমন জীবন পাই নাই। কেমন মোহগ্রস্ত হয়ে গেলাম।সপ্তাহের অন্যদিন গুলো তেও টাকার জন্য হোটেলে যেতে লাগলাম।স্বভাবতই আইটেম জমে পাহাড় সমান হয়ে গেলো আর আমি ফার্স্ট প্রফে বসতে পারলাম না।
ফার্স্ট প্রফে বসতে না পারায় বুঝতে পারলাম না যখন তখন বুঝতে পারলাম এতদিন কি ভুল করেছি। খুব হতাশ হয়ে পরলাম। আমার মনে হচ্ছিলো আমাকে দিয়ে আর পড়াশোনা হবে না। ঠিক এই সময়ই পরিচয় হল আফতাব ভাইয়ের সাথে। আফতাব ভাই কে পেয়েছিলেম কাস্টমার হিসেবে। তিনি আমাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন। আমার রূপে তিনি বিমোহিত হয়েছিলেন।একবার , দুই বার নয় বেশ কয়েকবার তিনি এসেছিলেন আমার কাছে।তারপর একসময় তিনি আমাকে সম্পূর্ণ নিজের করে পেতে চাইলেন। চির দিনের জন্য।
আমি আফতাব ভাইয়ের সাথে প্রতিবারই দেখা করেছি কোন না কোন হোটেলে। এই প্রথম তার বাসায় যাচ্ছি। গুলশানে তার বাসা। আমার ভয় লাগছে। কিন্তু এইবার তিনি অনেক বেশি পে করবেন বলেছেন। টাকার পরিমাণ অনেক বেশি। তাই যাচ্ছি তার বাসায়। বাস থেকে নেমে হাঁটছি গুলশান এভিনিউ ধরে। ঠিকানা মত পৌঁছে গেলাম। বাড়িটি দোতালা । প্রচুর গাছগাছালি তে ঢাকা। পুরো বাড়ি অন্ধকার। কেমন কেমন ভয় ভয় লাগে। আমি জানি না আসলে আফতকাব ভাই কি করেন কিংবা তার প্রফেশন কি।কিন্তু বুঝি তার অনেক টাকা। হাতে রোলেক্সের দামি ঘড়ি। কাপড় চোপর যা পরেন সব দামি ব্র্যান্ডের। আমার ভয় লাগছে। থাকবো নাকি চলে যাবো। পরে যদি কোন বিপদ হয়। সাহস করে বেল টিপলাম। ভিতরে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। কুকুর আমি ভীষণ ভয় পাই। গেট খুলল একজন বিহারি দারোয়ান। আমাকে জিজ্ঞেস করলো
– আপনি কাকে চান?
– আফতাব ভাই?
– আপনি কি পেয়াল?
– জি আমার নাম পিয়াল।
– আপনি দোতালায় চলে যান। স্যার আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
আমি মুল গেট পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠছি। সিঁড়ি তে হাল্কা টিমটিমে বাতি জ্বলছে ।উপরে উঠে নক করলাম দরজা। এবার দরজা খুললেন আফতাব ভাই নিজে। আমাকে দেখে মুখ ভর্তি হাসি। আফতাব ভাই মানুষ টা দেখতে খারাপ নন। জিম করা পেটানো শরীর। লোমশ গা। কৃষ্ণ বর্ণের।৪০-৪৫ হবে বয়স। ভিতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেলাম। কি সুন্দর ঘর। পুরো দেয়াল জুড়ে অনেক সুন্দর সুন্দর পেন্টিংস। ছাদ থেকে ঝুলছে ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। বড় গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক।মুগ্ধ হয়ে দেখছি সব।
– কি দেখছো পিয়াল বাবু?
– আপনার বাড়ি । এত সুন্দর করে সাজানো
– আর আমি দেখছি তোমাকে। তুমি এত সুন্দর।
আমি কেমন লজ্জা পেয়ে হেসে বললাম
– কই সুন্দর।কি যে বলেন!
– কেন আমার আগে কেউ কক্ষনো বলে নাই যে সুন্দর?
– বলেছে। কিন্তু আপনার মত করে কেউ কক্ষনো বলে নাই।
– তাই ?
– হ্যাঁ
– কারণ তুমি আমার কাছে অনেক স্পেশাল। আমি চাই না আর কেউ কক্ষনো তোমাকে ভোগ করুক। তুমি শুধু আমার হবে।
– মানে?
– শোন তোমাকে কেন বাসায় ডেকেছি তার অন্য কারণ আছে। সব কথা বলবো তার আগে চল কিছু খেয়ে নেই।
খাওয়া টেবিলে সাজানো। একজন শেফ আসলো খাবার সারভ করতে। কিন্তু আফতাব ভাই তাকে চলে যেতে বললেন ইশারায়। সেই কি খাবারের আয়োজন। প্রায় দশ এগারো পদের খাবার।চিকেন থেকে শুরু করে লবস্টার। সব কিছু খুব মজার ছিল। খাবার শেষে আমি আর আফতাব ভাই বেড রুমে গেলাম। বিশাল একটা বিছানা। উপরে লাল ভেল্ভেটের চাদর বিছানো। ওয়াল কেবিনেট লাগানো আর বিছানার সামনাসামনি বিশাল একটা টিভি আর মিউজিক সিস্টেম। আফতাব ভাই বিছানায় যেয়ে শুলেন। আমি বুঝতে পারছি না কি করবো। এত আদর করে ডেকে খাওয়ালেন। তারপর এখন বলছেন কি জানি কথা বলবেন। আমি দাঁড়িয়ে আছি দেখে আফতাব ভাই বললেন
– আসো বিছানায় আসো।
আমি যেয়ে শুইলাম আফতাব ভাইয়ের পাশে যেয়ে। তিনি বললেন
– আপনি কি জানি বলবেন বলছিলেন?
– হম,। তুমি তো আমার সম্পর্কে তো কিছুই জানো না।
– না।
– আমি কিন্তু খুব সাধারণ মানুষ নই। আমি আন্ডারওয়ার্ল্ডের মানুষ ।
– মানে?
– আমার ব্যবসা আছে। অবৈধ ব্যবসা। মাদকদ্রব্যের ব্যবসা।আজ আমার এখানে তো কাল সেখানে থাকতে হয়।
– কি বলেন!
– এখন থেকে তুমিও থাকবে আমার সাথে সব সময়। কারণ আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি।
– কিন্তু
– কোন কিন্তু নয়। আমার সাথে থাকলে তোমার আর টাকার চিন্তা করতে হবে না।তুমি যা চাইবা তাই তোমার সামনে হাজির হবে।
– কিন্তু
– কোন কিন্তু নয়। আর তার প্রথম প্রমান হল এই চাবি।
আমার হাতে একটা চাবি তুলে দিলেন আফতাব ভাই।আমি জিজ্ঞেস করলাম
– এটা কিসের চাবি।
– ফ্ল্যাটের চাবি।
– তুমি যদি আমার প্রস্তাবে রাজি হও তাহলে বাড্ডার একটা স্টুডিও এপার্টমেন্ট আমি তোমার নামে লিখে দিব। কিন্তু আমার সাথে কোন রকম দুই নম্বরি করা চলবে না। তা যদি কর তাহলে তোমার কপালে খারাপি আছে। আমি সব সহ্য করতে পারি। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা নয়।
আমি ভাবছি এসব কি বলছে আফতাব ভাই। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। না ভাল মত ভাবতে হবে। আগেই কিছু বলা যাবে না। আমি বললাম
– কিন্তু আমাকে ভাবার জন্য কিছু সময় দিন।
– কত সময় লাগবে?
– ২ দিন
– ওকে। তোমাকে সময় দিলাম ভাবো।
– এখন তাহলে?
– তুমি বাড়ি চলে যাও।তুমি রাজি থাকলে দুইদিন পর এই বাসায় আবার আসবে। তখন আবার কথা হবে। খেলাউ হবে। আজ কোন খেলা না।
– হম।
আমি সেইদিন চলে আসলাম। বাইরে এসে দেখি অঝোর ধারায় বৃষ্টি পরছে। আমি একবার উপরে তাকালাম। দেখি আফতাব ভাই দাঁড়িয়ে আছেন দোতালায় বারন্দায়।তার চোখ ২ টা কেমন আদ্র, ভালবাসায় পরিপূর্ণ।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাস স্টপে এসে দাঁড়ালাম। বাসে উঠে হলে এসে যখন পৌঁছেছি তখন ঘড়ি তে ১১ টা বাজে। ঘরে এসে অনেক ভাবলাম কি করবো । সারা জীবন কষ্ট আর ভালাবাসা বিহীন একটি পরিবেশে বড় হয়েছি। বাবা ছাড়া কেউ ভালবেসে ২ টা কথাও বলে নাই। মায়ের আদর কি তাও জানিনা। এখন তো বাবাউ নেই। আমার আপন বলতে কেউ নাই। কোন পিছুটান নেই। অনেকদিন পর আজকে আফতাব ভাই আমাকে ভালবাসার কথা বললেন। তার চোখে সত্যি আমি আমার প্রতি ভালবাসা দেখেছি। আর আমার যে অবস্থা। ঢাকায় একটা ফ্ল্যাটের মালিক কোন দিন হতে পারবো কিনা কে জানে! আর সেখানে আফতাব ভাই মুখের কথায় একটা ফ্ল্যাট দিয়ে দিচ্ছেন। তিনি মাদক ব্যবসা করেন। হ্যাঁ এটাই আমাকে বিবেকে বাধা দিচ্ছে। কিন্তু সৎ উপায়ে মানুষ আর কত টাকা রোজগার করতে পারে। না এত কিছু ভাবলে চলবে না।
২ টা দিন ভাবতে ভাবতেই কেমন ম্যাজিকের মত চলে গেল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আবার যাবো ওই বাসায়। মানে আমি আফতাব ভাইয়ের কথায় রাজি হব। বাসে উঠলাম। আমি এখনো দোনমনায় ভুগছি।একবার মনে হচ্ছে বাড়ি চলে যাই।আবার কোন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে টানছে আফতাব ভাইয়ের দিকে। গুলশানে এসে আবার সেই বাসা। এইবারও একি ভাবে বিহারী দারোয়ান গেট খুললো। আমি উপরে দরজা খুলতেই আফতাব ভাই দরজা খুললেন। আজ তিনি ড্রেসিং গাউন পরা। আমাকে দেখে হেসে বললেন
– আমি জানতাম তুমি আসবে।
আমিও হেসে দিয়ে বললাম
– আপনি আমাকে এত ভালবাসেন । কিভাবে না আসি।
আমি আর আফতাবভাই সেদিন রতি ক্রিয়ায় লিপ্ত হলাম। সেদিনের সেক্স টা আরও বেশি রমণীয় ছিল। সেক্সের শেষে আফতাব ভাই ঘুমাচ্ছেন। আমি বারন্দায় বসে আছি। আজকে পূর্ণিমা !চাঁদের আলোয় চারদিক ভেসে যাচ্ছে!কি অপরূপ দৃশ্য!কিন্তু আমার সেদিকে খেয়াল নেই।আমার মাথায় কাজ করছে অন্য কিছু। ভাবছি প্রকৃতি মানুষ কে নিয়ে কত খেলাই না খেলে।আজকে আমার কি এখানে থাকার কথা ছিল? আমি কি এখানে এসে ভুল করলাম। আফতাব ভাই আমাকে সত্যি ভালবাসে কিন্তু আমি কি আফতাব ভাই কে ভালবাসি ? আমার মনে হয় উত্তর টা না। তাহলে আসলাম কেন? একটা সিকিউরিটির লোভে । সারা জীবন আর টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না! এই লোভে !কিন্তু আমার জীবনে কক্ষনো আমার ভালবাসার মানুষ আসবে না। সেটা কি আমি মেনে নিতে পারবো।না যা হয়েছে তা ঠিকই হয়েছে। আমি মাথা থেকে সমস্ত চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিলাম। আফতাব ভাইয়ের পাশে যেয়ে শুয়ে পরলাম।
জীবন এখন খুব সুন্দর।আমি বাড্ডায় আমার নিজের ফ্ল্যাটে থাকি। মাঝে মাঝে গুলশানে আফতাব ভাইয়ের বাসা তেও থাকা হয়। আমি এরই মাঝে আফতাব ভাইয়ের সাথে খুলনা ভ্রমণ করেছি।সেখানে পরিচয় হয়েছে আফতাব ভাইএর সেকেন্ড ইন কম্যান্ড রাজার সাথে। কিন্তু একটা জিনিস আমাকে খুব পীড়া দিচ্ছে। তা হল রাজার দৃষ্টি। পুরুষের এই চাহনি আমার চেনা। এই দৃষ্টি তে কাম রয়েছে। যাইহোক আফতাব ভাই আমার পাশে আছে। সেখানে রাজা আর কি করবে!
ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। আমি আমার ফ্ল্যাটে। বসে গল্পের বই পড়ছি। আমি এখন আর হলে নেই। ফ্ল্যাটে উঠে গিয়েছি। নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়েছি ফ্ল্যাট টা।আফতাব ভাই মাঝেই মাঝেই আসেন ফ্ল্যাটে। আজকেও আসার কথা। তিনি গাজিপুর গিয়েছেন।ওখান থেকে ফিরেই আমার ফ্ল্যাটে আসবেন।তারপর বাইরে খেতে যাবো। তাই কিছু রান্নাও করি নাই। বই পড়তে পড়তে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। আমি আলো জ্বালালাম। বাইরে এখনো বৃষ্টি পরছে। আমি টিভি ছাড়লাম। নিউজ হবে। নিউজের শিরোনাম গুলো পড়ে যাচ্ছেন সংবাদপাঠিকা। একটা খবর শুনে আমি পাথর হয়ে গেলাম। এটা কিভাবে সম্ভব। আমি কি ঠিক শুনেছি।অন্য চ্যানেলে গেলাম। সেখানেও নিউজ হচ্ছে। সেখানেও একই সংবাদ।
“পুলিশের ক্রস ফায়ারে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী আফতাবের মৃত্যু”
আমার ভয়ে হৃদয় কেঁপে উঠলো। এখন কি হবে? পুলিশ কি আমার এখানেও আসবে।

কয়দিন যাবত আত্মগোপন করে আছি পুরনা ঢাকার একটি বাসায়। সাথে আছে রাজা আর তার ৪ জন সঙ্গী। আমরা সবাই খুব খুব ভয়ে ভয়ে আছি। যদি ধরা পরি। এখান থেকে কোন ক্রমে ভারত চলে যেতে পারলে সেফ। সেখানে আমাদের নেটওয়ার্ক আছে।সেখানে আশ্রয় পাওয়া যাবে।এদিকে আমাদের কেউই ঘর থেকে বের হতে চাইছি না।বাজার থেকে শুরু করে বেশির ভাগ ঘরের কাজই আমি করছি। কারণ আমাকে পুলিশ তেমন ভাবে চিনে না। এবং আমার রেকর্ড পুলিশের কাছে নেই বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সেদিন যখন খবরটা শুনলাম তখন প্রচণ্ড বিষণ্ণতা এবং ভয়ে আক্রান্ত হয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল পুলিশ আমাকে এখনই এসে ধরে নিয়ে যাবে।এখানে আমাকে রক্ষা করার কেউ নাই।আমি ভয় পেয়ে হলে চলে যাবো ভাবছিলাম।কিন্তু হলে গিয়েই কি রেহাই পাবো । কিন্তু ঠিক সেই সময় রাজার ফোন আসে। আমাকে দেখে সনাক্ত করা যায় এমন যা যাবতীয় জিনিসপত্র আছে তা নিয়ে দ্রুত ফ্ল্যাট এর নিচে আসতে বলে। আমার কাছে মানি ব্যাগ, ন্যাশনাল আইডি কার্ড , কলেজের আইডি কার্ড ছাড়া আর তেমন কিছু ছিল না। আমি সেগুলো নিয়ে ফ্ল্যাটের নিচে চলে আসি। দেখি রাজা দাঁড়িয়ে আছে। ভীত চেহারা। সে বলল
– চল দ্রুত সরে পরি। কারণ আফতাব ভাই যে এখানে আসতেন তা পুলিশ হয়তো জানে
কথাটা শুনে আমি আরও ভয় পেয়ে গেলাম। আমার মুখ দেখে আমাকে অভয় দেয়ার চেষ্টা করলো রাজা
– পুলিশ তোমাকে সম্ভবত চিনবে না। তুমি এত ভয় পেয়ো না।
কথা টা শুনে আমার ভয় গেলো না। তাও শুকনো হাসি হাসলাম। তারপর পর চলে আসলাম পুরানা ঢাকার এই বাড়িতে। বাড়িটা বিশাল। চারিদিকে বিল্ডিং ।মাঝখানে উঠান। আমরা থাকি দোতালায়। নিচ তলায় একটা যৌথ পরিবার থাকে। তাদের বাচ্চাকাচ্চা সারাদিন চেঁচামেচি করে। কিন্তু তারা ভুলেও দোতালায় আসে না। এটা একটা শান্তি। উঠানে সারাক্ষণ ক্রিকেট খেলা চলে। আমি বারান্দায় বসে খেলা দেখি।প্রায়ই ছক্কা মারার কারণে বল দোতালায় চলে আসে। তখন বল আমি ছুড়ে পাঠিয়ে দেই নিচে।
এমনিতে সারাক্ষণ এক কথায় সবাই শুয়ে থাকে বা ঘুমায়। মাঝে মাঝে টিভি দেখে কেউ কেউ। একটা খুব পুরাতন টিভি ও রয়েছে। রাজার মুখ দেখে বোঝা যায় সে ভীত। রাজা ভীত মানে ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সারাটা দিন আমার খারাপ যায় না।কিন্তু রাতে শোয়ার সময় খুব অস্বস্তি লাগে। কারণ রাতে রাজার সাথে এক ঘরে এক বিছানায় শুতে হয়। বাকি চার জন থাকে অন্য ঘরে। রাজা দেখতে খারাপ নয়। ফরশা, ৫-৮ , মাথা ভর্তি চুল, স্লিম ফিগার।কিন্তু তার মুখে কেমন জানি একটা নিষ্ঠুর অভিভ্যাক্তি। বিশেষ করে হাসে যখন তখন বেশি নিষ্ঠুর লাগে। ২ দিন যাবত আমি রাজার সাথে ঘুমাচ্ছি। কিন্তু কোন সমস্যা হয় নাই এখন পর্যন্ত।
আজ তৃতীয় রাত। আমি শুয়ে শুয়ে পেপার পড়ছি। রাতে রাণ্ণা করে রেস্ট নিচ্ছি। আসলে বাজার থেকে শুরু করে রান্না আমারই করতে হয়। কারণ বাকি রা রান্না করলে তা মুখে দেয়া যায় না। তাই রান্নার দায়িত্ব আমিই মাথা পেতে নিয়েছি। রাজা কই জানি গিয়েছে। এখনো ফিরে নাই। ও ফিরলেই আমরা সবাই একসাথে খেতে বসবো। কিছুক্ষণের মাঝে রাজা ঘরে ফিরলো। এবং আজকে তাকে বেশ খুশি খুশি লাগছে। ভীত ভাব টা আর নেই। তার মানে কি বিপদ কেটে গিয়েছে?আমি ভাবলাম জিজ্ঞেস করি। কিন্তু তার আগে রাজা নিজেই বলল
– ভারতে পালিয়ে যাবার সমস্ত ব্যবস্থা করে আসলাম। আর সেখানে ২ মাস ঘাপটি মেরে থাকলেই হবে। ২- ৩ মাস পর সব শান্ত। তারপর সব নতুন করে শুরু করা যাবে।
তার এই কথা শুনে সবাই খুশি। সবাই হৈচৈ শুরু করলো । খাওয়া শেষে যে যার ঘরে চলে এলাম।সবাই খুশি হলেও আমার কেন জানি ভাল লাগছে না। ভারতে যাওয়ার কথা ভেবে মোটেও ভাল লাগছে না। আর সেখানে গেলেও তো অবৈধ ভাবেই থাকতে হবে। স্বাধীন ভাবে তো আর থাকা যাবে না। তার উপর রাজার সাথে থাকা। যদিও এখন পর্যন্ত রাজা খুব ভদ্র ব্যবহার করছে। কিন্তু পরবর্তী তে কি করবে তার কি গ্যারান্টি। রাজা বারান্দায় বিড়ি টানছে।আমি শুয়ে আছি। বাতি নিভাই নি। রাজা ঘরে ঢুকে বারন্দার দরজাটা বন্ধ করে দিল। আমি বললাম
– কি ব্যাপার বারান্দার দরজা বন্ধ করছো কেন?ঘরের ভিতর ভ্যাঁপসা গরম।
– কাজ আছে তাই বন্ধ করেছি।
– কি কাজ?
– অস্থির হইয়ো না সোনা পাখি। বলছি
রাজা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। মুখের হাসিটা খুব নিষ্ঠুর।আমার ভয় লাগছে। কি এমন কাজ আর এমন ভাবে হাসছে কেন!আমার দিকে তাকিয়ে রাজা বলল
– আচ্ছা পিয়াল সোনা বল তো এখন আমাদের ব্যবসার প্রধান কে ?
আমি কিছু বলছি না। চুপ করে আছি।
– পারছো না? বস মারা যাবার আগে আমি কি ছিলাম?
– সেকেন্ড ইন কম্যান্ড
– বসের কোন ছেলে ,মেয়ে,বউ বা পরিবার আছে?
– না
– তাহলে সব কিছুর দায়িত্ব কে পায়?
– তুমি
– হ্যাঁ । এই তো পারলে।হুম এই রাজা এখন তোমাদের সবার বস।
– আচ্ছা এবার অন্য কথায় আসি।তুমি বসের কি ছিলে তা কেউ না জানুক আমি জানি।
– মানে?
– চিৎকার কর না।চিৎকার করে কোন লাভ হবে না।
– তুমি কি বলতে চাও
– সোজা সাপ্টা বলবো তুমি বসের একটা সম্পত্তি ছিলে। আর অন্য সব কিছুর মত তুমিও এখন আমার সম্পত্তি। আমি যা বলবো তুমি তাই করবা। যেমনে নাচাবো তেমনে নাচবা।
– পাগল নাকি
– বেশি কথা বললে গুলি করে রাস্তায় ফেলে রেখে যাবো। আমি তোর সব হিস্ট্রি জানি। তুমি কোন খানের মাল তা জানতে আমার বাকি নাই।
– চুপ
– একদম চুপ।
আমি সত্যি চুপ হয়ে গেলাম। কারণ রাজার হাতে পিস্তল।রাজা হিংস্র ভাবে বলছে
– সতীপনা না করে কাপড় খোল ।
আমি কি করবো। অনেক ধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি জীবনে। কিন্তু বিপদ কক্ষনোই আসে নাই। একজনের হাতে পিস্তল যার উপর আমি সম্পূর্ণ নির্ভরশীল আর পুলিশের কাছে গেলে পুলিশ উল্টা আমাকে ধরবে। এই রাত টা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ রাত। এর আগে যা করেছি তার কোন কিছুই জোর করে কেউ করায় নাই। কিন্তু আজকে রাজার কথা মত সবকিছু করতে বাধ্য হলাম। শেষে ক্লান্ত হয়ে এক পর্যায় বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো রাজা।আমার নিজের উপর নিজের ঘেন্না লাগছে। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছে। আমি কাপড় পরে বারন্দার দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ইচ্ছে করছে আত্মহত্যা করি। কিন্তু আমি এইভাবে কাপুরুষের মত মরবো না। তাহলে কি করবো। প্রতিদিন রাতে নিজেকে এইভাবে রাজার কাছে বিলিয়ে দিবো ? ভারতে চলে গেলে এই অত্যাচার আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। আর পুলিশের কাছেও যাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে?কি উপায়? উপায় একটা আছে তা হল। পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু পালিয়ে যাবো কোথায়? নানু বাড়ি চলে যাবো।গ্রামে। এটাই সবচেয়ে সেফপ্লেস।আজকে এত রাতে পালানো যাবে না। কালকে যখন বাজার করতে বের হবো তখন পালাবো। এই কথা গুলো চিন্তা করার পর মনে মনে একটু স্বস্তি পেলাম। তাহলে এইবার ঘুমাই। কিন্তু ঘুম কি আর হল। কেমন কিছুক্ষণ পর পর দুঃস্বপ্ন দেখছি আর ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। একদম ভোরে আমি উঠে গেলাম। রান্না ঘরে যেয়ে সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করছি।
দুপুর গড়িয়ে গেলো। কিন্তু আমাকে কেউ বাজারে যাবার কথা বলে না। রাজাও বাসায়। কোথাও যাবার কোন লক্ষণ দেখছি না। আমি নিজে থেকেই বললাম
– আজকে কি বাজার টাজার হবে না? রান্না করবো কখন?
রাজা জবাব দিল
– তোমাকে বাজার, রান্না বান্না আজকে কিছুই করতে হবে না সুইট হার্ট । আজকে তোমার ছুটি।
– মানে?
– রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আসবে আজকে। আজকে একটু ভাল খানা খাই। অনেকদিন খাই না।
আমি হতাশ হয়ে গেলাম। বাজারে না গেলে আমি কিভাবে পালাবো ? কি বলে পালাবো?সারাদিন বাসায় কাটলো। হটাত সন্ধ্যার দিকে রাজা কার সাথে জানি ফোনে কথা বলে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। আমি বুঝলাম এটাই সময়। বাকি ৪ জন কে জবাবদিহি করার প্রয়োজন মনে করি না আমি। তবুও একজন জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম নিচে
– যাচ্ছি ফুচকা খেতে। ফুচকা ওয়ালা আসছে। অনেকদিন খাই না।
খুব একটা পাকা যুক্তি না। কিন্তু কেউ তো আর জানে না যে আমি পালাতে যাচ্ছি।কেউ আমার সাথে ফুচকা খেতে চাইলেই ধরা পরে যেতাম। কিন্তু ভাগ্য ভাল কারোর ঘর থেকে বের হবার ইচ্ছা নেই।
আমার সব প্ল্যান প্রোগ্রাম করা। আমি লালবাগের মোরে একটা ফ্লেক্সি লোডের দোকান থেকে ফোন দিলাম থানায়। বললাম
– আপনারা যে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রাজা কে খুঁজছেন সে এখন নাজিমুদ্দিন রোডের সালমা মঞ্জিলে পলাতক অবস্থায় রয়েছে
অন্য সাইড থেকে কে জানি বলছে
– হ্যালো আপনি কে বলছেন প্লিজ।
আমি ফোন রেখে আর দাঁড়ালাম না। এই নম্বরে এখুনি ফোন আসবে। দ্রুত একটা রিকশায় উঠে বললাম
– চল কমলাপুর রেল স্টেশন
– যামু না
– কই যাবা?
– আজিমপুর
– আচ্ছা আজিমপুর ই চল
রিকশাওয়ালা খুব অবাক হল এমন যাত্রী মনে হয় কক্ষনোই পায় নাই। রিকশা আমাকে আজিমপুর চায়না বিল্ডিঙের সামনে নামায় দিয়ে গেলো। এরপর আমি ধীরে সুস্থে কমলাপুর রেলস্টেশনের দিকে রওনা দিলাম। মনে মনে ভাবছি সব ঠিক থাকবে তো। নিশ্চয় এতক্ষণে পুলিশ সালমা মঞ্জিলের দিকে রওনা দিয়েছে। আর আমি শিউর ক্রস ফায়ার হবে সেখানে। কেউ বেঁচে ফিরবে না। আর আমার পিছনেও কেউ আসবে না। না পুলিশ না রাজা। উফ বড় বাঁচা বেঁচে গিয়েছি। কেমন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এখন তাহলে চিটাগাঙের দিকে রওনা দেয়া যাক। নানু বাড়ি। সেখানে কয়েকদিন ঘাপটি মেরে থেকে হলে ফিরবো। আবার আগের জীবনে।

কমলাপুর স্টেশনে এসে ট্রেনের টিকেট কেটে বসে আছি। ট্রেন ১০ টায়। এখন ৮ টা। সময় কাটানো মুশকিল হয়ে পরেছে। একটা পেপার কিনে পড়ছি। আচ্ছা এমন যদি হয় তারা কেউ ধরা পরে আমার কথা বলে দিল। অবশ্য রাজা ছাড়া কেউ আমার হিস্ট্রি কিছুই জানে না। কিন্তু রাজা যদি ক্রস ফায়ারে না মারা যায় ধরা পরে। পুলিশ কে বলা কি ঠিক হল। এটা তো ভেবে দেখি নাই। শীরদাঁরা বেয়ে একটা ভয়ের স্রোত নিচে নেমে গেলো। তাহলে কি নানু বাড়ি যাবো। আমার নানু বাড়ির ঠিকানা কি রাজা জানে।আমি মন কে বুঝালাম আফতাব ভাই ই জানতো না তো রাজা জানবে কিভাবে। নানু বাড়িতে যাই । কিছু হবে না।
১০ টা বাজে। আমি ট্রেনে উঠলাম। এখন পর্যন্ত আমার মোবাইলে কোন কল আসে নাই। তাহলে কি সবাই ক্রসফায়ারে এতক্ষণে মারা গিয়েছে! নিশ্চয় তাই হবে। তা না হলে তো কেউ না কেউ তো অবশ্যই ফোন দিত। যাক বাবা বাচা গিয়েছে।
আমি ট্রেনে অনেকদিন পর ভ্রমণ করছি। সেই কবে ছোটবেলায় নানু বাড়ি গিয়েছিলাম। মামা এসে জোর করে নিয়ে গিয়েছিল সৎমায়ের কাছ থেকে। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর আবার নানু বাড়ি যাচ্ছি। জানি না এত দিনে কি কি পরিবর্তন হয়েছে গ্রামে। মন টা কেমন ভার মুক্ত মনে হচ্ছে।কিন্তু আজ হটাত আফতাব ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে। লোকটা আমাকে সত্যি ভালবেসেছিল। যারা আমাকে ভালবাসে তারাই আমাকে ছেড়ে চলে যায়! কাউকে আমি ধরে রাখতে পারি না।
ট্রেন চলছে ঝিক ঝিক। কত কথা মনে পড়ছে আর নস্টালজিক হচ্ছি। সেই ছোট বেলার কথা মনে পড়ছে। সৎ মা এর অত্যাচার, বাবার আদর সব কিছু। কত দ্রুত বড় হয়ে গেলাম। বাবা মারা গেলেন।পড়াশোনার টাকা যোগাড় করতে বেশ্যাবৃত্তি তে নামলাম। তারপর ক্ষণিকের জন্য আফতাব ভাইয়ের ভালবাসা পেলাম। তারপর আবার সব শেষ । ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরলাম জানি না। যখন ঘুম ভাঙ্গলও তখন সীতাকুণ্ড পার হচ্ছি।কিছুখনের মাঝেই ট্রেন চিটাগং স্টেশনে পৌঁছে যাবে। এখন বাজে ভোর ৬ টা।এখন পর্যন্ত কোন ফোন আসে নাই। কোথাও নিউজ শুনতে পারলে ভাল হত। আসলে কি হয়েছে জানা যেত।
স্টেশনে নামলাম ৬.১৫ টা তে।স্টেশনের একটা চায়ের দোকানে বনরুটি আর চা খেলাম। তারপর স্টেশনের বেঞ্চের উপরে শুয়ে পরলাম। ৮ টার আগে কোন বাস পাওয়া যাবে না। সুতরাং স্টেশনে রেস্ট নেয়াই ভাল। ৭ টার দিকে স্টেশন থেকে বের হয়ে বাস স্টপে গেলাম।এখান থেকে বাসে আরও ২ ঘন্টার রাস্তা। একজন কে নিউজ পেপার বিক্রি করতে দেখে সেদিকে দৌড়ে গেলাম। ১০ টাকা দিয়ে নিউজ পেপার কিনে নিলাম। পেপার খুলতেই সংবাদ
“ সালমা মঞ্জিলে ক্রসফায়ারে ৪ পলাতক মাদক ব্যবসায়ী নিহত”
চার জন কেন? আমি দ্রুত পুরো নিউজ টা পড়লাম। সেকি নিহত দের মাঝে সবার নাম আছে। শুধু রাজার নাম নেই। তাহলে কি সে মরে নাই! আমার বুক এর হার্ট বিট যেন আমি শুনতে পারছি। রাজা না মরলে আমার সামনে সমূহ বিপদ। কি করি এখন! ঠিক এই সময় একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসলো।আমি ফোন রিসিভ করলাম
– হ্যালো
– ওই শালা কই তুই?
আরে এতো রাজার কণ্ঠ। ভয়ে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। না ওকে বুঝানো যাবে না যে আমি ভয় পেয়েছি। ওই পাশ থেকে রাজা গালি গালাজ করেই যাচ্ছে।
– ওই শুয়ারের বাচ্চা কথা কশ না কেন?
– কি বলবি বল
– বাহ তুই তোকারি করছিস
– তুই শুরু করেছিস
– হুম একটা কথা জানিস তো পিপীলিকার পাখা উড়ে মরিবার তরে। তোর পাখা গজিয়েছে। হা হা। কি মনে করিছিলি আমাকে পুলিশের হাতে ধরায় দিবি। ক্রস ফায়ারে মারা যাবো আমি। এত সহজ না।
– তুই আমাকে ফোন করেছিস কেন?
– একটা কথা জানাতে। শোন শুয়ারের বাচ্চা কান খুলে শোন তোকে আমি ছাড়বো না। তোর সব তথ্য আমি জানি। কোথায় যেয়ে লুকাবি তুই। বাংলাদেশের যেখানেই থাকিস তোকে খুঁজে বের করবোই তারপর শাস্তি দিব
– আরে যা যা। আগে তুই নিজে পুলিশের হাত থেকে রেহাই পা। তারপর আমার কথা ভাবিস।
ওই পাশ থেকে রাজা ফোন রেখে দিল। আমার কি হবে এখন। আমি যতই রাজার সামনে সাহস দেখাই না কেন। ওর ভয়ে তো জুজু হয়ে আছি। আমার কি নানু বাড়ি যাওয়া সেফ হবে? কিন্তু তা না হলে কোথায় যাবো ! আমি ধপাস করে বাস স্ট্যান্ডের বেঞ্চির উপর বসে পরলাম। এ কি হল! রাজা কেন বেঁচে থাকবে! যাই হোক এখন ভয় পেলে হবে না। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে। কিন্তু নানু বাড়ি যেতেই হবে। আমার টাকা পয়সা দরকার। নানু বা মামার কাছ থেকে নিতে হবে। মায়ের সম্পত্তির ভাগ আমি কিছুই নেই নাই।এখন মামা কি আমাকে সাহায্য করবে না? তার আগেই সিম টা ফেলে দিতে হবে। কল ট্র্যাক করে আসা রাজার কাছে কোন কঠিন ব্যাপার না। আমি সিম ফেলে দিয়ে কাছ থেকে নতুন একটা সিম কিনে নিলাম। তারপর নানু বাড়ি যাবার উদ্দেশ্যে বাসে উঠে পরলাম।
২ ঘন্টার রাস্তা। কিছু দূর যেতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। রাস্তা জ্যাম হয়ে গেলো। আমি সিটে বসে থাকতে থাকতে এক সময় ঘুমিয়ে পরলাম। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলাম। আমি নানু বাড়ি গিয়েছি। রাজা আমার পিছু পিছু নানু বাড়ি চলে এসেছে। আমার সাথে সাথে ঘুম ভেঙে গেলো । স্বপ্ন দেখে কপাল থেকে ঘাম ঝরছে। গলা শুকিয়ে গিয়েছে। সাথে পানি ছিল।ঢক ঢক করে পানি খেলাম।বাইরে তাকিয়ে দেখি প্রায় পৌঁছে গিয়েছি।
বাস স্টপে নামলাম। এরপর রিকশা করে আধাঘন্টার রাস্তা। অনেক দিন পর আসলাম তাও রাস্তাঘাট চিনতে পারছি।কিন্তু গ্রামে এসে রাস্তা গুলিয়ে ফেললাম। আসলে অনেক নতুন বাড়ি ঘর হয়েছে তাই চিনতে পারছি না।একজন কে জিজ্ঞেস করলাম ভূঁইয়া বাড়ি টা কোনদিকে। আমার নানা বাড়ি হল ভূঁইয়া বাড়ি। আমার বড় নানা ছিলেন জমিদার। বিশাল এলাকা জুড়ে বাড়ি।তাই সবাই চিনে আমাদের এই বাড়ি। নানা রা জমিদার ছিলেন। কিন্তু জমিদারী চলে যাওয়ার পর সব কিছু বিক্রি করে খেয়েছেন। এখন আর সেই অবস্থা নেই। অবস্থা পরে গিয়েছে।
লোকটার ডিরেকশন অনুযায়ী পৌঁছে গেলাম নানা বাড়ি।বাড়ি তে ঢুকে দেখি উঠানে কেউ নেই। রান্না ঘরের দিকে গেলাম। ওখানে নিশ্চয় নানু থাকবে। যা ভেবেছিলেম তাই। নানু রান্না ঘরে। আমি পিছন থেকে ডাকলাম
– নানু
নানু পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল
– কে ডাকে রে আমায়? গলার স্বর চেনা চেনা লাগে,
নানু অনেক বৃদ্ধা হয়ে গিয়েছেন। আসলে সময় তো অনেক বয়ে গিয়েছে। নানু বাসার কাজের মহিলা ফুলবানু কে ডাকলেন।
– আমার চশমা টা দিয়ে যা তো ফুলবানু।আজকাল চশমা ছাড়া কিচ্ছু দেখি না।
আমি বললাম
– নানু আমাকে চিনতে পারছো না। আমি পিয়াল;
– পিয়াল নানুভাই আমার! এত দিন পর এই বুড়ি কে মনে পড়লো। দাড়া চশমা পরে নেই। কত দিন পর দেখবো নানু ভাইয়ের মুখটা।
– তোমার চোখ এত খারাপ হয়ে গিয়েছে নানু! চশমা ছাড়া কিচ্ছু দেখো না।
নানু চশমা পরে আমার দিকে তাকালেন।আমাকে এসে জড়িয়ে ধরে বললেন
– ওমা আমার পিয়াল নানুভাই এত বড় হয়ে গিয়েছে।
নানু কাঁদতে লাগলেন হাপুস নয়নে। আমি ধমক দিয়ে বললাম
– নানু থামো তো কি হচ্ছে এগুলো
– কতদিন পর এলে নানু ভাই। সুমি মারা যাবার পর মাত্র তিন বার দেখেছি তোরে। তোকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবো না তো কাকে দেখে কাঁদবো।
এরপর নানু আমাকে নিয়ে মূল বাড়ি গেলেন। মামা নাকি কি কাজে চিটাগাং গিয়েছেন। আমার মামা চিরকুমার। বিয়ে করেন নাই। তাই বাড়ি তে শুধু নানু আর মামা। কাজের লোক রয়েছে।
আমি ঘরে গিয়ে কাপড় পাল্টালাম। মামার কাপড় পরলাম। মামার কাপড় দেখলাম আমার একদম ফিট হয়েছে। আমাকে খেতে ডাকলেন নানু। উঠানে মাদুর বিছিয়ে খেতে দিয়েছেন। খেতে খেতে নানুর সাথে গল্প করছি। নানু সব খবর রাখেন। আমি যে ডাক্তারি পড়ি তাও জানেন।
গ্রামে খুব তাড়াতাড়ি রাত হয়। সন্ধ্যা হতেই সকলে ঘুমিয়ে পরে।কিন্তু আমার ঘুম আসছে না। আমি টাকার কথা নানু কে বলেছি। বলেছি যে আমার ডাক্তারি পড়ার জন্য কিছু খরচ লাগবে।নানু বললেন যে মায়ের সকল গহনা তার কাছে রয়েছে। সেগুলো নিতে। আমার গহনা গুলো নিতে কেমন জানি লাগছিল। তারপরও নিলাম।
বাইরে জানালা দিয়ে তাকালাম। পূর্ণিমা। বড় গোল রূপালি থালার মত চাঁদ উঠেছে। চারিদিক পূর্ণিমার আলোয় ঝলমল করছে। চারিদিক শুনশান নীরবতা। শুধু ঝি ঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আমি উঠানে এসে বসলাম। মামা চিটাগাং থেকে এসেছে। আমাকে উঠানে বসে থাকতে দেখে আমার পাশে এসে বসলেন মামা। মামা বললেন
– কি রে উঠানে একা বসে
– গ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করছি
– বাঁশি শুনবি
মামা খুব ভাল বাঁশি বাজায়। ভুলেই গিয়েছিলাম সেই কথা।
– অবশ্যই। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে তুমি কত সুন্দর বাঁশি বাজাও।
মামা বাঁশি বাজাচ্ছেন। চারিদিকে জোনাকি পোকা। আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ। কেমন এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি হচ্ছে আমার মধ্যে। কেমন একটা বেদনা আমাকে এসে ঘিরে ফেলেছে। ভাবছি আমার জীবনের কথা। কক্ষনো শান্তি পাই নাই। প্রথমে সৎমা। তারপর টাকার অভাবে বেশ্যাবৃত্তি আর এখন পালিয়ে বেড়ানো। কবে একটু স্থির হতে পারবো !
৭ দিন পর।
আমি ৭ দিন হল নানু বাড়ি । কিন্তু হলে যেতে সাহস পাচ্ছি না। আর মাদক অভিযান থেমে গেলে নিশ্চয় রাজা আবার জাকিয়ে বসবে।আর রাজা আমার খোঁজ ভালভাবে নিলে এতদিনে নিশ্চয় নানুবাড়ির ঠিকানা পেয়ে গিয়েছে। আমাকে মারতে চাইলে যে কোন মুহূর্তে রাজা এসে পরতে পারে এখানে। আমি সাহস পাচ্ছিনা এখন আর নানু বাড়ি থাকতে। কিন্তু কই যাবো?
সকাল ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করছি। এই সময় ফুলবানু এসে বলল
– ভাইয়া আপনার এক বন্ধু আইসে গেরামে
– মানে?
– ওই যে মুদী দোকানদার রহমত কইলো কে জানি আপনার খোঁজে আইসে। আপনার মতই বয়স। আপনার বন্ধুই হইবো
শুনে আমার হার্টবিট বেড়ে গেলো। কে আসবে আমার খোঁজে রাজা ছাড়া ।
– ফুলবানু ওরে কি রহমত বাসার ঠিকানা দিয়েছে।
– জে ভাইয়া। হুনলাম হে বাইরত নাস্তা করতাসে। আমি রহমত রে কইলাম ভাইয়ার বন্ধু বাইরে নাস্তা করবো এইডা কেমুন কথা।
এই কথা শুনে একটু স্বস্তি পেলাম।ভাগ্য ভাল রাজা বাইরে নাস্তা করছে। আমি এই ফাঁকে পালাই। আমি রুমে গিয়ে দৌড়ে ব্যাগটা নিলাম। ব্যাগ গুছানোই ছিল। সামনের গেট দিয়ে বের হওয়া নিশ্চয় সেফ হবে না। আমি পিছনের গেট দিয়ে দ্রুত বের হয়ে একটা রিকশা নিলাম। নানু আর মামা কে বলে আসা হল না। কিন্তু কিছুই করার নাই।নানু কে বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করলে রাজা এসে পরবে। আমি বাসস্টপে পোঁছালাম ১৫ মিনিটের মাঝেই।সকাল বেলা দেখে দ্রুত পৌঁছে গেলাম। কিন্তু কই যাবো এখন? রাজা যখন জানবে যে আমি বাসায় নেই তখন নিশ্চয় বাস স্টপেই আসবে। কি করা যায়! এখানে অপেক্ষা করা যাবে না। যে বাস চোখের সামনে পরবে তাতেই উঠে পরবো। তারপর অন্য কিছু ভাবা যাবে। আমার হার্টবিটের শব্দ আমি নিজেই শুনতে পাচ্ছি। আমি থাকতে থাকতে রাজা যদি বাস স্টপে চলে আসে তাহলে রাজার হাত থেকে কেউ আর আজকে আমাকে রক্ষা করতে পারবে না। কিন্তু কোন বাস ছাড়ছে না। ঠিক এই সময় খেয়াল করলাম একটা বাস ছাড়বে ছারবে করছে। আমি আর কিছু না ভেবেই সেই বাসে উঠে পরলাম। বাসটি তে পেসেঞ্জার কম। সহজেই খালি সিট পেয়ে গেলাম। টিকেট চেকার এসে টিকেট দিয়ে গেলো। বাসটি যাচ্ছে পাহাড়ি শহর অচিনপুরে। চললাম অচিনপুর।

অচিনপুর যাবার পথে আরও ২ টা ছোট শহর পরে। ফুলতলি আর রায়পুর। বাস এই ২ টা শহরেই থামলো । এরপর প্রায় ৩ ঘন্টা পর পৌঁছে গেলাম পাহাড়ি শহর অচিনপুরে। ময়ূরাক্ষী নদী পার দিয়ে যখন বাস যাচ্ছিল তখন সে কি অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। কিন্তু রাজার চিন্তায় বিভোর ছিলাম দেখে এই অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য আমার মন কাঁড়তে পারলো না। রাজা যে নানু বাড়ি পর্যন্ত চলে যেতে পারবে তা আমি আঁচ করতে পেরেছিলাম। কিন্তু কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিলো না রাজা এতটা ডেস্পারেট আমার ব্যাপারে। কিন্তু যখন রাজা নানু বাড়ি পর্যন্ত চলে এলো তখন বুঝলাম রাজা কতখানি সিরিয়াস আমার ব্যাপারে। আজ অচিনপুর পালিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে রাজা চলে এলে কোথায় যাবো। আমার কান্না আসছে। এভাবে কতদিন পালিয়ে বেড়াবো ।ভাবছি ভারত চলে যাবো ।সেখানে আমার এক পরিচিত ব্যবসায়ী আছে।সে নিশ্চয় আমাকে সাহায্য করবে।বলেছিল কখনো ভারতে গেলে দেখা করতে। তার কার্ড এখনো আমার কাছে আছে।আচ্ছা রাজা কি বুঝে ফেলবে যে আমি অচিনপুরে এসেছি। নিশ্চয় বুঝবে। কারণ সে খোঁজ নিলেই জানতে পারবে যে সেই সময় টায় শুধু অচিনপুরের বাস ছেড়েছে । অচিনপুরে যাবার পথে ফুলতলি আর রায়পুর ২টা শহর আছে। এগুলোর যে কোন একটা তেও অবশ্য আমি থাকতে পারি। কিন্তু অপশন টা তো কমে আসলো । তাহলে কি অচিনপুর ছেড়ে চলে যাবে। না কারণ এই শহর টা ভারতের খুব কাছে। এখান থেকে যত সহজে ভারতে পালানো যাবে তা আর অন্য কোন শহর থেকে সম্ভব নয়। তাছাড়া এইভাবে আর কত পালিয়ে বেড়াবো। এইবার দরকার পড়লে রাজা কে ফেস করতে হবে। বাস যখন বাস স্ট্যান্ডে এসে থামলো তখন দুপুর। ঝা ঝা রোদ মাথার উপর। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্ট্যান্ডে বসে আছি। কিন্তু কই যাবো বুঝতে পারছি না। সেই সময় বাস স্ট্যান্ডের চার পাশের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়লো সালেহ কাকুর বাসার বিজ্ঞাপন। আমি কোন হোটেলে উঠতে চাই না। কারণ তাতে ধরা পরে যাবার সম্ভবনা বেশি। আমার চেহারায় কেমন জানি একটা ইনোসেন্ট ভাব আছে। আর মানুষ কে খুব সহজেই ইম্প্রেস করার একটা গুন রয়েছে। সালেহ কাকু এক কথায় আমাকে বাসা ভাড়া দিতে রাজি হলেন। পরিচিত হলাম ব্যবসায়ী হিসেবে। মামার কাছ থেকে কিছু টাকা পেয়েছিলাম। তা দিয়ে এডভ্যান্স দিয়ে দিলাম। কিন্তু কিছুদিন যেতেই টাকায় টান পড়লো। গহনা গুলো আমার কাছে আছে। আমি তা বিক্রি করতে সাহস পাচ্ছিলাম না।কারণ এত গুলো গহনা বিক্রি করলে তার খবর রাজার কাছে চলে যেতে পারে। কারন এই তিনটা শহরই ছোট। রাজা যদি চোখ রাখে এই শহর তিন্টার উপর তাহলে এই খবর অবশ্যই রাজা পাবে। আমি এই ভয়ে গহনা গুলো বিক্রি করতে পারছিলাম না। আর তক্ষুনি পাশের বাড়ির একটি মেয়ের সাথে পরিচিত হলাম। মেয়ে টার নাম লুবনা।
পিয়ালের কথা সমাপ্য।
আমি এতক্ষণ যাবত নিবিষ্ট চিত্তে পিয়ালের কথা শুনছিলাম।পিয়ালের পুরো গল্প শুনে তা একটা রোমহর্ষক থ্রিলার গল্প মনে হচ্ছিলো। কথা শুনতে শুনতে আমার কিছু লোম সত্যি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে যখন রাজা পিয়াল কে ধরতে আসছিল সেই জায়গাটা খুব ভয় লাগছিল।পিয়াল আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল
– কি বিশ্বাস হচ্ছে না আমার গল্প?বিশ্বাস না হবারি কথা। তোমার আপু কে তো আমি ঠকিয়েছি।
– হ্যাঁ ঠকিয়েছেন তো। কিন্তু কেন ঠকালেন তা এখনো বুঝতে পারি নাই
– খুব সিম্পল। টাকার জন্য। আমার টাকার দরকার ছিল। তোমার আপু টাকা দিয়েছে। আমার গহনা বিক্রি করার সাহস হচ্ছিলো না।
– কিন্তু এটা কি ঠিক করেছেন?
– ঠিক কি আমার সাথে হচ্ছে?আমার সাথেই কেন সারা জীবন এত অন্যায় হবে?
– দেখেন ভালবেসে ঠকার কষ্ট টা অনেক বেশি
– তোমার আপু কক্ষনোই আমাকে ভালইবাসে নাই। যদি ভালবাসতো তাহলে এত সহজে আমাকে ভুলে গেলো কিভাবে। আর আমি সব স্বীকার করবো ঠিক করেছিলাম। কিন্তু তার আগেই পুলিশ অফিসারের সাথে তোমার আপুর সম্বন্ধ হল। এই সময় আমি সব স্বীকার করলে আপু রেগে গিয়ে পুলিশ অফিসার টাকে বলে দিলে কি হত বল?আমাকে তো সোজা জেলে ভরতো।তোমার আপু খুব্ বোকা
আমি ভেবে দেখালাম সত্যি তো আপু খুব বেশি কষ্ট পায় নাই।তা নাহলে এখন কিভাবে দুলাভাইয়ের সাথে এত মিষ্টি করে কথা বলে! বরং পিয়ালের প্রতি কেমন খুব মায়া হচ্ছে।বেচারা সারা জীবন বঞ্চিত হয়েছে। এখন পাগলের মত পালিয়ে বেরাতে হচ্ছে। না পিয়াল কে ক্ষমা করে দেয়া যায়। বরং পিয়াল কে কিভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করা যায় সেই চিন্তা করা উচিৎ।একটা প্রশ্ন মাথায় আসলো ।আমি জিজ্ঞেস করলাম
– আচ্ছা এই কয়দিন কোথায় ঘাপটি মেরে ছিলেন?
– ওহ রায়পুরে গিয়েছিলাম গহনা বিক্রি করতে। কোন উপায় না দেখে গহনা বিক্রি করতেই হল।
– রাজা যদি জেনে যায়?
– তাতো জানতেই পারে।কিন্তু আর কোন উপায় ছিল না।
– আপনি অচিনপুর ছেড়ে চলে যান।
– না আর কোথাও যাবো না।
– কিন্তু রাজা এসে উপস্থিত হলে?
– আমি এইবার ওকে ফেস করবো বলে ঠিক করেছি। এভাবে আর পালিয়ে বেড়াবো না।
– মানে?
– আমি একটা জিনিস কিনেছি।
– কি>?
– দাড়াও দেখাই।
পিয়াল টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কাপড়ে মোড়ানো একটা জিনিস বের করে আনলও। কাপড় সরালো । আমি আঁতকে উঠলাম দেখে । একটা পিস্তল। আমার দিকে তাকিয়ে পিয়াল হেসে বলল
– কি ভয় পেলে?
– না
– আমি স্পষ্ট দেখলাম ভয়ে তুমি আঁতকে উঠেছো
– মোটেই না।‘
– আচ্ছা এবার বাড়ি যাও। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে।
– যাবো । তার আগে বলেন
– কি বলবো
– আমার পোট্রেট টা শেষ করবেন না?
কথা টা বলে আমি কেমন লাজুক হাসি হাসলাম । পিয়াল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো
– আমার এত কাহিনী শোনার পরও তুমি আমার কাছে আসবে?
– অবশ্যই ।আসবো না কেন?
– বুঝলাম
– কি বুঝলেন
– তুমি আমার প্রেমে পরে যাচ্ছো
– মোটেই না।
– উহু।তুমি আমার এই জীবনের সাথে জড়িয়ো না। বিপদে পরবে।
– জড়িয়ো না বললেই হবে?জড়িয়ে তো অলরেডি গিয়েছি
– তুমি খুব ভাল ছেলে লাবু
এই বলে পিয়াল আমার গালে একটা চুমো দিল। এই আমার জীবনের প্রথম চুমো । আমি যেন বাতাসে ভেসে ভেসে প্রজাপতির মত আকাশে উড়ে গেলাম। পিয়ালের কাছে বিদায় নিয়ে বাসার দিকে চললাম। আমার চোখে কেমন যেন ঘোর লেগেছে। আর এই ঘোর লাগিয়েছে পিয়াল। আমি আমার অজান্তেই পিয়াল কে ভালবেসে ফেলেছি।
ছয়
বাড়ি ফিরে আমার কেন জানি খুব পুলকিত লাগছে। আচ্ছা প্রেমে পরলেই কি এমন হয়? সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে আমার কেন জানি বিছানায় শুয়ে বাতি নিভিয়ে রোমান্টিক গান শুনতে ইচ্ছা করছে। আমার মনে হয় এটাও প্রেমে পরার একটা লক্ষন। কিছুক্ষণের মাঝেই মা দরজা ধাক্কাতে শুরু করলো। আমার খুব বিরক্ত লাগছে। মা সব সময় বিরক্ত করে। মায়ের জন্য কিছু করা যায় না! উফ। মা জোরে জোরে দরজা ধাক্কানো শুরু করেছে। এখন না খুলেও উপায় নাই। আমি দরজা খুলতেই মা চিৎকার শুরু করলো
– এই সন্ধ্যা বেলায় পড়াশোনা রেখে গান শোনা হচ্ছে। বলি এটা কেমন তর ব্যাপার ।
– মা
– কি? মা মা করে লাভ নেই! খাবার ঘরে যেয়ে ২ টা খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর।
– আমি কিছু খাবো না এখন মা। আমার ক্ষুধা নেই
– ক্ষুধা নেই ,না?
ধুমধাম করে ২ টা থাপ্পর মারলো আমার পিঠে। বুঝলাম ডিনার না করে উপায় নেই। খাবার টেবিলে দেখি মুখ অন্ধকার করে বসে আছেন। আমি বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
– কি হয়েছে বাবা?
– আর বলিস না। খুব খারাপ একটা খবর আছে।
– কি খবর বাবা?
– তোদের স্কুলের ড্রয়িং স্যার আমিরুল আজ হটাত সন্ধ্যা স্ট্রোক করেছেন। হাস্পাতালে নিতে নিতেই শেষ
– কি বল বাবা?
স্যারের হাসি হাসি মুখ টা আমার চোখের সামনে ভাসছে। স্যার খুব ভাল মানুষ ছিলেন। খুব কম কথা বলতেন। শাস্তি তো কক্ষনোই দিতেন না। আর খুব খুব সুন্দর ছবি আঁকতেন। আমাকে ভীষণ পছন্দ করতেন স্যার। কারণ আমিও ভাল ছবি আঁকি । মনটা খারাপ হয়ে গেলো। খেয়ে দেয়ে ঘরে যেয়ে চুপচাপ বসে আছি। মানুষের জীবনটা এত অনিশ্চিত কেন। আজকে আছে তো কাল নেই। আচ্ছা এখন পিয়াল কি করছে। হটাত কেমন একটা ভয় ঘিরে ধরলো আমাকে। যদি আজকেই রাজা এসেই পিয়াল কে মেরে ফেলে। নাহ তা কি হবে?এত সহজ। আচ্ছা ছাদে উঠে দেখি তো পিয়ালের ঘরে আলো দেখা যায় কিনা।যেমন ভাবা তেমন কাজ। সোজা ছাদে উঠে গেলাম। পিয়ালের ঘরে আলো জ্বলছে। আমি বসে বসে সেই আলো দেখছি। আচ্ছা মানুষ প্রেমে পরলে কি এমন পাগল হয়। আমি পুরো ১ ঘণ্টা বসে বসে পিয়ালের ঘরের আলো দেখলাম। তারপর পিয়াল যখন বাতি নেভালো তখন আমি নিজের ঘরে গেলাম। আমার একটা ডায়রি রয়েছে। আমার কিছু লিখতে ইচ্ছা হচ্ছে। ডায়রি টা হ্যান্ডমেড পেপারে তৈরি। আগে কক্ষনো কিছু লিখি নাই লিখতে মায়া লাগে। কিন্তু আজ লিখবো। কলম আর ডায়রি নিয়ে বসলাম। লিখছি মনে যা আসছে তাই। লেখা গুলো একদম হৃদয়ের গহীন থেকে আসছে।
প্রিয় পিয়াল
আমার এই ডায়রি টা খুব প্রিয়। তাই কক্ষনো কিছু লিখি নাই পাতা নষ্ট হবে ভেবে। কিন্তু আজ যখন তোমার প্রেমে পরলাম তখন কিছু লিখতে ইচ্ছা করছে খুব। প্রথম যখন তোমাকে সালেহ কাকুর বাসায় দেখলাম তখন থেকেই তোমাকে আমার ভাল লেগেছে। আর আজকে ভালবেসে ফেলেছি তোমায় । জানি এই চিঠি কক্ষনো তোমাকে দেয়া হবে না।থাকুক না এই ডায়রির পাতায় আজীবন ………………।
এত টুকু লিখে প্রথম থেকে আবার পড়লাম। কি ছেলে মানুষী লেখা হয়েছে। কেটে ফেলতে ইচ্ছা করছে। কাটতে মায়া লাগছে। আচ্ছা থাকুক না ডায়রি তে।

সাত
আমি বসে আছি পিয়ালের ঘরে। পিয়ালের কাছে অঙ্ক শিখবো রাতে এই কথা বলে রাতে পিয়ালের বাসায় থাকার অনুমতি নিয়েছি বাসায়।সকাল বেলা বাসা ফিরে যেতে হবে। পিয়াল আমার পোট্রেট করবে। পাথরের মূর্তির মত বসে থাকতে হচ্ছে। আমি নড়লেই পিয়ালের মনোযোগ নষ্ট হয়। কিন্তু এইভাবে আর কতক্ষণ। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম
– উহু আর পারছি না এইভাবে বসে থাকতে।
– আর অল্প কিছুক্ষণ সোনা।
আধাঘন্টা পর ছবি আঁকা শেষ হল। আমি দেখতে গেলাম। পিয়াল বলল
– উহু এখন নয়। একদম ফিনিশিং টাচ দিয়ে নেই। তারপর দেখবে।
আমি আর জোরাজুরি করলাম না। পিয়াল আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলো। আমি পিয়ালের বাহুডোরে আবদ্ধ হলাম। পিয়ালের কমলার কোয়ার মত ঠোঁট আমার ঠোঁট কে স্পর্শ করলো। আমি পিয়ালের জিভের স্বাদ নিতে লাগলাম। পিয়ালের গায়ে অসম্ভব পুরুষালী একটা গন্ধ আছে। যেটা আমাকে মাতাল করে দেয়। পিয়াল ধীরে ধীরে আমার টিশার্ট জিন্স খুলে দিল। পিয়াল নিজেও নগ্ন হল। লাইট নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে যৌনতার আবেদন বেশি পাওয়া যায়। পিয়াল জিভ দিয়ে আমার নিপল স্পর্শ করলো। এক অজানা শিহরণে কেঁপে উঠলো আমার শরীর। পিয়াল তার শরীর দিয়ে আমাকে যেন পিষতে লাগলো। ব্যথায় আমি শীৎকার করে উঠলাম । সেই ব্যথায় এক অন্যরকম সুখ রয়েছে। পিয়াল আমার ভিতরে প্রবেশ করলো। সে এক অনন্য সুখ। যার সাথে কোন কিছুর তুলনা হয় না। নিজেকে তখন পিয়ালের শরীরের অংশ মনে হয়। এক সময় পতন হল পিয়ালের। আমার বুকের উপর মাথা রেখে হাঁপাচ্ছে সে। আবার আমার বার বার চুমু দিতে লাগলো সে। মাদকতাময় কণ্ঠে পিয়াল বলছে।
– তোমাকে অনেক ভালবাসি। জীবনে এই প্রথম ভালবেসে কারো শরীরের প্রবেশ করলাম। আর এর যে সুখ তা তুলনাহীন।
– আমিও তোমাকে ভালবাসি পিয়াল। আমাকে ছেড়ে কক্ষনো যাবে না তো ?
পিয়াল চুপ করে আছে। আমি অধৈর্য হয়ে বললাম
– বল পিয়াল চুপ করে আছো কেন?
– তোমাকে আমার জীবনের সাথে জড়াতে ভয় লাগছে।
– কেন?
– রাজা আমাকে খুঁজছে। খুঁজে পেলে প্রতিশোধ নিবেই। তুমি আমার জীবনে থাকলে তোমারও বিপদ হতে পারে।
– হোক। কিন্তু আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।
– কিন্তু আমার তো পালাতে হবে এই শহর ছেড়ে ভারতে।
– আমাকেও তোমার সাথে নিয়ে যাও।
– তা কি হয়? ওখানে আমি কিভাবে থাকবো তারই ঠিক নেই। আর তোমার বাবা মায়ের কথাও ভাবো । তোমাকে সাথে নিতে পারলে আমার চেয়ে খুশি আর কেউ হবে না।
আমার দুই চোখ থেকে পানি পরছে।আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে পিয়াল বলল
– আমি যেখানেই যাই না কেন আবার ফিরে আসবো তোমার জন্য।
– সত্যি
– তিন সত্যি
– তুমি কবে যাবে?
– যত তাড়াতাড়ি। সম্ভবত এই সপ্তাহেই।
আমি দীর্ঘ শ্বাস ফেললাম। একজন কে ভালবাসলাম। সেও আমাকে ছেড়ে দূরে সরে যাবে। জীবন আমাকে নিয়ে এ কি খেলা খেলছে। পিয়াল কাপড় পরে বলল চল ছাদে যাই। এই সময় কেউ ছাদে আসবে না। আমি তোমাকে তারা দেখাবো। ছাদে একটা পাটি বিছিয়ে আমরা ২ জন শুইলাম। আমার মাথা পিয়ালের বুকে। কালো আকাশে মেঘ নেই। অসখ্য নক্ষত্ররাজি আকাশ জুড়ে। এত সুন্দর সময় আমার জীবনের আর কখনো আসে নাই। কিন্তু এই সময়টা খুব ক্ষণস্থায়ী। এক সপ্তাহের মাঝে পিয়াল আমার থেকে আলাদা হয়ে যাবে। আমি তাকে আটকাতেও পারছি না। কারণ রাজা ভয়ানক। আমার জন্য যদি পিয়ালের কোন ক্ষতি হয় আমি নিজে কে কোন দিন ক্ষমা করতে পারবো না। এইভাবেই শুয়ে রইলাম আমরা সারা রাত। কখন যে ভোর হয়ে গেলো তা টেরই পেলাম না। আজানের সুমধুর ধ্বনি কানে আসছে। আমার কিছুক্ষণ পর পিয়াল কে ছেড়ে যেতে হবে।কিন্তু আমার তাকে ছাড়তে ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে জনম জনম পিয়ালের সাথে এইভাবে যদি থাকা যেত। ভাল সময় এত তাড়াতাড়ি চলে যায় কেন?
আট
আমাদের স্কুলে নতুন ড্রয়িং স্যার এসেছেন। বাবা স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান। তাই আমাদের বাসাতেই প্রথমে উঠবেন। পরে বাড়ি ঠিক হয়ে গেলে তিনি আমাদের বাসা থেকে শিফট করবেন।ড্রয়িং স্যার লম্বা ফরশা স্লিম। চোখে রিমলেস চশমা পরেন।বয়স ৩০-৩২। নাম রাজীব। স্যার আমাদের বাসায় উঠায় আমার বেশ সমস্যাই হল। আমার ঘর স্যার কে ছেড়ে দিয়ে বড় আপুর ঘরে উঠে যেতে হল। স্যার খুব কথা কম বলেন। রাতের খাবার টেবিলেও তিনি তেমন কোন কথা বললেন না। খেলেনও খুব কম। তারপর আমার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তখন হটাত আমার মনে পড়লো ডাইরির কথা। ডাইরি টা তো নিয়ে আসা হয় নাই। ডায়রি যদি স্যার পড়ে ফেলেন। কিন্তু এখন কিছু করার নেই। এত রাতে স্যারের ঘরে নক করে ডায়রি নিয়ে আসাটা নিশ্চয় ঠিক হবে না। কালকে স্যার স্কুলে গেলে ডায়রিটা নিয়ে আসতে হবে। রাতে আমি কেন জানি সারা রাত ছটফট করলাম। কি এক আজানা আশঙ্কায় আমার সারা রাত ঘুম হল না। মনে হচ্ছে সামনে কোন একটা ঝড় আসছে।
সকালে উঠে দেখলাম স্যার নাস্তা করে স্কুলে চলে গিয়েছেন। আমি এই ফাঁকে স্যারের ঘরে ঢুকলাম। স্যার একটা ছোট লাগেজ ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসে নাই। আমি ড্রয়ার খুললাম। দেখি ডায়রি নেই। আমি তো এখানেই ডায়রি রেখেছিলেম। আরেকটু খুঁজে দেখলাম স্যারের বিছানার উপর ডায়রিটা। তার মানে স্যার ডায়রি পড়েছেন। আমার খুব রাগ লাগছে। স্যার একজন শিক্ষক। তার মানসিকতা এমন কেন হবে যে অন্যের প্রাইভেসি রক্ষা করতে জানে না। ডাইরি নিয়ে সোজা আমার ঘরে চলে এলাম। মেজাজ খুব খারাপ।
দুপুরটা খুব নিঃসঙ্গ লাগছে। ভাল লাগছে না। ভাবলাম বিকেলে পিয়ালের ওখানে যাবো। পিয়াল সব গুছিয়ে নিয়েছে। হয়তো ২-৩ দিনের মাঝেই ভারত চলে যাবে। আমি কিভাবে থাকবো পিয়াল কে ছাড়া। ভাবতেই বুকটা হু হু করে উঠে। এই অল্প কয়েকদিনেই পিয়াল কে আমি এত ভালবেসে ফেলেছি।পিয়াল কে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।
বিকেল হয়ে এলো। আসরের আজান দিয়েছে। আমি রেডি হয়ে বাড়ি থেকে বের হব। স্যারের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম স্যার নেই। এই সময় আবার স্যার কই গেলো। আমি সালেহ চাচুর বাড়ি তে এলাম। দেখি সালেহ চাচু বাড়ির সামনের বাগানে বসে আছেন। আমাকে দেখে এক গাল হেসে বললেন
– কি পিয়ালের কাছে এসেছও?
– জি চাচা। অঙ্ক বুঝতে। ভাইয়া খুব ভাল অঙ্ক পারেন।
– যাও যাও। ছেলেটা খুব ভাল।এমন ছেলে আজকাল দেখাই পাওয়া যায় না।
– জি চাচা। আসি।
সিঁড়ি ঘর টা অন্ধকার হয়ে আছে। বাতি জ্বালানো হয় নাই।পিয়ালের ঘরের দরজা টা ভেজানো। বন্ধ করা না। এই অসময়ে পিয়াল দরজা বন্ধ না করে বসে আছে। কেউ এলো নাকি। কিন্তু কে আসবে এই অবেলায় পিয়ালের কাছে? আমি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলাম। এ কি দেখলাম আমি!জগতের আদিমতম খেলা চলেছে ভিতরে। শীৎকার শোনা যাচ্ছে ২ জন পুরুষ মানুষের। ২ টা নগ্ন পুরুষ দেহ একজন আরেকজন কে জড়িয়ে ধরে আছে। একজন পিয়াল। আরেকজন ড্রয়িং স্যার। আমাকে ২ জন কেউই খেয়াল করে নাই। তারা ২ জন তাদের কাজে ব্যস্ত। আমি ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। এমন ঘটনা আমি দেখবো দুঃস্বপ্নেও ভাবি নাই।
সৃষ্টিকর্তা মানুষ কে নিয়ে কত খেলাই খেলেন। কিন্তু আমাকে নিয়ে এ কি খেলা খেলছেন তিনি। আমার এই ১৭ বছরের জীবনে এত কষ্ট আমি কক্ষনো পাই নাই। পিয়াল আমাকে ধোঁকা দিল? যে সব ভালবাসার বলেছে তা সব মিথ্যা?আমাকে ভালবাসলে আরেকজন পুরুষ মানুষের সাথে সে কিভাবে এক বিছানায়…। সে এমন কত পুরুষ কে তার ঘরে নিয়ে এসেছে কে জানে। ঘৃণায় আমার মুখে থুথু চলে আসছে। ছিঃ এমন মানুষ কে আমি ভালবেসেছি? আমার প্রতিশোধ নিতে হবে। আমি বৃশ্চিক রাশির জাতক। প্রতিশোধ আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আমি কিছু ঠিক মত ভাবতে পারছি না। কি করবো! আমি ঘরে এসে বসলাম। হ্যাঁ একটাই প্রতিশোধ নেয়া যায়। তা হল পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয়া। পিয়াল আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। যেমন টা আপু কে ধোঁকা দিয়েছে। আপু ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি ছাড়বো না। স্থানীয় পুলিশ আমার মত বাচ্চার কথা হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না। তাহলে উপায় কি! একটা কাজ করা যায় দুলাভাই মানে তপন দা কে ফোন করলে কেমন হয়। তিনি তো পুলিশের অনেক বড় পোস্টে আছেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। আম্মুর মোবাইল টা নিয়ে আসলাম। ফোন দিলাম দুলাভাই কে। একবার রিং বাজতেই দুলাভাই ফোন ধরলো।ওই পাশ থেকে দুলাভাই বললেন
– হ্যালো
– হ্যালো দুলাভাই আমি লাবু।
– হ্যাঁ শালাবাবু বল কি খবর
– দুলাভাই একটা বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ খবর দেয়ার জন্য আপনাকে ফোন করেছি।
– বল
– পিয়াল আমাদের পাড়ার এক বাসায় রয়েছে।
– পিয়াল কে?
– দুলাভাই মাদক ব্যবসায়ী রাজার গ্রুপের সদস্য।
– দাড়াও তুমি রাজার নাম জানলে কিভাবে। সে তো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী।
– পিয়াল বলেছে। সে এই গ্রুপেরই সদস্য।
– তুমি শিউর?
– আমি ১০০ ভাগ নিশ্চিত।এখনই ধরতে না পারলে তাকে ধরা যাবে না। সে ভারতে পালাবার প্ল্যান করেছে।
– তুমি জানলে কিভাবে?
– সে অনেক কথা দুলাভাই। পরে আপনাকে সব খুলে বলবো। এখন পুলিশ না পাঠালে আর ধরতে পারবেন না।
– আচ্ছা আমি স্থানীয় থানার ওসির সাথে কথা বলছি। তুমি তাদের কে হেল্প কর।
– ওকে দুলাভাই।
ফোন রেখে ভাবলাম এইবার উচিৎ শিক্ষা হবে পিয়ালের । সারা জীবন জেল খাটো। আমার বুকটা এখনো জ্বলছে প্রতিশোধ স্পৃহায় । ঠাণ্ডা মাথায় কিছু ভাবতেই পারছি না। থানার ওসি আমার নাম্বারে ফোন দিল
– হ্যালো লাবু বলছো ?
– জি
– আমি অচিনপুর থানার ওসি। তোমার দুলাভাইয়ের সাথে মাত্র কথা হল।
– জি আঙ্কেল।
– কোথায় রয়েছে পিয়াল? ঠিকানা বল
আমি সালেহ চাচার বাড়ির ঠিকানা দিলাম।
– আঙ্কল আমি আসবো ?
– না। ওখানে গোলাগুলি হতে পারে। তোমার যাওয়া ঠিক হবে না।
– ওকে আঙ্কল।
ওসি সাহেব ফোন রেখে দিলেন। আমি অপেক্ষায় আছি কখন খবর পাবো পিয়ালের ধরা পরার।প্রতিশোধ নিতে পারলেই আমি শান্তি পাবো। সময় পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোন খবর পাচ্ছি না। আমি অধৈর্য হয়ে যাচ্ছি। যাবো নাকি পিয়ালের বাসায়। গিয়ে দেখি কি হচ্ছে। কিন্তু ওসি আঙ্কল তো না করেছেন। আচ্ছা আমি যে প্রতিশোধ নিলাম তা কি ঠিক করলাম। তাকে তো আমি ভালউবাসি। না আগে বাসতাম এখন আর বাসি না। এখন ঘৃণা করি। নিজের মন কে বুঝাচ্ছি। কিন্তু মনে র ভিতর কোথায় জানি খুত খুঁত করছে। কাজটা কি ঠিক করলাম। পিয়াল কষ্ট পেলে কি আমার কষ্ট লাগবে না?কেমন জানি কষ্ট লাগছে। এতক্ষণ লাগছিল রাগ। এখন কষ্ট। চোখ দিয়ে দর দর করে পানি পরতে লাগলো। কেন এমন হল কেন!সব কিছু এখন অসহ্য লাগছে। কেন পুলিশ কে বলতে গেলাম। যা হবার হোক আমি এখন পিয়ালের ওখানে যাবো। দেখি কি হচ্ছে সেখানে।

নয়
পুলিশ একটা ডেড বডি বের করেছে পিয়ালের বাসা থেকে। আমার ভয় লাগছে । কার ডেড বডি। আর পিয়াল বা কোথায় ? আমি ঘটনাস্থলে বসে আছি। বেশ কিছু সাংবাদিক ইতোমধ্যে চলে এসেছে।
ডেডবডি টা কার! পিয়ালের নয় তো ! আমার খুব ভয় লাগছে। যেভাবেই হোক জানতে হবে কার ডেডবডি। পুলিশের কাছে যাওয়াই যাচ্ছে না।একজন সাংবাদিক ডেড বডির ছবি তুলে এনেছে মাত্র। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম
– ভাইয়া কার ডেড বডি রয়েছে ওখানে ?
– দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রাজার ডেড বডি।
– কে মারলও? পুলিশ?
– না যতদূর শুনলাম রাজার গ্রুপের আরেক জন সদস্য রাজা কে গুলি করে মেরে পালিয়েছে। নিজেদের মধ্যে ঝামেলা ছিল মনে হয়।
আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। রাজা আসলো কোথা থেকে। আমি তো দেখে এসেছি ড্রয়িং স্যার আর পিয়াল কে। দুলাভাই কে ফোন দিলেই সব কিছুর উত্তর পাওয়া যাবে।আমি যা ভাবা তাই করলাম। দুলাভাই কে ফোন করলাম।রিং বাজতেই অপাশ থেকে দুলাভাই ফোন ধরলো
– হ্যালো দুলাভাই।
– শালা বাবু ইউ হ্যাভ ডান আ গ্রেট জব
– আমি তো কিছুই জানি না দুলাভাই।
– তোমার দেয়া ঠিকানা থেকে রাজার ডেড বডি উদ্ধার করা হয়েছে।
– মানে?
– তোমাদের স্কুলের ড্রয়িং স্যারের ছদ্দবেশে সে এই শহরে এসেছিল। তারপর পিয়াল নামে তার যে সহচর ছিল সেই তাকে খুন করে পালিয়েছে। ও শীঘ্রই ধরা পরবে আশা করছি।
– আচ্ছা দুলাভাই আমি রাখি
এখন আমি সব কিছু মিলাতে পারছি। ঘটনা ঘটেছে হল রাজা ড্রয়িং স্যারের চাকুরী নিয়ে স্কুলে জয়েন করেছে শুধু মাত্র পিয়াল কে খোঁজার জন্য। আমার ডায়রি পড়ে সে খুব সহজেই জানতে পেরেছে পিয়াল কোথায় আছে। পিয়াল কে তারপর সে অস্ত্র দেখিয়ে সেক্স করতে বাধ্য করছিল। তাই তখন আমি যা দেখেছি তা দেখে মনে হয়েছে ২ জন সেক্স করছে। কিন্তু আসলে ভাল মত খেয়াল করলে নিশ্চয় বুঝতাম রাজা জোর করে সেক্স করছিল। আর আমি ভুল বুঝে পুলিশ কে খবর দিলাম। এদিকে কোন ভাবে দাবার গুটি উলটে যায়। পিয়াল রাজা কে কোন ভাবে হত্যা করে পালিয়ে যায়। আর পিয়ালের কাছে তো একটা পিস্তল ছিলই। সুতরাং রাজা কে খুন করতে পারা টা অসম্ভব কিছু না।
আমার এখন খুব অনুশোচনা হচ্ছে। কেন পুলিশ কে খবর দিতে গেলাম। এখন যদি পুলিশ পিয়াল কে ভারতে যাবার আগেই ধরে ফেলে তাহলে তো পিয়ালের জেল হবে। ফাঁশিও হয়ে যেতে পারে। এবং তা হলে আমি নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবো না।
সারাটা দিন গেলো উৎকণ্ঠা আর কষ্টের মিশ্র অনুভূতিতে। কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত পিয়াল কে ধরার কোন খবর এলো না।হয়তো সে খুব সেফলি ভারতে পালিয়ে গিয়েছে। সারা রাত আমি নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে প্রে করলাম। জানি না আমার প্রার্থনা আল্লাহ শুনেছেন কিনা। কিন্তু যেভাবেই হোক পিয়াল সম্পূর্ণ রূপে অদৃশ্য হয়ে গেলো। তাকে পুলিশ খুঁজে পেলো না। মাস গেল, বছর গেল কিন্তু পিয়ালের কোন খবর পাওয়া গেল না আর। আমি এক অর্থে খুশি হলাম এটা ভেবে যে সে যেখানেই থাকুক নিশ্চয় ভাল আছে। অন্তত পুলিশের হাতে ধরা পরে নাই। কিন্তু এটা ভেবে কষ্ট লাগে আর হয়তো কোন দিন পিয়ালের সাথে দেখা হবে না। কিন্তু পিয়াল আমাকে বলেছিল যেখানেই থাকুক সে আবার ফিরে আসবে। আমি সেই অপেক্ষায় থাকি। যখন রাত হয় অন্তত নক্ষত্ররাশির দিকে তাকিয়ে ভাবি পিয়ালও হয়তো আজ আমার মত তারা দেখছে ঠিক সেই রাতের মত।
দশ
১০ বছর পর
১০ বছর পার হয়ে গেলো। আমি গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছি। এখন আমি একজন গর্বিত ইঞ্জিনিয়ার। এখনো আমি পিয়ালের অপেক্ষায় থাকি। আমার কেন যেন মনে হয় কোন একদিন পিয়াল হটাত করে এসে বলবে।
– কি লাবু আমাকে জড়িয়ে ধরবে না? এই দেখো আমি কথা রেখেছি। আমি ফিরে এসেছি
আমি দৌড়ে তাকে জড়িয়ে ধরবো। কিন্তু জীবন তো কল্পনা নয়। বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। এই দেশে পিয়াল কেন ফিরবে? এই দেশে তার নামে ওয়ারেন্ট জারি করা। পুলিশ ধরলে তার ফাঁশি হয়ে যেতে পারে। আমি তা চাইও না।
আমি পিএইচডি এর জন্য অস্ট্রেলিয়ার সিডনীর এক ইউনিভার্সিটি তে ফান্ড পেয়েছি। চলে যাবো কিছু দিনের মধ্যে। আমার সাথে পিয়ালের সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে সাথে সাথে। কারণ পিয়াল তো আমাকে আর খুঁজে পাবে না। কিন্তু জীবন এর বাস্তবতা মেনে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পথে পারি জমালাম।
একাদশ
দেখতে দেখতে আরও পাঁচ বছর পার হয়ে গেল। আমার পিএইচডি প্রায় শেষ পর্যায়। আমার আর্টের প্রতি একটা ভালবাসা জন্মে গিয়েছিল পিয়ালের সাথে সম্পর্ক হবার পর থেকেই। তাই প্রায় সিডনীর চিত্র প্রদর্শনী গুলো তে যাই। একদিন দেখলাম সিডনীর একটা আর্ট গ্যালারি তে একজন চিত্র শিল্পীর চিত্র প্রদর্শনী হবে। শিল্পীর নাম রুদ্র পল্লব । নাম দেখেই বুঝলাম বাঙালী। আর আমি তো খুবই এক্সাইটেড সিডনীতে বাঙালী চিত্র শিল্পীর চিত্র প্রদর্শনী। আমার দেখতে যেতেই হবে। এক বিকেলে আমি গেলাম সেই প্রদর্শনী তে। ছবি গুলো দেখছি। মন ভরে যাচ্ছে। গর্ব হচ্ছে একজন বাঙালী এত সুন্দর ছবি এঁকেছে। মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। হটাত একটা ছবি দেখে আমি হত বিহ্বল হয়ে গেলাম। এতো আমার পোট্রেট যেতা প্রায় ১৫ বছর আগে পিয়াল এঁকেছিল। পিয়ালের সাথে সাথে এই পোট্রেট টা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ছবি এখানে কেন! আমার এই প্রদর্শনীর শিল্পীর সাথে দেখা করতেই হবে। যা ভাবা তাই। আমি আর্ট গ্যালারি থেকে সেই শিল্পী রুদ্র পল্লবের ঠিকানা পেলাম। আমার জানতেই হবে কিভাবে রুদ্র পল্লব আমার পোট্রেট টা পেলেন। এক বিকেলে আমি রওনা দিলাম রুদ্র পল্লবের বাসার উদ্দেশ্যে। সিডনীর একটা ছোট এপার্টমেন্টে থাকেন তিনি। আমি কলিং বেল বাজালাম। কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না। আবার কলিং বেল বাজালাম। এইবার দরজা খোলার শব্দ শুনছি। দরজা খুললেন একজন ভদ্র লোক। আমি ভালভাবে তাকালাম তার দিকে। এ আর কেউ নয়। পিয়াল। বয়সের কারণে চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু আর কোন কিছু পরিবর্তন হয় নাই।
পিয়াল আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সে বোধ হয় কক্ষনো ভাবতেও পারে নাই যে আমি তার ফ্ল্যাটে আসতে পারি।
পিয়াল অস্ফুট স্বরে বলল
– লাবু তুমি?
আমার তখন অনেক অভিমান জমে আছে। কেন সে আমার সাথে যোগাযোগ রাখে নাই। আমি বললাম
– হ্যাঁ আমি
– ভিতরে আসো।
আমি ভিতরে ঢুকলাম। ছোট একটা লিভিং রুম। ২ টা সোফা । মাঝখানে একটা কফি টেবিল। আর দেয়ালে কয়েকটা পেন্টিং ঝুলানো।পাশের ঘর থেকে রঙের গন্ধ আসছে। বুঝলাম সেখানে পিয়াল ছবি আঁকে। আমি সোফার উপর বসলাম।পিয়াল জিজ্ঞেস করলো
– কি খাবে বল?
– কিছু না। আমি শুধু কয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো
– জিজ্ঞেস কর।
– সেদিন কি হয়েছিল?
– তা তো তুমি জান। আমি রাজা কে খুন করে পালিয়ে গিয়েছিলেম।কিন্তু আমি ভাবতে পারি নাই যে তুমি পুলিশ ডাকবে।
বুঝলাম সেও অভিমান করে আছে আমার উপর পুলিশ কে খবর দিয়েছিলেম বলে। কিন্তু পুরো টাই তো ভুল বুঝাবুঝি।আমি বললাম
– সেদিন তোমাকে রাজার সাথে বিছানায় দেখে আমার মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল।
– রাজা আমাকে পিস্তল দেখিয়ে সেক্স করতে বাধ্য করছিল।
– আমি বুঝি নাই। তাই প্রতিশোধ নেবার জন্য পুলিশ কে খবর দিয়েছিলেম।আমাকে মাফ করে দাও। কিন্তু তাই বলে তুমি একবারও আমার সাথে যোগাযোগ করলে না।একটা চিঠি পর্যন্ত না।
– লাবু তোমাকে এখনো ভালবাসি। এক তো অভিমান করে ছিলাম। তার উপর আমার এই অভিশপ্ত জীবনে আমি তোমাকে জড়াতে চাই নাই। তাই যোগাযোগ করি নাই।
– তুমি যে আমাকে ভালবাস তা তোমার আঁকা পোট্রেট টা দেখেই বুঝেছি। এখনো তোমার কাছে আছে ছবিটা।
– তুমি ওই ছবি কই দেখলে
– তোমার ছবি প্রদর্শনী তে।
– তুমি অস্ট্রেলিয়া কেন?
– পিএইচডি করতে এসেছি। প্রায় শেষ। ডিফেন্স সামনে
– বাহ। আমার তোমাকে নিয়ে গর্ব হচ্ছে।
– আচ্ছা আমরা নতুন করে সব কিছু শুরু করতে পারি না?
– কি নতুন করে শুরু করতে চাও ?
– আমাদের রিলেশন।আমাদের জীবন।
– সম্ভব না। আমি আমার অভিশপ্ত জিবনে তোমাকে জড়াবো না।
– নিজে কে কেন অভিশপ্ত বলছো ? এখন তো তুমি সেফ।কেউ তোমার ক্ষতি করবে না। তুমি বরং একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী।
– হা হা।
– হাসছও ?
– আমি খুব বেশি দিন আর বাঁচবো না।
– মানে?
– আমি লিকেমিয়ায় আক্রান্ত। চিকিৎসা নিচ্ছি। কিন্তু ডাক্তার রা তেমন একটা ভরসা দিচ্ছে না। হয়তো আর ২-১ বছর বাঁচবো
– কি বল!
– যা বলছি এক বর্ণ মিথ্যা নয়।
– তাহলে তো আমি তোমাকে আরও ছেড়ে যাবো না। ভালবাসার মানুষ কে অসুস্থ অবস্থায় একা ফেলে রেখে যাবো ? তুমি হলে পারতে?
– সত্যি তুমি আমার সাথে থাকবে?
– হ্যাঁ
– আমি সেই কবে থেকে একলা। আমার কেউ নেই।
– আমি আছি। থাকবো
গোধূলি লগ্ন । বিকেল নেমে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। অন্ধকার হয়ে গিয়েছে ঘর টা। লাবু আর পিয়াল বহু দিন পর নিজেদের আবার খুঁজে পেলো ।
পরিশিষ্ট
সেই ধাক্কায় পিয়াল বেঁচে গিয়েছিল। আর রূপকথার গল্প গুলোর মত শেষ টা ছিল। তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.