আবার আমাদের গল্প

মেঘ রাজ সাইমুন

এক।

ঝুমু বাসর ঘরে বসে আছে।পুরো নাম ফারিয়া জাহান ঝুমু।

আমি দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলাম।

মেয়েটাকে আজ প্রথমদিনের মতই সুন্দর লাগছে।সেই কাজল টানা বড় বড় চোখ!
উত্তলিত নাসিকার গোড়ায় যুগল ভ্রু!
পাতলা ঠোঁট!
আমি ধীর পায়ে বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।ঝুমু নড়েচড়ে বসলো।
আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”বসেন।কিছু বলবেন?”
আমি বসলাম।আমার একটু ইতস্তত বোধ হচ্ছিল।এভাবে বাসর ঘরে ঢোকা ঠিক হয় নি।না জানি ঝুমু মনে মনে কি ভাবছে।
আমাকে এদিকওদিক তাকাতে দেখে ঝুমু আবার বলল,”আপনি কিছু খুঁজছেন?কিছু বলবেন?”
আমি ঠোক গিলে বললাম,”ঝুমু!আমি কি তোমার হাতটা একটু ধরতে পারি।”
ঝুমু দু’টো হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,”ধরুন না।আমি কিছু মনে করবো না।
“না মানে!”
ঝুমু জোর করে আমার হাত দিয়ে ওর হাত ধরিয়ে দিলো।তারপর হেসে বলল,”আপনি না খুব ভীতু।”
আমার চোখ ছলছল করে উঠলো।কয়েক ফোঁটা পানি হয়তো ঝুমুর ধরে রাখা হাত উপর গিয়ে পড়লো।
ঝুমু আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”আপনি কাঁদছেন?”
আমি ঝুমুর হাতটা আরো জোরে চেপে ধরে বললাম,”থ্যাংক ইউ সো মাচ।”
আমার থেকে হাত ছাড়িয়ে ঝুমু আবার আমার হাত ধরে বলল,”আরে থ্যাংকস তো আপনার পাওনা।বরং আমি আপনার কাছে ঋণী।যদি কোনদিন পারি আপনার ঋণ শোধ করতে তবে বুকের বোঝা হালকা হবে।”
আমি দুষ্টুমি করে বললাম,”তাহলে এসো বাসর শুরু করি।”
ঝুমু চিমটি কেটে বলল,”হিমু ভাইয়া!আপনি পারেনও বটে।”
আমি হেসে বললাম,”ওকে স্যরি আমার বোনটি।বাই দ্যা ওয়ে সৌরভ কোথায়?সেই যে তোমাকে বিয়ে করে এনে রাখলো।আর তো দেখা পেলাম না।”
“আর বলবেন না।আমার বিয়ে শুনে তিনি উল্টাপাল্টা গাড়ি চালাচ্ছিলো।কোন একটা ছেলের সাথে ছোটখাটো একটা এক্সিডেন্ট হয়ে গেছে।ছেলেটা এ বাড়িতেই আছে।তার কাছে গেছে।”
আমি উঠতে উঠতে বললাম,”ওকে।তাহলে আমি যায়।বেস্ট অফ লাক।”
সৌরভ এসে কাধে ভরে করে বলল,”কই যাও শালাবাবু?আমি বাসর করি।তুমি দেখো।”
আমি বললাম,”সৌরভ!ডোন্ট কল মি শালাবাবু।আমি কিন্তু ঝুমুর বড়।সো আমি তোমার সম্মুন্দি।”
সৌরভ আমার পিছন থেকে সামনে এসে দাড়িয়ে বলল,”ধ্যাত ইয়ার।ঝুমু যায় হোক।তুমি আমি তো একই বয়সী।বাই দ্যা ওয়ে থ্যাংক ইউ।”
আমি অবাক হয়ে বললাম,”কিন্তু কেন?”
সৌরভ আমাকে টেনে নিয়ে সোফায় বসালো।ঝুমু সাজানো পালঙ্ক ছেড়ে এসে আমাদের পাশে দাড়ালো।
সৌরভ তাকে টেনে কোলে বসিয়ে বলল,”মাইন্ড করো না শালাবাবু।”
আমি লজ্জা পেলাম।
কিন্তু মুখে বললাম,”আরে না ইয়ার।ইট’স ওকে।”
“তুমি জানো না হিমু!এই পাগলিটাকে আমি কত ভালোবাসি।আজ তুমি না থাকলে একে আমার পাওয়া হতো না।”
আমি বললাম,”আরে সৌরভ ঠিক আছে তো ভাই।ঝুমু আমার বাবার বন্ধুর মেয়ে,যদিও আগে কোনদিন পরিচয় ছিলো না।সেইসূত্রে ঝুমু আর আমিও তো বন্ধু।তাই না ঝুমু?”

ঝুমু একটা মিষ্টি হাসি দিলো।

খুব পরিচিত হাসি।

আমার কারোর কথা মনে পড়ে গেল।জানি না সে এখন কোথায় কি করছে!
সৌরভ আমার হাত ধরে আবার বলল,”তোমার ঋণ আজীবনেও শোধ করতে পারবো না।”
আমি মনে মনে বললাম,”আরে সৌরভ গাঙ্গুলী তোমার আর কি উপকার হয়েছে আমার হয়েছে হানড্রেড পারসেন্ট।”
“ঝুমুকে হারিয়ে ফেললে হয়তো আমি পাগল হয়ে যেতাম।ভাগ্যিস তুমি দেবদূতের মত ঝুমুর সব কথা শুনে,ওর ফ্যামিলিকে কনভেঞ্জ করে আমাদের কাছে আসাটা সহজ করলে।না হলে যে কি হতো।”
বলতে বলতে সৌরভ আবেগী হয়ে গেল।
আমি ওর কাধে হাত রেখে বললাম,”ইটস ওকে।হ্যাপি ম্যারিড লাইফ।আমার এবার উঠতে হয় ভাই।”
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,”পাগল?এতো রাতে কই যাবে?”
“বাসায় যেতে হবে।তুমি তো দেখলে বাবা কিভাবে রেগে চলে গেলো।এখান থেকে ঝুমুদের বাসা হয়ে রুপা আপুদের নিয়ে বাসায় যেতে হবে।”
ঝুমু আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”হিমু ভাইয়া!আপনি চিন্তা করবেন না।সৌরভ সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে।রুপা আপুরা আজ রাত আমাদের বাসায় থাকছে এবং আঙ্কেলকে সৌরভই ফোন করেছিলো।আঙ্কেলের রাগ কমেছে।সো আপনি আজ রাত আমার শ্বশুরবাড়িতেই আছেন।”
আমি নিরুপায় হয়ে বললাম,”তবে তাই হোক।”
আমারও সারাদিনের ক্লান্তিতে নড়তে ইচ্ছা করছে না।থেকেই যায় বরং।একটা রাতেরই তো ব্যাপার।সকাল হলে ওর খোঁজ নিতে হবে।
সৌরভ বলল,”হিমু!আমাদের গেস্ট রুম একটা।তুমি তো দেখছো ভাই,ঝুমুকে আনার পর থেকে বাবা মা আনন্দে চারদিক ছুটাছুটি করছে,একেওকে খবর দিচ্ছে,ফোন করছে।কয়েক ঘন্টায় বাড়িটা লোকজনে ভরে গেছে।তবুও আমি গেস্ট রুমটা কে দখলে রেখেছি।ঝুমু বোধয় বলেছে একটা ছেলের কথা?”
আমি বললাম,”হ্যা,ছেলেটার এখন কি অবস্থা?”
সৌরভ মনটা খারাপ করে বলল,”ছেলেটার প্রচন্ড জ্বর আসছে।ডাক্তার দেখে ইঞ্জেকশন দিয়ে গেছে।বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।”
তারপর সৌরভ বিনয়ের সঙ্গে আবার বলল,”তোমার আজ ঐ বেডে শুতে হবে ভাই।ওর তো হুশ নেই।আশা করি ডিস্টার্ব হবে না তোমার!”
ঝুমু বলল,”রোগীর কাছে শুতে এলার্জি থাকলে বাদ দিন।আমরা তিনজন না হয় সারারাত গল্প করে কাটিয়ে দেবো।”
সৌরভ সম্মতি দিয়ে বলল,”ঝুমু অবশ্য ঠিক বলেছে।”
আমি সৌরভের পিঠ চাপড়ে বললাম,”মেরি ভাই!বিয়ের প্রথম রাতে বিড়াল মারা উচিত।তা না হলে পস্তাবে।তাছাড়া আমি কাবাবে হাড্ডি হতে চাই না।”
ঝুমু বোধয় লজ্জা পেল।
সৌরভের কোল থেকে নেমে একরকম আমার সামনে থেকে পালিয়ে গেলো।
আমি আর বিলম্ব করলাম না।সৌরভকে অভিনন্দন জানিয়ে বেরিয়ে এলাম।

গেস্টরুমে ঢুকে দেখলাম পালঙ্কের এক কোণায় সৌরভের সেই ছেলেটা পড়ে আছে।উপরে সিলিং ফ্যান চলছে।ফাল্গুন মাসের শুরুটা এতটা গরম থাকে না,হালকা শীত থাকে।গায়ে-মুখে এমনভাবে বেডসিট পেচিয়ে আছে মুখটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না ছেলেটার।জ্বরের কারনে হয়তো ঠান্ডা লাগছে।আমি লাইট অফ করে অন্য একটা বেডসিট টেনে শুয়ে পড়লাম।ফ্যান অফ করলাম না কারন রাতে জ্বর ছাড়লে ছেলেটা ঘেমে যাবে,তখন বাতাসের দরকার পড়বে।সৌরভ বারবার বলে দিয়েছে ছেলেটাকে একটু দেখে রাখতে।কিছু দরকার পড়লে ওকে জানাতে।যেভাবে ঘুমাচ্ছে,মনে হয় না সারারাত একটিবারও জাগবে।যদি কিছু দরকার পড়ে আমিই দেখে নেবো।অযথা ঝুমুদের বিরক্ত করবো না।অদ্ভুত ভাবে পরিচিত কারোর গায়ের গন্ধ নাকে এলো।কিন্তু মাথায় নিলাম না ব্যাপারটা।

শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম ও কোথায় যেতে পারে।এ শহরে আমরা ছাড়া ওর আর কেউ নেই।এয়ারপোর্টে খবর নিলাম ও তো লন্ডনেও যায় নি।কিন্তু বলে তো গেলো চলে যাচ্ছে।জোহান হয়তো জানে ওর খবর।কিন্তু এত রাতে ফোন দেওয়া ঠিক হবে না।ভোরবেলা উঠে খোঁজ নিতে হবে।না জানি কোথায় কেমন আছে,কিভাবে আছে,বুকের ভিতর চিনচিন করছে।গলায় হাত দিয়ে ওর দেওয়া লকেটটা বেরোলাম।অভিমানে দেওয়া ওর লকেট,তবুও তো ওর হাতের ছোঁয়া আছে।সকালে যাওয়ার আগে সৌরভের একটা ছবি যোগাড় করে ঝুমুর সাথে লকেটে ওকে পাশাপাশি করে চেইনটাসহ দিয়ে যাবো।তাড়াহুড়া বিয়েতে সৌরভকে কিছু দেওয়া হয় নি।এটা পেলে নিশ্চয় খুশি হবে।আর ভাবতে ইচ্ছা করছে না।মাথার ভিতর ফাঁকা হয়ে আসছে।ঘুমও আসছে না।আজ ও পাশে থাকলে কত ভালো হতো।আমার সব রকম মানসিক চাপের সময় ওর সাপোর্ট পেয়েছি।আজ ওকে হারিয়ে আমি কেমন অসহায় হয়ে গেছি।

পাশে শুয়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকালাম।সেভাবেই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।

আমার শরীর খারাপ হলে ও সারারাত ঘুমাতো না।তখন শরীর খারাপ নিয়ে আমি পড়তাম বিপদে।একটা মানুষ মাথার কাছে জেগে থাকলে নিজের কখনো ঘুম আসে?

ভোরে উঠে যাওয়ার সময় দেখলাম ছেলেটা সেভাবে পড়ে আছে।ঝুমু সৌরভকে অনেক বুঝিয়ে আমি সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম জোহানের বাসার উদ্দেশ্য।মনে হলো ফোন না করে সরাসরি যাওয়া উত্তম হবে হয়তো।

দুই।

জোহান ওর খোঁজ দিতে পারলো না।

আমি কোথায় যাবো?কি করবো?বুঝতে পারছি না।শেষমেশ হতাশ হয়ে বাসায় ফিরলাম।

আমাকে শুয়ে থাকতে দেখে মামনি এসে মাথায় হাত বুলাতে লাগলো।
আমার চেয়ে মামনির অবস্থা খারাপ।কাল রাতে ঠিকমত খাওয়াদাওয়া করে নি বোধয়।
মামনি চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,”কি’রে ওর কোন খোঁজ পেলি?
আমি সজল চোখে মামনির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ালাম।
“চিন্তা করিস না।নিশ্চয় খোঁজ পাবি।খাবি চল।কাল থেকে তো কিছুই খাস নি।”
আমি ডুকরে কেঁদে উঠলাম।
মামনি পিঠে হালকা থাপ্পড় মেরে বলল,”বোকা!কাঁদছিস কেন?”
মামনি আমাকে শান্তনা দিচ্ছে।অথচ গতরাতে আমার থেকে বেশি চিন্তায় এবং কাঁন্নায় সময় কাটিয়েছে সেটা তার চোখমুখ দেখলে বোঝা যাচ্ছে।
আমি আমার মাথায় রাখা মামনির হাতের উপর হাত রেখে বললাম,”তুমি গতরাতে কি খেয়েছো শুনি?”
মামনি মুখ লুকালো।
আমি হালকা হাসির রেখা টেনে বললাম,”ওর জন্য আমার থেকে তোমার চিন্তা তো অনেক বেশি।নিজের অবস্থা কি করেছো দেখছো।”
মামনি চুপ করে রইলো।আমার যায় হোক!মামনির শরীর খারাপ,তাকে খাওয়ানো অবশ্যক।আমি রুম্পাকে ডেকে খাবার আনতে বললাম।মামনিকে জোর করে খাওয়ালাম,কিন্তু আমি খেলাম না।মামনিকে বললাম,গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে খাবো।

দুপুরে অস্থিরতা নিয়ে শুয়ে এপাশওপাশ করছিলাম।

ঝুমুর ফোন এলো।

তাই ছুটে বের হতে হলো।জ্যামে আটকে আছি।আজ সকালেই ঝুমুর নতুন শ্বশুরবাড়ি থেকে গেলাম।কয়েক ঘন্টার মধ্যে কি এমন ঘটলো যে আমাকে আবার না গেলে নয়।খুব অস্বস্তি লাগছে।গাড়ি নিয়ে এগোতেও পারছি না।

ঝুমুদের বাসার কাছে পৌছাতেই দেখলাম এ্যাম্বুলেন্স দাড়িয়ে আছে।
ঝুমু আমাকে দেখেই বলল,”হিমু ভাইয়া!এতো লেট করলেন কেন?”
আমি দম আটকে বললাম,”কি হয়েছে তুমি এত ইমার্জেন্সি আমাকে ডেকে পাঠালে কেন?”
ঝুমু চোখ বড় করে বলল,”আপনি আমাকে দেখতে আসার দিন যে ছেলেটাকে সঙ্গে করে এনেছিলেন,সেই ছেলেটাই সৌরভের গাড়িতে এক্সিডেন্ট করেছিলো।সকাল থেকে রক্তবমি হচ্ছে।”
আমি শুধু একবার বললাম,”মুন?”

তারপর আর কিছু মনে নেই।

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন চোখ মেলে নিজেকে হাসপাতালের সাদা ধবধবে বিছানায় দেখলাম।উঠতে চেষ্টা করতেই সৌরভ হাত ধরে বসলো।
“শুয়ে থাকো।তুমি খুব দুর্বল।”
আমি আবার শুয়ে পড়লাম।
পাশ ফিরে দেখলাম পাশের বেডে মুন শুয়ে আছে।সৌরভকে জিজ্ঞাসা করলাম,”ওর কি হয়েছে?”
সৌরভ বলল,”ঐ ভাই ঠিক আছে।তুমি ওকে চেনো নাকি?”
মনে মনে বললাম,”ওকে আমার থেকে ভালো আর কেউ চেনে না এই পৃথিবীতে।”
মুখে বললাম,”হুম!আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।”
সৌরভ আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলল,”ও এখন সুস্থ আছে।ডাক্তার বলেছে উচ্চ রক্তচাপের কারনে রক্ত মস্তিষ্কে উঠে রক্ত বমি হয়েছে।”
আমি আবার ফিরে দেখলাম মুনের দিকে।নিষ্পাপ ভঙ্গিতে কি সুন্দর ঘুমিয়ে আছে।গতরাতে ঝুমুদের বাসায় আমি ওর পাশে ঘুমিয়ে এসেছি অথচ বুঝতেই পারি নি যে আমার মুন আমার পাশে অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে আছে।গায়ের গন্ধ পেয়েও বুঝতে পারি নি।
সৌরভ আমার হাত চেপে ধরে বলল,”দেখো হিমু,আমি কিন্তু এক্সিডেন্টটা ইচ্ছাকৃত ঘটিয়েছিলাম না।ও ই হঠাৎ করে গাড়ির সামনে এলে পড়লো।ঝুমুকে নিয়ে টেনশনে ছিলাম,খেয়াল করি নি।তবুও যতটা পেরেছি এক্সিডেন্টটা রোধ করেছি।ওর তেমন ক্ষতি হয় নি।”
আমি সৌরভকে সাত্ত্বনা দিয়ে বললাম,”ইট’স ওকে।আমি বুঝতে পারছি।আসলে মুন একা রোড পার হতে পারে না।”
“তুমি টেনশন করো না।ডাক্তার বলেছে,ওর জ্ঞান ফিরবে ঘন্টাখানেকের মধ্যে।”
আমি স্থির চোখে বললাম,”ওকে সৌরভ।তুমি এখন বাসায় যাও।সন্ধ্যা হয়ে এলো।ঝুমু পথ চেয়ে আছে,হয়তো টেনশনও করছে।আমি এখন ঠিক আছি।ও কে আমিই দেখতে পারবো।”
সৌরভ উঠতে উঠতে বলল,”আচ্ছা!কিন্তু কিছু প্রয়োজন হলে অবশ্যই আমাকে কল করবে।কোন দ্বিধাবোধ করবে না।ওকে?”
আমি হেসে বললাম,”আচ্ছা করবো।”

সৌরভ চলে গেলো।

মামনিকে ফোন করা দরকার।ফোন পেলাম বালিশের কাছেই।আমি জানি ফোন পেলে যতই রাত হোক মামনি আর রুপা আপু পৌছে যাবে।আমি একা মুন কে নিয়ে ভরসা পাচ্ছি না।মামনিকে আমার পাশে চাই।মামনি থাকলে মুনের জন্য আমার কোন চিন্তা নাই।মামনিকে কল শেষ করে দেখলাম একজন নার্স ঢুকছে।
আমি উঠতে উঠতে বললাম,”আন্টি…..!”
কথাটা শেষ করার আগেই ধমক খেলাম।
“তোমাকে না উঠতে মানা করা হয়েছে।তবুও বারবার উঠছো কেন?কয় দিন পেটে দানাপানি দাও নি,হুম?”
আমি মাথা কাধ করে বললাম,”দুদিন।”
তিনি চোখ রাগিয়ে বলল,”কি কেস?প্রেম নাকি জোর করে বিয়ে?”
আমি হেসে বললাম,”দুটোই।”
তিনি এবার হাসলেন।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,”তোমাদের জেনারেশন টাই কেমন জানি,কিছু একটু হলে উল্টাপাল্টা করে বসো।কারোর জন্য চিন্তা ভাবনা নেই।”
আমি আবার হাসলাম।এবারও ধমক খেলাম।
“এত হেসে কাজ নেই।স্যুপ এনেছি খেয়ে নাও।”
আমি বাধ্য ছেলের মত স্যুপবাটি হাতে নিয়ে এক চুমুকে খেয়ে ফেললাম।আমার চুমুক দিয়ে স্যুপ খাওয়া দেখে নার্স মহিলাটি চেয়ে রইলো।মনে মনে হয়তো পাগল ভাবছে।তাতে আমার কি?
আমি স্যুপ শেষ করে বাটি এগিয়ে দিয়ে বললাম,”আন্টি একটা কথা রাখবেন?”
তিনি রাগী সুরে বললেন,”কি?”
“আমার বেডটা একটু ঐ ছেলেটার পাশে রেখে যাবেন?আসলে আপনি তো উঠতেই দিচ্ছেন না।আমি কিন্তু সুস্থ।উঠি?”
তিনি অবাক হয়ে আমাকে বললেন,”কি হয় ছেলেটা?”
আমি চোখ লুকিয়ে বললাম,”বেস্ট ফ্রেন্ড।”
“না’কি অন্য কেস?”
“কি যে বলেন।”
নার্স বলল,”ওকে দিয়ে যাচ্ছি।তবে উনাকে ডিস্টার্ব করবে না।”
“আচ্ছা।”মনে মনে বললাম,”ওকে ডিস্টার্ব আমি করবো না তো কি আপনি করবেন!”
আমাকে মুনের পাশে রেখে তিনি চলে গেলো।যাওয়ার সময় একবার ফিরে হেসে উঠলেন।নার্সটি সামান্য বদরাগী হলেও খুব ভালো।

আমি নিজের বেড থেকে মুনের নিস্তেজ হাতখানা নিজের হাতের মুঠোয় পুরলাম।কি ঠান্ডা মুনের হাতটা।বেড ছেড়ে এবার মুনের বেডে ওর পাশে শুয়ে পড়লাম।বাম কাত হয়ে হা করে মুনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।কতক্ষণ ছিলাম জানি না।হঠাৎ মুন তার স্পেশাল চোখ তুলে আমার দিকে তাকালো।অর্থাৎ মুনের জ্ঞান ফিরেছে।সে এটার জন্য প্রস্তুত ছিলো না।আকস্মিক আমাকে তার পাশে দেখে অবাক এবং হতবাক দুটোই হলো।তাও আবার হাসপাতালের একই বেডে।হা করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।আমি একটু উচু হয়ে ওর কপালে একটা চুমু দিলাম।
তারপর জড়িয়ে ধরে বললাম,”কেমন আছো?”
মুন প্রথমবার মুখে বলল,”তুমি এখানে কি করে?আর আমি বা এখানে কেন?”
আমি জড়িয়ে রেখেই বললাম,”সব বলবো আগে তুমি সুস্থ হও।”
মুন কেমন অবাক চোখে তাকিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করল,”তুমি বিয়ে করেছো?”
তারপর মাথা চেপে ধরে বলল,”খুব পেইন হচ্ছে মাথায়।”
আমি ওকে আলতো করে ঠিকঠাক ভাবে শুয়ে দিয়ে বললাম,”তুমি একটু রেস্ট নাও,মামনি এখনি চলে আসবে।”
মুন বলল,”আচ্ছা ঠিক আছে।”

রাত আটটার দিকে মামনি আর সোহেল ভাইয়া এলো।রুপা আপু হয়তো সাদ’কে রেখে আসতে পারে নি।তাই সোহেল ভাইয়াকে নিয়ে মামনি এসেছে।মামনি এসে ঘুমন্ত অবস্থায় মুনকে টেনে তুললো।মানা করলাম শুনলো না।
মামনিকে দেখে মুন প্রশ্ন করলো,”আপনি কে?আমাকে এভাবে ধরছেন কেন?”
আমি অবাক হয়ে বললাম,”মুন!কি বলো,তুমি মামনিকে চেনো না?”
মুন আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”আপনি কে?”
আমি ওকে ধরে বললাম,”একটু আগে না তুমি আমার সাথে কত সুন্দর কথা বললে!”

সোহেল ভাইয়া আমাকে আর মামনিকে টেনে রুমের বাইরে নিয়ে এলো।

তিন।

ডাক্তারের কথা শুনে আমার হার্টবিট দ্বিগুন হয়ে গেলো।বিশ্বাস করাটা আমার ঠিক হয়ে উঠলো না।

ডাক্তারের প্রশ্নের উত্তরে মামনি বলল,”হ্যাঁ,ছয়-সাত বছর আগে একটা রোড এক্সিডেন্টে ওর স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেছিলো।ফেস থেঁতলে যাওয়ার কারনে প্লাস্টিক সার্জারিও করানো হয়েছিলো।পরে অবশ্য স্মৃতিটা ফিরে এসেছিলো।”
ডাক্তার বলল,”যদিও স্মৃতি ফিরে এসেছিলো তবুও সেই সময়কার সেই বড় এক্সিডেন্টে ওর ব্রেইনের কিছু নার্ভ অকেজো হয়ে গেছিলো।এখন সেটা ক্রমশ বাড়ছে।যার কারনে উনি বর্তমানে এসে এখন শর্ট টাইম মেমোরি ডিসঅর্ডারস এ ভুগছেন।”
সোহেল ভাইয়া বলল,”ঠিক বুঝলাম না।একটু পরিষ্কার করে বলুন।”
ডাক্তার পুনরায় বলতে শুরু করলেন,”হঠাৎ হঠাৎ করে উনার ব্রেইন কিছু সময়ের জন্য অতীতের স্মৃতিগুলো আড়াল করছেন,যার ফলে উনি অতীতের কিছু স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসছেন,দেখা যাবে রেসেন্টলি ঘটে যাওয়া ঘটনাও তিনি মনে রাখতে পারছেন না!”
আমি হতাশ হয়ে বললাম,”ডাক্তার আঙ্কেল এটার কি কোন চিকিৎসা নেই?”
তিনি বললেন,”দেখো বাবা!মেডিকেল সাইন্স সব পারে না,কিছু ক্ষমতা ঐ সাত তবক আসমানের আরোশ মহল্লায় যিনি বসে আছেন তিনি তার কাছে রেখেছেন।আমরা কেবল এটাকে ওষুধের দ্বারা কমিয়ে রাখতে পারি।তবে উপরওয়ালা যদি চান কোন মিরাক্কেল ঘটতেও পারে।”
মামনি বললেন,”ভাই সাহেব!বিদেশেও কি এর কোন চিকিৎসা নেই?”
ডাক্তার সামান্যতম ভরসা দিয়ে বললেন,”দেখুন ভাবি!আপনারা বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন।ভালো হতেও পারে আবার না ও হতে পারে।তবে আমার মনে হয় না খুব বেশি লাভ হবে।”
আমার চোখ দিয়ে অনর্গল পানি চলে আসতে লাগলো।
মামনি আমাকে টেনে কাছে বসিয়ে বলল,”হিমু!তুই অল্পতেই বেশি ভেঙ্গে পড়িস!এমন হলে চলে?তুই এখানে বোস তো।”
সোহেল ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে মামনি বলল,”বাবা!তুমি একটু মুনের কাছে যাও তো।আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলছি।”
সোহেল ভাইয়া উঠতে উঠতে বললেন,”জ্বি মামনি।আমি দেখছি।”

সোহেল ভাইয়া বেরিয়ে গেলেন।

মামনি ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন,”ওকে আপনাদের এখানে কত দিন রাখা লাগবে?”
ডাক্তার বললেন,”আপাতত সপ্তাহখানেক রাখেন।একজন বিদেশি ডাক্তার আসার কথা।মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে দেখি কিছু সমাধান হয় কি’না।না হলে আপনারা বিদেশে চেষ্টা করতে পারেন।”
মামনি দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,”ওহ।আজ তাহলে উঠি ভাই সাহেব।”
ডাক্তার বললেন,”দেখুন ভাবি চিন্তা করবেন না।আপনার হাজবেন্ড আমার বন্ধু।আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করবো আপনাদের সাহায্য করার।”
“থ্যাংক ইউ।হিমু চল বাবা।”
আমরা উঠতে গেলে ডাক্তার বলল,”তবে ভাবি একটা কথা।ছেলেটার এই যে ভুলে যাওয়ার প্রবণতাটা এটা কিন্তু দিন দিন বাড়তেই থাকবে।বলতে যদিও খারাপ লাগছে তবুও বলি,চিকিৎসায় যদি কোন ফল না হয় তবে এক সময় দেখা যাবে ও আগেপরের সব ভুলে যাচ্ছে খুব দ্রুত।তখন ওর মস্তিষ্ক আলাদা একটা জগৎ তৈরি করবে কল্পনায়,সেখানে আপনারা থাকতেও পারেন না ও থাকতে পারেন।”
মামনি আর কোন কথা না বলে আমাকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন।

মুনের কেবিনে গিয়ে দেখলাম মুন খুব পরিচিত ভঙ্গিতে সোহেল ভাইয়ার সাথে কথা বলছে।
আমাকে দেখে বাচ্চাদের মত হেসে বলল,”হিমু!তোমার নাকি বিয়েটা হয়নি?সোহেল ভাইয়া বলছে ঝুমুর নাকি সৌরভ নামের কাউকে বিয়ে করেছে?”
মামনি মুনের পাশে বসতে বসতে বলল,”হয়নি তো!হবে কেন?তোকে ছাড়া আমার ছেলে কাউকে নিয়ে ভালো থাকতে পারে?”
মুন মামনির গলা জড়িয়ে ধরে বলল,”থ্যাংক ইউ।”
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”হিমু!আচ্ছা আমি হাসপাতালে এলাম কিভাবে?”
মা আমাকে চোখে ইশারা করলো।
তারপর মুনকে বলল,”মুন,এদিকে শোন আমি বলছি।তুই তো আমার ছেলের উপর রাগ করে বেরিয়ে এলি।কিন্তু তোর তো আবার বাচ্চামি স্বভাব আছে।রোড পার হতে পারিস না।তাহলে কি হয়েছিল বল তো?”
মুন হেসে বলল,”ও এক্সিডেন্ট।মনে পড়েছে।”
মামনি বলল,”দ্যাটস লাইক এ গুড বয়।”
মামনি আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”হিমু মুনের কাছে এসে বস।সোহেল ফার্মেসিতে গেছে,আমি ওকে বাসায় পাঠিয়ে আসছি,রুপা সাদকে নিয়ে একা আছে।তোর বাবা তো ফিরে তাকাবে না।”
আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম,”আচ্ছা তুমি যাও।”

মামনি বেরিয়ে গেলে আমি মুনকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললাম,”কি ছেড়ে যেতে চাইলি,পারলি?”
মুন আমার নাক চেপে ধরে বলল,”খুব আহ্লাদ না?”
আমি মুনের ঘাড়ে কিস করতে লাগলাম আর ও সুড়সুড়িতে হেসে আমাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো।না পেরে ঘুরে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

ডাক্তার কিছু করতে পারছে না।অগত্যা উপায় না দেখে এক সপ্তাহের বদলে পনের দিনের দিন মুন কে বাসায় নিয়ে এলাম।বাবা এর ভিতর একবার হাসপাতালে গিয়ে মুনকে দেখে এসেছে।তার বিশেষ কোন রাগ নেই বলে মনে হলো।কিন্তু মুন বাসায় ফিরে সেই যে রুমে দরজা এঁটেছে আর খুলছে না।ও কি কাউকে চিনতে পারছে কি’না কে জানে?চিকিৎসার জন্য যে দুএকের ভিতর বিদেশ নিয়ে যাবো তারও উপায় নেই।বিয়ের দিন রাগ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নিজের পাসপোর্ট ভিসাসহ আমারগুলোও নিয়ে গেছিলো যাতে আমি পালাতে না পারি।এখন এক্সিডেন্টের পর সেগুলো কোথায় মুন বলতে পারছে না।পুলিশে জিডি করা হয়েছে দশ দিনের মত তারাও সন্ধান দিতে পারছে না।
মামনিও আমাদের সাথে যেতে চাচ্ছে কিন্তু বাবা যেতে দিবে না।ভার্সিটির অধ্যাপিকা থাকাকালীন মামনি বিভিন্ন কাজে দেশে বিদেশে যেতো তখনকার পাসপোর্ট আছে,ভিসা লাগালেই হতো।বাবা সেটা তালা বদ্ধ করে রেখেছে।তার মানে মামনি আর যেতে পারবে না।বাবার এসব কান্ডে মামনি অর্ধেক মরে গেছে।আমার উচিত যত দ্রুত পারা যায় মুনকে নিয়ে এ দেশ ছাড়ার ব্যবস্থা করা।

এরপর অনেকগুলো দিন কেটে গেল।

সেদিন মুন এসে আমাকে বলল,”রাহাত চল না আমরা কোথাও ঘুরে আসি।বাসায় একা একা ভালো লাগছে না।”
আমি তো অবাক।মুন আমাকে রাহাত বলছে কেন?আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বললাম,”একা কোথায়?আমরা সবাই তো আছি।”
মুন আমার পাশে বসতে বসতে বলল,”এদের আমি চিনি না।”
মামনি এসে আমাকে বলল,”ও যখন চাইছে যা না একটু বাইরে থেকে ঘুরে আয়।”
আমি মামনির দিকে বললাম,”হুম!মুন তুমি রেডি হয়ে আসো।”
মুন আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”তুমি ভুলে গেছো রাহাত।আমার নাম মুন না,ছোঁয়াদ।”
আমি বললাম,”হুম ছোঁয়াদই তো।আমি ভালোবেসে মুন ডাকলাম!”
মুন উঠতে উঠতে বলল,”আচ্ছা রেডি হয়ে আসি।”
আমি মামনির দিকে তাকিয়ে বললাম,”মামনি!”
মামনি সোফায় আমার পাশে বসে পড়লো।বলল,”তোর ডাক্তার আঙ্কেল বলেছিলো ও আমাদের থেকে আলাদা কোন কল্পনার জগৎ তৈরি করবে।সেটা বোধয় করতে শুরু করেছে।”

আমি মামনিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিলাম।আমার মত এত বড় একটা ছেলেকে শান্তনা দিবে কি মামনি নিজেই কাঁদতে শুরু করলো।তার মমতাময়ী চোখের পানি আমার মাথায় এসে পড়তে লাগলো।

বেরোনোর আগমুহূর্ত সৌরভ এসে হাজির।

আমার হাতে একটা ব্যাগ দিলো।চিনতে পারলাম।এটা মুনের ব্যাগ।
সে বলল,”আমার গাড়ির পিছনের সিটের নিচে ছিলো এত দিন।সেদিন মুনের এক্সিডেন্টের সময় ওকে গাড়িতে উঠার পর পিছনে ছুড়ে মারছিলাম।আমার খেয়াল ছিলো না।”
রুম্পাকে ডেকে সৌরভকে নাস্তাপানি দিয়ে আমি মামনির কাছে গেলাম।
মামনি রেডি হয়ে গেছে।জোহান ও চলে এসেছে।মুনকে নিয়ে একেবারে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবো।

যাওয়ার আগে বাবাকে বলতে গেলাম।

তিনি অন্যদিকে মুখ করে আমাকে বললেন,”তুমি আর কোনদিন এদেশে এসো না।আমি তোমাকে ত্যাজ্য করলাম।আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও।”
কথাটা বলেই তিনি দরজা এটে দিলেন।উদ্দেশ্য মামনিকে আটকে রাখা।আমি কিছু বললাম না।আসলে এই মুহূর্তে ঠিক কি বলা উচিত আমি ভেবে পেলাম না।

বেরোনোর সময় মামনির অস্পষ্ট কাঁন্নার সুর কানে এলো।রুপা আপু,সোহেল ভাইয়াকেও বলে যাওয়ার সময় পেলাম না।আপুর শ্বশুরবাড়ি সেই কতপথ।ফোন করার সময়ও নেই আমার হাতে।শেষমেশ জোহানকে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।

জোহানকে পিছনে ফেলে মুনের হাত ধরে আমি এগিয়ে গেলাম এয়ারপোর্টের চেকিং সাইডে।পিছে পড়ে রইলো আমার ছেলেবেলা।
দূরে দাড়িয়ে থাকা আমার প্রিয় বন্ধু।
আমার অশ্রুসিক্ত মামনির চোখ।
আমার মুন সুন্দর স্মৃতি নিয়ে এসেছিলো এদেশে তাকে ফিরতে হচ্ছে বিস্মৃতি হয়ে।

পরিশিষ্টঃ লন্ডনে এসে চিকিৎসা করেও মুনের কোন উন্নতি হয় নি।আজকাল আমাকেও চিনছে না সে।রোজ রোজ নিজের কল্পনার জগৎ বাড়িয়ে চলেছে।একদিন আমাকে নিশান বলে ডাকলে অন্যদিন ডাকে সিফাত বলে।
শুনতে খারাপ লাগে না।
এভাবেই চলছে আমাদের গল্প।শুধু স্মৃতি হয়ে চাপা পড়ে আছে আমাদের সেইসব রঙিন দিনগুলো।

রোজ ভাবি সব ঠিক হয়ে যাবে,কিন্তু কিছুই আর ঠিক হয় না।সুদূর বাংলাদেশে থাকা আমার মামনির অশ্রুসিক্ত মুখ কল্পনা করে আমি বলতে থাকি,”মামনি তুমি এসে একবার দেখে যাও তোমার মুন তোমার হিমু আজ ভালো নেই।অস্তিত্ব সংকটে আছে তোমার হিমুন।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.