আমার মাস্তান বয়ফ্রেন্ড

শঙ্খ দীপ

১.
ছোটবেলায় শুনেছিলাম মস্তানরা আসলে ভিতরে ভিতরে ভীতু হয়! এই কথাটা একদম আমার বয়ফ্রেন্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য! সেদিন প্রথমবার আমার বাড়ি আসছে। না না জামাই আদর খেতে না! আমার একটা ছোট্ট অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। তাই কিছুদিন ধরে হোস্টেলে ফিরতে পারছিনা! দেখতে এসেছিল। এখন একটু হাঁটা চলা করতে পারছি… চারটেয় আসতে বলেছিলাম! বিকেলের দিকে যখন কলিং বেলের আওয়াজ পেলাম, মোবাইলটা তুলে দেখলাম কাঁটায় কাঁটায় চারটে বাজে! একটু ঘুমিয়ে পরেছিলাম! কলিং বেলের আওয়াজেই ঘুম ভাঙল। যে ছেলেটাকে লেটোর লেটো তস্য লেটো বললেও কম বলা হয়, সে একদম ডট্ চারটেতে এসেছে! খটকা লাগল তখনই! নিশ্চই নার্ভাস!
মা জানত না! ইচ্ছা করেই বলিনি। দেখব বলে কত কথা ও বলতে পারে! কত সাহস ওর!কত স্মার্টলি ও আমার মা’কে হ্যান্ডেল করতে পারে! এটা একটা প্রিসাপোজিশন। প্রথমত আমার সব বন্ধুদের মা চেনে মোটামুটি! ওকে চেনে না! আর আমার সব বন্ধুরা কমবেশি আমার মতোই। রোগা বা মাঝারি। ছিমছিমে। একটু পড়াকু টাইপের লুক! আর সেই দিক থেকে ঋক যাকে বলে মাচো! জিম বিল্ড বডি! অস্বাভাবিক মাসকুলার লাগে না! তবে শরীর স্বাস্থ্য ভাল। ব্যায়ামট্যাম করে বোঝা যায়! চুল স্পাইক! আমি কলিং বেলটা শুনে তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে টের পেলাম এখনও এত তাড়াতাড়ি ওঠানামা আমি করতে পারব না! পায়ের ব্যাথাটা এখনও আছে বেশ। আমি তাও আসতে আসতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জানলা দিয়ে নীচে দেখলাম!
উড়িবাবা!চেকশার্ট পরে এসেছে। দাড়ি ট্রিম করে কাটা!চুল স্পাইক নেই। হাতে মিষ্টি আর ফল! বাবা…এতকিছু শিখল কখন?
অলরেডি মা’র সাথে কথা শুরু হয়েছে দরজায় দাঁড়িয়েই। আমার মা যাকে বলে “লেডি হিটলার”। সন্দেহ জাগলে প্রশ্ন করে করে মেরে ফেলবে!
আমি শুনতে পেলাম বলছে ” কাকিমা… ও জানে আমি আসব!”
“কৈ আমাকে তো কিছু বলেনি!”
একটু ইতস্তত করছে!”হয়ত ভুলে গেছে!”
“তুমি ওর ক্লাসে পড়?”
“না কাকিমা… আমি ওর সিনিয়র!”
“তা তোমার সাথে ওর বন্ধুত্ব হল কিভাবে?”
“মানে কাকিমা… হয়ে গেছে…!”
আচ্ছা বলে রাখি এই কথোপকথনটা আমি পরে দুজনের কাছ থেকে শুনে কনফার্ম করেছি। কারণ ওপর দিয়ে সব শোনা যাচ্ছিল না!
“তোমার নাম কি বললে?”
“কাকিমা… সায়ন্তন!”
“এখানে দাঁড়াও… ওকে জিজ্ঞাসা করছি…!”
আমি ওপর থেকে হাঁক দিলাম “মা… ওকে ওপরে পাঠিয়ে দাও…”
মা ওকে ওপরে নিয়ে এল! “ও এখন কমপ্ল্যান খাবে… তুমিও কি খাবে? নাকি আমি চা খাব.. তুমিও চা খাবে!”
“কাকিমা কিছু লাগবে না…”
আমি তো এদিকে হাসি আর চেপে রাখতে পাচ্ছি না! আমি কোনমতে বললাম “মা.. ওকে তুমি কফি করে দাও!চিনি ছাড়া!”
“বাবা… অনেক কিছু জান দেখছি!” মা কি ভাবছে আমি জানি! বলে মা নীচে চলে গেলেন!
ও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। রুমাল দিয়ে কপালের ঘামটা মুছে নিয়ে বলল “এটা তোমার মা? যাওয়ার সময় একটা পাউচ প্যাকেটে একটু পায়ের ধুলো দিয়ে দিয়ো তো!… বাপ্রে!”
আমি এতজোর হাসলাম যে পাজরের ব্যাথাটা চাগাড় দিল। “উড়ি বাবারে…”
“কি হল…”
“ব্যাথা…আছে এখনও!” ব্যাথা লেগেছে ঠিকই,কিন্তু হাসি আর থামছে না!
“আর তুমি বলে রাখনি কেন আমি আসব!”
“তোমার নাম বললে মা চিনত না… আর এটা হত না!”
“কোনটা?”
“এই যে কলেজের মস্তান… কিভাবে মিউমিউ করে কথা বলে…”
“চুপ করো… মোটেও মিউমিউ করিনি! তোমার মা হয়… তাই সম্মান দিয়েছি!”
“বাবাহ… তাই? তুমি তোমার মত করেই কথা বোলো..”
” দেখো… ঠিক বলব! ”
কিছুক্ষণ পর মা এল, ওর কফি নিয়ে আর আমার কমপ্ল্যান নিয়ে!
“মা ও তোমাকে কি একটা বলবে..”
মা স্বভাবজাত গম্ভীর গলায় বলল “কি?”
“না কাকিমা কিছু না…!”
“না না… বলো না!মা কিছু মনে করবে না!” “মানে…আপনাদের বাড়িটা খুব সুন্দর!”
“Thank you… ” বলে মা চলে যেতে গিয়েও পিছনে ফিরে বলল “চাউমিন করছি… খেয়ে যেও! ”
ও চোখ পাকিয়ে কি একটা বলতে যাচ্ছিল, মায়ের কথা শুনে থেমে গেল। “আচ্ছা মা.. মানে কাকিমা!”
মা চলে গেলেন।
“তুমি কি মারা পরাবে নাকি?”
“তাহলে স্বীকার কর তুমি ভয় পেয়েছিলে…”
“পায়নি বললাম তো…”
“মা…” আমি চ্যাঁচালাম!ও আমার মুখটা চেপে ধরল।”পেয়েছি… পেয়েছি…!”
“কি পেয়েছ?”
“ভয় পেয়েছি… খুশি? ”
“হুম…”
“ওষুধ খাচ্ছ তো ঠিক করে?”
“খাচ্ছি তো…”
আমার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল “তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে এসো তো! ভাল লাগছে না একা একা…”
“কেন মস্তানি করছ না…”
“আমি এখন ওসব করি?”
“তাই.. করো না!”
“এখন সব মস্তানি তো আপনার সাথে জানাব…” বলে গালে টকাস করে চুমু খেল! “আপনাকে খুব miss করছি!”
“ফোন করবে…”
“ফোন করলে আরো মন খারাপ করে… গলা শুনলে দেখতেও ইচ্ছা করে…”
*
এই মস্তান ছেলেটিকে এতক্ষন দেখে যতটা রোম্যান্টিক লাগছে, কিছু মাস আগেও তা ছিলেন না! বুঝে গেছেন নিশ্চই উনি হচ্ছেন মস্তান! হোস্টেলের যাকে বলে “দাদা”! ওনার সাথে আমার প্রথম দিনের আলাপটা আমার এখনও মনে আছে! আমরা কলেজের হোস্টেলে সবে প্রথম দিন! সন্ধ্যা হতেই প্রায় দশজনের সিনিয়িরদের একটা গ্যাং আমাদের ঘরে এল! এমন বডি ল্যাঙ্গুয়েজ যেন মিউজিয়াম দেখতে এসে! আমরা সব আর্টিফ্যাক্ট! আমাদের রুমে আমি একাই ছিলাম! একজন আসেনি! আর একজন কোথায় একটা গেছে!তখনও ফেরেনি।আমাদের রুমে আমি একাই আগে হোস্টেলে থেকেছি!মিথ্যা বলব না, একটু গর্বও ছিল তার জন্য! কিন্তু স্কুলের হোস্টেল আর কলেজের হোস্টেলের মধ্যে তো পার্থক্য আছেই!
“নাম কি তোর?”
“সার্থক! ”
“কোন ডিপার্টমেন্ট?”
“হিস্ট্রি”
“নে গালাগালি দে…!” ও তখনও কিছু বলেনি! শুধু দেখছিল!
“মানে?” এ আবার কি ধরনের র্যাগিং?
“মানে গালাগালি কি জানিস?”
“জানি… বাট্ দিতে পারি না!” আমি সত্যিই গালাগালি দিতে পারিনা! খুব ক্যাবলা ক্যাবলা লাগে আমাকে গালাগালি দিলে।থাকেনা..কয়েকজনের মুখে গালাগালি ঠিক মানায় না! আমি ওরম!
ওরা সবাই এই কথাটা শুনে খুব হাসল, যেন প্রথমবার শুনেছে! একজন বলল “এ কে রে? কোন স্কুল তোর?”
“নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন…!”
“ভাই রামকৃষ্ণ মিশন… তোর জাত ভাই!” ওদেরই একজন আরেকজনকে বলল। আমি একটু হিরো সাজতে আমিও জিজ্ঞাসা করলাম “তোমারও রামকৃষ্ণ মিশন?”
“রহড়া…” উত্তর দিল সে!
“ও… ওখানে আমার এক দাদাও পড়ত..আগের বছরই পাস আউট করেছে…”
“কে? নাম কি?”
“ওর ভাল নাম… শুভব্রত.. ওকে বোধ হয় ওখানে জন্তু বলে ডাকত!”
” ও তুই জন্তুর ভাই?”
“হ্যাঁ… শুভ দা আমার মাসির ছেলে!”
“ও… ও তো বিষ মাল..! সব কেসেই কমন নাম ওর..!”
“জানো… ও ছোটবেলায় খুব শান্ত ছিল!”
“বাট্ খুব গুনী ছেলে… হাতের আঁকা খুব সুন্দর..”
“তোদের সাংসারিক আলাপ হয়েছে?” এই প্রথমবার মস্তান কথা বললেন! ওকে কিন্তু হোস্টেলে আমি একাই “মস্তান” বলেই ডাকি! অন্যরা “গুরু” বলে! “কেন গালাগালি দিতে পারিস না কেন?”
আবার এক কথায় ফিরে গেল। এত কথায় কথায় কাটানোর চেষ্টা করলাম! আমিও বললাম “আমাকে গালাগালি দিলে খুব ক্যাবলা লাগে!”
“এমনি সময় কি খুব স্মার্ট লাগে?”
” না সেটা না… তবে গালাগালি দিলে যতটা ক্যাবলা লাগে ততটাও লাগে না!”
“এ ছেলে চালু…গুরু!” পাশ থেকে আরেকটি ছেলে বলল!
“চল… জামা খোল…”
সত্যি বলব? মস্তানকে দেখে না প্রথম থেকেই কেমন একটা ভাল লেগে গেছিল! আর একটা সত্যি কথা বলব?…আমার বডিটা সত্যিই সেক্সি! তাই তখন ঝট করে মাথায় এল, এই সুযোগ! যদি লাইনের হয় পটে যেতে পারে! আমি একটু ন্যাকামো করে প্রথমে “কেন?… না… মানে!” করলাম! দাবড়ানি খেয়ে খুলেই ফেললাম জামাটা! আমি ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম… দেখছে কি না! পুরো হাঁ করে দেখছিল!
“এবার কি করবে বলে দে গুরু!”
পাশের ছেলেটির কথায় তার হুঁশ ফিরল। আর একটু দেরী হলে মুখে মাছি ঢুকে যেত!
“ধুস চ! একে র্যাগিং করে মজা পাচ্ছি না! বাড়া রামকৃষ্ণের ছেলে!”
আসো বাচ্চু… লাইনে এস! বলে সদলবল নিয়ে বিদায় হতে গিয়েও পিছনে ফিরে বলল “নামটা কি বললি? ”
“সার্থক… ”
“সায়ন্তন…”
“নাইস টু মিট ইউ…”
আমি প্রথমদিনেই বুঝে গেছিলাম ডাল মে কুছ কালা হ্যায়… আই মিন সাদা হ্যায় আরকি!
মা চাউমিনের প্লেটদুটো নিয়ে ঢুকল। মা না বিড়াল পায়ে আসে! বোঝাই যায় না! ও আমার হাতটা ধরে বসেছিল। মা ঢুকতেই হাতটা সরিয়ে নিল। আমি শিওর মা’র চোখে পড়েছে!
প্লেট দুটো রেখে বলল “তোর কিন্তু ওষুধ আছে একটা! খেয়ে খেয়ে নিবি….”
“আচ্ছা…”
মা আবার বিদায় নিলেন!
“তুমি কি তোমার মার শাসন থেকে বাঁচতেই হোস্টেলে গিয়ে থাকো?”
আমি হাসলাম!
“ঠিক ধরেছি!”
“কি ঠিক ধরেছ?”
“যে তুমি তোমার মায়ের শাসনের ভয়েই হোস্টেলে থাকো!”
” না… মস্তান, তোমাকে আমি একটা কথা বলিনি এখনও! আমার বাবা আমাদের সাথে থাকেন না! কোনদিনিই ছিলেন না! মা ব্যবসা করেন.. ছোটবেলায় বাড়িতে দেখার কেউ ছিল না তাই হোস্টেলে দিয়ে দিয়েছিল! এখনও তাই… ওখানে থাকলে মা’কে আমার ব্যাপারে চিন্তা করতে একটু কম হয়! নয়ত মা’র পক্ষে কাজ ফেলে আমার পিছনে সময় দেওয়া সম্ভব না!”
মস্তান আমার হাতটা আবার চেপে ধরল। “ঠিকাছে আর বলতে হবে না!” আমিও ওর হাতের মুষ্টিটার জোরেই বল পাই!
ওর সাথে সেদিন পাক্কা এক মাস পর আমার দেখা হল। দুজনের কথা তো আর শেষ হয় না! মা এলেন আবার, এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন “ওষুধ খেয়েছিস? ”
“হ্যাঁ…”
ওটা অছিলা ছিল। মা এবার ওকে জিজ্ঞাসা করল “চাউমিনটা ভাল হয়েছিল?”
“হ্যাঁ…,কাকিমা!”
“তুমি কি এখন বাড়ি ফিরবে?”
“হোস্টেলে কাকিমা…”
“বেরিয়ে পরো তাহলে… সাড়ে আটটা বাজে!”
এই কথাটায় আমিও একটু অপ্রস্তুতে পরলাম। এভাবে কেউ বলে! Anyway, আমার মা বলেন!
“হ্যাঁ… ও’ও তাই বলছিল!” বলে আমি ওর মুখটা রক্ষা করার চেষ্টা করলাম! যতই হোক, বয়ফ্রেন্ড বলে কথা! টেঁরা হ্যায়, পর মেরা(হি) হ্যায়! মা ব্যাপারটা বুঝল। বলল “না আসলে রাত হলে আমাদের এদিকে বাস পেতে একটু সমস্যা হয়, বারবার অটো চেঞ্জ করে যেতে হয়, ভাড়াও বেশি লাগে প্লাস সময়ও… তাই বলছিলাম!চলে যেতে বলছি না কিন্তু…”
আর এখন বলে আর কিই বা হবে!
“না না কাকিমা… আপনি তো ঠিকই বলেছেন! ”
হ্যাঁ… এখন তো কাকিমাই ঠিক বলবে!
“চলি.. তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠ!”
” চলো আমি এগিয়ে দি…” বলে মা’ও পিছন পিছন গেলেন!
এখানে একটা ব্যাপার হয়েছে,সেটা আমি মস্তানের মুখে পরে শুনেছি। মা নিচে নিয়ে গেছেন, জুতো পরতে গিয়ে দেখে যে মস্তান ফোনটা নিতে ভুলে গেছে!
“দাঁড়াও.. আমি এনে দিচ্ছি!”
“না কাকিমা… আমি ছুট্টে গিয়ে নিয়ে আসছি!”
“না না.. তুমি এক পায়ে জুতো পরে ফেলেছ! আমি যাচ্ছি!” বলে মা এলেন আবার ওপরে! এসে বললেন “ও ফোনটা ফেলে গেছে রে?”
আমি জানতাম না, এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম আমার বালিশের পাশে! মা নিয়ে গেল! পরে রাতের বেলা ফোন করে আমাকে ব্যাপারটা খোলসা করে বলল “ধুস.. তোমার মা না সত্যি!”
“কেন আমার মা আবার কি করল? ”
“আরে বেরাবার সময় তোমার মা দাঁড়িয়েছিল.. তাই কিস করা হল না, তাই ফোনটা ফেলে এলাম! নিচে এসে নাটক করে বললাম যে ফোনটা ফেলে এসেছি, যাই নিয়ে আসি… কিছুতেই যেতে দিল না! ভাবলাম সেই ফাঁকে গিয়ে চুমু খেয়ে আসব! ”
“বেশ হয়েছে…বেশি বুদ্ধি তো!”
“তুমি বলো প্ল্যানটা ভাল ছিল না?”
“খুব খারাপ প্ল্যান! ”
এদিকে আমার মাতারাণী ও যাওয়া থেকে বিভিন্ন অছিলায় ওর কথা তুলছে। হাত ধরেছিল দেখে ফেলেছে তখন! “তোর অ্যাক্সিডেন্টের দিনে ও হসপিটালে ছিল… এখন মনে পড়ছে! কিন্তু সেদিন অন্যরকম লাগছিল… আজ অন্যরকম লাগল! তাই ভাবছি কোথায় দেখেছি…
“ছেলেটার নামটা কি বেশ! ”
“সায়ন্তন..”
“ও’ও কি তোদের ডিপার্টমেন্টের? ”
“না…”
“তাহলে তোদের বন্ধুত্ব হল কি করে? ”
“হোস্টেলের ম্যানেজার ও…”
“আর কিছু…”
“আর কি মা?”
মা জানে আমার ব্যাপারটা কিন্তু আমি জানি মা এই ব্যাপারটায় খুব একটা স্বচ্ছন্দ না, আমিও জোর করে কিছু বলিনা! মা আমার জন্য মাঝে মাঝে শুনতে চায়। প্রথমদিকে বলতে শুরু করেছিলাম, ঘেঁটে যায় দেখে এখন আর বেশি বলি না!
“ছেলেটা বেশ ভাল… ফল মিষ্টি নিয়ে এসেছে! ম্যানারস জানে!”
হ্যাঁ… আমারও প্রশ্ন জানল কি করে! বা ও যে এসব জানত তা তো আমি জানতাম না! যে ছেলে একদিন বাথরুমে আমায় ঠেলে ফেলে দিয়ে নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল, আর যার জন্য সে ‘সরি’ পর্যন্ত বলতে আসেনি, সে এত ম্যানারস্ কোথায় শিখল! সেদিনের কথা আমার এখনও মনে পরলে হাসিও পায়, রাগও ধরে!
দশটা বাজলেই হোস্টেলের বাথরুমে আর দাঁড়ানো যায় না! প্রতি কল পিছু এক মিনিট কি দু মিনিট! তার মধ্যে স্নান করতে হবে! নয়ত ক্যালাবে! আমি এমনিতে সকালেই করেনি! সেদিন একটা প্রজেক্টের কাজ করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছিল। তাই দেরি করেই গেছি। রাশটা কেটে যায় যাতে! আমি গিয়ে লাইন রেখেছি! ঘুম চোখে, মুখে ব্রাশ নিয়ে, গলায় গামছা ঝুলিয়ে এসে বলে “তোর আগে আমি!”
আগে মানে? মামার বাড়ি নাকি! আমি কিছুতেই ছাড়ব না কল! তা যাই হোক, ঝগড়া করে আগে স্নান করতে আরম্ভ করলাম! দু’মিনিট হতেই দরজায় টোকা!
“দেরি লাগবে.. সাবান মাখছি!” আমি মজা করছিলাম, সাবান আমি মাখছিলাম না! তাও দুমিনিটে স্নান সারা যায়! তাও সবার শেষে এসেছি যাতে ভাল করে স্নানটা করতে পারি! আবার টোকা!
“তুই বেরবি?”
“না…”
“আমার ক্লাস আছে!”
“না.. আমি তো এখানে চায়ের দোকানে কাজ করি! ”
কে জানত ওর এত রাগ? আর কে জানত, দরজার স্টিলের ছিটকিনি এত হালকা! একটা ঠেলা মারল, একদম ধুম করে খুলে গেল, ভাগ্যিস গামছা পরে ছিলাম! আমি ওকে ঠেলা দিয়ে বার করার চেষ্টা করলাম! আমার শরীর আর ওর শরীর…! আমাকে আলতো করে দেওয়ালে ঠেসে ধরে স্নান করে বেড়িয়ে যাচ্ছিল! আমি তাড়াতাড়ি করে হাতে সাবান ঘষে ফেনা করে ওর গায়ে লাগিয়ে দৌড়তে যাচ্ছিলাম… দিল ধাক্কা.. আমি পরে গেলাম! বেকাদায় পরলে সেদিন সামনের দাঁত দুটো ভেঙে যেত!নাকে লাগল! অল্প একটু রক্ত পরল! কোন তাপউত্তাপ নেই! সাবানটা ধুয়ে বেড়িয়ে গেল! তাকালোও না! আমি পরে আবার স্নান করে বেড়তে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, আমার পাশের বাথরুমটা তো খালিই ছিল, ও তো ওটাতেই ঢুকে যেতে পারত!
*
সেদিন আমার কিছু বন্ধুবান্ধব এসেছিল বাড়িতে। স্নেহা, রৌদ্র, ঝিনুক, সাম্য…. এরা সবাই আমার ক্লাসমেট! বসে গল্প করছি। মা এ’কদিন বিকেলের দিকটা বাড়িতেই আছেন। দোকানে দরকার থাকলে কর্মচারীরা ফোন করে। তখন যায়! মা ওদের জন্য লুচি করেছে। আমিও খাব আর কি! ওরা মাঝে মাঝে আসলে আমার অল্প আধটু খাওয়া হয়, নয়ত রিচ খাওয়ার খাওয়া মানা! এবং মা আমাকে ট্যালট্যালে ঝোল ছাড়া আর কিছু খাওয়াচ্ছে না! মা ট্রে’টা রাখতে রাখতে বলল “তোমাদের ঐ বন্ধুটা এল না?”
“কে কাকিমা?”
আমি বুঝে গেছি মা কা’র কথা বলছে! মা না সত্যি!
“কি বেশ নাম ছেলেটির… বল না!” মা’র নামটি দিব্যি মনে আছে, মা জাস্ট দেখছে ওরা চেনে কি না!
“সায়ন্তন?” আমি চাপা দিতে যাব ঝিনুক ধরিয়ে দিল। ঝিনুকও আরেক! ও মা হলে পুরো আমার মায়ের মতই হবে! পাক্কা!
“হ্যাঁ… হ্যাঁ ও! এলোনা?”
” না কাকিমা… ও তো আমাদের বন্ধু না! সিনিয়র!”
“সেদিন এসেছিল… বলল ওর বন্ধু!”
“হ্যাঁ… ওর বন্ধু! আমাদের না! ওর অনেক সিনিয়র বন্ধু আছে!”
“অনেক? তাহলে শুধু ও এল যে…”
“একাই এসেছিল?”
“হ্যাঁ… কত ফল মিষ্টি নিয়ে এসেছিল! বেশ ভাল ছেলেটি!”
আমি আলত করে একটা চিমটি কাটলাম! হাতটা সরিয়ে নিল ঝিনুক! “আসলে অ্যাক্সিডেন্টের দিন ও’ই তো ছিল খালি… তাই ভেবেছে হয় দেখতে না আসলে খারাপ দেখায় তাই এসেছে…”
“হবে হয়ত… তোরা কফি খাবি তো সব? ”
“কাকিমা আমি চা!” রৌদ্র বলল। ও একনম্বরের আঁতেল। চা ছাড়া তার মুখে কিছু রোচে না! মা বিদায় নিতেই সবাই হামলে পড়ল আমার ওপর!
“তাই? কবে এসেছিল রে! ” ঝিনুকটা মহা বজ্জাত মেয়ে! ও নাকি আমার বেস্টফ্রেন্ড!
“ফল মিষ্টি কি তোর জন্য এনেছিল…,নাকি শ্বাশুরি ইম্প্রেস করবে বলে!” সাম্য আমাদের কম্যুনিটির। একদম যাকে বলে বাংলা সিরিয়ালের ননদ-মেটেরিয়াল। মস্তান ওর ওপর খুব খাপ্পা! আমাকে কতবার যে বলেছে “ও যদি তোমার বন্ধু না হত না দেখতে… মেরে আমি ওর মুখ ভেঙে দিতাম!” সাম্যরও স্বভাব বাজে। যেখানে দেখতে পায় “ঐ যে আমাদের জামাইবাবু যাচ্ছেন … ” মস্তান হয়ত লজ্জায় বা রাগে ঘুরেও দেখল না! তখন বলে “কেমন জামাইবাবুরে বাবা… শালিদের দিকে ঘুরেও তাকায় না!” এইসব আর কি! তবে সাম্যর দোষ না, ওর এমনিতেই একটা সো-অফ ব্যাপার আছে! আসলে মস্তানের এক বন্ধুকে ওর পছন্দ। কিন্তু সে পিওর স্ট্রেট। অন্তত দেখে তাই মনে হয়। অবশ্য মস্তানকে দেখেও তাই মনে হত। সেদিন চুমু না খেলে বুঝতামও না যে ও’ও গে! আদতে ও গে না… ও বাই! এবং তখন তো মস্তানের গার্লফ্রেন্ডও ছিল। শিল্পী। ভাল মেয়ে! আমি যদিও কখনও কথা বলিনি!তবে শুনেছি ভাল। প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল ঠিকই আমি ওদের ঘর ভাঙছি। পরে ভাবলাম, কেউ কারোর ঘর ভাঙেনা! ভাঙার থাকলে আপসেই ভেঙে যায়! আমাকে যখন মস্তান বলেছিল “আমার একটা গার্লফ্রেন্ড আছে! ”
আমি স্ট্রেট বলে দিয়েছিলাম “দেখো… আমি বলব না ওকে ছেড়ে তুমি আমার কাছে এসো.. এটাও বলব না, আমার জন্য তুমি ওকে ছেড়ো না! তোমার যেটা ভাল মনে হয় করো… তবে একটাই কথা, একসাথে দু’জন নয়! তোমার যা ডিসিশন হবে আমি মেনে নেবো!”
ও বলেছিল “যদি বলি আমি ওকে ছাড়তে পারব না!”
“ফাইন… আমার তাতেও কোন প্রবলেম নেই! ”
“তাহলে যা হয়েছে আমাদের মধ্যে সেগুলোকে ভুলে যেতে বলবে?”
“ভুলতে বললেই তুমি ভুলতে পারবে তার তো গ্যারেন্টি কেউ দেয় নি! আর যা হয়েছে তাকে অস্বীকার করার জায়গা নেই… কিন্তু সত্যি যেমন সত্যিই থাকে.. এটাও তাই!”
তারপর ও শিল্পীকে ছেড়েছে। এটা কমপ্লিটলি ওর ডিসিশন!
যাই হোক, কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম। ওদের এতজনের প্রশ্নে আমি একটু লজ্জা পেয়েছিলাম ঠিকই, তারপর সামলেও নিয়েছি। রৌদ্র তো এককাঠি ওপরে! “ব্যাথা জায়গায় ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছে তো! ”
“মানে টা কি!”
“ছিঃ… ইউ! ” বলে চ্যাঁচিয়ে উঠল সাম্য।
“তুই যেটা ভাবছিস সেটা না, আমি চুমুর কথা বলেছি…” সাম্যকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল রৌদ্র “তোর তো খালি ওসব! তাই মনে সবসময় ওসব!”
স্নেহা বলল “ও নিজেরটাই মাখে… ওকে তো কেউ দেয় না!”
“তোকে বুঝি রোদ্দুর খুব দেয়!” সাম্য খেঁখিয়ে ওঠে! রৌদ্র আর স্নেহার মধ্যে একটা কেস আছে। স্নেহা রৌদ্রকে ভালবাসে! আর রৌদ্র এখনও তার আগের গার্লফ্রেন্ডের কথা চিন্তা করে কবিতা লেখে… সুতরাং ঘেঁটে ঘ! আমরা ব্যাপারটা সমঝোতা করবার চেষ্টা করেছিলাম। হয়নি। আমরাও আর ঘাঁটায়নি।
“বল না বল না… চুমু খেয়েছিস?” ঝিনুক উঠে পরে লাগল।
“উফফফ… কেন তোর জেনে কি হবে?”
“অনেককিছু হবে…”
“হ্যাঁ… খেয়েছি! খুশি!”
“তোর তো ঠোঁটের পাশটা এখনও ফুলে রয়েছে, কি করে খেলি? ব্যাথা লাগেনি?” সাম্য খুব ভেবেচিন্তে বলল।
“আমি খায়নি.. ও খেয়েছে! গালে!”
“awwww… how cute!” নেহা কাক্কারের মত করে উঠল সাম্য। সঙ্গে সঙ্গে মায়ের প্রবেশ কফি হাতে। আগেও বলেছি মা আর বিড়ালের মধ্যে কোন তফাত নেই! হাঁটলে বোঝা যায় না! কে জানে কতক্ষণ এসেছে! কতটা শুনল!

২.
সেদিন খুব বৃষ্টি হয়েছিল মনে আছে! আমি একটু বেড়িয়েছিলাম। কাজ ছিল। প্রত্যেকবারের মত কনফিডেন্টলি ছাতা না নিয়েই বেড়িয়েছিলাম। ঢুকতে ঢুকতে ভিজে চপচপে হয়ে গেছিলাম পুরো। জামা প্যান্ট পরেই স্নানে ঢুকেছি, দরজা খোলাই ছিল। জামাটা জাস্ট ধোবো বলে খুলেছি “হয়েছে… এবার বেরো!”
পিছনে ফিরে দেখি, ভিজে কাদা মাখা জার্সি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। জলে, ঘামে জামাটা চেপে বসে আছে গায়ে। গা তো না, যেন উপত্যকা! সবুজ রঙের জার্সি বুকের ওপর যেন নরম ঘাস বিছিয়ে উপত্যকা তৈরী করেছে! প্যান্টের দিকে তাকানোর সাহস হয়নি, নিজের ওপর কনফিডেন্ট না থাকার জন্য!
তাও মনে মনে তো চলে। যেন ইচ্ছা করেই ঝগড়া করব বলেই বললাম “তুমি পাশেরটায় যাও না… ওটা তো খালি!”
“না আমি এটাতেই করব! “
“তাহলে দাঁড়াতে হবে!”
“মাথা গরম করাস না তো সবসময়! “
“তুমি সবসময় আমি যখন বাথরুমে আসি তখনই কেন আস? “
কিচ্ছু বলল না, সোজা ঢুকে এসে, আমাকে হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে সাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে পরল। হাত তো না… আমাকে আলতো করে টোকা মারলেই আমি সরে যাই! আমি দেওয়ালে সেঁটে দাঁড়িয়েছিলাম, ওর অত বড় শরীরটা বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলের মত আমাকে গার্ড করে দাঁড়িয়ে ছিল। শুধু ওর মাথায় গায়ে পরে যা জলের ছিটে এসে পড়ছিল আমার গায়ে! সবসময় স্পাইক করা চুলগুলো ভিজে কপালের ওপর পেতে গেছিল। মুখটা সুন্দর তো… যেন বাচ্চা শিশুর মত লাগছিল। মনে হচ্ছিল আদর করি… মনে হচ্ছিল এই বাচ্চাটাকে যদি অ্যাডপ্ট করে নি! ওর বিশাল শরীরটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমি ঠাকুর দেখার মত ওর দিকে তাকিয়ে!
“কি হয়েছে?” চুলটাকে পিছনে দিকে করে নিল।
“কিছু না…” সেটা ছাড়া আর কিছু বেরোয়নি মুখ দিয়ে। আমি আলত করে পা ওপরে উঠিয়ে ওকে একটা চুমু খেলাম ঠোঁটে! ও এমনভাবে তাকিয়ে ছিল ভাবলাম একবার চড় মারবে না ঘুঁষি! মাথায় শুধু টোকা মেরেছিল, যেন বাচ্চা ছেলে ভুল করে ফেলেছি! ওর গা দিয়ে সেদিন অদ্ভুত একটা গন্ধ বেরচ্ছিল। ঘামের? না কাদার? নাকি দুটোর একসাথের? আমি জানি না! এক আলাদাই গন্ধ, যার মাদকতা আমি উপেক্ষা করতে পারিনি!
প্রথমে ভেবেছিলাম, এটা আরো কত রোম্যান্টিক হতে পারত। পরে মনে করে দেখলাম, এটা কম রোম্যান্টিক কি! কে ওরম করে! রোম্যান্টিকতা কি শরীরেই শেষ হতে হয়?
এতদূর পড়ে ডায়েরিটা বন্ধ করলাম। সেই ঘটনার এক সপ্তাহ পর মত লেখা! কিছু পাচ্ছিলাম না, মনের মধ্যে বারবার ফিরে ফিরে আসছিল সেদিনের ঘটনাটা! তাই লিখে রেখেছিলাম। আমি প্রতিদিন ডায়েরি লিখি না, মেমোরেবেল্ দিনগুলোর কথা লিখে রাখি খালি! ওর সাথে আমার প্রথম চুমু!সাম্যরা এত হইচই করে গেল যে ঘরটা খুব খালিখালি লাগছে! তাই ডায়েরীটা খুলে বসেছিলাম! কত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে! তারপর দিন থেকে আমি লজ্জায় আর ওর সাথে চোখে চোখ মেলাতে পারছি না, ও ও আগে কথায় কথায় রাগাত, কাঁধে জোরে হাত রেখে বলত “কি খবর!” সে খবর জিজ্ঞাসা তো নয়, মনে হত কাঁধটাই ভেঙে যাবে, সেসবও করেনি। আমার তাতে গিল্ট ফিলিং আরো বেড়ে গেল। অথচ ওকে একা পাচ্ছিও না, যে ‘সরি’ বলব। যদিও আমি ‘সরি’ ছিলাম না, তাও… চক্ষুলজ্জা! আর কিছুটা নিজেদের মাঝে তৈরি হওয়া দূরত্বটা কমিয়ে নেওয়া! আবার যেন কথা বলা যায়… আবার যেন…
এর মাঝে আমার একবার জ্বর হয়েছিল। হোস্টেলের দুজনের ডেঙ্গু ধরা পরেছিল রিসেন্টলি! অতএব রটে গেল আমারও ডেঙ্গু হয়েছে! আমার এক রুমমেট ভয়ের চোটে বাড়িই চলে গেল। আরেকজন ছিল। ও ভাল,এরম হরদম বাড়ি যাওয়া পাব্লিক না! খবর চাউর হওয়ার রাতে, হঠাত অনুভব করলাম,কে যেন মাথায় গলায় হাত দিয়ে দেখছে জ্বর আছে নাকি!আমি হাতটা ধরলাম। আমি জানতাম ওটা ও-ই। কি করে জানতাম, জানি না! তবে আমি জানতাম!
পাশে বসল। “ব্লাড টেস্ট করিয়েছিস?”
“হ্যাঁ… সন্ধ্যাবেলা নিয়ে গেছে!”
“শরীর কি দুর্বল লাগছে?”
জানলাম, না সেরম কিছু হয়নি। বললাম “তুমি আমার ওপর রেগে আছ?”
কিছু বলল না! উঠে যাচ্ছিল। আমি আবার হাতটা ধরলাম। “কি হল?”
“বসো না একটু! ”
বসল। আমি ওর হাতটা নিয়ে আমার গলার কাছে ধরে রাখলাম। আমি কেন করেছিলাম এসব এখন আর যুক্তি খুঁজে পাই না! ও কিছুক্ষণ বসল। তারপর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। দিয়ে কপালে একটা চুমু খেল। যেন মা!
“আমার কাল পরীক্ষা… এখন যাই ! মাঝে মাঝে এসে দেখে যাব! ” ও এসেছিল কি না জানি না! হয়ত এসেছিল। এই নিয়ে আর কথা হয়নি।
রিপোর্টে দেখা গেল এটা ডেঙ্গু না! আমিও সেরে উঠলাম। এদিকে আমার রুমমেটের ডেঙ্গু হল। তাকে তার বাড়ির লোক এসে বাড়ি নিয়ে গেল। আমি রুমে একা! রাতে আমি একা থাকতে পারি না! পারি… কিন্তু অতবড় ঘর। দুদিকে দুটো ফাঁকা খাট… কেমন একটা লাগে! আমি বাইরে চাতালের ওপর বসেছিলাম। ঘুম আসছিল না! ভাবলাম ঘুম আসলে ঘরে আসব, শোবো আর ঘুমাব!
“ঘোমাস নি?”
ফিরে দেখি ও। “না!”
“কেন? ”
“ঘুম আসছে না…!”
এসে দাঁড়াল কাছে। একটা হাত চাতালের ওপর আর একটা হাত আমার থাইয়ের ওপর রেখে, ঝুঁকে কি একটা দেখল। তারপর চ্যাঁচাল “পোদ্দার… পড়ছিস?”
” না ভাই… পানু দেখছি…!” নীচ থেকে আওয়াজ এল। আমি শুনে হাসলাম। ও আমায় দেখে হাসল। তারপর বাতাস যেন ওকে আমার দিকে ঠেলে দিল। ওর ঠোঁটদুটো আমার ঠোঁট আর নাকের মাঝের খাঁজটায় চুমু খেল! তারপর দু’চোখে… তারপর ঠোঁটে! কখন আমার হাতটা ওর গেঞ্জির গলাটা চেপে ধরেছে, আর ওর হাতটা আমার কোমরের খাঁজে বসে গেছে আমরা বুঝতে পারিনি! চারিদিকের সব যেন জলে গুলে গেছিল। শুধু শুনতে পেয়েছিলাম “ঘরে চল…”
সেদিনের বিনিদ্র রাত্রির প্রতিকটা মুহুর্ত আমার মনে আছে!অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালতে হয়নি। যখন ও আমাকে খাটে শোওয়ালো তখন অনুভূতি বলতে ঠোঁটে আর শরীরে। হাত পা আলাদা করে কিছু বুঝতে পারছিলাম না! শুধু অত বড় শরীরটার ভারটা অনুভূত হয়েছিল। ও খুব ঘামে। একেই গরম তার ওপর উষ্ণ মুহুর্ত, সব মিলিয়ে যেন মনে হচ্ছিল আমার দুজন বাষ্পঘরে! ঘামে ওর গেঞ্জিটা ভিজে সপসপ করছিল।আমি খুলে দিলাম! ও এত জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয় যেন মনে হয় আরো গরম হয়ে উঠেছে চারিপাশ। ও আগে কখনও কোন ছেলের সাথে ক্লোজ হয়নি! তাই জানে না কি করতে হয়। ওর ঠোঁট যখন আমার গলার কাছে কাঁথা বুনছে আমি কানে কানে বললাম “আমার জামাটা খুলে দাও…” ও তাই করল।
“এবার?”
“আর কি জান?”
“আগে তো কোন ছেলের সাথে…”
আমি উঠে ওকে শুইয়ে দিলাম। অন্ধকার তখন চোখ সওয়া! দেখতে পাচ্ছি অবাক বিস্ময়ে অপেক্ষা করছে এরপর আমি কি করি তার দিকে! আমি আলত করে ঠোঁটদুটো বসিয়ে দিলাম ওর ঠোঁটে… সেটা জানে… তাই কো-অপারেট করেছিল। তারপর ওর ঘাড়ের কাছে যখন নাকটা নিয়ে গেছি, সেদিনের গন্ধটা পেলাম। প্রতিবছর পুজোর আগে পাড়ার মাঠে বাঁশ ফেললে, গঙ্গার পচা বাঁশের গন্ধে যেমন পুজো পুজো গন্ধ বেরোয়, এই গন্ধটাও অনেকটা ওরম। শরীরে যেন বল দেয়। যত ঘ্রাণ নি মনে হয় আরো নি… আরো নি! ওর বুকের ওপর খুব কসরত করতে হয়েছে, যা চওড়া বুক। ওর বুকের সামনেটা ঠোঁট নিয়ে যেতেই আমায় জড়িয়ে ধরল বুকের মধ্যে!
“সার্থক… আমি গে না!”
আমি কিছুক্ষণ পর ওর বাহুমূল থেকে নিজেকে মুক্ত করে ওর মুখের সামনে আমার মুখ নিয়ে এসে বললাম “বেশ… আমি জোর করব না!… যাও শুয়ে পড়!”
*

ও চলে গেছিল সেদিন। ফিরে এসেছিল পরেরদিন রাতে। মানুষকে এত নির্লজ্জ হয়ত কোনদিন লাগে না! ও এসে আমার কাছে এসে বলল “কালকের মত আদর কর !” সে তে দাবি নেই… মিনতি আছে!”আমি শিখতে চাই একটা ছেলে কিকরে আরেকটা ছেলেকে ভালবাসা দিতে পারে!”
সেদিন আমি ওকে বুঝিয়েছিলাম, দুটো ছেলে কিভাবে একে অপরকে ভালবাসতে পারে! একটা ওরম শরীরের ছেলেকে নিজের জিভের নীচে কুইকুই করতে দেখলে একটা পৈশাচিক অনুভূতি হয়। সে সুখ, যৌন সুখের থেকেও সুখপ্রদ।
তারপর আমরা যখন শুয়েছিলাম, তখন ও শিল্পীর কথা বলল। আমি কি বলেছিলাম তা আগেই লিখেছি!
মাঝে কিছুদিন আর আসেনি। হয়ত সেই কথা গুলোর জন্যেই। তারপর হঠাত একদিন বিকেলবেলা এসে , শুয়ে পড়ল আমার খাটে!
“কি হল?”
“আমার বয়ফ্রেন্ডের খাটে আমি শুতে পারিনা…?”
কোথায় কি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে টেনে বুকের মধ্যে আটকে নিল দু’হাতের মাঝে! চোখে চোখ রেখে বলল “তুই আমার জীবনে না আসলে কি করে আমার সত্ত্বার এই দিকের কথা জানতাম? ”
“হুম… জানতে কোনভাবে! আমি নয়ত অন্যকেউ! ”
“না… অন্যকেউ না! তুই!”
“আচ্ছা.. আমিই!”
“আচ্ছা… তুই আমাকে ভালবাসিস তো নাকি… নাকি জাস্ট…”
“এই প্রশ্নটা তো আমার করার কথা…!”
“ওকে বলে দিয়েছি আজ!”
“কি বললে!”
“আমার পক্ষে ওর সাথে রিলেশনে থাকা আর সম্ভব নয়!”
“জিজ্ঞাসা করেনি কেন? ”
“হ্যাঁ… করেছিল।”
“কি বললে?”
“কিছু বলিনি!”
“তারমানে তুমি এখনও আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে শিওর নও!”
“সত্যি বলব?”
“বলো!”
“না… শিওর নই! তোর ওপর একটা ডিপেন্ডেন্সি তৈরি হয়েছে, সেটা ভালবাসা না শুধুই শারীরিক… বুঝতে পারছি না!”
“যদি পরে বোঝো এটা শুধুই শারীরিক… তাহলে! আমায় ছেড়ে চলে যাবে?”
“জানি না… ”
সৎ ছেলে! অন্তত আমার মন রাখা কথা বলেনি, আমি এতেই খুশি। আমি শুধু বলেছিলাম “তোমার যদি সেরম কিছু মনে হয়… আমায় বোলো কুণ্ঠাবোধ কোরো না!”
“হুম…”
ল্যাপটপটা খুলে বসেছি জাস্ট! অনেকদিন পড়াশোনা হয়না! একটু পড়ব বলে। এখন তো একটু ভালো আছি! মা একটু দোকানে গেছিল। ঝিনুক ফোন করল! “হ্যারে সায়ন্তন এসেছিল তারপর?”
“না তো… কেন?”
“কাকিমা ফোন করেছিল… জিজ্ঞাসা করছিল সায়ন্তনের ব্যাপারে! তোদের আলাপ কতদিনের? ছেলেটি কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি! ধরে ফেলল নাকি রে?”
আমার মা তো! সত্যিই! কি আর বলব, বললাম “ধরে আর কি করবে! সবই তো জানে!”
“তবে বলার আগে সায়ন্তনের সাথে কথা বলে নিস!”
“কেন রে?”
“দেখ আমি জানি ও ভাল ছেলে… তোকেও ভালবাসে! কিন্তু কাকিমা যে কারণে খোঁজ নিচ্ছে, সেটা সম্মন্ধে তুই কি শিওর?”
“মানে?”
“মানে… সায়ন্তন সারাজীবন তোর সাথেই থাকবে তো?”
ওর প্রশ্নটা বুঝতে আমার একটু সময় লাগল। পরে বুঝলাম ও কোনদিকে ইঙ্গিত করতে চাইছে! আমি বললাম “ঠিকাছে… আমি কথা বলে দেখব ওর সাথে! ”
সত্যি বলতে মায়ের ওপর রাগ যে হয়নি তা না! হয়েছিল। একবার ভেবেছিলাম মার সাথে ডিরেক্টলি কথা বলব। মস্তান বারণ করল। ও রাতে ফোন করেছিল। তখন বললাম ওকে। বলল “ছাড়ো না… মা তোমার! ছোটবেলা থেকে তোমায় একা মানুষ করেছেন, তোমার জন্য কনসার্ন তো হবেনই! উনি ডিরেক্টলি না বললে তুমি কিছু বোলো না!” মাঝে মাঝে মস্তানবাবু খুব বিজ্ঞের মত কথা বলে! উনি হলেন পার্টটাইম বিজ্ঞ। আর বাকি টাইমটা হাঁদা গঙ্গারাম তিলক। উনি প্রথমে আমায় খুব ভুগিয়েছে বাবাহ!
সে শিল্পিকে ছাড়া হল। এসে প্রথম দুদিন খুব বয়ফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড করা হল। ওমা… তারপর পালটি! সামনে দেখলে কথা বলছে না হাসছেও না! বাথরুমেও ঝামেলা করে না! কি হল ব্যাপারটা! মেসেজ করে বলত : রাতে বারান্দায় বেরোস। মানুষ ক্লোজেট থেকে ওপেন হয়। ওপেন হয়ে যে আবার ক্লোজেটে চলে যেতে পারে এই অভিজ্ঞতা আমার প্রথমবার! জিজ্ঞাসা করলে বলত “ও কিছু না! এমনি!”
এমনি এমনি ও এরম করবে না জানি! সেই সময় একটু রাগারাগি হয়েছিল। ও ও বলছে না কি ব্যাপার। আমারও জানতেই হবে! আর ও মস্তান। ওকে সবাই সমঝে চলে, ওর ক্ষেত্রে ওটাই ওর প্লাস পয়েন্ট! কিন্তু তখন বুঝিনি ওটাই ওকে আটকাচ্ছে!
এই সময় সাম্য খুব হেল্প করেছিল। ওর সবদিকে স্পাই লাগানো। আর সাম্য এমনিতেও অল-ইন্ডিয়া-রেডিও। ঠিক খবর এনে দিল যে ওর বন্ধুরা শিল্পীর সাথে ওর ব্রেকাপ আর আমার সাথে ওর বেশি ঘনিষ্ঠতার নিয়ে কথা বলাবলি করছে। মানে আমরা ভাবি কেউ দেখছে না, আদতে সবাই নজর রাখে! কি বলেছে সে খবর সাম্য আমায় দেয়নি। তবে কি কথা হতে পারে তার একটা আন্দাজ তো করা যেতেই পারে!
মানুষ ক্ষমতা খুব ভালবাসে। কেউ তার পাওয়ার পজিশন ছাড়তে চায় না! আর বিশেষ করে আগে যে সুযোগ সুবিধা ভোগ করা হত, তা যদি চলে যায়, তা আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। মস্তানের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। শুধু ও না, মস্তানের বন্ধুরাও তাই। তারা তো ছোটবেলা থেকে আলাদা করে ভাবতে শেখেনি। আলাদা না হলে আলাদা করে ভাবতে শেখা যায় না! তাই তাদের “গুরু” একটা ছেলের জন্য একটা মেয়েকে ছেড়ে দিয়েছে, মানে গুরু আর গুরু নেই। গুরু আর ছেলে না। আর গে’রা বরাবরই কম-ছেলে! সব মিলিয়ে মোটামুটি চেনা ছবি!আর মস্তান বাইরে থেকেই হোমরাচোমরা! ভেতরে মনটা নরম। তাই যে উত্তেজনায় নিজের মনের কথা শুনে সে এগিয়ে এসেছিল, উত্তেজনা কমে যেতে বিরোধিতার ভয়, ভয়-দেখানোর-ক্ষমতা খোয়ানোর ভয়ে তাই আবার সে নিজেকে লুকিয়ে রাখাতে তৎপর হয়ে উঠেছে! যাই হোক… এই সময়ে ওকে বোঝানো ছাড়া আমার হাতে কিছু ছিল না!
আমি সবার সামনে ওর সাথে বারবার কথা বলার চেষ্টা করে দেখছিলাম। এরম না যে উত্তর দিচ্ছিল না, কিন্তু ঐ ওপর ওপর। আর নজর রেখেছিলাম, অন্যরা নজর রাখছে কি না! রাখছিল। ওরা আমার সম্মন্ধে কি ভাবছে একদিনের একটা কথায় আমি বুঝে গেছিলাম। সেদিন আমার দরকার ছিল না। হোস্টেলে কি নিয়ে একটা সমস্যা চলছিল। ওয়ার্ডেন সন্তোষ দা একদম গ্রাউন্ড ফ্লোরে থাকেন। আমি ক্লাস থেকে ফিরেছি। আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন “সায়ন্তন কে ডেকে দাও তো একটু!”
আমি ওদের ঘরের দরজাটা ঠেলতে গিয়ে দেখলাম ভেতর থেকে বন্ধ। আমি টোকা দিলাম। “কে?” মস্তানের গলা। আমি ইয়ার্কি মেরে গলাটা ভারী করে উত্তর দিলাম, “আমি!”
“এই নেড়ি যা তো! খোল…!” মস্তানের হুকুম। ওদের ঘরের একটা দাদা, রোগা বলে ওকে ওরা নেড়ি বলে ডাকে! সে খুলল। খুলে দেখল আমি। ওমনি ঘরের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে বলল “গুরু তোর গার্লফ্রে… সরি বয়ফ্রেন্ড এসছে!”
“ক্যালানি খাবি?” দেখলাম উঠে আসছে!
আমি নেড়ি দা’কে বললাম “ওকে সন্তোষ দা নিচে ডাকছেন!” আমি আর দাঁড়াইনি। ওর একারই ঘ্যাম আছে? আমারো আছে।
একটু পরে মেসেজ ঢুকল : কথাটা আমাকে ডিরেক্টলিও বলা যেত!
আমিও তেমনি, লিখে পাঠালাম : না বাবা… আমার ক্যালানি খাওয়ার কোন ইচ্ছা নেই!
ইমোশনাল অত্যাচার করায় আমি পি এইচ ডি ভাই! আমার সাথে পাঙ্গা?… গিল্ট ফিল করিয়ে করিয়ে মারব! নিজেই আসবে কথা বলতে!
যাকে আমি ভালবাসি তার প্রতি আমি চরম নির্দয় হতে পারি! না নিজের প্রয়োজনে নয়, তার প্রয়োজনেই। ওকে এই মিথ্যা পরিচয়ের মোড়ক থেকে বের করে আনার দরকার ছিল। আর কথা তো তিনি শুনবেন না, মানে যেহেতু সবার সামনে কথা বলেন না! অতএব এটাই পথ। আমি ওর সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। শুনতে যতটা গুরুতর লাগছে, ব্যাপারটা আদতে অতটা গুরুতর নয়। যোগাযোগ মানে সামনে দেখলে নিজে থেকে যে কথা বলতাম ( ও না বলা সত্ত্বেও) সেটা বলতাম না,আরেকটা মোক্ষম জিনিষ মেসেজ সিন করে রেখে দেওয়া! নো রিপ্লাই…ওনলি ইমোশনাল অত্যাচার! তবে এখানে রিস্ক ছিল বৈকি। ভেবেছিলাম একবার, যদি পালায়! ছেড়ে চলে যায়? তারপর ভাবলাম পালালে… আমার ভালোর জন্যেই পালাবে!
এরম দু’তিনদিন হয়েছে যে রাতে মেসেজ করেছে : “বাইরে আয়” বা “কি করছিস?” বা “ভাঙা দোলনার সামনে আয়”… আমাদের হোস্টেল থেকে অনতিদূরে স্টাফ কোয়াটারের সামনে একটা পার্ক আছে। তাতে আছে বলতে একটা স্লিপ আর একটা ভাঙা দোলনা! ঐ থেকেই ঐ জায়গার নাম “ভাঙা দোলনা”! আমি তো স্পিকটি-নট্! আমিও দেখতে চাই কতদিন থাকতে পারে কথা না বলে! ঠিক চারদিনের মাথায় আমি সকালে স্নান করে বেরচ্ছি… ও জানত বা নজর রেখেছিল। কি জোর হাতটা চেপে ধরেছিল “কি হয়েছে কি তোর? এরম কেন করছিস তুই?”
“হাতটা ছাড়… ”
“ছাড়ব না..”
“ছাড় হাতটা!” একটু রেগে বললাম।
“আমাকে ছাড়লে না… এখানেই মেরে পুঁতে দেবো…!”
“আমার হাতে লাগছে!”
ভাগ্যিস নেড়ি দা আসছিল, তাই হাতটা ছেড়ে দিয়েছিল। এসে দেখি চার আঙুলের দাগ পরে গেছে! জোর আছে… দিতে পারবে ভাল! মনে মনেই হেসেছিলাম!
এরপরো অনেকবার দেখা হয়েছে। ও’ও কথা বলেনি,আমিও মাথা নীচু করে পাশ কাটিয়ে চলে এসেছি। তারপর ওনার কথা বলার ধরন কি! একদিন এসে বলল “তুই এইমাসের হোস্টেল ওয়ার্কিং কমিটিতে আছিস!”
“ফার্স্ট ইয়াররা তো থাকে না!”
“তুই থাকবি!”
ও ম্যানেজার! ও’ই ডিসিশন নেয় কে কে থাকবে। অথচ আমি একা থাকলে তো সন্দেহ করবে, তাই আরো দুটো ফার্স্ট ইয়ারকে কমিটিতে নেওয়া হয়েছে। পরে শুনেছিলাম, লজিক কি, না পরের বছর থেকে তো আমরাও থাকব, তাই এখন থেকে শিখে রাখতে হবে! এসব যুক্তি ও’ই দিতে পারে!
আচ্ছা, তা হল। কি কাজ? ক্যাশ সামলাতে হবে ওনার আন্ডারে! বাহ… আর কি! প্রতিদিন দেখতে হবে বাথরুম পরিস্কার হয়েছে কি না, সেই অনুযায়ী সপ্তাহের শেষে, বাথরুম পরিষ্কার করেন যে কাকু তাকে তার প্রাপ্য দিতে হবে!
গেছি প্রথমদিন। আলাদা কোন কথা বলেনি। দেখাচ্ছে আর কি যে আমার সাথে কথা না বললে তার কিছুই এসে যায় না! ভাল! আমিও শুধু কাজ করে চলে আসতাম। প্রতিদিন সকালে সেদিনের হিসাবের টাকা নিতে হত ওয়ার্ডেনের কাছ থেকে, আর বুঝিয়ে দিতে হত আগের দিনের হিসাব। যদিও সন্তোষ দা খালি বলেন “ওকে বুঝিয়ে দাও…” তিনি খালি শুয়ে শুয়ে ইউটিউবে গান শুনবেন আর বুক চুলকাবেন! আমি ওকে বোঝাব কি ও মোটামুটি সব জানে! কিন্তু তিনদিন পর, যারা বাজারে যাচ্ছে তারা দেখি আমাকে এসে হিসাব বোঝাচ্ছে! “আমাকে কেন বলছ? ”
“গুরু তোর কাছে আসতে বলল! ”
আগের প্ল্যানে সুবিধা করতে না পেরে এখন এই। যাতে আমি তাকে সকালবেলা করে হিসাব দেখাতে পারি। কথা বলাও হবে! প্রত্যক্ষ না হোক পরোক্ষ ভাবে তো হবে! এরম করতে গিয়ে সকালে স্নান করাটা গেল। ক্লাসে যাওয়ার আগেই করতে হত। বেশ উনিও তখন আসছেন। বুঝে গেলাম মস্তানবাবুর মাথায় পুরোটা গোবর নেই! একটু বুদ্ধিও আছে! এসে ইচ্ছা করে বলে “তাড়াতাড়ি কর..” “কি হল কি তাড়াতাড়ি কর… ”
আমিও সেরম। উনি তো একদম ধারের বাথরুমটা ছাড়া স্নান করেন না! আমি তাই পাশেরটায় সিফট করে গেলাম। নো ঝগড়া… নো ঝামেলা… অনলি ইমোশনাল অত্যাচার! হুঁ

এরমই গেল কিছুদিন। এক শনিবার। আমি মাঝের টায় স্নান করছি, ও পাশেরটায় করছিল। আমি সাবান মাখছিলাম বলে দরজা আটকানো ছিল। হঠাত দুমদুম বাড়ি দরজায়। কে রে বাবা… ও তো এরম করবে না! আমি দরজাটা খুলেছি জাস্ট, উনি আমায় ঠেলে ঢুকে পরলেন বাথরুমে, দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। আমার গলাটা টিপে ধরে পুরো দেওয়ালে সেঁটে দিয়েছিল। আমি আগে ভাবতাম শুধু সিনেমার ভিলেনরাই এসব করে, ও যে রিয়েল লাইফে করবে ভাবতেও পারিনি।
“কথা বলবি না?.. হুঁ? কথা বলবি না!”
সত্যি বাবাহ… কি জোর গলাটা টিপে ধরেছিল। মাথাটা ঝিমঝিম করছিল।চোখের সামনে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল শেষের দিকটা! আমিও প্রাণপণে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম!
“ছা…আ আ আরো…”
“কী ভেবেছিস তুই… আমায় কষ্ট দিয়ে মজা নিবি? নিজে সব শুরু করে এখন…! ” বলতে বলতে এমন চুমু খেয়েছিল পরে ঘরে এসে দেখলাম ঠোঁটের বাঁ’দিকে কেটে গেছে! কতদিন যে ঠিক করে খেতে পারিনি।কিছু খেলেই জ্বলত!
পরেরদিন সকালে সন্তোষ দা’র ঘরে গেছি হিসাব দিতে, সন্তোষ দা তখন পায়খানায় গেলেন। অতয়েব ঘরে মস্তান আর আমি। উনি আমায় আসতে করে বললেন “সরি! ”
আমি কোন রেসপন্স করিনি! আমি হিসাব দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি, আবার হাতটা চেপে ধরল “তুই আমার সাথে এটা ঠিক করছিস তো?”
“তুমি যেটা করছ সেটা ঠিক করছ তো!” একটু রেগে চ্যাঁচিয়ে বলেছিলাম বলে একটু ভরকে গেছিল। আমি হ্যাঁচকা টানে ওর মুঠো থেকে আমার হাতটা ছিনিয়ে চলে এসেছিলাম…
ফোনটা বেজে উঠল বালিশের তলায়। বালিশের তলায় ফোন থাকলে এমন গঁ গঁ শব্দে বাজে ঘুমিয়ে থাকলে ভয় লেগে যায়! আমারও কিছুটা সেরমই হল। আর ঘুমের মধ্যে ডিস্টার্ব করলে আমার হেব্বি মাথা গরম হয়ে যায়! ফোনটা না দেখেই কেটে দিলাম। আবার বাজল। উফফ… কে জ্বালাতন করছে! এবার অতি কষ্টে একটা চোখ খুলে দেখলাম মস্তান!
“হুঁ?”
“ঘুমাচ্ছ?”
“না… জগিং করছি!”
” সে করলে হয়েই যেত… ঠিকাছে তুমি ঘুমাও আমি পরে ফোন করব!”
“হুঁ… বলো কি বলবে!”
“তুমি জানো.. ৩৭৭ টার রায় আজকে!”
“হুম… জানি! সাম্য বলেছিল কাল!”
“তুমি আমায় বলোনি তো…”
“ভুলে গেছিলাম…”
“সে আমার বেলায় ভুলে যাওয়ারই কথা!”
“হুম…”
“আমার খুব এক্সসাইটমেন্ট হচ্ছে…”
“হয়ে আর কি হবে… ওটা গেলে আমাদের লাভ! তোমার কি?”
“কেন? কেন?”
“তুমি তো স্ট্রেট…”
“তোমাকে আমি নিতে পারিনা জানত… মুডটাই অফ করিয়ে দেয়… ঘোমাও..” বলে ফোনটা রেখে দিল। আমি ফিরে শুলাম। ধুস… ঘুমটা দিল চটকে! একবার ঘড়িটা দেখলাম। ৯ টা বাজে। মা ডাকেও না এখন। অবশ্য একটা ঘুমের ওষুধ চলে! তাই মা ডাকেনি। আর ডাক্তার বলেছে যত ঘুমাব তত ভাল! আমি উঠে বসলাম। মা’কে দুবার ডাক দিতেই মা ব্রাশটা দিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে জল আর গামলাও দিয়ে গেল। অ্যাক্সিডেন্টের পর মা ঘরেই ধুতে দেয় মুখ। যদিও বাথরুমে যেতেই হয় প্রাতঃকর্ম সারার জন্য! এখনও পা’টা মুরতে পারছি না! চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনদিনও চেয়ারে বসে পায়খানা করেছি নাকি… ধুস ধুস! প্রথমদিকে তো খুব সমস্যা হত! এখন একটু একটু যেন ব্যাপারটায় সড়োগড়ো! সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে এসে বসলাম পড়ার টেবিলটার সামনে! কি মনে হতে ফোনটা তুলে মস্তানকে মেসেজ করলাম : বাবুর রাগ কমল!
: তুমি ঘুমাও। তোমার দেখে কি হবে!
:হ্যাঁ ঘুম থেকে তুলে দিয়ে এখন আর ঘুমাও বললে কি হবে?
এ ছেলে খুব একটা রাগ ভাঙাতে পারে না! কোনদিনই পারে না! গায়ে জোর আছে, সেটাই ফলায়। আমার ওটাই ভাল লাগে। ওনাকে বলি না, যদিও! একেই তো আকাশে পা তুলেই থাকে, আরো প্রশংসা করলে উড়বে পুরো। তখনও ওর সাথে ঝামেলা চলছে। সেদিন সন্তোষ দা’র ঘর থেকে চলে আসার পরপরই মেসেজ করেছিল :সরি। আমি পাত্তা দি’নি। আমার হেব্বি লেগেছিল হাতে! ঠোঁটে তো কেটে গেছিলই। সব নিয়ে মাথাটা একটু গরম ছিল।
এরপরের দিনের ঘটনা। তার আগেরদিন আমি সব হিসাব পাই-টু-পাই লিখে রেখেছিলাম। আলাদা করে বলার দরকার ছিল না! আমি কাগজটা আর পাঁচটাকা বেচে ছিল, সেটা সন্তোষ দা’র ঘরে দিয়ে এলাম। তখনও তিনি আসেননি। সেদিন সকালে আর ডাক পরেনি। তাই সকালের দিকেই স্নান করতে গেছিলাম। ফিরছি। বেরিয়েই দেখি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ঘরের বাইরে!
আমাকে দেখতে পেয়ে বলল “আজকের টাকাটা…!” আমি হাতের দিকে তাকালাম, মুখের দিকে তাকাইনি। আমি এগিয়ে এসে টাকাটা নিলাম, হাতটা চেপে ধরল। না, এবারে আস্তেই ধরেছিল।
“তুই আমার সাথে কথা বলবি না!”
আমি কিছু বললাম না!
“কি হল?”
আসতে আসতে দেওয়ালে ঠেঁসে দিয়েছে। এটা একটা ওর বাজে অভ্যাস। কথা বলতে গিয়েই দেওয়ালে ঠেঁসে দেয়। অন্যদের করে কিনা জানি না! অবশ্য করবেই বা কেন…
ও আমার থেকে এতটাই লম্বা যে ও দেওয়ালে ঠেঁসে দিলে ওর বুকটা আমার মুখের সামনে থাকে! আমি ওর দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছি। ইচ্ছাও করছে ওর কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে, মনে হচ্ছে রাগটাও কন্টিনিউ করি! হঠাত হাত দিয়ে আমার ঠোঁটের কোনাটায় হালকা করে টাচ করল। তখনও ব্যাথা ছিল।
“আহ”
“ব্যাথা…?”আমি উত্তর দিলাম না! সে হাত দিয়ে আমার থুঁতনিটা তুলে ঠোঁটের ঐ জায়গাটা চুমু খেল! তখন আসলে আমার খুব খারাপ অবস্থা। শুধু গামছা পরে, তারমধ্যে চুমু! মানে… যতই হোক, লজ্জা তো একটু করে… আমি ছুটে ঘরে ঢুকে গেলাম। এখনও দুটো বাড়ি থেকে আসেনি। আমি একাই। ভাগ্যিস। নয়ত খুব লজ্জায় পরতে হত।
তিনি যে পিছন পিছন ঘরে ঢুকে এসেছেন সে আমি বুঝিনি! পেছনে থেকে বলল “আমার কাছে তোর লজ্জা কিসের!”
আর লজ্জা! কত লোকানো যায়?
এসে জড়িয়ে ধরল পেছন থেকে!”এত রাগ?”
“হুম…” কে বেশ বলেছিল বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতে রাগ দেখাতে নেই… তাই কথা বলেই ফেললাম! ঘাড়ের কাছে তখন নিঃশ্বাস ফেলছে দানবটা! শরীরের প্রতিকটা রোমকূপ যেন জাগ্রত হয়ে উঠেছে ঘাড়ের তার ঠোঁটের ছোঁয়ায়। ওর আদর করার মধ্যেও একটা বন্যতা আছে! এক হাত দিয়ে যখন কাছে টেনে নেয়, যেন মনে হয় জোর করছে! আসলে ওটাই ওর স্বাভাবিক শক্তি।
আমার গা বরাবরই নরম, স্নান করে তখন এক্সট্রা নরম। ওর খসখসে হাতের প্রলেপ আস্তে আস্তে যেন সব জল শুষে নেয়!
“তুই খুব সুন্দর রে!” বলে চোখের ওপর চুমু খেল। তারপর নাকে, তারপর নাক আর ঠোঁটের খাঁজে। ঐ জায়গাটা ওর খুব পছন্দের!
“আমি তোকে তুমি বলে ডাকব এবার থেকে!”
“কেন? আমি কি তোমার গার্লফ্রেন্ড?”
“বয়ফ্রেন্ড নোস?”
“তুমি এরকম করলে আমি হব না!”
“কি করেছি!”
“আমি জানি তুমি ভাবছ, তুমি আমার সাথে রিলেশনে আছ, সবাই সেটা জানলে, তোমাকে ওরা মানবে না…!”
“হুম… আজ থেকে আর করব না! তবে একটা শর্তে! ”
“কি?”
“আমি তোমায় তুমি বলে ডাকব!”
“কেন? হঠাত তোমার কি হল? কিরম লাগছে শুনতে!”
“লাগুক… আমার ভাল লাগছে!”
“বেশ… ডেকো!”সেই থেকে তার “তুই” হয়ে গেল “তুমি”! ও আমার থেকে লম্বা, প্লাস সেই ফিগার…ওর সাথে ওর পাশে শুলে আমাকে ওর বয়ফ্রেন্ড কম, পাশবালিশ বেশি লাগে! ওকে সেটা পরে বলেওছি। হাসে! বলে “পাশবালিশই তো!” সেদিন শুয়ে এই কথাটাই আমার মনে হয়েছিল, তাই লিখতে গিয়েও সেটাই মনে এসে গেল।
তখন আমি স্নানে ছিলাম। মা হেল্প করছিল। শুনতে পাচ্ছি ফোন বেজে যাচ্ছে! কে রে বাবাহ! ধরছি না যখন নিশ্চই ব্যস্ত আছি। … তাও! মা বিরক্ত হয়ে বলল “কে রে এতবার ফোন করে তোকে!”
“আমি কি করে জানব… আমিও তো এখানেই!”
স্নান করে গিয়ে দেখলাম সাম্যর চারটা আর মস্তানের আটটা মিসড কল! আগে সাম্যকে কল করলাম। ততক্ষণে বুঝে গেছি ফোনের কারণ কি! সত্যি বলতে, এটা হবে জানাই ছিল। বারতি উত্তেজনা আমার হয়নি। তবে সাম্যর গলা শুনে হেব্বি মজা হয়েছিল।
“কোথায় ছিলিস হারামি?”
“স্নানে গেছিলাম… কি হয়েছে বল! হয়ে গেছে তো!”
“হ্যাঁ… হয়ে গেছে!… ” ওর গলাতেও অদ্ভুত তৃপ্তি। বলল “কনগ্র্যাচুলেশন!”
“তোকেও অনেক শুভেচ্ছা… এবার একটা প্রেম কর!”
“খুঁজে দে একটা!” সঙ্গে সঙ্গে দেখি মস্তানও ফোন করছে! সাম্যকে বললাম যে ও ফোন করছে, ওকে একটু পরে ফোন করছি।
“হ্যাঁ… এবার বিয়েটা করে ফেল তোরা!”
“বিয়ের রায় তো দেয়নি এখনও…দিলেই করব!”
“আমি কিন্তু বড় গিন্নি তোর বিয়ের!”
“একদম…” আবার মস্তান ফোন করছে! “শোননা… রাখছি! আবার ফোন করছে!”
ফোনটা রেখে মস্তানকে ফোন করলাম। সে তো তুলেই এক দফা ঝার। “কোথায় থাকো কোথায়? আগে এত বার ফোন বেজে বন্ধ হয়ে গেল… আর এত কার সাথে কথা বল…?”
” জেলাস?”
“বাল…”
“আরে সাম্য ফোন করেছিল…”
“শোনো…?”
“বলো…”
“জানি ফোন করে এভাবে বলা ঠিক না… তাও বলছি! ”
“তুমি আবার এত ফরম্যাল হলে কবে থেকে?”
“তুমি আমায় বিয়ে করবে?”
“কেন… একসাথে থাকার জন্য বিয়ে কি করতেই হবে…”
“দেখো.. কথার জালে জরিয়ো না! আমার সাথে থাকবে তো সারাজীবন?”
“হুম…”
“কি হুম? ইচ্ছা নেই নাকি…?”
“আরে বললাম তো হুম..!”
“হ্যাঁ-ও তো বলা যায়! ”
“আরে বাবা… হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ…হয়েছে?”
“হুম… ভাবছি বাড়িতে জানাব!”
“উত্তেজনার সময় কোন সিন্ধান্ত নিও না… এখন আনন্দে ভাবছ বলে দি! ঝামেলা হলে সামলাতে পারবে তো! তোমার হিস্ট্রি কিন্তু অন্য কথা বলে!” সাবধান করলাম।
“তুমি কখনও লেগপুল করা ছাড়বে না… না?”
” এটা লেগপুল না… এটা সিরিয়াস!”
“হুম… ঠিকাছে! কি করছ?”
“এই স্নান করে এলাম!”
“খালি গায়ে?”
“হুম…”
“আমার এখন খুব ইচ্ছা করছে তোমায় গিয়ে আদর করি… আসব?”
“দেখা করতে এসো… বাড়িতে যে ওসব হবে না বুঝে গেছ নিশ্চই…!”
“বিকালে যাই…?”
“ঠিকাছে এসো…”
অ্যাক্সিডেন্টের দিন সকালবেলাও সব ঠিকঠাক ছিল। মস্তান সবার সামনেই কথা বলছিল। ওকে কিছুজন প্যাকট্যাক মেরেছিল কিছুদিন। ও প্রথমদিকে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিল ঠিকই, তারপর বলতে শিখেছে “তো? তোর কি? তোকে চুদেছি বাড়া?” আর ওর চেহারা তো আছেই! অতএব, বেশিদিন আর ঝামেলা পোহাতে হয়নি। সেদিন যে কেন আমি মোবাইল দেখছিলাম আমি জানি না। আমি সাধারণত রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল দেখিনা! ট্র্যাফিক সিগনাল দেখি… রাস্তার দু’ধারে দেখি, তারপর রাস্তা পার হই। সেদিন যে কি হয়েছিল… ঐ বলেনা.. কপালে থাকলে আর কে খন্ডাবে! দিল বাইকে ধাক্কা! ভাগ্যিস বাইকেই দিয়েছিল… লরি ফরিতে দিলে অক্কা পেয়ে যেতাম! আমার ধাক্কা খাওয়া অবধি মনে আছেন তারপর আর ঠিক মনে নেই! ঝাপসা ঝাপসা! চিৎকার! কারা বেশ ধরাধরি করে টানাহ্যাঁচড়া করছিল।ব্যাস! পরে শুনেছি মস্তান খুব কান্নাকাটি করেছে! আমাকে বেহুশ অবস্থায় অনেকবার ডেকেছে। আমি আর তখন কি আমাতে আছি! ও আসলে ভয় পেয়ে গেছিল… অনেক রক্ত বেরিয়েছিল নাকি! সব দেখে ও ভয় পেয়ে গেছিল। ও-ই রাস্তা থেকে আমায় পাঁজাকোলা করে তুলে ট্যাক্সিতে তুলেছে! এসব আমার সাম্যর কাছ থেকে শোনা!
হসপিটালে যখন ওর সাথে প্রথম দেখা হল, আমি কথা বলতে পারছিলাম না! ও’ও কোন কথা বলেনি। শুধু আমার হাতটা নিজের দুটো হাতে নিয়ে বসেছিল। সেদিন যেন প্রথমবার মনে হল সেদিনই আমার সবচেয়ে বেশি কথা বলেছিলাম। ওকে আমি কাঁদতে দেখিনি কোনদিন। সেদিন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মুখটা থমথম করছিল। ফরসা তো, দাড়িতে ঢেকে থাকে বলে, লাল হয়ে গেছিল গালদুটো। চোখ দুটোও লাল আর ফোলাফোলা! তারপর কে বেশ এসে খবর দিল আমার মা এসেছে… তখন বেড়িয়ে গেল!
আজ মা’ই বলল “চ বাইরে একসাথে খাই…!” আর আমি তো হাঁটতেও পারছিলাম। আমি আস্তে আস্তে গেলাম। গিয়ে দেখি খবর চলছে। নিউজে চলছে সুপ্রিমকোর্ট রায়ের খবর! পাশে আনন্দ উল্লাসের ছবি! মা বলল “তোদের ঐ ধারাটা বাদ চলে গেল… না?”
“হ্যাঁ… ”
“এখনই কি সবাই ওরা বিয়ে করতে পারবে!”
” না… তার জন্য আবার পিটিশন করতে হবে হয়ত… জানি না ঠিক!”
আর কিছু জিজ্ঞাসা করল না! খেলাম দেলাম। আমি একটু চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছি। মা রান্নাঘরে ছিলেন! বাসন ধুয়ে এসে বসলেন আমার পাশে, সোফায়!
“হ্যাঁরে…. তোর ঐ বন্ধুটি আর এলনা তো!”
“কে?”
“ঐ যে উঁচো-লম্বা করে ছেলেটা!”
“ও…”
“আসতে বলবি তো! ছেলেটা বেশ ভাল…” আমি মনে মনে ভাবছি এই ভদ্রমহিলার উদ্দেশ্যটা কি! ওর তো আজই আসার কথা! বলে দেবো? বলেই দি… বলেই দিলাম। “আজ হয়ত আসতে পারে!”
“আজ?”
“হুম…”
“দুপুরেই আসতে বলতে পারতিস… আমাদের সাথে খেত!”
আমি একবার তাকালাম। এই কথাগুলো মস্তানকে না বলা অবধি আমার ঘুম হচ্ছে না! আমি ঘরে চলে এলাম। যা ওষুধ খাওয়ার খেয়ে, ওকে ফোন করে সব বললাম। ও সব শুনে বলল “গাঁড় মেরেছে…!”
“এখনও হয়নি… আসো! হবে!”
“এই সত্যিই কিছু বলবে নাকি!”
“আমি কি করে জানব..” ইচ্ছা করেই চাপে রাখলাম। বেশি মস্তানগিরি তো! বেরোক একটু।
ঠিক সাড়ে চারটে। কলিং বেল। দরজা খোলার শব্দ। ওদের মধ্যে কিছু একটা কথোপকথন চলছে! দুজনেই উঠে এল। আমি ঘাপটি মেরে শুয়ে ছিলাম। “বাবু… ওঠ! সায়ন্তন এসেছে!”
“কাকিমা… থাক না! ও ঘোমাচ্ছে ঘোমাক… আমি বসছি একটু!”
“বেশ বসো তবে! ডাকো নয়ত…ও উঠে যাবে! তুমি কফি খাবে তো?”
“হ্যাঁ…”
“বসো…” মা বেরিয়ে গেলেন!
কিছুক্ষনের পরেই জনাবের ঠোঁট আমার নাক আর ঠোঁটের মাঝে খাঁজে চুমু খেয়ে বলল “আমি জানি আপনি জেগে!”
আমি হাসলাম। ওর ঠোঁটদুটো আলতো করে ছুঁল আমার ঠোঁট। কাগজে ভেজা তুলি বোলানোর মত দুবার বুলিয়ে নিল! “কনগ্র্যাচুলেশন!”
“আপনাকেও!” জড়িয়ে ধরলাম! কতদিন পর যে ওর গন্ধটা পেলাম।
তখন প্রায় সন্ধ্যা। মা লুচি আলুরদম মিষ্টি খাইয়েছে জামাইকে! কুড়ি খানা লুচি খেল… গুনে গুনে কুড়ি! মা বলল “খুব খিদে পেয়েছিল না… আরেকটা নাও না!”
“না কাকিমা আর নয়…”
“বেশ… যাও হাত ধুয়ে নাও!” মা’ও ট্রে’টা নিয়ে বেরিয়ে গেল। যাক এবার একটু আমরা একা থাকতে পারব, ও খাওয়ার গোটা টাইমটা মা দাঁড়িয়েছিল। ও ও সেরকম। কি রাক্ষসের মত খায়!
ও হাত ধুয়ে এসে রুমাল দিয়ে হাতটা মুছতে মুছতে সবে বসেছে, আবার মা হাজির!
“সায়ন্তন?”
“হ্যাঁ কাকিমা?” কাকিমার চ্যালা!
“একটু নিচে এসো… তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে!”
“কি কথা!” হঠাত ক’রে বেরিয়ে গেল। “না… মানে আসছি!”
“এসো!” বলে মা নেমে গেলেন!
“কি বলবেন?”
“আমি কি করে জানব?” আমি সত্যিই জানিনা!
“বলি দেবে বলে এত খাওয়াল..?”
“সিরিয়াসলি? ”
“না…সরি! বাট্ কি বলবে!”
“দেখো… কি বলে!”
“তুমি কিছু বলেছ?”
“না…”
“সায়ন্তন… কোথায়? আসতে বললাম যে! ”
“হ্যাঁ যাই কাকিমা…”
ওকে পাঠিয়ে তো দিলাম, কিন্তু এদিকে আমার টেনশন শুরু হল। আমার মা’কে ভরসা নেই… কি বলবে কি জানে! মনের মধ্যে এক অদ্ভুত উত্তেজনা, প্রিয় মানুষকে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে যেমন টেনশন হয়… ওরম টাইপের!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.