আমার হবু বয়ফ্রেন্ড

লেখকঃ শঙ্খদীপ

১.
কলেজস্ট্রীট আমার প্রথম ক্রাশ! প্রথম প্রেম! প্রথম ভালবাসা! সব… সব! সুযোগ পেলে কলেজস্ট্রীট যাওয়াটাও ফাঁকতাল পেলে প্রেম করার মতই। কাজ নেই চলো দেখা করি, ধরণের! বলে না প্রেমিকের এটা ভাললাগে, ওটা ভাললাগে বলে কিছু হয় না! প্রেমিকের সবটা ভাল হয়, কোন খারাপ নেই। কলেজস্ট্রীটও আমার কাছে তাই। প্রেসিডেন্সি ভাল লাগে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটটা ভাল লাগে। বইয়ের দোকানগুলো ভাল লাগে। হিন্দু, হেয়ার, কফি হাউজ, সুইমিংপুল, রাস্তা ঘাট, রেলিং, নর্দমা সব ভাল লাগে আমার!
যাদবপুরে আসার পর থেকে সেরম একটা যাওয়া হয়ে ওঠে না! উলটো রাস্তা হয় তো। অনেকদিন প্রেমিকের সাথে দেখা না হলে যেমন মন খারাপ হয়, আমারও তেমনি হচ্ছিল। আর আমার বয়ফ্রেন্ড তো বোবা হাঁদা! তার ফোন নেই, whatsapp, facebook ও নেই! অভিমান করার জায়গা নেই, কারণ সে তো দুবাহু খুলেই রেখেছে সবসময়! অতএব দোষ আমার! আমাকেই যেতে হবে! ক্লাস ছিল না সেদিন সেরকম। এক্টাই ছিল ১১ ০৫ থেকে ১২ ৫০। প্ল্যান করেই ছিলাম সেদিন যাব। সোজা ট্রেনে করে শিয়ালদা, সেখান থেকে ব্রিজের তলা দিয়ে ওপার হয়ে, বৈঠকখানা বাজার পেরিয়ে, মহাত্মা গান্ধী হয়ে সোজা হাঁটা! রাস্তা বরাবর হেঁটে গেলে সুইমিং ক্লাবের পাশ দিয়ে বেরনো। উফফফ… শেষের দিকে তো মনে হয় এই এল এই এল। প্রেম করার উত্তেজনা যে কি তা একদম হাড়ে হাড়ে টের পাই যেন!
গিয়ে একবার দাঁড়াতে পারলে নিশ্চিন্ত।বই ঘাঁটা শুরু। দোকান চরানো শুরু। ভাই কি লাগবে.. ভাই এদিকে… দাদা কি লাগবে বলো না… ও ভাই! আরে দাদা দাঁড়ান, প্রেমিকের সাথে এতদিন পর দেখা… একটু দেখতে দিন তো চোখ ভরে! জ্বালাতন খালি। তবে বইয়ের দোকান ঘুরতে ব্যাপক লাগে! কত বই।আমার এক সময় প্ল্যান ছিল, পুরো কলেজস্ট্রীটটা কিনে নেওয়ার! যাই হোক… বইয়ের দোকান গুলো ঘুরছি। এক জায়গায় চোখে পড়ল “এই র্যাকের সব বই ১০০”! অফার ব্যাপারটা বেশ মজাদার। মোটা মোটা বই ১০০! মনে হয় যেন সবচেয়ে মোটা বইটা ১০০য় কিনে লাভ করব খুব। সামনে গিয়ে দেখা যায় মোটা বইগুলোই আতিপাতি। সব না যদিও। Dan Brown এর বইগুলো কলেবরে বেশ হৃষ্টপুষ্ট। যাই হোক… একটা দোকানে দাঁড়িয়ে বই দেখছি। যত ছেঁকে নেওয়া যায়! পেজ কোয়ালিটি ভাল কি না, কভার পেজটা বেশি মুড়ে গেছে কি না, সেকেন্ড হ্যান্ড জানা… তাও পেনের দাগ আছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি!
অনেকদিন আগে একবার এসেছিলাম, তখন ১০০ টাকার অফারটা একটা দোকানেই ছিল। এখন দেখছি পরপর অনেক দোকানেই আছে। আমিও ঘুরে ঘুরে দেখছি! একটা দোকানে দাঁড়ালাম। সেখানে আগেই একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। অগোছালো। ভোম্বল গোছের লুক্স! চুলগুলো মাথার ওপর কাকের বাসা তৈরি করেছে। সেভ করেনি তাও প্রায় সপ্তা খানেক। দেখতে ছিমছাম। পরনে একটা লাল রঙের গেঞ্জি আর নিচে একটা কালো ট্র্যাকশুট্যের প্যান্ট। আর সবকিছুকে ছাপিয়ে যেটা চোখে পরছে তা হল তার পিঠে কালো গীটারের ব্যাগ। আমি যাদবপুরে এরম ক্ষ্যাপাটে ছেলেপুলে দেখেছি। আমি দূরেই দূরেই থাকি। যাদবপুরে এসব ছেলেদের “সিউডো আঁতেল” নামে সুখ্যাতি আছে! অবশ্য একে কখনও দেখিনি যাদবপুরে! আমি এক ঝলক দেখে আমি বইয়ের তাকটার দিকে তাকালাম। বই দেখছি হঠাত খানিক পরে কাঁধে টোকা! ফিরে দেখি ছেলেটা! একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে! কি রে বাবা পাগল নাকি! আমার পাগলে আবার ভীষন ভয়!
“হাই” কথা বলল শেষ পর্যন্ত!
“হাই…” আমি একটু বিব্রত হয়ে উত্তর দিলাম।
“আমি কি আপনার বোতল থেকে একটু জল খেতে পারি! ”
“হ্যাঁ হ্যাঁ…” বলে আমি বোতলটা বার করে দিলাম! হাফ বোতল মত জল ছিল। এক ঢোকে পুরোটা শেষ করে নিয়ে বলল “বাঁচালেন… জানেন! কতক্ষণ ধরে জল তেষ্টা পেয়েছিল!”
আমি হাসলাম। আবার বই দেখছি। কিছুক্ষন পর আবার বলল “আপনি কি এখানকার?”
“এখানকার মানে?”
“মানে প্রেসিডেন্সিতে পড়েন?”
“না…”
“স্কটিশ?”
“না… আমি যাদবপুরে পড়ি! ”
“ও” একটা রেলগাড়ির মত টান দিয়ে বলল।
“তুমি কি প্রেসির?”
” ..ভুস আমি নাকি প্রেসিতে পড়ি… আমি অত ভাল স্টুডেন্ট নাকি… কোন রকমে টুকেটাকে পাশ করেছি… ”
“তাহলে কোথায় পড়?”
“সুরেন্দ্রনাথ…”
“ও… সুরেন্দ্রনাথে আমার দুতিনজন বন্ধু আছে!”
“সত্যি? তুমি যাদবপুরে পড়ো.. তোমার সুরেন্দ্রনাথে বন্ধু…”
“কেন? সুরেন্দ্রনাথে কি ভাল ছাত্রছাত্রী পড়ে না! আমার বন্ধুগুলোই তো খুব ভাল পড়াশোনায়! আমার বিশ্বাস আরো ভাল ছাত্রছাত্রী আছে…!”
“এই তুমি খুব সুন্দর কথা বল…. এই দ্যাখো… তুমি হয়ে গেছে…”
“তুমিই বলো…”
“বাঁচালে… জানতো সবাইকে আমি তুমি করেই বলতে চাই! সেদিন বাসে এক কাকিমাকে তুমি করে বললাম… কি ঝাড়টাই না ঝাড়ল…কেন? না তুমি বলেছি তাই! শিক্ষা দিক্ষা তুলে বলল… খুব খারাপ লাগল জান! তারপর থেকে ঠিক করেছি অচেনা কাউকে আপনি করেই বলব… যদিও তোমাকে দেখে আপনি বলতে ইচ্ছা করছিল না…”
কথা বলতে বলতে কখন আমরা ফুটপাথ ধরে হাঁটা ধরেছি খেয়াল করিনি। কিছুটা এগিয়ে গেছি। ও মাঝে দাঁড়িয়ে পরল। “এই যা… বই কিনলে না?”
“নাহ… আজ আর কিনবো না! টাকাও নেই সেরকম!”
“ও… তুমিও আমার মত ভিখারি?…না মানে ভিখারি না… ঐ আর কি! আমার মানিব্যাগও ফাঁকা! শুধু ভাড়াটা আছে! ”
“তুমি থাকো কোথায়?”
“দমদমে! তুমি?”
“ও… তুমি দমদমে থাকো? আমি বেলঘরিয়া!”
“বাহ… পাশের পাড়া তো!”
পাশের পাড়া নাকি! ছেলেটি বেশ! মজারু। কোন কিছুতেই যেন কোন ভ্রুক্ষেপ নেই!
“তা তুমি গান করো?”
“গীটার দেখে বললে? ” হেসে বলল “হ্যাঁ… বাথরুম থেকে বেরিয়ে ইউনিয়ন রুম পর্যন্ত গেছি সবে!”
আমার বাস আসছিল।
“বাহ… বেশ একদিন গান শুনব তোমার!” বলে আমি এগিয়ে গেলাম “আমার বাস এসে গেছে… টাটা!”
আমি বাসে উঠতে যাচ্ছি, দেখি চ্যাঁচাচ্ছে “এই তোমার নাম কি!”
“শঙ্খদীপ…!” বাস ছেড়ে দিয়েছে, সিঁড়ির সামনেটা দাঁড়িয়েই জিজ্ঞাসা করতে যাব, ও-ই চ্যাঁচিয়ে বলল “আর আমি গোরাআআআআ…
সত্যি কথা বলতে গোরা মনে রাখার মত কেউ না! অতএব সেদিনের পরে কবে যে ও আমার মন থেকে মুছে গেছিল তা মালুম হয়নি আলাদা করে। রাস্তায় মাঝে মাঝে এরম অনেকের সাথে আলাপ হয়, যারা গায়ে পরে আলাপ করে! গোরাও তেমনি। তবে গোরার গায়ে পরা ব্যাপারটা অন্যদের থেকে আলাদা যদিও। অনেকেই প্রথম দেখাতেই whatsapp নাম্বার চায়! একবার ভুল করে দিয়েও ফেলেছিলাম একজনকে। সে জ্বালাত না যদিও। তবে মাঝে মাঝেই ফোন করর বলত “দাদা কি করছ?” আমি তার কবেকার দাদা কে জানে! আমি নাম্বার দিয়ে তো ভুলে গেছি। প্রথম দিন বললাম “কে বলছ? ”
“ঐ যে দাদা, বেলঘরিয়া স্টেশনে দেখা হল… ভুলে গেলে এত তাড়াতাড়ি!” মাথার মধ্যে ঘেঁটেঘুটে বার করলাম, হ্যাঁ তাই তো! আমার একটা সমস্যা আছে, আমি কারোর সাথে বাজে ভাবে কথা বলতে পারিনা! বলে ফেললেও পরে নিজেরই খারাপ লাগে, তাই হেসে কথা বলে রাখলাম সেদিন। ভেবেছিলাম, নাম্বার নিয়েছিল তাই হয়ত করেছে! আর করবে না! আর করবেই বা কেন! না আমি ওর কোন হোমে লাগব, না ও আমার কোন যজ্ঞে! ওমা, কিছুদিন পর দেখি আবার ফোন করে! কি করা যায়! অগত্যা ব্লক। এরমও পাব্লিক দেখেছি যে নাম্বার দিলে আবার ফোন করে নিজের নাম্বারো দিয়ে দেয়। ফলে ভুল নাম্বার দিয়ে কেটে পরাও যায় না! এরম অনেকবার ঠেকতে ঠেকতে, এখন এরম হলে সোজা বলেদি “আমি আমার নাম্বার শেয়ার করতে কম্ফর্টেবেল না!” গোরা এই দিক থেকেই আলাদা। নাম্বার চাইনি। ইচ্ছা করে জানার বা বন্ধু পাতানোর চেষ্টা করেনি। আর একবার কথা হয়েছে মানেই যে বন্ধুত্ব করতে হবে, তারই বা কি মানে আছে! ক্ষণিকের কথা… থাক না! ওটাই সত্যি। আর কেন!
প্রায় দুমাস পরে শিয়ালদা স্টেশনে ওর সাথে দেখা না হলে কোনদিনও ওর কথা মনে পড়ত কি না কে জানে! আমি ফিরছিলাম। ও’ও ফিরছিল। আমি ট্রেনের দরজার সামনেটা দাঁড়াই যাতে নামতে সুবিধা হয়, ও’ও এসে দাঁড়াল। আমি দেখিও নি। আমি ফোনে মশগুল, শিয়ালদায় ফ্রি-তে নেট পাওয়া যায়… যতটা নিজের নেট বাঁচানো যায়!
“কেমন আছ?” ওর কথায় চমক ভাঙল, ওর দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছিলাম, কোথায় দেখেছি ছেলেটাকে!
“কি মনে করতে পারছ না তো! নাকি ইচ্ছা করে করছ… মনে করতে না পারলে বলি আমার নাম গোরা, সেদিন কলেজস্ট্রীটে দেখা হয়েছিল, আর যদি ইচ্ছা করে কর, তাহলে আর ডিস্টার্ব করব না!”
হ্যাঁ… মনে পড়েছে! আমি হেসে বললাম “আরে না না, সত্যিই মনে করতে পারছিলাম না!কেমন আছ?”
“আমি আগে জিজ্ঞাসা করেছি! ”
“কি?”
“ঐ যে কেমন আছ?”
“ও…. আছি ভালোই!এবার তুমি বল?”
“আর আমি….যেমন দেখছ!”
“গীটার কোথায়?”
“বাড়িতে… প্রতিদিন নিয়ে ঘুরব নাকি! তারপর আবার এই হাঘরেদের মধ্যে…”
আমি মনে মনে হাসলাম। ট্রেনে ওঠার জন্য লোকগুলো যা হুড়মুড় করে তাদের আমারও হাঘরেই মনে হয়! আমি বললাম “আমারও তাই লাগে!”
“লাগে না! বলো!”
আমি হাসলাম। ও কেমন একটা লজ্জা লজ্জা টাইপের পেল। কেন পেল বুঝলাম না!
“কি হল? ”
“কিছু না… এখানে দাঁড়াব? তোমার মেয়ে দেখায় সমস্যা হবে না তো!”
“মানে?”
“মানে তুমি বেলঘরিয়া নামবে, চাইলেই ভেতরে গিয়ে বসতে পারো! না বসে এখানে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছ!”
“তার থেকে প্রমাণিত হয় আমি মেয়ে দেখতে দাঁড়াই!” আমি একটু রেগেই গেছিলাম।
“না… আমি ঢিলটা ছুড়ে দেখলাম লাগে কি না! জানতো আমার এক বন্ধু আসলে এটা করে, তাই তোমাকে দিয়ে মেপে নিলাম ব্যাপারটা ইন জেনারেল নাকি… ওরটা র্যানডম?”
ছেলেটা ভাল কথা বলে!
কিছুক্ষণ আর কোন কথা হল না! সে ঘুরে ঘুরে স্টেশন দেখছে! আমি ফোন ঘাঁটছি। আমি একবার আড় চোখে তাকিয়ে দেখলাম। ওর চোখটা চনমন করে এদিক ওদিক ঘুরছে!
“এবার কে মেয়ে দেখছে!”
“এই তুমি কথা বললে? তার মানে রাগ করোনি! আমি ভাবলাম রাগ করেছ, তাই ফোনে মুখ গুঁজে নিলে… ”
“কথা ঘুরিও না গোরা!”
“কি কথা!”
“ঐ যে এবার কে মেয়ে দেখছে!”
“ধুস… মেয়ে দেখে আমি কি করব? ”
“কেন তুমি ছেলে দেখো নাকি!”
“না সেরম কিছু না… পকেটে পয়সা নেই, মেয়ে দেখলেই হবে? ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে, বার্থডে, ভ্যালেন্টাইন ডে এসব সেলিব্রেট করতে হবে… আমি অতকিছু পারব না… শুধু শুধু ওকেই বা বিরক্ত করব কেন… আমিও বিরক্ত হব কেন! ”
“বেশ… বুঝলাম!”
ট্রেন ছাড়ল। আমি আবার কিছুক্ষণ ফোনের মধ্যে মুখ গুঁজলাম।
“তোমরা কি করো সারাদিন ফোনে…”
“whatsapp, facebook… তুমি করো না?”
“না আমার ফোনে এসব হয় না!…. এই যে” পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট ফোন বার করে এনে দেখাল। আমার কেমন একটা মনে হল। আমি একটু পরে ফোনটা ঢুকিয়ে নিলাম পকেটে!
“তুমি দমদমে নামবে তো?”
“আমার কোন কাজ নেই… বেলঘরিয়াতেও নামতে পারি! যদি তুমি বলো!”
আমি হাসলাম। “না তারজন্য বলিনি!”
বিধাননগরটা পার হয়ে গেল। ভাবছিলাম ছেলেটার নাম্বারটাকি চাইব? কেন নাম্বার কি দরকার? কি হবে নাম্বার নিয়ে? খালি উল্টোপাল্টা চিন্তা! নিজের বকানি খেয়ে চেপে গেলাম।
“তোমার সাথে দেখা হওয়াটা কিন্তু ভাগ্যের ওপর…দ্যাখো!”
আমি হাসলাম। সে এবারও কেমন একটা লজ্জা লজ্জা ধরনের হাসল। বলল “দমদম আসছে! তুমি অন্যদিন কখন ফেরো!”
“ভ্যারি করে… তবে বেশির ভাগই এই ছ’টা পাঁচের নৈহাটি লোকালটাই ধরি…”
“দেখা যাক দেখা হয় কি না!”
“বেশ”
“এটা তোমার মুদ্রাদোষ না? এই বেশ বলাটা!”
“হয়ে গেছে!”
“না না বোলো… দিব্যি লাগে শুনতে!”
ও না মাঝে মাঝে কেমন একটা লজ্জা পায়। কেন পায় বুঝিনা। আমি বোঝবার চেষ্টা করেছি, ও কখন কখন হাসে! বুঝিনি। যাই হোক, দমদমে নামার সময় বলল “টাটা…”
“টাটা…”
নেমে স্টেশনে দাঁড়িয়ে গেল। ট্রেন ছাড়ল তবে গেল। আমি হাসলাম। আবার দেখি লজ্জা পায়! এর কি মাথায় স্ক্রু ঢিলা নাকি! লজ্জা পেলে অদ্ভুতভাবে হাসে ও। সেই মাথার পিছনে হাত টাত দিয়ে! নিচের ঠোঁট কামরে!
যাই হোক, যথারীতি এত কাজের মাঝে ভুলে মেরে দিয়েছি। আর শিয়ালদা স্টেশনে ফেরার সময় দেখা হবে বললেই হয়? তাও ফোন নাম্বার নেই! বলে দেওয়া নেই এই কোচে উঠবে বা কিছু! পরেরদিন গিয়ে একবার চেষ্টা চরিত্তির করেছিলাম, পাইনি খুঁজে।
তারপর আবার আমাদের ডিপার্টমেন্টার সেমিনার হল। দুদিন ফিরতে ফিরতে রাত হল। তারপর ছুটি ছিল একদিন। তারপর শনিবার রবিবার! তারপর সোমবার আসতে আসতে গোরা মাথার সচেতন জগত থেকে ডিলিটেড! ঠিক ডিলিটেড নয়, মানে ঐ আর কি! ওর কথা আর মনে পরে নি!
সেদিব বোধ হয় বুধবার ছিল। আমাদের ছাত্রদলের আর্টস ইউনিটের মিটিং ছিল।ইউনিভারসিটি থেকে বেরতে বেরতে পৌনেপাঁচটা! তাও সেদিন তাড়াতাড়ি বেরিয়েছিলাম। এই টাইমটায় বেরলে একটা সমস্যা হয়। শিয়ালদায় তো পৌঁছে যাওয়া যায়! কিন্তু সেখান থেকে ট্রেন মেলে না! সাড়ে পাঁচটার পর আবার ছ’টা পাঁচ। মাঝে মাতৃভূমি, গ্যালপ….বেলঘরিয়া দাঁড়ায় না! এমন কি, প্রথম দিকেই ছ’টা পাঁচের নৈহাটি লোকাল না ধরলে জায়গা পাওয়া মুশকিল। তখন পরের ট্রেন। তবে তারপর থেকে ট্রেনই ট্রেন। অসুবিধা হয় না! আমি ছ’টা বারোর কল্যাণী সীমান্তটায় উঠলাম। সবে এসেছে ফাঁকা ফাঁকাই। আমাদের পাশেই নৈহাটি ভিড়ে ঠাসা। আমি শিয়ালদার ওয়াইফাইতে কানেক্ট করে নেট করছি! হঠাত দেখি ঝপ করে ঐ ট্রেন থেকে একজন আমার ট্রেনে আমার সামনে এসে পড়ল। এরম হামেশাই হয়। তাই আর গা করিনি। সে আর নরছেও না! আমার কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছিল যেন সে আমাকেই দেখছে! আমি মাথাটা তুলে চাইলাম। ভাবলাম একটা ক্রুড লুকস দিয়ে তাকে সেখান থেকে বিদায় করব… ওমা দেখি ও!
হাসছে!
“বাবা… তুমি তো কোনদিন ফোনেই ঢুকে যাবে! কি মন দিয়ে ফোন ঘাঁটো!”
“তুমি কোথা থেকে দেখলে?”
“আমি ঐ ট্রেনটায় ছিলাম!”
“সে তো দেখলামই… হনুমানের মত জাম্প করলে…”
“তুমি কি আমায় হনুমান বললে?”
“কৈ না তো? কোথায় হনুমান বললাম! আমি বললাম হনুমানের মত…!”
“ওহ… বাঁচালে! আসলে ছোট থেকেই শুনছি তো হনুমান বাঁদর উল্লুক আরো অনেক কিছু, তাও নিজের কনফিডেন্স ছিল আমি আসলে মানুষই। কিন্তু তুমি বলছ মানে সত্যিই হয়ত, কারণ তুমি আমাকে তো চেনো না… তোমার মনে হচ্ছে মানে সত্যিই হয়ত হবে!… ” কি তাড়াতাড়ি কথা বলে। একটু দম নিয়ে বলল “হনুমানের মত মানে হনুমান নয়… বলো!”
“না… তারপর কি করলে সারাদিন?” কথা খুঁজে না পেয়ে বললাম।
“এই উঠলাম, তারপর খেয়ে কলেজ এলাম। ক্লাস করলাম আড্ডা দিলাম… এখন বাড়ি ফিরছি…”
“তুমি স্নান করোনি!”
“না… কে স্নান করে প্রতিদিন! স্নান করতে যাও, তেল মাখো, সাবান মাখো, আমার খুব ঘন চুল তো, শোকায় না, ভিজে চুল নিয়ে রোদে বেরলে ঠান্ডা লেগে যায়… ”
“তোমার কাছে সবকিছুর উত্তর আছে না…?”
“হ্যাঁ” খুব কনফিডেন্টলি বলল! যেন ওটা ওর হিডেন ট্যালেন্ট!
আমাদের পাশের নৈহাটি লোকালটা ছেড়ে দিল! আমি সেদিকে চেয়েই হাসছিলাম। লক্ষ্য করলাম, উনি লজ্জা পেয়ে হাসছেন!
“আচ্ছা, তুমি এরম লজ্জা পেয়ে হাসো কেন!”
“এটা লজ্জার হাসি না!”
“তাহলে?”
“কিছু না… ছাড়ো না!”
“না না… বলো!”
“দাদা একটু সরে দাঁড়াবেন!” আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল। এসব পাবলিকদের আমি দু’চোখে নিতে পারিনা! দেখছে আর জায়গা নেই! রোগা ছেলে দেখলেই এইসব!
“আর কোথায় সরব কাকু!”
সে আর কিছু বলল না! আমিও আর কথা বাড়ালাম না।এরা না অভ্যাসে বলে!প্রতিদিন একবার করে না বললে এদের ঘুম হয় না! আমাদের গাড়িটাও ভরতি হচ্ছে আসতে আসতে। আমাদের এই নর্থ লাইনে ট্রেনের টাইমের কোন বাবা মা নেই! যখন ইচ্ছা ট্রেন চলে! টাইমে ছাড়াটাই অস্বাভাবিক! সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। এরকম একদিন ট্রেন একদম টাইমে ছেড়েছে। তো একটি কাকুর পিছনে লেগে আরো কয়েকজন বলছে, “কি অমুক দা, কি আপনার ট্রেন এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিল…!”
সে বলল “আমার ট্রেন!”
“আপনারই তো ট্রেন!…কালকে রেগেমেগে বললেন স্টেশন মাস্টারকে কিসব বলবেন!কি বললেন স্টেশন মাস্টারকে?”
পরে একসময় জেনেছিলাম উনিও রেলেই কাজ করেন। উনি সেদিন ঐ প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “*ড়ে ব্যাটারি পুড়ে এলাম…”
যাই হোক, লেটস্ কন্সেন্ট্রেট অন গোরা!মাঝে কথাটা বাঁধা পড়ল। আমি আবার শুরু করলাম “হ্যাঁ… কি বলছিলাম বেশ! বলো বলো… ”
“আরে ছাড়ো না…”
“না ছাড়ব না… বলো!”
“আচ্ছা, কাল যদি দেখা হয় ফেরার সময়… বলব!”
ভালোই জানে ছলাকলা! জানে কৌতুহলের বসে আমি নিশ্চই প্ল্যান করব যাতে পরেরদিন আমাদের দেখা হয়। করলামও তাই।
“আচ্চা, তোমার ফোন নাম্বার দাও… ”
দিল।
“একটা কল করে দাও… ” দিলাম!
বেলঘরিয়া স্টেশনে নেমে মনে হল! ব্যাটার মাথায় তো বুদ্ধি আছে! ফোন নাম্বার অদলবদল হয়ে গেল!
হুমমমম… আ’ম ইম্প্রেসড!
*
আমি ভাবলাম প্ল্যান করে নাম্বার যখন নিল, তাহলে আর ফোন করে কি হবে, ও-ই ফোন করবে! ওর মাথায়ই বুদ্ধি আছে খালি? আমার মাথাতেও আছে! আমি আর ফোন করলাম না! ও-ও ফোন করছে না! এদিকে আমি শিয়ালদা চলেও এসেছি। এ ছেলে তো মহাচালু! খেলাচ্ছে… তারপর হঠাত মনে পড়ল, আমি ওর সাথে ফেরার জন্য এত উৎসুক হচ্ছি কেন? কারণটা মাথায় আসছিল না! তারপর মনে পড়ল, হ্যাঁ, ও কেন ওরম করে হাসে, সেটা বলবে বলেছিল। আচ্ছা, না জানলে কি খুব অসুবিধা হবে! না জেনে কি খুব অসুবিধা হচ্ছিল জীবনে! শুধু শুধু শান্ত মনকে উতলা করে লাভ কি! আমি ফোন করলাম না! ও’ও ফোন করে নি! আমি নৈহাটি লোকালে উঠে গেলাম। বেলঘরিয়ায় নামলাম।সেখান থেকে বাড়ি গেলাম। রাতের বেলা একটি টেক্সট এল : ফোন করলে না?
কি লিখব? লিখলাম :ব্যস্ত ছিলাম!
:ও! কখন ফিরলে?
ভাবলাম দেরি করে বলব! আমি মিথ্যা কথা খুব একটা বলিনা! বললে আটঘাট বেঁধে বলি। আমি ভাবলাম যদি ও কোনভাবে আমাকে শিয়ালদায় দেখে থাকে তাহলে তো কেলো! আমি তাই বললাম : না না! ৬ ০৫ এর টা তেই ফিরেছি! বাড়িতে একটু সমস্যা হয়েছিল!
সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ : সবাই ঠিক আছেন তো!
: হ্যাঁ… দুশ্চিন্তা করার মত কিছু হয়নি!
: কাল ফাঁকা আছ? কলেজস্ট্রীট যাবে?
: একটা ক্লাস আছে! বাঙ্ক করে দেবো’খোন! বাই দ্য ওয়ে, কি দরকার ওখানে!
: এমনিই যাব! সেদিন যেমন গেছিলাম!
:তুমি এমনি এমনি কলেজস্ট্রীট যাও? ( হুমমম… বেশ বেশ)
: হ্যাঁ… কলেজস্ট্রীট যেতে কারণ লাগে নাকি!
ওয়ে ওহে…) ঠিক ঠিক…. বেশ কটায় যাচ্ছি?
: ১২ টা! শিয়ালদা!
: ওকে…

২.
আমার তখন বেটা-মনমে-লাড্ডু-ফুটা অবস্থা! কিন্তু এত বাড়াবাড়ি করার কিন্তু কোন দরকার ছিল না! আসলে আমি মানুষটা এরমই। এর জন্যেই বাঁশ খাই! যাই হোক, বন্ধুই তো! এর থেকে বেশি আর কি!
পরেরদিন ১২টা ০৭। শিয়ালদা! আমি ১১ ৪৫ এর ডানকুনি লোকাল ধরে এসেছি। বেলঘরিয়া থেকে ট্রেনে উঠতে পারার মত শারীরিক বা মানসিক কোন বলই আমার নেই! অগত্যা, ডানকুনি লোকালই ভরসা! এসে ফোন করলাম। বলল, এই তো এক নম্বরের সামনে! গেলাম। বাওবা… হেব্বি ড্রেস দিয়েছে তো! গুঁজে জিন্সের ওপর একটা চেক শার্ট পরে এসেছে। চুল আঁচড়ানো। তেল দিয়েছে। আজকে বোধ হয় স্নানও করেছে!
“আজকে স্নান করেছ? ”
“এই তুমি আমায় দেখেই বুঝে গেলে? কি চোখ তোমার!”
“এত সেজে তুমি কোথায় যাচ্ছ বলোতো…!”
“কেন… কলেজস্ট্রীট! ”
“তার জন্য এত মাঞ্জা কেন?”
“কোথায় মাঞ্জা…! এই তো জাস্ট…”
“ভাল লাগছ!”
বাওবা, সে কি লজ্জা তার! বেচারার চোখ মুখ লাল হয়ে গিয়ে একাকার!
“আমি বলছি তাতেই এই… মেয়েরা যখন রাস্তায় সিটি মারবে, বা চোখ মারবে তখন কি করবে…”
“চলো চলো… দেরী হয়ে যাচ্ছে..”
আমরা হাঁটতে আরম্ভ করলাম। আমি সাধারণত একা এসে অভ্যস্ত তো! হনহন করে হাঁটি। এবারও তাই হাঁটছিলাম! ও বলল “আমরা কি একটু আস্তে হাঁটতে পারি! ”
ওহ… সরি! এক পা… দুই পা.. তিন পা!
“অতও আস্তে না… মানে মিডিয়াম!”
“আচ্ছা, তোমায় একটা কথা বলব? জাস্ট সাজেশন আর কি…”
“কি? ”
“তুমি কিন্তু জামাটা ছেড়ে পরতে পারতে, আরো স্মার্ট লাগত…”
“এরম?” বলে দাঁড়িয়েই জামাটা বার করে নিল!
“হ্যাঁ… ”
“এবার স্মার্ট লাগছে…?”
“আগেও লাগছিল… এখন আরো বেশি লাগছে…”
“তুমি মিথ্যা কথা বলো?”
“হঠাত?”
“মানে… বোঝার চেষ্টা করতাম তুমি আমাকে মিথ্যা বলে বারে তুলছ কি না!”
“আরে বাবা… সত্যি বলছি! মিথ্যা বলতে যাব কেন? ”
আমরা এম জি রোড পেড়িয়ে মাস্টারদা সুর্য সেন স্ট্রীট ধরলাম। সে নিজের মত এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে যাচ্ছে ভালোই। ভালো দিক হল এই, যেমন কথা বলে চুপ করেও থাকতে জানে! একদম চুপ করে থাকলেও যেমন বাজে লাগে, বেশি কথা বললেও আমার ভাল লাগে না! যদিও আমিই কথা বললাম আবার!
“তুমি যে বললে একদিন গান শোনাবে?”
“এমা..মনে করালে গীটারটা নিয়ে আসতাম..!”
“এমনি গলায় শুনিও..”
“আমার এমনি গলা খুব খারাপ কিন্তু… গীটার থাকলে চাপা পড়ে যায়! ”
“আমি তো সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ নই যে বসে বসে তোমার সুরে ভুল ধরব..”
“বাবা… তুমি খুব ঝগড়ুটে না?”
“কেন? আমি তোমার সাথে কখন ঝগড়া করলাম?”
” না যেমন চ্যাটাংচ্যাটাং করে বললে, তাতেই বুঝে নিলাম আর কী!”
“হ্যাঁ… ঝগড়ুটে! তো?”
“তো… কিছুই না! কি আবার…”
“তাহলে বললে কেন?”
কিছুক্ষণ কিছু একটা বলার জন্য ইতস্তত করছিল, তারপর বলল “ভুল হয়ে গেছে… চলো!” ভাল ছেলে। এই তো আমার কথা শুনে চলবে! গুড বয়!
আমরা হাঁটতে হাঁটতে বিদ্যাসাগর পার্কটার পাশে এসে পড়লাম। এর মাঝে আমরা আর কথা বলিনি। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকাচ্ছিল আড় চোখে… আমি তাকাই নি! মানে তাকিয়েছি, নয়ত জানব কি করে ও আমায় দেখছিল!
“এসে গেছে!” আমার মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল। আমি ইচ্ছা ক’রে বলিনি কিন্তু!
“হু… আমায় বললে?”
“না…”
“ও”
“কাকে বলব আর, তুমি ছাড়া কে আছ আমার সাথে?”
“ও…!” ছেলেপুলেদের ভয় পাওয়াতে আমার বেশ ভালোই লাগে!
আমরা কলেজস্ট্রীটে এসে পড়লাম। এবার? কোথায় যাব? কি করা হবে? কিছুই তো প্রি-প্ল্যান নেই! জিজ্ঞাসাও তো করছে না! আমিই শেষে বললাম “কোথায় যাবে প্রথমে?”
“তুমি যেখানে বলবে!”
“মানে তুমি কিছুই বলবে না?”
” না… তুমি তো আমার থেকে বেশি চেনো কলেজস্ট্রীট… তুমি নিয়ে চলো না, কোথাও!”
কলেজস্ট্রীটে এসে আবার কোথায় নিয়ে যাব! তাও রাশ যখন আমার হাতে দিয়েইছে…
“চলো তাহলে সুইমিং পার্ক টার ভিতরে গিয়ে বসি”
“চলো…”
যাওয়া হল। এখন জলে কেউ নেই। অতো সুন্দর জলকেলি প্রাঙ্গন যেন ধুধু করছে। ধুস…! আমরা বসার জায়গা গুলোতে বসলাম এসে। আরো দু’তিনজন বসে আছে। আসলে এই সময়টা বেশি কেউ আসেনা! বিকেলের দিক থেকে আসতে আরম্ভ করে!
“বলো…” আমিই আরম্ভ করলাম। চুপ করে তো আর বসে থাকা যায় না!
“কি বলবো?”
“গান শোনাও একটা…”
“গান? এখন?”
” তুমি কি পাঁজি দেখে গান গাও…?”
“তুমি কি আদতে এরম স্কুলের দিদিমণিদের মত কথা বলো?”
মানে? স্কুলের দিদিমণি? আমি হেসে ফেললাম।
“at last..”
“কি at last?”
” at last… হাসলে! আমি তো ভাবলাম আজ সারাদিন বকা খেয়েই কাটবে!”
আমি কি বলব! আমি চুপ করে রইলাম!
দেখি গুনগুন করে গান ধরেছে “হামে তুমসে প্যার কিতনা… ইয়ে হাম নেহি জানতে….”
“একটু জোরেই করো…”
“এর থেকে বেশি জোরে করলে, ঐ যে কুকুরটা ঘোমাচ্ছে দেখছ ও ওর বন্ধুবান্ধবদের ডেকে এনে ঝামেলা করবে…”
“করো না…”
“উফফফ… হামে তুমসে…” আমার কানের কাছে নিয়ে এসে গান ধরল। ভালোই গলা। আমি তো সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ না, একটু সুরে আর মন থেকে গাইলেই আমার ভাল লাগে!
শেষ হল!
“আরেকটা?”
“আবার?”
“হোক হোক…”
“উমমমম… কি গাওয়া যায়? ” অনেক ভেবে সে গান ধরল “অগর তুম পাস হো…”
আচ্ছা, ও কি আমাকে শোনানোর জন্য গাইছে! না… ও’ও আমার মত? না না… আমার খুব বাজে স্বভাব হয়ে যাচ্ছে দিনদিন সবাইকে নিজের মত ভাবা! কিন্তু ও সবাইকে ছেড়ে আমাকেই ওর সাথে আসতে বলল কেন? হয়ত আর কোন বন্ধু নেই? এটা কি পসিবল! না! এমনি বন্ধুও তো হতে পারি… হয়ত দুজনেরই কলেজস্ট্রীট ভাল লাগে তাই হয়ত আমাকে বলেছে ওর সাথে আসতে! আচ্ছা, তাও নয় মানা গেল, কিন্তু তা হলেও একজন এভাবে আমার বকাঝকা মেনে নেবে? বিনা প্রতিবাদে বা রাগ না করে! নাহ… জানতে হবে!
গানটা শেষ হতে আমি বললাম “বাবাহ… এত রোম্যান্টিক সব গান গাইছ… মন কি উড়ু উড়ু নাকি? ”
লজ্জা পায় খুব।
“বুঝেছি!”
” কি বুঝলে?”
” কাউকে পছন্দ হয়েছে নাকি! ”
আবার দেখি লজ্জা পেয়ে হাসে। ব্লাস করতে করতে বেচারা কানদুটো রক্তাভ হয়ে উঠেছে।
“কি নাম তার? তোমার কলেজেই পড়ে…?”
কোন উওর দিল না! মুখটা দেখে মনে হল একটু বিরক্ত।
“বেশ জিজ্ঞাসা করব না!”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। হঠাত আমাকে জিজ্ঞাসা করল “তোমার জীবনে কেউ নেই?”
আমি তাকালাম না ওর দিকে! “ছিল… এক তরফা!”
“তারপর?”
“এক তরফা প্রেমে যা হয়… অসমাপ্ত সমাপ্ত…!”
” তোমরা কি বন্ধু ছিলে?”
“বলতে পারো…”
“যাদবপুরের?”
“ফেসবুকের!”
“কি নাম?”
” নামটা থাক না…! ”
“আচ্ছা বেশ… তোমাদের দেখা হয়েছে নাকি প্রোফাইল পিক দেখেই প্রেম?”
“দুটোই! লাভ অ্যাট্ ফার্স্ট সাইট বোঝো! ও ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টে ওর ছবিটা দেখে আমার সেটাই হয়েছিল। ”
“তুমি এসবে বিশ্বাস করো?”
“তখন করতাম না! এখন পিছনে ঘুরে তাকালে… এখন মনে হয় সেটাই ছিল!”
“তুমি ওকে বলেছিলে?”
“হুম…”
“তারপর…!”
“তারপর আর কি… ওর গার্লফ্রেন্ড ছিল!”
“মানে মেয়েটি লেসবিয়ান?” ও খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
“আরে কোন মেয়েটা?”
“তুমি যাকে পছন্দ করতে!”
উফফ! আমার এত হাসি পেয়েছিল ব্যাপারটায়। আমি ভেবেছিলাম হাসব না, হেসেই ফেললাম।
“এতে হাসির কি হল? জাস্ট জানতে চাইলাম…!”
“আরে মেয়েটা লেসবিয়ান না… আমি গে!তো সেই ছেলেটির গার্লফ্রেন্ড ছিল…!”
এটা শোনার পর কিছুক্ষণের জন্য পজ! মনে হয় কি বলবে কি বলবে না খুঁজে পাচ্ছে না!
“ওরম করে দেখার কি আছে?” জিজ্ঞাসা করলাম!”আগে কখনও গে দেখোনি?”
” না.. সরি!”
” ফর হোয়াট?”
“না… ঠিকাছে! তারপর বলো”
“তারপর কি! আসতে আসতে আমাদের মধ্যে যে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা ছিল সেটাও হারিয়ে গেল… এখন আমরা জাস্ট একে ওপরের ফ্রেন্ড লিস্টে আছি… ও সরি! না নেই… আমি ওকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছিলাম!”
কিছুক্ষন চুপচাপ সামনের সুইমিং পুলের জলের দিলে তাকিয়ে রইল। আমি ভাবলাম ও কি আমার সাথে আনকম্ফর্টেবল ফিল করছে!
“আচ্ছা, তুমি কি আমার ওরিয়েন্টেশন জানার পর আমার সাথে এখানে বসতে আনকম্ফর্ট ফিল করছ? ”
” না তো… কেন?”
“না কিছু বলছ না…”
“এমনি…”
“এবার তোমার পালা!”
“কিসের? ”
“তুমি তোমার কথা বলো… পড়াশোনা, প্রেম… ভালবাসা… গান”
“আমার কথা কি বলব, বলেইতোছি ছাত্র হিসাবে ঐ আর কি! গানটা শিখছি ছোট থেকে! বাড়িতে একটা গানের পরিবেশ আছে বলতে পারো… জ্যঠু, কাকা… ছোট কাকিমা, পিসিরা সবাই গান করে…!” থেমে বলল ” আর গান হচ্ছে আমার লাইফ! গান ছাড়া আমি বাঁচবোই না! এই…”
“আর প্রেম?”
“প্রেমিক হিসাবে একদম ব্যর্থ বলতে পারো…! ”
“কাউকে ভালবাসতে বুঝি!”
দূরের দিকে দৃষ্টি রেখেই মাথা নাড়াল।
“তাহলে?”
“এই যে তোমার বয়স কত, একুশ? আমারো! তোমার জীবনে প্রেম এসেছে! পরিণতি পায়নি, সেটা মানলাম। কিন্তু এসেছে… তুমি ফিল করেছ সেটা… আমি পাইইনি! আমার জীবনে কেউ কখনও আসেনি। ”
“তোমারও কাউকে পছন্দ হয়নি?”
“হয়েছে… অনেককে হয়েছে!প্রচুর আছে এরম। ওর গলা ভাল, তো ও আঁকে বেশ, ও ভাল কথা বলে তো সে ভাল স্টাইলিশভাবে সিগারেট খায়… ছোট ছোট বিষয়ে ভাললাগা তৈরী হয়েছে… তবে প্রেম করার মত কাউকে পাই নি! যে শুধু আমার হবে… আর আমি তার… আর সত্যি কথা বলতে আমি আশা করিনা জানো কেউ আসবে! কে চাইবে আমার মত ছাপোষা একটা ছেলেকে? আমার মা বলে আমি বিশ্বের ক্যাবলা! বাবা বলত ছিটিয়াল।”
“বলত?”
“উনি এখন আর নেই আমাদের মধ্যে!”
“ও সরি…কিছু মনে কোরো না! আমি জানতাম না তো!”
“নাহ.. এতে মনে করার কি আছে!”
“তো কি বলছিলে!”
“হ্যাঁ… এই, ছোট থেকে শুনে বড় হয়ছি আমার মাথায় ক্যাড়া আছে…ওরা বলছে যখন নিশ্চই সামনের লোকটাও তাই ভাববে… ব্যস… কেল্লা ফতে! ক্যাবলা ছিটিয়াল ক্যাড়াওয়ালা বয়ফ্রেন্ড কে চায়…!”
ওকে…
থামল।আবার বলতে শুরু করল। “আমার কিছু বন্ধু, যাদের সাথে আমি কথা বলি আর কি… তারা তো আমাকে বাচালও বলে… আমি বাচাল বলো! আচ্ছা, মানছি আমি বেশি কথা বলি… তবে বিশ্বাস করো সবার সাথে কথা বলি না! বলতে পারিনা কি করব! গীটার বাজাই, কথা বলি না… কম্বিনেশনটা ভাব! কিছুজন ভাবে ঘ্যাম দেখাই! ঘ্যাম দেখিয়ে আমি কি করব… আর আমার ঘ্যাম নেইও… আমি জাস্ট কথা বলতে পারিনা! পারিনা তো পারিনা… এখন কি যেচে গিয়ে কথা বলতে হবে…আজব সব! ” যেন মনে হচ্ছিল ভেতরের মালমসলা সব আগ্নেয়গিরি ব্লাস্টের মত ফুঁড়ে ফুঁড়ে বেরচ্ছে!
থামল।
আমিও কিছু বললাম না!
কিছুক্ষন পর জিজ্ঞাসা করল “কিছু বলো!”
“দ্যাখো… গোরা! তোমার মা বাবা বাড়ির লোক তোমাকে ক্যাবলা ছিটিয়াল ইত্যাদি কেন বলে আমি জানি না… কিন্তু এটা বুঝতে পারছি তুমি এমন কিছু করো যা সাধারণ মানুষে করে না… তাই তুমি আলাদা! বিশ্বাস করো.. আলাদা হওয়া খারাপ না… ভাল! আর ম্যাটার করে না… তুমি ক্যাবলা কি স্মার্ট! আর জানো আদতে স্মার্ট কারা? স্মার্ট তারা নয় যারা ভাল ড্রেস করে হিরোদের মত, বডি রাখে, আরো প্রচুর কিছু করে… স্মার্ট তারাই যারা সেল্ফ-ডিপেন্ডেন্ড, অন্যের ওপর কোন কিছুতে নির্ভরশীল নয় সেরম একজন! দেখানোর তাড়া নেই তোমার..এগুলোই প্রমাণ করে তুমি আসলে স্মার্ট! আর এই স্মার্টনেসটা যদি ক্যাবলামো হয় আমি তোমার এই ক্যাবলোমকে লাইক করি… জেনুইনলি লাইক করি! সাপোর্টও!…”
ও হাঁ করে শুনছিল। আমি থেমে গেলাম, ও বলল “আর প্রেম নিয়ে কিছু বলো!”
“প্রেম নিয়ে কি! আচ্ছা,তুমি বললে তুমি ব্যর্থ প্রেমিক! ব্যর্থ প্রেমিক মানে কি? যে প্রেমের সম্পর্কে ব্যর্থ? নাকি যে প্রেম করতে… ভালবাসতে ব্যর্থ? তুমি যদি আজ আমাকে বলো ও তোমার প্রেম গ্রহণ করেনি, তাই তুমি ব্যর্থ প্রেমিক! আমি মানবোই না… কেন মানব? আমি ওকে ভালবেসেছি… একদম সাচ্চা ভালবাসা! আমি তো ভালবাসতে পারি তাহলে… আমি তো প্রেম করতে পারি… আমি ব্যর্থ প্রেমিক কেন হব?”।
“ঠিক..”
“আর প্রেম তোমার জীবনেও আসবে টেনশন কোরো না… দেরী হচ্ছে হয়ত! আসবে! আর লোকেদের ছোটখাটো সাফল্যগুলো যে তোমায় তাদের দিকে আকৃষ্ট করে… এটা খুব বড় গুন। সবাই পারে না এটা করতে… আমাদের একে ওপরের দোষ ধরতে বলো আমরা পারি… গুন ক’জন দেখতে পারে… তুমি পারো…”
এবার বেচারা খুব লজ্জা পেয়ে হাসল!
“আর রইল কথা বাঁচলামোর… তুমি ওদের, মানে যারা তোমায় বাচাল বলে,এর পরেরবার বললে বলবে জানিস তো আমি বাচাল নই, বাচন রসিক! কথা বলতে ভালবাসি… বুঝলে?”
“আরে.. ওয়াহ…দারুন তো! বাচন রসিক…!” সে শব্দটি শুনে খুব মজা পেয়েছে!
“আচ্ছা অনেক জ্ঞানের কথা হয়েছে… চলো কিছু খাই…” বললাম!
“চলো… কোথায় যাবে বলো?”
“কফিহাউস?”
“প্লিজ… কফি হাউসের কফি খাবো না!”
“আচ্ছা ওদের চাউমিনটা ভাল করে.. চলো ওটা খাবো.. তারপর ভাড়ে করে চা! বেরিয়ে!”
আমরা প্রথমে কফিহাউসেই গেলাম। বসলাম। অর্ডার দিলাম। এরপর অপেক্ষার পালা! আমি জিজ্ঞাসা করলাম “গোরা… কেমন লাগছে ঘুরতে!”
“দারুন…” ও প্রথম থেকেই আশেপাশে তাকাচ্ছে। আমি ভাবলাম হয়ত প্রথমবার এসেছে। তারপর মনে পড়ল, প্রথমবার হলে জানল কি করে যে কফি হাউসের কফি খুব বাজে!
“তুমি আগে কফি হাউস এসেছে?” তাও জিজ্ঞাসা করলাম।
“হ্যাঁ… একবার! একা একা… সবাই বলে কফিহাউস কফিহাউস… একদিন ভাবলাম যাই দেখে আসি কফিহাউসটা কি বস্তু… গানও শুনেছি! তুমি?”
“বহুবার! তবে প্রথমটা অনেকটা তোমার মতই। সব লেখকরা এখানে আড্ডা দিতেন একসময়… আমরা যারা সাহিত্যানুরাগী তাদের কাছে কফি হাউস একটা তীর্থ ক্ষেত্রই! ”
“বাহ… আমি অতশত বুঝি না! আমি মনে হলেই একা বেরিয়ে পড়ি!”
“তুমি ভালোই আছ… একা একা বেরিয়ে পড়ো…!”
“হ্যাঁ… জীবনে আমরা খালি বড় বড় অ্যাডভেঞ্চার করার কথা ভাবি… অথচ এই ছোট ছোট অ্যাডভভেঞ্চার করতে ভুলে যাই… জাস্ট ইগনোর করি… আমার এই গুলোই ভাল লাগে! ভালো লাগে… প্লাস সামর্থ্যের মধ্যেও। ”
“আচ্ছা… যেমন শুনি একটু…!”
“ধরো কলকাতার ফেমাস মিষ্টির দোকান কি কি আছে?”
“… কে সি দাস.. ”
“সেসব আছে… পুরনো মিষ্টির দোকান?”
পুরনো মিষ্টির দোকান? আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম না…
” নাগ মিষ্টান্ন ভান্ডার, সেন মহাশয় যার প্রশংসা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন, নকুর চন্দ্র মল্লিক আর কি একটা ঘোষ বেশ… এই যে এই দোকান গুলো… চেনো?”
“নকুরটা চিনি!”
“আর দুটো চেনো না! আমি চিনি! আমি পকেটমানি জমিয়ে মিষ্টিও খেয়ে এসেছি পেট ভরে…”
” তারপর ধরো… একটা অচেনা রাস্তায় নেমে যাওয়া… তারপর উত্তর কলকাতার অলিগলির মধ্যে দিয়ে হাঁটা! দারুন ফিলিংক্স… কতক্ষণ লাগে বলো! কিন্তু একটা অ্যাডভেঞ্চার… আমি কত পুরনো চপের দোকান খুঁজে পেয়েছি! দারুন সব আইটেম… পুরোনো চায়ের দোকান… দোকানের গায়ে লেখাও এত খ্রীস্টাব্দ থেকে…এগুলো আমার কাছে দারুন আনন্দের… ”
আমি হাঁ করে শুনছিলাম। আমার তো শুনতে শুনতেই গায়ে কাটা দিচ্ছে…
“আমাকে একদিন নিয়ে যাবে?.” আমি আর উত্তেজনা চেপে রাখতে না পেরে বলেই দিলাম।
সে খুব লাজুক হেসে বলল ” যাব… “।
আমি তো তখনই এক্সাইটমেন্টে লাফাচ্ছি…
“তুমি মজা পেয়েছ না শুনে?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“বিশ্বাস করো… দারুন মজা হয়… আর সবচেয়ে বড় কথা, এক ঘেয়েমি থাকে না… লাইফ বোরিং হয়ে যাচ্ছে… তুমি ইন্টারেস্টিং বানিয়ে নাও…”
“কে তোমাকে ক্যাবলা আর আনরোম্যান্টক বলে! তারা তো তোমার এই দিকের কথা জানে না…”
প্রশংসা! হাসি। লজ্জা!
ওর ধারাবাহিতা লঙ্ঘন না করেই উনি হাসলেন! লজ্জা পেয়ে!
“বলছ আমি রোম্যান্টিক? ”
“অবশ্যই… শোনো রোম্যান্টিকতা তো শুধু প্রেমের ক্ষেত্রেই হয় না… এগুলোতেও হয়! বুঝলে…” আমাদের চাউমিন চলে এল।
কফিহাউসে আসতে ভাল লাগলে কি হবে… প্রচন্ড গরম। ভ্যাপসা টাইপ আবহাওয়া! আর বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়াতে তো পুরোটাই প্রায় একটা গ্যাসের গ্লোব হয়ে রয়েছে! কিছুদিন আগেই ফেসবুকে একটা ছবি দেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম হয়ত আগুন লেগেছে! নাহ… কফিহাউস থেকে ধোঁয়া বেরচ্ছে গল গল করে। বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া.. ভাবা যায়?
আমরা চাউমিন খেয়ে বেরলাম কফিহাউস থেকে। ভেতরে এত গরম যে বাইরে আসতে মনে হল যেন এ.সি ঘরে ঢুকলাম।
“এবার কি চা খাবে?” জিজ্ঞাসা করল।
“একটু পরে খাচ্ছি… কি গরম ভেতরে!”
“চলো তাহলে পার্কে গিয়ে বসি…!”
“চলো…”
আমরা আবার পার্কে গিয়ে বসলাম। ঘড়িতে তিনটে। বেশ ভিড় জমে উঠেছে! আমরা আগে যেখানে বসেছিলাম সেখানটা এখনও ফাঁকাই। আমরা সেখানে গিয়েই বসলাম।
এবার অনেকক্ষণ আমাদের মধ্যে আর কোন কথা নেই! এতক্ষণ এত কথা হয়েছে, সব কথা যেন কানে বাজছে! এত কথার ভিড়েও আমার অস্বস্তি হয়। তখন নিভৃত কোন খোঁজে মন। যেখানে শুধু আমি, আমার চিন্তারা, আমার কথারা। বলা কথা, না বলা কথা, শোনা কথা, ইম্যাজিনারি কথা… সব যেখানে কেমন যেন শান্তি রাগে গান ধরে! নিঃশব্দে ঝগড়া করে। মারামারি করে। খুঁনশুটি করে…! ভালোবাসে…..
সেদিন ও যখন দমদমে নেমে গেল তখন কেমন একটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। কেমন যেন, যেন কিছু শেষ হয়ে গেল বা যেন এতদিন একটা জিনিষ এক জায়গায় ছিল, হঠাত করে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর তাকে কেন্দ্র করে ধুলোর আস্তরণ রেখা যেমন তার অনুপস্থিতির কথা মনে করায়, অনেকটা সেরম। অথচ আমরা তো মোটে ৬ ঘন্টা এক সাথে ছিলাম। নামার আগে বলল… ” শঙ্খদীপ…?”
” হুম! ” আমাদের নিঃশব্দ কথোপকথন যেন এখানে এসে শেষ হল। কারণ এর আগে মাঝে একটাই কথা হয়েছে “ওঠা যাক?” আমি ঘাড় নেড়েছিলাম। ঐটুকুই! তারপর আবার এইবার!
“আমার কিছু বলার আছে… ”
“বলো…”
“না… এখন না! আর এভাবে না! কাল বিকেলে স্টেশনে একবার দেখা করবে?”
“শিয়ালদহ?”
” হ্যাঁ… আমি চারের-এ প্ল্যাটফর্মের মুখটায় থাকব!”
“আচ্ছা!”
ও নেমে গেল!

৩.
কি বলতে পারে সে সম্মন্ধে যে আমি ভাবিনি তা না! ভেবেছি। সত্যি বলতে আমার নতুন করে কোন উত্তেজনা তৈরি হয়নি। আমার মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব জিনিষ হয়। এমন এমন জিনিষে উত্তেজনা হয় যেগুলোর কোন ভিত্তি নেই, আর যেগুলো নিয়ে উত্তেজনা হওয়ার কথা, যেমন এই গোরা আমায় কি বলতে চায়, তা নিয়ে কোন উত্তেজনা হয় না! আমি জানি হওয়ার কথা! কারণ এরম সিচুয়েশনে আগে আমার উত্তেজনা হয়েছে। অথচ এখন মনে মনে ভাবছি উত্তেজনা হ উত্তেজনা হ… তাও কিছুই হচ্ছে না!
পরেরদিন আমি চারের-এ প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখি দাঁড়িয়ে আছে! আজকে আবার সেই ভোম্বল সিং পোশাক, যেটায় ওকে বেশি মানায়।
“এটাই আসল তুমি! ”
“কোনটা?”
“এই আলুথালু চুল… ইনফরম্যাল ড্রেস…”
“তোমার এরম পছন্দ?”
“হ্যাঁ… ”
বেচারা খুব লজ্জা পেয়ে হাসল।
“যাই হোক… বলো কি বলবে!”
“না বলব না!”
“কাল বললে যে…!”
“হ্যাঁ… বলার আছে! কিন্তু আমি সামনাসামনি তোমাকে সেই কথাগুলো বলতে পারব না!”
“তাহলে?”
হঠাত দেখি ও কাঁধ থেকে ব্যাগটা থেকে সামনে এনে, চেন খুলে, কি একটা বার করছে। একটা কাগজ বার করল। চারচৌকো করে মোড়া।
“এ নাও…”
“প্রেমপত্র?”
“পড়ে নিও…”
আমি খুলতে যাচ্ছিলাম, বলল “না এখন না! বাড়ি গিয়ে দেখো!”
“বেশ…” আমি ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। “তুমি কি নৈহাটি তে যাবে?”
“না… আমার এখানে একটা কাজ আছে! তুমি চলে যাও… ”
“আচ্ছা…”
বাড়ি এলাম। সত্যিই বলতে আমার চিঠির কথা মনেই ছিল না। মাঝ রাস্তায় স্বরুপ ফোন করল। ওর সাথে কথা বলতে বলতে কিছু নতুন কাজ পরে গেল। ব্যস… চিঠির কথা ভুলে গুলে খেয়ে ফেললাম!
পরেরদিন ইউনিভ যাচ্ছি, ট্রেনে যথারীতি ভীষণ ভীড়। দাঁড়ানো যাচ্ছে না! তাও আমি ডানকুনি লোকালে যাই বলে উঠতে পারি। বেলঘরিয়া দিয়ে ওঠাও যায় না! যাই হোক… দমদম আসতে কিছুটা ফাঁকা হল, বিধাননগর আসতে বসার জায়গা পেলাম।আগেরদিন রাত্রিবেলা কাজ করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেছিল। স্নান করে বসার জায়গা পেতে চোখ একদম ঢুলে এল। কখন ঘুমিয়ে পড়লাম। উঠে দেখি শিয়ালদাহ। কেউ ডাকেও নি। সারা কামরা ফাঁকা। কি অসভ্যরে বাবা! ডাকেও না! কিন্তু সত্যি বলতে আমার এত ঘুম পাচ্ছে! আমি উঠতে যাব, দেখি কিছু লোক উঠছে।
“কি ট্রেন দিয়েছে কাকু?” জিজ্ঞাসা করলাম।
“শান্তিপুর! ”
“গ্যালপ? ”
” না না.. অল স্টেশন! ”
কি মনে হতে আবার বসে পড়লাম। বেলঘরিয়ায় নেমে বাড়ি চলে যাব! আজ একটু ঘুমানো দরকার। ব্যস… চলে এলাম বাড়ি। মা জিজ্ঞাসা করল “কি রে ফিরে এলি?”
বললাম “শরীরটা ভাল লাগছে না… মাথাটা ধরেছে…!” মাকে বলে এলাম খাব না! খেয়েই বেরিয়েছিলাম তো!
শুয়ে পড়লাম ঘরে এসে। ঘুমিয়ে পড়লাম। আসলে ঘুমাতে আমি এতই ভালোবাসি যে আমাকে যখনই ঘুমাতে দেওয়া হোক না কেন আমি ঘুমিয়ে পড়ব। হঠাত দেখি ফোন বাজছে। তখন কতক্ষণ ঘুম হয়েছে জানি না! ফোনটা ধরলাম।
“কিছু জানালে না?”
“কে?”
“তুমি ঘোমাচ্ছ? শরীর খারাপ নাকি!”
” না না…কাল ঘুম হয়নি!”
“ও… পড়েছিলে?”
“কি?”
“চিঠিটা!”
ও… হ্যাঁ চিঠি দিয়েছিল না!
“না গো… পড়ে জানাব! এখন রাখছি…”
বিকেলে উঠে একটু ঝরঝরে লাগছে! চা খেলাম মা’র সাথে। মা দিদি নাম্বার ওয়ান দেখছিল। আমি দেখতে দেখতে চটপট উত্তর দিলাম। তারপর ঘরে এসে পড়তে বসলাম।
তখন প্রায় আটটা! মেসেজ ঢুকল।
:পড়লে?
উফফ… সত্যিই! বেচারা কাল চিঠিটা দিয়েছিল।এখনও পড়া হয়নি। আমি ভাবলাম এখন আর রিপ্লাই করব না, একেবারে পড়েই করব! আমি ব্যাগ হাতড়ে চিঠিটা বার করলাম। চিঠিটা খুলতেই যেটা চোখে পরে তা হল হাতের লেখা! মানে
… এটা গোরার হাতের লেখা! OMG….
সুন্দর হাতের লেখায় ওপরে লেখা : “শঙ্খদীপ!”
হাতের লেখা দেখতে ভাল লাগাটা ফেটিস কি না জানি না! যদি হয়, তাহলে আমার সুন্দর হাতের লেখায় ফেটিস আছে!

” শঙ্খদীপ,
আগে পরীক্ষা বাদে কোথাও কখনও কাউকেই চিঠি লিখিনি। তুমিই প্রথম। তখন বই পড়ে শিখেছিলাম কি করে চিঠি লিখতে হয়। আজ চিঠি লিখতে বসে দেখছি সেইসব পূর্বজ্ঞান কোন কাজেই লাগছে না! তাই বুঝতে পারছি না কি করে শুরু করতে হয়… কি লিখব প্রথমে, তাই শুধু নামই লিখেছি। তোমাকে কাল ট্রেনে বললাম কিছু কথা বলার আছে, সেইগুলো বলব বলেই লিখছি। জানিনা কতদূর লিখে উঠতে পারব, তাও শুরু করলাম।
কাল দ্বিতীয়বার যখন পার্কে এসে বসলাম, তুমি আর কথা বলছিলে না! আমিও বিরক্ত করিনি। আমার তখন অনেক কথা বলতে ইচ্ছা করছিল। অনেক। কিন্তু বলতে পারছিলাম না। আমার একবার মনে হয়েছিল যে তুমি আমার মনের অবস্থাটা বুঝেই হয়ত চুপ করে গেছ যেন আমি কথা বলি! আমিও বললাম না, কিন্তু বিশ্বাস করো, ঐ নৈঃশব্দিক সময়ে আমি তোমার সাথে সবথেকে বেশি কথা বলেছি। তুমি কি টের পেয়েছিলে?
কাল তোমার দুটো রুপ দেখেছি। একটা বকে ঝ’কে নিজেকে শক্তিশালী প্রমাণের চেষ্টা করে, আরেকটা একদমই উলটো। কোন কথা বলে না! চুপচাপ। এত চুপচাপ থাকো কি করে? আমাদের পাশের সবাই কত কথা বলছিল। সামনের পুকুরেও কত হইচই.. অথচ তুমি চুপ। যেন রেগে মেগে বাড়ির বৌরা ঘরের দ্বোর দিয়েছে। আর বেরচ্ছে না! বেরলে না কেন! কতকিছু বলার ছিল।
অবশ্য না বেরিয়ে ভালই করেছ, সেগুলো তখনই তোমার সামনে বলার সাহস আমার ছিল না। যাই হোক, না ভেজিয়ে কাজের কথায় আসি। তুমি কাল কত অকপটে স্বীকার করলে তুমি সমকামী! তোমার একটি ছেলেকে পছন্দ ছিল। সে তোমার প্রেমে সারা দেয়নি। প্রেমিক হিসাবে তোমার মত দৃঢ় আমি কাউকে দেখিনি। আমাকে প্রেম বোঝাতে গিয়ে যখন বলছিলে যে তুমি ব্যর্থ প্রেমিক নও, কারণ তুমি মন দিয়ে ভালবাসতে পারো, মনে হচ্ছিল পৃথিবীর কোন যুক্তি নেই যা তা কাটতে পারে! সেখান থেকে আমি খুব জোর পেয়েছি জানো! তাই একটা কথা বলার সাহস পেয়েছি। আমারো ছেলেদের ভাল লাগে! তবে সমকামী কি না জোর দিয়ে বলতে পারছি না! আমার পাড়ায় একটা ছেলে ছিল। দাদা বলা যায়। আমার থেকে বড়। ও একটু মেয়েলি ছিল। আমাকে ডেকে দু’তিনবার বাজে ইশারাও করেছে। ওকে পাড়ায় সবাই “হোমো” বলে। আমি তো ওরম না! আমি ভাবতাম আমি তো তাহলে হোমো নই। কাল তোমায় দেখলাম। তুমি কিছুটা আমার মতই। তুমি বললে তুমি গে। এবার আমার মনে হচ্ছে আমিও গে!
কাল তোমায় বললাম আমার কাউকে পছন্দ হওয়ার ধরণ। সত্যি কথা বলব, তোমার আলাদা করে কোন কিছু আমায় তেমন আকর্ষণ করেনি। কিন্তু তোমার সাথে কাটানো কালকের যতটা সময়, সেটা আমার এই ২২ বছরে কাটানো বেস্ট সময়। কাল তোমার সাথে কথা বলতে ভাল লেগেছে। ভাল লেগেছে তুমি যখন চুপ করে ছিলে তখন। যখন দমদমে নেমে গেলাম, তখন অনুপস্থিতি আমায় বারবার মনে করিয়েছে এতক্ষণ তুমি আমার সাথে ছিলে। তোমার সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তোমায় আমি ভীষণ ভীষণ মিস করেছি। ভীষণ … তোমার কিছুই আলাদা করে ভাল লাগেনি কারণ হয়ত তোমাকে সম্পূর্ণ ভাবে আমার ভাল লেগেছে।
আমি জানিনা তোমার জীবনে এখন কেউ আছে কি না! মনে কেউ আছে কি না… ঐ ছেলেটি হয়ত আছে। কারণ তুমি কাল ওর কথা বলার সময় তো নিজের মুখটা দেখতে পাচ্ছিলে না, যদি দেখতে। উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। আর আবার যখন বলছিলে তুমি ওকে সাচ্চা ভালবেসেছ তখনো… এতদিন লোকমুখে শুনেছি ভিতরের দ্যুতি! কাল দেখলাম। অবাক হয়ে ভাবলাম সিনেমায় যেরকম দেখায় যে হলুদ লাইট রিফ্লেক্ট হয়, আমি এতদিন নিজেত দ্যুতি মানে তাই ভাবতাম, হয়ত ওরম হলুদ আলো বেরয়। কাল দেখলাম আলো টালো বেরয় না… কিন্তু তাও যেন কিসের একটা আভা দেখা যায়। তোমার মনে এখনও হয়ত ও আছে! আচ্ছা সেখানে কি আমাকে একটু জায়গা দেওয়া যায়?
অনেককে বলতে শুনেছি ভালবাসা হতে সময় লাগে। কিন্তু সেই সময়টার কোন টাইম লিমিট আছে, মানে সর্বনিম্ন এত থেকে সর্বোচ্চ এত? তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছে দু সপ্তাহ প্রায় অতিক্রান্ত প্রায়। আমরা তাহলে সর্বনিম্ন সীমাটা অতিক্রম করে গেছি। এবার তো বলতেই পারি।
শঙ্খদীপ, আমি তোমায় ভালবেসে ফেলেছি কি না জানি না, তবে নিজের মধ্যে একটা সাহস অনুভব করছি। মনে হচ্ছে বাসতে পারব।
তবে তোমার ওপর কোন চাপ নেই। তুমি যদি সেরকম কিছু না ভেবে থাকো, আর যদি ভাবতেও না চাও, তাহলে জাস্ট জানিয়ে দিও।
এটুকুই… উত্তরের আশায় রইলাম!

ইতি
গোরা”

চিঠিটা পড়ে আমার কি বলা উচিৎ আমি বুঝতে পারছিলাম না! এত সুন্দর করে চিঠি লিখলে “হ্যাঁ” উত্তর দেওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা আমাকে না লিখলে! অন্য কাউকে লিখলে। একই চিঠি আমাকে লিখলে অনেকগুলো প্রশ্ন দানা বাঁধে। সত্যি কথা বলছে কি না! একটু তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে কি না! কতদিনই বা চিনি…
আমার ওর মেসেজের রিপ্লাই দেওয়া হয়নি। ও রাতের দিকে আরেকটা মেসেজ করল : দেখো… তোমার উত্তর যাই হোক না কেন আমাকে জানিও!
আমার কি বলা উচিৎ আমি তখনও জানিনা! আরেকটু সময় পাওয়া যাবে বলে আমি লিখলাম : তুমি যখন চিঠিতে লিখেছ… আমিও চিঠিতে লিখে জানাই?
:আচ্ছা! কবে দেবে?
: জানাব। লিখে নি!
বলে তো দিলাম। কিন্তু লিখবটা কি! কবের মধ্যেই বা দেব! সময় নিচ্ছি বলে তো আজন্মকাল সময় নেওয়া যায় না! অবশ্য ভাবনার আছেটাই বা কি! হ্যাঁ হলে হ্যাঁ… না হলে না! কিন্তু হ্যাঁ-না প্রশ্নই তো বেশি কঠিন! মাঝবরাবর থাকার অবকাশ নেই! লিখতে বসলাম…

“প্রিয় গোরা,

তুমি “প্রিয়” টা দাও নি। আমি দিলাম কারণ তুমি আমার প্রিয়। তোমায় আমার ভাল লেগেছে। তোমার পত্রের সাপেক্ষে উত্তর লিখছি তো, তাই প্রথমেই বলি, তোমার হাতের লেখাটি বেশ! এই হাতের লেখায় চিঠি পড়তে ভাল লেগেছে… ভাল লাগবে! আজ যদি “হ্যাঁ” বলি জানবে সেটার অনেকটা তোমার হাতের লেখার কৃতিত্ব! দ্বিতীয়ত, চিঠি লিখতে পারি না বলে যে চিঠিখানা দিয়েছ, তা অপূর্ব…”

যাক শুরু টা করা গেছে! থাক… উত্তর পরে লিখব! বলে কাগজটা ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রাখলাম খাতার ভিতর! পরেরদিন ক্লাস ছিল। ঘুমিয়ে পরলাম তাড়াতাড়ি। একদিন ল্যাদ খেলে মনে হয় পরেরদিনও খাই! অতএব, পরেরদিনও গরিমসি করে গেলাম না! শরীর যেন ছেড়ে দিয়েছে! আর বাইরে যা রোদ.. দেখে আর বেরতে ইচ্ছা করে না! বিকেলের দিকে ছাদে পায়চারি করছি। পশ্চিমদিকে অর্ধসিদ্ধ কুসুমরঙা সুর্য অস্ত যাচ্ছে! আকাশে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ চামচিকে উড়তে আরম্ভ করেছে! সন্ধ্যে হলে কোথা থেকে সব টিকটিকি চলে আসে ছাদে.. চারিদিক থেকে! কে জানে! ফোনটা তখনই এল।
“কোথায়?”
“ছাদে…!”
“ও আজ বেরোও নি? ”
“না…”
“আচ্ছা… কি করলে সারাদিন..”
“তোমার চিঠিটা হাফ লেখা হয়েছে!”
“হাফ কেন? ”
” কি উত্তর দেব বুঝতে পারছি না!”
“দেখো… তোমার ওপর কোন জোর নেই! তোমার যা মনে হয় সেটাই দিও!”
“হুম…”
সত্যিই তো! এত চাপ নেওয়ার আছে টা কি! নাকি আমি রিলেশনটা চাই, কিন্তু লাস্ট করবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দিহান! আমি অনেক ভাবলাম, কিছুই পেলাম না! শেষে প্ল্যান এল। চিঠিটা লিখতে থাকি! লিখতে লিখতে যা আসবে তাই উত্তর!

“অনেক ভেবে আবার, ব্রেকের পর আবার লিখতে বসলাম। সত্যি বলতে তোমার আমাকে ভাল লেগেছে এটা যেমন সত্য, তেমনই সত্য তুমি আমাকে সম্পূর্ণ চেনো না! আমার চরিত্র.. আমার মেজাজ… আমার ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ কিছুই তো তুমি জানো না! সম্পর্কে এসে যদি দেখো, তুমি আমাকে যেমনটা ভেবেছিলে তার থেকে কিছুটা বা সম্পূর্ণ আলাদা… তখন কি করবে! ব্রেকাপ? ব্রেকাপের ভবিতব্য জেনে রিলেশনে যাওয়া কি উচিত হবে? হবে না বোধ হয়….
এর মানে এই নয় যে তোমাকে আমার পছন্দ না! তোমার ভালভাসার ব্যাপারে সন্দেহ আমি করছি না! কিন্তু আমার সন্দেহ আমাকে নিয়ে! এখনও আমি সেই পর্যায়ে আসিনি যেখানে আলাদা করে বুঝতে পারব যে তোমার প্রতি ভাললাগাটা বাস্তব নাকি ক্ষণিকের মোহ।
সেদিন তোমার সাথে থেকে এটুকু আমি বুঝেছি তুমি অন্যকে বোঝো! বোঝার চেষ্টা করো! নিজের ভাললাগাগুলো অন্যের ওপরে চাপিয়ে দাও না! আমি খুশি… খুব খুশি! আমি খুব কম লোকের সাথেই আলাদা করে দেখা করতে যাই! তুমি তাদের অন্যতম। বলাই বাহুল্য, তোমার সাথে আমি এত মুক্ত হয়ে থেকেছি, যে বারবার মন চাইছে লিখে দি… হ্যাঁ! কিন্তু এই উত্তেজনায় ভেসে গিয়ে আমি তোমাকে পরে কষ্ট দিতে চাই না! নিজেও পেতে চাই না!
তাই আমার মনে হয় আমাদের আরো সময় নেওয়া দরকার! যে অনুভূতিটা তৈরী হয়েছে তাকে সুস্থ ভাবে প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া দরকার! আর এই অনুভূতিটা সত্যি হলে, একে ওপরের জন্য তো আছি!
ইতি
শঙ্খদীপ।”

***

“দেখো… হ্যাঁ বললে কিন্তু প্রতিদিন চিঠি লিখব! ”
“আচ্ছা?”
“সত্যিই…”
“প্রতিদিন চিঠিতে কি লিখবে!”
“কিছু না পেলে হাতের লেখা প্র্যাক্টিস করে পাঠাব..”
“সেই সেই…”
” আচ্ছা, তুমি হ্যাঁ বললে তোমাকে আমি কথা বলাব না… তুমি চুপ করে থাকবে!”
“মানেটা কি? তুমি কি আমার লেগপুল করছ!”
“ভুস… সে সাহস আছে নাকি!”
“দেখাই যাচ্ছে… ”
” এখনও তো কিছুই দেখোনি..! ”
“আচ্ছা… দর্শনীয় অনেক কিছু আছে বুঝি! ”
“হ্যাঁ… আছেই তো!”
“আচ্ছা.. তাহলে তো একদিন দেখতে যেতে হয়…!”
“তারজন্যে আগে “হ্যাঁ” নামক টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয়…”
“হুম… বেশি বুদ্ধি না!”
“তোমার থেকে কম…”
“আর তেল দিতে হবে না!”
“ওটা যতক্ষণ না “হ্যাঁ” বলছ ততক্ষণ! পরে আর দেবো না!”
“কি সৎ ছেলে…”
“তাহলে? এরকম সৎ ছেলে আর পাবে!”
” সেই সেই… আমার পিছনে ছেলের লাইন আছে!”
“সেই লাইনেত সবার সামনে তো আমি… আমাকে টপকে যেতে পারবে?”
“পারব না বলছ?”
“চেষ্টা করে দেখো… ”

_____সমাপ্ত_______


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.