এই সুরে কাছে দূরে

মেঘ রাজ সাইমুন

১।
“এতো রাতে ফুচকা?”বলে ছেলেটা অবাক হয়ে রইল।সে জানে ওপাশের কেউ একজনের মাথায় পাগলামি ঢুকেছে।
-রাত বেশি না,সবে একটা বাজে।
-তোর মাথা ঠিক আছে,বিচ্ছু?
-আসেন না।প্লিজ!আপনি ছাড়া কে আসবে বলেন?
-তোর বয়ফ্রেন্ডকে বল?
-আমি ওসব কিচ্ছু জানি না।আপনি আসছেন মানে আসছেন!আমি ফোন রেখে বের হলাম কিন্তু!
-ইশ!জবরদস্তি নাকি?
-হ্যা!জবরদস্তি।
-আমি পারবো না।এবং তুইও বের হবি না।
-ওকে আপনি আসবেন না তো!আমি একাই বের হলাম।
-তুই যা জ্বালাস না!অসহ্য।ওকে আসছি।
এই শীতের রাতে রাস্তায় বেরিয়ে কাঁপতে লাগলো অয়ন।ঢাকা শহরে অবশ্য কাঁপার মত শীত এখনো পড়ে নি।তবুও তার শীত লাগছে।বোধয় জ্বর আসছে।কিন্তু বিচ্ছুটার পাগলামির সঙ্গ না দিতে পারলে ক্ষেপে যাবে।দেখা যাবে দু’তিন দিন কথাই বলছে না।অয়ন এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু দেখতে না পেয়ে জিন্সের পকেটে দু’হাত ভরে হাটা শুরু করলো।শাহবাগ হেটে যেতে মিনিট দশেক লাগবে।যেয়ে হয়তো দেখবে বিচ্ছুটা পাগল করা হাসি নিয়ে,আকাশ দুটি চোখে পথপানে তাকিয়ে খুন করার মতলবে আছে।না হয় শীতে দাড়িয়ে কাঁপছে।
ফুচকাওয়ালা ছেলেটা বশির।মার্জিত,রুচিশীল।অভাবের দায় কাঁধে পড়াটা বেশি দুর এগোয় নি।দিনে ভার্সিটি চত্বরে এবং অনেক রাত অবধি এই মোড়ে ফুচকা বিক্রি করে।অয়ন সবদিক দেখে বশিরকে বলল,”বশির!আমার বিচ্ছুটাকে দেখছিস?”
-কে?তোরঙ্গ?
-হ্যা।
-না তো।আসে নি।অয়ন ভাই আপনি বসেন,তোরঙ্গ চলে আসবে।
অয়ন এদিকওদিক দেখে একটা চেয়ার টেনে তাতে উল্টাভাবে বসে পড়লো।কোথা থেকে তোরঙ্গ এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো।অয়ন বিরক্তিভাব নিয়ে বলল,”ছাড় তো।তুই জানিস কাল আমার অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে?না করলে দিবো কিভাবে বল?”
তোরঙ্গ সেভাবে জড়িয়ে ধরে বলল,
-ওকে!আমাকে এনে দিন আমি করে দিবো।
অয়ন পিছন থেকে তোরঙ্গকে টেনে সামনে দাড় করিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,
-তুই পারলে তোকে দিয়েই করাতাম বিচ্ছু!তুই বস আমি ফুচকা আনছি।
উঠতে উঠতে বলল,”বশির!দে তো ওর স্পেশাল আইটেম ফুচকা।”
“ধর তোর বেশি ঝাল টকের ফুচকা।”বলে অয়ন প্লেট টা তোরঙ্গের মুখের সামনে ধরল।তোরঙ্গ মোবাইলের আলো হতে মুখ তুলে উপরে অয়নের মুখের দিকে তাকাল।তারপর হা করে বলল,”খাইয়ে দিন।”
অয়ন তোরঙ্গের হাতটা ধরে তাতে প্লেট টা দিয়ে বলল,”ঠেকা পড়ছে আমার।বহুত জ্বালাইছোস!এবার মাফ কর।নিজে খা।আমার ভালো লাগছে না।”
তোরঙ্গ অয়নের হাতটা ধরে বলল,”নিচু হন তো।”
-কেন?
-হন না!
অয়ন নিচু হলে তোরঙ্গ তার কপালে হাত দিয়ে বলল,”শরীর ঠিক আছে তো?গাঁ তো গরম!”
-ধুর বাদ দে।ও কিছু না।
-আপনি বললেই হলো?ফেরার পথে নাপা কিনে ফিরবেন।
অয়ন তোরঙ্গের চুল টান দিয়ে বলল,”তুই খাবি বিচ্ছু?আমি ফিরবো তো।”
তোরঙ্গ একটা ফুচকা নিয়ে অয়নের মুখের সামনে ধরল।অয়ন মৃদু হেসে বলল,”ঐ বশির আমি ফুচকা খাই?”
বশির হাসতে হাসতে বলল,”তোরঙ্গ তুমি জানো না অয়ন ভাই ফুকচাকে কি খাবার বলে?”
-তুমি চুপ থাকো তো বশির ভাই।তোমার অয়ন ভাই বলল ওমনি ফুচকা মেয়েদের খাবার হয়ে গেল?
অয়ন চোখ স্থির রেখে তোরঙ্গের মুখের দিকে তার হাতটা নিয়ে বলল,”তাহলে তোর ফুচকা তুই ই খা।”
-খাবো তো।
ফুচকা খাওয়া শেষে তোরঙ্গ বলল,”আমি যাবো আপনার মেসে?”
-পাগল?তোকে দেখলে মামুন ক্ষেপে যাবে।যা বকবক পারিস!ও তো কুম্ভকর্ণ।ওর ঘুমের বারোটা বাজালে তোকে কিছু না বলে আমাকে গলা টিপে মারবে।
“কি?আমি বকবক করি?ওকে যাব না।”বলে হাটা শুরু করল।অয়ন পিছন থেকে ডেকে বলল,
-ঐ বিচ্ছু!অন্তত ফুচকার টাকাটা দিয়ে যা।
-আমি পারবো না।আপনি দিন।
-আমার কাছে টাকা নেই।
-ওসব জানি না।ভিক্ষা করতে বসে যান।
কথা টা শুনে অয়ন,বশির দুজনেই হাসতে লাগল।তোরঙ্গ কিছু দুর যেয়ে ঘুরে দাড়িয়ে বলল,”ওয়ালেট ফেলে আসছি ওটা থেকে দিন।আর ওষুধ নিয়ে যান।”
তোরঙ্গ ইচ্ছা করেই ওয়ালেট ফেলে এসেছে।সে জানে অয়নের তিন মাসের মেস ভাড়া বাকি।কিন্তু বললেই সে টাকা নিবে না।আর এগুলো বলাও যায় না।অয়নের প্রচুর আত্মসম্মান বোধ।শেষে বন্ধুত্বটা হারাবে তোরঙ্গ।সে জানে দায়ে পড়ে অয়ন ওগুলো খরচ করবে।পরে কাঁচুমাচু হয়ে বলবে,”টিউশনির টাকা পেলে দিয়ে দিবো।”তখন একগাল হেসে তোরঙ্গ বলবে,”সে টি হবে না।আমার সুদে-আসলে ফেরত চাই।আপনি চাকরি পেলে প্রতি মাসের অর্ধেক বেতন আমার।”অয়ন তোরঙ্গের নাকে আলতো আঘাত করে বলবে,”ওকে যা তুই পুরোটাই নিস।”
এসব ভেবে হাটতে হাটতে তোরঙ্গের কানে এলো কোনটা একটা পরিচিত গানের কথাগুলো ঠোঁটের অকৃত্রিম ভালো লাগা সুরের কৌশলে কে চেনো শিস বাজিয়ে চলেছে।সে পিছু ফিরে কাউকে দেখতে পেল না।
ক্যাম্পাসে এসে অয়নকে খুঁজতে লাগলো তোরঙ্গ।রক্তিমকে কোনমতে বুঝিয়ে কেটে পড়েছে সে।প্রেমিক হলে কি সারাক্ষণ সঙ্গে রাখতে হবে?সে ভেবে পায় না রক্তিম এমন কেন?ভালোবাসে বলে কি স্বাধীনতা নিয়ে নিবে?সেও যে রক্তিমকে ভালোবাসে না তা নয়!তার মনে হয় সে যথেষ্ট ভালোবাসে।কিন্তু রক্তিমের এসব ব্যবহার বিরক্তিকর।বেশি বাড়াবাড়ি।
তোরঙ্গ বুঝতেছে না কোথায় খুঁজবে অয়নকে।ফোনটাও তুলছে না।
-কি হারাল বাচালটার?
মামুনের কথায় ফিরে দাড়াল তোরঙ্গ।একগাল হেসে বলল,”মামুন ভাইয়া!অয়ন ভাইয়াকে দেখেছেন?”
-আইবিএ ভবনে যাও।অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে গেছে ও।
-থ্যাংক ইউ।আসেন একটু কোলাকুলি করি।
-দুরে গিয়ে মরো!ফাজিল।সারাদিন ফাজলামির তালে আছে।
তোরঙ্গ গলার স্বর নরম করে মিটিমিটি হেসে বলল,”মামুন ভাইয়া আপনি এমন করেন কেন সারাক্ষণ,একটু চলেন না আমার সাথে?আমি কখনো আপনাদের ডিপার্টমেন্টে যায় নি,ভয় লাগে!যদি বড় ভাইয়ারা র্য্যাগিং করে?”
মামুন হাসতে হাসতে বলল,
-তুমি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে যে ফাজিলের ফাজিল।তোমাকে দেখলে আমার থার্ড ইয়ারের বন্ধুরা ভয়ে কাঁপবে!বুকে থু-থু দিয়ে চলে যাও।আমার কাজ আছে।
-ওয়াক থু।
-এই এই আমার বুকে না তোমার।ফাজিল।শুধু শুধু অয়ন তোমাকে বিচ্ছু বলে!
কথাটা বলে মামুন আর অপেক্ষা করলো না।সে এমনিতে তোরঙ্গের বাচালতা ভয় পায়।শেষে নিজে না ফেসে যায় অয়নের বিচ্ছুর হাতে।
“কিরে টানতে টানতে এখানে আনলি কেন?”বলে অয়ন তোরঙ্গের দিকে চেয়ে রইল।
তোরঙ্গ অয়নের সামনে হাত পেতে বলল,”আমার ওয়ালেট বের করেন!”
-করছি তো এভাবে বলার কি আছে?
ওয়ালেট টা তোরঙ্গের হাতে দিতে দিতে বলল,”একটা অন্যায় করে ফেলেছি।”
তোরঙ্গ আগ্রহ নিয়ে বললো,”কি?”
-এটাতে দশ হাজার টাকা ছিলো আমি খরচ করে ফেলেছি।
-গাল গল্প দিয়েন না তো।এটাতে পঞ্চাশ টাকার বেশি ছিল।
-সত্যি বলছি ছিল।
“ধ্যাত বাদ দিন তো।”বলে তোরঙ্গ আবার প্রশ্ন করল,”আজ না লতিফ চাচার মেস ভাড়া দেওয়ার কথা!দিয়েছেন?”
অয়ন মুখ নিচু করে বলল,”না”।
-টাকা টা যদি থেকে থাকে তাহলে কি করলেন সেটা?
-আরে সত্যি তোর ওয়ালেটে দশ হাজার টাকা ছিল।
-মানলাম!কি করে খরচ করলেন?
-মামুনের মায়ের খুব অসুখ,ও কাঁন্নাকাটি করছিল।তাই পাঠিয়ে দিলাম।
-পুরোটাই পাঠিয়ে দিলেন?
-হ্যা।
তোরঙ্গ এবার রেগে গেল।সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,”বাহ!আপনি জানেন মেস ভাড়া যাতে দিতে পারেন তার জন্য আমি ওয়ালেট টা রেখে গেছিলাম।”
অয়ন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,”জানি!”
-তারপরও পুরোটা মামুন ভাইয়ার জন্য খরচ করলেন?
অয়ন এবার হালকা জোর দিয়ে বলল,”শোনো!কৈফয়েত চেও না।আমি তোমার টাকা দিয়ে দিবো।”
তোরঙ্গ অবাক হয়ে বলল,”আপনি ভুল বুঝছেন!আমি কৈফয়েত চাইছি না।কিন্তু আপনার মেস ভাড়া?”
-ওসব নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।আমি ম্যানেজ করে নিবো।আর হ্যা তোমারটাও পেয়ে যাবে।
বলে অয়ন হাটা শুরু করলো।তোরঙ্গ স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে ভাবতে লাগল,যে মানুষটার ভালো একটা শার্ট পর্যন্ত নেই।প্রতিদিন একটা শার্ট পরে ক্যাম্পাসে আসে সেই মানুষটা কিভাবে এমন নিঃস্বার্থ হয়?ভাবতে ভাবতে তার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
কিছুক্ষণ পর কাল রাতের সেই শিসের শব্দধ্বনি কানে এল তার।সে মুগ্ধ হয়ে অচেনা সুরের মানুষটিকে খুঁজতে লাগল।কেমন ভালো লাগা কাজ করে সুরটা কানে এলে।যেন কোথাও হারিয়ে যাওয়ার মত।
২।
“আচ্ছা তোমার ক্যাম্পাসের বড় ভাইদের সাথে কি?বিশেষ করে অয়ন ভাইয়ের সাথে?”
রক্তিমের প্রশ্নে তোরঙ্গের চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল।কিছুটা কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
-মানে!
-মানে কি সেটা আমার চেয়ে তুমি ভালো বোঝো!
-শোনো!অফ ডে তে সকাল সকাল তোমাকে ফোন দেওয়াই আমার খুব বড় ভুল হয়েছে।
-তো দিলে কেন?আমাকে না দিয়ে তোমার অ..য়..ন ভাইয়াকে দিলে পারতে!
“দুর মিয়া সকাল সকাল মুডটাই অফ করে দিলে?আসলে তুমি একটা সাইকো।আমাকে আর ফোন দিবে না কখনো।”বলে মোবাইলটা ছুড়ে ফেলে দিল বিছানায়।তোরঙ্গের কাঁন্না চলে এল।সে রক্তিমের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল,দায়িত্ববান।কিন্তু মাঝে মাঝে রক্তিমের পাগলামি অসহ্য লাগে।অয়ন ভাইয়া ওর কি এমন ক্ষতি করেছে সে ভেবে পায় না।ভালোবাসা তো কোন বৃত্তের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না,ভালোবাসার সম্পর্কের বাইরে কি কোন ভালো সম্পর্ক থাকা অন্যায়?
“ঐ শালা এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস?আজ তোর বাজার করার পালা।”কথাটা বলে মামুন অয়নকে পা দিয়ে পিঠে আঘাত করতে লাগল।
অয়ন কম্বল টা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে বলল,”দোস্ত!ছুটির দিন একটু ঘুমাতে দে,প্লিজ।
-বাজার না করলে খাবি কি?
-তুই আজকের টা করে নিয়ে আয় না,দোস্ত!পরে শোধ দিয়ে দিবো।
-আমি পারবো না,এমন বলে বলে বহুত খাটাইছোস!আজ তুই ই যাবি।
-এত নিষ্ঠুর কেন তুই?একটা দুধের বাচ্চা রে শান্তিতে ঘুমাইতেও দিস না!
-উঠবি নাকি গরম পানি দিবো?
অয়ন আড়মোড়া ভেঙে হেসে বললো,”দে শীতের সময় তো গরম পানি ভালোই হবে।”
মামুন পেন্টের চেইনের জায়গা দেখিয়ে বলল,
-প্রসাবের গরম পানি!দিব?
অয়ন ধড়ফড়িয়ে বসে পড়ে বলল,”ঐ না না।আমি যাচ্ছি।”
অয়ন মাঝে মাঝে ভাবে মামুনের মত একটা বন্ধু পেয়ে সে সত্যি খুব ভাগ্যবান।সেই ভার্সিটির শুরু থেকে আজ তিন বছর অবলীলায় মামুন তার পিছু ছাড়ে নি।সেও মামুনকে কোথাও আলাদা করে রাখে নি।যতবার ভাড়ার দায়ে মেস বদলাতে হয়েছে মামুন তার সঙ্গে এসেছে,সেও এনেছে।তার মত একটা অলস বন্ধুর সঙ্গে মামুন যে কিভাবে সংসার করছে সে ভেবে পায় না।অয়ন মৃদু হাসে।আসলে সংসারই তো করছে।পরম দু’জন বন্ধু একই ছাদের নিচে ঘুমাই,খায়,পড়ালেখা,খুনশুটি করে এটা সংসারের চেয়ে কম কিসে?
বাজার থেকে ফিরবার পথে পায়ের স্যান্ডেলটা ছিড়ে গেল।অয়ন উপায় না দেখে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে লাগলো।কিছুদূর থেকে কয়েকটা মেয়ের হাসি শোনা গেল।অয়ন তাকিয়ে দেখে কয়েকটা মেয়ে তার খুঁড়িয়ে হাটা দেখে হাসছে।সে নিচু হয়ে স্যান্ডেল তুলে পাশের ড্রেনে ছুড়ে ফেলে দিলো।সেটা দেখে মেয়েগুলো আরো জোরে হেসে উঠল।অয়নের বিশ্রী রকমের অস্বস্তি হল।সে দ্রুত হাটা শুরু করল।যদিও খালি পায়ে হাটতে কষ্ট হয় তার খুব।
কিছুক্ষণ পর তার পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে কাউকে হাটার শব্দ অনুভব করল।
“কি’রে বিচ্ছু!খালি পায়ে হাটছিস কেন?”পাশ ফিরে তোরঙ্গ কে দেখে কথাটা বলল অয়ন।
তোরঙ্গ কিছু বলছে না দেখে অয়ন আবার প্রশ্ন করল,”কি’রে মন খারাপ?”
তোরঙ্গ হ্যা-বোধক মাথা নাড়ালো।
-রক্তিমের সাথে কিছু হয়েছে?
এবারও সে মাথা নাড়ালো।অয়ন জানে এই ছেলেটা যতটা বাচাল,মন খারাপে ততটা নিশ্চুপ,শান্ত।এখন হাজারবার বললেও সে কিছু বলবে না,কিন্তু মন ভালো হলে নিজে থেকে সব বলবে।এই যে এখন মন খারাপের ছেলেটা খালি পায়ে হাটছে,সেটার কারন তার অয়ন ভাইয়া খালি পায়ে হাটছে তাই।এবং সে জানে বহুদিন ব্যবহৃত অয়নের ছেড়া স্যান্ডেল এখন ভেসে ভেসে দীর্ঘপথ,দীর্ঘ সময় অতিক্রম করে হয়তো বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়বে।মধ্যদুপুরে শীতের রোদে দুটি মানুষ নিরিবিলি হেটে চলেছে খুব চেনাপথে,অচেনা এই শহরে।
“কি’রে তখন তো কিছু বললি না।এখন বল।”ছাদের উচু করা প্রাচীরে বসতে বসতে অানমনা তোরঙ্গের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল অয়ন।
নিচের দিকে চোখ স্থির রেখে তোরঙ্গ বলল,”রক্তিমের সাথে ব্রেক আপ করে ফেলেছি।”
অয়ন হাসতে হাসতে পেটে হাত দিয়ে বলল,”এটা কত নাম্বার হলো?”
তোরঙ্গ মন খারাপ করে বলল,”পাঁচ নাম্বার”।
-আমাকে নিয়ে ঝগড়া করেছিস নিশ্চয়?
“হু”বলে তোরঙ্গ চুপ করে রইল।
-তোর সব ক’টা ব্রেক আপ তো আমার জন্য হল।আমার সাথে না মিশলে পারিস।তাহলে তোর এসব প্রেমিকদের সাথে ঝগড়াফসাদ হয় না,ব্রেক আপ ও হয় না।
-কেন মিশবো না?
-কারন এগুলা।
-কেন প্রেম করি বলে কি ভালো বন্ধু থাকবে না?
-আমি তোর বন্ধু?তাহলে অলটাইম অয়ন ভাইয়া,অয়ন ভাইয়া করিস কেন?
তোরঙ্গ চোখ বড় বড় করে বলল,”দেখেন রাগাতে আসবেন না।”
-আচ্ছা আমি রক্তিমকে বুঝিয়ে বলব।ওকে।
-জি না।একদম না।গেলে যাক।ঐ মুটকু টাকে আমারও ভালো লাগে না।
-বিচ্ছু!তুই সত্যি একটা বিচ্ছু।রক্তিমকেও চোষা শেষ?
তোরঙ্গ রাগ দেখিয়ে বলল,”অয়ন ভাইয়া!একদম ভালো হচ্ছে না কিন্তু।দাড়ান।”
“এই এই বিচ্ছু পড়ে যাব কিন্তু।ছাড়।দু’তলা থেকে পড়লে হাত-পা ভেঙ্গে যাবে।তখন সারাজীবন তোর আমাকে ঠেলে ঠেলে রাজপথে ভিক্ষা করাতে হবে।”
-ইশ!আমার বয়ে গেছে।তোমার এতো সুড়সুড়ি থাকলে আমার কি দোষ?
অয়ন তোরঙ্গকে থামানোর উপায় জানে।সে ছাদের উচুতে বসে তোরঙ্গের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
-আয় বিচ্ছু একসাথে সুইসাইড করি!
তোরঙ্গ নিজেও অয়নকে জড়িয়ে ধরে বললো,”ধ্যাত!শুধু ফাজলামি।”
-আচ্ছা মামুন রান্না করছে দুপুরে খেয়ে যাস।
-না আম্মুকে বলে আসি নি।
-ডরা মাত।আমি বলে দিচ্ছি।আন্টিকে পটানো মেরা বা হাত কা খেল।
-ইশ!তিনি যেন আন্টির মেয়ে জামাই!
-তুই ফোন দে আন্টিকে আর খেল দেখ।
-হয়েছে।আমি আম্মুকে বলে আসছি।
“ওরে বিচ্ছু!দাড়া তাহলে!” বলে অয়ন তোরঙ্গে তাড়া দিল।তোরঙ্গ ছাদের সিড়ি বেয়ে দৌড়ে নেমে যেতে লাগল।
তোরঙ্গকে খাইয়ে দিচ্ছে অয়ন আর মামুন বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে।অয়ন তা দেখে বলল,
-কি’রে মামুন কি দেখিস?
“ইশ!আস্ত ধেড়ে ইঁদুর।তাকে নাকি মুখে তুলে খাওয়াতে হবে।”মামুনের কথা শুনে তোরঙ্গ মুখের ভাত মুখে রেখে অয়নের দিকে তাকিয়ে রইল।
অয়ন মৃদু হেসে বলল,”মামুন বিচ্ছু টা কে ক্ষেপাস না।ভাতটাই এখন খাবে না তাহলে।”
-তোর বিচ্ছু কে তুই খাওয়া।আচ্ছা ওর হাত নেই?
তোরঙ্গ মুখের ভাতগুলো গিলে ফেলে বলল,”মামুন ভাইয়া!আপনি এতো হিংসুটে কেন মেয়েদের মত?”
-কি আমি মেয়েদের মত হিংসুটে?দেখলি অয়ন এতটুকু একটা পিচ্চি কি বলে?
-তোরা থাম তো।তোরঙ্গ তুই চুপ করে খা।
-উনি আমাকে ধেড়ে ইঁদুর বলল কেন?
-আচ্ছা এই কান ধরছি আর বলব না।তুমি বকবক বন্ধ করো,মাফ চাই।
তোরঙ্গ মন খারাপ করে বলল,”অয়ন ভাইয়া!আবার?”
-আচ্ছা মামুন আয় তোকেও খাইয়ে দেয়।
মামুন প্লেট নিয়ে উঠতে উঠতে বলল,”আমার লাগবে না।তোরা ঢং কর।আমি কিচেনে গেলাম খেতে।”
-এই কই যাস মামুন?
মামুন আর জবাব দিল না।অয়ন বিচ্ছু টার দিকে তাকিয়ে দেখলে ওটা হা করে মামুনের যাওয়া দেখছে।অয়ন দুষ্টমি করে সেই হা করা মুখে ভাতে ভরে দিলো।তোরঙ্গ বিষম খেলো।
অয়ন পানি নিয়ে তোরঙ্গের মুখে কাছে ধরে তার পিঠ চাবড়াতে লাগল।
তোরঙ্গ পানি খেয়ে অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,”অাসছে আমার দরদী,ফাজলামি করে পিরিত দেখাই।”
অয়ন এ্যাটো হাত দেখিয়ে বলল,”এটা সহ জড়িয়ে ধরব বিচ্ছুকে?”
-এই না না।
-তাহলে হা কর।
৩।
এই শীতের রাতে সারা শহর কাঁপছে।মানুষ তেমন নেই বললে চলে।নিঝুম,নিরিবিলি রাস্তায় শুধু কিছুক্ষণ পর পর সাইকেলের বেল বাজানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে।
অয়নের সামনে বসে আছে তোরঙ্গ।সে রাতের শহর দেখছে।কোথা থেকে একটা সাইকেলের ব্যবস্থা করে অয়নের সামনে এসে হাজির।তাকে নাকি সাইকেলে চড়িয়ে রাতের শহর দেখাতে হবে।অয়নের খোঁচা খোঁচা দাড়ি আবরনের থোতনা দিয়ে তোরঙ্গের বাম কাঁধে ঘষা দিয়ে বলল,”খুব মজা নিয়া হচ্ছে না?আমি শীতে কাঁপছি আর তুই হাসছিস?”
তোরঙ্গ সামনে থেকে বলল,”অয়ন ভাইয়া!আমি কিন্তু ওতো টা স্বার্থপর না।চাইলে পিছনে বসতে পারতাম।কিন্তু না বসে সামনে বসেছি।যাতে হাওয়াটা আমার গায়ে লাগে।”
অয়নের দু’হাত সাইকেল চালানোর দখলে।তাই নিচু হয়ে তোরঙ্গের কানে হালকা কামড় দিয়ে বলল,”ওরে বিচ্ছু।পাকামো হচ্ছে?ওয়েট কর।আশেপাশে খোলা নর্দমা পাই,একদম সোজা ওখানে ফেলে দেব।”
-তাতে আমার কি?
-ফাজিল!শীতের রাতে সাইকেল চালিয়ে দেখেছিস?
-এই তো দেখছি।
“কি?”বলে অয়ন সাইকেল থেকে দু’হাত সরিয়ে তোরঙ্গের কোমর জড়িয়ে ধরল।
“এই পড়ে যাবো তো।ধরেন।”
-আগে বল মজা নিবি না?
-ওকে ওকে।
অয়ন হাসতে হাসতে তোরঙ্গের কোমর ছেড়ে সাইকেলের ব্রেক ধরলো।যদিও ঠান্ডা লাগছে তবুও তোরঙ্গের জন্য এই রাতের ঢাকা অয়নের দেখা হচ্ছে।চারদিকে কত আলো।এত আলোর মাঝে নিজেকে আলোকিত মনে হয় কিছুক্ষণের জন্য হলেও।দিনের ক্লান্তি রাতের এই শহরের বুকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।মনের সকল গ্লানি হারিয়ে যায় লাল,সবুজ,হলুদ আলোর মাঝে।
দুরে একটা টোঙের দোকান দেখতে পেয়ে অয়ন বলল,”এই বিচ্ছু চা খাবি?”
-কিন্তু আমার যে জিহ্বা পুড়ে যায়?
অয়ন কথা কিঞ্চি দীর্ঘ করে বলল,”কি জিহ্বা পুড়ে যায়?হাহাহা..হা।
-সাইকেল থেকে একদম ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিব!হাসবেন না।
-দিলে দে।তুইও তো পড়ে যাবি।
-আমি গরম চা খেতে পারি না।তাই তো কোল্ড কফি খাই।
-ওরে আমার বড়লোকের বেটা।
-অয়ন ভাইয়া ফাজলামি করবেন না।
অয়ন সাইকেল থামিয়ে বলল,”ওকে বিচ্ছু ওয়েট কর।দেখ আজকে আমি তোকে চা কিভাবে খাওয়ায়।”
তোরঙ্গকে দাড়িয়ে রেখে চলে গেল।মিনিট পাঁচেক পর দুটো কাপে চা এনে তোরঙ্গের চোখের সামনে ধরলো।
-বললাম না আমি খেতে পারব না।
অয়ন নিজের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলল,”ওয়েট! আমি ঠান্ডা করে দিচ্ছি।”বলে তোরঙ্গের কাপে ফুঁ দিতে লাগলো।তোরঙ্গ তার সুন্দর দুটি চোখে চেয়ে চেয়ে অয়নের কান্ড দেখতে লাগলো।প্রতিটি ফুঁ এর সময় অয়নের গাল দুটো ফুলকো লুচির মত লাগছিলো।তোরঙ্গ মৃদু হেসে বলল,”অয়ন ভাইয়া!আমি লুচি খাবো।”
নিজের কাপে আরেক চুমুক দিয়ে বলল,”বিচ্ছু!আর বায়না করিস না।এতো রাতে ঢাকা শহরে লুচি পাওয়া যায় না।”
তোরঙ্গ বলল,”আপনি চা’য়ে ফুঁ দেন।”
অয়ন ফুঁ দিতেই তোরঙ্গ তার গাল দুটো ধরে বলল,”এটা খাবো।”
-কি?আমার গাল লুচির মত?
“হু” বলে তোরঙ্গ মাথা নাড়ালো।”তবে রে”বলে চা’য়ের কাপ দুটো ফুটপথে রেখে অয়ন তোরঙ্গ কে ধাওয়া করলো।
কিছুদূর যেয়ে তোরঙ্গ দাড়িয়ে পড়ায় অয়ন জড়িয়ে ধরে বলল,”ধরে ফেলেছি।”
তোরঙ্গ অয়নের হাতটা তার কোমরে জড়িয়ে দিয়ে বলল,”ধরেন শীত করছে।”
অয়ন কিছুটা শিহরিত হলো।কেমন একটা করে উঠলো শরীরে।যেটা কিছুদিন থেকে হচ্ছে।সে তোরঙ্গকে ছেড়ে বলল,”চল বাসায় ফিরি।অনেক রাত হলো।”
তোরঙ্গ অয়নের দিকে চেয়ে কোন কথা বললো না।তোরঙ্গের চা ঠান্ডা করে অয়ন বলল,”তুই খা আমি দেখি।”
তোরঙ্গ চা’য়ের কাপ ঠোঁটে ছুঁইয়ে ভ্রুযুগল প্রশস্ত করে অয়নের দিকে বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।যে দুটি চোখে পুরো নীল আকাশটা হারিয়ে যায়।শহরের নিয়নের আলোয় তা আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“রবি,তুই কোন সুর শুনতে পাচ্ছিস?”ক্যাম্পাসের কোন একটা জায়গা থেকে পরিচিত কোন গানের শিসের সুর ভেসে আসছিল।সেদিকে লক্ষ্য করে কথাটা বলল তোরঙ্গ।
-হ্যা।হয়তো কেউ মুখে কোন গানের লাইন সুর করছে শিসের মাধ্যমে।
-জানিস খুব পরিচিত লাগে শিসের সুরটা।আগেও কয়েক বার শুনেছি।আচ্ছা কি গানের লাইনে সুর করে বলতে পারিস?
রবি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,”দুর!হবে কোন গানের লাইন,মাথায় আসছে না।”
-আমিও মেলাতে পারি না।কিন্তু কেমন খুব পরিচিত লাগে।
-বাদ দে তো।উইন্টারে কোথাও ঘুরতে যাবি?
-না রে আম্মু যেতে দিবে না।
-আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে কক্সবাজার যাচ্ছি কয়েকজন।তুইও চল মজা হবে।সুন্দরী ললনারাও যাচ্ছে দোস্ত।
-কিন্তু আম্মু তো যেতে দিতে চাই না।
-এত ধনীর ছেলে হয়েও লাইফে একটু মজা নিবি না?কেমন জানি লাগে।
-আরে আমি তো চাই আড্ডা,মাস্তি করতে বন্ধুদের সাথে।কিন্তু আম্মুর থেকে আব্বু বেশি বেশি।সাথে আছে বড় ভাইয়া আর আপু।প্যারা আর প্যারা।
-কিন্তু তমাল ভাইয়া,তন্নি আপু তো ঠিকই মজা মারে দেখি।
-আমি নাকি এখনো ছোট!
-তোদের একটা ফ্যামিলি যা।
“আচ্ছা বাদ দে।চল ক্লাসে যাই।”বলে রবি দাড়িয়ে পড়লো।দূর্বাঘাসগুলোর কয়েকটা মাথা তুলে দাড়িয়ে গেল রবির উঠা জায়গায়।সবুজ দূর্বাঘাসগুলো কতশত অজানা গল্পের সাক্ষী।এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি ছোট-বড়র,সুখ-দুঃখের,হাসি-আনন্দের গল্পের নীরব,নিষ্ক্রয় দর্শক।
“কি’রে খিচুড়ি কই পেলি?”মামুনের কথায় অয়ন ফিরে তাকালো।
-তোরঙ্গ দিলো টিউশনি থেকে ফেরার পথে!বললো আজ বুয়া আসি নি,এটা নিয়ে যান।দু’জনে খেয়েন।
-তোর বিচ্ছু জানলো কিভাবে বুয়া আজ আসবে না?
-ফোনে কখন বলেছি বোধয়।হয়তো আন্টিকে বলেছে,আন্টি পাঠিয়েছে তাই।
মামুন মুখ টিপে হাসল।টেবিল হতে খিচুড়ির বাটি হাতে নিয়ে খুলতে খুলতে বলল,”তোরঙ্গের আম্মু তো দেখি তোকে জামাই ভাবতে শুরু করেছে।”
-লাথি খাবি বদ।আন্টি আমাকে ভালোবাসে খুব।তাই এটা ওটা পাঠাই।
খিচুড়ি খেতে খেতে মামুন বললো,”বাহ!তোর শ্বাশুড়ি দেখি ভালোই রান্না করে।”
অয়ন তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে ছিলো।সেটা ফেলে দিয়ে বিছানায় বসা মামুনকে ধাওয়া দিলো।মামুন দৌড়ে খাটে উঠে গেল।
-শালা!ওটা আন্টি রাঁধে নি,ওটা ও বাসার রমিজের মা খালা রেঁধেছে।
-ইশ!তোর বড় লোক শাশ্বড়ি কি নিজে হাতে রাঁন্না করবে আর!
-ঐ আবার!দাড়া।
অয়ন খিচুড়ির বাটি কেড়ে নিয়ে টেবিলে বসতে বসতে বলল,”ভার্সিটি তো ছুটি।চল আমাদের খুলনায়।মা যেতে বলেছে।”
“না’রে,জানিস তো মা অসুস্থ।বাড়িতে যেতে হবে।”
-ওহ,তাও ঠিক।আচ্ছা যা তাহলে।আমি ফিরবার পথে মাগুরা হয়ে আন্টিকে দেখে ফিরবো।একসাথে আসতেও পারবো দুজন।
“হুম”বলে মামুন বিছানায় বসলো।অয়ন বাটি দিয়ে বলল,”আমি আর খাবো না তুই খা এগুলা।”
-তুই তো কিছুই খেলি না!
-টিউশনি বাসায় নাস্তা দিয়েছিল।সকালে বেশি খাওয়া লাগে?
অয়ন উঠে গেলে মামুনের দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।তার বুকে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয়।অয়নদের অবস্থা ওদের থেকেও খারাপ।তবুও অয়ন তাকে ভাইয়ের মতো করে আগলিয়ে রাখে।রক্তের সম্পর্কও মাঝে মাঝে এমন ভ্রাতৃত্ব,বন্ধুত্বের সম্পর্কের কাছে হার মানে।যার নিজের ঘর নেই,সে অন্যের ঘর বাঁধে এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর।

৪।
“আন্টি ভালো আছেন?”তোরঙ্গের কথায় অয়নের মা পুকুর ঘাট হতে ফিরে তাকাল।
“মা!ও তোরঙ্গ।তোমারে যার কথা কতাম,সে।”
অয়নের মা ঘাট হতে উঠে এসে তোরঙ্গকে দেখে খুশি হয়ে বলল,”ভালো আছি বাবা।আপনি ভালো আছেন তো?”
তোরঙ্গ মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,”আন্টি!আমি তো আপনার ছেলের মত।তুমি করে বলেন তো।”
অয়নের মা তোরঙ্গের থুতনিতে হাত দিয়ে বলল,”বাহ!তুমি তো খুব সুন্দর কইরে কথা কও।দেখতিও তো রাজপুত্তরের মতন।”
তোরঙ্গ নিচু হয়ে পায়ে সালাম করল।অয়নের মা কিছু বিস্ময় ও আশ্চর্য হয়ে গেল।গ্রামে এ ধরনের সালাম তেমন প্রচলন নাই এখানে।শহরে একটা ধনীর ছেলে তার পা ছুঁয়ে সালাম করছে।বড়ই অবাকের বিষয়।
“অয়ন,মামুন আসি নাই?”
“না মা,আন্টি অসুস্থ!তাই বাড়ি গেছে।”
-ও।
“অয়ন!তুই ওরে নিয়ে যা বাড়ি।আমি তাড়াতাড়ি আসতিছি।”
-আন্টি তাড়াহুড়ার দরকার নাই।আপনি নিরিবিলি,ধীরে সুস্থে আসেন।
“আচ্চা বাবা তোমরা যাও।”
অয়ন বাড়ির পথে পা বাড়িয়ে একটু এগিয়ে বলল,”আমার মা খুব সহজ সরল!”
-এই শোনেন!শহরে থাকি বলে কি সরলতা বুঝি না?আমি মানুষ তো নাকি?
অয়ন মাথা চুলকে বলল,
-দুর বিচ্ছু!আমি ওভাবে কিছু বলি নি।আগে তো গ্রামে আসিস নি,তাই বললাম।
-চুপ থাকেন।
“ওরে,তুই আমাদের গ্রামে এসেও আমাকে ধমকাস দেখি।”
অয়ন তোরঙ্গের কাঁধে হাত দিয়ে সরুপথে হাটতে লাগল।
তোরঙ্গকে দেখে অয়নদের বাড়ির লোক আনন্দে আত্মহারা।কথায় বলে,”সুন্দর মুখের জয়,সর্বত্রই হয়।”তোরঙ্গের মিষ্টি চেহারাতে সবাই মুগ্ধ।গাঁয়ের সহজ-সরল মানুষগুলো এমনই।তোরঙ্গ তার বাচালতা দিয়ে কিছু সময়ের মাঝে সবার মন জয় করে ফেলেছে।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর অয়নের মেজো ভাবি এসে দরজায় ঠেস দিয়ে দাড়াল।সামান্য কাশি দিয়ে বলল,”দুই দেওরা!তোমাগে যে ঘর ছাড়তি হবে?ছুয়াল মাইয়ে সব ঘুমাবে!”
অয়ন বলল,”আচ্চা!আমরা আলিমগে বাড়ি যাচ্ছি।ওরে বইলে রাখছিলাম।”
“যাও যাও!তয় আমার এই সুন্দর দেওরা ডারে দেহেশুইনে রাইহো সায়জে ভাই।”
অয়ন মেজো ভাবির সামনে এসে তোরঙ্গে টেনে সামনে এনে তোরঙ্গের কাঁধে দুই হাত রেখে বলল,”ভাবি!তুমি এইডে রে ছোট দেহো।এ সেরামের বিচ্ছু।”
-অয়ন ভাইয়া!ভালো হচ্ছে না কিন্তু।আপনি ভাবির সামনে আমাকে বিচ্ছু বলছেন।
-তুমি জানো না ভাবি!এইডে খালি আমারে জ্বালাই মারে।
তোরঙ্গ হাত উল্টিয়ে অয়নের পিঠ বরাবর আঘাত দিলো।অয়ন তোরঙ্গকে কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,”চল বিচ্ছু তোকে আজ কোলে করে নিয়ে যাবো।ভাবি আসলাম।”
-বিচ্ছু কিছু মনে করিস না।আমাদের বাড়ি রুম কম,আর আমরা এতো গুলা ভাইবোন যে…।
চলতি পথে অয়নের মুখ চেপে ধরলো তোরঙ্গ।সামনে দাড়িয়ে বলল,”আপনাকে এতো নত হতে হবে না।নিজের অবস্থা নিয়ে এমন করতে নেই অয়ন ভাইয়া।দরিদ্রতা কোন পাপ নয়।”
অয়ন দুই হাত তোরঙ্গের কাঁধে রেখে কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলল,”তুই ওসব বুঝবি না।খুব কাছ থেকে দেখছি তো তাই বুঝি।”
-শোনেন!আমার শীত করছে।চলেন তো কোন বাসায় যাবেন।
অয়ন তোরঙ্গকে জড়িয়ে ধরে বলল,”নে শীত করবে না এখন।”
-হুম হুম,দম বন্ধের প্ল্যান।
-ইশ এমন বলতে পারলি?
-আহারে!
“চল”বলে তোরঙ্গের হাত ধরে চলতে চলতে অয়ন বলল,”জানিস,এসএসসি পরীক্ষার সময়ও আমি না খেয়ে খেয়ে পরীক্ষা দিতে গেছি।দুপুরে এসে দেখি মা ক্ষুদের ভাত(চাউলের বাতিল অংশ) রাঁন্না করছে,সব ভাইবোন মা কে ঘিরে বসে আছে।”
তোরঙ্গ নিশ্চুপ হয়ে শুনতে লাগল।
-যখন হত!মা দুটো দুটো করে সবাইকে দিতো।আমিও পেতাম।গরম ক্ষুদের ভাত দেখে চোখ চকচক করে উঠতো।মা একটা একটা সিদ্ধ মরিচ সবার প্লেটে দিত,আমরা ভাইবোনেরা কি যে তৃপ্তি নিয়ে খেতাম!
“আমি এরওর জমিতে কাজ করে কোনমতে পড়ালেখা চালিয়ে গেছি।মা-বাবা সব সময় আমাকে সাপোর্ট দিত।আজ হয়তো আমাদের অবস্থা ওতো টা খারাপ নেই,এই ভেবে ভালো লাগে যে ভাইয়ারা,ভাবিরা,আমরা মা-বাবা,ভাইবোন,ভাইপো-ভাইঝি সবাই তো আজ তিনবেলা ভালো করে খেতে পাচ্ছে।”
-আপনি পড়ালেখা করছেন।একদিন বড় চাকরি করবেন।সেদিন দেখবেন সবাই খুব ভালো থাকবে।
-দোয়া করিস বিচ্ছু!আমি যেন সবার মুখে হাসি ফুটাতে পারি।বড় দুই আপার তো বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগে,শুধু ছোট বোনটাকে দেখে শুনে দিতে হবে।আর ছোট দু’টো ভাইকে পড়াতে পারলে হয়।টিউশনি করে যা পাই,তা দিয়ে নিজে চলে বাড়ি আর কতই বা পাঠানো যায়!
তোরঙ্গের গলা ধরে এল।সে কোনমতে বলল,”দেখবেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।”
-তোকে খুব বিরক্ত করলাম!না?
-একদম না।
-নিজের জীবনের দুঃখের গান বলে তোকে ভারী করলাম।
তোরঙ্গ ধরা গলায় বলল,”অয়ন ভাইয়া!”
অন্ধকারে দুটো মানুষের চারটা চোখের জল চোখাচোখি হল না।তোরঙ্গ হাত ছেড়ে বলল,”আর কত দূর!আমার শীত লাগছে,আপনাদের গ্রামে যা হাওয়া বয়।”
অয়ন হেসে বলল,”এই তো সামনে।”
তোরঙ্গ অয়নের সামনে গিয়ে বলল,”কোলে নেন।”
-দুর বিচ্ছু।কোলে নেওয়া যায় এত বড় ছেলেকে।
-হু হু,জানি না।আমি আর হাটতে পারবো না।
অয়ন দুষ্টমি বলল,
-আচ্ছা পিঠে চড়ে বয়।
তোরঙ্গ সত্য সত্য কাজটা করলো।অয়নের গলা দু’হাতে চেপে ধরে পিঠে চড়ে বসলো।অয়ন কাশতে কাশতে বসে পড়ল।
-গলা চেপে মারবি না’কি আমায়?সত্য করে চেপে বসলি।দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো।
-তাতে আমার কি?
অয়ন তোরঙ্গের হাত দুটো মুখের কাছে এনে কামড় দিয়ে বলল,”আমি মরলে সত্য তোর কিছু হবে না?”
কামড়ে “উফ” শব্দ করে তোরঙ্গ বলল,”না।আমার কি?”
-জ্বালাবি কাকে?
-আপনাকে।
-কিভাবে?
-আমিও মরে যাবো।
“মাইর খাবি বিচ্ছু!”বলে অয়ন দাড়িয়ে তোরঙ্গকে পিঠ কোলা করে হেটে চলল।তোরঙ্গ অয়নের গলা জড়িয়ে ধরে থুতনি লাগিয়ে রাখল অয়নের কাঁধে।
বহুদিন পর বন্ধুর সাক্ষাতে তাকে জড়িয়ে ধরে রাখল অনেকক্ষণ।তারপর ছেড়ে দিয়ে বলল,”দোস্ত!এ তোরঙ্গ।ভার্সিটির এক ছোটো ভাই।”
আলিম আর তোরঙ্গ করমর্দন করলো।তারপর আলিম বলল,”অয়ন তোদের জন্য রুম রেডি করেছে মা।চল।দোস্ত।”
আলিমের মায়ের সাথে আলাপ সেরে অয়ন বলল,”তুই কই থাকবি?”
আলিম বলল,”পাশের রুমে।”
-আমাদের কাছে থাক।
-এই বিছেনে তিন জন থাহা যাবে না নে।
দু’জনে হেসে উঠলো।তোরঙ্গের দিকে তাকিয়ে আলিম বলল,”ছোটো ভাই কিছু মনে কইরো না।খুলনার মানুষ তো খুলনার ভাষা বারোই যাচ্ছে।”
তোরঙ্গ ও হেসে উঠলো।
-আপনাগে মোতো আমিও কতা কতি পারি!
অয়ন হেসে বলল,”বিচ্ছু!তুই কুয়ান তে শিখলি আমাগে ভাষা?”
-সিডা জাইনে কি অরবেন?শিকছি যিহানতে হোক।
-এটা মামুনের কাজ।আমি ওর সাথে মাঝে মাঝে বলতাম।তাই না বিচ্ছু?
তোরঙ্গ মুখ টিপে হাসল।আলিম বলল,”দুর!তোরা জাইগে জাইগে কতা ক!আমার ঘোম পাচ্ছে।গেলাম।”
-আচ্ছা যা।
৫।
দরজা ভিজিয়ে অয়ন তোরঙ্গের কানের কাছে এসে বলল,”আমার সাথে একা শুতে ভয় লাগছে।”
-মার খান না মনে হয় অনেক দিন।ভয় লাগবে কেন?
তোরঙ্গকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে অয়ন বলল,”না!আগে তো রাতে থাকছিস নি কখনো আমার সাথে।”
তোরঙ্গ ঢোক গিলে বলল,”তো কি হয়েছে!ছাড়েন তো!ঘুম পাচ্ছে।”
“ওকে”বলে অয়ন তোরঙ্গকে বিছানায় শুইয়ে দিলো।তারপর ওকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল অয়ন।
দরজায় কারোর ধাক্কাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল অয়নের।মোবাইলে সময় দেখে রাত দুটো।এত রাতে কে আবার?দরজা খুলে দেখলো আলিম।অয়ন হাই তুলতে তুলতে বলল,”কি’রে মাত্র তো ঘুমালাম।কি হলো আবার।”
-চল খেজুরের রস খায়ে আসি!
অয়ন অবাক চোখে বলল,”স্কুল লাইফের মত?”
“হু”বলে আলিম অয়নের অনুমতির জন্য তাকিয়ে রইল।অয়ন কিছুক্ষণ ভেবে হেসে বলল,”চল!দাড়া,তোরঙ্গকে ডাহে তুলি।”
“ওকে!আমি গ্লাস আর কাপড় নিয়ে আসতিছি।”
“হু!কি?”বলে তোরঙ্গ ফিরে শুলো।অয়ন তোরঙ্গের গায়ের থেকে লেপ ফেলে মুখ কানের কাছে নিয়ে বলল,”এই বিচ্ছু!চল!খেজুরের রস খেয়ে আসি।”
এবার তোরঙ্গের ঘোর কাটলো।সে অবাক হয়ে বলল,”কী?”
“তোর বুঝে কাজ নেই।উঠ।এই নে তোর শীতের কাপড়।পর।না হলে ঠান্ডা লাগবে।শেষে আবার আমার কাঁধে ঝামেলা পড়বে।”
তোরঙ্গ উঠতে উঠতে বলল,”কি আমি ঝামেলা?”
-না তুই তো আমার লক্ষ্মী সোনা।চাঁদের কণা।
“কি’রে তোগে হলো,চল।”
“হ্যা”বলে তোরঙ্গের হাত ধরে বেরিয়ে নিয়ে গেল অয়ন।
শীতের সময় গ্রামে একটু বেশিই শীত পড়ে।কোথাও কোন শব্দ নেই,নির্জন,নীরবতা চারদিকে।গাছের আড়াল থেকে বেলে জোসনা কোথাও কোথাও উবছে পড়েছে।এই ঠান্ডায় তোরঙ্গ দাড়িয়ে কাঁপতে লাগল।অয়ন খেজুর গাছের তলায় টর্চ জ্বালিয়ে আলিমের দিকে তাকিয়ে আছে।আলিম ভাড় নিয়ে নামতে নামতে বলল,”দোস্ত!গাছ অনেক পিচলে গেছে নিহার পইড়ে,পা পিচলালেই তোর ঘাড়ের উপর যায়ে পড়বা নি।”
-বেশি কথা না কয়ে,নাম শীঘ্রি।
কথা টা বলে অয়ন শিস দিয়ে কোন গানের লাইন সুরাশ্রিত করতে লাগল।তোরঙ্গ এই শিসের সুরটা আগেও শুনেছে।আলো-আঁধারী জোসনায় অয়নের দিকে তাকিয়ে সে যেন ঘেমে যেতে লাগল এই শীতের রাতেও।হৃপিন্ডের স্পন্দন বেড়ে গেল।সত্যি কি শিসের সুরটা অয়নের।তাহলে সে যাকে খুঁজছে!সে কি অয়ন।অসম্ভব!
“কি’রে বিচ্ছু!গ্লাসটা ধর।”কথাটাই আচমকা কেঁপে উঠল তোরঙ্গ।
-কি’রে ভয় পেলি না’কি?
“না”বলে তোরঙ্গ হাত বাড়ালো গ্লাসের দিকে।
“কি’রে তো হাত কাঁপছে কেন?ঠান্ডা কি বেশি লাগছে?”
“কই না তো”বলে গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে সম্পূর্ণ খেজুরের রস টুকু খেয়ে ফেলল।অয়ন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।বিশেষ করে শীতের রাতে খেজুররস খেলে ঠান্ডা টা বেড়ে যায়।ফিরবার পথে তোরঙ্গকে দূরে দূরে হাটতে দেখে অয়ন বলল,”কি’রে বিচ্ছু!তুই তো রিতিমত কাঁপছিস।আমার কাছে আয়।”
তোরঙ্গ ধরা গলায় বলল,”না,আমি ঠিক আছি।”
অয়ন এই প্রথম নির্বাক হয়ে গেল,আলিমের সামনে অসহায় বোধ হলো তার।তোরঙ্গের মুখটাও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না এমন আলোয়।অয়নের ভিতর অস্থিরতা বেড়ে গেল।ওর কি শরীর খারাপ হলো!নানান চিন্তা তার মাথায় আসতে লাগলো।তোরঙ্গ রুমে ঢুকেই শুয়ে পড়ল।আলিমের সাথে কথা বলে অয়ন এসে দেখে তোরঙ্গ ঘুমিয়ে গেছে।
“আলিম!তোরঙ্গ কে দেহিছিস?ঘুমেত্তে উঠে দেহি বিছানায় নেই।”
আলিম উঠানে দাড়িয়ে ব্রাশ করছিল।মুখের থু থু ফেলে বলল,”এট্টু আগে তো দেকলাম মার সাথে দাড়াইয়ে কথা কচ্চে।আমি দেকতিচি দাড়া।”
কোথাও খুঁজে না পেয়ে অয়ন হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি এসে দেখে তাদের বাড়ির উঠানে তার ভাইপো-ভাইঝির সাথে দৌড়াদৌড়ি করছে তোরঙ্গ।এটা কোন কথা হল?যাকে সারা গ্রাম দুই বন্ধু মিলে খুঁজে বেড়াচ্ছে,আর সে এখানে বাচ্চাদের সাথে খেলছে।অয়ন দৌড়ে গিয়ে তোরঙ্গকে ধরে সজোরে মুখে থাপ্পড় বসিয়ে বলল,”তুই জানিস তোকে কত জায়গা খুঁজেছি।আর তুই এখানে?”
তোরঙ্গ হা করে অয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।অয়ন তোরঙ্গকে ঝাঁকি দিয়ে বলল,
“তুই কোথাও হারিয়ে গেলে আন্টিকে আমি কি জবাব দিতাম।আন্টি তো আসতেই দিতে চাচ্ছিল না।”
তোরঙ্গ অয়নের হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে ঘরে চলে গেল।
“তুই ওকে মারলি ক্যান?”
“মা তুমি জানো না,ও হারাই গেলে কি কান্ড হতো?”
-হারাই তো নি।পরের ছুওয়ালের গাঁই হাত দিয়ার তুই কে?
অয়নের বড় ভাবি রান্নাঘর থেকে বলল,”সাইযে ভাই,এডা তুমি কি কল্লে?বড়লোকের ছুওয়াল,শেষে কি হতি কি হয়ে যায়।তুমি যাও তো ঘরে।”
অয়ন ঘরে গিয়ে দেখে তোরঙ্গ ব্যাগ গোছাচ্ছে।সে এগিয়ে গিয়ে বলল,”কি করছিস তুই?”
-আপনি একদম আমার কাছে আসবেন না।
অয়ন তোরঙ্গের হাত ধরে বলল,”আমি মারতে চাই নি।তুই তো মাথাটা গরম করালি।জানিস আমার কি টেনশন হচ্ছিল।”
-আমি থাকবো না আর এক মুহূর্তে।
কথাটা বলে তোরঙ্গ ব্যাগ কাঁধে হাটা দিলো।অয়ন তোরঙ্গ কে দরজা থেকে টেনে দরজার আড়ালে নিয়ে জড়িয়ে ধরলো।
-প্লিজ বিচ্ছু!এমন করিস না।
তোরঙ্গ ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করলো।অয়ন সেটা দেখে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,”আমার ভুল হয়ে গেছে,প্লিজ।”
তোরঙ্গ জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে বাইরে এসে দাড়ালো।অয়নের দু’চোখ টলমল করে অস্পষ্ট হয়ে গেল।
“মা ওরে যাতি দাও।ও খুব জেদি।তুমার কথা শোনবে না নে কচ্চি।”
-তুই চুপ থাক।যা নায়ে আয়।
-শীতে সুআল বেলা নাতি যাবো ক্যা।
“তোর মাথা গরম ওয়ে গেছে তাই।”মেজো ভাবি হাসতে হাসতে বলল,”তুমার মাথা গরম ওয়ে গেছে দেওরা,যাও নায়ে আসো।এ দেওরারে আমরা দেকতিছি।”
অয়ন গোসল করে এসে দেখে তোরঙ্গ তার মায়ের কাছে বসে আছে।আর আড়চোখে তাকাচ্ছে।সে যায় নি দেখে অয়নের যতটা না ভালো লাগছে,তার চেয়ে চিন্তামুক্ত লাগছে নিজেকে।তোরঙ্গ চলে গেলে তার ঠিকই পিছন পিছন যেতে হতো।ওকে তো সে একা একা অজানা,অচেনা পথে ছেড়ে দিতে পারতো না।কিন্তু তোরঙ্গকে দেখে তার স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।কিছু একটা লুকাচ্ছে বোধয়।তার বিচ্ছু টা তো এমন ছিলো না।
“কি হলো প্লেট নিয়ে উঠে যাচ্ছিস কেন?”
তোরঙ্গ কোন কথা না বলে খাট থেকে নেমে স্যান্ডেল পায়ে দিতে লাগল।
“কি’রে আজ আমার হাতে খাবি না?”
“না”
“কি করলাম আমি?”
“শোনেন!আমি ভাবিদের,আন্টির অনুরোধে এখানে আছি।যে দু’তিন দিন এখানে আছি,দয়া করে কথা বলার চেষ্টা করবেন না।”
অয়ন চোখ স্থির রেখে বলল,”আচ্ছা কথা না হয় না ই বললাম।কিন্তু তুই তো আমার হাতে খাস!আজ খাবি না?”
-না!আমি আন্টির কাছে যাচ্ছি।
কথাটা বলে তোরঙ্গ চলে গেল।অয়ন মাখানো ভাত মুখে না দিয়ে প্লেট রেখে বেরিয়ে গেল।সে ভাবতে পারছে না একটা থাপ্পড়ের কি এমন দোষ হলো?তার জায়গায় থাকলে তোরঙ্গ কি করত?কোন রিঅ্যাকশন কি করত না?অয়নদের বাড়ির কাছে একটা পদ্মবিল আছে,বিল থেকে তাদের বাড়ির উঠান দেখা যায়।অয়ন সেখানে গিয়ে বসে রইল।শীতের সময় অবশ্য পদ্মফুল ফোটে না!শুধু ধবল সাদা বকের উড়াউড়ি দেখা যায়।দিগন্তে তাকালে মনে হয় বিলের অপর পাশের আকাশটা নেমে গেছে অচেনা পথে।এমন আকাশ সে তোরঙ্গের দুটি চোখে দেখেছে।
অয়ন পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো তোরঙ্গ উঠানে দৌড়াদৌড়ি করছে ছোটদের সাথে।অয়ন হেসে উঠল।তোরঙ্গ তো সত্যি একটা বাচ্চা,তবে সুন্দর একটা বাচ্চা।কেমন মিষ্টি,আর নির্মল নীল আকাশের মত।
ফোন বের করে মামুনকে কল করলো সে।
৬।
সারা বাসে একটা কথাও বলে নি তোরঙ্গ।এমনি কি গত চার’দিন অয়নদের বাড়িতে থেকেও তার সাথে কথা বলে নি তোরঙ্গ।অয়নের মা একদিন আলিমকে ডেকে তোরঙ্গ কে সময় দিয়ে সারা গ্রাম ঘুরাতে বললো।অয়ন অবশ্য তাদের পিছু পিছু ছিলো কিন্তু তোরঙ্গের সঙ্গে কথা বলার সাহস পায় নি।যখন তারা বিদায় নিয়ে আসছিলো তখন তোরঙ্গ তার মা,বড় ভাবি,মেজো ভাবি,তার বাবাকে সালাম করে এলো।বাবা কত খুশি হয়ে তোরঙ্গের মাথায় হাত বোলালো।মা তো কেঁদেই দিলো।আসার সময় তোরঙ্গ ছোটদের হাতে টাকা দিয়ে এলো।তারাও এই কয়’দিনে ছেলেটাকে কেমন আপন করে নিয়েছে।তোরঙ্গ এমন একটা ছেলে,যাকে চোখ বন্ধ করে সবাই বিশ্বাস করবে,ভালোবাসবে।অথচ আজ এই চলতি বাসে সেই বাচাল,সুন্দর চোখের ছেলেটি কেমন শান্ত,স্থির হয়ে পড়ে আছে।গাড়ি মাগুরায় ঢোকার পর মামুনের মাকে দেখতে যাওয়ার কথা মনে পড়লো।কিন্তু কিভাবে যাবে?তোরঙ্গটা যা করছে।জালানায় তাকিয়ে এসব ভাবছে অয়ন।অগত্যা উপায় না দেখে মামুনকে টেক্সট করে দিলো সে।তোরঙ্গ কানে হেডফোন দিয়ে গান শুনছে।কিন্তু এই ছেলেটাই বাসে উঠলে ঘুমিয়ে যায়।যাওয়ার সময় সম্পূর্ণ জার্নিতে তোরঙ্গ অয়নের কাধে ঘুমিয়ে গেছিললো।মুখের লালায় অয়নের পুরানো একটিমাত্র শার্ট ভিজিয়ে ফেলে ছিল।অথচ আজ ঘুম যাতে না আসে তাই তার গান শোনা।জালানা দিয়ে দুরে ছুটে চলা এক ঝাঁক পাখির উড়ে চলা দেখছে সে।অয়ন তার হাতটা ধরে জিজ্ঞাসা করল,”ঘুম আসছে?”
তোরঙ্গ না বোধক মাথা নাড়াল।
“বিচ্ছু!তোর চোখ তো তা বলছে না।”
অয়ন কাঁধ দেখিয়ে বলল,”ঘুম আসলে ঘুমা।”
তোরঙ্গ কথা বললো না।ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে রইল।
“তুই আর আমার সাথে কথা বলবি না বিচ্ছু?”
তোরঙ্গ কিছু শুনতে না পেয়ে অয়নের দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো উপর-নিচ করলো।অয়ন তার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের দু’হাতে দুটো কান ধরে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল তোরঙ্গের দিকে।তোরঙ্গ গানের সাইন্ড আরো বাড়িয়ে দিল।
এই বন্ধ ঘরে তোরঙ্গের ইচ্ছা করছে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে।রাতের রাস্তায়,ক্যাম্পাসে,ঘরের জালানার কাছে যে শিসের সুর সে শুনতে পায় সেটা যে অয়নের।তোরঙ্গ যে শিসের সুরকারের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো,সেটা যে অয়ন ভাইয়া তা কি জানতো সে?কিন্তু এটা কি কখনো সম্ভব?সে গে জেনেও মামুন ভাইয়া,অয়ন ভাইয়া কখনো তাকে ঘৃণা করে নি।বরং অয়ন ভাইয়া প্রতিটি ব্রেক আপের পর তার পাশে থেকেছে।সাহস দিয়েছে।কিন্তু অয়ন তো তার টাইপেরই না।অয়নের গার্লফ্রেন্ড ছিলো।পুরা ভার্সিটি অয়নকে এক নামে চেনে।অচেনা সেই ছেলের সুর শুনতে শুনতে তোরঙ্গ তার প্রেমে পড়ে গেছে সেটা তে তো কারোর কোন হাত নেই।তবুও যতটুকু পারা যায় অয়নের সামনে থেকে সরে যেতে হবে তার।কিছু কিছু মানুষ চোখ দেখে মনের কথা পড়ে ফেলতে পারে।অয়ন সে রকম হলে তো তোরঙ্গের লজ্জার শেষ নেই।তার পাশাপাশি গেলে তো আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।সে কিভাবে তার অয়ন ভাইয়ার সামনে যাবে?ভালো তো অয়নকে অনেক আগে থেকে বাসতো তোরঙ্গ,কিন্তু বন্ধুত্ব এবং লজ্জার জন্য কোনদিন বলতে পারি নি।তাই তো গে কমিউনিটি ঘেটে যার তার সাথে প্রেম করেছে,বিছানায় গেছে!যাতে অয়নের সামনে তার লজ্জা পেতে না হয়,তার ভালোবাসা ধরা পড়ে না যায়!যেদিন প্রথম এক রাতে তার পড়ার জালানার কাছে শিসের সুরটা শুনতে পাই,সেই যে একটা অজানা ভালো লাগা কাজ করেছিল তারপর থেকে প্রতিবার সেই সুর কানে এলে তার মনটা কেমন করে উঠত,মন খুঁজতো অচেনা সেইজনকে।কিন্তু এই সুরটা তার এত কাছে কিভাবে এল?অনেকদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গেও শুনেছে এই সুর সে।তাহলে কি অয়ন ভাইয়া আসত?কি পাগলের মত ভাবছে সে।তোরঙ্গ চোখের কাঁন্নাগুলো লুকাতে ওয়াশরুমে গিয়ে জলের কল ছেড়ে দিলো।
আজ সাতদিন পর ভার্সিটিতে যাচ্ছে তোরঙ্গ।মনে মনে দোয়া দরুদ পড়ছে সে।অয়ন যেন তার সামনে না পড়ে।কিন্তু কোথা থেকে আচমকা একটা হাত তাকে টেনে আড়ালে নিয়ে গেলে।দালানের দেওয়ালের সাথে তার হাত দু’টোকে চেপে ধরল সেই পরিচিত অয়নের হাত দুটো।অয়ন তোরঙ্গের মাথার সাথে মাথা লাগিয়ে ধরা গলায় বললো,”বিচ্ছু!তুই আমার সাথে কথা বলিস না কেন?”
-অয়ন ভাইয়া আমার ক্লাস আছে।ছাড়েন!
-ক্লাসে পরে যাবি,আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দে!
-আমার ইচ্ছা!
-তোর একার ইচ্ছাতে কিছু হবে?আমার ইচ্ছার অনিচ্ছার দাম নেই?
“না”বলে অয়ন দেওয়ালে পা বাঁধাল।অয়ন চোখ দুটো নিচু করে বলল,”এভাবে বলতে পারলি?একটা থাপ্পড়ের প্রতিশোধ এভাবে নিবি?”
-দেখেন!আমাদের মেলামেশা না করাই ভালো।তাতে দু’জনেরই মঙ্গল!
অয়ন তোরঙ্গকে জড়িয়ে ধরে বলল,”তুই জানিস তোকে না দেখলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।এই সাতটা দিন আমার কিভাবে কেটেছে জানিস?”
তোরঙ্গ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,”ছাড়েন তো।কেউ দেখলে মাইন্ড করবে।”
অয়ন বিদ্রুপের সুরে বলল,”হুম।সেই!মাইন্ড করবে!”
“কই ক্যাম্পাসে তো কত বন্ধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে।তোকেও তো ক্যাম্পাসে কত জড়িয়ে ধরেছি।তখন তো কেউ মাইন্ড করে নি।এখন কেন করবে?”
-আমি ওতো সব জানি না।আমি যাবো,ক্লাস আছে।
অয়ন তাকে ছেড়ে হাত দিয়ে পথ দেখিয়ে বলল,”যা!আজ তোর খুব তাড়া!”
তোরঙ্গ ক্লাসে যেতে যেতে অয়ন ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গেল।
“মামুন ভাইয়া!আসবো?”
মামুন বই থেকে মুখ তুলে বলল,”ও তোরঙ্গ!এসো।”
-বলেন।এই বিকালবেলা খবর দিলেন যে।
-তোমার আর অয়নের মধ্যে কি হয়েছে?
বিছানায় বসে তোরঙ্গ দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে বলল,”কই ভাইয়া!কিছু হয় নি তো।”
-তুমি বললে তো হবে না।তুমি জানো অয়ন গে।আমি কোন মানুষকে ঘৃণা করি না।সেকেন্ড ইয়ারে উঠে যখন জানতে পারলাম আমার বন্ধু গে,তখন বন্ধুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সোনিয়া নামের একটা মেয়ের সাথে প্রেম করিয়ে দিলাম।কিন্তু আফসোস ছ’মাসও রিলেশন টিকলো না।
তোরঙ্গ পলকহীন ভাবে শুনছিলো মামুনের কথা।মামুন বলতে লাগলো,
-তুমি জানো,রাতের পর রাত অয়ন তোমার বাসার জালানার কাছে দাড়িয়ে থেকেছে তুমি পড়বে,ও তোমার কন্ঠ শুনতে পাবে বলে।তুমি ঘুমিয়েছো,ও মাঝ রাতে উঠে চলে গেছে তোমার জালানার কাছে,তুমি মাঝরাতে পাগলামি করছো ফুচকা খাবে বলে,শীতের রাতে উঠে গেছে।তুমি বাসায় না পৌচ্ছানো পর্যন্ত তোমার পিছু পিছু তোমার বাসা অবধি গেছে।সারা শহর শীতে কাঁপে ও রাতের পর রাত তোমাকে সাইকেলে চড়িয়ে সকালে গায়ে জ্বর নিয়ে ফিরেছে।আমি রাগে ওষুধ আনিনি,পরে বিকালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছি।তুমি যার তার সাথে সেক্স করেছো,অয়ন জেনেও কিছু বলে নি।ওর রাতের কাঁন্নার শব্দ শুধু আমি শুনেছি।
বলতে বলতে মামুনের গলা ধরে এল।তোরঙ্গের চোখ নিজের উপর অভিমানে লাল হয়ে গেল।
“অয়ন গরীব মানুষের ছেলে,তবুও আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।নিজের বন্ধু বলে বলছি না,ওর মত ছেলে লাখে একটা হয় না।”
তোরঙ্গ দম আটকে রেখে শুধু একবার বলল,”অয়ন ভাইয়া এখন কোথায়?”তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেল।
অয়নকে পিছন থেকে অামচকা জড়িয়ে ধরে তোরঙ্গ বলল,”পড়ন্ত বিকেলে রেললাইনে বসে কি সুন্দরী মেয়ে দেখছেন?”
অয়ন গলা থেকে তোরঙ্গের হাত ছাড়িয়ে দিয়ে বলল,”কেউ যেন আমার সাথে কথা না বলে!”
রেললাইনের যে পাশে অয়ন বসে ছিলো সেইপাশে তার কাছাকাছি বসতে বসতে অয়ন বলল,”আমি তো কারোর সাথে কথা বলছি না,শুধু কারোর পাশে বসে আছি।কেউ কি আমাকে তার সেই মধুর সুরের শিস শোনাবে।”
অয়ন উল্টা দিকে তাকিয়ে বলল,”শিস যে বাজাত সে তো কার যেন অচেনা!তাছাড়া আমি তো অয়ন!”
“আমি কিন্তু তাকেই ভালোবাসি সে জানে?”
“আমি কাওকে ভালোবাসি না!”
তোরঙ্গ পাশ থেকে উঠে হাটা দিলো।অয়ন দৌড়ে গিয়ে তোরঙ্গের হাত টেনে ধরলো।
তোরঙ্গেরর কাঁধে তার খোঁচ খোঁচা দাড়ির থুতনি লাগিয়ে,কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,”ভালো..বাসি তো!”
তোরঙ্গ ফিরে দাড়াল।অয়ন তার দু’হাত তোরঙ্গের কাঁধে ভর দিয়ে নিচু হয়ে উচ্চতা সমান করে দাড়িয়ে,মুখের কাছে মুখ নিয়ে,চোখে একবার পলক ফেলে বলল,”বাসি..তো..ভালো।যার এত সুন্দর আকাশ দুটি চোখ তাকে কি ভালো না বেসে থাকা যায়,আমি যে তার চোখে তারা হয়ে গেছি?”
তোরঙ্গ মিষ্টি করে বলল,”সত্য কথা ভাইজান?”
অয়ন এক চোখ টিপে বলল,”ইশ বিচ্ছু!ভাইজান কি?শুধু জান বললে হতো না?”
তোরঙ্গ অয়নের পেটে আঘাত করে বলল,”ও তাই না?আমার বয়ে গেছে জান বলতে!”
রেললাইনের দুই পাটিতে দু’জনের হাত ধরে পড়িপড়ি হেটে চলার মাঝে অয়ন মুখে বাতাসের বিশেষ পদ্ধতিতে সেই চিরচেনা গানের সুরটিতে শিস বাজাতে লাগল।
তোরঙ্গ বলল,”এটা!তোমার আকাশ দুটি চোখে,আমি হয়ে গেছি তারা!সেই গানের সুর না?”
অয়ন মৃদু হেসে দিল।
তোরঙ্গ অয়নকে হাত ধরে টেনে রেললাইন থেকে ফেলে দিয়ে বলল,”ইশ!আগে ক্যান বুঝি নি?তালি অওন ভাইরে পাতি এ্যাত কষ্ট অত্তি হতো না!”
“এই দাড়া,বিচ্ছু!তুই আমারে খুলনার ভাষা কয়ে ভ্যাঙ্গাচ্চিস।”বলে অয়ন ধাওয়া করলো।তোরঙ্গ দৌড়াতে না দৌড়াতে অয়ন গিয়ে জড়িয়ে ধরে সুড়সুড়ি দিতে লাগলো।
“তোমার আকাশ দুটি চোখে,
আমি হয়ে গেছি তারা।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.