এক আকাশের নিচে

মেঘ রাজ সাইমুন

অাধ ময়লা লাল টকটকে টিশার্ট আর ফিকে হওয়া ঘিয়ে রংয়ের একটা প্যান্ট পরা ছেলে এসে দাঁড়ালো জগন্নাথ হলের সামনে।
কাধে একটা ব্যাগ।
এলোমেলো চুল।
বড় বড় মায়াবী চোখ।
ঠোঁট প্রশস্ত হালকা হাসি।
এই হলের কোন এক বিল্ডিংয়ে কোন এক রুমে তার থাকার সিট মিলেছে।কথা’টা ভেবে,আনন্দে তার সজল চোখ বুজে এল।

এক।

টগরের ভাতের প্লেটের ভিতর হাত ধুয়ে দিল শাওন।বড় বড় মায়াবী চোখ তুলে তাকাল টগর।
শাওন তার মাথায় থাপ্পড় মেরে বলল,”কি দেখিস হা করে?”
টগর ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি টেনে বলল,”কিছু না শাওন ভাই।”
শাওন তার প্লেট থেকে মাংসের টুকরো তুলে হাতে নিল।
টগর সেভাবেই হেসে বলল,”নিন ভাই!আমার কোন সমস্যা হবে না।এভাবেই খেতে পারব আমি।”
রিজুর প্লেটে মাংসের টুকরো দিতে দিতে শাওন বলল,”খেতে না পারলে বা কি!”
পানি ঢালা ভাতগুলো হাসি হাসি মুখে খেতে লাগল টগর।
তার চোখে ছিলো না কোন অভিযোগ।
অভিমান।
অপমান।
ঘৃণা।
রাগ।
কিংবা অনুরাগ।
রিজুর খাওয়া শেষে তাকে নিয়ে উঠতে গিয়ে শাওনের স্যান্ডেল ছিড়ে গেল।এত ছাত্র এখানে।সবাই খাওয়া দাওয়ায় ব্যস্ত।কেউ হয়তো শাওনের দিকে তাকিয়ে দেখবে না।তবুও তার অস্বস্তিবোধ হল।রিজু মুচকি হেসে ভ্রু-যুগল নাচিয়ে টগরের পায়ের দিকে নজর এনে দিল শাওনের।
অনেকদিনের পুরানো এক জোড়া স্যান্ডেল টগরের পায়ে।কোথাও কোথাও মুচির নিপুণ হাতের সেলাই পড়েছে বেশ।
শাওন উঠে গিয়ে টগরের পা পাড়িয়ে ধরে বলল,”স্যান্ডেল জোড়া দে তো সুনয়না।”
টগর প্লেট হতে হাত উঠে দাড়িয়ে বলল,”নিন ভাই।আমার কোন সমস্যা হবে না।”
শাওন নিজের ছেড়া স্যান্ডেল টগরকে দিয়ে বলল,”এটা নিয়ে চুপচাপ রুমে চলে আয়।কাজ আছে তোকে দিয়ে।”
টগর হ্যা সূচক মাথা নাড়াল।
শাওন হাটা দিতে গেলে টগর বলল,”কিন্তু ভাই আমার নাম তো সুনয়না না।টগর।”
শাওন রিজুর কাধে হাত রেখে বলল,”ঐ একই হলো।তোর চোখ দু’টো খুব সুন্দর।ডাগর ডাগর।তাই সুনয়না বললাম।”
টগর বলল,”আপনার যা ইচ্ছা বলেন।”
শাওন নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,”হুশ।তোর স্যান্ডেল কি নোংরা।শোন,গেটে মুচি বসা আছে।তুই যেয়ে আমার স্যান্ডেল জোড়া ঠিক করে আন তো।”
টগর মাথা নিচু করে বলল,”ভাই।ভাত ক’টা খেয়ে যাই।”
রিজুর কাধে আরো জোরে ভর দিয়ে দাড়িয়ে শাওন বলল,”রিজু!আমি ওকে কি বলেছি?”
টগর মুখ তুলে ড্যাবড্যাব করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,”আচ্ছা যাচ্ছি।”
“আমি এখানে আছি।তাড়াতাড়ি আসিস।”

পড়ন্ত বিকালে মেঝেতে শুয়ে থাকা টগর হঠাৎ লাফিয়ে উঠল।ঘুমন্ত মুখের উপর কিছু একটা এসে পড়েছে।
ঘুম ঘুম চোখে উপরের দিকে তাকাল সে।শাওন দাড়িয়ে আছে।শাওন রেগে আছে বোধয়।চোখ লাল তার।
শাওন খাটে বসতে বসতে বলল,”তোকে না বললাম আমার কাজ আছে।তুই রুমে এসে ঘুমিয়ে গেলি কেন?”
টগর মাথা নিচু করে বলল,”সরি ভাই।ভুল হয়ে গেছে।”
টগরসহ হোস্টেলের এ রুমে চারজন থাকে।সে,রিজু,তপন আর শাওন।তপন অধিকাংশ সময় রুমে থাকে না।গান বাদ্য নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকে।
শাওন রিজুকে বলল,”তোর কিছু আছে?”
রিজু বিছানায় মোচড়াতে মোচড়াতে বলল,”না।চেঁচামেচি করিস না তো শাওন।ঘুমাতে দে।”
শাওন টগরের দিকে তাকিয়ে বলল,”ঐ দু’টো টিশার্ট আর প্যান্টটা কেঁচে এনে দে।ভালো পরিষ্কার হয় যেন,না হলে তোকেই আবার কাঁচতে হবে।”
“কিন্তু ভাই,এখন কাচলে তো শুকাবে না।”
শাওন খাট থেকে হাত বাড়িয়ে টগরের মাথায় থাপ্পড় মেরে বলল,”তোকে কথা কম বলতে বলছি না!”
টগর তার মেঝেতে পাতা বিছানা থেকে টিশার্টগুলো তুলতে তুলতে বলল,”জি ভাই।ভুল হয়ে গেছে।”

এই শহর টগরের অচেনা নয়,অচেনা নয় শহরের মানুষগুলো,এবং খুব চেনা এই ব্যস্ত শহরের অলিগলি।তবুও কেমন জানি একটা লাগে তার।বারবার আকাশ পাণে তাকায় সে।কত স্বাধীন পাখি উড়ে যায় আকাশপথে।শুধু তার মুক্তি নেই।কখনো বা জগন্নাথ হলের সবুজ ঘাসে বসে থাকে অনেক রাত অবধি।জীবনের প্রতি তার নেই অভিযোগ।
কোন ক্ষোভ।
কিংবা বিতৃষ্ণা।

পিছন থেকে টিশার্টে টান পড়ায় থমকে দাড়াল টগর।টিশার্টের দিয়ে তাকিয়ে দেখে কাধের কাছে ছিড়ে গেছে।শাওন তার মাথায় থাপ্পড় মেরে বলল,”কি’রে তখন থেকে ডাকছি,কানে যায় না?”
টগর ছলছল চোখে বলল,”শুনতে পায় নি ভাই।”
“দু’টো সিগারেট নিয়ে আয় তো।”
“ভাই!আমার তো ক্লাস আছে!”
“যা বলছি তাই কর।”
টগর উশখুশ করতে করতে বলল,”টাকা?”
শাওন ধমকের সুরে বলল,”ফকির না’কি তুই?”
“আমার কাছে টাকা নেই ভাই।”
“ওত সব আমি জানি না,নিয়ে আসতে বলছি,আনবি।ব্যস!”
টগর চুপচাপ চলে গেল।

মিনিট দশেক পরে এসে টগর সিগারেট দিয়ে মাথা নিচু করে বলল,”আমি এবার যাবো ভাই?ক্লাস শুরু হয়ে গেছে।”
শাওন একবার তাকিয়ে বলল,”আচ্ছা যা।”

শাহবাগে টগরের সাথে ফটিক আর রাজার দেখা হয়ে গেল।
রাজা দৌড়ে এসে টগরকে জড়িয়ে ধরে বলল,”টগর ভাই!তুমি আর আমাগো কাছে যাও না ক্যান?”
টগর ফুটপাতে এক হাটু ভেঙ্গে বসে ফটিক আর রাজা দু’জনকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলল,”তোরা এখানে?কি করিস এদিকে?”
ফটিক টগরের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,”কি করতে আমু!যা করতে আয়ি তাই করতে আইছি।”
রাজা নিজেকে ছাড়িয়ে টগরের সামনে দাড়িয়ে বলল,”টগর ভাই!কইলা না ক্যান যাও না আমাগো কাছে?”
টগরের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
সে মুহূর্তে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বলল,”ফটিক!রাজা!তোরা কিছু খাবি?”
ফটিক অভিমানের সুরে বলল,”তুমি জানি কেমন হয়ে গেছো ভাই!”অভিমানে তার কন্ঠ ভারী শুনালো।
রাজা বলল,”ম্যানেজার চাচা কইলো তুমি না’কি এত বড় কলেজে পড়!এহন তুমি অনেক দামী হয়ে গেছো।”বিস্ময়ে রাজার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো।
টগর সেভাবেই হাটু গেড়ে বসে থেকে রাজার বাম গালে তার ডান হাত ছুঁয়ে বলল,”ছিঃ রাজা!এভাবে বলিস না লক্ষ্মী ভাই আমার।তোমাদের ওখানের থেকে এখানে আমার আরো বেশি কষ্ট হয় রে।তবুও এখানে আমি বড় বেশি ভাল আছি।শারীরিক অত্যাচার টা তো নেই।”
ফটিক আর রাজা অবাক হয়ে শুনছিলো।
টগর নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল,”ধুর আমিও না।বাদ দে তো।তোরা এসব জটিল কথা বুঝবি না।আগে বল তো কি খাবি?”
ফটিক আনন্দের চোখে চেয়ে বলল,”আমি গরম ভাত আর গরুর গোশত খাবো।কতদিন খাই না।”বলে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট চুষলো।
টগর রাজার দিকে তাকিয়ে বলল,”আর তুই কি খাবি রাজা?”
রাজা ফটিকের দিকে তাকিয়ে বলল,”আমিও গরম ভাত আর গরুর গোশত খাবো।”
“আচ্ছা চলল” বলে দু’জনের কিশোর কিশোর দু’টো হাত ধরে রাস্তা পার হলো টগর।

দু’জনের দিকে তাকিয়ে চোখে তৃপ্তি নিয়ে তাদের খাওয়া দেখছে টগর।গত মাসে একটা টিউশনি পেয়েছে সে।আজ মাসের শেষে টাকা পেলো তার।টগর মনে মনে বলল,টাকা টা পেয়ে ভালোই হলো।সেটা থেকে এদের খাওয়ানো যাচ্ছে।রাজার দিকে তাকিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এল টগরের।রাজার নামটা সে নিজেই রেখেছিল।
তখন ক্লাস সেভেনে কি এইটে।রাজা এলো।ভারী মিষ্টি চেহারা!বছর ছয়ের হবে।কচি কচি হাত-পা।উষার আকাশে শুকতারার মত জ্বলজ্বল করা চোখ।নামের সাথে নাকি ব্যক্তিত্বের পরিচয় মেলে।তাই সেদিনের ছেলেটার নাম রেখেছিলো রাজা।উজির-নাজির,পাইক-পেয়াদা,মন্ত্রী-সেনাপতি না থাকুক বড় হয়ে যাতে রাজার মন রাজার মত বড় হয়,সে খেয়াল সেদিন টগরের মনে এসেছিলো।

ফটিকের কথা টগরের ভাবনায় ছেদ পড়ল।
ফটিক হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল,”টগর ভাই!তুমি খাবে না?”
টগর হেসে বলল,”না ভাই।তোরা পেট ভরে খা।”
রাজা এক টুকরো গরুর মাংসের সাথে হাতের এক লুকমা ভাত টগরের মুখের কাছে নিয়ে বলল,”টগর ভাই!হা করো।দেখো না কি ভালো খেতে।”
টগর হা করে মুখে নিল।ডান হাত দিয়ে রাজার মাথায় হাত বুলালো।
তার চোখের সামনে কিশোর দু’টো মুখ ঝাপসা হয়ে এলো।
দ্রুত চোখের পানি মুছে হেসে বলল,”আমি লেখাপড়া শিখে যখন বড় চাকরি করবো তখন তোদের আমার কাছে নিয়ে আসবো।”
ফটিক অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,”সত্যি?”
টগর সম্মতিতে মাথা নাড়াল।

দুই।

“ঐ সুনয়না!লাইট অফ করলাম।আমার ঘুম পাচ্ছে।”কথাটা বলে শাওন রুমের লাইট অফ করে দিলো।
টগর হালকা কেশে বলল,”শাওন ভাই!আগামীকাল আমার একটা অ্যাসাইনমেন্ট আছে।”
“এত লেখাপড়া করতে হলে বারান্দার লাইটে গিয়ে কর।লাইট অন থাকলে আমার ঘুম আসে না!”
“আচ্ছা!”বলে টগর উঠে বারান্দায় চলে গেল।

বাইরে তখন চৈত্রপূর্ণিমা।

জোনাকিপোকা আলো বিলিয়ে যাচ্ছে পুরো জগন্নাথ হল আঙিনায়।দেখলে মনে হয় যেন কারেন্টের আলো ভেদ করে আকাশ হতে খসে পড়া সহস্র হাজার তারা।টগর বারান্দার রেলিংয়ে হাত দিয়ে দাড়িয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ।তারপর যে কারনে বাইরে আসা সেটার দিকে খেয়াল দিলো সে।

ক্লাস শেষে টগর হেটে হোস্টেলের দিকে আসছিল।কোথা থেকে হুট করে শাওন এসে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।
টগর ভয় পেয়ে বলল,”শাওন ভাই!আমি তো কিছু করি নি।কই নিয়ে যান?”
“বেশি কথা না বলে চুপচাপ আমার সঙ্গে আয়।”
টগর চুপ হয়ে গেল।

মিনিট তিনেক হাটার পর তারা যেখানে এসে দাড়াল তার থেকে গজ চারেক দূরে একটা মেয়ে দাড়িয়ে।
শাওন টগরকে সেখানে দাড়িয়ে করিয়ে বলল,”তুই এখানে দাড়িয়ে থাকবি।আমরা ঐ রুমটাই যাচ্ছি।কেউ এদিকে এলে আমাকে সিগন্যাল দিবি।মনে থাকবে?”
টগর মাথা নাড়াল।

“কি তোমার এত সময় লাগে আসতে?”রাগে তিশার চোখ জ্বলছিল।
রুমে ঢুকে তিশাকে জড়িয়ে ধরে শাওন বলল,”আরে সুন্দরী!সিকিউরিটি গার্ড খুঁজে পাচ্ছিলাম না যে।”
“ধুস!ছাড়ো তো।তোমার শুধু আজেবাজে কথা।”
শাওন তিশাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে বলল,”আরে সুইটহার্ট রাগ করো কেন?বলছি তো আর দেরি হবে না!”
তিশা ইতস্তত বোধ করতে লাগল।
নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে বলল,”তুমি এসব করতে আমার কাছে আসো?”
শাওন ছেড়ে দিয়ে অভিমান নিয়ে বলল,”এই তোমার বিশ্বাস?আসলে তুমি আমাকে ভালোই বাসো না।”
তিশা শাওনের মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে চোখে চোখ স্থির রেখে বলল,”আমার বড় ভয় লাগে।যদি কিছু হয়ে যায়।”
শাওন তিশার কাধে হাত রেখে বলল,”ডোন্ট ওয়ারি বেবি।আমি তো আছি।”
“তবুও শাওন।এগুলো ঠিক না।”
“ওকে তাহলে আমি যাই।”বলে শাওন হাটা দিলো।তিশা তার হাত টেনে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো।

অনেকক্ষণ বাইরে দাড়িয়ে থেকে টগরের পা লেগে এলো।সে সবুজ ঘাসের উপর বসে পড়ে ঘাস ছিড়তে লাগলো।
আরো মিনিট বিশেক পর শাওন বেরিয়ে এসে বলল,”চল হয়ে গেছে।”
টগর মুখ তুলে উপরে তাকাল।
শাওন হেসে বলল,”কি’রে তুই তো ঘেমে গোসল করে গেছিস।”
টগর হেসে বলল,”ও কিছু না।আমার অভ্যাস আছে।”
“তুই তো আচ্ছা বোকা।ছায়াতে যেয়ে দাড়াতে পারতি তো।”
টগর উঠতে উঠতে বলল,”বাদ দিন তো।আমি যাই শাওন ভাই।”
টগরের চলার পথে তাকিয়ে রইল শাওন।

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর শাওন বিছানায় শুয়ে পড়ল।
রিজুর দিকে তাকিয়ে বলল,”রিজু!তপন শালা আজও আসবে না বোধয়।কি করে রে সারাদিন রাত?তিন বছরে ও যে কি পরিমাণ ক্লাস ফাঁকি দিলো।”
রিজু বইয়ের পাতায় চোখ বদ্ধ করে বলল,”কি জানি!যা করে করুক।”
“এই খাটে আয় তো।গোপন কথা আছে।”
রিজু বিরক্তি হয়ে বলল,”ধুর পড়ছি তো।কাল ক্লাস টেস্ট।তোর তো না পড়লেও চলে।”
শাওন উঠে গিয়ে ওকে টেনে নিজের খাটে এনে বসিয়ে বলল,”এত পড়ে কি হবে বল তো?তার থেকে শোন কি বলি।”
রিজু একটা বালিশ নিয়ে সেটা দেওয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে বসল।
শাওন মেঝের দিয়ে তাকিয়ে বলল,”তুই কি দেখিস?মন দিয়ে পড়।”
টগর মাথা নিচু করে বইয়ের দিকে তাকাল।
শাওন রিজুর কোলে শুয়ে পড়ল।
পা দোলাতে দোলাতে বলল,”দোস্ত!আজকে তিশাকে মন মত আদর করেছি।”
রিজু শাওনের চুল টেনে ধরে বলল,”শালা কিছু একটা হয়ে গেলে ফেঁসে যাবি।”
“ধ্যাত কিছু হবে না।দেখিস!”
শাওন মুচকি হেসে বলল,”আজ কি বলেছে জানিস?”
রিজু নিচু হয়ে শাওনের মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল,”কি বলেছে রে দোস্ত?”
শাওন একটু উচু হয়ে একবার টগরকে দেখল।তারপর আবার রিজুর কোলে শুয়ে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,”আমার ইয়েতে একটা কালো তিল আছে।ওর নাকি খুব ভালো লাগে ওটা।”
রিজু হাসতে হাসতে বলল,”দোস্ত আমাকে তো কোনদিন দেখালি না!”
শাওন রিজুর পেটে ঘুষি মেরে বলল,”শালা তুই গে না’কি?”
“ধুর!আমি তো মজা করলাম।”
সরল টগরের চোখে মুখে কৌতুহল খেলে গেল!মনের ভিতর কেমন একটা হলো তার।বুকের স্পন্দন বেড়ে গেলো।ঠোঁটের কোণে আলতো করে হাসি ফুটে উঠল।শাওনের গোপন সেই কালো তিলটা খুব দেখতে ইচ্ছা হলো টগরের।কোন কামের বশিভূত হয়ে নয়।কেমন একটা অদেখা জিনিসের প্রতি দেখার যে অভিপ্রায় থাকে।
তেমনটা!
নেশা নেশা ভাব চলে এলো তার শরীরে।মনে মনে হাসল সে।কি সব ভাবছে।এটা কখনো সম্ভব নাকি?

সকালের ফুরফুরে হাওয়ায় হাটতে খুব লাগে টগরের।মশার কামড়ে রাতে ভালো করে ঘুমাতে পারে না সে।কিন্তু ভোরে উঠে ঢাকার এমন নির্জন রাস্তায় হাটলে তার মনপ্রাণ ভরে যায়।

ফুরফুরে মন নিয়ে রুমে ঢুকতেই শাওন এসে বলল,”ঐ সুনয়না!তোর খাবারটা রুমে এনে দিয়ে যা।”
রুমে অপরিচিত একটা ছেলের সামনে সুনয়না বলে ডাকায় টগর একটু ইতস্তত বোধ করল।
মাথা নিচু করে বলল,”আচ্ছা ভাই!”

খাবার নিয়ে ফিরে এলে শাওন বলল,”বড় ভাইয়ের সাথে আমার কিছু কথা আছে।তুই একটু বাইরে যা।”
টগর ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

ক্ষুধায় তার পেট জ্বলছে।বেলা হয়ে গেছে বেশ।কিছু একটা খাওয়া দরকার।পকেটে টাকা নেই।
আজ সরকারী ছুটির দিন।পার্বণকে পড়ানো সন্ধ্যায়।তবুও কিছু একটা ভেবে টগর পার্বণদের বাসার দিকে হাটা শুরু করলো।

পড়ানো শেষ হয়ে গেছে।
তবুও টগর বসে আছে দেখে পার্বণ বলল,”স্যার!আম্মু বাসায় নেই নাস্তার জন্য বসে থেকে কি করবেন।আপনি বরং যান।”
টগর কিছুটা লজ্জা পেল।অভাবী হলে সব সময় ভদ্রতা থাকে না।তাদের বাসায় টগরকে হয়তো খুব আগ্রহ নিয়ে খেতে দেখেছে পার্বণ।তাই কিশোর সরল বয়সে অতটা ভেবে কথা বলে নি ছেলেটা।তবুও টগর লজ্জা পেলো।
হালকা হেসে বলল,”নাহ্।কাজ নেই তো তাই একটু বসে যাচ্ছি।”
তারপর উঠতে উঠতে বলল,”তাহলে তুমি পড়াটা ঠিক করে রেখো পরশু আবার আসবো।কেমন?”
পার্বণ মাথা নাড়াল।

রাস্তায় বেরিয়ে সে পানির কল খুঁজতে লাগলো।শহরের অলিগলিতে পানির কল থাকে।অথচ আজ চোখে পড়ছে না।ভাগ্য খারাপ হলে যা হয় আর কি!কিছুদূর এসে একটা চোখে পড়লো বটে।কিন্তু তাতে বস্তির লাইন লেগে আছে।অগত্যা উপায় না দেখে হোস্টেলের দিকে হাটা শুরু করলো।

রিজু এসে হাত টান মেরে বলল,”কি’রে রাস্তায় ঘুরছিস কেন?”
টগর অবাক হয়ে ফিরে তাকাল।
ঢাকা শহরে তাকে এভাবে ডাকার মত কেউ নেই।থাকার মধ্যে রাজা আর ফটিক।তারা এদিকে আসবে না।
রিজুকে দেখে ভীতু হয়ে ঢোক গিলে বলল,”ভাই আপনি?”
রিজু বলল,”আচ্ছা আমাদের রুমে জিকু ভাই আসার কথা ছিলো।আসছে না’কি?তুই জানিস?আমি তো সকালে বেরিয়ে এলাম।”
টগর বলল,”কেউ একজন আসছে।উনি হবে বোধয়।”
রিজু হাসতে হাসতে বলল,”তাই বুঝি শাওন তোকে বেরিয়ে দিছে?”
“কি যে বলেন ভাই।”ফেলে আসা পথের দিকে ইশারা করে টগর বলল,”আমি টিউশনিতে গিয়েছিলাম।”
রিজুর তার কাধ চাপড়ে বলল,”খেয়েছিস?”
টগর আবারও ঢোক গিলে বলল,”হুঁ!”
“আচ্ছা যা তাহলে।আমার খুব ক্ষুধা লাগছে,কিছু খেয়ে আসি।”

রিজু চলে গেল।

তার চলার পথে তাকিয়ে রইল টগর।তারপর হালকা হেসে নিঃশ্বাস ফেলে হাটতে লাগল সে আবার।

তিন।

এভাবে দাড়িয়ে থাকতে টগরের বিরক্তি লাগছে।

শাওন প্রেম করবে আর তার দাড়িয়ে থাকতে হবে।সে কি প্রেমের পাহারাদার না’কি?কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হয় তার।কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে আসে।বুকের ভিতর দুরুদুরু করে।শাওন একবার দেখে ফেললে তার অবস্থা করুন হয়ে যাবে।তবুও সে’রাতে রিজুকে বলা শাওনের কালো তিলের নেশা ঘোরে টগরের মাথায়।

ধীর পায়ে সে পা বাড়ায়।রুমের একটা জালানা খোলা।নিঃশব্দে টগর চোখ রাখে তাতে।চোখের সামনে ভাসে শাওনের কোলে বসা তিশার মুখ।টগর চোখ বন্ধ করে একবার ঢোক গেলে।হৃদ স্পন্দন বাড়তে থাকে তার।

তিশা কোল থেকে উঠে দাড়িয়ে বেঞ্চে আধো বসা শাওনের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,”আজ নয় শাওন।আমার সমস্যা চলছে।তারপর বাড়াবাড়ি একটা হয়ে যাবে।”
শাওন তিশার কাধে এক হাত রেখে বলল,”কিছু হবে না।আমি তো আছি।”
“আমার ভয় লাগে।তুমি পরে যদি অস্বীকার করো তখন আমার মরণ ছাড়া গতি নেই।”
শাওন অভিমানী সুরে বলল,”আমাকে ভালোবাসো তো তুমি?”
“হুঁ”বলে তিশা মাথা নিচু করল।
হয়তো কিছু একটা হবে এমন প্রত্যাশায় টগর পাথর হয়ে দাড়িয়ে রইলো।চোখে তার শাওনের বিশেষ কোন জায়গায় কালো তিল দেখার নেশা।
শাওন উঠে দাড়িয়ে বলল,”ওয়েট!জানালাটা দিয়ে আসি।”
টগর যেমন নিঃশব্দে কৌতূহলে এসেছিলো তেমন নিরানন্দে সংকোচে সরে গেল।

মিনিট বিশেক পরে যখন শাওন ফিরে এল তখন টগরের মাথা নিচু।শাওনের শক্ত হাতের সজোরে থাপ্পড়ে তার গাল লাল হয়ে গেছে।
শাওন রক্তচক্ষু নিয়ে বলল,”তোরে না আমি এখানে দাড়াতে বলছি।তুই জানালার কাছে কি করতে গেছিলি?”
টগরের চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।
ভীরু গলায় বলল,”শাওন ভাই ভুল হয়ে গেছে!”
“আজকের কথা যদি কেউ জানে তোর কপালে দুঃখ আছে।”
“আচ্ছা” বলে টগর দ্রুত সেখান থেকে সরে গেলো।
শাওন সজোরে মাটিতে আঘাত করে বলল,”কুত্তার বাচ্চা।”

রাস্তায় এক সন্ধ্যায় ম্যানেজারের সাথে দেখা হয়ে গেল টগরের।
ম্যানেজার হেসে বলল,”কি’রে সেই যে এলে আর তো ওদিকে ফিরেও তাকালে না।”
টগর জড়সড়ভাবে বলল,”চাচা!লেখাপড়ার চাপ তো তাই যাওয়া হয় না।”
ম্যানেজার বিদ্রুপের সুরে বলল,”খুব যে লেখাপড়ার অজুহাত দিচ্ছো।আমরা না চাইলে কি তুমি এত দূর আসতে পারতে?”
টগর মাথা নিচু করে বলল,”সে তো ঠিক চাচা।”
ম্যানেজার এগিয়ে এসে গালে হাত দিয়ে বলল,”হোস্টেলে থেকে খেয়ে তো বেশ শরীর বানিয়েছো।”
টগর একটু সরে দাড়িয়ে বলল,”চাচা!আজ আসি।আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“আরে এত তাড়া কিসের।”তারপর চোখ সরু করে বলল,”একদিন এসো!কথা আছে তোমার সাথে।”
“আচ্ছা” বলে টগর একপ্রকার দৌড়ে পালিয়ে গেলো।

গভীর রাতে চিৎকার করে টগর উঠে বসল।
পায়ে দু’হাত চেপে ধরে বলল,”শাওন ভাই!কি করলেন এটা?”
রিজু ধড়ফড়িয়ে উঠে লাইট জ্বালিয়ে বলল,”কি’রে শাওন কি হলো?”
শাওন বিরক্তি নিয়ে খাটে বসতে বসতে বলল,”ধ্যাত!যাবো টয়লেটে।সব সময় কি মনে থাকে মেঝেতে ও শুয়ে আছে।নামতে গিয়ে ওর পায়ে পাড়া লাগছে।”
চোখে লাইট পড়ায় পাশ ফিরতে ফিরতে তপন বলল,”কি’রে এত রাতে আবার কি শুরু করলি তোরা?একটু ঘুমাতে দে।”
রিজু তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,”গাঁজাখোর!তোকে ঘুমাতে কে মানা করছে?”
বিদ্রুপটা তপনের কানে গেলো না।সে আবার ঘুমিয়ে গেল।
রিজু শাওনের দিকে ফিরে বলল,”দেখ শাওন।ওকে নিয়ে আমরা মজা করি ঠিক আছে।কিন্তু ও ও তো মানুষ।তুই আজকাল একটু বেশি করছিস।”
“রিজু জ্ঞান দিবি না।এসব আমার একদম ভালো লাগে না।”
রিজু হেসে বলল,”তোকে জ্ঞান দিচ্ছি না।কিন্তু ভেবে দেখ,আমরা সবাই খাটে শুই,ছেলেটা মেঝেতে শোয়।মশার কামড়ে ঠিক মত ঘুমাতে পারে না।তার উপর এত নিষ্ঠুর হওয়া ঠিক না।”
শাওন দৃষ্টি সরু করে বলল,”এত দরদ হলে তোর কাছে শোয়া।”
“খাট ছোট না হলে তাই করতাম” বলে রিজু বৃথা হাসার চেষ্টা করলো।
টগর মাথা উচু করে বলল,”ভাই!আপনারা এত রাতে তর্ক করেন না।আমার কিছু হয় নি।আমি ঠিক আছি।”
শাওন গদগদে সুরে কি বলে টয়লেটে চলে গেলো।

অর্ক এসে মাথায় হালকা আঘাত করে বলল,”কি’রে খুড়িয়ে হাটছিস কেন?”
টগর হেসে বলল,”আর বলিস না।রাতে শাওন ভাই খাট থেকে নামতে গিয়ে পায়ে পাড়িয়ে ধরছে।”
অর্ক কপাল গুছিয়ে বলল,”শাওন ভাই সিনিয়র হয়ে একটু বেশি মাস্তানি করে।তোকে কতবার বললাম হোস্টেল ছেড়ে দিয়ে আমাদের মেসে আয়।তুই তো কথা শুনিস না।”
টগর হেসে বলল,”ধুর!অত টাকা পাবো কই?”
অর্ক তুমি সম্মোধনে ভৎসনা করে বলল,”তুমি তো আবার ন্যায় নীতির আদর্শ প্রতীক।থাকো সেটা নিয়ে।মাথা মোটা।চল ক্লাস শুরু হয়ে গেছে বোধয়।”

ক্লাসের এই একটা ছেলে টগরের সাথে মেশে।বাকিরা ধারে কাছে ঘেষে না।সেলাই করা একটা লাল টকটকে টিশার্ট আর ফিকে হওয়া ঘিয়ে রংয়ের প্যান্টে টগরের প্রায় এক বছর চলে গেলো।রুমে একটা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জিতে চলে যায়।তবুও শাওন,রিজুর সামনে তার লজ্জা লাগে।মাঝে মাঝে চোরা চোখে তাকায় তাদের দিকে,বুঝতে চেষ্টা করে তাকে ওরা লক্ষ্য করছে কি’না।চোখাচোখি কখনো হয় না।অস্বস্তির হাত থেকে বেঁচে যায় টগর।মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবে,আমার দিকে এদের খেয়াল কেন আসবে?আমি কি আর ওদের লেভেলের!বরং এটা ভেবে তার মন ভালো হয়,যাক কেউ তো খেয়াল করছে না।তবুও তার মনে হয় কেউ যেন একজন তাকে খেয়াল করছে।

ক্লাস থেকে রুমে ফিরে শাওনকে শোয়া দেখে টগর ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলো,”শাওন ভাই।ক্লাসে যান নি?”
কোন সাড়া পেলো না।টগর সংকোচ নিয়ে শাওনের গায়ে হালকা ধাক্কা দিল।
“শাওন ভাই।ভাই।”
জ্বরে শাওনের গা পুড়ে যাচ্ছে।
শাওন কোনমতে চোখ খুলে বলল,”কে?রিজু!”
টগর বলল,”না ভাই।আমি।”
“ওহ” বলে শাওন নিস্তেজ হয়ে গেল।
টগর দ্রুত নিচে নেমে এল।
এই এলাকা সে ভালো করে চেনে না।ভার্সিটির মেডিকেল সার্ভিস আছে কি’না তাও তার জানা নেই।সে হল ছেড়ে রাস্তায় নেমে এল।সূর্যের কিরণ তখন প্রখর।আশেপাশে ফার্মেসির দোকান খুঁজতে লাগলো।

শেষে ওষুধ আর কেক নিয়ে ফিরে গেল।
তখনও শাওন অচেতন।
টগর আবার ডাকল দিল,”শাওন ভাই।”
শাওন টলমল চোখে চেয়ে বলল,”টগর!রিজু কই?”
শাওন আজ প্রথমবার জ্বরের ঘোরে টগরকে নাম ধরে ডাকল।সব সময় সুনয়না বলে ডাকা তার অভ্যাস।টগর অবাক হলো না।কেমন একটা ভালো লাগা খেলে গেলো তার শরীর ও মনে।
ঢোক গিলে টগর বলল,”রিজু ভাই তো বাড়িতে গেছে।আজ আর ফিরবে না বোধয়।”
গ্লাস ভর্তি পানি নিয়ে টগর খাটে বসতে বসতে আবার বলল,”সকালে তো কিছু খান নি বোধয়।কেক আনছি,খেয়ে ওষুধ খান।”
শাওন ঘুম ঘুম চোখে চেয়ে বলল,”ওষুধ খেতে অসহ্য লাগে।তুমি ফেলে দাও।”
তাকে তুমি সম্মোধনটাও শাওনের এই প্রথম।কেমন মধুর শোনালো।টগর সাহস নিয়ে এগিয়ে শাওনের মাথার নিচে হাত দিয়ে তাকে তুললো।দেওয়ালে একটা বালিশ রেখে তাতে ঠেস দিয়ে তাকে বসাল।
মুখের কাছে কেক নিয়ে বলল,”হা করুন তো।”
অনিচ্ছা নিয়ে শাওন টগরের হাতে কেক খেলো।
ওষুধ খেয়ে বিছানায় শুতে শুতে শাওন বলল,”রিজুকে একটু খবর দাও না।”

টগর কিভাবে খবর দিবে?রিজুর মোবাইল নাম্বার জানে না।তার নিজের কোন মোবাইল নেই।মনে মনে ভাবল,ওষুধ তো খেলো দেখা যাক কি হয়।
সে সন্ধ্যায় তপন,রিজু কেউ ফিরলো না।
পাশের রুমে কারোর সাথে টগরের সখ্যতা নেই।জ্বর পড়ে গেছে শাওনের।তবুও সে কেমন অচেতনের মত পড়ে আছে বিছানায়।

টগর সন্ধ্যায় রুটি কলা এনে রাখল।

নয়’টার দিকে শাওনকে ডেকে সেগুলো খাইয়ে ওষুধ দিলো।
তারপর নিজে পড়তে বসলো।

চার।

টগর পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই।
রুমের লাইট জ্বলছে।
বই তার পাশে পড়ে আছে।
অদ্ভুত একটা শব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল।চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসে দেখলো শাওন শীতে কাঁপছে।সে শাওনের আশেপাশে কাঁথা খুঁজতে লাগলো।
পেলো না।
মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে টগর এই গরমের ভিতরও কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাতো।উপায় না দেখে সে তার কাঁথাটা শাওনের গায়ের উপর দিলো।কপালে হাত দিয়ে দেখলো,জ্বর বেড়ে গেছে।রিজুর টেবিল থেকে জগ এনে তাতে গামছা ভিজিয়ে শাওনের কপালে জলপটি দিতে লাগলো।
তখন টগরের মনে নেশা চেপে বসল।শাওন জ্বরের ঘোরে।একবার লুঙ্গিটা সরিয়ে সে তো তিলটা দেখতেই পারে।কেউ তো দেখবে না।কাঁপা হাতে শাওনের লুঙ্গিতে হাত রাখল।তারপর অনেকক্ষণ কেটে গেলো।কি ভেবে সে হাতটা হঠাৎ সরিয়ে গুটিয়ে ফেললো।

ভোর রাতে জ্বর কিছুটা কমে এলে টগর সব রেখে ঘুমাতে গেল।

একে দু’য়ে রমজান মাস যায় যায় করছে।জগন্নাথ হল ছাত্র শূন্য হতে শুরু করলো।
শাওন ব্যাগ গোছাতে গোছাতে রিজুকে বলল,”এবার কি নানু বাড়ি ঈদ করছিস নাকি?”
রিজু একবার তাকিয়ে আবার নিজের কাজ করতে করতে বলল,”না!বড় দুলাভাই বিদেশ থেকে এসেছে।এবার বাড়িতে ঈদ করতে হবে।তবে ঈদের পরের দিন আমি নানু বাড়ি যেতে পারি।”
শাওন বলল,”তবে আমাদের বাড়িতে যাস কিন্তু।আর আন্টিকে আমার সালাম দিস।”
“ওকে।তোর হলো?চল বেরোই।”
শাওন একবার টগরের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,”আমরা গেলাম।নিজে যাওয়ার সময় যেন সব ঠিকঠাক করে রেখে যাওয়া হয়।”
টগরের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
হ্যা সূচক সম্মতিতে টগর বাম দিকে মাথা নিচু করলো।

গেটে সামাদের সাথে দেখা হয়ে গেল শাওন আর রিজুর।

সামাদ হোস্টেল তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকে।বয়স পঁয়ত্রিশ পেরোনোর আগে চুলে পাক ধরেছে।হোস্টেলের সবাই তাকে সামাদ ভাই বলেই ডাকে।
শাওন হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল।
“সামাদ ভাই আসি তাহলে।আপনি কখন যাচ্ছেন?”
সামাদ একটা হতাশ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,”আমার এবার যাওয়া হচ্ছে না ভাইয়েরা।”
রিজুর দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,”তবে তোমাদের ভাবী,ভাতিজীর জন্য টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি।”
শাওন অবাক হয়ে বলল,”যাচ্ছেন না কেন ভাই?”
সামাদ প্রথমবারের মত আবারও একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল।তবে এটা দীর্ঘশ্বাসে পরিনত হলো।
“তোমাদের রুমমেট টগর।ছেলেটা এতিম।আত্মীয় স্বজনও নেই।একটা এতিমখানা থেকে কোনমতে এই পর্যন্ত আসছে।এতিমখানার ম্যানেজার ফজলে শরীফ,লোকটা চরম খারাপ।এখন ছেলেটা অত্যাচারের ভয়ে সেখানেও যায় না বহুদিন।”

শাওন আর রিজু অবাক হয়ে শুনলো।

টগরকে কত অত্যাচার করেছে।ছেলেটা কোনদিন মুখ তুলে প্রতিবাদ পর্যন্ত করে নি।টগরের কাছে কোনদিন কোন আত্মীয় স্বজন আসতে দেখেনি তারা।সে সব সময় একটা টিশার্ট আর প্যান্ট পরে ক্লাসে যেতো বলে তারা অগোচরে কিপ্টে বলে হাসাহাসি করতো।শাওনের হাতের টানে যেদিন টগরের লাল টকটকে টিশার্ট টা ছিড়ে গেল।পরের দিন দেখা গেল সেটার ছেড়া জায়গায় সেলাই করা।দেখে তো কি হাসি তাদের।

সামাদ পুনরায় বলল,”আমার নিজের তো মা-বাবা বেঁচে নেই।তাই এতিমের কষ্ট কি সেটা বুঝি।ভাবলাম সব সময় তো যায় এবার না হয় এতিম ছেলেটার জন্য একটু আনন্দের উৎস খুঁজি।”
শাওন সামাদের হাত ধরে বলল,”সামাদ ভাই।আপনি বাড়িতে যাবেন।আমি আসছি।”
শাওন দৌড় দিল।
রিজু পিছন থেকে ডেকে বলল,”শাওন কই যাস?আমাদের লেট হয়ে যাইতেছে তো।”
শাওন দৌড়ে বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় উঠে গিয়ে রেলিং ধরে মুখ বাড়িয়ে বলল,”ভুলগুলো শুধরাতে।তুই একটু ওয়েট কর দোস্ত।”

হঠাৎ শাওন রুমে ঢুকাই টগর ধড়ফড়িয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে দাড়াল।
মাথা নিচু করে বলল,”সরি ভাই।ভুল হয়ে গেছে।”
শাওন দু’হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে ব্যাগ নিয়ে খাটে বসে পড়ল।
টগর সেভাবেই মাথা নিচু করে ভীতু সুরে বলল,”আর এমন হবে না।আসলে কোনদিন টেবিলে বসে পড়ি নি তো।আপনারা চলে গেলেন।ভাবলাম একটু বসলে কি আর এমন হবে।”
শাওন চুপ করে টগরের দিকে তাকিয়ে রইলো।
টগর হঠাৎ নিচু হয়ে বসে শাওনের পা জড়িয়ে ধরে বলল,”শাওন ভাই।সত্যি ভুল হয়ে গেছে।আমি আর কোনদিন আপনার টেবিলে বসবো না।এবারের মত মাফ করে দিন।”
শাওন উঠে দাড়িয়ে টগরকে তুলে তার বাম গালে সজোরে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।নিজের উপর অভিমানে শাওনের চোখ পানিতে ঝাপসা হয়ে এলো।রাগে তার শরীর জ্বলছে,তার সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে খুব মারতে ইচ্ছা হলো।
টগরকে আচমকা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে দিলো শাওন।
অস্পষ্ট সুরে কথা আওড়াতে আওড়াতে বলল,”এত ভালো তোকে কে হতে বলেছে রে?”
আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,”তুই কি মানুষ?তোর গায়ে রক্ত নেই ছাগল?”

আকস্মিক এমন ঘটনায় টগর বাক রুদ্ধ হয়ে গেলো।সে দু’হাত প্রশস্ত করে শাওনের পিঠ বাহুবন্ধ করলো।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর টগর শাওনের পিঠে হালকা খোঁচা মেরে বলল,”শাওন ভাই।আপনার কি হয়েছে?শরীর খারাপ লাগছে?”
টগরকে ছেড়ে দিয়ে এদিকওদিক তাকিয়ে শাওন ভাঙ্গা গলায় বলল,”তোর ব্যাগ কই?”
টগর বলল,”কেন?কি হয়েছে?আমাকে বলুন।”
“যা বলছি তাই কর।আমার মাথা গরম করাবি না!”
টগর ব্যাগ বের করে দিল।
শাওন ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল,”কি কি নিবি জলদি বল?”
পকেট হতে মোবাইল বের করে নাম্বার ডায়েল করে টগরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,”আমার মা!কথা বলবে!”
টগর কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইলটা কানের কাছে নিল।
ওপাশ হতে শাওনের মা বলল,”টগর?”
টগরের হৃদ স্পন্দন বেড়ে গেল।
কোনমতে বলল,”আন্টি আসসালামু আলাইকুম!”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
“জি!কি বলবেন বলুন।”
শাওনের মা বলল,”আসলে বাবা,আমার ছেলেটা তোমার সাথে কেমন কি করেছে জানি না।ও কিন্তু ওমন না।একটু আগে যখন দৌড়াতে দৌড়াতে আমাকে ফোন দিয়ে কাঁন্নাকাটি করলো,তখন বুঝলাম কিছু একটা হয়েছে।জিজ্ঞাসাতে করতেই কাঁদতে কাঁদতে বলল,মা,টগর।আমি একটা এতিম ছেলের সাথে অন্যায় করেছে ফেলেছি।”
টগরের কোন সাড়া না পেয়ে শাওনের মা বলল,”হ্যালো টগর।আছো বাবা?”
টগর ধরা গলায় বলল,”জি আন্টি!”
তিনি মমতা ভরা কন্ঠে বলল,”তোমার মা-বাবা,আত্মীয়জন নেই এটা কখনো ভাববে না!আজ থেকে আমি তোমার মা।”
টগর নির্বাক কন্ঠে বলল,”মা?”
শাওনের মা বলল,”আজ থেকে আমার দু’টো ছেলে।তুমি শাওনের সাথে ঈদে তোমার মায়ের কাছে আসবে।কি আসবে তো বাবা?”
টগরের চোখ ফেটে ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রু পড়তে লাগলো।
এক হাত দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,”আসবো মা!নিশ্চয় আসবো।আমার মা ডেকেছে আর আমি যাবো না?তাই কখনো হয়?”
“আচ্ছা বাবা!ঐ ছাগলটাকে নিয়ে সাবধানে এসো।”
“আচ্ছা মা!আপনার ছেলের দায়িত্ব আমার।”
কথাটা বলে জীবনের সবচেয়ে একটা আনন্দের হাসি দিলো টগর।আবেগী অশ্রুর মাঝে আলাদাভাবে আনন্দ অশ্রুর ঝরা জল যেন ধরা দিল তার চিকচিক করা মায়াবী চোখে।
শাওন আবার এসে জড়িয়ে ধরে বলল,”চল ভাই।আমরা মায়ের কাছে যায়।”

ছুটি শেষে একে একে হোস্টেল সরগম হতে শুরু হলো।সন্ধ্যায় রুমে ফিরে এসে শাওন দেখে টগর মেঝেতে বিছানা করছে।
শাওন দৌড়ে এসে মেঝেতে পাতা বিছানায় দু’হাটু গেড়ে বসে বলল,”বাড়ি থেকে ফিরেই আমাকে বকা খাওয়ানোর ধান্দা হচ্ছে?”
“কেন মিয়াভাই?আপনাকে কে বকবে?”
শাওন ডান হাত মুষ্টি করে বলল,”ঘুষি মেরে তোর নাক ফাটিয়ে দিবো!কতবার বলবো যে তুমি করে বলবি!বাড়িতে গিয়েও আপনি এগ্গে করে মাথা খারাপ করলি।”
শার্টের কলার ঝেড়ে বলল,”আমি তোর বড় ভাই।যা বলবো তাই করবি।”
“ইশ!যা বলবো তাই করবি।”বলে ভেংচি কাটলো টগর।রিজু তার বিছানায় বসে শব্দ করে হেসে উঠলো।
শাওন একবার সেদিকে তাকিয়ে বলল,”মজা নিচ্ছিস?মেরে তোরও নাক ফাটাবো।”
“আয় দেখি” বলে রিজু খাটে উঠে দাড়াল।
শাওন উঠে গিয়ে রিজুকে খাটে ফেলে গায়ের উপর চড়ে বসে গলা টিপে ধরলো।
রিজু কাশতে কাশতে বলল,”সরি দোস্ত।ভুল হয়ে গেছে।মরে যাবো।”
“ওর সাথে আর তাল দিবি বল?”
“কখনোই না।এবার তো ছাড়।”
শাওন খাট থেকে নেমে আবার টগরের সামনে হাটু গেড়ে বসে বলল,”তুই নিচে শুস জানলে মা আমাকে আস্ত রাখবে?”
“তোমার ঐটুকু খাটে দু’জনে শোয়া যায়?আমার দম বন্ধ হয়ে যাবে।”
“ধুস হয়ে যাবে দু’ভাইয়ের।চল তো।”
কথা শেষ করেই টগরের হাত থেকে কাঁথা বালিশ তার বিছানায় ফেলে দিলো।

অভিমানে রিজুর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।এতক্ষণে মুখে লেগে থাকা হাসিটা তার ম্লান হয়ে গেল।

পাঁচ।

শ্রাবণ মাস চলছে।

সকাল থেকে গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে চেনা শহর অচেনা হয়ে গেছে।
টগর হোস্টেল রুমের জানালা ধরে বাইরের বৃষ্টি দেখছে।রিজু শুয়ে শুয়ে পা দুলিয়ে চলেছে আর বারবার আড়চোখে টগরকে দেখছে।

বৃষ্টিতে ভিজে তিশা একাকার।তবুও হেটে চলেছে কোন এক গন্তব্যে।হঠাৎ টগরের চোখ পড়তে দেখল তিশা আপু দ্রুত সেদিকে যাচ্ছে যেখানে শাওন আর সে বরাবর দেখা করতো।তাদের বিশেষ এক সাক্ষী হয়ে পাহারা দিতো টগর।টগর একটু অবাক হলো।এত বৃষ্টির মাঝে তিশা আপুর কি এমন দরকার ওখানে?একটু পর যখন সে শাওনকেও যেতে দেখল তখন ব্যাপারটা দেখার জন্য দ্রুত নিচে গেল।রিজু উঠে বসে ভাবল টগর এমন কেন?

তিশার চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে।মাথা নিচু করে কেঁদে কেটে একাকার।টগর দ্রুত এসে সেই জানালার কাছে দাড়াল।
শাওন বিরক্তি নিয়ে বলল,”শিট!তুমি সাবধান থাকবে না?মেয়েদের ব্যাপার আমি ওতো বুঝি?”
তিশা মাথা নিচু রেখেই বলল,”তখন তো না দিলে রাগ করতে!”
শাওন বুকের সাথে দু’হাত বেধে নাচানো পায়ের আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে বলল,”যাই হোক!কয় মাস চলছে?”
“পাঁচ মাস।”
“হোয়াট?তুমি পাঁচ মাসে এসে টের পেলে?ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি?”
“বুঝতে পারি নি।গতকাল ডাক্তার চেক আপ করিয়ে জানতে পারছি।বাসার কেউ এখনো জানে না।হোস্টেলের কেউও জানে না।ঈদে বাসায় গিয়ে খারাপ লেগেছিলো কিন্তু এতদূর বুঝিনি।”
“ননসেন্স।কিন্তু পেট তো বোঝা যাচ্ছে না।”
তিশা নাক টানতে টানতে বলল,”স্বাস্থ্য ভালোর জন্য বোঝা যাচ্ছে না।”
“সেই।যাই হোক।আমি এসব দায়িত্ব নিতে রাজি না।তাছাড়া আব্বু শুনলে আমাকে মেরে ফেলবে।একজন মেয়রের ছেলে হয়ে এসব করেছি জানলে মিডিয়ায়,রাজনীতি অঙ্গনে আমার বাবার সম্মান থাকবে?আগামীকাল আমি মেডিকেল নিয়ে যাবো।তুমি বাচ্চা নষ্ট করে ফেলবে।
তিশা ছলছল চোখে বলল,”সেটাও বলছিলাম ডাক্তারকে,বলল,বাচ্চা অনেক বড় হয়ে গেছে।এখন করলে সমস্যা হবে?”
“সো হোয়াট?আমরা অন্য ডাক্তারের কাছে যাবো।”
“কিন্তু শাওন….”
কথা শেষ হলো না তিশার।
শাওন বলল,”কোন কিন্তু না।দ্যাট’স ফাইনাল।”বলে শাওন দ্রুত বেরিয়ে গেল।
তিশা এক হাত দিয়ে মাথা ধরে বেঞ্চে বসে পড়লো।

টগর আড়াল থেকে বেরিয়ে তিশার সামনে গিয়ে দাড়াল।

তখন বাইরে অঝোরধারায় বৃষ্টি শুরু হলো।

হোস্টেল রুমের দরজায় দাড়িয়ে টগর এদিকওদিক তাকিয়ে বলল,”রিজু ভাইয়া!আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে!”
“হুম বলো।”
“এখানে নয়।”
“চল কোথায় যাবে।”
টগর ঘুরে দাড়িয়ে হাটা দিলো।
রিজু খাট হতে উঠে দাড়িয়ে টগরকে অনুসরণ করতে লাগলো।

বৃষ্টির জলস্নানে তারা দু’জন গিয়ে ঢুকলো সেই খোলা জানালার রুমটাতে।যেখানে দাড়িয়ে টগর দেখতো তিশা আর শাওনের শত প্রেম সোহাগ।

টগর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রিচার্জ দোকান থেকে রিজুকে কল করল।
“কিছু ম্যানেজ হলো রিজু ভাইয়া?”
রিজু ঢোক গিলে বলল,”টগর!হাজার পাঁচেক জোগাড় হয়েছে।”
টগর হতাশ হয়ে বলল,”আচ্ছা ওতেই হবে ভাইয়া।বাকিটা আমি ম্যানেজ করে নিবো।”
রিজু বলল,”কিন্তু টগর,তিন মাসের বাসা ভাড়াটাও তো বাকি।এত টাকা কই পাবে তুমি?”
“রিজু ভাইয়া!আগে হাসপাতালের বিল পরিশোধ তো করি।তারপর আমি দেখছি।”
রিজু একবার ভেবে বলল,”আমি কি একবার শাওনকে বলে দেখবো?”
টগর অনুনয়ের সুরে বলল,”আপনি এসব বললে উনি আপনাকে অপমান করবে ভাইয়া।তাছাড়া এগুলো সবাই যাতে না জানে তার জন্য এত কিছু।আপনি তো সবটাই জানেন।”
“সেটা ঠিক আছে কিন্তু তুমি একা এত কিছু কিভাবে সামলাবে?তার উপর আমার এক্সাম চলছে।একটিবার যে হাসপাতালে যাবো,তাও পারছি না।”
“ভাইয়া!আপনি আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন।এটাই বা কয়জন করে?আপনি শুধু দোয়া করবেন যেন ওরা দু’জন সুস্থ থাকে।”
রিজু বিনয়ী ভাবে বলল,”তোমার খাওয়া দাওয়া কি কিছু হচ্ছে টগর?নাকি ওদের পিছনেই দৌড়াচ্ছো শুধু?”
“না মানে ভাইয়া…”
কথাটা শেষ হলো না টগরের।
রিজু ধমকের সুরে বলল,”শোনো!অনেক হয়েছে পরোপকার।করছো ভালো কথা,তবে নিজের শরীরের দিকে খেয়াল কে দিবে?তোমার যে দু’দিন পর এক্সাম!”
টগর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,”এটা আমার স্বপ্নের মত!কি করবো বলুন।”
“সেটা ঠিক আছে,তবে তোমার সুস্থ থাকার উপর তোমার স্বপ্ন নির্ভর করছে।”
“ওকে ভাইয়া!আমি নিজের খেয়ালও রাখবো।”
“হুম!নিজের খেয়ালও একটু রেখো।”
“আচ্ছা ভাইয়া তাহলে আমি রাখছি।আপনি ঐ টাকাটা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।”

শাওন দৌড়ে এসে রিজুর কাধে হাত রেখে বলল,”কি’রে এত কথা কার সাথে?এক্সাম শুরু হতে চলল আর তুই এখনো মোবাইলে বকবক করে যাচ্ছিস।”
রিজু মোবাইল পকেটে রাখতে রাখতে বলল,”সব ঝামেলা তোর জন্য!”
শাওন অবাক হয়ে বলল,”মানে?”
“না কিছু না।চলো এক্সামে লেট হয়ে যাবে।”
শাওন ঘুরে রিজুর সামনে দাড়িয়ে বলল,”কিছু না মানে কি?কি সব বললি তুই।”
রিজু একবার ভালো করে শাওনের দিকে তাকিয়ে বলল,”তুই এতটা স্বার্থপর হলি কিভাবে?চারটা বছর হলো তোর সাথে আছি।অথচ তোকে চিনলামই না।”
শাওন রেগে গিয়ে বলল,”বাজে বকিস না তো।কি হয়েছে বল।”
“আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে” বলে রিজু পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে গেল।
শাওন সেভাবেই দাড়িয়ে থেকে বলল,”এটা কিন্তু ভালো করছিস না রিজু।অর্ধেক কথা আমার একদম পছন্দ না।”
রিজু তেমন করেই হেটে চলে গেল।
একটিবার ফিরেও তাকালো না।

“আসবো?” টগরের কন্ঠ যেন কাঁপতে লাগলো।
ম্যানেজার ফজলে শরীফ তাকিয়ে বলল,”আরে এতদিন পর।এসো এসো।তা মিয়া তোমার খবর কি?”
টগর মাথা নিচু করে তার সামনে গিয়ে দাড়িয়ে বলল,”চাচা!আপনার কাছে আমার কিছু টাকা জমাবো ছিল উপবৃত্তির।একবার দিলে হতো না?আমার খুব দরকার ছিলো।”
এতিমখানার ম্যানেজার হেসে বলল,”টাকা তো তোমাকে সবই দিবে।”
পানের পিক ফেলে আবার বলল,”আমার সবই তো তোমার।কিন্তু আমাকে খুশি করো?”
টগর বসে ম্যানেজারেরর পা ধরে বলল,”চাচা!দিন না?আমার খুব দরকার টাকাগুলা।”
ম্যানেজার আবার পিক ফেলতে ফেলতে বলল,”তোমার জমানো টাকার চেয়েও বেশি দিবো।যদি তুমি মাঝে মাঝে এখানে এসে আমার সেবা শুশ্রূষা করবে বলে কথা দাও।”
টগর এবার পা ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে বলল,”বহুত হয়েছে চাচা।আমি কিন্তু এবার কর্তৃপক্ষে জানাতে বাধ্য হবো।”
ফজলে শরীফ উঠে দাড়িয়ে টগরের চুল ধরে বলল,”শালির পো।একদম জবেহ করে দিবো।”
টগর নিজেকে ছাড়িয়ে বলল,”আপনি সীমা অতিক্রম করছেন।”
ম্যানেজার টগরের মুখের কাছে গিয়ে বলল,”একবার বলে তো দেখ।তোর পেয়ারের রাজা আর ফটিককে খুন করে দিবো।”
টগর ঢোক গিলল।
ম্যানেজার ধাক্কা মেরে তার রুম থেকে বের করে দিলো তাকে।

রাস্তায় নেমে আকাশের দিকে তাকালো টগর।
এত দূরের আকাশ।
এত বিশাল আকাশ।
তার অসহায়ত্বের দিকে চেয়ে যেন মুচকি হাসছে।

ছয়।

ছয় বছর পর।

অফিস থেকে ফিরে সোফায় বসে টাবু কে জড়িয়ে ধরে টগর বলল,”আমার বাবু টা টিভিতে কি দেখে?”
টাবু হাতে থাকা রিমোট লুকিয়ে বলল,”রিমোট নিবে না।দেখছো না আমি কার্টুন দেখছি।”
টগর আহ্লাদী সুরে বলল,”ওলে বাবা!আমার টাবু সোনা কার্টুন দেখে?তাহলে তো ডিস্টার্ব করা যাবে না।”
টাবুর বা গালে একটা চুমু দিয়ে সে আবার বলল,”তাহলে ছোট্ট বাবুটা কি এটা বলতে পারবে তার রিজু আঙ্কেলটা কই?”
টাবু গাল ফুলিয়ে বলল,”বাথরুমে।গোসল করে।”
“ওকে তাহলে আমিও ফ্রেশ হয়ে আসি।”
টাবু একবার টগরের দিকে তাকিয়ে বলল,”আচ্ছা যাও।ডিস্টার্ব করো না তো আব্বু।”
টগর কাধের ব্যাগ রেখে উঠে টাবুর দু’গাল টেনে বলল,”আমি ডিস্টার্ব করি?”
টাবু দু’গাল দু’হাত দিয়ে ধরে বলল,”হুস।যাও তো আব্বু।”
টগর হেসে গান গাইতে গাইতে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল।

“উশ!সরি সরি!”
রিজু সেভাবে দাড়িয়ে থেকে বলল,”এটা কি হলো?”
টগর মুচকি হেসে বলল,”আমার কি দোষ?তুমি লক না করে বাথরুমে ঢুকছো কেন?”
“আমি বাথরুমে আছি তুমি জানো না মনে হচ্ছে!”
টগর হেসে দরজা লক করতে করতে বলল,”কই না তো।জানি না।”
“তাই না?”বলে রিজু টগরের হাত ধরে টেনে বাথরুমের ভিতরে নিয়ে লক করে দিলো।
“বললাম তো জানতাম না?ছাড়ো তো।”
রিজু টগরকে জড়িয়ে ধরে বলল,”আমার সব কিছু দেখে এখন পালানো হচ্ছে?সেটা হবে না।আমিও দেখবো।”
টগর নীল তোয়ালেটা টেনে রিজুর নিচে জড়িয়ে জড়িয়ে দিতে দিতে বলল,”ইশ!কি বিশ্রী দেখা যাচ্ছে।আস্ত মূর্তি।”
রিজু টগরকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার নাকের সাথে টগরের নাক ঘষতে ঘষতে বলল,”আমি বিশ্রী?”
“তো কি?খুব সুশ্রী?”
“সুশ্রীই তো।”টগরের শার্ট খুলতে খুলতে রিজু আবার বলল,”আমার টগো তো আরো সুন্দর।তাই তো প্রথমবার দেখেই প্রেমে পড়ে গেছিলাম।”
টগর রিজুর ভেজা চুলে টান মেরে বলল,”টগো বলতে মানা করছি না?”
“আউ,আস্তে।”

বাথরুমের দরজায় আঘাতে আওয়াজ হলো।
“আব্বু!একটা আঙ্কেল আসছে।”
টগর ভিতর হতে বলল,”টাবু সোনা!আঙ্কেলকে বসতে বলো।আমি আসছি।”
“আচ্ছা”বলে টাবু যেভাবে দৌড়ে আসছিলো সেভাবে দৌড়ে চলে গেল।
টগর শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল,”ছাড়ো তো রিজু।কে যেন আসছে।”
রিজু মুখ ভার করে বলল,”ধ্যাত!লোক আসার আর সময় পেলো না।”
শার্ট ঠিক করতে করতে টগর বেরিয়ে গেল।

টগরকে দেখে রাজা উঠে দাঁড়ালো।
টগর একবার টাবুর দিকে তাকিয়ে বলল,”তোমার স্যার আসবে তো বাবু।যাও গিয়ে টেবিলে বসো।”
রাজা সেভাবে দাড়িয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বলল,”ও থাকুক না।”
রাজার পাশ থেকে টাবু উঠে চলে গেল।
টগর সোফায় বসতে বসতে বলল,”আমার পাশে এসে বস।”
“তারপর সংশোধনাগার থেকে কবে ছাড়া পেলি?”

এতিমখানার ম্যানেজার ফজলে শরীফের ছেলের দোষ ছিলো।টগর আসার পর ফটিককে অত্যাচার করতো।একদিন ছেলেটা খুন হলো ম্যানেজারের হাতে।তার প্রতিশোধ নিতে রাজা খুন করলো ম্যানেজারকে।বিচার শেষে ছয় বছরের জন্য কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হলো রাজাকে।আজ ছাড়া পেয়ে সোজা এসে দাড়িয়েছে টগরের সামনে।

টগর আবার বলল,”কি’রে বস।আমি তোর সেই আগের টগর ভাই ই আছি।”
রাজা বসতে বসতে বলল,”এক সপ্তাহ হলো ছাড়া পেয়েছি টগর ভাই।শোনো না,বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না।আমাকে যেতে হবে।তোমাকে একবার দেখতে আসলাম।”
“পাগল নাকি তুই?কই যাবি?আমার কাছে থাক ভাই।”
রাজা টগরের দু’হাত ধরে বলল,”জানো টগর ভাই!আমি আমার মা বাবা কে খুঁজে পেয়েছি।এখন তাদের কাছে থাকি।”বলতে বলতে রাজার চোখ জলে ভরে গেল।
সে ধরা গলায় আবার বলল,”কিশোর সংশোধনাগারে থাকার কথা ছিলো ছয় বছর।আমার বাবা আমাকে তিন বছরেই ছাড়িয়ে আনলো।”
টগর অবাক চোখে চেয়ে প্রশ্ন করল,”মানে?কি বলিস এসব?”
রাজা টগরের হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,”হ্যা টগর ভাই।আমি বাবার দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে।আমার মা মারা যাওয়ার পর বাবা তার পিএ দিয়ে আমাকে এতিমখানায় পাঠিয়েছিলো।বাবা নাকি সব খরচ দিতো।কিন্তু ফজলে হারামী একটা টাকাও আমাকে দিতো না।”
কৌতূহল নিয়ে টগর প্রশ্ন করল,”তোর বাবা এমন করল কেন?”
“তার রাজনীতিতে দাগ পড়বে তার জন্য।”
রাজা একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার বলল,”আমি যেতে চাই নি।তবুও বাবা তো।এসে মাফ চাইলো।”
রাজার চোখে যেন বাবার প্রতি করুণা।
টগর রাজার দু’হাত ধরে বলল,”খুব ভালো করেছিস।এখন লেখাপড়াটা আবার চালু কর ভাই।”
রাজা উঠতে উঠতে বলল,”আজ বাবার সাথে গিয়ে নাইনে ভর্তি হয়ে এলাম।”
“ভালো করেছিস।আরেকটু বস না!কিছু একটা করি খেয়ে যা।”
রাজা টগরকে জড়িয়ে ধরে বলল,”না ভাই।অন্যদিন আসবো।তুমি কিন্তু আমাদের বাসায় যাবে একদিন।”
টগর রাজার পিঠ চাপড়ে বলল,”আচ্ছা ভাই।”

রাজা চলে যাওয়ার পর টগরের দু’চোখ জলে পরিপূর্ণ হয়ে গেল।রাজা তার পরিবার,আত্মীয়-স্বজন পেলো।সে তো পেলো না।তার মা কে ছিলো?বাবা কে ছিলো?আজও কি তারা বেঁচে আছে।তারা কি করছে এখন?কেউ কি তার কথা ভাবছে।এতিমখানা থাকাকালীন টগর শুনেছে কোন এক বেশ্যালয়ে তার জন্ম।তাই তো বাবা মানুষটার প্রতি তার এত ঘৃণা।টগর সদর দরজা ভিজিয়ে ভিতরে এসে দাঁড়ালো।মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,”বাবা কি এখনো তার স্ত্রী কে ঠকিয়ে অন্য কোন বেশ্যার কাছে যাচ্ছে?আচ্ছা সেই সংসারে কি সুখ নামের কোন পাখি আছে?”

রিজু এসে জড়িয়ে ধরে বলল,”আমার পক্ষীটা কি এত ভাবছে?”
টগর শীঘ্রই চোখের পানি মুছে বলল,”কিছু না।”
রিজু তার ঘাড়ে চুমু দিতে দিতে বলল,”কে এসেছিলো?”
টগর সোফায় বসতে বসতে বলল,”রাজা।”
“ওহ”বলে রিজু টগরের পাশে বসে আবারও আদর করতে গেল।
টগর এক হাত দিয়ে রিজুর মুখ সরিয়ে দিয়ে বলল,”রিজু টাবুর টিচার আসবে এখন।যাও চেঞ্জ করে নাও।”

হেমন্তের প্রায় শেষ।

শেষ রাতে হালকা ঠান্ডা লাগে।
দু’টো বেডসিট বের করে একটা টাবুর গায়ে টেনে দিয়ে ঘুমন্ত টাবু’কে বেডের একপাশে সরিয়ে তার শেষপ্রান্তে কোলবালিশ দিয়ে দিলো টগর।তারপর নিজে মাঝে শুয়ে বাকি বেডসিটটা রিজুর গায়ে টেনে দিয়ে নিজেও নিলো।রিজু নড়েচড়ে উঠলো।

টগর পিছন থেকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে।সে টগরের হাতটা সরিয়ে দিলো।
“আপনার দেখি রাগও আছে।ওকে টাবুকে মাঝখানে দিয়ে আমি ওপাশে গেলাম।”
রিজু হঠাৎ টগরের গায়ের উপর উঠে তার দু’হাত দিয়ে টগরের দু’হাত আবদ্ধ করে নাকে হালকা কামড় দিয়ে বলল,”খুন করে ফেলবো!আমাকে শুধু কষ্ট দেওয়ার ধান্দা,না?”
টগর এক হাত ছাড়িয়ে তর্জনী আঙ্গুল নিজের ঠোঁটে ছু্ঁয়ে বলল,”হুশ!আস্তে।কিউট বাবু জেগে যাবে।”
রিজু টগরের গালে মিষ্টি করে একটা চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল,”এখন আমি বাথরুমের প্রতিশোধ নিবো।”
টগর ইনোসেন্টভাবে মুখ ভেংচিয়ে বলল,”আচ্ছা।আমার প্রতি কারোর দরদটাই নেই।”
“আসো দরদ দেখাই!”বলে রিজু বেডসিট টেনে দু’জনেই তার নিচে চলে গেল।

সাত।

“কি সুন্দর ছেলে!”পাঁচ আঙ্গুল টাবুর পুরো মুখে ঘুরিয়ে রিজুর মা নিজের মুখে তার পাঁচ আঙ্গুলে চুমু এঁকে বলল,”রিজু!এটা কার ছেলে?”
রিজু টগরকে দেখিয়ে বলল,”মা!ও টগরের ছেলে।”
রিজুর মা মিষ্টি হেসে বলল,”টগর।তা বাবা বউমাকে আনলে না যে।”
টগর অপ্রস্তুত দেখে রিজু বলল,”মা ও বউকে ডিভোর্স দিছে।ওসব বাদ দাও তো।পরে বলবো।আমরা কি এখানে দাড়িয়ে থাকবো?রিয়া কোথায়?”
রিয়া এসে রিজুকে জড়িয়ে ধরে বলল,”ভাইয়া!আমার মেক আপ বক্স কই?”
রিজু মাথায় হাত দিয়ে বলল,”ইশ!মনে নেই একদম।”
রিয়া অভিমান করে বলল,”মা!দেখছো?হুহুহু…কাল আমাদের স্কুলে স্পোর্টস!”
রিজু রিয়ার মাথার বেনি টেনে বলল,”তোর খালি রাক্ষসী রাণী কটকটির মত সাজা।”
“কি?মা দেখছো?ভাইয়া কি বললো!”
রিজুর মা হেসে বলল,”আসতেই দু’টোতে শুরু করে দিলি।দাদু তুমি এসো তো আমরা এখান থেকে যায়।”
টাবুর কচি হাত ধরে রিজুর মা ভিতরে চলে গেল।

টগর ব্যাগ খুলে একটা প্যাকেট দিয়ে বলল,”আমার মনে ছিলো রিয়া।”
রিয়া সেটা নিতে নিতে রিজুর দিকে তাকিয়ে বলল,”দেখছিস?টগর ভাইয়ের ঠিক মনে আছে।”
টগরের দিকে তাকিয়ে বলল,”থ্যাংকস ভাইয়া।”
রিজুর দিকে আবার তাকিয়ে ভেংচি কেটে বলল,”ব্যাগটা রাখ একবার।চুরি করে ঠিক দেখে নেবো তোর বউয়ের জন্য কি আনছিস।”
টগর একটা চোরা দীর্ঘশ্বাস টেনে বলল,”তাই তো।এসে তখন থেকে ইতি ভাবীকে দেখছি না।”
রিজু একবার আড়চোখে টগরের দিকে তাকালো।তারপর রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,”আজ কি ইতির শেষ এক্সাম?”
“তুই যেন জানিস না।”বলে টগরের দিকে তাকিয়ে বলল,”ভাইয়া ভিতরে চলুন।”
রিজুর দিকে না তাকিয়ে টগর রিয়াকে অনুসরন করলো।

রিজু অপরাধীর মত দাড়িয়ে রইলো।

গ্রীষ্মের গরমে উঠানে দাড়িয়ে টগর বৈশাখীপূর্ণিমা চাঁদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
পাশে এসে রিজু দাড়ালো।
“টাবু ঘুমিয়েছে?”
“হুম”বলে টগর হাটা দিলো।
রিজু তার হাতটা চেপে ধরে বলল,”চলো!গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেটে আসি।”
“আমার ঘুম পাচ্ছে রিজু।”
“আরে চলো তো!”বলে রিজু টগরকে একপ্রকার টানতে টানতে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেল।

গ্রামের রাস্তা সারি সারি মেহগনি গাছে ছেয়ে আছে।টগর কিছুদূর হেটে তার একটাতে এক হাটু ভেঙ্গে দাড়ালো।
রিজু তার মাথার উপর মেহগনি গাছে এক হাত ঠেকিয়ে টগরের সামনে দাড়িয়ে বলল,”অভিমান শুরু হয়ে গেছে বাবুর।”
পূর্ণিমার আলোয় টগরের ডাগর ডাগর চোখ স্থির দিঘীর জলে চাঁদের আলো পড়ার মত জ্বলছে।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,”কিসের অভিমান?”
“কিসের অভিমান সেটা তুমি খুব ভালো করে বোঝো!”
টগর বলল,”আমার কোন অভিমান নেই।”
রিজু বলল,”এই অভিমানটা ছয় বছর আগে আমারও হয়েছিলো।যখন তুমি প্রথমবার মেঝে ছেড়ে শাওনের খাটে শুতে গেছিলে।”
টগর রেগে বলল,”ডোন্ট টক অ্যাবাউট শাওন।সে আমার ভাই ছিলো।তার সাথে আমার কিছু হইছিলো না।”
রিজু স্থির থেকে বলল,”তুমি রেগে যাচ্ছো কেন?আমি খারাপ উদ্দেশ্যে শাওনের কথা এখানে টেনে আনি নি।শুধু আমার ভালোবাসার ক্ষেত্রটা তোমাকে দেখালাম।”
টগর বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,”দেখো রিজু!তুমি আমাকে ভালবাসতে বলে তুমি বিয়ে করার পরও কিন্তু তোমাকে ভালোবেসেছি আমি!”
“টগর!ভালো তুমি বাসলে।যদি চার পাঁচটা বছর আগে বাসতে তাহলে এভাবে দুই নৌকায় পা দিয়ে আমায় চলতে হতো না।”
“বিয়ে তোমাকে এমনিতেই করতে হতো রিজু!”
“সেটা পরের কথা।কিন্তু পাঁচটা বছর আগে হলে তোমাকে তো মন ভরে ভালোবাসতে পারতাম।”
“এখন বুঝি পারো না?”
টগরকে জড়িয়ে ধরে রিজু বলল,”এই যে আজ তোমাদের সাথে রাতে থাকতে পারবো না।এটা কম কষ্টের?”
টগর রিজুর কাধে দু’হাত রেখে বলল,”দু’চারটা দিনেরই তো ব্যাপার রিজু।”
রিজু হতাশ হয়ে বলল,”দু’চার দিন নয় টগর।এখন থেকে রোজ আমাকে এক বিছানায় মন রেখে অন্য বিছানায় দেহ রাখতে হবে।”
টগর স্থির মনে জিজ্ঞাসা করল,”কেন?”
“ইতির এক্সাম শেষ।মা এবার ঢাকা নিয়ে যেতে বলছে ওকে।বিয়ের এক বছর হলো এটাওটা বলে এড়িয়ে যায়,এখন কি বলতাম বলো তো।”
টগর রিজুর কাধ থেকে হাত সরিয়ে বলল,”ভালো তো।নিয়ে চলো।ওটা তো তোমার ফ্ল্যাট।আমরা পিতাপুত্রে না হয় অন্য একটা ভাড়া করে নিবো।”
“কিন্তু ইতি বলছিল আমরা একসাথে তো থাকতে পারি।”
“শোনো রিজু!ইতিকে আমি যতদূর জেনেছি,ও একটা সরল মেয়ে।ও সরল বিশ্বাসেই বলছে।কিন্তু আমি কাউকে ঠকাতে পারবো না।”
রিজু অভিমান নিয়ে বলল,”তা পারবে কেন?তুমি ইতিকে ঠকাতে পারো না,শাওনকে পারো না,তিশাকে পারো না।পারো শুধু আমাকে ঠকাতে।”
“তুমি আবার পুরান কথা তুলছো রিজু?”
“আই অ্যাম সরি।বাট এটাই সত্য।”বলে রিজু মেহগনি গাছ থেকে হাত সরালো।যেখান থেকে টগরের মাথার উপর থেকে তার হাত সরে গেল।
“চলো।রিয়া কল দিচ্ছে।মা খুঁজছে বোধয়।”
“আচ্ছা” বলে টগর সোজা হয়ে দাড়ালো।রিজু সামনে এসে দাড়ালো।
“টগর!”
“হুম”বলে টগর ফিরে দাড়ালো।

দু’জনে ফেরার প্রস্তুতি নিল।

কিন্তু ডান হাতের তর্জনী উচু করে রিজু বলল,”একটা কিস দিতে দিবে টগো?”
টগর মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলো।
রিজু টগরের দু’কাধে দু’হাত রেখে আবারও তাকে মেহগনি গাছে ঠেস দিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট রাখল।
টগরের দু’চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।চোখের অশ্রু তার ঠোঁটে গেল।
রিজু তার ঠোঁটে নোনা স্বাদ পেল।

ছুটির ভোরে মোবাইলের রিংটোনে রিজুর ঘুম ভেঙ্গে গেল।আড়মোড়া দিয়ে ঘুম ভাঙ্গার আগেই কল কেটে গেল।

চোখ কচলিয়ে তাকিয়ে দেখে ইতি ড্রেসিংটেবিলে বসে আছে।সকালের গোসল শেষে তার চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।শহরে আসার পর ইতি বেশ পরিপাটি হয়ে গেছে।রিজু মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো টগর কল করেছে।কল ব্যাক করল সে।
“হ্যালো রিজু!”
টগরের কন্ঠে হতাশার সুর।
রিজু বিছানায় ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল।
“টগর!কি হয়েছে?”
“তুমি একবার আমার ফ্ল্যাটে আসতে পারবে?”
“হুম!কি হয়েছে তা তো বলো!”
“মোবাইলে বলা গেলে বলতাম রিজু।”
রিজু বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,”ওকে।আমি গোসল করে আসছি!”
টগর তাচ্ছিল্য ভরে বলল,”রাতে বউকে আদর করলে বুঝি?”
রিজু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,”টগর!আমি আসছি।”

এত বছর পর কেউ এসে টাবু কে দাবী করতে পারে।টগর সেটা কখনো ভাবতেই পারে নি।ঐ ঘরে যে দু’জন মানুষকে সে রেখে এসেছে তারা তার বহুদিন আগের পরিচিত দু’টো মুখ।স্বামী-স্ত্রী দু’জনে আগ্রহ নিয়ে তার দরজা খোলার অপেক্ষায় করছে।টাবু কে জড়িয়ে ধরে সে বসে আছে এখনো।টাবুর তার মত ডাগর ডাগর চোখ।ছোট্ট ছেলেটা একবার মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করল,”আব্বু!বাইরে কারা এসেছে?”
টগর মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল,”টাবু সোনা।তুমি এবার একটু ঘুমাও।”
টাবু মাথা নাড়ালো।
দরজায় আওয়াজ শুনে টগর প্রশ্ন করল,”কে?”
রিজু বলল,”আমি!”
টগর উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে রিজুকে ভিতরে ঢুকিয়ে আবার দরজা ভিজিয়ে দিলো।
রিজু উত্তেজিত হয়ে বলল,”এত বছর পর ওরা এখানে কিভাবে?”
টগর তর্জনী আঙ্গুল ঠোঁটে ছুঁয়ে বলল,”হুশ!টাবু ঘুমাচ্ছে।”

আট।

টগর আর রিজুকে বের হতে দেখে তিশা উঠে দাঁড়ালো।
“রিজু!আমার ছেলে কোথায়?বলো ভাই!”
শাওন দাড়িয়ে বলল,”রিজু তোকে না ভিতরে পাঠালাম আমার ছেলেকে আনতে।”
রিজু বলল,”শাওন,তিশা তোমরা শান্ত হয়ে একটু বসো।”
শাওন ঘুরে গিয়ে টগরের কাধ ধরে ঝাকিয়ে বলল,”টগর!বল ভাই,আমার ছেলে কোথায়?”
টগর চুপ করে রইলো।
রিজু শাওনকে ধরে নিয়ে গিয়ে বসালো।
তিশাকেও বসতে বলে নিজে বসে বলল,”দেখ শাওন!হঠাৎ তোরা এভাবে এলি কি করে?”
তিশা বলল,”আমি আমার ছেলেকে চাই ব্যস।”
রিজু হালকা হেসে বলল,”তিশা!যখন তুমি ছেলেকে ফেলে চলে গেছিলে তখন কোথায় ছিলো তোমার এই মাতৃত্ববোধ?”

তিশা চুপ করে রইলো।

শাওন বলল,”দেখ রিজু!আমরা একটু ভুল করেছি মানে এই নয় যে ছেলেটা আমাদের নয়।”
টগর দাড়িয়ে শুনতে লাগলো।
রিজু তার দিকে একবার তাকিয়ে শাওনকে বলল,”ছয় বছর আগে কি এই কথাটা তোর মনে ছিলো।শাওন।দেখ ভাই,তিশাকে যখন পাওয়া যাচ্ছিলো না,তখন তুই কাউকে কিছু না বলে বাবা মায়ের পরামর্শে বিদেশে পালিয়ে গেলি।এমনকি আমাকেও কিছু বললি না।তখন ঐ টগর তিশার দায়িত্ব নিয়েছিল।”
শাওন চুপ করে রইলো।
রিজু একটু থেমে বলল,”আর তিশা তুমি তো ছেলে খালাস করেই পালালে।সরি এর থেকে খারাপ ভাষা আমার মুখে আসছে না।”
তিশা জোরে বলল,”শোনো রিজু আমি ওকে পৃথিবীতে আনতে চাই নি।শুধু এই ছেলেটার জন্য আনতে হয়েছে।”
রিজু বিদ্রুপের স্বরে বলল,”বাহ!যাকে তুমি পৃথিবীতেই আনতে চাইছিলে না।আজ তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করছো?”
“শোনো রিজু।আগে কি করেছি সেটা জানি না
তবে আজ আমার সংসার আর স্বামী রাখতে আমার ছেলে চাই।”
“তিশা তুমি কিন্তু বড্ড অন্যায় আবদার করছো।”
শাওন উঠে দাড়ালো।
তিশাকে উদ্দেশ্য করে বলল,”চলো তিশা তাহলে আমরা আদালতেই যায়,ডিএনএ টেস্টে তো প্রুভ হবে ছেলে কার?”
টগর আকস্মিক হাটু গেড়ে বসে শাওনের পা জড়িয়ে ধরলো।
“শাওন ভাই।এমনটা করবেন না প্লিজ।টাবু কে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না।প্লিজ ভাই।”
টগর হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলো।
ঢোক গিলে তিশার পা জড়িয়ে ধরতে গেলো।তিশা পা সরিয়ে নিলো।
টগর দু’হাটু ভেঙ্গে দাড়িয়ে দু’হাত জোড় করে তিশার সামনে গিয়ে বলল,”তিশা আপু!সেদিন শাওন ভাই বেরিয়ে যাওয়ার পর আপনি যখন বিষ খেতে গেছিলেন তখন এই আমি আপনাকে বাঁচিয়ে ছিলাম।আপনার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলেছিলাম আর তিন’চারটা মাস কষ্ট করে শাওন ভাইয়ের ঔরসজাত সন্তানটা আমাকে ভিক্ষা দিতে।আপনি তো রাজি হয়েছিলেন।তাই এই আমি ঐ রিজুর সাহায্য নিয়ে আপনাকে সুস্থ রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম।তখন তো আপত্তি করেন নি?”
“দেখো টগর!তখন আমার মাথা ঠিক ছিলো না।ভেবেছিলাম তিন-চার’মাসেরই তো ব্যাপার।তাই রাজি হয়েছিলাম।তাছাড়া তুমি নিরাপদে,সবার অজান্তে থাকার ব্যবস্থা করেছিলে।সন্তান হওয়ার পর তোমাকে দিলামও।তারপর যখন দেখলাম আস্তে আস্তে সবাই জেনে চাচ্ছে,তখন পরিবারের ভয়ে বিদেশে আন্টির কাছে পালিয়ে গেলাম।আমার পরিবার শাওনদের চাপ দিলো।আমাকে খুঁজে না পেয়ে ভয়ে শাওন গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হতেই বিদেশ পালিয়ে গেল।”
টগর হাত জোড় ছেড়ে দিয়ে বলল,”ওহ!এখন শাওন ভাই আপনাকে মেনে নিছে বলে আপনি আমাকে শূন্য করতে এসেছেন?কিন্তু আপু আপনারা চাইলেই সন্তানের পিতামাতা হতে পারবেন।কিন্তু আমি টাবুকে ছাড়া থাকতে পারবো না।”
শাওন খোঁচা মেরে বলল,”শোন,তোর বয়স এমন কিছু হয়নি!বিয়ে করে ঘর সংসার কর,একদিন ঠিকই বাবা হয়ে যাবি।”
টগর বলল,”শাওন ভাই!বাবা হতে গেলে কি সন্তান জন্ম দিতেই হবে?”
রিজু বলল,”দেখ শাওন!টগর কে এভাবে হার্ট করে কথা বলিস না।”
শাওন হেসে বলল,”তুই আবার কবে থেকে এর দালালি শুরু করলি?”
“ওমা,তুই জানিস না?আমি তো বছর সাতেক আগে থেকেই করতাম।”
রাজা এসে টগরের কাধে হাত রাখল।
টগর উঠে দাড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল,”তুই কখন এলি?”
“মা!আপনি কখন এলেন?”
শাওনের মা এগিয়ে এসে বলল,”একটা আবদার নিয়ে এসেছি বাবা।”
রাজা টগরের দু’হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল,”টগর ভাই।তুমি একদিন বলেছিলে তোর যা দরকার হবে তুই আমার কাছে চাইবি।আজ আমি আমার ভাইয়ের সংসারের সুখটুকু চাই।দিবে?”
“শাওন তোর ভাই?”
“হ্যা!”
শাওনের মা বলল,”বাবা!তুমি একদিন হলেও আমাকে মা ডেকেছো।সেই দাবীতে বলছি তুমি আমার নাতিটাকে আমাকে ভিক্ষা দাও।তুমি না হয় আমাদের সাথে থাকবে!”
টগর চোখ মুছতে মুছতে বলল,”ওকে ফাইন!আমি কারোর ঋণ রাখতে চাই না।”
রিজুর দিকে তাকিয়ে বলল,”রিজু!টাবু ঘুম থাকতে থাকতে ওকে দিয়ে দাও।ও জাগলে হয়তো ঝামেলা করবে।”
রাজার দিকে তাকিয়ে বলল,”কি খুশি তো।”
তারপর টগর হাত জোড় করে সবার উদ্দেশ্যে স্বাভাবিকভাবেই বলল,”আপনাদের সবার কাছে এই এতিম ছেলেটা ঋণী ছিলো।আজ থেকে সে ঋণমুক্ত হলো।আশা করি আমাকে আপনারা ক্ষমা করবেন।”

“টগর!ওরা চলে গেছে।দরজা খোলো প্লিজ।”রিজু দরজায় আওয়াজ করতে লাগলো।
টগর ভিতর থেকে বলল,”তুমিও এখন যাও রিজু।আমাকে একটু একা থাকতে দাও।”
রিজু হতাশ হয়ে বলল,”টগর প্লিজ দরজা খোলো।”
“রিজু তোমাকে না বললাম আমাকে একটু একা ছেড়ে দাও।”
রিজু নিরুপায় হয়ে বলল,”ওকে।ফাইন।আমি চলে যাচ্ছি।কিন্তু তুমি আগে বলো উল্টাপাল্টা কিছু করবে না।”
টগর দরজার কাছে এসে দাড়িয়ে বদ্ধ দরজার ওপাশে থেকে বলল,”রিজু তুমি তো জানো আমি এতিম।মা নেই,বাবা নেই।ছোটবেলা থেকে জীবন সংগ্রাম করে বড় হয়েছি।এখন কোন কষ্ট আমাকে ছোঁয় না।তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো,আর যাও করি আমি মরবো না।আমি মরলে কষ্টগুলোর কি হবে?তাদেরও তো বসবাসের জন্য জায়গা দরকার।আমার হৃদয়টা তাদের জন্য উন্মুক্ত খাস জমিন।”
রিজু আরেকবার দরজায় আঘাত করে বলল,”প্লিজ এভাবে বলো না টগর।”
টগর বলল,”তোমার মোবাইল ভাইব্রেট হচ্ছে রিজু।ইতি ভাবী কল করেছে দেখ।সকালে ব্রেকফাস্ট না করে এসেছো বোধয়।”
রিজু দেখলো সত্যি ইতি কল করে যাচ্ছে।
টগর বলল,”যাও বাসায় যাও।তোমার জন্য বেচারী ছোট মেয়েটাও না খেয়ে আছে বোধয়।ও তোমাকে তুমি ভালোবাসে রিজু।”
রিজু চুপ করে রইলো।
টগর আবার বলল,”আমার যা মানসিক অবস্থা।আমি এখন রান্না করে যে তোমাকে দু’টো খেতে দিবো তার সাধ্য আমার নেই।”

রিজু রাস্তায় নেমে আকাশের দিকে তাকালো।আকাশ জুড়ে ঝলমল রোদের ঝিলিক।সূর্য প্রায় মধ্যাহ্নের কাছাকাছি।নিজের উপর অভিমানে তার চোখ দু’টি জ্বলছে।পা ফেলতে লাগলো কোন এক বাসায় উদ্দেশ্যে,যেখানে সংসারের নামে দু’টি মানুষের বসবাস সামাজিকতার বদ্ধ শিকলে।

রিজুর সাড়া না পেয়ে দরজা খুললো টগর।কোথাও কেউ নেই।ঘরের দুয়ারে বসে পড়ল সে দু’হাটু গেড়ে।আজ তার কোথাও কেউ নেই।নেই কোন পিছুটান।হঠাৎ তার মনে হলো শাওনের সেই কালো তিলের কথা,আজও আছে তার বিশেষ কোন জায়গায়।একদিন শাওনকে টগর ভালোবেসেছিলো।শাওনকে ভয় আর ভালোবাসা টগরের জীবনের আয়না হয়ে গিয়েছিল।না বলা ভালোবাসার প্রতিদান হিসাবে শাওনের সন্তানটা তার একমাত্র অবলম্বন ছিলো এতিম জীবনে।।শাওনের ঠাট্টায় বলা সেই সুনয়নার দু’চোখ বেয়ে অনর্গল অশ্রু পড়ল কয়েক ফোঁটা।

বিকট এক হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়ালো টগর।

তারপর দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে গেল।

পরিশিষ্টঃ

পঁয়ত্রিশ বছর পরের কথা।

রেল স্টেশনের কোন এক চায়ের দোকানে এক ষাট উর্ধ্ব বৃদ্ধ পাগল রুটি খেতে চেয়ে গলা ধাক্কা খেলো।পাগলটা উঠে মলিন হওয়া পোষাক ঝেড়ে কুঁচকে যাওয়া চোখে একবার দোকানের রুটির দিকে তাকালো।তারপর আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে রেল স্লিপারের উপর দুর্বল পা দু’টো টেনে টেনে অর্ধমৃত দেহখানা বয়ে নিয়ে চলল।

এক আকাশের নিচে আমরা কত রংয়ের আর রকমের মানুষ।
কেউ সুখী।
কেউ দুঃখী।
কেউ আবার পাষাণ।
কেউ কেউ বা আবার উদার।
এক আকাশের নিচে বসবাস করে,কেন আমাদের এই ভিন্ন রুপ?কে দিবে তার উত্তর?

পাগল টগর?
অভিমানী রিজু?
স্বার্থপর রাজা?
অবুঝ থাকা টাবু?
না’কি পাষাণ শাওন দম্পতি?

হয়তো বা গল্পের পাঠকরা তার উত্তরটা দিতে পারবে!কি পারবেন তো?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.