ভারমুক্তি

অপূর্ব অরণ্য

সজলকে প্লেনে তুলে দিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় ফিরছে নন্দিনী। সজলের সাথে সংসারের ২০ বছর পেরিয়ে গেছে। আজ সজল ২ মাসের জন্য দেশের বাইরে গেলো। একটানা এতো লম্বা সময় কখনো সজলকে ছাড়া কাটিয়েছে কিনা মনে পড়ছেনা নন্দিনীর। সৌম্য তাদের একমাত্র সন্তান, সেও এবার ভার্সিটিতে ভর্তি হলো ঢাকায়। বলতে গেলে এ’কয়মাস বাসায় একাই কাটাতে হবে নন্দিনীর।
টেক্সিটা বাসার কাছাকাছি যতই আসছে ততই উত্তেজনা বাড়ছে নন্দিনীর। সজল ইমিগ্রেশন ক্রস করার সময় বললো- ‘নন্দা বেডরূমের অয়ারড্রপের ড্রয়ারে একটা ডায়রী রাখা আছে তোমার জন্য, পড়ে নিও।’
বিয়ের পরপর প্রথমদিকে সজলের সারপ্রাইজ দেয়ার বাতিক ছিলো, রোমান্টিকও ছিলো অনেক। কিন্তু আজ এতো বছর পর কী এমন সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে নন্দিনীর জন্য?
.
০২.
নন্দিনী বাসায় ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়ার থেকে ডায়রীটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পরম কৌতুহলে খুললো-
নন্দা,
এই চিঠি যখন তুমি পড়ছো তখন আমি হয়তো উড়োজাহাজে মেঘের কাছাকাছি। জানালা দিয়ে মেঘ দেখছি, কিন্তু সে মেঘ ছুঁয়ে দেখার উপায় নেই। জানো আমারও ভীষণ মেঘ হতে ইচ্ছো করতো, হয়তো ছিলামও আমি মেঘ-ই, তুমি কখনো সে মেঘ ছুঁতে পারোনি, শুধু মেঘ দেখেই না পেয়েও পাওয়ার তৃপ্ততায় কাটিয়ে দিয়েছো ২০ টি বছর! মাঝে মাঝে আমি বৃষ্টি হয়ে ঝরেছি, কিন্তু সে বৃষ্টিও তোমাকে ভিজিয়ে যায়নি কখনোই, তোমাকে শীতল করেনি। বড় জানতে ইচ্ছা হয় এতো অপ্রাপ্তি নিয়েও এতোটা তৃপ্ততায় কিকরে কাটালে এতোটা বছর?
নন্দা, মনকে শক্ত করো, এখন আমি যে কথাটা বলবো তাতে তোমার সবচে সন্মানের স্থল এই আমাকে তোমার ঘৃণা করতে হবে। ভালোবাসার জন্য যেমন নরম হৃদয়ের প্রয়োজন (সেটা তোমার জন্মাবধি আছে), তেমনি ঘৃণা করতে শক্ত পাথুরে মন প্রয়োজন। ২০ বছরের ভরসা ভালোবাসাকে ঘৃণা করতে আরো বেশি শক্ত মন দরকার। তেমন শক্ত মন তোমার না থাকলেও আজ ঘৃণা তোমায় আমাকে করতেই হবে নন্দা, এছাড়া তোমার আর কোন উপায়ও নেই।
নন্দা, ২০ টি বছর সাথে কাটিয়ে দিয়েও তোমার জানা হয়নি আমি একজন ‘সমকামী’! কি অবাক হচ্ছো? আচ্ছা সমকামিতা কি তুমি কি বুঝো? অবাক হওয়ার বিষয় আমিও ঠিক ওভাবে বুঝতাম না তোমাকে বিয়ের আগে! সহজ কথায় সমকামিতা হচ্ছে সমলিঙ্গে আকর্ষন, একজন পুরুষ হয়েও পুরুষের প্রতিই প্রেম ও যৌনতার আকর্ষন ও তাগিদ অনুভব করা।
আজ এতো বছর পর সবটা তোমাকে বলতে চাই, শুরু থেকেই। তোমার মেনে নেয়া বা করুনা ভিক্ষা উদ্দেশ্য নয়, আমার সহধর্মিনী হয়েও আমার জীবনের অপরিহার্য এই অংশটির কথা তোমাকে বলতে না পারার কষ্ট হতে ভারমুক্তির চেষ্টা থেকেই আমার এই পত্র লেখা। আচ্ছা তোমার কি মনে আছে বিয়ের পর পর আমরা একই বাসায় থেকেও দুজন দুজনকে পত্র লিখতাম? কি মিষ্টি ছিলো সে সময়টা! তুমিও বেশ লিখতে, যদিও ১৮ না পেরুনো অপরিপক্ষ এক কিশোরীর সস্তা প্রেমআবেগ গুলো আমাকে হাসিয়ে যেতো!
নন্দা, তোমার সাথে বিয়ের আগে আমার ১৮/১৯ বয়স থেকেই তুমি জানতে আমি ও রাজন একসাথে থাকতাম। প্রায় ৬ বছর। সাথেই থাকা, বন্ধুত্ব, টুকটাক যৌথ ব্যবসা। রাজনই তোমাকে আমার জন্য পছন্দ করে। তুমিও তাকে অতি আপন জানতে, সে আমার আর আমি তার পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলাম। সাথে থাকতে থাকতে রাজনকে ভালোবাসতাম অনেক। কাপড় চোপড় থেকে ব্যাংক একাউন্ট কোনটাই কখনো আলাদা হয়নি দুজনের। একজন আরেকজনকে ছেড়ে থাকতে পারতামনা। হ্যাঁ, সাথেই ঘুমাতাম, একসময় যৌনতাও আসে দুজনের মধ্যে। এভাবেই চলছিলো।
বয়স যখন আমার ২৪/২৫ মায়ের ইচ্ছা পূরণে পড়তে যাই লন্ডনে। প্রথম সেখানে গিয়েই অনুভব করি রাজন বোধহয় শুধুই বন্ধু নয়, আরো বেশি কিছু! সারাক্ষন ওর জন্য মনটা কেমন করতো, পড়ালেখা বিলেতের রঙিন জীবন কোনটাই তেমন টানতোনা আমাকে। রাজনের মধ্যে যদিও অতটা ধরফরি টাইপ টান দেখিনি, ফোনে কথা হতো, এরমধ্যেই তার গার্লফ্রেন্ড জুঠেছে। এই বয়সে গার্লফ্রেন্ড থাকাতো স্বাভাবিক, কিন্তু তা শুনে আমার এমন হিংসা লাগতো কেন? আমার গার্লফ্রেন্ড ছিলোনা বলে?
বছর না পেরোতেই মা মারাত্মক অসুস্থ থাকায় লন্ডন থেকে ফিরতে হয়। আসার একমাস পর মারা যায় বাবা, এরপর মাকে নিয়ে ৫ মাস মাকে নিয়ে দেশে বিদেশে টানাটানি করেও শেষ রক্ষা হলোনা। মা ও চলেগেলেন। মা যাওয়ার আগে এক বছরের মধ্যেই বিয়ে করবো এবং বিয়ের আগে আর দেশের বাইরে যাবোনা এই কথা আমার কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছেন। মায়ের কথার বাইরে জীবনে কিছুই করিনি, এমনকি মা অসুস্থ হলে এম্বুলেন্সও মাকে জিগ্যেস করেই আনতাম! এদিকে এই এক বছরে রাজনের বেহিসাবিপনায় ব্যবসাও লাটে উঠেছে, সবটাই নতুন করে শুরু করতে হবে। বদলে গেছে রাজনও!
মায়ের মৃত্যুর পর বিয়ের পাত্রী দেখতে দেখতে অবশেষে তোমার শান্ত সিন্গ্ধ মুখাবয়ব, অনন্য নজরকারা রূপ ও সরলতায় আটকে গিয়ে আমার ২৬ শে বাঁধা পড়লাম ১৭ পেরোনো তোমার সাথে। রাজনেরও তোমাকেই পছন্দ ছিলো আমার জন্য। রাজনের এরমধ্যে নানা মেয়ে কেলেংকারি ও হঠাৎ বড়লোক হয়ে উঠার উচ্চাশায় পেয়ে বসেছে। আমিও ভাবলাম বিয়েসাধী করেছি, বিয়ের আগে এমন কত কিইবা হয়, এখন সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রথম প্রথম সব ঠিকই চলছিলো। কিন্তু দিন যায়… বছর পেরোয়.. তোমার কোল জুড়ে সৌম্য, আর আমি যেন কিসের অভাব বোধ করতে থাকি। কিসের অভাব? কার? রাজনের? কেন তোমার এতো রূপ আমায় সেভাবে আকর্ষন করেনা?
তবুও সৌম্যকে ঘিরে পুরোটা মমতা ঢেলে দিয়ে বেশ কেটে যাচ্ছিলো। এরমধ্যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর ভালো জব আবার সংসারে সচ্ছলতা আনলো। জব, সৌম্য, বন্ধুদের আড্ডা, বারে গিয়ে মদ খেয়ে মধ্যরাতে ফিরা… এটাই জীবন মানিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু বুঝতামনা কোন ছেলের প্রতিই আমার শুধু যৌন আকর্ষন হতো কেন? এটা কি আমার একপ্রকার মানসিক বিকারগ্রস্থতা?
বিয়ের ৪/৫ বছর পর হঠাৎ আমার জবটা হারিয়ে হতাশায় ডুবে যাই। দীর্ঘদিন চাকরীবিহীন, কোন ভরসার অভিবাবকও নেই, বন্ধু বান্ধবের থেকেও দূরে, নিজেই ডুবে থাকি নিজ জগতে, একাকী। বাসা ছেড়ে বাস শুরু করি গ্রামের বাড়িতে। নাওয়া খাওয়া কিছুতেই মন বসতোনা, তুমিই বলতে আমি কেমন যেন হয়ে গেছি। মনে আছে নন্দা সেই দুঃসময়ের কথা? তোমারতো মনে থাকবেই, কারন সারাক্ষন নানা অনটন ছাপিয়ে তুমিইতো ছিলো নির্ভার স্বাভাবিক, সাথেই। লেখালেখিটা এই একাকী সময়ে বেশ চেপে বসলো। অনলাইন রাইটার হিসেবে বেশ নাম হলো। আমি একলা নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করতাম, তাই তুমিও তেমন কাছে ঘেষতেনা। ব্লগার হিসেবে নানা হুমকী ধামকীতে তোমার অনুরোধে যদিও পড়ে লেখালিখি কিছুটা গুটিয়ে দিয়েছিলাম।
নন্দা, এমন সময় একটা সমকামী ফেইসবুক আইডির সন্ধান পাই। নিজেও একটা আইডি খুলি, অবাক হই এমন আরো হাজার হাজার আইডি ও তাদের একটিভিটিজ দেখে। ‘সমকামিতা’ সম্পর্কে বিস্তারিত জানি নানা অনলাইন মাধ্যম থেকে। জবাব পাই নিজের গহীনটায় এতোদিন কিসের এতো কমতির তাড়না ছিলো সে প্রশ্নের। আবিষ্কার করি আমি নিজেই একজন সমকামী!
ক’দিনেই হয়ে যায় প্রচুর অনলাইন ফ্রেন্ড, দেখাও করি দুএকজনের সাথে, যৌনতায়ও জড়াই। সারাক্ষন ঐ আইডিতে পড়ে থাকতাম, তুমিও আমি লেখালেখিতে ব্যস্ত ভেবে খুব একটা ঘাঁটাতেনা।
সেই আইডি থেকেই পরিচয় হয় একজনের সাথে। সেই প্রথম অনুভব করতে শিখায় ‘সমপ্রেম’ কি। প্রেম যে লিঙ্গ বুঝে তৈরি হয়না, প্রেম জমে উঠতে পারে সমলিঙ্গে, দুজন ছেলের মধ্যে, সেই প্রথম শিখিয়ে যায়, হয়তো ছিলোনা সাথে বেশিদিন।
তারও ২/৩ বছর পর খুঁজে পাই এমন একজনকে যে আমার আত্মার সাথে মিশে গিয়ে আমার প্রেম যৌনতা সবটায় জড়িয়ে আছে গত দীর্ঘ ১২ বছর ধরে! এরমধ্যে কতো কিছুই না বদলে গেলো, আমি আবার উঠে দাঁড়ালাম, মাঝে কতবার সে ছেড়ে গেলো আবার ফিরে এলো, কতো মান অভিমান, সবটা ছাপিয়ে আমার এই গুপ্ত প্রেমে আটকা পড়ে একটা ছেলে তার জীবনটাই আমার করে দিলো! সেদিনের ২২ বছরের সে ছেলেটি এখন ৩৪ বছর বয়সী মানুষ! আমিই তার দুনিয়া, তার প্রেম, তার সংসার!
এর মধ্যেই সে শুধু আমার মাঝেই আটকে থাকেনি, সে হয়ে হয়ে উঠেছে তোমার আপনজন, সৌম্যর প্রিয়জন, আমাদের সবার মানুষ, দূরে থেকেও আমাদের পরিবারেরই একজন। তার সব চিন্তা, প্ল্যানিং সবটা জুড়েই শুধু আমি নই, তুমি, সৌম্য, আমরা সবাই!
হ্যাঁ নন্দা, তুমি তাকে ঠিকই চিনেছো।
‘শুভ্র’। তোমার শুভ্র ভাইয়া। তুমি যাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো জেনে এসেছো এতোটা বছর। যে শুভ্র দেশের বাইরে থেকেও এমনকি আমার সাথে দীর্ঘ বিচ্ছেদেও তোমার সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করেনি। তুমিও তাকে দেখে এসেছো এক অকৃত্রিম ভালোবাসার চোখে এতোটা কাল। সৌম্যর প্রিয় বন্ধু, সেকেন্ড ফাদার, হাজারো আবদারের স্থল প্রিয় ‘শুভ্র আংকেল’।
নন্দা, আজ এতোটা বছর কাউকে বলতে না পারা প্রেমটা শুধু তোমাকে বলতে পারলেই মনেহয় পুরো দুনিয়াকে বলা হয়ে যায়। তাই তোমাকে বলছি- ‘আমি শুভ্রকে ভালোবাসি’।
নন্দা, তোমার রূপ, গুন, ধৈর্য, স্নেহ, মায়া, ভালোবাসা, সন্মান, কোনটারইতো কমতি ছিলোনা, এখনো কমতি নেই। তবে কেন আমি একটা ছেলে হয়েও ছেলের প্রতিই দূর্বলতা অনুভব করতাম? এই এমন অনুভব, এমন ভালোলাগা ভালোবাসা, কাউকে বলতে না পারার কষ্ট এতোটা বছর বয়ে বেড়ানোর পথ কি আমি স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলাম?
আর তোমার শুভ্র ভাই? কোনসে প্রাপ্তির পূর্ণতায় সমাজের চোখে চিরকুমার থাকার গ্লানি বয়ে বেড়াচ্ছে? কোন সে আত্মার টানে আজো এতোটা বছর পেরিয়েও ছুঠে আসে আমার কাছে, তোমাদের কাছে? তার কেন একটা নিজের পরিবার হলোনা?
নন্দা, শুভ্রকে ভালোবাসতে গিয়ে হয়তো কম পড়ে গেছে তোমার ভালোবাসায়, সমলিঙ্গে যৌনতায় পুরোটা অভ্যস্ত হয়ে উঠার পর হয়তো তোমার সাথে যৌনতায় আগ্রহ হারিয়েছি। এই আমির ভিতরে গোপন বসত ছিলো অন্য এক আমির। যার সবটাতেই ঠকেছ তুমি। এত্তোখানি ঠকে গিয়েও কী এক অবাক করা তৃপ্ততা ধরে রেখে কাটিয়ে দিয়েছ ২০ টি বছর!
তোমার কাছে ক্ষমা চাইনা, ক্ষমা করতে বলবোনা। এ আমার ভারমুক্তির প্রচেষ্টা মাত্র। আমি আসার আগে তুমি জেনেছ আমি দুমাসের জন্য পর্তুগাল যাচ্ছি। আমি এখান থেকে ফ্রান্স যাবো, সেখানেই বাকি জীবনটা কাটাবো। তোমার চোখে চোখ রাখার সে সাহস আমার আর নেই। ছেড়ে যাচ্ছি তোমাকে, শুভ্রকে, সৌম্যকে, সবাইকে। ভেবেছিলাম মৃত্যুর আগে তোমাকে সবটা বলে যাবো। কখন মারা যাবো আমরা কি আর কেউ জানি? ইদানিং তুমিতো দেখেছো ঘনঘন অসুস্থ হচ্ছি, বুকে ব্যথা অনুভব করি। তাই তোমাকে সবটা জানিয়ে পাড়ি দিলাম অচিন দেশে। ভারমুক্ত জীবন কাটাতে পারিনি, ভারমুক্ত সিন্গ্ধ একটা মৃত্যু চাই।
তোমাকে ‘ভালো থেকো’ বলবোনা। কারন আমি বিহীন ভালো থাকা তোমাকে এর মধ্যেই শিখিয়ে নিয়েছি। আর সৌম্যতো রইলোই। সে বাবাকে আদর্শ হিসেবে জেনে বড় হয়েছে, তাকে সবটা জানাবে কিনা তুমিই ভেবে নিও। বড় কষ্টে আজ আমি সবটা সত্য জানাবার মতো সাহসী হয়েছি, আজ আমার কাউকেই জানাতে কুন্ঠা নেই। আমাকে ফোনে পাবেনা, ইমেইলে অবশ্যই রিপ্লে পাবে। আমার কবিতার সবসময় তুমিই ছিলে প্রথম পাঠিকা, আরতো লেখা হবেনা। পরিশেষে তোমার জন্য কয়টা লাইন-
‘নাপেয়েও পাওয়ার ভানে
তুমি কেমন করে হাসো?
কতটা পেলে না ভেবে তুমি
কিকরে ভালোবাসো?’
বিদায় নন্দা।
ইতি-
তোমার সজল।
০৩.
লিসবন (Lisbon), পর্তূগালের রাজধানী, এই শহরটা বেশ অদ্ভুত। সাদা কালো বাদামী সব প্রজাতির মানুষের মিশ্রণ। আসলেই কারা এদেশের আদি বাসিন্ধা বলা মুশকিল। এই দূর প্রবাসে আজ ৭ দিন পেরোলো সজলের। প্রচন্ড ঠান্ডায় মানিয়ে নেয়াটা বেশ মুশকিল। ঠাঁই মিলেছে পুরোনো বন্ধু রানার বাসায়, ফ্রান্স যাওয়া সেখানে সেটেল হওয়া সব ব্যবস্থা রানাই করছে।
কাল রাত থেকেই মনটা খুব আনচান করছে সজলের। একবার কি ফোন দেবে নন্দিনীকে? শুভ্রকে দেবে? নাকি সৌম্যকে দেবে? নন্দাটা কেমন আছে? সৌম্য কি হোষ্টেলে সিট পেলো?
রিং হচ্ছে……
ফোন ধরেই অনেকটা চিৎকার করে উঠলো সৌম্য- ‘বা-পু-রি…..’
কিরে চিনলি কি করে?
– চিনবোনা আবার? বিদেশের নং এর ফোনযে! মা তো প্রতিদিন ১০ বার ফোন দেয়- তোর বাবা ফোন দিয়েছিলো?
তোরা ভালো আছিস্ বাবাই?
– ভালো আছি বাবা, তুমি ভালো? পৌঁছে ৭ দিন হয়ে গেলো ফোন দাওনি কেন? মা কাল মধ্যরাতে ফোন দিয়ে বললো তুমি ফোন দিলে যেন বলি তোমাকে মা একটা মেইল করেছে তুমি যেন মেইল চেক করে নাও।
তোর মা মেইল করেছে? আচ্ছা দেখে নিচ্ছি। আমি ভালো আছিরে, আজ রাখি, মাকে জানাস।
ফোনটা কেটেই হঠাৎ কেমন বুকটায় ব্যথা অনুভব করছে সজল। নন্দিনীর মেইল! কি লিখেছে সে? বুকের ভিতর এ’এক অন্যরকম ধুঁকপুকানি! ল্যাপটপটা অন করলো সজল।
প্রিয় সজল,
সন্মোধন করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছি। কি নামে ডাকি তোমায়? কখনো তোমাকে নাম ধরেই ডাকা হলোনা! এই ঐ ডেকেই ২০ টা বছর পার করে দিলাম! কেমন অদ্ভুত তাইনা?
সজল, যে কথাটা জানাতে তুমি নিজেকে আমার সামনে থেকে সরিয়ে নিয়েছো সেটাই আমার জানা ছিলো আরো ৮/১০ বছর আগেই! কি অবাক হচ্ছো? তুমিতো জানই শুভ্র ভাইও আমার ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হতো, এখনো হয়। আমাদের মধ্যে আত্মার সম্পর্ক, আমাদের সবটাই খোলা দুজনের মাঝে, আমারও এমন অনেক কথা আছে যা শুধু অকপটে তাকেই বলেছি। পরে আমিও বিভিন্ন ওয়েভ সাইট থেকে সমকামিতা কি ও কেন, বিস্তারিত জেনেছি। জেনেছি এ’এক স্বাভাবিক আকর্ষন, আকর্ষন ভিতর থেকেই আসে, কখনো কখনো তা জেনেটিকও। মানুষ ভিতরটা তৈরি কিংবা পরিবর্তন কোনটাই করতে পারেনা। তাছাড়া তুমিতো আমার বিকল্প বাইরে খুঁজে বেড়াওনি, যা খুঁজেছো কিংবা খুঁজে পেয়েছো তা তোমার দ্বিতীয় স্বত্বার চাহিদা।
সজল, তোমাকে ভালোবেসেছি। তোমার এপিট ওপিট মন্দ ভালো সবটাকে ভালোবেসেছি বলেইতো তোমাকে ভালোবেসেছি। তোমাকে ভালোবেসেছি বলেইতো তোমার ভালোবাসা শুভ্র ভাইকেও ভালোবেসেছি!
সজল, ছোটবেলায় বাবা হারানো বিত্তহীন পরিবারের সদ্য কৈশর পেরোনো চঞ্চলা এক মেয়েকে তুমি বউ করে এনেছিলে। স্নেহ মমতায় আমার বাচ্চামি সয়েছ, আমার সব আবদার পূরণ করেছ, লেখাপড়া কন্টিনিউ করিয়েছ, আমাকে তুমিই গড়েছ তোমার মতো করে। আমার কাছে দুনিয়াটাই ততটুকু যতটুকু তুমি আমায় দেখিয়েছো! আমার কাছে ভালোবাসার মানে তোমার কেয়ার, স্বামী হিসেবে তোমার দায়িত্ববোধ। যার কোনটাতেই তোমার কমতি কখনোই ছিলোনা। আমার কাছে ভালোবাসা মানেই তুমি, আমার পাশে তোমার উপস্থিতি।
সজল, তোমাতে শুধু একজন প্রেমিক, একজন স্বামীকেই খুঁজিনি, একজন বন্ধুকে খুঁজেছি, ছোটবেলায় হারানো বাবাকে খুঁজেছি… আমি আমার মতো করে সবটাকে খুঁজে পেয়েছি। এই এত্তুগুলান ভালোবাসার মধ্যে কোনটার কতটুকু আর কাউকে কতটুকু দিলে তাতে আমার তেমনটা কমতিতো অনুভব করিনি! তুমি ঘৃণার কথা বলেছ, কই ঘৃণা কি দেখেছো আমার চোখে? আমিতো জানতামই আগে থেকেই। সেটাকি শুধু ঘৃণা করার মতো শক্ত মন নেই বলে? আমিতো বরং তোমার মধ্যে দ্বৈতসত্তার কষ্ট দেখেছি, তোমার সে কষ্ট ছুঁতে না পেরে নিজে কষ্ট পেয়েছি।
সজল, তুমি বিশাল একজন। এযেন অসীম বিশাল খোলা মাঠ, যার একটা কোনায় আমার খেলাঘরটাই আমার কাছে স্বর্গসম। সে বিশাল মাঠজুড়ে ধাপিয়ে বেড়ানোর অতটা বিশালত্ব আমার ছিলোনা, নেই।
সৌম্যর কাছে তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। সৌম্যকেও পুরোটাই তোমার মতো করে তুমি গড়েছ, কখনো কখনো মা বাবা দুটোর ভূমিকায়। সৌম্যর কাছে তুমি আমৃত্যু তেমনই থাকবে, আদর্শ ও পরম শ্রদ্ধার প্রতীক হিসাবে।
ফিরে এসো সজল। তোমার নন্দা ঠিক ২০ বছর আগের নন্দার মতোই তোমার অপেক্ষায় আছে। তুমি সজল, ‘স্বচ্ছ যে জল’। কখনোই মিথ্যে বলোনি, শুধু এই একটি সত্য গোপন করতে গিয়ে নিজের গহীনেই ধরফর করেছো, আজ আর তোমার সে চাপা কষ্ট নেই, তুমি স্বচ্ছ সজল, নির্ভার। দেখে নিও তোমার সব অসুস্থতাও সেরে যাবে ঠিক। ফিরে আসো সজল। তুমি ভারমুক্ত মৃত্যু চেয়েছো, আমরা সবে মিলে বরং ভারমুক্ত হাসিখুশি বাকি জীবনটা কাটাবো।
২০ টি বছর তোমার কবিতা পড়েছি, এমন কতো কবিতা মুহূর্তেই তৈরি করেছো, আমি পড়েছি, যা আর কোথাও ছাপা হয়নি।
আজ আমিই তোমার জন্য কয়টা লাইন দিয়ে শেষ করছি। –
‘জীবনটা শুধুই অংক কেন হবে
একে একে মিলে দুই?
ছোট্ট জীবন, চলো সবে মিলে হাসি
এয়ী হয়ে মোরা রই।
জানি পত্র পেয়েই ফিরবে। যাওয়ার সময় আমার দেয়া নীল পান্জাবীটা পরে এসো।
ইতি-
তোমার অপেক্ষায়-
‘তোমার নন্দা’।
.
.
০৪.
আজ সজল ফিরছে। এ’এক নির্ভার সজল। এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করে বের হওয়ার তাড়াও যেন আজ আর সইছেনা। বাইরে হয়তো অপেক্ষা করছে নন্দিনী। শেষ কবে নন্দিনীর জন্য এতোটা ব্যাকুল হয়েছিলো সজল? মনে পড়েনা।
এক্সিট পয়েন্টের গ্লাস দিয়ে দূর থেকেই দেখা যায় নীল শাড়িতে নন্দিনী। একেবারেই কাছাকাছি সজল, নন্দিনীর চোখে চোখ পড়তেই মনে হলো সত্যিই এযেন ২০ বছর আগের নন্দা!
কিন্তু সেকি! নন্দার পাশে কে ওটা??
শু-ভ্র!!! সজল পরনের পান্জাবীর মতো একই পান্জাবী পরে শুভ্র! আজ শুভ্রও সেই ২২ বছরের ভার্সিটি পড়ুয়া যুকটি!
নন্দা ও শুভ্র উভয়ের হাতে একগোঁছা শাদা দোলনচাঁপা, চোখেমুখে হাসি। সজলের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে……দুজনকেই শক্ত করে জড়িয়ে নেয় দু’বাহুতে।
ওরা বাঁচবে,নতুন করে আবার। ভালোবাসার সব হিসেব নিকেশ উল্টো করে দিয়ে ওরা বাঁচবে, ত্রয়ী হয়ে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.