মায়ের কাছে চিঠি

অরণ্য রাত্রি


হলুদ আলো টিম টিম করে জ্বলছে।একটা ছেলে টেবিলে বসে চিঠি লিখছে। পাশের ঘরে চলছে জগতের আদিমতম খেলা। দেহের খেলা।মাঝে মাঝে শুনা যাচ্ছে শীৎকার। কিন্তু সব কিছু অগ্রাহ্য করে এক মনে চিঠি লিখছে ছেলেটা।
এই বাড়ি টা অনেকটা মেসের মত। ৫ টা ঘর। প্রতি ঘরে একজন করে সমকামী যুবক থাকে। রাত হলেই বাড়িটা হয়ে উঠে একটা বেশ্যাখানা।এই যুবক রা অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে বিলিয়ে দেয় নিজেদের। ইউনিভারসিটির প্রফেসর থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত এদের কাস্টোমার।
ছেলেটার চিঠি লিখতে খুব কষ্ট হচ্ছে। সে পিত্ত রোগে আক্রান্ত। সে জানে বেশি দিন বাচবে না। সেটা কালও হতে পারে। তাই তো শেষ চিঠি লিখছে সে। মায়ের কাছে লিখা শেষ চিঠি।
ছেলেটার নাম অভ্র। তার বাবা বড় ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু আজ তার জায়গা এই ঘিঞ্চি ভাঙ্গা বাড়িতে। আর পেশা দেহ ব্যবসা।
অভ্রের পাশের এসে দাঁড়ালো শান্ত। সেও এই বাসার একজন সদস্য।
– কিরে কি লিখিস?
– চিঠি
– মায়ের কাছে?
– হ্যাঁ
– কিন্তু তুই তো একটা চিঠিও পোস্ট করিস না।
– করবো না। আচ্ছা তুই একটা উপকার করবি আমার?
– কি?
– আমি মারা যাওয়ার পর এই চিঠি গুলো মাকে দিয়ে আসবি আর বলবি চিঠি গুলো যেন সমুদ্রের সৈকতে বসে পড়ে
– তুই মারা যাবি কেন? কি বলিস এগুলো
– আমি জানি আমার শরীরের অবস্থা।
শান্ত চোখের পানি এসে গেল। কত বছর এক সাথে রয়েছে তারা। ১২ বছর তো হবেই। এখন অভ্র তার নিজের ভাইয়ের মত। নিজের পরিবার। কিন্তু অভ্রের চিকিৎসা করার মত সঙ্গতি তার নেই।একবার গোপনে অভ্রের মায়ের কাছে যাবে নাকি? শুনেছে অভ্রের বাবা মা অনেক ধনী। হ্যাঁ এটাই এক মাত্র উপায় অভ্র কে বাঁচানোর।


দুপুরের কড়া রোদ । আমেনা বেগম বড় হুজুরের ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন। পড়নে কালো বোরখা। প্রায় ১২ বছর যাবত এই হুজুরের কাছে তার যাতায়াত।ইনি অনেক ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন।কিন্তু আমেনা বেগমের আর বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না। তারপরও যাওয়া। প্রতি মাসে একবার করে আসেন আমেনা বেগম। প্রতিবার হুজুরের কক্ষে ঢুকার আগে একটা আশায় বুকে বাঁধেন তিনি।হুজুর প্রায়ই আশার কথা শুনান। কিন্তু ১২ বছর তো হয়ে গেলো। আর কত? বার বার ঠিক করেন আর যাবেন না। কিন্তু শুক্রবার আসলেই ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যান। আজিমপুর যান হুজুরের ওখানে। আশা একটাই তার বড় ছেলের খোঁজ ।
ফুটপাথ ধরে হাঁটছেন আমেনা বেগম। হতাশ। চোখ টলমল করছে পানি তে। কেউ তার কষ্ট বুঝে না। মাঝে মাঝে মনে হয় বুকে কেউ ধারালো ছুড়ি বসিয়ে দিয়েছে। প্রতি পদে পদে বড় ছেলে অভ্রের কথা মনে পরে। ভাল কোন খাবার রান্না হলে মনে হয় আহা ছেলেটা কি খাচ্ছে কে জানে। এই খাবার আর তখন আমেনা বেগমের গলা দিয়ে নামে না।কেউ তো আর এখন আগের মত পিছন দিক থেকে হটাত করে জড়িয়ে ধরে না।আহ্লাদ করে কেউ বলে না
– মা তুমি আমাকে একটুও আদর কর না।খালি নয়ন কে আদর কর।
নয়ন তার ছোট ছেলে। আর অভ্র বড়।
এত বড় ছেলে তাও কত আহ্লাদ করতো। আমেনা বেগমের বিরক্ত লাগতো না। বরং ভাল লাগতো। থুতনি ধরে আদর করে দিতেন তিনি। সেই ছেলে এখন অনাদরে কোথায় আছে?
ফুটপাথে এক ব্যক্তি পাখী নিয়ে ভাগ্য গণনা করছে। আমেনা বেগমের ইচ্ছা হল। না হয় পাখি দিয়েও গণনা করা হল। অভ্র কে যদি পাওয়া যায়।
কি আশ্চর্য ১ মাসের মাঝেই নাকি অভ্রের খোঁজ পাওয়া যাবে। পাখির গণনা ।
আমেনা ভাবছেন হাতি ঘোড়া গেলো তল
পাখি বলে কত জল।
আমেনা বেগমের বাসায় যেতে ইচ্ছা করছে না।একটা হলে সিনেমা চলছে। একবার অভ্র ক্লাস টেস্টে ১ পেয়েছিল ১০ এ। সে কি কান্না। আমেনা বেগম ছেলের মন ভাল করার জন্য সিনেমা দেখিয়ে আনলেন। আমেনা বেগম এর বয়স ধরা যেত না। মনে হত অভ্র আর আমেনা বেগম ভাই বোন । এখন আর সেই রূপ যৌবন নেই। অনেক আগেই শেষ। জীবনের এত গুলো বছর এইভাবে কষ্ট করতে হবে কক্ষনোই ভাবেন নাই তিনি। রাতে হটাত হটাত ঘুম ভেঙ্গে যায়। বারান্দায় যেয়ে চুপ করে বসে থাকেন। কাউকে বিরক্ত করেন না। ভাবেন অভ্রের কথা। কত শখ ছিল অভ্র ডাক্তার হবে। কিন্তু তা তো দুরের কথা । সে বেঁচে আছে কি?বেঁচে থাকলে কি একবারও মায়ের সাথে দেখা করলো না। তার তো পরান পুড়ে। মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে। চিৎকার করতে ইচ্ছা করে। বলতে ইচ্ছা করে যেখান থেকে পারো অভ্র কে নিয়ে আসো। আমার বুকের ধন কে নিয়ে আসো।
অভ্র পরীক্ষার আগে খুব ভয় পেতো। সেদিন মায়ের সাথে ঘুমাবে। অভ্রের বাবা রাজিব সাহেব বিরক্ত হতেন। কিন্তু ছেলের আবদার। রাতে শুয়ে মা ছেলে কুট কুট করে গল্প করতো। কত কথা অভ্রর। সব কথাই বলতে হবে। শুধু একটা কথা বলে নাই। কেন বলে নাই? বললে এমন পরিস্থিতি কক্ষনোই হত না।
অভ্রটা যা ভীতু ছিল। একটু ভয় পেলেই দৌড়ে মায়ের ঘরে। এখন ভয় পেলে কোথায় যায় সে?

১২ বছর আগের কথা
অভ্র এইবার এইচ এস সি পরীক্ষা দিবে।আর দশটা তরুনের মত জীবন তার কাছে অনেক রঙিন। তার উপর রাজিব সাহেব একটা কম্পিউটার কিনে দিয়েছেন।ইন্টারনেট ও লাগিয়ে দিয়েছেন। পড়াশোনা লাটে উঠেছে। একদিন ব্রাউজ করতে করতে সে একটা সমকামী সাইট পেলো।আর অভ্র নিজেও সমকামী ।সে কক্ষনো ভাবে নাই বাংলাদেশে এতো সমকামী মানুষ আছে। সমকামী জগতের নেশা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো।সেই সাইট থেকেই অনেকের সাথে অভ্রের চ্যাট হল। পরিচয় হল পলকের সাথে। অনেকদিন চ্যাট হল।ছবি আদান প্রদান , ফোনে কথা হল।পলক খুব সুন্দর করে কথা বলে। আর দেখতেও সুন্দর। অভ্র তো মুগ্ধ। দেখা করলো ২ জন।ধানমন্ডি লেকে। প্রথম দেখাতেই প্রেম। ২ দিনের মাথায় তারা রিলেশনে গেলো।
সকালে আমেনা বেগম, রাজিব সাহেব আর নয়ন কেউ তেমন বাসায় থাকে না। একদিন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সকালে অভ্র , পলককে নিজের বাসায় নিয়ে আসলো ।২ জন সমত্ত পুরুষ একটা নির্জন কামরায় একসাথে। আগুন আর কেরোশিনের মিশ্রণ ঘটলো যেন। আগুন জ্বলে উঠলো দাউ দাউ করে। প্রেমের লীলায় মাতলো ২ জন। কিন্তু যা একবার হয় তা সুযোগ পেলে দ্বিতীয় বার হতে অসুবিধা কোথায়।প্রায়ই চলতে লাগলো তাদের শরীরের ভালবাসা।
বর্ষাকাল। ঝুম বৃষ্টি। বাসায় কেউ নেই। শুধু অভ্র । অভ্রের পলক কে খুব কাছে পেতে ইচ্ছা করছে। ফোন দিল। পলকের বাসা কাছেই। চলে আসলো। দিন দিন তারা বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছিলো। একজন আরেকজন কে আদর করতে লাগলো। কিন্তু দরজা যে খোলা সেই খেয়াল নেই।একজন আরেকজনের শরীরের গন্ধ বুক ভরে নিতে লাগলো। অভ্র পলক কে জড়িয়ে ধরে কানে আলতো কামড় দিল ।
রাজিব সাহেব আর আমেনা বেগম দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথে রাজিব সাহেব অসুস্থ হয়ে পরাতে বাড়ি ফিরলেন। দরজা খোলা দেখে তো রাজিব সাহেব খুব বিরক্ত। ছেলেটার আর আক্কেল হবে না।দরজা খোলা রেখেছে। তারপর যা হবার তাই হল। দরজা খুলতেই অভ্র আর পলককে চুম্বন রত অবস্থা দেখে ফেললেন তিনি।
পলক সাথে সাথে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। রাজিব সাহেব কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলেন। কিন্তু আমেনা বেগম চুপ থাকলেন না। এই মানুষ করেছেন তিনি ছেলে কে। জোরে এক চড় মারলেন অভ্র কে।যা আগে কক্ষনোই করেন নাই তিনি। আমেনা বেগম ভেবেছিলেন এখানেই সব শেষ হয়ে যাবে। মেয়ে রা অবৈধ ভাবে গর্ভবতী হলেও তো বাবা মা ক্ষমা করে দেন।
কিন্তু ব্যাপারটা এতো সহজে মিটলো না।রাজিব সাহেব কিছুক্ষণ পর গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন
– শুনো অভ্র আমার বাসায় তোমার আর জায়গা নাই। তুমি কাপড় গুছিয়ে নাও। আজই এখুনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবা। আই মিন ইট।
রাজিব সাহেবের কণ্ঠ এত শীতল ছিল যে অভ্র বুঝলো তার চলেই যেতে হবে
– বাবা যাওয়ার আগে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
– কর
– মানুষ কে ভালবাসা কি অপরাধ?
– হ্যাঁ যদি তা হয় সমলিঙ্গের।
– আর তুমি যে লাখ লাখ টাকা ঘুষ খাও তার থেকেও অপরাধ?
এইবার আর জামাল সাহেব নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। চড় মারলেন।
অভ্র আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। নিজের ঘরে ঢুকে ব্যাগ গুছালো।আমেনা বেগম দরজার বাইরে দাড়িয়ে আছেন। কি করবেন বুঝতে পারছেন না?
রাজিব সাহেব কে বললেন
– এগুলো কি বলছো এই বৃষ্টির রাত্রে সে কই যাবে?
– যেখানে খুশি যাক । আমার সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে? কত বড় সাহস। একটা বেশ্যা জন্ম দিয়েছি।
– ছিঃ । ছেলের নামে কি বলছ ?
– যা বলছি ঠিক বলেছি। দরকার হলে তুমিও চলে যাও। এটা আমার বাড়ি । আমার কথা মত থাকতে হবে। না হলে গেট লস্ট
আমেনা বেগম ভাবলেন ২ দিন পরেরই নিশ্চয়ই অভ্র ফিরে আসবে। ক্ষমা চাইবে। আবার সব আগের মত হয়ে যাবে। কিন্তু কিসের কি। ১ দিন নয়, ২ দিন নয় ১২ বছর পার হয়ে গেলো। সময় নাকি দ্রুত যায়। কিন্তু তার কাছে তো ১২ বছর ১২০০ বছর মনে হয়। জীবনের সবচেয়ে সুখ মা হওয়া। কিন্তু আল্লাহ তা আলা কি সুখের পরীক্ষা নিচ্ছেন তার।একটি বার যদি অভ্র কে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারতেন।

বৃষ্টির রাত কই যাবে? কিন্তু বাসায় আর ফিরবে না। পলকের বাসায় গেলে কেমন হয়? থাকতে দিবে?বৃষ্টিতে ভিজতেই ভিজতেই পলকের বাসায় গেল অভ্র।
পলকের বাসায় বেল বাজাতেই পলক দরজা খুলল
– তুই এখানে? এত রাতে?
– তোর বাসায় থাকা যাবে আজকের রাতটা ?
– তোর মাথা খারাপ? আমার বাবা মেরেই ফেলবে।তুই বাড়ি যা। আঙ্কেলের কাছে মাফ চা।
দরজা মুখের উপর বন্ধ করে দিলো পলক। ছিঃ এই মানুষ কে সে ভালবেসেছিল? তার জন্য সে আজকে বাড়ি ছাড়া।
কই যাবে অভ্র? হাত কিছু টাকা আছে।ঠিক করলো ঢাকা শহরে আর না। চিটাগাং চলে যাবে। বৃষ্টির রাত কমলাপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে অভ্র। চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে। মায়ের সাথে কি আর দেখা হবে না কক্ষনোই ? মায়ের গায়ের মিষ্টি গন্ধটা কি পাবে না সে আর? মায়ের হাতে আর খাওয়া হবে না? কান্না আসলে কি করবে? মা তো আর আচল দিয়ে চোখ মুছে দিবে না। মায়ের সাথে শুয়ে কলেজে কি কি হয়েছে সেই গল্প তো আর করা যাবে না। মা মা বলে চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে। মা তুমি কোথায় ? আমি তো অনেক অসহায়। তোমাকে ছাড়া আমি কিভাবে বাঁচবো
অভ্র ট্রেনে উঠলো। আস্তে আস্তে ট্রেন চলা শুরু করলো। ঢাকা শহর কে শেষ বারের মত বিদায় জানালো অভ্র।

তারপর অনেক বর্ষা চলে গিয়েছে।আমেনা বেগম এখন স্বাবলম্বী ।বাবার মৃত্যুর পর বিশাল সম্পত্তি পেয়েছেন আমেনা বেগম। তিনি আর তার ছেলে নয়ন একসাথে থাকেন। রাজিব সাহেব আলাদা থাকেন। আমেনা বেগম মনে প্রানে ঘৃণা করে রাজিব সাহেব কে।রাজিবের জন্য আজ অভ্র নেই। নয়ন , রাজিবের মত হয়েছে। অভ্রের খোঁজ নিতে গেলেই নয়ন আমেনা বেগমের উপর খুব বিরক্ত হয়।
এক সন্ধ্যা । একটি ৩০ বছরের মত বয়সী একটি ছেলে এসে উপস্থিত হল আমেনা বেগমের বাসায়। বেশ ভূষা তে দারিদ্র্য স্পষ্ট। নয়ন খুব বিরক্ত। এসব লোক কোথা থেকে বাসায় এসে জুটে।
আমেনা বেগম কথা বলতে আসলেন
– স্লামিলাকুম
– তুমি কে বাবা?
– আমাকে চিনবেন না। আমি অভ্রের বন্ধু
আমেনা বেগম ধন্দে পড়ে গেলেন। কি শুনেছেন তিনি। বুড়ো হয়েছে তো কানে কম শুনেন
– আমি অভ্রের বন্ধু চাচি।
আমেনা বেগম চুপ হয়ে গেলেন। কি করবেন বুঝতে পারছেন না। চিৎকার দিবেন? এতো দিনের সব চিৎকার তো সব জমে আছে। কাঁদবেন ? কাঁদলে তো বন্যা হয়ে যাবে। না সবার আগে আল্লাহর কাছে শুক্রিয়া আদায় করতে হবে।
– তুমি একটু বসো বাবা। আমি এখুনি আসছি।
নামাজে বসলেন আমেনা বেগম। আল্লাহ তা আলার কাছে শুক্রিয়া আদায় করলেন কাঁদলেন । তারপর আবার আসলেন বসার ঘরে।
– চাচি আপনি সব কথা না শুনেই চলে গেলেন
আমেনা বেগমের বুকটা ধক করে উঠলো। তাহলে কি কোন খারাপ খবর?
– চাচি অভ্র খুব অসুস্থ। ওর উন্নত চিকিৎসা দরকার। কিন্তু আমাদের পক্ষে চিকিৎসা চালানো সম্ভব না। অনেক কষ্টে অভ্রর কাছ থেকে আপনার ঠিকানা বের করেছি। সে দিবেই না।
– আমি যাবো তার কাছে।
– চাচি আপনি যেতে পারবেন না। আমি নিয়ে আসবো । আমরা যে জায়গায় থাকি তা খুব খারাপ জায়গা।
– কেন খারাপ?
– কিভাবে বলি কথা টা চাচি।টাকার বিনিময়ে আমরা দেহ ব্যবসা করি। অভ্র যখন প্রথম আসলো আমাদের সাথে সে এডজাস্ট করতে পারে নাই। কিন্তু খাওয়ার কষ্ট অনেক বড় কষ্ট। এক সময় সে আমাদের মত হয়ে গেলো। আমরা এখন তার ভাইয়ের মত। কোন অযত্ন আমরা করি নাই তার। চাচি আমাদের ঘৃণা করেন কিন্তু অভ্র কে বাঁচান । গলা ধরে আসলো ছেলেটার
– ১২ বছর আগের আমি আর এখনের আমি এক না। আমি স্বাবলম্বী। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেই। কোন রাজিব হাসানের কথায় আমি চলি না। আমি আমার ছেলে কে দেখতে চাই। যত টাকা লাগবে আমি চিকিৎসা করাবো। সমকামিতা কে আমি ঘৃণা করি না। সমাজ বিজ্ঞানই দের মতে সারা পৃথিবীর ১০ ভাগ মানুষ পুরোপুরি সমকামী। ইচ্ছা করলেই তারা পরিবর্তন হতে পারে না।
– চাচি অভ্রের অসুখ টা খুব কঠিন । হেপাটাইটিস সি।
– আমি ওর মা। আমি তাকে বাঁচাবোই। তুমি কালকে নিয়ে আসো ।আমি কমলাপুর স্টেশনে অপেক্ষা করবো


ছেলে টি চলে যাওয়ার পর নয়ন কথা বলল
– একটা দেহ ব্যবসায়ী কে তুমি বাসায় জায়গা দিবে? যেখানে তার আবার হেপাটাইটিস সি।
– ও তোর ভাই। আর তোর ভাল না লাগলে তুই তোর বাপের কাছে চলে যা। রাজিবের কপি হয়েছিস। কাল অভ্র আসবে আমার অনেক কাজ। শপিং যাবো
প্রথমেই আমেনা বেগম ঢুকলেন কাপড়ের দোকানে। কিন্তু কাপড়ের সাইজ তো জানে না। তাহলে। থাক কাপড় পরে। চাদরের দোকানে ঢুকা যাক। অভ্রের প্রিয় রঙ তো বেগুনি। বেগুনি রঙের চাদর কিনা হল। বিশাল চকলেট কেক। আমসত্ত্ব অভ্রের প্রিয়। এক গাদা গানের সিডি। অভ্র তো গান শুনতে অনেক পছন্দ করে। আচ্ছা অভ্র কি আগের মতই আছে। তাকে দেখেই কি অভ্র ছুটে আসবে? জড়িয়ে ধরবে? আমেনা বেগম ভাবছেন এই হাত ২ টা দিয়ে কালকে অভ্র কে ছুঁতে পারবেন। কত দিনের কষ্ট , ধৈর্য চোখের পানি। ভাবছেন
আমার ছেলে, আমার আদরের নাড়ি ছেড়া ধন। আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস আবার পাবো। আর হারাতে দিবো না। কক্ষনোই না। কেন কালকে আসে না? আর কতক্ষণ ? সূর্য টা ডুবে না কেন? ঈশ দিন টা আজকে বেশি বড়। অহ হ অভ্রের জন্য তো গেমের সিডি কেনা হয় নাই। কত গেম খেলতো পাগলটা।
খুশি তে চোখে পানি এসে গিয়েছে আমেনা বেগমের। কাল তার ছেলে আসবে। ১২ বছর পর। ১২ বছর…………।।

কমলাপুর রেলস্টেশনের প্লাটফরমে ফরমে দাঁড়িয়ে আছে আমেনা বেগম। ট্রেন এসেছে। আরে এই তো অভ্র। দৌড়ে ছুটে গেল আমেনা বেগম। কিন্তু না। অভ্রের মত আরেকজন। অভ্র নামছে না কেন ট্রেন থেকে। সবাই নেমে গেলো। অভ্র নেই। তাহলে কি পরের ট্রেনে আসবে। ছেলেটার এখনো সময় জ্ঞান হল না। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় ট্রেন চলে গেলো। তৃতীয় ট্রেন। অভ্রের দেখা নেই।নয়ন বলছে
– মা আজ বোধ হয় আসবে না। চল বাড়ি যাই।
– না। অভ্র কে না নিয়ে বাড়ি যাবো না।
– তুমি বাচ্চা দের মত জিদ করছো মা।
– তুই যা। আমি যাবো না বললাম তো
– শেষ ট্রেন। ট্রেন থেকে নামলো সেই ছেলেটা।
– বাবা অভ্র কোথায় ?
– ছেলেটা মাথা নিচু করে আছে।
– প্লিজ বল বাবা অভ্র কই?
– অভ্র নেই। এখানে আনতে আন্তেই পথে
– কি বললে?
– পথে মারা গিয়েছে।
ছেলেটা কাঁদছে
আমেনা বেগম আর কিছু বললেন না। নয়ন কে বলল
– চল বাড়ি যাই।
– চাচি আপনাকে প্রতিবছর মা দিবসে একটি করে চিঠি লিখত অভ্র। কক্ষনো দেয় নাই। আমি চিঠি গুলো নিয়ে এসেছি। আপনি পড়বেন। কোন এক সমুদ্রের ধারে। অভ্রের কক্সবাজার যাওয়ার খুব শখ ছিল। কিন্তু আপনাকে না নিয়ে যাবে না।আপনার নাকি সমুদ্র খুব প্রিয়। কিন্তু আপনি নাকি কক্ষনোই যান নাই। তাই সেও যায় নাই।
আমেনা বেগম চিঠি গুলো নিলো ।
বাড়ি ফিরে আমেনা বেগম খুব স্বাভাবিক ভাবে শুয়ে পড়লেন।
নয়ন এসে বলল
– মা তুমি এমন নিষ্ঠুর হলে কিভাবে ? এক ফোঁটা চোখের জল ফেলো নাই।
– আমি কাঁদলে আমার ছেলের আত্মা কষ্ট পাবে তা আমি হতে দিবো না।
কিন্তু পারলেন না। নয়ন কে জড়িয়ে ধরে হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগলেন।
– আমার ছেলে টা সারা জীবন শুধু কষ্টই পেলো।আমি একবার দেখতে পারলাম না তাকে। এত আয়োজন করলাম সব নষ্ট করে দে নয়ন। আমি এগুলো দেখলে শুধু অভ্রের কথা মনে পড়বে
নয়ন বলল
– নষ্ট করলেই কি তুমি ভুলতে পারবে?
– চল কালকে চট্টগ্রাম যাই। তাকে শেষ দেখে আসি।
– হ্যাঁ যাবো ।কিন্তু আমাকে সেখান থেকে সেইন্টমারটিন নিয়ে যাবি? আমি চিঠি গুলো পড়বো

সেইন্ট মারটিন আই ল্যান্ড। চারিদিকে নীল জলরাশি। আমেনা বেগমের হাতে অনেকগুলো চিঠি। সে ছোট অভ্রের চিঠি থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক অভ্রের চিঠি। আমেনা বেগম একটি করে চিঠি পড়ছেন উড়িয়ে দিচ্ছেন বাতাসে। এমন তাই চেয়েছিল অভ্র। তার কোন স্মৃতি চিহ্ন যেন না থাকে। তাহলে যে তার মা কষ্ট পাবে।
শেষ চিঠি।
মা তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে। ইচ্ছা বললে ভুল হবে আমার পাগলের মত লাগে। কিন্তু আমি এমন পঙ্কিল জগতের অধিবাসী সেখান থেকে তোমার কাছে আসা যায় না। আমি তোমার চোখে আমার প্রতি ঘৃণা নিতে পারবো না। ভেবেছিলাম গোপনে দেখে আসবো। কিন্তু তোমার সাথে আমি লুকোছাপা করবো না। যাদের মা আছে তাদের দেখলে আমার হিংসা হয়। টাকা পয়সা ক্ষমতা কিছু দ্বারাই মায়ের তুলনা হয় না। যদি পুনর্জন্ম থাকে তাহলে আমি আবার তোমার গর্ভে জন্মাতে চাই। এরপর আর ভুল হবে না। চির জীবন আমি তোমার লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকবো।
অভ্র

আমেনা বেগম নিঃশব্দে কাঁদছেন। তাকে জড়িয়ে ধরে আছে নয়ন। জীবন মাঝে মাঝে এত নিষ্ঠুর।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.