শিবুদা

রাজেশ চৌধুরী

আজ এয়ারপোর্ট রোডটা একদম ফাঁকা মনে হচ্ছে। বুলেট ট্রেনের গতিতে এগিয়ে চলেছে আমাদের সিএনজি। কাজীর দেউড়ি হয়ে লালখান বাজার ক্রস করে এখন টাইগারপাসের কাছাকাছি আমরা। গন্তব্য শাহ আমানত আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট।
সিএনজির যাত্রী শুধু আমরা দুজন।আমার পাশে আমার সহযাত্রী হিসেবে যে মানুষটা বসে আছে ওনি আজ সাত বছর ধরে আমার সুখ-দু:খ, হসি-কান্নার নিরভ সাক্ষী। মানুষটির নাম শিবময় চ্যাটার্জী। আমার শিবুদা। আমার জীবনের যত মজার অভিজ্ঞতা আছে তার সবটার স্রষ্টা শিবুদা।
আজ আমার শিবুদা চলে যাচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে একাউন্টিং এ উচ্চশিক্ষা নেওয়ার জন্য একটা স্কলারশিপ পেয়েছেন ওনি।
আমাদের সিএনজি এখন দেওয়ানহাটে জ্যামে পড়েছে। দূর দূরান্ত পর্যন্ত শুধু গাড়ির লাইন দেখতে পাচ্ছি। শিবুদা বলল, “পটলা আজ কি তাহলে ফ্লাইট ক্যান্সেল?”
“আরে দূর কি যে বলো না তুমি একটু ওয়েট করো,দেখবে গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে”, আমি শিবুদাকে আশ্বস্ত করলাম।
শিবুদা শিস দিয়ে গান গাইতে শুরু করল।
গাড়ি চলে না,চলে না, চলে না রে….
আমার সত্যিই শিবুদার গানের দিকে মনোযোগ নাই।আমি আসলেই আমার শিবুদাকে খুব মিস করব।কাল থেকে কারণে অকারণে আমার ফোনে শিবুদার কল আসবে না ভাবতেই বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে।আবার মনে মনে খুব খুশি কারণ শিবুদা ইউরোপে যাওয়া মানে ব্রিটিশদদের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া। এদিকে আমাদের গাড়ি এখনো জ্যামে।একচুলও যেন চলছে না।
আমার মন আজ নস্টালজিক হয়ে উঠেছে।মনের মণিকোঠায় সাজানো স্মৃতির পৃষ্ঠাগুলো আজ হঠাত স্ব-ইচ্ছায় আমার সামনে জ্বলজ্যান্ত হয়ে উঠেছে। অনেক পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল আমার।
আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনটির কথা যেদিন শিবুদা প্রথম আমাদের পাড়ায় এসেছিল। আমি সেদিন পাড়ার কয়েকটি ছেলের সাথে ক্রিকেট খেলছিলাম। আমি ব্যাট করছিলাম।আর আমার ব্যাটিং এ বলটি ঠিক গিয়ে পড়ল শিবুদার হাতে ধরে একুরিয়ামটির ওপর আর সঙগে সঙগে আমি দৌড় লাগালাম।হঠাত খেয়াল করলাম শিবুদাও আমার পিছনে দৌড় লাগালো। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে ধরে ফেলল।আমার কানটা মলতে মলতে যে বেহাল দশা করেছিল শিবুদা তা ভাবতেই এখন আমার হাসি পাচ্ছে।
স্মৃতিরা আসলেই এমন।সত্যি স্মৃতিচারণ করতে বড্ড মন চাইছে আজ।আমার মানসপটে যত স্মৃতি সংরক্ষিত আছে তার অধিকাংশই শিবুদাকে ঘিরে।
কতইনা হাসির আর মজার ঘটনা আছে এই শিবুদাকে ঘিরে।শিবুদা যেন একটা হাসির বাকসো।শিবুদাকে নিয়ে ভাবতেও আমার বেশ ভালই লাগে।
মনে পড়ে গেল প্রায় তিন বছর আগের ঘটনা।আমি আর শিবুদা আমাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেছিলাম সেবার।সকাল বেলা পৌঁছে বিকেল বেলা আমরা দুজন গ্রামে ঘুরতে বের হলাম।আমাদের গ্রামে এক ঝগড়াটে বুড়ো ছিল।আর গ্রামের সবচাইতে বড় খেলার মাঠটার মালিক ছিল বুড়োটা।সে কাউকেই তার মাঠে খেলতে দিতে চাইত না। সে সবসময় মাঠের পাশে একটা বিরাট বটগাছের শিকড়ে বসে বসে তার মাঠটা পাহারা দিত।আর কোন ছেলেমেয়েকে মাঠে ঢুকতে দেখলেই হাতের লাঠিটা নিয়ে তেড়ে আসতো।
শিবুদা আমায় বলল,” পটলা এই বুড়োটার কি করি আজ তুই খালি দেখ।”
আমি বললাম,” শিবুদা তুমি ওনাকে চেন না।ওনি খুব খতরনাক গালিদেওনেওয়ালা।শুনেছি ওনি গালির ওপর ডিপ্লোমা করেছে। ওর সাথে লাগতে যেও না প্লীজ।”
শিবুদা হেসে বললো, “আরে ওনি যদি গালিতে ডিপ্লোমা করে থাকেন তাহলে আমি চাপাবাজিতে মাস্টার্স। আচ্ছা বল তোদের এখানে কি ভূতের বালিশ পাওয়া যায়?”
আমি বললাম,”ভূতের বালিশ মানে?”
শিবুদা বলল,”আরে বোকা ওটা এক ধরণের ফল।সবাই ওটাকে বাঁদরলাঠি বলে।দেখতে লম্বা লম্বা লাঠির মত। একটা ভূতের বালিশ পেলেও হত।ওটা গুরো করে তা থেকে যদি একটু গুরো পাউডার বুড়ার গায়ে দিয়ে দেওয়া যায় তাহলে দেখবি বুড়ো জন্মের মত সোজা হয়ে যাবে।”
আমিতো শিবুদার কথা শুনে বেশ খুশি হয়ে গেলাম।মনে মনে একটু ভয়ও পাচ্ছিলাম অবশ্যই।আমরা গ্রামের কয়েকজন মিলে একটা পরিকল্পনা করলাম। গ্রামের পাশের জঙগল থেকে আমরা অনেক কষ্ট করে দুইটা ভূতের বালিশ জোগাড় করে ওগুলো থেকে পাউডার বানালাম।
শিবুদা এক বালতি পানি নিয়ে তাতে বেশ কিছু পাউডার মিশিয়ে দিল।আর বাকি পাউডারগুলো একটি প্যাকেটের সবজায়গায় মিশিয়ে দিল।এবার প্যাকেটেএ মধ্যে অনেকগুলো বড়ই নিল।
শিবুদা এবার বুড়োটার কাছে এসে বললো,” কাকু আমিতো গ্রামে নতুন এসেছি।আপনার সাথে কি একটু কথা বলতে পারি?
বুড়োটা কটমট করে উঠল,”কি আর কথা কইবা? এমনিতেই এই পোলাপানের জ্বালায় বাঁচি না।”
“জী কাকু এই ছেলেগুলো এক্কেবারে বদের হাড্ডি।এরা আশেপাশে থাকলে আসলেই শান্তিতে থাকা যায় না। দেখেন না আমি এসেছি আজ শহর থেকে।কোথায় একটু বিশ্রাম নিব তা না।এরা জোর করে আমায় নিয়ে এসেছে মাঠে খেলার জন্য,” শিবুদা দুঃখী ভাব নিয়ে বলল।
এবার বুড়োটা নরম হল। সে শিবুদাকে বলল,” মাঠ কি খেলবার জায়গা? তোরা খেলবি তোগো বাড়িতে যা। আমার এখানে কি?”
“ঠিক বলেছেন কাকু।মাঠ হল পবিত্র জায়গা।এটা হল গোচারণ ভূমি।ওদের একদম মাঠে খেলতে দিবেন না”, কথাগুলো বলেই শিবুদা তার পকেট থেকে একটা বড়ই নিয়ে খেল।
“কাকু বড়ই খাবেন? ঢাকাইয়া বড়ই।বড্ড মিষ্টি। আমি শহর থেকে এনেছি।”, শিবুদা বুড়োটাকে জিজ্ঞেস করল।
“মিডা আছে নি? এখানকার বড়ইগুলানতো কস”, বুড়োটা জিজ্ঞেস করল।
শিবুদা পকেট থেকে একটি মিষ্টি বড়ই দিল বুড়োটাকে। বুড়োটা ওটা খেয়ে বলল, “হুম মিডা আছে তো।”
“কাকু এই নিন।এই প্যাকেটের সবগুলো বড়ই আপনার জন্য।আপনি খেয়ে বলবেন কিন্তু সবগুলো মিষ্টি ছিল কিনা?” কথাগুলো বলতে বলতে শিবুদা বাঁদরলাঠির পাউডার লাগানো বড়ই ভর্তি প্যাকেটটা বুড়োটাকে দিয়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল
আমি আর আমার সাঙ্গপাঙ্গরা মিলে আমগাছটার ওপাশে দাড়িয়ে রইলাম।আমরা সবাই উর্ধবশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলাম এখন কি হয় দেখার জন্য।
বুড়োটা প্যাকেটটা হাতে নিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বড়ই খেতে লাগলো। আমরা তো অবাক। তাহলে কি সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল? মনটা সত্যি খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় হঠাত বুড়োটার চিতকারে আমরা সবাই সম্বিত ফিরে ফেললাম।
“বাবাগো, মাগো মরে গেলাম গো।উফফ। এত চুলকায় কেন হাতটা?”, বুড়োটা জোরে জোরে চিতকার দিতে লাগল।
“নিশ্চয় হাতে বিচ্ছু টিচ্ছু লেগেছে হয়ত।ধরেন এই পানি দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নেন।আশা করি ভাল লাগবে?” এই বলে শিবুদা বুড়োটাকে পাউডার মেশানো পানিভর্তি বালতিটা এগিয়ে দিল।
আমি মনে মনে বললাম,”শিবুদা ভাগ্যিস বালতিটা আগেভাগেই বটগাছের পিছনে এনে রেখেছিল।”
বুড়োটা সাতপাঁচ না ভেবেই বালতির পানি দিয়ে হাতমুখ ধুতে লাগল। শিবুদা এবার দুই হাত মুখের ভিতরে দিয়ে খুব জোরে একটা শিস বাজালো।আমরা সবাই এবার আড়াল থেকে হই হই করে বের হয়ে এলাম।আড় বুড়োটাকে উদ্দেশ্য করে ছড়া কাটতে লাগলাম।
এদিকে বালতির পানি দিয়ে মুখ ধোয়ার ফলে বুড়ো কাকুর অবস্থা আরোও খারাপ হয়ে গেল। ওনি বাইন মাছের মত লাফাতে লাগলেন।আর শিবুদা সহ আমাদের উপর ওনার ডিপ্লোমার জ্ঞান এপ্লাই করতে লাগলেন।
এদিকে আমরা তো মহাখুশি। সবাই মিলে বুড়োর মাঠে সারাদিন ক্রিকেট খেললাম। শিবুদা একটা মোটা কাগজ নিয়ে আসল।আর ওটাতে বড় বড় করে লিখল ”এই মাঠ আজ থেকে খেলার জন্য উন্মুক্ত করা হইলো।” আর কাগজটাকে সাইনবোর্ড বানিয়ে মাঠের কোণায় লাগিয়ে দিল।
আমরা অবশ্য সেদিন রাতের বেলায় শহরে চলে এসেছিলাম।কোন এক অজ্ঞাত কারণে ওই ঘটনার পর থেকে বুড়ো আর কখনো ছেলেমেয়েদের খেলতে বাধা দেয় নি ওই মাঠে। আর ওই সাইনবোর্ডটা এখনো আছে।
সত্যি শিবুদা মানুষটা আগাগোড়া রসিক।সেদিন বুড়োটার চেহারাটা সত্যি দেখার মত ছিল।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই হাসি পেল আমার। হাসতে হাসতে হঠাত খেয়াল করলাম পাশের সিটে শিবুদা ঘুমিয়ে গেছে।
“ভালোই হল।অনেক বড় জার্নি করতে হবে ওনাকে “, মনে মনে ভাবলাম আমি।
আমাদের সিএনজি এখন কাস্টমস মোড় ক্রস করে যাচ্ছে। আমি শিবুদার ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে রইলাম। মুখটা দেখে মনে হচ্ছে যেন ভাজা মাছ দিলে ওটা উল্টাতে পারবেনা মানুষটা। কিন্তু ভিতরে ভিতরে দুষ্টুমিতে ভরা এই মানুষটা।
আমাদের গাড়ি আবার জ্যামে পড়ল। “শালার ট্রাফিক জ্যাম।আমরা কি কোনদিন বিনাবাধায় যাত্রা সমাধান করতে পারবো না”, মনে মনে সরকারের গুষ্ঠি উদ্ধার করতে লাগলাম আমি।
শিবুদা যে কি চিজ এটা চিন্তা করে সত্যি অবাক হই।হঠাত গতবছরের একটা কথা মনে পড়ে গেল আমার।
গতবছর জানুয়ারির দিকেরকার ঘটনা। এক কাছের বন্ধুর অনুরোধে পটিয়াতে তার মালিকানাধীন কোচিং সেন্টারে ক্লাশ নিতাম।এস এস সি স্পেশাল বায়োলজি ক্লাশ।
একটা দিনের ঘটনা। সেদিন আমার খুব জ্বর।বিছানা থেকে উঠতেই পারছিলাম না;কোচিংএ কিভাবে যাব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
কিন্তু আমার বন্ধু ফোনে বললো দোস্ত আজ বায়োলজি লাস্ট ক্লাশ।তুই আসতে না পারলেও অন্য কাউকে পাঠা আজকের জন্য প্লিজ।
ওর কথা শুনে আমার জ্বর আরও চেপে এল। আমি জ্বরের ঘোরে কি করব না কি করব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে শিবুদাকেই ফোন লাগালাম।
আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম, “শিবুদা তোমাকে আজ একটা উপকার করতেই হবে।তুমি না করতে পারবে না কিন্তু?”
শিবুদা দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলল, ” কি উপকার শুধু একবার বল। আরেহ তোরা হলি এলাকার ছোট ভাই।তোদের জন্য কিছু করতে পারলে ভালই লাগবে।”
“শিবুদা আজকে একটু পটিয়া যাও না প্লীজ;শিহাব’স কোচিংএ। বায়োলজি ক্লাশটা নিয়ে আসবে।তোমার না এস.এস.সি তে সায়েন্স ছিল।”
শিবুদা কিছুক্ষণ কি যেন ভাবল।তারপর বললো,”পটলা,আমিত
ো বায়োলজি পড়েছিলাম মেট্রিক এ;এরপরতো আর পড়ি নাই।তবুও কুচ পরোয়া নেহি। এই শিবময় চ্যাটার্জীর ডিকশনারিতে না ওয়ার্ডটা নাই, বুঝলি?”
যাই হোক কোনরকমে শিবুদাকে পটিয়া পাঠালাম।এরপর আমার জ্বর বাড়তে লাগল।জ্বরের ঘোরে আমি শুয়ে গেলাম।সেই ঘুম ভাঙল এক্কেবারে সন্ধ্যায়।দেখি কি শিবুদা আমার রুমে বসে আছে।
আমি হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলাম,” শিবুদা আজকের কোচিং এর কি অভিজ্ঞতা?”
এই প্রশ্নের উত্তরে শিবুদা যা বললো তা শুনে তো আমার রীতিমত কিডনিতে হার্ট-এটাক হয়ে যাওয়ার জোগাড়। শিবুদা যা বললো তার সারসংক্ষেপ বড্ড বিচিত্র
শিবুদা যথারীতি কোচিংএ গেল।নির্ধারিত সময়েই ক্লাশে ঢুকলো সে।শিবুদা সমগ্র ক্লাশের ওপর একটু চোখ বুলিয়ে নিল। “ভালই তো ক্লাশের অধিকাংশ স্টুডেন্ট হল মেয়ে”, শিবুদা মনে মনে বেশ খুশি হল।
শিবুদা সবাইকে নিজের পরিচয় দিল।ক্লাশের শুরুতেই ওনি বায়োলজির ওপর একটা গুরুগম্ভীর বক্তৃতা দিয়ে দিল।ওনার এহেন দুর্বোধ্য বায়োলজিক্যাল বক্তব্যে স্টুডেন্টরা অজানা শঙকায় শঙকিত হল।
শিবুদা ঘোষণা করে দিল,”আজ তোমাদের প্রশ্নোত্তর দিবস। তোমরা বায়োলজি নিয়ে প্রশ্ন করবা আর আমি উত্তর দিব।”
ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আগ্রহ দেখা দিল।
মাঝখানের বেঞ্চ থেকে কোন এক সুন্দরী ছাত্রী প্রথম প্রশ্নটা করল, “স্যার fungi কি?”
শিবুদা খুব খুশি হল কাউকে প্রশ্ন করতে দেখে।শিবুদা বলতে লাগল,” আমি ৪৫০ টাকার স্টাম্পে সাইন দিয়ে বলব এই মেয়ে জীবনে কিছু একটা করবে। শোন মেয়ে, fungi হল ছত্রাক।”
“স্যার তাহলে ছত্রাক দেখতে কেমন?”
“বোকা মেয়ে ছত্রাক দেখতে হুবহু fungi এর মত।এবার বুঝেছো? ওকে পরের প্রশ্ন?”, শিবুদা একটু ঝেড়ে কাশল।
প্রথম বেঞ্চ থেকে একজন বলে উঠল,”স্যার জীন কি?”
শিবুদা খুব আফসোস করে বলতে লাগল,” তোমাদের জন্য খুব কষ্ট হয় আমার।তোমরা দুদিন পর পরীক্ষা দিবে।অথচ তোমরা জীন কি জান না।”
” জীন হল এক অপূর্ব সৃষ্টি যারা সাধারণত তাল গাছের মাথায় থাকে।এদেরকে দেখতে হলে দুপুরবেলায় তালগাছের নিচে গিয়ে দাড়িয়ে থাকতে হয়”, শিবুদা যোগ করল।
শিবুদার উত্তর শুনে সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।তারা কখনো বিষয়টা এভাবে ভাবে নি বোধয়।
পরের প্রশ্নটা করলো একজন ছেলে।সে বললো, “স্যার পরিবহন কলা কি?”
শিবুদা ভাবতে লাগল স্টুডেন্টগুলো তো এক্কেবারে গর্দভ। সহজ একটা জিনিস তাও পারে না। শিবুদা এবার উত্তর দিল,” শোন, কলা হল খুলে খাওয়ার জিনিস।জগতে অনেক ধরণের কলা আছে।আনাজী কলা,বাংলা কলা,সাগর কলা,আইট্টা কলার মত পরিবহন কলাও এক ধরণের কলা। যে সকল কলা দূরবর্তী এলাকা থেকে নিকটবর্তী এলাকায় বয়ে নিয়ে আসা হয় তাদেরকেই পরিবহন কলা বলে।”
ক্লাশের সবাই এবার মিটমিটি হাসতে লাগল।
শিবুদা এবার ধমক লাগালো,” বেয়াদব মেয়ে ছেলে। স্যারের সাথে ফাজলামো।মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলব।”
শিবুদার ধমকে সবাই চুপ মেরে গেল।
পরেরজন জিজ্ঞেস করল,” স্যার প্লাস্টিড কি?”
শিবুদা খুব গভীরভাবে উত্তর করল,”প্লাস্টিড হল একটি দাহ্য বস্তু,যাকে পোড়ালে বিচ্ছিরি গন্ধের সাথে ধোঁয়া বের হয়।”
ছাত্রটি পাল্টা প্রশ্ন করল,”স্যার আমি জানতে চেয়েছি প্লাস্টিড কি? প্লাস্টিকের সংজ্ঞাতো আমার নখদর্পণে।”
“চুপ থাকো বেয়াদব।ফাজিল কোথাকার।কি বোঝ তুমি? নাক চাপলে দুধ পড়বে;আর তুমি আমাকে শেখাও? শোন যাহা প্লাস্টিক তাহাই প্লাস্টিড। “
এরপর খুব সুন্দরী এক ছাত্রী প্রশ্ন করলো,”স্যার মেন্ডেল কে ছিলেন?”
শিবুদা চিন্তিত ভঙগিতে বায়োলজি বইটা কিছুক্ষণ উল্টালো।তারপর হঠাত করেই চোখ বড় করে বললেন,”মেন্ডেল একজন মালী ছিলেন।তিনি মটরশুঁটি চাষ করতেন।মটরশুঁটি বংশবৃদ্ধির জন্য উপকারী। “
ক্লাশের সবাই আর হাসি চেপে রাখতে পারলো না।তারা হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়লো।
শিবুদা খুব বিব্রতবোধ করলো।নিজেকে স্বাভাবিক করার জন্য ওনি সবাইকে আবার ধমক লাগালেন।ধমকের চোটে সবাই সাময়িকভাবে হাসি চেপে রাখলো।
শিবুদা বললো, ” ওকে এবার শেষ প্রশ্ন। এই ছেলে তুমি অনেকক্ষণ চুপ করে আছো।দেখে তো মনে হচ্ছে আইনস্টাইন টাইপের ছেলে তুমি।দেখি তুমিই শেষ প্রশ্নটা করো।”
ছেলেটা খুব স্বাভাবিক ভঙগিতেই দাড়িয়ে চশমাটা চোখ থেকে খুলে হাত নিয়ে বললো,” আচ্ছা স্যার জীবন মানে আসলে কি?”
শিবুদা অবাক হয়ে গেল।এই ছেলেমেয়েগুলো সারাজীবন কি করবে এটা ভেবে ওনি অস্থির হয়ে গেল।সে মনে মনে ভাবলো এদের বাসায় কি একটা টেলিভিশনও নেই।
শিবুদা খুব দু:খী হয়ে বলতে লাগলো,” তোমাদের দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে।জীবন মানে কি এই সহজ প্রশ্নের উত্তরও তোমরা জান না।শোন আজকে বলছি,সারাজীবন মনে রাখবা ‘ জীবন মানেই জি বাংলা’।”
শিবুদার উত্তর শুনে ক্লাশের সবাই হো হো হা হা করে চিতকার করে হেসে উঠলো।
কথাগুলো মনে পড়ে হঠাত আনমনে হেসে উঠলাম। এদিকে আমাদের সিএনজি এখন সিমেন্ট ক্রসিং ক্রস করছে।শিবুদা তখনো ঘুম। আমি সত্যি শিবুদাকে খুব মিস করব।শিবুদা যেন একটা জ্বলজ্যান্ত এন্টারটেইনমেন্ট এর খনি
শিবুদা সবসময় আমার কাছে রহস্যময় একজন মানুষ।ওনার সান্নিধ্যে আসা মানেই হল রহস্যের সাগরে ডুব দেওয়া। কিছুদিন আগের ঘটনা মনে পড়ে গেল হঠাত করে।
দুয়েকদিন আগেরকার ঘটনা।
বিকেলের অলস সময় কাটাচ্ছি বাসায়। হঠাত দেখি মোবাইলে শিবুদার কল। তো কল রিসিভ করলাম। কল ধরামাত্রই শিবুদা বলল, “শোন, তুই তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বের হ।একটু ভালমত ড্রেস ট্রেস পড়ে বের হোস।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ” শিবুদা তোমার না এক্সাম চলছে?”
“আরে দুর।কিসের এক্সাম? পরের এক্সামটা কেনসেল করা হয়েছে। তাই তোকে নিয়ে আজ ঘুরব। রথও দেখব,কলাও বেচব”, শিবুদা বলল।
যাই হোক আমি নির্ধারিত স্থানে গেলাম।গিয়ে দেখলাম শিবুদা একটা কার্টুনের মত প্যাকেট হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। আমি কিছু বললাম না।ভাবলাম কৌতুহলটা থাকুক।
বাসে উঠে বসলাম।তখন সন্ধ্যা।শিবুদা বসল জানালার পাশে। দেখলাম ওনি জানালার কাচ লাগিয়ে দিল। তারপরও ওনার উতকণ্ঠা দেখে জানতে চাইলাম কি হয়েছে?
“আরেহ বুঝলি, চারিদিকে যেভাবে পেট্রোলবোমা মারছে তাই খুব ভয়ে থাকি।এই দেখ, হাতে প্যাকেটভর্তি বালু নিয়ে ঘুরছি।যদি কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে তাহলে এই বালুই ভরসা।জানিস তো পেট্রোল পানি দিয়ে নেভানো যায় না,” শিবুদা এক নি:শ্বাসে বলল।
“মানে তুমি আগুন নিভানোর জন্য বালু নিয়ে ঘুরছো?”,আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“আচ্ছা তা না হয় বুঝলাম।কিন্তু তুমি আমাকে ভালমত সেজেগুজে আসতে বলেছো কেন?” আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।
“আরেহ ওটা একটু পরে বুঝবি।”
আমি আর শিবুদা প্রায় রাত নটা পর্যন্ত ঘুরলাম।অনেক আড্ডা দিলাম।মজা করলাম।এদিকে মজার চোটে আমার পেটে ক্ষুধা লেগে গেছে। আমি আবার ক্ষুধা সহ্য করতে পারি না।
“শিবুদা কিছু খাওয়াও।চল আজ বিরিয়ানি খাই প্লিজ।”
“কাচ্ছি খাবি নাকি শাহী? “
শিবুদার মুখে একথা শুনে আমি অবাক। এদিকে কথা বলতে বলতে আমরা একটি অভিজাত কমিউনিটি সেন্টারের সামনে চলে এসেছি। এতক্ষণে আমি ড্রেস-আপের রহস্য বুঝলাম।
দেখলাম শিবুদা পকেট থেকে একটা পুরোনো রেপিং পেপার বের করে খুব দক্ষতার সাথে বালুভর্তি প্যাকেটটা রেপিং করে ফেলল। এবার প্যাকেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল “শোন পটলা, তুই এটা ধরে দাড়িয়ে থাক।আমি প্রথমে ভিতরে ঢুকে যাব। আমাকে গেইটের দিকে আসতে দেখলেই তুই এগিয়ে আসবি।”
আমি দাড়িয়ে রইলাম। আর শিবুদা খুব স্বাভাবিক ভঙগিতেই ভিতরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর দেখলাম শিবুদা ভিতর থেকে গেইটের দিকে এগিয়ে আসছে। আমি শিবুদার কথামত গেইটের দিকে এগিয়ে গেলাম।
“আরে পটলা, যাক এলি তাহলে।আমিতো ভেবেছিলাম তুই বোধয় আর আসবিই না। আয় ভিতরে আয়”, শিবুদা আন্তরিকভাবে আমায় রিসিভ করে ভিতরে নিয়ে গেল।
আমি অবাক হয়ে দুরুদুরু বুকে ভিতরে গেলাম।আর বালুর গিফট নিয়ে গিফট জমা দেওয়ার জায়গায় গেলাম। শিবুদা বলল,” ভাই লিখেন কনেপক্ষ।”
গিফটটা কি এই প্রশ্নের জবাবে শিবুদা বলল, ” ভাই লিখেন সিলিকা সলিউশন সেট।”
আমি আর শিবুদা পেটপুরে খেলাম। বরপক্ষ আর কনেপক্ষ উভয়ের অনেকের সম্পর্কে শিবুদা অদ্ভুত অদ্ভুত গিট্টু লাগিয়ে দিল।
“শোন পটলা, বিয়ে শাদি হলো নতুন নতুন সম্পর্কের আতুরঘর।কত সহস্র প্রেমিক প্রেমিকার জন্ম হয়েছে এইসকল অনুষ্ঠান থেকে তার কোন ইয়ত্তা নেই। আরেহ আমিও তো দশ বারো জনের লাইন ফিটিংস করে দিলাম”, শিবুদা খুব গর্ব করে বলল।
আমি খুব আগ্রহ নিয়ে বললাম,”শিবুদা প্লীজ আমার লাইনটাও একটু মেরামত করে দাও না।”
শিবুদা বলল, “কুচ পরোয়া নেহি।আমি থাকতে তোর সম্পর্কে ফাটল ধরতে পারবে না।আমি সব নাট বল্টু টাইট করে দিব।”
আবশেষে আমরা দুইজন হাসিমুখে কমিউনিটি সেন্টার থেকে বের হলাম।
শিবুদা জিজ্ঞেস করলো, “কিরে পটলা কেমন খেলি?”
আমি বললাম, “শিবুদা জিও।তুমি চিরজীবী হও।”
তখন শিবুদা বলল, “একেই বলে রথ দেখতে দেখতে কলা বেচা।”
শিবুদার কথা শুনে দুজনেই হা হা হা করে হাসতে লাগলাম।আর বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলাম।
কথাগুলো মনে হতেই আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। আমার হাসির শব্দে শিবুদা ঘুম থেকে উঠে গেল।
“কিরে পটলা, তুই হাসছিস কেন?” শিবুদা আমার কাছে জানতে চাইল।
“তুমি তো ব্রিটিশদের নাচায় আসবে।ওটা চিন্তা করেই হাসি পাচ্ছে আমার”, আমি বললাম।
” আগে তো ইউকে পৌঁছাই তারপর না হয় ওদের নাচানো যাবে,” শিবুদা মুচকি হেসে বললো।
আমাদের সিএনজি অবশেষে এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছুল।আমার বুকটা হঠাত করে কেমন যেন মোচর দিয়ে উঠল
শিবুদা আমায় ভুলে যাবে না কিন্তু”, আমি আবেগাপ্লুত হয়ে বললাম।
“তোকে ভুলে কিভাবে যাব। তুই হলি আমার এলাকার সবচেয়ে আদরের ছোট ভাই। তোকে ভুলবো না রে,” শিবুদার চোখের কোণাটা একটু ভিজে এল মনে হল।
সত্যি কিছু মানুষের জন্ম হয়েছে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য। ওরা কখনোই নিজের এতটুকুন কষ্টও কারো সাথে শেয়ার করে না।হয়ত এতেই তাদের আত্মার সন্তুষ্টি।
আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না।শিবুদাকে জড়িয়ে ধরলাম।কতক্ষণ জড়িয়ে ছিলাম তা নিজেও জানি না।
শিবুদা ইমিগ্রেশনের ওখানে ঢুকে গেল। আমি আর কি মনে করে ভিতরে ঢুকলাম না।
কিছুক্ষণ পর একটা বিমান রানওয়ে ধরে আস্তে আস্তে চলতে শুরু করল।আস্তে আস্তে বিমানটি আকাশের দিকে উড়া শুরু করলো।
আমি উড়ন্ত বিমানটির দিকে অপলক চেয়ে রইলাম।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.