সন্ধ্যার মেঘমালা

অরণ্য রাত্রি

সকাল থেকেই আকাশটা ঘন কালো হয়ে আছে। মনটাও গুমোট । ভাল লাগছে না। অক্টোবরের প্রায় শেষ। অথচ বৃষ্টি থামছে না। যা ভাবছিলাম তাই হল। ঝুম বৃষ্টি নামলো। বারান্দায় দোলনায় দোল খাচ্ছিলাম। হাতে গল্পের বই। হুমায়ুন আহমেদের শ্রাবণ মেঘের দিন। বৃষ্টির পানি ছিটকে এসে গায়ে লাগছে। ঘরে এসে বসলাম। আজকে কোথাও যাওয়া হবে না।বাসায় মা নেই। একা আমি। ভাবলাম কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকি। শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ বন্ধ হয়ে গেলো। ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। এদিকে সহজেই কারেন্ট চলে যায়। আর বৃষ্টি পরলে তো কথাই নাই। মোম জ্বালালাম। মোমের আলোয় ঘরটা কেমন যেন এক মায়াময় পরিবেশ তৈরি হল। আয়ানার সামনে এসে দাঁড়ালাম । আবছা আলোয় আমার একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। আজকাল এত লম্বা হচ্ছি। ক্লাসের লম্বা ছেলেদের মাঝে আমি দ্বিতীয়। ওহ আমার পরিচয় তো দেয়া হয় নাই। আমার নাম রনক। ক্লাস এইটে পড়ি।আপাতত এটুকই। আস্তে আস্তে সব জানা যাবে।
ঠিক করলাম বই পড়বো মোমের আলোয়। চোখ খারাপ হলে হোক। সেলফে বই ঘাঁটছি।অন্ধকারে বই খুঁজে পাচ্ছি না। হটাত হাতে এসে পড়লো একটা ডায়রি।আহারে ডায়রি টা কত দিন পর হাতে নিলাম। ডাইরিটা খুব সুন্দর।পৃষ্ঠা গুলো হাতে বানানো কাগজের।সেই ছোট বেলায় ডায়রি লিখতাম। কত ছোট ছিলাম তখন। ক্লাস ফোরে পড়তাম। বাবা বলতো প্রতিদিন তোর যত মনের কথা লিখবি। তখন কি আর অত বুঝতাম। তাও লিখতাম। কিন্তু প্রতিদিন নয়। ক্লাস ফাইভে উঠা পর্যন্ত লিখেছি। লিখে কি হবে? কেন জানি আজকে ডায়রিটা পড়তে ইচ্ছা করছে। কেমন যেন নস্টালজিক লাগছে। হয়তো বা পরিবেশের কারণেই । বাইরে বৃষ্টি। মোমের আলোয় নির্জন একটা বাসায় আমার পুরানো ডাইরি পড়ছি…।ক্লাস থ্রিতে ডায়রি ভর্তি শুধু ছবি। নানা জিনিসের ছবি এঁকে রেখেছি। ছবি আঁকার পিছনে খুব ঝোঁক ছিল। একটা পেইজের ছবি দেখে তো হাসতে হাসতে মরি। আমার প্রিয় মানুষ দের ছবি এঁকেছি। কি বিকটও ছিল ছবি গুলো। শুধু মামাতো ভাই পলাশের চেহারার সাথে মিল আছে। ডাইরির ফাঁকে ফাঁকে সুকুমার রায়ের ছড়া। ছোট বেলায় সুকুমার রায়ের কবিতা মুখস্থ ছিল।এখনো তো কিছু কিছু মুখস্থ আছে…।
“শুনতে পেলাম পোস্তা গিয়ে তোমার নাকি মেয়ের বিয়ে?
গঙ্গারাম কে পাত্র পেলে জানতে চাও সে কেমন ছেলে?”

ডায়রির এক পাতায় লেখা
২৯/৬/১৯৯৫
আজকে আমার মাথা ন্যাড়া করতে বাধ্য হয়েছি। প্রচুর কান্নাকাটি বিদ্রোহ করেছি। কিন্তু কোন লাভ হয় নাই। শেষ পর্যন্ত চুক্তি হল বাবার সাথে, বাবাই প্রস্তাব দিলো। ন্যাড়া করলে বাবা আমাকে চিল্ডেন ফেয়ারি টেলস বই কিনে দিবে। এই বইটা অনেক মোটা। নানা দেশের রূপকথার গল্প রয়েছে।আমার অনেক দিনের ইচ্ছা বইটা পড়বো
*************************
তারপর আর কিছু লেখা নেই এই প্রসঙ্গে। কিন্তু বই টা সত্যি বাবা কিনে দিয়েছিল। এখনো আছে আমার কাছে। বইটার সবচেয়ে ভাল লাগতো গ্রিক দেশের রূপকথা গুলো।জিউস, কিউপিড, ভেনাস দের গল্প।
পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাচ্ছি। একটা পৃষ্ঠায় বেশ কিছু ছবি পেস্ট করা। ক্লাস থ্রি এর জন্মদিনের ছবি। সবাই কত কত ছোট ছোট।ক্লাস থ্রি এর জন্মদিন নিয়ে আমার একটা কষ্টের স্মৃতি আছে, জন্মদিন উপলক্ষে মা নতুন জামা কিনে এনেছেন। জামাটা একটুও পছন্দ হয় নাই আমার। আমি ঘ্যান ঘ্যান করছিলাম এই জামা পরবো না। মা কেন আমার জন্মদিনে এমন একটা জামা আনলও। খুব অভিমান হচ্ছিলো। আসলে ছোট ছিলাম তো। মায়ের আর্থিক অবস্থা বুঝতে চাইতাম না।বাবা, মার হাতে টাকা দিতে চাইতো না।আর জন্মদিন বাবার কাছে শুধু শধু টাকা খরচ।তাই ইচ্ছা করলেই যা খুশি কিনতে পারতো না মা। আমার ঘ্যান ঘ্যান শুনে মায়ের মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। বলছিল
– আজকে এই জামাটা পর। কালই তোমাকে নতুন জামা দিব।
এদিকে আমার বন্ধু রা আসা শুরু করেছে। এই জামা পরেই পালন করলাম জন্মদিন।
এই কথা গুলো বলতে মায়ের নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছিলো।জন্মদিনে ছেলের মুখে হাসি ফুটাতে পারে নাই। কিন্তু আমি তো ছোট ছিলাম মায়ের কষ্ট কিছুই বুঝতে পারি নাই।
পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি আর নস্টালজিক হচ্ছি। বাইরে বৃষ্টি কখন থেমে গিয়েছে। কিন্তু কারেন্ট আসছে না। মা আজকে তার খালার বাসায় মনে হয় থেকেই যাবে।
৪/৭/১৯৯৫
আজকে বাবা আর মায়ের খুব ঝগড়া হয়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই ঝগড়া হয়। আমার ভাল লাগে না। কান্না পায়। আগে কত ভাল ছিলাম। সবাই মিলে একসাথে ঘুরতে যেতাম লঙ ড্রাইভে। আর আজকাল তো বাবা এক টেবিলে বসেও মায়ের সাথে খান না।মা বলেছে কালকে নানুবাড়ি চলে যাবে। এটা একটা ভাল দিক ঝগড়ার। নানু বাড়ি যাওয়া যাবে।
***************
এরপর বেশ কয়েকটা পৃষ্ঠায় তেমন কিছু লিখা নেই।শুধু ছবি।কারেন্ট এসেছে। মোমবাতি নিভালাম। টেলিফোন বাজছে। দৌড়ে যেয়ে ধরলাম । মনেহয় মা ফোন দিয়েছে।
– হ্যালো
– রনক আব্বু?
মা সব সময় এমন আদর করে ডাকে। খুব লজ্জা পাই বন্ধুদের কাছে।
– বল মা? তুমি আজকে আসবা না?
– নারে। ফ্রিজে খাবার আছে গরম করে খেয়ে নিস। আচ্ছা রাখি। খোদা হাফেজ
– খোদা হাফেজ
– সারারাত একা থাকতে হবে, একাকীত্ব আমার পছন্দ নয়। অথচ এই একা থাকা হয় বেশিরভাগ সময়। আবার ডাইরিটা পড়া শুরু করলাম।
১০/৭/৯৫
আজকে খুব ভয় পেয়েছি। আজকের মত এত ভয় কোনদিন পাই নাই। বাবা মা দুইজনেরই আজকে মেজাজ খুব খারাপ ছিল। ২ জন ইংরেজি তে কি কি বলছিল।যাতে আমি কিছু না বুঝি। কথা শুনে মনে হচ্ছিলো বাবা কোন খারাপ কাজ করেছে। আবা্র বাবা তা স্বীকার করছে না। তাতে মা আরও ক্ষেপে যাচ্ছে,। আমার তো ভয় লাগছে এরপর মা জিনিস পত্র ভাংচুর করবে। আমি পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখছি সব কিছু। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যে হল বাবা , মা কে একটা চড় দিল। মা হটাত চুপ হয়ে গেলো।মা যেন পাথর হয়ে গেলো। আর কিছু বলল না।সোজা বিছানায় শুয়ে পড়লো। এদিকে বাবা বার বার সরি বলছে। এরপর সারা রাত পিন পতন নীরবতা ছিল বাসায়। খুব ভোরে মা আমাকে ডেকে তুলল।দেখলাম স্যুটকেস গুছিয়ে রাখা হয়েছে। আর একটা ব্যাগ। ওটাতে মনে হয় আমার জামাকাপড়। পিছনে বাবা অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে,।
*******************
আর কিছু লিখা নাই।অনেক বছর হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার কথা এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে।
বাবা কেমন আকুতির সাথে বলছে
– লীনা প্লিজ যেও না। আর এমন হবে না । কথা দিলাম।
– তুমি আগেও কথা দিয়েছিলে । রাখতে পারো নাই। তোমার কথার মূল্য নেই কোন। তার উপর তুমি আমার গায়ে হাত তুলেছও। তোমার সাথে থাকা অসম্ভব।
– প্লিজ
– না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি,
– আমি গাড়ি করে বাস স্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়ে আসি।
– না
– একটা বেবি ট্যাক্সি ডেকে দেই।
– না তোমার কষ্ট করতে হবে না। আমিই নিতে পারবো। বরং তুমি তোমার বন্ধু কে ডেকে আনো। দুজনে খুব আনন্দের সাথে সংসার করতে পারবা
আমি খুব অবাক হচ্ছি।বাবার কোন বন্ধুর কথা বলছে মা।বাবার তো কোন মেয়ে বন্ধু নেই।সেই বয়সেও আমি বুঝতাম শুধু ছেলে এবং মেয়ের মাঝেই সংসার হতে পারে।তার উপর আমার মা অসম্ভব রূপবতী ।ধব ধবে সাদা গায়ের রঙ। প্রায় কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল।এরপর আর কোন কথা হল না। আমরা বেবিট্যাক্সি করে রেল স্টেশনে গেলাম। সেখান থেকে সোজা নানা বাড়ি ঢাকায়। মা সারা টা ক্ষণ ট্রেনে চোখ মুছতে মুছতে গেল। আমি জিজ্ঞেস করতে খুব ভয় হচ্ছিল। ইচ্ছা করছিল মায়ের চোখ টা মুছে দেই। কিন্তু সাহস হল না। বাবার উপর খুব রাগ হচ্ছে।কেন চড় মারলও বাবা। আগামী মাসে আমাদের কক্সেসবাজার যাওয়ার কথা। তাহলে কি এইবার যাওয়া হবে না? এখন আমার কান্না আসছে। বন্ধু্দের কত বলেছি আগামী মাসে কক্সেসবাজার যাবো। এখন ওদের কি বলবো । মা যতবার রাগ করে ঢাকা গিয়েছে প্রতিবার বাবা , মা কে ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছে। এবারও নিশ্চয় আসবে। তাহলে নিশ্চয় যাওয়া হবে কক্সেসবাজারে।
ঢাকায় পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি তে ভিজতে ভিজতে আমরা একটা সিএঞ্জি নিলাম। নানা বাড়ি ঠিক ই বলি। কিন্তু নানা নানি কেউ বেঁচে নেই। শুধু মামা , মামী আর মামাতো ভাই আছে। ইকবাল রোডে বাসা। জায়গা টা আমার খুব প্রিয়। এত বড় খোলা মাঠ। বড় বড় বিল্ডিং ও হয় নি ।কলিং বেল টিপলাম। মামী দরজা খুলল।মামী ছোট খাটো , মোটা। পান খেয়ে ঠোঁট সব সময় লাল করে রাখেন।বাসায়ও সব সময় শারি পরে থাকেন। আমাদের দেখে যেন জোর করে হাসলো মামি। চিৎকার দিয়ে মামা কে ডাক দিলেন
– দেখে যাও কে এসেছে
মামা এসে দাঁড়ালেন দরজায়।মামা বেশ লম্বা। ৫-১০ হবেন, স্লিম, মার মতি ফর্শা। সাদা গেঞ্জি আর চেক লুঙ্গি পরা। মাথায় সাদা পাকা চুল আর চোখে মোটা ফ্রেমের কালো চশমা।
– লীনা তুই? জামাই কোথায়
– ও চিটাগাং এ । আসে নেই।
– ওহ। কাজ আছে বোধ হয়?
– হম। ভাইয়া আমরা কয়দিন তোমার এখানে থাকবো। তোমার কোন অসুবিধা হবে না তো?
– না না তোর বাড়ি । তুই থাকবি আমি বলার কে?
মা ঘরে ঢুকে পশ্চিমের শোয়ার ঘর টা তে ঢুকলো ।ঢুকেই মা আঁতকে উঠলেন।
– ভাবি , ভাবি
– লীনা কি হয়েছে।
– আমার জিনিস পত্র কই। এটা তো সম্পূর্ণ নতুন ঘর।
– আরে তোমারা থাকো না তো তাই বললাম ঘরটা আমার মত করে সাজিয়ে গেস্ট রুম বানালাম আর কি।
মামী কেমন জানি তোতলাচ্ছে।আসলে নানা ভাই মারা যাওয়ার আগে সম্পূর্ণ ঘর ভর্তি মায়ের বিয়ের আগের জিনিসপত্র ছিল। নানা ভাই সরাতে দেন নাই। নানা ভাই মারা যাবার পর এই প্রথম আসলাম আমরা। এর মাঝে এই অবস্থা।মা আর কিছু বলল না। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ঘরে ঢুকলও। মামী বললেন
– তোমরা এখন রেস্ট নাও।ডিনারের সময় কথা বলা যাবে।
আম্মু দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে কাপড় না পালটে শুয়ে পড়লো । আমার কিছু ভাল লাগছে না। ঘরের লাগোয়া একটা বারান্দা আছে।বারান্দায় বেতের দোলনা আছে। মার ছিল। এটা সরান নাই মামী। সেখানে যেয়ে বসলাম। বৃষ্টি পড়ছে অঝোর ধারায়। এরই মাঝে বিকট কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আমার মামাতো ভাইয়ের কান্নার আওয়াজ। আমার মামাতো ভাই প্রায় আমার বয়সী। ক্লাস থ্রিতে পড়ে । কিন্তু তাকে কঠিন শাসনের মাঝে রাখা হয়।মামী প্রচণ্ড রাগী। একটু এদিক সেদিক হলেই মারের উপর থাকতে হয়। আজকেও নিশ্চয়ই মারধোর করছেন মামী।
রাত দশটার দিকে মামী নক করলো। ডিনার রেডি। খাবার টেবিলে মামা আর মায়ের আলোচনাটা সুখকর ছিল না। আমার নানা বাড়ি টা আড়াই তলা। নানা মারা যাবার পর সহায় সম্পত্তি ভাগ করা হয় নি। মামা ভেবেছিলেন মা সম্পত্তি চাইবে না। কারণ তখন বাবার হাতে বেশ টাকা পয়সা আসা শুরু হয়েছে। আর মাও ছিল ভাই অন্তপ্রান। কিন্তু বাবার কাছ থেকে চলে আসার পর মা সম্পত্তি দাবী না করে কোন উপায় ছিল না।ডিনারের পর মা আমাকে ঘরে ঘুমাতে বলে মামার সাথে দীর্ঘ আলোচনায় বসলো।আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম। কিন্তু গভীর রাতে ঘুম ভাঙ্গার পর দেখলাম আমি একা বিছানায়। মা এখনো আসে নাই??আমি উঠে দেখলাম মা বারান্দায় বসে আছে একা একা। মা আমাকে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো। সেদিন মা কেন হটাত কেন এমন করেছিল তা আমি বুঝি নাই। কিন্তু আজকে বুঝি মা সেদিন রাতেই বুঝে গিয়েছিল তার জীবনে আমি ছাড়া আর কেউ নাই। পুরো পৃথিবীতে সে একা। এখন থেকে একাই সংগ্রাম করতে হবে।
পরের পাতায় গেলাম। প্রায় এক মাস পর লেখা।

১২/৮/৯৫
মামী আজকে আমার মামাতো ভাই পলাশ কে আমার সাথে খেলতে না করে দিয়েছে। আমি নাকি মফস্বল থেকে আসা খ্যাঁত ভুত। পড়া শোনা করি না। আমি তো পড়তেই চাই। কিন্তু কোন স্কুল তো আমাকে এই সময় ভর্তি নিবে না। মা বলেছে নতুন বছরে আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিবে। আর আমি কি কম বই পড়ি। মা ছোট বেলায় যে গল্পের বই পড়তো সব একটা স্টোর রুমে স্তূপ করে রেখে দেয়া হয়েছিল। আমি তো সব বই প্রায় পড়ে ফেলেছি। মামীর কথায় আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল।
******************
ব্যাস এতটুকুই লেখা।আসলে তখন মামা মামী কেউ আমাদের আর সহ্য করতে পারছিলেন না। ১ মাস হয়ে গিয়েছে যাওয়ার নাম নাই।উল্ট মা সম্পত্তি চাইছে।
পাতা উল্টালাম
২৩/৯/৯৫
আমাদের নতুন বাসা নানাবাড়ির তিনতলা। অথবা আড়াই তলাউ বলা যায়। কারন পুরো ৩ তলা তৈরি হয় নাই। ২ টা বেডরুম, ১টা বাথরুম, একটা ডাইনিংকাম লিভিং রুম আর একটা কিচেন। এই নিয়ে আমাদের বাসা। খুব বেশি আসবাব কিনা হয় নাই। তারপরো আমি খুশি। অন্তত মামীর মুখ দেখতে হবে না প্রতিদিন। কথাও শুনতে হবে না প্রতিদিন।বাবার জন্য মন খুব খারাপ লাগে। কতদিন দেখি না। বাবা নিশ্চয় আমাদের ভুলেই গেছে। একবারও ঢাকা আসলো না আমাদের ফিরিয়ে নিতে। বাবা না আসলে না আসবে ।আমি আর মা এখন ভাল আছি।
***************************
এই পৃষ্ঠার লেখা গুলো পরেই মনে পড়ে গেলো সেই আড়াইতলার কথা। অনেক ঝগড়ার পর মা এটুকু আর কিছু ক্যাশ টাকা আদায় করলো মামার কাছে থেকে। কিন্তু আমাদের সাথে মামাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলো। প্রায় মুখ দেখাদেখির বন্ধের মত অবস্থা। এক বিল্ডিঙে থাকি তারপরও কথা হয় না। শুধু আমার মামাতো ভাই পলাশের কোন বিকার নেই। সে আমার সাথে আঠার মত লেগে থাকতে চায়। যতই মামী না করুক। মামীর শাস্তি গুলো ভয়াবহ ছিল। একদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাসার বাইরে দাড় করিয়ে রাখলও। আমার খুব খারাপ লাগছিল। বেচারা কাঁদছে অথচ মামীর কোন বিকার নেই। এমন কি মাও বলল
– আহারে ছেলেটা কে এভাবে কষ্ট দিচ্ছে। কিন্তু কিছুই বলতে পারবো না। বললেই তো এক গাদা কথা শুনতে হবে।
মামী খুবই রাগী। কাজের মেয়ে টা সামান্য ভুল করলেই চুল ধরে টান মারে। এই জন্য কোন কাজের মেয়েই বেশিদিন টিকে না।
এদিকে বাবার উপর অভিমান ও আমার তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিলো ।

২৬/১০/৯৫
আমি ছোট কিন্তু আমি সব কিছুই বুঝতে পারি। আজকে বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। মানে তালাক। নাটকে দেখেছিলাম তিন বার তালাক বললেই তালাক হয়ে। বাবা , মাউ কি তাই করেছে? মা আমাকে সুন্দরি নানুর (মায়ের খালা)কাছে রেখে গিয়েছিল।আজকের পর থেকে বাবা , মা আর আমি আর কক্ষনো এক সাথে থাকতে পারবো না। বাবা আমাকে আর একবার দেখতেও আসলো না। এটা বাবার দেয়ার ডাইরি এখানে আমি আর কিছু লিখবো না। বাবার দেয়া কিছুই আমি আর ধরবো না।
*******************
এই লেখা গুলো পড়ার পর আমার আবার কষ্ট লাগছে। বাবার জন্য। বাবা কি আমাকে সত্যি কোন দিন ভালবাসে নাই? শুধু দায়িত্ব পালন করে গিয়েছে ।বাবা মা এর অফিশিয়ালি ডিভোর্স হয়ে গেলো। আমি শুধু এসব কথা জানতেই পারলাম। কিন্তু বাবা কে দেখলাম না। মা আমাকে তার খালার বাসায় রেখে ডিভোর্স পেপারে সই করে এসেছিলেন। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। ক্ষোভ হয়েছিল খুব। অভিমান অনেক অনেক। বাবা কি তাহলে আমাকে আসলেই ভালবাসে না? তাহলে ছোট বেলার এত আদর যত্ন , ভালবাসা এগুলো সব মিথ্যা? আমি ছোট মানুষ।ধীরে ধীরে এই জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে গেলাম।মা একটা স্কুলে চাকুরী নিলেন। অভাব আমাদের ছিল না। কিন্তু খুব যে বিলাসী জীবন যাপন করতাম তাও নয়।একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল। বাবা কোথায় থাকে? কেন ডিভোর্স হল কিছুই আমি জানতাম না। এখনো জানি না। মা উত্তর দেয় না।তবে এটুকু জানি বাবার কোন বন্ধু আমার মা- বাবার সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য দায়ী। তাকে পেলে আমি খুন করতাম। আর সেই বিভীষিকাময় দিন গুলোর কথা একদম ভুলে যাই নাই। প্রতিদিন মা বাবার ঝগড়া হত। জিনিসপত্র ভাংচুর এবং শেষ দিন বাবার মায়ের উপর হাত তোলার কথা আমি কোন দিন ভুলতে পারবো না।


ডাইরি তে আর কিছু লিখা নেই। কিন্তু কত কথা মনে পড়ছে। কারেন্ট এখনো আসে নাই।শুয়ে রয়েছি। আর ভাবছি সেই দিন গুলোর কথা। আমার নতুন স্কুলের প্রথম দিনের কথা। আমি খুব ইন্ট্রোভারট । কারো সাথেই মিশতে পারি না। আশ্চর্য ব্যাপার এই যে কেউ আমার সাথে তেমন একটা কথা বলতেও আসলো না। আমি ছাত্র ভাল ছিলাম। প্রতি দিন হোমওয়ার্ক করতাম। তাই শিক্ষক শিক্ষিকা রা আমাকে খুব ভাল চোখে দেখতে লাগলো। কেউ আমাকে খুব ভাল চোখে দেখতে না পারলেও একটা ছেলে প্রতিদিন আমার সাথে কথা বলার জন্য আমার পাশে এসে বসতো । তারও আমার মত আর কোন বন্ধু ছিল না। একটা কথা খুব মনে পড়ে বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি। ও নীল রেইন কোট পরে এসেছে। আর হাতে কয়েকটি কদম ফুল। ছেলেটার নাম ছিল অনিক।ছেলেটার চোখ গুলো ছিল হেজেল।তার এই চোখ ২টা আমার খুব ভাল লাগতো।তার মাথার চুল ছিল কোঁকড়া । অনিক আমার জন্যই ফুল গুলো নিয়ে এসেছিল। আসলে তখন ভালবাসা বুঝার মত বয়স ছিল না। ফুল গুলো আমার কাছে সেই সময় খুব একটা গুরুত্ব পায় নাই। বাসায় যাওয়ার পথেই ফুল গুলো ফেলে দিয়েছিলাম। আমার বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল।

মা খুব ভাল নাচতে পারতো। ছোট বেলায় নাচ শিখেছিল।নতুনকুড়ি চাম্পিয়ন ছিল মা।অল্প বয়সে বিয়ে হল।কিন্তু বাবা এসব পছন্দ করতো না।তাই নাচ ছেড়ে দিয়েছিল মা। মাঝেই মাঝেই মা ঘুঙুর গুলো বের করে স্পর্শ করতো। হয়তো হারিয়ে যেত তার কিশোরী বেলায়। যখন নাচতো মা। মায়ের খুব শখ ছিল মেয়ে হলে নাচ শেখাবেন। পরবর্তী তে কে যেন মায়ের মাথায় ভুত ঢুকালো যে ছেলেদেরও নাচ শেখানো যায়। আমাকে মা নাচের স্কুলে ভর্তি করে দিল। আমার নাচ শিখতে তেমন আপত্তি ছিল না। যে নাচ শিখাতেন তার নাম ছিল আমজাদ। আমরা ডাকতাম আমজাদ স্যার।রাজাবাজারের এক গলির ভিতরে নাচের স্কুল ছিল।গলি টা খুব অন্ধকার আর নোংরা ছিল। কোন রকমে নাক চেপে স্কুলে ঢুকতাম।স্কুলের ভিতর টাও কেমন অন্ধকার আর স্যাঁতস্যাঁতে।আমজাদ স্যার ছোট খাটো শুকনো আর শ্যামলা ছিলেন ।আমজাদ স্যার কে কেমন জানি অদ্ভুত লাগতো আমার। তিনি মেয়েদের মত ওড়না পরতেন। আমার নাচ শেখা শুরু হল।
তিনি ওড়না উড়িয়ে উড়িয়ে নাচ দেখাতেন
“এলো মেলো বাতাসে উড়িয়েছি শাড়ির আচল”
আমাদের সাথে আরও তিনটি ছেলে শিখতো। তার মধ্যে আমার বয়সী একজন । আর বাকি দুজন কিশোর। একজন ছিল প্রচণ্ড রূপবান।দুধে আলতা গায়ের রঙ, ঠোঁট গোলাপি, মাথা ভর্তি পিঙ্গল কেশ। বড় হলে সিনেমায় চান্স সহজে পাবে এমন সুন্দর। স্যার বেশি ভাগ সময় এই ছেলেটাকেই সময় দিতো। ছেলেটার নাম ছিল সৌম্য। আমার বয়সী যে ছেলেটা ছিল তার নাম ছিল রুমন। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি বাইরে। আমি আর রুমন ক্লাস শেষেও নাচের স্কুলে বসে আছি।বাইরে বের হতে পারছি না। রুমন ছিল ইঁচড়ে পাকা টাইপের।আর আমি ছিলাম একদমই বোকা। কিছুই বুঝতাম না।সে আমাকে নানা কথা বলতো। বেশিরভাগ কথাই আমি বুঝতে পারতাম না। সেই দিন আমজাদ স্যার, সৌম্য কে নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। বললেন সৌম্য কে আলাদা করে কিছু শিখাবেন। আমরা যেন বিরক্ত না করি। সৌম্য কোন আপত্তি জানালো না। রুমন আমাকে বলল
– নাচ শেখাতে যায় নাই। তারা গোপনে অনেক কিছু করে
– মানে?
– তুমি বুঝবা না ।আচ্ছা তোমাকে দেখাচ্ছি।
দরজায় ছোট একটা ফুটো ছিল। সেই ফুটো দিয়ে পুরো ঘরের ভিতরটাই দেখা যেত। রুমন কিভাবে এই ফুটোর সন্ধান পেলো সেও এক আশ্চর্যের ব্যাপার। প্রথমে রুমন ফুটো দিয়ে দেখলো আর বলল
– যা ভেবেছিলেম তাই
– কি ভেবেছিলে?
– তুমি দেখো। কিন্তু সাবধান কোন শব্দ যেন না হয়। তাহলে কিন্তু মেরেই ফেলবে।
আমি দেখলাম। আমার কাছে মনে হল এর থেকে অদ্ভুত ঘটনা আর কিছু হতেই পারে না। দুজন সম্পূর্ণ নগ্ন মানুষ । একজন আরেকজন কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। আমার কেমন বমি বমি লাগছিল। আমার দেখা শেষ হতেই রুমন বলল
– বুঝলা কিছু?
– না।
– শুনো আরেকটু বড় হলে তোমার আর আমাকেও স্যারের সাথে এমন করতে হবে।
– আমি মোটেও করবো না।আমার দেখেই বমি এসে গিয়েছে।
রুমন হাসতে লাগলো। আমি বৃষ্টির মাঝেই বের হয়ে গেলাম। আমি ঠিক করে ফেলেছি। এখানে আমি আর আসবো না। নাচ শেখা চুলায় যাক।মা কে সব খুলে বলতে হবে। আমার জীবনের কোন কিছুই আমি মায়ের কাছ থেকে গোপন করি না। আমি বাড়ি গিয়ে কাপড় না পালটিয়েই এক নিঃশ্বাসে খুলে বললাম মা কে। সব কথা শুনে মায়ের মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো।পরের দিন আমার আর নাচ শিখতে যেতে হল না। আমার নাচ শিখার সমাপ্তি এখানেই।

ক্লাস ফোর প্রায় শেষের পথে। এখন অনিকের সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে। আমরা এখন চিরদিনের বন্ধু। অনিকের সাথে আমার অনেক মিল।ও গল্পের বই পড়তে ভালবাসে। আমিও। আমরা একজন আরেকজনের সাথে বই বিনিময় করি। আমার বাবা থেকেও নেই আর অনিকের মা নেই। অনিক একদিন খুব উত্তেজিত।সে এসেই বলল
– আজ বাবা তোমার সাথে দেখা করবে। আমার আজকে জন্মদিন তো তাই। আমার সব বন্ধু কে নিমন্ত্রণ করেছে আব্বু। কিন্তু আমার তো বন্ধু এক জনই। আর সেটা হল তুমি।
আমার খুব লজ্জা আর ভয় হচ্ছিলো। অনিকের বাবা আমাকে দেখে কি ভাববে?তার উপর আমি নতুন মানুষের সামনে তেমন কথা বলতে পারি না।ছুটির পর খুব সংকোচ নিয়ে দেখা করতে গেলাম অনিকের বাবা জামান সাহেবের সাথে। যেতাম না কিন্তু আজ অনিকের জন্মদিন না করি কিভাবে। কারো জন্মদিনে তাকে দুঃখ দেয়া উচিৎ না।
জামান সাহেব খুব হ্যান্ডসাম। পেটানো শরীর। জিম করে মনে হয়। দেখে মনে হয় অনিকের বড় ভাই। জামান সাহেব আমাকে দেখে কি জানি ভাবার চেষ্টা করলেন। বললেন
– তোমাকে কই দেখেছি বল তো। কাউকে একবার দেখলে আমি তার চেহারা ভুলে যাই না। বিশেষ করে তোমার ঠোঁটের নিচের তিল টা আমি দেখেছি।
আরও কিছুক্ষণ ভুরু কুচকিয়ে ভাবার চেষ্টা করলেন তিনি। এক পর্যায় হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন
– চল অনিকের বারথ ডে সেলিব্রেট করি
মা কে না বলে যাবো ? কিন্তু জানাবো কিভাবে।আমাদের টেলিফোন নাই। কিন্তু আবার যেতেও ইচ্ছে করছে। ভাবলাম বাসায় যেয়ে মা কে বলবো আজকে এক্সট্রা একটা ক্লাস হয়েছে। সেই প্রথম মিথ্যা কথা বলা শুরু । এরপর থেকে যে কত মিথ্যা বলেছি!
অনিক দের গাড়ি টা বাবার গাড়ির থেকেও সুন্দর। বুঝলাম অনিক রা বেশ টাকা পয়সা ওয়ালা। খুব দামি একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করলাম।কেক কাটা হুল। এরপর অনিকের বাবা যে উপহার দিলেন অনিক কে তা অকল্পনীয়। অনিক কে তার বাবা থাইল্যান্ড নিয়ে যাবেন। তার সাথে তার সেরা বন্ধু কে নিয়ে যেতে পারবে। কক্সেসবাজার নয় সিলেট নয়! একেবারে পাতায়া, ব্যংকক। কিন্তু আমি জানি মা কক্ষনোই আমাকে অনিকের সাথে যেতে দিতে রাজি হবে না। ……………

কারেন্ট এসেছে। কিন্তু রাত বাজে ২ টা। আমি এখনো ঘুমাই নাই। কালকে স্কুল নাই। শুক্রবার। তাই ঘুমানোর অত তাড়া নেই। ওয়াকম্যানে সিডি ভরে গান শুনছি। আমার প্রিয় শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার রবীন্দ্র সঙ্গীত। আর স্মৃতি রোমন্থন করছি। অনিকের কথা ভাবছি। এখন কোথায় আছে? কেমন আছে ? কিছুই জানি না। মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছে করে। সেদিন অনিকের বাবার সাথে দেখা করে মায়ের সাথে প্রথম মিথ্যা বলেছিলাম। মন খারাপ করে শুয়েছিলাম। এমন কি আমার প্রিয় ক্যাপ্টেন প্লেনেট দেখলাম না।মা বাজারে গিয়েছিল।আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম। মা বাজার থেকে এসে আমার হাতে ২ টা ডেইরি মিল্ক চকলেট ধরিয়ে দিল। আমার মা আমাকে এত ভালবাসে আর আমি মিথ্যা বললাম?আর সেদিন রাতেই আসলো উথাল পাথাল জ্বর। মাথায় পানি ঢালা হল। প্যারাসিটাসল খাওয়ার পর জ্বর একটু কমলো।মা কে মিথ্যা কথা বলার জন্যই হয়তো সৃষ্টিকর্তা আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন । গভীর রাতে ঘুম ভাঙলো। দেখলাম পাশে শুয়ে আছেন মা। আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে। জ্বর নেমেছে। মার ও ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে।
– আব্বু কিছু হয়েছে?
– না মা জ্বর মনে হয় চলে গিয়েছে,
জ্বরের জন্য মার সাথে ঘুমিয়ে ছিলাম। নিজের ঘরে যেয়ে শুইলাম। সকাল হতেই কেমন ঠাণ্ডা লাগছে। কম্বল গায়ে রাখলাম। মা কে ডাকলাম। মা কপালে হাত দিয়ে বলল আবার জ্বর এসেছে। ৫ দিন না গেলে টেস্ট করে লাভ নেই। ৫ দিনের পরও জ্বর কমলো না। অনেক পরীক্ষার পর ধরা পড়লো টাইফয়েড। সবার টাইফয়েড ২ সপ্তাহে ভাল হয়ে যায়। কিন্তু আমার হল না। আমি ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারলাম না। আম্মু অনেক দৌড়াদৌড়ি করলো স্কুলে। মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দেখালও। বিশেষ বিবেচনায় আমাকে ক্লাস ফাইভে উঠানো হল।১ মাসের কিছু দিন পর জ্বর নামলো , ততদিনে আমি শুকিয়ে কাঠ। চোখ গুলো গর্তে ঢুকে গিয়েছে। প্রথম দিন ক্লাসে যাবার পর সবাই সমবেদনা জানালো । কিন্তু যাকে খুঁজছি সেই নাই। অনিক। অনিক নাকি এই স্কুল ছেড়ে চলে গিয়েছে।কোথায় গিয়েছে কেউ জানে না। আর জানবেই বা কিভাবে ওর একমাত্র বন্ধু ছিল আমি। আর তখন মোবাইল ছিল না। কেউ কারো বাসার ঠিকানা জানতাম না। আর আমাদের বাসায় টেলিফোন নেই।অনিক পুরোপুরি হারিয়ে গেলো আমার জীবন থেকে।

ফজরের আযান দিচ্ছে । ছোটবেলার কথা ভাবতে ভাবতে কখন সকাল হয়ে গেলো। এখন ঘুম পাচ্ছে। ওয়াকম্যান এ গান ছেড়েছিলাম। বন্ধ করে শুইলাম। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। ঘুমিয়ে পরলাম।শেষ হল আমার শৈশব স্মৃতি রোমন্থন করা।

পাঁচ মাস পর
ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে দিয়েছি। শীতকালিন ছুটি চলছে। তাই আজকাল ঘুম ভাঙ্গে ১০ টায়। মা স্কুলের চাকুরী ছেড়ে দিয়েছে। তার প্যাশন নাচ। সে একটা নাচের স্কুলে চাকুরী নিয়েছে। সেখানে ক্লাস শুরু হয় তিনটা সময়। সকালে বাসায় থাকে। তাই মায়ের চিল্লাচিল্লি তে বাধ্য হয়ে ১০ টায় ঘুম থেকে উঠতে হয়।নাহলে হয়তো ১২ টা পর্যন্ত ঘুমাতাম।
আজকাল মা কে খুব খুশি দেখায়। সেই যে ডিভোর্সের ঝামেলা শুরু হওয়ার আগে থেকে যেমন লাগতো ঠিক সেরকম। অনেক সাজগোজ ও করে এখন। আমার ভাল লাগে মা কপালের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট টিপ দেয় সেটা।

ক্লাসে আমার এখন বন্ধু আছে কিন্তু তারা না আমাকে জ্বালিয়ে অনেক মজা পায়। আমি নাকি মেয়েলি , হাফ লেডিস। যাই হোক এসব শুনতে শুনতে আর গায়ে মাখি না । বলুক না যা খুশি। আমার মাথায় কি কম চিন্তা? এসব নিয়ে চিন্তা করলে তো জীবন আর জীবন থাকবে না।
আমি ক্লাস নাইনে উঠবো এইবার। কিন্তু সবাই বলে আমার নাকি বয়সের তুলনায় ইম্যাচিউরড। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড অয়ন তো আমাকে কিউটি বেবি ডাকে। মাঝে মাঝে গাল টিপে দেয়। আমার কিন্তু রাগ উঠে না। বরং ভালই লাগে।
এখন আসি সমস্যার কথায়। আমার জীবনে সমস্যার অন্ত নেই। তার ফাঁকে আমি মজার একটা কথা বলে নেই। প্রথম যেদিন আমার স্বপ্নদোষ হল সেই দিন আমি কি লজ্জা পেলাম। আমার মনে হয়েছিল আমি বোধয় বিছানায় পস্রাব করে দিয়েছি। কিন্তু প্রস্রাব তো এমন হয় না। আঠালো। এরপর আমার আবার যখন হল খুব ভয় পেলাম। আমার কি তাহলে কোন অসুখ হল? কাকে বলবো? কে কিভাবে নিবে? মাকেই বা কিভাবে বলি? লজ্জা লাগে। আর একটা ব্যাপার খুব আজব লাগতো। স্বপ্নে সুন্দর কোন সুদর্শন কোন পুরুষ কে দেখলেই এমন হত।
এই যে পুরানা কথা বলা শুরু করেছি। এখন আসল কথায় আসি। আমার জীবনটায় চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছে। ক্লাস সিক্স সেভেনে যখন বন্ধুরা মেয়েদের নগ্ন ছবি নিয়ে আসতো দেখে নানা কথ বলতো , মন্তব্য করতো কার বুবস কত বড় এসব নিয়ে আমার তখন অবাক লাগতো কি কারণে তারা এত উত্তেজিত। আমার তো কিছুই লাগে না। বরং নগ্ন মেয়ের পাশে কোন নগ্ন ছেলে দেখলে আমার চোখ সেদিকে চলে যেত। সবচেয়ে বেশি ভাল লাগতো খেলা দেখতে। কারণ কি সুন্দর বডি খেলোয়াড় দের। তাদের ঘর্মাক্ত শরীর আমাকে উত্তেজিত করতো। আমার যৌনাঙ্গ শক্ত হয়ে যেত। মাঝে মাঝে ফোঁটা ফোঁটা পানির মত বের হত। তখন শরীরের এই পরিবর্তনের কথা কিছুই বুঝি নাই। সকালে ক্লাসে যাই। আমি খুব বোকা না। বুঝতে পারলাম নারী শরীর নিয়ে কথা না বললে ওরা আমাকে অন্য রকম ভাববে। এমনিতেই প্রায় আমার পেনিস ধরে টান দিতে চায়, আমার ওটা আছে কিনা চেক করার জন্য। কি যে অসভ্য ছেলে গুলো। ক্লাসে যেয়ে আমিও বানিয়ে বানিয়ে কত কথা বলি, আস্তে আস্তে জানলাম সেক্স কি? ছেলেরা মেয়েদের সাথে কি করে তাও জানলাম। ব্যাপারটা আমার মোটেও ভাল লাগলো না। কেমন জানি বমি বমি লাগছিল। বাড়ি যেয়ে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলাম। তার মানে বিয়ে করলে আমারও বউ এর সাথে এমন করতে হবে। ছিঃ আমি পারবো না। অথচ আমার বন্ধু গুলো এগুলো কবে করবে সেই আফসোস করে। আমার কেন এমন হয় না? আমার তো একটুও ইচ্ছা করে না। তাহলে কি আমি অন্যরকম! খুব ভয় লাগা শুরু করলো। অনেকের মাঝে ভিন্ন হওয়াটা ভয়ের ব্যাপার বটে।
এর মাঝে পুরুষ শরীর দেখলে উত্তেজিত হবার ব্যাপারটা আছেই। তাহলে কি আমি আসলেই হাফলেডিস? আমার তো দেখি সব উলটা। সুন্দর সুন্দর পুরুষ মানুষ দেখলে মন চায় তাকিয়ে থাকি। আমার কি হবে এখন? কেউ যদি জেনে যায় ব্যাপারটা তখন তো মহা মুশকিল হয়ে যাবে। তখন কাকে বলবো ? এই দুনিয়াতে কি আমি একমাত্র এরকম? কেন এমন হল। চোখ ফেটে কান্না আস্তে চায়। কিন্তু কাউকে বলাও যাচ্ছে না। আবার মিথ্যা অভিনয় করতে হচ্ছে। এমন ভাব করতে হচ্ছে দীপিকা আমার জান আর প্রিয়াঙ্কা আমার প্রাণ । কিন্তু আসলে তো বরুণ আমার জান আর সিদ্ধারত আমার প্রাণ।
এখন আজকাল মনে পরে সেই নাচের স্কুলের কথা। সেখানে তো দুই জন পুরুষ মানুষ সেক্স করছিল। তাহলে নিশ্চয় আমার মতই। তখন বুঝি নাই। কিন্তু এখন তো বুঝি।

নাইনে উঠলাম। এখন কিছুটা ম্যাচিউরড। বুঝলাম আমার পরিবর্তন হতে হবে। যেভাবে হোক আমার ভাল লাগাটা মেয়েদের দিকে নিয়ে আসতে হবে।তা না হলে কোন উপায় নেই। কিন্তু আমি কি দুনিয়া তে এক মাত্র এরকম? তাই বা কি করে হয়! আমার মত নিশ্চয় আছে। নাকি নেই?
আমি খুব গল্পের বই পড়ি। এখন কিছু কিছু এডাল্ট বই পড়া শুরু করেছি। একদিন কোন এক বই পড়ে জানতে পারলাম আমেরিকাতে নাকি ২ জন পুরুষ বিয়ে করেছে। কিন্তু সে কি করে হয়! খুব আগ্রহ জাগলো। ভাবলাম অয়ন কে জিজ্ঞেস করবো।ও যদি কিছু জানে? কিন্তু আবার কিছু সন্দেহ করবে না তো। ইতস্তত করতে করতে একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। ও তো হেসেই অস্থির। আমার রাগ উঠলো। আমি বললাম
– হাসা বন্ধ কর।
সে এবার বলল
– ওরা তো গে।
– গে মানে
– হোমোসেক্সুয়াল
আমি কিছুই বুঝতেছি না। বললাম
– আমাকে একটু বুঝিয়ে বল।
তারপর ও যা বলল তার সব আমার সাথে মিলে যাচ্ছে। তাহলে কি আমি গে? না জানতেই হবে। কিন্তু কিভাবে জানবো ?
এর মাঝে আমার প্রথম পর্ণ দেখা হয়ে গেলো অয়নের বাসাতেই অয়নের পিসি তে। আমার সর্বক্ষণ চোখ ছিল নগ্ন পুরুষ এবং তার যৌনাঙ্গের উপর। আর স্বভাবতই অয়ন মেয়ে টা কে দেখে মত্নব্য করছে
– দেখেছিস কি হট ? বুবস গুলো কত বড়। আহা যদি পেতাম। টিপে টিপে লাল করে দিতাম।
আমি তো তার সব কথা তেই মাথা নাড়াচ্ছি। কিন্তু আমার সব চিন্তা ভাবনা ওই ছেলে কে নিয়ে ঘুরছে।
আমি বাসায় এলাম। ৪ বার মাস্টারবেট করলাম ছেলেটাকে ভেবে। এবং মেয়েটার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে। আহ কি সুখ।
রাত্রে পড়তে বসলাম। আর তখুনি নানা ভাবনা আস্তে শুরু করলো। আমি তো হোমসেক্সুয়াল। যদিও জিনিস টা সম্পর্কে এখনো আমি ভাল জানি না। কিন্তু নিজেকে আমার এমনি মনে হয়। আমার খুব খারাপ লাগা শুরু করতে লাগলো। আমি সবার থেকে ভিন্ন। আমার কোন দিন গফ হবে না। বিয়ে করলেও তো সেই সংসার টিকবে না। আমার এত বাচ্চার সখ সেটাও তো কোন দিন পূরণ হবে না। আমার তো একাই থাকতে হবে। আমার মত আরেক জন কে কি বাংলাদেশে কোন দিন পাওয়া যাবে?আমার খুব কান্না আসে। নিজেকে একা মনে হয়। ক্লাসে অভিনয় করতেই আর ভাল্লাগে না। হটাত ঘটলো এক ঘটনা।

১০
ক্লাস টেন এর হারুন ভাইয়া আজকাল খুব আমার সাথে কথা বলে।হারুন ভাইয়া দেখতে ছোট খাটো স্লিম, ফরশা। চোখে বড় বড় গোল চশমা পরে। হারুন ভাইয়া ক্লাসে প্রথম হয়। অঙ্কে তার মত মেধা এই সারা স্কুলে আর কারো নেই। আমাকে নিজে থেকেই বলে
– তুই তো অঙ্কে ফেইল করেছিস। আমার কাছে আসলেই পারিস আমি অঙ্ক বুঝিয়ে দিতাম।
আমার মনে হল আমি হাতে চাঁদ পেয়েছি হারুন ভাইয়া আমাকে অঙ্ক বুঝাতে চায়। যেখানে হারুন ভাইয়া দেমাগে কারো সাথে কথা বলে না সে কিনা নিজে থেকেই আমার সাথে অঙ্ক বুঝাতে চায়। আমি তো ধন্য হয়ে গেলাম। মা কে বলতে মা তো আরও খুশি। এত দিনে ছেলের সৎ সঙ্গ হয়েছে। ঠিক হল আগামী বৃহস্পতিবার আমি হারুন ভাইয়ের বাসায় থাকবো ।
আমি তল্পি তল্পা গুছিয়ে বিকেলে হারুন ভাইয়ার বাসায় আসলাম।হারুন ভাইয়ার ঘর টা খুব বড় নয়। কিন্তু টিপটপ করে সাজানো। একটা বড় বিছানা, একটা পড়ার টেবিল আর আলমারি। সারা বিকেল অঙ্ক করলাম । জ্যামিতির উপপাদ্য , সম্পাদ্য করলাম। বুঝলাম। হারুন ভাইয়া আসলেই অঙ্কে সেরকম। রাত ১০ টা বাজতেই হারুন ভাইয়া বলল
– আর ভাল লাগছে না। আয় একটু সিনেমা দেখি।
আঙ্কেল আন্টি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পরেছে। হারুন ভাইয়ার ঘরে ল্যাপটপ আছে। সিনেমা দেখা কোন ব্যাপার না । আমি ভাবলাম বুঝি কোন হিন্দি সিনেমা ছাড়বে। কিন্তু ছাড়লো কি একটা ইংরেজি ফিল্ম। আমার আবার ইংরেজি ভাল লাগে না। আমি বললাম
– ভাইয়া অন্য ফিল্ম দেন। হিন্দি টিন্দি।
– আরে দেখ না! মজা পাবি।
কিছুক্ষণ পর বুঝলাম ভাইয়া কি মজা পাওয়ার জন্য মুভি ছেড়েছে। কিছুক্ষণ পর পর বেড সিন। অনেকটা থ্রি এক্স এর মত। ২ জন প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে রাতে ঘুমাতে গেলাম। পাশাপাশি শুয়ে আছি। ইচ্ছে করছে হারুন ভাইয়া কে জড়িয়ে ধরি। আর সিনেমা তে মেয়ে টা যা করেছে তার সব করি হারুন ভাইয়ার সাথে।কিন্তু হারুন ভাইয়া যদি জানে এমন। না না কিছু করা যাবে না। কিন্তু ঘটনা ঘটলো উল্টা দিক থেকে। হটাত করে হারুন ভাইয়া আমাকে জাপটে ধরলও জড়িয়ে ধরে মুখ ঘষতে লাগলো আমার পিঠে। আমার খুব ভাল লাগছে। অনেক ভাল লাগছে।আমি বাধা তো দিলাম না বরং আরও বেশি নিজেকে যেন সঁপে দিলাম হারুন ভাইয়ার কাছে।
হারুন ভাইয়া ফিস ফিস করে আমার কানে বলছে
– আমি জানতাম তুই এমন।
– মানে?
– আমার মত। হোমোসেক্সুয়াল।
আমি যেন নিজের কান কে বিশ্বাস করাতে পারছি না। আমার মতন সত্যি এমন একজন আছে বাংলাদেশে। আমি যেন সাগর সেঁচে মুক্তা পেলাম। তারপর চলতে লাগলো অঙ্ক আর সেক্স সমান তালে।
হারুন ভাইয়ার কাছে থেকে অনেক কিছু শিখলাম। সিগারেট খাওয়া। সেক্সের নানা নিয়ম। আর গে পর্ণ দেখা। কিন্তু এ সুখ আর বেশি দিন রইলো না। হারুন ভাইয়া এসএসসি পাশ করে দেশের বাইরে পড়তে চলে গেলো। প্রথম প্রথম মাঝে মাঝে মোবাইলে কথা হত। তারপর তাও এক সময় বন্ধ হয়ে গেলো।ক্লোজ হয়ে গেলো হারুন ভাইয়ার চ্যাপ্টার।
১১
আজকাল মা বাসায় আসতে দেরি করে। অনেক সময় বাইরে ডিনার করে। এখন মায়ের খুব পরিচিতি বেড়েছে।অনেকটা সেলিব্রেটি দের মত। এই জন্য এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে হয়। আমার বিকেল টা কাটে খুব বিষণ্ণ । স্কুল থেকে ফেরার পর আর কিছু ভাল লাগে না। খালি হারুন ভাই এর কথা মনে পড়ে। অনেক সময় চোখে পানি এসে পড়ে । কিন্তু হারুন ভাইয়ার সাথে সেরকম মানসিক বন্ধন তৈরি হয় নাই।কিন্তু দৃঢ় শারীরিক বন্ধন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এটা কে তো আমি ভালবাসা বলতে পারি না। তাহলে এত কষ্ট লাগে কেন! হয়তো তার মত কাউকে আর পাবো না সেজন্য? আমি সেক্স করতে পারবো না তার জন্য কান্না আসে?নিজেকেই নিজের ঘেন্না লাগতে লাগলো। না আর কান্না করা যাবে না।
বিষন্ন বিকেল বারান্দায় বসে আছি।নিচে থেকে হটাত জিনিসপত্র ভাংচুর আর অশ্রাব্য গালিগালাজ শুনতে পাচ্ছি। আমার মামাতো ভাই পলাশ এমন করছে। সে বাইপোলার মুডডিস অর্ডারের রোগী।আমি গেলে ও একটু শান্ত হয়। আগে খুব মায়া লাগতো। মামা মামী যাই করুক আমার সাথে পলাশের তো কোন দোষ নাই। মামী এসেছেন। আমাকে ডাকতে এসেছে্ন পলাশ কে একটু শান্ত করতে। আগে নিজেই দৌড়ে যেতাম। কিন্তু এখন বিরক্ত লাগে। আজকে যেয়ে দেখলাম পলাশ আজকে বেশি বেশি পাগলামি করছে।শরীরের কাপড় খুলে ফেলেছে। আজকে আমার কথাউ শুনছে না। আমি বললাম
– মামী ডাক্তার কে ফোন দেন।আজকে অবস্থা খুব খারাপ
মামা বাসায় নেই। মামী একা। আজকে মহিলার জন্য একটু মায়া হচ্ছে। এই মহিলার ছেলে কে নিয়ে কত গর্ব ছিল । কিন্তু ক্লাস সেভেনে উঠে পলাশের বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার ধরা পড়েছে।তারপর আর পলাশ সেইভাবে পড়াশোনা কন্টিনিউ করতে পারে নাই। কখনো সে এতই ডিপ্রেসড থাকে যে বিছানা থেকে উঠতে পারে না। আর ম্যানিক হলে এই অবস্থা। মামী সব সময় খুব কান্নাকাটি করেন।একদিন মা নিজে গেলো মামী কে সান্ত্বনা দিতে।যে মামী আমাদের দেখতে পারতো না। তিনি মাফ চাইলেন। এখন সম্পর্ক ঠিক আগের মত হয়ে গিয়েছে। আমিও ভুলে যেতে চাই মামীর সেই সকল আচরণ ।কিন্তু কেন জানি মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যায়!
মামী ফোনে কথা শেষ করে এসে বললেন
– ডাক্তার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেছে।
এই বলে মামী কেঁদে দিলেন।
– আমার ছেলেটা পাগল হয়ে গেলো। আমি কিছুই করতে পারলাম না।
– মামী কাঁদবেন না। এটা একটা রোগ। দেখবেন হাসপাতালে ভর্তি হলে পুরো ভাল হয়ে যাবে পলাশ।
এ্যাম্বুলেন্স আসলো। তারাই নানা ভাবে জোর করে পলাশ কে নিয়ে গেলো হাসপাতালে। আমরা পিছন পিছন গাড়ি নিয়ে গেলাম। হাসপাতালে যেয়ে মামী অসুস্থ হয়ে পড়লেন কাঁদতে কাঁদতে। তার ধারণা তিনি পলাশ কে যে শাস্তি দিতেন , প্রেশার দিতেন তাতেই এই অবস্থা তার। পলাশের জীবন নষ্ট করার পিছনে তিনি দায়ী। তার একটাই কথা
– আমি আমার ছেলের জীবন নষ্ট করে দিলাম…।
মামা ইতিমধ্যে চলে এসেছেন। তিনি শান্ত করার চেষ্টা করলেন মামী কে। কিন্তু মামী কোনভাবেই শান্ত হচ্ছেন না। ডাক্তার পরামর্শ দিলো ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখতে।
বাসায় পৌঁছে দেখি মা এখনো বাসায় ফিরে নাই। খুব অভিমান হয় আজকাল মায়ের উপর। আমরা একটা বুয়া রেখেছি। আমি তাকে রুমা খালা বলি। খালা খুব সুন্দর রান্না করেন।খুব ক্ষুধা পেয়েছে। মায়ের জন্য আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। খালা কে বললাম খাবার দিয়ে দিতে। ঠিক সেই সময় গাড়ির হর্নের শব্দ পেলাম। এমই বারান্দায় যেয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম গাড়ি থেকে নামলো। সাথে একজন পুরুষ মানুষও নামলো। তাকে খুব ভাল মত চিনি। তিনি বাংলা সিনেমার বিখ্যাত একজন পরিচালক। মায়ের চেয়ে বয়স কম হবে। কিন্তু মায়ের বয়স বোঝা যায় না। অনেক সময় অনেকেই মা কে আমার বোন মনে করে ।আজকে মায়ের সাথে এই লোক টা কে দেখে কেন জানি ভাল লাগলো না। কিন্তু মিডিয়ায় কাজ করতে গেলে তো কিছু মানুষের সাথে মিশতেই হবে। আমি শুধু উলটা পালটা ভাবছি। মা এখন কত সুখি। মা কে তো আমি এমনি দেখতে চাই।
মা সিঁড়ি দিয়ে উঠলেন আমাদের বাসায়। হাতে এ প্যাকেট মিষ্টি
– মা কিসের মিষ্টি ?
– শোন খুশির খবর আছে। আমি একটা সিনেমায় লিড রোলে চ্যান্স পেয়েছি। তাও যে সে পরিচালক না।বায়েজিদ হোসেনের সিনেমা
ও এই জন্য মা কে বায়েজিদ হোসেনের গাড়ি থেকে নামতে দেখলাম। আমার মাথায় যে কি সব অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা আসে।আমারও খুশি লাগছে। মা সেলিব্রেটি হয়ে যাচ্ছে। আর বায়েজিদ হোসেনের সিনেমা একেকটা মাস্টার পিস। আর্ট ফিল্ম হয়।আবার কমার্শিয়াল ফিল্ম এর মত সিনেমা হল গুলো তেও ভাল চলে।
– কি মিষ্টি এনেছো দেখি?
প্যাকেট খুলে দেখি সাদা চমচম। আমার সবচেয়ে প্রিয়।আমি একটা মুখে নিয়ে বললাম
– মা তুমি এতসব মনে রাখো কিভাবে যে আমার প্রিয় সাদা চমচম।
– আরে বায়েজিদ কিনলো। তারও প্রিয় চমচম।
রাতে ঘুমাতে গিয়ে ভাবছি জীবনের প্রতিটা পরতে পরতে কতই না ভাঁজ। মা তো কবেই নাচ ছেড়ে দিয়েছিল। কখনো সিনেমা করবে তা কি কক্ষনো ভেবেছি? কি বিষণ্ণ ছিলাম আমরা। এখন ঘর ভর্তি সুখ।
১২
আমার এসএসসি পরিক্ষা এসে গেলো। আর তক্ষুনি পড়লো মার শুটিং এর ডেট। শুটিং হবে টাঙ্গাইলে। আমি যেতে পারবো না।আবার মায়ের খারাপ লাগছে আমার পরীক্ষার সময় থাকতে পারবে না। বায়েজিদ আঙ্কেল খুব ভাল। তিনি আমাকে মোবাইল কিনে দিলেন। তাও যে সে মোবাইল না। আই ফোন। আমি যাতে সব সময় মায়ের সাথে কন্টাক্ট করতে পারি। আরও বলেছেন পরীক্ষার পর ল্যাপটপ কিনে দিবেন। পরীক্ষার ২ দিন আগে মা চলে গেল টাঙ্গাইল। বাড়িতে আমি আর রুমা খালা। পরীক্ষার পড়া তে মন বসে না। মা কে ছাড়া তো এইভাবে থাকি নাই। আবার মা সব সময় ফোন ধরতে পারে না। শুটিঙের সময় ফোন অফ রাখে।
এদিকে পলাশ বাড়িতে এসেছে। হাস্পাতাল থেকে ছেড়ে দিয়েছে। এমই প্রায়ই মামার বাসায় যাই। মামা আর মামী খুব খুশি হন। মামী প্রস্তাব দিলেন এসএসসি পরীক্ষার পুরোটা সময় তার ওখানে থাকতে। আমারও একা ভাল লাগছিল না। পলাশ সারাদিন মন মরা হয়ে বসে থাকে। আমি যখুনি সময় পাই ওর সাথে সময় কাটাই। ওর প্রতি অনেক মায়া। নিজের ছোট ভাইয়ের মত লাগে। একদিন রাতে সিনেমা দেখে ওর সাথেই শুয়ে পরলাম। রাতে ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। পলাশ আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমো দিল। আমি কোন রেস্পন্স করলাম না। মরার মত পরে রইলাম। তাহলে কি পলাশের কি আমার প্রতি সেক্সুয়াল আকর্ষণ আছে ? আর কক্ষনো পলাশের সাথে শুই নাই সেদিনের পর। পলাশও কোন যৌন আসক্তি দেখায় নাই সেদিনের পর।
আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে দিলাম।আমি এখন জীবনের অনেক কিছুই বুঝতে পারি। আসলে হারুন ভাইয়ার বিরহ আমাকে অনেক ম্যাচুরড করে তুলেছে। এদিকে মায়ের শুটিং প্রায় শেষ। মা চলে আসবে ভাবতেই আনন্দ লাগছে। মায়ের কাছে শুটিঙের গল্প শুনবো। আর বায়েজিদ আঙ্কল তো ল্যাপটপ দিবেন বলেছেই। সাথে ইন্টারনেট কানেকশন।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মামা মামী কেমন গম্ভীর। ফিসফিস করে কি কি জানি বলছেন। আমাকে দেখে থেমে গেলেন।আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম আমাকে নিয়েই কথা হচ্ছিলো। মামার হাতে পেপার। সেটা আমি চাইলাম। পড়বো।মামা কেমন যেন ইতস্ততও করছে। মামী বলল
– পেপারটা রনক কে দাও। এক সময় না এক সময় সে জানবেই।
আমি খুব অবাক হলাম। কি ব্যাপার মামী ?
– পেপারে তোমার মায়ের সাক্ষাৎকার বের হয়েছে। পড়
– কই দাও দেখি
মামার হাত থেকে পেপার নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। একদম শেষে যেয়ে একটা বিরাট ধাক্কা খেলাম। মা এমন কথা বলবে আমি ভাবতেই পারি নাই। মা বলেছেন , “ হ্যা আমি আর বায়েজিদ একে অপরকে ভালবাসি। কিন্তু আমার একটা ছেলে আছে। সে যদি মত দেয় তাহলেই আমি বায়েজিদ কে বিয়ে করবো, নাহলে নয়”।
মামী বললেন
– এসব ভেবো না । লীনা ফিরুক আমরা ওকে বুঝিয়ে বলবো ।
– আমি কিছু ভাবছি না মামী। মা যা করলে খুশি হবে আমি তাতেই রাজি।
নাস্তা দেয়া হয়েছে। নাস্তা খাচ্ছি। কেউ কোন কথা বলছে না। পিনপতন নীরবতা । আমি কেমন যেন নির্বিকার হয়ে গিয়েছি। প্রথমে খুব বড় ধাক্কা খেয়েছিলাম। কিন্তু এখন কোন বোধ আসছে না। না ভাল না খারাপ। কেন এমন হচ্ছে। আমার এখন রাগ হবার কথা কিন্তু আমি একদম নির্বিকার হয়ে গিয়েছি। কোন মতে নাকে মুখে কিছু গুঁজে নিজের ঘরে গেলাম। এত দিন শুধু আমি আর মা ছিলাম। এখন আমাদের জীবনে আরেকজন আসবে। মামী নক করছে দরজায়। মামী কক্ষনোই আমার ঘরে আসেন না। এখন এসেছেন।
– মামী আপনি?
– হ্যাঁ তোর সাথে একটু কথা বলতে আসলাম।
– বসেন মামী
মামী আমার বিছানায় ঠিক পাশে এসে বসলো
– শোন তুই হয়তো আমাকে পছন্দ করিস না। এক সময় তোকে আর তোর মা কে অনেক কথা শুনিয়েছি আমি । কিন্তু পলাশের অসুখ টা হবার পর আমি পুরো পাল্টে গিয়েছি আমি। তোরা যে সাহায্য করেছিস তা কোন দিন ভুলবো না।
– কি যে বলছেন এসব মামী। এগুলো তো আমাদের দায়িত্ব । তাই না?
– তুই পলাশের জন্য যা যা করছিস তাতে এখন তোকে আমার নিজের ছেলের মতই মনে হয়। আমি বুঝতে পারছি তোর কষ্টটা। কিন্তু লীনার কথা একবার ভাব। সে কত বছর ধরে সে একা! তোর বয়স হচ্ছে। তুই আর কয়েক বছর পর বিয়ে করবি।তখন কিন্তু তোর মা আরও একা হয়ে যাবে। ওর বয়সই বা কত? এখনো ৪০ পার হয় নাই।
– মামী আমার কোন আপত্তি নাই। মা আসলে মা কে বলে দিয়েন। মা খুশি থাকুক সেটাই আমি চাই।
– তুই যদি তাই চাস তাহলে নিজের মুখেই বলতে হবে।
আমি আর পারলাম না। চোখ থেকে পানি পরতে লাগলো । মামী আমার মাথায় হাত রাখলও। আজ এই মহিলার সামনে এত কেন ইমোশনাল হলাম তাও বুঝতে পারছি না।আসলে সব মহিলাদের মাঝে মায়ের স্নেহ থাকে।
১৩
বিয়ে খুব অনাড়ম্বর পরিবেশে হবে বলে ঠিক করা হল। তারপরও যে পরিমান আয়োজন করা হল তাকে আর যাই হোক অনাড়ম্বর বলা যায় না। হলুদ থেকে শুরু করে বিয়ে , বউভাত সব হল, আর আমাকে সব অনুষ্ঠানে সেজে গুজে হাসি মুখে থাকতে হল।যদিও মন অসম্ভব খারাপ। সব টিভি চ্যানেল আমার সাক্ষাতকার নিল। আমি সবাইকে একই কথা বললাম, “মা খুশি থাকলে আমিও খুশি”। তারপর বায়েজিদ ,মা আর আমি (হাসি হাসি মুখে)আছি এমন ছবি পেপারে দেয়া হল।
বায়েজিদ কে আমি বাবা বলি না। বায়েজিদ আঙ্কল বলে ডাকি। আমার ব্যাপারে তিনি খুব কেয়ারিং। ল্যাপটপ কিনে দিয়েছেন। ইন্টারনেট কানেকশনও লাগিয়ে দিবেন। কিন্তু তার এই কেয়ারিং ভাবটাতেই আমার রাগ লাগে। মেকি মনে হয়। মা আর বায়েজিদ হানিমুন এ যাবে। বায়েজিদ নাকি আমাকে ছাড়া যাবেই না। কিন্তু আমার যেতে একদম ইচ্ছা করছে না। মাও চায় আমি যাই সাথে।নেপালে যাওয়ার প্ল্যান। শেষ পর্যন্ত আমি পরীক্ষার দোহাই দিয়ে বাসায় থেকে গেলাম।ওহ বলা হয় নাই এমই এসএসসি পাশ করেছি। গোল্ডেন এ প্লাস। নতুন একটা কলেজে ভর্তি হয়েছি।
১৪
আমি এখন জীবনের অনেক কিছুই বুঝতে পারি। আসলে হারুন ভাইয়ার বিরহ আমাকে অনেক ম্যাচুরড করে তুলল।আমি হারুন ভাইয়ার অভাব ভুলতে পারছি না। মাঝে মাঝেই কষ্ট হয়। বুঝলাম এই জীবনে আরেকজন হারুন ভাইয়া পাওয়া সম্ভব নয়।আমি আমার সমবয়সী অনেক ছেলের থেকে পিছিয়ে আছি। আমার ফেসবুক একাউন্ট নেই।খুলতেও ইচ্ছা করে না কলেজে যাই। বাসায় আসি। কিছু পড়াশোনা করি। এই আমার জীবন। নতুন করে কোন বন্ধুও আমার গড়ে উঠছে না কলেজে। আমি আসলে অনেক অন্তর্মুখী। কারো সাথে নিজে থেকে কথা বলতে দ্বিধা লাগে। জীবন সম্পর্কে ধারণা অনেক নেগেটিভ হয়ে গিয়েছে।সৃষ্টিকর্তা কেন আমাকে এমন ভাবে তৈরি করলো। আসলেই কি তিনি আছেন? কেমন দিন দিন নাস্তিক হয়ে যাচ্ছি। আমাদের কলেজে কো-এড। ছেলে মেয়ে উভয়ে পড়ে। প্রায়ই দেখি সবাই আড্ডা দিচ্ছে। আমি আড্ডায় যাই না। কেউ আমাকে ডাকেও না। আমি সারাদিন আমার জীবন নিয়ে ভাবি। আমার জীবনের আসলে লক্ষ্য কি? আমি তো কোন দিন বিয়ে করতে পারবো না। মা আর বায়েজিদ কে দেখি। তারা এই মধ্যবয়সে একজন আরেকজন কে সাপোর্ট দিচ্ছে। আমাকে কে দিবে এই বয়সে সাপোর্ট।বৃদ্ধ বয়সে আমাকে কে সাপোর্ট দিবে? আমার তো একাই থাকতে হবে। না হবে আমার কোন পরিবার। না হবে আমার কোন সন্তান। আর বন্ধু। এইই হিপক্রেসির বন্ধুত্ব আমি চাই না। আমি তো নিজেকে কারো সামনে মেলেই ধরতে পারবো না।আমার কলেজের ছেলেরা যদি জানতে পারে আমি গে তাহলে তো আমি তাদের হাসির খোরাক হব। না না কোন ভাবেই বলা যাবে না কাউকে। আমার একাকী জীবন চলতে লাগলো
হারুন ভাইয়ার কাছ থেকে প্রেম ভালবাসা ছাড়াও আরেকটা জিনিস পেয়েছিলেম তা হল তার অঙ্কের জ্ঞান । আমি কলেজের অঙ্ক পরীক্ষায় রেকর্ড পরিমাণ নাম্বার পেলাম। এত দিন যারা আমাকে আড্ডায় ডাকতো না তারা এখন আমাকে সমীহ করে। অঙ্ক বুঝতে আসে। আমাকে জোর করে আড্ডায় নিয়ে যায়। মেয়েরাও আজকাল আসে অঙ্ক বুঝতে। এভাবেই পরিচয় হল সঙ্গীতার সাথে। মেয়েটার সাথে আমার গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেলো অল্প কিছুদিনের মধ্যে। আমার সঙ্গীতার সাথে কথা বলতে খুব ভাল লাগে। কিন্তু কোন কাম ইচ্ছা জাগে না। আমার কেন জানি মনে হল সঙ্গীতার সাহায্য পেলে আমি স্ট্রেট হয়ে যেতে পারবো ।
আমি দিন দিন নিজে নিজে চেষ্টা করতে লাগলাম। আমি মেয়েদের নগ্ন শরীর দেখা শুরু করলাম। তাদের কে ভেবে মাস্টারবেট করার চেষ্টা করতাম। কোন সুন্দর পুরুষ মানুষের দিকে তাকাতাম না। জোর করে মাথা থেকে দূর করতাম পুরুষ মানুষের চিন্তা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে দুয়া করতে লাগলাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আবার এদিকে সঙ্গীতা যেন আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমি কি করবো এখন?
এক সময় হাল ছেড়ে দিলাম । আর সম্ভব নয়।

১৪
মা রা নেপাল থেকে চলে এসেছে। এক গাদা উপহার কিনেছে তারা। কিন্তু আমার কেন জানি খুলে দেখতেও ইচ্ছা করছে না। ইচ্ছা করে মায়ের পাশে শুয়ে গল্প করা। কিন্তু মা এখন কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গিয়েছে।এত পার্টি , সাজগোজ আগে ছিল না । মা আজকাল এত ব্যস্ত থাকে বাসায় এসে বায়েজিদ কে সময় দেয়। আমি মাঝে মাঝে বসি তাদের সাথে। কিন্তু আমাকে যে আলাদা করে সময় দেয়া দরকার তা হয় না। বায়েজিদ আমার সাথে কক্ষনোই খারাপ ব্যবহার করে না। বরং বন্ধুর মত আচরণের চেষ্টা করে। বায়েজিদ প্রচুর মুভি দেখে । যখুনি সময় পায় তখুনি মুভি দেখে।অনেক সময় আমাকে নিয়ে দেখে। আমরা মুভি নিয়ে আলোচনা করি। কথা বলি।মতামত দেই।আগের থেকে সম্পর্ক টা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে।
আমরা বাড়ি বদল করছি। বায়েজিদ ধানমণ্ডি তে ফ্ল্যাট কিনেছে। সেখানেই উঠবো। খুব অভিজাত এলাকায় বাসা। বাসার ভিতরের ফিটিংস, ডেকোরেশনও সেইরকম সুন্দর।আমার নিজের বাসাতেই থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু মায়ের আর বায়েজিদের এত আগ্রহ দেখে না করলাম না। নতুন আসবাবপত্র কেনা হচ্ছে। মায়ের খুব উৎসাহ। আমাকে মাঝে মাঝে সাথে করে নিয়ে যায়। কিন্তু আমার একদম সিম্পল জিনিস পছন্দ। মার আবার এত সিম্পল পছন্দ হয় না। যাই হোক আমি আমার ঘরের জন্য একদম সিম্পল ফারনিচার কিনলাম। ঘরের রঙ আকাশি রঙের।
আমাদের বাড়ি বদলে সবচেয়ে কষ্ট পেলেন মামী। আমাকে জড়িয়ে ধরে মামীর কি কান্না। অথচ একসময় এই মহিলা আমাদের ঘর ছাড়া করতে চেয়েছিল। সব কিছুই সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়।আমি কথা দিলাম আমি প্রতি সপ্তাহে আসবো পলাশ কে দেখতে। পলাশ এখন অনেক ভাল আছে। ক্লাস এইটে ভর্তি হয়েছে। মহল্লার একটা সিনিওর ভাইয়ের সাথে বন্ধুত্ব নাকি হয়েছে। একদিন দেখা হয়েছিল ভাইয়াটার সাথে। ভাইয়াটা মেয়েলি।তাহলে পলাশ কি আসলেই আমার মত সমকামী। কি জানি ! মাথায় এত কিছু ঢুকতে চায় না। মামা মামী আর পলাশ কে রেখে আমরা চলে গেলাম আমাদের নতুন বাসা ধানমণ্ডি তে।
প্রতিদিন সকালে আমি মা আর বায়েজিদ লেকের ধারে মর্নিং ওয়াক করি। এখন বায়েজিদ কে আমার নিজের পরিবারের একজন হিসেবেই মেনে নিয়েছি। তার উপর আমার কোন রাগ নেই এখন আর। প্রায়ই একসাথে আমরা লং ড্রাইভে যাই। আমাকে সহজ করার সমস্ত ক্রেডিট বায়েজিদের। সেই আমার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করছে। আমি ভেবেছলাম সে আমার বাবার স্থান দখল করতে চাইবে। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। সে আমার উপর একদম খবরদারী করে না। সে আর আমি বন্ধু। আমরা এখন একসাথে মুভি দেখি, সুইমিঙে যাই, টেবিল টেনিস খেলি, জিম করি। আমিও বায়েজিদ কে বন্ধু হিসেবে পেয়ে খুশি। এমন কি এখন বায়েজিদ কে আমি নাম ধরেই ডাকি। আঙ্কেল ও বলি না।
১৬
জীবন থেমে থাকছে না। চলে যাচ্ছে । বায়েজিদ তার নতুন সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেছে। যদিও এখনো আগেরটা মুক্তি পায় নাই। পাবে ককেকদিনের মাঝেই। মায়ের প্রথম মুভি। এদিকে মা ইউ এস এ তে একটা স্টেজ শো তে পারফর্ম করার অফার পেলো । ১ মাসের জন্য যেতে হবে। মা থাকবে না ভাবতেই খালি খালি লাগছে। বায়েজিদ প্রতিদিন রাত্রে বাসায় থাকে না। সিনেমার কাজ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যায়। অত রাতে বাসায় ফিরে না। ওখানেই রাত কাটায়। মারও খুব আফসোস কারণ তার প্রথম সিনেমা রিলিজ পাওয়ার সময় থাকবে না সে দেশে। কিন্তু ওদের কে আগেই কথা দিয়ে দিয়েছে। যেতেই হবে। আর সম্ভবত এর পর মায়ের বেশ কিছুদিন গ্যাপ দিতে হবে। কারণ মা প্রেগন্যান্ট।
যখন কথাটা শুনি তখন খুব অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিলো। এক সময় আমার খুব কষ্ট ছিল আমার কোন ভাই বোন নাই কেন? কিন্তু এখন যখন শুনলাম আমার একজন ভাই বা বোন হবে আমি কেমন যেন ভয় পেয়ে গেলাম। বায়েজিদ আসার পর মা কেমন যেন একটু দূরে সরে গিয়েছে। নতুন ভাই বা বোন আসলে মা আরও দূরে সরে যাবে না তো ? আর মা কি একরকম থাকবে?
মায়ের ফ্লাইট ২৬ তারিখ আর তার প্রথম মুভি , “ আমি নর্তকী” মুক্তি পাবে ৩০ তারিখ। মা যাওয়ার আগে বেশ কয়েক জায়গায় সিনেমা প্রোমোশনের জন্য গেলেন। বায়েজিদ আমাকেউ সাথে যেতে বলেছে। কিন্তু আমার এসব ব্যাপারে একদম আগ্রহ নেই। তাই জোরাজুরি করে না। ২৬ তারিখ মা কে সি অফ করে আসলাম বিমানবন্দর থেকে। আমাদের ২ জনেরই মন খারাপ। বায়েজিদ আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে কই যেন চলে গেলো। মনে হয় সিনেমা প্রোমোশনে। পুরা বাসায় একা।ভাল লাগছে না। একাকীত্ব আমার পছন্দ নয়। গিটার শিখছি আজকাল। গিটার নিয়ে বসলাম। হটাত কলিংবেলের শব্দ। এত রাতে কে? রাত বাজে ১২ টা। দরজা খুলে দেখলাম বায়েজিদ দাঁড়িয়ে আছে। চোখ গুলো লাল। আর মুখ দিয়ে ভক ভক করে এলকোহলের গন্ধ আসছে। বায়েজিদ ড্রিংক করেছে। হেলে দুলে ঘরে ঢুকলও বায়েজিদ। আমি দরজা বন্ধ করলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম
– বায়েজিদ তুমি ড্রিঙ্ক কর?
– করবো না কেন? আর্ট বুঝো আর্ট? ড্রিঙ্ক না করলে ক্রিয়েটিভিটি আসে না।
– মা জানে?
– সব ওরে বলতে হবে কেন?
– তুমি মা কে গোপন করে ড্রিংক কর এটা খুব খারাপ বায়েজিদ।
– সব বলতে হবে?? তোমাকে যে আমি ভালবাসি তা তো বলি নাই ওরে
– মানে? তোমার মাথা ঠিক নাই বায়েজিদ। ড্রিঙ্ক করে কি যা তা বলছও ?
– সত্যি যেদিন তোমাকে প্রথম দেখি সেদিন ই ক্রাশ খেয়েছি। এত মডেল আমার আশে পাশে । তারা নায়ক হতে চায় তাদের চেয়েও সেক্সি তুমি।
– তুমি মা কে ভালোবাসো না?
– বাসি। তোমাকেও ভালোবাসি।আসো আমার কাছে।
আমার ভয় লাগছে। এসব কি বলছে বায়েজিদ। ইচ্ছে করছে নিজের ঘরে যেয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকি। বায়েজিদ উঠে আমার দিকে আসছে। কি করব!ও টলছে। জোর করে কিছু করতে পারবে না। বরং দেখি কি করতে চায়। আমাকে জড়িয়ে ধরলও বায়েজিদ। তারপর ঠোঁটে , গালে সব জায়গায় চুমো খেতে লাগলো। আমি বায়েজিদ কে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলাম। ও ব্যালেন্স রাখতে না পেরে পরে গেলো।আমি সোজা দরজা খুলে বাসা থেকে বের হলাম। কিন্তু কই যাবো ? মামার বাসায় যাবো। সেটাই সবচেয়ে সেফ প্লেস। সারা রাস্তাঘাট ফাঁকা। বাসা খুব বেশি দূরে না। একটা রিকশা পেলাম। খালি রাস্তা। খুব দ্রুতই ইকবাল রোডে পৌঁছে গেলাম আমি। কিন্তু মামা কে কিছু বলা যাবে না। আগে মা আসুক তারপরে।কিন্তু আমার হাতে তো কোন প্রমাণ নেই। মা যদি আমার কথা বিশ্বাস না করে। এত সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মামার বাসার কলিংবেল টিপলাম।দরজা খুলল মামা। আমাকে দেখে অবাক হল মামা
– তুই এত রাতে?
– বাসা খালি তো কেউ নেই। তাই ভাবলাম তোমাদের বাসায় কয়েকদিন থাকি যদি তোমাদের কোন সমস্যা না হয়।
– কিসের সমস্যা। আয় ভিতরে আয়।
ঘরে ঢুকে সোফার উপর ধপ করে বসে পরলাম। বায়েজিদ এটা কি করলো , কি বলল তার কিছুই মাথায় ঢুকছে না। এমন কেন করবে। মামার কথায় চিন্তায় ছেদ পড়লো
– বায়েজিদ কোথায় ?
– ও সিনেমা প্রোমোশনের কাজের জন্য কোথায় যেন গিয়েছে।
মিথ্যা বললাম না বলে উপায় নেই। ঘুম পাচ্ছে। মামা কে গুড নাইট জানিয়ে পশ্চিমের গেস্ট রুম্ টা তে শুয়ে পরলাম। বায়েজিদ কে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
মামীর ডাকে ঘুম ভাঙ্গল।
– বেলা কত হয়েছে জানিস?
– কয়টা বাজে?
– দশটা
– কতক্ষণ তোর জন্য খাবার নিয়ে বসে থাকবো ?হাত মুখ ধুয়ে খেতে আয়।
টেবিলে খেতে যেতেই বুকটা ধরাস করে উঠলো। লিভিং রুমে বায়েজিদ বসে আছে। বায়েজিদ টেবিলে এসে বসলো। আমি আমি বায়েজিদের দিকে না তাকিয়েই খেতে বসলাম।বায়েজিদ আমার দিকে অনুযোগের দৃষ্টি তে বলল
– এই কাজ টা তুমি ঠিক কর নাই রনক। আমাকে না বলে মামার বাসায় চলে আসলে। আমাকে একবার জানাতে পারতে।
– সরি বলার সময় পায় নাই।
মামা মামী সামনে সত্য কথা বলতে চাইছিলাম না। সত্য কথা বললে তো প্রমাণ করতে পারবো না। উল্টা আমার ক্ষতি করে যদি বায়েজিদ। বায়েজিদ বলল
– ইটজ ওকে। চল তোমাকে নিয়ে একটু বাইরে যাবো। কাজ আছে। খেয়েদেয়ে চটপট রেডি হয়ে নাও।
আমি আঁতকে উঠলাম । আমার কোন ক্ষতি করবে না তো সে?পরে ভাবলাম ভয় কে ফেস করা উচিৎ ? কতদিন বায়েজিদ কে উপেক্ষা করতে পারবো আমি। আমি রেডি হলাম। বের হয়ে দেখি বায়েজিদ গাড়িতেই বসে আছে। আমি বায়েজিদের পাশে এসে বসলাম।বায়েজিদ বলল
– কোথায় যাওয়া যায় বল তো ?
– ২ দিন পর তোমার সিনেমা মুক্তি পাবে আর তুমি বলছো কোথায় যাবে।
– ছবি মুক্তির থেকে বেশি দরকার তোমার সাথে কথা বলা।
– আচ্ছা চল ক্রিমসন কাপে বসি। আমারও কিছু ব্যাপারে কথা বলা দরকার।
– ওকে চল
ক্রিমসন কাপে বসলাম । আমার খুব প্রিয় জায়গা। বায়েজিদ কথা শুরু করলো ।
– দেখো কালকে রাত্রে যা করেছি সুস্থ মাথায় করি নাই। প্রচণ্ড রকম ড্রাঙ্ক ছিলাম। আমি জানি কাজটা ঠিক হয় নাই। এত বেশি ড্রিঙ্ক করা আমার উচিৎ হয় নাই। তাই হয়তো অনেক উলটা পালটা কথা বলেছি , করেছি। কিন্তু রিয়েল লাইফে আমি এমন না। বিশ্বাস কর।
আমি বায়েজিদের কথা একদম বিশ্বাস করতে পারছি না।বায়েজিদ নিশ্চয়ই বাইসেক্সুয়াল। আমার প্রতিও হয়তো সেক্সুয়াল এট্রাকশন আছে। কিন্তু এগুলো বলা যাবে না। বায়েজিদ কে ভয় পাচ্ছি। তার কাছে লাইসেন্স করা রিভলবার আছে। বায়েজিদ যদি আমার কোন ক্ষতি করার চেষ্টা করে। নাহ বায়েজিদের সাথে লাগতে যাওয়া ঠিক হবে না।
– কি ব্যাপার কিছু বলছও না কেন রনক
– বায়েজিদ আমি কালকে রাত্রে ভয় পেয়েছি ঠিকই।কিন্তু এখন তোমার কথায় সকল কিছু ক্লিয়ার হয়ে গেলো।
– থ্যাঙ্কস রনক। তুমি যে এত সহজে বুঝতে পারবে ভাবি নি।আরেকটা অনুরধ এই ঘটনা আমাদের মধ্য থাকুক। তোমার মা কে বল না।
– আমার মাথা খারাপ। এসব কথা মা কে বলতে যাবো না। তুমি একদম টেনশন কর না।
এরপর আর তেমন কোন কথা হল না। গাড়িতে উঠে গেলাম। বায়েজিদ বলল
– রনক তোমার সামনের ড্রয়ারে একটা রুমাল রেখেছি। দাও তো
আমি ড্রয়ার টা খুলে ভয় পেলাম। বায়েজিদ এর রিভলবার রাখা আর একটা রুমাল। আমি রুমাল টা দিলাম বায়েজিদ কে। কিন্তু আমার মাথায় ঘুরছে অন্য কথা। এটা কি কোন পরোক্ষ ভাবে কোন হুমকি দিল? রুমাল নেয়া টা একটা ছুতা। নাহ মা কে এখন কিছু বলা যাবে না। আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে বায়েজিদ কোথায় যেন গেলো।
১৭
আজ , “আমি নর্তকী” মুক্তি পাচ্ছে। সকাল থেকে বায়েজিদের সাথে বিভিন্ন হলে যেয়ে দেখছি দর্শক রেসপন্স কেমন।প্রতি টা শো হাউজফুল যাচ্ছে। মানে দর্শক সিনেমাটা পছন্দ করেছে। অনেক অনেক ভাল রিভিউ আসছে। বায়েজিদ তো মহা খুশি। মা ফোনে সব কথা শুনে সেইরকম খুশি হল। কিন্তু আমার মাথায় ঘুরছে সেদিনের কথা আর বায়েজিদের পিস্তল। বায়েজিদ ঠিক করলো মা আসলে বিশাল একটা পার্টি থ্রো করবে।
মা ফিরলও শেষ পর্যন্ত। অন্তত এখন আর বায়েজিদের সাথে এক সাথে থাকতে থাকতে হবে না।সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতে হচ্ছিল বায়েজিদ কিছু করবে না তো ?ধীরে ধীরে বাইয়েজিদের সাথে একটা দূরত্ব তৈরি করেছি। এখন মা এসে গিয়েছে আর কোন চিন্তা নেই।
মা এখন আর শো করে না। বেবি হবে তাই। আমার একটা বোন হবে। এর মাঝে বায়েজিদের কাছে একটা অফার আসলো পুনা ইউনিভার্সিটি ভারতে ফিল্ম তৈরি করার জন্য ৬ মাসের ট্রেনিং। কিন্তু মা কে এই অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। আর ফেলে রেখে যাবে তাও চাইছে না বায়েজিদ।মা জোর করে পাঠালও বায়েজিদ। এখন শুধু আমি আর মা। আগের মত।
মায়ের শরীর টা ভাল নেই। এখন বায়েজিদ নাই তাই মামা এসে মা কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। একদিন ডাক্তারের কাছ থেকে এসে মা খুব মন খারাপ করে বসে আছে। মামা বলল
– রনক তোমার মায়ের কমপ্লিকেশন দেখা দিয়েছে তাই ডাক্তার সিজারিয়ান সেকশনের কথা বলছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশনটা করতে হবে।ডেটের আগেই অপারেশন করতে হবে।
আমি বললাম
– বায়েজিদ কে খবর দেয়া দরকার।
কিন্তু মা না করলো। বলল
– বায়েজিদ কে বললে বায়েজিদ ট্রেনিং ছেড়ে চলে আসবে। এটা আমি চাই না।
মার এরকম বায়েজিদ এর প্রতি ভালবাসা দেখলে আমার গা জ্বালা পোড়া করে। কিন্তু কিছুই বললাম না।। সেদিনই মা কে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। আমি , মামা এবং মামী ৩ জন হাসপাতালে।আমি হাসপাতালের করিডোর ধরে হাঁটছি। নানা ধরণের চিন্তা মাথায় ঘুরছ। মার অপারেশন ঠিক মত হবে তো ? বাচ্চা হবার পর মা আমাকে আগের মত ভালবাসবে?বায়েজিদ কি ধরণের ব্যবহার করবে। হটাত দেখি মামা করিডোরে দৌড়ে আসলেন। খুব খুশি। আমাকে দেখে বললেন
– তোর একটা ফুটফুটে বোন হয়েছে।
আমি দৌড়ে গেলাম কেবিনে। সত্যি দোলনায় একটা বাচ্চা শুয়ে আছে। দেখতে একদম পুতুলের মত। এই তাহলে আমার বোন। খুব মায়া লাগছে মনে হয় কোলে নেই। কিন্তু ছোট বাচ্চা অনেক সেন্সিটিভ হয়। তাই হাত দিয়ে ছুঁলাম না। মা কে দেখলাম হাসছে। মা বলল
– হেক্সিসল দিয়ে হাত ধুয়ে তারপর ধর।
এমই হাত ধুয়ে এসে বেবি টা কে কোলে নিলাম। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। আমার বোন। নিজের বোন। হোক না বাবা ভিন্ন। আমরা তো একই মায়ের সন্তান।
মামা এসে ঘরে ঢুকলও। মামা বলছে
– কয় কেজি মিষ্টি কিনবো ?
– আমি বললাম ১০ কেজির কম হবে না। পারা প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন সবাই কে দিতে হবে।
এদিকে মা বলছে আমাকে
– রনক বায়েজিদ কে জানিয়েছিস ফোনে ? হটাত একটা সারপ্রাইজ পাবে।
আমি ফোন দিলাম। ভেবেছিলেম খুব খুশি হবে বায়েজিদ।কিন্তু সে রেগে গেলো।আমি অপারেশনের আগেই কেন জানাই নাই। তারপর বলল
– এটা আমার মেয়ে । সবার আগে আমার জানার অধিকার ছিল।
এই একটা কথা দিয়ে বায়েজিদ বুঝিয়ে দিল আমার আর নতুন বেবি টার মাঝে অনেক পার্থক্য। কারণ আমাদের বাবা ভিন্ন।

১৮
আমার কিছু ভাল লাগে না।জীবনটা কেমন পালটে যাচ্ছে। যেই আমি অনেক অপ্টিমিস্টিক ছিলাম সেই আমি এখন পেসিমিস্টিক হয়ে গিয়েছি। বুঝে গিয়েছি সারাটা জীবন আমার একা কাটাতে হবে। বাসায় নতুন বেবি আসার পর সবাই কত খুশি। অথচ আমি মন খারাপ করে বসে থাকি। মা জানি কেমন হয়ে গিয়েছে। সারা দিন শুধু বেবি আর বেবি। আমার অস্তিত্ব যেন নেই। সঙ্গীতাও আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পরেছে। তাকে কিভাবে না করবো ? আমার একটা মাত্র ভাল বন্ধু ছিল। সেও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? আমার আর বেঁচে থাকতে ভাল লাগে না। মরে গেলেই ভাল। কিন্তু এত সহজে আমি মরতেও তো পারবো না।
আমি ঠিক করলাম সঙ্গীতার কাছে সব স্বীকার করে আত্মহত্যা করবো। আমার কাছে পঞ্চাশটা ঘুমের ওষুধ আছে। আস্তে আস্তে জমিয়েছি। এদিকে বাসায় কারো সাথে সম্পর্ক আমার ভাল নেই। কাউকে সহ্য না। এক সাথে খেতে বসতেও ইচ্ছা করে না। খাবার টেবিলে না বসে নিজের ঘরে খাবার এনে খাই। কেউ কোন কথা বললে রুক্ষ ভাবে জবাব দেই। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি একদম। মা আর বায়েজিদ থেকেই কি লাভ। তারা তো আমার সমস্যা বুঝতেই পারবে না। উলটা বকাঝকা করবে। আসলে আমি নিজেই একটা সমস্যা। আমার এই দুনিয়ায় থাকার কোন অধিকার নেই। যত থাকবো ততই শুধু পাপ বাড়তে থাকবে । আর কিছুই হবে না। এর থেকে চলে যাই এই দুনিয়া থেকে। কিন্তু তার আগে সঙ্গীতা কে সব বলে যাবো।
সঙ্গীতা কে নিয়ে এক বিকেলে বসলাম ধানমন্ডি লেকের ধারে। সঙ্গীতা খুব খুশি। সেজে গুজে এসেছে। হয়তো সে ভাবছে আজকে আমি তাকে প্রপোজ করবো। কিন্তু কিসের কি। আমি কিভাবে বলবো এই কথা গুলো মাথায় গুছিয়ে নিলাম। তারপর জানি না কিভাবে কথা গুলো বলে গেলাম। আমার কথা সে যতই শুনছে ততই সঙ্গীতার চোখ পানিতে টলমল করতে লাগলো। আমি ভাবেছিলেম এই কথা গুলো বলার সাথে সাথে সঙ্গীতা আমাকে ঘৃণা করা শুরু করবে। কিন্তু তার চোখে ঘৃণা নেই। তার চোখে সমবেদনা। আর আমার চোখে পানি।তারপর যা হল তা অভাবনীয়। সে আমার হাত ধরে বলল
– আমি হয়তো ভালবাসার মানুষ হতে পারবো না। কিন্তু সারা জীবন বন্ধু হয়ে তোর পাশে থাকবো। তুই কোন দিন একা থাকবি না। কারণ আমি থাকবো তোর সাথে
– তুই আমাকে ঘৃণা করিস না
– ছিঃ । তুই আমাকে এমন ভাবিস? তুই কি নিজের ইচ্ছায় এমন হয়েছিস? এতে তোর কোন দোষ নেই।
আমি চুপ। এমন মানুষ তাহলে আছে দুনিয়ায় যারা সমকামিতা কে ঘৃণা করে না। সঙ্গীতা আমাকে শিখালো ফেসবুক ইউজ করা। তার মতে আমার মত নাকি হাজার হাজার মানুষ আছে এই পৃথিবীতে। এমন কি এই বাংলাদেশেও। সে আমার জন্য একজন কে খুঁজে বের করে দিবেই এমন প্রতিজ্ঞা করেছে। আর এজন্য দরকার ইন্টারনেট। কিন্তু এখন তো নেট নেই বাসায়। সঙ্গীতা বলল
– সাইবার ক্যাফে আছে কি জন্য?
সঙ্গীতার পরামর্শে ফেসবুক আইডি খুললাম। কিন্তু তাতে কি? আমার মত একজন কে কিভাবে আমি ফেসবুকে খুঁজে পাবো।। এদিকে আমি কৈশোর পার করে তারুণ্যে পা দিতে যাচ্ছি। আমার এইচএসসি পরীক্ষা চলে এলো।আমি এইচএসসি পরীক্ষা মামার বাসায় থেকে দিলাম। কারণ নিশুর কান্নাকাটি তে পড়াশোনা করতে পারি না। নিশু আমার বোনের নাম। আর মা নিজেই বলল মামার বাসায় থেকে পরীক্ষা দিতে। আর আমি নিজেও বায়েজিদের সাথে কমফোর্টেবল হতে পারছি না।বায়েজিদ যে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে তা না। কিন্তু একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছে।
আমি তল্পিতল্পা গুছিয়ে মামার বাসায় চলে আসলাম। মামা মামী খুশি হন আমি আসলে। কারণ পলাশ খুশি হয় আমি আসলে। পড়াশোনা আর তেমন করতে পারছে না। কিন্তু পাগলামি এখন আর করে না খুব একটা। আমি অনেক খাটাখাটুনি করে পরীক্ষা দিলাম। কারণ আমি জানি আমার ভাল রেজাল্ট না করে উপায় নেই। ভালো গ্রেড না পেলে ভাল ইউনিভারসিটি তে ভর্তি হতে পারবো না। প্রাইভেটে পড়ার টাকা আমি মায়ের কাছ থেকে নিবো না। বাবার উপর খুব রাগ হয়। আমার দায়িত্ব যখন নিবেই না তখন জন্ম দিয়েছিল কেন?
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলে বাসায় চলে আসলাম। এসে দেখি বায়েজিদ ওয়াই ফাই নিয়েছে বাসায়। ভাল। এখন আর সাইবার ক্যাফে তে যাওয়া লাগবে না।মা আবার অভিনয়ের চিন্তা করছে। এইবার মা নায়িকা না। সহঅভিনেত্রী । বায়েজিদের নতুন সিনেমায় অভিনয় করবে।এইবারের শুটিং ঢাকাতেই হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাসায় বিভিন্ন সেলিব্রেটি রা আসে। আর সিনেমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা হয়।
আমাদের বাসাটা ডুপ্লেক্স। আমার ঘরটা দোতালায়। তাই শব্দ খুব একটা আসে না। সারাদিন ভর্তি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করি। মাঝে মাঝে সঙ্গীতার সাথে দেখা হয়।ওর একটা প্রেম হয়েছে তাই সে সবসময় দেখা করতে পারে না। কিন্তু যতক্ষণ ওর সাথে থাকি ততক্ষণ খুব ভাল লাগে।
এইচএসসি এর রেজাল্ট দিল। আমার রেজাল্ট খুব ভাল হল। গোল্ডেন এপ্লাস। মা খুশি হলেন। কিন্তু বাসায় তেমন উচ্ছাস প্রকাশ হল না।আম্মু এক কেজি মিষ্টি আনলো। কিন্তু উচ্ছাস প্রকাশ করলেন মামা মামী। তারা সন্ধ্যায় আসলেন ৫ কেজি মিষ্টি নিয়ে। তারপর সবাই কে নিয়ে বড় একটা রেস্টুরেন্ট নিয়ে গেলেন সেলিব্রেট করার জন্য। বায়েজিদ গেলো না। তার কি জানি কাজ আছে। মা গেল। রাতে বাড়ি ফিরে দেখলাম বায়েজিদ বাসাতেই আছে। সে আমাকে একটা ঘড়ি দিল। কিন্তু সেটা তার ইউজ করা যদিও অনেক দামী। আমার নিতে ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু আমি কোন ঝামেলা চাই না। তাই নিলাম।
বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা চলে এলো।আমার একটা ব্যাপার খুব কষ্ট লাগে। মায়ের আমার পরীক্ষা নিয়ে কোন চিন্তা নেই। মা এমন পর হয়ে যাচ্ছে।সারাক্ষণ নিশু কে নিয়েই ব্যস্ত। বায়েজিদ আজকাল বেশির ভাগ সময় বাসায় থাকে না। সকালে যায়। রাতে ফিরে।নতুন সিনেমার শুটিং নিয়েই ব্যস্ত। তাই তার সাথে দেখা হয় না বললেই চলে। মামা আর সঙ্গীতা খোঁজ নেয়। কিন্তু তাও তারাও যেন দূরে সরে যাচ্ছে। পৃথিবীতে মনে হয় আমি একা হয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমার জীবনে কোন আপনজন নেই। আর আমি সমকামী। এমন কোন ছেলে পেতাম যাকে ভালবাসতাম। সেও আমাকে ভালোবাসতো। যাকে আঁকড়ে ধরে আবার বাঁচার প্রেরণা পেতাম। বুয়েট এ পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেলাম না। খুব কষ্ট পেলাম।বাসায় এসে নিজের রুমে ঢুকে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে রইলাম। খুব কান্না পাচ্ছে। কিন্তু কান্না থামিয়ে রাখতে পারছি না। এমন সময় মা ঢুকলও ঘরে। মা আমাকে দেখে অস্থির হয়ে গেলো
– কি হয়েছে আব্বু?
এত দিন পর আম্মুর স্নেহ ঢালা আব্বু শব্দটা শুনে আর নিজেক থামিয়ে রাখতে পারলাম না।
– কি হয়েছে তোর কাঁদছিস কেন?
– মা আমি বুয়েটে চ্যান্স পাই নাই।
– তো কি হয়েছে ?আরও অনেক ভারসিটি আছে। সেগুলোর কোন টা তে তো হবেই।
– আমার স্বপ্ন ছিল বুয়েট ।
– তোর কষ্ট আমি বুঝতে পারছি। আয় আমার বুকে বাবা
কতদিন পর মা এভাবে ডাকলও। আমার ক্ষোভ , অভিমান সব প্রকাশ করে ফেললাম আমি।মা সব শুনল। তারপর বলল
– তোকে একটা কথা বলা হয় নাই। তুই জানিস না। আমাকে একটা কষ্ট প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয় করে দিচ্ছে।
– কি কষ্ট ?
– এটা শুধু আমি আর বায়েজিদ জানি। এখন তুই জানবি। নিশু স্বাভাবিক নয়।তার চামড়ায় একটা অসুখ আছে। অনেক চেষ্টা করছি ট্রিটমেন্টের। কিন্তু কোন ভাবেই কিছু হবে না।সারাক্ষণ অয়েন্টমেন্ট মেখে রাখতে হয়। বাবা ওর দিকে বেশি নজর দিয়ে হয়তো তোকে অবহেলা করা হয়েছে। মাফ করে দে বাবা।
– ছিঃ মা এগুলো কি বলছো? মার কি কক্ষনো ছেলের কাছে মাফ চাইতে হয়। এমই তো এই ব্যাপার গুলো জানতাম না। তাই ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে।
– চল আজকে মা-ছেলে দুইজন এক সাথে ঘুরে আসি। শপিং করবো , সিনেমা দেখবো , খাবো ।
অনেকদিন পর মার সাথে বের হলাম। বুয়েটে চান্স না পাবার কষ্ট অনেকটাই দূর হয়ে গেছে। মা কে তো আবার আগের মত করে পেলাম।
১৯
ঢাকা ভার্সিটি আর মেডিক্যাল এ হল না। ঠিক করলাম আগামী বছর আবার মেডিক্যাল এ পরীক্ষা দিবো । এখন হাতে অনেক সময়। সময় কাটে না। কতক্ষণ পড়া যায়? বন্ধু বান্ধবও নেই। তখন ভাবলাম ফেসবুকে ফেক আইডি খুলি। প্রথম প্রথম ভয় লাগছিল । নিজের পরিচয় দিতে গেলে ফেক নাম, ফেক ঠিকানা দিতাম। ছবি কোন ভাবেই দিতাম না।যতই অনুনয় বিনুনয় করুক না কেন।ধীরে ধীরে ভয় কমে যেতে লাগলো। যার সাথে ভাল চ্যাট হত, বন্ধুত্ব হতে লাগলো তাদের কে নিজের নাম ঠিকানা বলতে শুরু করলাম। তারপর ছবি দেয়া শুরু করলাম। ফেসবুক আমার নেশা হয়ে গেলো। সারাদিন ফেসবুক নিয়ে পরে থাকতে লাগলাম। আমার আজকাল ২ জন মানুষের সাথে অনেক চ্যাট হয়। তাদের একজন রুমি ভাইয়া আরেকজন সাইফ। ২ জন আমার সিনিওর। রুমি কে ভাইয়া বলি। কিন্তু সাইফ আমার থেকে বড় হওয়া সত্তেও কেন জানি ভাইয়া বলা হয় না।
রুমি ভাইয়া ফ্রি ল্যনাসার। তিনি এই কমিউনিটির সেলেব্রেটি টাইপের। তার একটা গ্রুপ আছে ঢাকা গে বয়েস। এই গ্রুপ টা খুব জনপ্রিয়। তাদের অফলাইন , অনলাইন এক্টিভিটি আছে।
সাইফ ব্যবসায়ী। থাকে চিটাগং। তাকে আমার বন্ধু মনে হয়। এর বেশি কিছু না। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয় সাইফ আমাকে অন্য ভাবে পছন্দ করে। কিন্তু যদিও বলে নাই এই ধরণের কথা।বরং সে বলে সে কোন দিন রিলেশনই করবে না।
রুমি ভাইয়ার সাথে সম্পর্ক বাড়তে লাগলো। আমরা ছবি বিনিময় করলাম। রুমি ভাইয়া অনেক ম্যানলি আর ফিগার সুন্দর। আমার খুব ভাল লাগলো রুমি ভাইয়া কে। আর আমার ছবি রুমি ভাইয়ার এত ভাল লাগলো যে তার প্রতিদিন একটা ছবি চাই ই চাই। তার মতে আমার একেকটা ছবি একটা করে আইস্ক্রিম খাওয়ার মত।কথাও হল ফোনে। অনেকক্ষণ ধরে কথা।রাত পার হয়ে যায় কথা শেষ হয় না।
রুমি ভাইয়া এইবার দেখা করতে চাইলো । আমি এখন পর্যন্ত কারো সাথে দেখা করি নাই।এইবার দেখা করতে হবে। তাও প্রথম বারই একজন এই কমিউনিটির সেলিব্রেটি। কি করবো বুঝতে পারছি না। আমার খুব দেখা করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ভয় আর একরকম অস্বস্তি হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত দেখা করতে রাজি হয়ে গেলাম।দেখা করতে গেলাম আশুলিয়া। বর্ষাকাল । চারিদিকে পানি থই থই করছে। মাঝখানে রাস্তা। আমি অনেকক্ষণ ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু রুমি ভাইয়ার দেখা নেই। সময় কাটানোর জন্য একা একা ফুচকাও খেলাম।ভয় ভয় লাগছে। রুমি ভাইয়া যে স্মার্ট। আমাকে দেখে খ্যাঁত মনে করবে না তো? আবার আস্তে এত সময়ই বা লাগছে কেন?
অবশেষে রুমি ভাইয়া আসলো। পুরানা একটা লাল রঙের টয়োটা করলা গাড়ি আছে রুমি ভাইয়ার। সেটা চালিয়ে এসেছে। একদম ছবির মতই দেখতে সে। কিন্তু সামনাসামনি আরও স্মার্ট লাগছে।লাল রঙের একটা শার্ট পরেছে। চুল গুলো লম্বা লম্বা।প্রায় ৫ ফিট ১০ হাইট। স্লিম ফিগার। আমাকে দেখে হাত নাড়লো। আমি সামনে আসলাম। কেন জানি লজ্জা লাগছে। এত চ্যাট, এত ফোনে কথা। তারপরও লজ্জা লাগছে। আসলে এভাবে দেখা করি নাই তো কারো সাথে। রুমি ভাইয়া ব্যাপারটা বুঝলো। সে আমার সাথে কথা বলতে বলতে আমাকে অনেকটা ইজি করে ফেললো। রুমি ভাইয়া আমাকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলো
– কি আমাকে পছন্দ হয়েছে ?
আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। কি বলবো ? আসলেই তো পছন্দ হয়েছে। কিন্তু সামনাসামনি সরাসরি কিভাবে বলবো ?আমার লজ্জা মাখা হাসি দেখে রুমি ভাইয়া নিজেই বুঝে নিলেন উত্তরটা কি হবে।আমিও অনেক সাহস করে হেসে বললাম
– আর আমাকে?
– কাউকে পছন্দ না হলে ১৫ মিনিটের মাঝেই আমি চলে যাই।এখন ঘড়ি তে দেখো তো কয়টা বাজে?
– ৬ টা বেজে ৭ মিনিট,
– ১৫ মিনিট পার হয়েছে?
– সে কতক্ষণ হয়ে গেলো
– তাহলে?
– বুঝেছি
– কি বুঝেছ?
– এত কিছু জানতে চান কেন?
– আমার কৌতূহল বেশি । আমি আরও অনেক কিছুই কিন্তু জানতে চাইবো।
– যেমন?
– রোল প্লেস ?
আমি হেসে দিলাম।কারো রোল প্লেস আসলেই আমরা এখনো জানি না। কক্ষনোই জিজ্ঞেস করি নাই কাউকে।রুমি ভাইয়া হেসে বলল
– আমি সিরিয়াস।
– আমি স্ট্রেট আর প্লেস দিয়ে কি হবে?
– এই যে দুষ্ট ছেলে স্ট্রেট সাজা হচ্ছে না?
আমি হেসে দিলাম। রুমি ভাইয়া প্রস্তাব দিল
– চল নৌকায় উঠি।
আমিও রাজি। এক ঘন্টার জন্য নৌকা ভাড়া করে উঠলাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমরা নৌকায়। রুমি ভাইয়া গান গাইছে
– তোমার ঘরে বাস করে কারা ও মন জানো না…
তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা।………
পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে গিয়েছে। চারিদিক পানি তে থই থই করছে। বৈঠার নৌকা। আর রুমি ভাইয়ার গান। আজ যেন আমি আমার কল্পনার কোন রাজ্যে চলে এসেছি। অথবা স্বপ্ন।হটাত করে স্বপ্ন হয়তো ভেঙ্গে যাবে।
নৌকা থেকে নেমে আমরা আরেক দফা ফুচকা খেলাম। এখন বাড়ি ফেরা দরকার। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। সূর্য ডুবে গিয়েছে। রুমি ভাইয়া বলল
– চল তোমাকে গাড়িতে করে নামিয়ে দেই
আমি না করলাম না। কারণ তাতে রুমি ভাইয়ার সাথে আরও কিছুক্ষণ থাকা যাবে। রুমি ভাইয়া গাড়িতে গান ছাড়লো
“তুমি কি বল আসবে?
পথ ভোলা নদীর দেশে
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসাবো হৃদয়
হব দুজন সাথী”
আমার মনের মাঝে নানা চিন্তা আসছে।এরপর কি হবে?আমি কি রুমি ভাইয়ার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি? সে কি আমার প্রেমে পরেছে? এমন আরও কত চিন্তা ………
বাসার একটু কাছে এসে রুমি ভাইয়া থামালো গাড়ি। বলল
– আমি কি তোমার হাতটা একটু ধরতে পারি
আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। এই প্রথম রুমি ভাইয়ার স্পর্শ।আমার ভিতর করে কেমন জানি করে উঠলো। মনে হচ্ছিলো এই হাত যদি সারা জীবন ধরে রাখতে পারি।আমি হাত ছেড়ে দিলাম। না এত সহজে প্রেমে পড়া যাবে না। আমি গাড়ির দরজা খুলে বললাম
– যাই । ভাল থাকবেন।
আমি হাঁটছি। একবার পিছনে ফিরে তাকালাম। এখনো গাড়ি টা রয়েছে।আমি দ্রুত হেঁটে গাড়ির দৃষ্টি সীমা থেকে দূরে সরে গেলাম। সারা জীবন বঞ্চিত হয়েছি। তাতে আমার কোন ভুল ছিল না। আমার করার কিছু ছিল না। সব নিয়তি। কিন্তু এইবার সব কিছু আমার উপর। কোন ভুল করা যাবে না।

বাড়িতে ফিরতেই সাইফের ফোন। সাইফ খুব রুক্ষ প্রকৃতির ছেলে। সব স্ট্রেটকাট কথা। কেমন যেন একটু ওয়াইল্ড প্রকৃতির। কিন্তু ওর সাথে কথা বলতে আমার ভাল লাগে। ওর ছবি দেখেছি। নিজের খুব একটা যত্ন নেয় বলে মনে হয় না। কিন্তু তারপরও কেমন যেন একটা কি জানি আকর্ষণ করে আমাকে।আমি সাইফ কে বললাম না রুমি ভাইয়ার সাথে দেখা করার কথা। রুমি ভাইয়ার সাথে যেমন আমার সাহিত্য, গান , মুভি কত কিছু নিয়ে গল্প হয় কিন্তু সাইফের সাথে আমার কথা বলার বিষয় খুঁজে পাই না।টিভি দেখলে সে হয় খেলা দেখে নাহলে কোন হিন্দি বা কলকাতার বাংলা কমেডি শো দেখে যেগুলো আমি একদম পছন্দ করি না। আর টিভি ছাড়া তার দৈনিক কাজের বেশির ভাগ সময় সে ঘুমিয়ে থাকে। কি ব্যবসা করে তা সে আমাকে বলবে না এবং এই বিষয়ে প্রশ্ন করা যাবে না সে প্রথম দিনই বলে দিয়েছে। ওকে আমার একটু ভয় ভয় লাগে। তাই মজাউ তেমন করা হয় না। তারপরও কথা বলতে ভাল লাগে। কেন বুঝি না।সব চেয়ে আশ্চর্য এবং সাথে সাথে ভয়ের বিষয় হল আমার একমাত্র ওর সাথেই যৌনতা নিয়ে কথা হয়েছে। ওর কি ভাল লাগে সব শুনেছি বিস্তারিত তার মুখে। এমন কি আমি মতামতও দিয়েছি। আগে অস্বস্তি লাগতো কিছু বলতে। প্রথম দিন ভেবেছিলেম আর কথা বলবো না ওর সাথে। এমন কি রুমি ভাইয়ার সাথেও আমার যৌনতা নিয়ে কথা হয় নাই। কিন্তু সবার মাঝেই ডক্টর জেকিল এবং মিস্টার হাইড থাকে। সাইফের সামনে হয়তো আমার অন্য এক রূপ বের হয়ে আসে। কিন্তু পরে নিজেই নিজেকে বুঝালাম যৌনতা তো মানুষের জীবনের একটা অংশ। কয়জন বলতে পারবে জীবনে মাস্টারবেট করে নাই বা পর্ণ দেখে নাই। বললে সেটা হবে হিপোক্রেসি। আমি যার সাথে সাচ্ছন্দে এই কথা গুলো বলি তার সাথে বলছি। এই কথা বলা মানে আমি ফোন সেক্স করেছি এমন তো নয়। যৌনতা বিষয়ক নানা বিষয় নিয়ে কথা হয়। যেমন একদিন এইডস নিয়ে কথা হল। আর প্রতিদিন যে এসব কথা হয় তাও নয়।
আজকে সাইফের সাথে বেশি কথা হল না। কি করি, খেয়েছ নাকি এই টাইপ কথা হল।
আমি রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবছি আমি কি রুমি ভাইয়ার প্রেমে কি আসলেই পরেছি? নাকি আমার জীবনের ক্রান্তিকালে যখন কাউকে দরকার তখন যে একটু মায়া দেখিয়েছে তার প্রতি কি আকৃষ্ট হচ্ছি? ভাল করে ভাবতে হবে… কোন ভুল করা যাবে না। কোন ভুল মানুষ কে যেন না ভালবাসি।
২০
আজকাল প্রায়ই রুমি ভাইয়ার সাথে বের হওয়া হয়। উনাদের গ্রুপের মিটিং গুলোতেও যাওয়া হয়।সেখানে অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে।সবাই আমাদের নিয়ে ফাজলামো করে। তারা ধরেই নিয়েছে আমরা রিলেশনে আছি। কিন্তু ব্যাপারটা তো তা নয়।এখন আমি সময় চেয়েছি রুমি ভাইয়ার কাছ থেকে। কিন্তু তার গ্রুপ টা নিয়ে আমার একটু কনফিউশন আছে। উনারা তেমন কোন সিকিউরিটি মিসার না নিয়েই নানা প্রোগ্রাম করেন। আর সেগুলো তে ক্রসড্রেসিং খুব হয়। এগুলো আমার ভাল লাগে না। বাইরের মানুষ জেনে গেলে খুব সমস্যা হবে। এগুলো রুমি ভাইয়া কেও বলেছি। কিন্তু তিনি হেসেই উড়িয়ে দেন। তার মতে এ ধরণের কোন সমস্যাই হবে না।কিন্তু আমার খুব ভয় লাগে।আর তাদের পার্টি, গেট টুগেদার এগুলো তে যেতেও আমার ইচ্ছা করে না।কিন্তু রুমি ভাইয়া মাইন্ড করবে তাই কিছু বলি না। অবশ্য সেখানের কয়েকজন খুব ভাল।তাদের মাঝে আদনান আর রূপক কে আমার বেশ ভাল লাগে। বাকিরাও আমার সাথে আন্তরিকতার সাথেই মিশে।সামনে তাদের গ্রুপের বড় একটা প্রোগ্রাম হবে কোন রিসোর্টে।সবাই পুরো এক রাত থাকবে সেখানে। নাচ গান হবে। রুমি ভাইয়ার তো খুব ইচ্ছা আমি যদি রাজি হয়ে যাই তাহলে সেখানেই আমাদের রিং সিরেমনিটা করে ফেলবে। ব্যাপার টা আমার মোটেও ভাল লাগে নাই। কিন্তু কিছুই বলি নাই এখনো।
২১
দিন যায়। বর্ষাকাল চলে গেল। তেমন বৃষ্টি হয় না এখন আর। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। শারদীয় দুর্গা পূজাও আসন্ন।একদিন রুমি ভাইয়ার সাথে উত্তরার দিয়াবাড়ি গেলাম।শরৎকালে সেখানে কাশফুল ফুটে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম এক বিকেলে। সূর্য তখন অনেকটাই পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। কিন্তু গরম খুব বেশি। এখনো সূর্যের তেজ ততটা কমে নাই। দিয়াবাড়ি যাবার কিছুদূর রাস্তা বেশ খারাপ। গাড়ি নিয়ে যেতে বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হল রুমি ভাইয়ার। গোল চক্করটায় এসে গাড়ি থামালও রুমিভাইয়া। আসলে সেইরকম সুন্দর। আমার তো ঢাকার বাইরেও তেমন যাওয়া হয় না। এমন প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখাউ হয় না।চারিদিকে শুভ্র সাদা কাশফুলের বন। কাশফুলের বনের মাঝখান দিয়ে রাস্তা। চায়ের স্টল আছে। রেস্টূরেন্ট আছে। আজকে রুমি ভাইয়ায় কেও আশ্চর্য সুন্দর লাগছে। এমনিতেই রুমি ভাইয়া প্রায় ছয় ফুট। আকাশি একটা পলো টিশার্ট পরেছে। একদম মডেল দের মত লাগছে। দূরে উত্তরার সরকারী ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। দূর থেকে দেখতে খুব সুন্দর লাগে। আমরা রাস্তা ধরে হাঁটছি। একটা ব্রিজ পড়লো। ব্রিজের নিচে জলধারা। এখন সূর্য প্রায় ডুবি ডুবি অবস্থা। পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে গিয়েছে। এত চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য অনেকদিন দেখি নাই। একটা নির্জন খোলা জায়গা পেলাম। চারদিকে কাশফুলের বন। মাঝখানে জায়গাটা।দুজনেই বসলাম সেখানে। রুমি ভাইয়া আমার হাতে হাত রাখলো। আমার নিজের শরীরে কেমন আলোড়ন উঠলো। কিছু বুঝার আগেই রুমিভাইয়া আমার ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো।এই প্রথম কারো ঠোঁটের স্বাদ পেলাম আমি।আমিও তাঁর ঠোটের স্বাদ নিতে লাগলাম। তখন সূর্য প্রায় ডুবে গিয়েছে। রুমি ভাইয়া অস্ফুট স্বরে বলল
– আমি তোমাকে ভালবাসি রনক। কেন বুঝো না?
আমার জানি কি হল। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভিতর থেকে বের হয়ে আসলো
– আমিও তোমাকে ভালোবাসি রুমি ভাইয়া।
রুমি ভাইয়া আমার ঠোঁটে হাত দিয়ে বলল
– এখন থেকে আর রুমি ভাইয়া নয়। শুধু রুমি।
আমার কেমন যেন লজ্জা লাগলো। শুধু রুমি বলা কি এখুনি সম্ভব।কিন্তু রুমি ভাইয়া জেদ করলো তাকে রুমি বলেই ডাকতে হবে।এদিকে রাত হয়ে আসছে। আমরা উঠলাম। চায়ের স্টলের সামনে এসে চা খাবো । এক জায়গায় মাল্টা চা তৈরি হচ্ছে। আমার মাল্টা চা খেতে। সব লজ্জা ঝেড়ে এইবার বললাম
– চল রুমি মাল্টা চা খাই।
রুমি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলও। এই মানুষটা যখন হাসে তাকে এত ভাল লাগে কেন? আমার চোখে কেমন যেন পানি এসে যাচ্ছে। এমনও কিছু ঘটছে আমার জীবন নাকি কল্পনা। অথবা স্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই ভেঙ্গে যাবে।
চা খেয়ে রওনা দিলাম। অনেকখানি রাস্তা। এখন রওনা না দিলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। গাড়িতে উঠলাম। রুমি গান ছাড়লো
– কত গম গম লার…।
হালদা সিনেমার গান। গান শুনে আমারও মনে হল আসলেই কতই না ভাল লাগছে।
২২
বাড়ি ফিরে ডিনার করেই নিজের ঘরে ঢুকে গেলাম। সাথে সাথে সাইফের ফোন। ভাবলাম আজকে সাইফ কে সব বলে দিবো। সাইফ কে ফোনে খুলে বললাম শুধু। সাইফ শুধু হুম হুম করছে। আর কিছুই বলছে না। আমি বললাম
– সাইফ তুমি আমার এই কমিউনিটির প্রথম এবং সেরা বন্ধু। আমার জীবনে এত বড় ঘটনা ঘটলো। আর তুমি শুধু হুম হুম করছো ?
– কি বলবো তাহলে?
আমার মনে হল সাইফ কেমন রেগে আছে। আমি বললাম
– তুমি কি কোন কারণে আমার উপর রাগ করেছো ?
– রাগ, কষ্ট , আবেগের কি বুঝো তুমি?
– মানে?
– মানে কিছুই না। তোমাকে অভিনন্দন। তোমাদের জীবন সুখের হোক।
– ধন্যবাদ সাইফ।তোমার মত এত ভাল একটা বন্ধু পেয়ে আমি আসলেই ভাগ্যবান
এরপর আর তেমন কথা হল না। ফোন রেখে ভাবছি সাইফের কথা।রাগ ,কষ্ট আবেগের কি বুঝি আমি? এই কথাটা কেন বলল আমায়? তাহলে কি সাইফের রাগ হয় নাই।কষ্ট হয়েছে?কিন্তু কেন?আমি আবার ফোন দিবো সাইফ কে? কেন সে কষ্ট পাচ্ছে? আমার জানা দরকার। কারণ আমি তার বন্ধু। কষ্টে বন্ধু হয়ে পাশে থাকবো না তা কি করে হয়?আমি আবার ফোন দিলাম। অনেকক্ষণ রিং বাজার পর ফোন ধরলও সাইফ। সাইফ বলল
– হ্যালো
কেমন ভেজা ভেজা লাগছে তার কন্ঠ । কিন্তু কেন?
– কি হয়েছে বল তো ।
– কি হবে আবার? কিছু না।
– উহু। আমি ঠিক বুঝতে পারছি কিছু হয়েছে।
হঠাত সাইফ হাউ মাউ করে কেঁদে দিল। একদম ছোট বাচ্চাদের মত।ওর মত এত শক্ত একটা ছেলে এইভাবে কাঁদতে পারে আমি ভাবতেও পারছি না। ওরে কিছুক্ষণ স্পেস দিলাম। কাঁদুক। মনটা হাল্কা হোক। তারপর জিজ্ঞেস করবো কারণ টা কি?সাইফ কান্না থামিয়ে দিল কিছুক্ষণ পরেই।কান্না থামিয়ে বলল
– সরি।আমি খুব ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম।
– আমি বললাম আমরা সবাই কখনো না কখনো ইমোশনাল হই। এতে সরি বলার কিছু নাই।এখন বল কেন কেঁদেছ?
– তোমার জন্য।
– মানে??
– আমি চাই না তোমার রুমির সাথে রিলেশন হোক ।
– কেন?
– কারণ
সাইফ ইতস্তত করছে।
– বল কি কারণ?
– আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি রনক।
আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। কি বলবো বুঝতে পারছি না।
– কিন্তু তুমি তো কক্ষনো বল নাই।আর তুমি তো সব সময় বল তুমি রিলেশন লাইক কর না
– হ্যাঁ করতাম না। কিন্তু তোমার সংস্পর্শে আসার পর আমি পুরোই পরিবর্তন হয়ে গিয়েছি।জানো মায়ের মারা যাওয়ার পর এই প্রথম আমি আবার কাঁদলাম।
– কিন্তু তুমি তো কক্ষনোই বল নাই।
– কারণ আমি তোমার যোগ্য নই।আর রুমি আমার থেকে অনেক বেশি যোগ্য
– কে যোগ্য আর কে যোগ্য না সেটা আমার বুঝার কথা। তুমি বল নাই কেন আগে।
– তুমি কি রুমি কে ছেড়ে আমার মত চালচুলো হীন অন্ধকার জগতের বাসিন্দা কে ভালবাসতে ?
– অন্ধকার জগত মানে?
– সে তুমি বুঝবে না
– দেখো সাইফ তোমাকে আমি আমার সেরা বন্ধু ভাবি। প্লিজ তুমি এসব ভুলে যাও।আমরা আরও ভাল বন্ধু হতে পারবো দেখে নিও। আর বন্ধুত্বের থেকে সেরা সম্পর্ক আর কি আছে?আর আমার থেকেও ভাল কেউ তোমার জীবনে আসবে।
– এসব গত বাধা সান্ত্বনার কথা আমাকে বলতে হবে না। আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি। কিন্তু তোমাকে অনুরোধ তুমি আর আমাকে আর ফোন কর না। তোমাকে আমি ভুলতে চাই।তুমি ফোন দিলে আমি তোমাকে ভুলতে পারবো না।
আমি কি বলবো। চুপ করে রইলাম। সাইফ ফোন রেখে দিল।খুব কষ্ট লাগছে। চোখে পানি এসে গিয়েছে। দীর্ঘ ৬ মাসের বন্ধুত্বের কি তাহলে এখানেই সমাপ্তি??
দিন ঘনিয়ে আসছে। সামনেই রুমিদের গ্রুপের গ্র্যান্ড পার্টি। রিসোর্ট ভাড়া করা হয়ে গিয়েছে। লোকে মুখে শুনছি রুমি নাকি আমাকে রিং পরাবে সেদিন। হোয়াইট গোল্ডের রিং।অনেকে পার্টি তে নাচবে ।তাই রিহারসেল ও চলছে। কিন্তু আমার কেন জানি ভাল লাগছে না। এসব পার্টি আমার জন্য নয়। কিন্তু রুমি এত উৎসাহী পার্টি নিয়ে যে পার্টি তে না গেলে সে নিশ্চয় মাইন্ড করবে। তাই বাধ্য হয়ে পার্টি তে যাচ্ছি। রুমি এত ব্যস্ত তে যে তার সাথে একান্ত সময় পাচ্ছি না। তাই বেশ রাগও লাগছে। আমার এসব পার্টি, হোয়াইট গোল্ডের রিং চাই না । আমার শুধু তাকে চাই।তাকে…………।
২৩
ঢাকা মেডিক্যাল এর সামনে গাড়ির ভিতর বসে আছি। রাত বাজে ৪ টা। পলাশ সুইসাইডাল এটেম্পট নিয়েছে। ১০০ টার উপরে ঘুমের ওষুধ খেয়েছে।এত গুলো ওষুধ কই পেলো সেটাও একটা আশ্চর্যের ব্যাপার। সে ঢাকা মেডিক্যাল এর আইসিইউ তে ভর্তি।অবস্থা ভাল নয়। আমার প্রচণ্ড অবাক লাগছে। পলাশ কেন সুইসাইডাল এটেম্পট নিল। এটা কি তার বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডারের কারণে নাকি অন্য কোন কারণ আছে। মামা ,মামী এবং মা ভিতরে। কিন্তু আইসিইউ এর সামনে এত মানুষ ভির করতে দিচ্ছে না। মামা মামী কাঁদছেন বাচ্চাদের মত হাউমাউ করে। মা আর বায়েজিদ সামলাচ্ছে তাদের কে।এত রাতে পুরো হাসপাতাল টা নীরব। রোগীর আত্মীয় স্বজন করিডোরের মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়ে রয়েছে। ফিনাইলের গন্ধ। আমার ভাল লাগছিল না একদম। তাই ইমারজেন্সির সামনে গাড়ি রেখে গাড়ির ভিতরে শুয়ে রয়েছি। ঘুম তো আসছেই না। অস্থির লাগছে। একটু পর পর ফোন করছি মা কে। অবস্থা জানার জন্য।
হটাত একটা গাড়ি এসে থামলো। এত রাতে আবার কে আসলো রোগী নিয়ে। কিন্তু রোগী না। গাড়ি থেকে নামলো পাঞ্জাবী পরা একটা ছেলে। হাতে বিয়ের রাখি। ছেলেটা কে চিনতে পারছি। পলাশের সিনিওর ফ্রেন্ড। আমার গাড়ির দিকেই আসছে। আমি গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। বন্ধুর খোঁজ নিতে এত রাতে এসেছে। ভাল বন্ধুই বলতে হবে। কিন্তু একি তার চোখ লাল। মনে হয় কেঁদেছে। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো
– আপনি রনক না?
– জি
– আমি পলাশের বন্ধু।
– চিনতে পেরেছি
– পলাশ কেমন আছে?
– ভাল না। কি হবে বুঝতে পারছি না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।
ছেলেটা কেঁদে দিল
– আরে আপনি কাঁদছেন কেন?
– আমার জন্যই পলাশের আজকে এই অবস্থা।
– মানে?
– পলাশ আমাকে ভালবাসতো আর আমিও পলাশ কে। কিন্তু হটাত করে মা বিয়ে ঠিক করলো। আমি এক মাত্র ছেলে। বংশের বাতি আমাকেই জ্বালাতে হবে। অনেক না করার পরও উপায় না দেখে বিয়ে তে রাজি হয়েছি। কিন্তু এই ব্যাপার টা পলাশ মেনে নিতে পারছিল না। আমি অনেক বুঝিয়েছি বিয়ের পরও আমাদের সম্পর্ক থাকবে। কিন্তু পলাশ কোন ভাবেই বুঝতে চাইলো না। ও যে এমন একটা কাজ করবে ভাবতেই পারি নাই।
প্রথমে কথা গুলো শুনে আমার অবাক লাগছিল। কিন্তু পরে রাগ লাগলো। বিয়ে যদি করবি এখন ছিঁচকাঁদুনে কান্না কেন? আর বিয়ের পরে সম্পর্ক রাখবে। ছিঃ। আমার ঘৃণা লাগছে।
– পলাশ যদি বিয়ে করে আরকেটা মেয়ের সাথে সংসার করতো আর আপনি সিঙ্গেল থাকতেন তাহলে কি আপনি মানতে পারতেন।
ছেলেটা থতমত খেয়ে গেলো। আমি বলেই যাচ্ছি
– নিজের দিক থেকে ভাবা অনেক সহজ। কিন্তু ওপর জনের মনের অবস্থা বুঝতে হয়। যাই হোক আজকে মনে হয় আপনার গায়ে হলুদ ছিল। আপনি বরং চলে যান।
– চলে যাবো ?
– হ্যাঁ। কারণ আমাদের সমাজ এই ভালবাসা কে স্বীকৃতি দেয় না। আপনি থাকলে অনেক কথা উঠতে পারে। তাতে পলাশেরই সমস্যা হবে। পলাশ সুস্থ হলে আমি আপনার কথা বলবো। আপনি প্লিজ চলে যান।
ছেলে টা চোখ মুছতে মুছতে চলে যাচ্ছে । কেমন যেন পরাজিত মনে হচ্ছে ছেলেটা কে।আমি পিছন ফিরে ডাকলাম
– শুনেন
– বলেন
– আল্লাহ না করুক পলাশের কিছু হলে আপনি কিন্তু আসবেন না। আমি চাই না পলাশের নামে কোন কলঙ্ক ছড়াক।
– না আমি আসবো না আর।
ছেলেটা চলে গেলো। ছেলেটার সাথে বেশি খারাপ ব্যবহার হয়ে গেলো। আমি নিজে সমকামী হয়ে এমন কথা বললাম। কিন্তু আমি তো জানি বাংলাদেশে সমকামী দের কিভাবে দেখা হয়।
ফজরের আযান দিচ্ছে। আমার নামায পড়া হয় না। কিন্তু আজকে গেলাম মসজিদে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবো ।কিন্তু আমার মত পাপীর প্রার্থনা কি আল্লাহ শুনবেন?
নামায পড়ে আসতেই শুনলাম পলাশের অবস্থা ভাল নয়। লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছে। আমার চোখে পানি এসে গেল । সেই ছোটবেলা থেকে এক সাথে বড় হয়েছি। ও আমার সঙ্গ এত পছন্দ করতো। তাকে নিজের ছোট ভাইই মনে হত।সব মনে পড়ে যাচ্ছে। আজ যদি কিছু হয় আমি কি সহ্য করতে পারবো?আমার কাঁদতে ইচ্ছা করছে। হাসপাতালের এক কোনায় যেয়ে কাঁদলাম। কেউ যাতে না দেখে। তারপরও যারা দেখছে তাদের কোন ভাবান্তর নেই। এমন দৃশ্য এরা প্রতিদিন ই দেখে।
পলাশ আমাদের ছেড়ে চলে গেলো সকাল ১০ টায়। আমি পলাশের মোবাইল থেকে ছেলেটার নাম্বার পেলাম। জানাবো কি ছেলেটা কে। আজ ওর বিয়ে।থাক না জানাই। তারপর মোবাইল থেকে একে একে মেসেজ ডিলিট করে দিতে লাগলাম। কত প্রেম ভালবাসার কথা।কোন ট্রেস রাখা যাবে না। আমি চাই না মামা মামী জানুক। তাদের কষ্টই তাতে বাড়বে ।ছেলেটার নাম্বার ব্লক করে দিলাম। ডিলিট করে দিলাম পলাশের নষ্ট ভালবাসা। আসলে আমাদের মত সমকামী দের ভবিষ্যৎ মনে হয় এমনই।

২৪
আলো ঝলমল করছে চারিদিক। মরিচ বাতির আলোয় সাজানো সারা রিসোর্ট। আজকে গ্র্যান্ড পার্টি। রিসোর্টের হল রুমে হবে নাচ গান। অতিথি প্রায় ৩০ জনের মত। প্রায় সবাই ঝকমকে পার্টি ড্রেস পরে এসেছে। এক মাত্র আমি সাধারণ ড্রেসে এসেছি। রুমি এসে মাথায় একটা ঝকমকে টুপি পরিয়ে দিয়ে গিয়েছে। এতে কিছুটা পার্টি লুক এসেছে। একে একে যারা নাচবে তারা ঢুকছে হল ঘরে। কারো পরনে ঝকমকে গাউন। কেউ বা গহনা শারি পরা। ক্রস ড্রেসিং করেছে। মুখে এক পরত মেকাপ। ভাল লাগছে না আমার। এ ধরনের পরিবেশে আগে আসি নাই। চলে যেতে ইচ্ছে করছে। শুধু রুমি মাইন্ড করবে এই কারণে যেতে পারছি না। পার্টি চলবে অনেক রাত পর্যন্ত। আমার কেমন ঘুম ঘুম লাগছে। পারফরম্যান্স শুরু হয়েছে। উমরাও জান এর সালাম গানের সাথে মুজরা নাচ্ছে একজন। হই চৈ চিৎকার শুরু হয়ে গিয়েছে। ভির জমে গিয়েছে ওখানে।কেউ কেউ শীষ দিচ্ছে। রুমি খুব ব্যস্ত। পুরো পার্টির দায়িত্ব তো তার উপরেই। আমার ইচ্ছা করছে উপরের কোন ঘরে যেয়ে ঘুমাতে। চুলায় যাক পার্টি। বালের পার্টি। বাজে কথা বলতে ইচ্ছা করছে। এমন পার্টি তে কোন দুঃখে এসেছি। রুমির সাথে আমার সম্পর্ক থাকলেও আমি আর এইরকম পার্টি তে আর আসবো না। এইবার শুরু হয়েছে ম্যাজিক মামুনি। না আর থাকা যাচ্ছে না। এইবার উপরে যেয়ে ঘুমাবো। আমি রিসোর্টের একটা ঘরে যেয়ে শুয়ে পরবো ঠিক করলাম। যেতে যেতে দেখলাম সুইমিং পুলের ধারে বসে কেউ কেউ আড্ডা দিচ্ছে। তাও ভাল। কিন্তু ওদের চিনি না। সোজা রিসোর্টের একটা ঘরে ঢুকে গেলাম। সুসজ্জিত ঘর। নরম বিছানা। বিছানায় শুতেই ঘুমিয়ে পরলাম।
২৫
যখন ঘুম ভাংলো তখন অসংখ্য মানুষের ভির ঘরে। ঘুম ভাঙলো তাও ঠিক নয় ঘুম ভাঙ্গানো হল। ঘরে পুলিশ এবং কিছু মানুষের ভির। আমাকে অনেকটাই টেনে হিঁচড়ে নিচে নামানো হল। দেখি সবাই দাঁড়িয়ে আছে রিসোর্টের গেটে। চারিদিকে পুলিশ।কি হল। আমি ঠিক বুঝতেই পারছি না। রুমি খুব রাগত স্বরে কথা বলছে এক পুলিশ অফিসারের সাথে। পুলিশ অফিসার কোন কথাই শুনছে না। কিছু কিছু কথা আমারও কানে আসছে। অফিসারটি বলছে
– আপনারা অসামাজিক কাজে লিপ্ত।
– কি অসামাজিক কাজ করেছি।
– আপনারা সমকামিতা করছেন।
– নাচ গান করা সমকামিতা করা?
– না। কিন্তু এগুলো কি নাচ গান? আপনারা ছেলে হয়ে মেয়ে সেজে নাচ্ছেন। তাছাড়া একজন কে আমরা রিসোর্টের ঘরে পেয়েছি। কে জানে সে কারও জন্য অপেক্ষা করছিল কিনা
– মানে?ঘুমানোউ এখন অপরাধ
বুঝতে পারলাম আমার কথা হচ্ছে। এ কি বিপদ। জীবনে এমন বিপদে পরবো কোন দিন ভাবি নি। কি করবো মাথায় কিছু ঢুকছে না। অফিসারটি বলছে
– আপনাদের সবাই কে থানায় যেতে হবে। তারপর অন্য কথা।
হটাত দেখলাম সবাই মুখ ঢেকে ফেললো। আমি কিছু বুঝার আগেই ছবি তুলে নিয়ে গেলো একজন। পুলিশের ভ্যানে করে থানায় যেয়ে নামলাম।প্রচণ্ড ভয় লাগছে। কেউ কোন কথা বলছে না। আমাদের কে তখুনি হাজতে ভরে দিল। হাজতে বিশ্রী গন্ধ। নোংরা পরিবেশ। কথাও পস্রাবের দাগ।অসংখ্য মশা। আমার দম বন্ধ লাগছে। রুমি এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে
– এই যে তুমি। তোমাকে কে বলেছিল উপরে যেয়ে ঘুমাতে। এই রিসোর্টের রুম গুলো তে ব্যবসা হয়। পুলিশ ভাবছে তুমি কাস্টমারের জন্য অপেক্ষা করছিলে
– মানে । কি বল এগুলো
রুমি আর কিছু বলছে না। আমার রাগ উঠে গেল। তার জন্য পার্টি তে এসে বিপদে পড়েছি আমি। আর সেই আমার উপর হম্বি তম্বি করছে। আমি কিছু বলতে যাবার আগেই একজন এসে রুমি কে সরিয়ে নিয়ে গেলো।
– নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে কি হবে?এখান থেকে বের হবার উপায় খুঁজতে হবে এখন।
আমাদের সবার মোবাইল নিয়ে গিয়েছে। আর মোবাইল থাকলে কি হত ? বাসায় তো জানানো যেতো না। আমার এই বিপদের মাঝেও ঘুম পাচ্ছে। কি আশ্চর্য ব্যাপার। আমার কেমন জানি তন্দ্রা এসে গেলো। কি ঘটছে দেখছি। আবার দেখছিও না।ভোর ৪ টার দিকে একজন স্যুট টাই পরা লোক এসে হাজতের সামনে দাঁড়ালো। পুলিশ এসে আমাদের সবাই কে বের করে দিল হাজত থেকে।
ইনি রুমির মামা।খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে আছে। তার কথায় পুলিশ একবারে আমাদের ছেড়ে দিল। থানা থেকে বের হয়ে দেখলাম যে যার মত রাস্তা ধরেছে। রুমিও নেই। সবাই কেমন ছাড়া ছাড়া হয়ে গেলো। এত রাতে বাসায় যাওয়া যাবে না। কই যাবো তাহলে। পুলিশ মোবাইল ফেরত দিয়ে দিয়েছে। আমি ফোন দিলাম রুমির মোবাইলে। কিন্তু বন্ধ।কই যাবো। ভয় লাগছে আমার।আমি বলে এসেছি বাসায় এক বন্ধুর বাসায় থাকবো। এর মাঝে কিভাবে বাড়ি যাবো? সকালের আগে বাড়ি যাওয়া যাবে না। আমি বাস স্ট্যান্ডের বেঞ্চে যেয়ে শুয়ে পরলাম।ঠিক করলাম সকালের বাসে বাড়ি যাবো।
ভোর হতে বেশি দেরি নেই। আযানের সুমধুর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে গিয়েছে।সকাল হয়ে গেলো। খুব খিদে পেয়েছে। রুটি কলা কিনে খেলাম পাশের একটা দোকান থেকে। বাস আর আসে না। আমার অধৈর্য লাগছে। তাছাড়া রুমির কোন খবর নেই। ফোন অফ। খুব চিন্তা লাগছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাস আসলো। এইবার বাসে উঠলাম। বাড়ি যেতে সময় লাগবে। ততক্ষণে অনেক বেলা হয়ে যাবে। বাসে একজন পেপার বিক্রি করতে উঠলো। পেপার কিনলাম একটা । সময় কাটানোর জন্য।পড়তে পড়তে শেষ পাতায় গেলাম। একটা খবরে চোখ আটকে গেল।
“৩০ জন সমকামী গাজিপুরের রিসোর্ট থেকে আটক”
উপরে ছবি আছে। সেখানে আমার ছবি স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। পুলিশ আমাদের ছেড়ে দিল। তারপরও কিভাবে খবরটা পেপারে আসলো বুঝলাম না। রিসোর্টে যে ছবি তুলেছিল সেই সাংবাদিক ছিল বুঝলাম। কেন যে তখন মুখ ঢাকি নাই। এখন কি হবে! বাসায় অবশ্যই এই ছবি বায়েজিদ আর মায়ের চোখে পড়বে। প্রচণ্ড ভয় লাগছে।কিন্তু আগে তো বাড়ি যাই। তারপর পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা।
২৬
পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ বেলা হয়ে গেলো। কিন্তু এখনো বাড়ি থেকে কোন ফোন আসলো না কেন বুঝলাম না। একটা রিকশা নিয়ে ধানমন্ডির বাসায় এসে থামলাম।
কলিংবেল বাজাতেই বায়েজিদ দরজা খুললো। আমাকে দেখে চোখ সরু করে বলল
– কি মনে করে এসেছো ?
– মানে?
– আমাদের সবার নাম ডুবিয়ে এখন বাসায় এসেছো?
বুঝলাম পেপার এতক্ষণে পড়া হয়ে গিয়েছে। আমি বললাম
– তুমি বুঝতে পারছো না বায়েজিদ। পুরো টাই একটা মিথ্যা খবর।
-তুমি ভিতরে এসে বস।
নিজের বাসায় কিরকম অতিথির মত বসলাম ।ভিতর থেকে মা চিৎকার করছে
– ওকে বাড়ি থেকে বের কর বায়েজিদ। আমি ওরে আর দেখতে চাই না।
– দেখেছো তোমার মা কি বলছে?
আমি বললাম
– মা কে আমি বুঝিয়ে বলবো
– উহু। তোমার মায়ের প্রেশার অনেক হাই হয়ে গিয়েছে। তোমাকে দেখলে তোমার মায়ের স্ট্রোক হতে পারে।
– কিন্তু আমার যেটা দোষ না।
– বুঝলাম পেপার মিথ্যা। কিন্তু রুমি নামে একটা ছেলের বাবা ফোন করেছে বলেছেন তুমি নাকি তার ছেলে কে নষ্ট করার জন্য দায়ী
– মানে? রুমির বাবা কিভাবে এই কথা বলে? আমি এখুনি ফোন দিচ্ছি রুমি কে।
– আচ্ছা দাও
আমি ফোন দিলাম। কিন্তু রুমি ফোন ধরছে না। বার বার ফোন দিচ্ছি । ধরছে না। বায়েজিদ বলল
– কি ফোন ধরলো না? তোমার এত ভাল বন্ধু
মা হটাত ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে আসলো । মায়ের এই রুদ্র মূর্তি আগে কক্ষনো দেখি নাই।
– সমকামী বাবার ছেলে আর কি হবে সমকামী হবে
আমি কথা শুনে থত মত খেয়ে গেলাম। মা কি বলছে এসব। বায়েজিদ যেয়ে মা কে ধরে নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে আসলো।
– দেখেছো তো তোমার মায়ের অবস্থা। আমি কোন ভাবেই মানাতে পারছি না। আমি বলি কি তুমি কিছুদিনের জন্য অন্য কোথাও থাকো। তোমার মা একটু শান্ত হলে আমি তোমাকে নিয়ে আসবো
– কিন্তু আমি কই যাবো ?
– এই যে টাকা দিচ্ছি রাখো। নিজের পথ নিজেই খুঁজে নাও।দরকার হলে হোটেলে থাকো। আর তোমার ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি। ব্যাগ নিয়ে যাও।
এক কথায় আমাকে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিল বায়েজিদ। এখন মামা মামী থাকলে মামাবাড়ি যাওয়া যেতো। কিন্তু তারা হজ্ব করতে গিয়েছেন। তাহলে কই যাবো ? রুমি কে আবার ফোন দিলাম। এইবার ফোন রিসিভ করলো
– হ্যালো রনক আমাকে মাফ করে দাও।
ফোন টা রুমির হাত থেকে কেউ কেঁড়ে নিলো মনে হল। রুমির বাবা কথা বলছেন
– শোন ইয়াং ম্যান। তোমার জন্য আমার ছেলে নষ্ট হয়েছে। সেই বাড়ি আসার পর থেকে শুধু তোমার নাম গাইছে সে।কাঁদছে আর পাগলামি করছে। তুমি আর ফোন দিবে না।ফোন দিলেও পাবে না অবশ্য। আজই আমি রুমি কে নিয়ে কানাডা তে ফ্লাই করবো ।
এগুলো কি বলছে। আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। মাথা কেমন ভারী ভারী লাগছে। ফোন রেখে দেয়া হয়েছে। আমি রুমি কে নষ্ট করেছি ? নাকি সে আমাকে নষ্ট করেছে।খুব রাগ উঠেছে। আমি আবার ফোন দিলাম। এইবার রুমি ধরেছে। ইচ্ছে মত যা মনে আসছে বলছি। গালি গালাজ করছি। রুমি কিচ্ছু বলল না। ফোন রাখার আগে বলল
– এটাই আসলে আমার প্রাপ্য। আমি জানি তুমি কোন দিনও জানবে না আসল ঘটনা। আমি তোমাকে এই বিপদে ফেলতে চাই নাই।কিন্তু আমার বোকামি আর পরিস্থিতি বাধ্য করেছে।
আমার আর কথা শুনতে ইচ্ছা করছে না ফোন রেখে দিলাম। যে ছেলে নিজেকে সেভ করার জন্য স্বার্থপরের মত কানাডা পালাচ্ছে তার আর যাই হোক কৈফিয়ত দেয়া চলে না। আমার চোখ ফেটে কান্না আসছে। কি করবো আমি।আমি বাড়ি তে কি আর কোন দিন ফিরতে পারবো। আর ওটা মায়ের বাড়ি হলে আমি বাড়ির নিচে বসে থাকতাম। কিন্তু ওটা বায়েজিদের বাড়ি। ওখান থেকে বায়েজিদ বের করে দিয়েছে আমাকে। আমি জানি সেই ঘটনার পর বায়েজিদ এটাই চাইতো আমি বাড়ি থেকে চলে যাই।সুযোগ পেয়েছে। মাকে বুঝানো খুব কঠিন কিছু ছিল না।কিন্তু বায়েজিদ সেটা করে নাই। আচ্ছা তখন মা কি বলল এটা। ব্যাপারটা তো আমি ভেবেই দেখি নাই। আমার বাবাউ সমকামী ।ও এটাই তাহলে ডিভোর্সের কারণ। এতদিন এই কথাই সযত্নে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল আমার কাছ থেকে? আচ্ছা তাহলে আমার বাবার কাছেই যাবো । কিন্তু তার ঠিকানা তো জানি না। মা জানে নিশ্চয়। মা কি আমার ফোন ধরবে? বায়েজিদ কে জিজ্ঞাসা করা যায়। কিন্তু এত ঘটনার পর বায়েজিদ কে আর ফোন দেয়া যায় না।
২৭
সন্ধ্যা সাত টা।আমি কমলাপুর স্টেশনে বসে আছি। কেন এখানে এসেছি তাও জানি না। কিন্তু মনে হচ্ছে ঢাকা থেকে চলে যাই। কিন্তু কই যাবো। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতাও এমন না যে ভাল কোন চাকুরী পাবো। ২ জন কে খুন করতে ইচ্ছা করছে। এক বায়েজিদ। দুই রুমি। ঠিক এই সময় একটা ফোন আসলো। মার ফোন ?
নাহ! সাইফ ফোন দিয়েছে। ধরতে ইচ্ছা করছে না। আবার ভাবলাম ধরি।
– হ্যালো
– হ্যালো
– কি খবর রনক ? তোমার ছবি দেখলাম পেপারে।
– তুমি এটা নিয়ে মশকরা করার জন্য ফোন দিয়েছো আমাকে?
– মোটেও না। আমি চিন্তিত হয়ে ফোন দিয়েছি।তুমি থানায় থাকতে পারো জেনেও ফোন দিয়েছি। তুমি থানা থেকে ছাড়া পেয়েছো ?
– হম
– থ্যাঙ্কস গড। কোথায় তুমি এখন?
– কমলাপুর স্টেশনে। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
– কি বল? রুমি কোথায় ?
– রুমি কানাডা চলে যাবে আজ রাতে।
– তুমি তাহলে কোথায় যাবা?
– জানি না। যাওয়ার জায়গা নাই। রাস্তাতেই থাকবো
সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল
– যতদিন ঝামেলা না মিটে তুমি আমার এখানে থাকতে পারো
আমি চুপ করে ভাবলাম। আসলেই তো কই যাবো ? সাইফ যখন বলছে তখন ওর ওখানেই যাওয়া যাক। আর সে তো একা থাকে। তার পরিবারের কারো কাছে কোন জবাবদিহি করতে হবে না।সাইফ আবার জিজ্ঞেস করলো
– কি আসবা?
– হ্যাঁ আসবো। আমি চিটাগাঙের টিকেট কাটছি। কাল সকালে পৌঁছে ফোন দিবো।
– ওকে । সেফলি আসো। বাই।
চিটাগাঙের টিকেট পেতে সমস্যা হল না। উঠে পরলাম ট্রেনে। যাচ্ছি চিটাগাং।

২৮
১৫ দিন হয়ে গেলো আমি সাইফের ওখানে আছি।মা একবারও ফোন দেয় নাই। আমিও দেই নাই।আমি বুঝে গিয়েছি বায়েজিদ আমাকে আর ফিরতে দিবে না বাসায়। ভাবছে আপদ বিদায় হয়েছে । ভালই হয়েছে।
সাইফের বাসা ঠিক চিটাগাং শহরে না। শহর থেকে একটু দূরে। পাকা বাড়ি। টিনের ছাদ। ১টা ঘর। বাথরুম ১টা আর রান্নাঘর আছে। বাথরুম এটাচড না।খুবই অগোছালো আর নোংরা ছিল ঘরটা। আমি আসার পর পরিস্কার করেছি। গুছিয়েছি। সাইফ দেখতে খুব পুরুষালী।একদম ফিট বডি ফিগার।৫ ফিট ৮ হবে হাইট। এলো মেলো চুল আর মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। তাতেই ওকে অনেক সুন্দর লাগে।ওর বিছানাটা অনেক বড় ।আমরা একই বিছানায় শুই। কিন্তু কেউ কাউকে স্পর্শ করি নাই। এই দিক থেকে সাইফ অনেক ভাল । কক্ষনোই জোর করে কিছু করার চেষ্টা করে নাই। বরং আমার ভিতরের মিস্টার হাইড টাই আজকাল জেগে উঠতে চায়। মাঝখানে আমাকে রেখে ৫ দিনের জন্য কই জানি যেতে হয়েছিল সাইফ কে। অবশ্য সে মোবাইলে সর্বক্ষণ যোগাযোগ রেখেছে। ওর ব্যবসাটাই নাকি এমন। মাঝে মাঝে বেশ কিছুদিনের জন্য যেতে হয়। আবার বাকিটা সময় বাসাতেই থাকে। কি আজব ব্যবসা ! বুঝি না। সাইফ এর সাথে থাকতে থাকতে সিরিয়াল আর কমেডি শো দেখার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে আমার। আজকাল করার কিছু থাকে না দেখে নিজেই রান্না করি। সাইফের সাথে জিমে যাই।
এলাকাটা পাহাড়ি। কেমন কেমন জঙ্গল জঙ্গল। মাঝখান থেকে রেলপথ চলে গিয়েছে। সেই রেললাইন ধরে আমি মাঝে মাঝে হেঁটে যাই একা একাই। তখন রুমির কথা খুব মনে পড়ে।খুব কান্না পায়। মায়ের কথা মনে পড়ে। মা কিভাবে আমাকে ছাড়া থাকতে পারছে। তার জীবনে এখন বায়েজিদ আর নিশুই সব।আমি কেউ না। আমি ঠিক করেছি আরও ১৫ দিন আমি দেখবো। এর মাঝে মা ফোন না দিলে এই সিম ফেলে দিবো। তখন মা ইচ্ছা করলেও আর খুঁজে পাবে না আমাকে। দরকার নাই আমার কাউকে জীবনে। আমি একা একাই থাকবো।
ঘুমিয়ে ছিলাম । টিভির শব্দে ঘুম ভাঙলো। উফফ সাইফ এত জোরে টিভি ছেড়ে দেখে যে আমার মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত লাগে।
– আরে বাবা কি দেখো এত জোরে টিভি ছেড়ে ?
– জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার।
– কি সব ফালতু জিনিস যে দেখো !
– আরে দেখো আমার প্রিয় অভিনেত্রী পুরস্কার পেলো মনে হয়
– কে তোমার প্রিয় অভিনেত্রী ?
– লীনা রহমান
কথাটা শুনে থকথাটা শুনে থতমত খেয়ে গেলাম। এতো অভিনেত্রী থাকতে মা , সাইফের প্রিয় অভিনেত্রী। আমি বিছানা থেকে উঠে টিভি এর দিকে তাকালামা। মা একটা সাদা জামদানী পরেছে। কপালে সাদা টিপ। আর রূপার লম্বা ঝুলানো ঝুমকা। খুব সুন্দর লাগছে। খুবই হাসি মুখে উঠে দাঁড়ালেন। পুরস্কার নিতে স্টেজে উঠছে। আমার চোখ টলমল করতে লাগলো। ছেলের কোন খবর নেই আর মা হাসিমুখে পুরস্কার নিতে স্টেজে উঠছে। আমার প্রতি কি তাহলে কোন ভালবাসাই আর অবশিষ্ট নাই মায়ের ? মা থেকেও না থাকার কষ্ট টা আমার থেকে বেশি কে বুঝবে? আমি আর দেখতে চাই না। রিমোট দিয়ে টিভি অফ করে দিলাম। সাইফ বলছে
– কি হল টিভি অফ করলে কেন?
– কারণ যিনি পুরস্কার নিতে স্টেজে উঠলেন হাসিমুখে তিনি আমার মা
– কি বল!
– হুম
– কক্ষনো তো বল নাই।
– বলতে হবে কেন? কেন লীনা রহমানের ছেলে বলে আমার দাম বেড়ে যেতো
– রাগ করছো কেন?
– আমি আর নিতে পারছি না এগুলো সাইফ।মা থেকেও নেই। বাবা কই আছে জানি না। বফ বেঈমানি করেছে। পড়াশোনা চাকুরী কিছু নেই। আর কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য কে জানে!
– আমি তো আছি।
সাইফ এত কোমল কণ্ঠে কথা বলছে। আমি বিস্ফোরিত চোখে তাকালাম সাইফের দিকে। সাইফ আমার মাথায় হাত বুলোচ্ছে । এটুকু মায়া মমতার জন্যি যেন অপেক্ষা করছিলাম। যত ক্ষোভ , অভিমান , কষ্ট কান্না হয়ে আমার চোখ থেকে দর দর করে পড়তে লাগলো। হটাত সাইফ আমাকে বুকে নিল। আমি সাইফের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে লাগলাম। লাগাম ছাড়া কান্না।এত দিনের জমানো কান্না। এক সময় কান্না থামালাম। আমার লজ্জা লাগতে লাগলো। কেমন বাচ্চা দের মত কেঁদেছি । সাইফের টিশার্ট ভিজে গিয়েছে চোখের পানিতে। আমি বোকার মত বললাম
– সরি।
– সরি কেন বলছো। তুমি আমাকে আপন ভেবেছো বলেই তো আমাকে সব বলেছো।
আমি চোখ মুছে বললাম
– হম । আচ্ছা সাইফ চল না একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। আমার কেমন দম বন্ধ লাগছে।
– কই যাবা?
– রেললাইন টা ধরে হেঁটে যাই কিছু দূর।
– আচ্ছা চল।
বের হয়ে দেখলাম আজকে পূর্ণিমা । চাঁদের আলোয় চারিদিক ঝলমল করছে। আমরা ২ জন রেল লাইন ধরে হাঁটছি। চারিদিক নির্জন। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আর জোনাকি পোকার আলো । রেল লাইনের ধারে এক জায়গায় একটু খালি জায়গা। বড় বড় পাথর। পাথরের উপরে বসলাম ২ জন।
সাইফ বলল
– জানো আজকে যখন তুমি কান্না করছিলা আমার ইচ্ছা করছিল তোমাকে অনেক আদর করে দেই।
– দিতে
– আচ্ছা অনেক দিন আগে তোমাকে একটা কথা বলেছিলাম তোমার মনে আছে?
– হুম থাকবে না মনে। তুমি কান্না করেছিলে অনেক। যেটা তোমার মত শক্ত ছেলে কে মানায় না।
– আচ্ছা আমি শক্ত বুঝলাম। তাই বলে কি আমার কোন মন নেই? আমি কি ভালবাসতে জানি না?
– না তা না।
– তাহলে?
– কিছু না
– আচ্ছা আজ যদি ওই কথাটা আবার বলি?
আমি চুপ করে রইলাম। কি বলবো। একবার একজন কে ভালবেসে ভুল করছি। আবার পুনরাবৃত্তি হবে না তো ? কিন্তু হ্যাঁ সাইফের প্রতি আমারও ভালবাসা জন্মেছে মনে হয়। মাঝখানে যে কয়দিন সে বাসায় ছিল না আমার কেমন অস্থির লাগছিল। মনে হচ্ছিল কখন ফিরবে সে। সাইফের পাশে যখন ঘুমাই তার গন্ধ আমার ভাল লাগে। আমার ভিতরের মিস্টার হাইডটা জেগে উঠে। আর আজকে যে মমতা নিয়ে সে আমাকে বুকে নিল! কি বলবো আমি। আমার নীরবতা দেখে সাইফ বলল
– বুঝেছি তোমার উত্তর না হবে। আমি বোকা দেখেই আবার বলেছি। আর কোন দিন বলবো না
সাইফের কণ্ঠে অভিমান স্পষ্ট। আমার কাছে মনে হতে লাগলো কোন একটা মূল্যবান জিনিস আমি হারাতে যাচ্ছি। আমার মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বের হয়ে আসলো
– আমি তোমাকে ভালবাসি। অনেক ভালবাসি।
২৯
আমাদের টোনাটুনির সংসার খুব ভালই চলছে। মাঝে মাঝে খুনসুটি ঝগড়া যে হয় না তা নয়। আর বিছানায় আজকাল আমার মিস্টার হাইড টা বেশি জেগে উঠেছে। কখনো আমরা রোমান্সের ভুবনে হারিয়ে যাই আবার কখনো বা ওয়াইল্ড সেক্স। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় চুম্বন। তার কমলার কোয়ার মত ঠোঁট ২ টা খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। আজকাল প্রায়ই বাইরে বের হই। পুরো চিটাগং শহর টই টই করে ঘুরি। পতেঙ্গার সমুদ্রে পাথরের উপরে বসে প্রায়ই আমরা সূর্যাস্ত দেখি।অভয়মিত্রের ঘাঁটে ফুচকা খাই। আবার কখনো ক্যান্ডল লাইট ডিনার।আলমাসে সিনেমাউ দেখেছি। সাইফ আমাকে আবার পড়াশোনা শুরু করতে বলছে। সামনেই মেডিক্যাল এক্সাম। কিন্তু আমার পড়তে ইচ্ছা করে না। তারপরও ভাবছি শুরু করবো।
মাঝখানে আবার সে ব্যবসার কাজে ৫ দিনের জন্য উধাও হয়ে গেলো। কি এমন ব্যবসা বুঝি না। সে এক্সপোর্ট ইমপোর্টের ব্যবসা। কিন্তু আমার কেমন অবাক লাগে। আর আমার সাথে মিথ্যাই বা কেন বলবে।
আজকাল মায়ের কথা মনে পরলে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু এটা ভেবে সান্ত্বনা দেই আমার জীবনে তো আরেকজন ভাল মানুষ এসেছে। আমি আমার সিম টা ফেলে দিয়েছি। আমার মা কোন দিন আর নাগাল পাবে না। সেটাই ভাল।মা তো কক্ষনোই আমার আইডেনটি্টি মেনে নিবে না। সাইফ কে মেনে নিবে না। বাবার কথাও ভাবি। আমাকে বাবার কি মনে পড়ে ? যদি সে সমকামী হয়ে থাকে তাহলে কেন সে বিয়ে করেছিল? আমাকে জন্ম দিয়েছিল? আমার খুব ইচ্ছা একবার অন্তত বাবার সামনে দাঁড়ানো আর তাকে জিজ্ঞেস করা এই প্রশ্ন গুলো।
আজকে ফিরবে সাইফ। আমার খুব খুশি লাগছে। এই কয়দিন খুব একা একা লেগেছে। যদিও সাইফ ফোনে সারাক্ষণ যোগাযোগ রাখে। আশেপাশের ২-১ টা বাড়ির মানুষের সাথেও পরিচয় হয়েছে।তাদের সবাইকে আমি বলি আমি সাইফের কাজিন। কিন্তু সাইফের সাথে কারো তেমন বন্ধুত্ব নেই। সেও এক অদ্ভুত ব্যাপার। কিন্তু আমার সাথে সবারই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে যাচ্ছে। আমি আজকে কি রাঁধবো ভাবছি। আমি ছোট বেলায় মায়ের কাছে রান্না শিখে বেশ পাকা রাঁধুনি হয়ে গিয়েছি।অনেকক্ষণ চিন্তা করে চিকেন বিরিয়ানি রাঁধবো ঠিক করলাম। সকল উপাদানই আছে। সন্ধ্যা হয়ে যাবে সাইফের ফিরতে ফিরতে। রান্না বান্না শেষে টিভি দেখছি। এইচ বি ও। সাইফ থাকলে তো ইংলিশ ফিল্ম দেখাই যায় না। সে হিন্দি আর বাংলা দেখবে।সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। কখন ফিরবে সাইফ। ভাল লাগছে না। ৫ দিন হয়ে গেলো ওকে দেখি না। ঠিক এই সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। দরজা খুলতেই দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে। মুখ ভর্তি দাড়ি। এই কয় দিন শেভ করে নাই বুঝা যাচ্ছে। আমাকে দেখে হাসলও। ওর এই হাসি দেখলে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। এত সুন্দর করে মানুষ হাসে কিভাবে?দরজা বন্ধ করে আমাকে জড়িয়ে ধরলও সাইফ। গায়ে ঘামের গন্ধ। কিন্তু তাও ভাল লাগছে। আমি ওকে এত ভালবাসি কেন? সাইফ গোসল করতে ঢুকলও।আমি ব্যাগ থেকে নোংরা কাপড় গুলো আলাদা করছি। এত অগোছালো ছেলে টা।কাপড় গুলো আলাদা করে এসে মানিব্যাগ টা টেবিলের উপর রাখলাম। টেবিলের ড্রয়ার টা সব সময় তালাবন্ধ থাকে। আজকে দেখলাম খোলা। আমার খুব কৌতূহল হল কি আছে এর ভিতরে যে সব সময় তালা দিয়ে রাখে। খুললাম। খুলতেই ভয় পেয়ে গেলাম। এই জিনিস আগেও দেখেছি। বায়েজিদের কাছে ছিল। একটা রিভলবার। আর ঠিক সেই সময় ঘরে ঢুকলো সাইফ।
৩০
আমি , সাইফের সামনে বসে আছি। সাইফ খুব গম্ভীর।আমিও। এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। পুরো আলোচনাই রিভলবারটা নিয়ে। হটাত করে হাল ছাড়ার ভঙ্গী তে কথা শুরু করলো সাইফ।
– আমি কক্ষনো তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই নাই। কিন্তু এখন মনে হয় বলতে হবে।
– বল
– আমি অন্ধকার জগতের মানুষ
– মানে?
– এই রিভলবার টা একটা অবৈধ অস্ত্র। আমার কোন লাইসেন্স নাই।
– কিন্তু কেন?
– ঐ যে বললাম অন্ধকার জগতের বাসিন্দা।
– হেঁয়ালি না করে খুলে বল
– আমি কোন ব্যবসা করি না
– মানে?
– মানে হল খুব সোজা আমি আন্ডার ওয়ার্ল্ডের মানুষ।আমি মানব পাচারের সাথে জড়িত
আমি এই কথা টা শোনার পর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। আমি একটা বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছি। তাই কথা আসছে না মুখ থেকে।সাইফ বলছে
– আমি জানতাম এই কথাটা শোনার পর তুমি আমার সাথে আর থাকতে চাইবে না। তাই তোমাকে এই কথাটা কক্ষনো বলি নাই।
– বলা উচিৎ ছিল
– তুমি কি এখন আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?
– না । কিন্তু তোমার এই অন্ধকার জগত ছেড়ে চলে আসতে হবে
– চাইলেই কি আসা যাবে?
– কেন নয়? দরকার হলে আমরা জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিবো। আমি যেই চাকুরী পাই তাই ই করবো
– টাকা টা ফ্যাক্ট না
– তাহলে কোন টা ফ্যাক্ট?
– আমি এই জগত ছাড়া মানে আমার মৃত্যু। আমি এই অন্ধকার জগত থেকে আর কোন দিনও ফিরে আসতে পারবো না। ওরা আমাকে বাঁচতে দিবে না তাহলে।
– কারা?
– যাদের আন্ডারে আমি কাজ করি। আমাদের বস।
– চল কোথাও পালিয়ে যাই। এমন কোন জায়গায় ওরা খুঁজে পাবে না।
– সম্ভব না।ঠিক খুঁজে বের করবে
– তাহলে?
– তুমি বরং আমাকে ছেড়ে চলে যাও।
– এই কথা তুমি বলতে পারলে?
– আমার অন্ধকার জগতের সাথে তোমাকে জড়াতে চাই না।
– না আমি কোথাও যাবো না।
সেদিন আর কোন কথা হল না। নিঃশব্দে আমরা খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়লাম।
রাতে বিছানায় আমার এক ফোঁটা ঘুম হল না। আমার খালি মনে হচ্ছে আমি এত কিছু জেনেও কেন ওরে ছেড়ে যাচ্ছি না? আমার যাওয়ার জায়গা নেই তাই? নাকি তাকে আমি ভালবাসি? মনের মাঝে কঠিন যুদ্ধ চলছে। নাহ তাকে আমি ভালবাসি। আমি দ্বিধা দন্দ ছেড়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। দেখলাম সে ঘুমায় নাই। বিছানায় ঝড় উঠলো………..

৩১
রনকের বাবার কথা
রনকের বাবা জাকির হোসেন বড় হয়েছেন এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার ছিল অনেক গুলো ভাই বোন। তাই জাকির সাহেব এর প্রতি আলাদা কোন মনোযোগ দিতে পারেন নাই তার বাবা মা। কিন্তু তিনি ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। নিজের চেষ্টাতেই এসএসসি, এইচএসসি তে ভাল রেজাল্ট করেন। ভর্তি হন ঢাকা ইউনিভারসিটি তে। পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। উঠে পরেন মহসিন হলে।তল্পিতল্পা গুছিয়ে চলে আসেন হলে। তার রুমে আরেকজন উঠবে। তার সাথে তখনো দেখা হয় নাই।তিনি ভয়ে ভয়ে আছেন। কেমন হবে রুমমেট। কারণ রুমমেট ভাল না হলে ৪ বছর কিভাবে কাটাবেন। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। রুমমেট এসে উপস্থিত হল। জাকিরের মনে হল এত রূপবান ছেলে আগে দেখেন নাই তিনি।সেই সাথে অসম্ভব স্টাইলিশ। হাল ফ্যাশনের বেলবটম প্যান্ট পরা।লম্বা কলারের শার্ট। বলে নেয়া ভাল জাকির সমকামী।তার রুমমেটের নাম জামান। কিছুদিন একসাথে থাকতেই বুঝলেন জামান বেশ বড়লোক পরিবার থেকে এসেছে। তার পরিবার থাকে চিটাগাং এ। জামানের সাথে জাকিরের বন্ধুত্ব আস্তে আস্তে দৃঢ় হতে লাগলো। ২ জনে একসাথে ঘুরাঘুরি করে। বলাকা হলে সিনেমা দেখে, মরনচাঁদের দোকানের মিষ্টি খেতে যায় , কখনোবা নিউমার্কেটে ঘুরে বেড়ায়।তাদের কে সবাই মানিকজোড় ডাকা শুরু করলো। জাকিরের সাথে জামানের কত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কবিতা, উপন্যাস, সিনেমা , রাজনীতি সব। কিন্তু জাকির একটা বিষয় খেয়াল করলো জামান কক্ষনো মেয়েদের নিয়ে কোন কথা বলে না। এমনকি প্রসঙ্গই তুলে না। বরং কোন অভিনেতা দেখতে সুন্দর, কোন গায়ক স্টাইলিশ এইসব প্রসঙ্গ চলে আসে তাদের মাঝে। জাকিরের সন্দেহ হতে লাগলো জামান তার মত সমকামী নয় তো ?
এদিকে জাকির ইতিমধ্যে জামানের প্রেমে পরে গিয়েছে। আসলে জামানেরও ততদিনে জাকিরের প্রতি দুর্বলতা জন্মে গিয়েছে। কিন্তু কেউ নিশ্চিত না যে অন্যজন তারই মত সমকামী। কিন্তু ২ জনেরই সন্দেহ জন্মেছে। হটাত একদিন জাকিরের বিছানার একটা পায়া ভেঙ্গে গেলো। এই বিছানায় ঘুমানোটা ঝুঁকি হয়ে যায়। জাকির মেঝে তে বিছানা করছে। এই সময় জামান বলল
– তুমি আমার বিছানায় ঘুমাতে পারো
– তুমি কোথায় ঘুমাবে?
– আমার বিছানা বেশ বড়। ২ জন অনায়াসে ঘুমানো যাবে।
– তুমি শিউর?
– আরে হ্যাঁ ।
সেদিন রাতে তারা এক বিছানায় ঘুমালো। আর এতদিনের অপেক্ষা ভালবাসা হয়ে ঝড়ে পড়লো।এত দিনের ধৈর্য , কামনার সমাপ্তি ঘটলো।বিছানায় ঝড় উঠলো । কে প্রথম শুরু করেছিল তা বলা মুশকিল। কিন্তু ২জনেই প্রেম ভালবাসার পরীক্ষায় ভালভাবেই উত্তীর্ণ হল। ২ জন ২ জন কে গভীর ভাবে ভালবাসলো।সেদিন থেকে তাদের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হল। তাদের সম্পর্কের মোড় ঘুরে গেলো। বন্ধুত্ব থেকে ভালবাসায় রূপ নিল তাদের সম্পর্ক।
কিন্তু বেশিদিন আর সুখ থাকলো না। নিয়তি মনে হয় তাদের এক হতে দিবে না।জামানের বাবা প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়লো। জামান কে ডেকে পাঠালেন চিটাগং এ। জামানের বাবা মারা গেলেন তার এক সপ্তাহ পরেই।জামানের পড়া লেখার এখানেই সমাপ্তি। বাবার ব্যবসার দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়লো। জামানের বাবা আব্দুল কাদেরের কোন ব্যবসাই তেমন বৈধ ছিল না। ছিল পতিতালয় আর মাদকদ্রব্যের ব্যবসা। আর সামনে সামনে ছিল কাঠের আসবাবপত্রের ব্যবসা।সবাই তাকে কাঠের ব্যবসায়ী হিসেবেই জানে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অন্য অবস্থা।
এদিকে জাকির জামানের অনুপস্থিতিতে বিরহ যন্ত্রনায় ভুগতে লাগলো। কোন খবরও পাচ্ছে না। কি হল। কেন আসছে না জামান? আর কি আসবে না? জাকির কে কি জামান ভুলে গেলো ?
জামানের নিজের মনেও শান্তি নেই। জাকির কে একটা চিঠি পাঠালো জামান। এদিকে বাড়ি থেকে জামানের বিয়ে দিতে চাইছে। মেয়েও ঠিক। জামানেরই দূরসম্পর্কের আত্মীয়া। জামান বিয়ে তে মত দিল না। কিন্তু জামানের মা আমেনা বেঁকে বসলো। এখানেই জামান কে বিয়ে করতে হবে। তিনি কথা দিয়ে দিয়েছেন। অন্যথা হলে তিনি গলায় ফাঁস নিবেন।
চিঠি জাকির যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলও। কিন্তু জামান আর পড়াশোনা করবে না। তাদের একসাথে থাকা হবে না ব্যাপারটা তাকে অসম্ভব যন্ত্রণা দিতে লাগলো ।
এদিকে মায়ের চাপে পরে বিয়েতে মত দিল জামান। আমেনা মঞ্জিলে বাজলো বিয়ের সানাই। পুরো আমেনা মঞ্জিল কে সাজানো হল নতুন করে।রাতের বেলা মরিচ বাতির আলোয় ঝলমল করতে লাগলো আমেনা মঞ্জিল।
এদিকে জাকির ঠিক করলো হটাত করে চিটাগাং যেয়ে জামান কে চমকে দিবে।যা ভাবা তাই করলো সে। রাতের বেলা চিটাগাঙের ট্রেনে উঠে বসলো …
যখন চিটাগাং পৌঁছে গেল তখনো সকাল হয় নাই। একটা বেবি ট্যাক্সি নিয়ে জাকির নামলো আমেনা মঞ্জিলের সামনে। সারা বাড়ি আলোয় ঝলমল। মূল সদর দরজায় বড় একটা গেট বানানো হয়েছে। কারো বিয়ে এই বাড়িতে বুঝাই যাচ্ছে।
কলিংবেল টিপলো। এত ভোরে কে এসেছে তা দেখতে জামান নিজেই নিচে নামলো। সদর দরজা খুলতেই সে বড় একটা ধাক্কা খেলো। জাকির যে এসে উপস্থিত হবে তা সে ভাবতেই পারে নাই। আর সে তো বিয়ের কথা জাকির কে জানায়ও নাই।
জাকির ভিতরে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলো
– আমি আসায় তুমি খুশি হও নাই
জাকির জামানের চোখের দিকে তাকায় ঠিকই বুঝতে পেরেছে কিছু একটা সমস্যা আছে। জামান বলল
– খুশি হব না কেন? ভিতরে এসে বস তো।
আমেনা বেগম ফজরের নামাজ পড়ছিলেন। নামাজ শেষে তিনিও নিচে নামলেন। বসার কক্ষে জামানের বয়সী একটা ছেলে বসে আছে। আমেনা বেগম জামানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন
– কে এসেছে জামান?
– মা আমার এক বন্ধু এসেছে ঢাকা থেকে
জাকির এসে পা ছুঁয়ে সালাম করলো।আমেনা বেগম বেশ খুশি হলেন। ভালই হয়েছে জামানের তো তেমন বন্ধু নেই। বিয়ে তে দুই – তিন জন বন্ধু থাকা ভাল ।নাহলে বিয়েতে ফুর্তি হয় না। আমেনা বেগম বেশ খুশি কণ্ঠে বল্লেন
– থাক থাক বাবা সালাম করা লাগবে না। তুমি আসাতেই ভাল হয়েছে। জামানের বিয়ে তে তুমি আমাদের কে অনেক সাহায্য করতে পারবে।
– জামানের বিয়ে?
– কেন জামান বলে নাই?
জাকিরের মনে হল কেউ যেন তার কানে শীশা ঢেলে দিল।জামান তো বলে নাই। জামান এভাবে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো । কিন্তু মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলল
– না না খালাম্মা জানবো না কেন? আমি তো এইজন্যই এসেছি।
জামান কে আমেনা বেগম বললেন
– ছেলেটা কে গেস্ট রুম টা দেখিয়ে দেয়। এত দূর থেকে এসেছে। একটু বিশ্রাম নেক।
জাকির , জামানের পিছন পিছন আসছে। তার চোখ ফেটে কান্না আসছে। অতি কষ্টে কান্না চেপে রেখেছে। বুকে মনে হচ্ছে কেউ ভারী কোন পাথর বসিয়ে দিয়েছে।
গেস্ট রুমে ঢুকেই জামান দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিল।জাকির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো
– দরজা বন্ধ করলে কেন?
– তোমাকে কিছু কথা বলা দরকার।
– তোমার সাথে তো আমার আর কোন কথা থাকতে পারে না। তাই না?
– তুমি রাগ করছো
– না আমার তো খুশি হওয়ার কথা।
– আমি বিয়েতে বাধ্য হয়ে মত দিয়েছি।
– ভাল
– সব খুলে বলবো। কিন্তু এখন না। আজ সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবার নাম করে সেখানে সব খুলে বলবো।এখন তুমি রেস্ট নাও।
এদিকে আমেনা বেগম ডাকছেন
– জামান কই গেলি বাবা।
জামান দরজা খুলে বলল
– মা আসছি।
৩২
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বসে আছে জাকির এবং জামান। এই প্রথম সমুদ্র দেখলো জাকির। কিন্তু তারপরও সমুদ্রের বিশালতা তাকে মুগ্ধ করছে না। তার মাথায় শুধু জামানের বিয়ের কথা ঘুরছে। জামান বিশ্বাসঘাতকতা করলো। কিন্তু জামান এই কথাও অবশ্য কক্ষনো বলে নাই যে সে কক্ষনো বিয়ে করবে না। জামান লেকচার দেয়ার ভঙ্গিতে কথা বলা শুরু করলো।
– দেখো জাকির আমাদের সম্পর্ক সমাজ সংসার কোন দিনও মেনে নিবে না। আজ আমি বিয়ে করেছি। কাল তোমাকেও বিয়ে করতে হবে। কিন্তু তাই বলে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছে তাতো নয়। বিয়ে হবে, সংসার হবে। কিন্তু তোমার আমার সম্পর্ক থাকবে। বাইরে বাইরে আমরা বন্ধু কিন্তু শুধু তুমি আর আমি জানবো যে আমরা একে অপর কে ভালবাসি। অনেকটা আমার ব্যবসার মত।
– তোমার ব্যবসার মত মানে ?
– সামনে সামনে আমার ব্যবসা কাঠের আসবাবপত্রের ।কিন্তু আসল ব্যবসা মাদক প্রাচার আর পতিতালয়।
– কি বল!
– আমিও জানতাম না। বাবার মৃত্যুর পর সব জানলাম। প্রথমে সব ছেড়েছুড়ে পালিয়ে আসতে চেয়েছিলেম। কিন্তু কয়েকদিন ভেবে দেখলাম টাকা ছাড়া এই দুনিয়া অচল। আর বৈধ উপায়ে কক্ষনো আমি সেই পরিমাণ টাকা উপার্জন করতে পারবো না। ও হ্যাঁ তোমার জন্য একটা প্রস্তাব আছে। তুমি কি আমার ব্যবসায়িক পার্টনার হবা?
– কি বলছো । মাথা ঠিক আছে?
– একদম সুস্থ মস্তিষ্কে বলছি। তোমার মত মেধাবী কেউ আমার পার্টনার হলে আমি নিশ্চিত আমরা অনেক এগিয়ে যাবো। আমার লক্ষ্য দেশের এক নম্বর বিজনেজ ম্যাগ্নেট হওয়া।এখুনি তোমাকে কিছু বলতে হবে না। তুমি ভেবে উত্তর দিও।
এরপর আর তাদের মধ্যে তেমন কোন কথা হল না। সূর্যাস্ত হচ্ছে। পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে গিয়েছে। এই সুন্দর দৃশ্য কিন্তু জাকির কে স্পর্শ করলো না। তার মাথায় চলছে তখন ঝড়।
৩৩
সারা রাত জাকির ঘুমাতে পারলো না। এপাশ ওপাশ করলো বিছানায়। ভাবছে আসলেই তো তাদের সম্পর্ক কক্ষনো সমাজ মেনে নিবে না। বরং তারা সমাজ থেকে এক ঘরে হয়ে যাবে। বিয়ে করতেই হবে। বরং এটাই ভাল তাদের সম্পর্ক টা আড়ালে থাকুক। কিন্তু পরের প্রস্তাবটা? মাদকের ব্যবসা? সে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। অভাব কি সে জানে। অভাবের মাঝেই বড় হয়েছে সে। সে জানের দুনিয়া আসলেই টাকার উপর চলে। তারও স্বপ্ন অনেক টাকা রোজগার করা। এখন যে প্রস্তাব সে পেয়েছে এর থেকে ভাল প্রস্তাব আর হতে পারে না। কারণ পাশ করে সে আর কয় টাকা বেতনের চাকুরী পাবে? সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। অনেক বড় সিদ্ধান্ত।
পরেরদিন সে তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল জামান কে। তারা ২ জন মিলে একদিন এই দেশের বিজনেজ ম্যাগ্নেটে পরিণত হবে।
জামানের বিয়ে খুব জাঁকজমকের সাথে করা হল। জাকির থাকলো পুরো অনুষ্ঠানে। সেও অনেক ফুর্তি করলো। সে তো জানেই জামান যতই বিয়ে করুক তারই থেকে যাচ্ছে।
কিছু দিনের মাঝে জাকিরের গ্রাজুয়েশন হয়ে গেলো। এরপর জাকির সোজা চিটাগাং এসে বাসা নিল একটা। বিয়ে করলো লীনা কে। ২ জনেরই সন্তান হল একই সময়ে। জামানের স্ত্রী অন্তরা জন্ম দিল অনিক কে আর জাকিরের স্ত্রী লীনা জন্ম দিল রনক কে। সবই ঠিক মত চলছিল। বাইরে জাকির আর জামান বন্ধু আর বিজনেজ পার্টনার কিন্তু ভিতরে তাদের ভালবাসা ঠিকই অক্ষত রয়েছে।কিন্তু হটাত অন্তরা আত্মহত্যা করলো। কারণ জানা যায় নাই। এরপর জামান আর বিয়ে করে নাই। অনিক কে নিজের হাতেই মানুষ করার সিদ্ধান্ত নিল। লীনা বুদ্ধিমতী মেয়ে । জাকির আর জামান যতই লুকিয়ে রাখলও তাদের অবৈধ সম্পর্ক লীনা সন্দেহ করতে লাগলো। এত ঘন ঘন কেন জামানের সাথে চিটাগাঙের বাইরে, দেশের বাইরে যেতে হবে। এগুলো নিয়ে অশান্তি চলতে লাগলো জাকির এর সংসারে। এবং লীনা ধারণা পাকাপোক্ত হল এক সময়। সে না জানিয়ে জাকিরের অফিসে উপস্থিত হল। এবং যা হবার তাই ।জামান এবং জাকির কে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে ফেললো। তারপর ঘটলো সেই ঘটনা। লীনা রনক কে নিয়ে ঢাকা চলে আসলো । তারপরের ঘটনা তো আপানাদের জানা ই।
এই ঘটনা ১০ বছর আগের। এরপর নদীর জল অনেক গড়িয়ে গিয়েছে। জামানের ক্যান্সারে মৃত্যু হল। সমগ্র চিটাগাঙের মাদক ব্যবসার এক চোটিয়া আধিপত্য দখল করলো জাকির। হয়ে উঠলো গডফাদার। বাইরে দিয়ে চিটাগাঙের বিজনেজ ম্যাগ্নেট। মানব পাচারের সাথেও জড়িত হল জাকির। আর তারই আন্ডারে কাজ করে সাইফ।
জাকিরের জীবন নিঃসঙ্গতায় পরিপূর্ণ। ব্যবসা , টাকা পয়সা এগুলোর উপর আগ্রহ তার চলে গিয়েছে। জামানের মৃত্যু তাকে ভীষণ ভাবে কষ্ট দিয়েছে। এখন সে জামানের ছেলে অনিক কে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে। নিজের ছেলের খোঁজ সে রাখে। সে জানে লীনার কাছে রনক ভাল থাকবে। সে চায় না রনক কে এই অন্ধকার জগতের সাথে সম্পৃক্ত করতে। তাই সে কখনো রনক কে নিজের কাছে এনে রাখতে চায় নাই।
কিন্তু লীনা যখন বিয়ে করলো বায়েজিদ কে তখন থেকে জাকির সাহেব ভয় পেতে লাগলেন তার ছেলে ঠিক মত মানুষ হবে তো। তিনি আরও বেশি খোঁজ লাগালেন ছেলে রনকের উপর। কিন্তু জানলেন বায়েজিদের সাথে রনকের ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তাহলে কি রনক বায়েজিদকে বাবা হিসেবে মেনে নিয়েছে? তিনি কেমন যেন কষ্ট আর জেলাস অনুভব করলেন। কিন্তু পরে তিনি ভাবলেন এটাই ভাল হয়েছে রনকের বাবার অভাব বুঝতে হচ্ছে না। এখানেই হল ভুল। রনকের খোঁজ আগের মত আর নিতে থাকলেন না। ভাবলেন থাকুক ওরা তাদের মত। তিনি বরং অনিক কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মৃত্যু শয্যায় জামান কে কথা দিয়েছিলেন অনিক কে মানুষ করবেন। কিন্তু অনিক কি মানুষ হল? তার ভিতর জন্ম নিয়েছে এক অমানুষ। সেও জাকির সাহেবের ব্যবসায় যোগ দিয়ে অন্ধকার জগতে পা রাখলো। এই হল রনকের বাবা জাকির সাহেবের কথা।
৩৪
জাকির সাহেব খুব সাবধানী মানুষ। তিনি তার আন্ডারে যারা কাজ করে তাদের ভাল মন্দ যেমন দেখেন তেমনি তার সাথে কেউ বেঈমানি করলে তাকে চরম শাস্তি দেন। সব কর্মচারী দের উপর তার তিন নম্বর চোখ রয়েছে। আর তার এই তিন নম্বর চোখ হল অনিক। অনিকের একটা ছোট বাহিনী রয়েছে যারা সকল কর্মচারীদের উপর স্পাইং করে।
আজকাল জাকির সাহেবের কানে সাইফের ব্যাপারে নানা কথা আসছে। কাজে আসলে সাইফ নাকি প্রায় সারাক্ষণ কার সাথে ফোনে কথা বলে।তিনি ভাবলেন ব্যাপারটা খোঁজ নিতে হবে। প্রেমিকা হলে সমস্যা নেই। ডেকে বিয়ে পড়িয়ে দিবেন। কিন্তু অন্যকিছু হলে …। খবরটা নেয়া দরকার। তক্ষুনি অনিক কে বললেন সাইফের উপর নজরদারির ব্যবস্থা করতে।
অনিক পরের দিনই খবর নিয়ে আসলো জাকির সাহেবের কাছে। অনিক জাকির কে পাপা ডাকে। অনিক বলছে
– পাপা কি বলবো লজ্জার কথা। আমি তোমার সামনে বলতে পারবো না। কিন্তু সে যে করছে সেটাও সহ্য করা যায় না!
– কেন কি হয়েছে?
– আমি বলতে পারবো না। মনির কে ডাকছি সে সব খুলে বলবে।
– আচ্ছা ডাক
মনির অনিকের প্রধান সাগরেদ। সে এসেও মাথা নিচু করে ফিক ফিক করে হাসছে। জাকির সাহেব গেলেন রেগে
– এখানে কি সার্কাস হয়েছে? কি হয়েছে খুলে বল। না বলতে পারলে বিদায় হো।
জাকির সাহেবের রাগ দেখে মনির হাসি বন্ধ করলো। মনির বলল
– স্যার সাইফ বড় পাপ করছে। এ সহ্য করা যায় না।
– কি পাপ করছে সেটা খুলে বল
– সমকাম করছে।
জাকির সাহেবের বুকে এসে ধাক্কা লাগলো। এত বছর পর এই বিষয় টা তার সামনে আবার আসছে। সেই যে জামান মারা গেল তারপর আর এগুলো নিয়ে আর ভাবতেন না।কত বছর কেটে গেল। অনিক কে মানুষ করতে চেয়েছেন। কিন্তু সেটাও বাপের ব্যবসায় নামবে। কত লেখা পড়া করানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেটাও হয় নাই। শেষ পর্যন্ত বাপের ব্যবসাতেই নামলো ।জাকির সাহেব জিজ্ঞেস করলেন
– তুই জানলি কেমন করে?
– আমরা খোঁজ নিয়েছি ঢাকা থেকে একটা অচেনা ছেলে কে নিয়ে এসেছে সে। বলছে কাজিন। কিন্তু আমরা জানি সাইফের দুই কূলে কেউ নাই। এক মা ছিল তাও মারা গেছে।কাজিন আসবে কোথা থেকে।
– ছেলেটা কে খোঁজ নিয়েছিস
– জি স্যার
– নায়িকা লীনা রহমানের ছেলে। নাম রনক।
জাকির সাহেবের মনে হচ্ছে কথা টা কি তিনি ঠিক শুনেছেন? তার ছেলে রনক সমকামী এবং তাও রয়েছে সাইফের মত চালচুলো হীন ছেলের সাথে। জাকির সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন
– মনির ঠিক মত বল ।কথা কি সত্য
অনিক মাঝখান থেকে বলে উঠলো
– একদম ১০০ ভাগ সত্য পাপা। আমি খোঁজ নিয়েছি।ছেলেটার ছবিও আছে আমার কাছে। পেপারে উঠেছে। সমকামিতা করতে গিয়ে পুলিশের কাছে ধরা পড়েছিল। পরে ছাড়া পেয়ে বাসায় গেলে লীনা রহমান বাসা থেকে বের করে দিয়েছে তাকে। তারপর সাইফের সাথে কিভাবে জানি যোগাযোগ।পাপা দলের সবাই খুব অসন্তুষ্ট। সবার এক কথা সমকামী কাউকে দলে তারা দেখতে চায় না। পাপা তুমি এখন একটা সিদ্ধান্ত নাও। বল তুলে নিয়ে আসি সাইফ কে। তারপর বিচার কর।
– দলের সবাই জানলো কিভাবে?
এইবার অনিক আর মনির মাথা নিচু করে রয়েছে
– তোরা একটা কথা পেটে রাখতে পারিস না। আমি যখন থাকবো না তখন দল চালাবি কিভাবে। দূর হো আমার চোখের সামনে থেকে।
অনিক আর মনির ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। এরপর মনির সাহেব পেপার টা আবার ভাল করে দেখলেন। আসলেই তো রনক। এখন তিনি কি করবেন? গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন জাকির সাহেব।

৩৫
আমার মনে হচ্ছে কোন কল্পনার রাজ্যতে চলে এসেছি। কক্সেসবাজার থেকে বেশ দূরে মায়াছড়ি তে একটা পুরানা কাঠের দোতালা বাংলো আমার আর সাইফের নতুন ঠিকানা। চারপাশে সবুজ পাহাড় আর অরণ্য । একটু দূরেই সমুদ্র। কাছের টিলাটায় উঠলেই সমুদ্র দেখা যায়।দূরে একটা ঝর্ণা রয়েছে। আমাদের বাংলোটার চারপাশে অসংখ্য গাছ।নাম না জানা কত পাখি। আর আমি কোন গাছও চিনি না। সাইফ আমাকে নিয়ে বের হলে চিনিয়ে দেয় কোন টা কোন গাছ। আমি ঠিক করেছি সব গাছের পাতা যোগাড় করে একটা স্কস্টেপ দিয়ে লাগিয়ে নিচে লিখে রাখবো কোনটা কোন গাছের পাতা। আমাদের বাড়িটায় আমরা ছাড়াও আছি একজন বুড়ো কেয়ারটেকার। তার নাম আবুল মিয়াঁ। আমরা তাকে ডাকি আবুল চাচা বলে। আর রয়েছে খাদিজার মা। আমরা ডাকি খালা বলে। তিনি রান্না করেন। বাংলোর চারিদিকে বাগান করার দায়িত্ব আমার। আমি এখুনি অনেক ফুল গাছ লাগিয়েছি। গোলাপ , হাস্নাহেনা, ডালিয়া, গন্ধরাজ গাছ। বাগানে কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বসার জায়গা করেছি। বাংলো টা বেশ বড়। নিচে তিনটা শোবার ঘর। উপরে তিনটা শোবার ঘর।বাংলোয় বিদ্যুৎ আছে। আর বাথরুম গুলো শ্বেত পাথরের।
আমরা এটাকে রেস্টহাউজ হিসেবে চালানোর চিন্তা করেছি। এদিকে অনেক টুরিস্ট আসে। তাদের অনেকেই থাকার জায়গা খুঁজে। তাদের জন্য রেস্টহাউজ করবো।ছোট একটা পুরানা জিপ গাড়ি আছে। দরকার লাগলে আমরা এই গাড়ি করে কক্সেসবাজার শহরে চলে যাই। আমার মনে হচ্ছে আমার জীবন টা স্বপ্নের চেয়ে সুন্দর হচ্ছে।
৩৬
হটাত আমাদের জীবনে এই পরিবর্তন কিভাবে আসলো তা বলি। এক রাতে আমি আর সাইফ বসে টিভি দেখছি। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ। এত রাতে কে আসলো ? আমি দরজা খুললাম। দেখলাম ৩ জন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। একজন চেহারা কেন জানি আমার খুব পরিচিত লাগছিল। তার হেজেল চোখ খানা মনে হচ্ছিলো আমি আগেও দেখেছি। ছেলেটাও মনে হল আমাকে কেমন অবাক হয়ে দেখছিল। বিশেষ করে আমার ঠোঁটের নিচের কালো তিলটা। কেউ একবার আমাকে দেখে থাকলে অবশ্যই আমার তিলটার কথা মনে রাখবে।
পিছন দিক থেকে সাইফ এসে দাঁড়ালো। ছেলে টা খুব রুড় ভাবে সাইফ কে বলল
– সাইফ চল বস ডেকেছে।
এত রাতে সাইফের বস কেন সাইফ কে কেন ডাকছে!তিন জনের চোখে মুখে কেমন ঘৃণা আর ক্রোধের ছাপ। আমার কেমন জানি ভয় লাগছে। কি হল এমন যে এত রাতেই যেতে হবে। আর এই তিন যুবকের চোখে মুখে কেন এমন ক্রোধের ছাপ। কোন কারণে বস কি সাইফ এর উপর রাগান্বিত? আমি সাইফের দিকে তাকালাম। সাইফের চোখেও মনে হল ভয়ের ছাপ। সাইফ বলল
– আমি রেডি হয়ে আসছি।
– ওকে যা। বেশি সময় নিবি না।
– না না ৫ মিনিট লাগবে।
আমাকেও ভিতরে ডেকে নিয়ে গেলো সাইফ। আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলল
– বস এত রাতে ডাকা মানে কোন সিরিয়াস কিছু হয়েছে। কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়ার জন্য ডাকতে পারে। অথবা কোন শাস্তি
– কি বল! শাস্তি!
– আমি তো এমন কিছুই করি নাই যাতে বস রাগান্বিত হতে পারে। মনে হয় অন্য কোন কাজে ডেকেছে। তাও শোন এই ড্রয়ারের চাবি নাও। এখানে আমার যত সেভিংস আছে রাখা রয়েছে। আমি যদি আর না ফিরি তুমি রেখে দিও।তোমার জীবনটাকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা কর।
– কি বলছো এগুলো ? তোমার মাথা ঠিক আছে?
– আরে বাবা আমি শুধু সম্ভাবনার কথা বলছি।
বাইরে থেকে ডাক আসছে।
– এই তাড়াতাড়ি আয়। দেরি হলে বস রেগে যাবে।
– আসছি
আমাকে শেষ বারের মত একটা চুমো দিয়ে মাথার চুল গুলো এলোমেলো করে দিয়ে বের হয়ে গেল সাইফ।
৩৭
নির্ঘুম রজনী কাটছে আমার। কখন ফিরবে সাইফ।অপেক্ষার মত বিরম্বনা মনে হয় আর কিছু নেই। কিছুক্ষণ গান শোনার চেষ্টা করলাম। নাহ ভাল লাগছে না। টিভি ছাড়লাম। টিভির দিকে তাকিয়ে আছি। কিন্তু মন পরে আছে সাইফের কাছে। কখন আসবে? সারা রাত পার করে আসবে? যদি না আসে আর। আমার বুকটা কেঁপে উঠলো ভয়ে। কোন খবর পাবার উপায় নেই। কাউকে চিনি না তার সহকর্মী দের।নাহ আসবে না কেন! সাইফ তো বললই সে কিছু করে নাই। নিশ্চয়ই কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ডেকে নিয়ে গিয়েছে। মন কে বুঝানোর চেস্টা করি। ফোন করছি একটু পর পর। কিন্তু মোবাইল অফ। মোবাইল কেন অফ থাকবে। কান্না পাচ্ছে। কারো কাছে যেয়ে সান্ত্বনা চাইবো তেমন কেউ নাই। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালাম। ১ টা বাজে। সকাল হতে এখনো অনেক দেরি। সাইফ মনে হয় ভোর বেলা ফিরবে। এত রাতে কি আর ফিরবে। এমই শুধু শুধু ভয় পাচ্ছি। আবার ফোন দিলাম। না অফ। শেষ রাতের দিকে কেমন জানি চোখ বুজে আসলো। ঘুমিয়ে পরলাম আমি। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। দরজার কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাংলো। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম। নিশ্চয়ই সাইফ। আসলেই সাইফ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কেমন জানি ভয়ের ছাপ। দরজা বন্ধ করে আমাকে বলল
– তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে নাও। আজকে সকাল হবার আগেই আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে।
– কেন?
– এত কথা বলার সময় নেই। পরে সব কিছু খুলে বলবো
– কই যাবো ?
– কক্সেসবাজার। মায়াছড়ি।
৩৮
পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেলো। বাসে ওর মুখে সব কথা শুনেছি। তার বস নাকি জেনে গিয়েছে সে সমকামী। তাই তার বস তাকে দয়া করে হত্যা না করে নির্বাসন দিয়েছেন কক্সেসবাজারের মায়াছড়িতে। বলেছে বফ কে নিয়ে বাকি জীবন মায়াছড়িতে কাটিয়ে দিতে। কক্সেসবাজারের বাইরে গেলে তার দলের লোকেরা কিছু করলে তার দায় তিনি নিবেন না। তিনি দলীল করে মায়াছড়ির বাড়ি আর জমি সাইফের নামে করে দিয়েছেন আর সেখানে একটা রেস্টহাউজ কাম রেস্টুরেন্ট করতে বলেছেন। আমার কাছে শাস্তি টা বরং দারুন লেগেছে। আমি তো এমন জীবন চেয়েছিলেম। অবশ্য নির্বাসনের ব্যাপারটা আমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কিনা তা বুঝতে পারছি না। আরও মজার ব্যাপার হল মাসে মাসে বস নাকি বেশ ভাল অঙ্কের টাকা পাঠাবেন। একটা পুরাতন জিপ ও দিয়েছেন তিনি। আমার খুব ইচ্ছা সাইফের বস কে একবার দেখার। তিনি কোন কারণ ছাড়াই আমার এত উপকার করছেন কেন।
৩৯
আমার ইচ্ছা পূরণ হল একদিন। হটাত করেই একদিন বস আমাদের রেস্টহাউজে এসে উপস্থিত। সাইফ অতি ভক্তিতে কি করবে বুঝতে পারছে না। কোথায় বসাবে বস কে সেটা নিয়েই সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গিয়েছে। আমি দূর থেকে দেখছি বস কে। সানগ্লাস পরা , চাপ দাড়ি । কাচা পাকা মেশানো। মাথা ভর্তি চুল। লম্বায় আমার মত হবে। এত পরিচিত লাগছে কেন। হটাত চোখে পড়লো উনার গালের বড় তিল টার উপর। এই তিল কিভাবে লুকোবে?এ আমার বাবা ছাড়া কেউ নন। আমি যে বুঝে গিয়েছি তা আমি তাকে বুঝতে দেই নাই। এত দিনে আমার কাছে রহস্য খোলসা হল। কেন এতদিন তিনি আমার এই উপকার করে চলেছেন। কিন্তু কেন তিনি নিজেকে প্রকাশ করছেন না? তিনি মাঝেই মাঝেই আসতে লাগলেন রেস্টহাউজে। আমাকে দূর থেকে দেখেন। আমি বুঝি আমাকে দেখার জন্যই তিনি আসেন। আমার খুব অভিমান হয়। কেন তিনি আমাকে বাবা বলে বুকে টেনে নেন না। আমিও না চেনার ভান করি। যেদিন তিনি বুকে টেনে নিবেন শুধু সেদিনই আমি বলবো যে আমি তাকে চিনেছি। এত ভয়ঙ্কর গোপন সত্য আমি সাইফের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারি নাই। একদিন বলে দিলাম। সে বলল
– সর্বনাশ
– কেন? সর্বনাশের কি আছে?
– সর্বনাশ না? তোমার বাবার মৃত্যুর পর তো তোমারই সব কিছুর মালিক হবার কথা।আর সেটা অনিক জানলে তোমাকে এই পৃথিবীতে বাঁচতে দিবে মনে করেছো ?
– কিন্তু আমি তো চাই না এত সব সম্পত্তি , ক্ষমতা , কালো টাকা।বরং এখন যা আছি তাতেই ভাল আছি।
– কিন্তু তা তো আর অনিক বুঝবে না। তাই তো বস কক্ষনো তোমার সামনে তার পরিচয় প্রকাশ করেন নাই। তিনি বুঝেছেন যতদিন তিনি আছেন তিনি হয়তো তোমাকে রক্ষা করবেন কিন্তু তারপর? তিনি চান না অনিক আর তোমার মাঝে কোন সংঘর্ষ হোক ।তুমি তোমার পরিচয় আর কারো কাছে প্রকাশ কর না।
কথা গুলো আমার বুকে গিয়ে আঘাত করলো । তাহলে কি বাবা কক্ষনোই সামনে আসবেন না? কক্ষনো তার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে পারবো না। বাবা বলে ডাকতে পারবো না। আমার দুই চোখ থেকে পানি পরতে লাগলো। সাইফ আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল
– এই বোকা ছেলে কাঁদো কেন? বস যে তোমাকে কত ভালবাসে তা এখন বুঝতে পারছি। নাহলে আমার ছোট এই রেস্টুরেন্টে , রেস্টহাউজে প্রায়ই আসবেন কেন?এখন বুঝি তোমাকে দেখতে আসেন।তুমি কত ভাগ্যবান চিন্তা কর। আমার তো বাবাউ নেই
– কিন্তু বাবাকে তো কক্ষনো স্পর্শ করতে পারবো না। একটু বাবা বলে ডাকতে পারবো না।
– বোকা ছেলে আবার কাঁদে । বাবা , মা কি সবার সারা জীবন থাকে? একসময় তো অন্য কাউকে দরকার হয়। আমি আছি না? আমার মত আগলে কে রাখবে বল তোমাকে
আমি মনে মনে ভাবলাম আমি আসলেই ভাগ্যবান। আমার জীবনে সাইফ আছে। আমার সাইফ। আর কেউ নাইবা থাকলো !
৪০
মার কথা আর কিছু বলি নাই। মা জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছেন। আবারো পেলেন। বায়েজিদ আর মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেলো। সব খবর পেলাম পেপারে। আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল মায়ের কাছে যাই। মাকে সান্ত্বনা দেই। কিন্তু মা তো আমার এই নতুন পরিচয় মেনেই নিতে পারবেন না। তাই যাই নাই। কিন্তু যখন জানতে পারলাম মা ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। মৃত্যুর জন্য দিন গুনছেন তখন আর না যেয়ে পারলাম না। যে কয়দিন বেঁচে ছিলেন মার কাছে ছিলাম। মা কে সাইফের কথা কিছু বলি নাই। কি দরকার একজন মৃত্যু পথযাত্রীকে কষ্ট দিবার। মা আমাকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ পেলেন। অন্তত আমাকে পেয়ে শেষ কয়েকটা দিন তিনি শান্তিতে ছিলেন। এটাই আমার সান্ত্বনা । কিন্তু শেষ দিন গুলো তে তিনি শুধু বলতেন ছেলের বউ দেখতে চান। আসলে তিনি বুঝছিলেন আমি আসলেই সমকামী। তাই হয়তো এই পথ থেকে সরিয়ে আনার জন্য একটা ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। যেদিন মা মারা গেলেন সেদিন খুব হাল্কা লাগছিল। মনে হচ্ছিল আমার আর কোন পিছুটান নেই। এখন শুধু মায়াছড়ি আমার ঠিকানা হবে।
পরিশিষ্ট
আমি এখন কক্সেসবাজার মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। হলে থাকি। সুযোগ পেলেই ছুটে যাই মায়াছড়ি । সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকে সাইফ। আমার স্বপ্ন মায়াছড়ি তে হাসপাতাল দিবো । অবশ্যই ডাক্তার হবার পর। মা আমার নামে অনেক সম্পত্তি রেখে গিয়েছেন। তা দিয়েই হাসপাতাল করবো । মায়ের নামে হাসপাতাল হবে। আর আমার পাশে থাকবে সাইফ। বাবা এখনো মায়াছড়ি তে আসেন। আগের মত আর নেই। অনেক বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছেন। এখনো আমি অপেক্ষা করি। একদিন বাবা নিশ্চয়ই আমাকে কাছে টেনে নিবেন।

“সমাপ্ত”


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.