সবুজ নিশান

সানশাইন ক্রিস্টাল

১.
মগবাজার রেইলক্রস এর গেট আটকে দেয়া হয়েছে। ট্রেন যাবে। কিন্তু একটা ভারী ট্রাক দূর থেকেই দ্রুত গতিতে উল্টো রাস্তায় এগিয়ে আসছে। সিগনালের জন্য এই পাশটা খালি। পিছনে পুলিশের গাড়ি। হয়তো পুলিশের তাড়া খেয়ে গাড়ি নিয়ে পালাচ্ছে, নয়তো ব্রেক ফেইল হয়েছে, কারণ ট্রাকটা থামছে না। ট্রেনও মেইন রোড ক্রস করছে। উপস্থিত জনতা চোখ বড় করে তাকিয়ে দেখছে। কারও চোখ আনন্দে চকচক করছে, চোখের সামনে দুর্ঘটনা দেখা বিরাট অ্যাডভেঞ্চার। ৬ নং বগিতে এসে ট্রাক ধাক্কা দিল।
বগিটা লাইনচ্যুত হল। প্রথম পাঁচটা বগিও চোখের পলকে উলটে লাইনের পাশে পরল। পিছনের তিনটা বগিও লাইনচ্যুত হওয়ার পর মুহূর্তেই ট্রেন থেমে গেল। তবে সামনে উলটে পরা ইঞ্জিনের চাকা তখনও ঘুরছে। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। মুহুর্তেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু। অপেক্ষমান জনতার মাঝে একটা ঢেউ খেলে গেল। সবাই যেন ঝাপিয়ে পড়ল মানুষ উদ্ধারে। তবে সামনের বস্তির অনেকেই এসে চুরি করতে শুরু করল। এদেরও চোখ চকচক করছিল। আজ তাদের রহমতের দিন।

রাজ্জাক আহমেদ মিটিং-এ ব্যস্ত। কখনও মিটিং-এ ডিস্টার্ব করা নিষেধ। তারপরও মারজান মিটিং রুমে ঢুকে খবরটা দিল। মিটিং ক্যান্সেল করা হল। এক মাত্র ছেলের মৃত্যু সংবাদ রাজ্জাক সাহেবকে বিমূঢ় করে দিয়েছে। হঠাৎ পাওয়া দুঃসংবাদে মানুষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না, একদল মানুষ পারে, তবে সময় নেয়। রাজ্জাক সাহেব বুঝছেন না সে কোন দলে। তার এখন চিন্তা ছেলেকে নিয়ে নয়। সে কোন দলে সেই চিন্তাই তাকে ভাবাচ্ছে।
অনেকক্ষন পর বুঝতে পারলেন তিনি প্রথম দলেই। তার স্ত্রি রাজিয়া ফোনই ধরছে না। ও বাসায় না হসপিটালে তাও জানেন না। মারজান গায়ে হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। মারজান রাজ্জাক সাহেবের পার্সোনাল সেক্রেটারি। তবে কোনো কাজের না। মারজান শুধুই বিছানায় ভালো কাজ পারে। কিন্তু ওর ছোঁয়ায় রাজ্জাক সাহেবের এই মুহুর্তে কামনা জাগছে না। তিনি উঠে পরলেন। হাসপাতালে যেতে হবে। লাশ ছাড়াতে হবে।

রাজিয়া আই. সি. ইউ. এর জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। রাফাত মারা যায় নি। কোমায় আছে। রাফাত কলেজ ছাড়া বাসা থেকে বের হয় না। তাও প্রাইভেট কারে আসা যাওয়া করে। অথচ ট্রেন দুর্ঘটনাস্থল হতে ওকে উদ্ধার করা হল। কীভাবে সম্ভব। ও কেন ট্রেনে উঠবে? আর দুর্ঘটনার সময়তো ওর ক্লাসে থাকার কথা। রাজিয়া বুঝে উঠতে পারে না। হঠাৎ তার চোখে পড়ল রাফাত এর আঙুল নড়ছে। রাজিয়া চিৎকার করে ডাক্তার ডাকল। রাজ্জাক সাহেব পাশে রাখা বেঞ্চে বসেই ঘুমোচ্ছিলেন। চিৎকারে তার ঘুম ভেঙে গেল। তিনি দৌড়ে এসে রাজিয়ার পাশে দাড়ালেন, গ্লাসের মধ্যে থেকে তাকিয়ে রইলেন। মনে সামান্য আশা, একটাই তো ছেলে তার।
২.
এক মাস পর….
সিলেট এর সড়ক ও জনপথ এর ডাক বাংলোয় আগেই খবর দেয়া ছিল এক উচ্চতর কর্মকর্তা আসছেন। বাংলো ঝাড়-পোছেই সবাই ব্যস্ত। গোরা তার মায়ের সাথে বাংলোয় কাজে আসে। সবসময় কাজ না থাকলেও আজ আছে। কাঠ কাটতে হবে। বাবুরা পিকনিক করবে। তার মা এখানে স্থায়ী কর্মচারী, সে নয়। তবুও ম্যানেজার চাচার কথায় কাজ করে। কাজ শেষে ম্যানেজার বসতে বলল। বাবুদের ফুট-ফরমাশ খাটতে হবে। রাজ্জাক সাহেবের এর শ্যালিকা বাংলোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। রাফাতের জ্ঞান ফেরার পর থেকে সে কাউকে চিনতে পারছে না। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তবে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় গেলে তার খুব উলটা পালটা কিছু স্মৃতি মনে পরে, যার সাথে রাজ্জাক সাহেব বা রাজিয়া কেউই পরিচিত নয়। কারণ তারা রাফাতকে ঢাকা শহরের ধুলাবালিতে ঘোরার সুযোগ দেয় নি।

ছুটিতে তারা দেশের বাইরে কাটাত। অথচ রাফাত যেন ঢাকা শহরের প্রতিটি ইঞ্চি চিনে। তবে তার স্মৃতিতে শুধু একটা মানুষ থাকে, সে রাজিয়া নাকি রাজ্জাক নাকি অন্য কেউ তা রাফাতের জানা নেই। তাই ডাক্তার বলল অপরিচিত জায়গায় পরিচিত মানুষদের সাথে সময় কাটাতে। তাহলে উপকার হতে পারে। তবে বিমানে ভ্রমণ নিষিদ্ধ। তাই রাফাতের খালা সিলেটের বাংলো ঠিক করল। তারা অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনসহ পরদিন আসবে।
রাফাতেরা এসেছে দুই ঘন্টা হয়ে গেল। তিনজনেই ফ্রেশ হওয়ার পর চুপচাপ বসে আছে। কোনো কথাই বলছে না। হঠাৎ রাফাত বলে বসল, “খালার সাথে আমার সম্পর্ক কি?” “তিনি তোমার মায়ের ছোটো বোন।” রাজ্জাক সাহেব জবাব দিলেন। “বড় বোনকে কি বলে?” “বড় খালা বলে।” রাফাত অবাক হল। সম্পর্কের নামগুলো সাধারণ। অতএব মানুষও সাধারণ। নাকি মানুষের সম্পর্কগুলো সাধারণ!!! রাফাতের অবাক চেহারা দেখেই রাজ্জাক সাহেব বুঝতে পারলেন রাফাত এখন প্রশ্ন শুরু করবে। তিনি উঠে গেলেন। রাফাতের সব প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারেন না। রাজিয়া পারে। রাফাতও উঠে গিয়ে রাজিয়াকে ধরল,
—আচ্ছা, মা, আপনার বড় বোন নেই?
—তুমি আগে তুমি করে বলতে রাফাত।
—আমার আগের কথা মনে পড়লে বলব।
—ছিল একজন, মারা গেছেন।
—মারা যাওয়া কি?
—মারা যাওয়া মেনে জীবন থেমে যাওয়া। যে মারা যায় সে আর কথা বলতে পারে না, দেখতে পারে না, শুনতে পারে না, চলতে পারে না, কিছুই করতে পারে না।
—আপনার বড় বোনের জীবন কেন থেমে গেল?
রাজিয়া বিরক্ত হল। ছেলেটা বাচ্চা বাচ্চা আচরণ করছে। তবুও জবাব দিল।
—আপু সারাদিন পানি নিয়ে খেলত, পুকুরে নামলে উঠতে চাইত না। বাথরুমে ট্যাপের নিচে বসে পানি ছেড়ে রাখত। খুব কড়া ঠাণ্ডা লেগে মারা গেলেন।
—আর কি কি ভাবে থেমে যাওয়া যায়?
—অনেক ভাবে, তোমার এখন জানতে হবে না।
—আপনার বড় বোনের পর কি এবার আপনি থেমে যাবেন?
—হয়তবা, কেউ জানে না সে কখন মারা যাবে।
—ওহ, বাবার বড় বোন নাই?
—নাহ
—তাহলে আমার কোনো বড় খালা নেই?
—নাহ নেই, তবে বাবার বোনকে ফুপু বলে।
—বড় বোনকে বড় ফুপু?
—হ্যা।
—খুব সাধারণ। আপনি বাবার কি হন? ছোটো বোন?
—আমি তোমার বাবার স্ত্রী।
—এটা কীভাবে হয়?
—এটা ভালোবেসে হয়।
—ভালোবাসা কী?
—এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। ভালোবাসলে তুমি এমনিই বুঝতে পারবে। তখন তার জন্য অনেক কিছু করবেন।
—ওহ আপনি ভালোবেসে বাবার জন্য কি করতেন?
—আমরা অনেক কিছু করতাম। লুকিয়ে চিঠি লিখতাম। টেলিফোনে কথা বলতাম। ঘুরতে যেতাম। আমার সব কথা ওকে বলতাম, ওর সব কথা আমাকে বলত।
—এখন আর বাবাকে ভালোবাসেন না?
রাজিয়া হকচকিয়ে গেল। ছেলে এমন প্রশ্ন কেন করল?
—হ্যা বাসিতো।
—কই, এখন তো আর চিঠি লেখেন না? ফোনেও কথা বলেন না। এমনকি ঘুরতেও যান না। আর সব কথা কি বাবাকে বলেন?
রাজিয়া জবাব দিতে পারল না। উঠে গিয়ে খাবার দিতে বলল।
খাবার টেবিলে বসার পর রাফাত মুখে খাবার তুলতে পারল না। তার সামনে গোরা নামে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে। হাসপাতাল ছাড়ার পর মায়ের সাথে সে ঢাকার অনেক জায়গায় ঘুরেছে। কিছু জায়গায় টুকরা স্মৃতি তার মনে পরেছে। এবং তার স্মৃতিতে তার সাথে গোরা নামের এই ছেলেটিই ছিল।
৩.
রাজিয়া ছেলের সব কথাই ছেলের বাবার সাথে বলল। রাজ্জাক সাহেব অবাক হলেন, আসলেইতো তিনি এখন আর রাজিয়ার খোঁজ নেন না। পার্সোনাল সেক্রেটারি মারজানের শরীরটাই এখন তার প্রেম। কিন্তু এতে শুধুই কামনা। আর আগের সেই সোনালী দিনগুলোতে কোনো কামনা ছিল না। শুধু ভালোবাসা ছিল। আহা কি মজার দিন ছিল সেসব…. গালর্স কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, ভয় করত, নিজেদের কলেজের টিচার যদি চলে আসে। সপ্তাহে একদিন কথা হত রাজিয়ার সাথে। তাও অল্প সময়ে। সেই অল্প কথাটুকুই সারা সপ্তাহ জুড়ে ভালোবাসা বাড়িয়ে দিত। কলেজ পাশের পর ঢাকা এসে সপ্তাহে একটা চিঠি দিত। সেই চিঠি নিয়েও কত উৎকণ্ঠা। রাজিয়ার বাসার কারও হাতে না পরে যায়।
হঠাৎ একদিন রাজিয়ার বাবার হাতে চিঠি পরল। খবর এল দুই শুক্রবার পরেই রাজিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে। রাজ্জাক সাহেবেরও বাবার চিঠি এল, একি দিনে রাজ্জাকেরও বিয়ে ঠিক হয়েছে। বাড়িতে যেতে বলেছে। এক সেমিস্টার লস হোক। রাজ্জাক আর আর দেরী করেনি। সব পরিকল্পনা শেষে বাড়ি গেল এবং বিয়ের দুইদিন আগে রাজিয়াকে নিয়ে পালালো। সে রাজিয়া ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। এমনকি রাগে যে মেয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে তার ছবিও দেখল না। সারারাস্তা রাজিয়া অন্য দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছিল। খুব খুশী হয়ত তাকে কাছে পেয়ে। হঠাৎ তার দিকে তাকালেও খলখলিয়ে হেসে দিয়ে অন্য দিকে তাকায়। রাজ্জাকের ভালো লাগে, সারাজীবন এমনি হেসে ঘর আলো করে রাখলে হয়। “হাসো কেনো?” রাজ্জাক প্রশ্ন ছুড়ে। কিন্তু রাজিয়া জবাব দেয় না।

খিলখিল করে হাসে। চারদিন পালিয়ে থাকার পর খবর পেল রাজিয়ার সাথেই তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। রাজ্জাক বোকা হয় যায়। রাজিয়ে আরও খিলখিল করে হাসে। রাজ্জাক বুঝতে পারে রাজিয়ার চারদিন ধরে অনবরত হাসার কারণ। তারা বাড়ি ফিরে যায়। ধুমধাম আয়োজনে বিয়ে হয়। আহা, কি সেই সোনালী দিনগুলো…. রাজ্জাক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। তিনি আজ রাজিয়াকে নিয়ে ঘুরতে বেরোবেন। ছেলের ভুল ধারণাকে ভেঙে দেবেন।
ম্যানেজারকে বলে গেলেন রাফাতের দিকে খেয়াল রাখতে। ঘুম থেকে উঠলে খেতে দিতে, ঘুরতে বেরোতে চাইলে বাংলোর এরিয়ার মধ্যে ঘুরতে। বাইরে যেন না যায়। রাজিয়া একটি জলপাই রঙের শাড়ি পরেছে। হাতে হটপট। হয়ত খাবার নিয়েছে। রাজ্জাক সাহেব ড্রাইভার ছেড়ে দিলেন। তিনি গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করবেন। রাজিয়া মুচকি হাসে।
রাফাত ঘুম থেকে উঠেই বুঝতে পারে বাবা মা বাসায় নাই। ও খুশি হয়। কিছুটা সময় স্বাধীন মনে হয়। চুপে চুপে বাংলো থেকে বের হয়। কিন্তু সামনে গোরা ছেলেটা পরে যায়। রাফাত অস্বস্তিবোধ করে। কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারে না।
—ছোট সাব কই যান?
—এমনি বসে থাকতে ভালো লাগে না তাই হাটতে বের হলাম।
—আপনের তো বাইর হওন নিষেধ।
—বললাম তো ভালো লাগে না।
—আরেহ ঘরে যান, ম্যানেজার চাচায় শুনলে আমারে বকব।
—অল্প সময়ের জন্য আমায় একটু ঘুরতে নিয়ে যাবা? প্লিজ?
রাফাতের চোখের দিকে তাকিয়ে গোরা নিষেধ করতে পারে না। চুপচাপ বাংলোর পিছনের দিকে হাটতে শুরু করে। রাফাত গোরাকে অনুসরণ করে। গোরা একটা দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়ায়। দক্ষভাবে দেয়াল পেরোয়। রাফাতও অনুসরণ করে। যখন দেয়ালের অন্যপাশে পৌছে তার মাথাটা দুলে উঠে।
চোখ বন্ধ করে ঘাসের উপর বসে পরে। মনে করার চেষ্টা করে। হ্যা এইতো তার মনে পরছে। স্কুলের ঘন্টা বাজছে। সবাই ক্লাসের দিকে যাচ্ছে কিন্তু রাফাত উলটো দিকে হাটছে। ওয়াশরুমের পাশ থেকে স্কুলের পিছনে চলে যায়। দেয়ালের সাথে লাগোয়া আম গাছ। সে গাছের খাজে পা দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করে। দেয়ালের সমান উচ্চতায় উঠেই অপর পাশে ঝাপ দেয়। কেউ একজন বলে উঠে, “তাড়াতাড়ি আসো। কেউ দেখে ফেলবে।” কে তা রাফাতের মনে পড়ে না। “ছোট সাব কী হইছে? চোখ বন্দ কইরে বইসে আছেন যে? তাড়াতাড়ি চলেন, কেউ দেখেলে পরে আর কখনও আসতে পারবেন না।” রাফাত সম্বিৎ ফিরে পায় কিন্তু পরের স্মৃতিটুকু আর ফিরে আসে না।
৪.
রাজ্জাক সাহেব ছোট একটা নির্জন টিলা খুজে পেলেন। এটাই সময় কাটানোর ভালো জায়গা হবে। রাজিয়াকে পাশে বসালেন। আজ তারা প্রেম করবেন। হঠাৎ রাজ্জাক সাহেব খেই হারিয়ে ফেললেন। ঠিক কীভাবে প্রেম করতে হয় তাই সে ভুলে গেছেন। রাজিয়া অনেকক্ষণ ধরে রাজ্জাক সাহেবকে খেয়াল করে বিরক্ত হলেন। তিনি হটপট খুলে চামচ দিয়ে রাজ্জাক সাহেবকে খিচুড়ি খেতে বললেন। রাজ্জাক সাহেব চুপচাপ খেতে লাগলেন। অনেকটা খাওয়ার পর রাজিয়ার হাতে দিলেন। রাজিয়া হটপট আটকে উঠে দাড়াল।
—বাসায় চল।
—একটু বস না রাজিয়া, আমরা শুধু খেতে এসেছি এখানে? একান্তে কিছু সময় কাটাতে এসেছি।
—হাহ, তুমি একান্তে সময়ও কাটাতে জানো?
— ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কীভাবে শুরু করব।
—তুমি পারবেও না। তুমি আসার পর থেকেই চুপ করে ছিল। গত ১৬ বছরে তুমি আমায় একবার জিজ্ঞেস করেছ আমি কেমন আছি? আজ এই প্রশ্নটা দিয়েই শুরু করতে না হয়। তুমি আর তুমি নেই রাজ্জাক।
—কেমন আছো তুমি?
—হচ্ছে না রাজ্জাক। আমার মনেও হয় না আর কখনও হবে। আমিতো তোমার পাশে বসে ছিলাম, একবার আমায় খেতে সেধেছ? আমি কিছু খেয়েছি কি না জিজ্ঞেস করেছ?
—আমি তো পুরোনো সেই দিনগুলোর কথা ভাবছিলাম।
—হাহ, পুরোনোদিন!!! মনে পরে পরীক্ষার সময় আমরা বলতাম ঘুরতে গেলে সময় নষ্ট হয়। পরীক্ষা শেষে দেখা হবে। আর আজ দেখো রাজ্জাক, আয়োজন করে একান্তে সময় কাটাতে হয়। তাও নিজের ইচ্ছায় না। ছেলেকে ভুল প্রমাণ করতে।

রাজ্জাক সাহেব অবাক হন, আসলেই তিনি কী ছিলেন আর কীসে পরিণত হয়েছেন। রাজিয়া উঠে গিয়ে গাড়িতে বসে। রাজ্জাক কিছু মুহুর্ত অপেক্ষা করেন। বুঝতে পারেন রাজিয়া ফিরতে চায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে পরেন। সম্পর্কটা একদিনে শেষ হয় নি। তাই একদিনে ঠিক করে ফেলা সম্ভব না। রাজ্জাক সাহেব মনে মনে ধৈর্য ধরেন। মনমরা হয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে ফেরেন।

রাজিয়া কোনো কথা বলে না। শুধু খোপাটা খুলে দিয়ে জানালা থেকে মাথা বের করে। আলতোভাবে জানালায় হাত রেখে হাতের উপর শোয়। চোখ থেকে এক টুকরো পানি কাচ হয়ে গাল বেয়ে নেমে আসে। রাজ্জাক সাহেব মুগ্ধ হন। আজ রাজিয়ার জন্য তার ভালোবাসা বাড়ে, আর মারজানের জন্য ঘৃণা। বাংলোতে ঢোকার পরই বুঝতে পারেন কিছু হয়েছে। ম্যানেজার মাথা নিচু করে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছে। গাড়ির শব্দ পেয়ে ম্যানেজার দৌড়ে আসেন। “রাফাত সাহেব সকাল থেকে বাড়িতে নাই। কই গেছে কিচ্ছু জানি না।”
রাফাত আর গোরা একটা ধানক্ষেত পাড়ি দিয়ে বনের মধ্যে এগিয়ে যায়। “আমি ধানক্ষেত আগেও দেখেছি। আজও দেখলাম। ধানক্ষেত ভালো লাগে। বন ভালো লাগে না। চলো বাসায় ফিরি।” গোরা জবাব দেয় না। সে এগোতেই থাকে। সামনে একটা দিঘী পরে। পাড় ধরে ওরা হেটে যায়। দিঘীর এক পাশ থেকে সরু একটা নালা আবার বনের ভিতরে চলে যায়। ওরা নালা ধরে এগোয়। কিছুদুর গিয়েই দেখতে পায় নালা চওড়া হয়ে ছোট পুকুরে রুপ নিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে। পুকুরে বিভিন্ন জায়গায় শাপলা ফুটে আছে। মাঝে স্বচ্ছ পানি। আরও অবাক হয় রাফাত। পুকুরের মাঝে সাদা শাপলা। সাদাগুলোকে ঘিরে লাল শাপলা গোল হয়ে পুকুর জুড়ে আছে।

একদম পুকুরের কিনারে নীল শাপলার একটা বড় বৃত্ত। বড় বড় গাছ পুকুরটা ঢেকে রেখেছে। সূর্যের আলো কম তাই দিনের বেলাও অনেক শাপলা ফুটন্ত। গোরা ছিরতে গেলে রাফাত নিষেধ করে। এগিয়ে গিয়ে হাটু গেড়ে বসে। মাথা নিচু করে একটা নীল শাপলায় নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নেয়। এক আঁশটে অসাধারণ ঘ্রাণ। এ ঘ্রাণ তার চেনা। আবার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠে। রাফাত চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করে। একটা হাত,”এদিকে আয়, এদিকে আয়, ওদিকটায় চল, লোক নেই, কেউ দেখবে না।” রাফাত হাতের দিকে দৌড়ে যায়। হঠাৎ হাতটি একটা শাপলা তুলে ধরে। রাফাত শব্দ করে হাসে, হঠাৎ দুইটা লোক দৌড়ে আসে। লাঠি হাতে। বলে “ধানমন্ডি লেকের শাপলা তোলা নিষেধ জানো না?” মারতে আসে, সামনে একজন এসে দাঁড়ায়। রাফাতের স্মৃতিটা ভেঙে যায়। মাথার মধ্যে কেউ যেন বাড়ি দিচ্ছে। গোরার হাত ধরে উঠে দাঁড়ায়। তবে পা কাঁপছে। গোরাও চিন্তায় পড়ে, একে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে।

৫.
রাফাতের চাচা রাজ, দুই ফুপু রেহানা আর রোকসানা, এক ফুপা আলম, তিন ফুপাত ভাই আলমাস, আয়তিহাদ, আলিফ, খালা রোজিনা, খালু আফতাব আর খালাতো বোন আসমা চলে এসেছেন। রাজিয়া তার বোন রোজিনার উপর খুব রেগে আছেন। রোজিনার স্বামী আফতাব সাহেব এসেই পিকনিকের আয়োজন শুরু করেছে, রোজিনাও তাতে সায় দিচ্ছে। রাফাতকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না এ ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথাই নেই ওদের। আফতাব তো এসেই বলে ফেলল, “আপা টেনশন করবেন না। হয়ত রাফাত জ্ঞান বুদ্ধি হারিয়ে বাচ্চা হয়ে গেছে, তারপরও এত বাচ্চা হয়নি যে রাস্তা ভুলে যাবে। ঠিক এসে পরবে। আপনি বলেন কোনটার রোস্ট হবে, পাহাড়ি হাস নাকি বনমুরগী।” রাজিয়া জবাব দিল না, তবে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল, পারলে আফতাবকেই ঝলসে রোস্ট করেন। বাকীরা সবাই বসে আছে, শুয়ে আছে, তাদের পিকনিক নিয়েও মাথাব্যথা নেই, রাফাত হারিয়ে যাওয়াতেও মাথাব্যথা নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাফাতকে কোলে নিয়ে গোরা ঢুকল। রাফাতের সামান্যই জ্ঞান আছে। সে শুনতে পেল, গোরা কৈফিয়তের সুরে বলছে, “জংলায় পইরা ছিল, দেইখা নিয়া আসলাম।” রাফাত বুঝল না ছেলেটা মিথ্যে কেন বলছে। কিন্তু তার মাথাব্যথা আরও বাড়ল। তার টুকরো স্মৃতির মনে পরা ছেলেটাও এভাবে মিথ্যে বলত। কি কি বলত মনে পড়ার আগেই রাফাত জ্ঞান হারাল।

আফতাব সাহেব অনেক কষ্টে রাজিয়ার মান ভাঙালেন। যদিও শেষ কথাটা কাজে দিয়েছে। “রাফাতের ঘুম ভাংলে খুব ক্ষুধা লাগবে, আরও পিকনিকের আয়োজন দেখলে খুশি হবে।” পাহাড়ি হাস বনমুরগী দুটোর ব্যবস্থাই করা হয়েছে। রাফাতের যা ভালো লাগে সে তাই খাবে। রাজিয়া ছেলের খুশীর জন্যে নিজেই রান্নাবান্নার তদারকি করছেন।

সন্ধ্যায় রাফাতের জ্ঞান ফিরল। রুমটা অন্ধকার, কেউ নেই। ও উঠে বসল ওর আজ অনেক স্মৃতিই মনে পরছে কিন্তু মাথা ব্যথা লাগছে না। হালকা ঝিমঝিম করছে। বিছানা ছেড়ে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাড়াল। বাগানে অনেক মানুষ। আগুন করে সবাই ঘিরে বসেছে, হাসি ঠাট্টা চলছে। সবার হাতেই গ্লাস। একজন লাঠির সাথে বড় ধরনের মুরগি বেধে আগুনে ঘুরাচ্ছে। রাফাত সিড়ি ধরে নিচে নামতে লাগল আর মনে পড়া স্মৃতি নিয়ে ভাবতে লাগল। ওর স্কুলে এক ছেলের সাথে পরিচয় হয়। কে সে, পরিচয় মনে করতে পারল না। তবে রাফাতকে সে উচ্চবিত্ত জেল থেকে বের করেছিল। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে স্কুলের দেয়াল টপকে ঘুরে বেড়াত ওরা।

ঢাকার অনেক জায়গায়ই এজন্য ওর চেনা লাগে। ধানমন্ডি লেকে শাপলাও সে ছেলেটার সাথেই দেখতে গিয়েছিল। হ্যা নাম মনে পরেছে, রুপক। রুপক মিথ্যেও বলত প্রচুর। গোরার মত, গোরার মতই শরীর অনেকটা। তবে গোরার সাথে গুলিয়ে ভুল করল চলে না। নিচে নামতেই গোরার মায়ের সাথে দেখা। গোরার মা রাফাত কে দেখেই ডাক দিল, “খালা, ছোডো সাবের ঘুম ভাংছে।” রাফাতের মা দৌড়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন। “আর কখনো তোকে একা ছাড়ব না।” রাফাত মুচকি হাসল। মায়েরও কিছু স্মৃতি তার মনে পরেছে। রাজিয়া বাগানে নিয়ে সবার সাথে রাফাতকে পরিচয় করিয়ে দিল। রাফাতের প্রত্যেকের সাথেই কিছু স্মৃতি মনে পড়তে লাগল। মাথা হালকা ঝিমঝিম করছে তবে অসুস্থবোধ করছে না। রাফাত কে রাজিয়া বুঝিয়ে বললেন সবাই তার জন্যই এসেছেন। সবাই তাকে দেখে আনন্দ উল্লাস করল। রাফাত শুধু মুচকি হাসল।

৬.
বার-বি-কিউ পার্টি শেষে সবাই ঘরের মধ্যে গিয়ে বসল। এখন একটা খেলা হবে, “ট্রুথ অর ডেয়ার।” সবাই গোল হয়ে বসল। রাফাতের বাবা কাচের কোকের বোতল নিয়ে মেঝেতে ঘুরালেন। প্রথমেই উঠল রাফাতের খালু আফতাব সাহেব। তিনি ট্রুথই বেছে নিলেন। জানালেন রোজিনার জন্য একটা ফ্লাট কিনেছেন গুলশানে। সবই উউ করে আনন্দ উল্লাস দিল। রোজিনা লজ্জায় হাসছে আর ভাবছে এমন স্বামী কয়জনের হয়। এবার আফতাব সাহেব বোতল ঘুরালেন। রাফাতের ফুফাতো ভাই আলমাসের পালা আসল। ও ডেয়ার বেছে নিল। আলমাস আমেরিকা ছিল। আফতাব সাহেব বললেন আমেরিকান একটা কালচার প্রাকটিস করে দেখাতে। আলমাস উঠে আফতাব সাহেবের মেয়ে আসমাকে হাটু গেড়ে প্রপোজ করল। সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

আলিফ হাততালি দিল। কিন্তু আফতাব সাহেব রেগে গেলেন। রোজিনা তাকে শান্ত করলেন। এ নিয়ে পরে কথা হবে বলে সবাইকে থামালেন। তিনি এখন ফ্লাটের মোহে ভালো মুডে আছেন। এবার আলমাস বোতল ঘুরাল। রাফাতের পালা পরল। রাজিয়া বললেন আবার ঘুরাতে, রাফাতের কিছুই মনে নেই তাই ট্রুথ ডেয়ার কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু রাফাত বলে ফেলল ট্রুথ। রাজিয়া অবাক হয়ে তাকালেন। তার মনে হল ছেলে এখনি বলবে, “মা, আমার স্মৃতিশক্তি ফিরে এসেছে বা, হারায় নি, সবাইকে এক করার জন্য মজা করেছি।” তবে রাফাত তা বলল না। সে বলতে শুরু করল, “আমি সন্ধ্যা থেকেই অনেক কিছু মনে করতে পারছি। সবাইকে বাগানে দেখার পর আরও অনেক স্মৃতি মনে পড়েছে। ট্রুথ মানে হচ্ছে একটা কথা যা কখনই কাউকে বলা হয় নি এমন তো? তবে খালুর ব্যাপারে (আফতাব সাহেব) আমার একটা কথা মনে পরছে। আমার যতদূর মনে পরে, তিনি আমায় সবসম্য ব্যপারটা কাউকে বলতে মানা করেছেন।” আফতাব সাহেবের মুখ পাংশুটে বর্ণ ধারণ করল।

রাজ্জাক সাহেব ঠাট্টা করে বললেন কি গো ভায়রা, সব দেখি তোমাকে ঘিরেই হচ্ছে। সবাই একটু হাসল। রাফাত চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করল, “আমি যখন ময়মনসিংহে তাদের বাসায় বেড়াতে যাই, এক সন্ধ্যায় খালু আমাকে নিয়ে ছাদের ছোটো ঘরটায় যান। উনি আমায় কোলে বসিয়ে তার মুখ দিয়ে আমার মুখে নাড়াচাড়া করছিলেন। সাথে শরীরে বিভিন্ন জায়গায় স্পর্শ করছিলেন। তারপর বিছানায় আমায় শুইয়ে দিয়ে আমার উপর উঠে কি কি যেনো করতেন, আমি সবটা মনে করতে পারছি না। তবে তিনি আমায় বারবার করে বলছিলেন এগুলো যেনো কখনো কাউকে না বলি। এরপর থেকে প্রতবারই ময়মনসিংহ গেলে উনি এটা করতেন।

এ পর্যন্ত বলেই রাফাত চোখ খুলল। “আর মনে পরছে না।” সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল। আলমাস উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ড্যাম, আংকেল ইজ আ গে এন্ড হি ইউসড মাই কাজিন। হাউ লেইম!” আলমাস রুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন। রোজিনা কাঁদতে শুরু করল। ফ্লাটের কথা এখন আর তার মনে নেই। সে কাঁদতে কাঁদতে উঠে এসে রাফাতকে জড়িয়ে ধরে বলল, “বাবা তুই মন খারাপ করিস না, এই খচ্চরটার শাস্তির আমি ব্যবস্থা করব।” রাফাত অবাক হয়ে বলল, “উনি ভুল কি করেছেন? শাস্তি কেন দিবেন?” রোজিনা কাঁদতেই বলল, “ও যা করেছে তোর সাথে তা খারাপ।” রাফাত আবার বলে, “ওনার হয়ত আমাকে ভালোই লাগে, একজনকে আর একজনের ভালো লাগা ভুল?” “না বাবা, ছেলে মেয়েদের মাঝে ভালো লাগা হয়। ছেলে ছেলেদের মধ্যে হয় না।” রোজিনা কাঁদতে কাঁদতে জবাব দিলেন। “কেন?” রাফাত আবার প্রশ্ন করল। কিন্তু কেউ তাকে বুঝাতে চেষ্টা করল না ব্যাপারটা কেন অপরাধ। রাজ্জাক সাহেব আফতাবকে টেনে বাইরে নিয়ে গেলেন। সবাই এখন এটা জানতেই ব্যস্ত রাজ্জাক সাহেব কি ব্যবস্থা নেন। রাজিয়া মনে মনে বলতে লাগল এমন স্বামী যেন কারো না হয়।

আফতাব সাহেব রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেলেন। রোজিনা ছাদে উঠে আধফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। সে আসমার ভবিষ্যৎ নিয়েই চিন্তিত। আসমা বাগানে গিয়ে আলমাসের পাশে বসে আলমাসের কাধে মাথা রাখল। সে তার বাবার থেকে আলমাসকেই এখন বেশী বিশ্বাস করছে। আলমাসও আসমার কাধে হাত রাখল। “তুমি কখনও ছেড়ে যেও না।” আসমা বলল। আলমাস হাতটা সরিয়ে নিল। আসমা মাথা তুলে আলমাসের দিকে তাকাল। “দেখো আসমা, প্রপোজটা খেলার মধ্যে মজার ছলে করা। আর এমন বাবার মেয়ের সাথে আমি অবশ্যই নিজেকে জড়াব না।” বলে আলমাস উঠে ঘরে চলে গেল।
আসমা চাপা গোঙানির সুরে কাঁদতে লাগল। বয়সের দোষ। রাজিয়া রাফাতকে জড়িয়ে ধরে নিরবে চোখের পানি ফেলছে। বাইরের মানুষকে বিশ্বাস নেই বলে একা কখনও ছেলেকে ছাড়েন নি। অথচ ঘরের মানুষ এত বড় ক্ষতি করে গেল। কি হত রাফাতকে বাইরে স্বাধীনতা দিলে বড়জোর আজ সিগারেটই ধরত। কিন্তু ছেলে কেন ছেলেকে পছন্দ করতে পারে না এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হত না আজকে। রাফাত মায়ের বুকের শুয়ে ভাবছে শুধু, “রুপক তুমি কোথায়? আমি যে তোমায় খুব পছন্দ করি। খালু যেমনটা আমায় করে। কিন্তু এরা কেন যে এটাকে অপরাধ হিসেবে নিচ্ছে? খালু একা এতরাতে কোথায় যাবে? রুপক তুমি ফিরে এস, আমার একদমই এগুলো ভালো লাগছে না।” আর আমি লেখক ভাবছি, “হায়রে রাফাত তুই জানিস না তোর খালু তোর মধ্যে কত খারাপ একটা জিনিসের বীজ বপন করেছে।

৭.
সকাল ১০ টার মাঝেই সবাই বাংলো খালি করে চলে গেল। রাফাত, রাজিয়া আর রাজ্জাক সাহেব থাকলেন। তারা চান রাফাত কিছু ভালো স্মৃতি নিয়ে ফিরুক। রাফাত বাইরে যেতে চাইল। রাজিয়া বললেন চল, আমি নিয়ে যাচ্ছি। রাফাত না করল, সে গোরার সাথে যেতে চায়। রাজিয়া ভাবল ওর স্বাধীনতা দরকার। গোরা ছেলেটারও ভালো দায়িত্ববোধ আছে। তিনি অনুমতি দিলেন।

গোরা জিজ্ঞেস করল, “কখনও রেইলগাড়ি দেখছেন?” রাফাতের শব্দটা পরিচিত লাগল কিন্তু মনে করতে পারল না। “সামনেই একটা ষ্টেশন আছে। চলেন একটুপরেই গাড়ি আসবো।” রাফাত ওর পিছে হাটতে লাগল। ষ্টেশনে পৌছে ও হতবাক হল। ওর মাথা ঝিমঝিম করে, স্মৃতি মনে পরে। ও আর রুপক তেজগাঁও থেকে ট্রেনে চড়েছিল কমলাপুর ফিরে স্কুলে যাবে বলে। কিন্তু ওদের সামনের বগিতেই একটা ট্রাক এসে হামলে পড়ে। রুপক দরজায় দাঁড়িয়ে বস্তি দেখছিল। অ্যাকসিডেন্টের সময় রুপকে দরজা থেকে ছিটকে বাইরে পড়তে দেখে রাফাত। এদিকে রাফাত নিজে ছিটকে একটা চেয়ারের ফোমের উপর পড়ে। মাথাটা বগির লোহায় বাড়ি লাগে। আর তার মনে নেই।

মাথা ঝিমঝিম করে। হঠাৎ ট্রেনের শব্দে রাফাত ঘুরে তাকায়। গোরা বলে, “এইটা এখানে থামবে মনে হয়। ২০ মিনিট পরে আরেকটা বড় ষ্টেশন আছে ওইখানে সব ট্রেন থামে। চলেন ঘুইরা আসি।” বলে গোরা কাউন্টারে যায় এইটা এখানে থামবে কি না জানতে। থামলে সে পরের ষ্টেশনের দুইটা টিকিট নিবে। অন্যদিকে রাফাত উঠে দাঁড়ায়। সে দেখতে পায় রুপক ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। তার পিছনেই একজন সবুজ একটা নিশান বাতাসে ভাসাচ্ছে। রাফাত সবুজ নিশানের মানে জানে। সবুজ নিশান দিয়ে বোঝানো হয় সব ঠিক আছে। তার মানে রুপক ইঞ্জিনের সামনে ঠিকই আছে। সে রুপকের দিকে দৌড়ে যায়। ষ্টেশন মাষ্টার সবুজ নিশান নাড়তে নাড়তেই হতবাক হয় দেখে একটা ছেলে রেললাইনের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে।
আরেকটা ছেলে তার পিছে দোড়ে চিৎকার করে বলছে, “ছোডো সাব, এই ট্রেন থামত না।” কিন্তু সামনের ছেলেটা ট্রেন আসতেই ইঞ্জিনের দিকে হাত বাড়িয়ে কিছু ধরার জন্য লাফ দেয়। ষ্টেশন মাষ্টার যেন লাল নিশান উড়াতেই ভুলে গেলেন। সবুজ নিশান রাফাতকে রুপকের খুবই কাছে নিয়ে গেল। কারণ এই প্রতিকূল সময়ে রুপককেই রাফাতের বেশী দরকার। হয়ত আগের স্কুল পালিয়ে হাত ধরে ঢাকা দেখার মতই দুজন ঘুরে ঘুরে জান্নাত দেখবে। কারো মনেই তো পাপ ছিল না..

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.