হাজার বর্ষা রাত

অরণ্য রাত্রি

এক
ফাল্গুনের শেষ। চৈত্রের লু হাওয়া বইছে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি যে হয় না তা নয়। আজও হয়তো বৃষ্টি হবে।আকাশটা কালো হয়ে রয়েছে।দুপর কে সন্ধ্যা বলে বিভ্রম হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি নামবে বলে মনে হচ্ছে।
অপুর কেন জানি ক্লাসে আজকে মন নেই। অথচ অপু ফাঁকিবাজ ছাত্র নয়। ভাল ছাত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচিত। আসলে এই কয়দিন যাবত অপু একটু অস্থির। কয়েকদিন যাবত চ্যাট হচ্ছে একটি যুবকের সাথে। বয়স ত্রিশ বত্রিশ হবে। অবশ্যই নিষিদ্ধ জগতে। ফেক আইডি তে। হ্যাঁ অপু সমকামী। তাই তো সমস্ত আগ্রহ ছেলেদের প্রতি। মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করে। কিন্তু শারীরিক আকর্ষণ বোধ করে না।আর এমন বৃষ্টি ভেজা দিনে মন তো কারো জন্য একটু অস্থির হবেই। বয়সটা তো এমনই।
ঝর ঝর করে বৃষ্টি ঝরেই পড়লো। কিভাবে বাড়ি যাবে ভাবছে অপু। বাড়ি গিয়ে চ্যাট করবে। পড়াশোনার বাইরে এটাই তার বিনোদন। অবশ্য সুপার হিরো দের নিয়ে সিনেমা দেখতেও সে অসম্ভব পছন্দ করে। বাড়ি বলতে মেস। তার পরিবার থাকে ময়মনসিংহে। যে মানুষ টার সাথে পরিচয় হয়েছে তার নাম রূপক। রূপকের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে সে খুব সাধাসিধে সরল প্রকৃতির যুবক। অন্তত সেক্স ফ্রিক না। কারন এখন পর্যন্ত রোল জানতে চায় নি। তার চেহারা খুব সাধারণ।অবশ্য চেহারা নিয়ে অপু খুব বেশি চিন্তা করে না। মানুষ টা কেমন সেটাই তার কাছে মূল আগ্রহ।
বৃষ্টি থামা পর্যন্ত বিশবিদ্যালয়ে বসে রইলো অপু। এরপর যখন বৃষ্টির অঝোর ধারা থেমে গেল টুপটাপ করে বৃষ্টি পরতে লাগলো তখন সে ওই হাল্কা বৃষ্টি তে ভিজেই বাড়ি গেলো। খাবার রান্না করে রেখে গিয়েছে মেসের বুয়া। খেয়ে দেয়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে স্মার্ট ফোন টা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকলো অপু। নাহ রূপক অনলাইন নেই। অপু একটু হতাশই হল। কিন্তু কি করা। ভাবলও সাইন আউট করে ঘুম দিবে। ঠিক সেই সময় রূপক অনলাইন হল।
হাই , হ্যালো হবার পর একটা প্রশ্ন শুনে অপু প্রচণ্ড বিরক্ত হল। রূপক কে অপু সরল ভেবেছিল। অথচ আজকে তার প্রথম প্রশ্ন
– আপনার রোল টা জানতে পারি?
– না।
এই উত্তর দিয়েই অপু সাইন আউট হয়ে গেলো। এভাবে হয় নাকি। এই নিষিদ্ধ জগতের সবাই খারাপ। আর ঢুকবেই না এই আইডি তে।
২ দিন গেলো। কেন যেন আবার রূপকের সাথে আবার চ্যাট করতে ইচ্ছা হল অপুর। একবার না হয় রোল জিজ্ঞেস করেছেই। তাতে কি একটা মানুষ খারাপ হয়ে যায়।সে ভাবলও আরেকটু চ্যাট করেই দেখি। যা ভাবা তাই কাজ। ফেসবুকে লগ ইন করলো ফেক আইডি তে। ঢুকেই দেখলও অনেক গুলো অফলাইন মেসেজ। রূপক দিয়েছে।
– আপনি কি মাইন্ড করলেন?
– আমি সরি আমার এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা উচিৎ হয় নাই।
– আপনি কি আর আসবেন না? নাকি আমাকে অফলাইন দিয়ে রেখেছেন
– ভাল। আমার সাথে আর চ্যাট করার দরকার নেই। আমি তো খারাপ। রোল জিজ্ঞেস করি।
অফলাইন মেসেজ গুলো পড়ে অপুর কেমন হাসি পেলো। লোকটা কেমন বাচ্চা বাচ্চা। তার উপর আবার অভিমান করেছে। কেমন যেন মায়া লাগছে অপুর।সেদিন আবার নতুন করে অপুর সাথে রূপকের চ্যাট শুরু হল। এরপরে ফোনে কথা হল।ফোনে কথা বলে বেশ ভাল লাগলো কিন্তু দেখা আর হয় না। অপুর ক্লাস থাকে। পরীক্ষা থাকে। তাই সে সময় বের করতে পারে না। এদিকে রূপক ব্যবসা করে। নিজের ব্যবসা তাই যখন তখন সময় বের করতে পারে। রূপক দেখা করার জন্য অস্থির হয়ে গেলো । অবশেষে ২৬ শে মার্চ ২ জন দেখা করবে বলে ঠিক করলো।
দেখা হবে ধানমন্ডি লেকে। সকাল ১১ টা দেখা হবে। অপু দেখা করার ১৫ মিনিট আগে পৌঁছে গেলো। আর কিছুখনের মাঝেই নামলো ঝুম বৃষ্টি। অপু কোনমতে একটা ছাউনি মত জায়গায় আশ্রয় নিল। কিছুক্ষণের মাঝে ফোন আসলো রূপকের
– কোথায় তুমি?
– এইতো ধানমন্ডি লেকেই তো
– লেক বিশাল এলাকা জুড়ে। তুমি কোথায় ?তোমাকে যেখানে থাকতে বলেছিলেম সেখানে তো নেই তুমি
– আসলে বৃষ্টি শুরু হওয়াতে আমি দৌড়ে একটা ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু জায়গাটা কোথায় ঠিক বলতে পারছি না।আমি তো এদিকে কক্ষনো আসি নাই
– আচ্ছা আশে পাশে কি আছে বল তো । আমি খুঁজে বের করছি।
– এইতো একটা মসজিদ আছে।
– আচ্ছা আমি বুঝেছি। আসছি।
কিছুক্ষণের মাঝে নীল একটি ছাতা মাথায় রূপক এসে হাজির হল ছাউনির নিচে। অপু একবার দেখেই চিনে ফেললো। রূপক অপুর দিকে তাকিয়ে হাসলও । রূপক ও চিনতে পেরেছে। বৃষ্টি যখন থেমে টুপ টাপ করে পরছে তখন দুইজনে হেঁটে হেঁটে ডিঙ্গি রেস্টুরেন্টে এসে বসলো। ধূমায়িত কফি খেতে খেতে গল্প করছে তারা। কত কথা! কেউ একটা প্রসংগ শুরু করলে আরেকজন তা শেষ করে। বৃষ্টি আবার জোরে সোরে পরা শুরু করলো। বেলা হয়ে গিয়েছে। বাড়ি যেতে হবে। একটা ছাতার নিচে ২ জন হাঁটতে লাগলো। কিন্তু একটা ছোট ছাতায় কি পুরোপুরি না ভিজে থাকা যায়? ২ জনেই কম বেশি ভিজে বাস স্টপে এসে উপস্থিত হল। আকাশ আঁধার হয়ে আছে এখনো। মধ্য দুপুর কে সন্ধ্যা বলে মনে হচ্ছে। এভাবে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ২ জনের মধ্যে প্রেমটা হয়ে গেল। ২ জন ২ দিকে যাবে। তাই আলাদা আলাদা বাসে উঠলো। বিদায় নিবার সময় ২ জনেই কি যেন ভাবছে আনমনে। আসলে ২ জনের মনেই একই প্রশ্ন “আমাকে পছন্দ হয়েছে তো”?
বাসে বসে অপু ভাবছে দিনটার কথা। একটা স্বপ্নময় দিন। এইভাবে কক্ষনো সে আগে কারো সাথে দেখা করে নাই। আর রূপক কে তার অসম্বভ ভাল লেগেছে। কিন্তু রূপকের কি ভাল লেগেছে? ঠিক এমন সময় রূপকের মেসেজ আসলো
“ ধন্যবাদ এত সুন্দর একটা দিন উপহার দেবার জন্য। তোমাকে আমার অসম্ভব ভাল লেগেছে। তোমার আমাকে কেমন লাগলো ? নিশ্চয় ভাল লাগে নাই। আমি তো বুড়ো। তোমার থেকে অনেক বয়স্ক। তার উপর চেহারাউ ভাল না”।
অপু মেসেজটা পড়ে হেসে দিল। লোকটা এত ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগে কেন?তার বয়স বেশি আছে ঠিক। কিন্তু সেটা তার কাছে ভালবাসার জন্য কোন বাঁধা নয়। এমন হলে তো সে দেখাই করতো না। আর মানুষ টা দেখতে মোটেও তেমন খারাপ নয়। কেমন বাচ্চা বাচ্চা একটা ভাব রয়েছে। আর কথা বলার ভঙ্গী, প্রসঙ্গ কোন কিছুতেই তাকে বুড়ো মনে হয় নাই। বরং তার সমবয়সী মনে হয়েছে। অপু মেসেজ পাঠালও
“ আপনি এত ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগেন কেন বলেন তো ? আপনাকে আমার মোটেও বুড়ো মনে হয় নাই। আর আপনাকে অনেক অনেক ভাল লেগেছে। আর কক্ষনো নিজেকে বুড়ো বলবেন না”।
কিছুক্ষণের মাঝেই রূপকের কাছ থেকে আরেকটা মেসেজ আসলো
“ তাহলে কি আমরা আজকে ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস টা দিয়ে দিতে পারি?”
অপু মেসেজ পড়ে হাসলও । রিপ্লাই পাঠালও
“ অবশ্যই দিতে পার। কারণ আমি তোমাকে ভালবাসি”
সেদিনই ফেসবুকে আরেকটা রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আসলো। কংগ্রাচুলেশনের বন্যা বয়ে গেলো স্ট্যাটাসের নিচে।আপাত দৃষ্টি তে মনে হয় এই রিলেশনটা হওয়া তে সবাই খুব খুশি হয়েছে। আসলে কি তাই?
দুই
রিলেশন হয়েছে বেশ অনেকদিন কেটে গিয়েছে। এর মাঝে অনেকেই ইনবক্সে অপু কে অনেকেই কিছু মেসেজ দিয়েছে। কেউ বলেছে
“বুড়োর সাথে কেন রিলেশনে গেলে”
কেউ বলেছে
“এই রিলেশন ২ মাসও টিকবে না”।
কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক কথা বলেছে তিন জন। তারা রূপকের নামে নানা বাজে কথা বলেছে। এর মাঝে একজন বলেছে
“ রূপক খুব খারাপ। এখন বুঝতে পারবে না। কয়েকদিন গেলেই বুঝবে। ও অনেকের সাথে সেক্স চ্যাট থেকে শুরু করে সেক্স করে বেড়ায়”।
বাকি ২ জনের কথাও অনেকটা এরকম।
এসব মেসেজ পড়ে আর অপু হাসে। সবাই জেলাসি থেকে এমন বলছে। মানুষের ভাল অনেকেই সহ্য করতে পারে না তো।রূপক এমন হতেই পারে না।ও কত ভদ্র। একদম পারফেক্ট জেন্টেল ম্যান যাকে বলে। এই সব মেসেজের কথা সে রূপক কে কিছুই বলল না। বরং তাদের কে ব্লক করে দিল অপু।
তিন
আজ রূপকের বাসায় থাকবে অপু। রূপক একটা ছোট ফ্ল্যাট নিয়ে একাই থাকে। রূপকের ফ্ল্যাট টা খুব সুন্দর করে সাজানো। রূপক খুব গোছান ছেলে। আর তার রুচির প্রশংসা করতেই হয়।ঘরের রঙ থেকে শুরু করে বিছানার চাদরে পর্যন্ত রুচির ছোঁয়া রয়েছে। সেদিন রাতে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার হল। সমস্ত খাবার রান্না করেছে রূপক একাই।সর্ষে ইলিশ , চিংড়ি মাছের মালাইকারী , মুরগীর কোর্মা আরও কত কি!সেরকম মজা হয়েছে খাবার গুলো। খাওয়ার পর রূপক গিটার নিয়ে বসলো। আর অপু গান গাইলো। অপু খুব সুন্দর গান গাইতে পারে। তারপর যখন আরও রাত হল।চারিদিক শুনশান হয়ে গেলো। এমনিতেই রূপকের ফ্ল্যাট টা অনেক উপরে। ১০ তলায়। বারান্দা থেকে ঢাকা শহরের একাংশ দেখা যায়। এই রাতেই প্রথম তাদের প্রেম হল। একজন আরেকজন কে ভালবাসলো। হৃদয় উজার করে ভালবাসলো।গভীর চুম্বনে ডুবে গেল একজন আরেকজনের ঠোঁটের মাঝে। আদর করলো শরীরের সমস্ত কামনা দিয়ে। একসময় বিছানার ঝড় থেমে আসলো। দুইজনের শরীর নিস্তেজ হয়ে আসলো।
তারপর ২জন ২ জনকে জড়িয়ে কত কথা বলল। যে যার পূর্বের জীবনের কথা বলল। অপু বলল তার আগের প্রেমের কথা। আরও বলল তার কাজিনের সাথে সেক্সের কথা। রূপকও তার আগের প্রেমের কথা বলল। ২ জনেই তাদের সকল যত গোপন কথা ছিল স্বীকার করে নিল। রাতটা একটি স্মরণীয় রাত হয়ে থাকলো তাদের জীবনে।
অপু তার রিলেশন নিয়ে সুখী। জীবনে রূপক কে পেয়ে সে ধন্য। রূপকের মত ছেলেই হয় না। আর মানুষ জন কত কথা বলেছে। আজ মানুষের কথা শুনে নাই দেখে রূপক কে পেয়েছে। রূপক নাকি সেক্স ফ্রিক । হুহ। কোন দিন রূপকের মাঝে সেক্স নিয়ে ক্রেজিনেস দেখে নাই সে। হ্যাঁ রূপকের বয়স তার থেকে বেশি। সেটা তার কাছে ম্যাটার করে না। রূপকের সাথে তার সম্পর্ক এখন এমন যে তাকে তার কোন দিন থেকেই বয়স্ক মনে হয় না।এখন প্রায়ই অপু রূপকের বাসায় আসে। রাতে থাকেও মাঝে মাঝে।দুজনের জীবন এখন ভালবাসায় পরিপূর্ণ।
চার
আজ আবার অপু এসেছে রূপকের বাসায়।বর্ষা কাল। প্রতিদিন ই বৃষ্টি হয়। আজও হচ্ছে। মুষলধারে বৃষ্টি পরছে। আজ রূপকের মুড কেন জানি অফ। রান্না তেমন ভাল হয় নাই। লবন দিতেই ভুলে গিয়েছে একটা তরকারি তে। খাওয়া শেষে দুইজনেই শোবার ঘরে এসে বিছানার উপর বসলো ।অপু রূপককে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে চুম্বন দিতে গেলো। কিন্তু রূপক সরে গেলো।অপু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো
– কি হল?
– আমাকে আদর কর না। আমি এর যোগ্য নই।
– মানে
– বললাম তো যোগ্য নই
– খুলে বল তো কি হয়েছে।
তারপর রূপক কান্না ভেজা কণ্ঠে যা বলল তা অনেকটা এরকম।
রূপক অনেক আগে থেকে এই নিষিদ্ধ জগতের অধিবাসী। সে অপুর সাথে রিলেশন হবার আগে অনেকের সাথে রিলেশন করেছিল তা অপু কে আগেই বলেছিল। কিন্তু সে যে সেক্স ফ্রিক ছিল তা কক্ষনো বলে নাই। সে হেন মানুষ নেই যার সাথে সেক্স করে নাই। অন্য আইডি খুলে সেই আইডি তে সেক্স চ্যাট , ক্যাম সেক্স ও করেছে।সে মোটেও সহজ সরল নয়।এই কথা গুলো শুনে অপু প্রথমে হেসে উঠলো
– তুমি নিশ্চয় রশিকতা করছো আমার সাথে
– না।
– কি বল! আমি বিশ্বাস করি না এগুলো
– আমি জানি তুমি এই কথাই বলবে। কিন্তু আমি আসলেই অত ভদ্র সভ্য নই।
– এগুলো আগে বল নাই কেন?এত দিন আমাদের রিলেশন!
– রিলেশন ভেঙে যাবে এই ভয়ে বলি নাই।
– তাহলে এখন বললে কেন?
– আমি প্রতিদিন বিবেকের দংশনে দংশিত হতে হতে আর পারছিলাম না। আমার কেবলি মনে হচ্ছিল তোমাকে আমি ঠকিয়েছি।তাই আজ বলেই ফেললাম। জানি তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। তাও বললাম। আর পারছিলাম না সত্য গোপন করে রাখতে।
– তার মানে আমাকে যারা তোমার সম্পর্কে নানা কথা বলেছে। তারা সত্য কথাই বলেছে। আমি সব অবিশ্বাস করেছিলাম আর বোকার মত তোমার সব কথাই বিশ্বাস করেছি। তুমি আমাকে এইভাবে ঠকালে ?
– বিশ্বাস কর রিলেশন হবার পর আমি কারো সাথে কিছু করি নাই।
– তাতে কি? তুমি তো বিশ্বাস ভঙ্গ করেছো। আর সম্পর্কে বিশ্বাস না থাকলে সেই সম্পর্কের কোন মূল্য নেই।
– আমি না বললে কি তুমি কক্ষনো বুঝতে পারতে?আমি তো নিজেই স্বীকার করলাম।
– তুমি আগে কেন বল নাই। দূর! আমার কিছু ভাল লাগছে না।আমি এখন চলে যাবো
– এত রাতে? এই বৃষ্টির মাঝে?
– হ্যাঁ হ্যাঁ । এখনই, এই মুহূর্তে
– প্লিজ সকাল হলে বৃষ্টি থামলে তারপর যাও।
– না এখনই যাবো
– তাহলে কি আমাদের সম্পর্ক শেষ ?
– জানি না!
অপু আর কথা না বাড়িয়ে বৃষ্টির মাঝেই সে রাতে রূপকের ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে গেলো। রূপক তাকিয়ে দেখলো । কিন্তু আটকালো না। আসলে আটকিয়ে কি লাভ। তার কথা তো অপু শুনবে না। সে তো ঠকিয়েছে অপু কে। সারাটা রাত সে একটুও ঘুমাতে পারলো না। বারান্দায় বসে রইলো।অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরলো।আর চোখ থেকে পানি পড়লো রুপকের। সে বুঝলো এই সম্পর্ক এখানেই শেষ। তার নিজের প্রতি খুব রাগ হচ্ছে। সে কেন রিলেশনে যেতে চেয়েছিল। তারমত নষ্ট ছেলের তো রিলেশনে যাওয়া উচিৎ নয়। সে তো ভাল হয়ে যেতে চেয়েছিল। সে চেয়েছিল সারা জীবনের জন্য একজনের হয়েই থাকতে। কিন্তু এটা ভুল ভাবনা। কেউই তাকে গ্রহণ করবে না।
আর অপু বৃষ্টির মাঝেই হাঁটতে লাগলো রাস্তা ধরে। সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো রাস্তায় বৃষ্টির পানি তে পরে প্রতিবিম্ব তৈরি করছে। সেই রাস্তা ধরে অবিরত হেঁটে চলল অপু। বুকে জমানো অভিমান। এভাবে বিশ্বাস ভঙ্গ করলো রূপক। তার বিশ্বাসের এই মূল্য দিল রূপক। অজান্তেই চোখ থেকে পানি পরতে লাগলো অপুর।
পাঁচ
প্রতিদিনের মত এখন আর অপুর মোবাইলে কল আসে না ভোর বেলায়। কেউ তাকে গুড মর্নিং জানিয়ে ডেকে তুলে না। কেউ আর বাচ্চাদের মত আদুরে ভঙ্গি তে কথা বলে না তার সাথে। কেউ অভিমান করে বলে না অপু কে যে কেন অপু তাকে কল দেয় না। হ্যাঁ অপু আর কল দেয় না রূপক কে। তাতে কি রূপকের একটুও অভিমান হয় না? জীবন টা কেমন অগোছালো হয়ে গেল অপুর। কিছুই তার ভাল লাগে না। কাকে যেন মিস করে সে সব সময়। কিন্তু যে তার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে তাকে কি মিস করা ঠিক ?সে চাইলেই অন্য কারো সাথে রিলেশন করতে পারে। কত মানুষ তার সাথে রিলেশন করতে চায়। কিন্তু অপুর একটুও ইচ্ছা করে না। বরং চ্যাট করার পরিমাণ সে একদম কমিয়ে দিল। রূপক কে সে ফেসবুকে ব্লক করে নাই । মাঝে মাঝে রূপক কে অনলাইন দেখায়। কিন্তু রূপক কে সে নক করে না। রূপকও করে না। কোন মুখে রূপক নক করবে তাকে। তাই আর অনলাইন হতেও অপুর ইচ্ছা করে না। পড়াশোনায় মন দেয়। কিন্তু পড়া কি আর হয়? সব সময় তো একজনের ভাবনা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
রূপক আজ প্রায় অনলাইন থাকে। অপু অনলাইন হয় কিনা তা দেখার জন্য। অপু অনলাইন হয় খুব কম। অনলাইন হলেই রূপকের মনে হয় এই বুঝি অপু তাকে নক করবে। আদুরে ভঙ্গি তে আগের মতই জিজ্ঞেস করবে
“ কি কর হানি?”
কিন্তু তা আর হয় না।অপু তাকে নক করে না।রাতে রূপকের ঘুম হয় না। তার মনে হয় এই বুঝি অপু তাকে ফোন দিল। কিন্তু রূপক , অপু কে ফোন দেয়ার সাহস পায় না। কোন মুখে সে ফোন দিবে? ফোন দিলে হয়তো শুধু গালিগালাজ শুনতে হবে। অবশ্য গালিগালাজ ই তার প্রাপ্য।
এভাবে সাত দিন কেটে গেল। জীবন থমকে গিয়েছে দুইজনেরই। ভালবাসার এত ক্ষমতা ! দুইজনের জীবন কে ওলট পালট করে দিল।
ছয়
রাত গভীর। ঝুম বৃষ্টি। সেদিনের মত বৃষ্টি পরছে।রূপকের মনে হচ্ছে সেদিনের পর হাজার বর্ষা রাত চলে গিয়েছে।কিন্তু আসলে তো মাত্র সাত দিন, সাত রাত। রূপক গিটার হাতে বসে আছে বারন্দায়। মাঝে মাঝে গিটারে টুংটাং শব্দ করছে। কিন্তু মন নেই গিটারের দিকে। এক সপ্তাহ পরে গিটার হাতে নিয়েছে সে। এইবার গিটার ছেড়ে মোবাইল হাতে নিল সে। এক সপ্তাহে বহুবার মোবাইল হাতে নিয়েছে সে। কিন্তু সাহস করে ফোন দিতে পারে নাই কোন বার। আজ কি একবার ফোন দিবে। চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে রূপকের। আজ একবার ফোন দিবেই সে। যা খুশি বলুক অপু।গালিগালাজ করুক। সব শুনবে সে।
অপু শুয়ে আছে। হটাত মোবাইল বাজতেই চমকে উঠলো সে। মোবাইল হাতে নিয়ে তার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেলো। এতদিন পর রূপকের ফোন। ফোন রিসিভ করলো অপু।
– হ্যালো
ওপাশ থেকে কেউ কথা বলছে না। শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। অপু আবার বলল
– হ্যালো
– তুমি কি আমাকে ক্ষমা করে দিতে পারো না?আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।
অপু ধমকে উঠলো
– এত দিন পর ক্ষমা চাওয়ার কথা মনে হল। জানো প্রতিদিন তোমার ফোনের অপেক্ষায় আমি বসে থাকি।
এইবার রূপক অবাক হয়ে বলল
– সত্যি?
– হ্যাঁ সত্যি।তুমি কিছু কথা বললে আর তাতে আমাদের এতদিনের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে?আমাদের সম্পর্ক কি এতই ঠুনকো ? কাগজের নৌকার মত।
– আমি তো খারাপ
– আগে কি করেছো তা নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই। আমার শুধু অভিমান হয়েছে আগে কেন বল নাই।
– আগে বললে তুমি আমার সাথে সম্পর্ক করতে না যে।
– এটা তোমার ভুল ধারণা । আমিও ধোয়া তুলসী পাতা ছিলাম না। তোমার বয়স বেশি, সুযোগ বেশি ছিল। আমার ছিল না। তাই হয়তো আমি তোমার মত হই নাই। আর সবচেয়ে বড় কথা রিলেশনের পরে তুমি কি করছো সেটাই আমার কাছে আসল কথা।
– তাহলে এত দিন ফোন দিলে না একবারও …
– আমি অপেক্ষা করছিলেম কবে তুমি ফোন দিয়ে আমার অভিমান ভাঙাবে
– ঈশ কেন যে এতদিন পর ফোন দিলাম।আরও আগে ফোন দিলেই পারতাম। আমি ভেবেছিলেম ফোন দিলে তুমি আমাকে বকবে।
– উফ! একটু বকা শুনলে কি হয়?আচ্ছা এখন পাঁচ মিনিটের মাঝে নিচে নামো। আমি তোমার ফ্ল্যাটের নিচে আসছি ।
– এই বৃষ্টির মাঝে?
– তো কি হয়েছে? তোমাকে আসলেই বকা দেয়া উচিৎ। একটুও রোম্যান্টিক হতে পারো না তুমি।আজকে বৃষ্টি তে ভিজবো দুইজন।
ভালবাসার এত ক্ষমতা ! নিমিষেই দুইজন কে এক করে দিল।
পরিশিষ্ট
ভালবাসলে মান অভিমান থাকবেই। কিন্তু সম্পর্কের খুঁটি শক্ত হলে তা এত সহজে নষ্ট হবে না। অপু আর রূপকের মাঝে এই ঘটনার পর ভালবাসা আরও তীব্র হয়েছে। দুইজন দুজন কে পাগলের মত ভালবাসছে।ভালবাসা তাদের জীবন কে পরিপূর্ণ করে দিয়েছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.