বেস্টফ্রেন্ড

 শঙ্খদীপ

-১-
জানলাটা খোলা। রোদ্দুর এসে মেঝে ছুঁয়েছে। ঘরে পাখা চলছে। হাওয়ায় জানলায় পর্দা দুলছে আর তার ছাওয়া মেঝেতে রোদের গায়ে খেলা করছে। পাখাটা খুব বেশি পুরোনো না। দু-তিন বছরের কেনা। এর মধ্যেই কেমন ঘ্যারঘ্যার শব্দ করে ঘোরার সময়। সেটার শব্দ হচ্ছে একটানা। বিছানায় মোবাইল নিয়ে খুটুরখাটুর করছে শিব। শিবের পুরো নাম শিবাশীষ। খুব গরম পড়েছে, তাই জামার বোতাম গুলো খোলা! উন্মুক্ত বুকে হালকা হালকা লোম। পেটে মেদ নেই। মন্থর গতিতে উঠছে নামছে। নীল ডেনিমের ওপর ভেতরের আন্ডারওয়্যারের স্ট্র‍্যাপ বেরিয়ে আছে। কিছুটা সাদা-কালো ডোরা প্রিন্টও দেখা যাচ্ছে। পা’টা দেওয়ালে তুলে দিয়ে দিব্যি নাড়াচ্ছে। ঘরে ঢুকল বছর বাইশের একটা মেয়ে। শিউলি। ঢুকতেই একবার থমকে দাঁড়ায় দরজার কাছে। হাতে তার জামাকাপড়ের বোঝা! যে কোনো মেয়ের জন্যেই এই দৃশ্য মনোরম হলেও তা লজ্জার কারণও বটে। তাও ছেলেটার যখন লজ্জা নেই তখন তারই বা লজ্জা করে কি হবে?
আসছি, বলে ঘরে ঢুকে এল শিউলি। দেখি সরে শৌ!
তোর এসেই শুরু হয়ে গেল তো! বললেও সরে শোয় শিব। শিউলি হাতের জামাকাপড় গুলো খাটে নামিয়ে রেখে ভাঁজ করতে থাকে। শিবও ফোনে ব্যস্ত।
জামাকাপড় ভাঁজ করতে করতে শিউলি চোখ বুলিয়ে নেয় শিবের আদুরো বুকে। ভাবে নাম শিব, এদিকে ফরসা। লোমশ বুক দেখতে শিউলির খুব ভাল লাগে। রুদ্র দাদার বুকে ভালো লোম। এর বুকে লোম নেই। সারা গায়ে শুধু নাভি থেকেই যা একটু লোম দেখা যায়।
এমনিতে শিবের লজ্জাশরম একটু কম। তাও সে জামাটা গায়ে জড়িয়ে নেয়। বোতাম লাগায় না। এক্ষুণি বেরিয়ে যাবে শিউলি, তখন আবার খুলতে হবে। সে জানেনা যে শিউলি তার দিকে দেখছে কি না, কিন্তু তাও যেন তার একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।
শিউলি হঠাৎ লক্ষ্য করল দারুন ফুর্তিতে শিব পা ঘষে চলেছে দেওয়ালে। এই পা নামাও দেওয়াল থেকে!
রুদ্র কখন স্নানে গেছে রে? পা নামায় না শিব।
অনেকক্ষণ!
বেরোতে বল তাড়াতাড়ি!
তুমি বলো… তোমার বন্ধু হয়! বলে বেরিয়ে গেল শিউলি।
শোন একবার! শিব পিছু ডাকে।
কী? এমনভাবে সারা দেয় যেন শিব মহাভুল করে ফেলেছে।
একটু কফি বানিয়ে দে না!
পারছি না! আর এই গরমে কেউ কফি খায়? বলে চলে যেতে যায় শিউলি। শিব বলে, বলে দেবো কিন্তু!
এই একটা কথাতেই তুমি ফাঁসিয়ে রেখেছ আমাকে! বলে চলে যাচ্ছিল শিউলি।
রুদ্রকে বল তাড়াতাড়ি বেরোতে। শিউলি এবার আর সাড়া দিল না। সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দ পাওয়া গেল খালি।
চিৎ হয়ে শুল শিব। সিলিং ফ্যানটা আলো কেটে কেটে ঘুরে চলেছে। দেখলে মনে হচ্ছে তিনটে না, সারা চাকতি জুড়েই ডানা বসানো। ফোনটা পাশে রেখে বালিশের পাসের থেকে বইটা তুলে নিল। তিতাস একটি নদীর নাম। তারই বই। রুদ্র পড়বে বলে নিয়ে এসেছিল প্রায় দু’বছর আগে। এখন পড়ছে হয়ত। বইটা খুলতে গিয়ে টুপ করে কোন পাতা থেকে বেশ বুকমার্কটা খসে বুকের ওপর পড়ল। সে আবার বুকমার্কটা বইয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে ভাবলেশহীন ভাবে বইটা বালিশের পাশে রেখে দিল। বালিশটা তুলে দেখল। লাইটার। সিগারেটের প্যাকেটটা কোথায় রাখে কে জানে! ঘরটা ঠান্ডা। বাইরে রোদ্দুর খুব। হলুদ রোদ্দুর। খুব তাপ বাইরে। তাই ঘরটা কেমন নিস্তব্ধ লাগছে। পাখাটার একঘেয়ে আওয়াজে যেন নিস্তব্ধটা বেড়েছে বই কমেনি। বাইরে দিকে একটা লোহা ভাঙা টিন ভাঙা-ওয়ালা চলে গেল। তার চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে এমন গলার অবস্থা যে “লোহা ভাঙা… টিন ভাঙা” বলতে গিয়ে কথাটা আধরাস্তাতেই শেষ হয়ে যায়। যেন মনে হয় জং ধরা লোহার মতই তার গলায়ও বহুকালের জং ধরেছে। রুদ্রর ঘরের জানলাটা দিয়ে, খাটে শুয়ে শুয়ে, অনতিদূরের একটা নারকেল গাছ দেখা যায়। এখনও যাচ্ছে। দুটো কাক একটা ডালে কিছুটা তফাতে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর একটা উড়ে গেল। তার কিছুক্ষণ পর আরেকটাও উড়ে গেল। খাঁ খাঁ করছে গাছের পাতাটা। হাওয়া দিচ্ছে না। গাছের পাতা স্থির। রাস্তায় কে চ্যাঁচাল, মা জল এসেছে! এগারোটা বাজল বোধ হয়। ফোনটা দেখল। এগারোটা দশ। দশ মিনিট দেরীতে জল এল তাহলে!
রোদের আকাশে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে আকাশের রংটা কেমন পানসে পানসে লাগে। দেখে মনে হয় এই রঙে তো ছাওয়া হওয়ার কথা, তাও রোদ কেন কে জানে! হঠাত ছড়ছড় শব্দ তুলে গাছের পাতাগুলো দুলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে রুদ্র ঘরে ঢুকল।
কি রে তুই কখন এলি?
এই তো!
এনে কফি!
শিউলিটা খুব ফাঁকিবাজ!
ওর তো তোর মত শুয়ে বসে কাজ না! রুদ্র বলে।
তুই এতক্ষণ কি করিস বাথরুমে! শ্লেষটা ঘুরিয়ে দিল সে রুদ্রর দিকে।
বাথরুমে মানুষ কি করে? বলে পড়ার টেবিল থেকে চিরুনিটা নিয়ে চুল আচড়াতে থাকে। রুদ্রের ঘরে আয়না নেই। সে নিজের মতই আচড়ায়। পরনে একটা গামছা। খালি গায়ে সদ্য স্নানের সাবানের সৌরভ! বুকেত লোমগুলো পাখার হাওয়ায় দুলছে। চুল আচড়াতে হাত তুলেছিল, তখন শিব লক্ষ্য করল, বগলের লোমগুলো কাটা। না, দেখার ইচ্ছা ছিল না, স্বভাব দোষে চোখ চলে গেল। ছেলে দেখার অভ্যাস থাকলে ওরম হয়। বন্ধু হয় বলে কোনো ছাড় পাওয়া যায় না।
চুলটা আচড়ে, রুদ্র বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ফিরে এল গায়ে পাউডার লাগিয়ে। চুলটাও সাইজ করে এসেছে আয়না দেখে বোধ হয়।
এসে খাটের ওপরের জামাকাপড় গুলো থেকে পাজামাটা বেছে নিয়ে আবার একবার বাইরে গেল। সিঁড়ির কাছে মুখ বাড়িয়ে চ্যাঁচাল, শিউলি আমার আন্ডারওয়্যার কোথায়?
বারান্দায় মেলাছিল তো! নীচ থেকে সিঁড়ি পথে উত্তর এল। আবার কোথাও গেল। বারান্দায় বোধ হয়। পাশের ঘর দিয়ে বারান্দায় যাওয়া যায়। লাল রঙের একটা আন্ডারওয়্যার নিয়ে এল হাতে করে। পরে নিল। পাজামাটাও পরল। তারপর একটা স্যান্ডোগেঞ্জি চাপাল গায়ে। টাইট স্যান্ডোগেঞ্জিতে বুকের বৃন্তদুটো উদগ্রীব হয়ে ফুটে রয়েছে।

তা তোদের ঝামেলা মিটল? জিজ্ঞাসা করল রুদ্র।শিব কফিতে চুমুক দিতে দিতে রুদ্রকে লক্ষ্য করছিল। শিব তার বেস্টফ্রেন্ড। সে কোনোদিনও তাকে সেই চোখে দেখেনি। তাও পুরুষ বলে তার বিভিন্ন জিনিষ তার চোখে পড়ে যায়। ওর ব্যাপারে এই রকমভাবে সে ভাবতেও চায়না। তাও, মানুষের মন। কখন কোনদিকে বয়ে চলে কে জানে। আজ যেমন, কেন তার হঠাত এই কথাটা মনে হল কে জানে যে তারা দুজন প্রেম করলে কেমন হত। মনে হতেই উত্তর এল, নাহ, বন্ধু হিসাবেই রুদ্র বেশি ভাল। প্রেমিক হিসাবে হয়ত অতটা হবে না। বা একদমই হবে না। কারণ সে প্রেমিক হিসাবে যেরকম ছেলে চায় তা রুদ্র কোনোদিক দিয়েই না। কিরকম ছেলে সে চায়, সেটা যদিও লাখ টাকার প্রশ্ন। কারণ এতদিন পর্যন্ত যাদের সাথে সে প্রেম করেছে, তাদের মধ্যে মিল খুঁজে বার করতে বললে, দেখা যাবে, মিল শূন্য। তাই তার থেকে প্যাটার্ন খোঁজা, যে এইরকম ছেলেই পছন্দ, তা বার করা মুশকিল। কিন্তু রুদ্রের বোদ্ধা ভাবটা ভীষণ বোরিং। বইয়ের বাইরে যে একটা জগত আছে তা রুদ্র বোঝে? এরকম একটা বোরিং ছেলের সাথে প্রেম করে মজা নেই। তার থেকে একটু ব্যাড-বয় টাইপের ছেলেদের সাথে প্রেম করে মজা আছে। এসব ভাবতে ভাবতেই রুদ্রের প্রশ্নটা এসে পড়ল। সে কফি কাপে আরেকবার চুমুক দিয়ে বলল, নাহ! ও ঝামেলা মিটবার নয়!

কেন? আবার কি হল। পাশে বসল রুদ্র। বসে কফিকাপটা শিবের হাত থেকে নিয়ে চুমুক দিল।
কি আবার হবে? ঐ যা হয়!
কি হয়?
আরে আমি কি সারাদিন বাড়িতে বসে থাকি বল! আমারও তো কাজ থাকে! সারাদিন মেসেজ করে খবর নিতে আমার ভাল লাগে না!
সেটা বল ওকে!
বলেছি!
কি বলে?
ধুস… বাদ দে!
দিলাম! তা আজ তো আমার কাছে না এসে তার কাছে যেতে পারতিস।
ধুস… ভাল লাগছে না! এখন দেখা করতে গেলেই ঝগড়া হবে। আর আমার বেশি হাইপার হতে ইচ্ছা করছে না! একেই গরম বাইরে। বলে হাসল।
রুদ্রও হাসল।
কাকিমা কোথায় রে?
মাসির বাড়ি গেছে আজ সকালে!
ও…
বলার সাথে সাথে কারেন্ট চলে গেল। গরমকালে এই এক সমস্যা। বাজে বাজে টাইমে কারেন্ট চলে যায়।
গেলো! বলেই উঠে পড়ল রুদ্র। সিঁড়ির কাছে মুখ বাড়িয়ে বলল, ফ্রিজের সুইচটা অফ করে দে শিউলি!

তুই একটা প্রেম কর এবার! কথা না পেয়ে বলল শিব। কেন বলল সে নিজেও জানে না। তার সাথে তার কিছুক্ষণ আগের ভাবনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না সেটাও সে জানে না। পাশ থেকে পাউডার আর সাবানের গন্ধ বেরোচ্ছে এখনও।
ধুস… নিজে প্রেম করে ভুগছিস, আবার আমাকে প্রেম করতে বলছিস!
আমি ভুগছি বলে তুইও ভুগবি?
শুধু তুই না, আশেপাশে অনেকেই ভুগছে!
যেমন?
তুই জানিস, রাকিব দা’র ব্রেকাপ হয়ে গেছে স্পন্দনের সাথে!
তাই নাকি! কবে?
আগের সপ্তাহে! ভাব! ৫ বছরের রিলেশন!
কত বছরের রিলেশন সেটা সত্যিই ম্যাটার করে না রে!
তা ঠিক! তারপর শ্রেয়া আর মালবিকাকে দেখ। মালবিকার তো নতুন গার্লফ্রেন্ডও হয়ে গেল!
তা, ব্রেকাপ হয়ে গেছে বলে কি কাঁদবে হাত পা ছড়িয়ে!
না তা না! তাও… একটু তো সময় নেওয়ার দরকার পড়ে।
কিচ্ছু পড়েনা! কে বলতে পারে ঐ মেয়েটার জন্যেই মালবিকা ব্রেকাপ করেছে শ্রেয়ার সাথে!
হতে পারে! তাহলে দেখ… ঝামেলার তো শেষ নেই।
তা বলে কি তুই সারাজীবন একা থাকবি?
তা কেন! দেখি… নিশ্চই কেউ আসবে!
তোর দিক থেকে তো কোনো চেষ্টা নেই!
তুই জানিস?
আন্দাজ করতে পারি!
কেমন করে?
এই যে তুই ফেসবুকে নেই… গ্রাইন্ডারে নেই… তা থেকেই। হোয়াটস্যাপেও নাম কা ওয়াস্তে! মেসেজ পাঠালে পড়বি কি না নিশ্চয়তা নেই।
রুদ্র হাসে!
হাসিস না আর! এবার প্রেমটা কর। আমি সিরিয়াস!
তুই দায়িত্ব নিয়ে একটা ছেলে খুঁজে দে!
কেমন ছেলে তোর চাই বল!
আমি বলতে বলতে ক্লান্ত! আর বলতে পারছি না!
ঢং শব্দে ফ্যান ঘুরতে আরম্ভ করল। আবার চলে গেল।
কোথাও লাইন সারাচ্ছে নাকি? একটু সহিষ্ণুতার সাথেই প্রশ্ন করে শিব।
হুস… এসব ওদের ডেলিকার ড্রামা! দুপুর হলেই এক নাটক! রুদ্রের অসহিষ্ণু উত্তর পেয়ে হাসে সে। ইতিমধ্যেই পাউডার গায়ে ঘামে জমতে শুরু করে দিয়েছে রুদ্রর। শিব শুয়ে শুয়ে দেখছিল রুদ্রর কপালে ঘাম বিন্দু। রুদ্রর স্কিনটা খুব সুন্দর। দেখলেই মনে হয় খুব পেলব।
শিব জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। গাছের পাতাটা নড়েই চলেছে। যেন কত বাতাস বইছে। অথচ তার হাওয়া একফোঁটাও ঘরে ঢুকছে না।
রুদ্র গান ধরল গুনগুন করে। লাল ইস্ক! এই গানটাই সে কাল রাত থেকে শুনছে তাই বারবার মুখে চলে আসছে। রুদ্রর মাঝে মাঝে একটা গানের ওপর ভালো লাগা তৈরি হয়। তখন সে বারেবারে এই একই গান শুনতে থাকে। বার বার। বার বার শুনে সে গানটার লিরিক্সগুলো মুখস্ত করে নিতে চায়। আর ততবার সে হারিয়ে যায় নিজের খেয়ালে।

রুদ্র আর শিবের আলাপ সেই স্কুল থেকে। রুদ্রর বাবা বদলি হয়ে কলকাতায় এল। তখনই রুদ্র ভরতি হল স্কটিশ চার্চে। ক্লাস সেভেনে। সেখান থেকেই শিবের সাথে তার পরিচয়। শিব বরাবরই খুব এক্সট্রোভার্ট। তার এই চনমনে ভাবের জন্যেই তাদের বন্ধুত্বটা হয়েছে। নয়ত হত না। কারণ রুদ্র নিজে যেচে বন্ধুত্ব করার মত ছেলে না। প্রথম ক’দিন দূর থেকেই সে শিবকে দেখেছে। স্মার্ট। বলিয়ে কইয়ে। স্কুল ড্রেসে ভীষণ হ্যান্ডসম দেখাতো শিবকে। রুদ্র কখনও বলেনি যদিও ওকে যে প্রথম প্রথম সে বিস্তর চাপ খেয়েছিল শিবের ওপর। তারপর সে চাপ বাড়ল যখন শিব যেচে তার সাথে আলাপ করল। তখন ও কি একটা পারফিউম ব্যবহার করত। কি সুন্দর গন্ধ বেরোতো ওর গা দিয়ে। শিবকে দেখেই মনে হত ওম্যানাইজার। ওর সাথে যারা যারা পড়ত তারা বলতও তাই যে ও মেয়ে চড়ানো পার্টি! রুদ্র ইলেভেনের আগে ব্যাচে পড়েনি কখনও। তাই শিবের এই বদনাম প্রত্যক্ষ করে দেখার সুযোগ হয়নি। ক্লাস ইলেভেনে ব্যাচে পড়তে গেল, তখন শিবের স্ট্রীম পালটে গেছে। তার সায়েন্স আর শিবের কমার্স। শুধু অঙ্কটাই তারা একসাথে করত। তাও সেখানে মেয়েদের সংখ্যা ভীষণই কম ছিল। পরে কানাঘুষোয় শোনা গেছিল টিচারটারই একটু চারিত্রিক দোষ আছে।
শিবের ফোনটা বেজে উঠতে ভাবনায় ছেদ পড়ল রুদ্রর। শিব ওপাশ ফিরে শুয়ে ছিল। ফোনটা বেজেই চলেছে। রুদ্র উঠে একবার দেখল। শিব ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফোনের ওপরে “মা” ভেসে আছে। রুদ্র ফোনটা ধরল।
হ্যাঁ কাকিমা… রুদ্র বলছি!… হ্যাঁ ও আমাদের বাড়িতেই আছে। ঘুমিয়ে পড়েছে।… না চিন্তা কোরো না ও এখানেই খেয়ে নেবে!… হ্যাঁ ভালো আছি! তুমি আর কাকু একদিন এসো না! বাবা পরের সপ্তাহ নাগাদ ফিরবে তখন এসো… আচ্ছা আসবে কিন্তু!
বলে ফোনটা রেখে দিল সে। গরমে গলার ভাঁজ ফিয়ে বুক হয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে শিবের। কারেন্টটা কখন আসবে কে জানে! হাওয়া দিচ্ছে মাঝে মাঝে। কিন্তু গরম হাওয়া। সে উঠে বইটা নিল। খুলেই বুঝল এ নির্ঘাত শিবের কাজ। ভাগ্যিস পেজ নাম্বারটা মনে ছিল।
শিউলি এল। শিব দাদা খাবে তো এখানে?
হ্যাঁ… তুই চিকেনটা বার করে দিস! ও ভালোবাসে।
সে দেবো! বলছি মোটামুটি রান্না হয়ে গেছে… আমি ঝট করে বাড়ি থেকে স্নানটা করে আসি! এসে খেতে দেবো।
যা!
দেড়টা মত বাজবে আসতে।
ঠিকাছে। তবে আর বেশি দেরী করিস না!
তুমি দরজাটা একবার কষ্ট করে দিয়ে যাও।
যাচ্ছি।
দরজাটা দিয়ে এসে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখল কারেন্ট চলে এসেছে। শিব চিৎ হয়ে শুয়েছে। একদিক থেকে জামা সরে গিয়ে বুক বেরিয়ে আছে। খয়েরী বৃন্তটা যেন কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে তার দিকে! সে কাছে এসে দেখল শিব হা করে ঘুমাচ্ছে। গলায় ঘাম। পাখার হাওয়ায় তা শুকিয়ে যাবে হয়ত।
সে জানলার কাছটা এসে দাঁড়াল। হঠাৎ করে ছাওয়া নেমেছে। রুদ্র জানে এ ছায়া বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না!

২.
প্রথম সবকিছুই খুব স্পেশাল হয়। সেই প্রথমবারের স্পর্শকাতর ফোনটা হারিয়ে গেল পুজোর সময়। তারপর আর বাবা কাছে ফোন কিনে দাও বলার মুখ ছিল না রাজের। প্রথম প্রথম ঠিক করেছিল আর ফোন ব্যবহার করবে না। রাগে নয়, কিছুটা দুঃখে আর কিছুটা ইতিমধ্যেই যে বোধটা দানা বেঁধেছিল যে একটু বেশিই ফোন ঘাঁটা হয়ে যাচ্ছে, তাতে। তখন মনে হয়েছিল, ভালোই হয়েছে ফোনটা হারিয়ে। উচ্চমাধ্যমিকের আগে ফোনটা হারিয়ে সত্যিই কাজের কাজ হয়েছিল তা রাজ মুক্ত কন্ঠে স্বীকার করে। তা না হলে রেজাল্টটা যা’ও বা হয়েছে, সেটুকুও হত না। কিন্তু বাড়ি থেকে বলা হল ফোন তো লাগবেই! কারণ স্কুল দূরে। কোচিং থেকে ফিরতে রাত হয়, ফোনটা রাখলে যোগাযোগের সুবিধা। তাই বাবার পুরোনো ফোনটাই জুটল এসে। প্রথম প্রথম অনাদর পেলেও অচিরেই সেই বাচ্চা ফোনটা স্নেহের পাত্র হয়ে উঠল। তাতে সবই করা যায়। নেট… ফেসবুক ইত্যাদি। কিন্তু স্ক্রিনটা এতটাই ছোটো যে করে মজা নেই। অতএব ধীরে ধীরে এসব দিকে রাজের একপ্রকার মোহমুক্তিই ঘটছিল। আর ত্যাগ করলে দারুন কনফিডেন্স বাড়ে। ত্যাগ শব্দটা খুব ভয়ঙ্কর এমনিতে। মনে হয় আসতে আসতে জীবন থেকে সব রঙ মুছে ফেলার নামই বুঝি ত্যাগ। আদতে তা না। ত্যাগ খুব কাজের। জলে নামব অথচ বেণী ভেজাবো না গোছের। সবই করব, কিন্তু তাতে বাড়তি কোনো আগ্রহ নেই। হলেও হয়, না হলেও হয়। হলে ভালো, না হলে আরো ভালো। এরকম।
এরপর আস্তে আস্তে উচ্চমাধ্যমিক মিটল। রেজাল্ট বেরোলো ৬৪ না ৬৫ দিনের মাথায়। হল মোটামুটি ভালোই। কলেজে ভরতি হল। পুরো দস্তুর ক্লাস শুরু হয়ে গেল। বন্ধুবান্ধব জমতে শুরু করল আশেপাশে। কিন্তু যা হয়, সবার কাছে ওরম বড় বড় ফোন। তাতে হরেক রকম জিনিষ। সবচেয়ে বড় জিনিষ তো whatsapp. এই ছ’সাত মাসের মধ্যেই এইটা যেন মানুষের জীবনকে একদম হাতের মুঠোয় করে ফেলেছে। ফেসবুক তখন ফ্যালফ্যাল করে দেখছে। রাজ বুঝতে পারে না, এই whatsapp টা আদতে কি? ফোন নাম্বার সেভ করলেই হয়? আবার ভয়েস নোট পাঠানো যায়। সে এক ভীষণ প্রলোভনের বস্তু। কিন্তু তার ছোট্ট ফোনটায় ফেসবুক হয়, কিন্তু whatsapp হয় না। হবেও না কোনোদিন। লোকে যে কেন বলে, নির্জনে সাধনা করতে এবার বুঝল রাজ। পাশে এত প্রলোভনের জিনিষ থাকলে কি নিজেকে ঠিক রাখা যায়? তারমধ্যে তাকে হঠাৎ করে পাশ কোর্সের কোঅর্ডিনেটর বানিয়ে দেওয়া হল। কাজ পড়ল সবার থেকে মেইল আইডি নিয়ে একটা গুগুল জি-মেইল গ্রুপ খুলতে। ধুস, একটা বড় ফোন থাকলে কি ভালো হত। ফটফট হয়ে যেত। না তো এখন সাইবার ক্যাফে গিয়ে ঝামেলা। তারপর, কলেজের সব নোটস্ সব মেইলে পাঠানো হয়। বইএর পিডিএফ পাঠানো হয়। ফোনেই পড়া যায়। তারপর ক্লাসের একটা whatsapp গ্রুপ তৈরী করা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিন কখন-কটায় ক্লাস জানানো হয়। কত আড্ডা হয়। প্রতিদিন কলেজে এসে খালি শুনত রাজ। মাঝে মাঝে বলত, ধুস, তোদের আর খেয়েদেয়ে বসে কাজ নেই, ঐ কর!
সেই খড়া কাটল আগের বছর দোলের দিন। আগের বছর দোলে দুপুর বেলা বৃষ্টি হল বেশ কিছুটা। বাড়িতে ছোড়দি এসেছিল। ছোড়দিই বাবাকে বলল, ওকে এবার একটা ফোন কিনে দাও!কি ভাগ্যি, বাবা রাজিও হলেন। দায়িত্ব পড়ল ছোড়দির ওপরেই। রাজ বাইরে গেছিল কি একটা কাজে। সেদিন অনেকদিন পর মনে হতে একটু নেট-প্যাকটা ভরাল। ১ টাকার তিনদিনে ১০০ এমবি। রাস্তাতেই খুলেছিল ফেসবুকটা। ১০টা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে। সে দোকানে দাঁড়িয়েই দেখছিল কে কে পাঠিয়েছে! কলেজের চেনাশোনা কেউ কি না! নাহ… সেরকম কেউ নেই। সবাই মোটামুটি অচেনা। হঠাৎ করে একজনের দিকে চোখ গেল। ফোনটা ছোটো। স্ক্রিনটা আরো ছোটো। তাতে প্রোফাইল পিকটা স্বচ্ছভাবে বোঝা যাচ্ছে না। তাও যেন ছবিটা দেখে কেমন একটা ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ল। ছেলেটার নাম ঋতম অধিকারী। প্রোফাইল পিকচারে একটা সাদা গেঞ্জির ওপরে একটা চেক শার্ট পরে। বুক খোলা। সাদা গেঞ্জি বেরিয়ে আছে। মাথাটা একটু ডানদিকে বাঁকানো। হাসছে। হাসিটার মধ্যে একটা কেমন আলো আলো ভাব। একটা পজিটিভ এনার্জি যেন। রাজ শুধু ঐ ছেলেটার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করল। করে ফোনটা বন্ধ করে দিল। এতদিন সরে থাকতে থাকতে, সেটাই অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। দোকানের কাজ মিটিয়ে যখন বাড়িতে ফিরল, তখন ছোড়দিই কথাটা পাড়ল। বাবা ফোন কিনে দেবে বলেছে তোকে। কালকে।
এহেন ভাগ্যোদয়ে খুশি না হয়ে উপায় ছিল না। খুশিই হল রাজ। তবে মুখে খুব একটা প্রকাশ করল না। ছোড়দির সাথে অনেক আলোচনা হল কি ফোন কেনা যায়। রাজের আগের ফোনটা স্যামসং-র ছিল। তাই তার ওপর তার দুর্বলতা ছিল একটু। ঠিকাছে, স্যামসং-ই কেনা হবে। ঠিক হল।
মনের মধ্যে সে কি চাপা উত্তেজনা। তাও রাজা অনেক চেপে থেকেছে যাতে সেই উত্তেজনা প্রকাশ করতে না হয়। ফোনটা যখন হারাল, বাবা বলল, আর তো ফোন কিনে দেবো না! রাজও তেজ দেখিয়ে বলেছিক, আমি কি তাই বলেছি নাকি! সেই থেকে মনের মধ্যে একটা জিদ যে ফোন থাকুক না থাকুক তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না!
রাতের বেলায়ও উত্তেজনার চোটে ঘুম আসছিল না! তাই চাদরের মধ্যে সেই ছোট ফোনটা থেকেই ফেসবুক খুলল সে। অনেক গুলো মেসেজ এসে রয়েছে। তখনও দেখেছিল। সে তাই মেসেজের জায়গাটাতে ক্লিক করল। অনেকে মেসেজ। সবার ওপরে ঐ ছেলেটা “hi” লিখে পাঠিয়েছে, সেটা রাজ চ্যাটবাক্স না খুলেও বুঝতে পারল। ছেলেটাকে প্রথমে দেখেই সিগনালে ফ্রিকোয়েন্সি ধরেছিল। তাই সে ঋতমের চ্যাটবাক্সে গিয়ে লিখল :Hlo. এই ফোনে এখনও কোনো অক্ষর আনতে গেলে বোতামগুলোকে বিভিন্ন সংখ্যায় চিপে চিপে লিখতে হয়। টক টক করে আওয়াজ হয়।
তারপর সে পিছন ফিরে অন্য মেসেজগুলো দেখছিল। সৈকত মেসেজ করেছে, কিরে কেমন আছিস! সৈকত তার স্কুলের বন্ধু। বেশি বনিবনা হত না কোনোদিনই। আগে কোনোদিন কথাও হয়নি ফেসবুকে। সে’ও তাই লিখে পাঠাল : ভালোই। তুই? এখন অন নেই। ভালোই হয়েছে। এখন এর সাথে বকার কোনো ইচ্ছে নেই তার।
দীপ্তি মেসেজ করেছিল : কি রে আসবি তো! না, যাওয়া হয়নি। সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। প্রথমে বৃষ্টি শুরু হল রাজের এখানে। সে জানাল, বৃষ্টি পড়ছে রে, কি করে যাব?
দীপ্তি উত্তর দিল : কোথায় বৃষ্টি? আমাদের এখানে পরিস্কার আকাশ।
মেসেজটা অনেক পরে দেখেছিল রাজ। ততক্ষণে মোটামুটি পাঁচ-ছ মিনিট পেড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই আরেকটা মেসেজ ঢুকে পড়েছিল, এই আমাদের এখানেও নামল রে!
এর আগেই বোধ হয় ফেসবুকে মেসেজ করেছিল।
দীপ্তির চ্যাটবাক্স থেকে বেরিয়ে দেবদূতের চ্যাটবাক্সে যেতে গিয়েই দেখে, ঋতম ছেলেটার মেসজ এসেছে।
ঋ : কি কিরো?
রা : পড়াশোনা চলছে! তোমার?
ঋ : কোথায় থাকো?
ঋ : আমিও পড়ছি।
রা : রথতলা।
ঋ : আচ্ছা! বাহ!
রা : তুমি?
ঋ : ডানলপ রথতলা?
ঋ : আমি শ্যামবাজারে!
রা : হ্যাঁ!
ঋ : ওখানে আমার মাসির বাড়ি!
রা : আচ্ছা!
রা : কোন কলেজ তোমার?
ঋ : সুরেন্দ্রনাথ। তোমার?
রা : স্কটিশ চার্চ!
ঋ : সামনেই তো!
রা : হ্যাঁ…
ঋ : তারপর? গার্লফ্রেন্ড আছে?
রা : না… Am not supposed to have girlfriend!
ঋ : why?
রা : bcz, I’m gay!
ঋ : Auuuu… how do u know that u r gay?
রা : আমার ছেলেদের ভালো লাগে, মেয়েদের লাগে না…
ঋ : আমারো ছেলেদের ভালো লাগে.. তাহলে কি আমিও গে?
রা : তুমি কি আমায় জিজ্ঞাসা করছ?
ঋ : হ্যাঁ…
রা : তুমি কি কখনো ছেলেদের সাথে ক্লোজ হয়েছ!
ঋ : না, সেভাবে নই!
রা : অন্যভাবে?
ঋ : হুম… একবার! আমরা একসাথে মাস্টারবেট করেছিলাম। mutual masturbation… আর কি!
রা : ঐ ছেলেটা বাদেও কাউকে ভালো লেগেছে! মানে কোনো ছেলেকে?
ঋ : হ্যাঁ… সুন্দর দেখতে ছেলে দেখলে… ভালো লাগে!
রা : বুঝেছি! তোমার কি গার্লফ্রেন্ড আছে?
ঋ : হ্যাঁ…
রা : তার প্রতি শারীরিক আকর্ষণ আছে?
ঋ : আছে!
রা : শিওর তো?
ঋ :100%
রা : আমি শিওর নই… তবে তুমি বাই হতে পারো!
ঋ : জানো তোমার মত স্ট্রেট ফরোয়ার্ড উত্তর আমাকে কেউ দেয়নি!
রা : hihihihi…
ঋ : সত্যি! তুমি whatsapp এ আছ?
রা : আজ নেই… কিন্তু কাল থাকব!
ঋ : মানে?
রা : মানে… কাল আমি ফোন কিনব সকালে। তারপর whatsappটা ইন্সটল করব। তারপর!
ঋ : মনে করে নাম্বারটা পাঠিও!
রা : একদম! শুভরাত্রি… খুব ঘুম পাচ্ছে!
ঋ : okk.. gd n8!

সকালে যখন ফোনটা কেনা হল, ফোনটা কতক্ষণে ঘাটাঘাটি হবে, তার জন্য যেন মনটা উতলা হয়ে উঠেছিল রাজের। দোকান থেকে বলে দিয়েছিল আট ঘন্টা এখন চার্জে লাগিয়ে রাখতে। কে কার কথা শোনে? ফোন কেনার সাথে সাথে সিমও কেনা হল নতুন। সে সিম আবার সিম-১ এ ভরলে দু’মাস এক জিবি করে নেট ফ্রি। সোনায় সোহাগা আরকি। এসেই ছোড়দি, whatspp খুলে দিল। কতক্ষণে বন্ধুদের মেসেজ করে বলব, ভাই আমাকে whatsapp এ গ্রুপে একটু add কর তো!

তখন ক’টা বাজে, ন’টা হবে। রাত। মেসেজ ঢুকল ফেসবুকে : ফোন কিনলে!
রাজের দেখতে একটু দেরিই হল। চার্জে বসানো ছিল। যখন দেখল তখন সাড়ে এগারোটা প্রায়। সে উত্তর দিল : কিনলাম! whatsapp নাম্বারটা দিতে ভুলে গেছিলাম… বলে whatsapp নাম্বারটা লিখে দিল।
টুং করে একটি বৃদ্ধাগুলি শোভিত হাত স্ক্রিনে ভেসে উঠল। যেন বলছে, কাঁচকলা!

: ঋতম। একটা আননোন নাম্বার থেকে whatsapp এ মেসেজ ঢুকল।
: hi…Ritam! Raj.
: তোমার আসল নাম কি রাজই?
: ডাক নাম রাজ। ভাল নাম রাজদীপ।
: ও
:হুম…
: ডিনার হয়েছে!?
: এই হল! তোমার!?
: আমি করব। বাবা ফিরুক দোকান থেকে!
: ও তোমাদের দোকান আছে?
: হ্যাঁ… ফ্যামিলি বিজনেস!
: ও… কিসের?
: স্টিল আর রট্-আয়রনের!
:বাহ…
: হিহিহিহি…
: আচ্ছা, তুমি কোন ইয়ার!
: সেকেন্ড। তুমি?
: ফার্স্ট! তুই করে বলি? তুমিটা ঠিক আসে না!
: আরে… আমিও এটাই ভাবছিলাম।
: ঋতম, আমি তোকে কাল মেসেজ করছি। খুব ঘুম পাচ্ছে।
সত্যিই ঘুমটা এত ত্যাঁদোর।সেদিন নতুন ফোন কিনেছিল সে, ঘুমটা দেরী করে পেলে পারত। ছেলেটাও বেশ। রাজ নিজেকেই দোষে। কিন্তু কিছু করার নেই। দু’চোখে তার জন্মের ঘুম যেন!

পুজোর জামা ঠিক পর পরই পরে যেতে কেমন একটা লাগে রাজের। তার খালি মনে হয়, সবাই ভাব্বে বুঝি, দেখাচ্ছে। কিন্তু কেনা তো দেখানোর জন্যেই। এ কথা কে বোঝাবে তাকে? কিন্তু জামাকাপড়ের বেলায় তাও নতুন জামাকাপড় উপেক্ষা করে পুরোনো পরে যাওয়া যায়! কিন্তু ফোনের বেলায়? নাহ, ঠিক লজ্জা নয়। তাও কেমন একটা। কলেজে ভর্তির প্রথম থেকে যদি এই ফোনটা থাকত তাহলে কিছু মনে হত না। নতুন ফোন কলেজে নিয়ে গেলেই, সবার ঐ, আরে, নতুন ফোন নাকি! কবে কিনলি- এই টাইপের কথাগুলো কেমন একটা অস্বস্তি তৈরী করে। আর সব জায়গাতেই কিছু স্বযাচিত গ্যাজেট-গুরু থাকে। তারা বলবেই, ধুস, এই কম্পানি কিনলি? এটার তো এটা ভালো না। ঐটার ঐটা ভালো!
যাই হোক, কি করা? ফোন তো নিয়ে যেতে হবেই। স্বাভাবিকভাবে যা প্রত্যাশা ছিল তাই জুটল। কেউ বলল, ভাই নতুন ফোন। কবে কিনলি? কেউ বলল, ফোন কিনেছিস, খাওয়া! আর কিছুজন, স্যামসং? হ্যাং করবে দেখিস!

মায়ের শরীরটা খুব একটা ভাল যাচ্ছে না। ওষুধপত্র খাবে না ঠিক করে। এর মধ্যে নন্দাটাও সেরকম। পড়ে সবে নাইনে, এর মধ্যেই কেমন গিন্নী গিন্নী ভাব। এসব ভেবেই মন মরা হয়ে দোকানে বসেছিল সেদিন ঋতম। ফেসবুকটা খোলা ছিল এমনিই। সুকান্ত দা’টাও নেই দোকানে। কথা বলারও কেউ নেই। একা একা বসে থাকতে থাকতেই বাবার ফোন এল।
বলো, ডাক্তার দেখালে?কি বলল?

তোমায় বললাম না, মা ঠিক মত ওষুধ খায় না!

আচ্ছা ঠিকাছে, তোমরা সাবধানে এসো!

দোকানেই আছি। তোমার ডিরেক্টলি দোকানে আসার দরকার নেই। তুমি মা’কে বাড়িতে রেখে এসো!
ফোনটা রেখে, গলা বাড়িয়ে পাশের দোকানে হাঁক দিল, এই নন্টে চা দিলি না আজকে!
দিচ্ছি দাদা, নন্টের আওয়াজ এল। নন্টে বাচ্চা ছেলে। চোদ্দো পনেরো হবে। চায়ের দোকানটা ওর বাবার। সন্ধ্যেবেলা এসে হাতে হাতে সাহায্য করে।
নন্টে এসে চা দিয়ে গেল।
কি রে খবর কি তোর?
কি আবার খবর?
সেদিন দেখলাম!
কোথায়?
ভিক্টোরিয়ায়!
তুমি কি করছিলে ওখানে?
আমি যাই করি, তুই কি করছিলিস বল!
তুমি যা করছিলে! বলেই কেটে পড়ে নন্টে। লজ্জা পেয়েছে বোধ হয়। বেচারা যতটা সম্ভব আড়াল করে বসেছিল কোনার দিকে। তাও ঋতমের চোখে পড়ে গেল। তার কারণ অবশ্য ঋতমও একটা কোন খুঁজছিল। নন্দার সবার সামনে বসতে লজ্জা করে। মেয়েটা সত্যিই পাগলি!
চায়ে চুমুক দিতেই মাথাটা ছাড়ল যেন। কম্পুটারের স্ক্রিনটা অফ হয়ে গেছিল। মাউসটা নাড়াতেই আলো জ্বলে উঠল। মেসেজ এসেছে।
রাজ : কি করা হচ্ছে!
ঋতম রিপ্লাই দেয়: এই বসে বসে বোর হচ্ছি! তুই?
রাজ : আমিও! কি গরম! ভালো লাগছে না!
ঋতম : হ্যাঁ… ভীষণ। তবে আমাদের এখানে বিকাল থেকে হাওয়া দিচ্ছে।
রাজ : আরে আমি একটা কাজ করছি। ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে যে একটু ছাদে পায়চারি করে আসব, তার সময় পাচ্ছি না!
ঋতম : কি কাজ করছিস?
রাজ : একটা assignment!
ঋতম : করে ফেল!
রাজ : রাতে কথা হচ্ছে!

এই ছেলেটার সাথে কথা বলে ঋতমের খুব ভাল লেগেছে। খুব পরিষ্কার চিন্তা ভাবনা। নিজেকে পরিষ্কার ভাবে চেনে, বোঝে। কনফিউজড নয় একেবারেই। ঋতমের তো সেরম কোনো বন্ধুই নেই যে মন খুলে দুটো কথা বলবে। তবে এই ছেলেটির সাথে পরিচয় হয়ে খুব ভালোই হয়েছে। সুন্দর কথা বলে আর অনেক কথা বলা যায়। কথা বলার জন্য কথা খুঁজতে হয় না!
নন্দাটাকে আরেকবার ফোন করবে ঠিক করল। বেচারির রাগ কমল কি না কে জানে। সামনে পরীক্ষা, রাগ না কমলে তো আবার পরীক্ষা বাজে দেবে। পরে এসে বলবে, তোমার জন্যেই তো পরীক্ষা খারাপ হল। ঋতম ফোন করে। ধুস.. এবারেও ধরল না! কি রে বাবাহ! এবার একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে না!
তাদের দোকানটা স্টিল-রট আয়রনের আসবাবপত্রের। দোকানের ভিতরের দিকে গুদাম। সেখানে তিনজন মিস্ত্রী কাজ করে। দেবাশিষ দা, হরি জেঠু আর বান্টু দা। বান্টু দার ভাল নাম বাপ্পা। বেঁটে বলে বান্টু বলে ডাকে সবাই।
ফোনটা রাখতেই হরি জেঠু বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন। দাদা কখন আসবে গো?
আসবে একটু পরেই।কেন গো কিছু দরকার?
হ্যাঁ একটু দরকার ছিল। ছুটির জন্য। কদিন একটু বাড়ি যাব… ভাবছি! ছোটো ভায়রাভাই অসুস্থ। যায় যায় অবস্থা!
ও… বাবা আসবে আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই!
আচ্ছা!
চা খেয়েছ তো?
হ্যাঁ… নন্টে দিয়ে এল তো! তারপর একটা বিড়ি বের করে বলল, বিড়িটা খেয়ে নি।
ঋতম কিছু বলল না। নন্দাকে একটা মেসেজ করল, বেশি বাড়াবাড়ি কোনোকিছুতেই ভাল নয়।
ঋতম দা, আমিও কিন্তু তোমায় সেদিন দেখেছি, কালো সালোয়ার পরে ছিল… হট করে বলে পালালো নন্টে! ঘটনাটা এতটা চকিতে হল যে ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই নন্টে পালাল। সে কিছুটা লজ্জিত মুখে হরি জেঠুর দিকে তাকাচ্ছিল তিনি কিছু শুনতে পেয়েছে কি না দেখার জন্য আর সঙ্গে সঙ্গে একটা মেসেজ এল ফোনে। রাজের।
শোন… ভাল লাগছে না! আমি সুইসাইড করছি।

-৩-

চ আজ ঝিলে যাই! তখন ক’টা হবে? ন’টা সাড়ে ন’টা হবে। লাল ফোন করে বলল শ্যামকে। ঝিল শ্যামেদের বাড়ির কাছেই। বলা ভাল পাশেই। দু’তিন মিনিট হাঁটা। বেশ বড়ো লেক। রবিবারে ঝিলে স্নান করতে যাওয়ার অভ্যাস ওদের আজকের না। অনেক ছোটো থেকেই তারা ঝিলে স্নানে যায় মাঝে মাঝে। আর এই ক’বছর তো সবার কলেজ মোটামুটি আলাদা। পড়াশোনাও শেষের দিকে। কেউ কেউ চাকরির চেষ্টা করছে। কেউ বা বাবার দোকানে বসছে। তাই দেখা করার সময় তেমন হয়ে ওঠে না। ঐ মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ, চ আড্ডা হোক, কেউ মেসেজ করল হোয়াটস্যাপ গ্রুপে। সেই ; নয়ত এই মাঝে মাঝে স্নানে এলে যা দেখা সাক্ষাত হয়। শ্যাম হোয়াটস্যাপ গ্রুপে মেসেজ করে দিল। ১১.৩০ টার মধ্যে তার বাড়ির সামনে দেখা করা হবে।
লালের আজ মনটা ভাল নেই। বাড়িতেও পিসির অসুস্থতা নিয়ে কেমন একটা থমথমে পরিবেশ। তার মধ্যে সবে লাস্ট সেমেস্টার পরীক্ষা হয়ে গেল। পাঁচ বছরের সম্পর্ক ইউনিভারসিটির সাথে। ছাড়বে বললেই ছাড়া যায়? সব মিলিয়ে মনটা খুব তেতো হয়ে আছে। কিছুই যেন ভালো লাগছে না। শ্যামকে ফোন করে বলল বটে ঝিলে যাবে, তাও যেন কেমন গা ছাড়া ভাব। বাড়ির বারান্দায় বসেছিল একা একা। একটা চেয়ারে বসে আর আরেকটাতে পা ছড়িয়ে। মা এসে সকালের খাবার দিয়ে গেছে। পাউরুটি মাখন। পিসির শরীরটা হঠাৎই খারাপ করল কাল রাত থেকে। পাকস্থলীর ক্যানসার। অনেক খরচ। অত খরচ করার সামর্থ্য তাদের নেই। বুঝতে বুঝতে অনেকটা সময় লেগে গেছিল প্রথমদিকটাতেই। তাই যাওবা সুস্থ হওয়ার একটা অবকাশ ছিল দেরী হওয়াতে সেটাও নষ্ট হয়েছে। পিসেমশায়ের নিজের হার্টের অসুখ। তিনি পিসির দেখাশুনো করার অবস্থাতে নেই। তাই সবাই মিটিং করে পিসিকে লালেদের বাড়িতে এনে রেখেছে। আজ যা হোক কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। কাল রাত্রে খুবই বাড়াবাড়ি হয়েছে।
খেতে ইচ্ছা করছে না। মন ভাল না থাকলে কিছুই যেন ভালো লাগেনা। যেমনকার খাবার তেমনটাই ধরা। তাও খিদে পাচ্ছে। লাল ইচ্ছা না থাকলেও একটা পাউরুটি কোনোমতে মুখে ঢুকিয়ে নিল। একটা পাউরুটি খেয়েই যেন পেট ভরে গেল।
দাদা? তিন্নি ডাকল।
তিন্নি লালের বোন। এবার মাধ্যমিক দেবে। আর এইবারেই বাড়িতে এসব। ওর পড়াশোনা নিয়ে সবাই বেশ চিন্তিত। কিন্তু কিছু করারও নেই। মাঝে ঠিক হয়েছিল, তিন্নিকে মামাবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তিন্নি কান্নাকাটি করে যায়নি।
আয়! লাল তিন্নিকে কাছে ডাকল। তিন্নির মুখটা থমথম করছে। চোখ লাল। কাঁদছিল বোধ হয়। ফরসা বলে গালদুটোও লাল হয়ে রয়েছে।
খেয়েছিস? লাল জিজ্ঞাসা করল।
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল তিন্নি। তুই খাস নি কেন?
ভালো লাগছে না! যাওয়ার সময় প্লেটটা নিয়ে যাস তো!
বাবান দাদা আসছে।
এতদিনে ওর আসার সময় হল?
বাবান দা’র ওপরে লালের খুব রাগ। কেমন ছেলেরে বাবা, মায়ের এই অসুখ, আর ছেলে দিব্যি বাইরে পরে আছে!
তুই মিছিমিছি বাবান দা’র ওপর রাগ করিস! তুই ওখানে চাকরি করলে আর মা’র বা বাবার এরম হলে তুই চাকরিবাকরি ছেড়ে চলে আসতে পারতিস?
লাল কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল।তিন্নি বলল, বাবান দা’ কাজটা করে বলেই পিসির এই চিকিৎসার কিছুটা হলেও তো করা গেছে ।
কথাটা ফেলার নয়। লাল অনেক কিছু ভাবছিল। কিন্তু সবকিছুকে ছাড়িয়ে যে চিন্তাটা তার মাথায় উঠে এল তা হল, তিন্নি অনেক বড় হয়ে গেছে! যদিও বাবান দা’র সাথে ওর ভাব বেশি। সেই ছোটো থেকেই।
তিন্নির কথা মেনে নিয়েও, লাল বলল, তুই বাবান দা’র হয়ে ওকালতি করা বন্ধ কর তো!
তিন্নি প্লেটটা নিয়ে চলে গেল ভেতরে!
বাইরের রাস্তায় রোদ্দুর জমেছে স্থানে স্থানে। আশেপাশের বাড়িগুলোর ছায়া ছড়িয়ে রয়েছে ইতিউতি। তাদের বাড়ির পাশের আমগাছটার পাতার ছড়া বারান্দার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। যেন টুকি দিচ্ছে। সে উঠে দাঁড়াল। কোমরটা ধরে গেছে। সে একটু পেছনে সামনে বেঁকে কোমরটাকে ঠিক করার চেষ্টা করল। ঘরে গিয়ে ফোনটা দেখল। সোয়া এগারোটা বাজে। সাড়ে এগারোটায় শ্যামদের বাড়ির সামনে যেতে হবে। সাইকেলে গেলে অবশ্য বেশিক্ষণ নয়। সে একবার নেটটা অন করল। গ্রুপে শ্যাম মেসেজ করেছে, কারা কারা আসছিস?
লালের মনটা সায় দিচ্ছে না। সে মেসেজ করল। আমার মনে হয় হবে না রে! পিসির যায় যায় অবস্থা!
তার বন্ধুরা সবাই তার পিসির কথা জানে!
শ্যাম : কি রে! আসব নাকি?
লাল : না কিছু হয়নি। তবে অবস্থা ভালো নয়। আজই কিছু একটা হতে পারে।
পল্টু : ভাই, মন খারাপ করিস না, কষ্ট পাওয়ার থেকে চলে যাওয়া ভালো!
লাল : আমিও সেটাই চাই! এক বছরের বেশি হয়ে গেলো কষ্ট পাচ্ছে!
সোহম : আজ প্ল্যানটা ক্যানসেল কর! লাল, যে কোনো দরকারে ফোন করিস!
লাল : হুম…
শ্যাম, গ্রুপের বাইরে, ব্যক্তিগতভাবে মেসেজ করে : আমি আসছি তোর বাড়ি!

বাবু যা না এইবেলা চানটা করে আয়! সবিতা ঘরে ঢুকে দেখলেন শ্যাম এসেছে। সবিতার চুল উষ্কখুষ্ক। কাল রাত থেকে ঘুম নেই। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ও, তুই এসেছিস?
শ্যাম মৃদু হাসে!
লালও খাটে হেলান দিয়ে বসে ছিল। সবিতা আবার বললেন, যা না, চানটা করে নে এবেলা! আর সময় পাবি কি না!
ও এইমাত্র এল! বললেও লাল নিজেও জানে সেটা অজুহাত মাত্র।
ও বসবে একটু! তুই স্নান খাওয়াদাওয়া করে এসেছিস বাবু? আজ যা বাড়ির অবস্থা খেয়ে যেতে যে বলব সেই অবস্থা নেই!
না, কাকিমা তুমি এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন?
যা তুই যা, চান করে আয়, আমি বসছি ওর কাছে!
তুই তাহলে বোস… বলে লাল বেরিয়ে যায় ঘর থেকে! সবিতা বালিশটা টেনে নিয়ে গা’টা এলিয়ে শোয়।
কাল রাত থেকে চলছে! মাথাটা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে বিশ্বাস কর… সবিতা বলে চলে।
ওষুধ খাওনি?
খেয়েছি রে! আর চিন্তা উদ্বেগ সব নিয়ে আরকি! ফ্যানটা একটু জোরে করে দে তো!
শ্যাম উঠে ফ্যানটা বাড়াতে গিয়ে দেখল, ফুল স্পিডে চলছে। অনে চলছে কাকিমা!
ও… মা কেমন আছে রে বাবু?
ভালো আছে কাকিমা!
অনেকদিন দেখা হয় না জয়িতার সাথে। সেইবার শিবরাত্রির দিন মন্দিরে দেখা হয়েছিল!
ও…
ঝপ ঝপ করে আওয়াজ হচ্ছে। কুয়োর পারে স্নান করছে লাল। তিন্নি এল ঘরে। মা?
কি?
বাবা ডাকছে তোমায়!
বল যাচ্ছি!
এখনই ডাকছে!
উফফফ… শরীরটাকে কোনোমতে টেনে তুলে নিয়ে গেল সবিতা! তিন্নি শ্যামকে জিজ্ঞাসা করল, দাদা জানে তুমি এসেছ?
হ্যাঁ… তোর পড়াশোনা কেমন চলছে?
এই তো দেখছ বাড়ির অবস্থা!
শ্যাম বোঝে তিন্নির অসুবিধার কথা। সে ম্লান হেসে বলল, বুঝতে পারছি।
তুমি বসো… আমি যাই! পিসির যখনতখন অবস্থা!
একবার যাব?
তুমি যাবে? এসো! তিন্নি শ্যামকে ঘরের ভিতর দিয়ে কোনার ঘরটায় নিয়ে যায়। ঠিক কোনা নয়। বড় বড় জানলা আছে। দুটোই খোলা। পরদা টানা। ঘরে পাখা চলছে। ঘরের মধ্যে একটা রোগি-রোগি গন্ধ। ঘরে বেশি কেউ নেই। দু’জন লোক। একজন বেশ বয়স্ক। আরেকজন মধ্য বয়স্ক। শ্যাম ঘরে ঢুকল না। দরজার সামনেটাতেই দাঁড়াল। তিন্নি যতটা পারা যায় কম ঠোঁট নেড়ে মিনমিন করে বলল, বয়স্ক করে যিনি, উনি পিসেমশাই। আর উনি… পিসেমশাইয়ের ভাই।
খাটে পিসি একদম যেন বিছানায় লেগে গেছেন। শ্যাম লালের পিসিকে অনেকদিন আগে একবার দেখেছিল। তখন বেশ স্বাস্থ্যবান ছিলেন। আজ যেন একদম চেনা যাচ্ছে না। গায়ের চাদরটা সরিয়ে নিলে হারমজ্জা সার খালি! হা করে সিলিং-র দিকে চেয়ে আছেন। আর গঁ গঁ আওয়াজ করছেন।
শ্যাম বেশিক্ষণ দেখতে পারল না। সে ফিরে এল ঘরে। তিন্নিও আসছিল। সবিতা ডাকল। তিন্নি মা, পিসেমশাইকে জিজ্ঞাসা কর তো চা খাবেন কি না!
যাই! মাঝ পথ থেকেই ঘুরে গেল তিন্নি। শ্যাম এসে লালের ঘরে ঢুকল। লালের স্নান শেষ। ঘরে ঢুকল যখন তখন সে গেঞ্জি পরছে। গলায় রুপোর চেনটা ফরসা ত্বকের ওপর ঝুলছে। এই দৃশ্য দেখে শ্যামের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
দেখলি? লালের কথায় হুঁশ ফিরল শ্যামের।
হুঁ…. এসে খাটের ওপর বসল।

যখন ওরা শ্মশানে এল, তখন রাত প্রায় ন’টা। বিকেলের দিকে মারা গেলেন পিসি। তখন বোধ হয় আড়াইটে কি দুটো পঁয়ত্রিশ। ডাক্তার ডাকা হল। তিনি এসে দেখলেন। চার ঘন্টার আগে ডেথ সার্টিফিকেট লেখে না ডাক্তার। সাড়ে ছ’টায় আবার এলেন। ডেথ সার্টিফিকেট লিখে চলে গেলেন। বাবান দা তখনও এসে পৌঁছয় নি। প্লেন কলকাতা বিমানবন্দরে নেমে গেছে। তখন রাস্তায়। আজকার রাস্তাতেও ভীড় হয় খুব। পয়লা বৈশাখের সেল চলছে চারিদিকে। রাস্তাঘাট ফিরে ঠাঁসা। বাবান দা বাড়ি ঢুকল আটটা দশ। বেশিক্ষণ আর বাড়িতে রাখা হয়নি। ন’টার মধ্যে শ্মশান। কি ভাগ্য, শ্মশানে আজ বেশি লাইন নেই। দুটোর পরেই পিসি ছিল।
সবিতা তিন্নি ওরা আসেনি। এরা সব শ্মশান থেকে ফিরলে আরো কত নিয়মকানুন আছে। সেগুলো সব জোগাড় করতে হবে। পল্টু, সোহম, পল্লব ওরা সব এসেছিল। শ্যামই ফোন করেছিল বোধ হয়। শ্মশান থেকে ওরা আর বাড়িতে আসেনি। যে যার বাড়ি চলে গেছে। শ্যাম এসেছিল শুধু। দুপুর থেকে ছিল। এসে সব নিয়মকানুন পালন করে সে বিদায় নিল।
চ, আমার বাড়িতে চ! শ্যাম বলল লালকে।
নাহ… রে! অশুচ না?
ধুস… আমি ওসব মানি না! আর পিসি তো বিবাহিত। তোদের কেন অশুচ হবে। ওদের পরিবারের অশুচ।
নাহ রে… এই অবস্থায়!
আচ্ছা, ঠিকাছে। মন খারাপ করলেই ফোন করিস!
লাল ঘাড় নাড়ে। শ্যাম লালকে বোঝে। তার মত কোমলহৃদয় ছেলে খুব কম আছে। মুখে কিছু বলবে না, উপরাউপর কিছু বোঝাও যাবে না। কিন্তু ভেতরে তার কি চলছে তা শ্যাম বোঝে। লালের চোখ দুটো অদ্ভুদ। যেন আয়না। মনে কি চলছে সব যেন দেখা যায়।
থ্যাঙ্কস রে! যাওয়ার সময় বলল লাল।
বেরোহ… হেসে বিদায় নিল শ্যাম। সবিতাকেও বলে গেল। হ্যাঁ বাবা আয়! কত উপকার করলি আজকে। তোরা না থাকলে, এত কিছু জোগাড় করা এত কম সময়ে খুব সমস্যা হত!
তুমি ওসব ভেবো না তো! বলে শ্যাম বিদায় নেয়।

ভেজা গায়ে যখন লাল পাড়ে উঠে দাঁড়াল তখন তার গা থেকে যেন কাঁচের টুকরো ঝড়ে পড়ছে। ফরসা গা। তাতে লোমগুলোর নিম্নমুখিতা যেন প্রমাণ করতে ব্যস্ত এ গ্রহেও একদিন জলের অস্থিত্ব ছিল। শ্যাম তখনও জলের মধ্যে। লাল এমনভাবে উঠে দাঁড়াল যেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁর বিশ্বরূপ দর্শন করাচ্ছেন। শ্যাম হাঁ করে কিছুক্ষণ চেয়ে ছিল ওর দিকে। সে সুর্য প্রণামে ব্যস্ত। ভেজা প্যান্টা গায়ে চেপে বসে আছে। ভেতরে অন্তর্বাস পরা আছে তাও ঐজায়গাটা ভীষণ কামোদ্দীপকভাবে উঁচু হয়ে রয়েছে। লাল চোখ খুলতেই শ্যাম ডুব দিল জলে। যখন উঠল তখন লাল গা মুচছে।
অনেকদিন পরে তারা ঝিলে স্নান করতে এল। আজ আর কেউ আসেনি। সে আর লাল। সপ্তাহের মাঝে কারোরই ছুটি নেই। শ্যামের বাবার সোনার দোকান। সে’ও ভালোই কাজ পারে। সে দোকানেই বসবে। কিছুদিন ধরে বসছেও মাঝে মাঝে। আর লাল গবেষণা করার জন্য নেট দিয়েছে। ডব্লুবিএসসি আর ইউপিএসসিও দেবে বলছে।
স্নান করে ভিজে প্যান্টে গায়ে গামছা জড়িয়েই দুজনে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। চটিতে জল লেগে চ্যাকচ্যাক আওয়াজ হয়ে চলেছে অবিরত। প্যান্ট থেকে জল পড়ছে টুপটাপ দুলতে দুলতে, হাঁটার তালে তালে। কথা নেই কারোর। স্নানের পর রোদ্র গায়ে লাগছে, তাও গামছাটা ভেজা বলে তাপ লাগছে না। চুলগুলো পেতে রয়েছে কপালের ওপর। মধ্যে মধ্যে জল চুঁইছে। নাক বরাবর। ঠোঁট ছুঁয়ে। থুতনিতে দুলে, টুপ করে রাস্তায় পড়ছে।
শ্যামদের বাড়ি কাছেই। তাই ওদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল দুজন। ওখানেই লালের সাইকেল রাখা। লাল সাইকেল নিতে ঢুকল। রমা রান্নাঘরে ছিল। হাঁক দিল, স্নান হল?
হ্যাঁ কাকিমা! লাল হেসে বলল। রমা বোধ হয় ডালে ফোঁড়ন দিলেন। আওয়াজ হল সেরকমই। রমা আর কথা বলল না দেখে লালই বলল, কাকিমা আমি আসছি।
কোথায় যাচ্ছিস?
বাড়ি!
কেন? খেয়ে যাস! তুই তো স্নান করতে এলে খেয়েই যাস!
না কাকিমা আজ না!
কেন?
জানোই তো সব!
তাতে কি? তোকে কি মন্ডা মিঠাই খাওয়াব? সাধারণ বাড়িতে যা হয়েছে তাই খাবি! আমি দাঁড়া বৌদিকে ফোন করে দিচ্ছি।
থেকে যা না! বিকালে যাস! শ্যামও বলল।
লাল বলল, জামা প্যান্ট কিচ্ছু তো আনিনি।
আমি কি বাড়িতে ল্যাংটো হয়ে থাকি? বলে হাসে শ্যাম। লালও হাসে।
কিছুক্ষণ আগেই রমা ঘরের ভেতর গেছিল। এখন গলা শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। কি বলছে বোঝা যাচ্ছে না যদিও। তারপর বেরিয়ে এসে বলল, বলে দিয়েছি। যা জামা কাপড় বদলে নে! হাতে ছোটোফোনটা মুঠোতে ধরা তখনও।
লাল শ্যামের সাথে ভেতরে গিয়ে ভিজে প্যান্ট বদলে নিল।
রমাই হাঁক দিল, ভিজে প্যান্টগুলো বারান্দায় রেখে যা। স্নানের সময় ধুয়ে মেলে দেবো।
রমা কাকিমার ওপর বেশি কথা বলতে পারে না লাল। এত মাতৃহৃদয় মহিলা! তাই লজ্জা সত্তেও শ্যামের সাথেই নিজের প্যান্টটাও রেখে এল। তবে আন্ডারওয়্যারটা নিজেই ধুয়ে ভেতরের বারান্দায় মেলে দিল।
গরম পড়ে গেছে ভাল। তাই জামা পরতে লাগে না। লজ্জা বিষয়টা না থাকলে প্যান্টও হয়ত পরতে হত না!
হ্যাঁরে… শ্রেয়ার সাথে কথা হয়? লাল শুয়ে শুয়ে ফোন ঘাটছিল। শ্যামও ফোনই ঘাটছিল ওর পাশে শুয়ে। ফোন এমন এক বস্তু যে দুটো মানুষ পাশাপাশি থেকেও ফোনে কথা বলে। মুখে কথা বলে না।
হঠাৎ? লাল ফোন থেকে মুখ তোলে না!
আমার পোস্টে লাইক করছে, তাই মনে পড়ল।
নাহ!
শ্যাম কথা বলতে বলতে লালের খোলা বুকটা দেখছিল। ডান দিকের বুকের বৃন্তটা যেন চেয়ে আছে তার দিকে। সাদা বুকে খয়েরী বৃন্ত। বৃন্তকে মাঝে রেখে লোমগুলো যেন আবর্তন করছে। মাঝে মাঝে বইতে বইতে নদীর জল যেমন ঘোরে। সেরম।
তোদের মধ্যে আর কিছু নেই?
নাহ! লাল উত্তর দেয়। তোর প্রেমের কি খবর?
চলছে! যেমন চলে।
যেমন চলে মানে?
মানে ঐ, সময়ে সময়ে মেসেজ। মাঝে মাঝে দেখা। রাতে একবার ফোনে কথা!
বাবাহ, রুটিন করা তো পুরো!
ছকবাঁধা জীবন আর ভাল লাগছে না!
ছক ভেঙে বেরোয় যা!
একটা চান্স পেলেই বেরিয়ে যাব।
কি করবি?
বেরাবো। ঘুরে বেরাবো। আমার আর ভাল লাগছে না রে!
কি হয়েছে কি বলবি তো?
আগে নিজে বুঝে উঠি কি হয়েছে, তারপর নয় তোকে বলব। বলার জন্য তো নিজে বুঝতে হবে!
হুম… বুঝলাম!
কি বুঝলি!
তুই একটা সাইক্রেয়াটিস্ট দেখা!
বুকটা ছাঁত করে ওঠে শ্যামের। এক অজানা ভয়ে ভেতরটা কেমন হয়ে উঠল। ভেতর ভেতর গুটিয়ে গেল সে। কেন? আমি কি অসুস্থ নাকি?
না, অসুস্থ কেন হবি! তবে এরকম ডিপ্রেশন এলে কাউন্সিলিং করানো উচিৎ।
ও! ধরে প্রাণ এল শ্যামের যেন।
আমিও করাবো ভাবছি! লাল বলল।
কেন? তোর কি হয়েছে।
কিছুই না। এমনি। খুব কনফিউজড রে কি করব না করব! কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না… মাঝে মাঝে মনে হয় সামনেটা পুরো অন্ধকার! খুব ভয় করে!
হুম… ঠিকই বলেছিস!
তুই কি বলছিস? তোর বাবার তো সোনার দোকান!
আরে বাবার সোনার দোকান তো কি?
বসবি! তোর হাতে তো অলরেডি জয়েনিং লেটার আছে! লাল মিচকে হাসে!
ধুস, হাতে কিছু নেই, তাই বসতে হচ্ছে। যেদিন মনের মত কাজ পাব, সেদিন থেকে আর বসব না!
তাহলে দোকানের কি হবে?
কেন, ভাই আছে তো!
ও’ও যদি এরম বলে?
তাহলে কি তুলে দেবো। বাবা যতদিন আছে ততদিন।
তুই করতে কি চাস?
জানিনা! অন্যরকম কিছু?
অন্যরকম কি?
আমি ঘুরে বেড়াতে চাই!
জার্নালিজম নিয়ে পড়লি না কেন তাহলে?
ভাবছি, ভরতি হব।
কোথায়?
দেখি, কোথায় কোথায় পড়ানো হয়! এখনও দেখিনি। এমন কাজ করতে চাই যেন একঘেয়েমি না আসে!
বুঝেছি!

খেয়ে এসে দুজনের শুল আবার আগেত মত। পেটে হাত বুলাতে বুলাতে লাল বলল, কাকিমা এত চেপেচুপে খাওয়ায় না! উফফ… আঁইঢাই করছে পুরো!
শুয়ে থাক। ঠিক হয়ে যাবে।
কিছুক্ষণ পর লাল বলল নিজে থেকেই : শ্রেয়ার সাথে আমি ব্রেকাপ করে নিয়েছি রে!
শ্যাম একটুও অবাক না হয়ে বলল, কবে?
আগের সপ্তাহে!
কেন?
ও কলেজে কার সাথে চক্কর চালাচ্ছে!
কে বলল?
সোর্স আছে আমার।
ওর কলেজে কি সোর্স তোর?
আরে আছে। আমার মামার মেয়ে তো ওদের কলেজেই পড়ে।
ও…
ও কে দিয়ে কি নজর রাখাতিস?
না না! ও আগের সপ্তাহে এসেছিল বাড়িতে। ফলমূল দিতে। কথা হচ্ছিল। ওকে ছবি দেখালাম। তখন বলল। ও তো ছেলেটার সাথে আমার কথাও বলালো!
ও…
শালা প্রেমটাও ভাল করে করতে পারলাম না!
কেন এই যে আমার সাথে প্রেম করছিস!
যা বলেছিস… যা দিনকাল গে’ই হয়ে যেতে হবে! বলে হাসে লাল। শ্যামের ভেতরটা কেমন কুঁচকে যায় আবার!

-৪-

তুই কি পাগল?
সাতসকালে প্রিয়ম এসে হাজির। সুদূর পুনে থেকে। চাকরিবাকরি ছেড়ে। কেন? না ব্রেকাপ হয়ে গেছে। অভি তখন প্রায় মাঝ ঘুমে। এই সাড়ে চারটের সময় শুয়েছিল সবে। শেষ দুটো সপ্তাহ খুব হেকটিক গেছে অভির। পুজো আসছে। তিনটে ফরমায়েশি উপন্যাস লিখতে হচ্ছে! মুখের কথা নাকি? কাল বাচ্চাদেরটা শেষ হয়েছে! বাচ্চাদের পূজাবার্ষিকীটা সবার আগে বেরোয়। তার মধ্যে কাচা ঘুম ভাঙিয়ে ভোর ছ’টায় প্রিয়মবাবু এসে হাজির। অনেকক্ষণ ধরেই বেল বাজাচ্ছিল নাকি। দুধওয়ালা আর পেপারওয়ালা সকালে বেল বাজায় না। ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রেখে পালায়। যখন বেলটা শুনতে পেল কিছুটা ধরমড়িয়েই উঠল অভি।
তুই? এত সকালে?
জবাব না দিয়ে ব্যাকপ্যাকটা ঘ্যাঁষটাতে ঘ্যাঁষটাতে ঘরে নিয়ে ঢুকল অভি। সোফার ওপর গা এলিয়ে দিয়ে বলল, ধুস, সব ছেড়েছুড়ে চলে এলাম!
সব ছেড়েছুড়ে মানে?
মানে…সব!
চাকরী?
আরে সব!
অভি ভাবল এখন বেশি ঘাঁটানো উচিৎ হবে না প্রিয়মকে আর। আর তার নিজের ঘুমটাও পূরণ করা দরকার। তাই সে আবার গিয়ে শুয়ে পড়ল। যখন উঠল তখন সাড়ে ন’টা। উঠে দেখে প্রিয়মবাবু রান্না ঘরে। রান্না করছে। প্রিয়ম ভাল রান্না করে। ওর হাতের রান্না অভি আগেও খেয়েছে কয়েকবার। বাথরুমে যেতে গিয়ে খেয়াল হয়নি, ঘুম চোখ ছিল বলে হয়ত। বাথরুমের দরজাটা খুলে বেরোতে বেরোতে ঘুমটা কেটেছে অনেকটা। ড্রয়িং রুমটা পরিপাটি করে গোছানো! মেঝে ঝাঁট দেওয়া, মোছাও! জিনিষপত্র সব টিপটপ।
থ্যাংকস!
বাড়া আমার!
এই কথাটা প্রিয়ম প্রায়ই বলে। হাসে অভি। ভেবেছিল আরেকটু ঘোমাবে। তারপর দুপুরবেলা বেরিয়ে লেখাটা দিয়ে আসবে পত্রিকার দপ্তরে।অবশ্য মেইলে পাঠিয়ে দিলেও হত কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওরা এখনও ই-ভারসানে টাকা লেনদেন করে না। হাতে দেয়। অগত্যা…
কফি না চা! রান্না ঘর থেকে ডাক দিল প্রিয়ম।
চা… চা! কফি নেইও ঘরে!
আনলাম তো! আমি খেলাম! তুই খেলে বল বানিয়ে দি!
না… চা’ই দে!
আচ্ছা!

প্রিয়মের সাথে অভির আলাপ কলেজে। শিবপুরে তখন তারা একসাথে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত। একঘরেও ছিল তিন বছর। প্রিয়ম এক বছরের সিনিয়র। তবে বয়স তাদের একই। তখন থেকে প্রিয়মের নাড়ী নক্ষত্র অভি চেনে। ছেলেটা যতটা স্মার্ট হতে চায় ততটা স্মার্ট ছেলেটা না। সবার সামনে দেখায় সে ভীষণ ইউজ-অ্যান্ড-থ্রো পলিসিতে বিশ্বাসী। সবার সামনে কুল-ডুড্। বন্ধুদের কাছে ইমেজ রক্ষার একটা ব্যাপার থাকে। কিন্তু মনে মনে চায় একটা স্টেবেল রিলেশনশিপ। সবাইকে দেখাবে চাইলেই সে গ্যালন গ্যালন মদ খেতে পারে কিন্তু আদতে লিমিটের মধ্যেই থাকে। এইরকমই ও। শিবপুর থেকে বেরিয়ে কিছুদিন কলকাতায় ছিল। তারপর কোম্পানিই পাঠিয়ে দিল পুনেতে। সেখানেই টানা আট বছর। মাঝে বোধ হয় দু’বছর আমেরিকায় একটা ট্রেনিং এ গেছিল। আর অভি তো বেরিয়ে চাকরি পেয়েছিল রাজস্থানে। হিন্দুস্থান অয়েলস-এ। মন টিকল না। তারপর আরেকটা কাজ নিয়ে ভুবনেশ্বর। ওখানে থাকতেই লেখালিখি শুরু। তারপর একটু চেনা পরিচিতি হতে কলকাতায়। হঠাৎ করে সাহিত্য একাডেমী যুব পুরস্কারটা পেয়েই শিকে ছিঁড়ল। তারপর কলকাতায়। ভুবনেশ্বরে থাকতেই কলকাতায় আরেকটা কোম্পানিতে আবেদন করল চাকরীর। প্রোফাইল ভাল ছিল, পেয়েও গেল। ব্যস সোজা চলে এল কলকাতায়। অভির আসল বাড়ি জলপাইগুড়ি। তারপর বাবাকে পকিয়ে পাকিয়ে কলকাতায় এই টু-রুম ফ্ল্যাটটা কিনল।
এর মাঝে প্রিয়মের সাথে সমানে যোগাযোগ থেকেছে। প্রিয়মও জানত তাকে যদি কেউ বোঝে তাহলে সে অভিই। তাই তাকে নিজের আসল রূপটা দেখাতে সে ইতস্তত করেনি। এমনিতে সে এক্সট্রোভার্ট। কিন্তু সবার সামনে নিজেকে খোলে না।
অভি এমনিতে খুব একটা কাউকে নিজের জীবনে ঢোকায় না। বন্ধুত্ব হলেও ওপর ওপর। কিন্তু কেউই অন্তরঙ্গ না। সে ব্যক্তিজীবনেও খানিকটা একা থাকতে পছন্দ করে। কখনও ভীড়ে তাকে খুঁজে পাওয়া যেত না। না ফ্রেসার্স, না পার্টি, না কোনো রাজনৈতিক সভা, না ক্যান্টিনে। কিছুতে না। সেখান থেকেই হয়ত প্রিয়মও বুঝতে পারে অভি অন্যদের থেকে আলাদা। অভিও প্রিয়মকে প্রথম চিনেছিল যেদিন শ্রেয়সীর সাথে ব্রেকাপের পর সবাইকে সে মদ খাইয়েছিল। খুব হাসাহাসি ফুর্তি করেছিল বন্ধুদের সাথে। রাতে ঘরে ফিরে অভিকে বলেছিল, কি রে পার্টিতে এলি না! অভি খুব ক্রূর ভাবে উত্তর দিয়েছিল, নিজেকে অন্তত বোকা বানাস না। প্রিয়ম প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি। আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিল। অভি ডেকে বলেছিল, প্রিয়ম কথা বলতে চাইলে বলতে পারিস!
হুম, সাড়া দিয়েছিল প্রিয়ম।
হঠাৎই মাঝ রাতে প্রিয়ম ডাকে অভিকে।
কি হল?
খুব কষ্ট হচ্ছে রে!
অভি সেদিন না বলেই প্রিয়মকে জড়িয়ে ধরেছিল। প্রিয়ম কেঁদেছিল নিজের মত। ওকে জড়িয়ে ধরে থাকতে থাকতে অভিরও ওর প্রতি কেমন একটা মায়া এসে গেল। তারপর থেকেই তার জীবনে প্রিয়মের একটা আলাদা জায়গা হয়েছে । সেদিন বাদেও তার সাথে অনেকদিনের আলাপ তার। চেনা জানা। অনেক কিছুর সাক্ষী সে। কলেজ দিনের র‍্যাগিং থেকে বন্ধুত্ব সবটা পথ পেরিয়ে এসেছে তারা। তাই কিছুদিন আগে প্রিয়মকেই বলেছিল সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা! বাবা মা’ও জানত না তখন!
বাড়া আমার, তিন বছরে একবার বুঝতেও পারিনি!
প্রিয়মের এই ফার্স্ট রিয়্যাকশন দেখে হেসেছিল অভি। অথচ কত ভেবেছিল সে জানতে পারলে প্রিয়ম যদি তার সাথে আর সম্পর্ক না রাখে। এতদিনের বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায়! একপ্রকার পরীক্ষামূলক ভাবেই প্রিয়মকে বলেছিল অভি। দেখতে চেয়েছিল যে প্রিয়ম কি রেসপন্স দেয়। প্রকৃত বন্ধু হলে সে যেরকমই হোক মেনে নেবে। প্রিয়ম পরীক্ষায় পাশ করে গেছিল।
শোনো বাবু, বেশি ভেবো না। আমি তোমার পাশে আছি সবসময়! বলেছিল প্রিয়ম। বাড়িতে জানে?
এখনও না!
আমিই প্রথম?
হ্যাঁ!
আচ্ছা! বেশ। বয়ফ্রেন্ড হয়েছে নাকি?
নাহ রে বাবা!
পুনেতে চলে আয়। অনেক আছে। তোর সাথে লাইন করিয়ে দি!
অভি হেসেছিল। কলকাতায় খুঁজি। না পেলে পুনেতে দেখব।
প্রিয়মের নতুন রিলেশনটাও চার বছরের হতে চলছিল। মেয়েটার নাম তানিয়া। পুনেতেই থাকে। মারাঠি মেয়ে। দেখতেও সুন্দর। কত ছবি দিয়েছে এই ক’বছরে। দু’তিনবার কথাও হয়েছে মেয়েটার সাথে। তবে সামনাসামনি দেখা হয়নি। প্রিয়ম অনেকবার বলেছে একবার ঘুরে যেতে পুনে থেকে। অভির যাওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু যাবে না।কারণ ব্যক্তিগত।
প্রিয়ম ছেলেটাই ওরম। যখন যাকে ভালবাসে প্রাণ দিয়ে বাসে। হঠাৎ করে কেন ব্রেকাপ হয়ে গেল কে জানে। অভি ভাবে, এখনই জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে না। সবে সবে এসেছে। নিশ্চই সেরকম কিছুই হয়েছে। সে আর এই নিয়ে কথা বাড়ায় না।
চা খেতে খেতে অভি বলে, একটু শুয়ে নিতে পারতিস তো!
দুপুরে ঘুমাবো এক্কেবারে! চা’টায় চিনি ঠিকাছে?
পারফেক্ট!?
তা তুই তো এত বেলা অব্দি ঘুমাতিস না!
কিছু করার নেই বস্ … কাল চারটের সময় বাচ্চাদের পূজাবার্ষিকীরটা শেষ করলাম।
ও… তোর এত লিখতে ক্লান্তি আসেনা!
যা দিয়ে পেট চলে এবং তৃপ্তি মেটে তাতে ক্লান্তি আসলে চলে?
চাকরীর ওখানে অসুবিধা হয় না?
বসের দুটো টুইন। দুটোই মেয়ে। পড়ে ইংলিশ মিডিয়ামে। বাংলা পড়তে চায় না। পড়ে একমাত্র হাবলু-গাবলু আর শ্রুতি। বস্ বাংলা শিখিয়েই ছাড়বে। অতএব মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছুটি মঞ্জুর করেন!
বাবাহ!… ভালোই আছিস!
অভি হাসে!
তা এবারে শ্রুতি কোথায় যাবে?
উঁহু… এখন বলব না! বেরোলে পড়বি।
তোর ম্যানুস্ক্রিপ্টটা দিস… পড়ব।
সরি স্যার… হবে না! আজ দুটোর আগে সম্পাদকের টেবিলে চালান দিতে হবে। দু’সপ্তাহ ধরে ঘোরাচ্ছি।
তুই চাইলেই আরেকদিন দেরী করতে পারিস!
তোর কিনে পড়তে কি হচ্ছে?
আচ্ছা, ঠিকাছে যা! কিনেই পড়ব।
বেশ… দুপুরের কি কি রান্না করলি বল?
উচ্ছে ছিল, উচ্ছে ভাজলাম। আর কিছুই করিনি এখনও। ভাবছি মুগের ডাল করব।
আর?
আর, কি খাওয়াবি বল?
তুই কি খাবি বল?
আচ্ছা, অনেকদিন ট্যাংরা মাছের ঝোল খেতে ইচ্ছা করছে জানিস! পাতলা করে জিরে বাটা দিয়ে!
তুই ট্যাংরা মাছ চিনিস? অভি জিজ্ঞাসা করল!
হ্যাঁ… চিনব না কেন?
তাহলে যা বাজার থেকে নিয়ে আয়। সন্ধ্যা দি একটু পরেই আসবে। ও রেঁধে দেবে!
ও তুই রান্নার লোক রেখেছিস?
অনেকদিন তো! রাতেরটা নিজে করার চেষ্টা করি! বলে উঠে পড়ল অভি। পেপারটা আর দুধটা নিয়েছিস?
না তো!
সকালেই দিয়ে যায়! বেলও দেয় না আজকাল। কি এত ব্যস্ততা কে জানে! বলে সামনের দরজাটা খুলে দুধ আর পেপারটা নিয়ে এল।
এসে অভি প্রিয়মের পাশে দাঁড়াল, দেখি সর! দুধটা জাল দি!
আমি দিয়ে দিচ্ছি!
বেশি কাজ দেখাস না তো!
প্রিয়ম হাসে! সে এসে পেপারটা নিয়ে সোফায় বসে পড়ে। অভি দুধের প্যাকেটটা কেটে সস্-প্যানে দুধটা ঢাললো। তারপর বোতল থেকে জল দিয়ে প্যাকেটের ভেতরের গায়ে যা দুধ লেগেছিল তা ধুয়ে বাটিতে দিল।
সত্যিই তুই একদম টিপিক্যাল বাঙালি! প্রিয়ম পিছনে লাগে!
কেন? কি হল?
এই যে দুধ ঢেলে, দুধের প্যাকেটে জল দিয়ে ধুয়ে নেওয়া!
হাসে অভি! তা বলতে পারিস!

দুধটা বসিয়ে চায়ের কাপটা ধুয়ে রাখল। হ্যাঁরে সকালে খাবি কি? পাউরুটি বাটার চলবে তো?
দৌড়বে! পুনেতে থাকতে সকালবেলার খাওয়ার বলে কিছু ছিল না। লাঞ্চ পর্যন্ত কফি আর জল খেয়েই কেটে যেত! খুব রেয়ার একটা স্যান্ডউইচ!
বেশ! ফ্রিজে আছে সবই। আমিও খাবো। তারপর নিজের মনেই বলতে থাকল, আজ সন্ধ্যা দি’কে ঐ ঘরের চাদরটা পালটে দিতে বলতে হবে! ঘরটাও মোছে না বোধ হয় কেউ থাকে না বলে!
একবার বাথরুম থেকে ঘুরে এসে সোফায় বসল প্রিয়মের সামনে! দেখি সম্পাদকীয়টা একটু! বলে সম্পাদকীয় পেজটা টেনে নিল অভি!
হ্যারে, কাকু কাকিমা জানেন তুই কলকাতায়?
নাহ! কেন?
নাহ… এমনি জিজ্ঞাসা করছি!
একটা চাকরি নি আগে এখানে… তারপর বলব!
তুই পুনেতে আর ফিরবি না?
নাহ… আপাতত ইচ্ছা নেই!! ক’দিন একটু এখানে থাকি! তারপর ব্যাঙ্গালোর-ট্যাঙ্গালোরের দিকে চলে যাব!
আচ্ছা! অনেকদিন পর তোকে সামনে দেখলাম। অভি বলেই ফেলল কথাটা! সেই শেষ সামনাসামনি দেখা হয়েছিল রাজস্থান থেকে ফেরার সময় একবার একদিনের জন্য দিল্লিতে ছিল। প্রিয়মও দিল্লিতে ছিল। সেবার। তারপর ভিডিও কলে কথা হয়েছে! কিন্তু ভিডিও কল আর সামনাসামনি কথা বলার মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ।
তারপর আর ক’টা বাকি? হঠাৎ প্রশ্ন করল প্রিয়ম।
কি কটা বাকি?
লেখা!
ও! এখনও একটা উপন্যাস। একটা বড় গল্প।
ওউ! বাহ… তুই কি কাগজে লিখিস? না ল্যাপটপে?
ল্যাপটপে! এখন কেউ আর হাতে লেখা কাগজ নিতে চায় না। নিজেরও সময় বাঁচে… ওদেরও!
হ্যাঁ… তা তো ঠিকই!
হুম… তুই আমার লেখা পড়িস?
সব পড়েছি বলব না! তবে কিছু পড়েছি।আকাশকুসুমটা পড়েছি। বিনিদ্র গল্পেরা পড়েছি। সুখতারা পড়েছি…
বাহ… অনেক পড়ে ফেলেছিস তো!
হাসে প্রিয়ম। প্রিয়ম কোনোদিনই খুব একটা পাঠক-বস্তু নয়। সে সিনেমা দেখবে। কিন্তু বই পড়তে তার ভীষণ অনিহা! অভিও তা জানে। প্রথম যেবার পূজাবার্ষিকীতে লেখা ছাপলো, অভি প্রিয়মকেই প্রথম ফোন করে জানিয়েছিল। প্রিয়মও পূজাবার্ষিকী কিনে ছবি তুলে হোয়াটস্যাপে পাঠিয়েছিল। অভি জানত প্রিয়ম তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্যেই কিনেছে। এমনিতে সে পড়বে না। সে যে পড়েছে এই অনেক! এছাড়া অন্যান্য যেখানে অভির গল্প ছাপত তাও সে প্রিয়মকে পাঠাতো! প্রিয়মও খুব উৎসাহ দিত, পাঠা পাঠা! পড়ব। অভি জানতো প্রিয়ম পড়বে না। তাও পাঠাত।
তুই না, আকাশকুসুমের শেষটা অতটা কষ্টের না রাখলেও পারতিস!
কেন কান্না পেয়েছে?
পেয়েছিল কি কেঁদেওছি!
হিহিহিহি… তোর মত কতজন আছে বলত যারা কেঁদে তৃপ্তি পায়!
আচ্ছা, তোর নিজের কান্না পায় না!
নাহ! এবারে দেশে কি লিখছিস?
বলব কেন?
বল না!
নাহ… বলব না!
বল না!
এবার আমি দেশে আমার আর তোর গল্প লিখব!
কিরম কিরম? চোখ পাকিয়ে মুখ হা করে বসল প্রিয়ম।
এই কলেজে দেখা। তারপর ফ্রেন্ডশিপ। তারপর আমার কাম আউট… তারপর তোর ব্রেকাপ… তারপর টা এখনও ভাবিনি! লিখতে লিখতে যা আসবে!
সিরিয়াসলি?
হ্যাঁ… বলে হেসে উঠে গেল অভি!
জানোয়ার একটা! প্রিয়ম বুঝল তার সাথে অভি এতক্ষণ ইয়ার্কি মারছিল।
তবে প্লটটা মন্দ নয়! পেপারটা উল্টাতে উল্টাতে বলল প্রিয়ম।
শোন, লিখতে বসছি। ডিস্টার্ব করবি না! সন্ধ্যা দি আসলে ঐ ঘরটাকে পরিষ্কার করতে বলবি। আর বাজার থেকে মাছ নিয়ে আসবি। সামনেই বাজার! রাস্তার ওপারের গলিটা দিয়ে সোজা গেলেই। আর টিভির রিমোট টি-টেবিলের ড্রয়ারে। পাউরুটি খাবি যখন নিজে একা খাস না, আমাকেও দিস! গড় গড় করে বলে গেল অভি।
জো হুকুম মেরে আকা… প্রিয়ম বিনা অনুভূতি দিয়েই কথাটা বলল। তারপর খেলার পেজটাকে মুখের সামনে মেলে ধরল!
ওদিকে অভি ঘরের দ্বোর দিল।

-৫-

শিবকে ঘুম থেকে তোলা মানে একটা বাড়তি ঝামেলা। ডেকে ডেকেও ওঠানো যায় না। শিউলি এসে বলল, দাও না জল ঢেলে গায়ে।
কেন তোর কি ওর ওপর রাগ আছে? রুদ্র হেসে জিজ্ঞাসা করল!
আছেই তো! এসেই অর্ডার করে… এই কর সেই কর!
হাসে রুদ্র। যা এক গ্লাস জল নিয়ে আয়!
সত্যি সত্যি জল ঢেলে দেবে নাকি!
নিয়ে আয় না!
মুখে দুষ্টু হাসি হেসে জল আনতে গেল শিউলি! রুদ্র আরেকবার ডাকল ‘শিব!’ ‘এই… মাড়া!’ ধাক্কাতে গলার ভাঁজের ঘামের রেখা চিকচিক করে উঠল। শিব ঘুমালে চোখটা দেখে মনে হয় যেন আধ-খোলা। যেন জেগেই আছে। ইচ্ছা করে ঘুমাচ্ছে। গরমটাও সেরকম পড়েছে। ঘামে রুদ্রর গ্যাঞ্জিটাও সপসপে হয়ে গেছে। আবারও কারেন্ট গেছে বহুক্ষণ। আসেনি এখনও। শিউলিটাও আসতে দেরী করল। গরম কালে একবার স্নান করে নিলে, এ রোদ্দুরে আর বাইরে বেরোতে ইচ্ছা করে না তা রুদ্র জানে। সেও বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল। শিউলি এসে কলিংবেল টিপতে ঘুমটা ভেঙে গেলো।
শিউলি এক গ্লাস ভরতি করে জল নিয়ে এল! রুদ্র দেখে হাসে। তুই কি পাগল? এত জল এনেছিস কেন?
ভালো করে ঢালো!
বিছানা ভিজে যাবে না? বলে রুদ্র হাতের তালুতে অল্প একটু জল নিয়ে ছিটিয়ে দিল শিবের মুখে! সঙ্গে সঙ্গে মুখচোখ চনমন করে উঠল তার ! ঘুরে শুলো! আরেকবার জলের ছিটে দিল রুদ্র।
হুঁ? হুঁ? হুরমুড়িয়ে উঠে বসল। উঠে বসে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে সামনের দেওয়ালের দিকে চেয়ে থাকল শিব। শিউলির সে কি হাসি! প্রথমে মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসছিস! হাত দিয়ে চাপতে পারছিল না, সে হাত ফেটে বেরিয়ে গিয়ে বোমার মত হাসি ফেটে পড়ল। রুদ্র মৃদু মৃদু হাসছিল। ঘুমু ঘুমু মাতাল চোখে শিব পিছনে ফিরল। রুদ্র জলের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর শিউলি হাসছে নির্লজ্জের মত।
কি হল? শিব জিজ্ঞাসা করল!
কিছু না! ওঠ। খাবি চ! শিউলি যা খাওয়ার বার!
যাই… হাসতে হাসতে বিদায় নিল শিউলি। উফফ… বাবাগো!যেতে যেতেও হাসির রেশ ঘরে ছেড়ে গেল। দুপুরবেলা এক কান্ড হল বটে!

বিকালের দিকে পাঁচটা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ফুরফুর করে ঠান্ডা বাতাস দিতে শুরু করল। গরম থেকে এসে ফ্রিজ খুলে মুখ দিয়ে দাঁড়ালে যেমন আলুথালু ভাবে শীতল হাওয়া ছুঁয়ে যায় তেমনই জিরিয়ে দিতে থাকল সবাইকে।
কি মনে হয় বৃষ্টি হবে? শিব জিজ্ঞাসা করল। ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা যায় অনেকটা। রোদ পড়ে গেলেও খুব যে ঘন কালো মেঘ জমেছে এমনটা নয়। অন্তত এখনও তো চোখে পড়ছে না। রুদ্র গাছগুলোতে জল দিচ্ছিল।
কে জানে! বৃষ্টি হোক না হোক… একটু হাওয়াটাওয়া দিক। ঝড়টড় হোক… তাহলেই হবে!
এইটা কি গাছ রে?
ক্যাকটাস প্রজাতি! এমনি নাম জানি না! কি সুন্দর না ফুল গুলো!
হ্যাঁ… ক্যাকটাসের ফুল বরাবর খুব অ্যাট্রাক্টিভ হয়!
হ্যাঁ…
কাকুর সাথে যোগাযোগ করলি আর?
নাহ!
এখনও হরিদ্বারেই আছেন?
তাই তো জানি!
খবর নিস নি?
নাহ! কি করে নেব?
শিব আর কিছু বলে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে রুদ্রই বলতে শুরু করে, আর যে জীবনটাকে এতদিন ধরে চাইছিলেন, এখন সেখানেই আছেন। ওনার সাথে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করার মানে ওনাকে বিব্রত করা। আমি বা মা কেউই সেটা চাইনা! যে কদিন জোর করে হলেও সংসারে ছিলেন… আমাদের কোনো অভাব রাখেন নি! এবার নিজের জীবন নিজে বাঁচছেন… তার সে অধিকার আছে!
কাকু কি বরাবরই এরম ছিলেন?
হ্যাঁ… মোটামুটি। সাংসারিক কোনো বিষয়ে মাথা ঘামাতেন না! উদাসীন গোছের। বিয়ে করেছিল কেন সেটাই বিষয়!
ফ্যামিলি প্রেসার আবার কি!
সেটাই… ফ্যামিলিগুলোরও খেয়ে দেয়ে কাজ নেই… নিজেদের আশা আকাঙ্ক্ষা সব ছোটোদের ওপর চাপিয়ে দেয়!
তোকে তো দেয়নি!
কিন্তু তোকে তো দিয়েছে! শিব আর কথা বলে না!

জল দেওয়া শেষ করে রুদ্র শিবের পাশে এসে দাঁড়াল। শিব দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে সিগারেট খাচ্ছিল আপন মনে!
সিগারেট খাওয়াটাকি বেড়েছে? তির্যক প্রশ্ন করে রুদ্র।
কৈ আমি তো বুঝি না! হতে পারে! শিব এড়িয়ে যায়! রুদ্র ভালোই জানে এর মানে। কোনো বিষয়ে গভীর ভাবে ভাবলে শিব সিগারেট খায়। একটার পর একটা! এই এক্ষুণি ছাদে দাঁড়িয়েই তো তিনটে পুড়ে গেল।
কথা বল! কথা না বলে তুইও তো ভাল নেই! রুদ্র কাঁধ দিয়ে ঠ্যালা মারে।
ধুস… কথা বলতে গেলেই শুনতে হবে সব নাকি আমার দোষ! তার নাকি কোনো দোষ নেই!
আচ্ছা… তা নয় একটু শুনে নিলিই বা! কি এমন ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে!
আরে শুনে নেওয়াটা বড় কথা নয়। প্রতিদিন এক কথা শুনতে ভালো লাগে কারোর?
লাস্টবারের মত শুনে নে!
তুমি তো পরোনি খপ্পরে। বুঝতে পারছ না!
কিসের খপ্পরে?
এই যে রিলেশনের! মেনটেন করা যে কি চাপের!
উফফ… তোরা যেন রিলেশনশিপে থেকে মাথা কিনে নিয়েছিস! নিজেদের ইগোর জ্বালায় মরবি.. আবার আমাদের ঠারে ঠারে কথা শোনাবি! একটু জোর গলাতেই বলে রুদ্র।
আরে রাগ করিস না! শিব হাসে। এখন থেকে দেখে শিখে রাখ! পরে কাজে দেবে!
ছাই দেবে!
গাছে গাছে পাতার ঘষাঘষির এক মধুর ধ্বনি উঠেছে। কারোদের মনে হয় কোনো টিনের চাল হেলছে বেঁকছে। টন-টন করে আওয়াজ হচ্ছে হাওয়ায়। হাওয়াটা ভালোই দিচ্ছে!
তোর জন্য একটা ছেলে দেখি!
থাক… আপনি নিজেরটা সামলান! সামনে নিভে যাওয়া সুর্যটাকে কি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যেন ডিমের কুসুম। কমলাভ লাল।
আরে… মানুষ জানিস না নিজেরটা থেকে অপরেরটা ভাল সামলাতে পারে!
সেই… আমি কিন্তু কনিষ্কর সাথে কোনোভাবেই কথা বলতে পারব না! তোদের ঝামেলা তোরা মেটাবি। সুর্যটাকে দেখছিস?
ধুর… ভাড় মে যায়ে সুর্য! একবার… একবার! একবার চ আমার সাথে! তুই থাকলে কম ঝাড়বে। আমারো মনে বল থাকবে!
তিনটে বল সামলাতে পারবি না… দুটো নিয়েই থাক!
ইয়ার্কি মারিস না তো! চ’ না! চ’ না!
না… আমি যাব না! আমার পরীক্ষা আছে পরশু। আমি এখনি পড়তে বসব!
মিথ্যা কথা বলিস না রুদ্র! তোর কোনো পরীক্ষা নেই!
আছে… আছে!
তুই আমার সাথে যাবি ব্যাস!

সাড়ে চ’টা নাগাদ তখন ওরা ক্যাফেটেরিয়ার সামনের লনে দাঁড়িয়ে। কনিষ্ক তখনও এসে পৌঁছায়নি। তুমুল বেগে ঝড় উঠেছে। বৃষ্টি নামবে নামবে মনে হচ্ছে!
কোথায় ছেলেটা দেখ না! রুদ্র বলল।
ও ঠিক চলে আসবে! শিবের যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ফোনে গেম খেলছে অনেকক্ষণ থেকে!
বাড়া তোর লাভার না আমার?
আমার! কেন?
আরে এত ঝড় উঠেছে! দেখ ফোন করে কোথায় আছে? এটুকু কেয়ারিং মনোভাব তো ও’ও আশা করে নাকি!
বাদ দে তো! এত বেশি দ্যাখানোর কি আছে!
ফোনটা রাখ তো! বলে শিবের ফোনটা কেড়ে নেয় রুদ্র।
আরে কি হল? এই রাউন্ডটা জিতে যেতাম! তোর জন্য! কতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি! রেগে মেগে বলল। শিব।
নে… এবার ওকে ফোন কর!
তুই কর গে যা! তোর যখন এত টেনশন হচ্ছে।
শোন বেশি এরম করলে আমি এখান থেকে চলে যাব! রুদ্রও গলা তুলল।
যা গে! এসে একদম মাথা কিনে নিয়েছে!
ধর তোর ফোন! চললাম! বলে বৃষ্টির মধ্যেই রুদ্র বেরিয়ে গেল। সবে সবেই বৃষ্টিটা শুরু হয়েছে।
শিব কিছু বলল না। পেঁচামার্কা মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। এদিকে বৃষ্টির তোড় আরো বাড়ল। হাতেই ফোনটা ছিল। কি মনে হতে একবার কনিষ্ককে ফোন করল শিব!
কোথায়?

ও… ওখানেই দাঁড়া! বৃষ্টিটা একটু কমুক… তারপর আসিস!

হুম… দাঁড়াব।
খোঁজ নিয়ে ভাল লাগছে শিবের। কিন্তু রুদ্রের সাথে শুধু শুধু ঝামেলাটা হল! মনটাই বিগরে গেল। এই বৃষ্টির মধ্যে ও যে কোথায় গেল কে জানে!

-৬-

সকাল থেকে বাড়িতে এত ব্যস্ততা ফোনটা দেখার সময় হয়নি। বাড়িতে আজ পুজো। প্রতিষ্ঠা করা রাধাকৃষ্ণ। তারই বার্ষিক পুজো। এই জোগাড় টোগার হয়ে ঠাকুর মশাই পুজোতে বসল। এবার প্যান্টটা ছেড়ে ধুতি পরতে হবে। তাই ঘরে এসে দরজাটা লাগিয়ে বসল ঋতম। সকাল নয়, কাল রাত থেকেই ছোটাছুটি চলছে। ফুল আনা। মিষ্টি আনা। ডেকোরেশন। এদিকে খাওয়াদাওয়া। যদিও সে দিকটা বাবা দেখছেন তবুও ক্যাটারিং-র অর্ডার তো নিয়েছে ঋতমেরই এক পাড়াতুতো বন্ধু। তার বাবাও তাকে চেনে। ঋতম কিছুই বলেনি। বাবাই ডেকে বললেন, পল্টুকে বল। নতুন ক্যাটারিং-র ব্যবসা খুলেছে। ওরও তো প্রসার লাগবে।
বাবা এইসব দিক দিয়ে ঠিক আছে। নিজেও তো ব্যবসাটা শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন, তাই এসব বোঝেন। পল্টু ঋতমের থেকে একটু বড়ই। ও পল্টু দা’ই বলে। ওর ট্রুপে যারা কাজ করে সবাই মোটামুটি পাড়ারই। কুচে কুচে সব। পকেট মানির লোভে কাজ করে। খাটতেও হয় সেরকম। নাহ, ওরা খাটতেও পারে। আর পল্টু দা যে শুধু ওদের ওপর অর্ডার করে এমন নয়, নিজে হাতে খাটেও ছেলেটা। ওদেরকে ডাকা। সাত সকালে উঠে বাবার সাথে বাজারে যাওয়া। সকাল থেকে চলছে একটার পর একটা। বার ভেতর দুটোই। ঠাম্মার বয়েস হয়েছে। মা’র শরীরটাও ভাল নেই। তাই বলে বাৎসরিক পুজোটা তো বন্ধ হতে পারে না!
নাহ, জোগাড়যন্ত্র ভালো মতই হয়েছে।পুজো শুরু হতেই, এসে চিতপটাং হয়ে খাটের ওপর শুল ঋতম। ফ্যানটা চলছে ভঁ ভঁ করে। শুয়ে শুয়েই জামার বোতামগুলো খুলে ফেলল। বুকে হাওয়াটা লাগতে একটু স্বস্তি হচ্ছে যেন। স্নান হয়নি। ফট্ করে স্নানটা সেরে আসতে হবে। নরম পেটটা নামছে উঠছে। ঋতমের অনেকদিন ধরে মনে হচ্ছে জিমে ভরতি হতে হবে। সেদিন নন্দা বিশাল দা’কে দেখিয়ে বলছিল, দেখছ কেমন বডি বানিয়েছে!
সত্যিই তাই। আগে একটা নদে ভুড়ি নিয়ে হোমদামুখো লাগদ। কিছু মাসের মধ্যেই ভোল বদলে গেছে। মডেলিংও করছে নাকি। নন্দাই বলেছে। বিশাল দার গার্লফ্রেন্ড নন্দাদের পাশের বাড়িতে থাকে। নামটা নন্দা বলেছিল। ভুলে গেছে। নাহ, তারও মডেলিং-র সখ। ছেলেগুলোকে ফটোতে কি সুন্দর লাগে! ঋতমের খুব ভাল লাগে দেখতে। সে ভাবেও তাকেও ওরম সুন্দর লাগবে। তার স্বপ্ন একদিন কোনো আন্ডারওয়্যার কম্পানির মডেল হবে। তারা সব থেকে বেশি সেক্সি হয়। তাদেরকে কতজন কামনা করে। সে নিজেও করছে। মেয়েরাও করে। সে জানে।
এই বাবু… স্নান করে নে! অঞ্জুলি দিবি না! দরজাটা খোল একটু। বাইরের থেকে মায়ের গলা পেয়ে উঠে পড়ল ঋতম। দরজাটা খুলল। মা হাতে একটা ধুতি আর একটা উত্তরীয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে গিয়েই কিনে এনেছিল।
এনে… স্নান করে এগুলো পরবি! আর যা… তাড়াতাড়ি স্নানে যা!
যাচ্ছি! বলে কাপড়গুলো নিয়ে আবার দরজা বন্ধ করে দিল। প্যান্টটা ছাড়ল। ভেতরের লাল আন্ডারওয়্যারটা ছাড়ল। লোমগুলো বেড়ে গেছে। ট্রিম করতে হবে। আজ তো হবে না! তাড়াতাড়ি স্নান করতে হবে! তাও হাত দিয়ে টেনে টেনে লোমগুলোকে স্ট্রেট করে দেখল কতটা বড় হয়েছে। নাহ… ভালোই বড় হয়েছে। তারপর বাথরুমে যেতে গিয়ে দেখল গামছাটা বারান্দায় মেলা। এই অবস্থায় যাবে? আর প্যান্ট পরতে ইচ্ছা করছে না! বারান্দার দরজাটা খোলাই ছিল। পর্দা টানা। পর্দাটা সরিয়ে দেখল গামছাটা রেলিং-এ মেলা। সে চারিপাশের বাড়িগুলোর জানলাগুলোতে একটু চোখ বুলিয়ে নিল। ও বাড়ির নিতু কাকিমা রান্না করছে। তাহলে তো এখন যাওয়া যাবে না! সারাদিন তিনি তাদের বাড়িতে চোখ দিয়ে বসে থাকে। গেলে তাকাবেই! আর নিতু কাকিমাকে নিজেকে এভাবে দেখানোতে তার কোনো ইচ্ছা নেই। মনে হতেই, মনে মনে হাসে সে! সে তারপর মেঝেতে উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে। তারপর সাপের মত, বুকে ভর করে, কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে দিয়ে গামছাটা নীচ থেকে আসতে করে টেনে নেয়। নিয়ে আবার ওভাবেই হাতের ওপর ভর করেই ঘরে ঢুকে যায় পর্দার নীচ দিয়ে।

তোর ঘুমটা খুব বেড়েছে! মা সকাল সকাল উঠতেই কানে দিয়ে দিল। ছোটোবেলায় রাজ যখন সকালে ইচ্ছা করে ঘুম থেকে উঠত না, মা যখন বলত, ঘুমা, কত ঘুমাবি ঘুমা! আমি কিচ্ছু বলব না! রাজ বুঝে যেত। এটাই লাস্ট ওয়ার্নিং! এখন বড়বেলায় তো ওরম করে বলা যায় না! বললেও কে শুনছে। কিন্তু ছোটোবেলায় খুব ভয় ছিল। কেন ভয় পেত এখন ভাবলে অবাক লাগে, হাসি পায় রাজের।
বাবা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, কতবার বলি রাতের বেলা না পড়ে, সকালে উঠে পড়। নিশ্চুপ থাকে। সকালের পরিবেশটাও ভাল থাকে। শরীর স্বাস্থ্যও ভালো থাকে! বাবা নিজে ভোর ভোর ওঠেন। ব্যায়াম করেন। হাঁটতে বেরোন। মা’ও ভোরেই ওঠেন। ব্যায়াম করেন। কতবার বলেছেন যে সকালে উঠে তাদের সাথে ব্যায়াম করতে। কে কার কথা শোনে!
দাঁতটা মেজে বাবার উচ্ছিষ্ট খবরের কাগজটা নিয়ে বসল সে। বাবা জীবনেও পেপারটা ঠিক মত ভাঁজ করে না! কি যে অসুবিধা হয়। তাই তার প্রতিদিনের এই বারতি কাজ পেজ নাম্বার অনুযায়ী পাতাগুলোকে সাজানো। তারপর পড়া। পেপারটা গুছিয়ে নিয়ে বসে পড়তে পড়তেই মা চা নিয়ে এল। চা’টা খেয়ে নিয়ে একটু বাজারে যা। কতগুলো জিনিষ আনতে হবে। আর এমনিতেও আলু নেই। পিঁয়াজও বেশি নেই!
বাবা কই?
কেন… তুই যাবি!
রাজ আর বেশি কথা বাড়াল না! সে চা’টা শেষ করে উঠে পড়ল। ফোনটা তার ঘরে। মা’কে বলে গেল, শোনো না মা, বিছানাটা গুছানোর সময় ফোনটা দেখো না! চার্জ নেই মনে হয়। বসিয়ে দিও।
আচ্ছা! আর শোন… একটু মাংস নিস! তুই তো মাছ কিনতে পারবি না আবার !দুপুরে খাবি কি নয়ত!
আচ্ছা!

মাংসের দোকানে মধ্য সপ্তাহে ভীড় সাধারণত হয় না! আর রাজ তো সব লেগ ছাড়া নেবে না! সবার সামনে সব লেগ দেওয়া যায় না। তাই অপেক্ষা করতে হল। প্রায় ঘন্টাখানেক লেগে গেল বাড়ি ফিরতে ফিরতে। খিদেও পেয়েছে। এসেই খেতে বসে পড়ল। বাবা খাচ্ছিল। মা’ খাইনি। সে ফেরেনি, কি করে খায়? আসতেই বাবার প্রশ্ন, সব লেগ দিয়েছে তো? নাকি বুক দিয়ে দিয়েছে!
বুক দিয়ে দিয়েছে! রাজ ইয়ার্কি মেরে বলল।
বাবা বোঝেন। মৃদু হেসে আর কথা বলেন না!
তুমি খেয়েছ? মা’কে জিজ্ঞাসা করল রাজ। জানে খাইনি। তাও। ভালো লাগে করতে।
না… তুই বাজারে… আর আমি খেয়ে নেবো?

বই নিয়ে যখন শেষমেশ বসা গেল তখন পৌনে দশটা-দশটা !আজ সেরকম একটা ক্লাস নেই। কাল ইন্টারনাল। পড়া হয়নি। তাই ঠিক করেই রেখেছিল আজ ইউনিভারসিটি যাবে না। ফোনটা দেখল একবার। চার্জ হচ্ছে। ঠিকই ধরেছিল। বেশি চার্জ ছিল না। এখন ৮৯% দেখাচ্ছে। এক ঘন্টায় অনেকটা চার্জ হয়ে গেছে। কাল ঋতমের সাথে কথা হয়নি সেভাবে।পুজো আছে বলল। ব্যস্ত। সে তাও একবার অন হয়ে দেখল। নাহ… মেসেজ আসেনি। তাও সে একটা ‘good mrng’ পাঠিয়ে রাখল। ক্লাসের গ্রুপে মেসেজ এসেছে। আজকের ক্লাসটা ক্যানসেল হয়েছে। ভালো হয়েছে বাবা… ক্লাসটা নয়ত মিস হত। গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। তাও…
কাল রাত্রিতেই ক্লাস নোটসগুলো ফেয়ার করা হয়ে গেছিল। ফেয়ার করা তো নয়, একপ্রকার পাঠোদ্ধার করা। ভাগ্যিস, বহ্নি ক্লাসে নোটস্গুলো পুরোটা নেয়। সে তো লিখতেই পারে না। খুব কম জনই লিখতে পারে। বহ্নি সেই বিরল ব্যক্তিগুলোর একজন। তাও ওর খাতার ফটোকপি থেকে নিজের খাতায় তোলাটা একটা কষ্টসাধ্য কাজ। যদিও এই করতে গিয়ে দুবার পড়া হয়ে যায়। একদিক দিয়ে ভালোই হয়। খাতাটার পড়া প্রায় শেষ। জিস্টটা মনে আছে। বইটা পড়তে পারলে ভাল হয়। তাই মোবাইলটা চার্জ থেকে খুলে নিয়ে এল। বইয়ের পিডিএফটা ক্লাস গ্রুপে পাঠানো ছিল। বইটা বেশ মোটাসোটা। যদিও ফোনে তো বোঝা যায় না। তবে ৫৪৮ মত পেজ! কিছুটা আগে পড়া ছিল। তারপর থেকে পড়তে শুরু করল। ফোনটা হয়ে ভালো হয়েছে। এই বই টই পড়া যায়। শুধু পড়ার বই না গল্পের বইটইও বেশ পড়া যায়।
তবে ফোন হাতে থাকার একটা বাড়তি অসুবিধাও আছে। বিশেষ করে যদি ফোনে নেট থাকে। বারবার মন উশখুশ করে একটু অন হই… এ যে কি প্রলোভন তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না! রাজেরও তাই। তিন চার পাতা পড়েই এত ক্লান্তি চলে আসে যে তার থেকে রিল্যাক্স হওয়ার জন্য একটু নেট করতেই হবে। যথারীতি অন হল!
টুং-টুং শব্দ করে হোয়াটস্যাপে মেসেজ আসার বার্তা দিল। ঋতম কি? হ্যাঁ… ও’ই! ছবি পাঠিয়েছে কতগুলো! বাড়ির ঠাকুরের। শ্বেত পাথরের রাধা গোবিন্দের মূর্তি। খুব সুন্দর করে সাজানো। ঠাকুর ঘরটাও বেশ সুন্দর। দেখেই মালুম হচ্ছে। শেষে নিজের একটা ছবি পাঠিয়েছে। খালি গায়ে, উত্তরীয় ঢাকা। বুক দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু লোমাবৃত পেটটি বেশ সুন্দর বোঝা যাচ্ছে। খুব স্থূল নয়। তবু যেন পেলব। ছবিতেই যেন দেখে মনে হচ্ছে নরম হবে পেটটা। সে একবার যেন কল্পণা করে নেয়, তার হাতের তালুটা ঋতমের পেট ছুঁয়েছে। লোমগুলো ঠেকেছে হাতে। সুড়সুড়ি লাগছে। নীচে ধুতি পরেছে। ধুতির গিঁটটা নাভির অনেকটা নীচে বেঁধেছে। তাই পেটের কাছটা অদ্ভুত হয়ে রয়েছে। ছবিটা দেখা মাত্রই রাজের কেমন একটা করে উঠল শরীরটায়।
সে লিখে পাঠাল : এসব ঠিক না!
অনই ছিল বোধ হয়, কিন্তু এতক্ষণ দেখাচ্ছিল না কোনো কারণে। রিপ্লাই এল : কিসব?
রা : এইসব উত্তেজক ছবি পাঠানো…
ঋ : কেন তোর উত্তেজনা হচ্ছে?
রা : স্বাভাবিক…
ঋ : তাহলে আমাকে ভালোই লাগছে!
রা : ভালোই লাগছে… তবে উত্তরীয় ছাড়া তুললে আরো ভালো লাগত!
ঋ : 😒😒😒😒
রা : মুখ ব্যাকানোর কিছু হয়নি!
ঋ : খালি উল্টোপাল্টা ফন্দি!
রা : সে নয় করলামই একটু…
ঋ : একদম করবে না! বাচ্চা ছেলে… যাও পড়তে বোসো!
রা : 😊😊😊😊 পুজো মিটলো?
ঋ : একটু আগে!
রা : খেয়েছিস কিছু? না উপোস?
ঋ : খাচ্ছি…
রা : কি খেলি?
ঋ : লুচি তরকারি মিষ্টি
রা : বাহ… খা তবে!
ঋ : তুই খেয়েছিস সকালে?
রা : হ্যাঁ…
ঋ : কি করছিস?
রা : এই পড়ছিলাম… কাল ইন্টারনাল আছে!
ঋ : … পড় তবে! রাতে কথা হচ্ছে!
রা : কেন আর সারাদিন কথা হবে না?
ঋ : পড়ে নাও… তারপর অনেক কথা বলব!
রা : বেশ… বেশ!
ঋ : হুম… বাই!
রা : বাই… বললাম না!

-৭-

কারেন্ট চলে গেছে। একটু ঝড় হলেই এদিকে খুব কারেন্ট যায়। অনেকে বলে, গরমকালে ঠাকুরের কাছে হাওয়া চাইতেও ভয় হয়। হাওয়া দেবে তো কারেন্ট নিয়ে নেবে। তবে আজ বিকেলের দিক থেকেই একটু ঝড় বৃষ্টি হয়েছে। ঘুমটা ভাল হবে, এই ভেবে শুলেও লালের ঘুম আসছে না। জানলার পর্দাটা হাওয়ায় দুলছে। বাইরের সেরকম কোনো আলো নেই। অমাবস্যা না, তবুও মেঘলা আকাশে চাঁদের আলো খুব একটা নেই। মনটা কেমন অস্থির অস্থির করছে। আর দুদিন। বাবান দা চলে যাবে। আবার কবে আসবে? আর আসবে কি না! পিসেমশাইকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা চলছে। এইবারে না হলেও পরেরবারে। পিসেমশাইয়ের ইচ্ছা গয়াতে পিসির নামে পিন্ডদান করবেন। বাবান দা’র যাওয়ার সময় নেই। স্বাভাবিক। ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে এসেছে। অগত্যা শুধু পিসেমশাই যাবেন। খুব সম্ভবত পিসেমশাইয়ের ভাই যাবেন তার সাথে। সেখান থেকে পিসেমশাইকে পুনেতে পৌঁছে দিয়ে তিনি কলকাতায় চলে আসবেন। ভাবতেই ভাবতেই জানলাটা ধুম করে পড়ল গ্রিলে। হাওয়ায়। লাল উঠে গিয়ে জানলাটা লাগিয়ে এল। জানলা দিয়ে বারান্দাটা দেখা যায়। বাবান দা সিগারেট খাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে না তবু সিগারেটের আগুনের কমলা শিখাটা বোঝা যাচ্ছে। লাল এসে খাটে শুয়ে পড়ল।
তারা তখনও ছোটো। যদিও খুব ছোটো বলা চলে না। কিন্তু জীবনটাকে বড় ধরলে তখন ছোটোই বটে তারা। বাবান ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে তখন। লাল ইলেভেনে। দু’বছরের ছোটো বড় তারা। বাড়িতে কিসের বেশ পুজো ছিল। খুব সম্ভবত পৌষ মাসের লক্ষ্মী পুজো। ঠাকুমা প্রচলন করে গেছিলেন। অপরূপার সেই অর্থে কোনোদিনই শ্বশুর শ্বাশুড়ী ছিল না। পিসেমশাইরা অনেক ছোটোতেই তাদের বাবা মা-কে হারিয়েছেন। তাই অপরূপা বাপের বাড়ির সমস্ত অনুষ্ঠানেই উপস্থিত থাকত। আর অপরূপা ছিল বলে সবিতা’ও পুজোআচ্চার ব্যাপারে নিজেকে বেশি জড়াত না। জড়াত না মানে, পুজোর দিকটা অপরূপা দেখত আর সবিতা অতিথি আপ্যায়নের দিকটা দেখত। রান্না বান্না, লোককে বসিয়ে খাওয়ানো, এ-এক বড় ঝক্কির ব্যাপার!
বাবান আর লাল তখন একসাথে শুত। শুতে হত। প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে শুতে দেওয়ার মত ঘর তখন হয়নি। লালের ঘরটা তার দাদুর। ঠাম্মাকে সে দেখেনি। তার জন্মানোরও আগে তার ঠাম্মা মারা গেছেন। তাকে শুধু ছবিতেই দেখেছে সে। দাদু মারা গেল ক্লাস নাইনে থাকতে। তারপর থেকে লাল এইঘরটাতেই থাকে। অপরূপা আর সবিতায় খুব ভাব। তাই তারা একঘরে শুত। অপরেশ, মানে লালের বাবা, ওদের সাথে শুত বা বাইরে বসার ঘরে। তিন্নি তখনও বড় হয়নি বেশি। সে তো সবিতার কাছে বা অপরেশের কাছে শুত।
সেবার শীত পড়েছিল খুব। সবাই যেতে, রাত্রি বেলা কম্বলের মধ্যে ঢোকা হয়েছে। ঘরের দরজা জানলা সব বন্ধ। অনেক রাত্রি তখন।লাল ঘুমিয়েই পড়েছিল প্রায়। হঠাৎ সে অনুভব করে একটা হাত তার প্যান্টের মধ্যে প্রবেশ করছে। লাল তৎক্ষনাৎ উঠে বসে। কি করছ এসব?
বাবান দা, উঠে মুখে হাত চেপে ধরে! চেঁচাস না! তুইও মজা পাবি…
না… আমি এসব করব না!
তোকে কিচ্ছু করতে হবে না। তুই খালি শুয়ে থাক।
লালের যে একটুও ইচ্ছা হচ্ছিল না তা নয়। তখন বয়সটাই এমন। এরকম কোনো অভিজ্ঞতাই যেন কেমন একটা উচ্চাদামের। লাল কিছুই করেনি। বাবান দা’ই করেছিল যা করার। কিন্তু কি যে করেছিল… লালের যেন কোনো হুঁশই ছিল না। নিজের মুখ দিয়ে সেই গোঁঙানীর শব্দ সে আগে কোনোদিন শোনেনি। বাবান দা’র মুখ ঠোঁট জিভ অদ্ভুদ নিপুণতার সাথে সেদিন লালের ভেতর থেকে সমস্তটা নিঙড়ে নিয়েছিল। কিন্তু পরেরদিন সকালে কি এক পাপবোধে লাল বাবানের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল। যতটা না বললে নয়। সেই পাপবোধ এতই মারাত্মক যে সে বাবানকে একপ্রকার ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। বাবানও অদ্ভুত এক মানসিক টানাপোড়নে পড়েছিল। লাল যে কাউকে বলে দেয়নি এই তার ভাগ্য ভাল। সে’ও তারপর থেকে লালের এই দূরত্ব মেনে নিয়েছে। তবু ভালোলাগা তো ছিল। সেটা আছে। আজও দেখা হলে বাবান ভাবে লাল বুঝি তার সাথে আগের মত করে কথা বলবে। সে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বৃথামনোরথ হয়ে ফিরিয়ে নেয় চাহনি। এটা যে বাড়ির কেউ লক্ষ্য করেনা তা না। সবিতা অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছে, কি হয়েছে রে তোদের!
লাল এড়িয়ে গেছে। মুখে বলে, কিছু না।
তাহলে কথা বলিস না কেন ঠিক করে?
ভাল লাগে না! পিসি কষ্ট পাবে বলে সে এই কথা কখনও পিসির সামনে বলেনি। পিসি তার খুব কাছের। ছোটো থেকেই সমস্ত আবদারের জায়গা ছিল অপরূপা। অপরূপাও খুব বাচ্চা ভালো বাসত। খুব মেয়ের সখ ছিল। তিন্নি হতে কতবার যে বলেছে, সাবু মেয়েটা আমায় দিয়ে দে। সবিতাকে সাবু বলে ডাকত। সম্পর্ক তো ননদ-বৌদি না। ছোটোবোন বড়বোন যেন। পিসিও জিজ্ঞাসা করেনি এমনটা না। লাল পিসিকে বলেছে, পিসি ওটা আমাদের মধ্যেই থাক। সে কথা বাবানের কানেও গেছে।
বাইরে বুঝি আবার বৃষ্টি নামল। নিম্নচাপ নাকি? লালের মনে পড়ল বাবা পিসে মশাইকে বলছিলেন সে কথা। বাবান দা কখন শুতে আসবে? এইকিছুদিন বাবান দা তার ঘরেই শুচ্ছে। বাবা বলাতে মা একটু গাঁইগুঁই করছিল কিন্তু এই অবস্থায় লাল এইসবকে গুরুত্ব দেওয়ার মত ছেলে না। বাবান দা’ও খুব ব্যস্ত। অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে ল্যাপটপে। কখন শোয় কে জানে। লাল উঠে দেখে বিছানার একপাশে শুয়ে।
আজ রাতের বেলা সে রাতের কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ। মনে হয় না তা নয়। কিন্তু বাবানের সাথে তার এই সম্পর্কের রূপরেখাটা এতটাই অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে যে সবসময় আর সে রাত্রের কথা মনে থাকে না। সেদিনের কিসের ভয় ছিল কে জানে যা তাকে বুঝিয়েছিল এটা ঠিক না। আজ শ্যাম দুপুরে বলল ওর সাথে প্রেম করছি নাকি… ও ইয়ার্কি মেরেই বলেছে কিন্তু লালের মনের দেওয়াল যেন চুন খসে পড়েছে। কেমন যেন একটা লাগছে তারপর থেকেই।
আজ ঠান্ডা ঠান্ডা প্রকৃতিতে গা’টা কেমন গরম হয়ে উঠছে। কানের পাশগুলোও গরম।নিজের অজান্তেই লালের হাত চলে গেল তার প্যান্টের ভেতর। গরম ছুটেছে। হাতটা বার করে নিল সে। কিরম একটা হচ্ছে যেন শরীরের মধ্যে। সে উঠে বসল। দরজাটা খুলে বাইরে এল। এতক্ষন অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে। বাবান ঘুরে তাকাল। তারসাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। বাবানও তাকাল। আস্তে আস্তে বাবানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
ঘুমাস নি এখনও?
ঘুম আসছে না।
বাবান আর কিছু বলল না। লালও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল। পিসির কথা মনে পড়ছে?
হুম… দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল বাবান।
কষ্ট পেও না!
শেষকটা দিন থাকতে পারলাম না! এই যা আফসোস।
হুম… বুঝতে পারছি! বলে বাবনের হাতে হাত রাখে লাল। সরিয়েও নেয় সঙ্গে সঙ্গে।
এরপর কি করবি? পি এইচ ডি?
ইচ্ছা তো আছে!
নেট দিয়েছিস?
দেবো! পরের মাসে!
ও!
তোমার কাজ কেমন চলছে?
খাটতে হয় খুব!
হুম… দেখতেই পাই!
বাবান হাসল। আসতেই। শোনা যায় না। তবু অন্ধকারে দেখা গেল।
হাসলে যে!
তুই যে আমার দিকে তাকাস… সেটা শুনে!
ও!
তুই নাকি প্রেম করছিস? মামি বলল!
করছিলাম! ব্রেকাপ হয়ে গেছে!
মামি যে বলল…
মা জানে না!
ও!
তোমার কি খবর? তুমি প্রেম করছ না!
নাহ… সময় কৈ?
এটা বিশ্বাস করতে হবে?
এক রাত্রিরের ঘটনা দিয়ে একটা মানুষকে বিচার করা কি উচিৎ?
আচ্ছা, তুমি কি গে?
বাবান তাকাল লালের দিকে! নাহ! বলে চুপ করে রইল বাবান। লাল তাও তাকিয়েছিল বাবানের দিকে। কিছুর অপেক্ষায় হয়ত।
বাইসেক্সুয়াল! বাবান যোগ করল।
লাল এবার সামনের দিকে তাকাল। এটার জন্যেই বোধ হয় সে অপেক্ষা করছিল।
থ্যাংকস! বাবানের আচমকা ধন্যবাদে কিছুটা বিস্মিতই হল লাল।
কিসের জন্য?
তুই যে ঐ কথাটা কাউকে বলিসনি তার জন্য!
হুম!
বৃষ্টি পড়ছে ঝিরিঝিরি। হাতে মুখে ছিটে লাগছে অল্প অল্প। ওপর থেকেই দেখা যাচ্ছে রাস্তার গর্তগুলোতে জল জমে গেছে। তার মধ্যে বৃষ্টির ছিটে পড়ে জলতলে হিজিবিজি কাটছে।

কারেন্ট এল। বারান্দার আলোটা জলে উঠল। ঘরের ফ্যানটাও টং করে আওয়াজ করে ঘুরতে আরম্ভ করল। অন্ধকারে আলো জ্বলে উঠতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল দুজনের। দুজনই দুজনের দিকে তাকাল। দুজনের চোখেই কি যেন একটা ধরা পড়ল। তারা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ঘরে যাই ! বৃষ্টিটা বাড়ল। লাল ঘরে ঢুকে এল। সে জানে বৃষ্টিতে বাবান বেশিক্ষণ বাইরে দাঁড়াতে পারবে না! কিছুক্ষণ পর বাবানও ঢুকে এল। এসে শুল বিছানার ওপাশে।
তুমি কবে ফিরছ বেশ! লাল জানে, তাও জিজ্ঞাসা করল। কথাটা শুরু করার জন্যেই হয়ত।
আর তিনদিন আছি।
হুম… তিন্নি তোমার কথা প্রায়ই বলে!
জানি!
তোমার ন্যাওটা খুব। যদিও কাছে পায়না তাই।
তোর কথা শোনে না!
নাহ্… মুখ করে খুব! কাইকাই করে কথা শোনায়!
হাসে বাবান!
তবে তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।ওর জন্য অন্তত মাঝেমাঝে এসো!
তুই চাস না আমি আসি!
আসলেই হল! আমার জন্য আর ওর জন্য! দেখা তো হবেই আসলে!
তাও! এদিকে ঘোর!
লাল বাবানের দিকে ঘুরে শুল।
সরি… আমার সেদিন সেরম করা উচ… কথা শেষ করে ওঠার আগেই লাল তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রেখেছে। সেই কথাগুলো সেই দুই ঠোঁটের মাঝেই মিশে গেল। তাও আজ যেন বাবান কিছুটা সাবধানি। ঠোঁট বাদে কিছুই চলছে না আর। লাল আসতে করে কাছে সরে এল। কোমড় বরাবর জড়িয়ে ধরল!

কাল রাত থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। না গরম কালে বৃষ্টি হওয়া ভালো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রাস্তাঘাট ভিজে যায়। নর্দমার জল উঠে যায়। সব মিলিয়ে একটা কেমন কেমন ভাব। জানলা দিয়ে ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে এসবই ভাবছিল শ্যাম। নিবেদিতা ফোন করেছিল সকালে। বলে, কি রোম্যান্টিক না ওয়েদার না!
তা বটে! ওয়েদারটা কাল সন্ধ্যা থেকে বেশ রোমাঞ্চকরই বটে! তবে মনে অশান্তি থাকলে কিছুই কি ভালো লাগে! শ্যাম বসে বসে পায়ের গোঁড়ালির চামড়া খুঁচছিল। শুকনো চামড়া। উঠে যায়। ফাঁকা হয়। মনে হয় ঘর খালি হল। বিছানায় গুঁড়ো গুঁড়ো শুকনো চামড়া ভরতি। ঝেড়ে নিয়ে পাটা নামিয়ে বসল। পা’টা দোলাতে শুরু করল যেন নদীর জলে পা ডুবিয়ে পা দোলাচ্ছে। নদী বলতে নদী তো মাথায় আসেনা। আসে ঝিলের কথা। ঝিলের কথা মাথায় আসতেই লালের সেই বিশ্বরূপের কথা মনে পড়ে গেল! আচ্ছা ওর কি তখন হার্ড অন হয়েছিল? কেন? পরক্ষণেই মাথা ঝাঁকায়, এসব কি ভাবছে সে! এসব ভাবা উচিৎ না! সে একটা সিগারেট ধরায়। বাইরে তখন বৃষ্টিটা একটু কমেছে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়াল। নীচের নর্দমা উপচে জল যাচ্ছে শাঁই শাঁই করে। রাস্তায় গর্তের মধ্যে কে একটা কাগজের নৌকা ভাসিয়েছিল। ওটা হেলে গেছে একদিকে। তার ওপরই জলের ফোঁটা পড়ছে। ভিজে ফুলে গেছে কাগজটা। নিশ্চই পাপাই হবে।
পাপাই ছেলেটা তাদের বিপরীত দিকের বাড়িতেই থাকে। একটু কেমন কেমন। লোকে বলে সাধারণ না। বয়স হয়েছে তাও দশ মত। কথাগুলো আদো আদো। পরিস্কার নয়। তবে ছেলেটা খুব শৌখিন। আঁকে টাকে। ছেলেটার নৌকার খুব সখ। পাপাইকে কিছুদিন শ্যাম পড়িয়েছিল। পারেনি। ওর জন্য স্পেশাল শিক্ষক চাই। যে ওকে বুঝবে। সবাই সবাইকে বোঝে না। তখন ওকে বাড়িতে পড়াতে গিয়ে দেখত, বিভিন্ন রঙের কাগজের নৌকা। বিভিন্ন মাপের! ছোটো বড়ো। সব থড়ে থড়ে সাজানো।
তোর নৌকা এত ভালো লাগে!
পাপাই হাসে! বলে, আঁ… দা-আউন লাগে!
নৌকা চালাবি তুই?
আঁ… আঁ! খুব মিষ্টি করে বলে!
পাপাই প্রতিদিন একটা করে নৌকা বানিয়ে দিত শ্যামকে। একদিন শ্যাম জিজ্ঞাসা করল, এত নৌকা নিয়ে কি করব?
আদা…আদাকে নিয়ে উরবে! বুঝতে একটু সময় লেগেছিল শ্যামের। রাধাকে নিয়ে ঘুরবে। ওর মা এসে উদ্ধার করে দিল। ও মা আবার চোখ পাকিয়ে বলল, দেখো বিচ্চু ছেলের কথা!
সত্যিই তো! তুই কার থেকে শুনলি রাধা কৃষ্ণের কথা?
আম্মা…। ঠাম্মা!
ও… তোর ভালো লেগেছে?
আঁ… আউন!

পৃথিবী যে কি বিচিত্র জায়গা। কত ধরনের মানুষ। তাদের সৌন্দর্য বোধ কত আলাদা। তাও তার মধ্যেই এক অদৃশ্য সুতো মালার মত ধরে রেখেছে সবাইকে। সবাই সুন্দর খুঁজতে চায়। খোঁজেও। তাদের চোখ আলাদা আলাদা। সুন্দরও আলাদা আলাদা। ছোটো ছোটো সুন্দর মিলিয়ে যেন একটা বড় সুন্দর, এই পৃথিবী।
কি রে খাওয়া দাওয়া হবে না আজ! রমার ডাকে জ্ঞান ফিরল শ্যামের!
মা, আমার নাম শ্যাম কে দিয়েছিল?
তোর দাদু… কেন রে?
এমনি মনে হল হঠাৎ…
আমার একটু ব্যাকডেটেড লেগেছিল। একমাত্র ছেলে, এরকম একটা নাম হবে… বললাম থাক, ওটা তবে ডাক নাম হোক। ভালো নাম অন্য কিছু একটা হোক। ঠাকুমা বললেন, কৃষ্ণের নাম হওয়া চাই। তারপর ঠিক হল পীতম।
আমি তো ফরসা!
সবাই কি আর পীতম বলতে পীত্ রঙ বোঝে? ভাবে কৃষ্ণ সুন্দর তুইও সুন্দর। অতএব ঠিকই আছে!
শ্যাম কিছু বলে না! রমা বলে, আয় নিচে আয়। খেয়ে নিবি। বেলা হয়েছে অনেক।
ক’টা বাজে!
দশটা বেজে গিয়েছে।
কি বলো!
দেখ গিয়ে বিশ্বাস না হলে! মেঘলা বলে বোঝা যাচ্ছে না!
বলে রমা নীচের সিঁড়ি ধরল।
শ্যাম কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ওভাবে। নৌকাটার দিকে তাকিয়ে। শ্যামের রাধাকে পাওয়া হয়নি কখনও। পেতে চাইওনি বোধ হয়। সমাপ্তি দিতে চাইনি বোধ হয়! নিউটন পরে বলেছেন, সরলরেখায় গতিশীল কোনো বস্তুকে বাইরে থেকে আঘাত না করলে সে সারাজীবন ঐভাবেই চলতে থাকবে। অনেকটা সেরকম। কিন্তু মুশকিল হল, প্রেমের গতি কি সরলরৈখিক?….

ধুস.. চ তো!
দাঁড়া না!
বেকার টাকা নষ্ট হল!
টাকাটা যাতে নষ্ট না হয়… তাই এসিতে বসে যা!
দুজনের মধ্যে এরকমই উস্খুস বাক্য বিনিময় চলছে। সিনেমা দেখতে এসেছে। প্রিয়মকে এক জায়গায় চুপ করে বসাবে কার সাধ্য। তার মধ্যে সিনেমাটাও খাজা। একটা রিভিউ লিখতে হবে তাই, নয়ত অভিও দেখত না। রিভিউ লেখার ব্যাপারটা প্রিয়ম জানে না। অভি জানায়নি। না জানানোর সেরকম কোনো কারণ নেই। বলা হয়নি! পরে বলবে। প্রিয়ম যা দুষ্টু… রিভিউয়ের কথা শুনলে দেখতেই দেবে না ভালো করে!
আচ্ছা… আমি ঘুমালাম। শেষ হলে ডাকিস! বলে প্রিয়ম অভির কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।
উফফ…! একবার আওয়াজ করেও অভি থেমে গেল।
উম্ম… প্রিয়ম ডাকল!
অভি সাড়া দিল না!
উমমম?
কি হল?
খিদে পাচ্ছে! চ না বাইরে যাই!
দাঁড়া এটা না দেখে আমি যাব না!
ধুত… বলে আবার শুয়ে পড়ল।
আশ্চর্যের বিষয় ঘুমিয়েও পড়ল। অবশ্য শুয়েই ঘুমিয়ে পড়া অভ্যাস প্রিয়মের আজকের না। শিবপুরের সমস্ত প্রফেসররা বলত, প্রিয়ম পরে চাকরি পাবে না! তখন ঘুম ছুটবে। তাই এখন ঘুমায়!তাদের প্রেডিকশন মেলেনি। প্রিয়ম ভাল চাকরি পেয়েছে। ঘুম কমেছে কি না অবশ্য এই দুদিনে দেখার সময় হয়নি। অভিও ব্যস্ত থাকে লেখা নিয়ে। আজ দুপুরে খেয়ে উঠে অভি খবরটা দেখবে বলে সোফাতে বসল। প্রিয়ম এসে সটান ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।
চল না ঘুরে আসি কোথা থেকে!
তুই জানিস… আমার এখন হবে না! লেখা শেষ করতে হবে!
আরে, আজ সন্ধ্যাবেলার কথা বলছি! এসে থেকে বাড়ির মধ্যেই আছি।
তোর কিছু বন্ধু আছে না?… যা দেখা করে আয়!
তুই যাবি কি না বল!
না…
যা যেতে হবে না! বলে মুখ অভির পেটে গুঁজে শুয়ে পড়ল। অভি খবর দেখছিল।
একটু মাথায় হাল বোলাতো!
পাচ্ছি না! শান্তি করে বসতে দে তো একটু!
বসেই তো আছিস!
না… হাত নাড়াতে পারছি না! বলেও অভি হাতটা প্রিয়মের মাথায় রাখল। আস্তে আস্তে চুলে বিলি কেটে দিতে থাকল। কিছুক্ষণ পর ওমনি নাক ডাকা শুরু। অভির পেটে সুড়সুড়ি লাগছিল। কিছুক্ষণ দম চেপে বসেছিল অভি। ঘুমিয়ে পড়েছে, শুধু শুধু ডেকে তুলবে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সহ্য হল না। পেটের মাংস এমনিতেই নরম। সুড়সুড়ি বেশি লাগে।
এই যা ও ঘরে গিয়ে শো! প্রিয়ম?…
উমমমম?
তুই মুখটা ওদিকে ঘুরিয়ে শো তাহলে। পেটে সুড়সুড়ি লাগছে।
প্রিয়ম মুখটা ঘুরিয়ে শুল।
হা করে ঘুমায় প্রিয়ম। দেখলেই হাসি পায়। অভি খবর দেখবে না ওর ঘুমন্ত মুখ দেখবে? অনেকক্ষণ ওভাবে বসে পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছিল অভির। সে আসতে করে প্রিয়মের মাথাটা তুলে সোফায় রাখল। টিভিটা বন্ধ করে, একটু পায়চারি করে ঘরে গিয়ে লিখতে বসল।
বিকেল তখন ক’টা হবে- পৌনে চারটে! অভি কি একটা কারণে টিভির ঘরে এসেছিল। তখনও ঘুমাচ্ছিল প্রিয়ম। হঠাৎ উঠে বসে বলে, চ সিনেমা দেখে আসি!
তুই কি সিনেমার স্বপ্ন দেখছিলি?
হ্যাঁ…

ঠিক হল সিনেমা দেখতেই যাওয়া হবে। বিকালে আদিত্য দা ফোন করল। কি হে লেখা কতদূর?
অনেকদূর!
তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো!
কথায় কথায় অভি জানাল সিনেমা দেখতে যাচ্ছে সে আর প্রিয়ম।
ও.. তাহলে দেখে এসে একটা রিভিউ লিখে ফেল। পাঠিয়ে দিও রাতে বা কাল সকালে।
ওমনি একটা কাজ জুড়ে দিলে তো।
আরে লেখার মধ্যে থাকলে লেখা খুলবে!
সেই সেই! বলে হাসতে হাসতে ফোন রাখল আদিত্য দা।
আদিত্য দা’র সাথে এ ক’বছরে সম্পর্কটা দাদা-ভাইয়ের মত হয়ে গেছে। উনি এমনিতেই ওনাদের সংস্থার সিনেমা পেজটার সম্পাদক। এর আগেও অভি তার পেজে চলচ্চিত্র সমালোচনা লিখেছে। প্রথম যেবার লিখতে বলেছিল, অভি বলেছিল, আমি কি চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ?
ধুস… লেখ তো! যারা পড়বে তারা থোড়াই বিশেষজ্ঞ যে তোর লেখা জাডজ্ করবে!
সেখান থেকেই অভি মনে সাহস পেয়েছে। যদিও তার বিবেকে বাঁধে মাঝে মাঝে।কিন্তু দু’দশ টাকা লাভও হয়। এমনিতে যদিও প্রথমবার একদমই কাঁচা হাত আর কাঁচা মাথা দিয়ে লিখেছিল একটা ছবির রিভিউ, কিন্তু তার পর থেকে সিনেমা বিষয়ক অনেক বই পড়েছে। ছবি দেখেছে। এখন একটু যেন ছবি দেখার চোখ তৈরী হয়েছে। তাও নিজের ওপর এই বিষয়ে কেন জানি না, বিশ্বাস আসে না অভির। ঠিক ভরসা পায় না।

সিনেমা যখন প্রায় শেষ, শেষের দিকের টাইটেল ট্র‍্যাক বাজছে, অভি প্রিয়মের দিকে তাকালো। দেখেই হেসে ফেলল। ডান দিকের ঠোঁটের কোনা থেকে লালা পড়ছে। সে নিজের রুমালটা বার করে মুছিয়ে দিতে যেতেই প্রিয়ম জেগে গেল।
লালা ফেলে ভালোই তো ঘুমালি!
একটু কেবলা কেবলা চাহনিতে হাসল সে। রুমালটা অভির হাত থেকে নিয়ে ঠোঁটের কোনাটা মুছে অভির হাতে আবার দিয়ে দিল।
শেষ তো! চ… খিদে পাচ্ছে হেভি! বলে উঠে পড়ল।

রাতে বাড়ি আসতে আসতে এগারোটা। আজকে আর লিখতে বসা হবে না। টায়ার্ড লাগছে খুব। এই ভেবে এসে সোফায় গা’টা এলিয়ে দিল। প্রিয়মের জোরে পায়খানা চেপেছিল আসতে আসতেই। ঢুকেই বাথরুমে ছুটেছে। গান জুড়েছে বাথরুমের ভেতরে। অভি হাসে। ফোনটা একবার দেখল। মা ফোন করেছিল দেখে কল ব্যাক করল।
বলো..
এই তো সিনেমা দেখে ফিরলাম…
প্রিয়ম এসেছে… ওর সাথেই!
হ্যাঁ… বাইরে থেকে খেয়ে এলাম। তোমরা খেলে?
আচ্ছা!
ও এখন আছে…
দেখি পারলে নিয়ে যাব! আমি লেখালিখি নিয়ে ব্যস্ত। সময় হবে কি না বলতে পারছি না!
বেশ… ঠিকাছে!

“কে রে? কাকিমা? দে দে” বাথরুম থেকে বেরিয়েই ফোনের ওপর হামলে পড়ল প্রিয়ম। টাওয়েলটাও নিয়ে ঢোকেনি। আন্ডারওয়্যার পরেই বেরিয়ে এসেছে কাঁধে প্যান্টটা নিয়ে। ফোন নিয়ে চলে গেল ও ঘরে। মা আর ও খুব গ্যাজাতে পারে! শিবপুরে থাকতে, মা খালি ওকে বলে যেত, বাবা ভাই মনে করে দেখে রেখো! একটু চুপচাপ ছেলে! বোঝোই তো…
সেই আলাপ!

মায়ের সাথে এমনিতেই তার ভাগের কথা বলা শেষ। অভি চেঞ্জ করে নিল। বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে এসেও দেখছে গ্যাঁজাচ্ছে।
কি রে তোরা? কি এত বকিস? বলে নিজের ঘরে চলে এল অভি।
খাটের ওপর পিঠটা দিতে শান্তি। মুখে চোখে তখনও জল। হাওয়ায় ঠান্ডা লাগছে। চোখটা বুজে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমটা হালকা হয়ে ভেঙে গেল। অভি উঠে ঠিক করে শুল। তখনও ও ঘর থেকে প্রিয়মের গলা পাওয়া যাচ্ছে।

পরেরদিন সকালে যখন উঠল অভি তখন বেশ সকাল। ফোনটা খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ মনে পড়ল ফোনটা ও ঘরে, প্রিয়মের কাছে।সে উঠল। দেখল বাইরের আকাশে তখনও আঁধার। সে উঠে বাইরে এল। বাইরের লাইটটাও বন্ধ করা নেই। জ্বলছে। লাইটটা বন্ধ করে দিল অভি। দেওয়াল ঘড়িটা দেখল। পাঁচটা পনেরো। প্রিয়ম ঘুমাচ্ছে তা অভি জানে। তাও কি মনে হতে ও ঘরে উঁকি দিল অভি।
প্রিয়ম শুয়ে আছে। খালি গায়ে শুয়ে আছে। পরনে বলতে কালকের সেই অন্তর্বাস। হা করে দুদিকে হাত ছড়িয়ে শুয়ে আছে। অভি একবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রিয়মকে এ অবস্থায় দেখা নতুন কিছু না। আগেও দেখেছে সে প্রিয়মকে এভাবে। অভির মনে হল, প্রিয়ম কেন ফিরে এল তার জীবনে? কোনোদিনই যায় নি কিন্তু দূরে দূরে তো ছিল। সেটাই তো ভাল ছিল। আবার এসে তার এই মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার কি কোনো অর্থ হয়? অবশ্য প্রিয়ম তো ইচ্ছা করে করেনি। কিন্তু তাকে শক্ত থাকতেই হবে। নিজের অনুভূতির দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। হঠাৎ করে তার চোখ পড়ল ফোনটার ওপর। সে ফোনটা তুলে নিল… এটার জন্যেই তো আসা! এসব চিন্তা ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়াই উচিৎ না… বলে মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল অভি। দাঁত মেজে একটু চা করল। কাপটা নিয়ে এসে লেখার টেবিলে বসল। ল্যাপটপটা খুলে বসল। লিখতে গিয়ে আঙুলটা থেমে গেল…. কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাবল কিছু একটা। তারপর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আঙুল চালাতে শুরু করল কী-বোর্ডে….




Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.