সবার আমি বনাম আমার আমি

সেই ছোট্টবেলায় যখন প্রথম ‘খেলনা’ জিনিসটার সম্পর্কে ধারণা হয়, তখন থেকেই কেন যেন আমার জন্মগত লিঙ্গ পরিচয়ের সঙ্গে মিল রেখে পুতুল কিংবা হাড়ি-পাতিলের দিকে আমার দৃষ্টি যায়নি! সব ধরনের খেলনা গাড়ি আর পিস্তল-ই ছিল আমার আকর্ষণের কেন্দ্রস্থল। আজ এত বছর পরে এসেও সেই আকর্ষণের কোন পরিবর্তন হয়নি, সেই গাড়ি গাড়িই আছে সেই পিস্তল পিস্তলই আছে! শুধু মধ্যখানে ‘খেলনা’ শব্দটা উধাও হয়ে গিয়েছে এই যা!

কার্টুনের বেলাতেও ব্যাটম্যান, সুপারম্যান চরিত্রগুলো যতটা গোগ্রাসে গিলতাম, গোলাপি বর্ণের মেয়েলি কার্টুন চরিত্রগুলো ততটাই বিচ্ছিরি লাগতো! তারপর যখন আর একটু বড় হয়ে পোশাক পরিচ্ছদের ব্যবহারিকতা সম্পর্কে একটু একটু ধারণা জন্মালো, তখন থেকে ছেলেদের যাবতীয় পোশাক পরিচ্ছদকেই সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব বলে ধরে নিলাম। খুব মনে পড়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার আগে আমাকে নিয়ে সারা বাড়িতে একটা হুলুস্থুল পড়ে যেত! মেয়েদের খুব সুন্দর কোন ফ্রক জামা আমাকে পরানোর আপ্রাণ চেষ্টা এবং তার সঙ্গে মিল রেখে আমার উচ্চস্বরে কান্না আর চিৎকারে সারা পাড়া যেন নতুন করে ‘শব্দদূষণ’ কথাটার সঙ্গে পরিচিত হত! শেষমেশ রণে ভঙ্গ দিয়ে আমার বাবা-মা আমাকে ছেলেদের কোন জামা-ই পড়িয়ে নিয়ে যেত!

এরপর যখন স্কুল কলেজের অধ্যায় শুরু হয়ে গেলো তখন শুধুমাত্র বাধ্য হয়ে মেয়েদের ইউনিফর্মটা গায়ে জড়াতাম, আর পুরোটা সময় যেন শ্বাস আটকে বসে থাকতাম। প্রতিটা মুহূর্তে মনে হত আমি যেন এক ভুল পৃথিবীতে ভুলভাবে পরিচিত হচ্ছি, যেখানে আমার ভিতরের ‘আমি’-র কোন প্রকাশ নেই।

স্কুল কলেজের দিনগুলো রঙিন হয়, ভালোলাগা-ভালোবাসার জায়গাটা তখনই শুরু হয়। আমার ক্ষেত্রে ভালোলাগার জায়গাটা ছিল নিঃসন্দেহে কোন মেয়ের প্রতিই, যা ছিল আমার দিক থেকে খুব স্বাভাবিক কিন্তু সমাজের চোখে সমকামীতা। তাই সেই ভালোলাগাটা প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক হীনমন্যতা আর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করেছে সবসময়। অবশেষে অনেক ভেবে দেখলাম, সমাজের মানুষের সাথে যুদ্ধ করে হয়ত বেঁচে থাকা যাবে কিন্তু প্রতিনিয়ত আমার ভিতরের ‘আমি’-র সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে পারব না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে যাই বলে বলুক, আমি আমার নিজস্ব সত্ত্বা নিয়েই চলবো, নিজের ভিতরের ছেলে সত্ত্বাটাকে বিসর্জন দিয়ে আমি বাইরে দিয়ে মেয়ের সাজ নিয়ে চলতে পারবো না। যার ফলস্বরূপ কলেজের গণ্ডী পার করার সাথে সাথেই আমার জীবন থেকে মেয়েদের ঐ একমাত্র পোশাকটিও নিজের ফেয়ারওয়েল নিজেই উদযাপন করে বিদেয় হল!

শারীরিক গঠনের দিক থেকেও আমি অনেক ভাগ্যবান বলতেই হবে! আমি খুব সহজেই ছেলে হিসেবে নিজের জায়গা করে নিতে পারি সব জায়গাতেই। কিন্তু অফিসিয়াল জায়গাগুলোতে যখন যাই, যেখানে আমার জন্ম পরিচয়ের ব্যাপারটা সামনে চলে আসে, সেখানে আমাকে দেখার পর সবার মুখে যখন একগাদা প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখতে পাই, তখন হঠাৎ করেই কোথায় যেন একটা ধাক্কা খাই। তখন মনে হয় সবাই যেন আমায় বলছে “ ওহে না-বালক! তুমি এক হাওয়াবিহীন সাইকেলকে জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছ শুধু! কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছুতে পারবে না…”

তখন হঠাৎ করেই ভীষণ অভিমান হয়, মনে হয়, কেন আমি এই সমাজেই জন্মালাম? কেন আমি কোন পাশ্চাত্য সমাজের নাগরিক হলাম না? কিন্তু ফের ভাবি, সমাজের কথায় হেরে গেলে তো হবে না, আমার যোগ্যতাই হবে আমার সকল প্রশ্নের উত্তর। তাই হাল ছাড়িনি, বিশ্বাস করি একদিন প্রতিটা নিন্দুকের মন জয় করতে পারবো। আর না পারলেই বা কি?! এই একবিংশ শতাব্দী আমাদের কিছু সুন্দর বাক্য উপহার দিয়েছে! তার মধ্যে একটি হচ্ছে “Haters gonna hate!” সব শেষে এসে আমার দিক থেকে বলার মত আর কিছুই নেই, তাই মহাত্মা গান্ধীজির একটি বাণী দিয়ে শেষ করতে চাই,

“First they ignore you,

then they laugh at you,

then they fight you,

then you win”                      

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.