অতৃপ্তি

লেখক-অজানা

তার সাথে আমার প্রথম দেখা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে।দু’পা হেঁটে আমরা বসেছিলাম একটা বাদাম গাছের নিচে।আশেপাশে যানবাহনের ছড়াছড়ি আর মানুষের কথাবার্তার কোলাহল। তাও আমরা আমাদের দৃষ্টিতে নীরব ছিলাম। চোখ থেমে এলে খানিক বাদে ‘কবে ফিরছো দেশে?’ কিংবা ‘আবার কবে আসবে?’-র মত প্রশ্নে নিজেদের স্বরের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিলাম।

সেদিনের সেই শহুরে ব্যস্ত রাতে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ সাজাচ্ছিলাম।মতিঝিলের গোলচত্বরে বসে কত অবাস্তব স্বপ্ন বুনছিলাম।কিছু হবে না- এসব সম্ভব না ভেবেও আমরা এগোচ্ছিলাম।দু’জনের ইচ্ছেগুলো একই ছিলো বুঝি! তাই কেমন ক’দিনের মধ্যে নিজেদের একটা সংসার হয়ে গেলো।

সম্পর্কের দু’দিন না যেতেই তোমার বাড়ি যেতে হলো।ঘরের কী একটা কাজ পড়ে গেল হুট করে। খুব কাছে এসে সেই সময়টা আর দীর্ঘ হলো না আমাদের। আমার ছলছলে চোখ দেখেও বাসের ভেতর ঢুকে গেলে তুমি।

স্টেশন থেকে ফিরে এসে আমার চোখ থেকে জল বেরোল না-কান্না এলো না।কেবল নাকমুখ চিড়ে একটু পর পর দীর্ঘশ্বাস বেরোতে লাগলো।

অফিসের কাজে হুটহাট কতদূরে চলে যেতে মাঝেমধ্যে। আমার একা থাকার অভ্যেস ছিল না।ভয় পেতাম খুব।

কিন্তু সেই তীব্র ভয়কে ছাপিয়ে আমার ব্যথা হতো। ভয় না পেয়ে কষ্ট পেতাম।তোমার পরা জামাকাপড় গুলো চোখের সামনে থেকে সরিয়ে রাখতাম।এসব চোখে না পড়লে তোমার কথাও মনে পড়বে না। কতটা লাভ হত জানি না।

তোমার আমার ঘরে কত মানুষ আসতো। খেয়েছে,রাতে থেকেছে। কিন্তু ভালবাসায় স্বার্থপর আমরা কাউকে একমুহূর্তের জন্যও বরদাস্ত করেছি কি? অস্বস্তি নিয়ে ক’টা দিন আমরা লোক সমাজের খোলস পড়ে পড়ে চলেছি। ভুলে বাবু ডেকে ফেললে ‘এটা ওর ডাকনাম’ বলে চালিয়ে দিয়েছি। একটা মেহমান সামলাতে গিয়ে কত নিয়ম মেনে চলেছি। ‘আবার আসবেন’ বলে দরজার বাইরে তাকে বিদায় করেই তোমার ঠোঁটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি।

ঢাকার ছোট রিকশায় বসে তোমাকে কখনো চেপে ধরে বসতে গেলে শতবার ভাবতে হয়েছে।ফুটপাথের মানুষ দেখছে ভেবে ভাঙা রাস্তাতেও তোমাকে ধরে সাপোর্ট তৈরি করতে দ্বিধায় ভুগতে হয়েছে। হাতিরঝিলের সন্ধ্যে বা রমনার বিকেলে তোমার চোখের দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকার ইচ্ছের কথা বাদই দিলাম। কত সীমা টেনে টেনে তোমাকে ভালবাসতে হয়।

মেঘছোঁয়া একটা পাহাড়ে যাব বলেছিলাম বলে তুমি রাঙামাটির দেশে নিয়ে গেলে আমায়।সমুদ্রে পা ডোবাতে চাই বলে যাওয়া হলো সৈকতে।সারপ্রাইজ দেবে বলে একদিন কিছু না জানিয়েই প্লেনে চড়িয়ে বসলে– বিস্ময়ের ঘোর আমার কাটেনি এরপর। তোমার পরিবার, আমার পরিবার- তোমার সহকর্মী, আমার পাড়ার বড় ভাই- তোমার ছোট বোন- আমার মেজো বোন সবাই কী যেন আঁচ করে ফেললো। ‘এত কীসের ঘনিষ্ঠতা?’- প্রশ্নবানে তোমার কত মানুষ তোমাকে জর্জরিত করলো। কত ভয় নিয়ে তুমি আমাকে ভালবাসো।

তোমাকে অফিসে যেতে হয়- আমাকে ভার্সিটি যেতে হয়। তুমি মাঝেমধ্যে বলো,আমাকে তোমার বুকপকেটে নিয়ে ঘুরতে পারলে ভাল হতো।আচ্ছা,তোমার অফিস, আর আমার ভার্সিটির এনারা কি পারে না আমাদের প্রেমিক ভাতা দিয়ে বিনামূল্যে জীবন যাপন করার সুযোগ করে দিতে? এত ভালবাসে যারা,তাদের কি অফিসার আর স্টুডেন্ট রূপে না দেখলে হয় না?

জীবনের এত নিয়ম মেনে আমাদের আর ভালবাসাবাসি হয় কোথায়! মা’কে দেখতে যেতে হবে- কাকা অসুস্থ-বোনের সামনে পরীক্ষা এত সব সামাজিকতা মেনে আমাদের আর কাছে থাকা হলো কই?এতসব চিন্তা নিয়ে আমাদের নিজেদের আর কতটা ঠাঁই দেওয়া হলো নিজেদের জগতটায়!

আচ্ছা,দক্ষিণ মেরুতে জায়গা সস্তা না? কিছু টাকা লোন করে চলো ওদিকে গিয়ে খানিকটা জায়গা কিনি।বরফে ভরা অঞ্চল হলেও সমস্যা কী? তুমি থাকছো আমার সাথে- তবে আর চিন্তা নেই।তোমার অতবড় বুকে একটা আগ্নেয়গিরি আছে উষ্ণতার।

অথবা চলো এস্কিমোদের গ্রামে চলে যাই।ওদিকে মানুষ কম।নির্ঝঞ্ঝাট অমন একটা এলাকায় আমরা পাসপোর্ট আর নেটওয়ার্ক বিহীন আটকে পড়ে থাকবো। শীতকালে ওই গ্রামে সবকিছু বরফের চাদরে ঢাকা পড়ে থাকে।গভীর রাতে কাঠের বেলকনিতে বসে বরফ গলা পানিতে পা ডুবিয়ে স্নোফল দেখবো আমরা। আর একটা ভারী চাদরের নিচে একে অপরকে ছুঁয়ে থাকবো দুজন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.