অনুক্ত প্রেম

লিখেছেনঃ আরভান শান আরাফ।

ইমরানকে আমি সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি।কত যে মারপিট আর ঝগড়া করেছি তার অন্ত নেই।আজ আমি বিবিএ পড়ছি।ইমরানও।দেখতে দেখতে জীবনের পথে চলতে চলতে কখন যে আমরা এইখানে এসে পৌছলাম তার সন্ধান আজো আমি পাইনি।

যখন আমি বড় হতে লাগলাম তখন থেকেই খেয়াল করতাম ইমরানের প্রতি আমার ভালবাসা আর আকর্ষণ খুব বেশি । ওর পশমী বুক আর মায়াময় চোখ দুটি আমাকে খুব টানতো । একদিন প্রকৃত অর্থেই বয়স বাড়ল আর বুঝতে বাকি রইল না যে ,আমি সমকামী ।

কীভাবে , কেনো ,কখন আমি সমকামী তা অবশ্য আমার জ্ঞানের বাহিরে ছিল তবে সমকামীতার অনূভোতি আমাকে ভিতরে ভিতরে তলিয়ে দিচ্ছিল । যখন বুঝতে পারলাম ইমরানের প্রতি ,আমি দুর্বল আর সমাজ , ধর্ম আর জাতি তা সমর্থন করে না তখন নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইলাম ।

কিন্তু পারলাম আর কৈ ? ঐ দিন রাত্রে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবলাম ইমরান থেকে দূরে সরে যাব । তার সাথে কম মিশব । তাহলে হয়তো ,সমকামীতার ভয়ানক যন্ত্রনা হতে বাঁচতে পারব ।তাই সিদ্ধান্ত মোতাবেক কয়েকদিন কলেজে যাওয়া বন্ধ করে ইমরানের নাম্বারটা ব্লক করে বাসায় বন্ধি হয়ে রইলাম ।

এই ভাবে তিনটা দিন কাটল ।চতুর্থ দিনের মাথায় বিকাল তিনটার দিকে , ইমরান আসল আর সাথে তার মা । আমি আন্টিকে দেখে সালাম দিয়ে বসতে বলে আম্মুকে ডাকতে গেলাম । ইমরান ও আমার সাথে সাথে গেল , আম্মুকে ডেকে ,ঘুরে দেখি সামনে ইমরান ।

দেখে মনে হচ্ছিল ,আমার প্রতি খুব রেগে আছে । ইমরান খুব জোরে আমার হাতের পেশিতে একটা ঘুষি দিয়ে বলল , কীরে ,তুই মরছিলে নাকি ?তর কোন খবর টবর কিছু নেই । আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম , মরে তো কবেই গেছি এখন তো শুধু বেঁচে থাকার রং মেখে বেঁচে আছি ।

তুর কথা বল ? কী মনে করে একে বারে আন্টিকে সাথে নিয়ে এসেছিস ? ইমরান বলল , ভেবেছিলাম আমার সাথে রাগ করছিস তাই রাগ ভাঙাতে আম্মুকে নিয়ে এসেছি । ঐদিন ,আমার প্রতি যে ইমরানের একটু হলেও টান আছে তা বোঝার বাকি ছিল না ।সিদ্ধান্ত নিলাম যা হবার হবে ।

ইমরানের পাশেই রব । প্রেমী হয়ে না পেলেও বেস্ট ফ্রেন্ড করে তো পাব ? তারপর দিন যতো যেতো লাগলো আমি ইমরানকে আরো ভালবাসতে লাগলাম । আমার সমকামী চাহীদা মাঝে মাঝে ইমরানকে তলিয়ে দিতো আমার মনে , মাথা ঝাড়া দিয়ে তা ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করতাম ।

কিন্তু , সমকামীতা তো আর মাথার উপর উড়ে বসা জল ফড়িং না যে মাথা ঝারলাম আর উড়ে গেলো । তাই যতো ইমরানের সাথে চলতে লাগলাম ততো প্রেম বাড়তে লাগল । মুখ খুলে বলার মত কোন সাহস আমার ছিল না । তাই বলা ও হলো না ।

একদিন ইমরানের বড় ভাইয়ার মোবাইল থেকে কল আসল । ফোনটা রেসিভ করে বুঝতে পারলাম ওনি খুব কষ্টে কাঁদছে আর গলা কাঁপছে আমাকে ওনি দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলল ,আমি খুব স্পীডে বাইক চালিয়ে হাসপাতালে গিয়ে শুনি , ইমরান তার এক হাতের রগ কেটে ফেলেছে ।

খুব রক্ত ক্ষরণ হয়েছে । ডাক্তার বলেছে অতিশিগ্রী প্রচুর রক্ত লাগব । আমি তা শুনে ঐখানে স্থির থাকতে পারিনি । ভাইয়া আমাকে শুধু এতোটুকু বলেছিল আমার আর তার রক্তের গ্রুপে মিল আছে কিনা ? তারপর , ইমরানকে রক্ত দিলাম । যতোটা লাগেছিল । আরো দুই ব্যাগ কিনতে হয়েছিল ।

আমি মনে হয় কষ্টের তীব্রতায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম । জ্ঞান ফেরার পর সবাই আমার শত মুখী প্রশংসা করল । কিন্তু , তখন খুব কষ্ট লেগেছিল যখন শুনলাম একটা মেয়ে শিলাকে বোঝাতে যে, সে তাকে কতটুকু ভালবাসে তাই হাতের রগ কেটেছিল ।

খুব কষ্ট লেগেছিল এই ভেবেযে যে ইমরানকে আমি ঠিক এতোটা ভালবাসি সেই ইমরান কোন দিন ও আমার হবে না । সে শিলাকে প্রকৃত অর্থেই গভীর ভালবাসে । আমি অন্যসবার নিষেধ সত্তেও দুর্বল শরীর নিয়ে , ইমরানের কাছে ছিলাম প্রায় পাঁচ দিন ।

এই পাঁচদিনে , শিলা ও অনেকবার এসে তাকে দেখে গেছে । খুব সাজগুজ করে । দেখে বুঝতেই পারলাম না যে ,এই মেয়ে সত্যিই কী ইমরানকে ভালবাসে ? না বাসতে পারবে । পরক্ষণে চিন্তা করলাম সে না বাসুক ইমরান তো তাকেই ভালবাসে ।

যেখানে আমি একটা দায়িত্ববান বন্ধু ছাড়া আর কিছুই না । ইমরান যতদিন অসুস্থছিল ঠিক ততদিন আমি রোজা রেখেছি , রাত জেগে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি । আমি সমকামী তাই হয়তো ,আমার রোজা , তাহাজ্জুত কিছুই আল্লাহ কবুল করেনি তাই একদিন আমিই খুব অসুস্থ হয়ে গেলাম ।

আব্বু আম্মু একপ্রকার জোর করেই আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসল । প্রায় এক সপ্তাহ পরে ইমরান সুস্থ হল । স্বাভাবিক ভাবে চলতে শুরু করল । কিন্তু , আমি শারিরীক দুর্বলতায় বিছানা ছাড়তে পারছিলাম না । খুব ইচ্ছে করছিল তখন ইমরানকে একবার গিয়ে দেখে আসতে কিন্তু , সাধ্যে কুলায় নি ।

ইমরান ও আসেনি একটি বার আমাকে দেখতে । শুনছি , সে নাকি খুব ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছে তার মনের মানুষ শিলাকে নিয়ে । কথাটা শুনে বুকে চিনচিন ব্যথা করে ওঠল । তারপরে ও দুর্বল শরীরে শুকনো মুখে একটা মুচকি হাসি দিলাম ।

ঐ দিন ,কলেজের সব বন্ধুরা আমাকে দেখতে এসেছিল । ভেবেছিলাম ইমরান ও আসবে । কিন্তু সে আসেনি । কে যেনো বলছিল সে ,শিলাকে নিয়ে মার্কেটিং এ গেছে । ঐ দিন কেনো জানি দু , চোখ বেয়ে পানি ঝড়তে লাগল । একজন বলল চিন্তা কর যে ,ইশাণ তাকে এতো রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে তুলল সে ইশাণকেই দেখতে ও আসেনা ।বেইমান একটা ।

অন্যের মুখে ইমরানের নামে গালি ভাল লাগে নি তাই তীব্র প্রতিবাদ করেছিলাম । একদিন আমিও সুস্থ হয়ে গেলাম । মোবাইলে সিমটা ঢুকিয়ে ইমরানকে কল করলাম । নাম্বার ব্যস্ত ছিল তাই আর চেষ্টা না করে তাদের বাড়ির দিকে ছুটলাম । বাড়িতে পৌছে দেখি , অনেক মানুষ ।

আন্টি আমাকে দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরে ভেতর ঘরে নিয়ে বলল যে ইমরানের বিয়ে শিলার সাথে তাই আমার অনেক দায়িত্ব । আমি সেখানে কিছু না বলে ইমরানের রুমে যায় । গিয়ে দেখি সে শিলার সাথে ফোনে কথা বলছে আমাকে দেখে ফোনটা রাখি বলে কেটে দিয়ে ওঠে এসে জড়িয়ে ধরে বলল ,ধন্যবাদ তুই এসেছিস বলে ।

আমি অশ্রুভরা চোখে ইমরানের কপালে একটা চুমু দিয়ে বললাম , আমি তোকে ভালবাসিরে খুব ভালবাসি । আজথেকে আমার দায়িত্ব শেষ । আমি চলে যেতে যেতে দেখলাম ইমরান ঠাই দাঁড়িয়ে আছে । আর আমি অশ্রুভরা চোখ আর বুক ভরা কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরছি ।আমার প্রেম অনুক্তই রয়ে গেল । শুধু বল হলো ভালবাসি । ———————————————————————-

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.