অন্যরকম ভালোবাসা

লেখক: রোহিত রায়

“হোয়াট?” রাগ ও বিরক্তি মেশানো প্রশ্নটা করে তৃষা।

–“ইয়েস ডার্লিং। পুরো মৌর্য ইতিহাস ল্যাটিন ইংলিশে লিখতে হবে।” বললেন কলেজের অধ্যাপিকা মিসেস সেনগুপ্ত।

মনে হল কেউ যেন ক্লোরোফর্ম চেপে ধরল নাকে।অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার উপক্রম তৃষার।মৌর্য বংশের ওপর প্রোজেক্ট ও তৈরী করেছিলো ঠিকই কিন্তু বাংলায়। এখন বলছে english মাথায় বাজ পড়বে নাহ্।কারণ ল্যাটিনে ও তেমন ওয়াকিবহাল নয়।

তৃষার অবস্থা ল্যাজেগোবরে সেটা ম্যাম বুঝলেন, কারণ হাতে আর এক সপ্তাহ। তিনি বলেন ” আমি সাধারণত এই পরামর্শ কাউকে দিইনা। কিন্ত তোমার যা অবস্থা…….। এক কাজ করো English department এর প্রিয়মের সাথে। ও ল্যাটিন-এ history and culture চর্চা করে।”

কি যেন একটা ধাক্কা দিলো ওর বুকে…… ও কি প্রিয়মের নাম শুনল। প্রিয়ম দ্য কলেজ ক্রাশ। ওফফফফ ওতো ভাবতেই পারছে না। দমবন্ধ করা ভালোলাগার গরম হাওয়া বয়ে গেলো ওর সামনে দিয়ে।

—- গিয়ে বলবে অামি পাঠিয়েছি… আর হ্যা এটা ওর বই…. নিয়ে যাও দিয়ে দিয়ো ওকে….।

স্বপ্ন রাজ্যে চলে যায় ও… ভাবতেই পারেনা, ও প্রিয়মের সাথে কথা বলতে চলেছে। যে কিনা মাঝেমাঝেই ওর নিলয় ও অলিন্দের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়

*

যাকে দেখলে ঝকঝকে জলাশয়ের কন্ঠ থেকে রামধনুর মত গান আর একদল রঙিন প্রজাপতির সুর বেরিয়ে আসে।তবে হৃদয়ের ভালবাসা সামনা সামনি প্রকাশিত হয় না।

প্রিয়ম নিজের হৃদয়ের রাজা।পুরো কলেজে বন্ধুত্ব্ব বলতে, একজনের সাথেই, সে ওর প্রিয় বন্ধু আয়ুশ,।” আমি কলেজ সুন্দরী, ওরকম অনেক ছেলে আমার পায়ের তলায় পড়ে থাকে সেখানে, আমি প্রিয়ম বলতে পাগল, তাও আমার আত্মসন্মান বোধ আছে নিজের থেকে, আমি বলব।কোনোদিন না।কিন্তু প্রিয়ম তো আমার দিকে তাকায়ও না….তৃষা তুই কী এখন ও ওর যোগ্য সুন্দরী হয়ে উঠিস নি।” কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সোহিনীকে নিয়ে প্রিয়মের ক্লাস এর দিকে যাচ্ছিলো তৃষা। সোহিনী বলেছিলো “ফাইনালি তোর সাহস হল”

— এতে ভয়ের কি আছে,ছেলেই তো না,মেয়ে দেখলে লাল টপকানোর জাতই তো…. হুহ।

প্রিয়মের সামনে এসে চুপসে গেল ওর সাহসের বেলুন।মুখে যেন কুলুপ এটে গেল।সোহিনী ই পুরোটা খুলে বলে। প্রিয়ম সোজাসুজি তৃষার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞাস করে ” তাহলে হেল্প তোমার দরকার তাইতো”।হতভম্ব হয়ে ও বলল ” হ্যা আমারি দরকার তোমায়।…. রাতে বাড়ি এসে এই কথা ভেবে বড্ড হাসি পেয়েছিলো আমার। হ্যা ও আমাকে প্রতিদিন দুটো শিট দেবে, আমি সেগুলো টুকবো।

*

এটা একটা দারুন অনুভূতি, এই কাজটার মাধ্যমে ওর এত কাছে আসলাম।ভালোবাসি কিনা যানিনা ভালোলাগছে ভীষণ। পরের দিন ও প্রিয়মের কাছে আসে। বলে মৃদু হেসে” হয়েছে প্রিয়ম।

—- হ্যা হয়ে গেছে। আয়ুশ ব্যাগে আমার লেখা দুটো শিট আছে, গিভ মি দোস।… আয়ুশ অদ্ভুত ভাবে তাকায় প্রিয়মের দিকে, মৃদু হেসে কাগজ দুটো বার করে দেয়।

প্রিয়ম বলে “তোমার কাজ, দুটো হুবহু টোকা।আচ্ছা আমার কি লাভ হবে এতে তৃষা?” হেসে বলে প্রিয়ম।

তৃষা কি বলবে বুঝে পায় না। কিন্তু কি যে ভালোলাগছে ওর। নিজে যেচে কথা বলছ প্রিয়ম।ও বলে ” can I have some tea or coffee with you?” প্রশ্নটা শুনে প্রিয়ম আয়ুশের দিকে তাকায়। আয়ুশ ব্যঙ্গ করে বলে ” আমার দিকে তাকানোর কি আছে, বন্ধুকেও সাথে করে ডেটে নিয়ে যাবি। প্রিয়ম হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষন তাকালো, দীর্ঘশাস ফেলে হাসে বলে ” না তৃষা অন্য কোনোদিন, অামার কাজ অাছে একটা, ” মুখটা চুপসে গেলো তৃষার।

— অাচ্ছা কালকে ও.কে।

ও চলে গেল। প্রিয়মের চোখ আপ্লুত ভাবে সরে আয়ুশের দিকে পড়ল।চোখাচুখি হতে আয়ুশ ক্ষীন কন্ঠে বলে ” ভালোবাসিস কি??”

— প্রচন্ড ভালোবাসি।you never understand। সময়ের সঙ্গে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। যাক আরকদিন।”

*

দুদিন পর ক্যাফেতে

– আচ্ছা প্রিয়ম তোমায় কেউ বলেনি তোমার হাসি খুব সুন্দর।যে কেউ প্রেমে পড়ে যাবে।যে কোনো মেয়ে।

— হ্যা বলে তো.. আয়ুশ সবসময় বলে।ক্ষ্যাপাটা বলে সাবধানে থাকিস।তৃষা ভাবে ঠিকই তো, যেমন অামি তো পড়ে গেছি। মুখে বলে ” তো কোনো মেয়ে পটল, মানে গার্লফ্রেন্ড কোনো ” ইতস্তত করছিলো তৃষা

— না অামার কোনো gfনেই।

— কেন।তুমি single.. look at u you r so hot, sexy…

— আহ্… তৃষা please, its my personal matter yeah.. বাদ দাও let’s change the topic.।

— ও কে। তোমার বন্ধু আয়ুশ আসল না আজকে।তোমরা খুব ভালো বন্ধু বল??like ভাই ভাই…

চন্দ্রে যেমন গ্রহন লাগে সেরকম মুখ হয়ে গেল প্রিয়মের শুধু বলল ” ভাই ভাই না.. শুধু বন্ধু… বন্ধুত্ব… যা সীমাহীন। আজকে আসেনি ও। রেগে আছে বোধ হয়।

ঘোরাঘুরি হল। সেদিন তৃষা প্রিয়মকে একটা shirt দিলো। দোনোমনা ছিলো কিন্তু শেষ অবধি নিলো।

এতদিনে অনেক কাছাকাছি আসলাম আমি আর ও। আমার ওকে খুব ভালোলাগে.. আমার দেওয়া জামা কালকে পরে আস্তে বলেছি।তবুও কিযেন বাদ পড়ে যাচ্ছে। ভালোলাগা টা ভালোবাসায় পরিণত হচ্ছে না… something is missing.. কী! কী!?কাল রবিবার ফাইনাল শিট নেব। বলব মন বাক্য

*

“অসাপ্তি নিয়ে বেচে থাকা যায়,অপেক্ষা সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।কিন্তু তুমি না থাকলে না হবে বেচে থাকাটা সুখের..আনন্দের।না হবে এগিয়ে যাওয়াটার সমাপ্তি….ব্লা..ব্লা….।” আয়ুশের এই লেখাটা কলেজ ম্যাগাজিন এ ছেপেছে। খুব রোমান্টিক লেখা ওর, তবে কাকে উদ্দেশ্য করে? অন্তঃপ্রেম কে…। প্রিয়ম আমার জামা পরে কলেজ এসেছিলো। খুব দারুন লাগছিলো ওকে। আমাকে তখন বলেছিলো বালুরঘাট পার্কে অাসতে। খুব অাপসেট ছিলো ও। আয়ুসের সাথে তার একটু আগে ঝামেলা হচ্ছিলো ওর। কী নিয়ে বোঝা যাচ্ছিল না দূর থেকে।প্রিয়ম তো ওকে ওর প্রথম publishing এর জন্য congratulations যানাতে গেছিলো যা মনে হল।ভালো কেননা বন্ধুত্বের প্রথম শর্ত হল ঝগড়া।ওটা ছাড়া বন্ধুত্ব হয় নাকি!?

আজ প্রিয়মের সাথে কলেজ

আওয়ার্সের বাইরে দেখা হবে।কী করব, না করব বুঝতে পারছি না। ও তো অামার সাথে প্রেমিকে মতই অাচরন করে। না ছিলো কোনো শরিরী প্রেম, না আবেগী ভালোবাসা।শুধু রাখছি অন্তঃহীন প্রত্যাশা।

*

ওই তো বসে আছে হিরো, জিম করে একদম ফুলিয়ে ফাপিয়ে এসেছে। কী লাগছে প্রিয়মকে।তৃষা কাছে যায়” অনেক্ষন বসে আছ নাকি প্রিয়ম। “

– নাহ্। এই এলাম! বিশাল গরম লাগছে! দাড়িয়ে কেন বসো এখানে।

প্রশস্ত উঁচিয়ে থাকা হাতের শিরাগুচ্ছ, পেশীকে এমনভাবে এক্সপোস করছিলো। তৃষারর কথাও যেন বেরিয়ে আস্তে চাইছে।

ব্যাগ থেকে শেষ পেপার দুটো প্রিয়ম তৃষাকে দিয়ে বলল” তাহলে দেনা পাওনা সব শেষ”বলে চোখ রাখে রবীন্দ্র সেতুর দিকে।

—সব দেনা পাওনা শেষ!! অবাক হয় তৃষা।

— শেষ নয় কী?

যা থাকে কপালে ভেবে ও বলেই দেয় ” প্রিয়ম, কলেজের প্রথম দিন থেকে আমার তোমাকে পছন্দ।I love you… very much…অনেক সাহস করে বললাম।”মৃদু হেসে দেয় তৃষা।” তোমার কাছে এসে কখন তোমায় ভালোবেসে ফেললাম”

কোনো সাড়া নেই প্রিয়মের। শুধু একরাশ হাসি ও দীর্ঘশাস, ফেলে বলে “কোনোদিন কোনো কথা ঘুরিয়ে বলিনি.. so its no from me “

হেসে ফেলে তৃষা ক্ষীন দুঃখ কাজ করছিলো, শুধু, কিছুই যেন হৃদয় কে ভেঙ্গে দিতে পারলো না তৃষার। মুখে বলে ” আমিও পাগল। এক সপ্তাহের মধ্যে কেউ কারোর হতে পারে না। কিন্তু সে কে আমি যান্তে পারি…. আমাদের কলেজের কোনো মেয়ে!?? দেখব, হওয়ার চেষ্টা করব তার মত।

হাসে প্রিয়ম। ” তুমি তোমার যায়গায় একদম ঠিক আছো। বহু ছেলে তোমার জন্য পাগল…. কিন্তু তার মত তুমি কোনোদিন হতে পারবে না।

কারন সে আর আমি রঙিন প্রেমের জগত থেকে বিলং করি।আমরা ভারতীয় সংবিধানের 377নং ধারার অন্তর্ভুক্ত। u know what is section 377..।

— আমি অশিক্ষিত নই প্রিয়ম। কিন্তু কে সে?……..এক মিনিট এক মিনিট আয়ুশ।!?

প্রিয়মের ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেল।”হ্যা আয়ুস, বলেছিলাম না বন্ধুর থেকে অনেক বেশী।তুমি আমার কাছে আশার প্রথম দিন থেকে আয়ুশ insecure ফিল করছিলো।ভাবল আমার আকর্ষণ অন্যদিকে ডাইভার্ট হচ্ছে।সব কিছুর উরধে ও আমার কাছে, মেয়েদের মতো কথায় কথায় রাগ করে।,তখন সব থেকে ভালোলাগে ওকে।”

কিছু একটা চিন্তা করে তৃষা বলল” ওই জন্য কফির কথা শুনে ও রেগে গেছিলো সেদিন।”

— শুধু তাই না। তুমি যাওয়ার পর বলেছিলো আমি এখও ওকে ভালোবাসিতো।

— কি বলেছিলে?? স্নিগ্ধ কন্ঠে বলে তৃষা।

— প্রচন্ড। হয়ত ও insecure কিনতু ও যানেনা অামি ওর জন্য প্রান দিতে পারি।

–বড়ো অদ্ভুত প্রেমের জগত নাহ প্রিয়ম?!!

–সত্যই তাই এই প্রেমে নেই কোনো শরীরি সুখ।না আছে সাংসারিক সুখ।নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দুঃখতো থাকবে।

আবার থাকবে ভালোবাসার মানুষটার সাথে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার ভালোলাগা।নিজের ভালোলাগার মানুষএর সাথে সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়াই তো ভালোবাসা।না হলে তো তা অর্থহীন।যানিনা ভবিষ্যতে কি হবে কিন্তু এখন যে সময়টা চলছে, যার সাথে আমি আছি, আর যেটা আমি করছি, তা আমার কাছে চরম মূল্যবান।

স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো তৃষা।” তোমার প্রেমে আরো বেশী করে পড়েগেলাম আমি। এক তরফা প্রেম থেকে গেলো কিনা জানিনা। কিন্তু শেষ অনুভূতি টা অনন্য।আয়ুশ কে বলো, ওর রামধনুর জগতে আমি কোনোদিন বৃষ্টি হয়ে আসব না। gay সম্পর্কে ধারনা বদলে দিলে তুমি। গে একজন সুস্থ সবল পুরুষ হতেই পারে।আর পুরুষ তাকেই বলে যে নিজের ভালোবাসার জন্য সারা দুনিয়ার সাথে লড়ার ক্ষ্মমতা রাখে।

এক রাশ চার্মিং হাসি ছিলো প্রিয়মের গালে।

— আমি তোমার কাছে ভালোবাসা আশা করছি না প্রিয়ম। কিন্তু একটা ইচ্ছে পূরন করতে দেবে।??

— কি ইচ্ছে???

তৃষা জড়িয়ে ধরে প্রিয়মকে। বুকে ও ঘাড়ে হাত রাখে। ছোয়া রাখে প্রিয়মের সমপ্রেমে ভেজা ঠোঠে নিজের ঠোঠের। উঠে ছেড়ে দিয়ে বলে ” এটার জন্য আফসোস থেকে যেত তাই। “হাসল প্রিয়ম ওর কথা শুনে। বলল ” আজকের এই কথা গুলো তুমি কাউকে বলবে কিনা, তোমার ব্যাপার। কিন্তু তুমি যানো 377 no ধারা কি অবস্থায় আছে সো…….

পিছনে তকায় তৃষা, কিছুটা ভেবে নিয়ে বলে” এক টা শর্তে।

— কি।অবাক হ য় প্রিয়ম

— বন্ধুত্ব সারাজীবন রাখতে হবে। হাসে তৃষা।

আমি সেদিন ট্রেন থেকে দেখেছিলাম প্রিয়ম কে রবীন্দ্র সেতুর দিকে তাকিয়ে থাকতে। জীবনের চলার জটিল পথ গুলো হয়তো খুজছিলো ও। কারন সোজা পথ ওর জন্য আর নয়।হারিয়ে গেছিলো রাস্তা ওর জন্য।

আয়ুশের বাকি লেখাটা মনে পড়েগেছিলো “পথ জটিল, পাশে এসে হাত ধরার অপেক্ষায় আছি।কারন হাজার জটিলতার মাঝে সমাধান হয়ে এসেছিলে তুমি আমার জীবনে…. অন্তঃপ্রেম।” প্রিয়ম ই সেই অন্তঃপ্রেম।

ধন্যবাদ আয়ুশ, ধন্যবাদ প্রিয়ম, ভালোলাগা ও ভালোবাসার পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।প্রকৃত ভালোবাসার সামনে দাড় করানোর জন্য।ভালোলাগা নয় ভালোবাসার এক মাত্র অর্থ, অন্ধ ভালোবাসা নিজেই।যা কোনো কিছুর পরোয়া করে না। কে ছেলে কে মেয়ে।খেলা শুধু অনুভূতির।সত্যি এও এক ভালোবাসা।

তবে অন্যরকম।

___সমাপ্ত___

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.