অবম

অনিকেত

১.

আজকে কপালে কি আছে জানিনা। চাচী সেই কখন বাজারে পাঠিয়েছিলো! ঘড়ির দিকে তাকালাম, ২ ঘন্টা পেরিয়ে যাবে যাবে করছে। ক্যারাম খেলার নেশাটা দিনদিন পেয়ে বসছে। আজও হয়তো চাচীর বকবক শুনতে হবে। সাইকেলের প্যাডেলে চাপ বাড়ালাম, আর বিপত্তি ঘটলো তখনই। সামনেই বাঁক, আর আমি বাড়িয়েছি স্পিড! একদম সামনে পড়লো মানুষটি।

আমি ছিটকে গেছি সাইকেল থেকে। দেয়ালে ঘষা লেগে মা-বাবার থেকে পাওয়া শেষ সম্বল ঘড়িটারও দফা রফা। ওদিকে বাজার ব্যাগ একদিকে পড়ে, ডিমগুলো ভেঙ্গে রাস্তায় ছড়ানো। আমার পুরো শরীর কাঁপছে। আগন্তুক আমার সাইকেলের নিচে পড়ে আছে। আমি কাঁপতে কাঁপতে উঠে গিয়ে সাইকেল তুলে ধরলাম। লোকটি হাত-পা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালে আমি কাতর ভঙ্গিতে সরি বললাম।

তিনি আমার দিকে তাকালেন। এক মুহূর্তের জন্য আমি চমকে উঠলাম, মনে হলো সেও চমকে উঠেছে। কেনো চমকালাম জানিনা। বারবার মনে হলো লোকটি আমার কতো যেনো চেনা।

উনি আমার বাজারের ব্যাগ তুলে ধরে বললেন, “তোমার তো হাত ছড়ে গেছে, রক্ত ঝরছে। চলো গলির শেষেই আমার বাড়ি, একটু এন্টিসেপ্টিক লাগাবে।” আমি না- সূচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করবো ভাবলাম, তারপর কি ভেবে তার পিছু নিলাম।

ছোটখাট পুরোনো গেট পেরিয়ে চওড়া লেনের পর একতলা একটা বাড়ি। বাড়ির গেটের পাশে সাইকেল ফেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকেই দ্বিতীয় দফা চমকানোর পালা! একটা পরিচিত গন্ধ বাড়ির ভেতরের বাতাসে। আমার বুকের ভেতর কেমন খালি খালি লাগছে। কি একটা মনে পড়ে পড়ে করেও পড়ছেনা।

আমরা বৈঠক ঘরে ঢুকতেই পাশের প্যাসেজ থেকে এক পৌঢ়া মহিলা বেরিয়ে এলেন। আমাকে দেখে ভ্রুকুটি করলে সাথের আগন্তুক পুরো ঘটনা তাকে জানালেন। আগন্তুক আমার দিকে ফিরে জানালেন মহিলা তার মা। এরপর উসখুস করতে করতে বললেন, “তোমার নামটাই জানা হয়নি!” ওনার অবস্থা দেখে মনে হলো কি মনে হয় একটা দোষ করে ফেলেছেন। আমি হেসে ফেলে বললাম, “আমি অনিকেত!” লোকটি মনে হলো আবার চমকালেন। তিনি জানালেন তার নাম অর্ক। আমার মাথা ঘুরছে। এটা কি দূর্বলতা, কিছুক্ষণ আগের এক্সিডেন্ট নাকি নামটা শুনে ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি একটু বসতে পারি?”

মহিলা একটু লজ্জা ভাব নিয়ে এগিয়ে এসে আমাকে সোফায় বসালেন। অর্ক এক পাশের ঘরে ঢুকে মেডিসিন বক্স নিয়ে বেরিয়ে এলো। এরমধ্যেই মহিলা আমাকে পানি দিয়েছেন। অর্ক আমার পাশে বসে ছড়ে যাওয়া হাতটা বাড়াতে বললো। আমি হাসিমুখে জানালাম আমিই পারবো। তাও সে হাত বাড়ালো। আমি হাত বাড়াতেই সে আমার হাতের ঘড়িটা খুললো। যদিও ঘড়িটি এখন বন্ধ এবং ভাঙ্গা! তরল এন্টিসেপ্টিক তুলোয় লাগিয়ে আমার ছড়ে যাওয়া কনুই অন্য হাত দিয়ে ধরতেই আমি কেঁপে উঠলাম। কি জানি কেনো! দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে বললাম, “আমাকে দিন, আমিই লাগিয়ে নিচ্ছি।” তিনি আমার হাতে তুলো ভিজিয়ে দিলেন। আমি ঝটপট ছড়ে যাওয়া জায়গা গুলোতে ঘষে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। স্বভাবতঃ বাসায় কেউ এলে বাড়ির লোকজন দুপুরে খেয়ে যেতে বলে, এরাও বললো। আমি তাড়াহুড়ো করে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এসে সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দিলাম।

আশ্চর্যজনকভাবে চাচী আজ কিছুই বললো না, চিন্তিত ভঙ্গিতে আমার ব্যান্ডেজ করা কনুইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ব্যাগ রেখে গোসলে যা।” আমি ব্যাগ রেখে গোসল সেরে বৈঠক পেরোতে গিয়ে দেখি ঘরভর্তি মেহমান। খুব সম্ভবত আজকেও তুলিকে দেখতে এসেছে এরা। ছোট্ট তুলি সুন্দর করে সেজে বসে আছে। আশ্চর্য, আজকে ওকে অনেক সুন্দর লাগছে।

চাচা আমাকে দেখে বললেন, আরে অনি, আয় বোস। উপস্থিত সবাই আমার দিকে তাকালো। আমি চাচার পাশে বসলাম। তুলির পাশে মাঝ বয়সী এক সুঠাম যুবক। খুব সম্ভবত ইনিই তুলির বর হলেও হতে পারে। সবার কথার ধরণ দেখে মনে হলো দু’পক্ষই সহমত। আমি তুলির দিকে তাকালাম। তাকিয়ে অবাক হলাম! পিচ্চি মেয়েটা আড়চোখে তার হবু বরকে দেখছে! আমি সেন্টি খেলাম।

দুপুরে খেয়ে মেহমান বিদায় হলেন। তুলির গাল লাল হয়ে আছে। চাচা-চাচীর মুখ হাসি-হাসি। চাচা কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, অনিরে, তোর বাবাকে দেয়া কথা আমি রাখতে পারছি এতেই আমি খুশি।

আমি কিছু না বলে উঠে সরে আসলাম। ইমশোনাল কথাবার্তা শুরু হবে এখন। বাবা মা’র মারা যাবার ঘটনা আরেকবার শুনতে চাইনা আমি।

২.

খুব সকালে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভাঙ্গলো। চাচী আর্তনাদ করে কাঁদছে। চোখ মেলে দেখি দরজার কাছে ভেজা চোখে তুলি দাঁড়িয়ে। আমি লাফিয়ে উঠে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি চাচার ঘরের সামনে জটলা। ঘরের ভেতর থেকে চাচীর আর্তনাদ ভেসে আসছে। জটলা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখলাম চাচার নিথর দেহটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে!

আমাদের কোনো আত্মীয় আছে, এমন কখনও শুনিনি। তাই প্রতিবেশি ছাড়া অপরিচিত কাউকে দেখলাম না। দুপুর গড়িয়ে চাচার জানাযা। আমি দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছি, কিছু বলার নেই আমার। তুলি আমার জামার হাতা ধরে পাশে দাঁড়ানো। চাচী এখনো হাহাকার করে যাচ্ছে। চাচার গোসলের পানি গড়িয়ে এসে আমার পায়ে ঠেকলে চমকে একপাশে সরে গেলাম আমি।

সন্ধ্যায় এক এক করে সবাই বিদায় নিলো। তুলির হবু বর এসেছে। চাচীকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। আমি উঠানের একপাশে স্রেফ মাটির উপর বসা। তুলি চায়ের কেটলি নামাচ্ছে। মেয়েটি কি সত্যিই সুখের দেখা পাবে?

-অনিকেত?

পরিচিত গলার ডাক শুনে পেছনে ফিরে দেখি অর্ক দাঁড়িয়ে। আমি হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ালাম। অর্ক এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখলো। আমার বুক ফেটে কান্না এলো। অর্ককে জড়িয়ে ধরে খুব করে কাঁদতে কাঁদতে চেতনা হারালাম আমি।

চোখ মেলতেই তুলির সুন্দর মুখটা দেখলাম।

-দাদা, এখন কেমন আছিস?

তুলির প্রশ্ন শুনে ভালো ভাবে চোখ মেললাম। “ভালো”- জানালাম। চাচী কপালে হাত দিয়ে জানালেন জ্বর পড়ে গেছে। চাচা মারা যাবার পর দু’দিন আমি জ্বরে বেহুশ ছিলাম।

বাইরে অর্কের গলা পাচ্ছি। আশ্চর্য, তার কণ্ঠস্বর এতো পরিচিত লাগছে কেনো আমার?

দরজা ঠেলে অর্ক পাশে এসে দাড়ালো। তার হাতে থার্মোমিটার, মুখে হাসি। আমার হাত থেকে গ্লুকোজের নল সরাতে সরাতে জানালো, সেদিন তার বাহুতেই আমি অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। এরপর তিনটি রাত পেরিয়ে গেছে। আমি অর্কের চেহারা খুঁটিয়ে দেখছি। বয়স ২৬ হবে, খোঁচা দাঁড়ি, সুন্দর চেহারা। চিবুক বেয়ে ঠোঁটে চোখ পড়ার আগে কেনো জানি মনে হলো তার অধরে একটা তিল থাকবে, ঠিক ডান দিকে। আশ্চর্য, তাই আছে।

অর্ক এমবিবিএস ডাক্তার। অর্কের সাথে প্রায়ই দেখা হয়, কথা হয়। ওদিকে তুলির বিয়ে এগিয়ে আসছে, সবাই চায় এক সপ্তাহের মধ্যে তুলির বিয়ে হোক। মেয়েটা আবার খুব হাসিখুশি হয়ে গেছে। মাঝেমাঝেই ফোনে কথা বলে, অবশ্যই রাশেদের সাথে। রাশেদ ওর হবু জামাই।

সবার হাসিখুশি অবস্থা দেখে আমারও খুব ভালো লাগছে। চাচীর শরীর দিনদিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। অর্ক তাকে বড় ডাক্তার দেখানোর কথা বললে সে বললো, ” বিয়েটা হয়ে যাক!” অর্কের মা মাঝেমাঝে এসে তাকে সাহায্য করছেন। অর্কের সাথেও আমার খুব ভালো সখ্যতা গড়ে উঠেছে। সে শহরে একটা বেসরকারি হাসপাতালে এসিস্ট্যান্ট ডাক্তার। তাও সময় বের করে এসে সাহায্য করছে আমাদের। এই মানুষটিকে আমার খুব পরিচিত লাগে; তার আচরণ, গায়ের গন্ধ, গলার আওয়াজ, চাহুনি সবকিছুই যেনো আমার বড্ড চেনা! অথচ পরিচয় ১৫ দিনের বেশি হয়নি। দূরে দাঁড়িয়ে যখন তাকে দেখি; মনে হয়, এটা আমার নিজের মানুষ। একান্ত আমার।

৩.

খুব ধুমধাম করে তুলির বিয়ে হয়ে গেলো। আমিও এমবিএ করতে শহরে চলে এলাম একসময়। অর্কের সাথে যোগাযোগ কমে গেছে। আমি পড়াশোনা আর জব প্রিপারেশন নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে গেছি।

একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। আমি ভার্সিটি থেকে ফিরতে গিয়ে পুরো কাক ভেজা হয়ে ভিজে গেছি। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দিতে যাবো হঠাৎ মাথার উপর কে জানি ছাতা ধরলো। বামে ফিরে দেখি, অর্ক! ছেলেটা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুদর্শন হয়ে গেছে।

পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কুশলাদি জানলাম। আজ সে পারফিউম মেখেছে। চেনা গন্ধ, অথচ আমার পরিচিত কেউ কখনই পারফিউম মাখেনি।

রাতে ভালো ঘুম হয়নি। সারাটা রাত কি সব বিদঘুটে স্বপ্ন দেখে ছটফট করেছি। অস্থির স্বপ্ন, এক চিত্র থেকে আরেক চিত্রে চলে যাচ্ছে। একজায়গায় দেখলাম আমি খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। হঠাৎ দেখি আমাকে হত্যা করা হচ্ছে। ওপাশ থেকে কারো মিনতি, অনিকে মেরোনা। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলাম। ঘেমে নেয়ে গেছি একদম। বাইরে পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমি গোসলের জন্য বাথরুমের দিকে চললাম।

ভার্সিটিতে বেরোনোর আগে বাড়িওয়ালা জানালেন দুই মাসের ভাড়া বাকী। তারা নতুন ভাড়াটিয়া দেখেছে। আমার হাতে এই মুহুর্তে ভাড়া দেবার মত টাকাও নেই, চাকরিও নেই। মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। রাস্তার ধারে টং দোকানে বসে আছি। হঠাৎ কোথা থেকে অর্ক এসে দাঁড়ালো। “চা খাবে?” জিজ্ঞেস করলো। আমি হ্যাঁ – না কিছু বললাম না। অর্ক দুই কাপ চা নিয়ে পাশে বসলো।

-কিছু হয়েছে?

আমি চুপ করে রইলাম।

পরদিন ভার্সিটি থেকে ফিরে দেখি রুমে নতুন ভাড়াটিয়া উঠে গেছে। আমার কোনো জিনিসপত্রও নেই। দৌড়ে বাড়িওয়ালার কাছে গিয়ে জানলাম অর্ক এসে সব নিয়ে গেছে। আমি এখন কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ওর সাথে ভালো সম্পর্ক আছে ঠিকই, তাই বলে এটা ঠিক হবে না। আমি অর্কের বাড়ির গেটে গিয়ে বেল বাজালাম। অর্ক বেরিয়ে এসে হাসিমুখে আমাকে ভেতরে ডাকলো। আমি বললাম, “এটা কেনো করেছো?”

-তো? তোমাকে রাস্তায় থাকতে দিতে হতো? চুপচাপ ভেতরে এসো।

ওর বাসায় ঘর তিনটা, একটা বসবার ঘর একটা ওর বেডরুম আর একটা সারানো হয়নি। তো, আমাকে তার সাথেই থাকতে হবে। আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। জাস্ট ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “থ্যাংকস!”

দিন কাটছিলো ভালোই। সকালে আমার ক্লাস, বিভিন্ন জব ইন্টারভিউ এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকি। সপ্তাহে ছুটির দিনে অর্ক আর আমি ঘুরতে বের হই। একদিন হঠাৎ তুলির ফোন পেলাম। চাচী হাসপাতালে ভর্তি, স্ট্রোক করেছে। ডাক্তার বললেন ভালো চিকিৎসা দরকার। আমার হাতে মোটেও টাকা নেই। চাকরির একটা ইন্টারভিউ দিয়েছি, কিছু জানায়নি ওরা। মন প্রচণ্ড খারাপ হয়ে গেলো আমার। হেঁটে বাসায় ফিরছি, আকাশ ভরা কালো মেঘ। আমার মাথা ঝিনঝিন করছে, হুট করে বৃষ্টি নামলো। রাতে আমার প্রচণ্ড জ্বর আসলো। অর্ক সারারাত জেগে আমার পাশে। আমি নিজের মাথা ওর কোলে রাখলাম। কতো যেনো শান্তি! আমার ঘুম আসলো, ঘুমের মাঝে আবার উদ্ভট সব স্বপ্ন, আমাকে কারা মেরে ফেলতে চাইছে। ওপাশ থেকে কেউ মিনতি করছে। অন্ধকার থেকে, আমি খুব করে তাকে দেখতে চাইলাম।

ঘুম ভেঙ্গে গেলো। অর্ক আমার কপালে হাত রেখে তাকিয়ে আছে, ওর চোখ ভেজা।

পরদিন সকালে জ্বর পড়ে গেলো। দুপুরে ঠিক আগে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসলো। আমার চাকরিটা হয়ে গেছে, চাইলে কাল থেকেই জয়েন করতে পারি। খবরটা তুলিকে দিয়েছি। অর্ককে সামনে জানাবো বলে বাসায় বসে আছি। আজ যেনো সন্ধ্যা নামবে না। বিকালের পর কালো মেঘে আকাশ ছেঁয়ে গেলো। আমি বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। বড়সড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়া শুরু হলো এমন সময় বাইরের দরজায় টোকা। দরজার বাইরে ঘেমেনেয়ে দাঁড়িয়ে অর্ক। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে জানালাম আমার চাকরি হয়ে গেছে। কথা শেষ হতেই চমকে গেলাম, এই বুকে আমি আগেও আবদ্ধ হয়েছি!

রাতে ঘুম আসছেনা আমার। অর্ককে নিয়ে আমার এমন মনে হয় কেনে? আমি কি অসুস্থ? ভয়ানক কোনো অসুখ? বাম পাশ ফিরতেও অর্কের মুখোমুখি, ওর চোখ ভেজা। আমি লাফিয়ে উঠে বসলাম।

-কি হয়েছে তোমার?

-কিছুনা।

-তুমি না ঘুমিয়ে গেছিলে?

-হুমম।

-কিছু হয়েছে?

-অনিকেত?

-বলো..

-তুমি জন্মান্তরে বিশ্বাস করো?

-কি বলছো এসব?

-কিছুনা। আচ্ছা ঘুমাই। ঘুমিয়ে যাও তুমিও।

আমার ঘুব মায়া হলো ওকে দেখে। কি ভেবে ওকে বুকে জড়িয়ে নিলাম।

৪.

প্রথমদিন চাকরিতে গিয়েই বাধালাম বিপত্তি। দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে ক্যানটিন থেকে খাবার কিনে দরজা দিয়ে মাত্র বেরোতে গেছি, কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে সামনে এসে পড়লো এক ভদ্রলোক, আমার সমস্ত খাবার গিয়ে পড়লো তার সাদা রঙের শার্টে। আমি সরি সরি বলতে লাগলাম। উনিও সরি বলছেন। সরি বলা শেষ হলে একজন আরেকজনের দিকে তাকালাম। আমাদের অফিসেই ইনি। আমি বিভ্রান্ত হয়ে গেছি ওনার তাকনো দেখে। হাত বাড়িয়ে দিলেন, “আমি শুভ্র।” আমিও হাত বাড়িয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। আসলে পরিচয় কি সেদিন শেষ হলো? এরপর নিজেদের ফেসবুক, ফোন নাম্বার শেয়ার। শুভ্র অনেক কেয়ার করতে লাগলো আমার। একসময় উপলব্ধি করলাম, আমিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছি। এরপর সত্যি সত্যি একদিন আমাদের প্রেম হলো। একসাথে না থাকলে আমার দম বন্ধ হবার জোগাড় হতে লাগলো, ওকে আমার সবসময় চোখের সামনে চাই এমন অবস্থা হয়ে দাড়ালো। খুব সকালে বেরিয়ে যেতাম আর ফিরতাম অনেক রাতে। একদিন রাত ২ টায় ফিরলাম। দরজা খুলে দেখি অর্ক জেগে, তার চোখদুটো লাল। আমি বললাম, “ঘুমাওনি?”

অর্ক কিছু না বলে উঠে গেলো। আমি ফ্রেশ হয়ে ঘুমাতে গিয়ে উসখুস করতে লাগলাম। কথাটা অর্ককে কিভাবে বলবো বুঝতে পারছিলাম না।

-কিছু বলবে?

-না, আসলে কিভাবে বলবো বুঝতে পারছিনা।

-বলে ফেলো।

-আসলে আমি একটা ফ্ল্যাট দেখেছি…

-একা?

-না, এক কলিগ আর আ..

-কলিগ?

-হ্যাঁ, তো অনেকদিন তো হলো তোমার ঘাড়ে চেপে বসে আছি।

-হাহাহা, তা ঠিক। তো কবে উঠছো?

-কালই।

-কালই?

-হুঁ।

-আচ্ছা।

সারাটা রাত আমি চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। শুভ্রকে ২৪ ঘন্টা এখন থেকে চোখের সামনে পাবো এজন্য, নাকি অন্য কোনো কারণে?

সকালে আমি নতুন ফ্ল্যাটে পার হয়ে এলাম। একটা নতুন জগৎ! আমার নিজের সংসার, নিজের মানুষের সাথে। প্রতিদিন ভাগাভাগি করে ঘরের কাজ করা, একসাথে অফিসে যাওয়া, একসাথে ফেরা। ছুটির দিনগুলোতে নিজেদের ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে আমরা দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরে ফিরতাম। এর মাঝে তিনমাস পেরিয়ে গেলো। মাঝে মাঝে ভাবতে অবাক লাগতো, আমার কপালে এত সুখ?

অবস্থা এমন দাঁড়ালো, শুভ্রের বুকে মাথা না রাখলে আমার ঘুস আসেনা। বিষয়টা উপলব্ধি করলাম যখন ও গ্রামের বাড়িতে গেলো।

ওর সকালে বাড়ি পৌঁছে ফোন দেবার কথা, আমি ফোন দিয়েও বন্ধ পেলাম। তারপর লাঞ্চ ব্রেকেও যখন ফোন অফ বললো, আমার বুকের ভেতরে ব্যাথা অনুভূত হলো। শুভ্রর পরদিনই ফেরার কথা কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গড়ালো শুভ্র ফিরলো না। রাতে আমার প্রচন্ড জ্বর এলো। স্বপ্নে ভুলভাল দেখতে লাগলাম। আমি মরে পড়ে আছি, অন্ধকারে কারও আহাজারি শোনা যাচ্ছে। পরিচিত একটা কণ্ঠ। কণ্ঠটা পরিস্কার না। পরিস্কার হচ্ছে কণ্ঠ, একটু একটু করে.. “অনিকেত?”

আধো চোখ মেলে অর্ককে দেখলাম। চোখের পাতা ভারী, জ্বর এখনো পড়েনি আমার। হাসপাতালের গন্ধ পাচ্ছি। আমি অর্কের দিকে তাকালাম, ছেলেটা এত শুকিয়ে গেলো কিভাবে? আমার হঠাৎ শুভ্র কথা মনে পড়লো। কি হয়েছে ওর? কথা বলতে চাই আমি ওর সাথে। কণ্ঠনালী দূর্বল, কথা বেরোচ্ছে না। আমার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে, জ্বর বাড়ছে। ঘুমিয়ে পড়লাম।

৫.

হাসপাতাল থেকে ফিরেছি গতকাল। ফ্ল্যাটের সবকিছুই আগের মত আছে, শুধু শুভ্রের কিছু নেই। আমার বুক ব্যাথা শুরু হলো, মাথা প্রচন্ড ঘুরছে। শুভ্রের নাম্বার বন্ধ। আমি অফিসের রিসিপশনে ফোন দিয়ে জনলাম শুভ্র ফিরেনি তবে তার অব্যহতি পত্র জমা পড়েছে। আমার মাথা ভনভন করছে, সব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। রিসেপশনিস্ট মেয়েটাকে অনুরোধ করতেই শুভ্রর বাসার নাম্বারটা মেসেজ করে দিলো। ফোন ধরলেন এক বৃদ্ধা। শুভ্রর মা। জানালেন শুভ্রর বিয়ে হয়ে গেছে, সস্ত্রীক আমেরিকা চলে যাচ্ছে। ফ্লাইট বিকাল ৪টা। আমি ফোন কেটে দিলাম। ঘড়িতে দুইটা চল্লিশ। আমার শরীর কাঁপছে, কবে এসব? আর কেনো? এই মুহুর্তে আমার সবকিছুর জবাব চাই।

এয়ারপোর্টে পৌঁছে শুভ্রকে খুঁজে পেতে মোটেই বেগ পেতে হয়নি। ও আমাকে দেখেই হাসলো। পাশে সুন্দরী তরুণী। মেয়েটিকে কিসব বলে আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমার হাত, পা কাঁপছে। আমি ওর হাত ধরে বললাম, “কেনো?”

শুভ্র আমাকে তার বউয়ের আড়ালে নিয়ে গেলো।

-অনিকেত, স্বাভাবিক হও। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসতাম ঠিকই, কিন্তু এই ভালোবাসার কোনো অস্তিত্ব নেই। একদিন না একদিন এরকম হতোই।

-ভালোবাসতাম?

-অনি, আমার অনেকদিন আগেই বিয়ে ঠিক ছিলো। পড়াশোনার জন্য শুধু জবটা করা। তুমি এমন ভেঙ্গে পড়ছো কেনো আমি বুঝতে পারছিনা।

-সত্যিই তাই।

-আচ্ছা শোনো, ফ্লাইটের সময় প্রায় হয়ে গেছে।

-ওহ,

-তুমি এমন করছো কেনো? আমার এখন যেতে হবে। আমি আমেরিকা পৌঁছে ফোন দিবো।

খুব ইচ্ছা হলো বলতে, “তুমি বাড়ি পৌঁছেও ফোন দিতে চেয়েছিলে।” চোখের সামনে বিমানটা আকাশে পাখা মেলে উড়ে গেলো, মুহুর্তেই!

টুপটুপ শব্দে পানির কল থেকে পানি পড়ছে। শব্দটা একঘেয়ে না লেগে বরং ভালোই লাগছে! যেনো একটা তাল/ লয়। বেসুরো জীবনে এমন অদ্ভুত লয়ের কি আদৌ কোনো অর্থ হয়? হাস্যকর বটে।

নিঃশব্দে উঠে গিয়ে কলের প্যাচ শক্ত করলাম। পানি পড়া বন্ধ হলো ঠিকই; আকস্মিক মাথা ব্যাথা শুরু হলো, আমার প্রচণ্ড জ্বর এলো হনে হচ্ছে। চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসতে লাগলো, তাৎক্ষণিক মাথায় আঘাত লাগলো, তারপর সব অন্ধকার।

৬.

আমার আশেপাশে অনেক মানুষ। আমাকে চিতায় তোলা হয়েছে। আশেপাশে সবাই চিৎকার করছে, ওদেরকে পুড়িয়ে দাও।

আমার চিতার নিচে কেউ কাঁদছে, আমি মাথা তুলতে পারছিনা। কে কাঁদছে? কদাকার চেহারার একজন হাতে মশাল নিয়ে এগিয়ে আসছে, হুট করেই যে কাঁদছিল সে উঠে দাঁড়ালো। প্রতিবাদ করে বললো আমাকে পোড়াতে দেবেনা। মশালধারীর চেহারা ভয়ানক হয়ে গেলো। আমি মনে মনে চাইছি প্রতিবাদকারী ঘুরে দাঁড়াক, আমি একবার তাকে দেখতে চাই। আমার মনে হলো সে ঘুরছে, ঘুরছে..

-অনিকেত?

ঘুম ভেঙ্গে দেখি অর্ক দাঁড়িয়ে। মুখ মলিন, চোখ লাল। আমি অপলক তাকালাম। তুলি এসেছে, কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে ছোট্ট মেয়েটা। রাশের এসে আমার বুকে হাত রেখে বললো, “ভাই এখন কেমন আছেন?” আমি হাল্কা মাথা কাত করলাম। কথা বলতে পারছিনা। তুলিকে ইশারা করে ডাকলাম। ওর ছোট্ট হাতটা ধরে রাশেদের হাতের ভেতরে দিয়ে চাপ দিলাম। রাশেদ আমাকে আশ্বস্ত করলো, “ভাই, আপনি শুধু সুস্থ হয়ে উঠেন।”

আমার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে, আমি স্বপ্ন দেখতে চাই আবার। ওদের হাতের ইশারা করলাম, সবাই বেরিয়ে গেলে আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

চারদিন পর শরীর একটু ঝরঝরে হলে আমি বাড়ি ফিরতে চাইলাম। অর্ক স্রেফ মানা করে দিলো। আমি বললাম, “তোমার ওখানে গেলে তো চলবে নাকি? ডাক্তার পাশেই থাকবে।” অর্ক চোখ জলে ভরে গেলো। ছেলেটা এমন করে কেনো? আমার খুব মায়া হয়।

পাশে অর্ক শুয়ে কিজানি ঘুমিয়েছে নাকি জেগে। পাশ ফিরতেও আলসেমি লাগছে। আমার কি কিছু হয়েছে? ভয়ানক কিছু? পাশের টেবিলের উপর একটা ডায়েরি। অবাক হলাম, অর্ক ডায়েরি লিখছে কবে থেকে? আমার খুব পড়তে ইচ্ছে হলো। ব্যাপারটা যে অন্যায়, তবু আমার একটুও খারাপ বোধ হচ্ছেনা।

সকালে অর্ক কিছু ঔষধ কিনতে বাজারে গেলে আমি ডায়েরি মেলে বসলাম।

ডায়েরি শুরু হয়েছে মহাদেব সাহার দুটি লাইন দিয়ে-

“তোমাকে দেখেছি সেই কবে কোন বৃহস্পতিবার।

আর এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখিনা।”

সারপ্রাইজ হলাম ডায়েরি লিখেছে আমাকে নিয়ে। প্রথমদিন আমার সাইকেলে এক্সিডেন্ট থেকে গত দুদিন আগের সব কিছু লিখেছে, তবে আমাকে কেন্দ্রিক ঘটনাগুলো শুধু।

পড়তে পড়তে আমার মাথা প্রচণ্ড ব্যাথা হতে লাগলো। আমার মত তারও আমার উপস্থিতি চমক দেয়, আমাকে তার কত দিনের চেনা মনে হয়। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয়, আমার মত সেও স্বপ্ন দেখে, ঠিক আমি যা যা দেখি। তবে সে তার লাশের পাশে বসে কাঁদা মানুষটিকে দেখেছে, সে আমি।

শেষ পাতায় কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লিখেছে সে আমাকে ভালোবাসে। চাচার মৃত্যুর দিন যখন আমি তার বাহুতে অজ্ঞান হলাম, সেদিন থেকে ওর আমাকে ভালো লাগে। তবে আমার তাকে ছেড়ে শুভ্রর সাথে যাওয়ার কথা শোনার পর সে বুঝেছে সে আমাকে কতটা ভালোবাসে!

“অনি, তুমি কি কখনো জানবে আমার এসব কথা? আমি যে স্বপ্ন দেখি তাতে আমার মনে হয় আমি তোমাকে আগের জন্মেও ভালোবেসেছি। তুমি কিভাবে আমাকে ফেলে আরেকজনকে বেছে নিলে? তুমি যাবার পর আমি খেতে পারিনা, ঘুমাতে পারিনা। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। তবে কি আরও এক জন্ম এমন পেয়ে হারানোর বেদনা সইতে হবে আমাকে?”

আমার চোখে জল ভরে এলো। আমি কি অর্ককে কখনও অনুভব করছি? হ্যাঁ করেছি। তবে তার সবকিছুই আমাকে চমকে দিতো। আমার ভয় লাগতো এটা ভেবে, আমি কি অসুস্থ? এসব অসুস্থতার লক্ষণ? তার ফলেই আমি পালিয়ে বেড়িয়েছি।

শেষাংশ-

বাইরে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কাকভেজা হয়ে ভিজতে ভিজতে জানালার ওপাশে অর্ক হাসিমুখে এসে দাঁড়ালো। এই মুহুর্তে আমার মনে হলো কয়েক মহাকাল আগেও আমি জানালার এপাশে দাড়িয়েছিলাম, আর বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়েছিলো অর্ক।

“হ্যাঁ আজও, শত সহস্র কোটি বছর পরেও,

জানালার ওপাশে সে বর্ষা হয়ে নামে।”

[উৎসর্গ: আমার নিজের মানুষটিকে। আজকে তার জন্মদিবস।]

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.