আনন্দলোকে

লেখকঃ-ফাহিম হাসান

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

*

বেলা সাড়ে বারোটা বাজে। আমি মেসের ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। ছাদে দাঁড়ানোর জন্য সময়টা একেবারেই উপযুক্ত না। প্রচন্ড রোদ। তারপরেও দাঁড়িয়ে আছি। সাড়ে বারোটা থেকে বারোটা চল্লিশের মধ্যে রাশেদ নামের মেসের এক বড় ভাইয়া ছাদে ভেজা কাপড় রোদে দিতে আসে। বেশ কিছুদিন হলো হঠাৎ করেই তাকে ভালো লাগতে শুরু করেছে। এবং তার পর থেকে যত প্রকার উপায়ে সম্ভব তার সামনে পড়ার চেষ্টা করছি (আর এমন একটা ভাব করছি যেন তার সাথে দেখা হওয়া বিষয়টা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত)।

আসছে না কেন?

আমি ছাদজুড়ে পায়চারি করতে লাগলাম। আমাদের মেসের ছাদটা মোটামুটি অপরিষ্কার একটা জায়গা। ছাদের অনেক অংশেই শ্যাঁওলা জমে ভয়ানক পিচ্ছিল হয়ে আছে। মেসের মালিক ছাদে বাগান করার চেষ্টায় ঢাউস সাইজের ড্রামে লেবু, মেহেদি, গোলাপ, করমচা আর ক্যাকটাস গাছ লাগিয়েছিলেন। পানির অভাবে সেই গাছগুলোর মধ্যে মেহেদি আর গোলাপ গাছটা অলরেডি মারা গেছে। ক্যাকটাস গাছটাই একমাত্র স্বাভাবিক আছে। সম্ভবত, মরুভুমির আদি অভ্যাস।

স্যান্ডেলের শব্দ হচ্ছে; চট চট চট। কেউ একজন ছাদে আসছে। রাশেদ ভাই ছাড়া আর কেউ না নিশ্চয়ই। আমি তাড়াতাড়ি করে আমার আনা ভেজা কাপড়গুলো রোদে মেলে দিতে লাগলাম। সেই সাথে আড় চোখে ছাদের দরজার দিকে তাকাতে লাগলাম। হ্যাঁ, রাশেদ ভাই-ই এসেছে। চোখ সরাতে পারছি না। রাশেদ ভাইয়া কাপড় মেলে দিতে দিতে আমার দিকে একবার তাকালো। আমি তখনও তাকিয়ে আছি। চোখাচোখি হয়ে গেল। আর এদিকে দড়িতে আমার ট্রাউজার অর্ধেকটা ঝুলতে ঝুলতে পড়ে গেল।

“ইশ! ময়লা হয়ে গেছে। আবার ধোয়া লাগবে। উফ,” বলে আমি সামনে তাকাতেই দেখি মশাই চলে গেছে। এতো গম্ভীর একটা মানুষ হয় কীভাবে?

এরপরই আমি দ্রুত তার মেলে দেওয়া কাপড়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। তার ভেজা কাপড়ের খুব কাছে নাক এনে গন্ধ শুঁকলাম। সার্ফ এক্সেল ডিটারজেন্টের গন্ধ আসছে।

“এতো পরিচ্ছন্ন কেনো তুমি?” মনে মনে বললাম।

এই পর্যায়ে আচমকা বুঝতে পারলাম যে ছাদে অসম্ভব রকম গরম। তাড়াহুড়ো করে আমার রুমে চলে আসলাম।

এখানে বলে রাখা ভালো যে সেদিন বিকালেই আমি সার্ফ এক্সেলের কয়েকটা প্যাকেট কিনে এনেছিলাম কাপড় কাঁচার জন্য।

*

মেসে আমার রুম তিন তলায়। আর মশাইয়ের চার তলায়। আমার রুমটা ডাবল সিটের। আমার রুমমেটের বাড়ি নোয়াখালীতে।নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা আমি কিছুই বুঝিনা।শুধু ভ্যাবলার মত তাকিয়ে থাকি লোকটা যখন কথা বলে ।

অন্যদিকে, মশাই থাকে সিঙ্গেল রুমে। ইশ! যদি ও আমার রুমমেট হতো!

দরজা খুলে রুমে ঢুকতেই আমার রুমমেট রিয়াদ ভাই হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ালো। মুখভর্তি কোনো খাবার মনে হয়। মুখ ফুলে আছে। এবং খুব দ্রুত সে মুখের ভেতর থাকা খাবার চিবুচ্ছে। ঠোঁটের চারপাশে খাবার লেগে আছে। তার বিছানার ওপর ঠোঙার মধ্যে সিঙ্গারা উঁকি দিচ্ছে। আমি রুমে ছিলাম না এই সুযোগে মনে হয় খেতে বসেছিল। এতো তাড়াতাড়ি আমি চলে আসবো ভাবে নি হয়তো।

আমাকে সে দিগন্ত বিস্তৃত একটা হাসি দিলো। আমি গিয়ে আমার টেবিলে পড়তে বসলাম। রুমমেট আমার থেকে সিনিয়র হওয়ার পরও কেন এরকম অদ্ভুত আচরণ করে কে বলবে?

আজকেই প্রথম না। এর আগেও একদিন এরকম হয়েছে। আমি দুপুরে গোসলের জন্য বাথরুমে গিয়েছি। গোসল শেষে রুমে ঢুকেই দেখি সে সেভেন আপ আর পরোটা খাচ্ছে। আমি রুমে ঢোকা মাত্রই তাড়াহুড়া করে সে ওই খাদ্যদ্রব্যগুলা বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখলো। তখনও তার মুখ ভর্তি খাবার এবং ঠোঁটে দিগন্ত বিস্তৃত হাসি।

*

আচ্ছা, আমি প্রতিদিন যে এতো পরিপাটি হয়ে মশাইয়ের সামনে ঘোরা ফেরা করি সেটা কি ও খেয়াল করে না? সেদিনও লাল শার্টটা পরে ওর সামনে দিয়ে গেলাম। তখনও কি আমাকে ও খেয়াল করে নি? তাছাড়াও, সাদা গেঞ্জিটা পরেও ওর সামনে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। দুই সেকেন্ডের জন্য চোখে চোখ পড়ার বাইরে তেমন কিছু তো হয় নি। চোখে মুগ্ধতা থাকলেও না হয় বুঝতাম যে তারও আমাকে পছন্দ হয়েছে। কিন্তু, কেমন জানি শূণ্য দৃষ্টিতে সে আমাকে দেখে। যে দৃষ্টিতে ভালোবাসাও নেই, বিরক্তিও নেই।

*

সেদিন সন্ধ্যায় তাকে দেখে আমার পছন্দের মাত্রাটা বহুগুণ বেড়ে গেলো। গ্রীক দেবতাদের যেমন কোকড়ানো চুল আর খাড়া নাক থাকে, ওরও তাই। তার উপরে কালো একটা টিশার্ট পরেছে। আমাকে দেখে সে মাথা নিচু করে ফেলল। আচ্ছা, একবার তো জিজ্ঞেসও করতে পারে “কী খবর?”। কিন্তু না। সে যেমন বদ্ধ দেয়ালের মধ্যে বাস করে, আমিও তেমনি। যদিও আমি তার নাগাল পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করি, কিন্তু তার হাবভাব দেখে মনে হয় না তার সঙ্গ পাওয়াটা সহজ কোনো কাজ হবে।

ওই রাতে প্রচন্ড আবেগের বশে একটা দুঃসাহসিক কাজ করে ফেললাম। না না, অশ্লীল টাইপ কিছু না। যা করলাম তা হলো, একটা ছোটখাটো চিঠি লেখে ফেললাম। জেলপেনে যতটা সম্ভব সুন্দর করে লেখা যায় লিখলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হলো প্রথমবার আমার হাতের লেখা বিশ্রী হলো। জোর করে সুন্দর করে লিখতে গেলেই এই ঝামেলাটা হয়। আরেকটা কাগজ নিয়ে দ্বিতীয়বার লিখতে শুরু করলাম। বেশি বড় না চিঠিটা। কয়েকটা বাক্যই আছে।

“এই যে মশাই,

তুমি একটুও হাসো না কেন বলো তো? হাসলে তোমাকে দেখতে অসম্ভব রকম সুন্দর লাগে, এই তথ্য তোমাকে কি কেউ দেয় নি?

জানো, মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় তোমাকে আমার সামনে বসিয়ে রেখে শুধু তাকিয়ে থাকি তোমার দিকে।

ভালো থাকবে কিন্তু, বুঝেছো?

A”

চিঠির শেষের A হলো আমার নাম আদিল এর প্রথম অক্ষর। চিঠিটা তার কাছে পাঠাবো কীভাবে এটাই এখন চিন্তা। আচ্ছা, তার রুমের দরজার নিচ দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলে কেমন হয়? কিংবা, সে যখন মেসের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকবে তখন তার গায়ের উপর ছুঁড়ে দেই তবে? শেষমেশ দুটা প্ল্যানই বাদ দিলাম।

গায়ের ওপর চিঠি ছুঁড়ে দেয়া বিশ্রী একটা ব্যাপার। আর রুমের দরজার নিচ দিয়ে চিঠি চালান করা তো আরো বিপদজনক। অন্য বোর্ডারদের কেউ না কেউ সবসময় ঘোরাঘুরি করছে সেখানে। চিঠি নিয়ে ধরা পড়লে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। অবশেষে অসম্ভব রকম ভালো একটা বুদ্ধি পেলাম। বুদ্ধিটা এতোটাই ভালো যে, আমার খানিকটা আহ্লাদ বোধ হলো “বাহ আমি তো খুব ট্যালেন্টেড!”

এই প্রথম কাউকে চিরকুট দেবো এই উত্তেজনায় রাতে ভালো ঘুম হলো না। এপাশ ওপাশ করতে করতে রাতে আড়াইটার দিকে ঘুম এলো।

*

পরদিন দুপুরে ছাদে গেলাম না। বিকালের দিকে মশাই বাইরে বের হয় এটা জানা ছিল। তাই, একেবারে বিকালে গেলাম। ছাদে উঠে যা দেখবো ভেবেছিলাম, তা আর দেখা হলো না। মেসের বড় ভাইগুলা জটলা বেঁধে গল্প করছে। প্রচন্ড রাগ লাগছিল তখন। আর কি সময় ছিল না? এখনই গল্প করার ছিলো? রাগে গজগজ করতে করতে আমার রুমে আসলাম।

অনেক কষ্টে রুমে আধা ঘণ্টা পার করে আবার ছাদে গেলাম। যাক বাবা, সবাই চলে গেছে। খুশি এবং একই সঙ্গে ভয় ভয় করতে শুরু করলো। আমি যা করছি, ঠিক করছি তো?

তারের সাথে রাশেদ ভাইয়ের ট্রাউজার আর গেঞ্জি মেলে দেওয়া । আমি তার ট্রাউজারের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার পকেট থেকে চিরকুটটা বের করলাম। আশে পাশে কেউ নেই তো? না, নেই। চারপাশটা তবুও ভালো করে দেখে নিলাম। তারপর, চিরকুটটা রাশেদ ভাইয়ের ট্রাউজারের পকেটে সাবধানে রেখে দিলাম। সে যখন প্যান্টটা পরবে, কোনো না কোনো সময় অবশ্যই পকেটে হাত দেবে। আর হাত দিলে অবধারিতভাবে চিরকুটটা হাতে পড়বে। এরপর নিশ্চয়ই সে একবার হলেও পড়বে।

*

রুমে এসে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আচ্ছা কাজটা করা কি ঠিক হলো? যদি রাশেদ ভাই ওই চিরকুটটা মেসের বাঁকি সবাইকে দেখিয়ে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে তাহলে? কিংবা যদি গালাগালি করে?

এসব ভাবতে ভাবতেই আমার মুখ পাংশুবর্ণ ধারণ করলো। বুঝতে পারলাম একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছি। কী দরকার ছিল হুজুগের মাথায় চিরকুট লেখার?

চিরকুটটা ফেরত নেয়ার জন্য তাড়াতাড়ি আবার ছাদে চলে গেলাম। কাপড় চোপড় কিচ্ছু নেই ওখানে। ছাদ থেকে নেমে রাশেদ ভাইয়ের রুমের ওদিকে হাঁটতে লাগলাম। আর বাইরে এমন একটা মুখ করলাম যেন এমনি এমনি বেড়াচ্ছি। যাহোক, সে রুমেই আছে। তবে, ভেতর দিক থেকে রুম বন্ধ করা। ভেন্টিলেটর দিয়ে আলো আসছে। তাড়াহুড়া করে প্রায় দৌড় দিয়ে আমার রুমে চলে আসলাম। হাপাচ্ছি দেখে রুমমেট ভাই শুদ্ধ ভাষায় জিজ্ঞেস করলো, “কী আদিল, এতো দৌড়াও ক্যান?”

আমি আমতা আমতা করে বললাম, “ভাইয়া, ব্যায়াম করতে ছিলাম”।

তিনি হাসলেন। যদিও তাকে দেখে মনে হলো না যে তিনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন। না করলে নাই।

চিরকুটটা কোন দুঃখে যে দিলাম। উফ। টেনশন হচ্ছে। পরেরবার রাশেদ ভাই আমাকে দেখলে নিশ্চয়ই মিটমিট করে হাসবে আর না হয় প্রচণ্ড ধমক দিবে। সম্ভাবনা আছে এই রাত্তির বেলা-ই আসতে পারে। বারবার মনে হতে লাগলো এই বুঝি কড়া নাড়ার শব্দ আসবে। ফোনে ফ্লেক্সিলোড দেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও ভয়ে রুম থেকে বের হলাম না। বের হলেই যদি দেখি মশাই বসে আছে তাহলে? যদি সে বলে, “বেশ কয়েকদিন ধরে তোমাকে খেয়াল করছি যে তুমি যখন তখন আমার দিকে তাকাচ্ছো। আবার রসিয়ে রসিয়ে একটা চিঠিও দিয়েছো। লজ্জা করে না? বেহায়া ছেলে কোথাকার। তোমার বাবা মা কি তোমাকে এই শিক্ষা দিয়েছে? এতো টাকা খরচ করে তোমাকে কি এমনি এমনিই বাইরে পড়তে দিয়েছে?” তাহলে আমি শেষ।

আচ্ছা, ওকে সামনা সামনি যদি বলে দেই “এই যে ভাইসাহেব! তোমারে আমার খুব ভালো লাগে।” তাহলে কেমন হয়? ‘ভাইসাহেব’ বলাটা কি ঠিক হবে? কিন্তু, খুব বলতে ইচ্ছা করছে, খুউব। এর মধ্যে আমি রুম থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিলাম। কিছুটা রাশেদ ভাইয়ার ভয়ে, কিছুটা পরীক্ষার পড়ার জন্য।

এর বেশ কিছুদিন পরের কথা। সেদিন জোছনা রাত এটা জানা ছিলো। তাই সন্ধ্যার পর পরই আমি ছাদে চলে গেলাম। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম ছাদের একপাশে চেয়ারে রাশেদ ভাই বসে আছে। আর তাকে দেখেই বরাবরের মতো আমার হৃদপিণ্ড ছ্যাৎ করে উঠলো। আমি ছাদের অন্য পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। টের পেলাম আমার ভেতরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম অথচ তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। তখন মনে হচ্ছিল এরকম সুযোগ হয়তো আর কোনোদিন আসবে না। তাকে আমার কথাগুলা বলার জন্য এরচেয়ে ভালো পরিবেশ আসা কি সম্ভব? না, সম্ভব না। হঠাৎ করেই দুঃসাহস জমা হতে লাগলো একই সঙ্গে ভয় ভয়ও করতে লাগলো। আমি ছাদের অন্য পাশে সে যেখানে বসে আছে ওখানে গেলাম। তার চেয়ারের কাছে ছাদের রেলিঙ ধরে দাঁড়ালাম। পায়ের শব্দে সে একবার পেছন ফিরে তাকালেও আমাকে দেখে আবার সামনে তাকালো। উফ! এতো গম্ভীর কেউ কেনো হয়?

সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে আমি বেশ জোরে শব্দ করে বলে উঠলাম, “রাশেদ ভাইয়া! আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। ভালোবাসি খুব আপনাকে।”

রাশেদ ভাইয়া ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। আতঙ্কের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে আমি তখন প্রায় দৌড়ে ছাদ থেকে নিচে নামতে চাইলাম। বিপত্তিটা ঘটলো তখনই। ছাদে ছড়ানো ছিটানো পানির পাইপের একটায় আমি ধাক্কা খেয়ে ক্যাকটাস গাছের টবের কাছে গিয়ে পড়লাম। তেমন একটা ব্যাথা লাগে নি অথচ পড়ার সময় “ধুপ” করে একটা শব্দ হয়েছে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ বিশ্রী একটা ব্যাপার হয়ে গেলো। রাশেদ ভাইয়া উঠে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সে এসে হোহোহো করে হাসতে শুরু করলো। আমি এক হাতে আমার হাঁটুর ব্যাথা লাগা জায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, “আপনার হাসিটাও অনেক সুন্দর।”

এই কথার মধ্যে রসিকতার কী আছে জানি না অথচ এই কথা শুনে তার হাসির শব্দ আরো জোরালো হলো। আমি তখনও ছাদে ওভাবে বসে আছি।

হাসি থামিয়ে সে বললো, “গাধা ছেলে কোথাকার। উঠে দাঁড়াও বলছি।”

আমি উঠে দাঁড়ালাম। সে বললো, “শোনো আমি প্রথম থেকেই জানতাম তোমার মধ্যে কোনো গণ্ডগোল আছে। আজকে তার প্রমাণও পেলাম।”

আমি আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলাম, “কী প্রমাণ পেলেন?”

সে বললো, “প্রমাণ পেলাম যে তোমার মাথার একটা তার কাটা আছে।”

বলেই আবার অট্টহাসি। আমিও একটু হাসতে চেষ্টা করলাম। হাসি হাসি থামলে সে বলল, “শোনো তোমার মধ্যে যে একটা গণ্ডগোল আছে সেটা আমি তোমার তাকানোর ধরণ দেখেই টের পেয়েছিলাম। আমার তো নিজেরই লজ্জা করতো তোমার তাকানো দেখে। সেদিন আবার প্যান্টের পকেটে চিঠি লিখে দিয়েছো।”

আমি তখন মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, আপনার আমাকে কেমন লাগে?”

সে বললো, “তোমাকে বেকুব টাইপ লাগে।” এবং আবার হাসি।

আমি তখন রাগে গজগজ করতে করতে ছাদ থেক নেমে যেতে লাগলে সে বললো, “আরে আরে, যাও কই? আমার কথাগুলা তো শোনো!”

আমি থেমে পেছন দিকে তাকিয়ে বললাম, “হ্যাঁ, বলুন শুনছি।”

সে বলল, “আসো জোছনা দেখি।”

আমি বললাম, “জোছনা টোছনা দেখতে আমার বিরক্ত লাগে। যা বলবেন তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন।”

সে বললো, “আরে এতো রাগ করছো কেনো। আসো, আজকে আমরা দুইজন হাত ধরে জোছনা দেখবো। এই যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। হাতটা ধরো।”

আমি হাত ধরলাম। দুজনেই ছাদের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। একসময় ও আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো, “ভালোবাসি তোমাকে।”

আকাশ ভেঙে জোছনা নেমেছে। তারাগুলোও আজকে অনেক উজ্জ্বল। সেই অপূর্ব জোছনায় আমরা দুজন অবাক হয়ে চারদিক দেখছি। অদ্ভুত উপায়ে চাঁদের আলো গলে গলে পড়ছে এই ইট-পাথরের শহরে।

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.