আমি তোমারও বিরহে রইবো বিলীন

মৃন্ময় রায়

পর্ব-১

উইন্ড চাইমের টুংটাং আওয়াজে ঘোর কাটিয়ে উঠতেই দেখি, ঘড়িতে ঠিক বিকেল পাঁচটা বাজে । অনেকদিন পর আজকের দিনটা ছিল আমার ইচ্ছেমত আলসেমি খোঁজার দিন । তাই এক মগ আগুন গরম কফি নিয়ে বারান্দায় বসেছিলাম সময় কাটানোর জন্য ।আমার বাসার এই ছোট্ট বারান্দাটির কখনো মন খারাপ হয় না । বলতে পারিনা, একটা বারান্দার কি কখনো নিজস্ব অনুভূতি থাকতে পারে ? বোধ হয় , পারে । নাহলে এক মগ কফি নিয়ে এই বারান্দায় বসলে আমার নিজের সাথে এত বোঝাপড়া কেমন করে হয়ে যায় ?

কফিতে শেষ চুমুক দেবার আগেই কল রিঙ্গের আওয়াজ পেয়ে উঠে দাঁড়াই আমি। টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি প্রান্তী – ম্যাসেঞ্জারে ভিডিও কল দিয়েছে । কল রিসিভ করতেই সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

“ কি হৃদয় ? খুব ভাল্লাগছে এখন তোমার, তাইনা ?”

প্রান্তীর চোখ পাকানো এক্সপ্রেশান দেখে ফিক করে হেসে ফেলতেই সে রীতিমত চিৎকার করে আমাকে বলল,

“বেয়াদব ছেলেমানুষ ! হাসবানা একদম !”

আমি হাসি থামানোর প্রানপন চেষ্টা করে মুখে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বললাম ,

“ ওককে ! এই থামলাম আমি । আর হাসবোনা । খেপে আছো কেন বল তো ?”

“ হৃদয়, তোমাকে বলেছিলাম আমি – এইসব ছাড় তুমি !”

আমি কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে নাক টেনে বললাম ,

“ কি ছাড়বো বলতো ?”

“ চুপ করো ! তোমাকে বললাম ‘অহন’ ছেলেটার সাথে ডেইট কর – সেলফি আপ দেও । ওই পাজির পা ঝাড়া লোকটাকে দেখাও , তাকে ছাড়া তুমি বিন্দাস আছো !”

“ আসল কথা, তুমি চাচ্ছো সুজনকে আমি জেলাস বানাই, তাইতো ? বুঝেছি ।”

প্রান্তী হাল ছেঁড়ে দিয়ে বলল, “ তুমি কি চাও বলতো ?”

আমি এক মুহুর্ত চুপ থেকে বিশাল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম ,

“ আরো কিছু বছর এই পৃথিবীর কার্বন ডাই অক্সাইড বাড়িয়ে ধাম করে মরে যেতে চাই ।”

“ তুমি মরো না – এক্ষুনি মরো। নাইলে ব্লক দিব আমি তোমাকে , কেমন ?”

আমি অট্টহাসি দেবার আগেই প্রান্তী কল কেটে দিয়ে অফলাইন হয়ে গেল । মেয়েটা রেগে আছে ভীষন । রাগ করার অবশ্য একটা কারন আছে – অহন নামে এক ছেলে আমাকে অনেকদিন ধরেই পটানোর চেষ্টা করছিল । বহুবার সহ্য করার পর সেই ভদ্রলোককে আজকে আমি সিরিয়াসলি রিজেক্ট করে দিয়েছি । অথচ কোন এক অদ্ভুত কারণে প্রান্তী একে একদম এ প্লাস মার্কস দিয়েছিল । তাই আমার এই কাজে সে খেপে আগুন হয়ে আছে । অবশ্য এটা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই । আমার কাজকর্মে রাগ করাটা তার জন্য আলুভর্তা- ডিমভাজির মতই নরম্যাল হয়ে গেছে । আর আমি তো জানি , সে কেন আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করে !

কফিমগটা নামিয়ে রেখে আমি আমার কোলের ওপর রাখা মোবাই ফোনের ব্যাক কভার টা ছুঁয়ে দিলাম।এই ব্যাক কভারটার পেছনে পুরনো হয়ে যাওয়া একটা শুকনো ফুলের মালা আর একটা কুড়ি টাকার নোট রয়েছে ।ফুলগুলো শুকিয়ে একদম চ্যাপ্টা হয়ে গেছে ।অথচ এখনো একে দেখলে আমার পুরো পৃথিবীটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায় !

আমি ছেলেটা আগে থেকেই ভীষণ বোকা ছিলাম । তাই খুব বোকার মতই একটা সময় আমি ভাবতাম , যদি কখনো কাউকে ভালবাসি তো চুপ করে থাকব না ! একদম ছেলেটার কলার চেপে ধরে বলব , ভালবাসতেই হবে আমাকে । খুব বোকাবোকা ভাবনা, তাইনা?অথচ বাস্তবতা কি অদ্ভুত ! আর এই অদ্ভুত বাস্তবতা সত্যিই আমাকে যখন ভালবাসতে শেখাল , আমি বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করলাম – আমার সামনে একটা পথই খোলা । আর সেই পথটা ধরে আমাকে নাকি চুপচাপ সরে যেতে হবে ! যে ছেলেটাকে ছাড়া আমার দম নিতেও কষ্ট হয় , এই একটা জীবন আমাকে নাকি তাকে ছাড়াই বাঁচতে হবে !

খুব ছেলেমানুষি জেদে আমি তাকে আঁকড়ে ধরতে গেলাম । কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম , সেই চোখে আমার জন্য কোন জায়গা নেই । তার নিঃশ্বাস আমার নামটা উচ্চারন করতে পারেনা । আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যেতে লাগল , কিছু বুঝে উঠবার আগেই আমি ডুবে যেতে থাকলাম এক অচেনা চোরাবালিতে !

কয়েকদিন পর এই আমিই আর তার কলার চেপে আমাকে ভালবাসতে বাধ্য করবার কথা ভাবতে পারলাম না । সেই অধিকারটুকু যে আমার নেই । আমাকে সে চায় না , ভালবাসেনা কিংবা তার জীবনে আমার অস্তিত্ব খুবই নগন্য – এরকম অনেকগুলো বুলেট এসে আমার হৃদয়ের মাঝখানে আঘাত করতে লাগল দিনের পর দিন । তাকে ছাড়া ভাল থাকবার কোন সুযোগ আমার নেই , তবুও আমি প্রতিদিন তাকে ছেড়ে যাবার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম । ভাবলাম , আমি চলে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি তো একাই ছিলাম , আরো একটু বেশি একা হয়ে গেলে আর কি ক্ষতি হবে আমার ?

একটা জিনিস আমি খুব ভালভাবে বুঝে গিয়েছিলাম – আমি যতদিন তার কাছাকাছি থাকব, ইচ্ছেয় অনিচ্ছেয় তাকে বিরক্ত করব । হ্যা , বিরক্ত ! আমি নিজেকে থামাতে পারতাম না কিছুতেই । তাই দূরে সরে যাওয়াটাই আমার একমাত্র অপশান ছিল । ঠিক করলাম, নিজের এই ভাগ্যকে মেনে নেব । দূরে চলে যাব – যত দূরে চলে গেলে এই একটা জীবনে সে আমার অস্তিত্ব আর খুঁজে পাবেনা কোনদিন !

আমার আগের জীবনটায় যদি ফিরে যেতে পারতাম , কতইনা ভাল হত ! যে জীবনে সে ছিল না । কেন যেন মানুষ শুধু বদলেই যায় । মানুষের ভাল লাগাগুলো বদলে যায় । দুজনের মাঝে একজন মুভ অন করতে পারে , আর অন্যজন চুপচাপ হয়ে যায় – মৃত মানুষের মত।আমার ক্ষমতা থাকলে আমি ওকে চলে যেতে দিতাম না।দুই হাতে ওর শার্টের হাতা খামচে নিয়ে বলতাম , “ সুজন , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে আমার অনেক ভয় করে ! সুজন ! সুজন !”

কিন্তু আমি পারিনি, আমার শেষরক্ষা হয়নি । সুজন অন্য একজনকে ভালোবাসতো । তার ভালোবাসার ছেলেটার নাম কি অথবা সে দেখতে কেমন – এসব কোন কিছু জানতে চাইবার সাহসই আমি পাইনি কোনদিন । নিজের জীবনটাকে যদি কোন ড্রামা হিসেবে আমি দেখতে পেতাম , তাহলে চোখ বন্ধ করে আমাকে বলা হত সেকেন্ড লিড । সেকেন্ড লিডদের আমার কখনোই ভাল লাগত না – নায়ক নায়িকার মাঝে শুধু কাবাব মে হাড্ডিগিরি ! অথচ আমার নিজের জীবনে আমি নিজেই কিনা হয়ে গেলাম সেকেন্ড লিড । যে হাজার চেষ্টা করলেও তার ভালবাসাকে ছুঁয়ে দিতে পারবেনা কোনদিন !

সুজন যেদিন আমাকে ফেসবুক থেকে ব্লক দিয়েছিল , সেদিন ছিল আলো ঝলমলে এক সুন্দর সকাল। এক হাতে কষ্টে পুড়ে যাওয়া বুকটা চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে আমি মোবাইল ফোনটা ধরে ব্রাউজারে কালো হয়ে যাওয়া ওর নামটা দেখছিলাম। সেদিনের সেই সকালে এই ব্লকটা আমার কাছে আমার ভালবাসার ছাড়পত্র এনে দিয়েছিল । যে ছেলেটা আমাকে কোনদিন একটা মুহুর্তের জন্যেও ভালবাসতে পারেনি , সেদিন আমি তার কাছ থেকে এক জীবন একাকীত্ব কিনে নিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম ।

একদিন রাতে ওয়ারলেস রেলগেটে দাড়িয়ে নিজের সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে বলেছিলাম ,

“ আচ্ছা সুজন, আমাকে কি তোমার কখনো ভাল লেগেছিল ? এই ধর , খুব অল্প সময়ের জন্য ?”

সে শুধু একটু হাসবার ভান করে বলেছিল , “আপনাকে তো আমার সবসময়ই ভাল লাগে, আপনাকে আমার কেন খারাপ লাগবে ? কিন্তু কিন্তু যেই সেন্সে ভাল লাগবার কথা বলছেন , – আমি আসলে সেই সেন্সে… আমি আসলে…”

সুজনের অবস্থা দেখে অতি দুঃখেও আমার হাসি চলে এসেছিল । এই ছেলেটা আমাকে কোনদিন ভালবাসতে পারেনি – এটা কি তার অপরাধের মাঝে পড়ে ?

আমি তবু দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিলাম, “ তুমি সত্যি অন্য কারো হয়ে গিয়েছো, তাইনা ? সত্যি আমার এখন গিভ আপ করা উচিত, তাইনা ?”

“ ধুর বোকা – রাজপুত্র আসবে আপনার জন্য !”

আমি ওর চোখের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিলাম,

“ সুজন, রাজপুত্র আসবার আগেই তুমি এসেছিলে কেন ?”

সুজন উত্তর দিতে পারেনি । আমি অপেক্ষা করেছিলাম কয়েক মুহুর্ত – তারপর তাকে পাথরের মত বসিয়ে রেখে আমি সেদিন চলে এসেছিলাম ।

সেদিনের সেই রাতে আমার ছেলেমানুষী হৃদয়টা ভীষণ বোকার মত মরে গিয়েছিল । মরে যাবার আগে আমাকে ডেকে বলেছিল , “হৃদয় ! এভাবে কাউকে চাইতে নেই । এভাবে কাউকে চাইতে হয়না । এতটা বোকামি কখনো করতে হয়না, হৃদয় !” তারপর দিনে দিনে কেটে গেল অনেকখানি সময় – আমি নিজেকে নিয়ে বাঁচবার জন্য বেঁচে রইলাম । শুধু আমার অস্তিত্ব থেকে সুজনকে আমি মুছে দিতে পারলাম না ।

সিদ্ধেশ্বরীতে আমার দোতলার ছোট্ট রুম থেকে মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভারের একটা সাইড চোখে পড়ে সবসময় । কোন কোনদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে আমি আমার স্বচ্ছ জানালা দিয়ে সেই দিকে তাকিয়ে থাকি । আমার জানালার সামনে জমাট বাঁধা অন্ধকার । আমিতো সুজনের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি – তবু এতগুলো দিন পরেও তার নামটা উচ্চারন করলেই আমার চোখ ফেটে কান্না আসে কেন ? খুব জানতে ইচ্ছে করে – এই দুর্ভাগা ভালবাসার গল্পে সবটুকু কাঁদবার জন্য আমি একাই পড়ে আছি কেন ?

সুজন , আমার মুক্তি নেই কেন ?

-“ আচ্ছা হৃদয় ভাইয়া , আপনার কি আড়িয়াল বিলে বেড়াতে যাবার অনেক শখ ?”

-“অনেক কিনা বলতে পারিনা , তবে একটু একটু শখ আছে ।”

-“মিথ্যে ! অনেক শখ না হলে কেউ আড়িয়াল বিলের কাছে লাভস্টোরি বলতে চায় নাকি ?”

আমি ধরা খেয়ে হেসে ফেলেছিলাম । সুজন পকেট থেকে আঙ্গুল সরিয়ে আমার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলেছিল ,

“ আপনাকে আমি একদিন আড়িয়াল বিলে নিয়ে যাবো । আমিও শুনতে চাই আপনার গল্প ।”

ঠিক সেদিন থেকে আমি সুজনের নামে মনে মনে জ্বালিয়েছিলাম একশ একটি ফানুশ । সে হয়ত একজন বন্ধু হিসেবেই আমার সাথে কথা বলত – কিন্তু আমি আর তাকে বন্ধুর চোখে দেখতে পারলাম না । তারপর একদিন ঘুম ভেঙ্গে জানতে পারলাম , সুজন যাকে পছন্দ করে – সে অন্য কেউ । জানতে পারলাম সুজন যাকে ভালবাসে , আমি হাজারবার মরে গেলেও কখনো সেই মানুষটি হতে পারব না !

সুজন আমাকে ব্লক করে দেবার পর , আমার আর আড়িয়াল বিলে যাওয়া হয়ে ওঠেনি – আর সুজনকেও ডাকা হয়নি কোনদিন ।কিন্তু প্রতিবার অবচেতন মনে আমি একই গল্প বলি – একই শ্রাবনে প্রতিবার ভিজি । তবু আমি আমার এই গল্পটাকে বদলে দিতে পারিনি কিছুতেই ।

শুধু এজীবনে আমার একটাই মাত্র শখ, খুব ঝলমলে একটা সকালে , আড়িয়াল বিলের টলটলে জলের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি মরে যাব ।

পর্ব-২

আমি প্রচন্ড অসহায়ের মত চোখ বন্ধ করে আমার কফিতে চুমুক দিলাম । প্রিয় সুজন, অনেক দিন পেরিয়ে গিয়েছে, সেই খবর নিয়েছ ? অনেক দিন আগের দুঃখ দুঃখ সকালে এই ছেলেটা যখন তোমার জীবন থেকে নিজেকে মুছে ফেলবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল , তুমি তখন কোথায় ছিলে সুজন ? একটা বারও কেন আটকাও নি তাকে ? আমি তো সেদিন বেশি কিছু চাইনি – শুধু তোমার সাদাসিদে মেরুন গেঞ্জির হাতাটা শক্ত করে ধরে রাখতে চেয়েছিলাম । তুমি সেদিন কোথায় ছিলে ?

আমি এক হাতে কফিমগটা ধরে রেখে অন্য হাতের আঙ্গুলগুলো দিয়ে জানলার গ্রীলটাকে আঁকড়ে ধরি । সুজন , তোমার কি মনে পড়ে ,সন্ধ্যা রাতে কলাভবনের সামনের বটতলায় তুমি আমার কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে গান শুনাতে ? হাসিতে আর গল্পে অনেকটা সময় পার হয়ে যেত – ঠিক ওই সময়টায় তুমি চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে । অনেকগুলো আবছা তারার আলো আমাকে তখন অন্ধ করে দিত । হ্যাঁ অন্ধ ই – তা না হলে আমি হয়ত বুঝে যেতাম , আমার চোখে তাকিয়ে তুমি আমাকে খুঁজতে না , তুমি ভুলতে চাইতে অন্য কাউকে ।

সুজনের সাথে থাকতে আমার ভাল লাগত । আর সেই ভাল লাগাটা একসময় এতটাই নির্লজ্জ হয়ে গেল যে, আমি তাকে সারাজীবন আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইলাম । কিছু টের পাবার আগেই আমি বুঝে গেলাম , আমার বোকা মনটা তাকে ঠিক বোকার মতই ভালবাসে ।

দিনরাত আমি তাকে হারিয়ে ফেলার ভয় পেতে লাগলাম ।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাভ হয়নি – সেই ভিতু আমি তাকে হারিয়েই ফেললাম । আমি তো বাহিরের সৌন্দর্যে সুন্দর নই – মনের সৌন্দর্যও ছিল না আমার । খুব খিটমিটে মেজাজের আমি কারণে অকারণেই তার ওপর আমার বিচ্ছিরি রকম রাগ ঝাড়তাম । সে চুপচাপ শুনে যেত । আমি যখন ভাবতাম , আমার সাথে সে আর কথা বলবে না – আমাকে ভুল প্রমান করে দিয়ে সে ফিরে আসত – প্রতিবার ।

সবাই বলতো – ভালবাসা নাকি কখনো পাপ হয়না , অথচ আমি জানতাম – সুজনের জন্য আমার এই অনুভূতিগুলো পাপ । আমি জানতাম , তার জীবনসঙ্গী ছিল , একটি ছেলের সাথে তার সম্পর্ক ছিল অনেক দিনের । তবুও আমি নিজেকে থামাতে পারিনি । আমার সাথে পরিচয়ের দুইদিন পরে ওর বয়ফ্রেন্ড ওর সাথে ব্রেকআপ করেছিলো – কিন্তু আমার জন্য এটা শুধুই একটা এক্সকিউজ । আমি জানি , এই পৃথিবীতে ওর সাথে আমার যে অবস্থাতেই দেখা হত না কেন, আমি ওকে ভালবাসতাম । এটা আমার নিয়তি । এটা আমার হাস্যকর নিয়তি।

ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আমি আমি বারান্দায় চেয়ারটার গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকি । আমার হাতে জড়ানো চকোলেট ব্রাউন রঙের ঘড়িটা টিক টিক করে চলতে থাকে । সোয়েবের দেয়া এই ঘড়িটা আমার গতবছর জন্মদিনে পাওয়া একমাত্র উপহার ছিল ।

তারপর বসন্ত পেরিয়ে গেল – কতদিন আমি আর সোয়েবকে দেখিনা । আচ্ছা সোয়েব, তোমার জীবনের যে ঘড়িটাকে তুমি কোন এক লুকোনো অভিমানের জন্য চিরতরে থামিয়ে দিয়েছিলে , সেই নষ্ট ঘড়ির জীবন নিয়ে মাটির নিচে তোমার কি খুব একলা লাগে ? মাটির ওপরে থাকা আমার মত যেসব ভীতু মানুষ স্বেচ্ছায় একা হয়ে যায় – সেই একাকীত্ব থেকে তোমার একাকীত্ব কি অনেক বেশি আলাদা ? আমার ইদানিং খুব ক্লান্ত লাগে সোয়েব- হারিয়ে ফেলার পাল্লাটা আর কত ভারি হলে আমার মত পরাজিত একজন মানুষ চিৎকার করে কাঁদতে পারবে, বলতে পারো ? আমি কেন যেন কাঁদতে পারিনা, একটুও না । পরের জন্মে সৃষ্টিকর্তা চাইলে এই জীবনের অনেক পাপই ক্ষমা করে দিতে পারেন – অথচ এই জন্মে ভালবাসা নামক পাপের শাস্তি কিনা এই জন্মেই মিটিয়ে যেতে হয় । এর থেকে পালিয়ে বাঁচা যায়না কিছুতেই – কেন যায়না , কে জানে ?

তারপর একদিন আমি জানতে পারলাম , সুজনের বয়ফ্রেন্ড তার জীবনে আবার ফিরে আসতে চায় – সুজনকে ভুলে থাকাটা তার জন্য হয়ত অসম্ভব হয়ে যাচ্ছিল । আর ঠিক সেই মুহুর্তে আমার প্রচন্ড স্বার্থপর হয়ে যেতে ইচ্ছে করল – আমার ইচ্ছে করল সুজনকে নিজের কাছে রেখে দিতে । কিন্তু তার আগেই আমি অনুভব করলাম , সেই সময়টা আমার আর নেই । আমি তাকে হারিয়ে ফেলছি – একটু একটু করে । যে মানুষটা আমার পাঁচ মিনিটের দেরিতে অধৈর্য হয়ে যেত , সে কিনা সারাদিন আমার সাথে কথা না বলে কাটিয়ে দিতে পারে ।

জীবনে সেই প্রথমবারের মত আমার প্রচন্ড ভয় করল । তাকে ভালবাসবার আগে আমার যে হৃদয়টা তার প্রেমে পড়বার একশ একটি কারন খুঁজে দিত, সে হারিয়ে যেতে থাকবার মুহুর্তে সেই হৃদয়টা একদম বোবা হয়ে গেল । সে আমাকে কখনো চায়নি , কোন দিন ভালবাসেনি – এরকম হাজারটা চিৎকারে আমার মনের সব কয়টা জানলার কাঁচ ভেঙ্গে পড়তে লাগল প্রত্যেকে মুহুর্তে । সেই ভাঙ্গা কাচের আঘাতে আমার দুই হাত তখন প্রচন্ড রকম রক্তাক্ত – অথচ সুজনের চোখ সেদিকে এলোনা । আমি বুঝে নিলাম , যে মানুষটি আমার আকাশে উষ্ণ রোদ হয়ে এসেছিল , তাকে আমার যেতে দিতে হবে – তাকে ছাড়াই আমার এই জন্মে একটা মেঘলা জীবন কাটাতে হবে ।

খুব অবুঝের মত কান্না পেত আমার । তার সাথে সারাদিনের একটা টেক্সট যখন একসময় সারা সপ্তাহে একটা টেক্সটে পরিনত হল , তখন আমি বুঝলাম তার জীবনে আমার প্রয়োজনটা আর অবশিষ্ট নেই । তার কাছে গিয়ে শেষবারের মত জানতে চাইলাম , “তুমি আমার কাছ থেকে সরে যাচ্ছ কেন ?” সুজন উত্তর দিয়েছিল , “আমার আর ভাল লাগছেনা হৃদয় ভাইয়া।“ আমার পুরো পৃথিবী ভেঙ্গে ফেলবার জন্য ওর এই একটা কথাই যথেষ্ট ছিল ।

সুজনের হাত ছেড়ে দেয়াটা আমার জন্য কতটা কঠিন ব্যাপার – ওর হাতটা না ছাড়লে আমি হয়ত সেটা কোনদিন জানতাম না । মাঝেমাঝে মনে হত , আমি বুঝি আর পারব না । ইচ্ছে করত , ওর কাছে গিয়ে বলি – আমাকে ভালবাসতে হবেনা , তুমি শুধু আমার পাশে থাকবে ? প্লিজ ?

কিন্তু প্রতিবার আমি নিজেকে আটকে রাখলাম । আমার চলে যাওয়াতে সুজনের জীবনে যদি স্বস্তি ফিরে আসে , আমি সেটা কেমন করে নষ্ট করতে পারি ?

আমি চাইলে অনেক অভিযোগই তুলতে পারতাম । ওকে গিয়ে বলতে পারতাম , কেন এমন করলে ? চলেই যদি যাবে , আমার মধ্যে এই অনুভূতি কেন তৈরি করলে ? মুছেই যদি ফেলবে , কেন বলেছিলে আমি না থাকলে তোমার কষ্ট হবে ? আমি রেগে থাকলে তোমার ঘুম হবে না – কেন বলেছিলে ? কেন , সুজন ? সবটুকু কান্না নিজের কাছে টেনে নিয়ে এই পৃথিবীতে কেন আমাকে একা বাঁচতে হবে, বলতে পারো ?

কিন্তু পরে ভাবলাম , কি লাভ ? এসব প্রশ্নের উত্তরে আমার কি কিছু আসবে যাবে ? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাকে কি একটু উষ্ণতা দেবে ? না !

আমি ঠিক করলাম , আমার সবটুকু কষ্টের দায়ভার আমি নিজেই নিব – সবটুকু নিয়ে আমি অনেক দূরে চলে যাব – যতটা দূরে চলে গেলে সুজনের কখনো আমার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হবেনা – ঠিক ততটা ।

তারপর মুহুর্তে মুহুর্তে আমার মনের ভেতরটা ডিসেম্বর মাসের মতই উষ্ণতা হারিয়ে ফেলল । আমি অনুভব করলাম , আয়নার সামনে দাঁড়ালেও আমার প্রতিবিম্বটা কিরকম যেন কুয়াশার মত ধোঁয়াটে হয়ে যায় । মাঝে মাঝে নিজেকে অসহ্য লাগত , আবার কখনো নিজের জন্য মায়াও হত ভীষণ । তাই অদৃশ্য একটা শামুকের খোলসে নিজেকে আটকে ফেললাম আমি ।

আমারদের এখানে পরিচিত কিছু ছেলেদের নিয়ে একটা কম্যুনিটি ছিল ।একদিন সেই কম্যুনিটির আয়োজন করা গেট টুগেদার পার্টিতে উপস্থিত হলাম আমি । ২০/২২ জনের ছোট্ট একটা গ্রুপ । এই কথা ওই কথায় সবার গল্পগুলো সেই একই জায়গায় গিয়ে জমল – ভালবাসা কিংবা সম্পর্ক ।

সবার গল্পগুলোই ভীষণ সুন্দর । তাদের ভালবাসার মানুষরা তাদের চোখের আড়াল করতে পারেনা – এইরকম ব্যাপারগুলো বাস্তবতায় শুনতে ভাল লাগছিল । একদম প্রায় শেষের দিকে আমার গল্পটা জানতে চাওয়া হল । আমি একটা দম চেপে বললাম , “ এত সুন্দর গল্পগুলোর পর আমার ওয়ান সাইডেড ব্যাপারটা বলা কি ঠিক হবে ? হাসি পাচ্ছে, তবু বলি – আমি যাকে পছন্দ করতাম , তার সাথে আমার সম্পর্ক টা আসলে কি ছিল আমি জানিনা । কিন্তু সত্যটা হচ্ছে – সে আমাকে কোনদিন অন্য চোখে দেখেনি । But it’s fine ! মেনে নিয়েছি আমি । এখন এইতো – একা আছি , ভাল আছি ।“

আমার পাশের ছেলেটা দুঃখ দুঃখ গলায় বলল , “ ভুলে যাও – কিছু ছেলে শুধু টাইম পাস ই করতে চায় ।“

আমি জানিনা কেন, কিন্তু এই “ টাইম পাস” শব্দটা শুনবার পরেই আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না । আমার দুই চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল । ব্যাপারটা এমন না যে , ওই মুহুর্তে আমি সুজনের কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলাম , কিন্তু এই শব্দটা শুনবার সাথেই আমার একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আমি কোনভাবে “ এক্সকিউজ মি” বলে বেরিয়ে আসলাম ।

সুজনের সাথে পরিচয়ের আগে রিলেশানশিপ নিয়ে আমার যে একটা এলার্জি ছিল তা হল এই “ টাইম পাস” । আমি এই শব্দটিকে প্রচন্ড ঘৃণা করতাম । তাই সুজন যখন খুব নিয়ম করে আমার খোঁজ খবর নিত , আমি ওকে একদিন বললাম,

“ সুজন – টাইম পাস নামক ব্যাপারটায় আমার প্রচন্ড এলার্জি আছে , জানো ? তুমি যদি শুধু মাত্র টাইম পাসের জন্য আমার সাথে কথা বল , তাহলে আমি দুঃখিত । আমাদের বরং এখানেই থেমে যাওয়া ভাল ।“

সুজন উত্তর দিয়েছিল , “ না হৃদয় ভাইয়া – এসব টাইম পাস না । এসব টাইম পাস না ।“

বাইরে বেরিয়ে এসে আমি খুব অসহায়ের মত কাঁদতে লাগলাম । সুজন, তোমার জন্য একা একা সাফার করার এই যুদ্ধটা – তার কারন শুধুই তোমার টাইম পাস ? এই টাইম পাস , এই মিথ্যে – তোমাকে কি খুব আনন্দ দিয়েছে ? যেই শব্দটিকে আমি সবচেয়ে ঘৃণা করতাম – তুমি কেন সেই শব্দটা দিয়েই আমার পৃথিবীকে শেষ করে গেলে ?

কিছুতেই যখন চোখের পানি থামাতে পারছিলাম না আমি – ঠিক তখনই টের পেলাম , কেউ একজন আমার পাশ থেকে বলছে,

“সবার কাছে নিজেকে এত কঠিন দেখিয়ে কি লাভ বলুন তো ? আপনি নিজেও জানেন আপনি কতটা দুর্বল – তাইনা ?”

আমি তাকিয়ে দেখলাম – জিন্স আর ব্লু রঙের শার্ট পরা একটা ছেলে ভ্রূ কুঁচকে আমাকে কথাগুলো বলছে ।

“ আমি সোয়েব । আপনি বোধ হয় খেয়াল করেননি আমাকে – কিন্তু আমি আপনার কথাগুলো শুনছিলাম । I am sorry, but you sound so fake..”

আমি হেসে ফেলেছিলাম – “ আমি জানি ।“

“ না জানেন না । ওইখানে সবার সুইট কোটেড স্টোরি শুনে আমি তো ভ্যাবাচ্যাকাই খেয়ে যাচ্ছিলাম । ঘুম পাচ্ছিল । মনে হচ্ছিল , এ কেমন জীবন – একাই ধোঁকা খেয়েছি নাকি ? তারপর আপনার গল্প শুনে জেগে উঠলাম ।“

আমি চোখ মুছে বললাম ,“ আমার কিন্তু কোন রিগ্রেট নেই । আমি চেষ্টা করেছিলাম – সত্যি বলতে , বেহায়ার মতই চেষ্টা করেছিলাম । কিন্তু হয়নি আর কি !”

“ ফেইক । এসব বলবেন না আমাকে , ওকে ? চেষ্টার পরেও যখন কাউকে থামানো যায়না – তখন অপমান লাগে । কিন্তু আমি আশা করি , আপনি আমার মত অপমান হন নি । আমার কি হয়েছিল জানেন ?”

“কি ?”

“ টাইম পাস তো টাইম পাস ই । আমি যখন আমার ফিলিংস এর কথা জানিয়ে ফেললাম , সেই বেচারা টেক্সট পাঠাল , সোয়েব , আমি বুঝছিনা কি রিপ্লাই দিব । এই মুহুর্তে ক্লাব ফুটবল দেখছি – খেলা নিয়ে ভাবছি ।“

আমি ছেলের কথা বলার ধরন শুনে ফিক করে হেসে ফেললাম –

“ হাসছেন ? আমি নিজেও হাসতে হাসতে হেচকি উঠিয়ে ফেলেছিলাম জানেন ? ব্যাপার হচ্ছে , আমার সাথে যে ও থাকবেনা আমি জানতাম । তবুও সেধে সেধে অপমান হলাম । আর এই অপমানের পরেও ছেলেটাকে ভুলে যাওয়া গেল না – সেটা আরেক ব্যর্থতা । তবে কয়েক মাস পরেই ও নতুন রিলেশনে গিয়েছিলো । খোঁজ নিয়ে দেখেছিলাম , তখনো কিছু একটা ক্লাব ফুটবল চলছিল । কিন্তু ওই আর কি – ছেলেটার ইম্পরট্যান্স ক্লাব ফুটবলের চেয়ে বেশি ছিল । “

আমি তাকিয়ে দেখি , তার বোকা বোকা হাসির আড়ালে দুই চোখে ঠিক আমার মত কুয়াশা । আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের দুইজনের হৃদয়েই বিচ্ছিরি রকম ডিসেম্বর ।

সোয়েব আমার পাঁচ বছরের জুনিয়র ছিল । মুখের উপর সত্যি বলে ফেলার অসাধারন একটা গুন ছিল ওর । আর সেই সোয়েব কিনা মনের মাঝে গোপন ডিসেম্বর নিয়ে একটা সত্যি ডিসেম্বরে সত্যি সত্যি উধাও হয়ে গেল । সায়ানাইড কখনো মিথ্যে বলে না ।

আমার হাতের কফিমগটা বরফের মত ঠান্ডা হয়ে আছে । জানলা জুড়ে পরদা কাঁপানো অতিথি হাওয়া আর তার সাথে মোবাইলের গ্যালারিতে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে সুজনের একটা ফটো।ফটোতে সুজনের সাথে অবশ্য আরো একজন ছিলো তবে সেটা আমি ছিলাম না।সেটা ছিলো অন্যকেউ। আমি চোখের পানি থামানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে বললাম,

“ প্রিয় অতিথি হাওয়া – যে একটা মানুষকে ঘৃণা করতে পারলে আমার জীবনটা সহজ হয়ে যেত , তাকে ঘৃণা করাটা আমার জন্য এতখানি কঠিন কেন ?”

কেউ উত্তর দিল না । আমি হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিলাম – তারপর গ্যালারি থেকে ছবিটা ডিলিট করে দিলাম।

নিজেকেও ডিলিট করে দিলাম সুজনের জীবন থেকে।

পর্ব-৩

আমি সুজন,হৃদয় ভাইয়ের সেই সুজন। হৃদয় ভাইকে যেদিন আমি ফেসবুক, ফোন নাম্বার সবকিছু থেকে ব্লক করে দিয়েছিলাম তারপর থেকে হৃদয় ভাই নিজেই নিরবে আমার জীবন থেকে সরে যায়। আর কোনদিন কোনরকম যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। তারপর একদিন আমার প্রেমিকও আমাকে ছেড়ে চলে যায়। তখন আমি ধীরে ধীরে হৃদয় ভাইকে অনুভব করতে শুরু করি।তার ভালোবাসাকে অনুধাবন করতে পারি। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ছুটে যাই হৃদয় ভাইয়ের কাছে। কিন্তু ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।হৃদয় ভাই তার ঠিকানা পাল্টে ফেলেছে। তারপর থেকে আমি দুইটা বছর পাগলের মতো হৃদয় ভাইকে খুঁজেছি। আর অবশেষে একদিন পেয়ে গেলাম।

– চলে গিয়েছিলে কেন ?

– যদি না যেতাম ? তাহলে ?

আমি কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে হৃদয় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম – এক মিনিট , দুই মিনিট – কি জানি, হয়তবা সহস্র বছর ! ছেলেটার দৃষ্টি ভরা তাচ্ছিল্য – সেই অদ্ভুত চোখ দুটো থেকে আবার কিনা টপটপ করে পানি পড়ছে । আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম , কথা বলবার সময় ওর গলা এতটুকুও কাঁপছে না ।

-সুজন , “চলে যেওনা “ নামক আকুতিগুলো কখনো কাজে আসেনা কেন বলতে পারো ?

আমি তবু উত্তর দিতে পারিনা । আমার উত্তরের কোন দরকার কি হৃদয় ভাইয়ের আছে ?

হৃদয় ভাই ওর ধূসর রঙের ল্যাপটপ ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে চোখ নামিয়ে বলল,

“ আমি দুঃখিত, সুজন । ভুল করে আবার তোমার সামনে চলে আসতে হল বলে । আমি ভাল আছি , তুমিও ভাল থেকো ।“

ত্রিশ সেকেন্ড পার না হতেই দেয়ালের ওপাশটায় আড়াল হয়ে গেল হৃদয় ভাই । আমি জানি , ও ওখানেই আছে । ঠিক যেমন এতোগুলো দিন ধরে মাঝে একটা দেয়াল নিয়ে আমরা দুজন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলাম – ঠিক সেভাবে ।

মাঝ দিয়ে ছেলেটা শুধু একটা মিথ্যে বলে গেল – আমি জানি, ও ভাল নেই । আমাকে ছেড়ে ভাল থাকার কোন উপায় ওর জানবার কথা না ।

কিন্তু দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবার মনবল আমি এতদিনে হারিয়ে ফেলেছি । যে হাতটা আমার হাতে থাকবার ছিল , সেই হাতটা হৃদয় ভাই যদি আমাকে আর নাও দেয় , আমি শুধু তার পাশে গিয়ে বাঁচতে চাই । এটুকু না পেলে আমার যে কিছুতেই চলবে না । আমি ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম ।

“জানেন ভাইয়া, ইদানিং কেন যেন আপনাকে আমার আঙ্গুলের ওপর পেপার কাটের মত মনে হয় । খুব সুক্ষ অথচ ভীষন তীব্র । যে আঘাতটিকে চাইলেই ইগ্নোর করা যায় অথচ আমি কিনা তাকে ভীষণ যত্নে ব্যান্ডেজ দিয়ে আড়াল করে রাখি । আমার দুই হাতের সবগুলো আঙ্গুলে অজস্র পেপার কাটের দাগ – আমি সেই চিহ্নগুলোকে আগলে নিয়ে বেঁচে থাকি। আমার আপনাকে আর ভুলে যাওয়া হলো না, ভাইয়া। সেই চেষ্টা আমি বাদ দিয়েছি ।“

আমার কথা শেষ হতেই হৃদয় ভাই অপ্রকৃতস্থের মত হাসতে থাকে ,

“বাহ – পেপার কাট , ব্যান্ডেজ !”

আমি ওর হাসি থামার অপেক্ষা না করেই বললাম ,

“ আর আপনি ?”

“ কি আমি ?”

“ কিচ্ছু না ?“

হৃদয় ভাইয়া ঠোঁট বাকিয়ে বলল,

“না সুজন, আমার ব্যান্ডেজের দরকার পড়েনি কখনো ।“

“সত্যি না ?”

“মিথ্যে হবে কেন ? ব্যান্ডেজে ঢেকে দেয়া যাবে – আমার আঘাতটা এত সামান্য ছিল না কোনদিন ।“

তারপর আমি কিছু বলবার আগেই হৃদয় ভাই পা বাড়াল । পেছন ফিরে বলল,

“ আমি তোমাকে ভুলতে পারিনা – ব্যাপারটা ঠিক সেরকম না সুজন । আমি তোমাকে ভুলতে চাইনা , একটুও না !”

আমি হৃদয় ভাইকে সেদিনের মত যেতে দিলাম । ক্যাম্পাসে এভাবে হঠাত ওর সামনে চলে আসাটা ওর জন্য বোধ হয় বেশি অতর্কিত হয়ে গিয়েছিল । কিন্তু সেদিন রাতে ও আমাকে টেক্সট দিল – দেখা করবে ।

“সুজন , তোমার তো সমুদ্র ভাল লাগত – আর আমি পাহাড় ছুঁতে চাইতাম একটু অবসর পেলেই । তোমার ভাল লাগত এলোমেলো বাতাসে চুল উড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোন ছেলেকে – অথচ আমি ছিলাম সেই কৈশোরে আটকে থাকা ভাবলেশহীন বালক , যার ছোট্ট চুলে একটা গাছের পাতাও আটকাতোনা । প্রিয় সুজন , তুমি তো পছন্দ করতে নির্জন সুরের গান – সেই তোমাকে নিয়ে আমি কেমন করে হাই ভোল্টের রোম্যান্টিক গান গাইবার সাহস করেছিলাম , বলতে পারো ? “

হৃদয় ভাই এক মুহুর্তের জন্য থেমে গেল । তারপর ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ঠিক আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ সুজন – তুমি তো কোনদিনই আমার ছিলে না । তাহলে এই আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলবার ভয়ে রাত দিন কেন আতংকে থাকতাম , বলো না ?”

আমি অস্ফুট গলায় বিড়বিড় করে বললাম ,

“ ভাইয়া , আমি দুঃখিত । আমি ভীষণ দুঃখিত । আমাকে কি ক্ষমা করা যায় ?”

হৃদয় ভাই ভয়ংকর রকম অনুভূতিহীন চোখে হাসতে হাসতে বলল,

“ দুঃখিত হবার নাম কখনো ভালবাসা হয়না, সুজন । যে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তুমি তোমার প্রিয় মানুষটিকে মেঘ দেখাতে চাইছো – সেই একই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমি তোমার জন্য কাঁদতে চাইনা । আমি কাঁদলে তুমি ভাল থাকতে পারবেনা – বিশ্বাস করো , একটুও পারবেনা । “

আমি কেন যেন একটুও নড়তে পারছিলাম না । তবুও কোনভাবে ওকে বলবার চেষ্টা করলাম এতদিনে ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলো । তারপর অনুরোধের গলায় বললাম ,

“ ভাইয়া – ফিরে আসতে দেবেন?”

হৃদয় ভাই অনেক দূরে তাকিয়ে থাকল । তারপর পুরনো দিনের মত আবৃতির কন্ঠে বলল,

“ঝড় বলেছে – হারিয়ে যাব , রাত বলেছে – থাক

পিছু ডেকে লাভ কি আছে ? কেউ শোনেনি ডাক ।

বাসতে ভাল না জানা এক মেঘ চিনেছে বাতাস

গদ্যছন্দে হারিয়ে গেছে গাংচিলের ওই আকাশ ।

মেঘকে শুধুই বলছি বিদায় – শ্রাবণ হাহাকার

আর যদি না ফিরে আসি , কষ্ট হবে তার ?”

আমি বুঝতে পারলাম , হৃদয় ভাই আর ফিরবেনা ।

ছেলেটা খুব বেশিক্ষন অপেক্ষা করলনা । চলে যাবার ঠিক আগ মুহুর্তে পেছন ফিরে বলল,

“ তুমি এত বিচ্ছিরি রকমের বোকা ছিলে কেন সুজন ? আমাকে চিনলে না !”

পরিশিষ্টঃ

“ প্রিয় সুজন,

একজন মানুষ কতটা অসহায় হলে তার সবচেয়ে ভালবাসার মানুষটিকে ছাড়া বাঁচতে শেখে , বলতে পারো ? কতটা নিরুপায় হলে কোন রকম অভিযোগ না তুলে হারিয়ে যায় , কখনো জানতে চেয়েছ ? যদি আগে জানতে না চেয়ে থাকো , তাহলে আর কখনো জানতে চেয়োনা ।

খুব রহস্যজনকভাবে কোনদিন কেউ যদি আমার সব ইচ্ছে পুরন করে দিতে চায় – আমি সেদিনও তোমাকে আর চাইব না । কেন জানো ? কারন আমি জানি… আমি জানি , তুমি আবার আমাকে ছেড়ে চলে যাবে । তাই তুমি যতই আমাকে ফিরে চাও না কেন, আমি আর আমাকে দিতে পারব না । আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো ।

গত হওয়া দিনগুলোতে যে একটু একটু করে মরে গিয়েছে , সে আর বেঁচে ফেরার আশা করে না ।

কোন বকুলের বাগানে । অথবা কে জানে , হয়ত দেখা হয়ে যাবে , জগন্নাথ হলের ক্যান্টিনে – এখনো ইলিশ, চিংড়ি, ঝাল মাংস আর মসুর ডাল পছন্দ করো তো ?

অথবা হয়ত দেখা হবে ।

দেখা হবে ।

-ইতি হৃদয়।“

গত আট মাস ধরে আমি প্রতিদিন এই একটা ইমেইল পড়ি । আমি এখনো বিশ্বাস করি , হৃদয় ভাইয়ের অভিমান একদিন ভেঙ্গে যাবে । তাই শীত পেরিয়ে গেলে আমি বকুলের বাগানে গিয়ে বসে থাকি । খিদে পেলেই জগন্নাথ হলের ক্যান্টিনে চলে যাই, যেখানে হৃদয় ভাইয়ের সাথে খেতাম পছন্দের খাবার গুলো।

বৃষ্টিতে হৃদয় ভাইয়ের মন ভালো হয়ে যেতো।আর তাই বৃষ্টি হলে আমি মনে মনে হৃদয় ভাইয়ের নাম ধরে ডাকি । বৃষ্টির আওয়াজ শুনি ।

হৃদয় ভাই তো বলেছে, দেখা হবে ।

দেখা হবেই ।

অন্তিম পর্ব-

রাতের শেষে আকাশে যে অমানবিক স্নিগ্ধ একটি আলো দেখতে পাওয়া যায় , তার সৌন্দর্যকে হয়ত হয়তো অন্য কিছুর সৌন্দর্যের সাথে মেলানো যায়না কিছুতেই । আমার কেন যেন মনে হয়, এই নরম আলোটি যখন আলতো করে আমার চোখদুটোকে ছুঁয়ে যায় , ঠিক তখন আমার বুকের ভেতরের সবটুকু অনুভূতিকে প্রতিফলিত করে রাঙ্গিয়ে দেয় ঐ আকাশে । তাই আমার মনখারাপের রাতগুলোর পুরোটা সময় ধরে আমি জেগে থাকি শুধুমাত্র ভোরের আকাশে আমার এই আলোচ্ছটা দেখব বলে ।

রোজকার নিয়মে সেই আলো আসে । আমিও বুভুক্ষের মত ভোরের আকাশ দেখতে থাকি অচেনা মাদকতায় – আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পাশে বসে থাকা হৃদয় নামের ছেলেটি প্রচন্ড শক্তিতে তার দুচোখ উপচে আসা পানিকে আটকে রাখবার চেষ্টা চালায় । উষার সৌন্দর্যে আকুল আমি তবুও তৃষ্ণার্তের মত শ্বাস আটকে রেখে হৃদয়কে বলি ,

“ হৃদয় , তুমি কি উষার আলো দেখতে পাও ?”

হৃদয় তার দুচোখ ভরা পানিতে অসম্ভব বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে , “না , পাইনা।”

আমি তখন আকাশের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে হৃদয়ের আটকে রাখা কান্নার রঙ দেখতে থাকি । এই অপূর্ব ছেলেটিকে কি আমি কোনদিন বোঝাতে পারব , কোন এক অদ্ভুত কারনে আমি ওর কান্নার রঙ দেখতে পাই ? হৃদয়ের কান্নার রঙ নীল – ভীষণ রকম নীল !

আজকে সারাটা রাত ধরে অহন নামের এক বিভ্রান্ত তরুন ভোরের আকাশকে সাক্ষী করে তার ভালবাসার মানুষটির বিষণ্ণতার আওয়াজ শুনে গিয়েছে অবিরাম । চাইলেই সে হয়ত তাকে তার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে এসে সেই দুঃখবিলাসকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে পারত । চাইলেই সে হয়ত প্রচন্ড চিৎকার করে তাকে বলতে পারত , “ তুমি আমাকে কেন চাও না ?” কিন্তু একটিবারের জন্যেও ছেলেটি এর কোন চেষ্টাই করেনি ।

গল্পের প্রথম পর্বে উল্লেখিত আমিই সেই অহন। শুনেছি, কিছু কান্নাকে নাকি বুকের ভেতর চেপে রাখতে নেই । হয়ত চেপে থাকা ঐ কান্নার কারণেই আমি একটিদিনের জন্যেও এই ছেলেটির ভালবাসা পাইনি । হয়ত এই কান্না না থাকলেও আমি তার মনের কাছাকাছি যেতে পারতাম না কোনদিন – কিন্তু তবুও আমি আশা ছাড়তে পারিনা । কাউকে সত্যিসত্যি ভালবেসে ফেলাটা যে পৃথিবীর সবচাইতে বড় অপরাধগুলোর মধ্যে একটি – এই কথাটা কেউ আমাকে আগে বলেনি কেন ?

দূরের আকাশ থেকে ভেসে আসা বাতাসে হৃদয়ের কোকড়া চুল যখন অল্প অল্প নড়তে থাকে , আমি তখন সময়কে আমাদের দুজনের মাঝে আটকে রাখবার অসম্ভব ইচ্ছেয় মত্ত হয়ে যাই নিজের অজান্তেই । অথচ এই ছেলেটি কিনা কখনোই আমাকে চায়নি – সে কিনা কখনোই স্বপ্ন দেখেনি, অনেকদূরের পাহাড়চূড়ায় যার হাত ধরে সে একদিন বসে থাকবে, সেই মানুষটি কখনো আমি হতে পারি । তবুও এতটা দিন ধরে আমিই শুধু একপাক্ষিকভাবে ওকে ভালবেসে গেছি । ও যতদিন যতবার আমাকে উপেক্ষা করে বলেছে , “ এভাবে ভালবেস না অহন, আমি বাসতে পারিনা” – ততবার আমি দ্বিগুণ মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছি কোনরকম সতর্কতা ছাড়াই । আর এখন শুধু মনে হয় , আমার বোধ হয় হৃদয়ের ভালবাসার আর কোন প্রয়োজন নেই – শুধুমাত্র সে যদি আমাকে তার পাশে থাকবার অনুমতিটুকু দেয়, রাত বিরেতে তার বরফের মত শীতল হাতদুটোকে উষ্ণতায় জড়িয়ে দিতে দেয় ; তাহলেই বোধ হয় আমার হাজার বছর বেঁচে থাকবার সাধ মিটবেনা কোনদিন !

হৃদয় আমাকে যতদিন যতবার আঘাত দেয়ার চেষ্টা করেছে, ঠিক ততটুকু নিয়ে মরুভুমির বিরক্ত প্রকৃতি সহজেই নামিয়ে দিতে পারত মরুঝড় । আমিতো ঝড় ভালবাসতাম না ,কিন্তু হৃদয়কে ভালবাসতে গিয়ে কখন যেন ঝড়ের আঘাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি । তবু হয়ত মাথা ভর্তি ধুলোবালি নিয়ে আমি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম ,যদি সে একবার বলত , “তুমি থাকো , অহন – তোমাকে কষ্ট দিয়েই আমি নাহয় বেঁচে থাকি ।”

হৃদয়কে এই কথাটা আমি অবশ্য বলেছিলাম – শুনে সে আস্তে করে বলেছিল , ” তুমি থেকো না ; তুমি কষ্ট না পেলেও আমার দিন চলে যেত – চলে যাবে ।”

তবুও আমি শরীর ভরা ঝড়ের চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি চুপচাপ – কেন থাকি , কেউ আমাকে এখনো সেই উত্তরটা দিয়ে যায়নি ।

হৃদয় নামের এই মায়াবী ছেলেটির সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল আজ থেকে দেড় বছর আগের একটি আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় । রাঙামাটি থেকে সেদিনই আমি প্রথমবারের মত পা রেখেছিলাম ঢাকার মাটিতে । আর সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত একটিবারের জন্যেও আমার মনে হয়নি , হৃদয়ের সাথে আমার পরিচয়টা কেবলই একটা কোইন্সিডেন্স হতে পারে । যে পাহাড় আর নদীটি খুব পরিচিত এক অতীত থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করে গিয়েছে , হৃদয়ের জন্য আমার এই ভালবাসাটা হয়ত তাদেরই উদ্দেশ্য ছিল ।

পড়ালেখার বাইড়ে অফটাইমটা আমি কাটিয়ে দিতাম ফেসবুকে । হোমেপেজে যখন কাছের বন্ধুদের নতুন জীবনে প্রবেশসংক্রান্ত ছবিগুলো দেখতে পেতাম , তখনও আমার মনে হয়নি – খুব বেশি ভালবাসতে পারব এরকম একজন মানুষকে আমি সত্যিই কখনো খুঁজে পাব । তাই একদিন একদিন করে বাঁচার সেই জীবনটায় আমি অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম একটু একটু করে । কখনো ভাবতেই পারিনি , এই ছকে বাঁধা অভ্যাসগুলো থেকে বেরিয়ে এসে অজানা কোন একজনের ওপর আমার ভাল থাকার বিষয়টা নির্ভর করতে পারে ।

ঢাকায় আমার চেয়ে বয়সে বছর তিনেক বড় এই কমিউনিটির একজন বড়ভাই থাকতেন অনেকদিন ধরে । তাই এখানে আসবার আগে তার সাথেই যোগাযোগ করি আমি । আমার আসার কথা শুনে তানজিম ভাই প্রচন্ড খুশি হয়ে জানালেন , কমলাপুর রেলস্টেশনে তিনিই আমাকে রিসিভ করবেন আর থাকা-খাওয়ার ব্যাপার নিয়ে আমি যেন কোন চিন্তা না করি ।

কিন্তু স্টেশনে নামবার পর আমি জানতে পারলাম , তানজিম ভাই ঢাকায় নেই – তার মায়ের অসুস্থতার কারনে আগের দিনই বাড়ির দিকে দৌড় দিয়েছেন । তবে নিজে না থাকলেও তিনি তার পরিচিত একজনকে অবশ্যই বলে দেবেন আমাকে কয়েকদিন হেল্প করবার জন্যে ।

আমি জানতাম , তানজিম ভাই ঠিক ম্যানেজ করতে পারবে। জানতে পারলাম , এই কমিউনিটির তার পরিচিত একজন বন্ধুকে তিনি ম্যানেজ করেছেন যে কিনা আমাকে হেল্প করতে পারবে ; তাই আমি যেন স্টেশনের কাছাকাছিই থাকি । আমি কোনমতে হা হু করে ফোন রাখলাম । সারাদিনের স্ট্রেসে আমি তখন ভয়াবহ টায়ার্ড। তানজিম ভাই সেদিন তার যে বন্ধুকে আমার হেল্পের জন্য পাঠিয়েছিলেন , তাকে কিন্তু এক দেখাতেই আমি ক্রাশ খেয়ে ফেলেছিলাম ।ওয়েটিং রুমে আমার দিকে গডগড করে হেঁটে এসে সে তো শুরুতেই বলে দিয়েছে , “ হ্যালো , ইটজ হৃদয় । আপনি অহন, রাইট ?তানজিম ভাই আমাকে আসতে বলেছেন । আমার বাসায় একটা রুম খালি আছে , আপনার প্রব্লেম হবেনা, আই হোপ ।” এইটুকু বলেই সে এমন একটা লুক দিয়েছিল, যার মানে ছিল অনেকটা এরকম – “এই মুহূর্তে এই পিনিকের স্টেশন থেকে উঠে আসলে আসেন , নাইলে থাকেন !” তাই এরকম লুকের সামনে পড়ে আমিও কোনরকম উচ্চবাচ্য না করেই ওর বাইকে গিয়ে বসেছিলাম ।

সাঁই করে বাইক ছুটিয়ে হৃদয় তার বাইক এনে থামাল।ফ্লাটের দিকে তাকিয়ে দেখি সেটা এক বিশাল ফ্লাট। বিশাল মানে – একটা ছেলের একা থাকার জন্য বেশ ভয়াবহ রকমের বড় । আমি ভয়ে ভয়ে হুডির নিচ থেকে চোখ বাড়িয়ে ছেলেটার দিকে তাকালাম । কে জানে , কালেজাদু চর্চা করে না তো আবার ? নিজের মায়ায় জড়িয়ে সাথে করে নিয়ে এসেছে ভ্যানিশ করে দেবার জন্যে – হতেও তো পারে !

কিন্তু জাদুর ধার না টেনেই ছেলেটা আমার হাতে রুমের চাবি ধরিয়ে দেখিয়ে দিল কোনদিকে যেতে হবে । আমি বারান্দায় আমার লাগেজটা রেখে পুরো বাড়িটার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকি । জাদুকরের বাড়ি হোক আর যাই হোক , লোকেশানটা ছিল ভীষণ চমৎকার , বারান্দার আলোয় দাঁড়িয়ে যতটুকু বুঝলাম – মিনিট দশেক হাঁটলেই রমনা পার্কে পৌছে যাওয়া যাবে । অবশ্য এই ভরা ডিসেম্বরের রাতে পার্কে হাটতে যাওয়াটা আমার সাথে ঠিক আসেনা । আমার মত অলস মানুষরা যে সময় কাটাতে কম্বলের উষ্ণতাকেই বেছে নেবে, এতে আর অবাক হবার কি আছে ?

সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে যেভাবে লম্বা একটা ঘুম দেবার প্ল্যান করেছিলাম আমি , তার সবটাই ভেস্তে দিয়ে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল পরদিন খুব ভোরে । তাই অভারঅলটা গায়ে জড়িয়েই বেড়িয়ে পড়লাম আশপাশটা দেখার জন্য । সেই ভয়াবহ রকমের বিশাল ফ্লাটের একমাত্র বাসিন্দা যে হৃদয় নিজেই , সেটা তখনই আন্দাজ করতে পারলাম ।

হৃদয়ের সাথে আমার পরিচয়টা এরকম অনাকাংখিতভাবে হয়ে যাওয়ার কারনে আমি মনেমনে মাটি থেকে কয়েক হাত উপরে হাওয়ায় ভাসছিলাম । কিন্তু তার দুদিন পরেই আমি বুঝতে পারি , আমি যেমনটা ভাবছি – বাস্তবতা আসলে ঠিক তেমনটা না । হৃদয় ছেলেটি ভীষণ রকম চুপচাপ একটা ছেলে । আমি নিজে খুব কথা বলতে পছন্দ করি বলে চিরকাল ভেবে এসেছিলাম আমার পাশের ছেলেটিও আমার মতই বকবক করুক । কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখলাম , হৃদয় যে আসলে শুধু কম কথা বলে তাই ই না , কোন প্রশ্নের উত্তর তার দিতে ইচ্ছে না করলে সে একটা ব্ল্যাংক লুকে তাকিয়ে থাকে । এসব দেখে ভয়ে ভয়ে তার উপর আমার ক্রাশ আমি প্রায় প্রত্যাহারই করে নিচ্ছিলাম যদি না তার সেই ব্ল্যাংক লুক আমাকে এক সমুদ্র নীরবতার প্রেমে ধাক্কা দিয়ে ফেলে না দিত ।

হৃদয় এই ঢাকা শহরে এসেছিলো ইন্টারমিডিয়েটের পর , কিন্তু আমার থেকে ক্লিয়ারকাট তিন বছরের জুনিয়র এই ছেলেটির হাবভাব দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যে সে মাত্র তিন বছর ধরে এখানে থাকে । আগা মাথা কিছু না ভেবে একদিন জানতেই চেয়েছিলাম , “ একা থাকতে খারাপ লাগে না ?” প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করবার সময় ছেলেটা তার ঘুম ভাঙ্গা চেহারায় নির্মমভাবে একটা গাজর চিবাচ্ছিল – কিন্তু আমার কথা শুনে গাজর চিবানো বন্ধ করে কিছুক্ষন সেই ব্ল্যাংক লুক দেয়া ছাড়া সে আর কিছুই বলেনি !

টিনটিনে খাপ খোলা তলোয়াড়ের মত ধারালো ছেলেটা ভার্সিটিতে পড়াশোনার বাইরে একটা টিউশন করত – তিনদিনে সে আমার একবেলার খাবার খেতে পারে কিনা সেই ব্যাপারে আমার অনেকখানি সন্দেহ থাকলেও ব্যাংকিং, গ্রোসারি , টুকটাক রান্না সবই সে কোনরকম জড়তা ছাড়াই ম্যানেজ করে ফেলত । এতদিনের ব্যাচেলর জীবনে এক রান্নাই যে আমাকে সবদিকে ফেইল মেরে দিয়েছে , তার কাছে হৃদয়কে অতিমানব লাগাটা খুবই স্বাভাবিক ।

হৃদয়ের বাসায় আমি মাস খানেকের মত ছিলাম । আমি কখনো ভাবিনি , এরকম আনন্দে উড়ে বেড়ানোর মত একটা বয়সে হৃদয়ের মত কোন ছেলে নিজের মাঝে ভীষণ গভীর কোন কষ্টকে চেপে রেখে বাঁচতে পারে । অবশ্য এরকম নিঃসঙ্গ জীবন যে সে খুব হাসিখুশিমনে গ্রহন করেছে – সেটা আমার কখনোই মনে হয়নি । তার ঘরে একদিন মেইল রেখে আসতে যাবার সময় দেখি, সে খুব শান্ত মুখে তার মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে – স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে সে কি দেখছিল বলতে পারিনা , কিন্তু তার চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরছিল । শুনতে হয়ত অদ্ভুত লাগবে , কিন্তু আমি তার ঘরের দরজার সামনে অবারিত মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম অনেক্ষন । চেপে রাখা দুঃখ যে কোনদিন কারো সৌন্দর্য হয়ে ধরা দিতে পারে , সেদিনই আমি যেন প্রথম সেটা আবিষ্কার করতে পেরেছিলাম ।

Monday at 12:55 · Sent from Messenger

Mrinmoy Roy

আমি অনেকদিন নিজের মনকে স্থির করবার জন্যেই হৃদয়ের সাথে কথা বলতে গিয়েছি । কিন্তু যতদিনই নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ না করার চেষ্টা করেছি ততদিনই সে ঠিক চোর ধরে ফেলবার মত করে বলেছে , “ দেখুন অহন, আমি যদি একদম ভুল না হয়ে থাকি , তাহলে ইদানিং আপনাকে দেখে আমি যা বুঝতে পারছি – আপনি আমার ব্যাপারে একইসাথে ভীষণরকম মুগ্ধ এবং আগ্রহী হয়ে আছেন । এই নিয়ে আমি ভুল হলেই খুশি । কিন্তু যদি আমি ভুল না হয়ে থাকি , যদি আপনার অবস্থা সত্যি এমনই হয় তাহলে অনুগ্রহ করে বলছি , আমার থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন ।”

আমি দূরে থাকতে পারিনি । নিজের অজান্তেই আমি তার পথ ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছি । খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে বাইরে আসার পর মাঝেমাঝেই আমি তাকে বেইলী রোডের রাস্তার দিকে হেঁটে যেতে দেখেছি । প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝে তাকে হাইওয়ের সামনে বাইকে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি । রেগুলার ড্রিংক করে চুপচাপ বাড়ি ফেরা বিষণ্ণতায় অসুস্থ ছেলেটাকে সাহায্য করতে চেয়েছি – কিন্তু প্রত্যেকবার সে হাত সরিয়ে নিয়েছে অবহেলায় । তবুও তাকে দূর থেকে দেখে রাখার মাঝেই আমার এক পৃথিবী আনন্দ ছিল । ছেলেটাকে সামনাসামনি দেখতে পেলে আমি বুঝতে পারতাম , তার চোখ-মুখ- আঙ্গুলে কি ভীষণ না পাওয়ার গল্পরা কথা বলে যায় । তার সেই গল্পের হাতছানিতে আমার দিশেহারা অবস্থাটা দিন দিন যেন কেমন করে বাড়তে থাকে । আমি তাকে চিনিনা – জানিনা, তার কষ্টগুলো আমার অজানা, তবুও কেন যেন আমার মনে হতে থাকে , আমি বুঝি আমার সবটুকু অনুভূতি নিয়ে সারাজীবন তার পাশে থাকবার ক্ষমতা রাখি !

আমি আবিষ্কার করলাম , ভালবাসা শব্দটা আগে আমার কাছে যেমন বানান করে লেখা তুচ্ছ একটা শব্দ ছিল – হৃদয় নিজের অজান্তেই আমাকে সেই শব্দটা অনুভব করতে শিখিয়েছে ।

খুব সাহস করে হৃদয়কে আমার এই আবিষ্কারের কথাও বলেছিলাম – কিন্তু সেদিন আর কোন শান্ত জবাব পাই নি । প্রথমবারের মত আমাকে তুমি সম্বোধন করে সে বলেছিল ,

“ সাবধান অহন , আমাকে মিথ্যে বলবে না !”

আমি ওর সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম , “ একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষকে ভালবাসবার অধিকার আমার আছে , হৃদয় । আমি তোমার কাছে আমার অনুভূতির কোন মুল্যায়ন চাইনি । ”

হৃদয় কোন উত্তর দিতে পারেনি , শুধু চোখটা সরিয়ে নিয়েছিল । আমি যখন চলে আসতে নিলাম , তখন সে ক্ষীণ গলায় আমাকে ডেকে বলল , “ যেও না , অহন । তোমার অধিকার বোধ হয় আমার দুঃখগুলোকে জানবার অধিকার রাখে ।”

হৃদয় সেদিন আমার হাত ধরে আমাকে ওর ঘরে নিয়ে গিয়েছিল । ওর টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনের দিকে আঙ্গুল দিয়ে বলেছিল ,

“ দেখ অহন – আমার ফোনের ওয়ালপেপারটা দেখ । হাসিমুখে দাড়িয়ে থাকা ঐ ছেলেটা সুজন।যাকে পাগলের মতো ভালোবাসি আমি।”

আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম, হৃদয় ভালবেসে আঘাত পাওয়া মানুষদের একজন – কিন্তু এতটা আঘাত পাওয়া , সেটা ভাবতে পারিনি । ওর ল্যাপটপের ওয়ালপেপারে দুইটা ছেলের ছবি ছিল । আমি সুজন ছেলেটাকে চিনি না , কিন্তু ভাল করে তাকিয়ে পাশের ছেলেটাকেও চিনতে পারলাম না । হয়তো ছবিটা সুজন আর তার প্রেমিকের। হৃদয়ের সেই ছবিতে জায়গা হয়নি।

“ so this is the one who belongs to your love , হুম ?”

হৃদয় হেসে ফেলেছিল , “ একটা চিহ্ন বলতে পারো । এভাবে আমার পাশে একজন থাকবে বলে কথা দিয়েছিল । আমি হয়ত যোগ্য ছিলাম না , কিন্তু ভালবাসতে তো আর যোগ্যতা লাগেনা । ও আমার থাকে নি । আমাকে দেখানো স্বপ্নগুলোর অধিকার ত্যাগ করে ও চলে গিয়েছে , অন্য একজনকে নিয়ে বাঁচতে শিখেছে । কোন সমস্যা নেই আমার । তোমার মত করেই বলি , আমি ওর কাছে আমার অনুভূতির মূল্যায়ন চাইনি !”

-“ কিন্তু সে তো তোমাকে কথা দিয়েছিল ।”

হৃদয়ের চশমার কাঁচে তখন জানলা গলে শেষ বিকেলের আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল । সে ওইদিকেই তাকিয়ে বলল ,

“ এজন্যই এই ছবিটা আমার ওয়ালে । আমি তো খুব পরাজিত একটা মানুষ – সবখান থেকে পালিয়ে বেড়াই , তাই মাঝে মাঝে একা চলার শক্তি হারিয়ে ফেলি । তখন এই ছবিটা আমাকে রিচার্জ করে । জানো , এই দুইটা বছরে আমি প্রতিদিন এই ছবিটা দেখে হাউমাউ করে কেঁদেছি । বারবার নিজেকে বলেছি , এই পৃথিবীতে সবটুকু কাঁদবার জন্য আমিই একজন না , আমি পারিনি ! ”

আমি প্রচন্ড বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি , অসহায় ছেলেটার চোখ বেয়ে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরছে – অথচ কথা বলার সময় তার একটুও গলা কাঁপছে না ।

আমি ভেবেছিলাম , হৃদয়ের মৃত হৃদয়টাতে আবার হয়ত প্রান জাগিয়ে তুলতে পারব । কিন্তু দিনে দিনে বুঝতে পারলাম , যে অস্তিত্ব স্বেচ্ছায় মরে গেছে , তাকে বাঁচানো যায়না । তবুও একদিন বললাম , “ একবার কি চেষ্টা করা যায় হৃদয় ?”

ছেলেটা নিষ্প্রাণ কন্ঠে বলেছিল, “কখনো জানতে চেয়োনা , কেন পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন মনের মানুষগুলো ভেতরে ভেতরে ভীষণরকম অসহায় হয়ে বেঁচে থাকে আজীবন । ঠিকানাহীন ট্রেনের অপরাধী যাত্রীদের কখনো ঠিকানার লোভ দেখিয়োনা । তারা কুয়াশার মাঝে নিজেকে আড়াল করে রাখতে রাখতে একদিন ঠিক মিলিয়ে যাবে ঝরাপাতার মত । চলে যাও, অহন; পারলে ভুলে যাও আমাকে – অথবা মনে রেখোনা ,আমি কখনো ছিলাম কিংবা আমি এখনো আছি ।”

আমি একরাশ ভালবাসা নিয়ে হৃদয়ের জলস্নাত চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি । আমি কি এই ছেলেটিকে কখনো বোঝাতে পারব, ঠিকানাহীন যাত্রীরা কখনো কখনো অন্যের স্থায়ী ঠিকানাকে ভুলিয়ে দেয় ? আমি আমার ঠিকানাকেই ভুলে গেছি , আমারতো আর ভুলে যাবার কিচ্ছু নেই ।

আগেই বলেছি , হৃদয় আমাকে ভালবাসুক কিংবা না বাসুক তাতে কোনরকম লাভ ক্ষতির হিসেব থেকে আমি নিজেই নিজেকে মুক্তি দিয়েছিলাম । আমি শুধু চাইতাম ওর কষ্টগুলোর ভাগ নিতে । কিন্তু যে মানুষটির জন্য হৃদয়ের বুকের ভেতরটায় এক জীবন অভিমান লুকিয়েছিল , একদিন হঠাত করেই সুজন নামের সেই ছেলেটি তার কাছে ফিরে এল । সে বোধ হয় জানত না – অতীতের হৃদয়কে ভুলতে না পারার ব্যর্থতা তাকে ফিরিয়ে এনেছিল এমন এক হৃদয়ের কাছে , যে ছেলেটি কিনা নিজের জীবন থেকে সবটুকু ভালবাসার প্রয়োজনীয়তাকে উৎসর্গ করেছিল বিনা অপরাধে । তবুও নিজের অপরাধের জন্য যতভাবে ক্ষমা চাওয়া যায় , তার সব চেষ্টাই সুজন করেছিল । কিন্তু হৃদয়ের চোখের মাঝে যে ভয়াবহ শুন্যতা আমি দেখতে পেতাম, কেন যেন তার কোন পরিবর্তন হল না । আমি আমার বুকের ভেতর চলতে থাকা ভয়ংকর অস্থিরতাকে কোনভাবে চেপে রেখে বললাম ,

Monday at 12:55 · Sent from Messenger

Mrinmoy Roy

“ হৃদয় , ফিরে যাবে না ?”

হৃদয় কোন উত্তর দেয়নি । চুপচাপ উঠে চলে গিয়েছিল ।

সেদিনের পর থেকে হৃদয়ের সাথে আমার আর কখনো দেখা হল না । আমি বুঝে নিয়েছিলাম , সে তার ভালবাসার কাছে ফিরে গিয়েছে ।

হৃদয় চলে যাবার পর আমি আবার আমার নিজের চিরাচরিত জীবনে ফিরে আসবার চেষ্টা চালালাম । কিন্তু আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম , ছেলেটিকে হারিয়ে ফেললে আমি ঠিক যতটুকু কষ্ট পাব বলে ভেবেছিলাম , আমার কষ্টটা তার তুলনায় অনেকখানি বেশি । আমি সর্বহারার মত আমার পুরনো আমাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি , সেখানে হৃদয়ের ছায়া ছাড়া আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই ।

সময় চলতে লাগল পুরনো নিয়মে । আর হৃদয় ফিরে এল ঠিক এক বছর পর এক বসন্তে । আমার বাসার বারান্দায় হেলান দিয়ে দাঁড়ানো শেষ বিকেলের ছেলেটিকে দেখে আমার এক মুহূর্তের জন্য মনে হল , আমার চারপাশের সময়টা বুঝি থেমে গিয়েছে – প্রচন্ড কষ্ট বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার একটি বছর আমার জীবনে যেন কখনই আসেনি !

আমিই প্রথমে নীরবতা ভেঙ্গে দিলাম , “ হৃদয় , তুমি কি এখনো ব্লাক কফি পছন্দ করো ?”

হৃদয় বারান্দার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে বলল , “ অহন , এতদিন পরেও তুমি একটুও বদলাও নি কেন ?”

অতঃপর হৃদয়ের পাশে বসে মন খারাপ করা একটা রাতে আমার সেই উষার আলোর জন্য অপেক্ষা করা । কোন একটা কারনে আমার মন খারাপ করতেই ভীষণ ভাল লাগছিল । আমার পছন্দের এই পাহাড়ে আমি যে কখনো হৃদয়ের সাথে বসে থাকবার সুযোগ পাব – এটা বোধ হয় আমি স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি ।

হৃদয়ের চোখ থেকে টুপ টাপ করে পানি পড়ছে । আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম ,

“ ছেলে , তুমি কি চাও ? ধুপ করে হারিয়ে গেলে – আমি ধরে নিলাম , সুখী হয়েছ । তারপর আবার ফিরে এলে – আর এখন ফিরে আসার পর কাঁদছো ? কেন হৃদয়?”

– “ অহন, আমি তো ওর কাছে ফিরে যাইনি ।”

– “ কোথায় গিয়েছিলে তাহলে ?”

– “ হারাতে চেয়েছিলাম । আবার কারো মায়ায় জড়াতে ভয় হচ্ছিল ।”

আমি এতদিনের চেপে রাখা ক্ষোভকে ভাষা দিয়ে বললাম , “ মিথ্যেবাদী ! তুমি মিথ্যেবাদী !”

-“ কেন বলছো ? আমি তোমাকে অপেক্ষায় তো রাখিনি ?”

– “ কিন্তু আমি থেকেছি ! তুমিও তো কাউকে ভালবেসেছো হৃদয়, অপেক্ষায় কেন থাকতে হয় তুমি বোঝোনা ?”

হৃদয় তার বর্ষা নামা চোখে অপলক তাকিয়ে বলল ,

“ আমি বারবার বলেছি এভাবে ভালবেসো না , আমি বাসতে পারিনা ।”

আমি হেসে ফেললাম ,

– “একটা পাখি , তিনটা পাখি আর দুইটা পাখিকে বুকের মাঝে আটকে রেখে যে ভালবাসার গল্পগুলো শুরু হয় , সেই পাখিগুলোকে আমি তো শুরুতেই উড়িয়ে দিয়েছি , হৃদয়। তারা ইচ্ছেমত উড়েছে , ইচ্ছেমত উড়তে গিয়ে তোমার চোখে পড়ার আগেই হারিয়েও গিয়েছে । কিন্তু আমি অবাক হয়ে কি আবিষ্কার করেছি জানো ? তোমার জন্য আমার অনুভুতিগুলো ঠিক পাখি ওড়ানো ভালবাসার ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়না কিছুতেই । তোমাকে ভালবাসাটা আমার জন্য একটা অভ্যাস , ঠিক যে অভ্যাসের কারনে আমরা ঘুমিয়ে থেকেও নিঃশ্বাস নেই , তুমি আমার সেই অভ্যাস । আর তাই তুমি আমার থাকো কিংবা নাই থাকো , আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসেনা – বিশ্বাস করো, একদম কিচ্ছু না !”

হৃদয় তার শীতল চোখের দৃষ্টিতে আমার হৃদয়ে তুষারপাত নামাতে নামাতে বলল , ” আমাকে ভালবাসাটা যদি তোমার জন্য নিঃশ্বাস নেয়া হয় – তবে সেই নিঃশ্বাস তুমি নিয়োনা, অহন । তুমি জানোনা , আমি কি ভীষণ রকম বিষাক্ত ! “

আমি একবার মুখ খোলার চেষ্টা করতেই চুপ হয়ে যাই, এই ছেলেটিকে আমি এখন কেমন করে বোঝাই – অহন নামের ছেলেটা আর বিষাক্ত বাতাস ছাড়া শ্বাস নিতে পারেনা !

তারপর আমাদের মাথার উপর একটু একটু করে একটা ভোর নেমে আসে । আমার পাশ ছুঁয়ে যাওয়া হৃদয়ের চুলের ঘ্রানে আমি বুঝতে পারি , এই ছেলেটি আমাকে তার কান্নাকে স্পর্শ করার অধিকারটুকু দিয়েছে ।

হয়ত এই অধিকারটুকু নিয়েই আমি বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারব ।

…………..

সমাপ্ত।

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.