আর্তনাদ

উদ্ভট জীব।

আজ প্রায় ৩ বছর পর আবার এই স্থানে।উদ্দেশ্য বড় ভাগনীর বার্থডে।স্বেচ্ছায় আসতে চাই নি।আপু আর ভাগনীগুলো এক প্রকার জোড় করেই এনেছে।।অবশ্য আমার যদি একেবারেই ইচ্ছে না করত তাহলে হয়ত আসতাম না।কাওকে খুশি করানোর জন্যও না।কেমন যানি একিটা টান অনুভব করি যায়গাটায়।

রেল লাইনের পাশে হাটছি আর সিগারেট ফুকছি।আসক্ত নয়।তবে আজ ইচ্ছে করল তাই।

আমার জীবনে সুখের মুহুর্ত খুবই কম।তারপরেও পুলিশফাড়ি রেল লাইন এমন একটা যায়গা যা আমাকে জীবনের কোন এক সময় সুখের স্বপ্ন দেখিয়েছিলো।উপহার দিয়েছে কিছু সুন্দর মুহুর্ত যা আজও হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে।কিন্তু সুখের মুহুর্ত হিসেবে নয়।করুণ এক আর্তনাদ হিসেবে।আসলে এক সময় যা সুখের মুহুর্ত থাকে পরে তা আক্ষেপ, অনুতাপ ও বেদনাময় অতীতে পরিনত হয়।।

আপুর বাসায় রেখে যাওয়া পুরনো কালো থ্রি কোয়াটার প্যান্ট আর সেই আকাশীরং এর টি- শার্ট পরেছি।আগের মত উজ্জ্বলতা নেই।কেমন একটা পুরানো ভাব-আর ন্যাপথালিনের ঘ্রান মিশ্রিত।নিজেকে আবার সেই কলেজ অধ্যয়নরত সহজ, সরল অভ্রতে পরিনত করার জন্যই এই সাজ।রাত ৮.১৫ মিনিট।মাত্রই হাত ঘড়িতে দেখে নিলাম।আমি হাটছি রেল লাইনের পাশ দিয়ে।কিছুক্ষন পর পর একটা দুটা ট্রেন যাচ্ছে।।

হাটতে হাটতে খিলগাঁও পুলিশ ফাড়ি থেকে মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত এসেছি।এবার ফিরতে হবে।।

বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি।আর ভাবছি নাহিদ কি এখনও এদিকেই থাকে?

আচ্ছা কেমন আছে ও?

আমার কথা কি ওর মনে আছে!!বা আমাদের কাটানো বিকেলগুলোর কথা!!

কি যানি!হয়ত আছে হয়তবা নেই।সে যাই হোক,আমি ভেবে কি করব।

কেমন যেন নিজেকে ছোট ছোট মনে হচ্ছে।।কেন তা যানিনা।।মনে পরছে এই রেল লাইনের কথা। ৩ বছর আগের সেই অভ্রের কথা।অতি দ্রুতগামী ট্রেন যাওয়ার শব্দ সইতে পারতাম না,,চোখ বন্ধ করে রাখতাম,রাস্তা পারাপারে ভয়,দ্রুত বাসে না উঠতে পারা,হাইট ফোবিয়া,রক্ত দেখে মাথা ঘুরানো ইত্যাদি বাজে অভ্যাসে ভরপুর অভ্র।গ্যাঞ্জাম থেজে নিজেকে অলয়েজ গুটিয়ে রাখতাম,পারি পার্শ্বিক সম্পর্কে ধারনা ছিলো খুবই কম।তবে আমি বিশাল একটা মনের অধিকারী ছিলাম সবাই বলত,আর নিজেও অনুভব করতাম।যেটা খুবই দুর্লভ।

আর কেয়ারিং!এক্সপার্ট ছিলাম।কেন যানি অন্যের সুখেই নিজের ভালো লাগা অনুভব করতাম আর প্রচুর হাসতাম।।তাই হয়ত খোদা আমার হাসিটাই তুলে নিয়েছেন।এখন আর আগের মত হাসি না. হঠাৎ ট্রেন যাওয়ার সিটি।খানিক বাদেই দ্রুত চলে যেতে থাকলো ট্রেন টি।বিকট শব্দ আর মাটির কম্পনে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল আনমনেই।হাত দুটো দিয়ে কান চেপে ধরলাম।তখন ই মনে হল কেউ যেন বলছে

“এই অভ্র,তুই এত ভীতু কেন!!হা হা”

চোখ খুলে গেল।দিগ্বিদিক খুজলাম চেনা কাওকে।অস্থির হয়ে এদিক ওদিক তাকালাম।কই? কেউ নেই তো।

তবে কি আমি আমার সেই চেনা মানুষ টিকেই খুজেছি।না তার দেখা নেই।

*রাতে ১০.৪৫।খেয়ে আমার রুমে আসলাম।এই রুম টাতেই আমি থাকতাম।এই সেই বেড।কত স্মৃতির শাক্ষি হয়ে আছে বিছানাটি। আর বালিশটা তো অশ্রু তেই সিক্ত হত।আজ কেন যানি হাসি পাচ্ছে আমার এসব ভেবে।আসলেই আমি কত বোকা ছিলাম।শুধু শুধুই এরকম পাগলামী করতাম যা কারোই সহ্য হত না। তবে হাসিটি বোধহয় উপহাসের হাসি ছিল।।নিজেকে নিয়ে উপহাস!!

কি মনে করে যেন ড্রয়ারটি খুললাম।খুলতেই এক বুক কস্ট ঘীরে ফেললো আমায়।।নিজেকে সংযত করতেই পারলাম না।পুরনো কস্ট আবার নতুন করে জেগে উঠল।হুড়মুড় করে কেদেই ফেললাম।আমি কাদছি।

খানিকটা শান্ত হলাম।চোখের জল মুছে বিছানায় বসে পরলাম।তারপর ধীরে ধিরে আবার ড্রয়ার টির দিকে গেলাম।সেখানে পরে আছে একটা রুপার ব্রেসলেট, একটা রিং,একটা স্টেইনলেস স্টিলের চেন,রুমাল,একটা কার্ড,ডায়েরী, আর ডায়েরীর পৃষ্ঠায় পিন দিয়ে লাগানো কয়েকটা সেন্টার ফ্রেশের খোসা,আর ছোট একটা কাগজের ছেড়া অংশ।সেখানে লেখা “অই অভ্র, ম্যাডামের আজাইরা প্যাচাল শুনার টাইম নাই।চল কলেজ পালাই।আমি পিছনের বেঞ্চে।তুই আয়”।

তারপর রিং টা অনামিকা আঙুলে পরে নিলাম,চেন টা গলায়,আর হাতে ব্রেসলেট পরে রুমাল দিয়ে আঙুল গুলো পেচিয়ে আয়নার সামনে চলে গেলাম।আরেহ!!

আমাকে তো একদম নাহিদের মত লাগছে।শুধু চুল গুলো ছোট ছোট।আর চোখদুটা লালচে।এই যা ব্যবধান।লাইট অফ করে রুমের দরজা লাগিয়ে দিলাম।

আজ আকাশে অনেক জোৎস্না।বারান্দায় যেয়ে বসে পরি।আজ একটু অতীতে ঘুরে আসলে কেমন হয়।আজ না হয় অতীত কেও একটু সময় দেই।চলে গেলাম কলেজের দিনগুলোতে।সেখানে যার কথা সর্ব প্রথম মনে পড়ল সে আর কেউ না।আমার নাহিদ। নাহিদ যে খুব চঞ্চল ছিল,বেপরোয়া টাইপের,যার সাথে কলেজের গাঁজাখোর থেকে শুরু করে ফার্স্ট বয়ের সাথে ছিল ভীষন সখ্যতা।মোটামুটি ফ্রেন্ডলি ।আর কলেজ ফাকিবাজ।এজন্যই ভি পি মিস ওকে নাজেহাল করে ছারতো।যদিও পড়ালেখায় তাকে মেধাবী বলা যায়। আন্দলনে,মারামারি তে ওর অংশগ্রহণ করা ছিল যেন বাধ্যতামূলক। আর আমি সারাদিন ওর সাথেই থাকতাম।কিছু বলতাম না।শুধু ওর পিছনে পিছনে হাটতাম।অবশ্য আমার বিরক্ত লাগতো মাঝে মাঝে। কিন্তু ও যেতেই দিত না।

কোন এক কোচিং সেন্টারে ওর সাথে আমার পরিচয়।।ওর সাথেই আসা যাওয়া,কাকতালীয় ভাবেই পাশাপাশি বাড়ি আমাদের।।ট্রেন লাইনের পাশে বিকেলের আড্ডা,ভাজাভুজি খাওয়া,বাদাম চিবানো আর ওর গান,সব মিলিয়ে যাস্ট অসাধারন জীবন ছিল।কলেজ জীবনের মজাটাই ছিল ওকে ঘিরে।তবে আরো একটা ভালো ফ্রেন্ড ছিল এদিকেই।নাম আরাফাত।মাঝে মাঝে ওর সংগ পেতাম আমরা।ভাবছি আর মুচকি হাসছি।আসলে প্রিওজনের কথা ভাবলে হয় মানুষের বুক ভারী হয়ে যায় অথবা মুচকি হাসি চলে আসে।

আচ্ছা এখন কেন আমি হাসছি??একটু আগেই যার কথা মনে পরে চোখ ভিজেছিল এখন তার কথা ভেবেই হাসছি!!মানুষ কত অদ্ভুত অনুভুতি সম্পন্ন প্রানী,তাই না।

তবে কি আজ আবার পুরানো প্রেম নতুন করে হানা দিচ্ছে এই ব্যথিত হৃদয়ে??

সে যাই হোক,দু:খ নিয়ে তো অনেক দিন ছিলাম।আজ না হয় একটু সুখ অনুভব করি।না পেলেও মিছে অনুভব করতে ক্ষতি কি??

খানিক বাদেই গান গাইতে আরম্ভ করলাম “খাচার ভিতর অচীন পাখিই কেমনে আসে যায়”গানটার মূল ভাবার্থ বা তাৎপর্য কিছুই যানি না আমি।যানতে ইচ্ছেও করে না।গাইতে ভালো লাগে তাই গাই।

গান টা নাহিদের মুখেই শোনা।ও ভীষন রকম গান গাইতে পছন্দ করত।তবে ফোক সং গুলোর প্রতি কেমন যেন একটা বেশি আগ্রহই কাজ করত ওর।

আমার তেমন ভালো লাগত না।তারপরেও শুনতাম ওর গান।ও চলে যাওয়ার পর এসব গানকেই আকড়ে আছি এতদিন।

এখন এসব গানই শুনি আমি।আনন্দ পাই নাকি বেদনা তা বুঝি না।আচ্ছা আনন্দ ও বেদনা একত্রে অনুভুত হলে তাকে কি বলে??

একটা সিগারেট ধরাই।কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকি আগুনের দিকে।কেমন একটা রং এই আগুনের।।লাল ও না কমলাও না।মাঝামাঝি একটা রং।আর এই সুন্দর রংযুক্ত আগুনই কিভাবে তিলে তিলে শেষ করছে তামাক আর কাগজটিকে।মনে হল সিগারেট টি আমায় বলছে”আচ্ছা তুমি আমায় পুড়িয়ে কি মজা পাও??”

আমি হেসে হেসে উত্তর দেই “সে আমাকে পুড়িয়ে মজা পায় তাই আমি তোমাকে পুড়িয়ে মজা নেই”অবশ্য আমার দোষ নেই।কারন নাহিদই আমায় সিগারেট খাওয়া শিখিয়েছিলো।নিজে খেত না কিন্তু আমাকে খাইয়েছে ও।বলতো তাহলে নাকি আমি পারফেক্ট পুরুষ হব।

আমি জিজ্ঞেস করি “তুই কেন খাস না তাহলে”

ও বলেছিলো”আগে খেতাম।কিন্তু এখন খাই না।একজনের কাছে প্রমিস করেছি তাই।”

কে ওই একজন খুব জানতে ইচ্ছে করেছিলো।কিন্তু জেজ্ঞেস করি নি।কেমন যানি ইগোতে লেগেছিলো।অত:পর আজ আমি ধুমপায়ী। । আমার পরিবর্তনের কারনটাই হলো নাহিদ।আগে, যে-আমি অল্পতেই কেদে দিতাম সে আমি এখন কস্ট পেলে চোখ বন্ধ করে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রাখি।।

রাত ৩.৪৫ মিনিট।অনেক রাত হলো।বেলকোনির এক কোনায় একটা গন্ধরাজ ফুলের গাছ।বেশ সৌরভ ছড়িয়েছে।পরিবেশটা মাদকতাময় করে দিয়েছে।।সেই ঘ্রানে আমি তলিয়ে যাচ্ছি গভীর ঘুমে।চোখে এখন শুধু ঘুম আর ঘুম।

*-এই অভ্র,,অভ্র।দরজা খুল।আর কত ঘুমাবি?

থতমত খেয়ে উঠে বসে পরি।একি!! আমি এখানেই পরে আছি এখনো।আপু দেখলে আবার হাজারটা প্রশ্ন।তারাতারি উঠে দরজা খুলে দিলাম।

-কিরে এত লেট করে উঠলি যে??

-আসলে আপু অনেক রাত ঘুমিয়েছি তো তাই।

-ও।কিন্তু তোর ঘরে সিগারেট এর গন্ধ কেন?আর তোর গেট আপ এমন কেন।

-মানে আমি একটু এইভাবে সেজে দেখলাম কেমন লাগে আমায়।আর রাতে স্মোক করেছিলাম তাই এমন গন্ধ।

-কি? তুই স্মোক করিস??দাড়া; মাকে আজকেই জানাবো।

-সে আর দরকার নেই।

-মানে??

-মা জানে আমি স্মোক করি।তবে আপু আমি এডিক্টেড না।মাঝে মাঝে একটু আক্টু ট্রাই করি আর কি।

-ও আচ্ছা।ফ্রেশ হয়ে খেতে আয়। খাবার দিচ্ছি।

-আসছি।

একি!!১১টার বেশি বাজে।ঝটপট খেয়ে নিলাম।আরাফাত কে একটা ফোন দিতে হবে।একটু দেখা করে যাই।শেষ বার যাওয়ার সময় একটু বলেও যাই নি।কত রাগ করেছিলো ও।এবার এসেছি যখন দেখা করেই যাই।

-হ্যালো।

-হ্যালো আরাফাত।

-হুম,কে আপনি?

-আরে অভ্র।কন্ঠে চিনিস নাই?

-আরে মামু তুই।এতদিন পর কি মনে করে??এই নাম্বার কার??চিনি তো না??কেমন আছিস??কি খবর তোর?(আরাফাত একদমে এত্তগুলো কথা বলে গেল।মনে হচ্ছে ও খুব এক্সাইটেড।)

-আরে সব বলবো।আমি এদিকে আসছি পরশু দিন রাতে।চল দেখা করি।

-অবশ্যই।দেখা না করে তোকে ছাড়ি এবার!!।কখন আসবি আর কোথায় আসবি বল.

-কোথায় আর?মালেক মামার চায়ের দোকানে।দুপুরে খেয়েই চলে আসিস।

-আচ্ছা। এখন বাই।

-হুম।

দুপুরে স্নান শেষে তারাতারি খেয়ে একটু রেস্ট নিলাম।পাশে ২ বছরের ছোট ভাগনী দুষ্টুমি করছে। আমি দেখছি আর হাসছি।বাচ্চাদের কে দুষ্টুমি না করলে মানায় না।ওরা আছেই তো এসব করতে।না হলে ওদেরকে নিষ্প্রান আর রোগা মনে হয়।এটা আমার অভিব্যক্তি। কে কিভাবে নে জানি না। হঠাৎ আরাফাতের ফোন,

-কিরে বের হইছিস অভ্র?

-এইত দোস্ত এখনই বের হচ্ছি।

-তারাতারি কিন্তু।আগের মত অলসতা করিস না।রাখি।

আগের মত!! এই কথাটা কেমন যেন বুকে ধাক্কা দিল।ওকে কিভাবে বুঝাই যে আমি আর আগের সেই অভ্র নেই।অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছি।

মাথা থেকে চিন্তা ঝেড়ে রওনা দিলাম।কিছুক্ষনের পথ।৫-৭ মিনিট।উত্তেজনা কাজ করছে।কতদিন পর প্রিয় একজন বন্ধুর সাথে দেখা হবে।ভাবতেই আনন্দ লাগছে।।

**দুপুর গড়িয়ে বিকেলের পথ ধরেছে।এখনও সূর্য কিরণ বেশ তীক্ষ্ণ। ওইত সামনের গলিতেই রেল লাইনের পাশে মালেকের চায়ের দোকান।এইখান কত আড্ডা দিয়েছি একসময়।পথ অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে।কিছু নতুন দোকান,বাড়ি।রাস্তাটাও বেশ অপরিচিত লাগছে।অবশেষে মালেকের দোকান!!

যেয়েই দেখলাম একটা ছেলে বেঞ্চিতে পিছন ফিরে বসে আছে।ডাক দিলাম

– আরাফাত।।

ঘুরে তাকালো সে।একটা মিষ্টি হাসি দিয়েই উঠে দাড়ালো আর এসে জড়িয়ে ধরল আমায়।বলে উঠল

-কতদিন পর অভ্র।আমার যে কি ভালো লাগছে তোকে বুঝাতে পারবো না।

-সেম টু ইউ ইয়ার।তুই কত পরিবর্তন হয়ে গেছিস দোস্ত।চিকন হয়ে গেছিস আর লম্বাও লাগছে বেশ।

-তাই নাকি অভ্র?আমি চেঞ্জ হলে তুই তো পুনর্জন্ম নিয়েছিস বলতে হয়।পুরা গেট আপ চেঞ্জ।চাপ দাড়ি।ফিট শরীর।আগে কত মোটাসোটা ছিলিস।আর চেহারায় ইনোসেন্টনেস ছিল। এখন ম্যাচার লাগছে ।

-আচ্ছা যাই হোক, চল বসি।

-হুম চল।

“কি খবর মামা?কেমন আছো?”জিজ্ঞেস করলাম।তিনি কতক্ষন ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইল।মনে হয় বয়সের ভারে চিনতে পারছে না।

“মামা আমি অভ্র,তুমি যাকে উদয় ডাকতে।বলতে যে আমার কথা তোমার মনে হলেই নাকি তোমার দোকানে আমি উদয় হই”

-উদয়।(খানিক্ষন ভেবে)ও আচ্ছা।কেমন আছেন বাবা?

-আপনি করে কেন বলছো মামা?আমি তো তোমার ছেলের বয়সী।

মামা খুব তড়িঘড়ি করে চা বানিয়ে সাথে দুইটা টোস্ট নিয়ে আসলো।এসেই কেদে দিল।বললো

-এতদিন কই আছিলা বাবা?এই বুড়া মামুটারে কি একবারও স্মরন হয় নাই।

– মামা জানো তুমি!!আমি কতটা মিস করেছি তোমাদেরকে। কেন যানি বলতে বলতে গলার স্বর ধরে উঠে আমার।।চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলাম না।

আরাফাত বলে উঠে

-তোর আর এই অভ্যাস গেল না।আর মামা তুমিও যে কি ছেলে মানুষী করছ।ও গেছে তো কি হয়েছে?আমরা তো আছি।।এবার চা দাও।

-এই নেও বাবা।তোমরা গল্প করো।আমি যাই।

-তো অভ্র এতদিন পর কি মনে করে এলি রে??আমাদের না বলে চলে গেলি।কত আসতে বললাম।আসলিই না।

-(তার মানে নাহিদ আরাফাত কে কিছু বলে নি)আসলে একটা সমস্যা হইছিলো তাই চলে গেছিলাম।আর ভাগনির জন্মদিনে অনেক জোড় করেছিলো আপু, ভাগনী।তাই আসলাম।

-ও তার মানে আমাদের জন্য আসোস নাই।

-ধুর তুই কথায় এত প্যাচ ধরিস কেন বলতো?

-আরে বাদ দে।আচ্ছা মামা নাহিদ রে আসতে বলস নাই।

-না রে।আর আসতে বললেও আসবে না ও।

-হুম হইতেও পারে।তুই যাওয়ার পর থেকে নাহিদ অন্য রকম হয়ে গেছে রে।আমাদের সাথে মিশে না।আড্ডা দেয় না।দেখা হলে হায়-হ্যালো।এই আরকি।

-কেন কি হইছে নাহিদের?(খানিকটা উত্তেজিত হয়ে বললাম)

-আরে এত উত্তেজিত হওয়ার কি আছে।

Jan 29 · Sent from Mobile

উদ্ভট জীব

নাহিদের কথা শুনলেই তুই অস্থির হতে যাস।আগেও তোর এই বদভ্যাস ছিল।তোর বেস্ট ফ্রেন্ড বলে তাই না??

-(মনে মনে বলি ও যে আমার ফ্রেন্ড এর চেয়েও বেশি)আরে ফ্রেন্ড এর জন্য এমন হওয়াই স্বাভাবিক,

কথা বলা শেষ হতে না হতেই ও বললো

-আরে মামা তোর গলায় এটা কার চেন?হাতের ব্রেসলেট টাও তো চেনা চেনা লাগে।

আমি হেসে বলি

-বলতো কার?

-নাহিদ পাগলার মনে হয়।এগুলা তো ও ই পরত।

হুম।

এরপর আমরা রেল লাইনে অনেক্ষন হাটি। ফাযলামি করি।খাওয়া দাওয়া করে ওকে বিদায় জানিয়ে রাতে বাসায় ফিরি।অনেক দিন পর একটা ভালো বিকেল-সন্ধ্য- রাত পার করলাম।আগে নাহিদও শামিল হত এসব আয়োজনে। আজ অনেক ক্লান্ত লাগছে।একটু ঘুমানো প্রয়জন।ফ্রেশ হয়েই শুয়ে পরলাম।এক ঘুমে রাত কাভার।

*সকাল সকাল কার যেন ফোন।বিরক্তি নিয়ে ফোন রিসিভ করে বললাম

-হ্যালো।

-হ্যালো অভ্র।আমি আরাফাত।শুন, আজকে সন্ধ্যায় আমরা ঘুরতে যাচ্ছি।রেডি থাকিস।

-আরে শালা আবাল,এই কথা এত সকাল সকাল বলা লাগে?দিলি তো ঘুমটার বারোটা বাজিয়ে।কই যাচ্ছি আমরা?

-হাতিরঝিল।

-আচ্ছা।

ঘুমানোর জন্য কিছুক্ষন চেস্টা চালালাম।ব্যর্থ হয়ে উঠে গেলাম।নাহ!আর ঘুম হলোনা।সারাদিন কিভাবে যেন কেটে গেল।বিকেল ৫ টার দিকে হাতিরঝিল এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

সন্ধ্যা ৬ টার মত বাজে।আমি উপস্থিত হই সেখানে।যেয়েই আরাফাতকে দেখি।

-কিরে আরাফাত এত তারাতারি আসলি যে?

-আজকে তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে দোস্ত।

-কিরে?তারাতারি কর।অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না।

-অইদিকে তাকা।

আমরা ২ নং ব্রিজের উপরে।হালকা আলো আধারী পরিবেশ।বাতাস চারিদিকে।মন ভালো হওয়ার মত পরিবেশ।আমি ঘুরে তাকালাম পিছন দিকে।

কে যেনো আসছে এদিকে। ভালো মত বুঝা যাচ্ছে না। তবে লম্বা, চিকন আর ব্লাক প্যান্ট,শার্ট পরা।এবার চেনা চেনা লাগছে।এ যে আমার বহুদিনের চেনা।

চেহারার এই অবস্থা কেন ওর?মুখে যেন প্রান নেই,সেই চঞ্চলাতাও নেই,কোথায় গেল ওর স্মার্টনেস? ফ্যাকাশে পান্ডুর লাগছে ওকে।

ও এদিকে এগিয়ে আসছে।আর আমার হৃৎকম্পন বাড়ছে।আমি কান্ডজ্ঞানহীন হয়ে পরি।কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না।হাত পা ঠান্ডা লাগছে।কাপছি আমি।ও তো আসছে।পুরোনো লজ্জ্যা আর পেতে চাই না।নতুন করে অপমানিত হতে চাই না আমি।আমার যে মান সম্মানে লাগে খুব।নাহিদ গুটি গুটি পায়ে অগ্রসর হচ্ছে।

আমি আরাফাত কে বলি

-আরাফাত নাহিদ এখানে কেন।(কাপা কাপা কন্ঠে)

-আরে সারপ্রাইজ। ওকে বলছি তুই আসছিস।

আমার ভীষন কান্না পাচ্ছে।আমি দৌড় দিলাম অন্যদিকে।আমি এই মুখ আর নাহিদ কে দেখাতে চাই না।আরাফাত ও দ্রুত হেটে আমার দিকে আসছে।

-কিরে কি হল তোর চলে যাচ্ছিস কেন?

-তোরা গল্প কর।আমি যাই।বলেই কেদে দিলাম।

আরাফাত আমার হাত ধরে ফেলে।ও বলে

-তোর হয়েছে টা কি?ওর সাথে ঝামেলা হইছে?তাহলে নো প্রব্লেম। আজ মিটিয়ে নে।ফ্রেন্ডশিপে ঝামেলা হবেই।

-দেখ তুই বুঝবি না।

-আচ্ছা তুই কাদছিস কেন আবার।

আমি আবার দৌড় দিলাম।পিছন থেকে একটা ডাক শুনতে পেলাম

-অভ্র।একটু দাড়া।

নাহিদ আমাকে ডাকছে।ওর ডাকে কস্টটা দ্বিগুন মনে হচ্ছে।আমি ঠায় দাড়িয়ে রইলাম।আমার পা কাজ করছে না।অবশ লাগছে।ঠোট দুটো কাপছে।চোখ গুলো বন্ধ করে আছি।মুখটা ভারি লাগছে।আমি ব্রিজের গ্রিল ধরে পানির দিকে মুখ করে দাড়িয়ে আছি।চোখ দিয়ে অনর্গল পানি ঝরছে।।

নাহিদ এসে বলে

-স্যরি অভ্র।আমাকে ক্ষমা করে দে।

আমি চুপ।আরাফাতও

-অভ্র এই অধমকে কি ক্ষমা করে দেওয়া যায় না?

আমি কিছুই বলছি না।ওর কথা গুলো বুকের মধ্যে যেন সুচ ফুটাচ্ছে আমায়।

-সেদিনের জন্য আমি খুবই লজ্জিত।প্লিজ একটা বার তাকা।

-দেখ অভ্র তোদের মধ্যে কি হয়েছে যানি না।তবুও নাহিদ এত করে বলছে ওকে কি ক্ষমা করা যায় না?

নাহিদ বলে আরাফাত তুই একটু যা।আমি ওর সাথে কথা বলছি।

আরাফাত দুরে চলে যায়।আমি দাড়িয়েই আছি।সংকোচ,লজ্জ্যা,ভয়, অনুতাপ কাজ করছে আমার ভিতরে।

-এই অভ্র।কথা বলবি না?

-কি বলবো?

-আমি যা বলি তার উত্তর দে।

-হুম বল।

-তোর হাতে, গলায় আমার এগুলো কেন পরিস?আমাকে এখনো তুই ভালোবাসিস?

-হুম।নাহিদ কে আমি ভালো বেসেছি আর বাসবো।

-তাহলে ক্ষমা করে দে

-ক্ষমা!! প্রিওজনকে সকলেই ক্ষমা করে দেয়।তাদের উপর রাগ করে থাকা যায় নাকি!

-তাহলে এদিকে তাকা

-না।কিছু বলার থাকলে বল।

-এখনো আমার জন্য ওয়েট করিস।

-কি করবো বল?অভ্যাস যে পরিবর্তন করতে আমি অক্ষম।

-কাদছিস কেন?

-সুখে।

-আমায় ভালোবাসবি আরেকবার??

বলেই আমায় জড়িয়ে ধরলো।

আমি ওর শার্টের কলার টা ধরে চিৎকার কিরে বলি

-এই ট্রানজেন্ডার কে ভালোবাসতে লজ্জ্যা করবে না তোর??

-না।

আমি ওর গালে একটা চড় মেরে দৌড়ে চলে আসি।ও অভ্র,অভ্র বলে ডাকতেই থাকে আমার পিছন পিছন আসে ।আর আমি কাদতে কাদতেই বাসে উঠে চলে আসি।

*বাসায় ঢুকে দরজা এটে শুয়ে পরি। আমি কাদছি।আমার মনে পরে সেই বৃষ্টির দিনের কথা।সেই কালো মুহুর্তের কথা। কোন এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় আমি আর নাহিদ বাসায় ফিরছিলাম।কোচিং শেষ হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে গেছিলো।কোন যানবাহন না পাওয়ায় হেটেই রওনা দিলাম।কারো কাছেই ছাতা নেই।কাক ভেজা হয়ে আমরা দুজন হাটছিলাম।আমরা দুই যুবা হাত ধরে হাটছি আর ভিজছি।কি সুখকর মুহুর্ত মনে হচ্ছিলো আমার কাছে।মনে হয়েছিলো এই বুঝি সব সুখ।ভেজা চুলে নাহিদকে কামুক লাগছিলো।আমি ওর দিকে চেয়ে চেয়ে হাটছি।তুই গাইছিলি

“আমার সারাটাদিন মেঘলা আলাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম”

আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম।কেন তোর কন্ঠে এত মায়া ছিল বলতো নাহিদ?

সেদিন সন্ধ্যায় মনে হচ্ছিল অনেক রাত হয়ে গেছে।আকাশ পুরো কালো।বাতাস বইছিলো।আমি বললাম

-নাহিদ একটা কথা বলি

-হুম বল

– আমি না তোকে ভালবাসি রে।

-আমি যানি।আমিও তোকে ভালোবাসি।তুইতো আমার বেস্টু।

-সত্যি?

-হুম।

-তাহলে আমার কপালে একটা চুমু দে।

– ধুর এগুলা কি বলস।তুই একটা ছেলে।তোকে কিভাবে কিস করি।

-আমি বললাম না আমি তোকে ভালোবাসি।

-সেটা তো ফ্রেন্ড হিসেবে।

-না প্রেমিক হিসেবে।

-কি বলিস এইসব।তুই আসলেই একটা আবাল

-সত্যি বলছি আই লাভ ইউ।

-সর এখান থেকে আমি যাই।পথ আগলে রাখলাম ওর। -কি হচ্ছে এসব অভ্র?পাগল হয়ে গেছিস তুই?

আমি দাড়িয়ে আছি ওর সামনে নিচের দিকে তাকিয়ে।ও আমায় একটা ধাক্কা দিল।আমি আবার পথ আটকে রাখি।তারপর জোরে চড়!!আমি দাড়িয়েই আছি ওর চলে যাওয়া দেখছি।।তারপর আস্তে আস্তে মাটিতে বসে পরলাম।আকাশে আলোর রেখাটুকুও নাই।কতক্ষন বসে ছিলাম যানি না।বেশ খানিক্ষন পর মালেক মামা এসলো

Jan 29 · Sent from Mobile

উদ্ভট জীব

কি হয়েছে উদয় বাবা?আমি কিছু না ইশারা দিলাম।

আমার লাল চোখ গুলো দেখে তিনি বুঝলেন কি জানি।আমাকে টেনে তুকে নিয়ে যেতে লাগলেন রাস্তার দিকে।তারপর একটা রিকশায় উঠিয়ে আমায় বিদায় যানান।বাসায় ফিরার পর তীব্র মাথা ব্যাথা শুরু হয়।।সেদিন বেশ অসুস্থ লেগেছিলো।একেতো বৃষ্টিতে অনেক্ষন ভিজা তারপর তীব্র ক্রন্দন।

একটু বিছানায় গা টা ছেড়ে দিলাম।অত:পর ঘুম।।হঠাৎ রাতে খুব পিপাসা পেল।উঠে ফোনে আলো জ্বালিয়ে দেখি রাত ৩:৪১ বাজে।আমার শরীর টা ভিষন গরম।বুঝলাম জ্বরের আগমন ঘটেছে।পানি খাওয়ার পর শুলাম।সারাদিন কি হয়েছে ভাবতে থাকি। অনুভব করি নাহিদ কে মনের কথা না বলতে পারলে শান্তি পাবো না।ওকে একটা টেক্সট দেই

“নাহিদ তোকে আমি সত্যিই ভালবাসি। এটা কোন ফাযলামো বা ছেলে মানুষী নয়।দেখ আমি কিছুই চাই না,শুধু একটু আগলে রাখিস আমায়।একটু সাপর্ট দিস।এটুকুই।আর কিছুতেই অধিকার খাটাবো মা।তুই তোর মতই থাকিস।শুধু দিনের ৫টা মিনিট আমায় দিস।আর কিছু না”

ম্যসেজ টা দিয়েই আবার ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

সকালে উঠেই দেখি নাহিদের ফোন।ব্যাক করলাম।ও বললো “আজ বিকেলে একটু রেল লাইনের পাশে আসিস।কিছু কথা আছে”।

তারমানে নাহিদ আমায় ভালোবাসে।সে কথাই বলবে।ওহ আল্লাহ!!এত ভালো লাগছে কেন আমার!!আজ আমার ভালোবাসা ধরা দিবে আমার কাছে।আমি জানতাম নাহিদ আমায় ভালো না বেসে থাকতেই পারবে না।

*সেদিন খুব পরিপাটি ভাবে তৈরী হলাম।একটা থ্রি কোয়াটার প্যান্ট আর নীল টি শার্ট পরে,চুলে খানিকটা জেল লাগিয়ে নিলাম।হাতে রিচব্যান্ড ও কেডস পরে বেরুলাম।কানে বড় হেডফোন।ফুলের দোকান থেকে কয়েকটা সাদা গোলাপ আর গ্লাডিওলাস নিয়ে রওনা দিলাম।

সেখানে গিয়েই ধাক্কা খেলাম।ও কেন এরকম মন মরা হয়ে দাড়িয়ে আছে??আমি যেয়েই ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম

-আই লাভ ইউ।

ফুল গুলো এগিয়ে দিলাম।

-হোয়াট দ্যা হে’ল্ল ইজ ইট??কিসব ন্যাকামি হচ্ছে।তোকে একটু পাত্তা দেই বলে যা ইচ্ছা তা করবি তুই?

-মানে??

-এইসব কি?(গত রাতের ম্যাসেজ টা দেখিয়ে)সালা হিজড়া।জন্মের ঠিক আছে তোর?মাদার*দ কোথাকার।তোর জন্য আজ এত লজ্জ্যা পাইতে হইছে আমায়।আমার ফ্রেন্ডগুলা সকালে এই টেক্সট দেইখা বলে আমি নাকি শেষ মেশ একটা হিজড়ার সাথে প্রেম করছি।ছি!!কত ইনসাল্ট।

আমি আসছি।ও বলে উঠে

-সালা মাইগ্যা।যা ভাগ।আবার ন্যাকা কান্না।তোরে যেন আর আমার সামনে না দেখি।

ফুলগুলো নিয়ে ছিড়ে ফেলে।তারপর আমার মুখে ছুড়ে মারে।গোলাপের একটা কাটা বিধে গেল গালে।আমি জোড়ে জোরে কাদি।ও চলে যায়।কেডস গুলো খুলে এদিক ওদিক ফেলে দেই।পাগলের মত লাগছিলো।চুল গুলো টেনে ইচ্ছে করছিলো ছিড়ে ফেলি।বাসায় আসি।সিদ্ধান্ত নেই আর এক মুহুর্ত এখানে না।

বইগুলো নিয়ে আর সব রেখে যাই এখানে।

আপু সেদিন অনেকবার নিষেধ করছিলো আমায়”যাস না অভ্র”ভাগনীরাও আটকায় যেও না মামা।আমি কারো কথা শুনিনি।সকলের ডাক উপেক্ষা করে সেদিন রাতেই রওনা দেই

বাসে উঠার আগ মুহুর্তে নাহিদকে ফোন দেই,

-হ্যালো নাহিদ।

-অই শালা আবার কি বলবি।তর দেখি লজ্জ্যা শরম ও নাই।

-আমি চলে যাচ্ছি।

-থ্যাংক্স গড।যা দুরে ভাগ।আমারে মুক্তি।দে।

-সত্যিই আমি চলে যাচ্ছি রে।

-তোকে না বলেছে কে!!আজব পাবলিক।

আর সইতে পারি নাই।ফোন কেটে বাসে উঠে পরি।

বাসের পিছনের দিকের একটা সিটে বসে পরি।হ্যা আমি চলে যাচ্ছি এই ব্যস্ত নগরী থেকে।যাচ্ছি চলে আমার সাদামাটা অঞ্চলে।সব মায়ার সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে ফিরছি নিজ গ্রামে।।এখানে আর পড়ালেখার দরকার নেই।শুধু মিস করবো

বোনের কড়া শাসন, মালেক মামার চায়ের দোকানের আড্ডা,ভাগনীদের দুষ্টুমি, আরাফাতের কমেডি কথা।আর কেউ আমায় ‘উদয় বাবা’বলবে না,

আর কেউ বলবে না

“অভ্র তুই এর সহজ সরল কেন!!একটু কেয়ারফুল হ!”

আর রাস্তা পার হওয়ার সময় কেউ হাত ধরবে না,,কেউ আমায় আগলে রাখবে না,কারো পিছু পিছু হাটা হবে না,বিকেলের নাহিদের গান!!ভালোবাসা কেড়ে নিল সব!!

কাদতে কাদতে বাড়ি চলে গেলাম।বাস স্টেশনে বাবা দাড়িয়ে ছিল।আমার ছলছল চোখ দেখে বাবা জিজ্ঞেস করেছিলো “কি হয়েছে তোর”আমি বাবার বুক জড়িয়ে ধরে অনেক্ষন কেদে ছিলাম্বার বলেছি”বাবা, আমি আর ওখানে যাবো না।কেন পাঠিয়েছ আমায় ওখানে??”

সেখানের একটা কলেজ থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেই।তারপর ন্যাশনাল ভার্সিটি। আর শহরমুখো হই নি।

কেন আবার আসতে গেলাম!!

এসেছি যখন চলে যাওয়াই বেটার।কালকে বিকেলেই ২য় বারের মত প্রস্থান করবো এই শহর থেকে।আপুকে বলে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি।।এবার ব্যাগে নাহিদের চেন,ব্রেসলেট,রুমাল আর ডায়েরীটা নিয়ে নিলাম।ডায়েরীর প্রতিটা পাতায় নাহিদ কে লিখা কিছু আবেগময় উক্তি।আর ওর দেওয়া প্রতিটি চকলেট,সেন্টার প্রেশের খোসা পিন দিয়ে আটকানো।আসলেই আমি খুব বোকা,নাহলে এগুলো কেউ এভাবে রাখে!!যদিও এগুলো আমার ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে থাকবে।

রাতে আরাফাত কে ফোন দিলাম।বললাম আমি কাল সন্ধ্যায় চলে যাবো রে।আসিস তুই।

ও সম্মতি জানালো।।

* সকাল থেকেই মন মরা লাগছে।কিছুতেই ভালো লাগছিলো না।বসে আছি ব্যালকুনিতে।সাদা সাদা ফুল।কি সৌরভ।মন ভালো হওয়ার মত।দৃষ্টি পাশের আম গাছটার উপর।একটা ফিঙে পাখি।আচ্ছা এর জোড়া পাখিটা কই!!নাকি এ ও আমার মত একা।খুব একা।

গোসল,খাওয়া শেষে টিভি দেখলাম কিছুক্ষন।তারপর তৈরী হয়ে নিলাম।বাসার সবাইকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম।মালেক মামার চায়ের দোকানে আমি আর আরাফাত বসে চা খাচ্ছি।মামাকে চায়ের বিল দিয়ে বিদায় জানালাম।”আবার আইসো উদয় বাবা”

-তুমি স্মরণ কোরো।তাহলেই উদয় হব আবার।

আরাফাত বলে

-আচ্ছা তোদের হয়েছেটা কি?তুই আর নাহিদ কেন এমন করিস।

-ও কিছু না।ছাড় তো।

আরাফাত আর কিছু বললো না।

সন্ধ্যা ৭.৩০।একটু পরেই বাস আসবে।স্টেশনে বসে আছি।হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি।আমি দাড়ালাম।বৃষ্টি দেখছি।আবার আবিষ্কার করলাম নাহিদ কে।ও এখানে কেন!!কে আসতে বলেছে ওকে!!

আরাফাত বলে

-আমি।

কিছু বললাম না।চুপ করে বসে পরলাম।নাহিদ বলে

-অভ্র যাওয়ার আগে আমায় ক্ষমা করে দিবি প্লিজ।তুই যাওয়ার পরে আমি তোর শুন্যতা অনুভব করি রে।আসলে তুই তো জানিসই আমার কলেজে একটা ইমেজ আছে।অইদিন আমার ফ্রেন্ডগুলা ফোন ঘেটে মেসেজ টা দেখে আমাকে নিয়ে অনেক তামাশা করেছে।তাই সহ্য করতে না পেরে তোর উপর চটে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সেদিন তুই যাবি না।এমনিই রাগে বলেছিস চলে যাবি।কিন্তু পরদিন থেকে দেখলাম তুই নেই।কত ফোন দিয়েছি।

কন্ট্যাক্ট করতে চেস্টা করেছি পেলাম না আর।

তুই জানিস, আমার পিছু কেউ আসেনি,কেউ বলেনি নাহিদ তুই এত বেপরোয়া কেন!!কেউ আমার অগোছালো চুল ঠিক করে দেয়নি।কেউ আমার গানে সুর মেলায় নি,কেউ আমি খেয়ে আছি কিনা জিজ্ঞেস করেনি,কেউ আমার হাত ধরে হাটেনি।তখন ই বুঝলাম তুই কতটুকু জুড়ে আছিস আমার।আমার পাগলটাকে আমি কত ভালোবাসি তারপর থেকেই অনুভব করি রে।যেদিন আরাফাত জানায় তুই এসেছিস আবার আমি পাগলের মত ছুটে এসেছি।আমায় ক্ষমা করে দে অভ্র।আমায় কি আরেকবার ভালোবাসা যায় না??

ও কাদছে।আরাফাত তাকিয়ে আছে। কি ভাবছে যানি না।শুধু জানি আমায় এখান থেকে চলে যেতে হবে।বাস এসেছে।আমি সব মোহ ত্যাগ করে যাত্রা শুরু করি।নাহিদ পিছু পিছু আসে।জানালা দিয়ে আমায় ডাকে।”অভ্র,অভ্র প্লিজ কথা টা শুন”

ও ভিজে যাচ্ছে।আমি কোন পতিক্রিয়া দেখাই নি।বাস চলতে আরম্ভ করে।ও বাসের পিছনে ছুটতে থাকে থাকে।আমি যেতে থাকি নিজ গন্তব্যে।

কিন্তু না!!পারিনি আমি নাহিদ কে ছেড়ে চলে যেতে।সামনে যেয়েই বাস থেকে নেমে আসি।ও ভিজছে বৃষ্টিতে । আমি ওকে ভালোবাসতে চাই।শুনেছি,সত্যিকার ভালোবাসলে নাকি শত অপরাধ ও ক্ষমা করে দেওয়া যায়।সব মেনে নেওয়া যায়। আমিও তাই সব মেনে নিলাম না হয়।

অনিচ্ছা সত্তেও চোখে পানি আসলো।বৃষ্টি আমার চোখে পানি ধুয়ে দিচ্ছে।এটা তো ফিরে পাওয়ার আনন্দের মুহুর্ত।তুই তোর ভালোবাসা ফিরে পেয়েছিস।

আমি দাড়িয়ে আছি।ও দুর থেকে দেখে দৌড়ে আসে আমার দিকে।এসেই বুকের মাঝে আমায় জড়িয়ে ধরে।আমি কাদতে কাদতে ওর গেঞ্জি ধরে বসে পরি,আর বলতে থাকি

-কেন এত কস্ট দিয়েছিস আমায়?কেন এত অপমান করেছিস।আমার জীবনের ৩ টা বছর কেন কালো করে দিলি।কেন আমায় ধুমপায়ী করেছিস।।

ও আমাকে দাড় করিয়ে কপালে একটা চুমু খায়।এ-ত বহু প্রতীক্ষিত মুহুর্ত!!

দুর থেকে আরাফাত দাড়িয়ে সব দেখছে আর মুচকি হাসছে।আর আমি মনেহয় প্রান ফিরে পেলাম।নাহিদের চোখে জল।মনে মনে ভাবলাম”বেচারা নাহিদ!!ওর ও চোখের জল কন্ট্রলের ক্ষমতা কমে গিয়েছে ইদানিং।

……………

সমাপ্ত।

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.