একটা নিষিদ্ধ প্রার্থনা

লিখেছেনঃ আরভান শান আরাফ।

উৎসঃ “প্রে ফর ববি” উপন্যাসের আলোকে গল্পটি লেখা।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

কলেনির সবচেয়ে ধার্মিক আর প্রভাবশালী পরিবার হচ্ছে মেথিও এর পরিবার।ওনার স্ত্রী হেলেন ধার্মিক আর গুনগ্রাহী।শহরের খ্রিষ্টান পরিবারের আদর্শ ই বলতে গেলে।মেথিও এর দু’ছেলে।বড় ছেলে আলব্রেট আর ছোট ছেলে ববি।আলব্রেট উচ্চশিক্ষা গ্রহণে ব্যস্ত আর ববি এখনো ও স্কুলেই।দু’ভাইয়ের বয়সের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান থাকলে ও তাদের মধ্য রয়েছে একটা গভীর বন্ধুত্ব।আলব্রেট যেমনি হোক পরিবার আর আত্মীয় সবার পছন্দের পাত্র ববিই।ববি শান্ত,মেধাবী,আর উৎসাহী।সে দেখতে সুন্দর,তার হাসি সুন্দর।তার মুখের কথা প্রাণোচ্ছালিত তার ভদ্রতা সবার দৃষ্টি আকর্ষনীয়।

ববি সবার সাথে মিশতে পারলেও একটা সময় নিজকে একা করে দিতে লাগলো।সেই শান্ত শিষ্ট ছেলেটি নিজের মধ্যে অদ্ভুত কিছু খেয়াল করতো।সে খেয়াল করতো যে সে আর বাকিদের মতো নয়।সে কিছুটা না বরং অনেকটাই আলাদা।

শ্রেণীকক্ষের সহপাঠিরা যখন তাদের শিক্ষিকা মিস গাগাকে নিয়ে যৌনুক্তি করে তখন তার শুনতে কেমন রুচিতে আটকায় কিন্তু,সুদর্শন শিক্ষক পলকে তার অনেক ভাল লাগে।ববি খুঁজতে থাকে এই নেশার কেন্দ্রবিন্দু।কিন্তু,সে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন পথ বাকি থাকে না।ববির ভাল লাগে সুদর্শন যুবক ।ভাল লাগে তাদের সাথে গা ঘেষে কথা বলতে।ভাল লাগে তাদের মাংসল উরু আর পেশিবহুল বাহু।ভাবতে ভাল লাগে তাদের নিয়ে একটা যৌনঘোর তৈরী করতে।ববি বুঝতে পারে এই চাহিদাগুলো অসামাজিক।সে জানে সে ইশ্বরের ঘৃনার পাত্র।তাই সে হতাশ।কী করতে পারে সে?যখন বারবার চেষ্টা করেও এ থেকে ফিরতে পারে নি।যখন তার মা জানবে যে,তার ছেলে অন্য ছেলে থেকে আলাদা,তার ছেলে স্বাভাবিক নয় তখন সে কী করবে?কী ভাবে গ্রহণ করবে তাকে আগের মতো তার আত্মীয়রা।

ববি বুঝতে পারে না।তার মাথায় চাপ পড়ে।তার চোখ বেয়ে জল নামে।সে একজন সমকামী।সে বাইবেলে বর্ণিত পাপী।সে সমাজ আর ধর্মের চোখে নিকৃষ্ট তা ভাবতেই তার বুকটা কষ্টে ভরে যায়।ইচ্ছে করে চিৎকার করে কাঁদতে।কিন্তু,সে কাঁন্নাটাও তাকে চেপে রাখতে হয়।তার কষ্ট শুধু তারই।ববির মা হেলেন খুবি ধার্মিক।প্রতিদিন একবার করে সে ববিকে নিয়ে গির্জাতে যান।সেখানের গির্জার যাজক ফাদারের সাথে ওনার পরিচিতি খুব বেশি।ঐদিন ববি গীর্জায় যাওয়ার পর,ফাদার তাকে বাইবেলে বর্ণিত সডোম জাতির গল্প বলল।যাদের সমকামের জন্যে ধ্বংস করে দিল।ফাদার সাথে এ ও বলল,সমকামীরা ঈশ্বরের অভিশপ্ত ।

তারা ক্রুশ ধারন করলে ও মুক্তি পাবে না।তারা চির নরকী।ববি ফাদারের কথা শুনে ঘাবড়ে গেল।তার চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।কষ্টে তার বুকে পাথর জমে গেল।নিশ্বাস ঘন হয়ে গেল।সে দ্রুত হেঁটে মাকে ফেলে একাই গীর্জা থেকে বের হয়ে পড়লো।

রেলপথ দিয়ে ববি হেঁটে চলছে।এই পথটা অনেক দূর চলে গেছে।ববির চোখে পানি।তার ইচ্ছে করছে কোথাও চলে যেতে যেখানে বাইবেল নেই,গীর্জা নেই,নেই কোন ফাদার।যেখানে থাকবে শুধু সে।সে ভাবে এই পথ কি তাকে নিয়ে যেতে পারবে সেখানে?যদি পারতো তবে সে চলে যেত।মাঝে মাঝে আবার ইচ্ছে করে ট্রেনের নিচে মাথাটা দিয়ে মরে যেতে।

সেদিন স্কুলে যাওয়ার পর একটা ছেলেকে দেখে সে।তার কাছে ছেলেটাকে খুবই ভাল লাগে।ববি ভুলে গেল সব।ছেলেটাকে কাছে পাবার বাসনায় মরিয়া হয়ে গেল।সে যত বারই তাকে দেখেছে ততবারই প্রেমে পড়েছে।তার ছোঁয়া পেতে,তাকে জড়িয়ে ধরতে সে প্রবল ভাবে উৎসাহী।কিন্তু,ববি জানতো না তার চাওয়া কোন দিন ও পাবার নয়।

একদিন ববি অনেক ভেবে স্থির করলো ঐ ছেলেটাকে সে বলবে তার মনের কথা।কিন্তু,তা আর হলো না।সে বলার আগেই যা দেখছে তাতে ববির মন ভেঙে গেল।তার বুকে ব্যথা করতে লাগলো।কষ্টে তার দম আটকে যাচ্ছিল।সে দেখল যাকে সে ভালবাসে সে তার বান্ধবীকে কিস করছে।নিজের প্রতি ববির ঘৃণা চলে আসলো।

এক বুক কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরল।বাড়ি ফিরে কষ্টটা যেন আরো বাড়তে লাগলো।সে কত গুলো ঘুমের ট্যাবলেট খুলে নিল।খাওয়ার জন্যে,মুখে দিতে গিয়ে ও দিল না মা আর বাবার কথা ভেবে।বড় ভাই আলব্রেট বাড়ি ফিরে ববিকে ডাকতে লাগলো।টিভি চলছে,আর কলের পানি পড়ার শব্দ।বাথরুম খালি পেল সে।অনেক গুলো রুম খোঁজে ও যখন পেল না তখন সে রিডিং রুমে গেল।সেখানে গিয়ে দেখে ববি মরার মতো পড়ে আছে।তার আত্মাটা মুচড় দিয়ে ওঠল।কাছে গিয়ে ববিকে টেনে তুললে পানি ছিটে দিতেই ববি জেগে ওঠল।কী হয়েছে জানতে চাইলে ববি কিছু না বলে এড়িয়ে যায়।

কিন্তু,আলব্রেট জেদ করে জানতেই চায়।ববি রেগে যায়।রাগের ঠেলায় এক পর্যায়ে বলেই ফেলে যে,সে একজন গে আর এটাই তার কষ্ট।দু’জনেই থ মেরে যায়।একজন সত্যটা বলে আরেকজন সত্যটা শুনে।পরক্ষণে ববি অনুরোধ করলো কাউকে যেন তা বলে।তাহলে সবাই তাকে ঘৃণা করবে।আলব্রেট ওয়াদা দেই কাউকে বলবে না।ববিকে সে জড়িয়ে ধরে।হয়তো আলব্রেট ভাইয়ের কষ্টটা বুঝতে পেরেছিল।ঐদিন ববি স্কুলে ছিল।এদিকে কথা প্রসঙ্গে আলব্রেট তার বাবা মাকে বলে দেয় যে তার ছেলে ববি একজন গে।কথা শুনে মিস্টার মেথিও এবং মিসেস মেথিও চমকে ওঠে।যে ছেলেকে ঘিরে তাদের এতো স্বপ্ন,তাদের এতো আশা সেই ছেলে গে?

ভাবতেই তাদের কাছে বিষয়টা কেমন কুৎসিত মনে হচ্ছিল।আত্মীয়রা জানতে পারলে মুখ দেখাবে কি করে?এই চিন্তায় দুজনেই অস্থির।ঈশ্বর তাদের এ কোন প্রকার শাস্তি দিল?এই কোন অভিশাপের ফলে এতো বড় পাপী ছেলে তাদের সংসারে এলো? ববি যখন আজ স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলো তখন প্রতিদিনের মতো মা এসে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল না।বাবা দিন কেমন কাটল তা জানতে চাইলো না।সবাই কেমন যেন চুপচাপ।ববির দিকে দু’জোড়া চোখ খুব অদ্ভুত ভাবে চেয়ে ছিল।আজ সকালে যে পরিবারটা তার ছিল অতি প্রশান্তির এই পরিবারটা এতো দ্রুত যে পাল্ঠে যাবে তা কে জানতো?কেউ কথা বলেনি।ববিও বলেনি।তার রুমে গিয়ে এমনি শুয়ে রইলো।

কিছুক্ষণপর বাবা আর মা আসলো আলব্রেট এর বলা কথাটার সত্যতা যাচাই করতে।তারা জানতে চাইলো ববি আসলেই গে কি না।ববি বুঝতে পারলো সব পাল্টাতে বসেছে।আর এই পাল্টানোর জন্যে দায় তার বড় ভাইয়া।সে রক্তচোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কেঁদে দিল আর বলল,তুমি কেন করলে এটা?কেন বলতে গেলে?সে জানতো সে সব হারাতে বসেছে তাই খুব রাগ হলো ভাইয়ের উপর।চেচিয়ে রাগ ঝাড়তে লাগলো দেখে বাবা থাপ্পর মেরে রুম ত্যাগ করলো।ববিও কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির বাহিরে চলে গেল।হেলেন সারা রাত ভাবলো ববিকে নিয়ে।পরের দিন খুব ভোরে তার বিশ্বস্ত যাজকের কাছে গেল।যাজক সব শুনে বলল যে,এটা ঈশ্বরের অভিশাপ।

এই অভিশাপ কাটাতে হলে প্রচুর শ্রম দিতে হবে।অনেক কিছু ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।ববির মা এই অভিশাপ কাটাতে পরিকর।সে তার শান্ত আর ভদ্র ছেলেকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে যাজকের কথা মেনে নিল।অন্যদিকে পরিবার সব জানার পর যেন সত্যিই ববি একটা অভিশপ্ত মানবে পরিণত হলো।ববি খুব একা হয়ে গেল।সারাদিন ঐ রেলপথে বসে থাকতো।মাথাটা দু’পায়ে মিশিয়ে।মাঝে মাঝে একটা খাতায় খসখস করে কী যেন লিখত।তার চোখ থেকে পানি ঝড়তো।ভাল লাগতো না তার কোন কিছু।স্কুলে যেত না ঠিক মতো।কারো সাথে কথা বলতো না।

মেজাজ মন সব খিটখিটে হয়ে থাকতো।রাত গুলো জেগে ভাবতো,সত্যিই কি গে হওয়া কোন অভিশাপ?ঈশ্বর কেন তাকে গে বানালো?সে তো চায়নি?কেন তার মস্তিষ্ক বিকৃত হলো?কেন তার জীনের ডিএনএতে সমকাম ঢুকে গেল?হায়,ঈশ্বর কেন সে সমকামী।হেলেন ছেলের অভিশাপ মুক্তির জন্যে যাজকের দেওয়া পবিত্র পানি ছিটাতে লাগলো সারা বাড়িতে।বিভিন্ন কবজ এনে লটকিয়ে দিল ববির এর রুমে।ববি যখন সন্ধ্যায় ফিরতো তখন এসব দেখে তার রাগ উঠতো মাঝে মাঝে টেনে ছিঁড়ে ও ফেলতো।প্রতিদিন সকালে মা এসে ববিকে বিভিন্ন পানি খেতে দিত আর বলতো এতে তার অভিশাপ কেটে যাবে।তার সমকাম দূর হয়ে যাবে।ববি খেত।

যদি মার কথা সত্যি হয়ে যায়।কিন্তু সত্য আর হয়না।দিনগুলো,মানুষগুলো পাল্টাতে লাগলো।ববির কাছে প্রতিটা সময় বিরক্তকর মনে হতে লাগলো।মাঝে মাঝে ইচ্ছে হতো ট্রেনের নিচে নিজেকে সপে দিতে।কিন্তু ঈশ্বর বলেন আত্মহত্যা পাপ।হায় ঈশ্বর আমায় সমকামী ও বানালে আবার আত্মহত্যা পাপ ও করলে।তা পারছি সমকাম থেকে বের হতে না পারছি,দুনিয়া থেকে বের হতে।কষ্টের আবেগ আর অনুভোতীতে আমায় আটকে দিলে।এটা কোন অভিশাপ।ঈশ্বর!এই বলে বলে ববি প্রায় কাঁদতো।ঐদিন গীর্জাতে গেল ববি।সাথে হেলেন আর তার স্বামী।সেখানে যাজক ববির উদ্দ্যশ্যে সমকামীরা যে ঈশ্বরের কত বড় অভিশপ্ত সেই আলোচনা করলো।

ববি আজ কাঁদেনি,চলে ও যায় নি।বসে থেকে শুনেছে।যাজকের প্রতিটা শব্দ যেন তার কাছে তীরের ফলার মতো লাগলো।তার শরীর থেকে যেন চামড়া কেটে কেটে তুলা হচ্ছে।বাড়ি ফেরার পর ববির মা খুব কাঁদলো।বাবা রাগ করে মান সম্মান হারানোর আগে গে ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করতে বললো।কোন এক আত্মীয়া সেখানে ছিল সে আরো কুরুচিপূর্ণ উক্তি করল।হেলেন কিছু বলল না,মেথিও না।আলব্রেড ও হয়তো কাঁদছিল।ববি সব শুনছিল।আজ তার কাছে পৃথিবীটা খুব বিরক্তকর লাগছিল।খুব কষ্টের লাগলছিল তার কাছে।তার জন্যে আজ এতো হ্যাপি পরিবারটা ভেঙে গেল।

সে রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে ছুটল রেল স্টেশনের দিকে।সোজা দাঁড়ালো রেলপথের সামনে।ববি জানে সে সমকামী।ঈশ্বর তাকে ঘৃণা করে।সে যদি আজীবন ঈশ্বরের পূজা করে তবুও সে নরকেই যাবে।আর যদি আত্মহত্যা করে তবুও নরকে।বেঁচে থেকে কষ্ট পেয়ে আর অন্যকে কষ্ট দিয়ে কি লাভ?ববি দাঁড়ালো ট্রেনের মুখমুখী।তার দু’চোখ বন্ধ।চোখ থেকে জড়ছে অশ্রু।ঈশ্বরের অভিশপ্ত কিশোর ববি কাঁদছে তাতে ঈশ্বরের কিছু আসে যায় না।কারন ঈশ্বর মহান ধার্মিদের জন্য।ববির মতো সমকামীদের মতো না।ববির চোখে জল ঝড়ছে আর ট্রেন ঝকঝক শব্দে এগিয়ে আসছে তাকে চাপা দিতে!শেষ।

ববিকে ট্রেনটা চাপা দিল।ঝকঝক ঝকঝক শব্দ করে রক্তপিপাসুকের মতো চলে গেল।আর রেলপথে পড়ে রইলো ববির ছিন্নবিন্ন মৃতদেহ।।হায়রে ধর্ম আর সমাজ!বাঁচতে দিল না,একটা কিশোর ছেলেকে।তার একটাই দোষ আর তা হচ্ছে সে সমকামী।আজ তার জন্যে আমরা প্রার্থনাও করতে পারবো না।কারন সে গে।আজ যদি তার জন্যে প্রার্থনা করি তবে তা হবে নিষিদ্ধ।ববি মৃত্যুর পর যদিও তার পরিবার তাদের ভুল বোঝতে পারে কিন্তু সে তো আর ফিরেনি।যে খাতাটাই সে রেলপথে বসে লিখতো তার সমগ্রটা জুড়ে একটাই লেখা,”হায় ঈশ্বর!আমি তোমাকে ঘৃণা করি।যেমন তুমি ঘৃণা করো আমাকে।”

———————————————————————-

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.