একটি নতুন প্রভাতের অপেক্ষা

আয়াদ মোহাম্মাদ হিমু

উৎসর্গ:-প্রিয় বন্ধু পৃত্থুজ আহমেদ

_____________________________________________

সময় রাত ১২ টা।হাতে এক মগ কফি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি বেলকনিতে।রাতের শহরটাকে অনেকটা অপরিচিত আকর্ষণীয় দেখায়।রঙিন বাতিগুলোকে তখন মনে হয় নিকষ কালো যামিনীর বুকে টিপ টিপ জ্বলা তারকারাজি।সেই সাথে একজন প্রেমিকের ঢিপ ঢিপ হৃদস্পন্দন।ভাবছি আর স্মৃতির গহীনে বুদ হয়ে যাচ্ছি একটু একটু করে।এই স্মৃতিগুলো যেনো বড্ড বেহায়া।ছাই চাপা আগুনের মতোই হঠাৎ করেই জ্বলে উঠে আর পোড়ামন টাকে আরেকটু পুড়িয়েই যেনো ক্ষান্ত হয়।তবে এই পোড়া স্মৃতিগুচ্ছ নিয়েই যেনো আমার বেঁচে থাকা।নিরন্তর জীবন সংগ্রামে এই স্মৃতিরাই যেনো ঢাল।ভাবছি আর অপেক্ষা করছি কখন ভোর হবে।কখন ফিরে যাবো আমার আপন নীড়ে।যেখানে রেখে এসেছি আমার প্রকৃত আমি কে।যেই আমিতেই আমার পূর্ণ অস্তিত্ব। যাকে মেনেছি আমার আমার বৈষ্ণব। যাঁর আর্চনাই ছিলো আমার প্রধান ব্রত।আবারও ফিরে যাচ্ছি আমার সেই উপাসনালয়ে বহুকাল পরে।আমার বিষ্ণু পূজো করতে।

হ্যাঁ!সে আমার।যে যৌবনের প্রথম প্রহরে আমার ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া তৃষাতপ্ত হৃদয়ে ভালোবাসার শীতল পরশ দিয়ে আমাকে সিক্ত করে আমার পুরো জীবন,যৌবন দখলে নিয়ে নিয়েছে।যাঁর জন্য এতোটা বছর অপেক্ষার আর্তনাদে নিত্য মরেছি। ফিরে যাচ্ছি তাঁর কাছে।আর তো কয়েক প্রহর ই মাত্র।তাঁরপরই দেখতে পাবো তাকে।

*

সবে দশম শ্রেণিতে উঠলাম কয়েকমাস হলো।আর কয়েকমাস পরেই আমার প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা।কিন্তু আমি!আমি সারাক্ষণ মোবাইল,ইন্টারনেট,আড্ডা এসব নিয়ে পড়ে থাকি।বইয়ের ধারে কাছেও ঘেঁষিনা।কিন্তু আমি যথেষ্ট মেধাবী।পড়ালেখা করিনা বিধায় কিচ্ছু পারিনা।কীভাবে যে আমি দশম শ্রেণি পর্যন্ত এসেছি তা আল্লাহ্ ই ভালো জানেন।আমার বয়স এখনো ষোলো ও শেষ হয়নি।এই বয়সেই আমি ইঁচড়ে পাঁকা স্বভাবের।সিগারেট খাওয়া,নীলছবি দেখা,এরপর হস্তমৈথুন করাটাও এক প্রকার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।মোটকথা উচ্ছন্নে যাওয়া মানুষদের যতোগুলো গুণ থাকা দরকার আমার মধ্যে ততোগুলোই বদগুনই আছে।আমার বাবা নিতান্তই ভালো একজন মানুষ।উনি একজন সরকারি কর্মকর্তা।তাঁর ছেলে হয়ে আমি কীভাবে এমন উচ্ছন্নে গেলাম,তাও পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বললে ভুল হবেনা।বাবা আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসেন।মাঝে মাঝে আমার কাছে এসে আমাকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেন।আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবা খুবই চিন্তিত।আর আমি!যেই লাউ সেই কদু!আমি কখনোই এতোসব গায়ে মাখিনা।তবে বাবার জন্য কষ্ট হয়।আমার কোনোকিছুতেই বাবা না করেন না।আমার কোনো অভাব রাখেনি বাবা।এমনকি মা চলে যাওয়ার পরও বাবা আমার কথা ভেবে আর বিয়ে করেন নি।আর আমার মা নাকি আমার জন্মের কয়েক মাস পরেই আমাকে রেখে তাঁর পুরাতন প্রেমিকের সাথে ভেগেছেন।ভাবতেই অবাক লাগে!যেখানে মায়েরা তাঁদের সন্তানদের জন্য নিজের জীবন বলিদান করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না,সেখানে আমার মা আমার জন্মের পর আমার জীবন সংকটে রেখে চলে গেলো,পার্থিব সুখের আশায়।আসলেই জীবনের সমীকরণ গুলো বড্ড বেরসিক এবং জটিলও বটে।ঝরাপাতার মতোই রসকষহীন জীবনের সমীকরণ।কেউ কেউ আছে জীবন সমীকরণের রসেই বুদ হয়ে থাকে আবার কেউবা সেই সমীকরণের রসে অন্বেষণেই নিরন্তর ছুটে চলে।হয়তো আমিও তেমনই একজন।

*

প্রতিদিনকার মতোই ক্লাসে বসে আছি।আমাদের স্কুলটা আমাদের এলাকার নামকরা একটা স্কুল।আমাদের এলাকাটা একটা মফস্বল শহর বলা চলে মোটামুটি।স্যার ক্লাসে অঙ্ক করাচ্ছিলেন।যথারীতি আমার সেদিকে কোনো মনোযোগই নেই।আমি আছি কোনো এক ঘোরের মধ্যে।কিন্তু কী নিয়ে ভাবছি সেটাই জানিনা। হঠাৎ স্যারের আওয়াজে ঘোর কাটলো।

সৌম্য!চক দিয়ে যাও তো।

স্যার চক আনার জন্য কাউকে ডাকলেন ক্লাসের দরজায় দাঁড়িয়ে।

কিয়ৎক্ষণ পর এক সুদর্শন যুবকের প্রবেশ দেখেই আমি পুরো ‘ত’ থেকে ‘থ’ বনে গেলাম।সে স্যারের হাতে চক দিয়েই আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যজনক হাসি দিয়ে চলে গেলো।আমি হা করে তাকিয়েই রইলাম ওর গমনপথে।আমার বন্ধুর খোঁচায় আমার হুশ ফিরলো।

কী রে!কী দেখছিস অমন করে?

আমি কিছুনা বলেই আবার ভাবনায় বুদ হলাম।কে এই ছেলে!যেখানেই যাই সেখানেই ঐ ছেলেকে দেখি।আমাকে জ্বালিয়ে মারলো এই ছেলে।

আমাদের পাড়ার শেষ সীমানায় একটা নির্জন বাগান আছে।সেদিন ওখানে বসে সিগারেট ফুঁকছিলাম।হঠাৎ ও কোত্থেকে এসে আমার হাতের সিগারেট টা নিয়ে ফেলে দিলো।আর একগাদা উপদেশ বাণী শুনিয়ে চলে গেলো।অন্য একদিন সেখানেই বসে মোবাইলে নীলছবি দেখছিলাম।আবারও এই ছেলে এসে আমার থেকে মোবাইলটা নিয়ে সবগুলো ভিডিও ডিলিট করে দিয়েছে। আমার ক্ষমতা থাকলে ওকে তখনই চোখের আগুনে ভষ্ম করে দিতাম।যেখানেই যাইনা কেনো ওর শকুনের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মনে হয় আমার উপরই থাকে।আরে!ছেলেটাকে তো আমি ঠিকমতো চিনিইনা।নামটা পর্যন্ত জানিনা।শুধু এটুকু জানি আমাদের পাড়ায় থাকে।আর এখানের নামকরা একটা কলেজে পড়ে।অনেক মেধাবী ছাত্রও বটে।কিন্তু ও আমাদের স্কুলে কী করছে?এটাই বিষ্ময়ের ব্যাপার!

*

পরেরদিন স্কুলে এসে জানতে পারলাম,সৌম্য আমাদের স্কুলের দপ্তরী সাকায়েত উল্যাহ্’র ছেলে।দপ্তরী নাকি অসুস্থ। তাই আর আসবেনা। এখন থেকে ওর ছেলেই এখানে কাজ করবে। শুনে আমার মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা।দপ্তরী আমাদের পাড়ায় থাকতো জানতাম,কিন্তু এই ছেলের জনক তা জানতাম না।এতোদিন পাড়ায় ছিলো,এখন স্কুলে এসেও জুঁটেছে।সারাক্ষণ আমাকে তো জ্বালাত।এখন স্কুলেও নিস্তার নেই।স্কুলেও তাঁর তীক্ষ্মদৃষ্টি থেকে রেহাই পাচ্ছিনা।এভাবে চলতে দেওয়া যাবেনা।কিছু একটা করতেই হবে।

কয়েকদিন পর টিফিনের সময় দেখলাম,ও কোত্থেকে যেনো হেলেদুলে আসছে।মনে হচ্ছে চোখ বন্ধ করে হাঁটছে।সামনে তেমন কোনো কিছু না থাকাই ভাব দেখাচ্ছে।সবুর করো বাছা!দেখাচ্ছি মজা!আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম,কয়েকটা কলার খোসা খুঁজে পেলাম।তাঁরপর সামনে ফেললাম,কারণ এদিক দিয়েই ও আসবে।আমিতো মনে মনে ভীষণ খুশি।ও আমার দিকে তাকালো,আমিও খুব স্বাভাবিক ভাবেই ওর দিকে তাকালাম।কিন্তু ও আমার সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে,খুব সাবলীল ভাবে কলার খোসাগুলো ডিঙ্গিয়ে চলে গেলো।আমি প্রচন্ড রেগে গিয়ে ওকে পিছন থেকে ধাক্কা দিতে তেড়ে গেলাম।অমনি ধপাস!মাটিতে পড়ে কাঁতরাচ্ছি।সৌম্য আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।আমার মেজাজ একেবারে তুঙ্গে চড়লো!কোথায় ও আমাকে সাহায্য করবে!তা না করে হাসছে।ও হাসতে হাসতে হাসতেই আমার দিকে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলো,আমাকে তোলার জন্য মাটি থেকে।আমি ওর তোয়াক্কা না করে নিজেই উঠে গদগদ করতে করতে চলে গেলাম।

কয়েকদিন পর।এক ছুটির দিন বিকেলে আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটছি।দেখলাম সৌম্য মহারাজ সামনে থেকে আসছে।দেখেই মেজাজ সপ্তম আসমানে।ভাবতে লাগলাম কী করে ওকে শায়েস্তা করা যায়!হাঁটার গতি কমিয়ে দিয়ে রাস্তার পাশের একটা পঁচা ডোবার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি।ওকে ডাকলাম খুব ভঙ্গিতেই।আর ও কেমন সবগুলো দাঁত বের করে হাসতে হাসতেই আসলো আমার দিকে।আমার পাশে দাঁড়ালো এসে।পাশে দাঁড়াতেই,ও কিছু বুঝে উঠার আগেই আমি ওকে ধাক্কা দিয়ে পঁচা ডোবায় ফেলে দিয়ে হাসতে হাসতে চলে এলাম।

পরেরদিন স্কুলে এসে দেখতে পারলাম,ও কেমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।আমার দিকে তাকিয়ে কেমন নিষ্প্রাণ একটা হাসি দিলো।আমার কেমন জানি অনুতাপ হচ্ছিলো।তবুও কোনোভাবে সেটা প্রকাশ করলাম না।

এভাবেই ওর সাথে আমার জাত শত্রুতা চলতেই থাকে।মনে হচ্ছে আমরা জন্ম জন্মান্তরের শত্রু।দেখতে দেখতেই প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা চলে এলো।আর কয়েকদিন পরই পরীক্ষা।এতো বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে পড়ায় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলাম।যদিও আমি কিছুই পড়বোনা জানি।

*

দাঁড়িয়ে আছি প্রধান শিক্ষকের সামনে।প্রধান শিক্ষক আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছেন,মনে হচ্ছে আমাকে এখনি গিলে খাবে।আমার অপরাধ আমি প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেইল করেছি।শুধু তাই নয়,আমি আজ আমাদের ক্লাসের রিনতির ওড়না টান দিতে গিয়ে ওর স্তনে হাত পড়েছে।আর রিনতি সেটাকে আরো তেল-মশলা দিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে নালিশ করেছে।যদিওবা ব্যাপারটা বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে করেছিলাম।

সকল শিক্ষকরা আছে প্রধান শিক্ষকের রুমে।সৌম্যও সেখানে আছে।প্রধান শিক্ষক অনেকক্ষণ পর বললেন,আমার বাবার কাছে নালিশ করবেন।কথাটা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা।বাবাকে কখনোই এসব কথা বলতে দেওয়া যাবেনা।আমি বাবার কোনো কথা শুনিনা ঠিকই,কিন্তু এসব শুনলে বাবা মরেই যাবে।আর বাবা ছাড়া আমার পৃথিবীতে আর কেউই নেই।আমি প্রধান শিক্ষকের পায়ে ধরে বলতে লাগলাম আমার বাবাকে না বলতে।কিন্তু উনি কোনো কথাই শুনছিলেন না।এক পর্যায়ে সৌম্যই এগিয়ে এসে প্রধান শিক্ষকের নিকট অনুরোধ করলো,আমাকে এবারের মতো ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য।সৌম্যর সাথে সকল শিক্ষকরাও বলছিলো একই কথা।কারণ কেউই চায়না একজন ছাত্রের জীবন খারাপ হোক।অবশেষে প্রধান শিক্ষক আমাকে মাফ করলেন এবারের মতো।সেইসাথে শর্তারোপ করলো,নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে আমাকে বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেবেনা।

আমি কিছু বললাম না।শুধু নতজানু হয়ে সৌম্যর দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকালাম।

সৌম্য আমাকে বাসায় পৌঁছে দিলো।

বাবা রিনতির ব্যাপারটা না জানতে পারলেও,পরীক্ষায় ফেইলের ব্যাপারে ঠিকই জানতে পেরেছিলেন। আর সেজন্য অনেক বকাবকিও করেছেন।এমনকি গায়েও হাত তুলেছে।এর আগে বাবা আমাকে কোনোদিন একটা টোকাও দেননি।

পরের দুইদিন স্কুলে যাইনি।লজ্জায়,ঘৃণায় যাইনি।প্রচন্ড অসুস্থও ছিলাম দুইদিন।সৌম্যই আমার সেবা শুশ্রূষা করে আমাকে সারিয়ে তুললো।দু’দিন পর স্কুলে গিয়ে আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।দেখলাম আমার বন্ধুরা আমার সাথে কথা বলছেনা।অথচ ওদের জন্যই আমি সবার কাছে খারাপ হয়েছি।

এসব নিয়ে মাথা ঘামালাম না আর।আমার লক্ষ্য হচ্ছে এখন যেকোনো ভাবেই নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।তাই এখন দম লাগিয়ে পড়াশোনা করছি।সৌম্যই আমাকে সর্বক্ষেত্রে সাহায্য করছে।আমাকে উৎসাহ দিচ্ছে,সাহস যোগাচ্ছে।ও এখন আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী।সৌম্যই যেনো আমার অভিভাবক।বাবা তো ভীষণ খুশি আমার এমন পরিবর্তনে।

*

আজ নির্বাচনী পরীক্ষায় ফলাফল ঘোষনা করবে।পরীক্ষা আমি ভালোই দিয়েছি।তবুও প্রচন্ড চিন্তা আমার।কী হয় নাহয় তাই ভেবে।কিন্তু সৌম্যকে দেখলাম খুব স্বাভাবিক বাচনভঙ্গি।যেনো ও জানে আমি খুব ভালো করবো পরীক্ষায়।মুখে চিন্তাভাবনার ছিঁটেফোটাও নেই।

অবশেষে ফলাফল পেলাম।খুব ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়েছি পরীক্ষায়।সোম্য অনেক খুশি।ও আমাকে কাছে এসে জড়িয়ে ধরে বললো,আমি জানতাম তুমি পারবেই।আমি ওর দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইলাম।অবাক ই হলাম আমার প্রতি ওর বিশ্বাস দেখে।

সৌম্যর সাথে আমার সখ্যতা দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে।আজকাল আমাদের পাড়ায় আমাদের একইসঙ্গে দেখায় সবখানে।যদিও আমাদের বয়সের বিস্তর তফাৎ রয়েছে।ওর সাথে আমার বিভিন্ন বিষয়াবলী নিয়ে কথা হয়।মাঝেমাঝে নিজেদের ব্যাপারেও কথা হয়।তবে খুবই কম।সৌম্য বলে,ও পড়াশোনা শেষ করে আমাদের স্কুলেই শিক্ষকতা করবে।ও এখন স্নাতক শেষ বর্ষে অধ্যয়ন করছে।আর কয়েকমাস পরই পর পরীক্ষা।ওর স্বপ্ন ও চাকরী পাওয়ার ওর বাবা মা দেখবে এবং ছোটো বোনটাকে মানুষ করবে।তাঁরপর,বিয়ে করে সংসারী হবে।কিন্তু কেনো জানি ওর বিয়ের কথা শুনতে আমার ভালো লাগেনা।বুকের ভেতর অদ্ভুত বেদনার স্রোতেরা উথালপাতাল করে।নিজেকে শূন্য মনে হয়।মনে হয় ওর স্ত্রীর জায়গায় আমি থাকলে আমি তো থাকতেই পারি।কিন্তু কেনো থাকবো?এর কোনো ব্যাখ্যা পাইনা।

একদিন রাতে সৌম্য আমায় ডেকে নিয়ো গেলো বাইরে।বাইরে এসে আমি বিষ্ময়ে হতবাক হওয়ার মতো অবস্থা!চাঁদের রূপালী কিরণে প্রকৃতি যেনো চিকচিক করছে।মনে হয় সাদা থান পরা কোনো এক রমনী আঁচল ছেড়ে হেঁটে চলছে বহুদূর।আর মাঝেমাঝে গাছের ছায়াগুলোকে মনে হয় রমনীর স্নিগ্ধ পায়ের ছাপ।

চলো মেতে উঠি জোৎস্না অবগাহনে,

নগ্ন পায়ে শীতল বালুকাময় উঠোনে।

মেতে উঠি চলো সোল্লাসিত যৌবন খেলায়,

প্রণয়ে প্রণয়িত দিগম্বর দেহের নগ্নতায়।

জোৎস্নার রঙে রঙিন হয়ে,

হারাই চলো জোনাকী হয়ে।

শরমেরা আজ সবই কাটুক,অবসান হোক সকল ভয়ের।

জোৎস্নারা আজ পড়ুক খসে খসে,

তোমার আমার প্রেমোল্লাসে।

আমি তন্ময় হয়ে ওর কবিতা শুনছি।এক অদ্ভুত ভালোলাগার আবেশ ছড়িয়ে গেলো দেহ মনে।ওর চোখে মুখে কেমন খুশির ঝিলিক দেখতে পেলাম।দুজন খুব কাছাকাছি বসে আছি।একে অপরের ঠোঁটের খুব কাছে।নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি যেনো।

এভাবেই চলতে লাগলো আমাদের সম্পর্ক।সৌম্য যেনো আমার অভ্যেসে পরিণত হচ্ছে ক্রমে ক্রমে।তাহলে কী আমি ওকে ভালোবাসি?কিন্তু তা কী করে হয়!এটা সম্ভব নাহ্।কারণ সৌম্য আমাকে কখনোই এভাবে মেনে নেবেনা।আর আমি এসব বলে সৌম্যকে হারাতে পারবোনা।

*

দেখতে দেখতে আমার এস.এস.সি পরীক্ষা ঘনিয়ে এলো।আমার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই সৌম্যর স্নাতক ফাইনাল পরীক্ষা।তাই দুজনেই পড়াশোনা নিয়ে এখন খুবই ব্যস্ত।দম ফেলার সময়টুকুও মনে হয় নেই।

পরীক্ষা খুব ভালোভাবেই দিলাম।এখন আমার কোনোকাজ নেই।কোনো ব্যস্ততা নেই।কিন্তু সৌম্য দিনদিন ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।ওর ব্যস্ততা যেনো ক্রমেই বাড়ছে।আগের মতো দেখা হয়না,কথা হয়না।ও তো পড়ালেখার কাজেই বব্যস্ত, তবুও মন মানতে চায়না।আর তাছাড়া এখন সারাদিন শুয়ে বসে থাকতেও ভালো লাগছেনা।

এমনই একদিন সৌম্যর কাছে গেলাম।গিয়ে দেখলাম ও পড়ছে।আমি ওর হাত ধরে টানাটানি শুরু করলাম আমার সাথে বাইরে আসার জন্য।কিন্তু সৌম্য কিছুতেই আসতে রাজি হচ্ছেনা।আমিও নাছোড়বান্দা।ওকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করছি তো করছিই।এক পর্যায়ে ও রেগে গিয়ে আমাকে কষে একটা চড় মারলো।এরপর বকাবকি শুরু করলো।একপর্যায়ে বললো,কে তুমি?আমার উপর অধিকার ফলানোর।

আমি কাঁদতে কাঁদতেই বেরিয়ে আসলাম।আর ভাবতে লাগলাম আসলেই তো!আমি কে ওর জীবনে?আমিতো কেউ না ওর উপর অধিকার দেখানোর।শুধু শুধুই ওকে বিরক্ত করছি,ওর ক্ষতি ছাড়াতো আর কিছুই করতে পারলাম না।তাহলে ওর জীবনে যেহেতু আমার কোনো স্থান নেই।তাহলে আমি ওর অপেক্ষায় কেনো পড়ে থাকবো!

বাসায় এসে বাবাকে বললাম,আমাকে শহরে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করতে।আমি আর এখানে থাকবোনা।শহরে গিয়ে পড়াশোনা।বাবা কোনো কথা না বলে,ব্যবস্থা করে দিলেন। দু’দিন পর চলে গেলাম শহরে।নতুন ঠিকানায়,নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার উদ্দেশ্যে।সৌম্যর সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখিনি।কেনোইবা রাখবো?আমিতো ওর কেউ না।ওর জীবনে আমার কোনো অস্তিত্ব ই নেই।

*

নিজের অজান্তেই দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো কপোল বেয়ে।এতোক্ষণ ভাবছিলাম আমার সৌম্যর কথা।হ্যাঁ!যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম।আর এখনো তাঁকেই ভালোবাসি।হয়তো ভবিষ্যতেও বাসবো।সেই যে নিজের এলাকা ছেড়ে আসলাম,আর যাওয়া হয়নি।সেখানকার স্মৃতিগুলোর সাথেই ফেলে এসেছিলাম আমার সৌম্য কে।তখন অপরিপক্ব অনুভূতিগুলো বুঝতে না পারলেও,এখন বুঝি ঐ অপরিপক্ব অনুভূতিগুলোই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।এখন বুঝি,সৌম্য আমার কতোটা জুঁড়ে আছে।আমি ওকে কতোটা ভালোবাসি।সৌম্যর সেদিনকার তিরস্কার ভালোই ছিলো।নাহলে আমি আমার ভেতরের সৌম্যর অস্তিত্বকে কখনোই খুঁজে পেতাম না।

বাবার সাথে অবশ্য যোগাযোগ আছে।সেদিন বাবা বললো সৌম্য নাকি বিয়ে করেছে।শুনে এতোটাও খারাপ লাগেনি।সৌম্য তো আমাকে কথা দেয়নি।আর ও তো আমাকে ভালোইবাসেনা।তাহলে ওর বিয়ে করাটাই স্বাভাবিক নয় কী!ভালোবাসা মানেই মিলন নয়।ভালোবাসার মানুষকে পেতেই হবে এমনটাও নয়।ভালোবাসা মানে তো অমিত অমিয়ের আলিঙ্গনে নিজেকে আবদ্ধ করা।মিলন সেখানে বড্ড তুচ্ছ ব্যাপার।

ভোর হয়ে আসছে।রাত প্রায় সাড়ে তিনটা বাজলো বলে।এতোদিন তো এই ভোরের অপেক্ষাতেই ছিলাম।যে প্রভাতে আমি আবার যাবো আমার স্মৃতির শহরে।আমার সৌম্যর কাছে।না ভালোবাসার দাবি নিয়ে নয়।যাবো আমার অস্তিত্ব খুঁজে নিতে।আমার অপরিপক্ব অনুভূতিগুলো পরিপক্বতায় রূপ দিতে।যেখানে দিগন্তের মতো আমার জীবনের শেষদিনগুলো রচিত আছে।

আচ্ছা সৌম্য কী আমায় চিনতে পারবে?

অবশ্যই পারবে।আমি যে তাঁর পরম আত্মীয়।নাই বা বাসুক সে আমায় ভালো।তবুও ঠিকই চিনে নিবে।আর আমিও ফিরে পাবো আমার আমিকে।যাঁর জন্য অপেক্ষা করেছি,এতোগুলো প্রভাত।

আর আজ সেই প্রভাত,আবারও নতুন প্রভাত হয়ে ধরা দিয়েছে।প্রতিনিয়তই আমি অপেক্ষমাণ ছিলাম,কবে আসবে আরও একটি নতুন প্রভাত।

প্রথম প্রকাশঃ-সাতরঙা গল্প

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.