জন্মদিন

দেবদূত

প্রথম পর্ব

…………………………….

গৌরচন্দ্রিকা–

ঢাকা শহরের মতিঝিল এলাকায় দুটো বিখ্যাত গোলচত্বর আছে। শাপলা চত্বর আর বক চত্বর। শাপলা হচ্ছে দেশের জাতীয় প্রতীক। বক হচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রতীক। বাংলাদেশে মজা করে বলা হয়, যত মানুষ, তত ব্যাংক। দুপাঁচজন বন্ধু একটু টাকা করলেই, খুলে ফেলেন নতুন ব্যাংক।

অভিবাসী শ্রমিকদের নিজের দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স আর এদেশ থেকে নবীজির দেশে পাঠানো যাকাতের অর্থে ব্যাংকগুলোর মূলধনের অভাব হয়না খুব একটা। এই অজস্র ব্যাংকের প্রধান দপ্তর হল এই মতিঝিল এলাকা। আগে ঢাকা শহরের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ছিল এই এলাকা। এখন গুলশানে অনেক সরকারি ও ব্যাক্তি এবং গোষ্ঠী মালিকানাধীন অফিস সরে যাওয়াতে, কিছুটা হাঁপ ছাড়ার জায়গা হলেও, মেট্রো রেলের কাজ শুরু হওয়াতে গোলমাল রয়েই গিয়েছে। শহরের পূর্বে বুড়িগঙ্গার আগে, গোলাপ শাহের মাজারের ওখানে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরণি অবধি আসবে এই রাপিড ট্রানজিট সিস্টেম। এর সঙ্গে যুক্ত আছেই রিক্সার দৌরাত্ম্য। বিমান থেকে সন্ধ্যারাতে ঢাকায় নামলে আকাশ থেকে বোঝা যায় মতিঝিল চত্বর। মনে হয় আকাশেই নাকে এসে লাগছে পরোটা আর মাংসের সুঘ্রাণ।

যাই হোক, মাটিতে ওই এলাকায় এত গোলমালের ভেতরেও শাপলা চত্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপরীতে, আর্মি বিল্ডিং এর পাশে রয়েছে এক ছোট্ট বাজার। সবজি থেকে মাছ সব নিয়েই বসে থাকে বিক্রেতারা। এইরকম নভেম্বর মাস তখন। নতুন নতুন শাক, ইলিশ মাছের ঝকঝকে পসরা নিয়ে বসে আছে দোকানিরা। বাজারের মুখে ফল, দেশী বিদেশী হরেক রকম। এই সবের দ্যুতি চারদিকের আলো পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে সব। প্রাণচঞ্চল জীবনের একটুকরো ছবি এই সন্ধ্যার বাজার। কিন্তু সব আলো ম্লান হয়ে যাচ্ছে নীল আর শুভ্রর চোখের আলোয় মুখের হাসিতে। ওরা আজ কথা দিয়েছে একে অপরকে, সারাজীবন পাশে থাকার। অনেক অনেক খুঁজে, অনেক ভেসে, অনেক ঘাটে পা ভেড়ানোর পর ওরা দুজন, দুজনকে পেয়েছে দুজনের জীবনে। সঠিক মানুষের খোঁজ কি সহজে মেলে!! অনেক সাধনা লাগে, তবে দৈবের বশে, সমস্ত জগৎ গ্রহ তারা চন্দ্র সূর্য এক হয়ে মিলিয়েছে ওদের। তাই আজ ওদের চোখের আলোর দীপ্তি, হাজার আলোর রোশনাই কেও ম্লান করবেই।

পরস্পরের হাত জোরে ধরে আছে ওরা। নীলের হাতের রক্তিমাভ তালু, ঋতু পরিবর্তনের কারণে একটু খসখসে। শুভ্র আরো জোরে ধরে আছে সেই হাত। ওই হাতেই তো হাসির ফুলের হার শত রঙে রং করা। মালয় থেকে এসে শুভ্রর একটু অসুবিধে হবার কথা। কিন্তু না, শত বিরূপ পরিবেশেও নীলের শহর ভাবলেই চারদিক সে সুন্দর দেখে। এ তার পূর্বপুরুষের শহরও বটে। এই মতিঝিল এলাকার কাছেই জন্ম হয়েছিল তার বাবার। এ শহর সম্পর্কে ছোট থেকে শুনে আসছে সে। কল্পনার সাথে অবশ্য বাস্তব মেলেনি। কারণ সময় পেরিয়ে গেছে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি। কিন্তু অবাক ভাবেই নীলের কষ্ট হয় এই ধুলো ধোঁয়ায়। কারণ, তার জন্ম শহর রাজশাহী বাংলাদেশ শুধু নয়, সারা পৃথিবীতেই অন্যতম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শহর বলে বিখ্যাত। সেদিন শুভ্রর একটু দেরি হয়েছিল এক সাহিত্যিক বন্ধুকে সাথে করে পান্থপথে আসবার সময়। একঘন্টার ওপর নীলকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ফুটপাথে আসবাবপত্রের দোকানগুলোর সামনে। ওর মুখের সামনে সিগারেট ফুঁকছিল অফিস ফেরত লোকজন। তাতেই খুব কষ্ট হয়েছিল নীলের। শুভ্র আসতেই সেকথা জানিয়েছিল নীল অকপটে। কিন্তু আজ, হাত ধরে ঘোরবার সময় ওখানেও মুখের সামনে ধোঁয়া ছাড়ছিল প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধ না হওয়া এ শহরের নাগরিকরা। কিন্তু নীলের একবারও সেদিকে মন যায়নি। শুভ্রর কাঁধে মাথা রেখে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল সে।

আসলে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথার উত্তর জানার ছিল নীলের, শুভ্রর থেকে। এতদিনের ফেসবুক চ্যাট আর কলে সঠিকভাবে আলোচনা করতে পারেনি সে ভালোভাবে। পারস্পরিক আলোচনার পর প্রত্যয়ী হয়ে শুভ্রর হাত ধরে হেঁটে চলেছে বাজারের দিকে। আঙুল তুলে দেখাচ্ছে নীল _

দেখো এই শাকগুলো কি সুন্দর না!! ওই মাছ দিয়ে এই শাকের খুব সুন্দর একটা রান্না আমি জানি। আমার বড় দিদি রান্না করত। তুমি icddr,b জয়েন করে চলে এলে আমি এগুলো বাজার করে রান্না করব। তোমায় সকালে আগে উঠে নাস্তা করে দেব। ডিমভাজা করব। আমাদের রাজশাহীর রান্না খুব সুন্দর। বিভিন্ন রান্না বিভিন্ন সময়ে করে খাওয়াব তোমায়। আমার দিদিটার থেকে সব শিখেছি একটু একটু করে। বিরিয়ানি থেকে পিঠে পায়েস অবধি। তোমায় জন্মদিনে করে খাওয়াব পায়েস, পিঠে। ভালো মাংস এনে বিরিয়ানি রাঁধব এমন, পাড়া প্রতিবেশী সুঘ্রাণে জেনে যাবে আজ তোমার জন্মদিন। শুভ্র তুমি তো জানোই, জন্মের সাথেই মা কে হারিয়েছিলাম আমি। এই বড় দিদিটাই আমার মা। কলকাতার ডাক্তার ভুল চিকিৎসা করে মেরে ফেলল আমার দ্বিতীয় মা কে। তুমি তখন থাকলে এমনটা হত না কিছুতেই। বলো, বলো, বলো….

শুভ্র শুধু শুনে যাচ্ছে। চুপ করে মনের ভেতর ঘনিয়ে তুলছে মিশ্র খাম্বাজে সরোদ এর আলাপ। সামনে থেকে দোতলা বাসগুলো চলে যাচ্ছে সায়েদাবাদ টার্মিনাল এর দিকে। তারাও যাবে দুজনে একসাথে জীবনের যাত্রাপথে। কোনো টার্মিনালে সেই গাড়ি বিশ্রাম নিতে ঢুকবে না। এগিয়ে যাবে, এগিয়ে যাবে।

পূর্বরাগ, রাগ এবং অনুরাগ–

মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টির নতুন অধ্যাপক গবেষক শুভ্র। ডক্টর অব মেডিসিন থিসিস লিখছে সে। এটা শেষ হলেই সে চলে যাবে নটিংহাম। তারজন্য বৃত্তি সে পেয়ে গেছে। তার থিসিসের সুপারভাইজর মালয়ে অবস্থিত এই ব্রিটিশ মেডিক্যাল স্কুলের অতিথি অধ্যাপক। তাঁর গবেষণা এগিয়ে নিয়ে চলেছে শুভ্র। ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়া নিয়ে তার কাজ। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই সমুদ্রঘেরা ক্রান্তীয় দ্বীপ রাষ্ট্র গুলোতে এই মারণ ম্যালেরিয়ার খুবই প্রকোপ। তার প্রাথমিক গবেষণা পত্র গুলো খুবই প্রশংসিত হয়েছে বিজ্ঞানী সমাজে। এমনকি খোদ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকুলার বায়োলজি ল্যাবরেটরির প্রধান শুভ্রর গবেষণাপত্রের পরবর্তী ধাপে কাজ করছেন। তাঁকে দিশা দেখিয়েছে শুভ্রর কাজ। সেই সুযোগেই তার ব্রিটেন যাত্রা। সেখানে অধ্যাপক ডেভিড ওয়ার্নার ল্যাব সাজিয়ে রেখেছেন শুভ্রর জন্য। যত জলদি সম্ভব আসতে বলছেন। কাজ শুরু করতে বলছেন।

শুভ্রর নিজের ও তার মায়ের জন্ম মালয়েশিয়াতে হলেও, তার বাবার জন্ম ঢাকায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের গোলমালের সময়ই শুভ্রর বাবারা চলে আসেন এই দেশে। শুভ্রর মাতামহ এক বিশাল পেট্রোল পাম্প চালান কুয়ালালামপুরে ভারত ভাগের আগে থেকেই। তাঁরা ছিলেন ফরিদপুরের।

নীল ঢাকায় পড়ছে তার নটরডেম কলেজে। মানবিক শাখায়। জে এস সিতে বৃত্তি পেলেও বিজ্ঞান নিয়ে পড়েনি সে। প্রথমে দু একদিন ক্লাস করে ছেড়ে দিয়েছিল। সে পড়বে মানবাধিকার নিয়ে। অহেতুক বিজ্ঞানের কচকচি দিয়ে করবেই বা কি সে!! বরং তার দরকার যুক্তিবিদ্যা নিয়ে পড়া। যুক্তিতে শান দিতে হবে তাকে। তবেই না পৃথিবী জুড়ে হয়ে চলা অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে পারবে, এগোতে পারবে মানবাধিকার রক্ষার দিকে। তাই সে নিয়েছে দর্শন, তর্কবিদ্যা, ইতিহাস এবং কম্পিউটার প্রযুক্তি। আধুনিক বিশ্বে পরিগণক বিদ্যায় ন্যুনতম ধারণা না থাকলে পারবে না সে তাল মেলাতে। বাংলা আর ইংরেজি তো আছেই। ইংরেজিতে সে ক্লাসের মধ্যে সেরা। বাংলাতে তো বটেই। কোন ছোট বেলা থেকে রাজশাহী শহরের লিটল ম্যাগ গুলোতে লেখে। কত প্রশংসা পেয়েছে পাঠকের সে। ছাত্র হিসেবে সব মিলিয়ে নটরডেম এর প্রথম পাঁচজনে থাকে সে।

নীলের বাবা সরকারি চাকরি করেন বদলির। তিনটি সন্তান তাঁর। বড় দুই মেয়ের পর এই ছেলে হতে গিয়েই তাঁর স্ত্রী মারা যান। অনেকদিনের গুপ্ত ফুসফুসের অসুখ ছিল ভদ্রমহিলার। নীলের বাবার উদাসীনতায় আর সংসারের চাপে চিকিৎসা হয়নি সঠিক। অল্প বয়সে দুই মেয়ের জন্মের সময় নরম্যাল ডেলিভারি হলেও এই এক ছেলে জন্ম দিতে গিয়ে বয়েসের কথা ভেবে ডাক্তার সিজারিয়ান সেকশনের সিদ্ধান্ত নেন। ছেলের জন্ম দিলেও, এনেসথেসিয়া সহ্য হয়নি তাঁর। টেবিলেই যাত্রা করেন অমৃতলোকে।

নীলের ছোড়দি বিয়ে করে সংসার করেছে। কিন্তু বড় দি সংসারের হাল ধরে বিয়ে করেননি। বাবা থাকেন বাইরে বাইরে। রাজশাহী এলেই মেতে থাকেন গানবাজনা নিয়ে। সংসারে কোনোকালেই মন ছিল না তাঁর। ভাগ্য করে প্রথম সন্তান পেয়েছিলেন। ছোট দুই সন্তানকে বড় করেছে ওই বড় মেয়ে। মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি কোনোদিন। বাবার উদাসীনতায় ও সিদ্ধান্তহীনতার অভাবে মায়ের মত মেয়েও চলে গেল অকালে। নীল দ্বিতীয়বার মাতৃহারা হল। কলকাতায় অসুস্থ মেয়ে নিয়ে চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাবা যদি মেতে থাকে গান আর ফিল্ম দেখা নিয়ে, তো অর্থপিশাচ ডাক্তাররা তো সুযোগ নেবেই। হার্টে সাধারণ এনজিওপ্লাস্টি করতে গিয়েই মারা যান নীলের দিদি। এখন রিটায়ার করে নীলের বাবা একটু চুপচাপ হয়েছেন, এই আর কি।

শুভ্রর তখন নিশ্বাস ফেলার সময় নেই। নিয়মিত ফেসবুক করলেও, তখন মন দিয়ে করার সুযোগ নেই। নটিংহাম পাড়ি দেবার আয়োজনে সে ব্যস্ত। এমন সময় একদিন একটা ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এলো। নাম নীল দরিয়া। ছবিতে রাজশাহীর পদ্মাপাড়ে সমুদ্র সবুজ রঙের জামা পরা এক ছেলে। প্রোফাইলে লেখালিখি দেখে আর কমন ফ্রেন্ড দেখে এড করে নিল সে। সুপারভাইজর সামনে বসিয়ে কাজ করাচ্ছেন তাকে দিয়ে। একটু ভুল হলেই বকছেন। কারন তাঁর প্রথম ছাত্রকে ইউরোপে পাঠাচ্ছেন তিনি। আদপে চীনা বংশোদ্ভুত এই মহিলা খুবই স্নেহ করেন শুভ্রকে। গর্বও করেন। এসময়ে নতুন বন্ধুর রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করে খেজুরে গল্প করার সময় নেই শুভ্রর।

আসল ঘটনা দুদিন পর থেকে শুরু হল।

——-

২য় পর্ব।

……………………….

একটুকু ছোঁয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি, তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী

——————————

এই দুদিন শুভ্র শ্বাস নেবার সময় পায়নি।

ড: ডেভিড কিছু তথ্য চাইছিলেন। দিনরাত এক করে শুভ্র সেই পরীক্ষা নতুন ভাবে করে রেজাল্ট পাঠিয়ে দিল নটিংহ্যাম এ। তবে শান্তি। ব্রিটেনে কাজের বিষয়ে ওঁরা এরকমই। এত্ত চাপের মধ্যে শুভ্রর একটা কাণ্ড হয়েছে।

খুব গভীরে গিয়ে হয়ত লিখছে বা এক্সপেরিমেন্ট করছে বা ম্যাডামের মুখের দিকে চেয়ে কথা শুনছে, তার মনের সপ্তম তল থেকে পাক খেয়ে উঠে আসছে একটা নাম। নীল দরিয়া। নীল দরিয়া। ২০০৮ থেকে ফেসবুক করছে শুভ্র। আগে অরকুট করত। কত সহস্র রিকু এসেছে । কই কোনো নাম তো এরকম মনে উথালপাথাল তোলে নি!!! তাও এরকম ব্যস্ততার মধ্যে!! এখন তার ২০০% মন দিতে হবে কাজে। তারপর সে যাবে তার ছোট্ট থেকে দেখা স্বপ্নের দেশে, স্বপ্নের কাজে। তার স্বপ্ন। তার মায়ের স্বপ্ন। সারাদিনে শত ব্যস্ততা থাকলেও প্রকৃতির ডাকে বা স্নান করতে মানুষকে বাথরুমে যেতেই হয় দুই তিন বার। পরপর তিনদিন শুভ্র খেয়াল করল যে একলা হলেই ওই নাম তার মনে ফিরে ফিরে আসছে। কি রে বাবা জাদু করল নাকি কেউ!! কোথায় রাজশাহীর কে রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে, প্রোফাইল ই ভালো করে দেখা হয়নি। তার জন্যে ” পরান পোড়ে ” কেন?

তিনদিন বাদে সব কাজ শেষ করে শান্তিতে বাড়ি ফিরল শুভ্র। খাওয়া দাওয়া সারল। তারপর নিজের বিছানায় বসে মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুক এপ খুলেই নীল দরিয়া বলে সার্চ দিল ফ্রেন্ড লিস্টে।

ওই তো সেই সমুদ্র সবুজ রঙের জামা পরা মায়াময় এক মুখ। আদি কবি কালিদাসের কুমারসম্ভব কাব্যের এক উপমা মনে পড়ে হেসে উঠল শুভ্র। উপমা কালিদাস লিখেছিলেন পার্বতী উমার নাভি দেশ বোঝাতে গিয়ে। সংস্কৃত সাহিত্যে বলা হয় ” উপমা কালিদাসস্য “। তো কালিদাস লিখছেন পার্বতীর নাভি গহ্বর কেমন? সেই সুগভীর সুমসৃণ নাভির চারপাশে মসৃণতর রোম রাজি ঘিরে রয়েছে। ঠিক মাঝে একটি ক্ষুদ্র সরোবর, চারপাশে কামিনী লতাগুল্ম ঢেকে রয়েছে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। সরোবরে ডুব দিলে কামিনীর সুঘ্রাণ পাওয়া যায়। অথবা মধ্যে এক অত্যুজ্জ্বল মাখন রঙের পোখরাজ পাথর। তাকে ঘিরে রয়েছে হীরে, মানিক্য, বৈদুর্য মনি, মুক্তা। তারা তাদের রঙে রসে ঘিরে রয়েছে মাঝের পোখরাজ কে কিন্তু সব ছাপিয়ে পোখরাজ এর সৌন্দর্য ছাপিয়ে উঠেছে।

নীল দরিয়া প্রোফাইলের সেই ছবি দেখে শুভ্রর মনে পড়ে গেল এই দুই উপমা। কারণ? কারণ এই, যে নীলের অনুপম মুখমণ্ডলের চারপাশে উদ্গত কোমল তর রোম রাজি। একইরকম ভাবে তারা তো সুন্দর বটেই। কিন্তু তারা আসলে সৌন্দর্য বর্ধন করেছে মুখ পদ্মের। এক জ্যোতি খেলে যাচ্ছে মুখে।

এতকিছু ভাবতে ভাবতে মেসেঞ্জারে নক দিয়েই ফেলল। জানতে পারল অপর জন রিকুর টোপ ফেলে অপেক্ষা করছিলেন কখন কথা বলি। ফাতনা নড়তেই কথার বন্যা শুরু হল। দুপক্ষই কথা বলতে লাগল এমনভাবে, যেন তারা কতকালের সঙ্গী। বোধ হতে লাগল যেন পরস্পরকে জন্মান্তর থেকে চেনে তারা। যেনো কথা হয়েই ছিল যে সামনের জন্মে ঠিক ষোলোতে ই প্রেমে পড়ে যাব আমরা।

শুভ্রর বৈশিষ্ট্য হল যে একসাথে বহুকাজ করলেও যে বিষয়ে ঢুকে পড়ে, সেটাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ” অকাজের ” ডাক বা ” বিনাকাজের ডাক” পড়লে তো কথাই নেই। দুজনে দুজনের জীবনে ঢুকে গেল শুভ্রনীল। নটরডেম এর পরীক্ষা, নটিংহ্যাম এর ডাক সব ভুলে দুজনে কেমন দুজনে মেতে উঠল। দিন যায়। সপ্তাহ যায়। নীল গান শোনায় শুভ্রকে। নীল গল্প শোনায় শুভ্রকে। সম্ভবত জীবনে প্রথমবার এরকম একনিষ্ঠ শ্রোতা পেয়েছে সে। এর আগে সে নিজে অনেকের শ্রোতা হয়েছিল। কথা হয় নিত্য। দুদিন বাদেই মতানৈক্য হয় এক সামাজিক রাজনৈতিক বিষয়ে। তাদের চ্যাটে কথা কাটাকাটি হয়। কারণ তারা তো জন্মান্তরের পরিচিত। নতুন দুদিনের আলাপ তো আসলেই নয়।

একটা সুবিধে মতন সময়ের পরে শুভ্র জিজ্ঞেস করে নীলকে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে। সে কি একা, নাকি সম্পর্কে আছে। নীল তাকে খুলে পরিষ্কার করেই জানায় যে সে মোটেই কোনো সম্পর্কে নেই। আগে ছিল কিছু, কিন্তু কোনোটাই বর্তমানে নেই আর। খুব গভীর হয়তো দুই তিনজনের সাথে তার সম্পর্ক হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেগুলো আর ভবিষ্যতের কোনো আলো দেখে না।

এরমধ্যেই শুভ্রনীল একসাথে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে। শুভ্রর অতীত সম্পর্কের বিষয়ে প্রথমেই সে খুলে জানিয়েছে সবকিছু। একটু খটকা থাকলেও সে নিয়ে আলোচনা হবে তাদের মধ্যে সেই ঐতিহাসিক বিকেলে। লক্ষ মানুষের ভিড়ে যেদিন এক হবে চারহাত।

আলাদা করে কখনোই তারা পরস্পরকে প্রপোজ করে নি। কেন জানি দুজনেই বুঝতে পেরেছিল দুজনের মনের কথা। ইচ্ছের কথা। একসাথে থাকার স্বপ্ন বুনতে শুরু করে দুজনে তাদের একটাই নক্সী কাঁথায়।

নীল টিউশন পড়া নিয়ে ব্যস্ত। শুভ্র ভাবছে একবার বাংলাদেশ গিয়ে দেখা করতেই হবে। এদিকে নটিংহ্যাম এ যাওয়া ফেব্রুয়ারিতে। সে কিছু বুঝতে পারছে না। সে অত ভাবছে না। সে মনে মনে অদৃশ্য ও অলৌকিক এক শক্তিতে বিশ্বাস করে। তাঁর কাছে সব কিছু নিবেদন করছে অন্তর থেকে। ছোট থেকে লালন করা স্বপ্ন। কিন্তু সবকিছুই তার কাছে তুচ্ছ, সম্পর্কের কাছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা যাবার মনে মনে। নীলের পরীক্ষা শেষ হবে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। তার পরেই ডাক দিয়েছে সে। এদিকে হঠাৎ ই অদৃশ্য শক্তির ইচ্ছায় এক গানের অনুষ্ঠানের ডাক এসে গেল। ছায়ানটে গাইতে হবে হেমন্তের সন্ধ্যায় প্রেমের গান।

আনন্দে নীল কে স্কাইপে ফোন করে প্ল্যান করল দুজনে মিলে। নীল তো আনন্দে ফেসবুক এ লিখে ফেলল লম্বা এক লেখা।

শুভ্রর আর তর সইছে না। প্রথমবার দেখবে নীলকে। প্রথমবার যাবে বাংলাদেশে। সব মিলিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। সে শুধু মনে মনে রচনা করে যাচ্ছে, কিভাবে কি হতে পারে। মানুষটি সামনে থেকেই বা কিরকম!! তার সাথে বয়েসের পার্থক্য রয়েছে খানিকটা। সব মিলিয়ে কীই হবে এই আনন্দে কেটে গেল দিনগুলো। এয়ার এশিয়ার সন্ধ্যার টিকিট। কুয়ালালামপুর থেকে কলকাতা। সেখানে ট্রানজিট নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে ঢাকা। ঢাকায় গানের উদ্যোক্তাদের আসার কথা ছিল। শুভ্র কায়দা করে তাদের এড়িয়ে গেছে। বলেছে বন্ধুরা আসবে নিতে। টেনশনের কিচ্ছু নেই। আসলে আসবে নীল। এয়ারপোর্ট এ নীল আসবে

শুভ্রর আর তর সইছে না। প্রথমবার দেখবে নীলকে। প্রথমবার যাবে বাংলাদেশে। সব মিলিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। সে শুধু মনে মনে রচনা করে যাচ্ছে, কিভাবে কি হতে পারে। মানুষটি সামনে থেকেই বা কিরকম!! তার সাথে বয়েসের পার্থক্য রয়েছে খানিকটা। সব মিলিয়ে কীই হবে এই আনন্দে কেটে গেল দিনগুলো। এয়ার এশিয়ার সন্ধ্যার টিকিট। কুয়ালালামপুর থেকে কলকাতা। সেখানে ট্রানজিট নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে ঢাকা। ঢাকায় গানের উদ্যোক্তাদের আসার কথা ছিল। শুভ্র কায়দা করে তাদের এড়িয়ে গেছে। বলেছে বন্ধুরা আসবে নিতে। টেনশনের কিচ্ছু নেই। আসলে আসবে নীল। এয়ারপোর্ট এ নীল আসবে শুভ্রকে নিতে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ওরা দুজনেই। কি হবে কি হবে!! শুভ্র পরেছে হালকা গোলাপি রঙের কাঁথা স্টিচের কাজ করা জামা।

সকালবেলা নীল মেসেজ করল, গাজীপুরে থাকেন ওর জেঠু, ভোর রাত্তিরে মারা গেছেন। শেষ কৃত্যে ওকে উপস্থিত থাকতেই হবে। ব্যস!! সমস্ত কিছুতে জল ঢালা হল। নীল আসতে পারবে না এয়ারপোর্ট এ। ওর সাথে কথা বলেই সব প্ল্যান। গানের উদ্যোক্তাদের বারণ করে দেওয়া। এদিকে এয়ার এশিয়া মেসেজ করেছে যে ফ্লাইট দুঘন্টা লেট্ হবে। তখুনি আবার এয়ার ইন্ডিয়া ক্যানসেল করে বিমান বাংলাদেশের শেষ ফ্লাইটের টিকিট করল শুভ্র। পৌঁছতে প্রায় রাত নটা হবে। নতুন শহরে একলা!! জিনিস থাকবে কিছু। নীলের জন্যই নিয়েছে বেশিরভাগ। চিন্তা হচ্ছে শুভ্রর।

এদিকে নীল পড়েছে মহা ফাঁপরে। পারিবারিক দায়ে জেঠুর শেষকৃত্য সেরে, তিনদিনের কাজ সেরেই তাকে যেতে হবে। আবার শুভ্র আসছে আজ তার কাছে, তার জন্য বিদেশ থেকে কত পথ পাড়ি দিয়ে। কি করবে সে!! গাজীপুরে দুপুরের মধ্যে শেষকৃত্য সেরে ঢাকা যাওয়াই যায়। কিন্তু বাড়ির পরিবেশ ঠিক নয়। লোকে কি বলবে!! গ্রাম এলাকা। এই পরিবেশে কেউ ঢাকা যাবার কথা ভাবতে পারে?? কি এমন কাজ তার হোস্টেলে ফেরার?? যে রাতেই যেতে হবে?? এদিকে শুভ্রও অধৈর্য হয়ে উঠেছে। সেও অবুঝের মতন বলছে যে কেন তুমি আসবে না!! সব মিলিয়ে খুব জটিল পরিস্থিতি এক। নীল ও তাকে সবটা বুঝিয়ে উঠতে পারছে না। শুভ্র বুঝছে কিন্তু, ভাবছে যে মানুষটার জন্য নদী সাগর পেরিয়ে আমি আসছি, সেই মানুষটাই থাকবে না?? দেশে নেমে তাকেই দেখবে না প্রথম?? আসলে শুভ্র তার বয়েসের মতন করে ভাবছে। এদিকে নীল অল্প বয়স। সে নিজের ইচ্ছাতে চললেও কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক বাধ্যবাধকতা তাকে মানতেই হয়। কি করবে সে!! এই জেঠু তার প্রিয় তো নয় ই। কিন্তু রক্তের সম্পর্কের মানুষ। তাকে এরকম দিনেই মরতে হল?? কি করবে নীল?? কি হবে আজ?? বাংলাদেশে প্রথমবার নেমে শুভ্র কি করবে?? কোথায় যাবে??……….

৩য় পর্ব।

…………………..

হেমন্তে কোন বসন্তেরই বাণী

—————————————-

ভরা আঘন মাস।

বিমান থেকেই শুভ্রর হার্টবিট বাড়তে লাগল যেই জানলা থেকে নিচে আলোকোজ্জ্বল ঢাকা শহর নজরে এলো। হালকা হিমের চাদর ওপর থেকে বোঝা যায়। ফ্লাইট অনেক দেরি হয়েছে। নিচের ওই আলোর মধ্যেই নীল অপেক্ষা করছে তার চোখদুটি নিয়ে। কুয়ালালামপুর থেকে কলকাতা অবধি খুব মন খারাপ ছিল শুভ্রর। কান্না পাচ্ছিল ওর। সেটাই ও তিরিশ পেরিয়েছে বলে রাগ হিসেবে প্রকাশ পায়। এই বিষয়ে সেদিন একজন সিনিয়রের সাথে কথা হচ্ছিল শুভ্রর। স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী সংসারে কষ্ট নিয়ে বাঁচেন, কিন্তু মহিলাদের একটা ইমোশনাল মুক্তির জায়গা আছে। সে কাঁদতে পারে। সন্তান থাকলে তাদের সাথে কথা বলতে পারে। আধ্যাত্মিক জীবনে সম্পৃক্ত হয়ে মোড় ঘুরিয়ে মন ঘুরিয়ে রাখতে পারে কিছুটা সে। এছাড়াও নাতি নাতনি রান্নাবান্না মায়া মমতা এসব নিয়ে ব্যস্ত থেকে বাকি জীবনটা কাটানো যায়। কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যু হলে, সেই বিপত্নীক পুরুষ বড়ই অসহায়। পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষ নিজেকে অসহায় ভেবে বড় হয় না। কিন্তু স্ত্রীর অবর্তমানে সত্যিই সে অসহায়। সে লোক দেখিয়ে কাঁদতে পারে না। ছেলে বৌমাদের সাথে ইমোশনাল কথা বলতে পারে না। অহেতুক দেখনদারি আধ্যাত্মিক জীবন নিতে পারে না। খিদে পেলে তৃষ্ণা পেলে কষ্ট হলে মা তার সন্তানকে বা সন্তানসম কাউকে বলতে পারেন। কিন্তু বাবারা কি পারেন?? না, পুরুষরা অত সহজে নিজেকে ভাঙতে পারেন না। কম বয়সে তাই কান্না পেলে, পুরুষ রেগে যায়। একমাত্র মা বোঝে তার অসহায়তা। বাইরের রাগের ভেতরে পুরুষের যে কতখানি অসহায়তা আছে, সেটা সহজে চট করে বোঝা যায় না। এই স্বামী স্ত্রীদের ক্ষেত্রে বললাম, সমকামী পুরুষ যুগলদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা খুবই বলবৎ থাকে। যিনি বয়েসে ছোট থাকেন, তিনি কেঁদে, অভিমান করে, রাগ দেখিয়ে, না খেয়ে এরকম অনেককিছু করে নিজের অসহায়তা প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু যিনি বয়েসে বড়, তাঁর অসহায়তা প্রকাশ করার উপায় ও মাধ্যম, দুইই খুব সঙ্কুচিত। তাঁর খুবই বিপদ। বয়েসের কারণে সমবয়সী বন্ধুদের কিছু বলতে পারেন না। তারা সকলেই বিয়ে করে সংসারী। অল্প বয়সে যেটা সহজেই কলেজ ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের কাছে নিজের মতন বলা যায়। মোদ্দা কথা, বয়েস বাড়ার সাথে সাথে পুরুষ হয়ে পড়ে ভেতরে ভেতরে খুবই অসহায় ও ভালনারেবল। হৃদিবান নিঃস্বার্থ প্রেমিকরা হয়তো বুঝতে পারে। উপলব্ধি করে। তাই প্রেমিককে বুকে আগলে রাখে।

যাই হোক শুভ্র এখন কুয়ালালামপুর থেকে কলকাতা এসে পৌঁছেছে। ওয়াই ফাই তে অন হবার সাথে সাথেই নীলের মেসেজ, তখন সন্ধ্যে ছটা। আমি প্রায় এসে গেছি এয়ারপোর্ট। ম্যানেজ করতে পারলাম। তুমি আসছো প্রথমবার, আমার দেশে, আমার শহরে, আমি কি না এসে থাকতে পারি শুভ্র? প্রিয় আমার?!?

এই মেসেজ পড়ে শুভ্র এক্কেবারে সাত আসমানের মাথায় চড়ে বসল। অনেকগুলো ইমোজী পাঠিয়ে লিখল আমি তো সবে কলকাতায়। দুঘন্টা বাকি তো ফ্লাইটের। বাংলাদেশ বিমান দেরি করবে। তোমার কতক্ষণ লাগবে এয়ারপোর্ট পৌঁছতে??

সারাদিনের ক্লান্তিতে নীল খুব ধকলে ছিল। মৃত্যু খবর পেয়ে আগের রাতে পৌঁছেছে। সকাল থেকে কাজকর্ম সেরে দুপুর নাগাদই বেরিয়ে পড়েছে। সেরকম খাওয়াও হয়নি। ভাবছে শুভ্র নামলে ওকে নিয়ে একেবারে খেতে যাবে শান্তি করে। তবুও মনের ভেতরে তার অপার আনন্দ। নীলের বাইরের চরিত্রে একটা শান্ত ধীর ভাব আছে। কখনো কখনো খুব উচ্ছ্বলতা করে। তবে সেটা খুব পরিচিত মহলে বা খুব খুব আনন্দের কিছু হলে তবেই। ফুর্তিতে থাকলে শুভ্রর সাথে ভিডিও কলেও উচ্ছ্বলতা করে ওঠে। টিকটক এপের তো কি এক উদ্ভট গলার আওয়াজ ওয়ালা ভিডিও আছে। একদিন ভিডিও কলে কোনো কথা নেই। চুপ করে শুভ্র শুধু তাকিয়ে নীলকে দেখছিল। সবসময় তো আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না। নীলের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেও হাজার কথা বলা হয়ে যায় ওদের। তো সেদিন হঠাৎ করেই নীল সেই টিকটক এপের আওয়াজটা করে ফেলল। শুভ্র ল্যাবে বসে কম্পিউটারে কাজ করছিল। ভিডিও কল হলেও, যেহেতু কথা হচ্ছে না, শুধু চোখের ইশারাতেই ভাববিনিময় চলছে, তাই ও আর হেডফোন লাগিয়ে রাখেনি। ওদিকে নীল তো কিছু বুঝছে না। সে হঠাৎ করে ওই আওয়াজ করতে লাগল বেশ কয়েক বার। এদিকে শুভ্রর ল্যাবে বসে থাকা লোকজন চমকে গিয়ে হাসতে হাসতে সে এক কাণ্ড। শুভ্র তো ফোন টোন বন্ধ করে ম্যানেজ দেবার দুর্বল চেষ্টা করে গেল। কিন্তু প্রেম এমন এক বিষয়, যে তাতে অপমানিত হবারও এক আনন্দ আছে। রাধা যেমন, কালার পিরীতে শেষ হল, অপমানিত হল, কিন্তু তাকেই আশ্রয় করে আজো অমর হয়ে রইল। কানুর নামের আগে তারই নাম উচ্চারিত হয় চিরকাল। কৃষ্ণ রাধা নয় গো, রাধাকৃষ্ণ। রাধেশ্যাম। লায়লা মজনু।

যাই হোক, নীলের তো চপল স্বভাবের একটু ইঙ্গিত দেওয়া গেল। কিন্তু আদপে ও শান্ত, ধীর, স্থির। একটা গভীর সরোবরের পাশে বদলে যেরকম শীতল হাওয়ার শান্তি পাওয়া যায়, নীলের পাশে বসলেও তেমনই অনুভব হয়। তবে একবার জেদ করলে বা অভিমান করলে, টানা দুদিন না খেয়ে একজায়গায় বসে থাকতে পারে নীল। এই বিষয়টা শুভ্র, তার মায়ের কাছেও শুনেছে। শুভ্রর মা, নিজেও বিয়ের আগে রাগ অভিমান হলে না খেয়ে ঘরের একজায়গায় বসে কাটিয়ে দিতেন দিন সাতেক। এক অদ্ভুত রকমের সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের সহাবস্থান আছে ওর মধ্যে। তবে আদপে নরম মনের মানুষ নীল। ওকে একটু ধৈর্য নিয়ে গভীরে গিয়ে বুঝতে হয়, এটা বুঝেছে শুভ্র।

সারাদিনে শুভ্রর সাথে ছেঁড়া ছেঁড়া কথা হয়েছে নীলের। ভালো করে নজর দিতে পারেনি শিডিউলে। বাড়ির গোলমাল তাকে বিরক্ত করে রেখেছিল। এখন দেরি হবে শুনে খুব রাগ আর বিরক্ত তার ও লাগল। আসলে এও এক পুরুষের অসহায়তা। কিন্তু তখন সব বুকে চেপে মেসেঞ্জার ভিডিও কল করে বলল কোনো সমস্যা নেই। আমি অপেক্ষা করব বাইরে। তুমি এসো।

কলকাতায় বিশ্ববাংলার লাউঞ্জে ঢুকে দুটো রাজা রানী কাঠের পুতুল কিনল। একটা গোপাল ভাঁড়ের পুতুল কিনল কৃষ্ণনগর গ্যালারি থেকে। আসলে শুভ্র বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে। উতলা হয়ে আছে ওই দুই চোখের জন্য।

বিমান তো পৌঁছল ঢাকায়। এদিকে সেই এয়ারপোর্ট তো গণ্ডগোল এ ভরা। বিশৃঙ্খলা চারদিকে। সাথে সৌদি থেকে দুটো বিমান পরপর এসেছে। ইমিগ্রেশন এ বিশাল সর্পিল লাইন। ইমিগ্রেশন পুলিশ তার মধ্যে নোয়াখালী বরিশাল নিয়ে বচসা করছে। বেচারি নীল বাইরে চারঘন্টা দাঁড়িয়ে ক্লান্ত বিধ্বস্ত। ওর পিঠের ব্যাগের বাইরের চেনে চারশ টাকা ছিল। সেটা কেউ ছিনতাই করেছে এয়ারপোর্টের বাইরের গাছতলার ভিড়ে। ও শুভ্রর সাথে চ্যাটে মশগুল ছিল। সব মিলিয়ে সে এক গোলমাল।

আজ নীল পরেছে কালো প্যান্ট, শ্রী লেদার্স এর কোলাপুরি চপ্পল আর গায়ে পুলিশ ব্র্যান্ডের বটল গ্রীন জমিতে সাদা স্ট্রাইপ দেওয়া টি শার্ট। পিঠে ছাই ছাই রঙের ব্যাকপ্যাক। ওই পিঠের ব্যাগে রয়েছে ওর বড় দিদির দেওয়া পেট খারাপ জ্বরের ওষুধ। অনেক কিছুর স্মৃতিতে ভারী সেই ব্যাগ।

অপেক্ষার শেষ। শুভ্র গ্রীন চ্যানেল দিয়ে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু ওর কাছে সিম নেই। বাইরে বেরোলেই ওয়াই ফাই চলে যাবে। ও নীলকে বলল ঠিক গেটের কাছে দাঁড়াতে। বেরিয়ে চারদিক দেখে কোত্থাও দেখতে পাচ্ছে না নীল কে। কি হবে!! এত্ত লোক, শুভ্র ভাবতেই পারেনি। এত্ত ভিড়ে কেমন চমকে গেছে সে। এভাবে দুমিনিট কাটল। সেই সময়ে দুই মিনিট ই মনে হচ্ছে দুঘন্টা। একজনের থেকে ফোন চেয়ে কল করল শুভ্র বাধ্য হয়ে। হ্যাঁ, ওই তো নীল ধরেছে।

কই কই তুমি?? একরাশ আকুতি শুভ্রর গলায়।

নীল বলছে, এই তো এই তো আমি।

আরে এই তো মানে কোথায়?? আমি তো ঠিক জুস পার্লারের পাশে।

আমি তো ঠিক গাছটার সামনে। বললাম না তোমায়!! ওহ ওই তো। দেখতে পেয়েছি।……

৪র্থ পর্ব।

————————-

আনন্দ বসন্ত সমাগমে

……………………………

শুভ্র নীলকে পেয়েই বুকে জড়িয়ে ধরল।

বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে নীলের হয়তো একটা ভাবনা কাজ করছিল। শুভ্রর আচরনে সেটা সহজ হয়ে গেলো। দুজনেই সামনে এসে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। দুজনে দুজনের হাত শক্ত করে ধরে আছে। শুভ্র বলল উবার বুক করি চল। তোমার ওয়াই ফাই টা দাও প্লিজ। নীল বলল শোনো, তোমার হোটেলে কিন্তু আগে নয়। আগে চল আমরা খেতে যাই।

এয়ারপোর্টে উবার পেতে দেরি হল না। দুজনে উঠে বসল গাড়িতে। পেছনের সিটে ডানদিকে শুভ্র, বামদিকে নীল। বড় রাস্তায় পড়তেই নীল শুভ্রর কাঁধে মাথা রাখল।

এতদিনের প্রতীক্ষার পর এই দিনে এসে ওরা চুপ হয়ে গেছে। পরস্পর, পরস্পরের সান্নিধ্য টুকু উপভোগ করছে। এত আনন্দে, পরিপূর্ণতায় ওরা শান্ত হয়ে গেছে। গাড়ি ছুটেছে ঢাকা শহর ভেদ করে। নীলের ইচ্ছে হান্ডি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবে শুভ্রকে। পুরানা পল্টনের এই দোকানের অনেক প্রশংসা শুনেছে লোকের মুখে। ঢাকা শহরের মধ্যম মানের এক রেস্তোঁরা এটি। অভিজাত সেইরকম কিছু নয়। কিন্তু তারপরেও খাবারের মান খুব ভালো। শুভ্র মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ঠিকই। কিন্তু সকলেরই স্কুল কলেজ জীবনের কিছু স্বপ্ন থাকে।

সেগুলো হয়তো রত্নহারের মত দামী নয়, তবে জুঁইফুলের গোড়ে মালার মতন পবিত্র অথচ মহার্ঘ। নীলের ছোটখাটো স্বপ্নের মধ্যে এও একটি সেরকম। আসলে রাজশাহী থেকে নটরডেম কলেজে পড়তে আসার পর ওর রুমমেটরা খেতে গিয়েছিল ওখানে। নীল তো একটু ঘরকুনোই বলা চলে, ফেসবুক মেসেঞ্জার এ সে সর্বজ্ঞ হলেও বাস্তবে ঢাকা শহরের সেরকম কিছু চেনে না সে। মনের সঠিক মিল না হলে মিশতেই পারেনা সে। বাইরে বেরোনো তো অনেক বড় বিষয়। একবার খালি বই কিনতে বাংলাবাজার গিয়ে সদরঘাট ঘুরে এসেছিল দুজন বন্ধুর সাথে। সেখানে গিয়ে প্রথম টিকটক ভিডিও করে নীল। যাই হোক, ওই রুমমেট দের মুখে এই হান্ডি রেস্তোরাঁর প্রশংসা শুনে ওর মনে একটা সুপ্ত ইচ্ছে ছিল। প্রেমিককে নিয়ে খেতে গেলে এখানেই যাব।

অনেক রাত হয়ে গেছে। শুভ্র ওর গেস্ট হাউসে ইনফর্ম করে রাখল। গানের অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে। বলেছে বন্ধু ওকে পৌঁছে দেবে। প্রায় বারোটা বাজার একটু আগে ওরা নামল পল্টনে। ঢুকে ওরা খাবার অর্ডার করল। এইসব বিষয়ে নীল খুব সংকোচ বোধ করে। শুভ্র খাবার অর্ডার করল। লখনৌ বটি কাবাব, রায়তা স্টাটারে। এর সাথে মাটন হায়দরাবাদি বিরিয়ানি আর বিফ কালা ভুনা। শেষে কুলফি মালাই এর কথা আগে থেকে জানিয়ে রাখল ওয়েটার কে। মনের উদ্বেগ চেপে না রাখতে পেরে নীল জিগেস ই করে ফেলল শুভ্রকে, হ্যাঁ গো তুমি কি বিফ খাও?? নাকি আমার জন্যই নিলে? সেক্ষেত্রে চিকেন নিলেই হয় তো। শুভ্র হাসিমুখে জানালো, কোনো খাবারের প্রতি, কোনো চাপিয়ে দেওয়া ছুঁতমার্গ তার নেই। শুনে নীলের খুব আনন্দ হল। সেও তো ছোট থেকে কোনো ঘেরাটোপে নিজেকে বাঁধতে চায়নি। চাপিয়ে দেওয়া বন্ধন, তার কাছে অসহনীয়। যা স্বভাব, তাই স্বাভাবিক, তাইই আচরণ করা উচিত বলে সে মনে করে।

ওয়েটারকে অর্ডার করে দুজনে মুখোমুখি বসল। মোবাইল বার করে নীল কয়েকটা সেলফি তুলল দুজনের। কথা হতে লাগল নানা বিষয়ে। আসতে আসতে নীল সহজ হয়ে উঠছে। কথার ফোয়ারা তার মুখে, খুশির আলো তার চোখে। বড় একটা রুমাল হাতে নিয়ে বারবার মুখ মুছছে নীল। এসির মধ্যেও আনন্দের আতিশয্যে ঘেমে উঠছে সে।

আর শুভ্র? আকস্মিক তার স্বপ্ন সাকার হয়েছে অল্প দিনের নোটিশে। তার মুখের সামনে বিশ্বের সকল সৌন্দর্য এক করে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এক মুখচন্দ্র। তার জ্যোতিতে পেছনে ফিকে হয়ে যাচ্ছে নটিংহ্যাম, কুয়ালালামপুর, অক্সফোর্ড, সমাজ, সংসার সব কিছু। কথা শুনতে শুনতে সে হারিয়ে যাচ্ছে আরো কোনো গভীর নীলের মাঝখানটায়। আর নীল বলেই যাচ্ছে, সেজেগুজে বেরোনো দেখে বাড়ির লোক কি বলল!! হঠাৎ রুমমেট এর সাথে বাস থেকে নেমে দেখা হওয়ায় সে কি বলল!! হোস্টেলের দারোয়ান কে কি বলবে!! শুভ্রর জামার রংটা সুন্দর। তার এই রুমাল বড় দিদি দিয়েছিল। এরকম কত কথা সে নাগাড়ে বলেই চলেছে। ওয়েটার এসে খাবার দিলে, ওরা একটু একটু করে খেতে শুরু করল। চারদিকে মায়াবী হলুদ আলোর মধ্যে নীলকে দেখাচ্ছেও অপরূপ!! সমস্তটাই ওদের দুজনের কাছে স্বপ্নের মতন মনে হচ্ছে।

কুলফি খেতে খেতে নীল বলল গাড়ি বুক করি?? তোমায় গেস্ট হাউসে নামিয়ে আমি হোস্টেল ফিরে আসব। এদিকে রাত একটা বেজে গেছে দেখে শুভ্র বলল, নীল বাবু, আজ রাতটা আমার সাথে গেস্টহাউসে থেকে যান। মাঝ রাত্তিরে হোস্টেলে আর নাই ফিরলেন। শুনেই নীল বলল না গো। কোনো সমস্যা হবে না। আমি দারোয়ানকে বলে রেখেছি। মনে মনে তার ইচ্ছে গেস্ট হাউসে যাবার ঠিকই। কিন্তু আবার মনে মনে এটাও ভাবছে, এ কী! তার স্বপ্নের প্রেম কুয়ালালামপুর থেকে উড়ে এলো। এরকম স্বপ্নটা এক ছাদের তলায় অন্ধকারে যদি হারিয়ে যায়??

তার প্রেমিক কি আর পাঁচজনের মত? যে প্রথমদিনের সাক্ষাতেই সুযোগ খুঁজছে?? শুভ্রও কি তবে শুধু সুখের জন্য তার কাছে এলো?? যেমন এর আগে বাকিরা এসেছে!! ওর ও কি তবে ধৈর্য, সাধারণ প্রবৃত্তি দমন করার সুশিক্ষা নেই? বাইরে শুভ্রকে কিছু বুঝতে না দিলেও ও মনে মনে ওপর ওলাকে ডাকছে, এমন কিছু কর, যাতে এত সুন্দর বুকে লালন করা স্বপ্ন আমার বুদবুদের মতন ফেটে না যায়। সত্য ভালোবাসার সন্ধান দাও আমায় প্রভু। যারা সুখের জন্য প্রেম চায়, তারাই তো সবার আগে সুখ হারায়।

গাড়ি চলে এলো। শুভ্রর পাশে বসে চুপ করে আছে নীল। অনেক কিছু ভাবছে সে। দেখতে দেখতে আসাদ গেট এর গেস্ট হাউস এসে গেল। শুভ্র বলল দেখো নীল, রাত দুটো বাজে। এত রাতে তোমাকেই বা একা যেতে দিই কি করে বল!! থেকে যাও আজ। কোনো চিন্তা নেই। এই শেষ চিন্তা না করার কথাটা বেশ জোর দিয়ে বলল শুভ্র। ওর মনেও নীলের দ্বিধা প্রকাশ পেয়েছে ও কাজ করছে। তাই নীলকে আশ্বস্ত করতে সে বেশ জোর দিয়ে বলল। নীলের মনে দুরকম বিষয় কাজ করছে। সে থাকতে চাইছে। কিন্তু ভয় ও পাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত ভয়। আচ্ছা, শুভ্রকে তো সামনাসামনি আজকেই চিনল ও। আচ্ছা এরকম যদি হয়, যে বিদেশ থেকে দুদিনের জন্য এসে নীলকে ভোগ করে চলে গেল শুভ্র। আর এলো না। তখন কি হবে!! নীল কি নিজেকে এত সস্তা করে দেবে!! না নীল এরকম নয়। ওর চরিত্রের দাম আছে। এত সহজ ও নিজেকে করবে না। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে গেস্ট হাউসে ঢুকেই পড়ল শুভ্রর সাথে। স্টাফকে বলল শুভ্র, এ আমার বন্ধু। এও থাকবে। আমি জানিনা কেমন রুম ব্যবস্থা করা, আমাকে প্লিজ ডবল বেড রুম দিন একটা। বেশি কিছু লাগলে আমি দিয়ে দেব। স্টাফ জানালো, চিন্তা নেই স্যার। আমাদের সব রুমগুলোই ডবল বেড। আপনারা থাকুন। সকালে ম্যানেজার আসলে বাকি কথা বলে নেবেন।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একটা সহজতা আছে। এটা শুভ্র লক্ষ্য করছে। তার ভালো লাগছে সেটা, কারন নিজের দেশে ও সেটা পায়না বিশেষ। যাই হোক, ওদের রুম দেখিয়ে চলে গেল গেস্ট হাউসের স্টাফ।

রুমে ঢুকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন নীল। ডবল বেড অর্থে দুটো আলাদা বেড। এন জি ও গুলোর মিটিং এ লোকজন আসেন কাজে। তাঁরা থাকেন। তাই হয়তো এরকম ব্যবস্থা।

দুজনে দুটো বিছানায় বসল। শুভ্র বাথরুমে গেলো ফ্রেশ হতে। নীল ঘরটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। শুভ্র বেরিয়ে এলো টিশার্ট আর শর্টস পরে। নীল শুধু মুখ ধুল।

আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল ওরা। ঘরে ঢোকার পর দুজনেই চুপ। আসলে এরকম কোনো প্ল্যান ছিল না। দুজনের মনেই তাই নানা চিন্তা কাজ করে যাচ্ছে

শীতলতা ভাঙলো শুভ্র। ওর হাতটা বাড়িয়ে দিল নীলের বিছানার দিকে। বলল তোমার হাতটা একটু দেবে নীল?

৫ম পর্ব।

……………………….

বিকশিত প্রীতি কুসুম হে…

…………………………

নীল হাতটা বাড়িয়ে দিলে সেই হাতে একটি চুম্বন করল শুভ্র পরম আশ্লেষে। তারপর দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিল দুজনে। পরোটা, বেগুন ভাজি আর ডিম ভাজি দিয়ে। আজ নীল শুভ্রকে ঘুরিয়ে দেখাবে ঢাকা শহর। সন্ধ্যায় ছায়ানটে অনুষ্ঠান। একটা রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল দুজন। নীলের কতদিনের স্বপ্ন আজ সাকার হল। প্রেমিককে পাশে নিয়ে ঢাকার রাস্তায় ঘোরার এই মায়াময় স্বপ্ন, সম্ভবত বাংলাদেশের প্রতিটি ছেলে মেয়ে দেখে। নীল ভাবত, কবে সে প্রেমিকের বাহু জড়িয়ে বসে এই শহরে ঘুরবে। আর আজ বিধাতা তার স্বপ্নকে বাস্তব করেছেন। এর জন্য পরম করুণাময়ের কাছে চিরকৃতজ্ঞ সে।

ধানমন্ডির ভেতর দিয়ে গিয়ে রিক্সা নামিয়ে দিল শাহবাগ মোড়ে। পথে যেতে যেতে সবকিছু চেনাচ্ছে শুভ্রকে। নামার পর নীল নিয়ে গেল যাদুঘরে। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে একের পর এক গ্যালারিতে ঘুরছে তারা। শুভ্র সবকিছু খুঁটিয়ে দেখছে, নীলকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। নীল ও প্রশ্ন করে যাচ্ছে তার প্রিয়তমকে। সেও অক্লান্ত ভাবে বুঝিয়ে যাচ্ছে তার ভাবের মানুষকে।

দুপুর হল। শুভ্র ভর্তা ভাত খেতে চাইল। আসার আগে ইউটিউবে বাংলাদেশের কুইজিন নিয়ে ছোটখাটো গবেষণা করে এসেছে সে। গতকাল রাতে মোঘলাই খানা খাওয়া হয়েছে তাদের। আজ তো বাঙালি খাবার খেতেই হবে। নীল শুভ্রকে নিয়ে গেল শাহবাগের কাছে আজিজ সুপার মার্কেটে নড়াইল রেস্তোঁরা তে। অনেক রকম ভর্তা, ভাজি আর মাছ দিয়ে খাওয়া হল। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ওরা বেরিয়ে পড়ল রমনা পার্কের দিকে।

টিএসসি চত্বর পেরিয়ে রমনা পার্কে এসে বসল ওরা। শীতের শুরুতে বিকেলে প্রেমিক প্রেমিকাদের ভিড়। ওরা একটু ফাঁকায় এসে বসল। নীল ওর স্বপ্নের ঝাঁপি খুলে বসল। দূরে উঁচু উঁচু বিল্ডিং দেখিয়ে বলতে লাগল, শুভ্র, তুমি একটা চাকরি নিয়ে চলে এসো ঢাকায়। আমরা ওরকম একটা বিল্ডিং এ ফ্ল্যাট নেব। তোমার অফিস থেকে নিশ্চয়ই ভালো ব্যবস্থা করবে। সেই বাসায় আমাদের প্রথম সংসার হবে। বুয়া ভাত ডাল করলেও, মূল তরকারি আমি করব। কতরকম রান্না তোমায় খাওয়ানোর ইচ্ছা আমার। কবে আসবে তুমি?

শুভ্র বলল আমি দেশে ফিরেই চেষ্টা করছি, কত জলদি আমি আসতে পারি তোমার কাছে। আমার বাকি সব হারিয়ে গিয়েছে। ফিকে হয়ে গেছে। এখন সামনে আছো তুমি। কেবল তুমি।

বিকেল শেষ হয়ে আসছে। ওরা রিক্সা নিল ছায়ানটের উদ্দেশে।

সাড়ে ছয়টার মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেল। গ্রিন রুমে গিয়ে তৈরি হল শুভ্র। নীল পাশে পাশে ছিল। মঞ্চে ওঠার পর, নীল দর্শকাসনে ঠিক মাঝে গিয়ে বসল।

দুটি প্রেমের গান গাইল শুভ্র। রেকর্ড করল নীল। ছবি তুলল নীল। প্রেমিকের গলায় রবীন্দ্রনাথের গানে এক আলাদা গভীরতা খুঁজে পায় নীল। অন্য কারোর গলাতেই সেটা পায়না। অন্যরকম রেশ নিয়ে বেরিয়ে এলো ওরা। আজ গাড়ি নিয়ে নীলকে পোঁছে দিল হোস্টেলে। শুভ্র চলে এলো গেস্ট হাউসে।

আগামীকাল চলে যাবে শুভ্র। তার এখন একটাই গন্তব্য। যেভাবে হোক চাকরির ব্যবস্থা করে ঢাকা আসতে হবে ওকে। শুভ্রর শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য সেটা অসম্ভব হবে না, এমনটাই আশা করে ও। নীল ও সেই কারণে প্রত্যয়ী। শুভ্র ভাবছে নীল পড়াশোনায় আরেকটু এগিয়ে উঠলেই, একসাথে নটিংহ্যাম যাওয়া যাবে। অসুবিধে নেই। কিন্তু নীলকে হারানো যাবে না। সে তার জীবনের পরম সম্পদ।

পরদিন সকাল সকাল একেবারে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল শুভ্র। গন্তব্য নীলের হোস্টেল। নীলকে আজ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে হবে। কি বলবে শুভ্র?? নীল ই বা কি বলবে??

অন্তিম পর্ব।

……………………..

ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে

………………………

গল্পের শুরুতে যেই সন্ধ্যে থেকে যাত্রা শুরু, সেইখানে এসে পৌঁছেছে শুভ্র আর নীল। সকালে দেখা করে ওরা গেছিল পুরান ঢাকায়। একসাথে বিউটি বোর্ডিং এ খাওয়া দাওয়া সেরে ওরা গেল মতিঝিল চত্বরে। আগামীকাল ভোরে শুভ্র ফিরে যাবে দেশে। দুজনেরই মনটা একটু ভারী। তবে কিছু জরুরি কথা তো বলার আছেই। শুভ্রর অতীত সম্পর্ক নিয়ে নীল জেনে নিল। আরো কিছু জানার ছিল তার। শুভ্র সাধ্যমত যা কিছু বলবার, বলল। তারপর শুভ্রর ডানদিকের বাহু জড়িয়ে নীল বলল, তুমি প্লিজ তাড়াতাড়ি চলে এসো এদেশে। আমি হোস্টেল থেকে বাসায় উঠে যাই। এখন থেকেই নোটিশ দিয়ে দেব হোস্টেলে। আমাদের একটা সংসার হবে। সেই অপেক্ষার দিন গুনব আজ থেকে। তবে চারদিন বাদেই তোমার জন্মদিন, শুভ্র। তোমাকে আমি কাছে পাব না, এটা ভেবেই খুব খুব খারাপ লাগছে, বলল নীল। শুভ্র বলল চিন্তা কি, দূরত্ব তো আসলে মনে। আমরা তো মনের কাছাকাছিই আছি। এরপর তো চলেই আসছি তোমার কাছে। তখন প্রতিটি দিনই হবে উদযাপনের। আর পাঁচজনের মতন ঘ্যানঘ্যান করা সম্পর্ক হবে না আমাদের। তাতে উত্থান পতন থাকবে, কিন্তু সম্পর্কে এমন কোনো একঘেয়েমি আসতে দেব না, যাতে টান টা ফিকে হয়ে যায়। ভালোবাসার আগুনে আমরা নিজেরা পুড়ে খাঁটি হব আরো কিন্তু আমাদের প্রেম থাকবে কলঙ্ক হীন। আমরা পরস্পরের প্রতি থাকব সৎ। কখনো কাউকে ঠকাব না। অন্যদের মতন সম্পর্কে থেকেও অন্য পুরুষে লিপ্ত হব না, যেটা কিনা কমিউনিটিতে ক্যানসারের মতন ছড়িয়ে পড়েছে। শরীর দেওয়া নেওয়াকে কমিউনিটির লোকজন জল ভাতের মতন মনে করে। তারা বিশ্বাস করে যে এতে বিশ্বাস ভাঙ্গা হয় না। তারা ভাবে যে আমি তো আমার মানুষকেই ভালোবাসি। না ভালোবাসার কারোর সাথে শরীর দেওয়া নেওয়া করলে কোনো অন্যায় বা পাপ হয় না। শরীর হচ্ছে যন্ত্রের মতন। স্নান করে নিলেই যেন সব পাপ ধুয়ে যায়।

নাহ, এরকম ভাবে নিজেদের আমরা কখনোই ঠকাব না। সততা ইউনিভার্সাল। যবে থেকে আদিম মানুষ সভ্য হয়েছে, প্রকৃতি থেকে সংস্কৃতির দিকে যাত্রা করেছে মানুষ যবে থেকে, তবে থেকেই মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেকে নিয়মে বেঁধেছে। মানবিক ধর্মই এই বিশ্বাসকে আরো বেঁধেছে। জীবন সঙ্গীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে পশুরা।

এরকমই নানান অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে পরস্পর পরস্পরের বন্ধনে আবদ্ধ হল তারা। আকাশ বাতাস জল মাটি রাস্তা মানুষজন কোলাহল নির্জনতা সবকিছু সাক্ষী রেখে এক হল ওরা। এত ভিড়েও তাই অপূর্ব একা ওরা।

রাত নামল। গাড়ি ছুটছে নীলের হোস্টেলের দিকে। শুভ্রর হাত ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে নীল। মনটা ভারাক্রান্ত। এত অল্প সময়ের জন্য প্রিয়তমকে পেলো ও। এবার শুরু অপেক্ষা।

পরদিন সকালের ফ্লাইট শুভ্রর। একইভাবে কলকাতা হয়ে কুয়ালালামপুর ফিরবে। ফিরেই ওর কাজ icddr,b তে এপ্লাই করা। ইন্টারভিউ দেওয়া। আর অপেক্ষা করা। এই প্রতিষ্ঠানে সকল সময়েই বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন থাকে। তাই ঢাকায় কাজ পেতে তেমন অসুবিধে হবে না শুভ্রর।

দুদিন বাদেই শুভ্রর জন্মদিন। এর মধ্যেই তাল কাটল একটু। নীল আর শুভ্র দুজনেই দূরে রয়েছে। একটু দুঃখ একটু অভিমান কাজ করছেই। তার মধ্যে নীলের এক অল্পদিনের বন্ধুর দেওয়া মহার্ঘ উপহার নিয়ে শুভ্র আর নীলের মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি হল। নীলের যুক্তি হচ্ছে যে, যেহেতু বন্ধু উপহার দিয়েছে, তাই সেখানে অর্থমূল্য বিচার্য নয়। যেকোনো অর্থমূল্য এর উপহার ই নেওয়া যেতে পারে যেকোনো বন্ধুর থেকে। তাতে জটিলতার কিছু নেই। ওদিকে শুভ্রর যুক্তি হচ্ছে, বন্ধুদের থেকে উপহার নেওয়া যেতেই পারে। তবে সেটা উপযুক্ত সময়ে নিজে কতটা ফিরিয়ে দিতে পারব সেটা ভেবেই। নইলে অহেতুক ঋণী হয়ে থাকতে হয়। আর কখন যে মানব মন সেই সুযোগ নিয়ে বসে, কবেকার কোন উপহারের বিনিময়ে কি যে কবে দাবি করে বসে সে আগে থেকে আন্দাজ করা যায় না। মহার্ঘ উপহার হলে ত নৈব নৈব চ। বন্ধু উপহার দেবে। বিপদের সময়ে পাশে থাকবে এই। উপহার দিলে তা একটা মধ্যবিত্ত সীমার মধ্যে থাকা উচিত আর বিপদে পাশে দাঁড়ালে সেই উপকার সমান উপকার করে বা তার চেয়েও বেশি উপকার করে মিটিয়ে দেওয়া উচিত।

কেবল প্রেমের ক্ষেত্রেই উচিত অনুচিত কাজ করে না। যদি সম্পর্ক প্রেমের না হয়ে বিশুদ্ধ বন্ধুত্বের ই কেবল হবে, তবে সেখানে এত ভারী দায় কেউ রাখবে না। আর কারোর একতরফা প্রেমের দায়ে নীল পড়ে যাক, সেটা শুভ্র চায় না স্বাভাবিভাবেই। সম্পর্কের দায়েই নীলের সেটা এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল নিশ্চয়ই।

যাই হোক, নীলের নিজের তরফেও যুক্তি অকাট্য। নীলের পার্সোনাল লাইফ আছে। সেখানে কোন বন্ধুর সাথে তার কি ইকুয়েশন, সেখানে শুভ্রর কিছু বলার থাকতে পারে না। কেউ যদি স্বেচ্ছায় নীলকে দামী কিছু দিতে চায়, সেটা নীল নেবেই। এমনকি সেটা যদি গোটা একটা ফ্ল্যাট হয়, তাহলেও নীল সেটা গ্রহণ করে নিতে পারে। ওর কোনো সমস্যা নেই কারোর কোনরকম উপহার গ্রহণ করতে। কারন ও নিজে নিজেদের থেকে কারোর প্রতি ইমোশন এ জড়াচ্ছে না। কেউ যদি নিজের থেকে জড়িয়ে এসব করতে চায়, করুক না। এতে তো নীলের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। তবে শুভ্র বলে, যে এতে নীলের একটা ক্ষতি হচ্ছে, সেটা মনোজগতে। যাই হোক, নীলের সবচেয়ে বড় যুক্তি হল এই, যে নোবেল বিজেতাদের পুরস্কার পাবার পর বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁদের উপহার দেন, সেটা কেন দেন? তাঁদের গুণ দেখেই। নীলকে তার গুণ মুগ্ধ বন্ধু মহার্ঘ উপহার দিয়েছে। এতে কোনরকম মন্তব্য করা শুভ্রর ঘোরতর অন্যায়।

যাই হোক, এ নিয়ে তো খুব ই কথা কাটাকাটি রাগারাগি দুজনের। এদিকে দুদিন বাদে শুভ্রর জন্মদিন। নীল কতকিছু করবে বলে প্ল্যান করেছিল এই দূর থেকেই। একটা অনলাইন গিফট কোম্পানির সাথেও যোগাযোগ করে রেখেছিল নীল। কিন্তু রাগারাগি হয়েছে। এখন কথা বলা যাবে না শুভ্রর সাথে। শুভ্র জন্মদিনের আগের দিন অনেক অনেক বার ফোন করলেও নীল ধরেনি ওর ফোন। কিন্তু জন্মদিনের দিন শুভ্র ভাবল যে আজ নীলকে কিছুতেই নিজে থেকে যোগাযোগ করবে না আজ শুভ্র। আজ তার জন্মদিন। নীল কি করে দেখতেই হবে।

কিন্তু সারাদিন শত আনন্দ উদযাপনের মধ্যেও শুভ্রর মন খারাপ। খালি ভাবছে এই বুঝি নীল মেসেজ করল। এই বুঝি ফেসবুকের কিছু লিখল। কিন্তু না। কিছুই না। যদিও শুভ্র জানে যে মন থেকে প্রার্থনা করছে নীল। কিন্তু মানুষ তো ভালোবাসার স্পর্শ চায়। ঈশ্বর অসীম, দৃষ্টির আড়ালে। কিন্তু তাঁর অমৃতময় পরশ তো মানুষ এই মরণশীল জীবনেই পেতে চায়। তেমন করেই, নীলের নীরব প্রার্থনা শুভ্রকে ছুঁয়ে যাচ্ছে সকালের আলোর সাথে, এ বিশ্বাস শুভ্রর থাকলেও, সে চাইছে একটু, একটুখানি স্পর্শ।

সারাদিন রাত কেটে গেল। শুভ্রর বিশ্বাসে এবার উদ্বেগ দেখা দিল। নীলের কোনো বিপদ হল না তো!! কত কিছু ভাবছে শুভ্র। হয়তো কোনো বড় বিপদের কারণে সামান্য মেসেজ ও করতে পারেনি। মোবাইলে হয় তো নেট নেই। কিন্তু বাংলাদেশে নেট না থাকলেও শুধু মেসেজ তো করাই যায় ডেটা ফ্রি মোড এ। তবে কি হল!! কোনো বিপদ!!

এরপর সব লাজ লজ্জা ভুলে নীলের ছোট দিদিকে মেসেজ করল শুভ্র। এই প্রথম। একটু একটু করে কথা হতে লাগল শুভ্র আর নীলের দিদির। তবে খানিক বাদে কথার ধরনে শুভ্রর মনে হতে লাগল যে, ওর দিদি নয়। সম্ভবত নীল নিজেই কথা বলছে। কিন্তু শুভ্র সেটা বুঝতে দিল না। কথা বলে গেল অনেক অনেক বিষয়ে। শুনল নীল ভারী হয়ে আছে দুদিন। শরীর খারাপ। অনেক কথা হবার পর রাত বারোটার ঠিক আগে নীলের দিদি শুভ জন্মদিন বলে উইশ করল। শুভ্র মনে করল আসলে নীল নিজেই করেছে সেই উইশ। রাগের জন্য, নিজের মুখে করতে পারছে না। তাই সুযোগ পেয়ে এই ভাবেই জানাচ্ছে মনের কথা। সেও তো থাকতে পারছে না। শুভ্রর বারবার মনে হচ্ছে যে নীল নিজেই কথা বলছে। এত নির্ভুল বাংলাতে সম্ভবত নীলের দিদি লিখবে না।

শুভ্রর বিশ্বাস নীল নিজেই কথা বলেছে। তার এতেই সুখ। জন্মদিন ধন্য। নীল নিজের মনের গণ্ডি না পেরোলেও মনের কথা বলতে পেরে তৃপ্ত। সে এসব বিশেষ দিনে খুব বিশ্বাসী নয়। আর সারাদিন সে তো নিখাদ প্রার্থনা করেছে। এই তার কাছে আসল।

বাস্তবে কি হয়েছিল কে জানে!!

এরপর তারা সুখে শান্তিতে সংসার করতে লাগল।

সে কাহিনী আবার নয় কখনো শুনবেন আপনারা।

…………………..

সমাপ্ত

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.