জানি দেখা হবে

আয়াদ মোহাম্মদ হিমু

উৎসর্গঃ-Yushnish Ayash(গল্পটার উৎসর্গের পাতা খালি ছিল।তাই কাছের একজন মানুষকে উৎসর্গ করে দিলাম)।

এক

ধীর পায়ে এগিয়ে চলছি সামনের দিকে।আর মাত্র কয়েক পা এগোলেই এগিয়ে যাবো আমার গন্তব্যস্থল,ফাঁসির মঞ্চে।হ্যাঁ!আমার ফাঁসি হবে।জল্লাদ মতো একটা বিশালদেহী লোক আমার মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।কেউ একজন আমার গলায় রশি বেঁধে দিয়েছে।এরপরেই রশিতে একটান আর সব শেষ।

আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো।সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে একাকার।এখন দিন নাকি রাত ঠিক বোধগম্য হচ্ছেনা।আচ্ছা আমি কোথায়! আর এখানের বিছানাটা এমন শক্ত কেনো!মনে করার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছিনা। গলাটা শুকিয়ে আসছে,মাথাও ব্যথা করছে প্রচন্ড।মাথায় হাত দিয়ে বসে আছি।ধীরে ধীরে সব স্পষ্ট হতে লাগলো।আমিতো জেলখানায়।প্রায় দেড়মাস যাবত আমি জেলখানায় আছি।আর গতো কয়েকদিন যাবত এই একই স্বপ্ন দেখছি।আর স্বপ্ন দেখার পর ঠিক আজকের মতো অবস্থা হয়।আমাকে পানি খেতে হবে।কিন্তু পানি!উঠে গেলাম বিছানা থেকে।জেলখানা তো আর আমার বাসা নয়,যে পানি থাকবে বিছানার পাশে। বাইরে এগোতেই পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ শুনলাম।আজকাল শহরেও পাখি ডাকে নাকি!অবাকই হলাম কিছুটা।তাঁর মানে ভোর হয়ে এসেছে,কিন্তু এখনো সূর্য উঁকি দেয়নি।হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি,আচ্ছা আমার কী তাহলে সত্যি সত্যিই ফাঁসি হবে!হবেই হয়তো।আমি তো খুন করেছি।খুনের আসামী।এইসব সাতপাঁচ ভাবছি আর হাঁটছি।হঠাৎই সামনে এক বিশালদেহী মানব হাজির।ওর মুখের দিকে তাকাতেই আমার মুখটা শুকিয়ে গেছে।জলিল!এখানকার এক কয়েদী। গতো দুই বছর যাবত জেলখানায় বন্দী।শুনেছি ও নাকি ৫ টা খুন করেছে।আর ওর চেহারাও কেমন রাক্ষসের মতো।চোখদুটো লাল কেমন জানি।এখানকার সব কয়েদী ওকে ভয় পায়।

কী ব্যাপার জানেমন!এতো সকালে কোথায় যাচ্ছো তুমি?কেমন একটা পিশাচমার্কা হাসি দিয়ে বললো!

আমি কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম,অমনি ও আমার হাত খপ করে চেপে ধরলো।আমি ওর হাত থেকে আমার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারছিনা।আসলে ওর বিশাল মাংসল পেশির সাথে পেরে উঠছিনা।ও আবারও সেই পৈশাচিক হাসি দিয়ে আমাকে বললো,তোমাকে কতোবার বললাম আমি যা চাই আমাকে দিয়ে দাও।তাহলে তুমি এখানে রাজ করতে পারবে।কেউ তোমাকে কিচ্ছু করবেনা।তুমি আমার সাথে থাকবে।কী থাকবে তো?

আমি আমার জীবনের সব লড়াই একাই লড়তে পারি।আমার কাউকে প্রয়োজন নেই।

ওহ!তাই নাকি?একথা বলেই জলিল আমাকে টেনে নিয়ে গিয়ে দেওয়ালের সাথে ঠেসে ধরলো।আর ওর মুখ ক্রমশই আমার মুখের দিকে এগিয়ে আসছে,আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছি।হঠাৎ একটা আর্তনাদে চোখ খুলে দেখলাম, জলিল মাটিতে পড়ে কাঁতরাচ্ছে।আর ওর নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে।

তোকে কতোবার নিষেধ করেছি,এসব কাজ এখানে করবিনা।তারপরেও তুই এসব করছিস!আবার যদি কখনও তোকে এসব কাজে দেখি তো তোর হাড় মাংস কিছুই রাখবো না।কথাগুলো বলেই আমার দিকে তাকালো ইন্সপেক্টর রিয়ান মাহমুদ।আর বললেন তুমি ঠিক আছো?প্রত্যুত্তরে আমি বললাম, জ্বী ঠিকআছি।বলেই হাঁটা ধরলাম।

এই শোনো!রিয়ান স্যার ডাকলেন।

আমি পেছনে তাকাতেই বললেন,ও যদি আবার তোমাকে বিরক্ত করে,অবশ্যই আমাকে জানাবে।

জ্বী আচ্ছা স্যার।

ইন্সপেক্টর রিয়ান মাহমুদ।এখানকার জেলার।বয়স ২৮ কী ২৯ হবে।দেখতে সিনেমার হিরো বললে কম বলা হবেনা।উনি সিনেনায় নাম না দিয়ে কেনো পুলিশ হলেন!আল্লাহ্ ই ভালো জানেন।শুনেছি এখনো বিয়ে করেন নি।কেনো করেন নি,সেটা সবারই অজানা।এখানে আসার পর থেকেই দেখছি,উনি আমার প্রতি আলাদাভাবে নজর রাখছেন।আমার সকল সুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখেন সবসময়।এমনকি ঐ পিশাচ জলিলের হাত থেকেও রক্ষা করে চলেছে প্রতিনিয়ত।অদ্ভুত রহস্যময় লোকটা।

দুই

জেলখানায় আসার প্রায় দুইমাস হহয় গেলো।এই দুই মাসে নিজেকে এই জেলখানা এবং জেলখানার মানুষগুলোর সাথে ভালোই মানিয়ে নিয়েছি।এখানে দিনকাল খারাপ কাটছেনা আমার।নিজের বাড়ি এবং সেখানকার পরিবেশ থেকে অন্তত ভালোই কাটছে আমার।আর গতো দুইমাসে ইন্সপেক্টর রিয়ানের সাথে আমার অনেকটাই ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।বেশিরভাগ সময় উনার সাথে গল্প করেই কাটাতাম।বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয় উনার সাথে।মাঝেমাঝে দেখি ইন্সপেক্টর রিয়ান আমার দিকে গভীর কৌতূহল ভরা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।আর বলে,তোমার মতো একটা ছেলে কেনো খুনি হলো!আমি কিছু বলিনা।চুপচাপ আকাশ পানে চেয়ে থাকি।আবার কখনোবা উঠে চলে আসি উনার পাশ থেকে।আর উনি অপলক চেয়ে থাকেন আমার গমনপথে।

এমনি এক নিদ্রাহীন রাতে আমি জেলখানার বারান্দায় বসে আছি।আমার কয়েকদিন পরেই আমার কেসের শুনানি ঘোষণা করা হবে।হয়তো আমার ফাঁসি হবে।মেঘমুক্ত আকাশের তারার দিকে আছি আর ভাবছি আর কয়েকদিন পর এই তারাদের ভীড়েই আমার স্থান হবে।হঠাৎ পাশে এসে বসলো,ইন্সপেক্টর রিয়ান।আর ঠিক আগের মতোই কৌতূহল ভরা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,কেনো তুমি খুনি হলে?

শুনতে চান সেই রক্তাক্ত খুনের কাহিনী? উনার দিকে না তাকিয়েই বললাম।

হ্যাঁ শুনতে চাই।

আজ কেনো জানিনা, উনাকে বলতে ইচ্ছে করছে।মনে হচ্ছে উনাকে বলি আমার জীবনের কথাগুলো।তাই আজ নির্দ্বিধায় বলতে আরম্ভ করলাম,আমার জীবনের নিকষ কালো অধ্যায়ের প্রথম পাতা থেকে।

তিন

আমি আমান আহমেদ।এক সম্ভ্রান্ত পরিবারেই আমি বড়ো হয়েছি।যদিও উনারা আমার আপন কেউ না।আমার মা আমার জন্মের কয়েকমাস পরেই মারা যান।আমার বাবা ছিলো শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একজন।মা মারা যাওয়ার পর বাবা আর বিয়ে করেন নি।বাবার কোনো আত্মীয় ছিলো না।তাই বাবা আমাকে দেখাশোনার জন্য তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু জাকির সাহেব আর তাঁর স্ত্রী ইলিনাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছে।সঙ্গে জাকির সাহেবের না ওও ছিলো।আমাদের বিশাল বড়ো বাড়িতে আমরা এই কয়েকজনমাত্র মানুষ।জাকির সাহেবের কোনো সন্তান ছিলো না তখন।তাই উনার স্ত্রী আমাকে তাঁর সন্তানরূপে মানতো।জাকির সাহেবের মাও আমাকে ভালোবাসতো।

আমার যখন পাঁচ বছর বয়স,তখন আমার বাবা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়।বাবা মা হারা দুনিয়ায় তখন ইলিনা খালামণিই ছিলো আমার একমাত্র আশ্রয়।বাবা মারা যাওয়ার পর খালামণি অর্থাৎ জাকির সাহেবের স্ত্রী কেমন জানি চুপসে গেলো।সারাক্ষণ কেমন জানি ভয়ে ভয়ে থাকতো।আমাকেও আগলে রাখতো আগের তুলনায় বেশি করে।বাবার মৃত্যুর পর,জাকির সাহেবের মাও কেমন জানি বদলে গেলো।আমার দিকে কেমন হিংস্রাত্বক দৃষ্টিতে তাকাতো।আমাকে একদমই সহ্য করতে পারতেন না।তবুও দিন কেটে যাচ্ছিলো।যখন আমার বয়স সাত বছর।তখন খালামণির কোল জুড়ে এক কন্যা শিশুর জন্ম হলো।খালামণিকে হাসাপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।খালামণির দেখাশোনার জন্য,উনার শ্বাশুড়ি অর্থাৎ জাকির সাহেবের মাও হাসপাতালে থাকতে চলে গেছে।বাসায় শুধু আমি আর আঙ্কেল মানে জাকির সাহেব।খালামণিকে হাসপাতাল নেওয়ার পরেরদিন আমি স্কুল থেকে ফিরে শুয়ে আছি।শুয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে গেছি মনে নেই।হঠাৎ কারো হাতের স্পর্শে ঘুম ভাঙ্গলে। কেউ একজন আমার সমস্ত শরীর এবং নিতম্বে হাত বোলাচ্ছে।চোখ মেলে দেখি আঙ্কেল।আমাকে জেগে উঠতে দেখে আঙ্কেল আমাকে বিছানার সাথে জোর করে চেপে ধরলো।তাঁরপর আমার পরণের প্যান্ট খুলে শুরু করলো উনার অমানবিক, পাশবিক যৌন অত্যাচার।আমার শতো কাকুতি-মিনতি,চিৎকারেও উনার মন এতোটাও গলেনি।খালামণি প্রায় একমাসের মতো হাসপাতালে ছিলো।এই একমাস আমার উপর অত্যাচারের মাত্রা এতোটুকুও কমেনি।মাঝেমাঝে আঙ্কেলের দুই একজন বন্ধুও আঙ্কেলের সাথে আমার উপর চড়াও হতো।ভেবেছিলাম খালামণি বাসায় ফিরলে হয়তো এসব বন্ধ হবে।কিন্তু না,খালামণি বাসায় ফেরার পরও কিছু হয়নি।খালামণিও জানতো ব্যাপারটা,কিন্তু কোনো উপায় ছিলো না।একেতো জাকির সাহেব উনার স্বামী,তাঁর উপর প্রভাবশালী হওয়ায়,খালামণিকে চুপ থাকতে হয়েছে।সেই থেকে শুরু,এরপর আমার মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন এবং এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও আঙ্কেলের হাত থেকে রেগাই পাইনি। তবে আঙ্কেল শুধু আমার সাথে না,আশেপাশের অনেক কমবয়সী শিশুর উপর এমন নির্মম যৌনাচার চালাতো।কিন্তু উনি প্রভাবশালী হওয়ায় কেউই কিছু করতে পারতো না।এমনি একরাতে আঙ্কেল বাসায় ছিলো না,তখন খালামণি এসে বললো,আমার মা ও বাবাকে আঙ্কেলই খুন করেছে।আর উনি আমাকে এখান থেকে চলে যেতে বলেছিলো।কিন্তু আমি কিছুই বললাম না।এবং গেলামও না কোথাও।

পরেরদিনই আঙ্কেল বাসায় ফিরে আসে।আজ আমি একেবারে খুব স্বাভাবিক আচরণ করলাম আঙ্কেলের সাথে।আঙ্কেল কিছুটা অবাকই হলো।কারণ আমি সাধারণত আঙ্কেলের কাছে ঘেঁষতে চাইতাম না।আঙ্কেল যা কিছু করতো,জোর করেই করতো।রাতে সবাই যখন ঘুমাচ্ছিলো,তখন আঙ্কেল কে ম্যাসেজ দিয়ে ছাদে আসতে বললাম।ছাদে পূর্বেই সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা ছিলো।আঙ্কেল যখন ছাদে আসলো,তখন আমি ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি।আঙ্কেল আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।কী ব্যাপার আজ নিজেই আমাকে ডাকলে?আমি কিছু না বলে আঙ্কেল কে ছাদের কোণার দিকে যেই কক্ষ টা আছে ওটাতে নিয়ে গেলাম।ওখানে একটা পুরোনো খাট আছে,ওখানে আঙ্কেল কে শোয়ালাম আর তাঁরপর আঙ্কেলের প্যান্ট,শার্ট খুলে একেবারে দিগম্বর করে ফেললাম।আঙ্কেল যখন উত্তেজনায় চোখ বন্ধ করে ফেললো,ঠিক তখনই ছুরি টা বের করে ওর উত্থিত শক্ত হওয়া লিঙ্গে এক ঘা বসিয়ে দিলাম,সাথে সাথে লিঙ্গের মাথা কাটা পড়লো,আঙ্কেল এমনটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না।তাই প্রচন্ড জোরে চিৎকার করছিলো।আমি তবুও থেমে থাকিনি।আঙ্কেলের লিঙ্গটা তিন টুকরা করলাম।অণ্ডকোষ দুটো আলাদা করে আঙ্কেলের হাতে ধরিয়ে দিলাম।প্রথমে ভেবেছিলাম আঙ্কেল কে বেহুশ করে মারবো,তাঁরপর ভাবলাম ওর মতো নরপিশাচ কে স্বজ্ঞানে মারা উচিৎ। মৃত্যু কতোটা ভয়ানক ওটা ওর দেখা উচিৎ। আঙ্কেল মারা গেলো।ওর রক্তে আমার সারা গা মাখামাখি হয়ে গেছে।আঙ্কেলের চিৎকারে খালামণি আর আঙ্কেলের মা ছুটে আসলো।খালামণির মা এই অবস্থা দেখে তৎক্ষণাত পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছে।অবশ্য আমি চাইলে পালিয়ে যেতে পারতাম।কিন্তু আমি তা করিনি।আর তারপর থেকে আমি জেলখানায় ই আছি।আর যদি আমার ফাঁসিও হয় হোক।তাতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।কারণ আমি আমার মা-বাবা এবং আমার উপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছি।খালামণি আমায় বলেছিলো,আঙ্কেল নাকি আমার সম্পত্তির জন্য আমার মা-বাবাকে মেরেছে।আর আজ সে তাঁর পাপের শাস্তি পেয়েছে।

চার

আমি কাঁদছি।ইন্সপেক্টর রিয়ান আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন।উনার চোখেও পানি খেয়াল করলাম।উনি শুধু আমাকে একটা কথাই বললেন,তোমার ফাঁসি হবে না।আমি তোমার জন্য লড়বো।আমি কিছু বললাম না শুধু উনার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।আর দেখছিলাম আমার জন্য উনার চোখে ভালোবাসার হিড়িক।এই কয়টা দিনে আমি নিজেও ইন্সপেক্টর রিয়ানের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছি।কিন্তু আমার অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে আরেকটা নিষ্পাপ জীবনকে জড়িয়ে কোনো লাভ নেই।তাই সবসময় তাকে উপেক্ষা ই করতাম।

আজ আমার শুনানির রায় ঘোষণা করা হলো।আমাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।অর্থাৎ চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড। কিন্তু আমার ফাঁসি হয়নি কেনো!আমি জানি এই কাজটা রিয়ানই করেছে।পরেরদিন ওকে জিজ্ঞেস করায়,ও বললো ও আমার বাসায় গিয়েছিলো,আমার খালামণি এবং আশেপাশের মানুষদের থেকে আমার পক্ষে প্রমাণ জোগাড় করেছে।আর তাই আমার ফাঁসি হয়নি।আমি কিছু না বলে শুধু রিয়ান কে জড়িয়ে ধরে নিরলস অশ্রু বিসর্জন করছিলাম।আর রিয়ানও আমায় জড়িয়ে ধরে একটা কথাই শুধু বলেছে,আমি তো আছি।

এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো দিন।রিয়ানের সাথে হাতে হাত রেখে জেলখানার চার দেয়ালের ভিতরে আমাদের নিষিদ্ধ প্রেম বিস্তার লাভ করছিলো।যদিও আমরা কেউই কাউকে ভালোবাসার কথা বলিনি।আর যৌনতার কথা না হয় বাদ ই দিলাম।

এমনি একদিন ভোরে ঘুম থেকে জাগলাম।কেউ একজন আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলো।চিরকুট টা খুলে দেখলাম।তাতে লেখা ছিলো,”জানি দেখা হবে।”আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।উঠে রিয়ান কে খুঁজতে লাগলাম।নাহ্ পেলাম না কোথাও।অনেক কয়েদী কেও জিজ্ঞেস করেছি,এমনকি অনেক অফিসার,কনস্টেবল কেও জিজ্ঞেস করে হদিস পেলাম কোনো।কয়েকদিন পর দেখলাম এক নতুন অফিসার এসেছে।কী ব্যাপার এটা কী হলো!পরে শুনলাম রিয়ান বদলি হয়ে গেছে। রিয়ান এর বদলেই এই নতুন অফিসার।খুব খারাপ লাগলো ব্যাপারটা।রিয়ান একবার আমাকে বলেও গেলো না!

এভাবেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। এক দিন,দুই দিন,করে কেটে অনেকটা বছর। কিন্তু রিয়ান আসেনা।কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি,আমি অপেক্ষা করছি।জানি রিয়ানের সাথে আমার দেখা হবেই।রিয়ান আসবেই।এভাবে অপেক্ষা করতে করতে কেটে গেলো চৌদ্দটা বছর।

পাঁচ

চৌদ্দ বছর পর।আজ আমার মুক্তির দিন।হ্যাঁ!আজ আমাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছে।গতো চৌদ্দ বছরে শুধুমাত্র একটা মানুষেরই নাম জপ করেছি।প্রত্যেকটা দিনই ছিলো আমার জন্য একটা নতুন অপেক্ষা। তবুও কিছুই তো হলোনা।গতো চৌদ্দো বছরে একটিবারের জন্যও রিয়ান আমাকে দেখতে আসেনি।

জেল থেকে বেরিয়ে ভাবছি কোথায় যাবো!আমার তো যাওয়ার জায়গা নেই।খালামণির কাছে যাবো?কিন্তু কোন মুখ নিয়ে যাবো খালামণির কাছে!নাহ!খালামণির কাছেই যেতে হবে।

চলে আসলাম আমার চিরচেনা সেই আপন নীড়ে।দরজায় টোকা দিতেই এক বৃদ্ধা মহিলা দরজা খুললেন।দেখেই বুঝতে পারলাম,ইনি খালামণি।আমি খালামণিকে জাপটে ধরে কান্না শুরু করলাম।খালামণির আমাকে চিনতে এতোটুকুও কষ্ট হয়নি।খালামণি জানতো আমি আসবো।কারণ খালামণি মাঝেমাঝে ফোণ করে আমার খবর নিতো।কিন্তু কেনো জানিনা কখনো আমায় দেখতে যাইনি।উনার শ্বাশুড়ি গতো হয়েছেন কয়েকবছর হলো।খালামণি আমায় বললো,তুমি এসেছো।এখন তোমার সম্পত্তি তুমি বুঝে নাও বাবা।আমি চলে যাবো।

না খালামণি!তুমি কোথাও যাবেনা।আমরা মা ছেলেতে একসাথে থাকবো।তোমার মেয়েটা কোথায়?

খালামণি অন্তি বলে ডাক দিতেই অপরূপ রূপসী এক মেয়ে আসলো।বুঝলাম এটাই খালামণির মেয়ে।ওর সাথে কিছুক্ষণ কথা বললাম।তাঁরপর নিজের ঘরে চলে গেলাম।নিজেকে গুচিয়ে নিতে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে।আমি পারবো তো!

দেখতে দেখতে অনেক দিন কেটে গেলো।এখন বাবার ব্যবসা আমিই দেখি।একজন পাক্কা ব্যবসায়ী বলা যায় এখন আমাকে।

একদিন রাতে বিছানায় হেলান দিয়ে নই পড়ছিলাম।খালামণি এসে আমার পাশে বসলো।

কিছু বলবে খালামণি?

আসলে কথাটা কিভাবে যে বলি!

আরে বলো খালামণি।এতো লজ্জার কী আছে!

আসলে বাবা আমান!তোমার বয়স তো কম হলো না।এবার বিয়ে শাদি করে নিজেকে গুচিয়ে নাও।সংসারী হও।আর কতোদিন এভাবে একা থাকবে।আমি বলছিলাম কী!তুমি যদি অন্তি কে বিয়ে করতে……………

আসলে খালামণি আমাকে কিছুদিন সময় দাও।আমি ভেবে বলছি।

আচ্ছা। এই বলে খালামণি চলে গেলো।

আর আমি ভাবনার অতলে ডুব দিলাম। আমার কী বিয়ে করাটা ঠিক হবে!তাহলে রিয়ান এর কী হবে!

আরে আমি এসব কী ভাবছি।রিয়ান তো আমাকে কথা দেয়নি।ও তো আমাকে ভালোবাসে কী না তাও বলেনি।আর ও আদৌ কখনও ফিরে আসবে কী না তাও জানিনা।তাহলে?তাহলে খালামণির কথাটাই মেনে নিতে হবে।

পরেরদিন সকালে খালামণিকে বললাম,আমি অন্তিকে বিয়ে করতে রাজি।খালামণি প্রচন্ড খুশি হয়ে ছলছল চোখে আমার দিকে তাকালো।আমি আর কিছুনা বললাম না।শুধু খালামণির হাতে হাত রেখে আশ্বাস দিলাম।

ছয়

আজ আমার আর অন্তির বিয়ের চারবছর পূর্ণ হলো।আমার আর অন্তির একটা বাচ্চাও আছে।আমাদের ছেলের নাম রিয়ান। হ্যাঁ!আমার রিয়ান।এই নাম নিয়েও অনেক ঝামেলা করতে হয়েছে অন্তির সাথে।অন্তি চাইছিলো আমার নামের সাথে মিলিয়ে আমাদের ছেলের নাম রাখতে।কিন্তু আমিই জেদ ধরে ওর নাম রিয়ান রেখেছি।রিয়ানের বয়স এখন দুইবছর।খালামণি গতো হয়েছেন প্রায় দেড়বছর হবে।

অন্তি এসে বললো আমাদের চতুর্থ বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ওকে আর রিয়ানকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য।কোথায় যাওয়া যায়!আচ্ছা সুন্দরবন গেলে কেমন হয়।অন্তি আমার প্রস্তাবটা এক বাক্যেই লুফে নিলো।

দুইদিন পর রওয়ানা দিলাম সুন্দরবন।এখানে এসে একটা হোটেলে আশ্রয় নিলাম।পরদিন সকালে বেরোলাম সুন্দর বন দেখতে,আমাদের সাথে ছোট্ট রিয়ানও আছে।ও আমার হাত ধরে হাঁটছে আমার সাথে তাল মিলিয়ে।আমরা এখন বন দেখছি।দেখতে দেখতে একপর্যায়ে খেয়াল করলাম, রিয়ান নেই আমাদের পাশে। আমরা দুজনেই ওকে খুঁজতে লাগলাম।অন্তি তো কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে।খুঁজতে খুঁজতে দেখলাম এক মধ্যবয়সী লোক রিয়ানকে নিয়ে আসছে কোলে করে। লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম অপলক।কেমন চেনা চেনা লাগছে না!হ্যাঁ।চিনিই তো।এ তো রিয়ান।সেই রিয়ান! যার জন্য প্রতিটা দিন কেটেছে অপেক্ষায়,প্রতিটা রাত কেটে নিদ্রাহীনতায়।আজ সেই রিয়ান আমার সামনে।অনেক পরিবর্তন হয়েছে ওর।চুলে পাঁক ধরেছে।মুখে দাঁড়ি।আমি নিষ্পলক তাকিয়েই আছি ওর দিকে।খেয়াল করলাম,রিয়ানও আমাকে দেখে থমকে গেছে।চিনতে পেরেছে নিশ্চয়ই।

অন্তি দৌঁড়ে গিয়ে ছোট্ট রিয়ানকে কোলে নিলো।আমি অন্তিকে বললাম,তুমি ওকে নিয়ে হোটেলে যাও।

অন্তি চলে যাওয়ার পর,আমি রিয়ানের কাছে গেলাম।ওকে জড়িয়ে ধরলাম শক্ত করে।তাঁরপর জিজ্ঞেস করলাম কেনো ফিরলেনা?ও বলতে শুরু করলো,সেদিন হঠাৎই ফোন আসলো ওপর মহল থেকে।আর বললো,আমার ট্রান্সফার হয়ে গেছে,এই সুন্দরবন থানায়।হঠাৎ করেই কী থেকে কী হয়ে গেলো।ওখানকার কেউ তোমার আর আমার মেলামেশা টা সহ্য করতে পারছিলো না।তাই আমার নামে অভিযোগ করেছে।আর তার ফলশ্রুতিতে আমি আজ এখানে।চাইলে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারতাম।কিন্তু তোমাকে কেউ বদনাম করুক তা চাইনি বিধায়,যোগাযোগ করিনি।কিন্তু বিশ্বাস করো,গতো প্রায় বিশটা বছর আমি তোমাকে ভেবেই কাটিয়েছি।তুমি আমার নিঃশ্বাসে মিশে আছো।তুমি আমার পুরোটা অস্তিত্ব জুড়ে বিদ্যমান।আর কিছু বললো না, অন্যদিকে ফিরে চোখের জল মুছলো।

এরপর জিজ্ঞেস করলো,বিয়ে করেছো তুমি?আর ওরা তোমার স্ত্রী আর সন্তান?

হ্যাঁ।আমার ছেলের নাম রিয়ান।তুমি বিয়ে করেছো?

নাহ!

কেনো করোনি?

যাকে নিজের অস্তিত্বে মিশিয়েছি।তাঁর জায়গায় অন্য কাউকে কিভাবে বুকে নিতাম!আমি পারতাম না এটা,তাই বিয়ে করিনি।আমি নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলাম কিছু বললাম না।কী ই বা বলবো!যেই মানুষটা আমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করেছে।এই শেষ বয়সে এসেও আমিই যার নিঃশ্বাস হয়ে আছি।তাকেই কী না আমি ঠকালাম। আমি শব্দ করে কেঁদে উঠলাম। রিয়ান আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।আমার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো,মিলনের জন্য ভালোবাসা নয়।সব ভালোবাসায় মিলন হতেই হবে,এমন কোনো কথা নেই।বিচ্ছেদেই শুনেছি ভালোবাসার প্রকৃত রূপ উপভোগ করা যায়।আমি কিছু বললাম না।শুধু ওর হাত ধরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছি।জীবনটা এভাবেই থেমে থাকলে হতো না।তবুও আমরা হারিয়ে যাই,নিজেদের স্বার্থে।সময়ের কষাঘাতে।শুধু একটা বাক্যই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল,

“জানি দেখা হবে……..”

প্রথম প্রকাশঃ-সাতরঙা গল্প

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.