তৃষ্ণা

ঘাসফড়িং

প্রায় পনেরো মিনিট পেরোতে চলল রাইম বাস স্টপে দাঁড়ানো।

তার ক্লাসে পৌছোতে হবে ৯:৩০ এর মধ্যে। এখন সময় ৮:৩৬। সে তার ফর্সা হাতে ঝুলানো কালো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখছে একটু পরপর।তাকে বাস ধরতে হবে ৯টার আগেই। ভার্সিটি ক্যাম্পাসে আজ সেলিনা ম্যাডাম আসছেন ক্লাস শুরু হওয়ার পূর্বে।

তিনি রাইমের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপিকা।

সেলিনা ম্যাডামের সবথেকে বড় বিশেষত্ব যেটা,সেটা হলো সাহিত্যের একজন তীব্র-তৃষ্ণার্ত মানুষ তিনি।লেখালেখির মূল নির্যাস অনুসন্ধিৎসু মানুষ গুলোর একজন- মাঝেমাঝে ক্লাসে লেকচারের ফাঁকে নিজের সাহিত্য জীবনের দুয়েকটা স্মৃতিচারণের মাধ্যমে সেলিনা ম্যাডামের যে এ-জীবনে প্রায় পাঁচ-সহস্রাধিক বই পড়া হয়েছে, সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে।

সামনের সপ্তাহেই রাইমদের বাংলা ডিপার্টমেন্টে সাহিত্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে গল্প,উপন্যাস,কবিতা,প্রবন্ধ,ভ্রমণকাহিনী, অনুবাদ-কাহিনী; মোটামুটি সাহিত্য শাখার সবকিছুর মাধ্যমেই অংশগ্রহণ করা যাচ্ছে। তারই পূর্বপ্রস্তুতি স্বরূপ আজ ক্লাসের আগেই এসে ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে ম্যাডাম কিছু নির্দেশনা দিবেন।

রাইম থাকে তার ফুফুর বাসায়।ফুফুর বাসা থেকে তার ভার্সিটি রিকশায় গেলে ৩০-৪০টাকা রাখলেও বাসে মাত্র ৫টাকার ভাড়া। সে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে একটা বাসের জন্যই দাঁড়িয়ে আছে।কিন্তু তার গন্তব্য পর্যন্ত যায় এমন বাস গুলোর একটিও এখনো আসছে না- যেগুলো এলো সেগুলোতে দাঁড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ ছিল না।

রাইম বিরক্তি নিয়ে আবারও তাকালো তার কালো রঙের হাত ঘড়িটার দিকে।অস্বস্তির মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে তার- সেই মুহূর্তে একটা খালি রিকশাকে দেখতেই ডাক দিলো রাইম।রিকশাকে ডেকে সে তার গায়ের হালকা নীল রঙের শার্টের দিকে তাকিয়ে ঠিক করে নিলো সেটা একটু। কাঁধের ব্যাগকে নেড়েচেড়ে সে ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামতেই দেখলো রিকশাটা একটা ছেলেকে নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।রাইম খানিকটা অবাক চোখে রিকশার দিকে তাকাতেই কমবয়সী ড্রাইভারটা রাইমকে বলতে লাগল,

-ভাইজান,ডাকছিলেন ক্যান?

রাইমের মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না কোনরকম।সে আসলে রিকশা ড্রাইভারের এমন আচরণকে নিতেই পারছে না।সিটে বসে থাকা মুখভর্তি দাড়িযুক্ত ছেলেটার দিকে একবার তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল,

-আপনার কাজ তো রিকশা চালানো।আপনাকে আমি ডেকেছি যেহেতু আপনি কি বুঝতে পারেননি আমি আপনাকে আসলেই কী জন্যে ডেকেছি?

রিকশায় বসে থাকা ছেলে এতক্ষণে মুখ খুললো।

-কী রে সাজু!

সাজু ছেলেটা এবার পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলতে লাগলো,

-আরে ভাইজান,আফনারে আমি রিকশায় তুলতে যাইতেছিলাম না,সেই পথে এইখানে এই ভাই আমারে ডাক দিছিলো।তো আমি আফনারে সিটে তুইলা উনি ক্যান ডাক দিছিল সেইজন্যে দুই প্যাডেল পিছাইয়া আবার উনার কাছে আইলাম।

রাইমের কাছে এতক্ষণে ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো।সে চোখমুখ শক্ত করে বলল,

-আপনাকে ফিরে আসার দরকার ছিল না।আপনার প্যাসেঞ্জার যেহেতু আমি ডাকবার আগে থেকেই ফিক্সড করা ছিল,আপনি উনাকে নিয়ে এগিয়ে গেলেই হতো।

রাইমের দিকে একটু বোকা বোকা চোখেই সিটে বসা ছেলেটা তাকিয়ে রইলো। রাইম তার কাঁধের ব্যাগটাকে আবারও ঝাঁকিয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো সামনের দিকে।তার এবারের ঝাঁকানোটা আগেরবারের মত স্বাভাবিক ছিল না।অতিমাত্রার রাগ মিশে ছিল এতে।

-এক্সকিউজ মি,দাঁড়াবেন প্লিজ।

রাইম কয়েক পা এগোতেই তাকে আবারো সেই রিকশা ডেকে থামালো। খোঁচা খোঁচা দাড়িভর্তি ছেলেটা এবার রিকশা থেকে নেমে এলো।

-আসলে সাজু আমার পরিচিত ড্রাইভার।আমার একজায়গায় যাওয়ার কথা ছিল এখন।আর তাই দশমিনিট আগে ফোন দিয়ে ওকে এখানে আসতে বলেছিলাম।আমি সচরাচর রিকশা ছাড়া কাছাকাছি দূরত্বের পথগুলোতে বাস ব্যবহার করি না। আপনার জরুরী হয়ত, আমার একটু দেরি হলেও হবে।আপনি রিকশাতে করে চলে যান।

যদিও রাইমের প্রচণ্ড রাগ জমে আছে ড্রাইভার ছেলেটার উপর,তারপরও সে কেবলমাত্র তাকে সহানুভূতি দেখানো ছেলেটার আচরণে মুগ্ধ হয়ে রিকশায় চেপে বসলো।এখানে অন্য কেউ হলে হয়ত ‘না না,আপনি রিকশা ঠিক করেছেন আগে,আপনিই যান’-কিন্তু না,রাইম সেরকম কিছু করেনি।তার প্রয়োজনটা প্রচণ্ড।সে রিকশায় বসে ছেলেটাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় হলো সেখান থেকে।

-আয়,বেঞ্চিটাতে গিয়ে বসি।

-না,আমার ভাল লাগছে না।

-তুই কি এখানেই এভাবে বসে থাকবি? বাসায় ফিরতে হবে না? আম্মু দু’বার ফোন করেছে।

রাইম কিছু বলে না।চুপ করে থাকে।

-কিছুক্ষন এখানে বসতে দে,রুশো।আর ফুফুকে বল আমরা ফিরছি।

রুশো আর রাইমের বসে থাকা স্থানটা ত্যাগ করার জন্য রুশো দাঁড়ানো ছিল।সে এবার ঝাপটি মেরে বসলো।

রাইমের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

-শোন,প্রত্যেকবারই যে তোর কবিতা ভাল হবে এমনটা না।আর প্রতিযোগিতায় হারজিত না থাকলে তুই কিছু শিখবি কি করে বল।প্রেমপ্রীতি নিয়ে তোর লেখা কবিতা সবসময়ই ভাল হয়েছে।কিন্তু একটা কথা তো সত্যি,মানুষ ব্যতিক্রমী জিনিস পছন্দ করে।ম্যাডাম কি বলেছিল শুনিসনি? তোর কবিতায় নতুনত্ব দরকার।

রাইম মুখ খুলল,

-নতুনত্ব আবার কীভাবে আনে? অনুভূতিতে যা আসে তাই-ই তো কবিতায় দেই।অনুভূতিতে আবার নতুনত্বের কি আছে!

-আছে।ইদানীং তোর লেখা কবিতা গুলো কিন্তু সেই আগের ধাঁচেই পড়ে আছে।তুই নিজেই খেয়াল কর,সেই বিরহ,মিলন,প্রেমের উত্থানপতন এসব নিয়েই লিখিস।কিন্তু আসলেই তা একিউটলি বিরহ মিলনকে স্পর্শ করতে পারে? তুই তো প্রেমই করিসনি।বিরহের কষ্ট কী করে বুঝবি পুরোপুরি ভাবে?প্রেম মানুষকে কবিতা লিখতে শেখায়।তুই একজন পুরুষকে বিশ্লেষণ করে একটা কবিতা লিখতে পারিস।প্রেমিককে খুঁটে খুঁটে তোর কবিতার পঙক্তি সাজাবি।

বলেই ফিক করে হেসে দেয় রুশো।রাইম চোখ বড়বড় করে তাকাতে গিয়েও কেমন যেন ধাঁধায় পড়ে যায়।রুশো তার কথাগুলো হেয়ালি করে বললেও কোথাও যেন একটা সুক্ষ্ম আর গূঢ় অর্থ খুঁজে পাচ্ছে রাইম।

সবকিছু ছাপিয়ে তার বারবার শুধু মনে পড়ছে তার কবিতা ভাল হয়নি।প্রতিযোগিতায় অন্যান্যদের কবিতার প্রশংসা করেছে সেলিনা ম্যাডাম।এটা তার জন্যে অসহনীয় কষ্টের মনে হচ্ছে। ভাবনার আরো গভীরে যেতে হবে তাকে।

রুশো রসায়ন বিভাগের ছাত্র হওয়াতেই বোধ হয় বুদ্ধিমান ভীষণ।তার মাথা কিছুটা ঠাণ্ডা প্রকৃতির।না হয় তারই সমবয়সী মামাতো ভাইটাকে সে কেমন মুরব্বীদের মত কনভিন্স করে নিয়ে বাসায় চলল।

রাইম পড়ার টেবিলে বসা।তার ফুফু তাকে খাবারের জন্য ডেকে গেল কয়েকবার।কিন্তু তার তেমন উদ্বিগ্নতাই যেন নেই সে নিয়ে।শব্দচয়ন,তাল-লয়,গদ্যছন্দের ভিন্নতা,অনুভূতির গাঢ়তা আর এসবের সমন্বয়ে একটা কবিতা- সেসবই তার মাথায় ফেঁদে আছে।

রাতের খাবার খেয়ে রাইম তার টেবিল,ওয়াড্রোবের ড্রয়ারে কিছু অফসেট পেপাপের খোঁজ করতে লাগল। সেসবের চিহ্ন মাত্রও নেই আর তার ঘরে। রুশো ঘরে ঢুকে রাইমের এমন তন্নতন্ন করে কিছু খুঁজতে থাকা দেখে বলল,

-অফসেট পেপার খুঁজছিস? সে তো দুদিন আগেই শেষ করে ফেললি। রাতুলকে পাঠা। নিচের দোকান থেকে গিয়ে নিয়ে আসুক।

ক্লাস টু’তে পড়া রাতুলকে দোকানে পাঠানো গেল না। সে যাবে না। অগত্যা রাইম তার টি-শার্টটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। দোকানটা অবশ্য তাদের ফ্ল্যাটের সাথেই।তাই সময় অসময়ে খাতাপত্র অথবা ফটোকপির কোন ব্যাপার নিয়ে তেমন একটা সমস্যা হয় না।

-ভাইয়া,৫টা অফসেট পেপার দিন তো।

দোকানী তার পরিচিত কাস্টমারদের সহসাই যখন খালি হাতে ফেরাতে বাধ্য হয়,তখন জিভে কামড় দিয়ে ‘এইমাত্র বিক্রি হয়ে গেল ভাইয়া’ বলে ব্যর্থতা প্রকাশ করে কিছু কিছু সময়। রাইমের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো।

রাইমের নিজের প্রতি একটা অনর্থক রাগ হতে লাগল। দোকান থেকে ফিরে যাবার উদ্দেশ্যে ঘাড় ঘুরাতেই সেদিনের ছেলেটা এসে দোকানে ঢুকল।রাইমকে দেখেই সে হাসিমুখ করে বলল,

-আপনি? কি খবর?

রাইমের খবর জানতে চাচ্ছে ছেলেটা।অথচ সে যে এখন রাগের কোন ডিগ্রীতে আছে তা কী করে বোঝায়! সে মুখে নকল হাসি টেনে বলল,

-এই তো ভালই।আপনি কি এদিকেই থাকেন?

-হ্যাঁ,আমরা স্থানীয় বাসিন্দা এদিকের। অফিসে আসা যাওয়াটাও সুবিধার এখান থেকে।আপনার বাসাও কি এদিকে?

-হ্যাঁ।

দোকানদার লোকটা এতক্ষণে মুখ খুলল,

-ভাইয়া ইনিই একটু আগে অফসেট পেপার গুলো কিনে নিয়েছেন সবগুলো।

রাইম ছেলেটার হাতের কাগজপত্রের দিকে নজর দিয়েই দেখল তার হাতে অফসেট পেপার। রাইম ভীষণ অবাক হলো।কাকতালীয় ব্যাপার গুলো বারবার এই ছেলের সাথেই কেন ঘটছে?সে নিজেকে প্রশ্ন করে।

-আপনার লাগবে?

রাইমের উদ্দেশ্যে ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।রাইম আগপিছ না ভেবেই ছেলেটার হাত থেকে দুটো অফসেট পেপার ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল,

-আপনি অফসেট পেপার না দিলেও আমি আপনার থেকে জোর করে নিতাম। দুটো দিয়েই চালিয়ে দেব।

ছেলেটা হেসে উঠলো মিষ্টি করে।সে তার হাতের সবগুলো অফসেট পেপার রাইমের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল,

-আপনার দরকারটা তাহলে বেশি।আমার ততটা না।আপনি সবগুলোই রাখুন।

সেদিনের মত ছেলেটাকে রাইম একটু ভাল করে দেখে।তাকায় ছেলেটার বোতাম-বদ্ধ শার্টের ফাঁকে বেরিয়ে থাকা বুক-পশমের দিকে;গুটিয়ে রাখা শার্টের হাতার বাইরের পশমভর্তি পেশিবহুল হাতদুটোর দিকে।রাইমের কেমন ঘোর লেগে আসে।রাইম এই ঘোর লাগা নিয়েই ঘরে ফিরে আসে।রাইমের হঠাৎ মনে পড়ে তার গোপন-প্রকাশ্য সবকিছু জানা মামাতো ভাই রুশোর কথা-

‘প্রেম মানুষকে কবিতা লিখতে শেখায়।’

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই গোসল সেরে নিল রাইম।চুলে তোয়ালে পেঁচিয়ে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সে চুলের পানি শুকোতে লাগল।মাথার ভেজা চুল নেড়েনেড়ে চুলের পানি নামাচ্ছে সে। আচমকাই তার চোখ আঁটকে গেল।কেউ তাকে দেখছে। বেলকনির নিচে তাকাতেই দেখতে পেল সরু আর লম্বা নাকের সাথে মায়াবী গড়নের ছেলেটাকে,যে ছেলেটা ভাগ্যের ফেরে বারবার রাইমের কাছে আসছে।রাইম হকচকালো না।স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই জিজ্ঞেস করল,

-কোথাও যাচ্ছেন?

ছেলেটা স্মিত হেসে উত্তর দিল।

-হ্যাঁ।অফিসে।

রাইম কিছু না ভেবেই হুট করে বলল,

-পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে পারবেন?

-হ্যাঁ।পারব।কিন্তু কেন?

-অজানার উদ্দেশ্যে বুঝি অপেক্ষা করা যায় না?

বলেই রাইম মুচকি হাসে। সে ঘরে এসে তার কাপড় পালটিয়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়।

হাঁটতে হাঁটতেই রাইম তার মাথার চুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করতে লাগল।কিন্তু সেটা হচ্ছে না দেখে সে কিছুটা বিরক্ত।

-এলো চুলেই সুন্দর দেখায়।

রাইম ছেলেটার দুষ্টুমি মাখা কথাটা শুনে একটু লজ্জা পায়।কিছু বলতে যেতেই ছেলেটা আবারও বলে উঠল,

-পাঁচ মিনিটের কথা ছিল।দশ মিনিট পেরোচ্ছে।

-আপনি ভার্সিটির দিকে যাবেন?

-না,ঠিক ওদিকে না।তার আগেই আমার অফিস।আপনি ভার্সিটিতে যাচ্ছেন?

-হ্যাঁ।ভাবলাম একসাথে যাই।

-তা যাওয়া যায়।

রিকশার অনুপযুক্ত দুটো সিটে দুজন মানুষের বসতে কষ্ট না হলেও,কিছুটা অস্বস্তি কাজ করছে।রাইমের তেমন কোন অভিব্যক্তি নেই।তবে রাইম কি চায় এই অস্বস্তি বোধটাও না হোক?হয়ত চায়।

ছেলেটা একটু সংকোচে থাকলেও রাইমের যেন কোন ভাবান্তরই নেই।তার মুখে হাসি প্রস্ফুটিত নয়,তবে চোখ দুটো হাসোজ্জ্বল। হাল্কা বাতাসে রাইমের কিছুক্ষণ আগের ভেজা চুলগুলো শুকিয়ে উড়তে লাগল।রাইম তা কপাল থেকে সরিয়ে নিয়ে কানের নিচে গুঁজে দিচ্ছে। পাশে বসা ছেলেটা তা মুগ্ধতা নিয়ে দেখে।ছেলেটার নিজের অজ্ঞাত মন হয়ত আর সংশয় রাখতে চায় না দুজনার মাঝে।

-সেদিন আমি আপনাকে ছোটখাট দশমিনিটের অপেক্ষা করালেও আজ আপনি আমাকে বেশ অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলেন।

-অফিসের কাজ শেষ করেই বেরিয়ে পড়েছি।আপনিই সময়ের আগে চলে এসেছেন।আমি কিন্তু খুব একটা লেট করিনি।ঘড়ি দেখুন।

-আচ্ছা,তর্ক বাদ দিয়ে বসুন।

ছেলেটা ঝাপটা মেরে রাইমের পাশে বসতেই দমকা একটা ঘামের গন্ধ এসে রাইমের নাকে লাগে।রাইম আরো একটু কাছে এসে বসে।যেন নেশা জাগানিয়া ঘামের গন্ধটা আবারো পাওয়া যায়। রাইম আড়চোখে তাকায় ছেলেটার দিকে,তার কপাল আর গাল জুড়ে চিকচিক করা ঘাম।এতেও যেন একটা সৌন্দর্য লুকোনো।অগোছালো চুল আর অপরিচ্ছন্ন দাড়িও এত মোহনীয় হতে পারে!রাইম মনে মনে আওড়ায়।

-আপনার নাম যা-ই হোক।আমি আপনাকে তপন বলে ডাকব।

-তপন কেন?

-সবকিছুর কেন জানতে নেই।

-আমার নামের নেপথ্য কী আমিই জানতে পারবো না?

-এটা আপনার নাম নয়।আমার দেওয়া নাম।

-আপ্নার দেওয়া নামের জন্য আমার বাবা-মায়ের দেওয়া নামটা বুঝি তলিয়ে যাবে?

রাইম নড়ে বসে।বলে,

-তলিয়ে যাবে কেন?এই নামে তো শুধু আমিই ডাকব আপনাকে।

-আচ্ছা।তাহলে শর্তটা হল তুমি করে বলতে হবে।

রাইম হো হো করে হেসে উঠে।কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,

-‘তপন,আপনি কেমন আছেন?’ এইরকম উদ্ভট কথাবার্তা বলার লোক আমি নই। কি বিচ্ছিরি সম্বোধন! আমি নাম ধরে যখন ডাকব,তখন তুমি করেই বলব।

তপনের আর কিছু বলার থাকে না।সে তপনই তার নাম করে নেয়।

রাইম তার কবিতা লেখায় হাত দেয়।

সে তপনকেও বিশ্লেষণে নামে- একজন পুরুষকে আবিষ্কার করার পণে নামে। একটু একটু করে তপনের সাথে নিজের একাত্মতা গড়ার চেষ্টায় রত সে রাতদিন।

পুরুষত্বে ভারি হওয়া তপনকে একটা মহাকাব্যের মত মনে হয় রাইমের। তপনের সাথে রিকশায় করে ঘোরা,অথবা তার ঘর্মাক্ত শরীরের গন্ধ অগোচরেই শুকে নেওয়া,কিংবা লোমশ তপনের পেশিবহুল মেদহীন শরীর- এসব কিছুই রাইমের একেকটা অন্তহীন অধ্যায় মনে হয়।সে এসবের প্রচ্ছন্ন ভাষা উন্মোচনে ব্যতিব্যস্ত।

তপনের ঘন দুটো ভ্রু যুগল দেখে রাইম তার ভেতর জুড়োয়।এঁটে সেটে লেগে থাকা শার্টের বাইরে দিয়ে তপনের বুকের দরজা দিয়ে দেখা পশম গুলো খসখসে সরু রাস্তা ধরে কেমন রহস্যময়তায় গিয়ে মিলিয়েছে তা ভেবে ভেবে রাইমের মোহ আর নেশা দীর্ঘ হয়।

ক্লাস শেষে কিংবা সপ্তাহ শেষে রাইম তপনের অপেক্ষায় থাকে-কিংবা তার কবিতার জগতে মেশার।

প্রকৃতি কাউকে কাউকে হয়ত সাক্ষী বানায় কিছু কাঁটা যুক্ত প্রেম-ভালবাসার।রুশোও কিছুটা টের পেয়েছিল রাইমের এমন আকস্মিক পরিবর্তনে।সে রাইমকে বলে,

-এত ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল তোর এক ছেলের সাথে আর তুই কেমন করে সব চেপে যাচ্ছিস।

-কী চেপে যাচ্ছি? আমি কিছু লুকোইনি,কিছু প্রকাশও করিনি।

-কথা পেঁচাস না। আজকাল তোকে এজন্যই এত গম্ভীর আর উদাস দেখায়।

-কবিরা এমনই হয়।

-প্রেমিকরা?

-হয়ত এমনই হয়।

-হয়ত?

রুশো আর কথা বাড়ায় না।রাইমকে ঘাটায় না তার নিজস্ব ব্যাপারে। রাইম আর ছেলেটার সম্পর্কের ব্যাপারে সে সবকিছু না জানলেও কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল।রাইমও ততটা গোপনীয়তা রাখেনি।রুশোর এ ব্যাপারে কিছুটা সংশয় কাজ করছিল।তার প্রয়োজন ছিল পরিষ্কার হওয়া।কিন্তু সংশয় কি আদৌ কাটলো? রুশোর ভেতরে ভেতরে প্রশ্ন জাগে।

‘সে একটা ঘোরের বস্তু,

কিংবা মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারা এক তান্ত্রিক।

না হয় এতটা চুম্বকত্ব সে কোথায় পায়?

যামিনীদের স্নিগ্ধ সুবাস তাকে এতটা নির্জনতায় কেন কামনা করে?

তার দেহের ভাঁজ,কিংবা দেহের কোষ একেকটা বিশাল অধ্যায়।

আমি তা অন্বেষণে কাঙালিনীর মত আঁচল নামিয়ে হাঁটি-

আমি অসামাজিক বেদেনীর মত তার ঘামের গন্ধের তালাশ করি-

সেই বিষাক্ত নেশা আমার নাসারন্ধ্র দিয়ে স্নায়ুতে প্রবেশ করে,আমি অবশ হয়ে তপনের উষ্ণতায় মদির হই।

আমার তৃষ্ণা কেমন নির্বিকার,

তবে তা কেন খুবই তীব্র?

এই পিপাসা আমাকে প্রণয় উপাখ্যানী করে দেয়।

এক আলোকবর্ষ নিয়েও উন্মোচন করতে না পারা সূর্যের বিশালতাকে আমি নির্বোধের মত এক জীবনেই খোলাসা করতে চাই!

তাকে আমি শিকার করি- খাঁচায় পুরে নেই।

তপনেই আঁটকে দেই-

সে শুধু আমার হয়েই থাকুক,আমি তার কামনার এলাকার যামিনী-

সে আমার কাব্যের অনুভূতি।’

সাদা কাগজের পাতায় লেখা এই কবিতা একসময় রাইমকে অনন্য করে দেয়।সে তার সবটুকু আবেগ আর প্রেম মিশিয়ে কবিতা লেখে।শুধু মিশিয়েই নয়,সমগ্র প্রেমটাই হয়ত সে তার কবিতার চরণে চরণে উজার করে দিয়ে এখন বিরান হয়ে গেছে।

ভালবাসার হিসেব নিকেশে সবকিছু পেয়ে যেতে নেই।কিছু অপ্রাপ্তি আর শূন্যতা থাকতে হয়।এসব শূন্যতাই অনুভূতিকে সিক্ত করে তুলে হয়ত।সবকিছু পেয়ে গেলে দুটো মানুষের অনুভবের জগতে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর না পাওয়ার ব্যথাটা থাকে না।ব্যথাহীন সুখও উপলদ্ধ হয় না।মনের সব বাসনা পূরণ হলে মনের আকুতিহীনতা কি প্রেমহীনতার কথাও বলে না?কে বলতে পারে, না পাওয়ার ক্ষীণ যন্ত্রণাতেই ভালবাসা লুক্কায়িত কিনা!

রাইমের অনুভূতির পরিতৃপ্ততাই হয়ত ওকে আর ভালবাসার দ্বারস্থ করছে না,নয়ত বা তার লেখা কবিতা সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছে বলেই।তার প্রত্যাশা পূরণের সাথে সাথে তপন নামক ছেলেটাও মন থেকে সরে গিয়ে দূরে কোথাও মিলিয়ে যেতে লাগল।ক’দিন আগের ধোঁয়াশা তপনকে তার এখন সচ্ছ রোদের মত লাগে বলেই হয়ত এখন রাইম একা একাই রিকশা করে ভার্সিটি পর্যন্ত যায়।বারান্দায় এসে চুল শুকোয় না- মনে মনে হয়ত এখন আর আগের মত গোপন সেই বাসনা নেই যে তাকে কেউ ভেজা চুলে দেখুক।

রাইম কি কাউকে উপেক্ষা করতে চাইছে? সে নিজের কাছেও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না।

তপনের তাপে রাইম নিজেকে একটু একটু করে উষ্ণ করে নিয়েছিলো। দিনকে দিন রাইমের ঘোর গভীর থেকে গভীরতর হতে হতে একসময় তা মিইয়ে এসেছিলো বোধ হয়।

কিন্তু অপরপ্রান্তে থাকা সরল ছেলেটা- সে পরিণতি নেই জেনেও কোমল মন নিয়ে বসে থাকে সপ্তাহ শেষে তার কারো সাথে দেখা হবে।নীল টি-শার্ট পড়া মাঝারি গড়নের ছেলেটাকে একটু দেখবে সে।তপনের এই চাওয়া গুলো অকস্মাৎ একমুখী হয়ে গেল কেন সেই উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে বারবার অমানিশায় ডুবে যায়।তার মনে হয় রাইম তাকে ভালোবাসে,কিন্তু এই রাইমের ‘ভালবাসা’ শব্দটাতেই কী যেন একটা নেই।না হয় তপনের চামড়ার ভেতরের অনুভূতির জগতটা কি একটুও সায় দিতো না রাইমকে নিয়ে তার এই দোনোমনার প্রশ্নে?

রাইমের এই দ্রুত পরিবর্তন কিংবা উন্নতি তাকে সত্যিই অন্যতম করে দিলো।তার লেখা কবিতাগুলোতে যেন এক নতুনত্ব খুঁজে পেল সবাই- কেমন যেন বিষাদ আর সুখের সমন্বয়ে তৈরি ছুঁচালো সব কবিতা। রাইমের দিনগুলো তার কাব্য-কবিতাকে ঘিরেই পার হয়ে যেতে লাগলো।

তবে রাইমের এই দ্রুত উন্নতির সঙ্গে সেও অদ্ভুতভাবে বদলে গেল।তপন সেই নির্মল সুন্দর চোখের রাইমের দৃষ্টিতে অপ্রত্যাশিতভাবেই এখন অবজ্ঞার ঢালি দেখতে পায়। তপনের নিজেকে নির্বোধের মত মনে হয়। মনে হয়,এসব হওয়ার নয় এবং হয়ওনি।সে যা দেখছে তা তার বিভ্রম।অথবা আগে যা দেখেছিল,বুঝেছিল তা-ই বিভ্রম ছিল। যেভাবেই তপন পথ খুঁজুক,তার নিজেকে ভালবাসায় অজ্ঞ এক নির্বোধের মতই লাগে।

অন্যদিকে রাইম তপনকে আগলে রাখতেও চাচ্ছিল না। তার অনুভূতির যেটুকু অর্জন ছিল তার সমাপ্তি ঘটাতে সে তপনকে এড়িয়ে যেতেও চাচ্ছিল না।

কিন্তু ভালবাসার অপর পিঠে কখনোই স্বাভাবিকতার লেশ থাকে না।সেখানে হয়ত ঘৃণা অবস্থান করে,নয়ত মৃত্যুর আবছায়া।

রাইমের লেখা নির্বাচিত কিছু কবিতা আর অনুভূতি-অনুচ্ছেদ নিয়ে সেলিনা ম্যাডাম নিজ দায়িত্বে কবিতার বই ছেপে দিলেন।বই মেলাতে সেই বই বের হওয়ার অপেক্ষায়।রাইমের চোখ অনেকদিন পর পরিপূর্ণ প্রাপ্তিতে জ্বলজ্বল করতে থাকে।তার চোখের নিচে কিংবা কপালের ভাঁজেও এখন তেমন কোন চিন্তার ছাপ নেই।তপনকে বেশকিছুদিন যাবত পথে ঘাটে দেখা যায় না বলেই হয়ত।

কিন্তু তপনের এই হঠাৎ নিখোঁজ হওয়াটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না রাইমের।বরঞ্চ ক’দিন আগ পর্যন্তও তার ক্যাম্পাস আর বাসার নিচে ঘুরঘুর করার মত কাণ্ডগুলোই যেন স্বাভাবিক ছিল।অফিসের সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসাদ পরিবারের সাথে বিলীন না করেই গলির রাস্তায় এদিক-ওদিক করা ছেলেটার দু’দিন যাবত নিরুদ্দেশের বার্তাটা রাইমকে অস্বস্তিমুক্ত রাখলেও, পারতপক্ষে সুক্ষ্ম এক দুশ্চিন্তার জন্ম দিচ্ছিল।

তবে এই সরু-যন্ত্রণার দৈর্ঘ বাড়েনি।

ক’দিন বাদেই কালো মেঘেঢাকা একদিনে রুশো রাইমকে নিয়ে চলল তপনদের বাসার দিকে।রাইসা বুঝতে পারছিল না রুশো কী করতে চাচ্ছে,তবুও রাইম চুপচাপ ছিল।

দুয়েকটা গলি আর তপনদের মহল্লা পেরিয়ে সন্ধ্যে নামা সেই ক্ষণে ওরা দু’জন এসে দাঁড়ালো প্রাচীর টানা এক নির্জন এলাকার পাশে। মোটা রড আর স্টিল দিয়ে তৈরি গেট পেরিয়ে রুশো রাইমকে নিয়ে ঢুকলো প্রাচীর ঘেরা বেষ্টনীর ভিতরটায়।

ততক্ষনে রাইমের উৎসুক নয়ন আর তৃষিত মন তাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছে। কিছু ক্যাকটাস গাছ,দুটো ল্যাম্পপোস্ট আর এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু কবরসহ একটা গোরস্থানে দাঁড়ানো ওরা দু’জন।

রাইম রুশোর দিকে তাকিয়ে দেখলো, সে কেমন নির্বাক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।যেন ভারি একটা কষ্ট তাকে অসাড় করে দিয়েছে।

নিরবতার পর্দা ছিড়ে রুশোর গলা শোনা গেল।

-রাইম,ছেলেটার ভুল ছিল কি জানিস? সে তোর মত বাজিগর ছিল না।

রুশোর শীতল কণ্ঠের কথাগুলো রাইমকে কিছুটা আতঙ্কিত করে তুলল।নিস্তব্ধ এই পরিবেশটাতে রাইম রুশোর কথাগুলো শুনতে লাগল।

-তুই যেভাবে ভালবাসাকে পুঁজি করতে পেরেছিলি,ঠিক এইভাবে যদি ছেলেটাও ভালবাসাকে দেখত,তবেই ব্যথার বোঝাটার সমতা হতো।কিন্তু না,ছেলেটা সরল মনেই হয়ত এই প্রথম কাউকে ভালবেসেছিল।আর ভালবাসার দেওয়া কাঁটা সব মানুষ সহ্য করতে পারে না।ছেলেটাও এই ধকলটা নিতে পারেনি। মূর্খ ছেলেগুলো ভালবাসা খুইয়ে অস্তিত্বই হারিয়ে বসে–এরকমটাই মনে করে ওরা।মূর্খ বলছি ছেলেটার এ যুগের ভালবাসার ধরন না বোঝাতে।

মূর্খ না বলে তাকে নিষ্পাপই বলা শ্রেয় মনে করি।তোর পূণ্য যে,তোর সামনের কবরে শুয়ে থাকা ছেলেটার ভালবাসার মানুষ ছিলি তুই।ভালবাসার ক্ষেত্রে সে অনিন্দ্য কেউ হলেও,সে আর দশটা সাধারণ প্রেমিকের মতই আত্মহনন করেছে।

বেশখানিকটা সময় পেরিয়ে গেল বোধয়,ঠিক কতক্ষণ সেটা রাইম বলতে পারবে না।রুশো অনেককিছু বলছিল সেই কথাগুলোর পরেও,কিন্তু শেষের কথাগুলো রাইম আর শুনতে পায়নি কেন জানি।আড়ষ্টতা তাকে আঁকড়ে ধরেছিল খুব শক্তভাবে।তার মনে হচ্ছিল ক্ষণকালের এই ক্ষুদ্র বিষাদের অপার এক শক্তি তাকে বাস্তব আর অলীকের দ্বিমেরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।তার আশপাশটা আচমকাই ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।

রাইম অসহায়ের মত স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকালো চারপাশে,কেউ নেই।

সে খেয়াল করল,তার থেকে ঠিক দু-তিন হাত সামনে কাঁচা মাটির একটা কবর।কবরটার মাটিগুলো উর্বর।চারপাশে বাঁশ কিংবা খেজুরের ডাল দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়নি বলে ছোট কবরটাকেই কিছুক্ষণের জন্য এক কৃষ্ণগহ্বরের ছায়ার মত মনে হল।যার শুরু কিংবা শেষ কিছুই নেই।যেই ছায়াপথের অসীমতার ভেতর কেবল সুগভীর বিষাদ নিয়ে হারানোই যায়।

রাইমের মনে হতে লাগল নরম মাটির এই কবরটাও যেন আচমকাই কেমন অসীমতায় মিশে গেল।যার আদ্যোপান্ত সে শুধু দেখেই যাচ্ছে কিন্তু দিগন্ত নেই।

এ যেন জনমে জনমেও না ফুরানো এক তীক্ষ্ণ অনুভূতি।যা শুধু সুঁচের মত অস্পৃশ্য এক আঘাত করে যাচ্ছে মনের শরীরে।

অনুভূতিটা আঘাতের হলেও তীব্র-অসম এক প্রাপ্তিও হয়ত ছিল এতে রাইমের জন্যে।এই নির্বিকার পরিবেশে বাস্তবতা ছাপিয়ে পাওয়া অনুভুতি কখনো শেষ হওয়ার নয়। আমৃত্যু ক্ষুৎপিপাসার তাড়নাহীন লিখতে পারা সহস্র কাব্যের রসদ সে পেয়ে গেছে।এই অপার্থিব অনুভুতি হয়ত কখনোই অন্তিমে পৌছবে না। অচ্ছুত এই ব্যথা কাব্যের এক আধার তৈরি করেছে নিরন্তরতাকে সাথী করে।এই অনুভূতির সমুদ্র তীরে সমাধিস্থ করা দেহটা কখনোই গহীন হতে মুছে যাবে না আর।দিন যাবে,সময় যাবে,বয়সের সাথে সবকিছু দুর্বল হয়ে এলেও আজকের এই নিভৃতে পাওয়া অনুভূতির বয়স হয়ত বাড়বে না।সে সর্বদাই সদ্য প্রস্ফুটিত সাদা ফুলের মত সুবাস ছড়াবে এক কাব্যিক-যুবক রাইমের জগতে।

….…………….

December 5, 2018 সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.