দিঘির জলে তুমি

পরিশ্রান্ত পথিক

“আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন

খুঁজি তারে আমি আপনায়

আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি

আমারি পিয়াসী বাসনায়।

আমার মনের তৃষিত আকাশে

ফেরে সে চাতক আকুল পিয়াসে

কভু সে চকোর সুধাচোর আসে

নিশীথে স্বপনে জোছনায়।”

সুনিপুণ সুরে নজরুলগীতিটা ঈষৎ স্পষ্টে শোনা যাচ্ছে। এত দরদ মিশিয়ে নজরুলগীতি, এই প্রথমবার কেউ হয়ত শুনে থাকবে। আর এই অপরাহ্নে ছায়া সুনিবিড় এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কেউ এই গান গাইবে, আন্দাজ করাটাও অনেকটা অলিকের মত। কে গাইছে? জানার কৌতূহল ক্রমশ বাড়ছেই তিলাশের।হাতে ক্যামেরা নিয়ে হাঁটছে। সারি সারি গাছগাছড়া পার করে সুরের উৎসের কাছে পৌঁছল। কেউ একজন মাদুর বিছিয়ে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে উত্তর দিগন্তে উন্মুখ হয়ে গাইছে। দেখতে অপরূপ লাগছে। যেন শুভ্রতা ভেসে যাচ্ছে দিগন্তে দিগন্তে। সামনেই পুরোনো, শ্যাওলাযুক্ত শাণ বাঁধানো দিঘি।সিঁড়ি অনেকটা নিচে নেমে পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি টলটলে তবে, বাদামি বর্ণ নেই, প্রগাঢ় সবুজ। হয়ত এ পানিতে কেউ গা ভেজায়না বহুকালব্যাপী। ঘাট দেখেই বুঝা যাচ্ছে পদব্রজ হয়না। কাছে যেতেই হয়ত, শুকনো পাতার মরমর শব্দে সুর ভঙ্গ করে গান থামিয়ে দিল। পেছন দিকে না ফিরেই বলল, কে? তিলাশ নিরবতা পালন করে সামনে গিয়েই বলল, আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি এখানে আজই প্রথম এসেছি।

-হুম।কেন এসেছেন?

-আসলে এসেছি সেই সকালে। বাবার একটা প্রজেক্টের কাজ ছিল। সামনের বিলে আমরা কিছু জমি কিনেছি।তো, ভাবছি সেখানে মেডিসিন ফ্যাক্টরি দিব।

– অহ,বড়লোক(কিছুটা অবজ্ঞার সুরে)।

-বড়লোক বললেন,কেন? জানতে পারি কি?

– না মানে বিরাট কারবার তাই আর কি।আচ্ছা, এখানে পৌঁছলেন কিভাবে?

-যাই হই মানুষ তো। আসলে গাড়ি করে যাচ্ছিলাম হঠাৎই একটা পাখির ডাক শুনি। ডাকটা খুব চেনা মনে হল।তাই হাটতে হাটতে একটা ছবি তুলব বলে এখানে।পরের রাস্তাটুকু আপনার গানই এনেছে।

– পাখির ডাকটি আপনি কোনদিন শুনেনই নি তাই পরিচিত লাগছে আপনার।

-তাই,না শুনেই পরিচিত লাগছে।অদ্ভুত তো!

– মাঝেমাঝে এরকম হয় যা আপনি কখনওই অনুভব করেন নি, তাই ই আপন হয়ে যায়।

-হয়ত,আপনি ঠিক।আমি অতশত বুঝিনা। যাহোক, আজ আসি।কাল এই সময়ে আবার আসব।

***আজ একটু আগেই এসে গেছে তিলাশ। খুব একটা আগেও না।এতক্ষণে বসে গেছে গায়ক পাখি। নিরবতা ভঙ্গ করে তিলাশ বলল, যাক বাবা গান মিস করিনি। তবে আজ কি শুনছি, আজ পোশাকে শুভ্রতা নেই, আছে নীলাম্বরীর নীলভ্রতা।

বলা মাত্রই বীণা হাতে নিয়ে গাইতে শুরুকরল,

নয়ন ভরা জল গো তোমার,

আঁচল ভরা ফুল

ফুল নেব না, অশ্রু নেব!!

ভেবে হই আকুল।

ফুল যদি নিই তোমার হাতে

জল রবে গো নয়ন পাতে

অশ্রু নিলে ফুটবে না আর

প্রেমের মুকুল…………

দিঘির জলে অশ্রুসিক্ত চোখে অপার হয়ে তাকিয়ে আছে তিলাশ।

– একি আপনার চোখে পানি।বাবাহ, বড়লোকরা আবার কাঁদতেও জানে।

– আচ্ছা, আপনি কি সব মানুষকে একরকমই মনে করেন?

– তা নয়। তবে বড়লোকদের কে একটু (বলতে গিয়ে থেমে গেল)

– দুদিন হল আসতেছি অথচ আপনার নাম টাই জানিনা।আপনার সম্মন্ধে জানতে পারি কি? যদি চান!

– পরিচয় দেবার মত কিছু নেই। আমি বিকলাঙ্গ সেঞ্জু। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে নাট্যকলায় পড়তাম। এখন পঙ্গুত্ব নিয়েই বসে আছি এগারো ঘন্টার অপেক্ষায়। একথা শুনে তিলাশের মুখকমল চুপসে গেল।যেন বৃষ্টি নামার পূর্বমুহূর্তের মেঘ জমেছে কপালে।

-কি? আপনি পঙ্গু। সরি, আমি বুঝতে পারিনি।

– আপনি সরি বলছেন কেন? গতকাল তো আমার আগেই আপনি চলে গেছেন। তাই বুঝতে পারেন নি। যা ছিল কপালের দোষ!

– ডাক্তার কি বলেছেন? পা কি ঠিক হবার নয়?

– আশ্বাস দিয়েছিল।কিন্তু!

– কিন্তু কি বলুন?

– দেখুন আমাদের মত গরিবরা কি করে এত টাকা দিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাবে, বলুন?

তিলাশের উত্তর দেওয়ার আগেই হঠাৎ করেই মেঘ গর্জে ওঠে। সাথেই ঝুম বৃষ্টি নামে। আকস্মিকভাবে দুজনেই ভিজে যায়। সেঞ্জুর বাবা ইতোমধ্যে ছাতা নিয়ে এসেছে।কিন্তু ছাতা এনে লাভ হয়নি। কিছুটা বিস্মিত হয় নতুন আগন্তুক কে দেখে। এই অজপাড়া গাঁয়ে এরকম সাহেব অবয়ব বিস্মিত হওয়াও বিস্মিতের কারণ নয়। যাহোক অদূরেই সেনজুর বাড়ি। বাড়ি বলতে একটা দক্ষিণমুখী খানিকটা বড় মাটির ঘর। পশ্চিমে ছোট একটা ঘর। আরেকটা খড়চালা হয়ত রান্নার ঘর। ওরা সবাই বড় ঘরের বারান্দায় উঠে।

***

সন্ধ্যে নেমে গেছে খানিকক্ষণ আগেই। রাতের অন্ধকার তাই জানান দিচ্ছে।বৃষ্টিও থেমেছে মিনিট দশেক আগে। তিলাশ ছটফট করছে, বসে বসেই।ছোট চারপায়াতে বসে আছে সে। এখন যাবার উপায় কি? মাদুরে বসে থাকা সেনজু বলে উঠে, একে তো বৃষ্টিবিঘ্নিত রাস্তা, তার উপর রাত। আজ মনে হচ্ছে না আপনি যেতে পারবেন। সেঞ্জুর বাবা বলে, বাবা কিছু মনে না করলে একটা কতা কই? আইজ রাতখানা আমাগো গরিবের বাড়ি থাইক্কা যান। সেনজুর দিকে তাকাল তিলাশ। সেনজু নিরব। তার মুখ দেখে কিছুই বুঝতে পারছে না তিলাশ সে রাজি নাকি না। এতক্ষণে সেঞ্জু বলল, বড়লোক মানুষ! আমাদের বাড়ি কি করে থাকবে? তিলাশ বলে,কি বারবার এক কথা বলছ? এবারও চুপ করেই রইল সেঞ্জু। রাতে খাবার শেষে শুয়ার বন্দোবস্ত হল পশ্চিমের ঘরে মানে সেঞ্জুর ঘরে। তিলাশ আর সেঞ্জু এক সাথে থাকবে। রাত বাড়ছে। গভীর রজনী ডানা মেলে আছে।আর দুজন মানুষ শুয়ে আছে একই খাটে। কিন্তু সেঞ্জু হালকা চাপা সুরে কান্নার আওয়াজ পেল। এত রাতে কে কাঁদবে? ওঠে হারিকেনের আলো বাড়াতেই দেখে তিলাশে চোখে জল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিলাশ জড়িয়ে ধরে সেঞ্জুকে। বলতে থাকে, এ কেমন ভালোলাগা, যা বলতেও দ্বিধা হচ্ছে? হয়ত ভালোলাগা আর সে অবয়ব এ নেই। ভালবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। এবার সেঞ্জুও কাঁদছে।পূর্ণবয়স্ক দুজন মানুষ, না বুঝার মত কিছু নেই কারো।আদিম অনুভুতি এটা। কখন যে উষ্ণ ঠোঁট দুজনার একিভূত হয়ে গেছে তা জানা যায়নি। সহসাই যেন চৈতন্য ফিরে পেল সেঞ্জু। সেঞ্জু বলল,আমি আর কাউকে জড়াতে চাই না আমার এ অসহায় জীবনের সাথে। আমি আমার মত করে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিব অবলীলায়।

– না,আমি তোমাকে উন্নত চিকিৎসা করাব দেশে না হয় বিদেশে নিয়ে।

– কারো করুণাআমি চাই না যে।মেনে তো নিয়েছি আমার পঙ্গুত্ব। ক্রেচারেই না হয় জীবন পথ পারি দিব।

– মনে কর, বিশুদ্ধ ভালবাসার কসম দিলাম।এবার আর না কর না,প্লিজ। আর কিছু বলার থাকল না সেঞ্জুর। গভীর অনুরাগে রাতের সমাপ্তি।

***

আজ ভোরেই নতুন সূর্য উদিত হয়েছে। সাতরঙা সূর্য।

আজই তিলাশ সেঞ্জুকে নিয়ে যাবে ঢাকা। সেঞ্জুর বাবা মায়ের অনুমতিও নিয়ে নিয়েছে তন্মধ্যে। রওনা হল গন্তব্যের দিকে। জানালায় ফাঁক দিয়ে গাছের অবিরাম ছুটে যাওয়া দেখছে সেঞ্জু। চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে তার।না বলা কিছু কথা যে বলা হয়নি দেবদূতের ন্যায় মানুষটিকে। সহসাই চেঁচিয়ে ওঠে সেঞ্জু, গাড়ি থামাও। তিলাশ অবাক হয়ে বলে,কি হয়েছে…( বলেই থেমে যায়)?একি তুমি কাঁদছ কেন?

– কিছু কথা বলা হয়নি তোমায়।

– কি কথা?

-আমি কাউকে ভালবাসতাম।সেদিন যখন আমার এক্সিডেন্ট হল।সে এসেছিল শেষ বারের মত। চলে গিয়েছিল আমায়। আমার পঙ্গুত্বকে মেনে নিতে পারেনি সে।শুধু রিপোর্টগুলো দেখে নিরব প্রস্থান করেছিল।

-কে সে?

– আমরা একসাথেই নাট্যকলায় পড়তাম।প্রতীমের নাচে আর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম আমি।আর আমার গানে ও বিমোহিত হয়েছিল। সেদিন আমি একটা প্রোগ্রামে গান গাচ্ছিলাম। তারপর থেকেই কথা বলা,প্রণয়।

– তোমাদের আবার মিলিয়ে দিব আমি।কথা দিলাম।

-আমার পঙ্গুত্বে যাকে আমার পাশে সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, নিজেই পালিয়ে গিয়েছিল সেদিন।কি করে মেনে নিব তাকে আবার। কখনওই পারব না। না তোমাকে পারছি মেনে নিতে।এ কেমন জীবন আমার।

-আচ্ছা তোমার চিকিৎসাটা আগে হোক।তারপর এসব ভাবা যাবে।

***

দুদিন পর সেঞ্জুর পায়ের অপারেশন। তাই এডমিশন নিয়েছে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে। কেউ একজন ওর কেবিনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।হঠাৎই থেমে যায় সে। ভেতরে আসলেই সেঞ্জুর চোখ পরে তার উপর। সেঞ্জুর মুখটা অনেকটা হা করা গাপ্সি মাছের মতন হয়ে গেছে।

প্রতীম, তুমি এখানে?

– হুম আমি। এসেছিলাম এক আত্মিয়কে দেখতে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হল তুমি।আসলেও তাই।মন যে বলেছিল তাই হল।মনের টান যে বড় টান।হাজার হলেও ভাল তো বাসতাম তোমায়।

-মন (অবজ্ঞার সুরে),কোন মনের কথা বলছ? যে মন সেদিন এক অসহায় পঙ্গু মানুষকে ফেলে রেখে গিয়েছিলে, সে মন। সেদিন কোথায় ছিল তোমার এই সো কলড মন।

-হ্যা,আমি সেদিন বুঝতে পারিনি।তবে ফিরে আসতে চেয়েছিলাম।কিন্তু তুমি যে প্রকারের জেদি, তাতে এসেও লাভ হত না।তাই অপেক্ষা করে গেছি। তুমি এসে আমার ভুল শুধরে দাও কিনা!

-বাহ, ধন্য তুমি।ধন্য তোমার অভিনয় জীবন। অস্কারটা আমার হাতে থাকলে আজ আমি তোমাকেই দিয়ে দিতাম।

– তিলাশ বুঝি অনেক বেশি ভালবাসা দিয়ে দিয়েছে। তাই আর কারো ভালবাসায় নজর পরছে না।

– তিলাশের ব্যাপারে তুমি জানলে কেমনে?

– সবই জানি।কিন্তু তুমি সব জান না।

-কি জানিনা আমি?

– যাকে তুমি ভালবাসেছ তার কারণেই আজ তোমার এই অবস্থা। সেদিন যে গাড়িটা তোমায় ধাক্কা মেরেছিল সেটা তিলাশের গাড়ি বহরের সামনের গাড়ি ছিল।তিলাশের অজানাতেই ওর লোক তোমাকে হাসপাতালে এডমিড করায়।যেদিন তিলাশ জানতে পারে সত্যটা, সেদিনই তোমার কাছে যায়।গিয়েই তোমার গানের প্রেমে পড়ে যায় সে।তাই সে সত্যু লুকিয়েছে পাছে না তোমায় হারিয়ে ফেলে। যদি কখনো সম্ভব হয় ফিরে এসো।আমি অপেক্ষা করব তোমার।

এসব বলেই প্রতীম চলে যায়।

কিন্তু সেঞ্জু নিরবে শুধু অশ্রুবিসর্জন দিয়ে গেছে কিছুই বলে নি আর।

আজ সেঞ্জুর অপারেশন হবে। কিন্তু সেঞ্জু কোথাও নেই।সাড়া হাসপাতাল তন্নতন্ন করে খুঁজা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিলাশও খুঁজছে। হঠাৎই তিলাশের দিঘির কথা মনে পড়ে। গাড়ি নিয়ে সেই শাণ বাঁধানো দিঘির পাড়ে যায়। ঠিক যা ভেবেছিল, সেঞ্জু বীণা হাতে বসে আছে মাদুর বিছিয়ে। কিন্তু আজ আর গান গাইছে না সে। তিলাশ সামনে গিয়ে দেখে সেঞ্জু অঝোরে কাঁদছে।

-তুমি না বলে চলে এসেছ কেন? আজ তোমার অপারেশন সে খেয়াল আছে তোমার?

– তোমার প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে।বাকিটা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তিলাশ সব বুঝে গেছে।বুক ফেটে তার কান্না আসছে। প্রায়শ্চিত্ত হলেও বড্ড ভালবেসে সে সেঞ্জুকে। তার গানে যে প্রাণ বিদ্ধ করে দিয়েছে জৌলুষে থাকা মানুষটার। এখন দুজন মানুষই অঝোরে কাঁদছে।একজন ভালবেসে, আরেকজন ভালবাসা হারিয়ে নতুন করে ভালবাসা পেয়ে।শুধু দ্বিধায় আছে একজন কাকে বেছে নিবে সে।যাকে প্রথম ভালবেসে ছিল নাকি যার ভালবাসা তার অতীত ভুলিয়ে দিয়েছিল তাকে। ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে।দিঘির জলে টুপটুপ করে ফোঁটা পরছে অবিরাম। ধুয়ে যাচ্ছে মান নাকি অভিমান।ভিজে গেছে দু নরযুবার তনু। মুখে কেউ রা টি কাটছে না। অবাক এ নিস্তব্ধতা।

::::::::::::::::::::::::::সমাপ্ত:::::::::::::::::::::::::

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.