দৈবাৎ

লেখকঃ-পৃত্থুজ আহমেদ

উৎসর্গঃ-ঈশান

আজ এখানে আমার শেষদিন।আজকেই চলে যাব এই জায়গা থেকে।চলে যাব বলতে এই চার দেয়ালের কারাগার থেকে মুক্তি পাব আমি আজ।গুণে গুণে চৌদ্দোটা বছর কাটিয়ে দিলাম এই কারাগারের অন্ধকার গৃহে।এই চৌদ্দো বছরে না কেউ আমাকে একটা ফোনকল করেছে,না কেউ দেখা করতে এসেছে।কারণ কী জানেন?কারণ হল আমি খুনি।অবশ্য আমার কেউ নেই যে আমার সাথে দেখা করতে আসবে কিংবা খোঁজ নেবে।তবে একজন ছিল যার থেকে ন্যুনতম একটা ফোনকল কিংবা একবার দেখতে আসাটা প্রত্যাশিত ছিল।অন্তত ঘৃণার ক্রোধ দেখানোর জন্য তার আসার কথা ছিল।কিন্তু সে আসেনি।কেন আসেনি?উত্তরটা আমি জানি কেন সে আসেনি।তবুও বেহায়া মন তাকে এক পলক দেখার জন্য তৃষিত ছিল।সেই তৃষ্ণা আজও মেটেনি।

সমস্ত ফর্ম্যালিটি শেষ করে অবশেষে বের হলাম যাবজ্জীবন কারাবাসের শাস্তি যবনিকা করে।এখন?এখন কোথায় যাব,কী করব,কার কাছে যাব এসবে টনকনড়ল।

যা হবার হবে ভেবে হাঁটতে লাগলাম।কোথাও না কোথাও তো জায়গা পাব।আর সেটা না হলে রেলস্টেশনে নাহয় থেকে যাব যতদিন না একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করতে পারছি।

কারাগারের সীমানা পেরোতেই দেখলাম একটা সাদা গাড়ি এসে আমার পাশে দাঁড়াল।

আমি না থেমে হাঁটতে লাগলাম।পেছন থেকে গাড়ির দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম।সেই সাথে আরেকটা পরিচিত কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম।ঠিক পূর্বের মত আচমকা ডাকছে,ঈশান?

কয়েক মূহুর্তের জন্য যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম।গত চৌদ্দো বছরের তৃষ্ণা যেন এক মূহুর্তে মিটে গেল।এই ডাকটা শোনার জন্যই তো আমি অপেক্ষা করছিলাম এতটা কাল।কতদিন,কত রাত না ঘুমিয়ে চাতক পাখির মত বুকফাটা আর্তনাদে হাহাকার করতাম শুধু এই মানুষটার ডাক শোনার জন্য।তার ডাক শুনে যতটা না খুশি হয়েছি তার চেয়ে বেশি ভয়,জড়তা,অভিমান চেপে বসল।ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম,আবার কোন ভয়ানক ঘটনা ঘটবে কী না সেই ভয়ে।এতটা ভীতসন্ত্রস্ত আমি পেছনে ফিরে যে মানুষটাকে একবার দেখব সেই সাহসটুকু পর্যন্ত নেই আমার।আখেরে,ভালবাসার মানুষ বলে কথা।জগতের সব ভয় মনে হয় এই ভালবাসাকে ঘিরে।ধরা পড়ার ভয়,পুনরায় হারিয়ে ফেলার সংশয়।তাই এই মধুর ডাক শুনেও না শোনার ভান করে উপেক্ষার ছলে হাঁটতে লাগলাম।কিন্তু না,আবার সেই ডাক আবার পিছুটান।

ঈশান?যেন কোন চৌম্বকীয় ধাতব বল আমাকে পিছু টানছে,টেনে আবার আমাকে চৌদ্দো বছর আগে নিয়ে যাচ্ছে।তখন আমি যেসব প্রশ্নের উত্তর দেব না বলে মুখ ফিরিয়েছি এই মানুষটার থেকে আজ আবার আমাকে তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।এটাই হয়ত কালের নীতি।মহাকালের বিধান।তাই সেই ডাকের মায়া আমাকে পিছু হটতে বাধ্য করছে।

ঈশান?ফিরে তাকাও এদিকে।দেখো,তোমাকে আমার কাছে আসতেই হবে।ফিরতে হবে এদিক পানে।তাকাও বলছি,আজ আর তোমার নিস্তার নেই।তাই পালানোর মত বোকামো না করে বাস্তবের সম্মুখীন হও ঈশান।আমি জানি তুমি এত বোকা নও।তুমি বাস্তব ভয় পাওনা।তাই এসো আমার কাছে,মুখোমুখি হও আরও একটা চরম বাস্তবতার।

বাহ্!আজও আমাকে মুখস্থ রেখেছে এই মানুষটা।হ্যাঁ,আমি বাস্তবতা ভয় পাইনা।তবে ভালবাসার মানুষের দিকে অন্যায় দৃষ্টি নিয়ে চোখে চোখ রাখা সবার পক্ষে সম্ভব হয়?ভয় তো ভালবাসা নিয়ে।ভয় যদি না পেলাম তো ভালবাসলাম কোথায়?তাই সমস্ত ভয়,সংশয় উপেক্ষা করে তার দিকে ফিরে তাকালাম।ফিরে তাকালাম বহু বছর আগের হারিয়ে যাওয়া আমার অস্তিত্বে।এই অস্তিত্ব আমার,যেথা আমি নিজেকে বিলীন করেছি।

এক পা,এক পা করে তার দিকে এগিয়ে গেলাম তার দিকে।তার ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।আমার কোন কথা নেই,অনুযোগ নেই,অভিমান নেই।আমি নির্বাক।আমার আজ আছে শুধু ভয়, সংশয়।আমার আজ যেমন কিছু বলার নেই,ঠিক গত হয়ে যাওয়া কালও কিছু বলার ছিলনা।আমি শুধু নির্বাক,নগণ্য কিছু সাহস সঞ্চয় করে অর্কের দিকে তাকিয়ে আছি।এই মূহুর্তে আমার হৈমন্তী শুক্লার একটা গান মনে পড়ে গেল,

“আমার বলার কিছু ছিলনা

না গো,আমার বলার কিছু ছিলনা”।

*

চোখ মেলে নিজেকে অচেনা একটা জায়গায় আবিষ্কার করলাম।জায়গা বলতে একটা কক্ষ।খুব সম্ভবত কারো শোবার’ঘর।মাথাটা হালকা ব্যথা করছে।আমি এখানে কীভাবে এলাম?মনে করার চেষ্টা করতে লাগলাম।আমিত অর্কের সাথে ছিলাম।তাহলে কী অর্ক আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে?

বিছানা থেকে উঠে কক্ষের বাইরে এসে সমস্ত বাড়ি খুঁজতে লাগলাম।কিন্তু কাউকে পেলাম না।একবার ভাবলাম চলে যাব।কিন্তু না,যে আমাকে এখানে এনেছে তাকে তো দেখতে হবে।আর কেন আমাকে এখানে এনেছে সেটাও জানতে হবে।সারাবাড়ি খুঁজেও পাইনি কাউকে।তাই কেন জানি মনে হল একবার ছাদে গিয়ে দেখি।আমার শরীর খারাপ লাগছিল তবুও কষ্ট করে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলাম।উঠে দেখলাম ছাদে কেউ নেই।ছাদের অন্য পাশে গিয়ে দেখি একটা আবছা অবয়ব ছাদের রেলিং ঘেঁষে বসে আছে।আমি ধীরে ধীরে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম।আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই সে বলতে শুরু করল এখন কেমন বোধ করছ?

এ তো অর্কের গলা।তার মানে সত্যিই অর্ক আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।

জ্বি এখন ভাল আছি।আমি কাঁপা কাঁপা গলায় জবাব দিলাম।

ভাবছ তো এখানে কেন তুমি?তখন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে।তাই কোন উপায়ান্তর না পেয়ে বাসায় নিয়ে আসলাম।অবশ্য তোমাকে তো এখানেই আসতে হত।আজ হোক কিংবা কাল।

অর্কের কথা শুনে আমি অবাক হলাম!কিন্তু কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না।

দেখুন মি.অর্ক আপনি এখানে এনে আমার অনেক বড় উপকার করেছেন।তার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।কিন্তু আমি এখানে থাকতে পারছিনা বলে দুঃখিত।আমাকে যেতে হবে।এই বলে আমি তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে ছুটতে গিয়ে পড়ে গেলাম।তারপর,আর কিছু মনে নেই।

সকালে যখন জ্ঞান ফিরল তখন নিজেকে আবার সেই একই বিছানায় আবিষ্কার করলাম।অর্ক সোফায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে।মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে আমার।উঠার চেষ্টা করেও উঠতে পারিনি।আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম থেকে যখন জাগলাম তখন বেলা কত হয়েছে বলতে পারব না ঠিক।তবে দুপুর কিংবা বিকেল নিশ্চয়ই হবে।

শুভ সকাল।শরীর কেমন আছে এখন?এই নাও জামাকাপড় পাল্টে ফ্রেশ হয়ে নাও।তারপর খাবার খেতে এসো নিচে।

আমার হাতে কিছু জামাকাপড় দিয়ে অর্ক দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাইরে চলে গেল।আমি অবাক হয়ে দেখছি অর্কের এমন আচরণ।আখেরে,অর্ক আমার সাথে এমন করছে কেন?

ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে দেখলাম অর্ক খাবার টেবিলে বসে আছে।আমাকে দেখেই বলল,আরে এসো এসো তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।খাবারের দিকে তাকিয়ে আমি আরও এক দফা অবাক হলাম।হরেক রকমের খাবারের পশরা সাজিয়ে বসেছে অর্ক আমার জন্য।কিন্তু এসব কেন?আমাকে সবটা জানতে হবে।

খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার জন্য শুয়েছিলাম।কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই।ঘুম থেকে উঠে বাইরে তাকিয়ে দেখি রাত হয়ে এসেছে।চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।এই বাড়ির আশেপাশে তেমন কোন বাড়িঘর না থাকায় অন্ধকার বেশ ভাল বোঝা যাচ্ছে।

আমি অর্ককে খুঁজলাম না আজ আর।কেন জানি মনে হল তাকে ছাদে গেলো পাব।তাই ছাদের দিকে রওয়ানা হলাম।ছাদে গিয়ে দেখলাম অর্ক ঠিক গতকাল রাতের সেই জায়গায় রেলিং ঘেঁষে বসে আছে।আমি গতরাতের মত অর্কের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

আমার ব্যবহারে তুমি অবাক হচ্ছো তাই না ঈশান? ভাবছ তো,মি.সাজ্জাদ চৌধুরীর খুনিকে আমি কেন এত আপ্যায়ন করছি?এর থেকেও বেশি অবাক হচ্ছো যে আমি তাকে বাবা না বলে সাজ্জাদ চৌধুরী কেন বললাম?সব প্রশ্নের উত্তর তুমি পাবে।কিন্তু তার আগে আমাকে বলো তো,তুমি মি.সাজ্জাদ চৌধুরী কে কেন হত্যা করেছ?

অর্ক আমার দিকে ঘুরে তাকাল।আমি অর্কের চোখের দিকে তাকিয়ে আছি।কিন্তু আমার মুখ থেকে কোন কথা বের হচ্ছেনা।অর্ক আমার দুই বাহুতে দুই হাত রেখে হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে জিজ্ঞেস করল বলো ঈশান,কেন হত্যা করেছিলে মি.সাজ্জাদ চৌধুরী কে?

আমি অর্কের হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালাম গিয়ে।বলতে শুরু করলাম নিজের জীবনীর কালো কিছু অধ্যায়ের কথা।

অর্ক তোমার সাথে সম্পর্ক হওয়ার কয়েকদিন পর আমি একদিন সকালবেলা তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম মনে আছে?তুমি যদিও আমাকে তোমার বাড়িতে তোমাকে না জানিয়ে যেতে নিষেধ করেছিলে।তবুও সেদিন কী মনে করে তোমার নিষেধ উপেক্ষা করে তোমার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।সেদিন অবশ্য তোমার সাথে আমার দেখা হয়নি তবে সেদিন জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যটা খুঁজে পেয়েছিলাম।তোমার বাবা!হ্যাঁ,সেদিন তোমার বাবার সাথে আমার দেখা হয়েছিল।যাকে এতগুলো বছর যাবত খুঁজে বেড়িয়েছি তাকে হাতের কাছে পেয়ে মনে হল আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেছি।তারপর,কয়েকদিন হীনমন্যতায় ভুগতাম যে ঐ লোকটা তোমার বাবা কেন হল?মানে আমার ভালবাসার মানুষের বাবা কেন এত জঘন্য হল!কেন তোমাকেই তার মত একজন ঘৃণিত ব্যক্তির সন্তান হতে হল।আমার এসব ভেবে খুব কষ্ট হত।তবুও,নিজেকে দমিয়ে রাখিনি।আমি আমার লক্ষ্যে অটল ছিলাম।মানে তোমার বাবা অর্থাৎ সাজ্জাদ চৌধুরী কে আমি খুন করবই করব।তাই তোমার অনুপস্থিতিতে আমি তোমাদের বাড়িতে যাওয়া শুরু করি ঘনঘন।তোমার উছিলায়ই যেতাম তোমার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য।কিন্তু আমার মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল তোমার বাবা।আমি কোন না ভাবে তোমার বাবাকে সিডিউস করার চেষ্টা করতাম সবসময়।কারণ,আমি জানতাম এতে কাজ হবে।এবং একটা সময় আমি সফল হই।তোমার বাবা আমার শরীরি ডাকে সাড়া দেয়।একদিন তুমি ভার্সিটি তে আসার পর তিনি আমাকে তোমাদের বাড়িতে যেতে বলে।আমি সব প্রস্তুতি নিয়েই তোমার বাবার কাছে গিয়েছি।তিনি যখন তার বেডরুমে আমাকে তার বিকৃত কামের তাড়নায় ছুঁয়েছিল বিশ্বাস করো অর্ক আমার তখন মনে হয়েছিল সীতার মত মাটিকে দু’ভাগ হয়ে যেতে বলি আর আমি পাতালে চলে যাই।কিন্তু না,আমাকে আমার প্রতিশোধ নিতে হবে।তাই সাজ্জাদ চৌধুরী’র সাথে তাল মেলাতে লাগলাম।সাড়া দিতে দিতে একপর্যায়ে তাকে আমি উলঙ্গ করে ফেললাম।উপর থেকে নিচে নামতে নামতে যখন তার নিচে আসলাম তার উত্থিত লিঙ্গ যখন অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল ঠিক তখনই আমি খপ করে সেটা ধরে ফেললাম আর আমার পকেট থেকে একটা ছুরি বের করে তার পাপের অঙ্গটাকে শরীর থেকে আলাদা করে ফেললাম।তারপর,তার বুকের বামপাশে ছুরি দিয়ে খোঁচাতে লাগলাম।আঘাতের পর আঘাত করতে লাগলাম তার বুকে।সাজ্জাদ চৌধুরী যত চিৎকার করছিল আমার তত আনন্দ হচ্ছিল।পৈশাচিক আনন্দ।একটা পর্যায়ে দুজনেই ক্লান,পরিশ্রান্ত হয়ে ক্ষান্ত হলাম।আমি ক্লান্তির সুখকর আবেশে ছুরি চালানো বন্ধ করলাম আর সে ক্লান্তির বেদনার্ত আবেশে হারিয়ে গেল পঞ্চত্বপ্রাপ্তির ক্রোড়ে।সেদিন আমার কোন অনুশোচনা,অনুতাপ কিচ্ছু ছিলনা।ছিলনা কোন তাড়াহুড়ো।শাস্তি থেকে বাঁচারও কোন প্রয়াস করিনি তাই।কেন জানো অর্ক?শোনো তাহলে আরেকটা করুণ অন্তরালের কাহিনী।

*

আমার বাবা আর সাজ্জাদ চৌধুরী ছিলেন ভাল বন্ধু,পরস্পরের ব্যবসায়িক অংশীদার।সেই সুবাদে আমাদের বাড়িতে সাজ্জাদ চৌধুরী’র অবাধ আনাগোনা ছিল।আমার জব্য সাজ্জাদ চৌধুরী প্রায়ই বিভিন্ন ধরণের খাবার,খেলনা এসব নিয়ে আসত।আমি তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তাম।একবার বাবা,মা আমাকে বাসায় রেখে জরুরি কাজে দেশের বাইরে যান বাসার কাজের লোকের কাছে।লোকটা অত্যন্ত ভাল ছিল।বাবার দুঃসম্পর্কের চাচা হয় তিনি।একদিন সাজ্জাদ চৌধুরী বাসায় আসে।বাবা তখনও দেশের বাইরে।আর কাজের লোকটা বাজারে গিয়েছিল।আমি সাজ্জাদ চৌধুরী কে দেখে তার কাছে এগিয়ে যাই।আর তিনি আমাকে কোলে তুলে নেন।দরজা বন্ধ করে তিনি আমাকে আমাদের বেডরুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলেন।তারপর,ঝাঁপিয়ে পড়েন আমার উপর।টানা ২ ঘন্টা সে অত্যাচার করতে থাকে আমার উপর।

কাজের লোক বাসায় এসে আমার এই অবস্থা দেখে বাবা মা’কে জানান।কিন্তু তারপর তাদের আর খোঁজ পাইনি।কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর কাজের লোক আমাকে একটা অনাথাশ্রমে নিয়ে দিয়ে আসে।তার কিছুদিন পর খবর পাই আমার বাবা মা দুজনেই চিরকালের মত হারিয়ে গিয়েছে।আর আমার জীবন শুরু হয় অনাথাশ্রমের মলিন দেয়ালের অন্তরালে।তাই যেদিন তোমার বাবাকে হত্যা করেছিলাম।সেদিন আমার জীবনের প্রতি আগ্রহ চলে গিয়েছিল।তাই শাস্তি থেকে বাঁচার চেষ্টা করিনি।তবুও তো বেঁচে গেলাম।আমাকে তো ফাঁসি দিলনা।চৌদ্দো বছর পর আবার আমাকে বাস্তবতার অন্ধকারে ছেড়ে দিল।

অর্ক এতক্ষণ সবটা শুনছিল চুপচাপ।আমার সামনে এসে আমাকে প্রশ্ন করল,আর আমি?আমার কথা একবারও ভাবলে না তুমি?আমি কীভাবে এতগুলো বছর তুমিহীনতায় কাটিয়েছি তুমি জানো না।আমি প্রতিদিন কারাগারে তোমাকে একবার দেখার জন্য যেতাম।শত ব্যস্ততার মাঝেও তোমার জন্য পাঁচ মিনিট সময় হলেও বের করে নিতাম তোমাকে দেখার জন্য।সেখানকার জেলাররা আমাকে চিনতেন।তাই আমার কথাতেই তারা তোমাকে জানায়নি।আমি দূর থেকে তোমাকে দেখে আসতাম।তুমি জানোনা ঈশান,তোমার জন্য আমার প্রত্যেকটা মূহুর্ত কতটা অসহায়ভাবে কেটেছে।এই যে,যা কিছু আমার যত অর্জন সব তোমার জন্য ঈশান।তুমি ফিরে এসে যেন কোন কষ্ট না পাও সবকিছু তার জন্যই অর্জন করা।তুমি কী করে ভাবলে আমি তোমাকে ঘৃণা করব?

কেন ঘৃণা করবেনা অর্ক?নিজের বাবার হত্যাকারীকে কেউ কীভাবে ঘৃণা না করে থাকতে পারে!আমার কথা শুনে অর্ক মৃদু হাসল,আর বলল…

সাজ্জাদ চৌধুরী আমার বাবা নয় ঈশান।

কথাটা শোনার পর আমি এতক্ষণে যতটুকু অবাক হয়েছি তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছি।

তাহলে সাজ্জাদ চৌধুরী কে অর্ক?অর্ক খুব সাবলীল ভঙ্গিমায় বলতে লাগল,

সাজ্জাদ চৌধুরী আমার কেউ না।আমি ছিলাম তার কাছে রক্ষিতার মত।সহজ কথায় বলতে গেলে যৌনদাস।আমার বাবা,মা কোথায় আছে,কী করছে কিংবা আদৌ বেঁচে আছে কী না আমি জানিনা সেসব।তবে আমি সবসময় সাজ্জাদ চৌধুরীর কাছ থেকে মুক্তি চাইতাম। কিন্তু চাইলেই কী সব হয়?কতবার নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম এমনকি সাজ্জাদ চৌধুরী কেও বহুবার মারতে চেয়েও পারিনি।আমি যে তোমার মত অত সাহসী না ঈশান।তারপর,একদিন তুমি এলে।নিরাশায় ডুবে যাওয়া জীবনের গাঙে তুমি এলে ভালবাসার পালতোলা নৌকো নিয়ে আমার জীবনে।যেন গভীর সমুদ্রে কিনারের আশায় সাঁতার কাটা ব্যক্তির সামনে দ্বীপ হয়ে উদয় হলে।তোমার সাথে সম্পর্ক হওয়ার পর আমি তোমাকে নিয়ে সবকিছু শুরু করতে চেয়েছি নতুন করে।তোমাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাব এই আশায় সবকিছু গোছাতে শুরু করেছিলাম।কিন্তু তুমি সেটা হতে দাওনি।অবশ্য তোমার দোষ দিয়ে লাভ নেই।মহাকালের নিয়মের চক্রব্যূহে আমরা সবাই বন্দী।আজ এ ডালে তো কাল ও ডালে।এভাবেই কখন জীবন নামক প্রদীপ নিভে যায় তা বুঝতেই পারিনা।

অর্ক কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।কী করুণ তার কান্না।কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরল।আমার কান্না পাচ্ছে না।আমার কান্না পায়না এখন আর।শেষবার কেঁদেছিলাম সেদিনের চিৎকারের সাথে।তারপর,বাবা মাকে হারানোর পরও কান্না পায়নি।

আমি অর্ককে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,অর্ক আমাকে কাল সকালে যেতে হবে এখান থেকে।অনেক তো হল,আর ক’দিন থাকব তোমার এখানে।

অর্ক চোখ মুছতে মুছতে বলল,কোথায় যাবে তুমি?এই ঘর,এই সংসার সব তো তোমার।এসব ছেড়ে কোথায় যাবে ঈশান?

না অর্ক।এসব আর হয়না।জীবনে বহুবার পড়তে পড়তে হাঁটতে শিখেছি।তারপর,হোঁচট খেতে খেতে এতদূর এসেছি।এই শেষ বয়সে এসে আর হোঁচট খেলে সামলাতে পারব না।তার চেয়ে বরং শেষ কয়টা দিন কোন বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মাঝে কাটিয়ে দেব।

শেষ বয়সে হোঁচট খেলে তো সামলানোর জন্য আমি আছি।তোমার হাতের লাঠি হওয়ার জন্য নাহয় আমাকে পাশে রেখো তোমার।শেষবার ঈশান,আরেকটা বার সুযোগ দেয়া যায় না ঈশান?

অর্ক ছলছল দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।এই দৃষ্টিতে কোন ঘৃণা,ক্ষোভ,রাগ নেই।আছে নিদারুণ ভরসার হাতছানি।এই দৃষ্টি কীভাবে উপেক্ষা করি আমি?

*

রাত অনেক হয়েছে।আমি আর অর্ক নেমে পড়েছি রাজপথে।পুরো শহর ঘুমোচ্ছে।ঘুমোচ্ছে কীটপতঙ্গরাও।মাঝেমাঝে নিরব শহরের মাঝ দিয়ে দানবের মত হুংকার দিয়ে কয়েকটা গাড়ি চলে যাচ্ছে।আর আমরা মাঝবয়েসী দুজন যুবক মেতে উঠেছি তারুণ্যের উল্লাসে।একে অপরের হাত ধরে হাঁটছি রাস্তার পাশ ঘেঁষে।হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে এসেছি শহরের শেষ সীমানায়।এই জায়গায় আমি আগেও এসেছিলাম।অনেক নির্জন,শুনশান জায়গাটা।ফজরের আযান হয়ে গেল।আমরা একপাশে গিয়ে আসন গেঁড়ে বসলাম।অর্ক আমাকে বলল একটা গান গাইতে।আমি গাইতে শুরু করলাম হৈমন্তী শুক্লার সেই গানটা,

“আমার বলার কিছু ছিলনা,

না গো,আমার বলার কিছু ছিলনা।

চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে,

তুমি চলে গেলে চেয়ে চেয়ে দেখলাম।

আমার বলার কিছু ছিলনা”।

এই মূহুর্তে বৃষ্টি হলে অনেক ভাল হত।কিন্তু আবছা অন্ধকারে আকাশ অনেক পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।বৃষ্টি হবে বলে মনে হয়না।হঠাৎ আমার কপোল বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল।অবাক হলাম,এইত বৃষ্টি হচ্ছে।মলিন বৃষ্টি।

আমার জীবনে সবকিছু হঠাৎ হঠাৎ করেই ঘটে গেছে।সাজ্জাদ চৌধুরীকে আমি কখনও মারতে চাইনি।কিন্তু হঠাৎ একদিন তাকে বহুবছর পর দেখে পুরনো ক্ষত চেপে বসল।আর অর্ক আসল আমার জীবনে হঠাৎ করে।আবার হঠাৎ মিলিয়ে গেল ধুমকেতুর মত।তারপর,এই শেষ বয়সে আবার তার আগমন।আমি অর্কের করুণ চাহনি উপেক্ষা করতে পারিনি।ফিকে হওয়া বাস্তবকে শেষবারের মত রঙিন করে তোলার চেষ্টায় অর্কের সাথে নিজেকে বেঁধে নিলাম।সবকিছু কেমন অদ্ভুত কাকতালীয় ভাবে ঘটেছে আমার জীবনের শুরু থেকে আজ অবধি।আকাশের দিকে তাকালাম।শুকতারাটা এখনও জ্বলজ্বল করছে।অর্ক আমার হাতটা গভীরভাবে মুষ্টিবদ্ধ করে রাখল।এক নতুন জীবনের আশ্বাস আমাকে আবার হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.