দ্বিধা

লেখক: রোহিত রায়

১.

টাইয়ের বাধন আলগা করে সোফায় নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দিল অহন। কিচেন থেকে ওর স্ত্রী ত্রিধা হাউসকোটে বেরিয়ে এসে, মদের গ্লাসটা ঠন করে কাচের টেবিলে রাখে। শব্দে ঝিম দেওয়া ভাবটা কেটে যায় অহনের। ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে নিজের হাতে ও। বিশেষত এই ড্রয়িং রুমের আলো আঁধারি পরিবেশটা সম্পূর্ন ওর আরকিটিক্ট মাইন্ডের অভিপ্রেয়। তিরিশ বছর বয়সী শক্তসামর্থ্য ক্লান্ত পুরুষ অহন ত্রিধার দিকে তাকিয়ে বলে ” so how was your day babe? “

ত্রিধার মুখটা কেমন যেন তিতো হয়ে গেলো এক লহমায়। সে বলে ” তোমার মুখে না এই সমস্ত বেবী, টেবী মানায় না। যে নিজের স্ত্রীকে সন্তান সুখ দিতে পারেনা। তার মুখে এরকম প্রোনাউন্সিয়েশন মানায় না, অহন। ” কথা টুকু বলে যায়গা ছেড়ে উঠে পড়ে সে, যেতে যেতে মুখে বিড়বিড় করে বলে ” উপরেই পুরুষ , কাজের বেলায় ট্র‍্যাজিক্যাল অপদার্থ একটা। “

অহন এখন এসবের প্রতিবাদ করে না। ও জানে দোষ ওরই। সেই যৌনঅক্ষম বোধ হয়। তবে চেষ্টার কোনো অভাব রাখেনি সে। বিভিন্ন ট্যাব্লেট, ওষুধ, তেল, ঝাড়ফুক সমস্ত পন্থাই বিফল। কোথাও যেন কিছু একটা মিসিং থেকে যায়। কিন্তু তাও সে তো মানুষ, এই রোজকার এক বিষয় নিয়ে ঝামেলা তার আর ভালও লাগে না। মাঝেমাঝে মনে মনে ঠিক করে নেয় অহন যে বলে দেবে ” দেখ ত্রিধা তোমার যদি মনে হয়, আমাদের ডিভোর্স হলে তুমি অন্য কোনো ছেলেকে বিয়ে করে বেশী খুশী থাকবে। then its fine, no problem ” কিন্তু ভয় হয়। মাঝেমধ্যে মনে হয় অন্তত নিজেকে পুরুষ প্রমান করতে বোধ হয়,ওর ত্রিধাকে প্রয়োজন।তবে এটা ভেবেও টুকরো টুকরো হয়ে যায় ও, যে নিজেকে পুরুষ প্রমান করতে ওর ত্রিধা… ছিঃ!

অহন অনিচ্ছা সত্তেও সোফা ছেড়ে ইঠলো। চোখমুখে বিরক্তির ছাপ বোঝা যাচ্ছিলো। কারন প্রতিদিনকার মতই আজও ত্রিধা চেষ্টা করবে নিজের নগ্ন শরীর দেখিয়ে সিডিউস করার। অহনের লিঙ্গ নিয়ে টানাহেঁচড়া করবে। তবে অহনও বারন করে না।আশায় থাকে, হয়তো ভুল বশতই ওর পেশী শক্ত হয়ে গেল কোনোদিন। সেদিন ও ত্রিধার সমস্ত চাহিদা পুরন করে দেবে। ওফ! সেইদিন টার জন্য ও মনেপ্রানে অপেক্ষা করছে। দেখিয়ে দেবে, এতদিন ঘুমন্ত সিংহকে চ্যালেঞ্জ করেছিলো ত্রিধা।

কাল অনেক রাতে ঘুমাতে পেরেছিলো অহন। অনেকক্ষন ধরে, ত্রিধার চালানো শারীরিক নির্যাতন ওকে সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু ফল কিছুই হয়নি। অফিসে এসে নতুন প্রোজেক্টের মিটিং সেরে নেয় অহন। কিন্তু প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছিলো ওর। অফিসে যে কয়েকজন ফিমেল কলিগ আছেন, তারা মোটামুটি অহনের বাহ্যিক সপ্রতিভতায় পাগল। হঠাৎ তাদের মধ্যেই একজন, নেহা কাচের দরজা ঠেলে ঢকুলো অহনের চেম্বারে। তাকে দেখে অহন সপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞাস করে ” হ্যা বলো কি দরকার। “

-” স্যার যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা জিজ্ঞেস করি। “

-” oh come on neha you are the most updated stuff of this place,u don’t have to hesitate too much,. come on make it clear.”

-” না! আজকাল প্রায়ই দেখি আপনি রিক্ততায় ভোগেন। এর কারন আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করব না। এটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। “

-” হ্যা সে বলতে পারো। কম বেশী, ডিপ্রেশন এ ভুগছি, তোমার কাছে কোনো প্রিভেনশন থাকলে you should share it ” সামান্য হাসে অহন। ওর যৌনাক্ষমতা সম্পর্কে বা পারিবারিক কেচ্ছা কিছুই শেয়ার করতে চায় না কারোর সাথে।

-” আমি আপনাকে প্রপার সলিউশন হয়তো দিতে পারবো না। কিন্তু আপনি যদি সারাদিনের কিছুটা সময় অন্তত বইয়ের পিছনে দেন। তাহলে উপকার পাবেন। “

অহন অবাক” বই, এ কেমন সলিউশন নেহা।?

নেহা হেসে বলে ” স্যার বলা যায়না বইয়ে আপনার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আপনি পেয়ে যেতেও পারেন।”

সেই কথা মতই অহন ডিরোজিও লাইব্রেরীরর সামনে এসে দাড়ালো। এখনো এক দোটানা কাজ করছে ওর মধ্যে ঢুকবে কি ঢুকবে না। কারন এই বই জিনিষ টা কখোনই তার সেভাবে পোষায় না। একভাবে বসে বসে পড়তে পারবে না বলেই, তো সে science নিয়েছিলো। তাও নেহা যখন সাজেস্ট করেছে একবাড় এতে নেমে দেখতে অসুবিধা নেই। তাই সে পা বড়ালো দরজার ভিতরে। ঘটনা ঠিক ঘটলো তখনি, এক পাজা বই ওপর থেকে পড়ল অহনের ঘাড়ের উপরে। অহন উপরে যতক্ষনে তাকায় ততক্ষনে টুল পিছলে অহনের গায়ের উপড় পড়ল। এই গল্পের অন্যতম প্রধান পুরুষ চরিত্র। অহন দেখল সেই ভয়ার্ত চোখ আর ফর্সা মুখটা । চকিতে অন্যান্য কর্মচারী দৌড়ে আসে। ডাক পড়তে থাকে “উজান! উজান! কি হলো। “”কিছু হয়নি তো? “

সময় কি থমকে গেল। উজান দেখল অহনকে। সেও কি সপ্রতিভতার দুনিয়া। এরকম সুন্দর আজকাল তেমন নজরে আসে না।

উজানকে ঠিক মত নামিয়ে অহন মৃদু হেসে জিজ্ঞাস করে ” are you ok, man “

উজান অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। ” এবাবা এটা তো আমার আপনাকে জিজ্ঞাস করে উচিৎ। আমি অকাল বৃষ্টির মত আপনার ঘাড়ের উপর এসে পড়লাম। “

-” no its absolutely fine., bye ” ম্লান হেসে অহন ভিতরের দিকে পা বাড়ায়।

রাশি রাশি বইএর মেলা। এযেন সম্পূর্ণ অন্য এক জগৎ। হতভম্ব হয়ে পড়ল। লাইব্রেরিয়ানের কাছে গিয়ে কার্ড করাতে সময় লাগেনি অহনের। কার্ড হাতে নিয়ে সে লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞাস করে ” কি বই নেব। “

-” কি বই নেবেন মানে, আপানার কোনো প্রিয় লেখক বা লেখিকা নেই! তার বই নিন। “

-“না! আসলে… “

-” থাক থাক বুঝেছি বুঝেছি। বই এর ব্যাপারে আপনি একেবারেই আনকোরা তাই তো। “

এটা শুনে অহন লজ্জিত হয়। ম্লান হাসি ফোটে ওর ঠোটে।

– “তা এত ঘাবড়াচ্ছেন কেন। মশাই! শুভ কাজ শুরু করতে গিয়ে কেউ ঘাবড়ায়। ওই যে ওই ছেলেটি কে দেখছেন। বলে উনি উজানের দিকে ইশারা করলেন।”ওর কাছে চলে যান ও ঠিক বুঝে যাবে আপনার কি দরকার। ও হচ্ছে গিয়ে বইপোকা ” বলে অজথাই হাসলেন। এই জন্য অহনের ঠিক এই সাহিত্য রসিক মানুষগুলো কে পোষায় না। যাই হোক সে এগিয়ে গেল। নীল জামা, হলুদ ট্রাউজার পরা উজান নামের ছেলেটার দিকে। পিছনে ঘুরে থাকা উজানের ঘাড়ে হাত রাখে অহন। উজান ঘুরে বলে ” ওহ আপনি। কিছু বলবেন “

ছেলেটা বড্ড বেশী হাসে খেয়াল করল অহন। কথায় কথায় দাঁত গুলো বের করে দেয়।তবে অদ্ভুত সুন্দর সেই হাসি। অহনকেও কম্পিটিশন দিয়ে দেয় এই উজানের সৌন্দর্য।

অহন হেসে বলে ” I’m first time in this book world, and….. “

-” থাক থাক আর বলতে হবে না। আসুন আমার পিছন পিছন। “

অহন উজানকে অনুসরণ কর এগিয়ে যাচ্ছে। উজান আবার জিজ্ঞাস করে ” হঠাৎ বই পড়ার ইচ্ছে জাগল আপনার?। “

– ” একজন সাজেশন দিলো। জীবনের অনেক প্রশ্নের উত্তর নাকি বই দিতে পারে। আর তাছাড়া কাজের ফাকে বইএর অভ্যাস তো খারাপ নয়। কি তাই নয়? “

উজান হট করে সামনে ঘুরে দাঁড়ালো। অহনও দাঁড়িয়ে যায়। পাশের র‍্যাক থেকে একটা বই বার করে এনে বলল ” আপনি রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন কখোনো। “

অহন উত্তর দেয়” ওই কাবুলিওয়ালা পর্যন্ত। “

হাসে উজান। ” আর রবীন্দ্র সঙ্গীত “

– ” না শোনা হয় না, তেমন। “

এটা হচ্ছে ‘ শেষের কবিতা ‘ নিন ধরুন। অহন বইটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞাস করল ” এর বিশেষত্ব কি “

উজান খুব সুন্দর এক স্বস্তির ছাপ ফুটিয়ে তুলল, বলল ” যে ভালোবাসা ব্যপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে,অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ, যে ভালোবাসা বিশেষভাবে প্রতিদিনের সব কিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে, সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।” অহন স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে শুনলো, অনেকদিন তার সাথে এইভাবে কেউ কথা বলে না। অফিসে কাজের কথা বার্তা আর বাড়িতে….।নম্র কন্ঠে কি স্নিগ্ধ এক গুচ্ছ শব্দ উচ্চারণ করল উজান।

উজান জিজ্ঞেস করে ” একটু বেশীই ভালো লাগল নাকি?”

অহনের ঘোর কেটে যায়। সে বলে ” খুব সুন্দর বললে। ভালো না লেগে উপায় আছে।? ” মৃদু হাসে সে।

উজান হেসে বলে ” আপনার ভালো লাগলো শুনে।? এখন তো এমন শ্রোতা পাওয়াই যায় না।। ” নীরবতা কিছুক্ষন, অহন বলে ” আমার শুনতে ভালো লাগে, ” এইটুকু বলে অহন পিছনে ঘুরে চলে গেলো। উজান কিছুক্ষন চলে যাওয়া দেখছিলো। মৃদু হেসে মাথা নাড়লো সে। আবার কাজে মেতে ওঠে উজান।

তিন দিন পরের ঘটনা উজান লাইব্রেরীর জানলার পাশে বসে বাইরের নির্মম পরিবেশকে বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। সমানে বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে সকাল থেকে। কলেজ থেকে ফেরার পথে একবার অন্তত লাইব্রেরীতে আসা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃতি যে তার এই সহজতার বিরুদ্ধাচরণ করবে সেটা কে জানত? বৃষ্টির জলের ঝাপটা আর একদলা ঠান্ডা হাওয়ার অনুভূতি জানলার বাইরে থেকে এসে বাড়ি মারল উজানের গায়ে। চোখ বন্ধ হয়ে যায় উজানের। শরীরের কোনো অজানা উৎস থেকে ওর গলার কাছে এসে জমা হয় ওর ভালো লাগার গান। তারপর কন্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে ” ভালোবেসে সখী, নিভৃতে যতনে আমার, নামটি লিখো। তোমার মনেরও – মন্দিরে। “

– ” বাহঃ খুব সুন্দর গান গাও তুমি উজান। “

উজান ফিরে আসে। ফিরে আসে আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে। তাকিয়ে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই অহন। হাসিমুখ খানা নিয়ে যাতে সহস্র প্রান কুরবান। উজান হেসে জিজ্ঞেস করে ” এই বৃষ্টির মধ্যে তুমি, ” উজানের মনেই নেই। এই অঝরার দিনে সেও যে অহন কে ‘আপনি’ এর যায়গায় ‘তুমি ‘ বলে সম্বোধন করছে খেয়াল নেই।

অহন বলে ” এই বইটা শেষ করলাম ফেরৎ দিতে এসেছি। দারুন ছিলো বইটা। “

– “আচ্ছা কার চরিত্রটা পছন্দ হল। “

-” কারোর না শুধু গল্পটাই বেটার ছিলো। “

এরকম উত্তর প্রথমবার পেল উজান। আকস্মাৎ কাছাকাছিই কোথাও আকাশ ভেঙ্গে পড়ল যেন। তার এত তীব্র আওয়াজ। উজান বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল ” আজ আমি বাড়ী যাব কি করে? “

অহন বাইরের দিকে তাকিয়ে বুঝল এ বৃষ্টি একদম গা ছেড়ে দিয়ে নেমেছে। ম্লান হেসে উজানকে বলল ” আমার গাড়ীতে করে চলো।! তোমার যদি বিশেষ তাড়া থাকে। আমি পৌছে দিচ্ছি। “

উজান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে এখনি সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। দেরীতো হয়েই গেছে। অহনের দিকে তাকিয়ে বলে “sure “।

লেক টাউনের পাশ দিয়ে বৃষ্টির পর্দা কে ছেদ করে গাড়ি এগিয়ে চলল।

উজানকে জড়সড় হয়ে বসে থাকতে দেখে অহন বলে ” hey, be free ok! “

উজান জিজ্ঞেস করে “তুমি খুব বড়োলোক, তাই না।? “

-“কেন হঠাৎ এই প্রশ্ন।?” হাসে অহন।

-“আমি কখোনো কোনো গরীব, মধ্যবিত্তকে, মার্সিডিজ চালাতে দেখিনি। “

-“সবদিন ছিলাম না, আমি নিজের চেষ্টায় আজ এখানে। “

-“তোমার বয়স কত হবে বলত? “

হাসে অহন বলে “আমি ঊনত্রিশ “

-“তুমি যানো আমিও কয়েকদিনের মধ্যে ভারত ছেড়ে চলে যাচ্ছি। অবশ্য নিজের চেষ্টায়। “

-” বাহঃ দারুন তো। আগে বলোনি তো। “

উজান হেসে বলে ” আমাদের পরিচয় হলো কতদিন।”খিল খিল করে হেসে ওঠে উজান।

উজানকে দেখে অহনের ঠোঁটেও হাসি ফুটল। ঠোঁটে এক হারিয়ে যাওয়া ভালো লাগার বাঁক, যা অহন অনেক দিন আগে হারিয়ে ফেলেছে। উজান জিজ্ঞেস করে ” কি হল, বল? “

অহন বলে ” তোমার হাসিটা বেশ সুন্দর। “

-” এটা তো আমার তোমাকে বলা উচিৎ ছিলো অহন। ” কি একটা ভেবে মাথা নাড়ালো উজান। তাকালো জানালার বাইরে। অহনের দৃষ্টি ফ্রন্ট গ্লাসের ওপারে। বৃষ্টি কখোন ওদের আলাপনের স্তরে হারিয়ে গেছে ওরা জানতে পারে নি।

আজকাল কোলকাতা শহর বড্ড মায়া জড়ানো লাগে অহনের। এই ধর্মতলা থেকে ডালহৌসি পর্যন্ত হেটে ইডেন গার্ডেনস যাওয়া হয়নি অনেকদিন। আজ কি মনে হতে অফিসের একটা কাজ মেটাতে প্রাইভেট গাড়ী আর কাজে লাগল না। ছয় সাত বছর আগেও এসব যায়গার রন্ধ্র রন্ধ্র দিয়ে হেটে বেরিয়েছি। ক্লাইন্টের সাথে দেখা করার অাগে মুডটা ঠিক করা প্রয়োজন। মুডটা খারাপ হত না! যদি না ঘুম থেকে উঠেই ত্রিধা গা জালানো কথা না শুনতে হত। তখন অহন সবে চান করে বেরিয়েছে, ত্রিধা গম্ভীর ভাবে বলে “শোনো ওই সব বই ঠই যদি পড়তে হয় অন্য ঘরে গিয়ে পড়বে। খালিখালি বেডরুম লাইট জালিয়ে রেখে ঘুমের ডিস্টার্ব কোরো না প্লীজ। “

– ” মানে বেডরুম টা তোমার একার নাকি? “

-“তুমি কি ঝগড়া বাধানোর মুডে আছো নাকি।? এমনি তেও বেডরুম তো তোমার কোনো কাজেই লাগে না। তাইনা?? “বলে ব্যঙ্গাত্মক হাসি মুচড়ে ওঠে ত্রিধার ঠোটে

-” তোমার কাছে কি সেক্সটা সম্পর্কের মেইন কনসার্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নাকি ত্রিধা?এত সেক্স স্টার্ভ তো তুমি ছিলে না।এত জালা কোথায় ছিলো? “

– ” কি করে জানব আমার বাবা আমাকে একজন সেক্সুয়ালি আনঅ্যাভিলেবল ছেলের ঘরে দেবে। তোমার মান সম্মান এখনো টিকে আছে কারন আমি লোকসমাজে বলে বেড়াচ্ছি we don’t need baby thing right now. না হলে যেদিন তোমার বাস্তবতা……. “

– ” ohh shut up you fucking bitch. “

পাশ দিয়ে সাঁয় করে একটা গাড়ী বেরিয়ে গেল। আর একটু হলে এক্সিডেন্ট টা হত আরকি। ওই সামনে দেখা যাচ্ছে” state bank of India “

ভিতরে যখন ঢুকলো অহন তখন অবাক কি বিশাল লাইন সেখানে। তার মধ্যে অতি পরিচিত এক মুখ দেখতে পেল সে। উজান এখন এখানে কি করছে। ও এগিয়ে গেল।

উজান দেখে সামনে দাঁড়িয়ে অহন। ” আরে তুমি।! এখানে এখন কি ব্যাপার। ” প্রচ্ছন্নতা সৃষ্টি হল ওর মুখে।

– “এই একটা কাজে এসেছি। কোম্পানির কাজে। “

– “এখন কুপন কাটলে তো তোমার অনেক দেরী হয়ে যাবে। “

অহন হাসে, ভাবে কি ইনোসেন্ট ছেলেটা। “তুমি এখানে কি করতে বাই দ্য ওয়ে।? “

– “আমি তো স্কলারশিপ এর কাজে এসেছি। “

হঠাৎ একজন পিছন থেকে বলে উঠলেন ” আরে! মি.অহন বসু মল্লিক যে।! একি আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন। ভিতরে আসুন। ” অহন উজানকে বলে আমি আসছি কেমন। উজানের মুখটা যেন ম্লান হয়ে গেল।

ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করছে উজান। এই ম্যানেজারের সাথে দেখা করার জন্য। তবে চান্স পেল না। অহন ঢুকে গেল এত তাড়াতাড়ি। একটু হিংসা হল উজানের। রাগ হল। কিছুক্ষন বাদে অহন বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। কাছে এসে বলে ” চলো আমার সাথে। আমি ম্যানেজারের সাথে দেখা করিয়ে দিচ্ছি। উজান শুনে খুব খুব খুশী হয়। কিন্তু বুঝতে দেয় না ওকে। ” বলে না! থাক অহন এতটা যখন একা আসতে পেরেছি। এইটুকু এগোতে আর তোমার সাহায্যের দরকার পড়বে না। “

অহন মৃদুভাবে মাথা নাড়ে। গম্ভীর ভাবে শুধু উচ্চারণ করে ” আচ্ছা আসলাম। “

অহন রাগ করে বেরিয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু বিল্ডিং এর বাইরে পা ডেওয়া মাত্র সে রিয়েলাইজ করে পুরো ঘটনা টা। যে উজানের বক্তব্যে ভুল টা ঠিক কোন প্লটে। জীবনে চলার এতটা পথ তো সে তার সাথে ছিলো না। কারোর ঋন নেই উজানের কাছে অহনের মত। সে তো নিজের সত্বায় সফল ব্যক্তিত্ব। তার একদমই রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে আসা উচিৎ হয়নি। যদিও অহন রেগে আছে কিনা তার মুখ দেখে ঠিক বোঝবার উপায় নেই। তাই সে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হলো যে উজান বুঝতে পারেনি। আমি বরং ওর জন্য অপেক্ষা করি।

উজানের কাজটা ভালোয় ভালোয় মিটে গেলো। একটু দেরী হল কিন্তু মিটে গেছে। কিন্তু একটা বিষয় উজানকে ছিড়ে খাচ্ছে পিশাচের মত। আমি কি ঠিক করলাম তখন অহনের সাথে। অহনকে দেখে বোঝা যায় মানুষ টা কোনো এক জটিল গোলোক ধাধায় আবদ্ধ। যেখান থেকে বেরোবার কোনো পথ নেই। রেগে আছে ও। পরের দিন দেখা হলে ক্ষমা চেয়ে নেবো ভাবতে ভাবতেই সামনে অদূরে ভেসে উঠল অহনের উজ্জল চেহেরা। শক্ত সবল এক পুরুষ যার গোলাপী ঠোট থেকে বেরিয়ে আসছে সিগারেটের রাশি রাশি ধোঁয়া। উজান নির্বাক, হতবাক। অহন ওকে দেখতে পেয়ে একটুকরো চাপা সপ্রতিভ হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে ” কি হলো কাজ? “

উজানের মায়ার ঘোরটা কেটে গেলো। অপ্রস্তুত হয়ে বলল ” ইয়ে.. মানে হ্যা হল। এবার এখান থেকে ড্রাফট ট্রান্সফার হবে। “

– “ওহ। “

উজান জিজ্ঞেস করে “তুমি বাড়ি যাওনি কেন?? “

-” ভাবলাম তোমার জন্য অপেক্ষা করি “

-” ওহ! অহন তখন ওই ভাবে তোমাকে না বলার জন্য extremely sorry. জানি রাগ করে আছো। থাকারি বিষয়। “

অহন হাসে “আমায় দেখে মনে হচ্ছে আমি রেগে রয়েছি।? “

– ” তুমি নাটক টা খুব সুন্দর করে করো। যে কেউ ফেসে যাবে অহন। আচ্ছা চলো আমার সাথে যাবে? “

– ” কোথায়? “

– ” চলো না।! বলছি। “

“গঙ্গার জলের ঢেউয়ে অজস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঢেউ মূল ঢেউ কে তার নিজের প্রাকৃত সত্ত্বা গড়তে সাহায্য করে। অথচ পাড় যখন নিকটে অহং বোধ জন্মায় তার। ভুলে যায় তার সাহায্য কারীদের আগে এগোবার নেশায়। পাড় যখন তাকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেয়। সে মৃত। “

এটুকু বলে উজান থামে। তারপর আপ্লুত দৃষ্টিতে অহনের দিকে। অহন বলে “এটা কার লেখা? “

-” কেন! আমার লেখা। যারা পড়ে তারা লেখেও। শোনোনি। প্রোনাউন্সিয়েশনেও তো থাকে লেখাপড়া। “

– “জানো অনেকদিন এরকমভাবে শান্ত ভাবে বসে কথা বলিনি কারোর সাথে। একটু একটু করে দিনগুলো কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আমি হারিয়ে যাচ্ছি। আমার যে একটা অস্তিত্ব আছে তা আর আমি খুজে পাই না। ” অহন হাওড়া ব্রীজের দিকে তাকায়।

– ” জানো ছোট বেলা থেকে আমাকে দেখার কেউ নেই। আমি অনাথ আশ্রমে বড়ো হয়ছি। সবসময় ভাবি আমি সবাই কে দেখিয়ে দেব, সবাই কে দেখিয়ে দেব আমার বাস্তব টা কি। ” মৃদু হাসে উজান ” তারপর মনে পড়ে, আরে আমায় তো দেখবার কেউ নেই আমি কাকে দেখাব? “উজান মৃদু হেসে তাকায় অহনের দিকে। দেখে সে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অহন বলে ” তুমি কবে যাচ্ছ? “

উজানের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে।

– “এই দেখো বোকা ছেলে। কাদে। ” নিজের প্রশস্ত বাহুদিয়ে আগলে নিলো উজানকে। ” কি হলো কাঁদছিস কেন? “

– ” no body is there for me কিন্তু তাও আমি তার জন্য গান গাই। অহন। মনে হয় কেউ তো শুনছেই সেই হৃদয় ভাঙ্গা গান। যাতে কোনো সুর তরঙ্গ নেই, শুধু একটু গান আছে। “

অহন উজানের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে কি মারাত্মক নেশা। কেমন যেন করে উঠলো তার শরীর। এ কেমন অনুভূতি। এত কোনোদিন হয়নি তার। শিথিল হয়ে পড়ে সে। উজানের নরম বাচ্চাদের মত মুখটা দেখে তার পেশী নড়ে উঠলো। সে বলে উঠল। ” গান কর উজান। একটা গান কর। শোনা তোর গান। ” বলে বেঞ্চে নিজের শরীরটাকে এলিয়ে দিলো অহন।তার সহ্য হচ্ছে না, এই অনাকাঙ্ক্ষিত দৈহিক প্রতিক্রিয়া। মনে হচ্ছে সব কিছু শেষ হতে চলেছে যেন। উজান তাকায় তার দিকে।….

৪.

বাইরে বৃষ্টির অনবরত ঝমঝম শব্দ আর ক্রমাগত ব্জ্রপাতের গগনবিদারী আওয়াজে, শেষমেশ ঘুম ভেঙেই যায় অহনের, কাল আর বাড়ী ফেরেনি ও। আর বাড়িতে আর ফিরবেও না, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে। এই ফ্ল্যাটবাড়ি অনেকদিন আগে অফিসের তরফ থেকেই পেয়েছিলো সে। ভেবেছিলো লাগবে না, কিন্তু কথায় আছে সময় পরিস্থিতিকে ঠিক পরিনতি দেয়। আজ শেষ বারের মত আরো একবার সে বাড়ি যাবে, নিজের জিনিষ গুলো গুছিয়ে নিয়ে আসতে। বাইরের দিকে ঘুম জড়ানো চোখে তাকিয়ে দেখে বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে গেছে প্রকৃতি, ঘন কালো মেঘের এহেন ঘনঘটা কমার নয়। বৃষ্টি জল মাথার কাছের কাচের জানলাটায় ভীষণরকম ঝাপটা মারছে। গায়ের ওপর থেকে তার কম্বল এখনো সরেনি কারন একটা ঠান্ডা আমেজ কাজ করছে সর্বত্র। এইরূপ আকাশ কি কালকের সেই দুপুরের ফলাফল, মনে হতেই অহনের চোখে এক প্রচ্ছন্নতা প্রবেশ করে। বাইরের মেঘবৃষ্টি আলোআঁধারির দিকে সে ফিরে যায় কাল দুপুরের বাবুঘাট পার্কে। তার শরীর যেন তাকে ক্রমাগত গ্রাস করছিল। চোখ ছোট হয়ে যাচ্ছিলো ক্রমশ। সে আর পারছিলো না এই নতুন অনুভূতির সাক্ষী হতে। বেঞ্চে শরীরটা এলিয়ে দেওয়া মাত্র উজানের কণ্ঠ হতে সুরের বিস্ফারণ ঘটে। সে শুধু তাকিয়ে ছিলো উজানের করুন নয়নের দিকে। ” শ্রাবন গগনে ঘোর ঘনঘটা –

নিশীথ যামিনী রে……

শ্রাবন গগনে ঘোর ঘনঘটা, ” উজান আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজল। অহন চোখ বোজে। উজানের গানের সুর তার কর্নছত্র হয়ে মস্তিষ্কের স্নায়ু রাজ্যে সাড়া ফেলে। সেখান থেকে শিরা, ধমনী ভেদ করে দেহের প্রতিটা কোনায় আঘাত করতে থাকে। সে কি মারাত্মক পৈশাচিক সুখানুভূতি। মনে হল সে আর চোখের জল ধরতে পারবে না।

” কুঞ্জপথে সখী কেইসে যাওব, অবলা কামিনী রে…

শ্রাবণ গগনে ঘোর ঘনঘটা।

উন্মদ পবনে যমুনা তর্জিত, হর হর গর্জিত মেঘ। “

অহনের পেশী স্নায়ু অবশ হয়ে পড়ল। ভিতরে ভিতরে কিছু যেন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ও আর পারছে না। উজানের সুর সহ্য করতে। এ কেন হচ্ছে তার সাথে। এ কেমন অনুভূতি। ও শুইয়ে রাখা শরীরটাকে উঠিয়ে উজানের ঠোট চেপে ধরে তার হাত দিয়ে। উজানের চোখ লাল হয়ে গেছিলো। আকাশের রং কালো, ঝোড়ো হাওয়া শুরু হলো। তাকিয়ে থাকে অহন। কিছু বলতে পারছিলো না ও। কি বলবে ও।? শুধু বলল ” আমি আর পারছি না উজান। না আমি পারছি, না প্রকৃতি, এবার শুধু জল বাধ ভাঙার অপেক্ষা। “

উজান কোনোদিকে না তাকিয়ে জড়িয়ে ধরল অহনের শক্ত পেশীবহুল বুক। মুখ গুজে দিলো অহনের ঘাড়ে উষ্ণ খাজে। অহনের চোখ বন্ধ হয়ে যায়। ও অনুভব করে উজানের শরীর মারাত্মক গরম হয়ে গেছে হঠাত। ও হতভম্ব হয়ে পড়লো। দূরে বিদ্যাসাগর ব্রীজ দ্যাখা যাচ্ছে। ঝোড়ো হাওয়ায় গায়ে শিহরণ দিয়ে ঊঠলো অহনের। এতকিছুর মাঝে শরীরের দক্ষিনাংশের কোনো পেশী হঠাৎ নড়ে উঠলো। বর্ধিত হলো। অহনের গলার সমস্ত জল শুকিয়ে গেল। মনে হল একবালতি ঠান্ডা জল কেউ তার গায়ে ছুড়ে মারে। কিন্তু এত অপ্রত্যাশিত। এরকম তো হওয়ার কথা নয়। সে তো হাজার হোক একজন পুরুষ, হতে পারে সে যৌনাক্ষম, কিন্তু পুরুষ তো। সমকামী নয় সে।। আজতো তার আনন্দের স্রোতে ভাসার দিন। কিন্তু কার্যগত ভাবে ঠিক থাকলেও স্থান,কাল, পাত্র ভুল। কিন্তু এত কন্ট্রাডিকশন থাকা সত্ত্বেও সে উজান কে দূরে সরালো না। বড়ো অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে ধরে তাকে উজান। যেন কোনো বিন্দুমাত্র চাহিদা, কামনা, বাসনা হীন এক জড়িয়ে ধরা। কি করে দূরে সরাবে তাকে? একসময় উজান নিজে ছেড়েদিলো ওকে। বড়ো বড়ো চোখনিয়ে তাকিয়ে শুধু বলল ” I am sorry, sorry অহন বিশ্বাস করো আমি এরকম কিছু করতে চাইনি, কিন্তু… কিন্তু। ” চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো উজানের। অহন ওকে থামিয়ে দিলো বলল ” চুপ, আমি তোকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি। কখোনো যদি একা মনে হয় নিজেকে, তাহলে জানবি এই দাদা আছে তোর পাশে।” উজান গুম মেরে গেল। অহন একবার নিজের পৌরুষ অনুভব করল, না সে বুঝতে পারছে তার মধ্যে পুরুষত্ব আছে। এ কোনো মায়াজাল ছিলো উজানের? সে বলে ” এখন চল। অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে। আকাশের অবস্থা ভালো না” অহন হাসি মুখখানা নিয়ে বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে ঢুকলো। স্পর্শ করল নিজের লিঙ্গ।ঘুমানোর ফলে যা উত্তেজিত ছিলো। কিন্তু এই স্বাদ সে কোনোদিন আর ত্রিধাকে দেবে না, দরকার হলে আরো একবার বিয়ে সে করবে। আর হ্যা আজ একবার লাইব্রেরী যেতে হবে। আর বাড়ীতে জিনিষ পত্রগুলো আনতে যেতে হবে।

ত্রিধা তিতো মুখে বলল” চলে যাচ্ছো মানে! “

-“কেন বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে নাকি!? I don’t want to be in any relationship with you, understand. ” অহন লাগেজের স্ট্র্যাপ টাইট করল।

– ” বাহঃ এটা কোন ধরনের কথা। সম্পর্ক রাখবে না বললেই হল। “

– ” আমি মিউচুয়াল ডিভোর্স করব, তোমার কোনো দাবী থাকলে পেপারস এ উল্লেখ করে দিও প্লীজ। ” অহন দরজা খুলে দাঁড়ায়।

– ” পালাচ্ছো নাকি। যাতে আর কোনোদিন কোনো ফেমিনাইন জেন্ডারের কাছে সেক্সুয়াল ডিজলভড না শুনতে হয়। তাইতো। যাও যাও। কি বলত হিজড়ারাও আলাদা একটা জার। আর তুমি সেই পর্যায়ও পড়ো না। “

অহনে ড্রইং রুম অব্দি চলে এসেছিলো। ত্রিধার কথা শুনে ঘুরে দাড়ালো

বলল ” কি বললে। তুমি? “

– ” হিজড়াদের থেকেও অধম তুমি। ওরা অন্তত মুখ লুকিয়ে পালায় না। “

অহন কাছে এসে জাপটে ধরল ত্রিধাকে। গায়ের জোরে। ” দেখবি কি করতে পারি আমি। “

ত্রিধাকে টান দিয়ে বিছানায় ফেলে। নিজের লিঙ্গ বার করে। বস্ত্রহীন করে ত্রিধার দেহ। ত্রিধার শরীরের খাজ পাহাড় দেখে অহন উত্তেজিত হয়ে পড়ল। ত্রিধা দেখল অহনের সেই রূপ। কিছু বলার আগেই নিজেকে নিক্ষেপ করল অহন।।

– ” ছাড়ো অহন I am feeling hard pain. leave me “

দাতে দাত চেপে রমণ করতে করতে বলল ” কেন হ্যা কেন। খুব তো শখ ছিলো। বলেছিলাম রাগাস না আমায়। আমি কিন্তু মারাত্মক পশু। এবার থেকে আর লাগবি না বুঝেছিস। ” হাফাতে হাফাতে বলল অহন।

– ” leave me! please leave me! “

অহন জীবনের প্রথম রমন দশ মিনিট করে নিজেকে বাইরে বার করে ত্রিধার শরীর থেকে। অনুভব করল ওর জীনবের প্রথম বীর্যপাত।এত অপেক্ষা করেছিলো যার জন্য সেটার অপচয় ঘটল এব্যাপারেও আফসোস হল তার। প্যান্ট পরে। ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল বাড়ী থেকে। শেষ বার পিছন ঘুরে দেখে নিলো নিজের হাতে সাজানো বাড়ি।

কারন জীবনে সামান্যতম শান্তির জন্য অনেক বড়ো বড়ো স্যাক্রিফাইস মানুষকে করতে হয়।এমনিতেও সে খুব সুখকর জীবনেও ছিলো না। আকাশ আজও মন খারাপ করে বসে আছে। যখন তখন কেঁদে কেটে একাকার করবে। একটু আগের ঘটনা টা এখোনো বিশ্বাস হচ্ছে না তার। সে রমন করল, তাকে আর মুখ লুকিয়ে থাকতে হবে না কোনো নারীর থেকে। ডাউন লেকের এই যায়গাটা বেশ ভালো। আজকে একটা অস্বস্তিকর গরম লাগছে। গায়ের থেকে কেমন যেন ঘামের গন্ধ আসছে। অহন দূরে নিজের গাড়ীটা দেখতে পাচ্ছে। গাড়ী টা দেখে ওর হঠাৎ উজানের কথা মনে পড়ে গেল। আচ্ছা এমন কেন হলো। উজানের ওই ছোয়ায় কি ছিলো যে আমি সাড়াদিলাম। জীবনে তো অনেক নারীকে ফ্যান্টাসাইস করেছি, কিন্তু এই মিরাকেলতো ঘটে নি। তবে কি আমি… আমি… না না এ কি করে সম্ভব, আমিতো সমকামিতা কে প্রশ্রয়ও দিই না। উজান কি তবে সমকামী?. যদি হয় তবে আমাকে নিয়ে ওর ভ্রান্ত ধারনা আমার ভাঙ্গা উচিৎ। একবাএ ওকে ফোন করে দেখি। কিন্তু আদৌ ও গে কিনা আমি তো শিওর না। হঠাৎ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই উজানের মায়াভরা চোখ। শরীরে আবার কে যেন ঠান্ডাজল ছুড়ে মারে অহনের। গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায় অহনের। এইভাবে চলতে দেওয়া যায় না। ও ফোন বার করে উজান কে ফোন করল।

” হ্যালো উজান, হ্যা আমি। আজ একটু পার্কস্ট্রিটের দিকে আসতে পারবি।?।……হ্যা কিছু কথা আছে। আয়।…. আচ্ছা আয় হ্যা।”…..

ফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উজানের গায়ে কাটা দিয়ে উঠেছিলো এই ভেবে ” কি বলবে অহন। কিনা বলবে অহন। “কিন্তু না সে কিছুই বলে নি, শুধু বলল দেখা করতে।তাই তাকে বেরোতেই হল। তবে কাল যেটা হলো সেটায় সে বড্ড তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে। কিন্তু কি করত ও? বেহায়া পরিবেশ টাও যেন এমনটাই চেয়েছিলো। কালো ঘন মেঘলা আকাশ, হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া, তার নিঃসঙ্গ জীবন তার মাঝে হঠাৎ ওরকম হ্যান্ডসাম অহন ওকে শরীরে এত কাছে টেনে নিলো, ওর শরীরের থেকে বেরোনো এক উত্তলা ঘ্রান। আমাকে বাধ্য করেছিলো অহনকে জড়িয়ে ধরতে।

আমি যে কি পাগল। এত বোধের অভাব আমার। নিজেকে বারবার বুঝিয়েছি ” কোনদিক দিয়ে অহন তোর সমকামী মনে হয় উজান। ” উজান নিজেও কি তুই সমকামী। কেন কলেজের অনিন্দিতাকে তোর ভালো লাগেনা” কিন্তু তাও।

সকালের ওই একপষলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর। এখন পরিবেশটা ফ্রীজ থেকে বের করা পাত্রের মত হয়ে গেছে। সবকিছু ভেজা ভেজা। মনে হচ্ছে উপরের মেঘগুলো নীচে নেমে এসেছে। পারিপার্শ্বিকটা বড্ড নিস্তেজ। পুরানো কোলকাতা এরকমই। ওয়েদার অনুযায়ী মুড চেঞ্জ হয়। আর দিন পাচেক ইন্ডিয়ায় আছে উজান। এসবকে বড্ড মিস্ করবে সে। কাউকে মিস করার মত কেউ বোধ হয় ভারতবর্ষ এ নেই। কোথায় এখানেই তো দেখা করতে বলল। উজান চোখ ঘুরালো এদিক ওদিক। আরে ওটা অহনের গাড়ি না?. হ্যা তো। কিন্তু সে কোথায়। গোড়ীটার কাছে এগিয়ে গেল, গাড়ীটার উলটো দিকে অহনকে দেখতে পাল উজান। উজানের ওই মারকাটারি শরীরটাকে খুব কষ্টে ঢেকে রেখেছে একটা সাদা সার্ট, আর খাকি চ্যুস কটন প্যান্ট। উজানকে কাছে আসতে দেখে অহন।উজানের চেহারাটা খানিক বিড়ালের মত। রোগা পাতলা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফর্সা, আর ঘোলাটে দুটো চোখ। একটা বেগুনী গেঞ্জির প্যান্ট আর রেড টি-সার্ট।

উজান পাশে এসে বসে। অহন একবার হেসে আবার অন্যদিকে মুখঘোরায়। উজান প্রতিক্রিয়ায় একবার হাসে। অস্বস্তিকর নীরবতা ছিলো ওদের আশপাশ দিয়ে। যেন পিন ফেললেও আওয়াজ পাওয়া যাবে।অহনের গা হাত পা আবার ঠান্ডা হয়ে আসছিলো। কি বলার জন্য ডেকেছিলো উজানকে। কি বলার জন্য।

– ” আজকের ওয়েদার বেশ ঠান্ডা বল। অহন? “উজান শুরু করল প্রথম কথা।

– ” হ্যা, খুব ভালো পরিববেশ, আজকে বেশ ভালোও লাগছে শরীরটা। অনেকদিন পরিবেশকে এইভাবে দেখা হয়নি জানিস অহন। আমার কাছে এ এক নতুন সকাল। “অহন উজানের দিকে তাকায়।

উজান বলে “নতুন সকাল কেন? কি হয়েছে, আর এতদিন কি তোমার শরীর খারাপ ছিলো? “

– ” বুঝবি না তুই, বুঝলেও আমি ঠিক বোঝাতে পারব না তোকে।”হাসে অহন।

– ” বলো কি বলবে! “

-” কি বলব?! “

– ” বললে দরকারি কথা আছে। ” উজান অবাক সূচক হাসি হাসে।

অহন বলে “সত্যি খুব ঠান্ডা লাগছে। চা খাবি?! “

উজান মাথা নাড়ায় হ্যা সূচক ভঙ্গিতে।

গঙ্গার ধারে জং ধরা রাস্তার এক ছোট্ট দোকানে দাঁড়িয়ে দুজন চা খেল। মাটির খুড় ফেলা অব্ধি ওদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। তারপর গঙ্গার পাড় ধরে চলতে শুরু করে।

অহন বলে “তুই আর কতদিন? “

– ” আর দিন চার বা পাঁচ। “

অহনের হাত দুটো পকেটের ভিতর ছিলো। উজান জলের দিকে তাকিয়ে বলল ” তোমকে সত্যি আজ খুব অন্যরকম লাগছে। কি ব্যাপার বলত? “

– “আমি আজ অনেকদিন পর, মুক্তি পেয়েছি উজান। এতদিন মনে হচ্ছিলো, আমি আটকে রয়েছি কোথাও, দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। “

উজান ম্লান হেসে বলে ” আজ হঠাৎ কি হলো। “

কিছুক্ষন চুপ ছিলো অহন। তারপর বলে “তুই বুঝবি নারে।বড়োদের ব্যাপার। “

– ” সেই কাকা জ্যাঠাদের ব্যাপার আমি আর কি বুঝবো বলো।? ” উজান ফিক করে হেসে দেয়।

অহন অবাক ” কি আমি কাকা, জ্যাঠা, কতই বা বয়স আমার। ২৯ কি ৩০। “

উজান বলে ” তুমিই তো বললে ‘বুঝবি না বড়োদের ব্যাপার।’ তা তুমি এমন ভাবে বললে বাবা কাকারাই এভাবে বলে। “

অহন উজান কে ভেঙ্গিয়ে হাসে।

উজান অহনের হাত ধরে বলে “ওকে ঠিক আছে বা!বা! অহনদা বা অহন হয়েছে।”

অহনের ফোন বেজে উঠলো। ফোন বার করে দেখে ত্রিধা কল করছে। অহনের মুখটা তিতো হয়ে উঠলো। কেটে দিলো ফোন।

উজান হেসে বলে ” তুমি বই এর প্রেমে কি এখোনও পড়োনি অহন? “

– ” না। সবে তো শুরু করলাম “

– ” চুপ করো অহন তুমি জানোই না বইতে কি লেখা আছে। চরিত্র গুলোর নাম কি? ” উজান ম্লান হাসে।

অহন চোখ মাথায় উঠিয়ে নিয়ে বলল “তুই কি করে জানলি?”

– ” ফলো ঠলো করছিস নাকি।? “

উজান হেসে ফেললো। বলল ” একদমি পড়োনি তা না। পড়েছো খুব কষ্ট করে হয়তো পাচ ছয় পাতা”

অহন লজ্জা পেয়ে গেল। ” তুই বুঝলি কেমন ভাবে বলনা। “

উজান মুখ ঘুরিয়ে বলল ” কেন বলব? আগে আমাকে বলো আজকের দিন তোমার কাছে একদন নতুন কেন? “

– ” যাহঃ! বাবা এটার সাথে এটার কি সম্পর্ক। “

-“তুমি জানোনা অহন এ জগতে প্রত্যেক বস্তু সে কাজ হোক, কথা হোক, যাই হো একে অপরের সাথে রিলেটেড। “

– ” কিন্তু আমি ওই ব্যাপারটাকে ভুলতে চাইছি।….

আবার ফোন বেজে উঠলো। হ্যা এবারেও ত্রিধা অহন রাগে লাল হয়ে গেল। ওর পাশে দাঁড়িয়ে উজান যেন গরম হয়ে গেলো। অহন ফোন আকাশের দিকে তুলে গায়ের জোরে আছাড় মারে মাটিতে। পা দিয়ে পিষতে পিষতে বলে ” শালা, রেন্ডী এবার সারা জীবন পস্তাবি তুই বিচ।” আশপাশ দিয়ে লোক দেখতে দেখতে যাচ্ছিলো। উজান কোনোরকমে অহনকে সামলায়।

– ” কি হচ্ছেটা কি অহন!?”

অহনের শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি দ্রুত হচ্ছিলো। উজান ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে অহনের হাতে দেয়। বলে ” কোনো কথা না বলে চুপচাপ, খেয়ে নাও। “

ওরা ওই পুরানো জং ধরা, ভেজা ভেজা রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে ছায়াঘন নন্দন কাননে এসে পড়ল।

– ” দেখ উজান কোলকাতার বুকে এমন একটা যায়গা আছে জানিই নাহ। “অহন তাকায় উজানের দিকে।

উজানের গোমরা মুখটা দেখে ও দীর্ঘশ্বাস ফেলল ” আচ্ছা। আমি ত্রিধা কে ছেড়ে দিয়েছি। কারন রোজ রোজ ঝামেলা আমার আর ভালো লাগত নাহ। তাও যদি কোনো স্বাভাবিক কারনে ঝামেলা হত মেনে নেওয়া যেত। “

– ” এখন কি সেই কারন মিটে গেছে। আর কি এমন কারন অহন? “

অহন কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে উজানের ঘাড়ে হাত রেখে বলে ” এটা উপযুক্ত সময় না। পরে একদিন ঠিক বলব। “

আবার হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া শুরু হলো। কি দারুন অনুভূতি। আমেজ, কোলকাতার বুকে কি এমন পাগলা হাওয়া বয়েছিলো আগে। অহন চারপাশটা দেখে।

” পাগলা হাওয়া বাদল দিনে, পাগল আমার মন জেগে ওঠে……….

চেনাশোনারর কোন বাহিরে ” উজানের সুরে হাওয়া যেন আরও মাতাল হয়ে উঠল। অহনের চোখ আবার বন্ধ হয়ে যায়। এ কেন হচ্ছে তার সাথে। উজানের সুরে কি আছে? ভগবান! উফ, আমি পারছি না এই ভালো লাগা সহ্য করতে।

অহন চিৎকার করে ” উজান!!!” উজানের বুক ধড়ফড়িয়ে ওঠে। অহনের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে চোখ লাল হয়ে গেছে। কানও হয়ে উঠেছে রক্তিম।” কি হয়েছে তোমার অহন? ” যেই ছুতে যাবে উজান ওকে, ও সরিয়ে দিয়ে বলে ” আমাদের এবার বাড়ী ফেরা দরকার অনেক দেরী হয়ে গেছে। ” উজান কি বলবে ভেবে পেল না। খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেল যেন। নির্বাক ভাবে শুধু দাঁড়িয়ে ছিলো। একরাশ ঠান্ডা হাওয়ার দলা বুঝিয়ে দিলো। না! তার অস্তিত্ব আছে তাহলে।…………

উজানের ঘুম আজ বড্ড সকাল সকাল ভেঙ্গেছিলো। আজ অনেকদিন পর আবহাওয়া পরিষ্কার হয়েছে। সূর্য এতদিনের জমানো তেজ আজকে একসাথে প্রয়োগ করছে। তাই গরমটাও আজ তুলনামূলক ভাবে বেশী। ঘাড়ে গলায় বিচ্ছিরি জ্যাবজ্যাবে ঘাম হচ্ছে। কাল অহন গাড়ীতে একটাও কথা বলেনি। ভালোইতো ছিলো হঠাৎ যে কি হলো। কালকে অহন কি বলার জন্য ডেকেছিলো ভগবান যানে। হয়তো ওর স্ত্রী কে ছেড়ে আসার পর, কাউকে পাশে দরকার ছিলো। কাল সেই চা খেতে খেতে অহনের সেই লাল ঠোটের চুমুক , আর সার্টের ভিতর থেকে উকি মারা নির্লোম সুগঠিত বুক। উজানের আরো গরম লাগতে শুরু করে। যতক্ষন আমি ওর সাথে ছিলাম সেই সময় টুকু একান্ত আমার ছিলো। ইন্ডিয়া ছেড়ে যাওয়ার সময় কি এসব হতে হলো। সারাজীবন পর নিজের “কেউ”টাকে আমি পেলাম, অথচ কতটুকুর জন্য। এখন সারাজীবন থেকে যেতে ইচ্ছে করছে। উজান মাথা ঝাকিয়ে উঠলো ভিতর থেকে কে যেন ওকে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারে।বলে ” কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছিস উজান? “

– ” অহনকে নিয়ে! “

– ” তাহলে তুই স্বীকার করে নিয়েছিস, যে তুই গে!। “

– ” আমিতো আমার ভালো লাগা টুকুকে চেয়েছি। সেখানে সমকামিতা, উভকামিতা, বিষমকামিতা এসব কৃৎনিশ্চয়তা ছাড়া কিছুই না। “

– ” বাস্তব জীবনে দর্শন কি খুব কাজে লাগে উজান। বাস্তব বাদীতাকে আন, আর বল যে ‘হ্যা আমি অহনকে ভালোবেসে ফেলেছি। ‘

– ” হ্যা! হ্যা! আমি অহনকে ভালোবেসে ফেলেছি। হ্যা যেখানে ভালোবাসা আছে বলতে লজ্জা নেই “

কে যেন হেসে উঠলো। ব্যঙ্গ করে বলল ” কিন্তু অহন যদি সমকামী না হয়।?! “

উজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আর কোনো প্রশ্ন নেই। শব্দ নেই। বারবার হয়তো এখানে এসেই থেমে যাবে সব কিছু। তাই সেখানে উত্তরের আর কোনো রকম আশা নেই। তাই এখানে এত নিস্তব্ধতা। কিন্তু উজান নিজের ভিতরে দেখার চেষ্টা করে, সে বের করে আনে উত্তর। বলে ” সেদিন যখন আমি অহন কে জড়িয়ে ধরলাম, আমার ঠোট ওর ঘাড় স্পর্শকরেছিলো। আর হাত ওর বুকে! তখন তো ও কিছু বলল না! ও তো স্বাভাবিক ছেলেদের মত ঘুরিয়ে এক থাপ্পড় মারেনি, তাহলে? “

অনেকসময় অপেক্ষা করেছিলো উজান।কিন্তু কিছু কিছু উত্তর জীবনাদর্শন দিতে পারে না। তার উত্তর খুজে বার করতে হয়। কিভাবে? – যানা নেই।

তাই উজান ফোন করল অহনকে। এর উত্তর একমাত্র সে দিতে পারবে। আর কোনো ভয় নেই যা হবে দেখা যাবে।

অহন মিটিং রুমে ঢোকার সাথে ফোন বেজে উঠলো। ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে উজান। ভাগ্যিস কাল উজান ফোন ভাঙ্গার পর সিম টা উঠিয়ে আমাকে যত্ন করে দিয়েছিলো। কিন্তু এখানে কি করে ফোন ধরবে সে। সে সাইলেন্ট করে দেয় ফোন। আধঘণ্টা পর আবার ফোনের স্ক্রিন লাইট জলে ওঠে। সে দেখে উজান। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে সে নিরুপায়। এক ঘন্টার আগে কিছুতেই সে বাইরে যেতে পারবে না। আবার পনেরো মিনিট পর ফোন স্ক্রিনিং শুরু করে। এবার অহন চিন্তায় পড়ে যায়। কি হলো ছেলেটার। মনের মধ্যে দুশ্চিন্তা গুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে। একবার মনে হলো। রাস্তায় কোনো এক্সিডেন্ট হয়েছে, কললিস্টে তার নাম হয়তো আগে আছে, বা উজান একমাত্র তাকেই ফোন করতে বলেছে। হঠাৎ সে দেখে ফোনে একটা ম্যাসেজ ঢোকে। সে ফোন টেবিলের আড়ালে নিয়ে ম্যাসেজ টা পড়ল। ” অহন তুমি আজকে অন্তত শেষবারের জন্য লাইব্রেরি আসতে পারবে। কিছু কথা আমার তোমাকে বলার ছিলো। “

অহনের ঘাম বেরোচ্ছিলো ওইসব ভেবে এতক্ষন পর ঠান্ডা হলো তার শরীর।

তখন বিকেল পাঁচটা। গাড়িটা আজকেই সার্ভিসিং করতে দিয়েছে অহন। তাই একরকম দৌড়ে দৌড়েই যাচ্ছিলো।

উজান ভিতরের দিকের দুটো র্যাকের মাঝে নীচে মেঝেতে বসে ছিলো। গা হাত পা কেমন যেন খসখসে হয়ে যাচ্ছে। ভয়! হঠাৎ একটা গন্ধ পেল। বড্ড চেনা এই গন্ধটা। এটা শরীরের একটা ভ্যাপসা গন্ধের সাথে চেরী ফুলের মিশ্রন। আর এটা আসা মানেই অহন চলে এসেছে। উজান পাটাকে একটু এগিয়ে দিলো যাতে অহন পা দেখে ওর যায়গা নির্ধারন করতে পারে। তাই হলো অহন এগিয়ে এসে ওকে দেখে হেসে বলে ” একি তুই মেঝেতে বসে আছিস।? “

উজান ভালো করে দেখলো অহন কে। সাদা ফিটিংস সার্ট যা কালো চ্যুস প্যান্টের মধ্যে ইন করা। আর ওপরে একটা কালো ব্লেজার। উজান খুব প্রচ্ছন্ন হলো এইরূপ দেখে। অহন হেসে ওর পাশে বসে। প্যান্ট একদম টাইট হয়ে খাপে খাপে বসে যাচ্ছে তা উজানের নজর এড়ায় নি। নিজে বরং লজ্জা পেয়ে গেল।

অহন গম্ভীর কন্ঠে বলে ” তুই বারবার ফোন করছিলি আমি মিটিং এ ছিলাম। I’m sorry. আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম। কি হলো কি না হলো? আর বেরোতেও পারছিলাম না। “

উজান ম্লান হাসে। বলে ” আমি ডাকলে তো তুমি আসতে বাধ্য নয় অহন। “

অহন হতভম্বের মত তাকায় ওর দিকে। ” কি হয়েছে উজান? আমি অবশ্যই বাধ্য তুই কেউ হোসনা নাকি আমার।? “

– ” ভালো লাগল শুনে আমার সত্যিইই কেউ আছে। আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি অহন। তুমি মিস করবে না আমায়। কারন তুমি না মিস করলে আর এমনিতেও কেউ নেই মিস করার।”

অহন দেখে উজানের চোখ ছলছল করে উঠলো। অহন যখন কিছু বলতে যাবে দেখা গেল কোনো এক অজানা কারনে ওর গলা বসে গেল। গলার কাছটা যেন কত কষ্ট দলা পাকিয়েছে অহনের। সে উজানকে আবার একপাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরে। উজানের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জল।

– ” তুই আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিস অনেক কিছু। তুই চলে যাবি এটা ভেবে অনেক যন্ত্রনা হয়। কিন্তু তা অনুভব হয় না। “

উজান নিজের হাত অহনের পেটের উপর রাখে। অহনের চোখ বন্ধ হয়ে যায়। কত দরদ, কত আন্তরিকতা। এই ছোয়াটায়। কেন অহন অন্য কোথাও খুজে পায়না এই পরশ।

– ” আমার যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে অহন আমি যাব না। ” বলে উজান তাকায় অহনের দিকে।

অহন তাকায় ওর দিকে। ” বাচ্চা ছেলেতো তাই অনুভূতি গুলো বড়ো করে দেখছিস…. “।

উজান দেখে অহনের চোখে কি একমুঠো সমুদ্র সেখানে আটকে রয়েছে। উজান আরো কাছে আসে অহনের। ওর ঠোট দুটো অহনের ঠোটের খুব কাছে চলে এসেছিলো। এক অদ্ভুত একটা উষ্ম প্রশ্বাস নিস্বাসের খেলা চলছিলো। অহন আর পারছিলো না। এ ও কি করতে চলেছে। কিন্তু এসব কেন ও ভাবতে পারছে না। মনে হচ্ছে এটাই বোধ হয় তার নিয়তি।হাজারো বইকে সাক্ষী রেখে ওদের দুজনের ঠোটএর আধ্যাত্মিক প্রণয় ঘটে। অহন যেন মুহূর্তে ভিতরে ঢুকে যেতে চাইছে। উজান বুঝলো কত যন্ত্রনা আটকে ছিলো, অহনের কতদিনের চাহিদা আটকে ছিলো। অহন টেনে নিচ্ছিলো ভিতর থেকে সমস্তটা। উজান বলেই ফেলে আর অপেক্ষা সহ্য হলো না ওর ” ভালোবেসে ফেলেছি অহন! তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। “

অহন মুহূর্তে দূরে সরে যায়। দাঁড়িয়ে পড়ে নিজের যায়গা ছেড়ে। উজান ভাবলেশ হীন হয়ে পড়ে আকস্মাৎ এই ঘটনায়।

অহন গম্ভীর ভাবে বলে ” বেটার হবে আমাদের আর দেখা না করা। I’m not looking for like an all this things. I’m not gay ujan “

আর একবারও পিছনে ফিরল না অহন। উজান তাকিয়ে ছিলো। হঠাৎ করে সব যেন ঝাপসা হয়ে যায়। কি প্রখর অনুভূতি। অহন কি আর ফিরবে না? কি থেকে কি হয়ে গেল।

অহন দৌড়াচ্ছিলো। কোলকাতার শহর সে দেখতে পায়নি ভীড় সে কিভাবে অতিক্রম করছিলো সে জানে না। তার কিচ্ছু মনে নেই। সে জামাকাপড় না খুলেই শাওয়ার চালিয়ে দিলো। আর কাঁদতে লাগল। চিৎকার করতে লাগল।সে আর পারছিলো না কিছু সহ্য করতে। ভালোলাগা, অস্তিত্বের টানাপড়েন একসাথে কাজ করছিলো ওর মধ্য। এক সময় মনে হলো সব নীরব। সব অদৃশ্য…..

অহন কালকের দিনের কথা ভেবেই চলেছে। দুটো জিনিষ ওর ভিতর আঘাত করছে প্রথমত কাল যেটা হলো সেটাকি সে করতে বাধ্য ছিলো? নাকি সে চেয়েছিলো ওটা করতে। কেন উজানের অমন করুন দৃষ্টি? আমি আবার কেন ওর কথা ভাবছি? আমিতো সমকামী নই! তবে কি ছিলো? উজানের কথা গুলো ক্রমশ কানে বেজেই চলেছে “আমার কেউ নেই “

” তুমি কি আমায় মিস করবে অহন।? “

তারপর ভেসে উঠছে উজানের কাছে আসা, আর সেই স্পর্স। উফ! আমি কেন বারবার ওর কথা ভাবছি। অহনের মনে হলো যদি ও নিজের চুল গুলো টেনে ছিড়ে দিতে পারত। চোখ লাল হয়ে ওঠে। বারবার ও ফোনের দিকে তাকাচ্ছে এই উজানের ফোন আসে। এই আসল বোধ হয়। কিন্তু না আসছে না। কিন্তু সে তো চায়নি উজানের সাথে যোগাযোগ রাখতে। সেতো চায়নি উজান আবার তাকাক অসহায় নয়নে, যেখানে শুধু আছে এক প্রবল আকর্ষন। আমি যত ওকে আমার মন, স্নায়ু থেকে মুছে ফেলতে চাইছি, ততই নিজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠছি। অহন কাগজে অনবরত কালির এলোমেলো আঁচড় ফেলতে লাগল। হুট করে চেয়ার থেকে উঠে পড়ে ও। নেহা ওর অফিস কলিগ, সকাল থেকেই খেয়াল করছিলো অহনকে আজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত অস্থির লাগছিলো। এতদিন মানুষটা একপ্রকার নির্জীব বস্তুর মত পড়ে থাকত। কিন্তু এখন চিন্তা, রাগ, মেজাজ, চাঞ্চল্য ইত্যাদি স্বাভাবিক জৈবিক ক্রিয়াকলাপ দেখে ভালো লাগছে। কিন্তু তাই বলে এইরকমভাবে হঠাৎ রিয়্যাক্ট কেন বুঝতে পারল না। ও এগিয়ে গেল বাথরুমের দিকে। দরজার আড়াল দিয়ে দেখে অহনের ভেজা চুল খুব দারুন ভাবে চোখের ওপর এসে পড়েছে। অহন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আয়নায় ওর প্রতিবিম্বের দিকে। সেখানে দুই মানব সত্ত্বার মধ্যে যেন লড়াই চলছে। নেহা কাপা কাপা কন্ঠে ডাকে ” মি. মল্লিক! “

– ” ভিতরে এসো নেহা। ” খুব গুরুগম্ভীর সুরে ডাকে অহন।

নেহা ভয় ভয় চোখে ঢোকে, দাঁড়ায় অহনের পিছনে। অহন সেকেন্ড খানেক অপেক্ষা ব্যতিরেকে নেহাকে ঠেসে ধরে দেওয়ালের সাথে।

– ” I know you like me neha. come lets do it. “

নেহার ঠোটের কাছে ঠোট নিয়ে গেলো অহন। নেহা বলে ” আমাকে নাও অহন, এতটা যখন নিয়েছো আরও কাছে নাও অহন। “

অহন শুনছিলো নেহার তীব্র কামনার আওয়াজ। ও ঠোট ঘষতে শুরু করে। নেহার শরীরে তখন আগুন জলছে। কিন্তু অহন স্তিমিত হয়েছিলো। ” কি হলো তার? সে নিজেকে অনুভব করতে পারছে কিন্তু সে কিছুতেই তাকে প্রকাশ করতে পারছে না। তার লিঙ্গ সমস্যা আবার….. কিন্তু কাল তো উজান। ” কল্পনায় ফিরে যায় অহন লাইব্রেরীতে সেই উজান,ওর সেই চোখ, ওর ছোয়ার আর্তি। ওর নরম দুটো ঠোট। তাকে ও রাক্ষসের মত গেলার চেষ্টা করছে। ও ভাবনা অত পর্যন্ত স্তিমিত রাখেনি। ও দেখে ওর প্যান্টের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে উজান। ওর বর্ধিত পৌরুষ লেহন করাতে লাগল উজানকে দিয়ে কল্পনায়। হঠাৎ অহন আজের বাস্তবে ফিরে আসে। দেখে তার লিঙ্গ যেন ফেটে বেরিয়ে আসবে, ওর ভিতর থেকে। নেহা সেই বস্তুকে কামুক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল।কিন্তু অহন ছেড়ে দিলো নেহাকে এত পর্যন্ত এসে। সে দেখল এক নারী তাকে খাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে। তার অস্বস্তি হতে শুরু করল,। কি ঘৃনিত লাগছে নেহাকে। অথচ সেই কল্পনায় উজান।! সে কি সপ্রতিভ রূপ। কাল রাতে সে চিল্লিয়ে বলেছিলো। তিরষ্কার করেছিলো নিজেকে। কিন্তু নিয়তি! নিয়তি তাকে কোথায় দাড় করালো। কাল যাকে ত্যাগ করে আসল তার সত্ত্বা হারিয়ে যাওয়ার ভয়। সেই সত্ত্বাকে সে আকড়ে নিতে যখন বাস্তব কে আকড়ে ধরতে চাইছে তখন তাকেই কিনা ঘৃনিত মনে হচ্ছে। এ কেমন জটিল দন্দ্বে ফেলল নিয়তি। সে নেহাকে জিজ্ঞাস করল

– ” তুমি সেক্স চাও নাকি আমাকে চাও নেহা।? “

– ” এ কেমন প্রশ্ন স্যার। সেক্স করতে গেলে তো আপনাকে কাছে টেনে নিতেই হবে। “

– ” উত্তর দিতে পারলে না নেহা।’ যদি বলতে আপানাকে চাই স্যার। তারপর সেক্সটা সম্পূর্ণ আপনার উপর নির্ভর করে। তাহলে দুটোই পেতেনা? আগে মানুষ টাকে কাছে টেনে নিতে শেখো। ” অহন সার্ট প্যান্ট ঠিক করে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে আসে অফিসের বাইরে। সে নিয়তিকে মেনে নেয়, সে যানে সে যা করছে, সেটা আগে থেকেই নির্ধারিত তবে সেই হিসেবে মানুষ তো পাপ করেই না। এসব সে কি ভাবছে, এখন তো তাকে তার নিয়তি একদিকেই যেতে বলছে। তাকে খুজে বার করতেই হবে।

এই অনাথ আশ্রমেই উজানকে ড্রপ করে অহন। সে প্রথম বার ভিতরে ঢুকলো। আশ্রম একেবারেই হা হুতাশ ছেলে মেয়েদের জন্য সেখানে অমন রাজপুত্রের আগমনে বেশ সরগরম ফেলে দিলো। ওখানে দু একজনকে জিজ্ঞেস করাতে ” তারা জানায় উজান সকালেই আশ্রম ছেড়ে চলে গিয়েছে। উজানের ঘরে ঝুলছে তালা। “

এ কি করল ও এরকম ভাবে হেলায় হারিয়ে ফেলল সব কিছু। বারবার ফোন করা সত্বেও একই কথা বলছে। ” this number is not valid. “

জগৎ সংসার অহনের সামনে বনবন করে ঘুরছে। তাকে তার প্রশ্নের উত্তর পেতেই হবে। আজ কিছুতেই অহন ভারত ছাড়বে না। একবার যাদবপুর ইউনিভার্স…….গাড়ী ছোটায় অহন। গাড়ী দাড় করিয়ে সে অফিস রুমে ঢোকে। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞাস করে ” উজান! উজান ত্রিবেদী। “

তারা জানায় ” ও সকালে এসেছিলো ফাইনাল ওয়ার্কশিট জমা দিয়ে। সার্টফিকেট নিয়ে গেছে। কাল ও চলে যাবে। “

– ” kindly বলতে পারবেন ফ্লাইটের টাইম!! “

– ” ohh its 8:00 pm “

গাড়ী চালাতে চালাতে সে ভাবছে কোন কুক্ষনে সে উজানকে বলেছিলো আর যোগাযোগ না করতে। আর ওই পাগলটা ঊফফ!! কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। সামনে কোলকাতার রাস্তাগুলো যে গোলকধাধা হয়ে উঠেছিলো, কোনদিকে যাবে? কেন যাবে? আদৌ ওই দিকে যাওয়া উচিৎ হবে কিনা এই সব বিবেচনা করা সত্তেও সে উদ্ভ্রান্তের মত গোল গোল ঘুরতে লাগল। তার সাথে বেহায়া ফোনকেও ছাড়ছে না বারবার ফোন করেই চলেছে। এসব কি হচ্ছে তার সাথে। কেন হচ্ছে তার সাথে আচ্ছা উজানের কি কোনো অস্তিত্ব আছে? তাহলে সে খুজে পাচ্ছে না কেন?

ছয় ঘন্টা আন্তাবড়ী ঘোরাফেরা করে শেষে বাড়ী ফিরে আসে অহন। নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে সোফায় এলিয়ে দেয়। সে দেখে সামনে সোফায় উজানের কাল্পনিক অবয়বব বসে আছে।

সে বলে ” এইসব পাগলামির কোনো মানে হয় উজান। তুমি জানো না আমি কাল যাব। “

– ” এত আমার ভিতরের তুই বলছিস। কিন্তু বড্ড ভয় হচ্ছে। কাল হয়তে আমাদের শেষ দেখাও হবে না। “

– ” কেন হবে না নিয়তির ওপর ছেড়ে দাও। গান শুনবে অহন? “

– ” তুই তো এখন আমার কল্পনা, আমার তো কোনো গান মনে নেই। “

অহন দেখল উজানের ওই কাল্পনিক অবয়বটাও ঊধাও হয়ে যায়।

অহন ফ্রেস হয়ে এসে আরো কয়েকবার ফোনে ট্রাই করে পেলো না। চোখ থেকে বিরহের জল গড়িয়ে পড়ে। প্রথম থেকে তার ভুল গুলো সে নিজেই ভাবতে শুরু করে।

কিন্তু এই ভাবনা বেশীক্ষনের জন্য স্থায়ী হয়নি। ও দেখল সেই উজানের অবয়ব তার পাশে এসে মাথা হাত বোলাচ্ছে।

অহন তাকে জিজ্ঞেস করে ” খুব রাগ হয়েছে না। এইটুকু বাচ্চা ছেলে তার এত রাগ।? “

– ” কেন রাগ কি শুধু কাকুদেরই হতে হয়।? “

অহন মৃদু হাসে,” আবার কাকু” আর মিলিয়ে যায় ভালো লাগার রাজ্যে। কাল তোর সাথে দেখা হবে উজান, অন্তত শেষ দেখা। হবে তো? “….

অহন সাতটায় ঢুকে পড়ে। এয়ার পোর্টে। ক্যালকুলেশন বলছে উজান এখোনও আসেনি। ও গেট ওয়ের কাছে ছোট্ট কফিশপে বসে। প্রথম চুমুক দেওয়ার সাথে সাথে জীবনে প্রথম বারের জন্য ওর ব্ল্যাক কফি সত্যিই তিতো লাগে। এ বোধ হয় শুধুমাত্র তার জীবনের বর্তমান সময় সাপেক্ষের জন্য। সে প্রথম থেকে ভাবে যে ডেস্টিনি তাকে কোথায় কোথায় হিন্টস দিয়েছিলো।

সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে মনে পড়ে অহন?

উত্তর ভেসে আসে ” মনে পড়ে ইডেন গার্ডেনে প্রথন উজান তোকে জড়িয়ে ধরল। সেদিন তুই প্রথম বুঝলি, হ্যা তুই পুরুষ। ভাব ও যদি না থাকত। তাহলে কোথায় থাকত এই সাহসী অহন। “

অহন জিজ্ঞেস করে ” এটা কি কোনো নারী দ্বারা হতে পারত না? “

– ” নিয়তিকে কখোনও প্রশ্ন করতে নেই। শুধু দেখতে হয়। আর তা ছাড়া দেখলাম তো নেহার সামনে একদম ঘেমে নেয়ে নিচ্ছিলি। তখনও তো এই উজানই সামাল দিলো। “

– ” তাহলে আমি কি সত্যিই সমকামী।? “

– ” প্রশ্নটার একটা অস্তিত্ব থাকত, যদিনা অহন লাইব্রেরীতে উজানের ওষ্ঠের স্বাদ নিতো। বা উজানের সঙ্গে সঙ্গম কালীন কোনো ফ্যান্টাসি না রাখত।”

-” তাও বারবার আমার মনে হচ্ছে কেন? যে পারব এর বিরুদ্ধে লড়তে।”

নিয়তি হাসে অহন হাসে তাহলে এয়ারপোর্ট এ কেন বাছা তুমি? অহন দূরে দেখে। অনির্দিষ্ট জীবনপথের দিকে।

উজান গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে আমরা সময় মত পৌছাতে পারব তো।?

– ” কি যে বলেন? এয়ারপোর্ট ফিল্ডের পাশ দিয়েই তো যাচ্ছি আমরা। “

– “ও এটাই। আচ্ছা! আগে কোনোদিন আসিনি তো। ” উজান নিজেকে ঠেলে দিলো সেই দূরাত্মিয়ের দাদুর ঠিক করে দেওয়া গাড়ীর সিটে। কাল তার সাথেই দেখা করতে গেছিলো সে।যদিও আশ্রমে দেওয়ার পর আর কোনো খোজ রাখেনি সে। তাও তার কর্তব্য সে করে এসেছে। এখন অহনের কথা খুব মনে পড়ছে। আরতো কোনো যোগাযোগ রাখবে না বলেই দিলো। দীর্ঘশ্বাস পড়ল উজানের। হয়তো দোষ তারই ছিলো। কিন্তু তার জন্য তো অহনের চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে ছিলো সে গুলো কি মিথ্যে? অহন তো নিজেকে কিছুতে প্রতিরোধ করলনা। তাহলে।? উজানের চোখ ছলছল করে উঠলো। মনে হচ্ছিলো ইন্ডিয়ায় সত্যি সত্যি কেউ আপনজন পেল। কিন্তু সে কি করে জানবে? সে বালির বাড়ি বানাচ্ছে! সব দোষ তার। সব!

এখন যদি ও এয়ার পোর্টে গিয়ে দেখে অহন দাঁড়িয়ে আছে। হাসে উজান। এটা কি রূপকথা গল্প নাকি। ট্যাক্সি এয়ারপোর্ট এ ঢুকে গেছে। এসব রাস্তা তার কাছে নতুন। কি করে কি করবে সে কিচ্ছু জানেনা। বিদায় বিরহেও কেউ নেই। যা করতে হবে একা করতে হবে। শক্ত করল নিজেকে উজান। এইটুকু তে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না উজান। যুদ্ধ!

ট্যাক্সি থেকে নেমে জিনিষ পত্র নামানোর সঙ্গে সঙ্গেই সে গাড়ী উধাও। উজান এয়ারপোর্ট বিল্ডিং এর দিকে একবার চোখঘুরিয়ে নিলো। ঘড়ী দেখে উজান। সময় সাতটা কুড়ি।

অহন ভাবে আজকে তো একবারো ওকে ফোনে ট্রাই করিনি। একবার শেষ… অহন ফোন করল। আরে হ্যা রিঙটোন বেজে উঠলো। অহনের বুক ধক করে উঠলো। ও ঠিক শুনছে তো।? কিন্তু ধরছে না কেন।?

মাথাটা এদিক ওদিক ঘোরাতে লাগে দুশ্চিন্তায়। ঘাড়ে মটাস মটাস শব্দ করে ও যেই পিছনে ঘুরলো। যেন কোলকাতা শহরটা গোটা নড়ে উঠলো। চারপাশে আর কিচ্ছু নেই এত মানুষজন হইহুল্লোড় সব ক্ষনিকে নিস্তব্ধ হয়ে যেন উবে গেলো। অহন শুধু দেখতে পেল সেই বিড়াল চোখ দিয়ে ওই উজান নামের ছেলেটা মাত্র হাত দশেক দূরত্বে দাঁড়িয়ে হা করে তাকিয়ে রয়েছে, দোতালার দিকে।

চোখের জল বাধ ভাঙ্গলো। আর কিছুমাত্র সময়ের মধ্যে অহন একদম সামনা সামনি।

-“উজান” ডাকে অহন।

উজান সামনে অহনকে দেখেই হা করে তাকিয়ে ছিলো। অপ্রত্যাশিত ভাবে অহন তার জলন্ত চোখদুটো দিয়ে করুন ভাবে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে। কোনো সাড়া নেই। নেই শব্দ।

হঠাৎ সজোরে একটা থাপ্পড় এসে পড়ে উজানের গালে। উজানের চোখ থেকে জল ছিটকে পড়ে কোনো অনির্দিষ্টে। এক গালে হাত দিয়ে সে আবার তাকিয়ে থাকল অহনের দিকে। অহন জড়িয়ে ধরে উজানকে সমস্ত জাজমেন্টাল লোকেদের সামনে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলে ” এই টুকু পুচকে ছেলে এত রাগ, কোথায় রাখিস, ওটাও তো বোধ হয় এত বড়ো হয়নি, যত টা রাগ তুই আমার ওপর করে আছিস। “

কেঁদে দিলো উজান এইবার ” কেন তুমিই তো বললে আর যোগাযোগ করতে না। “

অহন উজানের চোখে চোখ রেখে বলে “এই তোর ম্যাচুওরিটি, এই বোধ? আমাকে এই টুকু চিনলি তুই। আর ভালোওবেসে ফেললি।? “

উজান কাদতে কাদতে বলে ” কিন্তু তুমি তো আমায় হেট করো বললে। বললে তুমি…. “

অহন আলতো করে চেপে ধরল উজানের নরম ঠোট দুটো। বলতে দিলো না বাকি টুকু। নিজে বলল “I’m still not gay কিন্তু আমি অবশ্যই একটা জিনিষ। তুই জানিস সেটা কি? “

উজানে ঠিক পাঁচ বছরের ছোট্ট বাচ্চাদের মত মাথা নাড়ায়। সত্যি সে এখনো অনেক ছোট এই সমাজ, রীতিনীতি, মানুষের মন বোঝার জন্য।।

অহন ম্লান হাসে জড়িয়ে ধরে গায়ের জোরে আরও একবার উজানকে। বলে ” ওসব ফালতু আইডেন্টিটি তে আমি বিশ্বাস করি না। আর তুইও করবি না। আমি শুধু জানি, আমি উজানের অহন। “

ওয়েদার পরিষ্কার, অস্বস্তিকর গরম নেই। প্রতিবেশ একদম যেন নতুন ভাবে মেতে উঠলো। একটা মনখারাপের যে হাওয়া শহরকে গ্রাস করছিলো সেটা আর তার করা হলো না। উজান গেট ওয়েতে ঢোকার মুখে বলল ” so I’m going। কিন্তু….. “

– ” চল পালা। আর নতুন উজান হয়ে তবেই ফিরবি। আর ওদিক কার ছেলেদের থেকে সাবধান। ওদেরকে দেখে আমাকে ভুলে যাস না আবার। “

উজান ম্লান ভাবে তাকিয়ে ছিলো। শুধু দেখছিলো অহন নিদারুন অভিনয় করে যাচ্ছে। শুধুমাত্র তার জন্য।

– ” আর হ্যা আমি টাকা পাঠাবো থাকা খাওয়া নিয়ে একদম কোনো চিন্তা করবি না। একদম কোনোরকম চিন্তা না। ” উজান আর ঘুরে তাকায় নি। চোখের জলে যে সমস্ত শরীর ভিজে যাচ্ছে সেটা সে অহনকে লুকিয়ে চলে যাচ্ছে। আর একবার যদি অহনের ওই চোখের দিকে সে তাকায় তার আর যাওয়া, নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ অহনের স্বপ্ন পূরন করা হবেনা। তার জন্য এখানে কেউ আছে যার জন্য সে ফিরে আসবে। “

সময় আর আবহাঅয়া স্বাধীন তারা পারে মানুষের জীবন কে একদম গুড়িয়ে দিতে। তার প্রেক্ষিত পরিবর্তন করতে। কিন্তু পারেনি অহনকে পরিবর্তন করতে। কেননা, অহন আজও সেই জং ধরা রাস্তা দিয়ে হাটে, আর প্রতিদিন মাটির খুড়ে চা খায়। বাবুঘাট পার্কে গিয়ে সেই বেঞ্চটায় নিজের শরীর এলিয়ে দেয়। তাতে যে উজানের ছোয়া লেগে আছে। সে দেখতে পায়। উজানের অবয়বব তার পাশে হাটছে। অহন তাকে বলে – ” কেমন আছিস? “

– ” ভালো তুমি? “

– ” এই তো চলে যাচ্ছে। তুই নেই জীবনের সুরটাই হারিয়ে গেছে। “ম্লান হাসে অহন।

– ” আরতো কটা দিন। ঠিক কেটে যাবে, আমি ফিরে আসব। গান শুনবে।? “

অহন পার্কের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকে আর গান ভেসে আসে।

” ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে –

আমার নামটি লিখো।

তোমার মনেরও মন্দিরে।। “

হাওয়া দেয়। অহনের চোখ বন্ধ হয়ে যায়। সে আবার হারিয়ে যায় উজানের গানে,সুর ছুয়ে যায় তার শরীরের প্রত্যেক যায়গা, সে তার অস্তিত্ব টের পায় উজানের সুরের কল্পনায়। । কারন সে যানে,প্রতিটা ক্ষনে উপলব্ধি করে, তার ভালোবাসায় রয়েছে শুধু ‘আমি উজানের অহন। ‘উজানের সেই কাল্পনিক অবয়ব অহনের কাছে এসে আলত গোলাপি ঠোট ছুয়ে বলে ” হ্যা তুমি শুধু উজানের অহন।” হাওয়া অহনের চুলে বিলি কেটে দেয়। অহনের ঠোটে ফুটে ওঠে হাসি। উজান খিলখিল করে হেসে দেয়।

__সমাপ্ত____সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.