দ্বিরাগমন


লেখকঃআনন্দ
উৎসর্গঃচন্দ্রমুখী
[অদ্ভুত হলে সত্য যে আমি এই গল্পটা শরৎচন্দ্রের সৃষ্টি চন্দ্রমুখী চরিত্রকে উৎসর্গ করেছি।কারন বিশেষ কিছুই নয়।শুধু এই চরিত্র আমার সবচেয়ে প্রিয় তাই……]
এক.

আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে কিছুক্ষনের জন্য থেমে গেল শুভ্র।কাজের ব্যস্ততা এত বেশি যে নিজের চেহাড়াটাও ঠিক করে দেখার সময় পায় না।রিক্তার সাথে বিয়ের আজ তিন বছর হলো।দেখতে দেখতে যেন পেরিয়ে গেল তিন বছর।রিক্তার সাথে তার কলেজে প্রেম।হুম প্রেমই বটে।রিক্তার জন্য সে পাগল ছিল না।রিক্তাকে তার কেন ভাল লাগত সে জানে না।বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেই প্রেমটা করেছিল অবশ্য।কিন্তু সময়ের সাথে রিক্তা সত্যি তার আপন হয়ে গেল।তারপর পরিণয়।রিক্তার ঠোট তাকে সেভাবে কখনো আকৃষ্ট করত না।তবে সে ভাল মেয়ে।রিক্তা গালের লাল আভা তার চোখে চমক দিত না।তবে রিক্তা গুনবতী বটে।কিন্তু কেন রিক্তার প্রতি তার টান তেমন নেই সে বুঝে উঠতে পারে না।
তার স্কুলে নবমে পড়ার সময় একটা ছেলেকে দেখত সে।নিচের ক্লাসে ছিল।ওর হাসিটা খুব ভাল লাগত।তার ফর্সা মুখে খুচা খুচা দাড়ি বেশ সুন্দর দেখাত।এই কথা বলার কারন হল কৈশরে শুভ্র একটু বদলে গিয়েছিল।সেই ছেলেকে দেখলে তার কেন ভাল লাগত সে জানত না।কেন ও বার বার তাকে দেখত তাও জানত না।শুধু জানত ভাল লাগে।একটা ছেলেকে কি ভাল লাগতে পারে না আরেকটা ছেলের?কিন্তু তার তো মেয়েদের পছন্দ।সে কি সমকামি?কলেজে এসে তার রিক্তার সাথে পরিচয় প্রণয় ও শেষ পরিণয়।কিন্তু সেই একটা প্রশ্ন আজও তাকে খুড়ে খুড়ে খাচ্ছে।কেন সেই ছেলেকে ভাল লাগত।সে তো সমকামি নয়।যতই সে চেষ্টা করে ভুলার ততই যেন এই প্রশ্ন আরো ঝেঁকে বসে।
কলিংবেল শুনে হঠাৎ আয়নার থেকে মুখ সরাল শুভ্র।রিক্তা মনে হয় এসে গেছে।বাইরে গিয়েছিল কেক আনতে।আজ ছুটি নিয়েছে তাই শুভ্র বাইরে যায়নি।রিক্তাও তাকে ডাকেনি।মাত্র ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে নিল।শুভ্র গিয়ে দড়জা খুলল।রিক্তা হাসি মুখে ভেতরে এল।একটু বেশি খুশি দেখাচ্ছিল তাকে।চোখে মুখে আনন্দ স্পষ্ট।রিক্তা পিছন ফিরে কাকে যেন ডাকল।
-অহি ভেতরে আয়।
একটু পর ধীর পায়ে শান্ত মুখে যে ছেলেটা ভেতরে এলো তাকে দেখে শুভ্র চমকে উঠল।চোখে চশমা মুখে ছোট ছোট দাড়ি।তার মধ্যে গোলাপি ঠোট কম্পমান।নিচের দিকে দৃষ্টি।এই তো সে।আজ এত বছর পর আবার শুভ্রর জীবনে এই চেহাড়া।একটুও বদলায়নি সে।এই সেই ছেলে।যার কথা সে সকালে ভাবছিল।যে তার জীবনে এক গোলক ধাঁধাঁর সৃষ্টি করেছে।যাকে ঘিরে শুভ্রর সকল প্রশ্ন।কিন্তু ও এখানে কেন।আর রিক্তাই বা ওর সাথে কেন।
-আয় ভেতরে আয়।আজ থেকে তুই এখানেই থাকবি।আমার বাড়ি থাকতে তুই অন্য কোথাও ভাড়া থাকবি কেনো?
-কিন্তু রিতু।
-কোনো কিন্তু নয়।
রিক্তা ছেলেটার হাত ধরে টেনে হলরুমে নিয়ে বসাল।তারপর শুভ্রর দিকে ফিরে বলল,”একদম পাগল বুঝলে।আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।অহি।তোমার স্কুলেই পড়ত।তুমি চেনো?”
-হ..না।না তো।
-ওহ।আচ্ছা এখন পরিচিত হয়ে নাও।অহি তোর দুলাভাই।আচ্ছা শুনো,ও আজ থেকে এখানেই থাকবে।বেচারার এখন থাকার কোনো জায়গা নেই।বলছে ভাড়া থাকবে।আমি নিয়ে এসেছি।ভাল করিনি বলো।
রিক্তা মেয়েটা অনেক কথা বলে।একবার সুযোগ পেলেই হল।আর কাউকে সুযোগ দেওয়ার নামই নেবে না।অবশ্য সে জানে শুভ্র কখনই মানা করবে না।
-অহি তোরা কথা বল।আমি কেক রেখে কিছু খাবার নিয়ে আসি।
রিক্তা চলে গেল।শুভ্র কিছুক্ষন অহিকে আপাদমস্তক দেখল।তারপর নিজের অজান্তেই যেন হাত বাড়িয়ে দিল।
-হাই।
-হ্যালো।শুভ্র।
অহি শুভ্রর হাতটা ধরল।এতক্ষনে মনে হচ্ছে ওর কথার সংকোচ কেটেছে।তার উপর বাড়ির কেউ যদি আগ বাড়িয়ে কথা বলে তবে তা কেটে যাওয়া স্বাভাবিক।অহি চোখ তুলে তাকাল।বড় বড় চোখে ঢেপঢেপ করে চেয়ে থাকা।কিন্তু মুখে একটা লজ্জার ভাব রয়েই গেছে।
-আপনি আগে আমাকে দেখেছেন কখনো।
কথাটা বলে শুভ্র মনে প্রাণে চাইছিল একবার সে হ্যা শব্দটা বলুক।কেন চাইছে সে জানে না।তবে শুধু মনে হচ্ছে বলুক।
-না তো।কেনো?
-নাহ একই স্কুলের ছাত্র তো তাই জিজ্ঞাস করলাম।তা আপনার প্রফেশন?
-তেমন কিছু নয়।আগে গ্রামে একটা কিন্ডারগার্টেনে পড়াতাম।এখন বেকারই বলতে পারেন।তবে চারুকলা ইন্সটিটিউট এ ভর্তি হয়েছি।তাই এখানে আসা।
-ওহ আচ্ছা।
-হ্যা।তাই ভেবেছিলাম এখনও সাথে কিছু টাকা আছে।একটা মেছে বা ভাড়া বাসায় থাকব।তারপর কাজ খুজতে হবে।কিন্তু রিতুকে পেয়ে গেলাম।
-রিতু?
-রিক্তা।
-ওহ।ওকেই রিতু বলছো।সরি বলছেন।
-আপনি আমাকে তুমি করেই বলতে পারেন।
-তা পারি যদি তুমিও সেটা করো।আমার বয়সটা খুব বেশি মনে হয় কি??
এটাই তো শুভ্র চাইছিল।তাই তো ইচ্ছা করে তুমি বলেছে।সে জানে না কেন কিন্তু চাইছিল।এর মধ্যে রিক্তার ডাক শুনা গেল।

দুই.
ঘরে বসে ডায়রি লিখছিল অহি।কৈশরে তার চাহিদা বদলে যাওয়া থেকে এই বাড়িতে আসা।সব লিখে রাখে সে এখানে।রিক্তার সাথে এতদিন পর দেখা হওয়া।তারপর এ বাড়িতে প্রবেশ।সব কেমন নাটকিয় লাগে।তারপর তার লেখায় উঠে আসে শুভ্রর নাম।যাকে প্রথম দেখাতে ভাল লেগেছে তার।বার বার লিখতে গিয়ে শুভ্রর কথা চলে আসে তার মনে।
শুভ্রকে এত ভাল লাগছে কেন তার।তবে কি…নাহ ধুর।ও রিক্তার স্বামী।এসব কি ভাবছে সে।
কলমটা রেখে উঠে বিছানায় শুয়ে পড়ল অহি।আর লিখতে পারছে না।ধুর।এমন হয় নাকি।যতসব বাজে চিন্তা মাথায় আসছে।এমন সময় লেখা বন্ধ করে শুয়ে থাকাই ভাল।এসির বাতাস ঠান্ডা লাগছে তার।কিন্তু একেবারে বন্ধ করেও রাখতে পারছে না আবার কমাতে বাড়াতেও সে জানে না।রিক্তাকে বলবে??যদি শুভ্র কিছু মনে করে।যদি ভাবে কি ছোটলোককে ধরে এনেছে তার বউ।রিক্তা তো তাকে চেনে।বললে বড় জোড় এক গাল হেসে নেবে।কিন্তু….
তা ভাবুক যার যা ভাবার।তাতে কিছু আসে যায় না অহির।কিছুক্ষন ভেবে উঠে ডাইনিং এর দিকে এল সে।
শুভ্র বসে কফি খাচ্ছিল।অহি ডাকতে ডাকতে বের হয়ে এলো,”রিতু,রিতু।”
-ও বাসায় নেই।
কফি খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছিল শুভ্র।মুখ না তুলেই জবাব দিল।”ওহ আচ্ছা।”বলে অহি চলে যাচ্ছিল।শুভ্র মুখ তুলে বলল,”কিছু দরকার ছিল?”
-না মানে,দরকার…
-কি দরকার আমাকে বলা যায়?
অহি কিছুক্ষন ভাবল।বলবে নাকি বলবে না দুটানায় শেষে বলে দেওয়াটা শ্রেয় মনে হলো তার।
-আসলে আমার রুমের এসিটা।
-হু কি হয়েছে।বন্ধ হয়ে গেছে??
-না।আসলে আমার ঠান্ডা লাগছে।তাই কমাতে হবে।আমি তো….
-ওহ এই কথা?চল আমি দেখিয়ে দিই।
শুভ্র উঠে আগে চলল অহি তার পিছনে বাচ্চার মত চলতে লাগল।এখানে এসে এক সপ্তাহ হয়ে গেছে।তাই লজ্জাভাবটা কেটে গেছে প্রায়।কারন অহি বড় চঞ্চল ছেলে।তাই লজ্জা তার কিছু কমই।কিন্তু শুভ্রর কাছে এই সংকোচ কেন কে জানে।শুভ্র রুমে গিয়ে দেখল অহির টেবিলে একটা বড় পুরোনো ডায়রি রাখা।
-এটা তোমার?
-হ্যা আমার।
-কি লেখো এটাতে?
-আমার অন্যজগৎ।
বলে হাসল অহি।হাসিতে নৈরাশ্য নেই তবুও কেমন শুকনো হাসি মনে হলো।কিছু না পাওয়ার পরও আশা করে,তার স্বপ্ন দেখে মনে যে খুশি হয় তার হাসি।শুভ্র অহিকে দেখিয়ে দিল এসি বাড়ানো কমানো।চলে যাচ্ছিল হঠাৎ কি মনে করে যেন শুভ্র বলল,”তোমার আইডির নামটা কি?”
-অহিরাজ।
-এমন নাম কেনো।
-অহি মানে জানো??
-কি?
-সাপ।
বলে হেসে উঠল অহি।এর মধ্যে রিক্তা ফিরে এল।শুভ্র কিছু বলতে গিয়েও আর দাড়াল না।চলে গেল।


রাত্রে বিছানায় বসে ফোন চালাচ্ছিল শুভ্র।রিক্তা বাচ্চাদের মত পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছে।শুভ্র একবার তার দিকে তাকিয়ে দেখল।এই সেই মায়াময় মুখ।যাকে দেখে হয়ত প্রেমে পড়েছিল শুভ্র।রিক্তা চঞ্চলা বটে।তবে দুঃখ চেপে যায় সহজে।আজ তিন বছর তাদের কোনো বাচ্চা নেই।ডাক্তার দেখানো হয়েছে ঠিকি।এক বছর মেডিসিন নেওয়ার পরও কোনো কাজ হয়নি।শুভ্রর মা বাবা কেউই বেঁচে নেই।সুতরাং সে দিক থেকে চাপ আসার কোন পথ নেই।কিন্তু নারী হিসেবে মা না হওয়ার দুঃখ নারীকে নিজের কাছে অসম্পূর্ণ করে রাখে।বন্ধা নাম কেউই চায় না।শুভ্র কিছুক্ষন তাকিয়ে মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিল।তারপর ফোনে আবার মনযোগ দিল।অহির আইডি খুজছে সে।হঠাৎ একটা আইডি খুজে পেল সে।অহিরাজ।
প্রোফাইল লক।ওফফ।কি আজব।ছেলে মানুষের প্রোফাইল লকের কি আছে।অবশ্য প্রাইভেছি থাকতেও পারে।নিজের মনেই এমন হাজারটা কথা বলছে শুভ্র।এখন আর কিছুই করার নেই।রিকুয়েস্ট দিয়েছে।ছবিটা এত ছোট দেখাচ্ছে এটা অহি কিনা তা ও ঠিক নেই।নিউজফিড দেখতে দেখতে হঠাৎ নোটিফিকেশন আসল অহিরাজ তার রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করেছে।শুভ্র প্রায় বিদ্যুৎবেগে ওর প্রোফাইলে গেল।ঠিক তখনই একটা মেসেজ এলো।
-তাহলে রিকুয়েস্ট দিয়েই দিলে।
-অহি?
-হুম।আমি অহি।
-তোমার প্রোফাইল লক করা কেনো?
-হাহা মেয়েলী লাগছে?কিন্তু প্রাইভেছি তো সবার জন্য।আর আমার প্রোফাইল কিছুটা অন্য রকম তাই।
-কি রকম।
-ও কিছু না।
-মানে?
-প্রোফাইল চেক করেছো?
-না।
-করো না।হাহা।
-আচ্ছা আমরা কি বন্ধু হতে পারি।
-কেন নয় দুলাভাই।হাহা।
রাত বাড়ছে।শহরের কোলাহল কমেনি এখনও।এদিকে কিছু মনের আকাশ সবে রঙিন হতে শুরু করেছে।সে কি রঙে রাঙা হবে তা ভবিষ্যৎ এর গহীনে লুকানো।


ডাটা অফ করে শুয়ে পড়লো অহি।অনেক্ষন কথা হলো শুভ্রর সাথে।মিশুক বটে তা প্রথমেই বুঝেছে সে।কিন্তু কে জানে প্রোফাইল দেখে কি ভাবে।একবার মনে হয়েছিল এক্সেপ্ট না করতে।ওর রিলেটিভ কেউ নেই ওর লিস্টে।কিন্তু কেন যে শুভ্রকে বলে দিল নামটা কে জানে।যাই হোক।এত বছর পর নিজের পরিচয় জানার পর মানুষের প্রতিক্রিয়ার ভয় এখন আর কাজ করে না ওর।নিজেতে নিজে খুশি আছে সে।লোকের ভাল বলা মন্দ বলা এখন আর কোনো মাথাব্যথা নয়।

তিন.
অফিস থেকে আসার পর শরীর খুব ক্লান্ত লাগছে।তাই ফ্রেশ হতে যে উঠে বাথরুমে যাবে সেটুকু করতে ইচ্ছে হচ্ছে না শুভ্রর।একটু পর রিক্তা এসে তার পাশে সোফায় বসল।
-ক্লান্ত লাগছে?
-হুম।
-জুস দেবো?
-না।একেবারে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসব।
-তাই ভাল।আজ সারপ্রাইজ আছে।
-কি।
-বলব না।
-আরে বলো না।
-যাহ অমন হয় নাকি।
বলেই রিক্তা উঠে চলে যাচ্ছিল শুভ্র হাতটা টেনে বাকিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলো।
-শুভ্র লাগছে ছাড়ো।
-বলো আগে।কি সারপ্রাইজ।
-তা হবে না।বলে দিলে তো মজাই শেষ।
-আচ্ছা।দাড়াও তোমার হচ্ছে।
বলে শুভ্র একটা হাত রিক্তার কোমড়ে রাখল।তার পর মুখটা আস্তে আস্তে রিক্তা ঘারে রাখল।রিক্তা তখন থেকে”ছাড়ো” বলেই চলেছে।শুভ্র সেদিকে খেয়াল নেই।
“রিতু…”হঠাৎ একটা শব্দ শুনে শুভ্র রিক্তা দুজনেই ঠিক হয়ে দাড়াল।শুভ্র যেন রিক্তার চেয়ে বেশি লজ্জায় পড়ে গেল।বাড়িতে যে অহি রয়েছে সেটা তো ভুলেই গেছে।রিক্তা পালিয়েছে।কিন্তু হঠাৎ করে চলে আসায় যেন সবচেয়ে বেশি লজ্জায় পড়ল অহি নিজে।শুভ্র লক্ষ্য করল অহির নাক লাল টুকটুকে হয়ে গেছে।মনে মনে ভাবল অহি এত লজ্জা পাচ্ছে কেন।কিছুক্ষন নীরব থেকে শুভ্র বলল,”কিছু চাই অহি?”
-না মানে…
-রিক্তাকে তো?দাড়াও ডাকছি।
-না থাক।
-কেনো।
-আমি না ভুলে গেছি কেনো এসেছিলাম।
অহির মুখটা চুপসে গেছে।সে সত্যি গুলিয়ে ফেলেছে।শুভ্র আর হাসি আটকে রাখতে পারল না।অহি চোখ বড় করে শিশুর মত তাকিয়ে আছে।শুভ্র রাক্ষুসে হা করে হাসছে।হাসতে হাসতে সে পেটে ধরে সোফায় বসে পড়ল।কি আজব মানুষ।অহি আর দাড়াল না।
শুভ্র হাসছে আর ভাবছে অহি সত্যি বেচারা একটা ছেলে।


খেতে বসে শুভ্রর তো চক্ষু চড়কগাছ।একি এইসব রান্না কে করল।আজ তিন বছরে এ বাড়িতে এসব রান্না হয়নি।রিক্তা বেচারি গ্রাম্য রান্না পারেই না।কখনো শুভ্র করতেও বলেনি।সবার আগে যে জিনিসটা শুভ্র হাতে নিল তা হলো শুঁটকি মাছের ভর্তা।নাকের কাছে নিয়ে প্রান ভরে ঘ্রান নিল সে।চোখ বন্ধ করে এমন ভাবে ঘ্রান নিচ্ছিল যেন অমরাবতীর সুবাস।চোখ খুলে দেখল রিক্তা আর অহি হা করে তার দিকে চেয়ে আছে।শুভ্র একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
-কি হলো এভাবে কি দেখছো।
-তুমি ওটা ওভাবে শুকছো যেন কি না কি।
-তা নয় তো কি।কে বানালো।
-আমিই করেছি।
-তুমি কোথায় শিখলে।
-অহি বলে দিয়েছে।আমার জন্যও করেছি।শিং মাছের ঝোল।প্রান যাচ্ছিল এর জন্য।
অহি হতবাক হয়ে ওদের মুখের ভঙ্গিমা দেখছিল।ওদের দেখে মনে হচ্ছে কোনো গুপ্তধন পেয়েছে।কিন্তু ও তো এগুলো প্রতিদিন খায়।বরং এখানে আসার পর ভুলতে বসেছিল।ভাগ্যিস রেসিপি জানা আছে।নইলে এদের মত কাতরাতে হত।ভেবেই হাসি পাচ্ছে তার।
খাবার শেষে অহি তার রুমে চলে এল।একবার শুভ্রকে দেখে মনে হচ্ছিল সে কিছু বলবে।কিন্তু বলেনি।কি বলতো,ধন্যবাদ জানাতো?কি জানি কি বলত সে।কিন্তু সে কেন এত ভাবছে।আচ্ছা শুভ্রর কি উচিত ছিল না ওকে একটা ধন্যবাদ জানানো।একবার কি ফোনে মেসেজ দিবে?নাহ থাক।দিয়েই বা কি বলবে।আর যাই হোক ধন্যবাদ নিশ্চয় চাইতে যাবে না।
এমন চিন্তা ভাবনা করতে করতে শেষে ডাটা অন করেই ফেলল অহি।অন করার সাথে সাথেই একটা মেসেজ এলো।ধন্যবাদ।শুভ্র পাঠিয়েছে।দুই মিনিট আগে এসেছে।শুভ্র একটিভ ছিল দুই মিনিট আগেই।তাহলে কি সে ধন্যবাদ জানাতেই এসেছিল? কি কাকতালীয় ব্যাপার।হ্যা কাকতালীয় বটে।ভাবতে ভাবতে একটা স্বাগতম লিখে ফেসবুকে ঢুকে গেল অহি।প্রায় দুই ঘন্টা পর যখন সবে অহি ডাটা অফ করতে গেল তখন মেসেজ এলো শুভ্রর।অনেক কথা বলল শুভ্র।কিন্তু তার মানে ছিল এই যে শুভ্র অহির প্রোফাইল চেক করেছে।আর সে কিছুটা শক্ড।অহি প্রথমটাতে একটু ঘাবরে গেলেও সব শেষে নিজের আসল পরিচয় জানিয়ে দিল।তারপর শুভ্র অনেক্ষন কিছু লিখার চেষ্টা করছিল সে দেখছিল।কিন্তু উত্তর আসেনি।অহি ডাটা অফ করে শুয়ে পড়ল।


সকালে ঘুম ভেঙে রাতের কথা মাথায় আসতেই কিছুটা চিন্তিত হয়ে গেল অহি।সে কি ঠিক করল সব বলে।শুভ্র কি এরপর ওর সাথে আগের মত কথা বলবে।সামনে পেলে কি এড়িয়ে যাবে?আচ্ছা তাকে এটা জানার পর এ বাড়িতে থাকতে দেবে তো।
“অহি,তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়।কথা আছে।”নিচে থেকে রিক্তার গলা শুনে হঠাৎ গলা শুকিয়ে এলো অহির।এর আগেও তো তাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।তাহলে সে কিসের ভয় পাচ্ছে।মানুষ জানাজানি হওয়ার ভয়?না।সে অপমানকে ভয় পায়।খুব ভয় পায়।
“অহি নিচে আয়।”রিক্তার ডাকে হুশ হলো তার।উঠে ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকে গেল সে।

চার.
“কি হয়েছে রিতু।এসব ব্যাগ এখানে কেনো।”অহির কথা যেন আটকে যাচ্ছিল।শুভ্র তখন থেকে চুপচাপ দাড়িয়ে আছে।ওর মুখের গাম্ভীর্য দেখে বুঝার উপায় নেই যে কি হয়েছে।
-আমি চলে যাচ্ছি।
-কোথায়।
-বাবার ফোন এসেছিল।মা দেখতে চাইছে আমাকে খুব।তাই যাচ্ছি।
-কি হয়েছে চাচির।আমি আসার সময় তো ভালই দেখে এলাম।
-আরে না তেমন কিছু না।আমি যাচ্ছি এমনি।অনেকদিন হল যাই না।তাই হয়ত মা দেখতে চাইছে।
শুভ্র এতক্ষনে মুখ খুলল।”আচ্ছা রিক্তা তোমার বাড়ি আর অহির বাড়ি কি একই গ্রামে।”
-হুম।ক্লাস এইটে ওর মামা বাড়ি চলে যায় ও।তোমার গ্রামে।
-ওহ।
শুভ্র আবার চুপ হয়ে গেল।রিক্তা চলে গেল কিছুক্ষন পর।শুভ্র তাকে দিতে স্টেশনে।অহির ভিতর ধুকপুকানি কমে এলো।কিন্তু শুভ্র চেহাড়াটা দেখে তার কেমন যেন মনে হতে লাগল।আচ্ছা আজ তো সে একটা আতংকে আছে তাই এমন ধুকপুক করছে বুকে।কিন্তু প্রথমদিন শুভ্রকে দেখে এমন হয়েছিল কেনো।কি হলো তার।বার বার মাথায় কেন একই কথা আসছে।শুভ্র তো অন্য কারোর স্বামী।কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে সে নিজের রুমে চলে এলো।ডায়রিটা খুলে লিখতে বসল সে।আজ সে কি লিখছে সে তা জানে না।শুধু জানে সে আজ কিছুই লুকাচ্ছে না।কিছুই ঢাকার চেষ্টা করছে না।কোনো সত্য থেকে মুখ ফিরাচ্ছে না।একটানা লিখেই যাচ্ছে।অনেক্ষন লিখার পর ডায়রিটা বন্ধ করে খাটের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল অহি।শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
দড়জায় শব্দ হওয়াতে সোজা হয়ে উঠে দাড়ালো সে।”শুভ্র।এসো ভিতরে এসো।”শুভ্র কিছুক্ষন নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে ভেতরে এলো।কি বলবে বুঝতে পারছিলো না শুভ্র।একটা চেয়ার টেনে বসে কিছুক্ষন হাত কচলাতে লাগল।তারপর ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,”তুমি গে?”
অহি একটু চমকে উঠল।কিন্তু মুখের ভাবান্তর হলো না।বিছানায় বসে নিচে তাকিয়ে বলল,”হ্যা আমি গে।”
-তুমি ছেলেদের পছন্দ করো?
-তাই নিশ্চয় গে বলা হয়।
-তুমি যে আমাকে বলে দিলে।তোমার ভয় করছে না?
অহি কিছুক্ষন চুপ করে রইল।তারপর মাথা নাড়ল,”না লাগছে না।”
শুভ্র তখনও নিচে তাকিয়ে।”তোমার বাড়ির লোক জানে?”
-বাড়ির লোক?আমার তো কেউ নেই।চাচা চাচির সাথে থাকতাম।কয়েক বছর তোমাদের গ্রামে ছিলাম।মা মারা গেছেন অনেকদিন।
-তোমার ভয় করে না।
-লোকলজ্জার কথা বলছো?সে আমার সেদিনই চলে গেছে যেদিন আমি নিজেকে জেনেছি।
বলতে বলতে অহি উঠে জানালার কাছে বসল।আবার বলল,”খুব কষ্ট হয়েছে জানো?নিজেকে চিনতে।নিজেকে জানতে।তার চেয়ে বেশি নিজেকে মানতে।অনেক লড়াই করে মেনে নিয়েছি।এখন আর কিছুই ভয় করে না।”
শুভ্র এবার উপরে তাকাল অহির দিকে।বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখ দুটো ছলছল করছিল।অহি নিজেকে সামলে বলল,”তুমি চাইলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।আমার কোনো সমস্যা নেই।আমি চাইনা আমার জন্য অন্যের সমস্যা হোক।”
-নাহ।তুমি যাবে না।
শুভ্র উঠে দাড়ালো।অহি হা করে বাচ্চাদের মত শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আছে।চোখে পানি।
-অহি তুমি আগে আমাকে দেখেছো?
অহি মাথা নাড়ল।সে দেখেনি।আবার নিচে তাকাল সে।
-আমি দেখেছি।রোজ দেখতাম।
কিছুক্ষন দুইজনই চুপ।তারপর শুভ্র চলে যাচ্ছিলো হঠাৎ থেমে বলল,”তুমি যাবে না।”থেমে আবার বলল,”আমাকে কেমন লাগে?”
অহি আবার শুভ্রর দিকে তাকালো।কি বলছে শুভ্র।শুভ্র কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চলে গেল।অহি উত্তর দিল না।কিন্তু সত্যি কি সে উত্তর জানে না?সত্যি কি সে শুভ্রর প্রতি আসক্ত নয়।তাহলে ডায়রিতে এতক্ষন শুভ্রর ব্যাপারে কি সে মিথ্যা বলছিলো?সে জানে না।
পাঁচ.
কাল সারাদিন অহি কোথায় ছিল কে জানে। শুভও বাসায় ছিল না।শুভ্র আসতে প্রায় নয়টা বেজে গিয়েছিল।অহিকে ডায়নিং-এ দেখল।তারপর ঘরে চলে এলো।অহি তাকিয়ে ছিল।কেউ কোনো কথা বলেনি।আজ সকালে শুভ্র একবার উঠে বেলকনিতে গেল।রিক্তার কথা মনে পড়ছে।বাড়িটা ফাঁকা লাগছে ওকে ছাড়া।সুঠাম দেহে এটে বসা গেঞ্জি আর পাজামাতে দারুন দেখাচ্ছে শুভ্রকে।হাত মুখ ধুয়ে এভাবেই ব্রেকফাস্ট করতে বসে গেল সে।রুটিতে জ্যাম লাগাতেই হঠাৎ মনে হলো কাল রাতে অহি জেগেছিল।খেয়েছিল নাকি তা ও জিজ্ঞেস করা হয়নি।এখানেই বসেছিল।একবার কি জিজ্ঞেস করবে?কিন্তু ও হয়তো ঘুমাচ্ছে।থাক পড়ে জিজ্ঞাসা করা যাবে।
“শুভ সকাল।”অহির কথায় ফিরে তাকালো শুভ্র।মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে আজ আগ বাড়িয়ে কথা বলার খুব ইচ্ছা হয়েছে জনাবের।যা সে কখনো করে না।কারন এ বাড়িতে আসার পর থেকে এই প্রথম অহির মুখে শুভ সকাল শুনছে শুভ্র।একটু হেসে জবাব দিল শুভ্র,”শুভ সকাল।নাস্তা করে নাও এসো।”
অহি এসে একটা চেয়ার টেনে বসল।শুভ্র কিছুক্ষন ইতস্তত করে জিজ্ঞাস করেই ফেলল।
-কালকে খেয়েছিলে?
অহির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।সে খায়নি শুভ্র কি করে জানলো।
-কি হলো খাও নি?
-না।
-কেনো।
-এমনি ইচ্ছে ছিল না।তাই শুয়ে পড়েছিলাম।
তারপর আর কোনো কথা হলো না।শুভ্র খেয়ে উঠে চলে গেল রুমে।অহি কিছুক্ষন ওদিকে তাকিয়ে ছিল।কি অপরূপ লাগছিল শুভ্রকে।ঠিক যেন দেবদুত।সে উঠে গেল।রুমে এসে দড়জা আটকে দিল।
ডায়রিটা বের করে লিখতে বসল।লিখে চলছে,”আচ্ছা,ভালবাসা কি একবারই হয়।মানুষ কি পাত্র কাল ভেদে প্রেমে পড়ে।আমি কি কারো প্রেমে পড়েছি?
হয়ত পড়েছি।না না হয়ত না।সত্যি আমি প্রেমে পড়েছি।শুভ্রর প্রেমে পড়েছি আমি।আমি জানি এই নিষিদ্ধ প্রেমের পরিনতি নেই।আমি জানি সে রিক্তার স্বামী।কিন্তু তবু কেনো……
শুভ্র কি আমাকে ভালবাসে।কখনো কি বাসবে?আচ্ছা ও তো বললো ও আমাকে দেখত রোজ।আর কাল বলল ওকে আমার কেমন লাগে।হঠাৎ এই প্রশ্নের মানে কি?”
“অহি আমি যাচ্ছি।দড়জা লাগিয়ে দাও।”নিচে থেকে শুভ্রর গলা শুনে লিখা বন্ধ করে উঠে দাড়াল অহি।সে নিচে নামার আগেই শুভ্র বেরিয়ে গেল।অহি কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে দড়জা বন্ধ করে এলো।খুব ইচ্ছে হচ্ছিল একবার দেখতে শুভ্রকে।হঠাৎ কলিংবেল বাজল।অহি দড়জা খুলতেই হাসি মুখে দাড়িয়ে শুভ্র।
-ওয়ালেট ভুলে গেছি।

ছয়.
রিক্তা গেছে চারদিন হলো।শুভ্র অহি কেউই তেমন কথা বলেনি এর মধ্যে।একবার শুধু শুভ্র অহির রুমের সামনে গিয়েছিল কিন্তু কথা হয়নি।জড়তা যেন কমতে চাইছে না।
অহির অসহ্য লাগছে।এভাবে কথা না বলে একটা মানুষ কি করে আরেকজনকে এড়িয়ে যায়।সে তো এমন নয়।কিন্তু মুশকিল হলো সে নিজেও পারছে না জড়তা কাটাতে।তার ভয় হয়।সে শুভ্রর প্রতি ঝুকে পড়ছে দিন দিন।ভালবেস ফেলেছে তাকে।বাস্তবতা তার কাছে তুচ্ছপ্রায়।সে কল্পনার জগতে চলছে প্রতিনিয়ত।কিন্তু শুভ্র যে রিক্তার স্বামী।
অহি সারাদিন আর বের হলো না।ভাল লাগছিল না।সে নিজেই বুঝতে অক্ষম যে তার শরীর খারাপ নাকি মন।ঘরে এসে সে ছবি আকঁতে বসল।তুলির টানে টানে রঙের ফোঁটায় ফোঁটায় যেন সেই একই কথা তার মনে আসছে।শুভ্র কেনো তাকে এই কথা বলল।কেনো জিজ্ঞাস করল তাকে অহির কেমন লাগে।কিছুক্ষন থেমে আবার আকঁতে শুরু করল অহি।একটা অস্পষ্ট ছবি।যেটা দেখলে মনে হবে বাঁশি হাতে দাড়িয়ে মদন মোহন।চারপাশে আনন্দে ভেসে উঠা জীবকূল আর পরিবেশ।এ যেন সেই মুরলিধরের বাঁশির জাদু।


আজও বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে শুভ্রর।তখন থেকে টেবিলে বসে আছে অহি।খিদে পেয়েছিল তবুও খায়নি।প্রায় এক ঘন্টা হলো সে খিদে নিয়ে বসে।এখন আর তেমন কিছু বোধ হচ্ছে না।আসলে বেশিক্ষন খিদে নিয়ে বসে থাকলে খিদে মরে যায়।আরেকবার ঘড়ির দিকে তাকালো অহি।দশটা বেজে গেছে প্রায়।এত দেরি।এত দেরি তো শুভ্র করে না।একবার কি ফোন করে দেখবে?কিন্তু ও ফোন করলে শুভ্র কি মনে করবে?ঢাকা শহরে দশটা তেমন কোনো ব্যাপার না।হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল।দড়জা খুলে অহির শরীরে প্রাণ ফিরে এলো।শুভ্র এসে গেছে।কিন্তু ওকে এমন দেখাচ্ছে কেনো।থুম হয়ে দাড়িয়ে আছে।চোখ দুটো লেগে আসছে।কিছুক্ষন এভাবে দাড়িয়ে থেকে ভেতরে এলো শুভ্র।এসে সোজা সোফায় বসে পড়ল।অহির সাথে কোনো কথা বলল না।অহি দড়জা লাগিয়ে বলল,”হাত মুখ ধুয়ে নাও শুভ্র।আজ একসাথে খাওয়া যাক।”
-না আমি খেয়ে এসেছি।
শুভ্রর কথায় চমকে উঠল অহি।অদ্ভুত শোনাচ্ছে।অহি এসে পাশের সোফায় বসল।
-আজ দাওয়াত ছিলো কোনো?
-হ্যা ওই আমার এক ফ্রেন্ডের জন্মদিন।তাই ওখানে খেয়ে নিয়েছি।
বলতে বলতে পিছনের দিকে বেঁকে শরীর টানটান করে মাথায় হাত বোলাচ্ছিল শুভ্র।অহির সন্দেহ সত্যি প্রমান হলো যখন শুভ্রর মুখ থেকে গন্ধ লাগল।
-সরি।আসলে বন্ধুরা এমনভাবে ধরে বসল।তাই একটু…
-ইটস ওকে।
বলে উঠে যাচ্ছিল অহি।শুভ্র মুখ থেকে আবার বিশ্রী মদের গন্ধ আসছে।তবে মাতাল শুভ্র হয়নি।মাথাটা ঘুড়ছে হয়ত কিছুটা।”অহি শোনো।”
শুভ্রর কথায় দাড়িয়ে গেল অহি।
-আমার কাছে একটু বসো প্লিজ।
অহি ফিরে এসে বসল আগের জায়গায়।শুভ্র ওর হাতটা ধরে টেনে নিল।অহি বুঝতে পারছে শুভ্রর উপর প্রভাব পড়ছে।নেশা চড়ে যাচ্ছে তার।তাই সে বাধা দিল না।শুভ্র তার হাতটা দুইহাতে ধরে সোফা থেকে নিচে হাটু গেড়ে বসে গেল।
-সরি।
-ইটস ওকে।নো প্রবলেম।বন্ধুর কথায় খেয়েছো তাতে কি।আর তুমি তো মাতাল হও নি।
-না।এটার জন্য না।
-তবে?
-কালকের জন্য।
-কালকের জন্য?
-হ্যা।আমি তোমার ঘরের গিয়েছিলাম।
অহির ভেতর একবার ধক করে উঠল।কালকে ওর ঘরের দড়জা খোলা ছিল।আর ওর ডায়রিটা সারাদিন টেবিলের উপর ছিল।অহি পাথরের মত চুপ করে রইল।সম্মুখে অপরাধীর মত বসে থাকা শুভ্রকে কি বলবে সে বুঝতে পারছিল না।
-সরি অহি।
-কেনো?
-আমি…আসলে….
-আমার ডায়রি??
-হ্যা।আমি তোমার ডায়রি…..
কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ সজোরে শুভ্রর গালে একটা চড় বসিয়ে দিল অহি।ওর হাত কাঁপছিল।চোখ ক্রমশ লাল হয়ে ঝাপসা হয়ে গেল।একটু পর গাল বেয়ে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পরল।শুভ্র কিছুক্ষন চুপ ছিল।অহি উঠে দাড়াল।
-খাবার রাখা আছে।খেয়ে নিও।
বলে চলে যাচ্ছিল অহি।উপরে উঠে শুভ্র রুমের কাছে যেতেই হাত চেপে ধরল শুভ্র।পিছন থেকে হাত চেপে দাড়িয়ে আছে শুভ্র।

সাত.
“শুভ্র হাত ছাড়ো।”অহির কথায় হাতটা ছেড়ে দিল শুভ্র।অহি চলে এলো ঘরে।শুভ্র কিছুক্ষন সেদিকে দেখে আবার ওর পেছন পেছন ঘরে গেল।অহি ব্যাগ গোছাচ্ছে।
-কি করছো তুমি।
-প্যাক করছি।আমি কালই বাসা ছেড়ে দেবো।আজকের রাতটা থাকতে দাও।
অহি ফিরে তাকাল না।শুভ্র এবার ব্যস্ত হয়ে উঠল।
-অহি প্লিজ একবার আমার কথাটা শোনো।
-আমাকে ক্ষমা করো শুভ্র।আমি যা লিখেছে ওটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।
-অহি…অহি প্লিজ।তুমি আমার কথাটা তো শোন।
শুভ্রর মাথা তখনও কিছুটা ঘুড়ছে।অহির তার কাজের গতি বাড়ালো।”আমি তোমাকে ভালবাসি অহি।”হঠাৎ কথাটা শুনে হাত পা বরফ হয়ে এলো অহির।সে কি ভুল শুনলো?
পিছনে ঘুড়ে তাকিয়ে দেখল শুভ্র পাথরের মত নিচে চেয়ে দাড়িয়ে।চোখ ছলছল করছিল তার।অহি কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।শুভ্র আবার বলতে লাগল,”আমি তোমাকে ভালবাসি অহি।অনেক আগে থেকেই।তুমি এই বাড়িতে আসার পর থেকে আমি তা বুঝতে পারি।আমি তোমাকে স্কুলজীবনেই ভালবেসে ফেলেছিলাম হয়ত।কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি।এখানে তোমাকে আবার দেখার পর তা বুঝতে পারলাম।তারপর ওইদিন তোমার ডায়রিতে সব পড়েছি।আমি জানি তুমি আমায় ভালবাসো।তাহল….”
-এটা সম্ভব না।
শুভ্রকে শেষ করতে দিল না অহি।”তুমি রিক্তার স্বামী।ওই মেয়েটা তোমার বিবাহিতা স্ত্রী।আমি এখানে কেনো এলাম।না না।আমি এক্ষুনি চলে যাবো।”বলে অহি যা গোছিয়েছিল তা নিয়েই যেতে চাইছিল শুভ্র তাকে ঘুড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিল।অহি কান বেয়ে তার নিশ্বাস অহির ঘড়ে এসে লাগছিল।শুভ্র আস্তে করে নিজের নাকটা অহি ঘাড়ে ঠেকালো।
-তুমি যাবে না।আমার জীবনে তুমিই প্রথম ছিলে।তখন আমি বুঝতে পারিনি।কিন্তু আবার তোমার দ্বিরাগমন নিশ্চয় মিথ্যে বলছে না।আমি তোমাকে হারাতে চাই না অহি।প্লিজ যেও না।
অহি চোখ বন্ধ করে আছে।পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে আছে।শুধু তাদের দুজনের নিশ্বাস পড়ছিল অবিরাম।শুভ্র অহিকে ঘুড়িয়ে নিজের মুখের কাছে ওর মুখ তুলে ধরল।তারপর অহির চশমাটা খুলে ফেলে দিল।অহির নিশ্বাস ভারি হয় আসছিল।তার ঠোটের কাছে শুভ্রর নিশ্বাস ক্রমশ ঘন ও নিকটতর হচ্ছিল।
হঠাৎ একটা ধাক্কায় নিজেকে শুভ্রর থেকে সরিয়ে নিল অহি।
-না শুভ্র।এ কখনই সম্ভব নয়।আমি চলে যাচ্ছি।এক্ষুনি।
শুভ্র এবার আরো জোরে অহিকে টেনে বিছানায় ফেলে দিল।অহি বুঝে উঠার আগেই সে অহি বুকের উপর চড়ে গেল।অহি উঠার চেষ্টা করছিল।কিন্তু পারল না।শুভ্র আস্তে আস্তে তার ঠোট অহির ঠোটে ডুবিয়ে দিল।অহির হাত আবদ্ধ হলো শুভ্রর হাতে।অহি আর ছটফট করল না।শুভ্রর মুখে সেই মদের গন্ধ তার যতটা বিশ্রী লাগছিল তার শরীরের গন্ধটা ততটাই নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল তাকে।হিতাহিত জ্ঞান তখন তার লোপ পেয়েছে।শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
অমরাবতীর সুধা বড়ই মায়াবী।মনে বাঞ্চা থাকলে মাঝে মাঝে হয়ত কাছে আসেও বটে।তবে সে মধু এমন।যা কাছে এলে মুখ ফিরিয়ে থাকার উপায় কারো জানা নেই।সে মধুতে মত্য মানব,মত্য দানব,মত্য দেবতা।সে তৃষ্ণার কুল নেই।সে পিয়াসের বাধ নেই।তার জন্য সকলে সব সময়ই উন্মুখ।এ অমৃতের বারীপাতেও মেলে না তৃপ্তি।লোভনীয় টান তার জন্য থেকেই যায়।সবসময় থেকে যায়।
আট.
কয়টা বাজে ঠিক জানে না শুভ্র।সকাল সকাল অবশ্য এত তাড়াতাড়ি তার ঘুম আপনি ভাঙে না।চোখ ঢলতে ঢলতে উঠে বসল শুভ্র।পাশে লেম্পের নিচ থেকে নিজের ঘড়িটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালো।কিন্তু পেল না।অগত্যা সামনের দেওয়ালের দিকে তাকালো।কিন্তু সেখানেও তো ঘড়ি নেই।এখান থেকে ঘড়ি সরালো কে।মাথাটা একটু চুলকাতে চুলকাতে শুভ্র অনুভব করল তার গায়ে বাতাস লাগছে।একি সে খালি গায়ে কেনো।তার কাপড় কোথায়।এদিক ওদিক তাকিয়ে নিচে দেখতেই তার প্যান্ট আর শার্ট দেখতে পেল শুভ্র।চমকে গেল সে।দ্বিতীয় বার চমকে উঠল পাশ ফিরে।এলোমেলো চুল কপালে পড়ে আছে।শ্বাস নেওয়ার সময় ঠোট দুটো কাঁপছে।আর খালি গায়ে ব্লেংকেট দিয়ে তার পাশে শুয়ে অহি।শুভ্র কিছুক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে থেকে ওর ঠোটের কাছে মুখটা এগিয়ে নিল।সামান্য কেটে গেছে।আলাদাভাবে ফুলে আছে সেটুকু।
-অহি।অহি।
শুভ্রর ডাকে চমকে ঘুম থেকে উঠে বসল অহি।কিছুক্ষন শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ছিল।তারপর মুখ ঘুড়িয়ে নিল।শুভ্র কিছুই বুঝতে পারল না।
-কি হয়েছে অহি।
-কাল তুমি নেশা করেছিলে?
শুভ্রর এবার সব মনে আসতে লাগল।হ্যা সত্যি তো।কাল সে নেশা করেছিল।কিন্তু সে এতটা ও মাতাল হয়নি যে তার কিছু মনে নেই।সব চোখের সামনে ভেসে উঠল।কিছুক্ষন চুপ করে থেকে অহির দিকে তাকাল শুভ্র।অহি এখনও নিচে তাকিয়ে।
-আই…আ’ম সরি।অহি।
অহির চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।কাল রাতে কি তাহলে শুভ্র সবই মাতাল অবস্থার জন্য বলেছে।শুভ্র মাথাটা একবার ঢলে নিল।তারপর হঠাৎ অহির কোমড়ে হাত দিয়ে ঘাড়ে নাক গুজে দিল সে।
-একচ্যুয়েলি আ’ম নট সরি।আই লাভ ইউ।আমার সব মনে আছে।
-কিন্তু শুভ্র…
শুভ্র অহির কথা শেষ করার আগেই তাকে আটকে দিল।
-আমি তোমাকে ছাড়া বাচঁবো না অহি।প্লিজ সব ভুলে আমাকে আপন করে নাও।আমি জানি রিক্তা আমার স্ত্রী।কিন্তু তোমার শরীরের গন্ধ আমার নিতে ইচ্ছা করে।এভাবে তোমাকে জড়িয়ে বসে থাকতে ইচ্ছা করে।ভালবাসবে আমায়?
অহি চুপ করে আছে।শুভ্র ওকে ঘুড়িয়ে নিতেই বিছানা কিছুটা উপড়ে উঠে এলো।সাদা নয় তবুও রক্তের ছোপ অনেকটা ছিল এবং খুব স্পষ্ট ছিল।শুভ্র একবার সেদিকে তাকিয়ে অহির দিকে তাকাল।অহি এবার জড়িয়ে ধরল শুভ্রকে।”ভালবাসি।সত্যি ভালবাসি।বেসে যাবো।”
-আই এম রেলি সরি অহি।আমি আসলে…..এমন হবে…..
অহি এবার শুভ্রকে থামিয়ে দিল।মাথা নাড়ল সে।শুভ্র বাচ্চাদের মত তাকিয়ে রইল।অহির ব্যথার অনুভব সে করতে পারে নি।কিন্তু অহির ভালবাসার গভীরতা তার মাপা হয়েছিল।


পনেরো দিন হয়ে গেল।রিক্তার কথা আজ হঠাৎ মনে হচ্ছিল শুভ্রর।পুরুষের মন বড় কঠিন হয়।যে রিক্তাকে সে চোখে হারাতো যাকে ছাড়া তার বাড়ি খা খা করত।তাকে মনে পড়েছে সেটা মনে করে অদ্ভুত লাগছে।অহি বাড়ি নেই।সন্ধ্যা হয়ে গেছে এতক্ষনে নিশ্চয় ফিরে আসবে।আজ অফিস থেকে আগে চলে এসেছে শুভ্র।অহির সাথে আজ কিছুক্ষন সময় নিজের করে কাটানোর জন্য।কলিংবেল বেজে উঠল।শুভ্র গোলাপটা হাতে নিয়ে দড়জা খুলে সামনে বাড়াতে চমকে গেল।
রিক্তা ঘরে ঢুকলো।পিছনে অহি।”আমার জন্য?”রিক্তার কথায় হেসে উঠল অহি।
-না তো।ওটা তো আমার জন্য।পাগল।ওয়েলকাম বেক।হাসল অহি।
নয়.
কখন থেকে ক্যাফেতে বসে আছে অহি।শুভ্র বলেছে আটটা নাগাদ চলে আসবে।আর পাঁচ মিনিট বাকি।অহি বার বার বাইরে দেখছিল।ওয়েটার একবার এসে জিজ্ঞেস করে গেল কিছু লাগবে কি না।কিন্তু কিছু খেতেই ইচ্ছে করছে না তাই বলল আরেকটু পর।ভাবতে ভাবতে আরেকবার ঘড়ির দিকে তাকালো অহি।ঠিক তখনই শুভ্র ঢোকলো।এসেই সামনে দাড়িয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,”সরি।”
অহি ভেবেছিল রাগ করবে।কিন্তু শুভ্রর মুখের হাসিটার দিকে তাকিয়ে আর পারল না।আর এমনিতেও ঠিক সময়ে এসেছে।বসতে বসতে শুভ্র ওয়েটারকে ইশারা করে অর্ডার দিল।তারপর অহি দিকে তাকিয়ে বলল,”আসলে রিক্তার শরীর খারাপ লাগছিল।তাই আসতে দেরী হলো।”
-সেকি।রিতুর শরীর খারাপ আর তুমি ওকে ছেড়ে চলে এলে?
-আরে এমন কিছু হয়নি।ও বললো ঠিক আছে।
-ও বললো আর তুমি মেনে নিলে।ওর কাছে থাকারটা জরুরী ছিল।
-আর আমাদের দেখা করাটা ছিল না?
অহি আর কিছুই বলল না।তার কাছে উত্তর নেই।ক্যাফে থেকে বের হয়ে তারা ফূটপাত ধরে হাটছিলো।অহির হাতটা বার বার শুভ্রর হাতে লেগে যাচ্ছিল।শুভ্র তা অনেক্ষন খেয়াল করছিল।এবার অহির হাতটা টেনে বুকের কাছে ধরল।
-হাত ধরতে লজ্জা কিসের।
-কি করছো শুভ্র।রাস্তায় সবাই দেখবে তো।
-দেখুক।আমার কি।
-ধুর ছাড়ো তো।কি যে কর তুমি নিজেই জানো না।
-আরো কিছু করবো??
-রাত হয়েছে।নয়টা বাজে।আপাতত বাসায় চলেন।
বলে হেসে উঠল অহি।”রিতু একা বাড়িতে।”
-তুমি সবসময় আমার চেয়ে বেশি রিক্তার চিন্তা করো।আজ এক বছর হতে চলল আমরা প্রেম করছি।যতবার বাইরে আসি ততবার তুমি রিক্তার চিন্তাই করো।আমাকে ভালই বাসো না।
-ধুর।বাসি তো।অনেক।
-তাহলে কে আগে?আমি না রিক্তা।
-রিতু।আমার রিতু।
বলে এগিয়ে হাটতে লাগল অহি।শুভ্র জায়গায় দাড়িয়ে গেল।”ওর জন্য সব করবে?”
-হ্যা সব করব।
হাসছে অহি।শুভ্র তখনও দাড়িয়ে।
-পারবে আমাকে ছেড়ে থাকতে।
অহি ফিরে দাড়ালো।ফিক করে হেসে বলল,”হ্যা পারব।যেদিন যাব সেদিন আমাকে আর খুঁজে পাবে না।”
-তাই নাকি।দাড়াও দেখাচ্ছি।
বলেই অহির পিছনে ছুটলো শুভ্র।কিন্তু অহিকে পায় কে।সেও পালালো।
আজ একবছর ধরেই একই প্রশ্নেই একই উত্তর বিনিময় হচ্ছে।তারা কেউই জানে না এই প্রশ্নোত্তর পালা নিছক মজা নাকি মনের কথা।


বাড়ি ফিরতে দশটা বেজে গেল।রিক্তা তাদের একসাথে দেখে অবাক হয়নি।মাঝে মাঝেই তারা একসাথে বাড়ি আসে।তার নিজের শরীর আজ খুবই খারাপ লাগছিল।তাই খায় নি কিছুই।অহি ঢুকেই বলল,”রিতু তোর নাকি শরীর খারাপ।খাসনি নিশ্চয়।”
-না।
-দেখেছো।বলেছিলাম খাবে না।যান মেডামকে খাইয়ে দিন।নইলে খাবে না।
তিন জনেই হেসে উঠল।
অহি উপরে চলে এলো।নিচে ডায়নিং-এ শব্দ হচ্ছে।কলকল হাসির শব্দ।শুভ্র খাইয়ে দিচ্ছে হয়ত রিক্তাকে।কিছুক্ষন দাড়িয়ে তা শুনলো অহি।তারপর মৃদু হাসি দিয়ে রুমে চলে গেল।
রুমে এসে তার মনে হয় দেখতে দেখতে এক বছর চলে গেলো।আজও রিক্তা কিছু জানে না।আজও শুভ্র আর সে প্রথম বারের মতই দুজনকে ভালবাসে।স্বপ্ন মনে হয় মাঝে মাঝে সব।যা যেকোনো সময় ভেঙে যাবে।

দশ.
রুমে বসে ছবি আকঁছিল অহি।নিচে রিক্তা কিচেনে।শুভ্র অফিসে গেছে।হঠাৎ রিক্তার ডাকে নিচে নেমে এলো অহি।নিচে এসে কিছুক্ষন সে বুঝলো না কি হয়েছে।কারন রিক্তা আসে পাশে নেই।একটু পর বাথরুম থেকে টাওয়াল দিয়ে মুখ মোছতে মোছতে বের হয়ে এলো রিক্তা।অহি কাছে গিয়ে ওর হাত চেপে ধরল।
-রিতু।তুই ঠিক আছিস তো?
-না রে।শরীরে একদম শক্তি নেই।কয়েকদিন ধরে খুব খারাপ যাচ্ছে শরীর।মনে হয় শরীফকে দেখাতেই হবে এবার।
-সে কে।
-আমার ডাক্তার।শুভ্রকে নিয়ে ওকেই তো দেখাতে যাই সবসময়।শুভ্রর খুব ভাল বন্ধু ও।
-চল।তুই কাপড় বদলে নে আমরা এখনি যাবো।
-কিন্তু এখন।
-তুই চল না।
রিক্তা আর কিছুই বলল না।আধা ঘন্টা রিকসা করে যাওয়ার পরই সামনে হসপিটাল।


শুভ্র বাসায় ফিরতে আটটা বেজে গেল।কখন থেকে কলিংবেল বাজাচ্ছে।কারোর আসার নাম নেই।দাড়িয়ে থেকে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ দড়জায় থাবা দিল শুভ্র।ঠিক তখনই দড়জা খুলে সামনে এলো অহি।হাতে চকলেট ভরে আছে।ঠোটের কোনে কিছুটা ভরে আছে।শুভ্রর দিকে তাকিয়ে এক ভুবনভোলানো হাসি দিল সে।তারপর পিছন ফিরে ডাকল,”রিতু,শুভ্র এসে গেছে।এবার তো বেরিয়ে আয়।দু ঘন্টা হলো রুমে গেছিস।”
বলতে বলতে সে দিকে চলে গেল।শুভ্র কিছুই বুঝল না।সোফায় গিয়ে বসতেই সামনে এসে দাড়ালো রিক্তা।পিছনে কেক হাতে অহি।লাল জামদানী সাথে মেচিং ব্লাইজ।কানে বড় বড় এয়ারিং।গলায় একটা ভারী পাথরের গহনা পড়ে রিক্তাকে ঠিক পাঁচ বছর আগের কলেজ পড়ুয়া রিক্তা লাগছে।সে দিকে কিছুক্ষন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল শুভ্র।তার মুগ্ধতা দ্বিগুণ হয়ে গেল যখন সে পিছনে দাড়িয়ে থাকা অহিকে দেখল।নীল পাঞ্জাবী পড়ে কেক হাতে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে অপরূপ লাগছে।শুভ্র আরো কিছুক্ষন হতবাক হয়ে রইল।তারপর উঠে দাড়ালো।
-আজ কারো জন্মদিন?
রিক্তা চুপ।জবাব দিল অহি।”না তো।আজ কারো জন্মদিন নয়।”
-তাহলে এসব?
-আজ খুশির দিন।তাই।
-কেনো কি হয়েছে আজ?
-রিতু তুই বল।আমি কেকটা রেখে গেলাম।আমার কিছু জিনিস আনতে যেতে হবে।এক ঘন্টার ভিতরে চলে আসবো।
অহি চলে গেল।রিক্তা এখনও নিচে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।শুভ্র এবার এগিয়ে এলো।কোমড় চেপে কাছে টেনে নিল রিক্তাকে।
-কি মিসেস।আজ হলো কি আপনার।
-কিছু না।
-আচ্ছা অনেক হেয়ালি করেছো।এবার বলো তো।আমি আর থাকতে পারছি না।
-আজ শরীফের কাছে গিয়েছিলাম।
-আচ্ছা।কি বললো।
-আমাদের স্বপ্ন পুরন হয়েছে শুভ্র।আমি প্রেগন্যান্ট।
শুভ্র প্রায় চিৎকার করে উঠল।”ওয়াট।আর ইউ সিরিয়াস।তুমি….আমি বাবা হবো।”
রিক্তা মাথা নেড়ে শুভ্রকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলল।শুভ্র শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রিক্তাকে।চোখ দুটো ভিজে আসল।আজ এত বছর পর পাগলির স্বপ্ন আশা পূরন হলো।তার নিজের অনুভুতি রিক্তার এই খুশির কাছে কিছুই না।রিক্তাকে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দাড়িয়ে রইল শুভ্র।
এগারো.
বাসা থেকে কিছুটা দুরে একটা পার্কে বসে ছিল অহি।বিশাল এই উদ্যানে এক কোনে একটা বেঞ্চিতে সে একা।এখানে এই অন্ধকার তার আজ খুব ভাল লাগছে।মন তার খারাপ নয়।কারন রিক্তা মা হবে শোনে তার কতটা খুশি লাগছে তা সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না।তবুও তার চোখে পানি।হয়ত খুশির অশ্রু।হয়ত বেদনার।কিন্তু কিসের বেদনা তার।শুভ্র তো ওর স্বামী।ও সব জেনেই শুভ্রকে ভালবেসেছে।তাহলে তার চোখে এই অশ্রু মানায় না।আচ্ছা সে এখন কি করবে?এখান থেকেই কি চলে যাবে কোথাও।কারন শুভ্র আর রিক্তার একটা সন্তান আসতে চলেছে।তাই সে চায় না সে তাদের মাঝে আসুক।সে কি পারবে শুভ্রকে ছেড়ে থাকতে।
এমন কত কত প্রশ্ন অহির মনে আসছে।উত্তর আসছে একটাই।তাকে শুভ্রকে ছেড়ে চলে যেতে হবে।কিন্তু কি করে যাবে সে।শুভ্র কি তাকে যেতে দেবে?আর রিক্তাকেই বা কি বলবে সে।আচ্ছা রিক্তা যদি কখনো জেনে যায়।তাহলে ও নিজেকে সামলাতে পারবে তো।না না।ও পারবে না।আর কোনো চিন্তা নয়।অহি মন ঠিক করে ফেলেছে।সে চলে যাবে।বহুদুর।
অহি উঠতে উঠতে হঠাৎ থমকে গেল।সামনে দাড়ানো মানুষটাকে দেখে চমকে যাওয়ারই কথা।সামনে শুভ্র দাড়িয়ে আছে।অহির চোখের অশ্রু বিন্দু এখনও চকচক করছে গালে।
-অহি।
-একি তুমি এখানে কেনো।রাত হয়ছে অনেক বাড়ি চলো।রিতু বেচারি একা বসে আছে আমাদের জন্য।
-দাড়াও অহি।
অহি থামল না।বরং তার চলার গতি বেড়ে গেল।শুভ্রকে রেখেই সে হাটতে লাগল।শুভ্রর সামনে না কাদার অভিনয় সে করতে পারবে না।
-অহি দাড়াও।
শুভ্র পিছন থেকে এসে অহির হাত চেপে ধরল।
-হাত ছাড়ো শুভ্র।
-কি হয়েছে তোমার।তুমি খুশি নও।
-না।আমি খুশি নই।
-অহি।আমি তোমার চোখ দেখে বুঝতে পারি তুমি খুশি কি না।
-আমাকে ছাড়ো শুভ্র।
-অহি…
অহি হাত মুচড়ে হাত ছাড়িয়ে নিল।সহসা শুভ্র তার হাত টেনে নিজের দিকে ঘুড়িয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল তার গালে।অহি কাঁদল না নড়ল না কোন প্রতিবাদ করল না।শুধু পাথরের মত দাড়িয়ে রইল।শুভ্রর চোখ লাল হয়ে উঠছিল রাগে।নিজের উপর নিজের রাগ হচ্ছিল।ইচ্ছা করছিল হাতটা ভেঙে ফেলে কিন্তু এখন এটা ভাবার সময় নয়।
-অহি কেনো করছো তুমি এমন।
বলে অহিকে জড়িয়ে ধরল শুভ্র।অহি তখনও ঠাই দাড়িয়ে।একটু পর আস্তে আস্তে তার দুটো হাত শুভ্রর পিঠে আবদ্ধ করল।
-আমি রিতুর জীবন ধ্বংস করতে পারি না শুভ্র।আমি তোমাদের মাঝে থাকতে পারি না।আমি পারিনা।
-কি বলছো এসব তুমি।আমি তোমাকে ভালবাসি।তুমি আমাকে ছেড়ে কোথায় যাবে।পারবে আমাকে ছেড়ে থাকতে?
অহি কিছুক্ষন চুপ করে রইল।তার পর আস্তে আস্তে শুভ্রকে ছেড়ে দুরে দাড়াল।”আমি চলে যাব।আর আসব না।না রিতুকে ধোঁকা দেবো, না তোমাকে দুটানায় রাখব।চিন্তা করো না।আমি বাচঁতে জানি।”
-আমার কথা ভাববে না?রিক্তার জন্য তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে?
অহি নিচ থেকে উপরে শুভ্রর দিকে তাকালো।চোখে অশ্রু ঠোটে হাসি।
-দরকার হলে তাই করব।
শুভ্রর মাথায় এবার রক্ত উঠে গেলো।”তুই পাগল হয়ে গেছিস?আমাকে ছাড়া থাকতে পারবি?”
-হ্যা।
-ঠিক আছে।আমি নিজে তোকে বাড়ির বাইরে রেখে আসবো।তার আগে আমাদের আর কোনো কথা হবে না।আমার কাছে রিক্তা আছে।তোর কাছে কে আছে।যাকে ভালবেসে তুই বেঁচে থাকবি।
অহি এবার হাসতে লাগল।পাগলের মত হাসছে সে।”আমার কাছে।আকাশ আছে।বাতাস আছে।চাঁদ আছে।”বলে আবার হাসতে লাগল।
বারো.
একমাস কেটে গেলো।রিক্তার সময় তিন মাসে পড়ল।এই একমাস অহি এখানেই ছিল।শুভ্রর সাথে আর কথা হয়নি।শুভ্র চেয়েছে কথা বলতে।কিন্তু সে সুযোগ দেয়নি।সে চায় না শুভ্রর রাগ কমে যাক।সে চায় না শুভ্রর সাথে তার ঘণিষ্টতা বেড়ে যাক।কারন সে এই এক মাসেরই অতিথি।ভাবতে ভাবতে জানালা দিয়ে তাকিয়ে শুভ্রর যাওয়া দেখছিল সে।বা হাতটা এখনও ঠিক হয়নি।এক মাস আগে ওকে চড় মারার পর কি করেছে তা অহি জানে না।শুধু দেখল পরের দিন তার হাতে ব্যাথা।ডাক্তার বলল দুটো আঙুলে মারাত্মকভাবে চাপ লেগেছে তবে ভাঙেনি।
-অহি খেতে আয়।
-আসছি।
রিক্তার ডাকে নিচে নেমে কিচেনে ঢুকে গেল অহি।আজ দুদিন হলো রিক্তা ওর সাথে ঠিক করে কথা বলছে না।রাগ করেছে মনে হয় না।তবে কেমন এড়িয়ে চলছে।টেবিলে বসে রিক্তার হাতটা চেপে ধরল।
-রিতু তুই আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিস কেনো বলতো।
-কোথায় এড়িয়ে চলছি।
বলে রিক্তা তরকারি আনার জন্য গেল।অহি উঠে তার পিছন পিছন গেল।রিক্তার হাত থেকে বাটিটা টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,”যাচ্ছিস তো।দুদিন আগেও তুই আমাকে উঠতে বসতে বাড়ি না ছাড়ার জন্য বলছিলি।”
-হ্যা।কেনো যাবি তুই।
-আমাকে বলতে দে।দাড়া তুই এখানে।তুই আমার চলে যাওয়ার কথা শুনে বাড়ি মাথায় করছিলি।আর এই দুদিন তুই আমার সাথে তেমন কথাই বলছিস না।তুই বলবি না আমি বলাবো।
-কিছু হয়নি বললাম তো।
-বলবি না?খা তুই।আমি গেলাম।
“তুই তোর ডায়রিতে সব লিখিস তাই না অহি।”কথাটা শুনে হঠাৎ থেমে গেলো অহি।রিক্তা দুইদিন আগে কি তাহলে তার ঘরে গিয়েছিল।আর ডায়রিটা কি ও পড়েছিল।
সেদিন অহি ডায়রিটা মাটিতে পেল।সে ভাবছিল শুভ্র ধরেছে।
-রিতু..
-খেয়ে নে।খাবার ঠান্ডা হলে আবার গরম করতে হবে আমার।
রিক্তা চলে গেল।অহি দাড়িয়ে রইল।


রাতে অহি খাবার খেলো না।ঘরেই বসে রইল।সকাল থেকে একটা কথা তাকে খেয়ে যাচ্ছে।রিক্তা কি তাকে ঘৃণা করছে।সে কি তাহলে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর চোখে ঘৃণিত।হয়ত বা।কিন্তু সেটা নিয়েও ততটা চিন্তা হচ্ছে না যতটা চিন্তা হচ্ছে শুভ্রকে নিয়ে।রিক্তা আর শুভ্র স্বাভাবিক আছে তো?রিক্তা কোনো অশান্তি করার মেয়ে নয়।তবে রিক্তা এই কথা জেনে গেছে জেনে শুভ্র ওকে অবহেলা করছে না তো।নাকি রিক্তা ওকে কিছু বলে নি।মনে মনে হাজার হাজার বার একটাই প্রার্থনা করছিল অহি।রিক্তা শুভ্রকে যেন কিছু না বলে।নয়টার দিকে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে হঠাৎ মনে হলো তার টাকার ব্যাগটা রিক্তার কাছে।সেটা ছাড়া তার চলার উপায় নেই।তাই অহি নিচে নেমে এলো।
কিচেনে গিয়ে নিজেকে অপরাধী লাগছিল অহির।কিছুক্ষন চুপ করে দাড়িয়ে থেকে মাটির দিকে তাকিয়ে অহি বলল,”রিতু।”
রিক্তা ঘুড়ে দাঁড়ালো।”অহি।কিছু বলবি?”
-হ্যা আমার টাকার ব্যাগটা তোর কাছে রয়ে গেছে।আসলে আমার প্যাকিং শেষ।
-খেতে আসলি না কেনো রাতে।
-খিদে নেই।মনে হয় এসিডিটি হয়েছে।তুই ব্যাগটা নিয়ে আয়।আমি কালই চলে যাবো।
-গোছানো শেষ?
অহি মাথা নাড়ল।রিক্তার দিকে তাকাল না।রিক্তা বাতাসের বেগে ঘরে চলে এলো।
তেরো.
দুনিয়া বড়ই রঙিন।মানুষ বড়ই বিচিত্র।যদি সবগুলো মানুষ একই রকম হতো তাহলে কি দুনিয়া এমন হতো?হয়ত না।
রিক্তা আলমারি খুলে ড্রয়ারে হাত দিয়ে কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে গেলো।চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।কেনো সে অহিকে যেতে দিচ্ছে।কেনো সে অহিকে আটকে রাখতে পারছে না।মনের এক কোনে এমন লাগছে যেন অহিকে যেতে দেবে না।কিন্তু অন্য কোন থেকে আওয়াজ আসছে উল্টো।অহির সামনে কাঁদতে চায়নি তাই সে চলে এসেছে ঘরে।কিন্তু এই অহিই তার সব দুঃখ সুখের সাথী ছিল।শুভ্র অহির ব্যাপারটা জানার পর থেকে একবারও তার অহিকে ঘৃণা করেনি।তবে কেনো সে অহিকে আটকাতে পারছে না।শুভ্রর কথা ভেবে।নাকি তার সন্তানের পিতার কথা ভেবে।
ভাবতে ভাবতে ব্যাগটা বের করে চোখ মুছে নিল রিক্তা।ডায়নিং-এ দাড়িয়ে অহি।তার হাতে ব্যাগটা দিয়ে হাতটা চেপে ধরল সে।
-খেয়ে যা।খালি পেটে অসুস্থ হয়ে যাবি।
-না কিছু হবে না।আমাকে শুভ্র বলেছিল স্টেশনে দিয়ে আসবে।
কথাটা বলে অহি চুপ করে গেল।রিক্তা তাকিয়ে আছে অহির মুখের দিকে।কেমন শুকনো লাগছে।
-কাল যাস না।কাল আমি থাকব না।বাড়ি যাবো।কাল শুক্রবার।আমি শনিবারে আসবো।রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
-কিন্তু রিতু..
-প্লিজ।আমার জন্য এটুকু কর।
অহি এবার মুখ তুলে তাকাল রিক্তার দিকে।সে দেখল দুটি ছল ছল চোখ তার দিকে তাকিয়ে।কলিংবেল বাজল।অহি দড়জা খুলল।শুভ্র এসেছে।অহি সেদিকে তাকাল না।ঘুড়ে রিক্তার দিকে তাকিয়ে বলল,”আমি রবিবারেই যাব।শুধু তোর জন্য থেকে গেলাম।খেয়ে নে।আমি জানি তুই খাসনি।তুই এখন অসুস্থ রিতু।”
আর কিছুই বলল না সে।সোজা উপরে চলে এলো।শুভ্র কিছুক্ষন দাঁড়াল।তারপর সে ও ঘরে চলে গেল।রিক্তা কিছুই খেলো না।


সকালে যাওয়ার আগে রিক্তা অহির সাথে কথা বলল না।শুভ্রকে ও কিছুই বলল না।শুভ্র ওকে নামিয়ে দিয়ে আসতে চেয়েছিল রিক্তা শুধু মানা করে দিল।আর একটা কথাও সে বলেনি।শুভ্র বুঝতেই পারছে না রিক্তার কি হয়েছে।অহিও রিক্তার সাথে কথা বলেনি।কেমন যেন লাগছিল দুজনকেই।রিক্তা চলে যাওয়ার পর অহি বেরিয়ে পড়ল।শুভ্রর খুব ইচ্ছা করছিল জিজ্ঞেস করতে কোথায় যাচ্ছে।কিন্তু অনেক্ষন ভাবার পর যখন সে অহির রুমে গেল তখন অহি বেরিয়ে গেছে।ইদানীং অহি তার মুখোমুখি হয় না।ইচ্ছা করেই সামনে আসে না তা শুভ্র জানে।শুভ্রর মাথা কাজ করে না এসব ভাবলে।কি দোষ তার।সে উভকামী এটাই তার দোষ?হয়ত বা এটাই।না হলে সে কেনো রিক্তাকে ভালবাসবে।বিয়ের পর তার মধ্যে কেন প্রশ্ন থেকে যাবে নিজেকে নিয়ে।কেন অহি তার জীবনে ফিরে আসবে।কেনইবা এসব হবে।সে জানে না।তার মাথায় এখন শুধু অহির নাম আসছে।যাই হয়ে যাক অহিকে সে যেতে দিতে পারে না।আজ রিক্তা বাড়ি নেই।আজ অহির সাথে কথা বলতেই হবে।

চৌদ্দ.
সন্ধ্যায় অহি বাড়ি এলো।শুভ্র দড়জা খুলে কিছু বলার আগেই অহি তাকে পাশ কাটিয়ে উপরে চলে গেল।আজ শুক্রবার ছিল।আজ তো সে কাউকে ছবি আঁকা শিখাতে যাওয়ার কথা নয়।তবে কোথায় গিয়েছিল অহি।শুভ্র উপরে উঠে দেখল অহির ঘরের দড়জা লাগানো।শুভ্র একবার চাইছিল ডাকবে।কিন্তু তা আর করল না।নিজের ঘরে চলে এল।খাবার সময় নিশ্চয় অহি নিচে আসবে।তখন না হয় শান্তিতে বসে কথা বলা যাবে।আজ একবছর অহির কাঁপা ঠোট সে স্পর্শ করে আসছে।তার রক্তিম গাল স্পর্শ করে আসছে।তার ঘাড়ের খাজে নাক ডুবিয়ে গন্ধ নিয়ে আসছে।কিন্তু আজ একমাস হল সে অহির মুখই দেখেনি।ভেতরে ভেতরে সে ছটফট করছে।অস্বস্তি বেড়ে উঠছে।পারছে না নিজেকে সামলাতে।


রাত আটটা বেজে গেল।শুভ্র নিচে ডায়নিং-এ বসে অপেক্ষা করছে।অহি আসেনি।শুভ্র অস্থির হয়ে উঠছে।আরো কিছুক্ষন বসে এবার সে উঠে গেল।সোজা উপরে গিয়ে অহির রুমে নক করল।অহি দড়জা খুলে দাড়াল।কোনো কথা বলল না।কিছুক্ষন নিচের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে রইল।তারপর নিচে তাকিয়েই পিছনে সরে নিজের বিছানায় বসে বইয়ে মুখ গুজে দিল।শুভ্র ভেতরে এলো।
-আটটা বেজে গেছে।খাবে চলো।
অহি বইটা রেখে কিছু ভাবল।তারপর সোজা কোনো কথা না বলে শুভ্রকে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে এসে ডায়নিং-এ বসে গেল।শুভ্র আসার আগেই সে নিজের খাবার বেড়ে খেতে শুরু করল।শুভ্র নেমে টেবিলে বসার আগে অহি খাওয়া শেষ করে ফেলল।তারপর আবার একইভাবে ঘরে চলে গেল।ঘটনার গতিবিধি বুঝতে শুভ্র কিছুটা সময় লাগল।শুভ্র খেল না।নিজের খাবার ঢেকে চলে গেল উপরে।
-অহি।
-হুম।কিছু বলবে?
-আমাকে ক্ষমা করে দাও।আমি ওইদিন তোমাকে মারতে…
-অন্য কিছু বলবে?
-তুমি যাবে না।তুমি কোথাও যাবে না।আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।
-শুভ রাত্রি।
শুভ্র এবার এসে অহির একটা বাহুতে ধরে টেনে তাকে দাড় করাল।অহি এবার শুভ্রর মুখের দিকে তাকাল।শুভ্র চোখ সে পড়তে পারছে।শুভ্রর মন সে বুঝতে পারছে।তাই একটা টানে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সে।শুভ্র এবার অহিকে ঘুরিয়ে অহির পিঠ নিজের বুকের কাছে চেপে ধরল।অহির ঠোট কাঁপছে।সে জানে কি হতে চলেছে।শুভ্রর ভারী নিশ্বাস তার ঘাড়ের নিকট আসতে লাগল।একটা হাত দিয়ে শুভ্র অহির চশমাটা খুলে নিল।তারপর নাক ডুবিয়ে দিল ওর ঘাড়ে।
-শুভ্র ছাড়ো।
-তুমি যাবে না বলো।আমাকে ছেড়ে যাবে না।
অহির একটা হাত পিছনে নিয়ে বাকিয়ে ধরল শুভ্র।আরেক হাতে অহির শার্ট খুলে ফেলল।
-শুভ্র ছাড়ো আমাকে।আমার লাগছে।
-তুমি তো চলে যাবে।তাহলে আমি।কেনো সুযোগ ছাড়বো।
-আহ।শুভ্র আমার হাতে লাগছে।ছাড়ো।
শুভ্র হঠাৎ একটা ধাক্কা দিয়ে অহিকে বিছানায় ফেলে দিল।অহি উঠে দাড়ানোর আগেই শুভ্রর শরীরের ভারে পড়ে গেল।
-শুভ….


সকালে কখন ঘুম ভেঙেছে বলতে পারে না শুভ্র।উঠে দেখল খালি গায়ে সে শুয়ে আছে কিন্তু অহি কোথাও নেই।সে উঠে গেঞ্জি পড়তে পড়তে নিচে গেল।না কিচেনে ও নেই।শুভ্র এবার নিজের ঘরে গেল।এখানেও নেই।কোথায় গেল অহি।ঘর থেকে বেরিয়ে আবার অহির ঘরে যেতেই দেখল অহি গোসল করে বেরিয়েছে।তাড়াহুড়োতে বাথরুমের কথা মনেই নেই।শুভ্র এগিয়ে গিয়ে অহির কোমড়ে হাত দিয়ে বলল,”সরি।কালকে আসলে…”
অহি আটকে দিল।শুভ্রর ঠোটে আঙুল দিল।অহির চোখ ছল ছল করছিল।মুখে মিষ্টি একটা হাসি টেনে বলল,”আমি তো চলেই যাব।একটু ভুল না হয় করেই ফেললে।”
বলে কোমড় থেকে শুভ্রর হাতটা সরিয়ে নিল।
-কিন্তু অহি..
-এটা সম্ভব না শুভ্র।এখানে থাকা সম্ভব না।
শুভ্র এবার রেগে গেল।এত কিসের তেজ অহির।সে কি থাকতে পারবে না?
-ঠিক আছে।যা ইচ্ছা করো।
শুভ্র চলে যাচ্ছিল অহি হাত টেনে ধরল।
-আমাকে কাল নামিয়ে দিয়ে আসবে না?তুমি কথা দিয়েছিলে।
শুভ্র হাত ছাড়িয়ে চলে গেল।
পনেরো.
রিক্তার মন আজ কেনো ভাল নেই সে নিজেই জানে না।তার তো খুশি হওয়ার কথা।তার স্বামীর কাছ থেকে অহি দুরে যাচ্ছে।তার স্বামী কখনো আর ওর কাছে যাবে না।কিন্তু শুধু কি এতটুকু ভাবনাতেই তার খুশি সীমাবদ্ধ।অহির কি হবে।দোষ কি শুধু অহির।তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় এই ছেলেটা কি তার কাছে কিছুই না?আচ্ছা সত্যি কি ভালবাসা দোষের কিছু।যদি না হয় তাহলে তারা তো কোন ভুল করেনি।ভাবতে ভাবতে রিক্তার চোখে পানি চলে আসে।হঠাৎ দড়জায় শব্দ শোনে সে নড়েচড়ে বসল।চোখের কোনার পানিটা মুছে নিল।
-অহি।আয়।
-না।না..মানে আমি চলে যাচ্ছি।
-ওহ।
রিক্তা বসেই রইল।অহি কিছুক্ষন দাড়ালো।তারপর বলল,”শরীর খারাপ?”
-না তো কেনো।
রিক্তা অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
-না।শুভ্র দাড়িয়ে আছে।আমি যাই?
-হুম।
অহি আরো কিছুক্ষন অপেক্ষা করল।তারপর আবার বলল,”আমি যাই।”
রিক্তা এবার বিছানা ছেড়ে দৌড়ে এসে অহিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।অহির চোখ থেকে পানি পড়ছিল।কিন্তু সে কোনো শব্দ করলো না।রিক্তা অহিকে দড়জার কাছে নিয়ে এলো।ছাড়তে ইচ্ছা করছিল না।কিন্তু একবার থেকে যা কথাটা বলতে গিয়েও সে থেমে গেল।অহি গাড়িতে বসল।শুভ্র আগে থেকেই বসে ছিল।


রাস্তায় আসতে শুভ্র কোনো কথা বলল না।অহির দিকে তাকালো না।বাইরে তাকিয়ে ছিল।অহি জানে সে নিজের কান্না লুকাচ্ছে।স্টেশনে এসে ব্যাগ গুলো নামিয়ে শুভ্র দাড়িয়ে রইল।অহির সাথে কথা বলল না একাবারও।অহি নিজেই এবার এল।
-শুভ্র।শুভ্র।কথা বলবে না আমার সাথে?
শুভ্র চুপ।অহি আবার বলল,”ভালবাসো আমায়?”
কথাটা শেষ করার সাথে সাথে অহিকে জড়িয়ে কেঁদে উঠল শুভ্র।
-যেও না প্লিজ।
-আমাকে যেতে হবে শুভ্র।আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই।রিক্তা আর তোমার জন্য এটা করতেই হবে।
-চলো আমারা পালিয়ে যাই।
-আর তোমার সন্তান।তোমার স্ত্রী অন্তঃস্বত্তা।
-আমি কিছু জানি না।তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না।
-রিতুকে ভাল রেখো।
অহির চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।তবুও মুখে নির্মম একটা হাসি টেনে সে শুভ্রর হাতটা নিজের হাতে নিল।একটা সীম তার হাতে দিয়ে বলল,”এটার আর কোনো দরকার নেই।আমাদের যোগাযোগ এখানেই শেষ।”
-অহি….
-আমাদের আবার দেখা হবে।আমি আবার আসবো তোমার কাছে।পরের জনম থাকলে সেখানে তোমাকে আমার করে চাইতাম।
-আবার আসবে তো।
শুভ্রর বাচ্চার মতো প্রশ্নে হেসে দিল অহি।শুভ্রও হেসে উঠল।
-কথা দিলাম।

★★পরিশেষ★★
অহি চলে গেল।শুভ্র ফিরে এলো।সাত মাস পর রিক্তার কোল আলো করে এক ছেলের জন্ম হলো।আগের মত কিছুই রইল না।থেকে গেল একটা অপূর্ণ প্রেম আর অহির দেওয়া কথা।তারপর……

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.