ধার

ঘাসফড়িং

-এইযে শুনো।

-আমাকে ডাকলেন?

-হ্যাঁ।তোমাকেই।

-জ্বি বলুন।

-তুমি যখন রকমারী শপ থেকে ‘আড়শী নগর’ বইটা কিনছিলে,আমি ঠিক তখনই ‘আড়শী নগর’ বইটা কেনার জন্য ওখানে গিয়েছিলাম।

-কই,আপনাকে তো সেখানে দেখলাম না।

-দেখোনি হয়ত।মানুষের ভীড় ছিল প্রচুর।

-হ্যাঁ,ভীষণ ভীড় ছিল।

-আসলে বইটা আর ঐ শপে ছিলো না।

-ওহ হ্যাঁ হ্যাঁ,বইটা আমিই অনেক কষ্টে খুঁজে পেয়েছি।কোন শপেই পাচ্ছিলাম না। শেষে রকমারীতেই পেয়েছিলাম।

-তোমার হাত তো বোঝাই হয়ে গেছে বইয়ে।এতো বই পড়ো?

-এতো বই আর কই হলো?

বলেই আমি একটু হেসে উঠলাম।

-সবগুলো তো আর একদিনেই পড়তে পারবে না,তাইনা?

-তা তো অবশ্যই না।

-তাহলে আমাকে ‘আড়শীনগর’ বইটা একটু ধার দাও।আমার পড়া শেষ হলে তোমাকে ফিরিয়ে দেব।দেবে?

কেমন অদ্ভুত করে আমার দিকে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালো অপরিচিত ছেলেটা।আমি একটু অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে গেলাম।

-আপনাকে তো আমি চিনি না।

কথাটা বলতেই ছেলেটা ভরভর করে তার ডিটেল দেওয়া শুরু করল।

-আমি হিরণ। ঢাবিতে ফার্মাসিটিক্যালে ৪র্থ ইয়ারে আছি। আর তোমার বই মেরে দেবো না। ভয় পেয়ো না।

ছেলেটার কথায় আমি কিছুটা লজ্জায় পড়ে গেলাম।

-মেরে দেবেন বলতে?আমি কি বলেছি আপনি বইটা মেরে দেবেন? এ কেমন অদ্ভুত কথা।

এবার একটু শব্দ করে হেসে উঠলো ছেলেটা। চোখের চশমাটাকে আঙ্গুল দিয়ে একটু ঠিক করে নিয়ে বলল,

-সরি। আসলে তোমার বইটা আমার কাছে খুব যত্নেই থাকবে।তুমি এ ব্যাপারে সন্দিহান হয়ত।সমস্যা নেই।তোমার ফোন নাম্বারটা আমাকে দাও।

-আমার ফোন নাম্বার কেন? আপনার ফোন নাম্বারটা আমাকে দিন।আমি ফোন করে বইটা চেয়ে নেবো।

-কিন্তু আমার পড়া কবে শেষ হলো কিনা,এটা তো আমিই জানাতে পারবো তোমাকে।

-আসলেই তো।

……………………

সেদিন এভাবেই ছেলেটাকে বইটা দেওয়া হয়।কিন্তু কিছুই যেন সেদিনের কথোপকথনের মত এগোচ্ছে না।আজ ১৭ দিন হয়ে গেলো বইটা নেওয়া হয়েছে,কিন্তু ছেলেটা বইটা ফেরত দিচ্ছে না।উলটো দুদিন দেবে দেবে করে ধানমন্ডি লেক আর লালবাগ ঘুরে আসা হলো। আজও ফোন করে বলল টিএসসি চত্বরে যাওয়ার জন্য। বসে আছি একটা রিকশায়।আমার কিছুটা রাগ হতে গিয়েও ছেলেটার উপর রাগ হচ্ছে না কেন জানি। এই যে আজ বই আনতে যাচ্ছি,সেটাও যেন মনে মনে ভাল লাগার একটা বাতাস বইয়ে নিচ্ছে।তার কারণটা অবশ্য অজানা।

রিকশা থেকে নামতেই হিরক ছেলেটা এগিয়ে এলো।

-লেট হয়ে গেলো।

আমি রিকশা থেকে নামতে নামতে বললাম,

-বইটা কই!আপনার হাত খালি কেনো?

সঙ্গে সঙ্গেই ছেলেটা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলতে লাগলো,

-হায়!সর্বনাশ! বইটা আনতে ভুলে গেছি। সরি।

আমার রাগে গা জ্বলতে শুরু করলো।এই একটা বদভ্যেস আমার খুব অপছন্দের।

-এই যে ভাই,দাঁড়ান।

রিকশা ড্রাইভারকে আমি ডেকে বললাম।

হিরক অবাক হয়ে উঠলো।

-তুমি চলে যাবে এখনি?

-বই তো আনেননি।তাহলে আমার আর থেকে কি লাভ!

-না না,তুমি যাবে না। এই যে চাচা, আপনি চলে যান।

বলেই হিরক আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল।একটা কফিশপে বসল গিয়ে।যেন আগেই পরিকল্পনা করা ছিল।

-এক কাপ কফি খেয়ে যাও।

-আপনি এর আগেও দুবার আমাকে ফুচকা আর চা খাইয়েছেন বইয়ের কথা বলে বলে।আমি আর কিছু খেতে চাই না।বইটা দেবেন কবে বলুন।

-বাচ্চাদের মত কথা বলছো।বইটা কি আমি রেখে দেবো?ধারই তো নিয়েছি মাত্র।

কফি খেতে খেতে অনেক কথা হলো আমাদের মধ্যে।বিকেলের এই সময়টা এমন কাটলেই যেন ভাল হত। সন্ধ্যে নেমে এলো- যখন আমরা রাস্তার ফুটপাথে সোডিয়াম লাইটের আলোয় গা ভাসাচ্ছি। একটা রিকশা ডেকে হিরক আর আমি চেপে বসলাম তাতে। আমার বসতে একটু কষ্ট হচ্ছিল।কিন্তু ছেলে আমাকে একহাত দিয়ে চেপে ধরলো।আমি অবাক হলাম- শিহরিতও হলাম।

…………………………….

আজ যে জায়গায় বসে আছি,সেখানে নানান ছেলে মেয়েদের ভীড়।সপ্তাহের শেষ দিন বলেই হয়ত এত কোলাহল।কিন্তু ছেলে মেয়েরা কেন জোড়া বেঁধে এভাবে পার্কে আসবে?আমার জিদ হচ্ছিল নাকি রাগ,নাকি হিংসে হচ্ছিল-ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। দশ মিনিট হয়ে গেলো।বই নেওয়া ছেলের আসার কোন নাম নেই। কলেজ ব্যাগটাকে কাঁধে গুজে যখনি উঠতে গিয়ে পেছন ফিরলাম,তখনি দেখলাম হিরক ছোট একটা ফুল ওয়ালা মেয়েকে সাথে নিয়ে একটা ছেলের সাথে তর্ক করছে।আমি ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে যেতেই হিরক আমাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো।

-কখন এলে?

-অনেকক্ষণ হয়েছে।

-আই এম সরি। আসলে দেরিটা এখানে এসেই হয়েছে।

-কি নিয়ে বলাবলি করছিলেন ঐ ছেলের সাথে?

-মেয়েটা ফুল বিক্রি করে। ছেলেটার কাছেও বিক্রি করতেই গিয়েছিলো।কিন্তু ছেলেটা দুর্ব্যবহার করছিলো মেয়েটার সাথে।

হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়ানো তামাটে গায়ের রঙের ছোট মেয়েটাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম,

-আচ্ছা বুঝলাম। তা তোমার নাম কি?

-রুপু।

-তো রুপু তোমার ফুল গুলো আজ বিক্রি হচ্ছে না?

-না।

আমি হিরকের দিকে একটু দুষ্টুমির নজরে তাকালাম।

-আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার জন্য? ফুলগুলো আপনি কিনে নিলেই তো পারেন।

-আমি কিনব?কিনে কাকে দেবো?

হিরক কি যেন ভাবলো এক মুহূর্ত।এরপরই ছোট মেয়েটার থেকে সবগুলো ফুল রেখে দিল। টাকাটা পেয়ে রুপু মেয়েটা এক মুহুর্তও দেরি করলো না।দৌড়ে কোথায় যেন চলে গেলো।

-এই নাও,ফুলগুলো তোমাকে দিচ্ছি।

-আমি এত ফুল দিয়ে কি করবো।

-ধরো তো।

আমি হিরকের হাত থেকে ফুল গুলো নিলাম।

রিকশাতে বসার পর মনে হল,আমি তো এই ফুল আনতে যাইনি আজ রমনা পার্কে।বই আনতে গিয়েছিলাম।কিন্তু ফিরছি ফুল নিয়ে! আমার প্রচন্ড হাসি পেলো মনে মনে।

……………………..

আমার পড়ার টেবিলটার একপাশে ফুলগুলো আজ পাঁচদিন পেরোচ্ছে- ফুলগুলো আস্তে আস্তে শুকোচ্ছে, গন্ধহীন হচ্ছে।কিন্তু আমার অনুভূতি আর আবেগ গুলো কেমন যেন সজীব হচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফোন দিলাম হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া ধুরন্ধর ছেলেটাকে।

-কোথায় আছেন?

-এইতো ক্লাসে।

-ও আচ্ছা।

-কেন,কিছু বলবে?

-না কিছু না।

-বইয়ের জন্য তোমার ঘুম আসছে না বুঝি?

-ধ্যাত!

-বইয়ের জন্য ফোন দাওনি তো কিসের জন্য দিয়েছো?

আমার এবার লজ্জা লাগলো কেন জানি।আমি তড়িঘড়ি করে কথা বানাতে লাগলাম।

-বইয়ের জন্যই দিয়েছি।কাল তো বৃহস্পতিবার।আপনার সাথে দেখা করবো।

-দেখা করবে?

ফোনের ওপাশ থেকে হিরকের হতবাক হওয়া গলাটা শুনতে পেলাম।

-না না,বই বই। বই নিয়ে আসবেন।

-ও আচ্ছা,তাই? আসব তো।

…………………………

আমাদের প্রথম দিন যে জায়গাটায় দেখা হয়,আজ আমি সে জায়গাটাতেই বসা।হাল্কা বাতাস,পাখির কিচিরমিচির ডাক,সামনে সচ্ছ পানি আর ছোট ছোট দু তিনটে নৌকা। কেউ কেউ তার কাছের মানুষকে নিয়ে নৌকায় উঠে লেকে ভাসছে।সেদিন অবশ্য হিরক বলেছিল নৌকায় উঠার জন্য।কিন্তু প্রথম দিনই উনার সাথে কেন যে মিশতে পারছিলাম না ততটা।আজ নৌকায় উঠতে ইচ্ছে করছে।

হঠাৎ হিরকের কণ্ঠ,

-বিরক্ত হও নি তো?

-হলেই বা কি হবে?

-হলে সরি বলবো।

-আপনার সরিতে আমার বিরক্তি হওয়া সময়টা মুছে যাবে না।

-জ্যাম ছিল খুব।পরে রিকশা থেকে নেমে হেঁটে চলে এলাম।অনেক দ্রুত হেঁটেছি।ঘামছি কেমন দেখেছো?

হিরকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম,তার পরনের শার্ট কিছু কিছু জায়গায় পেট আর পিঠের সাথে লেপ্টে গেছে।আমি কলেজ ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম।

-মুছুন।

হিরক আমার পাশে বসতে বসতে বলল।

-থ্যাংক ইউ।

ওর ঝাপ্টা মেরে বসার ফলে পারফিউম আর তার শরীরের ঘামের কেমন একটা গন্ধ যেন এলো। কেমন লাগলো ঠিক বুঝলাম না।তবে আমি একটু নড়েচড়ে হিরকের দিকে এগোলাম। যেন গন্ধটা আবার আমার নাকে এসে লাগে।

ঘাড়,হাত, মুখ মুছেই যাচ্ছে হিরক।আমি তার দাড়ি ভর্তি মুখটার দিকে একবার তাকাই।আজ কেন জানি তাকে আমার চোখে অন্য রকম লাগে-আমার ঘোর লেগে আসে।

আমি নিরবতা ভাঙি।

-বইটা ধার নিয়ে ঠিক সময়ে ফিরিয়ে দিলেন না। আমাকে শুধু শুধু এখানে ওখানে এনে এনে সময় নষ্ট করেন।

-তাই? সময় নষ্ট করি?

-হুম।

ব্যাগ থেকে বইটা বের করলো হিরক-মলাটের উপরে বড় বড় করে সাদা কালিতে লেখা ‘আড়শীনগর’।

-নিন মশাই।আপনার বই।আমার ধার আমি চুকিয়ে দিচ্ছি।

আমার কেন জানি বইটা ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করছিলো না।থাকুক,তার কাছেই থাকুক-আমারও এই ছুতোয় পার হোক কিছু ভাল দিন-কিছু ভাল লাগার মুহূর্ত।

-কি ভাবো?

আমি হাত বাড়িয়ে বইটা নিতে যেতেই হিরক বইটা সরিয়ে নিল।

-ওয়েইট ওয়েইট,আপনাকে বইটা নেওয়ার আগে একটা শর্ত মানতে হবে।

-আমার বই। আমি আবার কি শর্ত মানবো?

-হুম।মানতে হবে।

-আজব! কি শর্ত শুনি?

হিরক একটু চুপ করে থাকলো। আমার দিকে আরেকটু এগিয়ে এলো। ঠিক চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

-বইয়ের ধারটা ঘোচানোর আগে আপনার মনটা আমাকে ধার দিতে হবে।

আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম।পুরো শরীর আমার কেঁপে উঠলো হঠাৎ।বুক ধড়ফড় করছিল হয়ত,আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো।

আমি ঝটকা মেরে বইটা নিয়ে নিলাম হিরকের হাত থেকে। বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে বললাম,

-চলুন তো একটু নৌকোয় উঠি।

আমার মুখে কি ছিলো জানিনা,তবে হিরকের চোখ দুটো দেখলাম প্রণয়-প্রাপ্তির ভাষায় চিকচিক করছে।

………………….

সমাপ্ত।

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.