নিভৃতচারী

উৎসর্গঃ ফাহাদ তানভি।

ছেলেটার সাথে আমার কেবল মেসেজেই কথা হতো।

ফেসবুক আইডিতে যেই নামটা দেওয়া ছিল,সেই নামটাও তার প্রকৃত নাম কিনা জানতাম না।অথচ আমাদের কথাবার্তা, সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে,আমাদের কারো অনুপস্থিতিই সহ্য করতে পারতাম না সহসায়।আইডি ডিয়েক্টিভ রাখলেই মনে হত অনলাইন জগতটা কেমন ফাঁকা। কেউ নেই- কিছু নেই।

আমার ভয়-ডরটা কম ছিল।তাই নিষিদ্ধ জগতটাতেও আমি নিজের প্রতিরূপ উন্মুক্ত করে রেখেছিলাম।দ্বীপ ছিল উলটো।তাই তাকে কখনো দেখা হয়নি আমার।

দ্বীপ নামে আইডি খোলা ছেলেটার পরিচয় ঠিকঠাক না জানলেও সে যে আমার কতটা জুড়ে নিয়েছিল সময়ের সাথে তা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম। ওপাশের ছেলেটার মনে কি ছিল আমাকে নিয়ে তা কখনো কখনো বুঝতাম আবার কখনো কখনো মনে হত সবকিছুই দুর্বোধ্য। আমি তার কিছুই না- কিংবা আট দশটা সাধারণ সম্পর্কের মানুষের মতই আমি তার কাছে।

দ্বীপের সাথে আমার কথা হতো সবকিছু নিয়ে। সেও কিছুই বাদ রাখতো না।গোটা দিন নাগাত তার সাথে কি হল না হল সবকিছু রাতের আঁধারে আমার ইনবক্সে মেলে বসতো।কেমন সরল মন নিয়ে খুঁটিনাটি সব বলত আমার কাছে।আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।ভাবতাম, এই তো বিশ্বাস।ভালবাসে কি না জানি না,তবে আমি যে দ্বীপের এত বিশ্বস্ত কেউ হতে পেরেছি এটা তো বিরাট অর্জন আমার।

ভাবনার জগতটায় যখন হাঁটাহাঁটি করতাম দ্বীপকে নিয়ে,তখন মনে হত আমি দ্বীপকে যতটুকু কাছের মনে করি, দ্বীপ তার থেকেও বেশি কাছের ভাবে আমাকে।

কিন্তু কোথাও যেন একটা ঘাপলা। মাঝেমাঝে দ্বীপ সেই ঘাপলার আভাস আমাকে দিত।তার পরিবারের কথা বলতো।সমাজের কথা বুঝাতো। আমি দেখতাম তার অপারগতার ব্যথাটা।

আমাদের নামহীন এই অস্বীকৃত সম্পর্কের পরিণতি জানে বলেই হয়তো ‘ভালবাসি’ শব্দটাকে দ্বীপ কখনো মুখে বলেনি আমার জন্যে।অথচ আমার খেয়াল রাখা মানুষের সারিতে সে ছিল শীর্ষের কেউ।আমার যত্ন নেওয়া মানুষ গুলোর মধ্যে দ্বীপ ছিল নিজস্বতায় জ্বলজ্বল করা একজন।।

বয়সের পরিপক্কতা না আসাতে আমি কিছুটা অবুঝই ছিলাম বলা যায়।দ্বীপ মৌখিক স্বীকারোক্তিতে আমাকে স্পষ্ট করে বলুক,সে আমাকে ভালবাসে এটা আমার বাসনা থাকতেই পারে। অথবা সমাজ-পরিবারকে উপেক্ষা করে আমার হাতটি ধরুক এটা আমার ভালবাসার দাবী হতেই পারে- কিন্তু এমনটা করে দ্বীপ ভাবতো না। কারণ,সে মানুষ হিসেবে বয়স সাতাশের গণ্ডি পেরিয়েছে।জীবনের নানা জটিলতায় সে আটকে গিয়েছে।

আমি আঠারো বছরের এই ছেলেটা ইচ্ছে করলেই যেমন কাউকে নিজের বলে ভাবতে পারি,দ্বীপের জন্য সেটা কঠিন তা আমি খুব ভালভাবেই বুঝতে পারতাম।

দেশের গভর্মেন্টের পেশায় জড়িয়ে থাকা দ্বীপের শুধু সামাজিক প্রতিবন্ধকতাই ছিল না- তার অতীতও তার ভালবাসার পথে বিশাল অন্তরায় ছিল। ভালবাসতে গিয়েও পুরোনো পরিণামের কথা ভেবে সে যে পিছিয়ে যেত,তা আমি আঁচ করতে পারতাম।

কিন্তু ভালবাসাকে তো নাছোড়বান্দা বলা যায়।সেই ভালবাসাকে গলা টিপে মারবার সাহস আমার ছিল না।দ্বীপ তার অনুভূতি-আকাঙ্ক্ষাগুলোকে বালিচাপা দিলেও আমি আমার মনের চারা গাছের নিচে নিয়ম করে জল ঢালতাম। রাত গুলোতে দ্বীপকে নিয়ে ভাবতে না চাইলেও সেই ছিল একমাত্র বাসিন্দা,যে আমার কল্পনায় অবাধ বিচরণ করতো।

নিরুপায় দ্বীপের কাছ থেকে ভালবাসার সহজ স্বীকারোক্তি আমি পাইনি।তার সুপ্ত ভালবাসায় আমি তৃপ্ত ছিলাম না।আমার আরো কিছুর অভাব ছিল।তার হাত ধরে হাঁটার ছিল,তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবানোর ইচ্ছে ছিল।

আমার এই ফাটল ধরা দেহে সে হাত বুলাক,লালা ঝরাক।উর্বর হোক তার স্পর্শে আমার শরীর; এমন সব কামনাগুলো আমাকে পীড়া দিত।

ইচ্ছে ছিল সে একান্তই আমার হয়ে থাকুক,কেননা তার প্রতি আমার ভালবাসাটা তীব্র। ‘দ্বীপ আমার সম্পত্তি’ ভাবার অধিকার টুকু অন্তত আমি রাখি।

আমার এমন একপাক্ষিক চাওয়া পাওয়া গুলো আমার ভুলই ছিল। এ ভুলের মাশুল আমাকে গুণতে হয়নি। তবে কেন জানি অনিদ্রা আমাকে পেয়ে বসেছিল।অনাহারী হয়ে থাকাটাই আমার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। ‘এই বুঝি সে আমাকে ভালবাসি বলল- এই বুঝি আমি তার আপন মানুষ বলল’

প্রতীক্ষায় দ্বীপের পানে উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি হয়রান হয়ে এলাম।দুর্বল হয়ে এলো আমার চারিপাশ।জীবনে নতুন নতুন পরিচ্ছেদ এলো।জটিলতা বাড়লো,স্বাধীনতা কমলো।তখন অনুভব করলাম দ্বীপের অসহায়ত্ব।তার অবস্থানটা- তার না বলা কষ্টগুলো।

আমি অনায়াসেই সব নির্গত করতে পারতাম,কিন্তু দ্বীপের অপ্রকাশ্য অনুভূতি গুলো তাকে কতটা অস্থিরতায় রেখেছে ভাবতেই আমার ভেতরকার জগতটা নড়ে উঠলো।

আর পিছু ফিরে তাকাইনি। সমস্ত কামনা-বাসনা বুকের খুপরী ঘরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমি দ্বীপের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম।

…………

তারপর অনেকদিন পেরোল।অগণন সেই সময়ের পরে এক শীতের সন্ধ্যায় আমি ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে একা একা ফিরছিলাম।ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলাম সেই বিকেলে,তাই শীতের কাপড় গায়ে জড়াইনি।অথচ ফিরতে ফিরতে চারিদিকে এখন পরিপূর্ণ অন্ধকার আর ঠাণ্ডা বিরাজ করছে। শরীরটা খানিক পর পর কেঁপে কেঁপে উঠছিল আমার। একটা চায়ের দোকানের টেবিলে বসে ভাবছিলাম বাসা অব্দি যেতে পারব কিনা। শরীরের নিস্তেজ হয়ে আসাটা ক্রমশ বাড়তে লাগলো। সাহস করে এই কনকনে শীত ভেদ করে হাঁটা শুরু করলাম।একটু এগোতেই পুরো শরীরে ব্যামো চলে এলো আমার। চায়ের দোকান গুলি পেরিয়ে ততক্ষণে আমি নির্জন মতন এক রাস্তার পাশে। শরীর মুচড়িয়ে ঢলে পড়ার আগ মুহুর্তটাতে নীল শার্ট পড়া কেউ একজন এদিকে ছুটে আসছিল দেখলাম। এরপর?

এরপর বেশ কিছুক্ষণ কাটার পর চোখ দুটো মেলেছিলাম আমি। জ্ঞানহীন মুহুর্ত গুলো কেউ আমাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিল। দৃষ্টি শক্তি পাওয়ার পর প্রশস্ত এক কাঁধে আমার চোখ পড়ল।একটা প্রাইভেট কারের ভেতর আমি। নীল রঙের শার্ট পড়া মানুষটা আমাকে এখনো বুকে জড়ানো। আমি কিছুটা নড়ে উঠতেই ছেলেটা আলতো করে আমার মুখটা সামনে নিয়ে এলো। শীতল চোখে আমার দিকে তাকানো ছেলেটাকে আচমকাই আমার আত্মার কেউ মনে হলো।আমার প্রতি তার এই মায়া দেখানোর জন্যই কি তাকে এতটা আপন মনে হলো?

নাকি স্মৃতির কোন সংযুক্তি রয়েছে তার সঙ্গে?

-আমি দ্বীপ। চিনতে পেরেছো?

স্থির পরিবেশটায় ছেলেটার এই কণ্ঠ শুনে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। এতদিন পরও আমাকে এই ছেলেটা এভাবে মনে রেখেছে?

আগেকার সেই খোশগল্প গুলির মত ‘শরীর ভালো তো তোমার?’ যত্ন আত্মিতে কথাবলা ছেলেটার মনে এখনো আমার প্রতি সেই পুরোনো টান? আমি বেশ খানিকক্ষণ তার দিকে তাকিয়েই থাকলাম। যেই চোখ গুলো বহু রাত ভিজে ভিজে আবার শুকিয়েছে,সেই চোখ গুলো এক ফোটা জলও ঝরায়নি এত কাছে বসে থাকা দ্বীপকে দেখেও।

এমন তীক্ষ্ণ নীরবতাটা ‘আব্বু’ মতন একটা কচি স্বরের ডাকে কেটে গেল।আমি হকচকিয়ে উঠে দ্বীপের কাছ হতে সরে আসলাম। খেয়াল করলাম গায়ে একটা চাদর আমার।

কিছুক্ষণ আগেও রাস্তায় যেই শরীরটা ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিল,সে শরীরটা এখন উষ্ণতায় ভরপুর।

গাড়ির জানালা দিয়ে দু’তিন বছরের একটা বাচ্চা ছেলে গাড়ির দরজা ঠেলে ‘আব্বু-আব্বু’ বলে ভেতরে ঢুকলো।দ্বীপ সেই বাচ্চা ছেলেটার দিকে এক মুহুর্তের জন্যও তাকায়নি। অথচ তার জগত জুড়ে হয়ত এখন কোন এক রমণী আর এই ফুটফুটে বাচ্চাটাই।

এইমাত্র যে মানুষটার গায়ে চাদর জড়িয়ে,বুকে জড়িয়ে দ্বীপ সারিয়ে তুলল,সেই মানুষটার কোন অস্তিত্বই হয়ত দ্বীপ আর অবশিষ্ট রাখতে চায়না তার নতুন ঐ জগতটায়। অথচ নিয়তি কেমন করে আমাকে না পাওয়া কিছু চাওয়া পাইয়ে দিলো; তার নিশ্বাসের শব্দ,তার বুকের উষ্ণতা,তার শীতল চোখ দুটোর নিখাদ মায়া- এসব আমার বাকি জীবনটার রসদ।

রাস্তায় নেমে এসে আমার মনে হলো,দ্বীপকে কেন বললাম না- ‘সে আমার কাছে সেই আগের মতই রয়ে গেছে।’ শুধু জড় হয়ে বসেছিলাম। আর বুকের ভেতর উত্থাল ঝড়টাকে সহ্য করছিলাম। কিংবা এটাও তো বলতে পারতাম-

‘দ্বীপ, এই জড় বস্তুর মত শরীরটাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে উষ্ণতায় সারিয়ে দিলে- কিন্তু আঘাতে আঘাতে যে মনটা দীর্ঘদিন পাথরের মত হয়ে আছে,তাকে একটু ছুঁয়ে দিলে না?’

কেন যেন বলা হয়নি এসব। গাড়িটা এখনো হয়ত সেই জায়গাটাতেই থেমে আছে।ভালবাসার ডালা নিয়েও দ্বীপের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া আহত এই ছেলেটা তাকে এভাবে মাঝপথে থামিয়ে দিতে চায়নি।

কিন্তু পৃথিবীটা তো গোল- আর একই আকাশের নিচেই তো আমরা বাস করি।

ভাবতে ভাবতে আমি পৌষের রাতের সেই তারাভরা আকাশটার দিকে তাকালাম।জলের ঘনত্বে তারাগুলোকে ঝাপসা দেখতে লাগলাম আমি।

দ্বীপ কি জানে, কতটা ভালবাসায় চোখের এই জল ঝরে? …………………

সমপ্রেমের গল্প December 24, 2018

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.