নিরন্তর-২

লেখকঃ ঘাসফড়িং

-স্যার কী লাগবে?

ছেলেটার ডাকে আমি একটু নড়েচড়ে বসি।বলি,

-এক কাপ কফি দাও।আর কিছু লাগবে না।

মাথা নুইয়ে চলে গেল ছেলেটা।

বসে আছি একটা কফিশপে।মিনিট পাঁচেক হবে এসেছি মাত্র।

এই কফি শপটা আমার ভাল লাগার অন্যতম একটা জায়গা।সবসময় না হলেও সপ্তাহে সময় করে অন্তত তিন-চার দিন আসা হয়ই।কাউকে সাথে আনি না।একা একা এসে নিজের জন্য এক কাপ কফিতে নিশ্চিন্তে চুমুক দিয়ে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি পাই।সাথের পাগলা বন্ধু গুলোকে আনলে ওদের হরগোলে কফির ঠিক স্বাদটা পাই না।তবে ওদের সময়টায় ভিন্ন একটা স্বাদ পাওয়া যায় কফিটার।কিন্তু এখন ওদেরকে ইচ্ছে করেই সাথে আনিনি।এই বিকেলের সময়টা সাধারণত একাই কাটাই।সন্ধ্যা হয়ে এলে ফুটপাথ ধরে বিনিদ্র নগরীর ব্যস্ততা আনমনে,একা-একা দেখার মত ভাল লাগা আমি সচরাচর অন্য কিছুতে পাই না।আমার এমন অভ্যাস দেখে বন্ধুদের প্রশ্নের শেষ নেই।কেউ ছ্যাঁকা দিল নাকি,কারো প্রেমে পড়ে এমন উদাস হলাম নাকি,কতসব অবান্তর প্রশ্ন যে শুনতে হয় এই সময়টা উপভোগ করতে!

ওদের প্রশ্নের উত্তর ওদের মর্জিমতো না হলে আরও চাপাচাপি শুরু করে ওরা।অবশ্য ওদের সন্দেহটা অযৌক্তিকও নয়।মেডিক্যালের সেকেন্ড ইয়ারে পড়া ছাত্রের বিশেষ কেউ না থাকাটা ওদের অবাক লাগে।আমার অবশ্য তেমন মনে হয়না।জীবনটা তো সবে শুরু।আর ভাল কি সবাইকে বাসা যায়?তবে কাউকে ভালবাসতে ইচ্ছেও হয়নি।এমনিতে হয়তো কাউকে কাউকে চোখের দেখায় একটু আধটু ভাল লেগেছিল একসময়।তাই বলে ভাল লাগার পরিণতি কখনও ভালবাসায় রূপান্তর করার মত মূর্খামি করিনি।সত্য যে,কাউকে কখনও গভীর ভাবে ভালও লাগেনি।ভাল লাগার গভীরতাও নাকি কখনও কখনও ভালবাসার ইঙ্গিত দেয়।

কফি শপটা চোখ ধাঁধানো সুন্দর।শুধুমাত্র ছাদটা ছাড়া পুরো কফিশপটাই শ্বেত রঙের।সামনেই হাইওয়ে রোড।আমি দরজা বরাবর বসে আছি,তাই কফিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে বাইরের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি।খিপ্ত গতীতে একের পর এক যানবাহনের আনাগোনা।

হঠাৎ করেই নাদুসনুদুস একটা ছেলেকে দেখতে পেলাম হাতে একটা সুটকেস নিয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েছে।আমি কফির মগ হাত থেকে নামিয়ে ছেলেটার দিকে প্রাণপণে দৌড়ে গেলাম।সাথে সাথেই দুদিক থেকে দুটো বাস ছেলেটাকে পিষেই ফেলেছিল প্রায়!

চোখ বন্ধ করে হাত দিয়ে নিজের কানদুটোকে শক্ত করে চেপে ধরল সে।মাত্র দু-ফিট দূরত্বের ব্যবধানে বাস দুটো গতি নিয়ন্ত্রণ করে থমকে গেছে।ছেলেটা বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে হাত-দুটো মাথা থেকে নামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে ধমক ছুঁড়তে থাকা বাস ড্রাইভার দুটির দিকে তাকাতে লাগল।ততক্ষণে ভীড় পড়ে গেছে ছেলেটাকে ঘিরে।আমি নির্বাক হয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতেই কিছু বুঝে উঠার আগে মাথা ঘুরে পড়ে গেল সে।লোকজন হৈহৈ-রৈরৈ শুরু করে দিল।আমি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না দিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে একটা ট্যাক্সিতে উঠে পড়ি।সুটকেসটা ভীষণ ভারি হওয়া সত্তেও দুটি ভারি জিনিসকে বহন করার শক্তি হঠাৎ করেই কোথা থেকে যেন আবির্ভূত হল।সোজা বাসার উদ্দেশ্যে ট্যাক্সিকে যেতে বললাম।ফ্ল্যাটের সামনে পৌছতেই কোলে করে নিয়ে বিছানায় শুয়ালাম ছেলেটাকে।

হঠাৎই মাথায় একটা চিন্তা চেপে বসল,চিনিনা-জানিনা কোথাকার কে!এভাবে যে ঘরে এনে তুললাম,কাজটা কি ঠিক হল?

যাহ,এসব আজেবাজে চিন্তা করাটাই উচিত হচ্ছে না।কেমন নিষ্পাপ একটা মুখ।তবে যেটুকু মনে হল ছেলেটা ইচ্ছে করেই রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল।তাহলে কি সুইসাইড কেইস!এতটুকুন একটা টিনেইজার ছেলে সুইসাইডেরই বা কী বুঝে!

দুশ্চিন্তার বেড়াজালে নিজেকে আর আটকালাম না।পাশ থেকে একটা জলভর্তি বোতল হাতে নিয়ে ছিপি খুলে ছেলেটার চোখেমুখে একটু পানি ছিটিয়ে দিলাম।

জ্ঞান ফিরল।খানিকটা সময় নিয়ে ছেলেটা ধীরে ধীরে চোখ খুলল।চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে কি না কি বুঝতে পারল কে জানে!ঝট করে উঠে বসল।আমার দিকে অদ্ভুত আর বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-আমি এখানে কী করে এলাম?

আমি একটু হেসে বলি,

-রাস্তার মাঝখানে তুমি ভুলক্রমে চলে গিয়েছিলে বোধহয়।সেখান থেকে তুমি এখানে।

বেশকিছু মুহূর্ত ছেলেটা স্তব্ধ হয়ে কাটাল।চিন্তিত মুখাবয়ব নিয়ে কি যেন ভাবতে লাগল।অদ্ভুত ভাবেই ছেলেটার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল।চোখের দৃষ্টি নানান দিকে ঘুরিয়ে ছেলেটা চোখের জলকে আড়াল করতে চাইল।আমি গলা পরিষ্কার করে জিজ্ঞাসা করলাম,

-আমাকে বিষয়টা একটু খুলে বলবে?

-আসলে কিছু বলার নেই।আপনি আমার অনেক বড় একটা ক্ষতি করলেন।

-ক্ষতি!কি ক্ষতি করলাম?

-আপনি আমাকে রাস্তা থেকে তুলে আনলেন কেন?

-অদ্ভুত তো!

-ওখানেই পড়ে থাকতাম।আপনাদের মত ছেলেদের জন্যই আমাদের জীবনটা কষ্টের পাহাড় হয়ে যায়।ছেলেটার মুখের কথা শোনে আমার এবার হাসি পেয়ে গেল।ওর বয়সটাই যে ওকে এমন আচরণ করতে বাধ্য করছে সেটা অবশ্য বুঝতে পারছি।কারো প্রতি জন্মে থাকা রাগ,অভিমান সব আমার উপর ঝেড়ে ফেলছে।তবে এতে ওর ভেতরের পাথরটা সরে যাবে।তখন আয়েশ করে ওর গল্পটা শুনতে পারব।তাই আমি চুপচাপ শান্ত ছেলের মত ওর বকাঝকা শুনে যেতে লাগলাম।

-তাহলে তুমি আত্মহত্যা করতে করতে গিয়েছিলে?

ছেলেটা নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল।আমার দিকে রাগাশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

-আপনি আমার ভাল করেন নি।কতটা সাহস সঞ্চয় করে যে এই পথটারপাথেয় জুগিয়েছিলাম;আর তো হাজার চেষ্টা করেও তা পারবনা।আমি প্রচণ্ড ভীতু।অনেক কঠিন এই একটা কাজ করতে গিয়ে যখন কেউ বেঁচে ফিরে আসে,তখন তার ভেতরে ভয় ঢুকে পড়ে,সাহস না।আমারও ঠিক তেমন অবস্থা হয়েছে।

-আমি জানিনা তুমি কেন সুইসাইড করতে গিয়েছিলে।কিন্তু হতে পারে,তোমার এই সুইসাইডের ফলে,অনেক বড় একটা বিপদ নেমে আসতে চলেছে তোমার পরিবারে।এছাড়া তোমার মা স্ট্রোকও করতে পারে।অথবা তুমি যেই ধারণা পোষণ করে সুইসাইড করতে যাচ্ছিলে;হতে পারে তা নিতান্তই ভুল।

-আপনি আমাকে কী বুঝাতে চাচ্ছেন,হ্যাঁ?একটা ছেলেকে বাড়ি থেকে ভাগিয়ে এনে তার ভালবাসার মানুষটা তাকে ধোঁকা দেওয়া বিষয়টা নিতান্তই ভুল ধারণা হবে আমার?

-তুমি তোমার ফ্যামিলির দিকটাও দেখতে পারতে।

ছেলেটার মুখ থেকে এবার কোনও শব্দ বেরোলনা।চুপচাপ বসে কিছু একটা ভেবে যেতে লাগল।আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ছেলেটাকে বললাম,

-রাত হয়ে এসেছে অনেক।আমি এখন রাতের খাবার খাব।তুমি এখন অতিথি আমার ঘরে।সুবোধ বালকের মত আমার সাথে টেবিলে গিয়ে বসলে আমি খুশি হই।

ছেলেটা আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকাল।মনে হল যেন ও জীবনেও কখনও এমন বেরসিকের পাল্লায় পড়েনি।আমি ছেলেটার হাত ধরে বিছানা থেকে টেনে তুলে দিয়ে ডাইনিং টেবিলে চলে আসি।ছেলেটা ধীর পায়ে এসে আমার পাশের চেয়ারটাতে বসে।ইতস্তত করেও কিছুক্ষণ পর মুখে খাবার তুলল।আমি নীরবতা ভেঙে বলি,

-তোমার নামটা জানা হয়নি।

-রূপক।

আবারও কিছুসময় নীরব হয়েই কেটে গেল।খাবার শেষে আমি রূপককে জিজ্ঞাসা করলাম।

-আচ্ছা রূপক,আমি তোমার একজন ভাল বন্ধু হতে পারি?

-হঠাত্ বন্ধু হতে চাইছেন যে!

-আসলে বন্ধু না হয়ে বিশ্বাস অর্জন করা যায় না।

-আমি কাউকে বিশ্বাস করিনা।

-বিশ্বাস করোনা হয়তো এখন।কিন্তু বিশ্বাসস্থুলন হলে যে কাউকে একই মাপকাঠিতে মেপোনা।

কথায় বিশ্রাম টেনে কিছুক্ষণ নীরব হয়ে কাটালাম।আবারও বললাম,

-থাক।বিশ্বাস বিষয়টা আপেক্ষিক।তাই আমি কিছু বলতে চাই না নিজ থেকে।

ধীর পায়ে আমি ডাইনিং টেবিল ছেড়ে বিছানায় গিয়ে বসলাম।সোফায় গুটিশুটি মেরে বসে থাকা রূপক অস্বস্তিতে সময় পার করছে।তার ছলছল করা চোখদুটো অনেককিছু বলে দিচ্ছে।অবশ্য বিশ্বস্ত কেউ হতে পারাটা আমি সময়ের উপর ছেড়ে দিয়েছি।সময় পার না হলে ওর প্রতারিত হওয়ার ঘোরটা কাটবেনা;একই চোখে সবাইকে দেখার অস্বাভাবিকতা থেকেই যাবে।ঘৃণায় ডুবে থাকা স্মৃতিগুলি ধামাচাপা দিতে কিছু সময়ের প্রয়োজন।

আজকের দিনটা অনেক সুন্দর।আকাশটা ঘন নীল।পাখির কিচিরমিচির শব্দ একটা কোলাহল তৈরি করেছে।মধুর কোলাহল।বেলকনিতে দাঁড়াতেই আরও হতভম্ব হলাম।মৃদু একটা ঠাণ্ডা বাতাস এসে পরশ বুলাতে শুরু করল।রোদ উঠেনি এখনও।তবে উঠে পড়বে কিছুক্ষণের মধ্যেই।আমি রেলিংয়ের উপর থেকে হাত নামিয়ে বিছানার দিকে তাকালাম।ঘুম ভাঙেনি এখনও রূপকের।মধ্য রাতের পরও ওর চোখদুটো খোলা ছিল।অন্ধকারেও বিড়ালের চোখের ন্যায় চিকচিক করছিল।

ভাবলাম কাছে গিয়ে ওকে ডেকে তুলি ঘুম থেকে।ভাবতে ভাবতেই ভাবনার দৃশ্যপট পাল্টে যেতে লাগল।এমন সুন্দর একটা সকালে সবকিছুতেই মনে হল সৌন্দর্যের তীব্রতা দেখা দিচ্ছে।রূপকের কোমল শরীরের ভাঁজ গুলো কি মাতাল করতে যথেষ্ট নয়?

রূপকের মাথার চুলগুলো চিকচিক করে উঠতে লাগল।জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়তে লাগল ওর মুখে।হালকা আলোয় ফর্সা মুখটা প্রাকৃতিক নির্মলতা পেয়ে অলৌকিক কিছু হয়ে উঠল।আমার কেন জানি খুব ইচ্ছে হতে লাগল ওর মুখটাতে হাত বুলিয়ে স্পর্শ করার।কিছুটা সময় ওকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকার।ভীষণ পীড়া দিতে লাগল ইচ্ছেগুলো।সেসব ধামাচাপা দিয়ে রূপকের পাশে বসতেই ও নড়েচড়ে উঠল।ধীরে ধীরে চোখ খুলে উঠে বসেই গুডমর্নিং জানাল।তবে শেষের সম্বোধনটা কার নাম ধরে হল!আমি তো পলাশ।কিন্তু ও তো আরহাম জাতীয় একটা নাম ধরে গুডমর্নিং জানাল।

ভাবনার জালে পেঁচিয়ে যাচ্ছিলাম।রূপকের টনক নড়ে উঠল কি-না কে জানে!সে কেমন হকচকিয়ে উঠার মত দৃষ্টি দিল।যেমনটা হয় মানুষ বিপাকে পড়ে গেলে।আমি তোয়ালে বাড়িয়ে বললাম,

-ওয়াশরুমে যাবে?নাকি আমিই আগে গোসলটা সেরে আসব।

কিছু না বলেই রূপক আমার হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।আমি কিছুটা হেসে উঠলাম কেন জানি!তবে হাসিটার অর্থ অদ্ভুত কিছু ছিল।

-আপনাকে সেদিন কিছু কটু কথা বলার জন্য আমি ভীষণ ভাবে দুঃখিত।

-ইটজ ওকে।

-আমি এবার ইন্টার এক্সাম দিয়েছি।বাবা-মা আর ভাই-বোনেতে আমাদের পরিবারটাকে সুখী পরিবারই বলা যায়।আমি…

-রূপক,নাশতা শেষ করো।তারপর আমরা সব শুনছি।

-আচ্ছা এই ফ্ল্যাটে আপনি আর বুয়াই শুধু থাকেন?

আমি খানিকটা হেসে দিয়ে বললাম,

-বুয়াও থাকেনা।রান্না করে দিয়ে চলে যায়।

-তার মানে আপনি একা থাকতে পছন্দ করেন?

-ততটাও না।হ্যাঁ;একাই থাকি।তবে বিকেল হতে দাও।পরশু উইকেন্ড ডে।আমার বন্ধুদের হট্টগোলে তুমি পালাবার পথ পাবেনা।

খাবার শেষ করে আমি রূপকের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলি,

-আচ্ছা বলো,তুমি সুইসাইড কেন করতে গিয়েছিলে?

বেশকিছুক্ষণ নীরব হয়ে বসে রইল রূপক।তার দৃষ্টিও স্থির হয়ে আছে।মনে হলো সে প্রকৃতি থেকে নির্দেশ চাইছে,তার না বলা কথাগুলো বলার জন্য।স্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে কোমল ঠোঁট দুটো নেড়ে বলতে শুরু করল।-আমি যে মানুষটাকে ভালবাসতাম,সে একজন ছেলে।

আমি রূপকের এইমাত্র বলা কথাটাকে মাথায় গুছিয়ে নিতে থাকলাম।ভাবলাম থাক,আর দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস না করি,’কি বললে?’

-তোমার পরিবারের কেউ জানত না নিশ্চয়ই?

-না।কেউই জানত না।এটা জানাবার কথাও নয়।তবে সত্যটা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি।কিন্তু সচেতন পরিবার হয়েও কট্টরপন্থী হয়ে গেল আমার বাবা-মা,ভাই।যার ভরসা-নির্দেশ আর আস্থাতে সত্যটা উন্মোচন করলাম,সে নিজেই তো আমাকে সঙ্গ দিল না!বলেই কেমন বিষাদ মেশানো একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ও।

-তবে একটা কথা কী জানেন,আমি মানুষের চোখের ভাষা পড়তে পারি।মুখের ভাষা ছাড়াও মানুষের চোখেরও যে একটা নিজস্ব ভাষা আছে তা জানেন?

-হুম।জানি।

-পড়তে পারেন?

-হ্যাঁ।কখনও কখনও অসাধ্যও হয়ে যায়।তবে গভীরভাবে তাকালেই নাকি পড়া যায়।

-আমি অবশ্য গভীরভাবে তাকাইনি।আপনার সহজলভ্য দুটো চোখ আপনার হয়ে অন্য কথা বলছিল।মধ্য রাতে আপনার গরম নিশ্বাস আর শুয়ে থাকা পাশের মানুষটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকা থেকে,প্রভাতের নির্বিকার ভঙ্গি আমাকে আমার সম্পর্কে আপনার কাছে এমন স্পর্শকাতর বিষয়েও বলতে সাহস দিচ্ছে।

আমি কিছু বলতে পারছিলাম না।ভেবেও পাচ্ছিলাম না কি বলা যায়।তবে এটাও সত্য,রূপকের ইনট্যুইশন বা চোখের-ভাষা পড়ার ক্ষমতা হুমায়ুনের হিমুর থেকে কম নয়।আমি স্বাভাবিক থাকতে চেষ্টা করতে লাগলাম।একটু মুচকি হেসে দিয়ে বললাম,

-রূপক তুমি তোমার সম্পর্কে না বলে আমাকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ছ।

-না না,বলছি।শুনুন।যেদিন আপনি রাস্তায় আমাকে দেখেছিলেন,সেদিন আমার আর আরহামের ইংল্যান্ডে চলে যাওয়ার কথা ছিল।আমাদের বাসা আর ওর বাসার মধ্যকার দূরত্বটা দু-তিন কিলোমিটারের বেশি নয়।যাই হোক,কথা না বাড়িয়ে সংক্ষিপ্ত ভাবেই সবকিছু আপনাকে বলি।তবে আমার আর ওর এই কাছে থাকাটাই আমাদের দুজনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।ও আমার প্রেমে পড়েছিল কখন জানেন?আমাদের কলেজের প্রফেসর একদিন আমাদের ল্যাবরেটরিতে ক্লাস নিচ্ছিলেন,সেদিন আরহামকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন।ইংল্যান্ডের কোনও একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওর লেখাপড়া।তখন আমি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।আরহাম ল্যাবরেটরিতে আসার পর,রসায়নের বিক্রিয়া আর পদার্থের সূত্র প্রয়োগের থেকেও ব্যবহারিক পড়াশোনার গুরুত্ব বুঝাচ্ছিল।স্মার্ট একটা ছেলে এমন ফ্রেন্ডলি আচরণ করছিল সবার সাথে,নিমিষেই সবাই ওর কথাবার্তায় মনোযোগের সাথে ডুবে গেল।আমার একটু অন্য মনস্কতা দেখে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমার কাছে এসে ও বলল,

-তোমার কী আমাকে পছন্দ হচ্ছে না?

আমি বেশ হকচকিয়ে উঠলাম।কাঁচুমাচু করেও কিছু বলতে পারছিলাম না।

ল্যাবের সবগুলো স্টুডেন্ট হেসে বিষম খেতে লাগল।স্যারের উপস্থিতিতে আমি এ-যাত্রায় কঠিন একটা লজ্জার হাত থেকে বেঁচে গেলাম।স্যার তার ভাতিজার নানান প্রশংসা করতে লাগল।গণিতে কখনও পঁচানব্বইয়ের কম পায়নি,জেলা পর্যায়ে ফার্স্ট হয়ে বৃত্তি পাওয়া,স্কলারশিপ পেয়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমানো-সহ নানান খেজুরে গপ্প জুড়ে দিল।আমার পুরো শরীরে তখন রাগের আগুন।আরহামকে তথা স্যারের ভাতিজাকে কিছুটা বোকা না বানালেই নয়।আমি স্যারের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওনার ভাতিজার উদ্দেশ্যে একটা প্রশ্ন রাখতে চাইলাম।আরহাম সাবলীল ভঙ্গিতে বলল,

-কী বলবে বলো।

-আচ্ছা ধরুন,একটা অন্ধকার ঘরে চারটা হ্যারিকেন আছে।প্রচন্ড বাতাসে একটা হ্যারিকেন নিভে গেল।ওখানে এখন কয়টা হ্যারিকেন আছে?

-তিনটা।

-হলোনা।হ্যারিকেন চারটাই আছে।বাতাসে একটা উড়ে চলে যায়নি।শুধুমাত্র নিভে গেছে।আপনি আমার এই সহজ অংকটা পারলেন না।

এখন আর কেউ হাসল না।ঝুম বৃষ্টি পড়ার আগে পরিবেশ যেমন স্তব্ধ হয়ে যায় ঠিক সেইরকম স্তব্ধ হয়ে রইল পুরো ল্যাবরেটরিটা।কাচের গ্লাস গুলোও মনে হচ্ছিল থ মেরে গেছে।স্যারও কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।আমি নিজেই শুধুএকগাল ঠেলে হেসে দিলাম।

আমাকে আরহাম ফলো করছিল কিনা তা আমি জানতাম না।তবে দু-মাস পর ফেইসবুকে ওর সাথে নতুন করে পরিচয় হয়।সেখান থেকে কথাবার্তার পরিমাণ বাড়তে থাকে,একসময়ে ফোনে কথা বলতে বলতে রাত পেরোত।কখনও কখনও ছুটির দিনটাও ফোনে কেটে যেত।এরই মাঝে সে একদিন দেশে এল।তার ভেতরে চেপে রাখা সত্যটা আমাকে জানিয়ে দিল।বলল ‘ভালবাসি’।

আমার বুকের একপেশে হয়ে একটা ব্যথার উপদ্রব দেখা দিল।আমি চুপচাপ হয়ে বসে রয়েছি;এবং রূপকের ভালবাসার গল্পও শুনে যাচ্ছি।কিন্তু ব্যথা এল কোত্থেকে তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

-আচ্ছা,তারপর?

-তারপর আরহামের চাচার ফ্ল্যাটে আমার অবাধ যাতায়াত শুরু হল।ওর ফ্যামিলি তখন ইংল্যান্ডে।আমি আর আরহাম আমাদের সবথেকে মধুর সময় গুলো পার করতে লাগলাম।সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠামাত্র চোখ বুজে রেখেই ওকে শুভেচ্ছা জানানো হত সকালের।মুখ না ধুয়েই চুমু খেতে হতো।তবে সেইসব আমরা আমাদের মধ্যেই রাখতে পারছিলাম না।আরহামের চাচার ফ্যামিলির লোকজনের দৃষ্টি এড়াতে হবে।আমাদের নতুন সংসার তৈরি করার উদ্যোগ মাথায় এলো।তাই ভাবলাম পরীক্ষা তো শেষই।ভালবাসাকে জয় করতে দেশ ত্যাগ করবোই না হয়।যেদিন সকাল দশটায় ফ্লাইট ছিল,সেদিন রাতেই আরহামের নির্দেশ অনুযায়ী সবকিছু খুলে বললাম ঘরে।কিন্তু তাদের খিপ্ত প্রতিক্রিয়া এতটাই হিংস্র ছিল যে,আমাকে একটা রাতপর্যন্তও নিজ ঘরে থাকতে দেওয়া হয়নি।তখন আমার মনের অবস্থাটা এমন হয়েছিল যে,আরহামকেও কিছু জানানোর প্রয়োজনবোধ করছিলাম না।আচমকাই নির্ভরতা আর মিথ্যে-মায়ার কঠিন ব্যাপারটা আমার কাছে মৃত্যু-যন্ত্রণা থেকেও অধিক কষ্টের মনে হতে লাগল।স্টেশনে বসে বসে রাতটা কাটিয়ে দিলাম।ভেবেছিলাম মাথা দিয়ে ফেলি কোনও একটা গাড়ির নিচে।কিন্তু অপর প্রান্তে থাকা মানুষটার ভালবাসা-মাখা কণ্ঠটা শুনেই মনটা কেমন গলে যেতে থাকল।ছোট্ট একটা নীড় তো আছে, সেই প্রত্যাশায় শক্তি খুঁজে পেলাম।সেই আশ্বাস আর ভরসা ক্ষীণকায় মনে হয়েছিলনা কখনও।কিন্তু যখন জড়িয়ে থাকা শেষ খুঁটিটাও ভেঙে গেল,ভালবাসার সাথে বিশ্বাসেরও স্থুলন ঘটল,তখন নিজেকে সামলে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হলনা।

স্তব্ধতার সঙ্গে রূপকের এমন গল্পকেও হার মানানো জীবনী শুনতে শুনতে চারপাশ ঝাপসা দেখতে শুরু করলাম।আমার কিছুক্ষণের জন্য মনে হচ্ছিল,এই কষ্ট গুলো যেন আমাকেই স্পর্শ করে গেল খুব গভীরভাবে।অদ্ভুত ভাবে এটাও কামনা করছিলাম,এই কষ্টের বোঝা যদি কিছুটা বইতে পারতাম ওর হয়ে,যদি কিছুটা হাল্কা করতে পারতাম ওর ভারাক্রান্ত হৃদয়টা।

আমি বুঝতে পারলাম যে,আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি।তাই ঘোর কাটিয়ে রূপককে জিজ্ঞাসা করলাম,

-আচ্ছা রূপক,সেদিন কী হয়েছিল?

-আরহাম আসেনি।

-তো?তখনই তুমি আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে?

-এছাড়া বাঁচার আর কোনও উপায় ছিলনা।আমি তো মরতে চাইনি।চেয়েছি সব জটিলতা থেকে নিজেকে মুক্তি দিতে।

-আরহাম আসেনি কেন সেটা জেনেছ তো?

-সেই সুযোগটাও আরহাম রাখেনি।যদি ওর ফোনে কল যেত,তাহলে ওর ফোনের কল লিস্টে শতাধিক ফোনকল পাওয়া যেত।

-হুম।তোমার মধ্যে আবেগটা প্রচণ্ড পরিমাণে।

-আপনি আমাকে আবেগপ্রবণ বলছেন? বলবেনই তো।তবে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হননি তো কখনও,তাই এমন বলছেন।

যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করে,বিষাদ হয়ে দাঁড়ায় শক্ত দেয়াল,তখন এমন পুঁথিগত বাণী শোভা পায়না।তবে আপনার ভুল ধারণা ভাঙার জন্য আমি প্রার্থনা করব,জীবন আপনাকেও যেন কণ্টকাকীর্ণ মুহূর্ত চাক্ষুষ করায়।

আমার হাসি চলে এল রূপকের কথায়।ফিক করে হেসে দিয়ে বলি,

-করো।দু-হাত তুলে প্রার্থনা করো।আচ্ছা,তুমি আরহামের বাসায় গিয়ে খোঁজ নাওনি?

-ওদের বাসায় আমাকে নিয়ে কানাঘুষা চলছিল।আরহামেরও নিষেধ ছিল।ওরা আমাদের সন্দেহের চোখে দেখছিল।তাই যাইনি।কিন্তু খোঁজ নিয়ে শুনেছিলাম সে বাসায় নেই।

-হতে পারে আরহাম কোনও একটা কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিল।

-এমন কোনও কাজ আরহামের থাকতে পারেনা।কারণ ও বাসা থেকে বের হওয়ার ঘণ্টা তিনেক আগেই আমাকে ফোন করে স্টেশনে অপেক্ষা করতে বলেছিল।

-ঘণ্টা তিনেক!তিন ঘণ্টায় কত কী হয়ে যেতে পারে তা তোমার ধারণা আছে?

রূপক এবার কথার পিঠে কথা ঠেকাল না।কেমন পরাজিত দৃষ্টি নিয়ে কিছু একটা ভেবে যেতে লাগল।আমি ওকে ভাববার সময় দিয়ে উঠে চলে এলাম।

-স্যার,৪নং বেডের পেশেন্টকে তো আজ রিলিজ দেওয়ার কথা।কিন্তু রোগীর অবস্থা কেন জানি ততটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।আরও দুদিন থাকতে হবে মনে হচ্ছে।

স্যার চোখ কটমট করে নার্সের দিকে তাকালেন।যদি চোখ থেকে আগুন বের হওয়ার সুযোগ থাকত,তাহলে নার্স হয়তো এতক্ষণে ভস্ম হয়ে যেত।

-তুমি যাও।আমি দেখছি।

নার্স ঘাড় নিচু করে চলে গেল।আমাদের ব্যাচ ভর্তি স্টুডেন্টসদের দিকে তাকিয়ে স্যার কিছু একটা খুঁজতে লাগলেন।আমাদের মেডিক্যাল শিক্ষা দানে ওনার অবদান অনস্বীকার্য।সাদা মনের মানুষদের কোনও তালিকা করলে স্যারের নামটাই সবার উপরে স্থান পাবে।

স্যারের দৃষ্টি এসে পড়ল আমার উপর।কিছুটা আন্তরিকতা মিশ্রিত কণ্ঠে বলতে লাগল,

-পলাশ,ক’দিন পরই তো ডাক্তার হয়ে বেরোবে।যাও তো,৪নং বেডের পেশেন্টের অবস্থা একটু দেখে আসো।

আমি হাসিমুখ করে বললাম,

-জ্বি স্যার।

রোগীটার বেডে এসে ওনাকে দেখতে পেয়েই আমার অস্বস্তি লাগতে শুরু করল।আমার বয়সী একটা ছেলে বিছানায় এমনভাবে ছটফট করছে,দেখতেই কেমন শোভাহীন লাগছে।মাথার একপাশ কীভাবে যেন থেঁতলে গেছে ছেলেটার,একটা হাতে প্রচণ্ড আঘাত করা হয়েছে,যার ফলে ছেলেটা হাতটা নাড়াতেও ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে।কাকতালীয় ভাবেই আমার চোখ জলে ভরে উঠল।স্যারের থেকে অনুমতি নিয়ে আমি ছেলেটাকে সুস্থ করার দায়িত্ব নিলাম।

বেশ ক’দিন কাটার পর ছেলেটা আমার খুব আপন কেউতে পরিণত হল।আমি অদ্ভুত ভাবেই ছেলেটার প্রতি একটা টান অনুভব করছিলাম।মায়া পড়ে যাওয়ার কারণটার মধ্যে একটা কারণ হল,ওর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা।সেটা শুনেই আমি দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম।ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে ছেলেটার এমন নির্মম অবস্থা হয়েছে।কিন্তু এতকিছুর মাঝে সবথেকে অবাক করার মত বিষয় হল,ছেলেটাকে জোর করে হাসপাতালে রাখতে হচ্ছে।কীসের একটা তাড়া ওকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছেনা।শেষমেশ কিছুটা সুস্থ হওয়ার পরপরই নাছোড়বান্দা হয়ে ওকে রিলিজ করে দিতে সিদ্ধান্ত নিতে হল।মেডিক্যাল শেষে বাসায় ফিরতে যেতেই মনে হল ৪নং বেডের ছেলেটা কি এখনো রয়েছে?একটু দেখে আসব বলে ওর কেবিনে গেলাম।ছেলেটার বেডে কাউকে দৃষ্টিগোচর হলনা।ভীষণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে ধীরে ধীরে কেবিনে প্রবেশ করলাম।হাতে একটা ফাইল নিয়ে নার্স এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

-আজ সকালেই রিলিজ করে দেওয়া হয়েছে ছেলেটাকে।

আমি সন্তর্পণে ফাইলটা হাতে নিয়ে চোখ বুলাতে লাগলাম।প্রেশেন্ট সাইনে গিয়ে আমার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল,’আরহাম’।এই ছেলেটাই রূপকের আরহাম নয়তো?আমার হতভম্ব চেহারা দেখে নার্স এগিয়ে এল।

-ওনার ফ্যামিলির লোকজনই ওনাকে নিয়ে গেছে।

চরম ব্যর্থতায় আমার অসহায় মনে হতে লাগল নিজেকে। রূপকের একয়দিনের বিষাদমাখা মুখটা দেখলে নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভবপর হয় না।কতবড় একটা আক্ষেপ রয়ে গেল।রূপকের সুখোৎস আমার সহাবস্থানে থেকে গেল এতটাদিন,অথচ আমি ঘুণাক্ষরেও টের পেলাম না।

পুরোটা দিন আমার এলোমেলো গেল।বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে মেডিক্যাল থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সিতে উঠতে যেতেই পেছন থেকে কেউ ডেকে উঠল,

-হ্যালো!

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই আরহামকে দেখতে পেলাম।মনে হল বুক থেকে একটা পাথর সরে গেছে।সারাটা বিকেল যেই পাথুরে ব্যথা সইতে হয়েছে।

-আপনি আমার সম্পর্কে কেমন ধারণা পোষণ করেছেন তা আমি বুঝতে পারছি।হয়তো ভাবছেন লোকটা কেমন অকৃতজ্ঞ।যার সুস্থ হয়ে উঠায় আপনার

কেয়ারফুলটাই মুখ্য ছিল,সে কি-না জানিয়েও গেল না!একটা থ্যাংকস পর্যন্ত দিল না।

-আরে এসব কী বলছেন!এমনটা কখনওই ভাবতাম না।আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি মাত্র।এটা আপনি অনেক বড় কিছু ভেবে নিচ্ছেন।

-আসলে কী জানেন,একটা অস্থিরতায় কেটেছে হসপিটালের সবক’টা দিন।সেদিন যদি রাস্তায় দুর্ঘটনাটা না ঘটত,তাহলে আজ হয়ত ইংল্যান্ডে থাকতাম।কিন্তু…

আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল আরহাম।আমি তার মুখের কথা টেনে নিয়ে বলতে লাগলাম,

-রূপক কে হয় আপনার?

-আপনি রূপককে চেনেন?

-হ্যাঁ।রূপক আমার কাছে আছে।

-মানে?বুঝলাম না ব্যাপারটা।

-আপনার প্রিয় মানুষটা আমার কাছে রয়েছে।একটা কাজ করুন,আপনি আমার সাথে আমার বাসায় চলুন।

আরহাম প্রবল আগ্রহ নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।আমি বললাম,

-রূপকের মুখ থেকে আমি সব শুনেছি।তবে ওর মধ্যে এখনও একটা ভুল ধারণা বিদ্যমান।সেটা ভাঙতে আর সময় লাগবে না।ও ভেবেছিল আপনি ওকে ঠকিয়েছেন।

-আপনি সত্যি বলছেন তো?

কথায় সম্পূর্ণতা না এনেই আরহামের নাকমুখ ভেদ করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোল।ওর চোখদুটোও কেমন ছলছল করে উঠল।বেশকিছু মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে নিজের আনন্দ-অশ্রুকে এড়িয়ে সে বলতে লাগল,

-স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার নেই।তবে কী জানেন,আমার সম্পর্কে এমন ধারণা করাটাই স্বাভাবিক ছিল।

আরহাম প্রবল অস্থিরতার সঙ্গে ড্রাইভারকে বলতে লাগল,

-তাড়াতাড়ি চলুন না ভাই।

আমি একটু হেসে দিয়ে বললাম,

-এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই।আমরা এগোচ্ছি তো।

বাসায় এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বেল চাপতেই রূপক দরজা খুলল।আমি ওর গভীর-নির্বিকার ভঙ্গি উপেক্ষা করে বলি,

-মানুষ সবসময় সঠিক থাকেনা।মানুষ আধ্যাত্মিক কেউ নয়।তার ভুল থাকবেই।আর সম্পর্কের ব্যাপারে ভালবাসার পূর্বে বিশ্বাস বস্তুটা স্থাপন করতে হয়।আরহাম তোমারই ছিল।

এরপর আমি আর দাঁড়িয়ে থাকিনি সেখানে।চুপিচুপি নিজেকে সরিয়ে আনলাম।ওয়াশরুমে ঢুকে নিজেকে বদ্ধ করে নিলাম কিছু অনিয়ন্ত্রিত মুহূর্ত হতে।বাইরে রূপক আর আরহাম তাদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান করে নিক।আমি অবসান করি কিছু গ্লানির,কিছু সীমাহীন দুঃখের।

আরহাম তার বাসায় চলে গেল।প্রায় বিকেল ঘনিয়ে এনে সে বিদেয় হয়েছে।ওদের কান্নার শব্দ শনশন করা পানির শব্দকে ভেদ করছিল।তখন নিজেকে বুঝিয়ে নিলাম ওদের ভালবাসার কাছে আমার ভালবাসা কেমন শোভাহীন,নিতান্ত সস্তা,পঙ্গু।

রাত হয়ে এল।পরিবেশের নিস্তব্ধতা আমাকে সঙ্গ দিতে লাগল।হঠাৎ করেই রূপক আবদার রাখার ভঙ্গিতে বলল,

-শুনুন,আরহাম আর আমি কাল ইংল্যান্ড চলে যাচ্ছি।আরহাম বলেছে আপনি যেন আমাকে স্টেশনে পৌছে দিয়ে আসেন।সে নিজেও আপনাকে দেখতে চায় শেষবেলাতে।

আমি একটু মুচকি হাসলাম,মনে হচ্ছিল কঠিন একটা ঝড়কে প্রতিরোধ করে একটু রোদের ঝলক দিতে ব্যর্থ চেষ্টা করলাম।

আজকের বিকেলটা একদমই অন্য রকম।সম্পূর্ণই ভিন্ন একটা রূপ ধারণ করে আছে।যেন অন্য কোনও এক পৃথিবীর প্রকৃতি আজকের দিনটাতে মিশে রয়েছে।নীরব,বিবর্ণ,সাথে নৈঃশব্দ্যের আবছায়া।

আমি আর রূপক হেঁটে চলেছি।রূপকের মুখে প্রাপ্তির ঝলক।আমি এক-কদম পিছিয়ে থেকে ওকে দেখে যেতে থাকলাম।ইচ্ছে করছিল শেষের সময়টাতে ওর হাতটা চেপে ধরে হাঁটি।তখনকার অধিকারটা এমন হোক যে,এই হাতটা আমারই ছিল,আমিই এই হাতটা চেপে ধরে হাঁটার মানুষ।

সেসব ভেবেই আমার মলিন মুখটা আমার বিপরীতার্থে চলে গেল।আমি স্বাভাবিক থাকতে চেষ্টা করতে লাগলাম।চোখ দুটোকে তিরস্কৃত করতে থাকলাম।শীতল হতে বারণ করতে লাগলাম।মাসুল দেওয়া যায় না এমন ভুল সে করেছে,আবারও কেন জল ঝরিয়ে ভুল করবে!

ভাল লাগার পরিণতি কখনওই ভালবাসায় রূপান্তর করা ঠিক নয়।আমি তো এমন বোকামি করার মত কেউ না,তারপরও কীভাবে এতবড় ভুলটা হল!

তবে তীব্র ভাললাগা কখনও কখনও ভালবাসারও ইঙ্গিত বহন করে।আমার ভাললাগাটাও হয়তো সেই রকম।থাক,সেদিকে আর না এগোই।আমি আমার ফেলে আসা পথের দিকে তাকালাম।মনে হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি আজকের এই চেনা পথটুকু শেষ হয়ে যাচ্ছে।অল্প থেকেও কম,স্বল্প মনে হচ্ছে পথের সীমানাটাকে।একটু সামনেই তো স্টেশন।এত দ্রুত কেন ফুরিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই পথচলাটা।আমার মনে হতে লাগল,পৃথিবীর সময়-গতিকে নিরন্তর করে দিতে,অন্তহীন করে দিতে এই সংক্ষিপ্ত পথটাকে।আমার আর আমার প্রিয় এই মানুষটার পথচলাটা যেন কখনওই শেষ না হয়।কখনও যেন দেখতে না হয় সে আমার পাশে নেই।গন্তব্য যেন

কখনওই দৃষ্টিসম্মুখ না হয় আমাদের।আমরা শুধু হেঁটেই চলব।কেউ কারো হাত চেপে ধরব না;তবুও দুজন পাশাপাশি থাকব।অলীক এক জগতে আমাদের প্রেম গভীরতর হয়ে দুজনকে মদিরতায় ডুবিয়ে রাখবে।তারপরও তো তাকে না দেখে সময় পার করতে হবেনা।

আমি সেসব ভেবে যেতে থাকলাম।জগতকে বললাম,তুমি স্থির হয়ে যাও,আমাদের পথচলাটা এখানেই শেষ করে দিও না।এক-পা,দু-পা করে পা ফেলার গতিটাকে আমি আরও কমিয়ে দিলাম।এই পথটা সীমাহীন হলেও পারত।…….

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.