নিশিপ্রেম

লেখক- আরভান শান আরাফ।

বিঃদ্রঃ ঘটনাটি ‘তারেক ভাই’ এর জীবন থেকে নেয়া।

২০০৮ সাল । দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে যেত ।চিৎকার করে জেগে ওঠতাম ।মা পাশের রুম হতে ডেকে ওঠতো ।বলতো পানি খেতে ।আমি ঢক ঢক করে পানি খেতাম ।পানি আমার ভয় দূর করে শান্ত করে দিত ।আমি শুয়ে পড়তাম ।।আর ঘুম আসতো না ,জেগে থাকতাম ।স্বপ্নে দেখা সেই কথা আর চোখ গুলো ভাবতাম । যেদিন ,স্বপ্ন দেখতাম ঐদিন সারা দিন আর কিছু ভাল লাগতো না ।খেতে ও ইচ্ছে হতো না ।চুপচাপ বসে থাকতাম ।বাবা মা অনেক ডাক্তার দেখাল কিন্তু ফল তার মহাশূন্য ।

আমিও খোঁজে পেতাম না সেই স্বপ্নের মানে ।এইভাবে একটা বছর গেল । ২০০৯ সাল । এক বছর আগে দেখা স্বপ্নের চেহারাটা আরো স্পষ্ট হচ্ছিল ।আরো হতাশ হচ্ছিলাম ।কোন উপায় খোঁজে পাচ্ছিলাম না ।স্বপ্ন যখন দুঃস্বপ্ন হয়ে যায় তখন চোখে মুখে ছাপিয়ে ওঠে ক্লান্তি ।সেই ক্লান্তি আমাকে ক্লান্তই করে দিয়েছিল ।আমি ক্লান্ত ছিলাম ।মসজিদের ইমামের কাছে স্বপ্নের কথা বললাম ।ওনি একটা তাবিজ দিল ।আমি তা বা হাতের বাহুতে বাঁধলাম ।ফল কিছুই হলো না ।দুঃস্বপ্ন একি রয়েই গেল । ঐ একি সালের একদিন ভোরে নিদ্রাভঙের দায়ে ফজর নামাজের পড় নদীর দিকে হাঁটতে বেড়েয়েছিলাম ।

মনটা খুব ফুরফুরে ছিল আর চোখে ছিল খুব ঘুম ।ঘুমে চোখ বুজে আসছিল ।হাঁটা থামিয়ে বাড়ি ফিরে আসছিলাম ।লক্ষ্য একটাই আর তা ছিল বাড়িতে এসে ঘোমানো ।আমি পথ চলছিলাম ভর আনমনে ।কবে যে মুল রাস্তা ছেড়ে বাড়ির দিকের ছোট রাস্তায় এসে পৌঁছলাম তার খেয়াল ছিল না ।বাড়িতে পৌছার মিনিট খানেক আগে আমি ভয়ে আৎকে ওঠলাম ।না ,ভূতের ভয় না ।গত দু বছর যাবত যে একটা চেহারা স্বপ্নে দেখে আসছিলাম সেই চেহারাসহ লোকটা আজ আমার সামনে দিয়ে চলে গেল ।আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল ।আমার চোখে মুখে বিষন্নতা ছাপিয়ে ওঠল ।

হায় ইশ্বর আমি জ্ঞান হারাবো না তো ! বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়লাম ।ওঠলাম বেলা ১০ টার দিকে । তখন যাকে দেখলাম তাকে স্বপ্নে দেখেছি নাকি বাস্তবে তার সঠিক বুঝটা আসেনি । তারপর অনেক মাস কেটে গেল ,। ঐদিনটা একটু অন্যরকম ভাবেই শুরু হয়েছিল ।ভার্সিটি যাওয়ার জন্যে ঘর থেকে বের হতেই বাড়ি হতে আম্মুর কল আসলো ,ভার্সিটি না যেতে ।বাড়িতে মেহমান আর আমার প্রচুর কাজ । কি আর করার বেচারা আমি বাড়িতেই গেলাম । বাড়িতে গিয়ে দেখি এলাহী কান্ড ।খালাতো বোন ,তার স্বামী ,দেবর আর তাদের ছোট বাচ্চা ।শুনেছি ,তাদের দেবর এসেছে কিন্তু দেখার ফুরসত হয়নি ।দেখার ফুরসতটা হয়েছিল রাত্রে ।তার নাম অনিক ।

তার সাথে ভাল পরিচয় ই হলো । ২০১০ সাল । আমি অনিকের সাথে বসে কথা বলছিলাম ।তার মোবাইলটা আমার হাতে ছিল ।আমি তার মোবাইলে তুলা ছবিগুলো দেখছিলাম ।হঠাৎ ,একটা ছবি দেখে অনিকের পাশের লোকটাকে চেনা চেনা লাগছিল খুব । হ্যা ।সে আর কেউ ছিল না ,ছিল আমার স্বপ্নে দেখা ঐ মুখ ।আমি অনিকের কাছে তার পরিচয় জানতে চাইলাম ।তার নাম তারেখ ।বর্তমানে সৌদী আছে ।গত মাসে গেছে । অনিক সন্দেহ করতে পারে তাই আর বেশি কিছু জানতে চাইলাম না । আমি যাকে ভেবে ভেবে আজ এতোগুলো বছর গত করেছি ।

যার সন্ধান পাগলের মতো করেছি ।আজ আমি তার পরিচয় জানি ।তাকে আমি চিনি ।বুদ্ধি খুলল মাথার ।ফেবুতে অনিকের ফ্রেন্ডলিস্ট হতে অনেক খোঁজে তাকে এডদিলাম ।বন্ধু আমার তখন খুব ব্যস্তছিল ।আমাকে ঝুলিয়ে রেখেছিল পাঁচদিন ।তারপর একদিন একসেপ্ট করলো আর মেসেজ ও করলো । আমাদের চ্যাটিং শুরু হলো । তাকে যত দেখতাম ততো ভাল লাগতো ।ভাল লাগতো ভার্সিটির ক্লাসগুলো মিস করে তার সাথে চ্যাট করতে ।ভাল লাগতো তারিখের কথা ভাবতে ।তখন আমার ফেচবুকে ফ্রেন্ড ছিল সীমিত ।এই সীমিত ফ্রেন্ডের মধ্যে দুজনের সাথে চ্যাট হতো অনিক আর তারিখের সাথে ।

২০১১ সাল । ভার্সিটি থেকে পাস করে চাকরির ইন্টারভিউ নিয়ে ব্যস্ত ।অতীতের দুঃস্বপ্নগুলো তখন আর দেখি না ।তখন সব বাস্তব ।যাকে স্বপ্নে পেয়েছিলাম তাকে এতো কাছে পাব ভাবিনি । আমি তারিখকে ভালবাসতাম ।তা কোন দিন তাকে বলতে যায়নি ।তা বলার ও প্রয়োজন পড়েনি ।কারন ,আমি সমকামী তা ঠিক কিন্তু তারিখ তো নাও হতে পারে ।হতে পারে সে সমকামীদের ঘৃনা করে ।তাই আর বলতে যায়নি নিজের মনের কথাগুলো ।যদি যাকে বন্ধু করে পেয়েছি সে জীবন থেকে হারিয়ে যায় ?এই ভয়ে ।দুই বছর একটা টানা ফেচবুকে বন্ধুত্বের পর ঐ সালের শেষের দিকে সে স্বদেশে ফিরে আসে ।আমি তখনো জানি নি । ১০১২ সাল ।

জানোয়ারির প্রথম তারিখে অফিস করে বাড়ি ফিরব তখন অনিকের ফোন ।ফোনটা অনিকের ছিল কিন্তু যে কল করেছিল তাকে চিনি নাই ।একট ভদ্র পৌরষালী ভারী কন্ঠস্বর । ।।আবির বলছু ? ।।হ্যা ।কিন্তু আপনাকে তো চিনি নাই ? ।।চিনতে হবে না ।অনিকের বাসায় আসু । বলেই ফোনটা কেটে দিল । কে হতে পারে এই চিন্তা করতে করতে অনিকের বাসায় গেলাম ।দরজা খুলল অনিকের ভাতিজি ।আমাকে দেখে মহাখুশি ।আমি গালে ধরে টান দিয়ে ভেতরে ঢুকে আমি মহাখুশি ।একেরে ?এ তো দেখে আমার স্বপ্নে দেখা রাজ পুত্র । তারেখকে দেখে আমার মন ভরে গেল ।

সে সোফা ছেড়ে ওঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো । সেইবার ই প্রথম আলাপ আমাদের সরাসরি । ঐদিন প্রথম বারের মতো মনে হয়েছিল যে আমি হ্যাপি ।আমি আজো ঐ একি রকম হ্যাপি । সেদিন আমরা দুজন বসেছিলাম ছাদে ।পাশাপাশি ।তার গা ঘেষে বসেছিলাম আমি ।তার একটা হাতছিল আমার আরেকটা হাতে ।বারবার ইচ্ছে করছিল তাকে বলতে যে আমি তাকে ভালবাসি কিন্তু আটকে যাচ্ছিলাম ।তারেখ মুখ খুলল ,বলল আবির আমাকে বিয়ে করতে বলছে ।আমি কি করব ?আমি তার দিকে ফিরে তাকালাম ।তার চেহারাটা বিষন্নতার কালীতে ঢেকে গেছে ।

কী বলব বুঝতে পারিনি ।চোখে জ্বল চলে এসেছিল ।তারেখ দেখে ফেলবে এই ভয়ে চলে এলাম ছাদ থেকে নেমে পায়ে হেঁটে নিজের বাড়ি । ঐদিনের মত কষ্ট আর কোন দিন ও পায়নি । ইচ্ছে করছিল মত খেয়ে পড়ে থাকি ।যদি কষ্টটা ভুলা যায় ।তখনো ও বলতে পারিনি যে আমি তাকে ভালবাসি । দুদিন পর ।খুব ভোরে তারেখের ফোন আসলো ।আমি ঘুম ঘুম চোখে ফোন তুলতেই সে বলল দরজা খুলতে ।আমি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললাম ।সে ঝাপিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো বাচ্চা ছেলের মতো । যাকে এতো ভালবাসি সে কাঁদছে দেখে আমার চোখের পানি আটকাতে পারিনি ।সে কাঁদা থামাল .আমার গালে হাত রেখে বলল আবির আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারবো না ।আমি তোমায় ভালবাসি । আমি পারবো না তোমায় ছাড়া থাকতে। তারেখের মনের আটকানো আবেগ আর তার উপছে পড়া ভালবাসা ঐদিন আমায় ভালবাসার দর্পনে এক সুখের বিম্ব দেখালো । ২০১৪ সাল । আমি আর তারেখ বর্তমানে ইউরোপের একটা দেশে এক সাথে আছি । যেখানে ভালবাসার মুল্য নেই সেখানে থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল ।আমি আজ খুব সুখি ।আমাদের ছোট সংসার যা ভালবাসার তৈরী তা নিয়ে আমি সত্যিই সুখি।

প্রথম প্রকাশ-সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.