পঞ্চত্বপ্রাপ্তি

লেখকঃ-ঘাসফড়িং

ভোর হতে কি না হতেই ঘুম থেকে উঠতে তাড়া দিতে শুরু করল মা।কিন্তু আমি সেই নির্লজ্জ বিড়ালের মতই বিছানাতে কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে রয়েছি।শুনেছি বিড়ালরা নাকি নির্লজ্জ হয়।

রাতে ঘুমোবার আগে মাকে বলেছিলাম যেন খুব সকালে ডেকে দেয়।কিন্তু এখন নিজেই মাকে শত্রু মনে করছি।তা ভেবেই চোখের কোণ কিছুটা সংকুচিত হল।আড়মোড়া ভেঙে দিয়ে বিছানা ত্যাগ করি।ফ্রেশ হয়ে এসে নাশ্তার টেবিলে বসি।নাশ্তার টেবিল আমাদের বরাবরই লোকশূণ্য থাকে কিছুটা।বাবা-মা আর আমি।

খাওয়া শেষে ক্লাসের পড়ায় একটু নজর বুলিয়ে কলেজের ব্যাগ গোছাতে থাকলাম।ড্রেস পড়ে বাবার সাথে কলেজের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ি।

আমার বাবা একজন রাজনীতিবিদ।সেই সুবাদে সব জায়গাতেই ওনার পদস্থ স্থানটা উঁচুতেই।কলেজের সামনে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে বাবা বিদায় দেয় আমাকে।পরিবারের একমাত্র ছেলে হিসেবে আমার উপর বাবা-মা আস্থাশীল হতে পারেনা।সংশয়ে থাকে প্রতিমুহূর্ত।কখনও কখনও সেসব ভেবে হাসিও পায়;এত স্নেহ-ভালবাসা আর কড়াশাসন খুব কম সন্তানই পায়।

কলেজের গেটে একবার নজর ছুঁড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চিন্তার জগতে হারিয়ে যাই।যেদিন প্রথম এই কলেজে বাবা আমাকে সাথে করে এডমিশন নিতে আসে,সেদিন কিছুটা অপদস্থ হতে হয়েছিল ওনাকে।মন্ত্রীর ছেলে হয়েও,জিপিএ ফাইভ পেয়েও ওয়েটিংয়ে থাকতে হবে কেন সেটাই ছিল বাবার ক্ষোভের কারণ।কিন্তু রুলসের বহির্ভূত কেউই নয়।তা মেনে নিয়েই কলেজের নীতি মানতে হয় বাবাকে।সেদিনই আড়চোখের দৃষ্টিতে পড়ি অনার্স বর্ষের ছাত্র রাতুলের।পুরো ক্যাম্পাসে ওর নাম শুনে সবাই চমকে উঠে।গানের গলা খুব ভালো।

প্রারম্ভিক অবস্থায় প্রায়শই ঘৃণা মিশ্রিত দৃষ্টি নিয়ে তাকাত আমার দিকে।যখন বাবার সাথে আমার কোনওরকম সামঞ্জস্যতা পেলনা তখন বোধহয় ওনার ধারণা পাল্টে গিয়েছিল। এরপর থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসে,রাস্তা-ঘাটে,শপিং মলে যেখানেই চোখে পড়িনা কেন;হেসে দিয়ে এসে সামনে দাঁড়ায়। গাড় কণ্ঠ নেড়ে বলে,

‘কেমন আছো মুন?’

সেই প্রশ্নের পিঠে তখন আমিও প্রশ্ন ঠুকে দিয়ে বলি,

‘আমার পুরো নামটাকে এভাবে বলেন কেন?’ তখন কিছুটা গম্ভীর গলাতেই বলত,’তুমি দেখতেও ঠিক তেমন।’

বেল বাজার শব্দে চিন্তার সুতো কেটে যায় আমার।দ্রুত গতিতে পা চালিয়ে গেট পেরোই।

-এত তাড়াহুড়োর জো থাকলে তুমি অনেক আগেই উঠতে মুনতাসির।যাও নাশ্তা রাখা আছে টেবিলে,খেয়ে নাও।

-মা আজ আর সময় নেই।আপনি খাওয়ার কথা বলবেন না আজকে অন্তত।

-তোমার বাবা শুনলে ক্ষেপে যাবে।তোমাকে একটা কিছু মুখে দিতে হবে।

অগত্যাই একটা আপেলে দু কামড় বসিয়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ি।ড্রাইভার আংকেলকে তাড়ার পর তাড়া দিতে থাকি যলদি কলেজে পৌছার জন্য। বড্ড ঘুম কাতুরে আমি।আর এই বদভ্যাসের জন্য অনেক হ্যাস্তন্যাস্ত হতে হয়েছে।আজও সেরকম কিছুই লেখা আছে কপালে।মা সেই ভোরের প্রথম প্রহর থেকেই ডেকে গিয়েছেন।ঘুমটা বেশ জেঁকেই বসেছিল তাই উঠতে এত দেরি। গাড়ি কলেজের সামনে থামতেই গেটের দিকে ছুট দেই।গেট বন্ধ করে ফেলেছে যে!

যার জন্য এত তাড়াহুড়ো করে ছুটে আসলাম সেই গেটই বন্ধ হয়ে গেছে। সময়ের আগে না পৌছোতে পারলে যা হওয়ার তা তো হবেই।হয়ে আসছে এটা।

গেটের প্রশস্ত ছিদ্র দিয়ে দারোয়ানকে বশ করতে চেষ্টা করেও কোনও লাভ হচ্ছে না।ওনি ওনার চাকরির ভয়ে নিয়মের বাইরে গেট খুলছেন না। আর এদিকে আমার চোখেমুখে প্রবল অস্থিরতা। হঠাৎ করেই কেউ একজন এসে দারোয়ানকে বলতে লাগল,

-চাচা গেট খুলুন।

চাচা সেই এক রীতিতেই অটল।হঠাৎ করেই ছুরিকাঘাত শুনতে পেয়ে ছিদ্রের বাইরের দিকে দৃষ্টি ফেলেই রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে যাই কিছুটা।রাতুলের হাত কেটে গেছে খানিকটা।রক্তমাখা ছুরিটা ওর হাতেই।

-ডাক্তারের কাছে যাব।এবার তো খুলবেন নাকি?

রাতুলের ঝাঁঝাল কণ্ঠস্বর থেকে উক্তিটা বেরোয়।

গেটের ওপার থেকে কথাটা কানে আসতেই কিছুটা হকচকিয়ে উঠলাম আমি।এসব কি করছেন ওনি?নিজেই নিজের হাত কেটে দিলেন যে! চিন্তিত

অবস্থাতেই গেট পেরিয়ে বেরিয়ে আসে রাতুল।ইশারায় বলে দেয় আমাকে,

-যাও।ঢুকে পড়ো।

আমার হা করে তাকানো দেখে কিছুটা হেসে উঠে ও। আমি সুযোগ পেয়ে গেট পেরিয়ে কলেজে ঢুকে পড়ি। আমাকে সুযোগ করে দিতেই কি রাতুলের এসব বিস্মিত করে দেওয়ার মত কাণ্ড ছিল? হাত কেটে ফেলল! অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা। এমনটা করার পেছনে ছেলেটার স্বার্থই বা কি ছিল? সারাদিন ভাবনার জগত জুড়ে এই উত্তরটাই খুঁজে বেড়াই।

-মুনতাসির!

-জ্বি বাবা।

-কলেজে নামিয়ে দেওয়ার পর সোজা ক্লাসে চলে যাবে।আর ফেরার সময় ড্রাইভার এসে তোমাকে নিয়ে যাবে।

-জ্বি।

-আর শোনো,কোনও মতেই কলেজের বাইরে পা দেওয়া চলবেনা।ঠিকাছে?

-জ্বি।

বাবার শাসনের পেছনে বরাবরই কোনও না কোন কারণ থাকে তা আমি জানি।আজকের এই নির্দেশের পেছনেও মোটাসোটা কারণই রয়েছে।হয়ত বাবার প্রতিপক্ষ দলের ভয়,না হয় অন্যকিছু।তবে যাই হোক,এর বিন্দুপরিমাণ আচঁও যেন আমাকে না পায় সে কারণেই আঠারো বছরের একটা ছেলের উপরও এত কঠোর নির্দেশ।

ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার জন্য গেটে দাঁড়িয়ে থাকি।মতিন আংকেল এখনও গাড়ি নিয়ে আসছে না যে!এমন তো হওয়ার কথা নয়।হাতে ফোন না থাকায় ফোনও করতে পারছিনা।একের পর এক স্টুডেন্টস কলেজ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।কেউ কেউ হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকছে তো কেউ কেউ উপহাসের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।সেদিকে ভ্রূক্ষেপ দিচ্ছিনা আমি।ব্যাগের লতায় হাত ঘষতে থাকি।বাবার নির্দেশের এক চুলও নড়া যাবেনা।কিন্তু আমি কি এখানেই থাকব।হঠাৎ করেই পেছন থেকে রাতুল ডেকে উঠল,

-মুন!গাড়ি আসেনি?

-না।

-চলো।

-কোথায়?

-বাসায় যাবেনা?

-যাব।কিন্তু….

-বেশকিছুক্ষণ তো হয়ে গেল।তোমাদের গাড়ি আসলে এতক্ষণে এসে যেত।উঠে পড়ো।

সংকোচ আর লজ্জাবোধের শক্ত দেয়াল ভেঙে রাতুলকে জড়িয়ে ধরে ওর বাইকে চেপে বসি।অদ্ভুত এক শিহরণে বারংবার শিহরিত হচ্ছিলাম কেন জানি।অচেনা এক জগতের বাসিন্দা মনে হচ্ছিল নিজেকে।কখনও খোলা রাস্তায় বাইকে চড়া হয়নি।বাবার কাঁচবন্দি প্রাইভেট কারেই ছিল আজীবন যাতায়াত।

-কেমন লাগছে?

আমি ম্লান গলায় উত্তর দেই।

-ভাল।

-আমি জানি তোমার ভালোই লাগবে।বাবার নিয়মের বাইরে না যাও,নিজের মনের কথাও তো কিছু শুনতে পার।তুমি এখন আর ছোট নও।

রাস্তার একপাশ দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম।পথিমধ্যে রাতুল বাইক থামিয়ে একটা দোকানে ঢুকে।আমি ওর চলনগতির দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি।ঘোর তৈরি হয় এক ভাল লাগার।রাতুল ফ্লেক্সি শেষে বাইকের কাছে এসে পৌছতেই ও কেমন যেন থমকে গেল।মুন বলে চিৎকার করে উঠে বাইক থেকে ফেল দিল আমাকে।কিছু বুঝে উঠবার আগেই একটা গুলি এসে বিধল রাতুলের বাহুতে।অকস্মাৎই ঘটে গেল সব।

কি হল এসব?আমার এখন করণীয় বা কি?সেই সিদ্ধান্ত শক্তিটাই হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে গেল মনে হচ্ছে।মতিন আংকেল গাড়ি নিয়ে যেতেই আমাকে দেখতে পেয়ে গাড়ি থামায়।কালবিলম্ব না করে হাসপাতালে নিয়ে আসি রাতুলকে।

রাতুলের বেডের পাশে একধ্যানে বসে রয়েছি।অপারেশন হয়েছে ছেলেটার।উদোম শরীরের দিক থেকেই চোখ সরছিলনা?নাকি অজানা এক মায়ার টানে চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে গেছে সেদিকে?সেসব নিয়েই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আছি।কত বিচিত্র একটা ছেলে।অদ্ভুত তার কাণ্ডকীর্তি।আমার প্রতি পুনরায় জীবনদানের মতো অবদানও যদি থেকে যায় কারোর,তাহলে তা একমাত্র এই মানুষটার।মৃত্যুর দুয়ার থেকেও ফিরিয়ে এনেছে আমাকে।

বাহিরের জগত আমার জন্য নয়।ভালবাসা-বাসি,একটা সম্পর্কের বন্ধন,সেসব আমার বাবার নীতিতে ঘুণাক্ষরেও নেই।রাতুলকে কখনও নিজের মত করে পাব কিনা জানিনা।এটা জটিল একটা সমীকরণ।আর তা কষতেও চাইনা।আমি জানি,এর ফলাফল প্রত্যাশিত হবেনা।

যখন জ্ঞান ফিরল রাতুলের,রূঢ় করে দেওয়া একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে আমার দিকে ও।

-তুমি কাঁদতে জানো?

থতমত খেয়ে যাই কিছুটা।আমি কাঁদছিলাম?অথচ আমি নিজেই টের পায়নি।বড্ড অদ্ভুত!

-তুমি কাঁদতে জানো তা বুঝিনি।

এবার কেমন জানি রাগ হতে শুরু করল রাতুলের উপর।রাগাশ্রিত দৃষ্টিতে রাতুলকে বলি,

-আমি কি অনুভূতিহীন কোনও দানব?

-না তা নয়।তুমি রাগ করলে?

আমার নীরবতায় রাতুল সিরিয়াস হয়ে পড়ে।

-আরে আরে।আমি তো ফান করেছি।এদিকে তাকাও প্লীজ।

আমি জলভরা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাতেই ও গালভরা হাসি নিয়ে আমার রাগ ভাঙাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এতকিছুর মধ্যেও একটা প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।বাবা মার উপর কখনও রাগ করেছিলাম কিনা আমার মনে পড়ছেনা।শুনেছি খুব আপন মানুষদের প্রতি নাকি আপনা-আপনিতেই রাগ-অভিমান জন্মে যায়।যাদের প্রতি ভালবাসা থাকে,তাদের প্রতিই রাগ হয়।রাতুল কি অজান্তেই আমার খুব আপন কেউ হয়ে গেল?সেটা জানা আবশ্যক বলে মনে হচ্ছে না।

তবে যেটুকু উপলব্ধি করতে পারছি,এই মানুষটার প্রতি জনমে জনমেও আমার ভালবাসার কোঠা শূন্যের স্তরে নামবেনা।কমতি হবেনা।

রাতুলকে একটা কঠিন প্রশ্ন করার দরকার ছিল তাই জিজ্ঞেসা করি

-আপনি আমার জন্য প্রাণ দিতে গেলেন কেন?

ভৎসর্ণার ছলে একগাল ঠেলে হেসে দেয় ও।বলতে থাকে

-তোমার সামনে আমাকে বা অন্য একটা লোককে কেউ হত্যা করতে চাইলে তুমি কি তাকিয়ে দেখতে?

-না।অবশ্যই আমি তাঁকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতাম।তবে নিজেকে নিষ্প্রাণ করার ঝুঁকি নিয়ে নয়।

এবার আর কথার পিঠে কথা ঠেকাতে পারলনা।পরাজিত দৃষ্টিতে ঘাড় ঝুঁকিয়ে ঠোঁটের কোণে মুচকি একটা হাসি তুলে দেয়।অদ্ভুত সেই হাসির অর্থ।যা সবার বোঝে নেওয়া সাধ্যতীত।রাতুল বলল,

-তুমি হয়ত নিজেকে একটু বেশি ভালবাসো তাই তা করবেনা।কিন্তু আমার নিজের থেকেও অধিক ভালবাসা মানুষের প্রতি।

কথা বাড়াইনি আর।আরও নানান কথা জুড়ে দেওয়া যেত রাতুলের অদ্ভুত কথার পেছনে।কিন্তু অপ্রত্যাশিত উত্তরের জন্য আমি প্রস্তুত না।তাই চেপে যাই নিজেকে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস লুকিয়ে।

এরই মধ্যে বাবা হাসপাতালে পাগলপ্রায় হয়ে ছুটে এসেছেন।আর অযাচিত সব কটু কথা শুনিয়েছেন মতিন আংকেলকে।বেচারারই বা কি করার ছিল! এমন অসময়ে গাড়িকে নিয়ে গ্যারেজে টানাটানি করতে হবে ওনি মনে হয় তা স্বপ্নেও ভাবেননি।কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে হয়ে গেলে কিছু করার থাকেনা।অবশ্য দুর্ভাগ্য বলতে হচ্ছে আংকেলের পুড়া কপালের দায়ে।সচরাচর কাজে কোনও ত্রুটি থাকেনা ওনার।কিন্তু আজ এমন হওয়াতে একরোখা বাবা আমার ড্রাইভারকে ঝেরে দিয়েছেন বেশ খানিকক্ষণ। আমি চুপচাপ একপাশ হয়ে বাবার রাগান্বিত আচরণ দেখে যাচ্ছিলাম। ভেতরে ভেতরে খুব মুষড়ে যাচ্ছিলাম।হতে পারে তা আমার জন্যই মতিন আংকেলকে কথা শুনতে হচ্ছে কিংবা অপরাধী বাবার সন্তানের খাতায় রয়েছি বলে।

তবে যাই করুক।ছেলের প্রতি ভালবাসা আছে বলেই বাবার এই কাঠিন্যতা।

তবে তটস্থ করে দেয়ার মত একটা ব্যাপার ঘটল। আমার ধারণা ছিল বাবা এমন একটা কিছু করতে পারে।কিন্তু তথাকথিত করেই যে ফেলবে তা ভাবিনি।ছেলের জীবন বাঁচানোর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বাবা রাতুলকে চেক দিতে চেয়েছে।রাতুলের দৃষ্টিটা তখন কতটা প্রকট হিংস্রতায় আচ্ছন্ন হয়েছিল তা হয়ত ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।

তাই প্রথমবারের মতোই বাবার মুখের উপর কথা বলি।

-বাবা আপনি এটা কি করলেন?

-কেন?

-কারো প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকারে যতটা আন্তরিকতা প্রকাশ করতে হয় আর কোনও কিছুতে কি তার বিকল্প রয়েছে?তাও টাকার মাধ্যমে!

খড়গ দৃষ্টিতে বাবা আমার কথাগুলো শুনে যায়।হয়ত উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না তাই কিঞ্চিৎ লজ্জিত।

পরপর দুদিন হাসপাতালে দেখতে আসি রাতুলকে।আজ রিলিজ করে দেয়া হয়েছে ওকে।মতিন আংকেলকে নিচে দাঁড় করিয়ে রেখে আমি রাতুলের কেবিনে এসে দাঁড়াই।ভেবেছিলাম বাবার দিকে যেরূপ করে তাকিয়েছিল আমার দিকেও অনুরূপ হবে।কিন্তু রাতুলের স্বাভাবিকতা আমাকে অবাক করে দিল।

-এসেছ?

-হুম।আসুন।নিচে গাড়ি দাঁড় করিয়ে এসেছি আপনাকে পৌছে দেব।

-না।তুমি আমার সাথে চল।তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।

-কোথায়?

-যেতে চাও তো,নাকি?

-হুম।

আর কোনও কথা হলনা।একদম ভদ্র ছেলের মত করে রাতুলের পেছন পেছন যেতে থাকি।ওর বাইকে করে যেখানে নিয়ে যাওয়ার কথা সেখানেই যাচ্ছি।কিছুদূর যাওয়ার পর একটা অনাথ আশ্রমের সামনে এসে রাতুলের বাইক থামল।ধীর পায়ে আমি এগিয়ে যেতে থাকি ওকে অনুসরণ করে।

ভেতরে ঢুকে তৃষিত নয়নে চারপাশ দেখতে থাকি।মাঠের একপাশে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের লাফালাফি,হৈ চৈ ডাগর দৃষ্টিতে দেখে যাই।আমার এই অবাকচিত্ততা দেখে রাতুল বলল,

-অবাক হচ্ছ?এটা আমার অনাথ আশ্রম।

আমি চুপচাপ হয়ে রাতুলের কথা শুনি।

-বাবা স্থাপন করেছিল।তবে সাংসারিক ঝায়-ঝামেলায় নিয়ন্ত্রিত রাখতে সক্ষম হয়নি।পরে আমিই বাবাকে অনুরোধ করে আশ্রমটাকে সচল রাখি।

ঠায় দাঁড়িয়ে শুনে যেতে থাকি রাতুলের বিস্ময় করে দেওয়া কথাবার্তা।পলকহীন ভাবে তাকিয়ে দেখে যাই বিচিত্র এই মানুষটাকে।প্রশ্ন করি,

-আচ্ছা আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?এদেরকে নিয়েই বাকি জীবনটা পার করবেন?অন্য কোনও স্বপ্ন নেই?

-হুম।এরাই আমার দেহের বিরাট একটা অংশ।আর অন্যটা হয়ত তোমার বুঝার কথা।

-আমি কিন্তু সত্যিই জানিনা।

-বাকি জীবনটা প্রিয় মানুষটাকে নিয়ে পার করা,এইতো।

আমি কিছুটা হেসে উঠি।

-হাসলে যে?

-আচ্ছা আপনি ভালবাসেন কাউকে?জানেন,তার ভাগ্যটা স্রষ্টা খুব যত্ন করে বানিয়েছেন।

অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হেসে উঠল রাতুল।

-আচ্ছা বাদ দাও।চলো ছাদে যাই।

বলেই আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে ছাদে উঠে।ছাদে আরও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। নানান ফুল দিয়ে ছাদটা সাজানো।গোলাপ গুলোই প্রস্ফুটিত বেশি।সেখান থেকে একটা গোলাপ তুলে নিয়ে যখন রাতুল তার হৃদয়াবেগ আমার সমীপে নিবেদন করে, অজানা কারণেই কেন জানি চোখদুটো থেকে জল ঝরতে থাকে আমার।এই জল কিসের আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না।ভয়ের, সংশয়ের,নাকি আনন্দের।যখন এগিয়ে এসে রাতুল আমার চোখ মুছে দিচ্ছিল তখন নিজেকে সঁপে দিতে ইচ্ছে করছিল রাতুলের সুবিশাল বাহুডোরে।মনের সাথে যুদ্ধ করে সংযত করে নেই নিজেকে ।

-ভুল বুঝবেন না প্লীজ। ক্ষমা করবেন।আমাকে।

-কেন মুন?

-আপনি জানেন না।আমি আমার বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে মরতেও পারবনা।এই ভালবাসা আমার জন্য নয়।

রাতুল মূর্তিমান হয়ে যায় আমার বলা কথা শুনে।তারপরও কেমন করে যেন হেসে দেয় ও।বলে,

-ধ্যাত!এটা নিয়ে কাঁদার কি আছে?কৈ,আমি কাঁদছি?তুমি যে আমাকে ফিরিয়ে দিলে আমার চোখ তো জল ঝরাচ্ছেনা!

-আপনি এখনও ভুল বুঝছেন আমা….

রাতুল আমার ঠোঁট চেপে ধরে এগিয়ে এসে বলতে থাকে। ওর গরম নিঃশ্বাসের উষ্ণতা আমাকে ছুঁয়ে যায়।

-নিজের মনের কথা শোন।জীবনটা তোমার,ভালবাসাটাও তোমার।ভালবাসা পরাধীনতার শৃংখলে ক্ষমতাতীত।

রাতুলের অমিয় বাণীব্রত হয়ে হৃদয়ের খুব গভীরেও একটা অজানা বোধ জন্মে যায় আমার।ধ্রুব সত্যই তো বলল ও।ভেবে দেখবারও প্রয়োজন বোধ করিনি আর।ঢলে পড়ি রাতুলের বুকে।মাথা গুঁজে দিয়ে অনবরত কেঁদে যাই।স্বর্গীয় একটা প্রশান্তি আমার তৃষাতপ্ত হৃদয়কে শীতল করে দেয়।মাথায় হাত বুলিয়ে পরশ দিতে থাকে রাতুল।যা আমি আগে কখনও পাইনি।

-আস্তে চালান।

-না।যতক্ষণ তুমি করে না বলছ বাইকের স্পীড কমছেনা।

-আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।হঠাৎ করেই দেখবেন তুমি বলতে পারছি।এখন স্পীড কমান প্লীজ।

-না।তোমাকে এখনই তুমি করে বলতে হবে আমাকে।রাস্তা তো একদম খোলাই।প্রবলেম কোথায়? তাই তো তোমাকে নিয়ে এ রাস্তায় চক্কর দেয়া।দেখছনা একটা কাকপক্ষীও নেই।

-তারপরও আমার ভয় করছে।এক্সিডেন্ট করলে খুশি হবেন?তখন যদি আমি মারা যাই?

দুষ্টুমির ছলে কথাটা বলি আমি।অপ্রস্তুত অবস্থায় বাইক থেমে যায়।কেমন চুপচাপ হয়ে যায় রাতুল।গম্ভীর মুখে বাইক থেকে নেমে পড়ে।বুঝতে পারলাম সাহেব রাগ করেছে।আমিও নেমে গিয়ে সাহেবের রাগ ভাঙাতে প্রদর্শনী উপস্থাপন করতে শুরু করি।

-সরি।আর কখনও হবেনা।এই কান ধরেছি।আমি কিন্তু প্রথম কারো জন্য কান ধরছি।

কিন্তু রাতুলের মুখে তেমন কোনও প্রভাব পড়লনা।ছলছল চোখে আমার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।অবশেষে অভিমানীটার রাগ ভাঙাতে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলাম।

-এত ভালবাস কেন?অতিরিক্ত সবকিছুতেই আতঙ্ক বেশি।আমার ভয় হয় তোমাকে নিয়ে।

আনন্দ অশ্রুত হয়ে রাতুল জড়িয়ে ধরে আমাকে।কপালে ছোট একটা চুমু এঁকে বলতে থাকে,

-আমার ভালবাসা তোমার ছায়া হয়ে থাকবে।ছায়া কখনও হারায়?

চোখে জল থাকার পরও ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে উঠল দুজনার।

ঐদিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে মধুরতম কাটল।যা স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করবে আজীবন।

দুজন দুজনকে খুব কাছ থেকে জানলাম।শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা,দেহের প্রতিটা কোষে পরশ বুলিয়ে ভালবাসায় সিক্ত করে তোলা,সহ্য শক্তির সীমায়িত হয়ে বিছানার চাদর খামছে ধরা,দুটি দেহ মিশে গিয়ে এক হয়ে যাওয়া,অবশেষে নিথর হয়ে একে অপরের বুকে মাথা গুঁজে হৃৎপিণ্ডের ঢিবঢিব শব্দ শোনা।আমার ভালবাসা স্মৃতির উপকরণ হয়ে থাকবে।রাতুলকে প্রশ্ন করি সেদিন,

-তুমি আগে কেন আসনি আমার জীবনে?

-ইশ! এই না ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছ। তোমাকে কি ক্লাস এইটে গিয়ে প্রোপজ করার দরকার ছিল নাকি?

বলেই ফিক করে হেসে দেয়।আমি কপট রাগ দেখাতে থাকি।পরে বুকে টেনে নেয়,কানের কাছে ওর খোঁচা খোঁচা দাড়িভর্তি মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলতে থাকে,

-একটু লেট হয়ে গেছে?সবটা পুষিয়ে দেব।যেটুকু সময় হাতছাড়া হয়েছে।হলো তো?

-মুনতাসির! খাবার খেতে আসো?

-আসছি মা।

-এখনই আস।আর কতক্ষণ পড়বে?এগারটা বাজতে চলল।

মায়ের ডাকে খাবার টেবিলে গিয়ে বসি।বাবা টিভি অন করে দিয়ে খাবার খেতে শুরু করে।বাবার সামনে বসে থাকায় ঘাড় ঝুঁকিয়ে রেখে খেয়ে যাচ্ছিলাম। টিভিতে কিসের যেন একটা খবর প্রচার হচ্ছিল।যতদূর বুঝতে পারছি হত্যা সংবলিত।আবার সমকামিতা নিয়েও কিসব যেন বলাবলি করছিল।বাবা হৃষ্ট গলায় বললেন,

-রসাতলে যাবে সমস্ত পৃথিবীটা।ধ্বংসের আর বেশি নেই মনে হয়।বাংলাদেশেও সমকামীতার অধিকার নিয়ে লড়ে।কত সাহস! তো হলো কি? আততায়ীর চাপাতির আঘাতে খুন! কপালে লিখেই এনেছিল বোধহয় বেচারা সম্পাদক।

মা বললেন,

-হত্যার বিচার হবেনা বলছে যে খবরে!

-কে করবে বিচার?সমকামীতার মত জঘন্য অপরাধকে কেউ প্রশ্রয় দেয় নাকি!প্রশাসন হত্যা মামলাটাকে গোপনে সাপোর্ট করছে,জানো?

মা আর কিছু বললেন না।আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বাবা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছিলেন,স্পষ্টত হয়নি বিষয়টা তাই আমি একটু নড়ে বসে কথাটার দিকে কান দেই।বাবা আমার সজাগ হওয়া দেখে বলে উঠে,

-রাস্তায় তোমার সাথে যে ছেলেটাকে দেখেছিলাম,ও কোথায় আছে জান,মুনতাসির?

আমি নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করি,

-কোন ছেলেটা বাবা?

-কাল রাস্তায় জড়িয়ে ধরে রেখেছিলে যাকে?

মুখে দেওয়া খাবার আটকে যায় আমার।আড়ষ্ট হয়ে যাই বাবার কথায়।চারদিক কেমন ঘুরছে মনে হচ্ছিল।বাবা আবারও বলতে লাগলেন,

-ব্যাপারটা জলঘোলা হওয়ার কোনও চান্স রাখিনি।আজ থেকে বাড়ির বাইরে এক পা-ও রাখবেনা তুমি।

মা অবাকচিত্তে প্রশ্ন করে বাবাকে,

-এসব কি বলছ?কিছুই তো বুঝতে পারছিনা।

-বোঝার প্রয়োজনও নেই।যেমনটা আছ তেমনই থাক।তবে এটুকু বলে রাখা উচিত,মুনতাসিরের জন্য আজ আরও একটি খুনের সংখ্যা বাড়ল আমার।তোমার ছেলেও সমকামী হবে তা হয়ত তুমি কল্পনাও করোনি।

এটুকু বলেই টেবিল থেকে উঠে যান তিনি।

আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বাবার দিকে চোখ তুলে তাকাই।মায়ের হয়ত মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মত অবস্থা হয়েছে।বাবার পিছন পিছন ছুটে যান তিনি বিষয়টা খোলাসা করতে।

রাতুলের কি কিছু হয়েছে?

প্রশ্নটা মনে জাগতেই একমুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল যেন আমি শূণ্যে ভাসছি।হঠাৎ করেই বুকের কোথাও অসহনীয় একরকম ব্যথার উৎপত্তি দেখা দিল আমার।তীব্র ব্যথার ফলে চেয়ার থেকে মেঝেতে পড়ে কাতরাতে থাকি।দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসে,অন্ধকার দেখতে শুরু করি চারপাশ।ঠোঁটের কোণ বেয়ে লালা ঝরতে থাকে।জ্ঞানশূণ্য হয়ে পড়ি।

আশপাশের পরিবেশটা কেমন নীরব-নির্জন মনে হচ্ছে।চোখের পাতা দুটোও খুলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। বেশকিছুক্ষণ পর্যবক্ষেণ করার পরও যখন কিছু ঠাওর করতে পারছিলাম না, তখনই ওপাশ থেকে কেউ একজন ছুটে এল। প্রফুল্লিত কণ্ঠে তার গলার স্বরটা বেজে উঠল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

-জ্ঞান ফিরল তোর!

আমি ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে তাকাই সাদা এপ্লোন পরিহিত মানুষটার দিকে।ততক্ষণে মুখাবয়বটা পরিষ্কার হয়ে উঠল আমার চোখের পাতায়।অনিক,আমার কাজিন।ডাক্তার ও।

আমি উঠে বসতে চেষ্টা করেও পারলাম না।ভীষণ বেগ পেতে হচ্ছে। অনিক সাহায্য করল। বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে চারপাশ দেখতে লাগলাম।কোমায় রয়েছি বর্তমানে। কবে এসেছি কি করে এসেছি এসব ভাবতেই অনিকের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম। ও কি করে যেন বুঝতে পেরে গিয়ে উত্তর দিতে শুরু করল আমার ভেতরকার প্রশ্নের।

-আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল তুই এই বেডে।

আমি বিস্ময়াচ্ছন্ন হয়ে অনিকের দিকে তাকাতেই ও আবারও বলতে শুরু করল।

-হার্ট ব্রেকের এমন ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট আমি খুব কমই মেইনটেইন করেছি।আংকেল আন্টি হসপিটালে অনিদ্রা অনাহারে একদম দূর্বল হয়ে যাচ্ছিল।আংকেল তো বাসা থেকে এ কয়দিন নিয়মিত বেরও হচ্ছে না তোর এ অবস্থা দেখে।আজ অনেক কষ্টে বাসায় পাঠিয়েছি ওদের।বলেছি আমি তোর পাশে আছি।

এরপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও বলল,

-আন্টির কাছে কিছু কথা শুনেছিলাম একটা ছেলের সম্পর্কে।

হঠাৎ করেই রাতুলের কথা মনে পড়ল।

-রাতুল কোথায় আছে,জান অনিক ভাই?

-তুই আগে একটু সুস্থ হ্।আমি তোকে সব বলব। আচ্ছা ছেলেটাকে এত ভালবাসলি কি করে?ওর অনুপস্থিতি সইতে পারবি?

আচমকাই অনিকের মুখের কথাটা শোনে শিরদাঁড়া বেয়ে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল।রুদ্ধশ্বাসে কাটছিল প্রতিটা মুহূর্ত।আমি জাপটে ধরে অনিককে জিজ্ঞেস করি।

-কি হয়েছে রাতুলের?আমাকে এখনই নিয়ে চল ওর কাছে।

-সকালটা হতে দে।

-না।তুমি এখন যাবে কিনা বল?

মুখে শান্তনার একটা রেখা এঁকে দিয়ে অনিক আমাকে নিয়ে চলল।

কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর একটা গোরস্থানের সামনে এসে আমাদের গাড়িটা থামল।

-সবাই জানে গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা গেছে রাতুল।কিন্তু আংকেল করেছিল এই জঘন্য কাজটা।

একটা কবর দেখিয়ে বলল অনিক।

আমি হতবাক হয়ে এগিয়ে যাই গেইটের দিকে।ধীর পায়ে দু-কদম এগোতেই একটা কবরে আলো জ্বলে উঠে।যার ইটে স্পষ্ট করে আমার খুব পরিচিত একটা নাম লেখা।নির্বাক হয়ে কিছু মুহূর্ত তাকিয়েই রইলাম।কেন জানি মনে হচ্ছিল এ সবই কোনও দুঃস্বপ্ন।এখনই ঘুম ভেঙে গেলে মনের সব বিষাদ দূর হয়ে যাবে।গাল বেয়ে ঝরে পড়া পানি গুলো মুছে যাবে।

ততক্ষণে আমার দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে গেছে।আকাশেও মেঘ জমে রয়েছে।ভীষণ কালো মেঘ।প্রকৃতিও আজ আমার সাথে নীরব-নিস্তব্ধ।যেন তারাও আজ রাতুলের মৃত্যুতে শোকাহত।

বলতে চাইছে,”রাতুলের মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী,তুমিই দায়ী।তোমার ভালবাসাই ওকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল।”

কিন্তু কেউ একজন তাদের মুখ আটকে দিয়ে চুপ করিয়ে দিচ্ছে।

বলছে,”চুপ।ও আমার ভালবাসা।কটু কথা বলবেনা একদম।”

আমি যেন শুনতে পাচ্ছি রাতুলের সেসব কথা।পরিবেশটাও আজ নিথর।ঝরঝর করে পড়া বৃষ্টির পানি আর রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে বাস্তবতা ছাপিয়ে আমিও মিলিয়ে যেতে লাগলাম।

পরপর দুইবার হার্ট ব্রেক হওয়া একটা রোগীকে কতই না যত্নে রাখছে আমার বাবা-মা।বাড়িতে নার্স ডাক্তারের আনাগোনার যেন শেষই নেই।বাবা পাশে বসে একটু আগেও বেশ খানিকক্ষণ চোখের জল ঝরিয়ে গেলেন।আমাকে দু-মুঠো ভাত খাওয়ানোর জন্য আজ তিনি বেজায় চিন্তিত।আমি একটি আবদারের বিনিময়ে মায়ের হাত থেকে দুটো দানা মুখে দেই।বাবাকে বলি রাতুলের অনাথ আশ্রমটার কথা।শুধু আমার বর্তমানেই নয়,আমার অবর্তমানেও যেন আশ্রমটা সচল থাকে।আৎকে উঠে মা প্রশ্ন করে ‘এভাবে বলিস কেন বাবা?’

তাদের আত্কে উঠাটাই স্বাভাবিক।

তারা কি উপলব্ধি করতে পারে আমাকে?আমি যে প্রতিনিয়ত অতল গহ্বরে তলিয়ে পড়ছি।মরণের প্রহর গুণে গুণে পার করছি প্রতিটা মুহূর্ত।আমার আর আমার ভালবাসার অ্যাধ্যাত্মিক কিছু টের পায়না ওরা।

জানালার গ্রিল ধরে যখন রাতের আকাশ দেখি, তখন মনে হয় ঘাড়ের কাছে কেউ এনে মাথা গুঁজে দিচ্ছে।স্পর্শের অনুভূতিটা রাতুলের স্পর্শের সদৃশ।রাতগুলো জেগে জেগেই কেটে যায় আমার।তবে কখনও চোখের পাতা দুটো এক হতে গিয়েও এক হয়না।চমকে উঠি।মা পাশের রুম থেকে দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে।কিন্তু স্তব্ধ আমার থেকে কোনও প্রত্যুত্তরই পাননা।

গভীর রাতে চাঁদের আলো যখন আমার ঘরটাকে একটু অন্তর একটু আলোকিত করে দেয়,তখন ঘরের কোণটাতে যেন কারো উপস্থিতি টের পাই।প্রাণপণে উঠে গিয়ে হাতড়ে পড়ি ওটায়।পরে দেখি আমার বিছানার ওপাশটায় ছায়ামূর্তিটা।আবারও ছুটে যাই ওদিকে।কিন্তু অবশেষে কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাইনা।তবুও মনে হয় আমার চারপাশে কেউ একজন সর্বদাই বেষ্টিত হয়ে আছে।ছায়া হয়ে ঘিরে রেখেছে আমাকে।

রাতুল যে ঠিকই বলেছিল,

“আমার ভালবাসা তোমার পাশে ছায়া হয়ে আছে।ছায়া কি কখনও হারায়?”

কিন্তু এ ছায়া যে আমাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছে।তবে এটাই আমার প্রত্যাশিত।রাতুলের সান্নিধ্য পেতে আর বেশি প্রহর গুণতে পারছিনা!

………………………….

সমাপ্ত।

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.