প্রথম প্রনয় বেলা

লেখকঃ-আনন্দ

উৎসর্গঃস্মাইলি সাদ ও রাত সিনহা মেঘ।

[প্রথম প্রেম নাকি কখনও ভুলা যায় না।জীবন অতি ছোট তবে এই জীবনে যত বসন্তই আসুক প্রথম প্রেমের মত কোমল ফুল আর ফুটতে পারে না।হতে পারে আমি ভুল….]

*********************************

১.

-হাই

-হ্যালো

-কি করছো শভ্র।

-বসে।তুমি।

-শুয়ে।খেয়েছো??

-হে তুমি।

-হে।তোমার গল্পটা বেশ ভাল লেগেছে।

-তুমিও তো লিখো।আমি পড়েছি।তোমারটাও ভাল লাগল।

-শুধু ভাল??

-হুম।

-তুমি কি কখনও খুব ভাল বলো না??

-নাহ।

আরো কিছুক্ষন কথার পর ডাটা অফ করে বেরিয়ে এলো রুহু।

এইবার ইন্টার এক্সাম দিবে।পড়ালেখার সাথে তার সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়।কথায় কথায় হাসা তার অভ্যাস।সবাই বলে বেশি কথা বলে।সে বলে বেশি কথা বলা মানুষের নাকি মন পরিষ্কার থাকে।কারো কোনো কথাই আজ পর্যন্ত তার এই কাজে বাধা দিতে পারেনি।বাড়িতে লোক বলতে মা বাবা আর বোন।সাত মাস আগে সে তার আপন স্বত্তা সম্বন্ধে জানতে পারে।ফেসবুকে আসার সুবাধে অন্য জগতের কিছু মানুষের সাথে তার বন্ধুত্বও হয়েছে।তারই মধ্যে অনন্য হল শুভ্র।

প্রায় পাচ মাস আগে রুহুর আইডিতে একটা রিকুয়েস্ট আসে।শুভ্র বলাকার দেশ।অদ্ভুত নাম।প্রথম দিকে একটু ঘাবরে গেছিল সে।কিন্তু মাস খানেক পর ওই আইডিতে ঢুকে কিছু গল্প পড়ার পর তার বেশ ভাল লাগল।রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করার পর ধীরে ধীরে কথা হয়।

সেই শুরু।রুহু সবসময় ঘরকোনো ছেলে।দিনে বের হতে ভাল লাগে না কখনও।ভাল লাগে রাত্রে বের হতে।রাত্রে অন্ধকারে বা চাঁদের আলোয় বসে শুভ্রর সাথে কথা বলাটা তার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।প্রতিদিন সকালে শুভ্রর শুভ সকাল আর রাত্রে শুভরাত্রি না শুনলে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ে সে ইদানীং।কেন এমন হয় তা সে জানে না।শুধু জানে এক অচেনা টান লাগে তার।ওর সাথে কথা বলার সময় মনের ভিতর বাসন্তী হাওয়া দেয়।কি এর মানে??তার জন্য কেন এত টান অনুভব করে রুহু।তবে কি এটা ভালবাসা??

কিন্তু কেমন ভালবাসা এটা।সে তো কখনও শুভ্রকে সামনা সামনি দেখেনি।তবুও কেন তার এমন লাগে।প্রশ্ন হাজার।উত্তর সে জানে না।কিন্তু কারনে অকারনে এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করতে বড় ভাল লাগে।এক অজানা কারনে সে খিলখিল করে হেসে উঠে।

২.

ওফফ স্যারের ঘ্যান ঘ্যান আর ভাল লাগছে না।ক্লাস ছেড়ে পালিয়ে গেলে বাঁচতে পারত যেন রুহু।মুখটাকে বাংলার পাচের মত করে রেখেছে।কারো সাথে কথাও বলতে পারছে না।কথা বললেই স্যার দাড় করাবেন।আর বলবেন “কে এটা??আমাদের বাংলালিংক না??আনলিমিটেড টকটাইম অফারের মত কথা বলতেই থাকিস।এত কথা তোর পেটে আসে কি করে রে?”

কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করল রুহু।চোখের সামনে অন্ধকার ভেদে এক পুরুষ ভেসে উঠছিল।ধীরে ধীরে।খোঁচা খোঁচা দাড়ি।শ্যামলা গায়ের রং।এলোমেলো চুল।প্রায়ই রুহু চোখ বন্ধ করলে এমন দেখতে পায়।কেনো কে জানে।”রুহু,রুহু এই রুহু।”

পিছন থেকে রবিনের ডাকে হুশ হল রুহুর।

-কি হয়েছে ডাকছিস কেন??

-বাইরে যাবি??

-পাগল??স্যার দেখলে সবার সামনে অপমান দেবেন।

-আরে চলনা কিচ্ছু হবে না।

-নাহ তুই যা।

-যাবি না তো??

-না যাবো না।তুই যা।

রবিন জানে রুহু ঠিক বের হয়ে আসবে।তাই সে উঠে পিছন দিয়ে বেরিয়ে গেল।রুহু একবার পিছনে দেখল।সাহস হচ্ছে না।কিন্তু ক্লাশে থাকারও ইচ্ছা নেই।স্যার পিছনে ফিরে আছেন।এই সুযোগ আর পাওয়া যাবে না।

ভয়ে ভয়ে উঠে পিছন দিয়ে যাওয়ার ঠিক আগেই হুচট খেল।

“ওহ মা।”নখে চাপ লেগেছে।

শব্দ শোনে স্যার বললেন,”এই কে যায় রে?”

পিছন থেকে সবিতা বলল,”স্যার রুহু ভাগছে।”

স্যার পিছন ফিরতেই রুহু পাথরের মত জায়গায় দাড়িয়ে গেল।সবিতাটা বড় ডাইনি।প্রতিবার ওর জন্য ধরা পড়ে যায়।এখন কি করবে।স্যার তো এবার চক ছোড়ে মারবেন নিশ্চিত।পেটের কথা মুখে আসেনি মাথার এক কোনে টক করে এসে চকের একটা টুকরো লাগল।সবাই হো হো করে হেসে উঠল।রাগে গা জ্বালা করছিল রুহুর।স্যার কিছু বলার আগেই সবিতার মাথায় একটা চড় মেরে এক ছুটে বাইরে চলে এলো সে।

বাইরে এসে শুনতে পেল সবিতা স্যারকে আবার বলছে,”স্যার রুহু মাথায় মেরেছে দেখলেন।”

রুহু রাগে হাত মুষ্টি করতে হাতে চকের টুকরোটা লাগল।ওটা তো ওর হাতেই এসে পরেছিল।ওইদিক থেকে রবিন এলো।

-কি? আজ আবার ধরা পরে গেলি তো?কালকেও অংক স্যারের হাতে ধরা পরেছিস।আমি যখন বলি তখন না আসার ফল এসব।

-চুপ কর তো।সব ওই ডাইনির জন্য হয়েছে।ওই তো বলে দিল।

-আচ্ছা চল এখন।

-আরে দাড়া।

রবিনকে দাড় করিয়ে আবার ক্লাসের দিকে গেল রুহু।চকে টুকরোটা সজোরে সবিতার মাথায় ছুড়ে মারল।ডাইনি নিচে চেয়ে লিখছিল।মাথায় লাগতেই উঠে দাড়িয়ে বলে,”স্যার আমি তো কিছু করিনি।”

অমনি রুহু পালিয়ে এসেছে।এবার স্যারের সাথে ওর টকশো চলতে থাকুক।

-চল রবিন।

*****

তারা গিয়ে বসল বট গাছের নিচে।কারন এখানে ছাড়া রুহু ভাল নেট পাবে না।তাই বসতেও চাইবে না।বসেই ফোনটা অন করল সে।রবিন কি নিয়ে যেন কথা বলছিল।তার সে দিকে খেয়াল নেই।শুধু হু হা করছে।সে মেসেজ চেক করছে।কিন্তু এক শুভ্রর তো কোনো মেসেজ নেই।এমন তো হয় না।সকালে সেই যে রুহু হাই বলেছিল আর তো মেসেজ নেই।মনটা খারাপ হয়ে গেল।রুহু উঠে দাড়াল।রবিন কথা বন্ধ করে উঠে দাড়াল।

-কিরে কি হল?

-কিছু না।বাড়ি যাব।

-কিন্তু সবে তো ক্লাশ বাঙ্ক করলি।এক্ষুনি বাড়ি যাবি?

-থাক।চল।তুই ও তো যাবি নাকি?

-আচ্ছা চল।

রবিনকে ফেলেই রুহু আগে আগে হাটতে লাগল।

৩.

খোলা হাওয়ায় হাটতে বেশ ভাল লাগে।মনটা চট করে ভাল করে দেয় দমকা হাওয়া গুলো।রুহুরও তেমন হল।খারাপ লাগাটা ক্ষনস্থায়ী হলেও চিন্তাটা থেকেই গেল।আরেকবার কি দেখবে?কিন্তু আসার পথে কম করে দশ বার সে অনলাইন গেছে।ইচ্ছা করে আজ হেটে যাচ্ছে।রবিন এর বাড়ি পিছনে পড়েছে অনেক্ষন।এখন একা একা হাটছে।অবশ্য এতক্ষন দুজনে চুপই ছিলো।রুহুর এবার দম বন্ধ লাগছে।এতক্ষন চুপ করে থাকা যায় নাকি।উফফফ অসহ্য!!

কিন্তু কারো সাথে কথা বলতেও ভাল লাগছে না।শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।মন বলছে,”আচ্ছা আকাশ তুমি কি জানো শুভ্র কোথায়।আচ্ছা মেঘ তুমি কি আমায় নিয়ে যাবে শুভ্রের ঠিকানায়।”আর ভাবছে এখনও তো শরৎ চলছে।বর্ষা গেল সেই কবে।শরতের মাঝামাঝিতে দাড়িয়ে আজ বড্ড ভিজতে ইচ্ছা করছে তার।শুভ্র সব সময় বলত “আমি তো কালো মানুষ”।

কিন্তু সে কি জানে।সেই কালো পুরুষের কালো রুপ দেখতে দুটো চোখ অধীর অপেক্ষায় বসে।অন্ধকার তার বরাবরই ভাল লাগে।তাই বলেই কি সেই কৃষ্ণকে দেখতে মন চায় তার?ভাবতে ভাবতে মনটা আবার উদাস হয়ে গেল।মাথা নুয়ে হাটছিল।কোথা দিয়ে এগোচ্ছে সে দিকে খেয়াল নেই একদম।হঠাৎ ধরাম করে চারপাশ নড়ে উঠল।সামনে গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছে।

-ধুর।উফফফ।আজ কপালটাই খারাপ।আর হাটবই না।দাড়াই।ওই ডাইনি নিশ্চয় ক্লাশ শেষ করে আসছে।ওর সাথে চলে যাব বাড়িতে।পিছনে ফিরে দাড়াতেই দেখে সবিতা রিক্সা করে আসছে।আর উপায় নেই।ওকে দাড় করাতে হবে।দুই হাত উপরে তুলে নাড়াতে লাগল।

-দাড়া ডাইনি।দাড়া।

রিক্সাটা যে তার কাছে এসে থামবে সে তা জানে।

-কি ডাকলি??

-কই কিছু না তো।আদর করে সাবু দিদি ডেকেছি।

-আমি তো শুনলাম ডাইনি ডাকলি।

-ধুর সর তো।জায়গা দে।

বলে রুহু রিক্সায় উঠতে যাবে এমন সময় সবিতার ধাক্কায় পড়ে গেল।

-উঠবি না।আজ মাথায় মারলি।দেখিস আমি কাকিমাকে বলে দেব।

-ও দিদি।লক্ষ্মী দিদি আমার।আর করবনা।এই রোদে পুড়ে মারা পড়ব শেষে।

-আমার কি।

-আচ্ছা যা।পরের বার পিকনিকে তোকে নিয়ে যাব।

-সত্যি??

-হ্যা সত্যি।

-দেব না।যাব না আমি পিকনিকে।

-ঠিক আছে দিস না।আমিও বলে দেব চাচিকে তুই রমেশদার সাথে প্রেম করি

সবিতা জানে রুহুর কোনো পিকনিক যাবার প্লেন নেই।তবুও সে ওকে রিক্সায় উঠালো।হাজার হোক।জীবনে যে কয়েকখানা প্রেম সে করেছে এবং যেটা বর্তমান আছে সবার খবরই রুহুর জানা।তাই আর বাড়ালো না।

৪.

রুহু ঘরে বসে ছিল।টিভি দেখছিল।বিগ বস শুরু হয়েছে।এবারের একটা এপিসোড মিস হওয়া চলবে না।নিচ থেকে মা ডাকল।

-রুহু।নিচে আয়।দেখ তোর নামে চিঠি এসেছে।

রুহুর কানে কথাটা যেন ভ্রম মনে হল।ওর নামে কে চিঠি লিখবে।কিন্তু মার কন্ঠ তো সে নিশ্চিত শুনেছে।

-আসছি আম্মা।

নিচে নেমে দেখে রুকু চিঠি নিয়ে খুলে ফেলেছে।ওর বড় বোনটা সত্যি রাক্ষসি।আজ ওর খবর আছে।রাগ উঠলে মুখে খাটি কিশোরগঞ্জ এর ভাষা আসে।অদ্ভুত হলেও এটা সত্যি যে সব মানুষেরই এই রোগ রয়েছে।

-ওই।তুই আমার চিডি দরলি কেরে।

-ও বাবা পড়েছি নাকি।

-এইডা কি?হাতে নিয়া খুইলা ফালছিস।আবার আমারে বেক্কল পাইছিস।

-এক চড় মারব শয়তান।

-আম্মা আম্মা।দেহো তোমার ছেরি আমারে মারছে।

বলেই চিঠিটা খাবলে নিয়ে দৌড়।রুমে এসে যেন শান্তি পেল।এবার মা আপানিকে বকতে থাকুক।ভেবেই মুখ দিয়ে শইতানি হাসি বের হয়ে এলো তার।যাক রাক্ষুসির পাট শেষ।এবার দেখা যাক চিঠি কে দিল।

উপরে নামটা দেখে ভিতরে মোচড় দিয়ে উঠল।শুভ্র।কোন শুভ্র?রুহুর শুভ্র??নাহ,শুভ্র তো কখনও রুহুর ছিল না।তবুও রুহুর তার উপর অধিকার ফলায়ে ভাল লাগে।শুভ্রর সাথে প্রথম দিকে কথা বলে মনে হচ্ছিল কি অভদ্র।একটা মেসেজ দিলে পরেরদিন উত্তর পায়।তবে আস্তে আস্তে সবই ভাল লাগতে শুরু করেছে।এখন আর ও আগের মত আপনি করে বলে না।এখন আর রিপ্লাই দিতে দেরী ও হয় না।যাক ওসব ভাবতে বসলে চিঠি পড়া হবে না।চিঠিটা খুলল সে।

রুহু,

কেমন আছো?এটা তোমার কাছে লিখা আমার প্রথম চিঠি।তাই প্রিয় শব্দটা উল্লেখ নিয়ে দ্বন্দে ছিলাম।তাই উল্লেখ করিনি।এই কয়েকদিন শরীর ভাল ছিল না।তার উপর আমার ফোনে ও সমস্যা হয়েছে।তাই কথাই হয়নি।তা কেমন চলছে তোমার দিনকাল??আমার নদীর পাড়ে দিব্যি দিন কেটে যায়।তুমি জানতে চেয়েছিলে না যে আমার বাড়ি কোথায়।এখন নিশ্চয় ঠিকানা পেয়েছো।এই কয়েকদিনে আমার কথা কি মনে পড়েছে জনাবের??

আমার মনে পড়েছে।বিশেষভাবে না হোক তবে দিনে বিশেষ একটা সময়ে ঠিকই মনে পড়েছে।ফোনটা মনে হয় আর ঠিক হবে না।তাই আর হয়ত এই শুভ্র বলাকা আকাশে উড়তে পারবে না।অবশ্য তুমি চাইলে আমরা চিঠিতে কথা বলতে পারি।কি বলবে তো??একটা মেমোরি পাঠালাম।একটা গানই আছে অবশ্য।ইচ্ছে হলে একবার শুনে দেখো।আশা করি মন্দ লাগবে না।

আশায় থাকব তোমার চিঠির।

ইতি

শুভ্র বলাকার দেশ

রুহুর ভিতরটা এখনও কাঁপছে।তার বিশ্বাস হচ্ছে না।শুভ্র তাকে চিঠি দিয়েছে।কিন্তু মেমোরিটা কোথায়।খামের ভিতরে হাত দিতেই মেমোরিটা হাতে লাগল।

*****

রাত প্রায় এগারোটা বাজে।শুভ্র যে গানটা পাঠিয়েছিল সে গানটা রুহুর খুবই পছন্দ হয়েছে।রবীন্দ্র সংগীত।কম করে বিশবার শোনা হয়ে গেছে।

“মেঘ বলেছে যাব যাব,রাত বলেছে যাই।”

কাল একটা উত্তর লিখে পাঠাতে হবে।

৫.

প্রিয় শুভ্র,

তোমার ডাকা পরের প্রিয় শব্দটা আমার পাওনা রইল।কাল সারারাত ভেবে আমি চিঠি লিখতে বসেছি।চিঠি কতদিনে পৌছাবে জানি না।কি বিশেষ লিখব তা ও জানি না।তবে হ্যা তোমার পাঠানো গানটা বড়ই ভাল লেগেছে।আর তোমার সাথে যোগাযোগের মাধ্যম তো কথায় নেই।কাওকে কখনও চিঠি লিখিনি।কাচা হাতের চিঠি।আরেকটা কথা।বড় শখ হয় তোমাকে দেখার।কিন্তু তোমার কাছে আমি তোমার ছবি চাইব না।কারন এই জিনিসে আগেও বিশেষ লাভ হয়নি।যাক কথা বলতে থাকলে আমাকে থামানো মুশকিল।শেষে চিঠি লিখতে বসে উপন্যাস লিখে বসব।

উত্তরের অপেক্ষায় থাকব।

ইতি

রুহু

বাহ বেশ ভাল চিঠি লিখেছে।এবার পোস্ট করে দিতে হবে।কিন্তু এই রোদে বের হতেই ইচ্ছা নাই।নাহ বের হতেই হবে।টেবিল থেকে ফোনটা নিল রুহু।

-হ্যালো রবিন।

-হে রুহু।বল।

-আরে কি বলব।তুই বের হ আগে।

-কোথায় যাবি।

-আরে তুই বের হ।আমি আসছি।আমলিতলায় দেখা কর।

-তুই আসবি।আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।

-বিশ্বাস না হলেও আসব।আর ডাইনিকেও ফোন দিয়ে বলে দিচ্ছি।

******

“বাপরে বাপ এত ভেপসা গরমে ভাল লাগে নাকি।কেনো আমাকে ডাকলি রুহু।”রাগে লাল হয়ে আছে সবিতা।

-চুপ কির ডাইনি।

-আবার ডাইনি ডাকলি।আমি এক্ষুনি চলে যাব।

-যা যা।আমিও চাচিকে বলে দেব।চাচুর পকেট থেকে টাকা চুরি কে করে।ডাকাতে কালী কোথাকার।

-হায় ভগবান।কি জ্বালায় পড়লাম।

রবিন ও এসে গেছে।

-ওই দেখ ডাইনি।রবিন ও এসেছে।চল পোস্ট অফিস।

-কেন?

-চিঠি জমা দেব।

৬.

ইদানীং সপ্তাহের রবিবার এলেই রুহুর মুখে আলাদা একটা খুশিভাব দেখা যায়।সারাদিন সে খাল পড়ে বসে থাকে।একা একাই কথা বলে।দুপুরে বাড়িতে আসে না খেতে।যদি চিঠি ভুল করে বাড়ি চলে যায়।তাহলে রুকু রাক্ষুসি ঠিক এইবার চিঠিটা পড়ে ফেলবে।ওই রাক্ষুসিকে ভরশা নেই।খালের পাড়ে একটা আম গাছের ছায়ায় বসে সে।এখন আমের সময় নয়।তাই গাছের মালিকের ঠেঙানো খাবার ভয়টাও নেই।নিশ্চিন্তে বসে সে গায়ে বাতাস লাগায়।

আজও রবিবার।আজও সে একই জায়গায় বসে।প্রায় ছয়মাস ধরে এভাবে পথের ধারে বসে চিঠি পড়ে সে।বেশ ভাল লাগে।

-এখনও কাকা যে কেনো এল না।ধুর এতক্ষন ধরে বসে আছি।

বাতাসে রুহুর লম্বা চুলগুলো কপাল থেকে সরে যাচ্ছিল বার বার।আচ্ছা শুভ্র কি এখন তার কথা ভাবছে।আচ্ছা শুভ্র কি আমার চিঠির জন্য এভাবে অপেক্ষা করে।তা মনে হয় করে না।ওর তো আরো অনেক বন্ধুরা ওর কাছে চিঠি দেয়।কিন্তু আমার কাছে তো এই একটি ঠিকানা থেকেই চিঠি আসে এবং এই একটি ঠিকানাতেই চিঠি যায়।ও খুবই কম কথা বলে।আমার সাথে কম কথা বলা মানুষ আমার একদম ভাল লাগে না।তাহলে তাকে কেনো ভাল লাগে।আমি কি ওকে ভালবেসে ফেলেছি।ওর চিঠির জন্য এভাবে অপেক্ষা।ওর মেসেজ না পেলে আগে মন খারাপ করা।উঠতে বসতে সব সময় শুধু ওর কথাই মনে পড়ে।কিন্তু ও কি আমাকে ভালবাসে?হয়ত বাসে না।

থাক না আমারটা এক তরফা।বহুদিন ধরে মনে কথা গুলো জমা আছে আমার আজ চিঠির উত্তরে সব লিখে দিব।

একা একাই সব কথা আওরাচ্ছিল রুহু।পিছন থেকে বেলের আওয়াজ হতে হুড়মুড়িয়ে উঠে গিয়ে সটান রাস্তার মাঝে দুই দিকে দুইহাত বাড়িয়ে দাড়াল।নইলে পিয়ন কাকা থামবে না।

-রুহু সর সর।লাগবো কিন্তু।সর সামনে খারইস না।

-তুমি আগে নাইমা চিডি আমার আতে দেও।নাইলে যাইতাম না।

-এই তুইল্লা দেম কিন্তু।

-হইও আমি ডারাইছি।নামো তো কাহা।

বেচারা উপায় না পেয়ে নামতেই হল।চিঠিটা বের করে দাড়াতেই এক থাবাই ওটা নিয়ে সোজা আম গাছের ডালে।

-যাও যাও।সই সাক্ষর আব্বা কইরা দিবোনে।

পিয়ন কাকা জানেন যে ওকে আজ আজ সন্ধ্যার আগে গাছ থেকে কেউ নামাতে পারবে না।তাই মাথা নাড়িয়ে হাসতে হাসতে তিনি বিদায় নিলেন।

*****

চিঠিটা রুহু প্রায় পনেরোবার পড়েছে।কি লিখেছে তার কিছুই এখন তার মাথায় নেই।মাথায় শুধু একটা কথা ঘুড়ছে।শুভ্র বলেছে, “আমাকে দেখার খুব শখ মহাশয়ের।এই পর্যন্ত যর চিঠি দিয়েছো সব গুলোতেই এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছো।তবে আমি তো নিজে দেখা দিবো না।দেখতে চাইলে এসো খুলনার মধুপুরে।দেখি জনাবের সাহস কত।হাহা।”

হাসিটা রুহু শুনেনি।তবুও যেন কানের কাছে বেজে চলেছে।

*****

প্রিয় শুভ্র,

আজ আবার তোমার কাছ থেকে সেই প্রিয় শব্দটা আমার পাওনা রয়ে গেল।এই নিয়ে অনেক চিঠি তুমি লিখেছো।প্রথম বার তুমি দ্বিধা বোধ করার কারনে প্রিয় শব্দটা উল্লেখ করনি।আজ এতগুলো চিঠি লিখার পরও দেখছি তোমার সেই দ্বিধা কাটেনি।আজ আমার কাছে বিশেষ কিছু লিখবার নেই।আজ প্রতিবারের মত পুরো সপ্তাহের বিস্তারিত বর্ণনাও দিব না।শুধু একটা অধিকার চাইবো।দেবে কি??

শুধু তোমার হাতটা চাইবো।যেটা প্রথম যখন তোমার প্রেমে আমি পড়ি তখন থেকেই আমার কাম্য বস্তু।শুধু তোমার মুখের সেই প্রিয় শব্দটা চাইবো যেটা আজও আমি শুনতে পায়নি।তুমি কি জানো! তোমার চিঠির প্রতিটা শব্দ আমার কানে লেগে যায়।মনে হয় তোমার সাথে কথা বলছি।

শুভ্র।ধরবে কি আমার হাত?যেভাবে ধরলে আর সারাজীবন ছাড়া যায় না সেভাবে।আমার মন বলছে তুমি এর পর আর চিঠি দেবে না।

আমি আসছি শুভ্র।তোমার কাছে।খুব শীঘ্রই।

ইতি

রুহু

৭.

“আব্বা,আসব?”ছোট্ট বিড়াল ছানার মতো গুটিসুটি হয়ে দাড়িয়ে আছে রুহু।

-রুহু।আয় আব্বা।ভিতরে আয়।

-আব্বা একটা কথা বলার ছিল।

-হ্যা বল।

কামরুল সাহেব কাগজপত্র দেখছিলেন।কিছুক্ষন কোনো শব্দ হলো না।একটু পর তিনি মাথা তুলে তাকালেন।রুহু সেই আগের মতই দাড়িয়ে।তিনি উঠে ড্রয়ার থেকে কিছু টাকা বের করে বললেন,”তোর আম্মা সব বলেছে।যা কিন্তু সাবধানে যাবি।আর নিজের খেয়াল রাখিস।”

রুহু একবার টাকাগুলো দেখল।তারপর উপরে তাকিয়ে বলল,”আচ্ছা।”

সে জানত মা আগে থেকেই সব বলে দেবে আব্বাকে।পিকনিকে যাবে বলে সেই তিন দিন ধরে মার পিছন পিছন ঘুরছে।মাঝে যখন একবার রুকু একটু বাদ সাধল।তখন মা আরো বেঁকে বসলেন।আপানিটা যে কি শান্তি পায় এমন করে।আসুক একবার ফিরে।রাক্ষুসির মাথায় একটা চুলও রাখবে না।কিন্তু শেষে সব ঠিক হয়ে গেছে এটাই অনেক।

পিকনিকে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না।সব কেমন খাপছাড়া লাগছিল ওর।তিন সপ্তাহ ধরে শুভ্রর চিঠি নেই।কিছুই ভাল লাগছিল না।আম গাছের নিচে বসে একা একা কথা আর ভাল লাগছিল না।সেই বাতাসে চুল উড়া অসহ্য লাগছিল।চিঠি আসবে না জেনে রাস্তার এক পাশে দাড়িয়ে থাকত।তাকে দেখেই কাকা ইদানীং দাড়িয়ে যান।সে ক্লান্ত চেহারা নিয়ে বলে,

-কাহা।আমার নামে কোনো চিডি আইসে?

কাকা সেই প্রতিবারের মত খুজে দেখেন।আর শুকনো মুখে মানা করে।

কলেজের ক্লাশে কোনো কথাই তার কানে যায় না।ক্লাশ ছেড়ে বেরিয়ে আসতেও ভাল লাগে না।কিন্তু এর মধ্যে রবিন একদিন ফোন দিয়ে বলল সবাই নাকি বেড়াতে যাবে।ওর চাচার বিয়েতে।রুহু প্রথমে মানা করেছিল।

-কিন্তু রুহু তুই না গেলে কিভাবে হবে।

-না রে আমার শরীর ভাল নেই।

-আরে বেশি দুর তো নয়।খুলনা যাব।

কথাটা রুহুর কানে বাজতে লাগল।খুলনা তো শুভ্রর বাড়ি।

-খুলনার কোথায়।

-মধুপুর। পদ্মবিলা।

৮.

বাস চলছে।ডাইনিটাও যাচ্ছা।যায়গাও পেয়েছে সবার পিছনে।কিন্তু তা নিয়ে রুহুর চিন্তা নেই।এমনি হলে রাগ হতো।তবে আজ তেমন লাগছে না।মনটা খুব হালকা লাগছে।পদ্মবিলার পাশেই শুভ্রদের গ্রাম।শুভ্র একবার বলেছিল তাদের গ্রামের পাশে একটা গ্রামের নাম পদ্মবিলা।সেখাবে নাকি পদ্মের শ্বাস বিক্রি হয়।এবার গেলে বেশ অনেক গুলো পদ্ম নিয়ে যাবে শুভ্রর জন্য।গিয়ে তার সামনে বসে বলবে।”তোমার জন্য এনেছি শুভ্র।নেবে?”

তখন শুভ্র হেসে বলবে”পদ্মবিলা থেকে ফুল এনে তুমি আমাকে দিচ্ছো।”কিন্তু সে হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো নেবে।

“রুহু,ওই রুহু।ঘুমিয়ে পড়লি নাকি।”

চোখ মেলে তাকাল রুহু।ডাইনির জন্য চোখ বন্ধ করেও শান্তি নেই।

-নামতে হবে তো চল।

রুহু কিছু না বলে সবিতা আর রবিনের পিছন পিছন নেমে এলো।তারা নেমেছে দৌলতপুর।সেখান থেকে মধুপুর আরো ভিতরে।

এখন আবার গাড়িতে উঠো।রবিনের বাবা গাড়ি ডাকতে গেল।আর ওরা এখানে দাড়িয়ে।আরো কয়েকজন বন্ধু এসেছে।কারোর সাথেই কথা বলার ইচ্ছা নেই রুহুর।এমনকি ওই ডাইনির সাথেও না।ও শুধু এদিক ওদিক তাকচ্ছে।

*****

গায়ে হলুদ এমনভাবে অনেকদিন পর দেখল সে।কোনো আধুনিকায়ন নেই।বরকে হলুদ দেওয়া শেষ হলে যে যার মত হলুদ নিয়ে যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই দিচ্ছে।একটু আগেই ডাইনি রুহুর মাথাটা হলুদে ভরে দিয়েছে।এবার যদি ওকে হলুদ না খাইয়েছে তবে রুহু নাম বদলে ফেলবে বলেছে।হাতে হলুদ শেষ হয়ে গেছে।ঘরে গিয়ে হলুদ আনতে হবে।কিন্তু ঘরে যাওয়ার জো নেই।দাদিরা ধরে এবার পানি ঢালবে।কি করবে?

হঠাৎ সবাই যেন একটু দমে গেল।মেয়েরা আস্তে আস্তে সবাই ঘরে চলে গেল।রবিন এদিকে আসছিল।

-কিরে রবিন কি হয়েছে।

-পাশের গ্রামের আজহারউদ্দীন এর ছোট ছেলে মারা গেছে।

-ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।কি হয়েছিল।

-জানি না।ওখানে গেলে জানা যাবে।যাবি?

রবিনের প্রস্তাবে রুহুর ভেতরটা একটু কেপে উঠলো।ভয় করছে।খুব ভয় করছে।

৯.

সবিতাও সাথে এসেছে।বাড়ির অন্যরা আগেই এসেছে।আজহারউদ্দীন মনে হয় এলাকায় নামি লোক।তাই অনেক মানুষ এসেছে।মানুষ বিভিন্ন কথা বলছে।রুহুর হাত পা কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে।খুব বেশি ভয় করছে।কিন্তু তার তো এমন ভয় কখনও করেনি।বাড়িতে সে সারারাত অনেক লাশের পাশে বসেছে।তখন তো এমন লাগেনি।মনটা খুবই অস্থির লাগছে।মন চাইছে এখান থেকে চলে যায়।এখানেই কোথাও হয়ত শুভ্র থাকে।তার সাথে দেখা হলে মনটা হয়ত শান্ত হবে।

-রবিন আমার ভাল লাগছে না।চল না চলে যাই।

-আরে দাড়া না রুহু।এসেছি যখন একটু জেনেই যাই।

রুহুর কথাই বলতে ইচ্ছা করছে না।খুব অস্থির লাগছে।সবিতা ওকে দেখছিল।

-রুহু কি হয়েছে তোর।এভাবে ঘামছিস কেন?

খারাপ লাগছে?

রুহু উত্তর দিল না।রবিন একজনকে দাড় করালো।হিন্দু লোক।

-দাদা, কি হয়েছিলো।

-ক্যান্সার হইছিলো।রক্তে।

রুহু একটু আতকে উঠলো।

-লিউকেমিয়া?

-(রবিন)হুম।ব্লাড ক্যান্সার।

-(সবিতা)দাদা নাম কি ওনার।

রুহুর ভিতরটা কাপছে।নাম জিজ্ঞাসা করার কি দরকার।চলে আসলেই তো হয়।সকালেও মনটা ভাল ছিল।এখনই বা এমন লাগছে কেন তার।

-মাজহার উদ্দিন।

রুহুর ভিতরে একবার ধক করে উঠে আবার যেন প্রান ফিরে এলো।

রবিন ঘুরে দাড়াল।

-মাজহার উদ্দিন?কিন্তু উনার ডাক নামটা যেন কি?

-শুভ্র।

রুহুর পায়ের নিচ থেকে যেন ঠান্ডা হতে শুরু করল।চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছিল।কোন শুভ্রর কথা বলল এই লোক।না না।এমন হলে শুভ্র ওকে ঠিক বলত।হয়ত বলত না।আর এখানে কি একটা শুভ্রই আছে নাকি।একবার কি দেখবে।বুকটা ধক ধক করছে ভয়ে।

আচমকা ভীড় ঠেলে সে লাশের কাছে গেল।

-চাচা মুখটা একটু দেখাবেন।

এক বৃদ্ধ মুখটা দেখাল।ঘুমন্ত এক শিশুর মুখের মত দেখাচ্ছে।চোখের নিচে কালি।রুহু তাকিয়ে ছিল অনেক্ষন।এই বুঝি শুভ্র চোখ খুলবে।

****

নদীর পাড়টা খুব সুন্দর।মৃদুমন্দ বাতাস বইছে।নদী ওই পাড়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রুহু।আজ সে কাঁদতে পারছে না।যে ছেলে চড় খেয়ে কেঁদে বুক ভাসাতো।সে আজ পাথরের মত বসে আছে।চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ছে।

পিছন থেকে হাত দিল কেউ।রুহু পিছনে ফিরল।

-(রবিন)এখানে কি করছিস।

-(সবিতা)তুই কাঁদছিস কেন।আর এই নদীর পাড়ে কেন এই সন্ধ্যাবেলা।

রুহু চোখ মুছল,”এ আমার প্রথম প্রনয় বেলা।যেখানে এপাড়ে আমি একা রয়ে গেলাম।”

আধার প্রায় হয়ে এসেছে।গাছের নিচে বসে আছে রুহু।পাশে দাড়িয়ে আছে সবিতা আর রবিন।গোধুলী লগ্ন হাজারবার আসবে।আসবে না শুধু এই বেলা।

[যবনিকা]

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.