প্রহেলিকা

আয়াদ মোহাম্মাদ হিমু

উৎসর্গঃ প্রিয় লেখক ঘাসফড়িং’কে

বিড়ালের মতো দৃপ্ত পায়ে এগোচ্ছি। কয়েকপা এগিয়েই হাঁটু গেড়ে বসলাম। তারপর, দিলাম এক থাবা আর ধরে ফেললাম তরতাজা এবং খুব সুন্দর একটা ঘাসফড়িং। আনন্দে আমার মুখটা জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁটের কোণে রাজ্য জয়ের হাসি। একটু দূরেই দেখলাম আরো কয়েকটা ঘাসফড়িং।সেখানে গিয়ে ওদেরও ধরলাম।ছোট্ট বাঁশের ঝুঁড়িটায় রেখে দিলাম সব।আজ অনেকগুলো ঘাসফড়িং ধরেছি। তাই আজকের মতো এখানেই ঘাসফড়িং ধরার ইতি টানলাম। বাড়ির পথে রওয়ানা হলাম। পথেই দেখা হলো আমাদের এলাকার রমিজ চাচার সঙ্গে। আমাকে দেখেই প্রসন্নমুখে জিজ্ঞেস করলো,

কী বাবা!সকাল সকাল ঘাসফড়িং ধরতে গেছিলে বুঝি?

হ্যাঁ চাচা!

তা আজ কয়টা ঘাসফড়িং ধরলে?

আজ অনেকগুলো ঘাসফড়িং ধরেছি।বলেই দেখালাম ঝুঁড়ির মুখ খুলে।

বেশ বেশ!তা এখন বাড়ি যাচ্ছো নাকি?

হ্যাঁ চাচা।যাই এখন।বলেই হাঁটা ধরলাম বাড়ির দিকে।

*

আমি হিমু।আরে না না!আমি হুমায়ুন আহমেদের সেই হিমু না।আমি একদম সেই কাল্পনিক হিমুর মতো না।আমিতো আয়াদ মোহাম্মাদ হিমু।নামটা আমার বাবার দেওয়া।তবে আমার বাবা কিন্তু হুমায়ুন প্রেমী না।এমনকি সাহিত্যের ধারেকাছেও নেই আমার বাবা। তবুও কেনো যে আমার নামের সাথে হিমু যুক্ত করলেন সেটা পৃথিবীর অষ্টম আআশ্চর্য বললেও ভুল হবেনা।আমি অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ি,আমাদের এলাকারই একটা কলেজে।স্বভাবে খুব দূরন্ত না হলেও মোটামুটি চটপটে বলা যায়।স্বল্পভাষী হওয়ায় বন্ধু খুব কম হলেও,অন্য সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে।

সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ানোই আমার কাজ।এখানে ওখানে ঘুরে বেড়িয়ে ঘাসফড়িং ধরাই আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ।আমি প্রতিদিন ঘাসফড়িং ধরে আনি,এদের সাথে সখ্যতা পাতাই আবার ছেড়ে দিই।কিন্তু আজ অবধি কোনো ঘাসফড়িং আমার বন্ধু হয়েছে কী না বলতে পারবো না।আমাদের বাড়ির আশেপাশে যতো ঘাসফড়িং ছিলো,সবগুলো আমি ধরেছি আবার ছেড়েও দিয়েছি।কিন্তু ঘাসফড়িগুলো মনে হয় ভয় পেয়েছে।আমার বাড়ির আশপাশ থেকে পালিয়েছে হতচ্ছাড়া গুলো।আমিতো ওদের কোনো ক্ষতি করিনি তবুও চলে গেলো!তাই এখন দূর দূরান্তে যেতে হয়।আমার এলাকার প্রায় সব মানুষ আমার ঘাসফড়িং ধরার অভ্যাসটা সম্পর্কে অবগত।তাই কেউ কেউ আমাকে ঘাসফড়িং শিকারী ডাকে,কেউ ডাকে ঘাসফড়িং এর জামাই।আর কেউ কেউ তো আমাকে ঘাসফড়িং বলেই ডাকে।আমার প্রাতিষ্ঠানিক নামটা এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।এই নিয়ে বাবা মনঃক্ষুণ্ণ আমার উপর।তাঁর পছন্দের নামে আমাকে কেউ ডাকেনা,সে নাকি আমার কারণেই।অবশ্য আমি ওসবে পাত্তা দিইনা।নামে কী আসে যায়।আমি মনোযোগ দিয়ে আমার ঘাসফড়িং ধরার কাজ চালিয়ে যাই।

*

আঠারো হাজার মাখলুকাত এর মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম কীটপতঙ্গ কে।তেলাপোকা,ঘাসফড়িং এবং যতো পোকা আছে সবে আমি ভয় পেতাম।কেউ আমার সামনে কখনো কোনো পোকামাকড় আনলে আমি চিৎকার করে আকাশপাতাল মাথায় করতাম।সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম ঘাসফড়িং কে।রাস্তায় কখনওই আমি ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটতাম না।মাঠে যেতাম না কখনো ঘাসফড়িং এর ভয়ে।কিন্তু এক দমকা হাওয়ার শীতল পরশ আমার জীবনটা পুরো পরিবর্তন করে দিয়েছে।বদলে দিয়েছে আমার সমস্ত ধ্যানধারণা।খুলে দিয়েছে সকল অনুভূতির দুয়ার।আমার জগৎটা আজ শুধু তাকে ঘিরেই।সে এসেছিলো আমাকে ঘাসফড়িং চেনাতে।ঘাসফড়িং ভীতি দূর করতে।কিন্তু কে জানতো!সে আমার মনের সকল আবর্জনা সরিয়ে আমার মনেই জেঁকে বসবে!ঘাসফড়িং তো তাঁরও খুব প্রিয় ছিলো।এমনকি ঘাসফড়িং হাতে নিয়ে ঘুরাও তাঁর একটা অভ্যাস ছিলো।আমার জীবনে তাঁর আগমন অনেকটাই শুকিয়ে যাওয়া গাছে পূনরায় জল দিয়ে সজীব করার মতো।আমার নিঃসঙ্গ জীবনটা,বেদনায় দুমড়ে মুষড়ে যাওয়া হৃদয়টা যখন একাকীত্বের বহ্নিতাপে পুড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিলো,ঠিক তখনই সে এসেছিলো সুপ্ত ভালোবাসার শীতল লাভা নিয়ে।

তখন দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছি সবে।একদিন আমার পাশের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিলো।আমিও সেখানে নিমন্ত্রিতদের মধ্যে একজন ছিলাম।যথারীতি খাওয়া শেষ করে ওদের বাগানে হাঁটছিলাম।আরো অনেকেই ছিলো সেখানে।আমি এককোণে একটা খালি পরিচ্ছন্ন জায়গা দেখে বসলাম।হঠাৎ কেউ একজন এসে আমার গায়ের মধ্যে কিছু একটা ফেলে দিয়ে দৌঁড়ে চলে গেলো।গায়ে কী ফেললো তা দেখার জন্য তাকাতেই গগন ফাটানো একটা চিৎকার দিলাম।আমার গায়ে একটা ঘাসফড়িং।তখন বুঝলাম ঐ লোকটা আমার পরিচিত কেউই ছিলো।আমি চিৎকার করেই যাচ্ছি অথচ ঘাসফড়িং টাকে যে ফেলে দিবো ভয়ে সেটাও করতে পারছিনা।ইতোমধ্যে মধ্যবয়স্ক একজন লোক এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো কী হয়েছে!এবার আমি ভয়ে কথা বলতে পারছিনা।আমার মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছে না।কোনোরকম চোখ দিয়ে লোকটাকে আমার গায়ের ঘাসফড়িং টার দিকে ইশারা করলাম।

তৎক্ষণাৎ সেখানে অনেক লোক জমা হয়ে গিয়েছিলো।অপরিচিতরা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলো,আর পরিচিতদের করুণ চাহনি।আমি কিচ্ছু বলতে পারছিলাম না।শুধু ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সবার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম ফ্যালফ্যাল করে।আমার সামনের লোকটা খপ করে ঘাসফড়িং টা ধরে আমার চোখ বরাবর সামনে এনে বললো এটাকে তুমি ভয় পাচ্ছিলে?আমি তখন হতভম্বের মতো আরো একটা চিৎকার দিয়ে লোকটাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে আসলাম।

*

সেদিন আর বাড়ি থেকে বেরোইনি।এমনকি এর পরেরদিনও বাড়ি থেকে বের হইনি।ঠিক তার পরেরদিন সকালবেলা কারো উচ্চস্বরে হাসির শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো।তবে হাসিটা ঠিক কারোর না,কয়েকজনের সম্মিলিত হাসি।বাবা এবং মায়ের হাসির শব্দটা খুব সহজেই বুঝতে পারলাম।কিন্তু আরেকজন কে?তাঁর কন্ঠটাও অবশ্য পরিচিত মনে হচ্ছে।আমি উঠে বারান্দার দিকে গেলাম যেখানে ওরা কথা বলছে।আমি ওখানে যেতেই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।সেদিনের সেই লোকটা!!যে আমাকে ঘাসফড়িং থেকে বাঁচানোর ছলে ভয় দেখিয়েছিলো।আর এখন এখানে দিব্যি বাবা মায়ের সাথে হাসি তামাশা করছে।আমার মেজাজ চটে গেলো।কিছু বলতে যাবো,তখনই লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বললো,আরে হিমু!এসো এসো তোমাকে নিয়েই কথা হচ্ছিলো।

আমি বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম।আমার নামটা লোকটাকে বাবা ই বলেছে।

যাইহোক! আমি ওদের পাশে পুরোটা সময় বসেই রইলাম।কোনো কথা বলিনি।লোকটা যাওয়ার আগে বললো,ওদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য।

লোকটা চলে যাওয়ার পর বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম লোকটা কে!থাকে কোথায়!

বাবা যা বললো তাতে আমি খুব অবাক ই হয়েছি।

বাবা বললো,লোকটা বাবার ছোটোবেলার বন্ধু।উনার নাম মুনির আহমেদ। এতোদিন ঢাকায় ছিলো,এখন থেকে গ্রামে থাকবে।তখন মনে পড়লো,এজন্যই তো আমি লোকটাকে চিনিনা।আমিতো ভেবেছি লোকটা বিয়ে বাড়ির কোনো আত্নীয়।এখন তো দেখি উনি আমারই আত্মীয় হয়।মানে আমার চাচা হবে তাহলে।

বাবা আরো বললো,আমাদের গ্রামের যে জমিদার বাড়িটা আছে,ওখানেই লোকটা মানে মুনির চাচারা থাকেন।মুনির চাচার পূর্বপুরুষরা নাকি জমিদার ছিলেন।শুনেই মুখ ভেংচি দিলাম।জমিদার না ছাই!লোকটাকে আমার একটুও সহ্য হয়না।তবুও বাবার বন্ধু বলে কথা!তাই মুখফুটে কিছু বললাম না।

আচ্ছা বাবা!উনি আমাকে উনার বাড়িতে যেতে বললেন কেনো?বাবা কিছু না বলেই উঠে গেলো।মায়ের দিকে তাকাতেই মা মুচকি হাসলো।

আমার ব্যাপারটা কেমন সন্দিহান মনে হলো।আবার বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে আমাকে ভয় দেখাবে না তো!

*

পরেরদিন বিকেলবেলা মুনির চাচাদের বাড়ি গেলাম।কিন্তু বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়েই আছি।কেমন ভূতুড়ে বাড়ি!শুনেছি পুরোনো জমিদার বাড়িগুলো তে ভূত,পেত্নী থাকে।এমন তো নয় মুনির চাচারাও সবাই ভূত!আমি একদম আসতে চাইনি,বাবার জোরাজুরি তে আসতে হলো।এর আগে কখনো এই বাড়ির ছায়াও মাড়াতাম না ভয়ে।কিন্তু আজ যদি সত্যি সত্যি ভূত আমার ঘাড় মটকে দেয়!এসব উদ্ভট ভাবনা ভাবতে ভাবতেই ওদের বাড়িতে প্রবেশ করলাম।মুনির চাচাকে দেখলাম সবার সাথে বসে ওদের দালানঘরের সামনে দাওয়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছে।আমাকে দেখেই মুনির চাচার মা বলে উঠলো,এসো এসো ভীতু হিমু!

আরে এই বৃদ্ধা আমার নাম কীভাবে জানলো?আমাকে চেনেই বা কী করে!এরা সত্যিই সবাই অশরীরী নয়তো!দেখলাম আমার বয়সীই একটা ছেলে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।পরিচিত মনে হচ্ছে।আরে হ্যাঁ!এ তো মামুন।আমাদের সাথেই পড়ে আমাদের কলেজে।কয়েকদিন আগেই ভর্তি হয়েছে।আমার সাথে মাঝেমাঝে এসে কথা বলতো,ভাব জমাতে চাইতো

আমি তেমন পাত্তা দিতাম না।আসলে ক্লাসে নতুন কেউ আসলে একটু ভাব নিতে হয়।আর তাছাড়াও আগবাড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস নেই আমার।

আরে মামুন!তুমি এখানে থাকো?জানতাম না তো!

তুমি কীভাবে জানবে!কলেজ ছুটি হলেই তো তুমি সবার আগে বাড়ি চলে আসো।কারো সাথে কথাও বলোনা ঠিকমতো।

আসলে ক্লাসে নতুন ছাত্রদের সাথে একটু আধটু ভাব নিতে হয়।বলেই দুজনেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম।মামুন আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো।ওর বোন,মা,দাদী এবং সবার শেষে মুনির চাচার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলো,বললো উনি আমার বাবা।যদিও ওরা সবাই আমাকে চেনে।আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মুনির চাচার দিকে তাকালাম।মনে হয় এক্ষুণি আমি উনাকে ভষ্ম করে দেবো আমার চোখের আগুনে।মুনির চাচার পরিবারের সবাই অনেক হাসিখুশি বলা চলে।আমাকে দেখে অনেক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো।আমারও ভালোই লাগছিলো।কিন্তু ওরা সবাই আমার ঘাসফড়িং ভীতিটাকে নিয়ে যাচ্ছেতাই মজা করলো,এটা আমার ভালো লাগেনি।শুধু মুনির চাচার স্ত্রী কে দেখলাম একটু নাখোশ।উনি আড্ডার মাঝখানেই উঠে চলে গেলেন।আড্ডা শেষে মুনির চাচা বললেন,হিমু শোনো! তোমাকে নিয়ে একটা জায়গায় যাবো চলো।আমি যাবোনা যাবোনা করেও সবার জোরাজুরি তে যেতে হলো,তবুও গেলাম মুনির চাচার সাথে।আমি মুনির চাচার পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম।বিশাল বড়ো বাড়ি।তার উপর কেমন ভূতুড়ে!কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কে জানে!আমার ভীষণ ভয় করছে।হঠাৎ মুনির চাচা একটা কক্ষের সামনে দাঁড়ালো।কক্ষের দরজা খুলেই আমাকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন।কক্ষটা দেখে মনে হলো এটা লাইব্রেরি ধরনের।বিভিন্ন আলমারির তাকেতাকে

বই দিয়ে সাজানো।কক্ষটা পুরোনো হলেও প্রাণবন্ত লাগছে বেশ।

*

কক্ষটাতে দেখলাম অনেক বড়ো বড়ো ঘাসফড়িং এর ছবি।এছাড়াও রয়েছে ঘাসফড়িং সম্পর্কিত অনেক বই।একটা টেবিলের উপর দেখলাম একটা বই।বইয়ের মলাটে দেখলাম অনেকগুলা ঘাসফড়িং এর ছবি।আমি বইটা খুলে দেখতে লাগলাম।হঠাৎ মুনির চাচা আমাকে ডাকলেন। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলাম উনার হাতে একটা কাচের পাত্র।বুঝলাম এটা প্রিজারভেশন জার।কারণ পাত্রটার ভেতরে অনেকগুলো ঘাসফড়িং কে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।এটা দেখে আমার ভয় করতে শুরু করলো।মুনির চাচা এবার দৃঢ কন্ঠে আমাকে ডাকলেন।আমি ভয়ে ভয়ে কাছে গেলাম।আমাকে বললো,দেখো ঘাসফড়িং রা কিন্তু কাউকে কাঁমড়ায়না কিংবা কারো কোনোরকম ক্ষতি করেনা।তুমি নির্ভয়ে এটা ধরতে পারো।এই বলে মুনির চাচা একটা ঘাসফড়িং কাচের পাত্র থেকে বের করে বললেন,ধরো এটাকে।আমি ধরছিলাম না ভয়ে।উনি ধমক দিয়ে আমাকে বললেন ধরো বলছি।আমি কোনোরকম ভয়ে ভয়ে সবেমাত্র ঘাসফড়িং টার গায়ে হাত দিতেই আবার সরিয়ে নিলাম।তারপর মুনির চাচা কে বললাম,আমি বাড়ি যাবো,সন্ধ্যা হয়ে আসছে।আর আমার ভালোও লাগছেনা।এই বলে চলে এলাম।

*

ভেবেছিলাম আর যাবোনা ঐ বাড়িতে।কিন্তু না!বাবার পীড়াপীড়ি তে পরেরদিন আবারও যেতে হলো মুনির চাচার বাড়ি।এবার মুনির চাচা আমাকে বললো,তুমি বসো আমি তোমাকে দেখাচ্ছি।বলে মুনির চাচা একটা ঘাসফড়িং নিয়ে আসলেন।তারপর ঘাসফড়িং টা আমার কাছে এনে আমার হাতে রাখলেন।আমি চিৎকার দিতে যাবো এমন সময় মুনির চাচা আমাকে ধমকে চুপ করিয়ে দিলেন।তারপর শান্ত গলায় বললেন,দেখো এটা তোমাকে কাঁমড়াচ্ছেনা।কোনোরকম ক্ষতিও করছেনা।আমি তাকিয়ে দেখলাম।আরে তাই তো!এটা তো আমার কোনো ক্ষতিই করছেনা।এবার মুনির চাচা আমাকে বললেন,এটাকে এবার ধরো।আমি ধীরে ধীরে হাত এগিয়ে নিয়ে ঘাসফড়িং টা ধরলাম।ধরেই আবার এক ঝঁটকায় ফেলে দিলাম।মুনির চাচা হাসলেন,আর বললেন আবার চেষ্টা করো।আমি এভাবে বারবার চেষ্টা করতে করতে এক পর্যায়ে সমস্ত ভীতি কাটিয়ে ঘাসফড়িং টা পুরোপুরি ধরলাম।

*

এবার আসলো ঘাসফড়িং কীভাবে ধরতে হয় মানে শিকার করগে হয়।মুনির চাচা আমাকে এটা শেখানোর জন্য প্রতিদিন বিকেলে বের হতেন আমাকে নিয়ে ঘাসফড়িং এর খোঁজে।এবং শেখাতেন।।মাঝেমাঝে আমাদের সাথে মামুনও যেতো।এভাবে একটা সময় আমার ঘাসফড়িং ভীতিটা পুরোপুরি কেটে গেলো।আমিও মুনির চাচার মতো ঘাসফড়িং ভালোবাসতে শুরু করলাম।এখন আমিও মুনির চাচার মতো ঘাসফড়িং হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াই।

মুনির চাচা অনেক হাসিখুশি একজন মানুষ ছিলেন।তবুও কখনো কখনো উনাকে প্রচুর বিষণ্ণ দেখাতো।মনে হতো জগতের সকল দুঃখ কষ্ট উনার মাঝেই ভর করে আছে।ইচ্ছে করতো মুনির চাচাকে জিজ্ঞেস করি,আপনার কেনো এতো বিষণ্ণতা?কীসের এতো দুঃখ!কিন্তু কখনোই সেটা বলা হয়ে উঠেনি।কারণ আমাদের সম্পর্কের একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা ছিলো।সেটা আমি কখনোই পেরোতে পারিনি,আর পারবোও না কখনো।

*

এভাবেই ঘাসফড়িং কে ভালোবাসতে,ভালোবাসতে ঘাসফড়িং এর পিছু ছুটতে ছুটতে কখন যে মুনির চাচা কে ভালোবেসে ফেললাম নিজেও বুঝতে পারিনি।হ্যাঁ আমি মুনির চাচাকে ভালোবাসি।একজন আঠারো বছরের ছেলের মুখে একজন চল্লিশোর্ধ পুরুষকে ভালোবাসার কথা যে কেউ অবাক হবে!নাক সিঁটকাবে।কিন্তু তবুও আমি মুনির চাচাকে ভালোবাসি।তাই মুনির চাচাকে একবার দেখার জন্য,কথা শোনার জন্য প্রতিদিন নানা ছুঁতোয় উনার বাড়ি যেতাম।

মামুন এর সাথে আমার বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে এখন।তাই ওর সাথে লেখাপড়ার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপের ছুঁতোয় সারাদিন পড়ে থাকতাম ওর সাথে ওদের বাড়িতে। আমি ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্র হওয়ায় মামুন এর জন্য সেটা তাঁর পরিবার ইতিবাচক ভাবেই নিয়েছিলো।আমাকে মামুন এর খুব ভালো বন্ধু হিসেবেই ওর মুমিন চাচার পরিবার গ্রহণ করেছিলো।কিন্তু আমি ওদের বাড়িতে গেলেই আমার মন পড়ে থাকতো মুনির চাচার কাছে,কখন দেখবো কখন দেখবো এই ভেবে।তবে মুনির চাচা এবং উনার স্ত্রী দুজনকেই প্রায় সময় দেখতাম বিষণ্ণ মনে থাকতো।আমার যেটা কখনোই ভালো লাগতো না।বিশেষ করে মুনির চাচার এমন অবস্থা আমাকে সবসময়ই পোড়াতো।

একদিন মামুন কে জিজ্ঞেস করেছিলাম মামুন বলতে চাইছিলো না।তবুও আমি জোর করায় বললো,ওর মা মানে মুনির চাচার স্ত্রী মুনির চাচার এমন কর্মকান্ড পছন্দ করেনা।সারাদিন ঘাসফড়িং নিয়ে পড়ে থাকা,বই পড়া এসব মুনির চাচার স্ত্রী একদম সহ্য করতে পারেনা।মাঝেমাঝেই ওদের ঝগড়া হতো এসব নিয়ে।আমিও অবশ্য কয়েকদিন দেখেছি এসব।যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি পোড়াতো,সেটা হলো মুনির চাচা আর উনার স্ত্রী নাকি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো।আর এখন ওদের সংসারে এতোটুকু শান্তি নেই।

*

মুনির চাচা ছিলেন প্রচন্ড সাহিত্যপ্রেমী একজন মানুষ।মাঝেমাঝে যখন আমরা সবাই মিলে গল্প করতে বসতাম উনার বাড়িতে।তখন উনি আমাদের বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন।এছাড়াও বিভিন্ন কবি,লেখক এবং মহামনিষী দের জীবনী বলতেন।আমি যদিও সাহিত্যের আগা গোড়া কিছুই বুঝিনা,তবুও মুনির চাচা থেকে কিছুটা রপ্ত করেছিলাম সাহিত্যের রস।মুনির চাচার কাছ থেকে অনেক বই নিয়ে পড়তাম আমি। মানুন এর কাছ থেকে শুনেছি মুনির চাচা নাকি অনেক ভালো গান গায়।মাঝেমাঝে ই ওদের গান শুনায়।তাই একদিন আমি অনেকটা জোর দিয়েই বললাজ আমাকে গান শোনানোর জন্য।কোনোরূপ ভণিতা ছাড়াই মুনির চাচা গাইতে শুরু করলেন,,

তুমি জানো না,

তুমি জানো না রে প্রিয়।

তুমি মোর জীবনের সাধনা!

তোমায় প্রথম যেদিন দেখেছি,মনে আপন মেনেছি।

তুমি বন্ধু আমার মনও মানো না।

তুমি জানো না।

আমি তন্ময়চিত্তে শুনছিলাম মুনির চাচার গান।গান শেষে দেখলাম মুনির চাচার চোখে জল,দূর থেকে দাঁড়িয়ে উনার স্ত্রী গান শুনছিলেন।লক্ষ্য করলাম উনিও আঁচলে চোখ মুছছেন।

*

একদিন অপরাহ্ণে হাঁটতে হাঁটতেই আমাদের গ্রামের শেষ মাথায় নদীর পাড়ে গেলাম।দেখলাম নদীর পাড়ের বটগাছটার নিচে মুনির চাচা বসে কী যেনো তন্ময়চিত্তে ভাবছেন।আমি মুনির চাচার কাছে গিয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করলাম,আরে চাচা!আপনি এখানে?

উনি আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বলতে লাগলেন,জানো হিমু!আমাকে কেউ বোঝেনা।আমার ভেতরের আমিটাকে কেউ কখনো পড়তে পারিনি।কেউ কখনো বুঝতে পারেনি,আমি কী চাই!আমি কীসে খুশি থাকবো।আমার আর এসব ভালোলাগেনা।ভালোলাগেনা এসব পিছুটান। আমি হারিয়ে যাবো দেখো।হয়তো এই নদীর জলেই কিংবা আমার ঘাসফড়িং দের ভীড়ে।

আমি কিছু বুঝতে পারলাম না।শুধু বললাম কী হয়েছে আপনার?

উনি কিছু বললেন না।হয়তো আমাকে বলা উচিৎ মনে করলেন না।কারণ আমাদের সম্পর্কের একটা সীমাবদ্ধতা আছে।আমরা চাইলেই তা অতিক্রম করতে পারিনা।

মুনির চাচা উঠে চলে গেলেন।আর আমি নির্বাক চেয়ে রইলাম মুনির চাচার গমনপথে।

*

সবকিছু ঠিকঠাক চলছিলো স্বাভাবিক নিয়মেই।এর ঠিক কয়েকদিন পর গেলাম সকালে মুনির চাচার বাড়ি গেলাম।গিয়ে দেখি এই সকালবেলা সবাই উঠোনে বসে আছে।দাদী,আপু,আর মুনির চাচার স্ত্রী বসে কান্না করছে।মামুন কে দেখলাম দূরে এককোণে বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে আছে।আমি ওর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে?

ও আমাকে একটা চিরকুট হাতে ধরিয়ে দিলো।তাতে লিখা ছিলো,চলে গেলাম সকল মায়া ছিন্ন করে,খুঁজোনা আমায়।খুঁজলেও পাবেনা।মামুন বলতে লাগলো মুনির চাচা গতোরাতে কোথাও চলে গেছে।উনাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।আমি কথাটা শোনার পর মনে হলো,আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে।এটা তো আমি শুনতে চাইনি।তাঁর মানে মুনির চাচা ঐদিন যা বললো,তা সত্যিই!

আমি একদৌঁড়ো বাইরে চলে আসলাম।সেই বাগান,নদীর পাড় সব খুঁজলাম।কিন্তু কোথাও পাইনি।উনি চলে গেছে।হয়তো আর কখনো ফিরবেনা।কিংবা ফিরে আসবে।আমি কী তাহলে আমার মুনির চাচাকে হারিয়ে ফেললাম?হারিয়ে ফেললাম আমার ভালোবাসা?

*

মুনির চাচা সেই যে গেলো এখনো ফিরলো না।অথচ আমি প্রতিনিয়ত তাঁর অপেক্ষায় প্রহর গুনছি।এখনো আমি গভীর রাতে কিংবা অলস দুপুরে গিয়ে বসে থাকি সেই বাগানটায়।কিংবা সেই নদীর পাড়ের গাছটায়।মনে হয় এএই বুঝি মুনির চাচা হিমু বলে ডাকবে।কিন্তু আফসোস! তা আর হয়না।আদৌ হবে কী না তাও জানিনা।

নিজের অতীত পড়তে পড়তেই বাড়ির সামনে চলে আসলাম।দেখলাম মা দাঁড়িয়ে আছে।আমার জন্যই অপেক্ষা করছে।আমি মায়ের দিকে ম্লান একটা হাসি দিয়ে ঘরে চলে এলাম।এই মা ই আমার একমাত্র আশ্রয় এখন।আজকাল বাবাও আমার সাথে রূঢ় আচরণ করে।বাবা আমার কার্যকলাপে বিরক্ত।কিন্তু মা আমাকে সবসময়ই নিঃশব্দে ভরসা দিয়ে চলেছে।যদিও মা জানেনা আমার এসবের পেছনের ইতিকথা।তবুও মা আমাকে নিরাশার অন্ধকারে ঠেলে দেয়না।ঘাসফড়িং এর ঝুঁড়িটা ঘরে রেখেই আবার বেরিয়ে পড়লাম।গেলাম সেই বাগানটায়।যেখানে মুনির চাচার সাথে প্রথম দেখা।ওখানে গিয়ে সেই গানটা ধরলাম,

তুমি জানোনা,

তুমি জানো না রে প্রিয়।

তুমি মোর জীবনের সাধনা।

তোমায় প্রথম যেদিন দেখেছি,

মনে আপন মেনেছি,

তুমি বন্ধু আমার মনও মানো না!

তুমি জানো না।

গানটা গাইতে গাইতেই নদীর পাড়ের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলাম।নদীর পাড়ে গিয়ে একেবারে পানির সাথে পা ঘেঁষে দাঁড়ালাম।নদীর ছোটো ছোটো ঢেউ আমার পায়ে এসে আঁচড়ে পড়ছে।।ভাবতে লাগলাম গানের কথাগুলো।আসলেই মুনির চাচা জানেনা আমি তাকে কতোটা ভালোবাসি।কখনো জানতেও পারবেনা,তাঁর জন্য কোনো এক হিমু অপেক্ষার প্রহর গুনছে।প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হচ্ছে অর্ন্তদহনে।

কপোল বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো নদীর জলে।আজ যেনো নদীর ঢেউয়ের কলকল ধ্বনিও আমার সাথে সম্মিলিত কন্ঠে বলছে,

আজ রিক্ত হস্তে! তাহারেই পড়ে মনে,

ভুলিতে পারি না কোনো মতে।

প্রথম প্রকাশঃ-সাতরঙা গল্প

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.