ফল্গু

ঘাসফড়িং

-হ্যালো,কোথায় তুমি?

-এইতো,আরেকটু।এসে পড়েছি।

-সেই কখন থেকেই আরেকটু আরেকটু করে যাচ্ছো।আমাকে এদিকে পাক্কা পঁচিশ মিনিট হল বসিয়ে রেখেছো।

-বাবু ক্লাস থেকে বেরিয়েই আমি গাড়িতে উঠেছি।বিকেলের দিকে রাস্তাঘাটে জ্যাম থাকে এটা তো তুমি জানোই।

-আরেকটু আরেকটু না করে এটা বলো যে তুমি ঠিক কোথায় আছো এখন।

-আমি হাতিরঝিলের পাশেই।এই দু’মিনিট লাগবে আর ব্রিজে পৌছুতে।

হাবিবকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আমি কলটা কেটে দিলাম।আধঘণ্টা পেরোতে চলল আমি এইরকম একটা অকোয়ার্ড জায়গায় একলা দাঁড়ানো। জায়গাটা মূলত ঘুরবার জন্যই-অকোয়ার্ড না। কিন্তু যাকে নিয়ে ঘুরতে আসার কথা সে এখনো এসে পৌছায়নি।আর লোকজনে গিজগিজ করা একটা জায়গায় আমাকে সিংগেল দাঁড়িয়ে থাকার ফলে কেমন অনাথের মত লাগছে। মনে হচ্ছে যেন আমি সমাজ বহির্ভুত কেউ।যার কথা বলার কেউ নেই।

ক্লাসমেট,পাড়ার বন্ধুবান্ধব-বড়ভাই সহ যারাই যাচ্ছে ব্রিজ দিয়ে,হাত নেড়ে নেড়ে ‘হাই ফাহিম! কেমন আছো?’ জিজ্ঞেস করছে।অথচ কেউ এসে পাশে দাঁড়াচ্ছে না।সবাই মোটামুটি জোড়া হয়েই হাঁটাহাঁটি করছে।এখানে সবচে’ বেমানান ব্যক্তিটি হলাম আমি।যে কিনা ব্রিজের গ্রিলে পিঠ ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে শরীরের সমস্ত রাগ হাতের কব্জিতে এনে আঙুল কচলাচ্ছি।

-ফাহিম,রাগ ঝেরো না প্লিজ।আজ ক্লাসেও স্যার বকাবকি করেছে।মনটা ভাল নেই খুব একটা।তুমিও যদি রাগারাগি করো তবে রাতটাও খারাপ কাটবে।

আমি চোখে বিরক্তি নিয়ে হাবিবের দিকে তাকালাম।তৈলাক্ত মুখটায় ক্লান্তির ফলে চোখের নিচে কালো ছোপ পড়েছে খানিকটা।ঢিলেঢালা শার্টটাও ভিজে উঠেছে ঘামে। চুলগুলো উস্কুখুস্কু- দেখলেই যে কেউ বলে দেবে এই ছেলে মাথা মোড়ায়নি গত এক সপ্তাহেও। ভার্সিটির হলে থাকে,ক্যান্টিনের খাবার খায়।ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ানিং পড়া স্টুডেন্ট হিসেবে মাসিক পাঁচ হাজার টাকায় একটা টিউশনি করিয়ে খুব ভালভাবেই এই ছেলের দিন কাটে।কিন্তু তারপরও একে দেখলে মনে হয় দিনরাত সে সাংসারিক টানাপোড়েনের চাপে দিনদিন এমন রোগার মত হচ্ছে।আর শারীরিক অবস্থা দেখলে মনে হবে এই মাত্র ইটভাটা থেকে উঠে এলো।

-গোসল করোনি আজ?

-হ্যাঁ,করেছি তো।তুমি এই প্রশ্ন এই নিয়ে অনেকবার করেছো।আর উত্তরও জানো।আমি প্রতিদিন সকালে গোসল করি।দরকার পড়লে মাঝেমাঝে রাতেও করি।

আমি চুপচাপ ঘাড় ঘুরিয়ে নিলাম হাবিবের দিক থেকে।আর বকবক করতে ইচ্ছে করছে না।’মাথায় চিরুনী ছোঁয়াওনি কেন?’, ‘গোসল করলেও এমন মুরগীর মত দেখাচ্ছে কেন তোমাকে?’, ‘এত লেট হলো কেন?’ এইসব প্রশ্ন করলে সে গোছগাছ কিছু উত্তর দিয়ে আমার মুখ বন্ধ করে দেবে আমি জানি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রাগটা কমাই এরপর হাত ধরে হাঁটা যাবে।

হাবিব এগিয়ে এসে ঘেষে আমার পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো।চুপিচুপি আমার বা হাতের কনিষ্ঠা আঙুলটা মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে সোজা তাকিয়ে রইলো। বিকেল বেলায় এই রাস্তাটায় মানুষের ঢল থাকে।আর আজ বৃহস্পতিবার হওয়ায় কপোতকপোতী থেকে শুরু করে ঝালমুড়ি ওয়ালাদেরও ভীড় চোখে পড়ার মত। যে যার মত হাঁটছে।এখানে যে দুজন মানুষের মান অভিমান পর্ব চলছে তা আর খেয়াল করে কে!

-আসো।ঝালমুড়ি খাবো।

হাবিব কাঁধের ব্যাগটাকে ঝাঁকিয়ে নিয়ে মধুর ভঙ্গিতে হেসে উঠলো। চোখ দুটো কেমন সরলভাবে মায়া ছড়ালো।আমি জানি, আমার রাগ নিয়ে হাবিবের প্রচণ্ড ভয়। রাগটা নিজ থেকে এভাবে সরিয়ে দিয়ে তার হাত টেনে ঝালমুড়ি খেতে বলব সেটা ও আশা করেনি।তাই খুশিতে ঝকমক করে উঠলো ঘামে ভেজা মুখটা।

হাতিরঝিলের আসল সৌন্দর্য ফুটে উঠলো সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই।আমাদের ফ্ল্যাট থেকে খুব একটা দূরে নয় হাতিরঝিল। পায়ে হেঁটে দশ-পনেরো মিনিট,আর রিকশায় পাঁচ মিনিটের রাস্তা। তারপরও আমি একা একা কখনো আসি না।হাবিবকে সাথে নিয়ে না এলে জায়গাটাকে আমার জ্যামে পড়া জংশনের মত লাগে।

বিলের পাশ ঘেষে যে পাড়টা উঠেছে, সেই পাড়টাতে খানিক বাদে বাদে লোকজন বসার জন্য বেঞ্চির মত করে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।নির্জন মত একটা জায়গায় হাবিবের একেবারে বুক লেপ্টে বসে আছি আমি। একহাতে আমার ডান হাতটা চেপে রেখে অন্য হাতে মাথার চুল গুলোতে হাত বুলাচ্ছে সে।আমি নিরব হয়ে তাকিয়ে আছি তার দিকে। কেমন এক শূন্যতায় আচমকাই আমার মন খারাপ করতে লাগলো। আমি হাবিবকে ছেড়ে ঠিক হয়ে বস্লাম।

-বাসায় ফিরবে?

হাবিব বুঝতে পেরেছে হয়ত আমার অস্বস্তিবোধটা।পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করতেই তার এ প্রশ্ন।

-হ্যাঁ,ফেরা দরকার।আম্মু বকবে না হয়।

-চলো,উঠি তবে।

শাহবাগের জন্য একটা রিকশা ঠিক করে হাবিব আর আমি চেপে বসলাম। রামপুরা আমাকে নামিয়ে দিয়ে হাবিবকে নিয়ে শাহবাগের উদ্দেশে রিকশাটা এগোতে থাকলো।

নির্বাচনী পরীক্ষার শেষে প্রায় দিন বিশেকের মত ছুটি পড়ল কলেজে।এত লম্বা ছুটি পেতাম না। চলতি মাসের শেষের দিকে জাতীয় নির্বাচন থাকাতে ভ্যাকেশন আর অবরোধ মিলে ছুটির দিন গুলো বেড়ে গিয়েছে। আব্বু ব্যাংকের কাজ কর্মের জটিলতায় আটকানো।জীবনের এই আঠারো বছর বয়সে এসেও আব্বুকে সেভাবে কাছে পাইনি।কিন্তু ছোট সন্তান আর একমাত্র ছেলে হিসেবে আমার প্রতি তার আদর ঈর্ষণীয়। চাচার মেজো মেয়ের বিয়ে ঠিক হওয়াতে কলেজের বন্ধটা কাজে লাগানোর সুযোগ হল। আব্বুও কিছুদিন ম্যানেজ করে নিল। সরকারি চাকরি থেকে রিটায়ার প্রাপ্ত আম্মুর তো আর ঝঞ্ঝাটই নেই। অবশেষে আমরা তিনজন মিলে গাজীপুর নানার বাড়ির জন্য রওনা হয়ে নিলাম।

নিজেদের প্রাইভেট কার থাকায় দুপুর গড়িয়েই আমরা গাড়িতে উঠি। গাড়িতে বসে আপুর জন্য আম্মুর আক্ষেপ শোনা গেল।

-তোমার মেয়েটা আর আসতে পারলো না।

বাবা কিছুটা দরাজ গলায় বলে,

-সে আসবে কী করে? কানাডা থেকে গাজীপুর আসবে বিয়ে খাওয়ার জন্য?

আম্মু অবাক কণ্ঠে বলল,

-বিয়ে কি খাওয়ার জন্যই শুধু? বিয়ে হল যেখানে আনন্দে মানুষের ভেতর পরিতৃপ্ত হয়।মেয়েটা আমার ওদেশে বসে ছটফট করছে।

-তুমিই তো মেয়েকে হাপিত্যেশ করাচ্ছো। ফাহিমের দুলাভাইকে না হয় ফর্মালিটির দায়ে ইনভাইটেশন জানালে,মেয়েটাকেও কি দরকার ছিল আসতে বলার?

আম্মু আর কিছু বলেনা। চুপ করে যায়। খানিক বাদে আবার বলে উঠে।

-শুনলাম ছেলেরা নাকি ঢাকাতেই থাকে?

বাবা কিছুটা খুশিমাখা গলায় বলে,

-হ্যাঁ।ছেলের ফুল ফ্যামিলিই ঢাকায় থাকে।ধানমন্ডিতে।

-তবে তো ভালই হলো। মাঝেমধ্যে আমরাও গিয়ে দেখে আসতে পারব তোমার ভাইজিকে।

আমরা যখন নানা বাড়ি পৌছলাম তখন সন্ধ্যা ফুরোতে চলল। বেশ কয়েকবছর পর নানার বাড়িতে আসতেই নানা-নানী,মামা-মামী,ফুফু-ফুফা সহ কাজিন গুলোর মধ্যে শোরগোল পড়ে গেল।বিয়ে বাড়ির আমেজ পেয়ে বসছে বুঝলাম। আমার চরম মাত্রায় ঝামেলাপূর্ণ মনে হয় বিয়ে বাড়িকে। তার উপর এমন বড় পরিবারের বিয়ে গুলো তো মরার উপরে খরার মত।

কাকার যে মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে,সে আমার থেকে বছর তিনেকের বড় মাত্র।অথচ গায়ে গতরে কতবড় নারী হয়ে গেছে। বিয়ের সাজে আরো ম্যাচিউর মনে হল তাকে। বিয়ের আগের রাতের অনিদ্রা,বিয়ের দিন সকাল হতে শব্দ দূষণের কবলে পড়ে মাথাটা ভনভন করতে লাগল আমার। আমি কারচুপি করে করে একটু আধটু আড়াল হই তো ছোট ছোট কাজিন গুলো ‘ফাহিম ভাই কই,ফাহিম ভাই কই’ বলে বলে খুঁজে বের করে।এদের কবল থেকে বেরোই তো মায়ের গলা শোনা যায়,’ফাহিম কোথায় গেলি রে’। রুমে এসে দুদণ্ড জিরোনোর সুযোগই পেলাম না বিকেলটা জুড়ে।

সবকিছুর ফাঁকে একবার ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা লাগিয়ে বসে রইলাম। তৎক্ষণাৎ বাহির থেকে দরজা নক করতে লাগল কেউ।আমি রাগে কটমট করতে করতে দরজা খুলতেই দেখি বাবার আর ছোট কাকা।সাথে চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী অপরিচিত ছয় ফুটি ফিটফাট একটা ছেলে।

ছোট কাকা মুখে হাসি টেনে বলল,

-ফাহিম,এই হল ছেলের ছোট ভাই।

আমি কিছুটা বোকার মত প্রশ্ন করে উঠি কাকাকে।

-কোন ছেলের ভাই?

আব্বু খড়গ গলায় বলে উঠে,

-তোমার কাকার যেই মেয়ের বিয়ে হচ্ছে,তার দেবর ও। বুঝতে পেরেছো?

-ওহ আচ্ছা।

-নর্থ সাউথ থেকে অনার্স শেষ করেছে।চাকরি বাকরি ছেড়ে ভাইয়ের ব্যবসা দেখাশোনা করছে।

ছেলেটার সাথে কুশলাদি বিনিময় করার পর বাবা আর কাকা ছেলেটাকে আমার দায়িত্বে দিয়ে চলে যান।আড্ডা দেওয়ার মত মানুষ পাওয়ায় ঘরের ভেতর আমার আর বোরিং লাগারও কোন সুযোগ রইল না।

কিন্তু হঠাৎ একটা ফোন কলের মাধ্যমে আমাকে জানানো হল আমি যেন কালকের মধ্যেই কলেজের ফ্রম ফিলাপ করি।কালই লাস্ট ডেট। এমন আকস্মিক ভাবে লাস্ট ডেট জানানো হবে তা কখনোই ভাবিনি। আব্বু আম্মুকে পুরো ব্যাপারটা জানানোর পর বিয়ের রাতেই আমার ঢাকা ফেরার বন্দোবস্ত হল।আব্বু আর আম্মু থাকছে।একদিন পর যাবেন।আমি ঢাকা ফেরার প্রসঙ্গ আসতেই একা একা কিভাবে ঢাকা ফিরব সেই প্রশ্ন এলো।অবশেষে বরযাত্রীর সঙ্গে করে বরের ছয় ফুটি ছোট ভাইটার বাইকে করে আমি ঢাকা ফিরলাম।

পুরো পথে খাবলে ধরে রাখা ছেলেটার শক্তপোক্ত বুকটায় আমার হাত দুটো লেগে ছিল।ছেলেটা কেমন নিবিড়ভাবে পুরোটা পথ বাইক চালিয়ে এলো।অতি প্রয়োজন ছাড়া কোন কথাই বলেনি তেমন।এক পর্যায়ে আমি খেয়াল করলাম ছেলেটা সাধারণ মানের কেউ না।বাইক থেকে নেমে হ্যাণ্ডশেক করতে গিয়েই টের পেলাম ছেলেটার হাতের বাহুর প্রশস্ততা টাইট শার্ট ছিড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

-বাকি পথটা যেতে পারবে তো?

-বাসার সামনে নামানোর পরও এই প্রশ্ন!

বলেই আমি একটু মুচকি হাসি।

-বরঞ্চ আপ্নার প্রবলেম হবে।আমার জন্য ধানমন্ডি না গিয়ে বাইক ঘুরিয়ে পেচিয়ে রামপুরা এনেছেন।এখন আবার ধানমন্ডি বাসায় যাবেন।

-ধুস,কি যে বলো বাচ্চাদের মত।ছেলে মানুষের এতটুকু বাইক চালানোতেই তুমি সমস্যা দেখছো? আমি ইচ্ছে করলে এক রাতেই পুরো ঢাকা শহরের অলিগলি ঘুরতে পারি বাইকে করে।ক্লান্তি আসবে না।

বলেই একগাল ঠেলে হেসে দেয় ছেলেটা।

-ফাপড় নিচ্ছেন?

বলেই হো হো করে হেসে উঠি আমি।

-ফাপড় মনে হয়? লেটস সী।রাতের দিকে একদিন আসব।রেডি থেকো।

আমি নিমন্ত্রণটাকে তেমন আমলে নেই না।বলি,

-আচ্ছা আজ তাহলে আসি।দেখা হবে অন্য একদিন।

বিদায় নিতে যেতেই ছেলেটা আমাকে ডেকে থামায়।

-এই তোমার ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাও।

আমার চোখমুখ কিঞ্চিৎ অবাক ভঙ্গিতে ছেলেটার দিকে নজর দেয়।কিন্তু এ নিয়ে তার যেন কোন ভাবান্তরই হলো না।

নাম্বারটা দেওয়ার পর একটা মিসড কল এলো আমার ফোনে।পকেট থেকে ফোন বের করতেই ছেলেটা বলল,

-আমার নাম্বার।সেভ করে নিও কেমন।

আমি ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি প্রায় ছ’সাতটা কল দিয়ে রেখেছে হাবিব।আমাকে সম্বিত ফিরাতে বাইকে বসে গিয়ারে হাত রাখা ছেলেটার গলার আওয়াজ বেরোয়।

-কি হল?

আমি চমকে উঠে বলি,

-আপ্নার নামটা?

-শিহাব।

-বাবা,রাতে কিছু খেয়েছিলে?

-নাহ,বিয়ে বাড়ি থেকে খাওয়ার পর আমার আর খিদে পায়নি।

-বলো কী! তা এখন সকালে কী খাবে?

-এখনো বিছানা ছাড়িনি। খাওয়ার চিন্তা পড়ে।

-বুয়াকে আমি ফোন করে দিয়েছি।রান্না করে দিয়ে যাবে। তুমি খেয়েদেয়ে কলেজে গিয়ে ফ্রম ফিলাপটা করে নিও।আমি আর তোমার আব্বু আজ রাতেই ফিরব ভাবছিলাম।কিন্তু তোমার মামা ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না।

-তোমরা আজ রাতও থাকবে?

মায়ের কথা শুনে আমার পুরো শরীরে রাগ ছড়িয়ে পড়লো। গলায় জোর এনে বলতে থাকি,

-কাল রাতে আমি কতটা ভয়ে ভয়ে ঘুমিয়েছি জানো? রাত দুটোর দিকে আমার চোখে ঘুম এসেছিল।তার আগ মুহুর্ত গুলোতে জড়োসড়ো হয়ে বিছানায় পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছিলাম।

-বাবা,আজ আমরা পৌছতে না পারলে তুই বাসা তালাবদ্ধ করে তোর পাশের ফ্ল্যাটের আন্টির ওখানে চলে যাস না হয়।

-ফোন রাখো।

আম্মু ফোন কাটেনি।আমি সমস্ত রাগ নিয়ে ফোনের কল-এন্ড অপশনে চেপে দিয়েছি। দুয়েক মুহূর্ত না যেতেই আম্মু আবার ফোন করল।

-বাবা,এমন করিস না।আম্মুর টেনশন হবে এদিকে।আর তোর বাবা যদি জানতে পারে তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।আমি এক কাজ করি,তোর আন্টিকে ফোন করে জানিয়ে রাখি।তুই রাতে তাদের ঘরে শুবি।

-এই তুমি ফোন টোন করে না কিন্তু।লাগবে না এসব।আমি ম্যানেজ করে নিতে পারব।

-না,তুই ভয় পাবি।

-বল্লাম তো ম্যানেজ করে নেব।ভয় হবে না।

-আচ্ছা,আম্মু আবার ফোন দেব।এখন রাখি বাবা।

-বাই।

সকালের খাবার খেয়ে কলেজের জন্য বের হলাম।কলেজে ছেলেমেয়েদের কী ভীড়।লম্বা সিরিয়ালে আটকে থাকার পর প্রায় দু’ঘণ্টা লাগিয়ে ফ্রম ফিলাপ করতে হল।রিকশায় বসার পর হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো।

হাবিবের কল।

-কাল রাত থেকে তোমাকে কম করে হলেও দুশো কল দিয়েছি।তোমার বাসায় যাব ভাবছিলাম।কিন্তু এদিকে টিউশনি থাকাতে আর যেতে পারিনি। তুমি ফোন কেন রিসিভ করছিলে না?

-ইনবক্স চেক করো। ‘আই উইল কল ব্যাক’ লিখে মেসেজ পাঠিয়ে রেখেছি।

কয়েক সেকেণ্ড পর আবার হাবিবের গলা শোনা গেল।

-ওহ সরি বাবু।আমি খেয়াল করিনি।প্রচুর টেনশনে ছিলাম। এদিকে কলেজে সমাবর্তনের দিন এগিয়ে আসছে বলে স্টুডেন্টদের নানা প্ল্যান,সেসবেই আটকে আছি।না হয় তোমার খুঁজে তোমাদের ওদিকে যেতাম।

-আজ আসো।

-আজ আসো বলতে?

-আজ আসো বলতে আজ আসো।আমাদের ফ্ল্যাটে।

-আংকেল-আন্টি?

-কেন? শ্বশুর শাশুড়িকে ভয় পাও?

-না।এম্নিই। দু’বছরেও কখনো বলোনি তো এভাবে।তাই।

-দু’বছরে বলিনি বলে এখনো বলতে পারব না?

-তুমি এত কথা পেঁচাও কি করে!কখন আসব বলো?

-আচ্ছা থাক।আসতে হবে না।

-কেন?

-কেন আবার,এমনি।

-এইমাত্র বললে আসার জন্য,আবার বলছো আসতে হবে না।আচ্ছা,ঠিকাছে।আসব না।তুমি এখন কোথায়?

-আমি কলেজ থেকে বাসায় ফিরছি।তুমি কি ক্লাসে?

-হ্যাঁ,ক্লাসে।স্যার ঢুকেনি।তবে আসছে মনে হয়।আমি তোমাকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে কল করছি।এখন রাখি কেমন?

-আচ্ছা,রাখো।

বুয়া দু তিন পদের তরি-তরকারি রান্না করে দিয়ে গেল রাতে খাওয়ার জন্য।সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত বুয়া বাসায় থাকায় ততটা ভয় লাগেনি।কিন্তু সে বাসা থেকে যাওয়া মাত্রই গতকাল রাতের মত ভয় করতে লাগল।কতক্ষণ মনে হয় বেলকনিতে কেউ দাঁড়িয়ে আছে তো কতক্ষণ মনে হয় ড্রয়িং রুমে বুঝি কেউ হাঁটাহাঁটি করছে। ভয়টা খুব বেশি পেয়ে বসলে মনে হয় আমার পিছনেই কেউ ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে রইলো নাকি।

ভয়ের মাত্রা তীব্র হতেই তড়িঘড়ি করে আমি হাবিবের নাম্বারে কল দিলাম।

-এই তুমি কই? তাড়াতাড়ি আমাদের এখানে আসো।

-এখন? দুপুরে না বললে আসতে হবে না। আর আমি তো এখন বন্ধু বান্ধবদের সাথে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছি।কাজও হাতে প্রচুর।

-আসো বলছি।বাসায় আমার খুব ভয় করছে।

-তোমার গলা এমন কেন শুনাচ্ছে ফাহিম? আর আংকেল আন্টি কই?

-এত কিছু জিজ্ঞেস করো না।আসবে কিনা বলো।

-পারলে তো বলতামই।

কয়েক মুহূর্ত বিরাম টেনে আমি কল কেটে দিলাম।ওপাশ থেকে হাবিব হ্যালো হ্যালো করছিল। সেসবকে আর পাত্তা দেওয়ার মত মানসিক অবস্থা আমার ছিল না।তাহলে কি শেষমেশ আমাকে পাশের বাসার দু তিন বাচ্চাওয়ালা আন্টিদের ওখানে থাকতে হবে? নাহ। উনাদের ওখানে যাওয়া যাবে না। যত ভয়ই লাগুক।

খানিকবাদে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ন’টা ছুঁইছুঁই। আমার গলা পর্যন্ত শুকিয়ে আসতে লাগল।এ জীবনে কখনো একা বাসায় না থাকার ফসল এসব। বিছানায় কাঁথা মুড়িয়ে শুতেই কলিং বেল বেজে উঠলো। এই সময় কে আসবে বাসায়? ভাবতে ভাবতেই ভয় ডর নিয়ে দরজা খুলতেই দেখি হাবিব দাঁড়িয়ে আছে দরজায়।ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ও বলে,

-বাসায় একা থাকার অভ্যেস নেই পিচ্চি ছেলে?আমি তো তোমার ফোন পেয়েই বাস ধরেছি। চোখমুখ দেখছি একদম কোটরে ঢুকে গেছে।এত ভয় পাচ্ছিলে!

আমি জড় বস্তুর মত হাবিবের দিকে তাকিয়ে আছি বলে ও কেমন হেসে উঠে।দরজাটা ভেজাতেই আমি ঝুপঝাপ করে ওর বুকে কিল ঘুসি দিতে শুরু করি। হাবিব কেমন মায়াভরা কণ্ঠে হেসে উঠে আমাকে বাচ্চাদের মত সামলে নেয়।আমি ওর বুকে মাথা ঠেকিয়ে কেঁদে ফেলি খানিকটা।

থুতনিতে আলতো করে ধরে হাবিব আমার মুখটাকে জলরঙে আঁকা ছবির মত করে অপলক দেখতে থাকে।

বেশ কিছুটা সময় কেটে যায়। আমি অদ্ভুত এক আকর্ষণে হাবিবের ঠোঁট দুটোর খুব কাছে চলে যাই। এতটাই কাছে পৌছি যে ওর চোখ দুটো ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না।কোমল এক নিষ্প্রভতায় হাবিব আমাকে স্পর্শ করে। ওর অপরিচ্ছন্ন দাড়িতে ঘেরা ঠোঁট দুটো আমার গালে,কানে ধীরে ধীরে গলা পর্যন্ত পৌছায়। জীবনের প্রথম পুরুষের প্রথম স্পর্শে আমার দেহ অস্বাভাবিকভাবে ছাৎ করে উঠে।আপাদমস্তক কেমন কেঁপে উঠতে থাকে হাবিব যখন আমার গায়ের টি-শার্ট ছাড়িয়ে নিচ্ছিল। আমি নির্লজ্জের মত বিছানায় গিয়ে পড়ি ওকে নিয়ে।মাঝারি গড়নের ভোলাভালা ছেলেটার নাভীর উপর আমার পুরো শরীর। আমি এক এক করে তার বোতাম খুলি। কালো পশমে ছেয়ে থাকা বুকটা আস্তে আস্তে ভেসে উঠে।

-তোমার বুকে এত পশম কেন? পশম ছাঁটো না?

-বুকের পশম ছাঁটতে নেই।এখানে সব ভালবাসা।

-ভালবাসা? কি বিচ্ছিরি দেখতে।কেমন জঙ্গল জঙ্গল লাগে।

-জঙ্গল জঙ্গল লাগে?

বলেই দুষ্টুমি মাখা হাসিতে ফেটে পড়ে হাবিব।আমার হাতদুটোকে মুঠোয় ভরে শায়িত করে দেয় আমাকে ও।নীরব শব্দে চালাতে থাকে ওর তৃষ্ণা মেটানোর দৌড়।আর আমি ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠতে থাকি,শিহরিত হতে থাকি।

প্রখর নেশায় আমার নিজেকে কেমন অন্য জগতের বাসিন্দা মনে হয়। হাবিবের জিভ যখন স্পর্শের সীমানা বাড়িয়ে তলদেশে গিয়ে ঠেকে,আমার পুরো জগতটাই নড়ে উঠে।তার মুখের লালায় আমার স্তন দুটো ভিজে উঠে। নাভীর আশপাশ শীতল হয়ে আসে। চোখ দুটো উত্তপ্ত হয়ে আসে।

একজোড়া শরীরের সুখের দোলাচলে আমি ব্যথাও টের পাই। সুক্ষ্ম সেই ব্যথা এমন অপার সুখের মাঝে তীক্ষ্ণ হয়ে দেখা দেয় না। আমি পরম তৃপ্তিতে চোখ বুজে থাকি।

বিবস্ত্র দুটো শরীর এক হওয়ার সমন্বয় এত মধুর! তা আগে কখনো জানা হয়নি।

-বুয়া করলা ভাজি,ভুনা গোশত আর ডাল রান্না করে দিয়ে গেছে। কোনটা খাবে?

-শ্বশুড়ের ঘরে এই প্রথমবার এসেছি।আর তুমি কোনটা দিয়ে খাব এটা জিজ্ঞেস করছো?

-ওহ,সেটাই তো। দাঁড়াও,আমি সবগুলোই নিয়ে আনছি।

টেবিলের একপাশে বসে হাবিব খাচ্ছে।আমি তার পাশের চেয়ারটাতেই বসা। পুরো শহর এখনো নিদ্রায় আচ্ছন্ন না হলেও একদমই গভীর। বাসার নিচের গলি মতন রাস্তাটা দিয়ে যাওয়া সাইকেল-হুন্ডার শব্দ আসছে। আর মাঝেমাঝে দূর থেকে বাসের হর্ণের শব্দ। আমাদের পাঁচতলার এই ফ্ল্যাটটাতে দু’তলার পুরো ফ্লোরটাই আমাদের নেওয়া।বাকি চার ফ্লোরে ভাড়াটিয়ারা থাকে। এত রাতে গেইট খোলার আওয়াজও আর আসছে না। রাত দশটার পরপরই গেইট অফ করে দেয় দারোয়ান।ঘুমন্ত ভবনটায় এই দুটো মানুষই কেবল সজাগ।

-এই, কী ভাবো এত?

হাবিবের ডাকে আমি সম্বিত ফিরে পাই।

-খাচ্ছো না কেন?প্লেটের ভাত তো নড়েওনি। আমি তো দু’প্লেট শেষ করার পথে।

আমি তাচ্ছিল্য আর ঠাট্টার স্বরে বলি,

-হু,এত খাই না আমি। খেয়ে খেয়ে তোমার মত ঝোলা শরীর বানাবো নাকি!

-আমার কোথায় ঝোলা শরীর!

-হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে আপনার নরম নরম হাত আর মোমের মত বুকের চাপ খেয়ে আমি বুঝতে পেরেছি।পুরুষের শরীর হবে শক্ত-বলিষ্ঠ।বুড়ো মানুষের কুচকে যাওয়া চামড়ার মত ছেলেদের শরীর ঢলে পড়লে হয়!

হাবিব কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়।মুখের লোকমা টুকু গিলে খানিকটা হেসে উঠে।

-আমার মত এত যত্ন করে কেউ ভালবাসবে না,বুঝলে! এই নরম স্পর্শের স্বাদ অলৌকিক সুখে মোড়ানো।তুমি এখনো বাচ্চা।বুঝবে না ওসব।

-এই একটা বুলি।কিছু একটা হলেই আমি বাচ্চা।

-বাচ্চাকে বাচ্চা বলব না তো কি বলব! আচ্ছা বাদ দাও।ঠাণ্ডা পানি পাওয়া যাবে?

-হুম।আনছি ফ্রিজ থেকে।

কোচিং ক্লাস হচ্ছে প্রতি কলেজেই।নির্বাচনী পরীক্ষার পর এই সময়টা কোচিং ক্লাস করেই কাটছে।করছি কোচিং ক্লাস অথচ স্যারদের প্রেশার নরমাল ক্লাস থেকেও বেশি। ক্লাসে যেতে খানিকটা দেরি করায় ক্লাস টিচার দু’ঘা বসিয়ে দিয়েছেন হাতের তালুতে। পুরো ক্লাসেই আমার মুখ ভার ছিল।পাঁচটা বিষয়ের ক্লাসে আমি পাঁচটা কথাও বলিনি।আশেপাশের ছেলেরা এক বিন্দুও যদি গুরুত্ব দিতো।বাঁদর গুলো আছে এদের নিজেদের নিয়ে।বিদায় অনুষ্ঠানে কে কি করবে না করবে এসব নিয়ে।

সিম্প্যাথি পাওয়ার জন্য মনে মনে সুপ্ত এক প্রত্যাশা ছিল বোধয়।সেটা না পাওয়াতে মুখটা আরো ভার হয়ে এলো।

আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে ব্যাগ থেকে ফোন করে হাবিবের নাম্বারে ট্যাক্সট করলাম- ‘মন খারাপ।কাজ না থাকলে আমাদের কলেজের সামনে এসো।’

ক্লাস ছুটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখি কলেজ গেইটের সামনের রাস্তায় সিধেসাধা ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে।রাস্তায় নামার পর হাবিব নির্লিপ্ত এক চাউনিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।

-এভাবে তাকাচ্ছো কেন? তেমন গুরুতর কিছু না।স্যার বেতিয়েছে।

-এজন্য তোমার মন খারাপ?

-হ্যাঁ।

-তুমি জানো,ক্লাস সেভেনে এক স্যার পিটিয়ে আমার শরীরে জ্বর তুলে দিয়েছিলো।

আমি চোখ বড়বড় করে তাকাতেই হাবিব বলে উঠলো,

-তোমার জ্বর এসেছে?

বলেই ও আমার কপালে হাত দিয়ে হেসে উঠে।

আমি বিরক্তভরা গলায় বলি,

-না।জ্বর আসেনি। তুমি এমন ঢিলেঢালা শার্ট পড়েছো কেন আবার? কতবার বলেছি এইসব শার্টে ছেলেদের ভাল দেখায় না।

-এই শার্টেই তো আমাকে ভাল মানায়।আমি কম্ফোর্ট ফিল করি এইসব শার্টে।

-আমার ভাল লাগার কোন গুরুত্ব নেই তোমার কাছে?

-থাকবে না কেন বাবু।আছে তো।কিন্তু আমার তো টাইট-ফাইট শার্ট নেই।

-আমি কিনে দেব এক ডজন।তুমি তখনও পড়বে না আমি জানি।

হাবিব শব্দ করে হেসে উঠে। তাচ্ছিল্যের বিষয় ভেবে সে পাশ কাটিয়ে যায় ব্যাপারটাকে।কিন্তু রাস্তাঘাটে নজরে পড়া চোখ ধাঁধানো ছেলেগুলোর মত যে আমারো ইচ্ছে করে আমার প্রেমিকটাকে দেখতে,এটা সে উপলদ্ধি করতে পারে না।

হাবিব আমার হাত টেনে ধরে বলে,

-চলো রিকশায় উঠি।

আমি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে শক্ত গলায় বলি,

-আমি যাব না।রিকশা ডেকো না।

হাবিব এসব কানে নেয় না।হাত টেনে ধরে একরকম জোর করেই আমাকে নিয়ে রিকশায় তুলে।হুড তুলে দিয়ে তার কত প্রদর্শনী আমার অভিমান ভাঙানোর।আমি একদম নিশ্চুপ দেখে যাই তার এসব কর্মকাণ্ড।

হাবিবের গায়ের স্যাঁতস্যাঁতে এক ঘামের গন্ধ এসে নাক ছুঁতে শুরু করে আমার।আমি কড়া কণ্ঠে বলি,

-আচ্ছা,তুমি একটা পারফিউমও ইউজ করতে পারো না?

-কি যে বলো,পারফিউম ইউজ করতে আছে সহসাই?ন্যাচারালিটি বলতে একটা ব্যাপার আছে না।পারফিউম ইউজ করলে মানুষের শরীরের নিজস্ব স্নিগ্ধতাটা হারিয়ে যায়।

-এসব মুর্খামি বাদ দাও।বি প্রাক্টিক্যাল।তুমি নিজে হয়ত পাচ্ছো না তোমার ঘামের গন্ধটা।কিন্তু পাশে বসা মানুষটা,পাশে হাঁটা মানুষটা যে তোমার ঘামের গন্ধে বিরক্ত হয় তা বুঝো না?

-মানুষ বিরক্ত হলে হবে,আমি কি কারো খাই না পড়ি!

বলেই এক দফা হেসে নেয় ও।

-কোন কথা বলবে না।আমি যেন এই গন্ধ আর না পাই।

হাবিব হাসতেই থাকে।কিছু বলে না।

-সেদিন লিলি আপুর দেবরের বাইকে করে গাজীপুর বিয়ে বাড়ি হতে ঢাকায় এলাম।তার শরীরের ঘ্রাণে পুরো পথ আমি মুগ্ধতায় ছিলাম।

-ওটা শরীরের গন্ধ ছিল না বাবু।পারফিউমের গন্ধ।

-এত কথা প্যাঁচাবে না তো। যাই থাকুক,ভাল লাগার মত তো।তাই না!

এরপর রিকশায় আমাদের আর কারো গলার আওয়াজ বেরোয়নি।হাবিবও তেমন কিছু বলেনি।শুধু ঘাড় কাৎ করে আমাকে দেখছিল।আর আমি তাকিয়েছিলাম অন্য দিকে। মন খারাপের পরিমাণটা প্রশমিত করার বদলে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ও। রাগে-ক্ষোভে আমি রিকশা থেকে নেমে পড়ি।হাবিব তাড়াহুড়ো করে ভাড়া চুকিয়ে হন্তদন্ত হয়ে আমার পেছন পেছন ছুটতে থাকে।

কিছুই যেন হয়নি ভান করে আমি স্বাভাবিক গতিতে এগোতে থাকি।হাবিব হাত চেপে ধরতেই চোখমুখ লাল করে বলি,

-একা ছাড়ো আমাকে।পেছন পেছন এলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।আমি বাচ্চা নই।বাসা অব্দি যেতে পারবো।

হাবিব কেমন আড়ষ্ট হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

কিছু পথ এগোতেই পিছনে ঘুরে তাকাই,হাবিবকে আর দেখা যায় না। পকেট থেকে রুমাল বের করে আমি ঘর্মাক্ত নাকের ডগাটা মুছে সামনের দিকে পা ফেলতেই রাস্তার ধারে হঠাৎ কেউ বাইক থামিয়ে আমাকে ডেকে উঠে। ভাল করে তাকাতেই দেখি শিহাব।লিলি আপুর দেবর।

-হেই,কোথায় যাচ্ছো ফাহিম?

-বাসাতে।

-পায়ে হেঁটে কেন?

উত্তর না থাকাতে আমি কিছুটা কাচুমাচুই করছিলাম।শিহাব ছেলেটা উৎসুক দৃষ্টি নিয়েই তাকিয়ে থাকে।হঠাৎ বলে উঠে,

-কী ভাবছো? আমি গুলশানের দিকেই যাচ্ছি।উঠে পড়ো।নামিয়ে দিয়ে যাই।

আমি চমকে উঠি।

-হু?

-আপত্তি আছে?

-না, তা হবে কেন।

-এত আমতা আমতা করো না রাস্তায় দাঁড়িয়ে।এমন কিউটি পাই ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকাটা ঝুঁকির।

আমি বোকা বোকা চোখে ভরাট-দেহী ছেলেটার দিকে তাকাতেই দেখি তার চোখেমুখে দুষ্টুমি খেলা করছে।ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ির সাথে এই হাসি মাখা মুখটা যে কতটা এট্রাক্টিভ এটা তাকে কেউ কখনো বলেছে কিনা কে জানে।

-সমস্যা না হলে উঠো।

-না।সমস্যা কেন থাকবে।

বাইক ছুটে চলার গতিতে শিহাবের লম্বা লম্বা ঘন চুল গুলো পিছনের দিকে উড়তে লাগলো।কালো পোশাক পড়া এমন একটা সুদর্শনকে জড়িয়ে ধরে বসা আমি তা হয়ত রাস্তার কত তৃষ্ণার্তর মনে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।

বাসার সামনের রাস্তায় শিহাব আমাকে নামিয়ে দিল। আমি বাইক থেকে নামতে যেতেই শিহাব বলে,

-আজ ভাইয়ের কোম্পানীর একটা প্রোডাক্টের ব্যাপারে জরুরি কাজটা না থাকলে তোমায় বাইক থেকে নামতে দিতাম না।ঘুরার ইচ্ছে ছিল।আচ্ছা ফাহিম,কাল তো শুক্রবার।আমি বিকেলের দিকে ফোন দিলে এখানে আসতে পারবে?

-একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে- আপ্নি আমার নাম জানলেন কী করে?

-ওহ আচ্ছা,কলগুলো তাহলে দেখোনি?

-কোথাকার কল?

-তোমার কন্টাক্ট নাম্বার আমার ফোনে সেইভ করতেই তোমার ফেইসবুক একাউণ্ট,হোয়াটস-এপ একাউণ্ট পেলাম।ওখানে কল করেছিলাম।

-ওহ আচ্ছা। কলগুলো দেখিনি তবে। আই এম সরি।

-সরি বলার কিছু নেই। কালকের কথাটা মাথায় রেখো।

আমি আর কিছু বলে উঠতে পারিনি।ঈষৎ লজ্জার আভা আমার মুখে ফুটে উঠছিল হয়তো।আমি কেমন নেতিয়ে পড়ি খানিকটা।নার্ভাসনেসের কবল থেকে বাঁচতে আমি ভাঙা গলায় বলি,

– আচ্ছা,আজ আসি তাহলে।

বিদেয় নেওয়ার মুহুর্তটায় শিহাবের মুখটার দিকে তাকাতেই দেখি তার উজ্জ্বল মুখটায় নিমিষেই কেমন মলিন এক ছাপ পড়ে গেছে।ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আমার পানে। ভাল লাগা আর মন্দ লাগার মিশ্র অনুভূতিতে আমি নতুন এক স্বাদ খুঁজে পাচ্ছিলাম।

অকস্মাৎ আমার হাবিবের কিছুক্ষণ আগের ফ্যালফ্যাল করা চোখদুটোর কথাও মনে পড়ে। হাবিবের ওই ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি উপেক্ষা করতে আমার কেন জানি একটুও কষ্ট হয়নি আজ।

অন্যদিকে শিহাবের কামুক মুখটার দিকে তাকাতেই সুক্ষ্ম এক ভাললাগা টের পাচ্ছিলাম।অজানা কোন কারণে তার চোখ দুটোকে উপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছিলো না আমার।

হাবিবের প্রতি আমার অভিমানের জন্যই কি আজ শিহাব এতটা মোহনীয় ছিল আমার কাছে? আমার প্রতি হাবিবের গুরুত্বহীনতার কারণেই কি তার সাথে আলাপ ছিন্ন করতে পেরেছি অনায়াসেই? কে জানে হয়ত এজন্যই। কেননা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাবিবের প্রতি অভিমানের পাল্লাটার ওজন ভীষণ ভারী হয়ে গেছে।

অভিমান কেবল আজকেই করিনি।গত দু’বছর আগে এসএসসি পরীক্ষার পর যখন সায়িন্সের এডভান্স কোচিং করতে গিয়ে টিচিং দেওয়ার বদৌলতে অজানা ছেলেটার সরলতা দেখে মুগ্ধ হয়ে তার প্রেমে পড়ি,ঠিক তখন থেকেই।

চুল গুলো ছেঁটে ভালো কোন স্টাইল করতে বললে হাবিব করত তার উলটো-চুলে চিরুনীই ছোঁয়াত না। স্যান্ডেল বাদ দিয়ে ক্যাডস পড়তে বললে সে পারে না চটি পড়ে আমার সামনে আসে।ভালো রঙ বেরঙয়ের কোন টি-শার্ট পড়তে বললে তার সেই আদিকালের একরঙা শার্ট গুলোই গায়ে চড়িয়ে দেখা কর‍তে আসে। গত সপ্তাহে বুকের পশম গুলো যখন দেখেছিলাম কামনার নেশায় সেই রাত্তিরে তেমন খারাপ না লাগলেও পরে এটা ভাবতেই আমার গা কেমন ঘিনঘিন করছিল।

এসব হাবিবকে বলাও হয়েছে শতবার।কিন্তু তার হেয়ালী মন এসবকে গায়ে মাখছে না।ফলে আমার মনের আঙিনায় অভিমান গুলো জমে জমে দিন ভারী হচ্ছে।কোন একসময় এসব হয়ত ভারী হতে হতে শিলার মত হয়ে যাবে।সেদিন মনের উপর থেকে পাথর গুলো সরাতে পারবে তো ও?

-আমার যে আজ বার্থ ডে ছিল তা তোমার মনে নেই?

-এই কান ধরছি বাবু,প্লিজ রাগ করো না।কাজের চাপে মনে ছিল না।

-তুমি ন্যাকামি বাদ দাও। আমার এই জন্মদিনের কথা তুমি জানতে না?

-জানতাম তো।

-গত বার্থ ডে তেও আমাকে উইশ করোনি।এটা মূল কথা না।মূল বিষয়টা হচ্ছে আমার কথা তোমার মনেই থাকে না।এজন্য আমার জন্মদিনের কথাটাও ভুলে বসে আছো।

-না বাবু,জন্মদিনের মত এত তুচ্ছ বিষয়ের জন্য এভাবে বলো না।তোমার কথা মনে পড়বার প্রসংগ বাদ দেই,আস্ত তুমিই তো আমার পুরো মন জুড়ে।

-জন্মদিনের বিষয়টা তুচ্ছ? আমার জন্মদিনের বিষয়টা?

-আমি ওটা বুঝাতে চাইনি ফাহিম। তোমাকে মনে পড়ে এই সত্য কথাটা এতটাই বিশাল যে,তার কাছে জন্মদিনে উইশ করাটা কিছুই না।

-প্লিজ দর্শনগিরি বাদ দাও।আমি পেয়ে গেছি আমার উত্তর।

-আমার কান দুটো টেনে ছিড়ে ফেলো।তারপরও এমন করো না। ফরেইন-এপ্লিকেশন নিয়ে একটু ঝামেলায় পড়ে আছি ক’দিন যাবত।এজন্য তোমার জন্মদিনের কথাটা মাথায় ছিল না।বোঝার চেষ্টা করবে না?

-আমার গত বার্থ ডে তে কি সমস্যা ছিল তোমার?

হাবিব কোন কথা বলে না।উত্তর নেই সে কি বলবে আর।জড় বস্তুর মত দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখেমুখে অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট। এই অস্থিরতা যদি সময়োপযোগী হতো,তাহলে হয়ত এখন আর আমাকে এমন ব্যবহার করতে হত না,আমার এতটা কঠোর হওয়া হত না।কিন্তু সে তো যেই কাজটা যে সময়ে করতে হবে তা না করে পরে এসে আফসোস করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। এমন বেখেয়ালী ছেলেরা সম্পর্কের ব্যাপারেও জঘন্য উদাসীন হয়।তা আমি এই দু’বছরে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

বিষয় গুলো ধীরে ধীরে জটিল হতে হতে মনের ভেতর রাগের,হতাশার,বিরক্তির জন্ম দিয়েছে।হঠাৎ মনে হল আর বহনযোগ্য না সম্পর্কটা। আমি শক্ত গলায় বলি,

-হাবিব,তুমি তোমার মত থাকো।আমাকে আমার মত থাকতে দাও।

-তোমার মত থাকো বলতে?

-মানে বুঝছো না কেন! আমাকে আর হয়রান করো না।তোমার এমন হেয়ালী মনে আমার জন্য গুরুত্ব খুঁজতে খুঁজতে আমি ক্লান্ত।আর পারছি না।

-এসব কোন ধরণের কথা ফাহিম?

-গেঁয়ো ভাবটা ছেড়ে সামান্য একটু স্টাইলিশ হতে পারলে না।আমার জন্য এদ্দিন লাগিয়ে কম্প্রোমাইজের যে চিহ্ন তুমি রেখেছ,ভবিষ্যতে যে কতটা ত্যাগী হবে তা সহজেই অনুমেয়। আমাকে ছাড়ো।নিজের মত চলো।আমাকে একা আর যন্ত্রনাহীন চলতে দাও।

-আচ্ছা স্টাইলিশ হবো।চুল সুন্দর করে ছাঁটবো।টাইট টি-শার্ট পড়ব,গায়ে ভাল পারফিউম মাখবো।তবুও এমন কথা বলো না।

-সময় ফুরিয়ে গেছে হাবিব।অসময়ে এসে এসব বলে লাভ নেই আর।

হাবিব বাজ পড়া মানুষের মত অদ্ভুত রকম স্তব্ধ হয়ে আসে।গলার স্বর বের হতে গিয়েও কোথাও যেন দলা পাকাচ্ছে তার। জরাজীর্ণ কণ্ঠে সে আকুতি ভরা চোখে বলতে থাকে,

-রাগটা কমলে সব ঠিক হয়ে যাবে বাবু।রাগের মাথায় তুমি এসব বল্লেও আমি সিরিয়াস্লি নিচ্ছি না কেমন।আসো রিকশায় চড়ি।

-হাত ধরবে না প্লিজ।তোমাকে কে বলেছে এমন সস্তা কিছু বেলী ফুল দেওয়ার জন্য আমাকে বাসা থেকে ডেকে আনতে?

হাবিব নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।আমি বিদ্যুৎ বেগে তার সম্মুখ ত্যাগ করি। বাসায় এসে হাতের ফুলগুলো বেলকনি দিয়ে নিচে ফেলে দিই।হাবিব হয়ত এখনো সে জায়গাতেই দাঁড়ানো অথবা হলে ফিরছে। যাই করুক,তাকে নিয়ে আমার আর ভাবতে ইচ্ছে করছিল না।সবকিছু মুছে ফেলার তীব্র উদ্দীপনায় আমি উন্মাদের মত হয়ে উঠি।

দিন দিন হতাশা আমাকে তার প্রতি বিষিয়ে দিয়েছে।সম্পর্কেরও পরিচর্যার প্রয়োজন পড়ে।খেয়াল রাখা,ডেডিকেটেড হওয়া,প্রিয় মানুষটার কথা গুরুত্ব দেওয়ার সমন্বয়েই ভালবাসা।এসবের একটাও ছিল না যার মাঝে তার সাথে নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে সৎ থাকার চেষ্টায় এতদিন সম্পর্কটাকে বয়ে নিয়েছি।উপরন্তু আমি মহা মনীষী নই- যে যা করুক আমি সব গিলে নেব। আমার আকাঙ্ক্ষা গুলোর প্রতি কারো কেয়ার না থাকলে,আমার আশা-প্রত্যাশা গুলো কাউকে ঘিরে থেকে বারবার এভাবে ভেঙে পড়লে আমি নিশ্চয়ই তা নিতে পারব না। প্রেমিককে নিজের এক্সপেকটেশন অনুযায়ী দেখতে সবারই স্বপ্ন থাকে। কিন্তু হাবিব আর প্রেমিকের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত হল কই!

সেই দুপুরে শুয়েছিলাম বিছানায়।সন্ধ্যা হয়ে আসার পরও বিছানা ছেড়ে উঠিনি।পুরো শরীরটা কেমন যেন জমে আছে মনে হচ্ছে।মনের চাপ যে শরীরের উপরও এভাবে প্রভাব ফেলবে বুঝিনি।

ড্রয়িং রুমে আম্মু সোফা ঠিক করছে দেখলাম- যখন ঘুম ভেঙেছে আমার।হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল।আমি রুমের খোলা দরজা দিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে তাকিয়ে দেখি আম্মু নেই। রান্নাঘর থেকে আম্মুর গলা শোনা গেল,

-ফাহিম দরজাটা খোল তো।আম্মু এখানে তরকারি বসিয়ে রেখেছি।

আমি বারোমাসী রোগার মত করে ধীরে ধীরে কাঁথা ছেড়ে বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে যাই।দরজা খুলার পর একজন অপরিচিত লোককে দেখতে পেলাম।সে বলল,

-ফাহিম আছেন?

-জ্বি আমিই।

-আপ্নার নামে একটা পার্সেল এসেছে।

আমি কিছুটা অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করি,

-পার্সেল?আমার নামে? কে পাঠিয়েছে?

-প্রাইভেসী আছে স্যার। বলা যাবে না।

-আমার নামে একটা পার্সেল এসেছে আর সেটা কে পাঠিয়েছে এটা না জেনেই আমি পার্সেল কেন গ্রহণ করব?

-আপনাকে নিতে হবে।আমাদের টাস্ক আমাদের কমপ্লিট করতে দিন।প্লিজ স্যার,টেইক ইট।

ফর্মাল ড্রেস পড়া ছেলেটা আমার হাতে একটা বক্স তুলে দিয়ে একটা সাইন নিল তাদের খাতায়।

-আসি স্যার। ভাল থাকবেন।

মাথার মধ্যে নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।আমি রোবোটের মত দরজা বন্ধ করে রুমে এলাম আমার।বিছানায় বসে বক্সটা সামনে নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ ভেবে ভেবেই কেটে গেল আমার। কে পাঠাল এটা?

উত্তর হয়ত বক্সেই আছে।আমি তাড়াহুড়ো করে বক্সটা খুলি। বক্সের ভেতরকার জিনিস সামনে আসতেই আমার চোখ যেন চড়কগাছ। সুন্দর করে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা একটা খয়েরি রঙের কেকের উপর- ‘হ্যাপি বার্থডে ফাহিম’।

তার সঙ্গে এমন দামী সব জিনিস কে পাঠালো? আই ফোন সেভেন প্লাস! দুটো বিশাল বড় চকোলেটের বক্স। ফুলের পাপড়ী দিয়ে মোড়ানো আরো একটা ভাউচার।

-কীরে! কে এলো?

আম্মু ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করল।

-একটা কুরিয়ার সার্ভিসের লোক।আমার নামে নাকি এই পার্সেলটা কে পাঠিয়েছে।

আম্মু বোকার মত তাকিয়ে রইল বিছানার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসত্রের দিকে।আমার পুরো শরীর আনন্দে কাঁপছিল।চোখদুটো চকচক করছিল এমন অপ্রত্যাশিত এক ঘটনায়।

-এসব কে দিল রে!

-বলতে পারছি না।

-তোর ঘনিষ্ঠ কেউ আছে?

প্রশ্নটা শুনেই আমার টনক নড়ে উঠলো। এসব কি হাবিবের কাজ? কখনোই না।তার মাথায় এতসব প্ল্যান আসবে না। সে এই ক্যাটাগরীর ছেলে না আমি জানি।

-না মা,তেমন কেউ তো নেই।

-তাহলে হয়ত তোর কোন বন্ধু-বান্ধবের কাজ। ঠিকানা-টিকানা পেয়েছিস?

-পাচ্ছি না তো।

-দ্যাখ ভাল করে খুঁজে।

-আর কি দেখার আছে বলো তো।সব তো তোমার সামনেই। একটা কেক,দুটো চকোলেটের বক্স,আইফোন, আর একটা ফুল দিয়ে মোড়ানো বক্স।

-সব তো ফুল দিয়েই মোড়ানো। এই বক্সটায় বেশি পড়েছে ফুল এই আরকি।এটা খুলে দ্যাখ।কিছু পাস কিনা।

আম্মু বলার সাথে সাথেই আমি বক্সটা খুলি।

একটা পারফিউম। কালো রঙের বড় বোতলের পারফিউম একটা। মা কেমন হতাশ কণ্ঠে বলে উঠল,

-নাহ।এতেও তো কিছু নেই।

রান্নাঘর থেকে পোড়া গন্ধ আসতেই আম্মু চমকে উঠল ভীষণ।

-দুধটা বসিয়েছিলাম রে।

বলেই আম্মু রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল।

আমি পারফিউমের বোতলের ছিপিটা খুলে নাকের কাছে এনে ধরি। আস্তে করে চাপি স্প্রে এর জায়গাটায়। বোতলটার ভেতর থেকে পারফিউমের ঘ্রাণটা বেরিয়ে আসতেই আমার সারা গা কাঁটা দিয়ে উঠলো।

ঘ্রাণ বেরোনোর সাথে সাথে ততক্ষনে পার্সেল পাঠানো ব্যক্তিটার পরিচয়ও আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠলো।

এমন মোহনীয় পারফিউমের ঘ্রাণ আমি কেবল একজনের শরীর থেকেই পেয়েছিলাম।

পারফিউমটার অপার সুঘ্রাণে আমার পুরো ঘরময় ভরে গেল। সুদর্শন ছেলেটা লুকিয়ে লুকিয়ে আমার মনোজগতকেও এক নতুন প্রেমের সুগন্ধীতে ভরিয়ে দিল।

-এডমিশনের কোচিং কেমন হচ্ছে রে ফাহিম?

-হ্যাঁ ভালই যাচ্ছে। পড়ার চাপটা খুব বেশি।

-তা তো হবেই।আর ক’দিন পরই তো এডমিশন টেস্ট।এখন না পড়লে পড়ার সময়টা আর কখন?

-হুম।ভয় লাগছে।

-ভয় পেয়ে হবেটা কী! ভয় ডর বাদ দে তো।

-হু,বললেই কি আর হয়ে যায় নাকি নিশি।আমি পারি না।

-আচ্ছা তোকে প্রতিদিন কোচিং শেষে বাইকে করে যে নিতে আসে ছেলেটা,ওটা কে রে?

-প্রতিদিন কই আসে?মাঝেমধ্যে আসে।

-মাঝেমধ্যেও না।ঘনঘনই আসে।সেজন্যই প্রতিদিন লেগেছে।

-বেয়াইন হয় সম্পর্কে।

-বেয়াইন? তোর আপুর দেবর?

-হুম।

-তোর আপুর ফ্যামিলি না কানাডায় থাকে?

-আরে চাচাতো বোন।

-ওহ আচ্ছা।কিন্তু তোকে এভাবে প্রতিদিন পিকাপ করে যে?

আমি নিশির প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে পড়ি।মনে মনে উত্তর সাজাতে শুরু করি।

-আব্বুর রিকুয়েস্টে।

-আচ্ছা বুঝলাম।আসল কথা হল কোচিংয়ের মেয়েদের মোটামুটি সবারই চেনা হয়ে গেছে ছেলেটাকে। যখনই ছেলেটা তোকে নিতে আসে কোচিংয়ের সব মেয়েরা তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।এত হ্যান্ডসাম ছেলে খুব কম আছে।

-তুই এমন প্রশংসায় গদগদ করছিস যে! প্রেমে পড়েছিস নাকি?

ও কিছুটা হেসে বলে,

-পড়েছি তো সেই কবেই।

আমি আর কিছু বলিনা নিশির কথার উত্তরে।চুপচাপ কোচিং ক্লাস ছেড়ে দু’জন বেরিয়ে আসতে থাকি। ফার্মগেটের রাস্তাঘাটে জ্যাম হয় প্রচুর।কিন্তু নিয়ম করে শিহাব এসে আমাকে নিয়ে যায় বলে আমি সেসব জ্যামের ভোগান্তিতে পড়ি না। ক্লাস ছেড়ে গিয়ে নিচে দাঁড়াতেই দেখি শিহাব বাইক নিয়ে দাঁড়ানো।

নিশিকে বিদায় জানাই আমি-

-নিশি যাই আজ।

-আচ্ছা।

নিশি আমার কোচিং ক্লাসের সবথেকে ক্লোজ মেয়ে বন্ধু।মূলত সেই সবচে’ খাতির হয়েছে আমার সাথে।অযথাই বেশি কথা বলা মেয়েটা একরকম গায়ে পড়ে এসেই ভাব জমিয়েছে আমার সাথে।আমারও এমন খোলামেলা মানুষ পছন্দ।আর কারো সাথে এতটা খাপ খায়নি কোচিংয়ের এই তিন মাসে।

নিশি মেয়েটা বাসের জন্য বাস স্ট্যাণ্ডের দিকে এগোতে থাকে।আমি গিয়ে শিহাবের বাইকে চেপে বসি। বাইক এগোতে থাকে।শিহাবের শরীরে সেই পারফিউমের গন্ধ। মুগ্ধকরা। কিন্তু ঘ্রাণটা কেন যেন আমাকে সেভাবে ছুঁতে পারছেনা।হঠাৎ শিহাব বলে উঠে,

-তোমাকে দেওয়া পারফিউমটা আজ লাগাওনি?

-না।লাগাইনি।

-আগে তো নিয়মিত তোমার শরীর থেকে আমার শরীরের মত গন্ধ আসতো পারফিউমটার বদৌলতে।ইদানীং আর তোমার শরীর থেকে সেই গন্ধটা আসে না।

আমি খানিকটা হেসে উঠে শিহাবকে আরো একটু শক্ত করে চেপে ধরে বলি,

-তোমার শরীর হতে তো আসে,নাকি? ওই ঘ্রাণটাকেই আমি মনে করবে।

শিহাব কিছুক্ষণ চুপ থাকে।কেমন যেন গলায় সাহস জুগিয়ে বলে,

-আজ বাসায় যেতে হবে ফাহিম?

-কেন?

-আমাদের ওখানে চলো।

-লিলি আপুরা কোথায়?

-ভাইয়া ভাবী গাজীপুর গিয়েছে।আর ওরা থাকলেই বা কি হল।আমি তো তোমাকে নিয়ে আর তাদের ঘরে পাঠাব না।

-আচ্ছা।চলো। তবে সন্ধ্যের আগেই ফিরতে হবে।

-আচ্ছা।

শিহাবের বলিষ্ঠ বুকে আমার দুহাত দিয়ে ওকে খামচে ধরে জড়িয়ে ধরে বসে থাকি আমি।ওর শক্তপোক্ত পিঠ ঘেষে আমার বুক লেপ্টে থাকে।

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শিহাবদের ধানমন্ডিতে পৌছাই।ফ্ল্যাটে কেউই নেই।পুরো ফ্ল্যাটে শুধু আমি আর ও।

-চলো,আমার ঘরটা দেখবে।

শিহাবের ঘরে যেতেই দেখি এ যেন ঘর নয়।ছোটখাটো একটা সাজানো বাগান। গোছগাছ ঘরটায় নানান ফুল দিয়ে বিছানার আশপাশটা সাজানো।টেবিলে ফুল,ওয়ারড্রোবের উপর ফুল,বেলকনিতে টবে ফুল।একটা নেশা জাগানিয়া মৃদু গন্ধ পুরো ঘরময়।

হঠাৎ টের পেলাম আমাকে পেছন থেকে আলতো করে এসে জড়িয়ে ধরেছে শিহাব।ওর হাতদুটো ধীরে ধীরে আমার কোমড়ে এসে ঠেকে।আমার পুরো শরীর কেমন অবশের মত হয়ে আসে হঠাৎ।আমি থরথর করে কাঁপতে থাকি। শিহাব তার খোঁচা খোঁচা দাড়িযুক্ত গালের স্পর্শ দেয় আমার ঘাড়,চিবুকে।

কামুক নিশ্বাসের শব্দ এসে আমার কানে শিরশিরি দেয় যখন ওর জিহ্বা আমার কানের লতিতে চুমু খাচ্ছে।

সহ্যের সীমাকে আমি আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না।পেছন ফিরেই শিহাবকে ঝাপটে ধরি শক্ত করে।

শিহাব কোলে করে বিছানায় শুইয়ে দেয় আমায়।তার কামনা ভরা চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে আমি মদ্যপের মত হয়ে যাই।

প্রশস্ত বাহুর কঠোর হাত দুটো দিয়ে আমার অধরে নেশা ধরিয়ে দেয় ও। গা থেকে ওর টিশার্ট ছাড়িয়ে নিতেই মেদহীন পেটানো শরীরটা ঝলকে উঠে। আমি ধীরে ধীরে পরশ বুলাতে থাকি ওর বুকে।লোমহীন মসৃণ শরীরটায় আমার নরম শরীরটার সংস্পর্শ হতেই আমি টের পাই এই স্পর্শে কামনার সর্বোচ্চ রস থাকলেও ভাল লাগার ক্ষুদ্র কিছু একটার কমতি।

আমার ছোট ছোট কোমল আঙুল গুলো গিয়ে ওর নাভীকুপে আটকায়-পিঠে আটকায়।

শিহাবের আবেদনময়ী উরুদুটোও আমার চোখের সামনে শরাবের মত হয়ে দেখা দেয়, ততক্ষণে শিহাব বিবস্ত্র। আমাকে একদম শিহাব তার নিজের করে ভাসাতে থাকে কামনার যমুনায়। এমন প্রগাঢ় সুখের সাগরে ভেসেও আমি খুব তীক্ষ্ণভাবে কিছু একটার অভাব অনুভব করছিলাম।

শিহাবের সাথে সম্পর্কটা তিন মাস পেরোচ্ছে।এইচএসসি পরীক্ষার আগেই হাবিবের সাথে সবকিছু বিচ্ছিন্ন করি আমি। ওর কোন কথা বলার সুযোগ আর দেওয়া হয়নি।পরের দুটো মাস পরীক্ষায় কেটেছে বলে আমি সম্পূর্ণ ব্যস্ত ছিলাম।ফলে হাবিবের সাথে শেষ সাক্ষাৎটা চার-পাঁচ মাস আগেই হয়েছে বলা যায়। মাঝে দু’তিন বার পরীক্ষার হলের বাইরে হাবিবকে দেখেছিলাম। কিন্তু দেখেও না দেখার ভানটা আমি খুব ভালই জানি বোধয়। আমার কাছ থেকে দুর্বিসহ এমন সব অবজ্ঞা পেয়ে পেয়েই হয়ত চুপিসারে হারিয়েছে কোথাও।তাকে আর দেখিনি পরে।

তারপর বেশ লম্বা সময় পার হয়। শিহাব আমাকে ভালবাসার কথা জানায়।আমিও তার প্রতি আমার মুগ্ধতার বশে সম্পর্কে জড়াই।

শিহাবের মত ছেলে পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার।কিন্তু সৌভাগ্যকেই যারা তৃপ্তির ভাগ্য জেনে থাকবে তারা ভুল করছে। মানুষই মনে হয় এই প্রকৃতির সবচে’ বড় অদ্ভুত আর রহস্যময় প্রাণী।এরা নিজের মনকেই সারাজীবন নিয়েও চিনে উঠতে পারে না-অন্তত এটুকুই অনুধাবন করেছি এই কয়েকটা মাসে।

চোখের মুগ্ধতায় বিভোর হতে পারিনি বলেই মনের মুগ্ধতাকে গলা টিপে মেরে ফেলে পুরোনো সম্পর্কটার সৎকার ঘটিয়েছিলাম।চোখের প্রশান্তির জন্য শিহাবের সাথে অন্তরঙ্গতা গড়লেও মনের তৃপ্তির খোরাক পাওয়া হয়নি।চোখের মুগ্ধতা তো ফুরোয়, কিন্তু ঐ সিধেসাধা ছেলেটার সরল ভালবাসায় মনের মুগ্ধতার রেশ তো ফুরোবার ছিল না।এসব কথা মাথায় ঘোরাটাও আজকাল অনর্থক,কেননা চোখের ছলনায় পড়ে আমি ভ্রমে আটকে গেছি এতদিনে।

আমি সরল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছি হাতিরঝিলে।ব্রিজের উপর থেকে নিচের বিলের পানিতে আমার স্থির দৃষ্টি।আমার পেছন দিয়ে কে যাচ্ছে কারা যাচ্ছে তা চোখে পড়ছে না। এই যে ঘণ্টা পেরোতে চলল আমি এখানে শিহাবের জন্য দাঁড়ানো, আমার এক মুহূর্তের জন্যও বিরক্ত লাগেনি। কিন্তু কেন লাগল না?

এমন কোলাহলপূর্ণ একটা জায়গায় যে একা দাঁড়ানোটা বেমানান,সেতো আমি খুব ভালভাবে টের পেতাম একসময়। একসময় এখানে আমার একা একা আসতে ইচ্ছে করত না। এমনও সময় গিয়েছে,যখন এই হাতিরঝিলে বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলেই আমি রাগে ফুসফুস করতাম।কিন্তু হালের এই আমি,এখানে এক ঘণ্টা তিন মিনিট দাঁড়ানো শিহাবের জন্য।তারপরও এতটা স্থির থাকছি!

-ফাহিম,কখন এসেছো?

বাইক থেকে নামতে নামতে শিহাবের কণ্ঠের আওয়াজ বেরোয়।আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে ফিরি। চাপা এক অভিমান যেন বুকে এসে জটলা পাকানো শুরু করে আমার।আমি অবুঝের মত তাকিয়ে থেকে বলি,

-এতক্ষণ লাগল কেন তোমার?

-এতক্ষণ কই? এক ঘণ্টাই না মাত্র।

-মাত্র!

আমার বিস্ময় হওয়ার ক্ষমতাটাও যেন লোপ পেয়ে যায় হঠাৎ। আমি নিস্তব্ধ হয়ে সময় পার করতে থাকি।হাতদুটো বুকে এনে গুঁজে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ভাবছিলাম দু তিন ঘণ্টা চুপ করে থাকব।কথা বলব না।তখন হয়ত শিহাব বুঝতে পারবে এক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করাটা কেমন অসহনীয়।

পরক্ষনেই মনে হল,বেচারা কষ্ট পাবে।এক গজ দূরত্বেও না থাকা মানুষটা তার সাথে কথা না বললে তার অস্বস্তি লাগবে ভেবে আমি নিজে থেকেই আমার ‘কেউ ভাঙুক অভিমান’ এই আশা রাখা অভিমানটা ভেঙে দিই।বলি,

-চলো।কোথাও গিয়ে বসে বসে আইসক্রিম খাই।

-চলো।

শিহাব আমার আগে আগেই এগোতে থাকে।পেছনে আমি।তার ছিল না কোন অস্থিরতা, হল না কোন ভাবান্তর।শিহাবের কি কোন চিন্তাই নেই এ নিয়ে যে, পেছনের ছেলেটার হাতটা ধরা উচিত? কয়েকমাস আগেও আমি ভাবতাম আমার রাগ নিয়ে হাবিবের প্রচণ্ড ভয়।মূলত ভয়টা আমার রাগ নিয়ে ছিল না,হাবিবের ভয়টা ছিল আমাকে হারানোর। যা হয়ত এই ফ্যাশনেবল শিহাবের মাঝে নেই। শিহাবের কি মনেই হয়নি যে,’আইসক্রিম খাব’ বাক্যটা শোনার পর তার মুখ ভরে হৃদয় উজাড় করা একটা হাসির প্রয়োজন ছিল?

নাহ, শিহাব তো আর সেই ভোলাভালা ছেলে হাবিব নয়।

আর আমিও কেমন যেন অস্পৃশ্য ব্যথার ভারে ভেতরে ভেতরে কুঁজো হয়ে গেছি। অদৃশ্য কিছু আঘাত কেমন যেন বাকরুদ্ধ করে রেখেছে আমায়।’আমার অতীত আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে’ বলার কথা হলেও আমি বলি ‘শিহাব,কখন দেখা করবে?’ এ যেন ধোয়ঁায় লুকিয়ে থাকা করুণ এক অসহায়ত্ব আমার।সেই অসহায়ত্বই বোধয় শিহাবকে ঘিরে অভিমান জমে থাকলেও তাকে কিছু বলতে দেয় না। একসাথে দুজন মানুষ থেকেও কেমন অন্তর্নিহিত অর্থের মত আমি একা একা এগোতে থাকলাম।

শরীরের সাথে টাইট হয়ে লেগে থাকা খয়েরী রঙের পোশাক পড়া শিহাবের শরীরের দিকে তাকালেই ক্ষণিকের জন্য হলেও তাকে পেতে ইচ্ছা করে। অথচ এই কামুক চাওয়া যেন কামরস উত্তোলন পর্যন্তই এগোয়। ভেতরের মনোরস যেন ঢিলেঢালা শার্ট পড়া কোন এক সাধাসিধে ছেলেকে দেখলেই নির্গত হত আমার।

শিহাবের বুকে হেলান দিয়ে বসে আছি আমি।আমার চুলগুলো তার ঠোঁট আর নাক ঘেষে। বাম হাতটা তার হাতের মুঠোয়। সে আলতো করে আমার বাম হাতের তালুটা ঘষছে একটু পরপর।অথচ আমি অনুভব করছিলাম কেউ যদি চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বিলি কেটে দিতো!

চোখ দুটো ছলছল করে উঠল কিনা বুঝতে পারলাম না,তবে অতীতের স্মতির পাতা হতে বিষাদের কুয়াশা সরে গিয়ে আমার খুব স্পষ্ট ভাবেই মনে পড়ল ঝুনো শরীরের ছেলেটার কথা।

শুনেছিলাম সে স্কলারশিপ নিয়ে ইউরোপ চলে গেছে।তাই আর আমার এলাকার অলিগলিতে কিংবা পরীক্ষার হলের বাইরে তাকে দেখিনি। কিন্তু অদ্ভুত সব ঘটনা গুলো ঘটেই যাচ্ছিল- এদিকে আমি শিহাবের সাথে করছি ফোনালাপ,অন্যদিকে বেলকনি দিয়ে রাস্তায় তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছি হাতে একগুচ্ছ সাদা বেলী ফুল নিয়ে হাবিব নামের ছেলেটা আমাকে ডাকছে। ক্লাস থেকে ফেরার পথে শিহাবের বলিষ্ঠ কাঁধটায় নাক ঠেকিয়ে রেখে ওর শরীর হতে মাতাল করা পারফিউমের ঘ্রাণটা নাক ছুঁলেও আজকাল আমার মনে হয় হাবিবের সেই স্যাঁতস্যাঁতে ঘামের গন্ধটাই বুঝি আমার বুক ছুঁতো! শিহাব হয়ত টেরই পায়নি কখনো- তার বুকে যখন সে আমাকে আগলে ধরে রেখে উষ্ণতা দেয়,তখন আমি তার বুকে থেকেও অন্য এক পুরুষের বুককে মনে মনে হারাই।

হাতিরঝিলের বিলের পাড়ের নির্জন মতন এই জায়গাটার বেঞ্চিটায় শুধু আমি আর শিহাবই বসা।দুজন মানুষের এমন একান্ত একটা পরিবেশে থাকার সুযোগ আমি সবসময়ই নিতাম।সেই পুরোনো অভ্যেসেই আমি ধীরে ধীরে শিহাবের এঁটে সেটে লেগে থাকা শার্টের দুটো বোতাম ছাড়িয়ে নিই।হাতের চারটি আঙুল সংগোপনে শিহাবের বুকের সীমানায় পৌছে। কেমন অন্ধের মত আঙুল গুলো বুকটায় মই চালাতে থাকে। যেন কিছু খুঁজছে।

কী খুঁজছে? জঙ্গলের মত লাগা সেই পশম গুলো?

কে জানে, সেগুলো হয়ত কেবলই কোন পশম ছিল না।

ছিল হয়ত অপার্থিব মায়ামমতা মাখা কিছু ভালবাসা।

………..

সমাপ্ত।

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.