ভাঙ্গা হৃদয়

লেখকঃ কষ্টের নীল কাব্য

শিশির বাবা মায়ের একমাত্র আর তাদের বংশের কনিষ্ঠ ছেলে।তাই সকলের খুব আদরের। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস সে সমপ্রেমী! চাচাতো ভাইবোনেরা তাকে খুব ভালোবাসে কিন্তু একজন ছাড়া,সে আর কেউ নয় সে হলো ইমরান।তার বড় চাচ্চুর ছোট ছেলে। দেখতে স্বর্গের দেবদূতের মতো।আসলে ওদের বংশের সবাই খুব ফর্সা একমাত্র শিশির শ্যামলা।কিন্তু শ্যামলা হওয়া সত্বেও সে দেখতে অপূর্ব! ইমরানেরা শহরে থাকে আর শিশিরেরা গ্রামে থাকে। আসলে বলতে গেলে ওদের সব চাচা-ই শহরে একপরিবারে সাথে। কিন্তু কিছু অসুবিধার জন্য শিশিরেরা গ্রামে থাকে।কিন্তু শিশিরকে লেখাপড়ার জন্য তার চাচ্চুদের সাথেই থাকতে হয়।সে সবার নয়নের মনি হিসেবে থাকে কিন্তু ইমরান তাকে দেখতেই পারে না।ইমরানের সামনে কখনও যদি শিশির পড়ে তাহলে তাকে অকথ্য ভাষায় কটু কথা শোনায়।শিশির সেগুলো নীরবে সহ্য করে যায় কারণ সে জানে ইমরান তার থেকে ৪ বছরের বড়। তাই বড়দের সাথে খারাপ আচরণ করতে নেই।মাঝে মাঝে সে নীরবে চোখের জল ফেলে। সে সহ বাড়ির কেউ জানেনা ইমরান তার সাথে কেনো এমন করে। আজও শিশিরের মন খারাপ কারণ সকালে ইমরান তাকে অনেক বকেছে তাই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মুশলধারে বৃষ্টি পড়ছে, সে ভিজতে চেয়েও ভিজতে পারছে না কারণ তার আজ বৃষ্টিকে অসহ্য লাগছে।তাই সে ঘুমিয়ে পড়লো।রাতে খাবার সময় দেখলো খাবার টেবিলে সবাই আছ কিন্তু ইমরান নেই।সে তার বড় মাকে বললো ইমরান ভাইয়া কোথায়? সে কি আমার উপর রাগ করে খেতে আসেনি নাকি? তার বড় মা বললো না শিশির তোমার ইমরান ভাইয়া বিকেলে বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাধিয়েছে।সে আর কিছুই বললো না খাবার খেয়ে রুমে চলে গেলো।পরদিন শিশির কলেজ থেকে ফিরে এসে দেখলো বাসায় কেউ নেই,সে রীতিমতো অবাক হয়ে গেলো। কারণ কলেজ যাবার সময় তো সবাই ছিলো।সে ব্যাগটা তার রুমে রাখতে যাবে এমন সময় সে কারোর গোঙরানোর শব্দ শুনতে পেলো,সে শব্দ অনুসরণ করে যেতে যেতে ইমরানের রুমে চলে গেল,আজ প্রথম সে ইমরানের রুমে প্রবেশ করলো। কাছে গিয়ে দেখে বেচারা জ্বরে আবোল তাবোল বকছে।দেরি না করে সে ইমরানের রুমে থাকা ওষুধের বক্স থেকে ইমরানকে ওষুধ খাওয়ালো। আসলে ইমরান এতটাই অচেতন ছিলো যে সে কিছুই টের পেলো না।শিশির ইমরানের মাথায় জলপট্টি দিলো। আর বড় মায়ের কাছে জানতে পারলো ইমরানের নানা মারা গেছে তাই সবাই চট্টগ্রাম গেছে। ইমরানের শরীর খারাপ তাই তাকে নেয়নি।এদিকে শিশির সারারাত ধরে ইমরানের পাশে বসে তার মাথায় জলপট্টি দেওয়াতে ইমরান বেশ সুস্থ।সে ভাবছে পাশে তো কেউ নেই তাহলে জলপট্টি দিলো কে? এমন সময় দেখে শিশির খাবার নিয়ে তার কাছে আসছে।সে ইমরানকে উঠে বসে থাকতে দেখে ভয়ে চুপসে গিয়ে বললো, ভাইয়া আমাকে মাফ করে দিন।আর কখনও আপনার রুমে আসবো না।আসলে আপনার খুব জ্বর ছিলো আর বাড়িতে কেউ ছিলো না তাই বাধ্য হয়ে আমি এসব করেছি।তখন ইমরান বললো আমি কি কিছু বলেছি তোমায়। ইমরানের কথা শুনে শিশির অবাক, কারণ এই প্রথম সে দেখলো ইমরান তার সাথে এতো মিষ্টি করে কথা বললো। শিশিরকে খাবার নিয়ে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইমরান বললো কই খাবার দাও।সে ইমরানকে খাবার এগিয়ে দিলো।তখন ইমরান বলল আমি তো অসুস্থ নিজে নিজে খাবো কি করে? খাইয়ে দাও।শিশির আরও অবাক।যাইহোক সে ইমরানকে খাবার খাওয়াতে লাগলো।ইমরানকে খাবার খাইয়ে শিশির রুম থেকে চলে যাবে এমন সময় ইমরান বললো এই শোনো তুমি সবাইকে তো তুমি বলে ডাকো তাহলে আমাকে কেনো আপনি বলছো?আজ থেকে আমাকে তুমি না বললে খবর আছে।শিশির অবাক হয়ে রুমথেকে বেরিয়ে গেলো ভাবছে এসব কি হচ্ছে তার সাথে।রাতারাতি কি করে বদলে গেলো একটা মানুষ?আসলে শিশিরের সেবা আর সরল চাহনিতে ইমরান কি যেনো সেদিন খুঁজে পেয়েছিলো,তাই সে বদলে গিয়েছিলো।

. দেখতে দেখতে ৬ মাস পার হয়ে গেলো সেদিনের পর থেকে আজ ইমরান আর শিশিরের সম্পর্কটা বদলে গেছে। আজ তারা একে অন্যকে ছাড়া থাকতে পারে না।আসলে তারা দুজন খুব ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছে।কিন্তু এদিকে যে শিশির ইমরানকে বন্ধুর থেকেও বেশি কিছু ভাবে।ইমরানকে নিজের করে পেতে চায়।,কিন্তু ইমরানের সাথে বন্ধুত্ব নষ্ট হওয়ার ভয়ে কিছুই বলতে পারে না।আর ওদিকে ইমরান কখন যে শিশির কে ভালোবেসে ফেলেছে তা নিজেও বুঝতে পারে না। সে ভাবে হায়রে ভালোবাসা তোর জন্য আজ আমি সমপ্রেমী হলাম!যা কিনা কখনও হওয়ার ছিলনা।এভাবেই কাটছিলো দিন।একদিন ইমরান,রেহানা বেগম(ইমরানের মা) আর শিশির গল্প করছিলো, কথায় কথায় ইমরানের মা বললো আমাদের ইমরানের বউ কিন্তু শিশিরকেই খুঁজতে হবে।এই কথাটা শোনামাত্র শিশিরের মাথা গুলিয়ে গেলো, সে ডুকরে কেঁদে উঠে বললো আমি পারবো না বড় মা। তোমার ছেলেকে কারও সাথে ভাগ করতে পারবো না।ওকে খুব ভালোবাসি!কথাটা শোনা মাত্রই ইমরানের চোখে জল চলে এলো।ইমরানের মা রুমথেকে বেরিয়ে গেলেন কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শিশির সমপ্রেমী। এদিকে কথাটা বলার পরই শিশির মেঝেতে ধপাস করে বসে পরে। তাই ইমরান তাকে টেনে তুলে বুকে জড়িয়ে নিতে নিতে বলে,এতো ভালোবাসো তবুও বলোনি কেনো।আমিও যে তোমার প্রেমে কবেই হারিয়ে গেছিলাম।যেদিন আমার o +রক্তের দরকার হয়েছিলো সেদিন তুমি আমাকে রক্ত দিয়ে আমাদের বন্ধকে যে জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলে।এতদিন কেনো অপেক্ষা করালে আমায়?এমন সময় ইমরানের মায়ের চিৎকারে তারা দুজন আলাদা হয়ে গেলো।তারা দেখলো ইমরানের মা রেগে আগুন হয়ে আছে। রেহানা বেগম রাগান্বিত স্বরে বললেন তোমরা দুজনে বসো তোমাদের সাথে কথা আছে।তারা অপরাধীর মতো বসে পড়লো।তিনি বললেন দেখো আমি আধুনিকা নারী তাই সব বুঝি,ভালোবাসা হয় দুটো মানুষের মাঝে।আর মানুষ হয়ে মানুষকে ভালোবাসা কোনো পাপ নয়।তোমরা দুজনে যদি একসাথে ভালো থাকতে পারো তাহলে আমার আপত্তি নেই।কারণ দুটো মানুষ যদি পরস্পরকে ভালবেসে সারাজীবন কাটাতে পারে তাহলে আমরা বাঁধা দেবার কে? রেহানা বেগমের কথা শুনে তারা তাকে জড়িয়ে ধরলো।আর রেহানা বেগমের সাথে করে আনা দুটো আংটি তাদের হাতে দিয়ে বদল করিয়ে নিলেন।এই প্রথম কোনো মায়ের সামনে রচিত হলো রঙিন ভালোবাসার জগৎ।রেহানা বেগম রুম থেকে বের হতেই ইমরান পরম আনন্দে শিশিরকে জড়িয়ে ধরলো। ইমরান আর শিশিরের ঠোঁটযুগল হারিয়ে গেলো ভালোবাসা নামক মহাসমুদ্রে।হঠাৎ শিশির ডুকরে কেঁদে উঠলো, ইমরান হকচকিয়ে উঠলো।বললো কি হয়েছো আমি কি বেশি বাজে কিছু করে ফেললাম নাকি?শিশির বললো ভয় হচ্ছে ইমরান যদি তোমাকে হারিয়ে ফেলি। এতো ভালোবাসা কি সহ্য হবে আমার? ইমরান পরম মমতায় শিশিরকে বুকে টেনে নিয়ে বললো ভয় কিসের ?আমি তো আছি।আমাদেরকে কেউ আলাদা করতে পারবে না একমাত্র মৃ.. বলতেই শিশির ইমরানের ঠোঁটে হাত দিয়ে থামিয়ে দিলো।

৩.

আজ ৩ দিন হয়ে গেছে শিশির গ্রামের বাড়িতে এসেছে। আজ তাকে নিতে ইমরানের আসার কথা।তাই সে ইমরানকে ফোন দিয়ে বললো এই যে জনাব শ্বশুর বাড়িতে কখন আসা হচ্ছে? ইমরান বললো এই তো আমি বাইক নিয়ে বের হয়েছি, সর্বোচ্চ ১০ মিনিট লাগবে।তখন শিশির বলল তুমি বাইক চালাচ্ছো? তাহলে ফোন রাখছি সাবধানে এসো। বলেই শিশির লাইনটা কেটে দিলো।এদিকে ফোন রাখতে গিয়ে ইমরানের বাইকটা অসাবধানতা বসত রাস্তার মাঝে চলে যায় আর একটা ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেয়ে ইমরান পড়ে যায়। চারদিকে রক্তের বন্যা বইছে।এদিকে ৫ ঘন্টা পার হয়ে গেলো তবুও ইমরানের দেখা নেই আর ফোনটাও বন্ধ দেখে শিশির বাড়িতে কিছু না বলেই ইমরানের বাসার উদ্দেশ্যে বের হয়। তার বাড়ি থেকে ২ কি.মি যেতেই দেখে সামনে অনেক লোকের জটলা।সে গাড়ি থেকে নেমে সেদিকে এগোতে থাকে। তার কেমন যেনো অস্বস্তি লাগছে।ভিড় ঠেলে কাছে যেতেই ইমরান বলে চিকৎার দিয়ে জ্ঞান হারায় শিশির।নিজেকে আবিষ্কার করে হাসপাতালের বেডে।জ্ঞান ফিরতেই পাগলের মতো ইমরানকে খুঁজতে থাকে।কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।কারণ আজ ৩ দিন সে সেন্সলেস অবস্থায় ছিলো।সে সব শুনে ডুকরে কঁদে উঠলো।পুরো হাসপাতালে নেমে এলো শোকের ছায়া।সে আবার জ্ঞান হারালো।

৪.

—–৩ মাস পর——

আজ শিশির অন্যরকম একজন মানুষ।ইমরানের চলে যাবার পর থেকে আর একদিনও হাসে নি।ঠিকমতো খায় নি।আর সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা সে সাদা শার্ট আর প্যান্টকে আপন করে নিয়েছে।ইমরানের মা অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু শিশিরের মুখে একটাই কথা যার জীবনে রং ছড়ানোর মানুষটাই চলে গেলো তার জীবনে রং দিয়ে কি হবে।শিশিরের মা শিশিরের রুমে উঁকি দিয়ে দেখলো ইমরানের ছবি সামনে নিয়ে শিশির অঝোরে কেঁদে চলেছে।আর বলছে কেনো এমন করলে? এটাতো কথা ছিলো না, কেনো আমাকে একা করে চলে গেলে।প্লিজ ফিরে এসো।মাকে দেখেই চোখ মুছে ফেলে বললো কিছু বলবে মা।তার মা বললো আমার একটা কথা রাখবি বাবা।শিশির বললো বলো মা।তিনি বললেন আগে ইমরানে ছবি ছুঁয়ে কথা দে।শিশির বললো কথা দিলাম।তিনি বললেন বাবা তোর পায়ে পড়ি তুই আগের মতো হয়ে যা, তোর জন্য তোর বাবা শেষ হয়ে গেলো।একমাত্র ছেলেকে কেউ চোখের সামনে শেষ হয়ে যেতে দেখতে পারেনা।তুই যদি আমার কথা না রাখিস তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি বলেই আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে তিনি বের হয়ে গেলেন। শিশির কিছু না বলে বোকার মতো তার মায়ের চলে যাওয়া দেখলো। ★সকাল ৯টা বাজে অথচ শিশিরের রুম এখনও বন্ধ। সবাই ডাকছে কিন্তু কোনো সারাশব্দ নেই।অবশেষে তারা দরজা ভেঙ্গে ফেলে রুমে ঢুকতেই সবাই অবাক হয়ে গেলেন। শিশিরের মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।কারণ শিশিরের নিথর দেহ পড়ে আছে আর মুখ দিয়ে পড়ছে রক্ত,পাশেই পড়ে আছে ঘুমের ওষুধের খালি কৌটা।এমন সময় শিশিরের বোন দেখতে পেলো তার হাতে একটা চিরকুট, সে খুলে কান্নাভেজা কন্ঠে পড়তে লাগলো। # মা তোমার জন্যই পৃথিবীর আলো দেখতে পেরেছি।তাই তোমাকে চোখের সামনে কেমনে চলে যেতে দিই বলো।তাই নিজেই চলে গেলাম।তুমি তো সবই জানতে। ইমরানকে ছাড়া আমি বাঁচবো কি করে।গাছ যেমন অক্সিজেন ছাড়া আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আমিও তো তেমনি শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম,কারণ ইমরান যে ছিলো আমার অক্সিজেন! জানো মা কাঁচ যেমন ভেঙ্গে যাবার পর জোড়া লাগালেও ক্ষত রয়ে যায় ,তেমনি আমার হৃদয়টাও যে ভাঙ্গা ক্ষত,বিক্ষত ।তাকে কি করে জোড়া লাগাবো বলো।কাচ ভাঙলে হয়তো অনেক জোড়াজুড়ির পর তা আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো যায়। কিন্তু হৃদয় ভাঙ্গলে কি তাকে আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো যায়?যায় না মা!আর আমার এই ভাঙ্গা হৃদয় নিয়ে কোনোদিন কিছুই করতে পারতাম না।শুধুই তোমাদের বোঝা হয়ে থাকতাম।তাই চলে গেলাম আমার আসল ঠিকানায়।যেখানে অপেক্ষা করছে আমার ইমরান। পারলে আমায় ক্ষমা করো।

ইতি ভঙ্গুর হৃদয়ী শিশির.

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.