ম্যাজিক

লেখকঃ অরণ্য রাত্রি

আমার ঘরটা নীল। এক টুকরো আকাশ কে যেন ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। অথবা নীল বেদনা।কারণ আমার মনটা প্রায়ই বিষাদগ্রস্ত থাকে। আজ তিন বছর হল আমি এক জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত। বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত আমি। আমি এই ভাল তো এই খারাপ। কখনো কখনো আদিম উন্মত্ততা আমায় চেপে ধরে।আমি ভাংচুর করি। চিৎকার করি । অথবা মনের কোনে গুমোট এক ঝলক বাতাস আমার মন কে বিষাদগ্রস্ত করে রাখে। যখন আমি সুস্থ ছিলাম তখন আমি দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। তিন বছর হল ভিজি নাই বর্ষার প্রথম বৃষ্টি তে। ঘুরি নাই বন্ধুদের সাথে রিকশা করে কোথাও।খাই নাই পথের ধারে ভেলপুরি।আমার জীবন থমকে গিয়েছে। এইভাবেই কেটে যাচ্ছে আমার নিঃসঙ্গ অসুস্থ দিন গুলো।

এখন আমি ব্যাংককে আমার মায়ের কাছে।মা এখানে জব করেন ।বলা হয় নাই আমার মা আর বাবা আলাদা থাকেন। তাদের মাঝে সেপারেশন। অবশ্য ডিভোর্স হয় নাই। আমার খুব আশা আবার মা , বাবা এক সাথে থাকবেন।কিন্তু তা পূরণ হবার নয়। আমি মায়ের কাছে এসেছি চিকিৎসার জন্য। মায়ের আশা এখানে চিকিৎসা করলে আমি সুস্থ হব। তাই তো এই চেষ্টা। কাল ডাক্তারের কাছে এপয়েন্টমেন্ট। বাম্রুনগ্রাদ হাসপাতাল। হাসপাতালে ঢুকলে মনে হয় কোন এক ফাইভ-স্টার হোটেলে চলে এসেছি। আর স্টাফদের ব্যবহার অসম্ভব ভাল। মন ভাল হয়ে যায়। ডাক্তার আমাকে খুব ভাল মত পরীক্ষা করলেন। বাংলাদেশের প্রেসক্রিপশন গুলো দেখলেন। ডাক্তার খুব হাসিখুশি। ব্যবহার চমৎকার। বললেন

– এই রোগ হয়তো পুরোপুরি ভাল হবে না। কিন্তু এখন অনেক ভাল ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে যা দিয়ে এই রোগ কে খুব ভাল ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমি ওষুধ দিচ্ছি। আশা করি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন। এ ধরনের আশ্বাস আগেও অনেকে দিয়েছেন। কিন্তু কোন লাভ হয় নাই। আমি কিন্তু খুব ভরসা পেলাম না। ২ দিন ওষুধ খাওয়ার পর আমার মনোজগতে একটা আলোড়ন ঘটলো । আমার ভাল লাগছে। বেশ ভাল লাগছে। আম্মু কে নিয়ে ব্যাংকক ঘুরতে বের হলাম। গেলাম টেম্পল, রাজবাড়ি, ফ্লটিং মার্কেট।অসংখ্য ছবি তুললাম। শপিং করলাম পাতুনামে। একগাদা জিনস আর টিশার্ট কিনলাম। কত দিন পর শখ করে শপিং করলাম। আম্মু সেরকম খুশি। কিন্তু অশেন ওয়ার্ল্ড এ গিয়ে মন খারাপ হয়ে গেলো। গতবার ৪ বছর আগে আব্বু আর আম্মুর সাথে এসেছিলাম এখানে। আজকে আব্বু নেই। গত তিন বছর হল বাবা আর মা এক সাথে থাকেন না। আর তখন থেকেই আমার এই অসুখের সূচনা। আমার আর ভাল লাগছিল না। মনে হচ্ছে আবার সেই বিষাদে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে আমার মন। কিন্তু আম্মু কষ্ট পাবে দেখে হাসি মুখে ঘুরে বেড়ালাম। কিন্তু ঠিক করলাম পরশুই দেশে ফিরে যাবো। আব্বু একা আছেন। আমি ছাড়া আব্বুর তো আর কেউ নেই। পুরো বাসায় একা একটা মানুষ।ব্যাংককে আম্মুর সাথে খালামনি থাকেন। তাকে তো দেখার তাও কেউ আছে।

দাড়িয়ে আছি সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্টে।আম্মু বিদায় দিতে এসেছে।এখন খুব কষ্ট লাগছে। এতদিন আব্বুর জন্য কষ্ট লাগছিল। এখন আম্মুর জন্য কষ্ট লাগছে। যতই খালামনি থাকুক। ছেলে মানে তো ছেলেই। আমি বিদায় জানিয়ে এয়ারপোর্টে ঢুকে পরলাম। একবার পিছনে তাকিয়ে আম্মু কে দেখলাম। কেমন নিঃসঙ্গ লাগছে তাকে। মনে হচ্ছে তার জীবনের সব সুখ আমার সাথে চলে গিয়েছে। এত অসহায় আগে কক্ষনো লাগে নাই তাকে। ইচ্ছা করছে দৌড়ে যেয়ে আম্মু কে জড়িয়ে ধরি।আম্মুর বুকে মাথা রাখি। কিন্তু সব ইচ্ছা পূরণ করতে নেই।বিমানে বসে আছি। চোখ থেকে পানি পরছে টপটপ করে। জীবন কেন এত নিষ্ঠুর। চাইলেও আমি কেন আমি আমার দুইজন প্রিয় মানুষ কে এক করতে পারি না? আমার পাশে একজন বৃদ্ধা বসেছিলেন। তিনি পরম মমতায় আমার ঘাড়ে হাত রাখলেন। আমি চোখ মুছলাম। তারপর বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। এই কষ্ট আমি কাউকে বুঝতে দিবো না। এটা আমার একান্ত নিজের কথা। একান্ত নিজের কষ্ট। কষ্ট বিলাসী আমি।

আমার এক টুকরো নীল, আমার ঘরে আমি বসে আছি। আমি ছিলাম না । কিন্তু আমার ঘর পরিপাটি করে সাজানো। কালুর মা আমার খুব যত্ন নেয়। সেই সব সময় আমার ঘর গুছিয়ে রাখে। কালুর মা আমাদের বাসায় কাজ করে। কিন্তু আমরা তাকে পরিবারের সদস্যই মনে করি। আব্বু আমি আসতেই আমার ঘরে উপস্থিত। আমার আব্বুর কিছু বাচ্চা সুলভ আচরণ আছে। তার একটা হচ্ছে চকলেট খাওয়া। আমাকে পই পই করে বলে দিয়েছে ব্যাংকক থেকে যেন চকলেট নিয়ে আসি। এইবার আম্মু নিজে চকলেট কিনেছে। তারপর পারফিউম কিনেছে। আব্বুর পারফিউমেরও অনেক শখ। আম্মুর অনেক আচরণ দেখে আমার মনে হয় আম্মু বুঝি এখনো আব্বু কে ভালবাসে। আমি উপহার গুলো বের করে দিলাম। বললাম না আম্মু কিনেছে। তাহলে আব্বু নিবে না।আব্বু চকলেট খেতে খেতে আমাকে বলছে

– তোর সাথে কিছু জরুরিকথা আছে।

– কি কথা?

– আজকে ডিনারের সময় বলবো আব্বু আরেকটা চকলেটের দিকে হাত বাড়ালও। আমি চকলেট কেঁড়ে নিয়ে বললাম

– তোমার যে ডায়াবেটিস আছে সেটা মনে আছে?

– উফ তোর জ্বালায় আর পারি না। চকলেট কি আমি ডেইলি ডেইলি খাই? বিদেশি চকলেট বলে কথা আব্বু চলে যেতেই আবার মনটা বিষাদে ভরে গেলো। আম্মুর কথা মনে পড়ছে। এই সময় আম্মু একা একা টিভি দেখছে। কত নিঃসঙ্গ আমার আম্মুটা। অথচ কিছু করার নেই। একটা ব্যাপার ঘটেছে। আমার মনের কষ্ট পুরোপুরি দূর না হলেও এখন আমি বেশ সুস্থ ভাবে সব কিছু ভাবতে পারছি। আগের মত কান্না করছি না। কিংবা অসম্ভব রাগও উঠছে না।জিনিস পত্র ভাংচুরের ইচ্ছা হচ্ছে না। তার মানে ওষুধ কিছুটা হলেও কাজ করেছে। মনে হচ্ছে আমি আমার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছি।

আব্বু ডিনারে যা বলল তা অনেক যুক্তিসঙ্গত।আব্বু বলল

– তুমি সারাদিন বাসায় একা একা থাকি। কোন কাজ নেই। আর এখন তো একটু সুস্থ হয়েছ। তুমি আবার পড়াশোনাটা শুরুকর। প্রাইভেটে এইচএসসি দিয়ে দাও

– কিন্তু এতদিন পর। আমি আসলে বই এর সংস্পর্শেই নেই অনেক দিন। একা একা কি পারবো ?

– এই কথাই বলছিলাম। আমার এক দুঃসম্পর্কের বোনের ছেলে। খুব গরীব। ঢাকায় এসে থাকবে চাকুরীর খোঁজে। আমাদের বাসাতেই উঠবে। ও তার বদলে তোমাকে একটু পড়া টা দেখিয়ে দিল

– কিন্তু সে কি পারবে?

– পারবে। ছাত্র খারাপ না। মেট্রিক ইন্টারমিডিয়েট দুইটাতেই গোল্ডেন এ প্লাস। আমি ভাবলাম শুরুকরা যাক। জীবন টাকে এভাবে থামিয়ে রাখবো কতদিন?

– আচ্ছা আব্বু আমি রাজি। আব্বু এসে আমার মাথা তার বুকে জরিয়ে বলল

– এই তো আমার লক্ষ্মী ছেলে। আজকে আমরা সেলিব্রেট করবো । ছাদে যেয়ে গান গেয়ে সেলিব্রেট করবো আমি ভাবছি ঈশ আম্মু যদি আজ এখানে থাকতো।কারন ছাদে গানের আসর বসলে তার মধ্যমণি থাকতো আম্মু। আমার চোখ ভিজে আসতে চায় জলে। কিন্তু কান্না করা যাবে না। শক্ত হতে হবে।

নতুন স্যারের সামনে বসে আছি। স্যারের নাম আতিক। তাকে আতিক ভাই বলে ডাকতে বলেছেন তিনি। তিনি আমাকে ম্যাজিক দেখাচ্ছেন। আমার নাকি খুব ভাল লাগবে। আমাকে দেখতে বয়সের তুলনায় কম দেখা যায়। তাই কি তিনি আমাকে বাচ্চা ঠাউরেছেন? কিন্তু ম্যাজিক চমৎকার দেখালেন। শূন্য থেকে কিভাবে জানি এক গাদা ক্যান্ডি নিয়ে আসলেন। এবার আমি পুরোপুরি বুঝলাম আমাকে তিনি বাচ্চাই মনে করছেন। আমাকে ক্যান্ডি গুলো দিলেন। আমি হেসে দিলাম

– কি ব্যাপার হাসছও কেন?

– আমাকে আপনি বাচ্চা ভাবছেন তাই। আমি কিন্তু এতটা বাচ্চা নই।

– তাই?

– হুম আমি এডাল্ট বই পড়ি , এডাল্ট মুভিও দেখি

– আর কি কর?

– মাঝে মাঝে সিগারেট খাই। আর অকেশনালি মদ্যপান করি ( যদিও মিথ্যা।স্যার কে ভরকে দেয়ার জন্য বলা)

– বাহ তুমি তো তাহলে আসলেই বড়। তা শুধু এডাল্ট বই পড় নাকি ভাল বইও পড়?

– আমার প্রিয় লেখক বিভূতিভূষণ । আপনার?

– বাহ। আমার শরৎচন্দ্র এরপর শুরু হল বই নিয়ে কচকচি। এই টপিকটা আমার খুব প্রিয়। কথা বলে আরাম পাচ্ছি। প্রথম দিনেই আতিক-ভাই কে ভাল লেগে গেলো।

আতিক ভাই প্রায়ই তার ঘরে আমাকে ডাকেন সিনেমা দেখার জন্য। আগে আমি কলকাতার আর্ট ফিল্ম দেখতাম না। এখন আমি কলকাতার আর্ট ফিল্মের মহা ভক্ত। আতিক ভাই এর ল্যাপটপে বসে দুইজন মিলে ফিল্ম দেখি। প্রাক্তন প্রায় তিন বার দেখে ফেলেছি। অপর্ণা সেন আর ঋতুপরন ঘোষের মুভিও প্রচুর দেখা হয়। আর বই নিয়ে ম্যারাথন আলোচনা তো চলেই। আর ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা। আমার একাকীত্ব অনেকাংশে দূর হয়ে গেছে। মন আগের মত গুমোট থাকে না। কেমন হাসি খুশি হয়ে উঠেছি আগের থেকে। এটা কি ওষুধের গুন নাকি আতিক স্যারের কৃতিত্ব বুঝি না।

আজ আমার খুব দুঃখের একটা দিন। আমার জন্মদিন। আমি গত তিন বছর জন্মদিন পালন করি না। এবং আমি খুব কড়া ভাবে সবাই কে বলে দিয়েছি কেউ যেন আমাকে উইশ না করে। আব্বু বা আম্মু কেউ উইশ করে না তাই। আবার কোন দিন আব্বু আম্মু এক হলেই জন্মদিন পালন করবো। নাহলে নয়। আতিক ভাই খবর পাঠিয়েছে তার ঘরে যেতে। কিন্তু একদম ইচ্ছা করছে না পড়তে। ভাবলাম আতিক ভাইয়া কে যেয়ে বলে আসি যে আজ পড়বো না। আতিক ভাই এর ঘরে যেয়ে দেখি আতিক ভাই পেপার পড়ছে। আমাকে দেখে পেপার সরিয়ে বলল

– কি ব্যাপার জামান তোমার মুখ এত শুকনো লাগছে কেন? মন খারাপ?

– হম

– কি নিয়ে বলা যায়?

– আজকে আমার জন্মদিন

– তাহলে তা খুশির খবর। মন খারাপ কেন?

– আমি ঠিক করেছি বাবা মা এক না হলে আমি কোন দিন জন্মদিন পালন করবো না

– আচ্ছা তা কর না। কিন্তু আমার সাথে ঘুরতে যেতে তো কোন সমস্যা নেই? আমার খুব অবাক লাগলো আমি আমার সব কথা হরবর করে লোকটা কে বলে দিচ্ছি কেন? লোক টা আমার কে?

– না ঘুরতে যাবো না। আমি বাগানে যাচ্ছি। গাছের পরিচর্যা করবো হটাত আতিক ভাই এসে আমার হাত টা চেপে ধরলও। আমার সারা শরীরে কি যেন ঢেউ খেলে গেলো । লোম দাড়িয়ে গেলো ।

– আজকে আমি তোমাকে আমার খুব পছন্দের একটা জায়গায় নিয়ে যাবো ।

আমি না করতে পারলাম না। কেমন যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত রাজি হয়ে গেলাম। আমাদের গন্তব্য মৈনট ঘাট।গুলিস্তান থেকে বাসে উঠলাম। পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেলো। পদ্মা নদীর তীরে এই মৈনট ঘাট । আতিক ভাই বলছেন

– গরিবের কক্সেসবাজার। আমার পক্ষে কক্সেসবাজার যাওয়ার টাকা নেই। তা-নাহলে তোমাকে আমি সেখানে নিয়ে যেতাম। আর একদিনে তো কক্সেসবাজার যাওয়াউ সম্ভব না। আমার সমুদ্র অসম্ভব প্রিয়। কক্সেসবাজারেও আমি অসংখ্যবার গিয়েছি। তারপরও মৈনট ঘাটে এসে মন ভাল হয়ে গেলো। যে কোন বিশাল জলরাশির সংস্পর্শে আসলে মন ভাল হতে বাধ্য। আমি জুতা খুলে পার দিয়ে খালি পায়ে হাঁটছি। সকালের সেই মন খারাপ ভাবটা কখন চলে গিয়েছে। আমরা লাঞ্চ করলাম অনেক দেরিতে বিকেল বেলা। সাদা ভাত , বেগুন ভর্তা আর ইলিশ মাছ দিয়ে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবে হবে এই সময় আমরা নৌকায় উঠলাম। মাঝ নদীতে যেয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিতে বললাম মাঝি কে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে গিয়েছে। আর আমার সামনে বিশাল জলরাশি।আর তাতে সূর্যের আলোর প্রতিবিম্ব পরছে। আরো কিছু নৌকা , ট্রলার রয়েছে নদীতে। যখন চারিদিক পুরো অন্ধকার হয়ে গেলো তখন আতিক ভাই গান ধরলেন। পরিবেশ টা এমন। গান একদম হৃদয়ে যেয়ে লাগলো। – তুই যদি আমার হইতি … আমি হইতাম তোর… কোলে তে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর আমার চোখে পানি এসে গেলো ।বহু বছর পর এক অসাধারণ জন্মদিন পালন করলাম।বাড়তি হিসেবে চাঁদ কে পেলাম। আকাশে আজকে পূর্ণ চন্দ্র।যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু নিরাপত্তার খাতিরে চলে যেতেই হবে। ফিরে চললাম যান্ত্রিক শহর ঢাকায়। নিয়ে গেলাম এক অসাধারণ স্মৃতি।

আতিক ভাইয়ের সাথে আমার এখন বন্ধুর মত সম্পর্ক। আমি আমার ঘরে কাউকে নেই না। এক মাত্র আতিক ভাই কে নিয়ে গিয়েছি। আতিক ভাই কে যখন ইচ্ছা আমার ঘরে আসার অনুমতি দিয়েছি। আর আমার বই এর সংগ্রহ তাকে দেখিয়েছি। একসাথে ছাদে উঠে বৃষ্টি তে ভিজেছি।রিকশা ভ্রমণ, ফুচকা খাওয়া কোন কিছুই বাদ নেই। আমার একাকী জীবনের একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠলেন আতিক ভাই।

১০

আজকে আমার ওষুধ সংগ্রহের দিন। আমি গত এক বছর যাবত ঘুমের ওষুধ সংগ্রহ করে যাচ্ছি। একটা সময় আমার জীবনের উপর প্রচণ্ড অনীহা এসেছিল। আমি ঠিক করেছিলাম যখন মানসিক যন্ত্রণা চরম শিখরে পৌঁছাবে তখন আত্মহত্যা করবো । তাই প্রতি মাসে ২ টা করে ঘুমের ওষুধ কিনে মজুদ করছিলাম। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঘুমের ওষুধ দিতে চায় না কোন দোকানদার। কিন্তু একটা চাইলে অনেক সময় দেয়। তাইতো একটা করে কিনি।একটা সুন্দর বাক্সে ওষুধ গুলো জমা করেছি। এখন পর্যন্ত ২৪ টা ঘুমের ওষুধ জমেছে। আমার টার্গেট ৫০ টা।বাক্স টা এলোমেলো ভাবে বিছানার উপর রেখে দিয়েছিলাম। ঠিক সেই সময় আমার ঘরে আসলেন আতিক ভাইয়া। তার চোখ পড়লো তো পড়লো একদম বাক্সটার উপরেই। তিনি বাক্স টা হাতে নিয়ে দেখে তিনি আঁতকে উঠলেন। বললেন

– একি এতো ঘুমের ওষুধ। এত্ত গুলো কেন? আমার দিকে তিনি কঠিন চোখ করে তাকালেন। বললেন

– সত্যি করে বল ঘুমের ওষুধ গুলো কি জন্য?

আমি তো বলবো না তা আগে থেকেই ভেবে রেখেছি। এইবার আতিক ভাই গলার স্বর নরম করে বললেন

– আমাকেও বলবে না? আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। কেঁদে দিলাম। টপ টপ করে চোখের পানি পরছে। বললাম আমার যত দুঃখের কথা। আমার বাবা মায়ের সেপারেশনের কথা। আতিক ভাই আমার চোখ মুছে দিয়ে বললেন

– আমি সব ঠিক করে দিবো এবার আমার অবাক হবার পালা।

– আপনি কিভাবে ঠিক করবেন?

– ম্যাজিক। ইউ মাস্ট বিলিভ ইন ম্যাজিক। প্যারা সাইকোলজি নিয়ে কিছু তুমি জানো ?

– না

– সাধারণ মনোবিজ্ঞান দিয়ে যেসকল আচরণ ব্যাখ্যা করা যায় না সেগুলোই প্যারা সাইকোলজির অন্তর্ভুক্ত। যেমন প্রিকগ্নিশন ড্রিম, পুনর্জন্ম , টেলিপ্যাথি, মৃত্যুর অভিজ্ঞতা, সাইকোকাইনেসিস ইত্যাদি।

– এগুলো কেন বলছেন?

– কারণ আমারও একটা ক্ষমতা আছে যা সাধারণ বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে না।

– কি ক্ষমতা?

– আমি চাইলেই মানুষ কে কনভিন্স করতে পারি খুব সহজে – বিশ্বাস করি না।

– আচ্ছা তাহলে তুমি চিন্তা করে দেখো ।তুমি তোমার জন্মদিনে আমার অনুরধে এক কথায় রাজি হয়ে গেলে । কেন? ঘুমের ওষুধ কেন জমাচ্ছও তা এক নিমিষে বলে দিলে। অথচ এটা তোমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।কেন বললে? আমি আমতা আমতা করছি। তাই তো কেন বললাম? কিন্তু তাও বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। আমি বললাম

– আপনি কি নিজেকে দুই দুয়ারির রিয়াজ ভাবছেন? তাহলে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

– আমি দুই-দুয়ারি দেখি নাই।

– আচ্ছা আপনি যদি সবাই কে কনভিন্স করতে পারেন তাহলে আপনার নিজের অবস্থা তো ইচ্ছা করলেই ভাল করতে পারেন মানুষ কে কনভিন্স করে

– আমার নানার এই ক্ষমতা ছিল। তিনি বলে গিয়েছিলেন আমাকে এই ক্ষমতা কক্ষনো নিজের স্বার্থে না ব্যবহার করতে। তাহলে আমার অনেক ক্ষতি হবে। কিন্তু আমি শুনি নাই। আমি করেছিলাম ব্যবহার। আমার এক শিক্ষক কে কনভিন্স করেছিলাম নাম্বার বেশি দিতে। ঠিক সেদিন ই আমার বাবা মারা যায়। হার্ট এটাক করে। এরপর কোন দিন সাহস হয় নাই নিজের প্রয়োজনে কাউকে কনভিন্স করতে।

আমার কাছে পুরোটাই গাঁজা খুড়ি মনে হচ্ছে। আমি সন্তান হয়ে আব্বু আম্মু কে কনভিন্স করতে পারলাম না। আর উনি পারবেন! হাতি ঘোড়া গেলো তল, আতিক বলে কত জল।হুহ!আতিক ভাই মনে হয় আমার মনের কথা পড়তে পারলো । বললেন

– আমি কথা দিচ্ছি তোমার জীবনে তোমার বাবা আর মা কে আগের মত ফিরিয়ে দিবো ।

আমি হাসলাম। কিছু বললাম না। আতিক ভাই ঘুমের ওষুধের বাক্সটা নিয়ে আমার ঘর থেকে চলে গেলেন।

১১

আম্মু ফোন দিয়েছে । ঢাকা আসছে। তাও আমাদের বাসায়। সে নাকি তার ভুল বুঝতে পেরেছে। এদিকে আব্বু বলছে ব্যাংকক যাবে। আম্মুর সাথে নাকি কি কথা আছে। আমার মাথায় কিছুই খেলছে না। তাহলে কি আতিক ভাইয়ের আসলেই ক্ষমতা আছে।তিনি কি সব ঠিক করে দিচ্ছেন? আব্বু ডাকছে।আব্বুর ঘরে গিয়ে আমার তো আক্কেল গুড়ুম। ঘরের জন্য নতুন পর্দা কিনেছে আব্বু, বিছানার চাদর টা পর্যন্ত নতুন। সব বেগুনি রঙের। আম্মুর প্রিয় রঙ। একটা শাড়ির বাক্স পর্যন্ত দেখছি।আব্বু বলল

– তোমার মা এত দিন পর আসছে। তাই কিছু কিনা কাটা করলাম। বিছানার চাদর পুরানো হয়ে গিয়েছিল। বদলালাম। আর পর্দার রঙ কেমন হয়েছে বল তো ?ঈশ এসির মিস্ত্রি এখনো আসলো না। তোমার মা তো চলে আসবে। কালুর মা কি রান্না করছে একটু দেখো তো!

– আব্বু এত ব্যস্ত হইও না। আমি সব দেখছি। আমার খুব আনন্দ লাগছে। আবার কান্নাউ পাচ্ছে। সুখের কান্না। কিন্তু আতিক ভাই কে কিভাবে ধন্যবাদ দিবো। কিন্তু আমার তো শুধু ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছা করছে না। জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে।আমি কেমন জানি তার প্রেমে পড়ে গিয়েছি। কিন্তু আতিক ভাইয়া তো আমার মত সমকামী নন। একটা গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে। মামার গাড়ি। কত্ত দিন পর মামা এই বাড়িতে আসলো। একটা কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। আতিক ভাইয়া তো চাকুরী খুঁজছেন। আচ্ছা মামা কে বলে তার কোম্পানি তে একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করলে কেমন হয়। মামার তো বিশাল কোম্পানি। নিশ্চয়ই তিনি চাকুরী দিতে পারবেন।

১২

বসে আছি আতিক ভাইয়ার সামনে। আমার এখন খুশির দিন। আম্মু এসে গিয়েছে। তারপর সেই এক নাটক । আম্মু আব্বু কে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না। এতদিন দের অভিমানের বরফ গলে পানি হল। আম্মু ব্যাংককের চাকুরী ছেড়ে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশে থাকবে আমাদের সাথে। এখন আর আমার তেমন ওষুধ খাওয়া লাগে না। আমি প্রায় সুস্থ হয়ে গিয়েছি। কিন্তু আতিক ভাইয়া কে ধন্যবাদ দেয়া হয় নাই। ভেবেছি ধন্যবাদ দিবো না । সরাসরি চাকুরীর খবর দিবো। মামা অনেক ভাল বেতনের একটা চাকুরী দিবে বলেছে আতিক ভাইয়া কে।আতিক ভাইয়া কেও আজকে খুব হাসি খুশি লাগছে। আমি বললাম

– ভাইয়া আপনাকে আজকে খুব সুন্দর লাগছে

– আসলে আজকে আমি অনেক খুশি। তাই তার প্রতিফলন চেহারায় পরেছে। তাই হয়তো সুন্দর লাগছে।

– খুশি কেন ভাইয়া?

– একটা ভাল খবর আছে – আমারও একটা ভাল খবর আছে। আচ্ছা আগে আপনারটা বলেন।

– আমি জার্মানি তে যাওয়ার একটা সুযোগ পেয়েছি।

খবর টা শুনে আমার সব খুশি নিভে গেলো। আতিক ভাইয়া আমার থেকে দূরে চলে যাবে।চাইলেই আর কথা হবে না। দেখা হবে না। হটাত কষ্ট গলায় দলা পেকে উঠলো।আর আমি যে চাকুরীর ব্যবস্থা করলাম সেইটার কি হবে?আমি বললাম

– কংগ্রাচুলেশন

– থ্যাংকস

– কবে যাবেন?

– আসলে আমি একজনের স্পাউস ভিসায় যাচ্ছি।তোমাকে বলি ।আমি আসলে সমকামী। আমি একজন জার্মান ছেলে কে কনভিন্স করে তার সাথে রিলেশন করেছি। ওই আমাকে নিয়ে যাচ্ছে

– কিন্তু আপনার নিজের স্বার্থে না কাউকে আপনি কনভিন্স করতে পারবেন না? তাহলে আপনার অনেক ক্ষতি হবে

– অনেক তো দেখলাম। কোন চাকুরী পাই না।ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছি।শেষে রিস্ক টা নিলাম।রিস্ক না নিলে কিছু হয় না। আচ্ছা তোমার ভাল খবরটা বল

– তেমন কিছু না। আমি বানিয়ে বললাম

– আম্মু আমাকে একটা ম্যাক-বুক উপহার দিচ্ছে।

– ওয়াও জোস

– ভাইয়া আপনি কবে যাবেন?

– এক সপ্তাহ পর ফ্লাইট। কাল বাড়ি চলে যাবো। মায়ের সাথে কয়েকটা দিন থাকবো

– তার মানে আজকেই আমাদের শেষ দেখা?

– হম । ভাল মত পড়াশোনা করবে বুঝেছ? আমি চাই তুমি প্রতিষ্ঠিত হও।

এই আতিক ভাইয়ার সাথে আমার শেষ কথা।

১৩

পাঁচ বছর পার হয়ে গিয়েছে। আমি এখন বি এ কমপ্লিট করে আব্বুর অফিসে বসি। আমার একটা বয় ফ্রেন্ড আছে। আমার অসুখ টা এখন আর নেই। মাঝেই মাঝেই আতিক ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। কিন্তু কোন যোগাযোগ নেই। একদিন ফেসবুক ঘাটতে ঘাটতে আতিক ভাইয়ার ফেসবুক প্রোফাইল পেয়ে গেলাম। কোন ছবি নেই। কিন্তু তিনি এখন বাংলাদেশে তা বুঝলাম। একটা ফোন নাম্বার দেয়া। আমি ডায়াল করলাম। ফোন ধরতেই আতিক ভাইয়ার সেই পরিচিত গলা শুনতে পারলাম।

– হ্যালো

– ভাইয়া আমি জামান ওই পাশ থেকে কোন কথা আসছে না। আমি আবার বললাম

– হ্যালো

– তোমাকে আমি চিনি না। প্লিজ আর ফোন দিবে না।

আতিক ভাইয়া ফোন খট করে রেখে দিল। তারপর থেকে ফোন বিজি।মানে আমার নম্বর ব্লক করে দিয়েছে। আর চেষ্টা করি নাই আমি কথা বলার।কিন্তু আতিক ভাই এমন করলেন কেন?

পরিশিষ্ট আমি জেনেছিলাম শেষ পর্যন্ত আতিক ভাইয়ার কি হয়েছিল। আতিক ভাইয়া সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মারা যায়। আমার বিএফ সেখানে চাকুরী করতো ডাক্তার হিসেবে।সেই খবর টা আমাকে দেয়। আতিক ভাইয়া এইডস এ আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। মৃত্যুর আগে তার কোন আপনজন তার পাশে ছিল না। আমার সাথে কথা বলতে চায় নাই হয়তো লজ্জা। তার এই অবস্থা তিনি দেখাতে চান নাই। আসলেই নিজের ক্ষমতা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করায় হয়তো তার এই অবস্থা। এর পর থেকে আমি ম্যাজিকে বিশ্বাস শুরুকরলাম।

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.