রং হারানোর বেলায়

জনি ড্যানিয়েল

গন্তব্যে পৌঁছতে পৌছতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলো। রাত্রি সাতটায় যখন সাথের লোকটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠাতে লাগলো তখন আর পা চলেনা। অন্ধকারে কিছুই ঠাহর করতে পারছিনা। শুধু বুঝতেছি, উপরে উঠছি।

কী দরকার ছিল এই কচুর চাকরী করার?

মনে মনে চাকরীর চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করলাম।

এরচেয়ে যদি একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে জব করতাম। বউকে নিয়ে সুখে শান্তিতে শহরে থাকা যেতো। কিন্ত আর হল কই? আর বর্তমানে চাকুরী সোনার হরিণ সেটা যে কেউই বুঝবে। অনেকেই কাঠখড় পুড়িয়েও চাকরী পায়না, আর আমি একটু চেষ্টাতেই পেয়ে গেলাম। সবই কপাল।

কপালে আছে নতুন বৌকে বাড়িতে রেখে চাকরী করতে সেই সূদূর ঢাকা হতে সুনামগঞ্জে আসতে হবে। কে জানতো?

পরিবেশ সংরক্ষণ বিভাগের চাকুরী। পোস্টিং করেছে সুনামগঞ্জে। চাকুরী কী আর নতুন বৌ মানে।

সদ্য বিয়ে করা বৌয়ের হাতের মেহেদী এখনো শুকায়নি। মধুচন্দ্রিমা ও হয়নি।

বিয়ের কয়েকদিন পরই চলে আসলাম।সকালে বউয়ের মুখটা মনে পড়ছে। গোসল করার পর ভেজা চুল মুছতে মুছতে অঞ্জনা আমাকে ডেকে তুলে চায়ের কাপটা হাতে দিতো। সকালের সেই কড়া লিকারের চায়ের মতই অঞ্জনা, শরীর মন চাঙা করে দেয়। বিদেয় জানাতে গিয়ে অঞ্জনা যখন খানিকটা কেঁদে ফেললো, তখন মনে হল কী দরকার চাকুরীর! অঞ্জনাকে নিয়েইতো দিনরাত পার করা যাবে। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে।

আহ! আরেকটা সকাল কাটাতে পারতাম।

ভাবতে ভাবতে অন্ধাকারের ভিতর পাহাড় বেয়ে কখন যে উপরে উঠে আসলাম, টেরই পায়নি।

ঘোর ভাঙলো গাইডের কথায়।

স্যার আফনের জায়গাত আইছেন

সরকারি বাংলো। নাম

“যাদুকাটা কটেজ”

টাকা দিয়ে বিদেয় করি গাইডকে। গেটের সামনে কড়া নাড়তেই কিছুক্ষণ পর বুড়োমত একটি লোক গেট খুলে দিলো। পরিচয় দিতেই নিজের পরিচয়টা দিয়ে ব্যস্ত হয়ে হাতের ব্যাগ সমেত উপরে নিয়ে গেল আমাকে।

_আসলে স্যার, আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলাম, এইজন্যে আর আপনাকে আনতে যাইতে পারিনাই। আসতে কোন সমস্যা হয়নাইতো আপনার?

বাংলোর কেয়ারটেকার মঈন চাচাকে বলি, _ জ্বী- না চাচা। কোন কষ্ট হয়নি।

আমাকে রুমে দিয়ে ফিরে গেলেন নীচে। আমি ওয়াশরুমে ঢুকে নিজেকে খানিকটা ফ্রেশ করে হাত মুখ মুছতে মুছতে রুমে ঢুকতেই মঈন চাচা এসে পড়লেন,

_নীচে আসেন স্যার, খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম নিবেন। চব্বিশঘণ্টার জার্নিতো আর কম সময় নয়।

নীচে খেয়েদেয়ে এসে শুয়ে পড়লাম বিছানায়। খানিকপর মনে হল, দরজাটা বন্ধ করিনি। দরজা বন্ধ করতে গিয়েই শুনলাম সুরটা। গুণগুণ সুরে কে যেন রবীন্দ্রসংগীত গাইছে,

মাঝেমাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাইনা…

খানিকটা চমকে উঠলাম। অঞ্জনার মত টান গলায়। বের হতে যাব, সুরটা নীচে নেমে গেল। হয়তো মনের ভুল ছিল। দরজা বন্ধ করে এসে শুয়ে পড়লাম। সারাদিনের ক্লান্তি জেকে বসলো শরীরে। ঘুমের ঘোরে তলিয়ে যেতে যেতে স্বপ্ন দেখলাম,

অঞ্জনা আমার পাশে বসে আছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে। আহ!

ঘুমের মধ্যে ঘুমের স্বপ্ন দেখা। ভারী অদ্ভুদ…।

*

সকালে যখন ঘুম ভাঙলো তখন সাতটা বাজে। সূর্য্যের ক্ষীণ অথচ তীক্ষ্ণ আলো জানালার ফাক দিয়ে এসে আমার উদোম শরীরে এসে পড়তেই আরাম ভর করলো যেন। চনমনে মন নিয়ে উঠে পড়ি। ফ্রেশ হতেই মঈন চাচার গলা পাওয়া গেল।

_স্যার, নীচে আসেন। সকালের নাস্তা রেডি।

দরজা খুলে বারান্দায় দাড়াতেই বিরাট বিস্ময়ে আমার চোয়াল ঝুলে পড়লো। আমি কী অন্য কোথাও চলে এসেছি?

গতকাল রাত্রিরে অন্ধকারে সবকিছু নিমজ্জিত ছিল বলেই কিছু চোখে পড়েনি।

চোখের সামনে খরস্রোতা নদী যাদুকাটা। সকালের সোনা রোদে যাদুকাটার চরের বালিগুলো স্বর্ণরেণুর মত চিকচিক করে নিজের ঔজ্জ্বল্যতা প্রকাশ করছে। নদীর পানিতে সকালে রোদ্দুর পড়ে চিকচিক করছে রূপোর টুকরোর মত। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। যাদুকাটার ওইপাড়ে গ্রাম। গ্রামের সীমানা শেষ হতে মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণী। পাহাড়ের চূড়ায় ও রোদ্দুরের ছোঁয়ায় যেন জ্বলসে যাচ্ছে। অপূর্ব দৃশ্য।

আমি যেখানে দাড়িয়ে আছি সেটাও পাহাড়ের উপর।

পাহাড়ের উপরে বাংলোটা বানানো হয়েছে।

বাংলোর বামপাশের বারান্দায় দাঁড়াতেই দেখতে পেলাম, পাহাড়ের উঁচুনিচু জমির উপর কৃষ্ণফলের বিরাট বাগান। আর পাহাড়ের পাদদেশে সমতল ভূমির ক্ষেত আর ক্ষেত। মুগ্ধতার রেশ কাটতে না কাটতেই মঈন চাচা এসে বললেন,

_ স্যার আইসা পড়েন।

টনক নড়লো।পেটে এখনো কিছু পড়েনি। নিচে এসে পেটপুরে নাস্তা করে উপরে চলে আসলাম। বারান্দায় একটা চেয়ার নিয়ে বসে বসে সৌন্দর্য্য দেখতে লাগলাম মেঘালয় পাহাড়ের আর যাদুকাটার ঝিলিক দেওয়া বালুকারাশির।

আহ! অঞ্জনাকে নিয়ে আসলে বেশ হত। হানিমুনটাও হয়ে যেত। আর একাও থাকা লাগতোনা।

সময় কেটে যেত তরতর করে।

উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বৌ নিয়ে আসা যায় কীনা? তিনি মানা করে দিলেন।

বাংলোটা নতুন হয়েছে। তাই মাসছয়েক পর নিয়ে যেতে পারবে। এখন থাকার ব্যবস্থা নেই।

থাকার ব্যবস্থা না থাকলে নাই হতো। এই ছোটখাটো খুপড়িতেই নাহয় কাটিয়ে দিতাম।

স্বপ্ন ছিলো,

পাহাড়ের উপরে নিজের এইরকম একটা ঘর থাকবে। বারান্দায় বসে দুজনে কাঁধে কাধ রেখে অবলোকন করতে থাকব নৈসর্গিক সৌন্দর্য। এইতো চাই।

ভাবনায় ছেদ পড়লো। নীচ তলা থেকে আবার সেই গতকাল রাতের গানের গলা শোনা যাচ্ছে।

“”আজিকে এই সকালবেলাতে

বসে আছি আমার প্রাণের সুরটি মেলাতে ॥

আকাশে ওই অরুণ রাগে মধুর তান করুণ লাগে,

বাতাস মাতে আলোছায়ার মায়ার খেলাতে ॥””

বেশ মিষ্টি গলা। রবীন্দ্রসংগীত যে কেউ গাইতে পারেনা। গলায় সুর লয় টান থাকতে হয়। গানের গলা শুনে বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠলো..

বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীচে উকিঝুঁকি মারলাম। নাহ, কাউকেতো দেখা যাচ্ছেনা।

নীচে এসে ঘুরেফিরে কাউকে দেখলামনা। রান্নাঘরটায় দেখলাম, মঈন চাচা থালাবাসন ধুচ্ছে। ভাবলাম, একবার জিজ্ঞেস করি। কিন্ত করিনা। ভেতরে সুরটি চিনচিনে দানা বাধে।

উপরে চলে এসে রুমে ঢোকে ব্যাগটা বের করলাম। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পোশাকাদি বের করে গুছিয়ে নিতে চাইলাম ঘরটাকে। কিন্ত ঘরটা এমনিতেই গুছানো যে আমার আর গুছানোর প্রয়োজন পড়েনা।

প্রথম দিনটা রুম আর বারান্দা করতে করতেই কেটে গেল। বিকেলে অঞ্জনার সাথে কথা হল। ওর গলায় বিষাদের সুর বাজে। আমি টের পাই। কিন্ত কিছু করার নেই অঞ্জনা। চাকরী বাঁচাতে হবে। নাহলে, তুমিও আমার ঘর করবেনা।

রাতটাও আগের রাতের মত কাটে। শুধু মাঝরাত্রিরে ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ।

ক্ষীন কন্ঠে গুণগুণ করা সুরটা কানে বাজে। কেমন টান লাগে? যেন মনে হয় সুরটা আমায় কাছে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।

জানালার পাল্লাটা খুলে যায় শব্দ করে। চমকে ওঠি। বিছানা থেকে নেমে জানালাটা বন্ধ করে দরজা খুলে বারান্দায় যাই। কাউকে দেখতে পাইনা। গানের সুরও শোনা যাচ্ছেনা। বাতাসের হিস হিস করে ওঠছে কানের পাশে।

মনের ভিতর কী একটা হচ্ছে,

কী যেন দলা পাকিয়ে ওঠছে।

*

কয়েকদিন অফিসের কাজ করে একদিন সকালে নাস্তা করার ফাকে মঈন চাচাকে বলি, এলাকাটা ঘুরে দেখতে চাই। এখনতো সেইরকম কাজ শুরু হয়নি। আরো ঢের দেরী। কাউকে সঙ্গে দিলে ভালো হয়। নতুন এলাকা।

মঈন চাচা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। মিলু বলে উচ্চস্বরে কাকে যেন ডাকলেন।

এবাড়িতেতো মঈন চাচা ছাড়া আর কাউকে দেখিনা। অপরিচিত মেয়েদের প্রতি অসস্তি লাগে আমার। শুধু অঞ্জনা ছাড়া আর কোন মেয়ের সাথে সহজ হতে পারিনি এখনো।

যে লো বেরিয়ে আসলো তাকে দেখে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। মিলু নামের নামের ছেলেটি এক ষোল বছর বয়সী কিশোর। শ্যামলা রঙের হালকা দেহগড়ন। তেমন সুন্দর না।

তবে মুগ্ধ হলাম তার চোখ দেখে। যুক্তভ্রযুগলের নীচে তার ডাগর ডাগর চোখে রাজ্যের আকর্ষণ আছে। এক অদম্য আকর্ষণে তার চোখে চোখ রাখতে হয়।

আমি চাতকের মত তাকিয়ে রইলাম তার আঁখিতে, যেন একফোঁটা জলের আশায়। মঈন চাচার ডাকে বাস্তবে আসি।

_ও আমার পুলা মিলু। এইবার কলেজে পড়তাছে।

আমি উনাকে থামিয়ে বলি, বলতে হবেনা। একসাথে যখন ঘুরব জেনে নেব।

আমার কথা বলতে হয়না। বুঝে নেয় হয়তো।

খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে মিলুকে নিয়ে বাংলো ছেড়ে রাস্তায় নামি। মনে হচ্ছে, খাঁচা ছেড়ে আকাশে উড়াল দিলাম। অঞ্জনার ফোন পেয়ে কেমন বিষাদ লাগে। বাংলোর প্রাঙ্গনে ঝাঁকড়া, সবুজ পাতাওয়ালা বাতাবি আর কমলালেবুর গাছগুলো পেরিয়ে এসে পাহাড়ের আকাবাকা রাস্তায় নামি।

আমাদের মধ্যে কথা হয়না। ও সামনে এগিয়ে যায়, আমি ওকে অনুসরণ করি। ও আমাকে জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবেন?

তোমার এলাকা। যেখানে ইচ্ছে সেখানে নিয়ে যাও,

শুধু বিপদেআপদে না ফেললেই হল।

আমি ওর সাথে রসিকতা করি। ও পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে নীচে নেমে যাদুকাটার পাড়ে নিয়ে যায়।

ত্রিমুখী সেই নদীর এক দিক দিয়ে চর। সেই চর দিয়ে এইপার ওইপার যাতায়াত করা লোকেরা।

সকালের রোদের স্পর্শে হালকা গরম হওয়া বালিতে হাটতে বেশ ভালো লাগে।

চর পেরিয়েই লাল সমুদ্দুরের সামনে এসে যেন দাড়াই। শিমুলবন। মিলু আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় শিমুলবনের ভিতরে। আমি মুগ্ধ হই বাগানের রূপ দেখে।

এই দুপুরের রোদে শিমুলবন যেন স্বর্গীয় হয়ে ওঠে। আগুনের লাল হলকা যেন বাগানের মাথায় লেগে যায়, ফাগুনের আগুনে ধিকধিক করে জ্বলছে শিমুলবন।

সারিসারি শিমুল গাছের নীচে আবার বাতাবি লেবুর ঝাড়। লেবু পাতার গন্ধ আর শিমুলের সৌন্দর্য্যে যেন নেশাগ্রস্থ হওয়ার অবস্থা।

মিলুকে ধন্যবাদ দেই। মুচকি হেসে অন্যদিকে চোখ ফেরায়। আমি ওর হাসির কারণ ধরতে পারিনা।

বনের মাঝখানে ওয়াচ টাওয়ারের উপর নিয়ে ওঠায় আমাকে। ওখানে যেন আরেকবিস্ময় অপেক্ষা করছিলো। ওয়চটাওয়ারে ওঠে শিমুলবনকে যেন আর গাছ মনে হয়না, মনে হয় আগুনের গালিচা পেতে রাখা হয়েছে। লাল রঙা সেই আগুনের গালিচায় ছোয়া লাগলেই পুড়ে যাবে দেহমন।

ওইপাশের নীল রঙা পানির যাদুকাটাকে মনে হয়, একটা বড়সড় নীল রঙা দড়ি। ধূ ধূ বালির চরকে মনে হয় সাদা চাদর। সেই চাদরে লাগানো রয়েছে অসংখ্য মাণিক্য। সূর্য্যের আলোতে মাণিক্যগুলো জ্বলমল করছে। এক অভাবনীয় দৃশ্য।

চোখ যায় মিলুর দিকে, ও মুগ্ধ হয়ে দেখছে। আর আমি ওকে দেখছি মুগ্ধ হয়ে। ওর চোখ। আর মুগ্ধ হওয়া চোখও নেশাগ্রস্ত করার মত। যেন অঞ্জনার চোখের আদলে বানানো। অঞ্জনার মত ওর চোখে এমন মায়া কেন? আচ্ছা, এই আগুনের গালিচা, মাণিক্যের চাদর,আর নীল যাদুকাটা থেকে কী এই অঞ্জনার চোখের মত মিলুর চোখের চাহনীর সৌন্দর্য বেশী নাকী ওগুলোর। আমি দ্বিধায় পড়ি। কখনো মিলুর চোখের কাছে ওগুলো তুচ্ছ মনে হয়।

আমি দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাই। শিমুলবাগান পেরোলেই বাঁশবন। বসন্তের নতুন পাতা গজিয়েছে বাঁশবনে। হঠাৎ কানে বাজে সেই গলার সুর,

“আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,

এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়॥

সখীর হৃদয় কুসুমকোমল –

কার অনাদরে আজি ঝরে যায়!

কেন কাছে আস’, কেন মিছে হাস’,

কাছে যে আসিত সে তো আসিতে না চায়॥”

মিলু গান গাইছে। আমার চোখের সামনে ও আমার দিকে চোখ ফেরায়।

আমি আবারো মুগ্ধ হই, ওর দৃষ্টিতে চোখ রাখতে বাধ্য হই। ওর প্রতি অন্তর থেকে কেমন একটা টান অনুভব করি। যেরকম টান অঞ্জনার প্র‍তি লাগে। বুকের বামপাশে চিনচিনে ব্যথা ওঠে। আমি কি ওকে অঞ্জনা ভেবে ভুল করছি?

মিলুর চোখের চাহনীতে অঞ্জনার কথা মনে পড়ে আবার। ওয়াচ টাওয়ারের নীচে নেমে আসি।

বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে। মঈন চাচা চিন্তা করবেন ভেবে মিলুকে তাড়া দেই।

চলে আসি বাংলোয়। সেদিন রাত্রিরে আর ঘুম হয়নি। সারাক্ষণ অঞ্জনার নেশায় ছটফট করি।

মন যে কি চাইছে বুঝে ওঠতে পারিনা।

ভাঙাভাঙা দু:স্বপ্নের ঘুমে কেটে যাচ্ছে রার। ভোর রাত্রিরে চোখে তন্দ্রা নামে।

*

ঘুম ভাঙতেই দেখি মিলু টেবিলে নাস্তা রেখে বসে আছে চেয়ারে। আমাকে জাগতে দেখে বলে ওঠে,

যাক ঘুম ভাঙলো আপনার। কালকের হাটাহাটিতে দেখছি আপনার শরীর ভেঙে পড়েছে।

আমি ওর দিকে চেয়ে হাসি। বিছানা থেকে নেমে ফ্রেশ হয়ে আসি। ওর সামনে বসে নাস্তা খাই। ও তাকিয়ে দেখে।

টুকটাক কথা হয়। ওর কথা শুনে পরিপক্ব লোকের মত মনে হয়। কখনো মনে হয়নি ও একজন কিশোর। আশেপাশে বন্ধুবান্ধব কেউ নেই। ওর বাবা আর ও একাই থাকে এই কটেজে। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম ওর মধ্যে কিশোরের চঞ্চলতা নেই। হয়তো নি:সঙ্গতার ঘুণে খাওয়ায় চঞ্চলতা কেটে গেছে। ও আমাকে ধন্যবাদ দেয়। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি,

“কেন?

আপনার সাথে গতকাল ঘুরে আমার অনেক ভালো লেগেছে সেজন্য।

~আমারো অনেক ভালো লেগেছে মিলু।

রাজ্যের কথা হয় তার সাথে৷ একদিনেই ওকে বেশ বন্ধুর মত বানিয়ে ফেলি। কেমন প্রকৃতির মত খোলামেলা সে। সেজন্যি বোধহয়। যদিও আমার চেয়ে অনেক ছোট। আমার খাওয়া শেষ হয়। ও এটো থালাবাসন নিয়ে নীচে চলে যায়। আবার আমি একা হই। একটা সিগারেট ধরিয়ে সুখধোয়া উড়াতে উড়াতে কল্পনা করি শিমুলবনে হাটছি। আমি আর অঞ্জনা। পাশাপাশি। ওর কোমল হাত আমার মুঠোয় ধরে ওকে টেনে নিয়ে যাই বনের গভীরে। লেবুগাছের ঝোপঝাড়ে। চিন্তায় ছেদ পড়লো রিংটোনে।

অঞ্জনার ফোন। ফোন ধরি, হালকা কথাবার্তা হয়। কিন্ত

ভেবে অবাক হই, এতক্ষণ পর্যন্ত অঞ্জনা আমার মনে ছিলনা। শুধু আবছায়া ছিলো। বারান্দায় গিয়ে বসি,

দূরে যাদুকাটার জলরাশিতে সূর্য্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে চিকচিক করছে। মেঘালয়ের পাহাড়ের উপর শুভ্র মেঘেরা এসে বাসা বাধছে।

আমায় কল্পনা সুখে পেয়ে বসে।

কল্পনা কাটাতে অফিসরূমে যাই। নীচতলায় অফিস রুমে টুকটাক দরকারী কাজ করতে হবে। চাকরী করতে এসেছি যে।

কাজ করতে করতে সময় কেটে যায়।

বাইরে থেকে গলা খাকাড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকে মিলু।

_আজকেই কি অফিসের কাজেই ব্যস্ত থাকবেন?

জিজ্ঞেস করে।

~এখানে আর অফিশিয়াল কাজ কীইবা আছে। এই একটু কাজ করছিলাম। কেন? আজকেও বেরোবে নাকী মিলু?

ও একটু লজ্জা পায়। মিনমিনিয়ে হু বলে মাথা উপর নিচ দোলায়।

আমি বলি, আচ্ছা। সে চলে যায়। কিন্ত

কাজ বুঝতে বুঝতে সন্ধ্যে নামে, সেদিন আর বের হওয়া উঠেনা।

রাত্রিরে আর মিলুকে আশেপাশে দেখতে পাইনি। খাওয়ার সময় নীচে গেলাম, খাবার টেবিলেও দেখলামনা। ভেতরটা কেমন অস্থির লাগছে। ছেলেটা কোথায় গেল? মঈন চাচাকে জিজ্ঞেস করিনা।

ছটফট ভাব নিয়েই ঘুমাতে যাই। মিলুর অনুপস্থিতিতে অঞ্জনাকে মনে করিয়ে দেয়।

অঞ্জনা’র কল আসে। টুকটাক কথায় হালকা প্রশান্তি পাই। কথা শেষে ফোন অফ করিয়ে ঘুমিয়ে যাই।

*

সকালের রোদে চিড়বিড় করে ওঠে শরীর। জানালাটা এই সাঝসকালে কে খুললো, চোখ টিপটিপ করে তাকিয়ে দেখি, মিলু।

জানালা খুলে আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দেয়। ওর হাসিতে অঞ্জনার মায়া। সেই মায়াকে ঘন্টা বানিয়ে বুকের ভিতরে কে যেন ঘন্টা বাজায়।

~অবশেষে সাহেবের ঘুম ভাঙলো, বলে ওঠে সে।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে ভদ্রতার হাসি দেই।

জিজ্ঞেস করি, গতকাল কোথায় ছিলা? খাবার সময়ও পেলাম না, রুমেও আসলেনা।

~কেন আসব? আপনিতো ব্যস্ত মানুষ।

ওর কন্ঠে অভিমানের আক্ষেপ প্রকাশ পায়। অবাক লাগে, অভিমানের ধরনটাও অঞ্জনার মত।

~তুমি দেখি অভিমান করে বসে আছো।

ও কিছুটা লজ্জা পেয়ে এড়িয়ে গিয়ে বলে,

~হ্যা..নেন। চা ঠান্ডা হয়ে এলো।

চায়ের কাপ এগিয়ে দেয় সে। চা খেতে খেতে বলি,

~আজ যাবে?

~কোথায়?

~ঘুরতে।

~না, আজকে আমার সময় নেই।

অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে।

~তুমিও দেখছি ব্যস্ত।

~আপনার কাজ থাকতে পারে, আমার কাজ থাকতে পারেনা।

বুঝলাম, রাগ পড়েনি এখনো। চায়ের কাপটা ওর হাতে দিতে দিতে খানিকটা অধিকার ফলিয়ে বলি, সময় থাকুক কিংবা না থাকুক। যেতেই হবে তোমাকে।

ও ফিক করে হেসে দেয়। মুখ ভেংচে বলে,

আমি আপনার ক্রীতদাস না৷ দৌড় মেরে চলে যায় সে। আমি সিড়িতে ওর দৌড়ের দুপদাপ শব্দ শুনি।

চঞ্চল সেই শব্দ শুনতে বেশ ভালো লাগে। একেবারেই বাচ্চাদের মত ব্যবহার৷ মেয়েদের মত রাগ অভিমান ওর প্রতি অঞ্জনার টান বাড়িয়ে তুলে।

দুপুরবেলা স্নান করে রেডি হয়ে নীচে যাই। মিলুকে দেখলাম বাতাবিলেবুর সাথে রঙ্গনের ঝাড়টায় পানি ছিটাচ্ছে।

কাছে গিয়ে বলি, যাবেনা?

যাবনা।

আমি ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে আসি রাস্তায়। ও বাধা দেয়না। আমি জিজ্ঞাস করি, আজ কোন দিকে আমরা?

জাহান্নামের দিকে।

ওর কাধে হাত রেখে বলি,

দু:খিত। আসলে কাজ বুঝতে বুঝতে কোনদিকে সময় গিয়েছে টেরই পাইনি। বুঝইতো, নতুন চাকরী।

ও আবার ফিক করে হেসে দিয়ে বলে,

হয়েছে ভাই! কৈফিয়ত দিতে হবেনা।

তারপর দুজনে দুপুরের রোদ্দুর গায়ে মেখে পশ্চিম পানে ছুটে যাই পাহাড়ী রাস্তা ধরে। ছোটবড় পাহাড়ী গাছে আচ্ছন্ন হয়ে আছে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া রাস্তা। রাস্তার পাশে কোথাও সবুজ ঘাসের উঁচুনিচু গালিচা। কখনো গাছগাছালি।

পাহাড় থেকেই দেখা যায় আরো পাহাড়ের সারি। ওখানে রয়েছে কৃষ্ণফলের, কাঠাল আর আম, কুলের বাগান। সব কটা গাছেই ভাবী সন্তানের আগমনের ইঙ্গিত। অর্থাৎ আমের মুকুলে, কাঁঠালের ভ্রুণে ছেয়ে আছে বাগাব।সন্তান বরণ করার জন্যই বোধহয় প্রকৃতি নিজেকে বসন্তে ঢেকে দিয়েছে।

মিলুকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, জায়গাটার নাম ‘কড়ইগড়া”।

পাহাড়ের গা ঘুরে এঁকেবেঁকে নামতে নামতে মনে হয়, এইতো সামনে হয়তো পথটা শেষ হয়ে গেছে। কিন্ত পথ শেষ হয়না। মিলু ছেলেটার সাথে হেটে যাই দীর্ঘপথ। পাহাড়ি পথগুলো অসমান। ক্লান্তি লাগেনা। বরং বেশ ভালোই লাগে।

একেবারে পাহাড়টার শেষ প্রান্তে গিয়ে থামে সে, যেখানে আবার ঢালু হয়ে নীচে নেমে গিয়েছে রাস্তা।

সে আমাকে নিয়ে একটা উচু ঢিবিতে বসে।

আমি ওর হাত ধরে বসে পড়ি পাশে। দুজনেই ক্লান্ত। তখন সূর্য্য অস্ত যায়। সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে বলি, অপূর্ব। এতো নৈসর্গিক দৃশ্য। সূর্যাস্তের রক্তিম আভা দুজনের গায়ে মাখি বেশ করে। মিলুর দিকে তাকাই।

ও তাকায় আমার দিকে।

চোখে চোখ পড়ে। কিন্ত কথা হয়না।

ওর চোখের মণিতে আমি সূর্য ডুবা দেখি, কিন্ত ওখানেও যেন অঞ্জনার ছায়া দেখতে পাচ্ছি। সূর্যাস্তের সাথে আমিও অতলে ডুবে যাচ্ছি ওর চোখের চাহনীতে।

দুজনে কাছাকাছি। অঞ্জনাকে মনে করে আমার ঠোট কেপে ওঠে। কথা বলতে পারিনা। মিলু আমার কাধে ওর মাথা রেখে হেলান দেয় শরীরে। সূর্যাস্ত দেখতে থাকে থাকি দুজনে। ধীরে ধীরে

সূর্য তখন দূর পাহাড়ের চূড়ায় অস্ত গিয়েছে।

হঠাৎ মিলুর টানে সম্বিত ফিরে। ফিরে আসি বাংলোয়। আমি সম্মোহিতের মত আসি। ঘোর লেগে থাকে চোখে মনে।

*

পরপর দুদিন আবার কাজে লেগে থাকি। অঞ্জনার সাথে খুব কম কথা হয়েছে। ওর কন্ঠে আমাকে না পাওয়ার অভিমান। কিন্ত আমার মনে লাগেনা। কার যেন ছায়া পড়ে আছে মনে। সরাতে পারিনা শতচেষ্টাও। নিজের মানসিক পরিবর্তনে অবাক হউ। আমার চিন্তায় শুধুই সেই ছায়াটা বিস্তার করছে, অঞ্জনা সেখানে ফিকে হয়ে আসে। অপরাধবোধ লাগে। মনে প্রশ্ন জাগে,

ছায়াটা মোহ নাকী এটাই সত্যি?প্রতিদিনকার অফিসের কাজ শেষে রাতে রুমে ফিরলেই দেখি মিলু খাবার নিয়ে বসে আছে। ফ্রেশ হয়ে বসি খেতে। খেতে খেতে মিলুর কথা শুনি।

ওকে প্রথম প্রথম মনে করেছিলাম চুপচাপ। আসলে ও চুপচাপ নয়। বেশ কথা বলতে পারে সাজিয়েগুছিয়ে। ওর কথা শুনতে আমারো ভালো লাগে। বিরক্ত লাগেনা। খাওয়া শেষে ও চলে যায় এটোবাসন নিয়ে। আমি ঘুমাই। কখনোবা গভীর রাত অবধি আলাপ বাড়ে।

এভাবেই কেটে যায় মাসে। মাঝেমধ্যে ঘুরতে যাই নদীর চরে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে

একরাতে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে গেছি, মাঝিরাত্রিরে দরজায় ঠোকা পড়ে। এত রাত্রিরে কে আসবে? মিলু? মঈন চাচা? কিন্ত এই অসময়ে।

ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দেখি, মিলু দাঁড়িয়ে আছে। আমি বলতে যাব, ও আমার ঠোটে ওর আঙুল ঠেকায়। হাতে হ্যাচকা টান মারে। আমি তাল সামলাতে না পেরে ওর উপর পড়ে যাই। ও ঝাকি দিয়ে আমাকে সোজা করে। তারপর নীচে নিয়ে আসে। ফকফকা জ্যোৎস্নায় আকাশ, বাতাস পাহাড় ভেসে যাচ্ছে। আকাশে তাকিয়ে দেখি ভরাট চাঁদ। পূর্ণিমাতিথি চলছে। বাংলোর সামনে যে রাস্তাটা সোজা নীচে নদীর পাড়ে নেমে গেছে,

সেই রাস্তা দিয়ে নদীর পাড়ে নিয়ে গেল।

আমি বুঝতে পারছিনা ও কী করতে। এক নিষিদ্ধ অনুভূতিতে ভেতরটা ভরে যাচ্ছে। ঠান্ডা বাতাসে ঠোট খানিকক্ষণ পর পর কেপে ওঠছে। ও আমাকে নিয়ে পাড়ে বেধে রাখা ডিঙি নৌকায় ওঠে। তারপর বাধন খুলে বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকা ভাসিয়ে দেয় নৌকা।

আমি ওর ব্যবহার দেখে থমকে আছি। এতটুকু ছেলের কী সাহস! সে নৌকা ভাসিয়ে নিয়ে যায় মাঝনদীতে।

চারিদিকে বড় বড় পাহাড় সাড়ির মাঝে এই নদীর মাঝে ছোট ডিঙি নৌকায় নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হতে থাকে। চাঁদ যখন মাথার উপর এসে উঠলো।

যেন জ্যোৎস্নার প্রকোপ বেড়ে গেল। জোছনার ফিনিক ফুটে ছড়িয়ে গেল আকাশে। যেন কিছুটা ঝরে পড়লো নদীতে। নদীর জলে জ্যোৎস্নার ছটায় মনে হল রূপা ঝিকঝিক করছে নদীতে। হাত বাড়িয়ে নদীর জলে চাঁদ ধরতে যাই, ধরতে পারিনা। হাত নিমিষেই পানির নীচে চলে যায়। রাগ উঠে। হাত দিয়ে এলোমেলো করে দেই পানিকে। চাঁদেরহাট ভেঙে শতটুকরো হয়ে যায়। দেখে ভালো লাগে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকাই মিলুর দিকে। ছেলেটা এত ভালো কেন? প্রকৃতিকে এত কাছে থেকে দেখে নিলো, আর আমি এত বড় হয়েও প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসতে পারিনি। নদীর নীল জলে এই জ্যোৎস্না রাত্রির চাদের প্রতিফলনে মুগ্ধ হই আমি। পাহাড়চূড়ায় জ্যোৎস্নার প্রলেপে চাঁদের পাহাড় মনে হচ্ছে। এত ভয়ংকর সুন্দর দৃশ্য সহ্য করতে পারিনা। চোখ বন্ধ করে ফেলি। মাথায় বা হাত দিয়ে চেপে ধরি। মিলু বৈঠা থামানো রেখে আমার কাছে আসে। আমি বসে আছি নৌকার গলুইয়ে। ও আমার সামনে বুকে হেলান দিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে বসে।। চাঁদ জোৎস্না দিয়ে যাচ্ছে। জ্যোৎস্না ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি চোখ বন্ধ করে বুকে ওর স্পর্শ অনুভব করছি। ওর স্পর্শে অঞ্জনাকে আবছায়ার মত মনে পড়ছে। আর ভাবছি, জীবনটা এত সুখের না হলেও পারতো। এমন জীবন পেলে শতজনম বাচার জন্য ফরিয়াদ করতাম খোদার কাছে। কিন্ত আমার চিন্তাধারণা উলটপালট হয়ে যাচ্ছে। একবার মনে হচ্ছে অঞ্জনা আমার বুকে হেলান দিয়ে আছে। একবার মনে হচ্ছে মিলু। এ কি মিলুরূপী অঞ্জনা, নাকী শুধুই মিল? সময় বয়ে যাচ্ছে, জ্যোৎস্নারা ম্লান হচ্ছে কিন্ত আমার ভাবনা ভালোলাগা ম্লান হয়না। আরো বেড়ে যাচ্ছে….

এক ভয়ংকর সর্বনাশ দিকে এগুচ্ছি। আমি প্রেমে পড়ে যাচ্ছি মিলুর সমস্ত চিন্তাভাবনা সমাজ সংসারকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে। ঠোট কাপছে ঠোট স্পর্শ করার জন্য। বুকে ঢিপঢিপ শব্দ বেড়েই চলছে। আমার উষ্ণ শ্বাস সামনে বসা মানুষটির ঘাড়ে পড়ছে। ও উচু হয়ে খানিকটা, ঠোট বাড়িয়ে দেয় আমার ঠোটের দিকে। যেন অঞ্জনা ঠোট বাড়িয়ে দিচ্ছে আমার দিকে। আমি তৃষ্ণার্ত শুষ্ক ঠোট দুটো ভেজাবার জন্য এগিয়ে দিচ্ছি….

*

যথাসম্ভব এড়িয়ে চলছি মিলুকে। আমিতো এমনটা চাইনি। কিন্ত বাস্তবটাও মেনে নিতে হবে।

আমরা সবাই বাস্তবের শিকার, বাস্তব অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। আমার উচিত হয়নি, নিজ স্ত্রী রেখে অন্যের সাথে মনের মিল করতে। তাও একটি ছেলের সাথে। মিলুও হয়তো বুঝতে পেরেছে খানিকটা।

সেদিনের পর আর কোন কথা হয়নি ওর সাথে।

আমি যে ওকে এড়িয়ে চলছি তা নয়, ওকে না দেখলে আমার অশান্তি লাগে।

হঠাৎ করেই যেন দূরে সরে যাচ্ছি মিলুর থেকে। আমার ভাবনারা আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। কিন্ত আমিতো মিলুকে ছেড়ে এক মুহুর্তও থাকতে পারছিনা।

কিন্ত আমিতো বাস্তবের জালে বাঁধা।

কিছু বলতে পারিনা। দুজনে দেখা হয় সিড়িতে উঠতে গিয়ে, কখনো ছাদে। মুখোমুখি হই, কিন্ত কথা বলতে পারিনা। এক অদৃশ্য দেয়াল আমাদের সামনে গড়ে উঠেছে। আমি আর সহ্য করতে পারিনা। কিন্ত কিছু বলতেও মুখে বাধে।

সেদিন সন্ধ্যারাত থেকে তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির প্রকোপে ঘর থেকে বের হওয়া দায়। সেদিন রাতে খাওয়া হয়নি আর। কেউ ঘরে খাবার এসে দিয়েও যায়নি।

আমি না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ি।

ঘুম ভাঙে ভোর সকালে। জানালা খুলে দেখি আকাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। পাহাড়ের চূড়াগুলো মেঘে ঢাকা। মনটাও খারাপ হয়ে আছে। মনের আকাশে মেঘ জমেছে।

গতকাল রাতে খাইনি। মিলু একটা খোঁজ পর্যন্ত নিলোনা। ভেবে ব্যথিত হই। কিন্ত মিলু আমার কে? আমার জন্যে ওর ভাবনা হবে কেন? নিজেকে বোকা লাগে। কিন্ত মনটা ছটফট করে।

খানিক পর দরজায় টোকা পড়ে। দরজা খুলে দেখি মিলু খাবার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। খানিকটা লজ্জা লাগলেও মনে বড় আনন্দ হয় মিলুকে দেখে।

আমাকে সরিয়ে টেবিলে খাবার রাখে সে। নিজমনে বলে,

“ক্ষিদা লাগলে নিজের খাইতে হয়। পরের দায় পড়েনি। এইযে রেখে গেলাম খাবার। খেয়ে নেয় যেন।”

পরোক্ষভাবে কথা বলে চলে যায় আমাকে এড়িয়ে, যেন আমাকে দেখতেই পায়নি। ওর ব্যবহার আমাকে হাসায়। ছেলেটা পারেও। মনটা কেমন আনন্দে ভরে ওঠে। কে যেন বলেছিল,

যেই কাজ তোমাকে আনন্দ জোগায়,

সেই কাজই নিজেকে করতে দাও। অন্যের কথায় নিজেকে গুটিয়ে ফেলবেনা। বাইরে শব্দ করে কোথাও বজ্রপাত পড়ে। বাইরে থেকে মিলুর গানের গলা শোনা যায়,

“কেন মেঘ আসে হৃদয়াকাশে,

দেখিতে তারে দেয়না”

খানিকপর তুমুলবর্ষণ হয়, আমি জানালার গারদে বসে পাহাড়ের চূড়ায় বৃষ্টির পতন দেখি। ভালো লাগে। মিলুর জন্যে শূন্যতা অনুভব করি। ইশ! সেদিন নৌকায় যেমন বুকে ঠেস দিয়ে মিলু বসেছিল, আজকেও যদি এইভাবে বসতো। ওকে বুকে নিয়ে বৃষ্টির পতন দেখতাম। আহ! নিজের প্রতি বিরক্ত হলাম। কেন যে মিলুর প্রতি দূর্ব্যবহার করলাম।

বৃষ্টির বর্ষণ কমে আসলে নীচে নেমে আসি। মিলুকে খুঁজতে থাকি। মঈণ চাচাকে বারান্দায় বসা দেখি। জিজ্ঞেস করলে বলে, নিজ ঘরে হয়তো বসে আছে। ওর ঘরে গিয়ে উকি দেই। কেউ নেই। টেবিলে একটা নোটপ্যাড পড়ে রয়েছে।

নোটপ্যাড টা হাতে নিলাম। যদিও অন্যের ব্যাক্তিগত জিনিস পড়া মানা। তারপরও নিজেকে সামলাতে পারিনা। নোট পড়ে ওর জন্যে গভীর মায়া অনুভব করি । প্রগাঢ় স্নেহে ওকে ভরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। আমি যেদিন এসেছিলাম সেদিন থেকে আজ অবধি প্রত্যেক টা কথা লিখা রয়েছে। ওর শেষের লিখাটা পড়ে কেন যেন নিজের প্রতি অপরাধবোধ জন্ম নেয়।

“কেন উনি আমাকে দূরে ঠেলে দিলেন। আমিতো উনাকে ভালোবাসতেই চেয়েছিলাম। উনি কেন আপন করে নিয়ে আবার দূরে সরিয়ে দিলেন। জীবনে কী যেন নেই মনে হচ্ছ। আচ্ছা, আমি যদি মরে যাই উনি আমাকে মিস করবেন”

বুক ফাটা হৃদয়ের হাহাকার যেন শুনতে পাই। পুরো কটেজ তন্নতন্ন করে খুঁজি। ওকে পাইনা। ছাদে যাই। গিয়ে দেখি ছাদের কার্নিশে পা দুলিয়ে আপন মনে গান গাইছে। ওকে চমকে দেয়ার জন্য পিছন থেকে ওর চোখ চেপে ধরি। কিন্ত নিজেই চমকে উঠি। ওর চোখের জলে গাল ভিজে রয়েছে। ও চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে দেখে আমাকে। তাড়াতাড়ি চোখ মুছে। ওর কান্না দেখে আমার মন খারাপ হয়ে ওঠে। ওর পাশে পা ঝুলিয়ে বসে যাই।

দুজনে পাশাপাশি বসে আছি। কিন্ত নিস্তব্ধ সবকিছু। বৃষ্টি হবার দরুণ সবুজ উপত্যকা, পাহাড়গুলো যেন সবুজে ভরে ওঠেছে আবার। আকাশ তখনো মেঘলা।

আমি ওর হাতটি ধরে আমার হাতের মুঠোয় রাখি। ও তাকায়না আমার দিকে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বলি,

এত জেদ কেন তোমার? মাফ করে দেয়া যায়না আমাকে। ও কিছু বলেনা। আমার ভীষণ কান্না পায়। কান্নাভেজা কন্ঠে বলি, তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লাগে মিলু। তোমাকে নিয়ে পাহাড়ের গহীন অরণ্যে হারিয়ে যেতে চাই, পূর্ণিমায় যাদুকাটার জলে তোমায় নিয়ে জ্যোৎস্নাবিলাস করতে চাই, শিমুলবনের নীচে তোমার ফাগুনের প্রেমে রাঙাতে চাই নিজেকে।

ও নিশ্চুপ থাকে। আমি আবার বলি,

তোমার রাজি না হলেও চলবে। শুধু আমার সঙ্গে থেকো। ও ফিক করে হেসে দেয়।

মেঘাচ্ছন্ন আকাশে মেঘ কেটে যায়। সূর্য্যের দেখা ওঠে। মেঘ ছাপিয়ে রোদ ভেসে আসে আকাশে। বৃষ্টির পর রোদ ওঠলে নাকী আকাশে রংধনু উঠে।

ও আমার বাহুকে ওর হাত দিয়ে চেপে ধরে। তারপর কাধে মাথা রাখে। আমি ওর কাধে হাত রেখে বুকে চেপে ধরি। আকাশে রঙধনুর দেখা মেলে। দুজনে আকাশে রংধনুর খেলা দেখি। ও বিড়বিড় করে বলে, তোমায় আমি খুব খুব ভালোবাসি।

আমি কিছু বলিনা। ওকে আরো বুকে চেপে ধরে সাতরঙা রঙধনুর সাথে আমাদের ভালোবাসাটা উজ্জ্বলিত হয়। আমরাও কল্পনায় আমাদের ভালোবাসাকে সাতরঙে সাজাতে থাকি।

আকাশে রঙধনু একসময় ফিকে হয়ে আসে। বাতাসে হারিয়ে যেতে থাকে রঙ। কিন্ত আমাদের ভালোবাসার রঙধনু উজ্জলতর হয়, রঙে রঙীন হতে থাকে ঠোটে ঠোট রেখে। চারপাশে পাহাড়সারি, আকাশে রংধনু, নীচে যাদুকাটার নীল জলরাশি রেখে ছাদে বসে ভালোবাসায় বুকে চেপে রাখি মিলুকে।

ওদিকে রঙ হারিয়ে যায় আকাশে। আকাশের রঙ হারানোর বেলায় মনের আকাশে ভালোবাসার রঙ ভেসে আসে। মিলুকে চেপে ধরি, মিলুও আমাকে চেপে ধরে থাকে….

___সমাপ্ত____ বি.দ্র. গল্পটি পরিমার্জিত এবং পূর্বপ্রকাশিত (বিহঙ্গ)

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.