রমিল -এক চিরন্তন মিলনের স্বাদ

লেখকঃনামহীন লেখকের প্রথম নিবেদন(নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)।

এক

রমিল আমার হাত দুটো চেপে ধরে রেখেছে ওর হাতের মধ্যে।

রমিলের শক্ত মুঠোর মধ্যে পড়ে আমার হাতে অসহনীয় যন্ত্রণা হতে শুরুকরেছে। ও আমার আরো সন্নিকটে আসার চেষ্টা করতে লাগলো। আমি রমিলকে দুরে সরানোর চেষ্টা করে ওকে বললাম,” কি করছিস? আমার হাতে প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে।”

রমিল আমার হাতদুটো আরও চেপে ধরে বলল,” আমার জানা নেই, আমি কি করছি! আমি শুধু এইটুকুই জানি, যখন থেকে তোমার সাথে আলাপ হয়েছে, যেদিন থেকে তোমায় দেখেছি, তোমায় ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই না। শুধু তোমাকেই অনুভব করতে থাকি। তুমি কিছু অনুভব করো না, যখন আমি তোমায় স্পর্শ করি? যখন তোমার কাছে আসি, তোমার সাথে থাকি, তুমি কোনো তফাত্ বুঝতে পারো না? তোমার এতটুকুও কি অনুভূতি নেই আমায় ঘিরে? সত্যি বলোতো, আমার সাথে দেখা হওয়ার পর তোমার জীবন কি একটুও বদলায় নি? সেদিনের দুর্ঘটনায় আমি আমার কথা চিন্তা না করে তোমার কথা চিন্তা করেছিলাম- যদি তোমার কিছু হয়ে যায় তাহলে আমি বাঁচবো কি করে?তোমার সাথে তিন মাস হলো দেখা হয়েছে-মাত্র তিন মাস।ভুলে যেতে পারি এই তিন মাস-শুরুকরতে পারি নতুন ভাবে জীবনটাকে – থাকতে পারি একা।কিন্তু সমস্যাটা হলো তোমায় ভুলবো কি করে? তোমার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো কিভাবে মুছে ফেলবো হৃদয় থেকে?”

“খুব ভালো হয়েছে এবারের সংলাপটা।এই সংলাপটা নাটকটির গুণগত মান আরও বৃদ্ধি করবে। সত্যিই খুব সুন্দর।তুই আর কলম একাকার হলে লেখা ভালো না হয়ে উপায় আছে?এবার হাতটা ছাড়। হাতটা বোধহয় ভেঙ্গেই গেল।তুইও এবার রিহার্সালের আয়োজন শুরুকর।সবাই এক্ষুনি এসে পড়বে। এসে যদি দেখে পরিচালক তার বন্ধুর সাথে গল্পে ব্যস্ত তাহলে হাস্যকর ব্যাপার হবে।”

এই বলে ওর হাত থেকে আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম।ওর মুখে অপ্রাপ্তি ও অনিচ্ছার একটা স্পষ্ট ছাপ।তা সত্ত্বেও আমার কথা মেনে নিয়ে স্ক্রিপ্ট আর সরঞ্জাম গোছাতে শুরুকরল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে সবাই আসতে শুরু করল। আধঘণ্টার মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক করে রমরমিয়ে নাটকের রিহার্সাল শুরুহলো। আমি একটু দুরত্বে একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়লাম। এবার প্রশ্নটা হচ্ছে আমি কে? সেই শুরুথেকে বকেই চলেছি। এটা তো সবে শুরু,আমি তো সেই শেষ পর্যন্ত বকেই যাবো। কারণ গল্পটা তো আমারই। আমি আসিফ। ভার্সিটির প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমি স্থানীয় হওয়ায় ভার্সিটির অধিকাংশ ছাত্রই আমার পরিচিত। তাই ভার্সিটিতে এসে নতুন করে বন্ধুত্ব পাতাতে হয়নি। সবার সাথে হাসি মজায় তিন মাস কাটানোর পর ভার্সিটিতে ভর্তি হলো রমিল- যার সাথে এতক্ষণ কথা বলছিলাম ও রমিল।রমিল ঢাকার একটা নাট্যদলের সংলাপের দায়িত্বে রয়েছে।নাটক নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকায় ভার্সিটির এবছরের নাটকের চিত্রনাট্য,সংলাপ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে রমিল।তবে তখন রমিল যে সংলাপটা শোনালো ওটা কোনো নাটকের সংলাপ নয়। কারণ ভার্সিটির নবীন বরণ অনুষ্ঠানে যে নাটকটি অভিনীত হবে তাতে কোনো দুর্ঘটনার দৃশ্য নেই। এমনকি নাট্যদলের আগামী যে নাটকগুলির সংলাপের দায়িত্বে রমিল রয়েছে তাতেও দুর্ঘটনার কোনো দৃশ্য নেই। আমি জানি ওগুলো রমিল আমাকেই বলছিলো কিন্তু ওর সাথে সম্পর্কে জড়ানোর কোনো অধিকার আমার যে নেই। কারণ আমি ওর জীবনে এলে আমার সাথে আরও কিছু অনিমন্ত্রিত সমস্যাও নেমে আসবে রমিলের জীবনে।

দুই

গল্পটা একটু শুরুরদিক থেকে শুরু করা যাক।ভার্সিটিতে তিন মাস ক্লাস হওয়ার পর কারও কারও মুখে শুনতে পাওয়া গেল কোনো এক ধনি পরিবারের ছেলে মোটা অঙ্কের ডোনেশন দিয়ে এতদিন ক্লাস হওয়ার পরে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। এই নিয়ে বেশ কিছু দিন মজা করা চলল। ক্যান্টিনে আড্ডা চলছে-সবাই গল্পে ব্যস্ত, আমরা সবাই হাসি ঠাট্টা করছিলাম, এমন সময় একটা ছেলে আমাদের ক্যান্টিনে প্রবেশ করল।সাথে সাথেই সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। অজান্তেই এগিয়ে গিয়ে তাকে আমার হাতটা দিলাম। আমার হাতটা ধরে তাড়াতাড়ি করে উঠে পড়ে ধন্যবাদ জানালো ছেলেটি। ছেলেটির দিকে বিভোর হয়ে তাকিয়ে রয়েছি। আমায় অনেক কিছু বলল কিন্তু কি কি বলল কিছুই বুঝতে পারলাম না। কোথায় যেন ডুবে ছিলাম।

ছেলেটির উচ্চতা প্রায় ৬ ফিট, ভরাট শরীর, চওড়া বুক, প্রশস্ত বাহু, মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, লম্বা নাক আর চোখের ভাষায় তীব্র পৌরুষত্ব – সব মিলিয়ে সুদর্শন এক যুবক। স্যোশাল মিডিয়ায় কোনো একজনের নিউজ ফিডে দেখেছিলাম, ‘এইরকম রূপবান কোনও ছেলে চোখে পড়লেই ফেইসবুকে এসে স্ট্যাটাস দেই, “ক্রাশ খাইলাম।” :3 ‘

ছেলেটির হাতের ছোঁয়ায় হুঁশ ফিরে পেলাম। ‘ভাইয়া কোথায় হারিয়ে গেলেন?’ তারপর তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর বুঝলাম ওই হল সেই ধনি পরিবারের ছেলে – নাম রমিল। একটা নাট্যদলের সংলাপের দায়িত্ব রয়েছে সে। বাবা ট্রান্সফার হয়ে এখানে এসেছেন – সঙ্গে ও আর ওর মা। কোনো রকম সমস্যা বা প্রয়োজনে সে যেনো আমার সাথে যোগাযোগ করে, এটা জানিয়ে তার থেকে বিদায় নিলাম। এরপর থেকে ভার্সিটির যেখানেই যাই, সেখানেই আমার আশেপাশে রমিলকে দেখতে পাই – বেশ কিছু দিনেই ওর প্রতি আমার মায়া জন্মে গেল। খুব উপভোগ করতে লাগলাম বিষয়গুলো। যখন ওকে দেখতে পেতাম না মনটা খুব খারাপ হয়ে যেতো, তখন খুঁজে খুঁজে ওর দৃষ্টির মধ্যে চলে যেতাম, যাতে সে আবার আমার আশেপাশে থাকতে পারে। শুধু রাগ হত একটাই – কোনোদিনও এগিয়ে এসে রমিল কথা বলত না।

তিন

কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের মঞ্চের দায়িত্ব এসে পড়ল আমার কাঁধে। রমিলের সাথে কথা বলার একটা সুযোগ পেয়ে ছুটে গেলাম ওর কাছে। ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখলাম রমিল আর মীরা, একসাথে কথা বলছে। মীরা প্রথম বর্ষের একজন ছাত্রী। এগিয়ে গিয়ে রমিলের কাঁধে হাত দিয়ে ‘Hi’ বললাম।

ও আমার দিকে ঘুরে তাকালো – ভূত দেখার মতো অবাক হয়ে আমায় বলল

-আমি কিছু বলিনি।

-কি বিষয়ে?

-তোমার,না মানে আপনার বিষয়ে।

কথাটা অর্ধেক রেখেই মীরাকে কিছু একটা আনার জন্য পাঠিয়ে দিল।আমি জিজ্ঞাসা করলাম,

-কি বলছিলে?

-কিছু না,আপনি হঠাত্ করে এসে গেলেন,তাই আচমকা দেখে ভুলভাল বলছিলাম।বলুন কি বলতে এসেছিলেন?

-তুমি আমায় তুমিই বলতে পারো,শুনতে বেশি ভালো লাগছিল।আমি তোমায় অল্প স্বল্প চিনি।আমি যেখানেই যাই তোমায় আশেপাশে দেখতে পাই।যাক আসল কথায় আসি, তোমার তো নাটক সম্বন্ধে ভালোই ধারণা আছে তাই না?

-হ্যাঁ, তা অল্প বিস্তর একটু আছে বলতে পারেন।

-আমি চাই এবারের নাটকের দায়িত্বটা তুমি নাও, যদি তোমার কোনো অসুবিধা না থাকে।

-অসুবিধা কিছু নেই।

তবে একা এতকিছু করব কি করে? -Chill! চার মাস সময় আছে, নিজের মত করে সবকিছু সাজিয়ে নাও।আর একা কোথায়? সবাই আছে। যা দরকার হবে আমায় বলবে, আমি মঞ্চের দায়িত্বে আছি।

-ঠিক আছে।

-Bye

-Bye.

এরপর বেশ কিছুদিন রমিলকে ভার্সিটিতে আসতে দেখছি না। মনটা খুব অস্থির করছে ওকে দেখতে না পেয়ে। আবার চিন্তাও হচ্ছে খুব ‘রমিলকে দায়িত্বটা দেওয়া ঠিক হয়নি বোধহয়। ওতো ভার্সিটিতেই আসছে না, এইভাবে নাটকটা হবে কি করে?’ আরও দুদিন পরে ফোনের শব্দে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। পুরো বারোটা বাজে।ফোনটা ধরলাম।

-হ্যালো, কে বলছেন?

-আমি রমিল বলছি। ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?

-না না বলো। আমার নম্বর কোথায় পেলে?

-মীরার থেকে। আসলে চিত্রনাট্য আর সংলাপ লেখায় ব্যস্ত ছিলাম, তাই বেরোতে পারিনি কোথাও। নিশ্চয়ই চিন্তা করছিলেন নাটকটা নিয়ে।

-না না তেমন কিছু নয়।

-চিত্রনাট্য সম্পূর্ণ হয়ে গেছে আর সংলাপও প্রায় শেষের দিকে। বাকিটা নাটকটা এগোবার সাথে সাথে হয়ে যাবে।কাল ক্যাম্পাসে দেখা করুন। সবকিছু দেখে একবার আপনি হ্যাঁ বললেই চরিত্রগুলোর জন্য অভিনয়ে ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীদের বাছাই শুরুকরব।

-ঠিক আছে কাল দেখা হবে তাহলে।

-শুভ রাত্রি

-শুভ রাত্রি।

চিত্রনাট্য ও সংলাপ পরিপক্ক হাতে লেখা, তা দেখেই বোঝা গেল। নাটকের কাজ এগোবার সাথে সাথে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও গাঢ় হতে শুরুকরেছে। রমিল আমায় তুমি বলতে শুরুকরেছে। খাওয়া আর ঘুমানো বাদে বাকি সময়টা একসাথে কাটাতে শুরুকরেছি।

ও রিহার্সাল নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আর আমি ওকে দেখতে ব্যস্ত থাকি। চোখাচোখি হয়ে গেলে এমন ভাব দেখাই যেন অনুষ্ঠান নিয়ে কত চিন্তিত। এখন মাঝে মাঝেই কোথায় যেন হারিয়ে যাই আমি। আবার রমিলের ধাক্কায় হুঁশ ফিরে পাই। ও যদি লাল রঙের কোনো টি-শার্ট পরে আসে তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই, ঘোরের মধ্যে বিভোর হয়ে থাকি। এমন সুদর্শন যুবকের সঙ্গে থাকলে যে কেউ প্রেমে পড়ে যাবে। তার মানে কি আমি রমিলকে ভালোবেসে ফেলেছি?

চার

সুন্দর কাটছিলো দিনগুলো। রাতগুলো ছিল স্বপ্নের রঙে রঙিন। আমাদের সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে উঠেছে।মাঝে মাঝেই মনে হয় সম্পর্কটাকে বন্ধুত্ব থেকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাই। কিন্তু ভয় হয় যদি এসবের কারণে আমাদের বন্ধুত্বটাও ভেঙে যায়। চিরকালের জন্য হারিয়ে ফেলি মনের মানুষটিকে। দুরে সরে যায় আমার থেকে।বাঁচবো কাকে ঘিরে – থাকবো কি নিয়ে – স্বপ্ন দেখবো কার – বিভোর হয়ে থাকবো কাকে দেখে? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই আমার কাছে। তাই ইচ্ছেগুলোকে বাক্সবন্দি করে ফেলে রেখেছিলাম ঘরের এক কোণে। আমি, রমিল আর তিনজন কাছের বন্ধু মিলে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম সন্ধ্যার সময়। রাতে ঘুরে সবাই মিলে আমার বাড়িতে চলে এলাম। এখন প্রায় দুটো বাজতে চলেছে। কেউ তাই সাহস দেখিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইলো না। একে তো এত রাত তারপর আবার সবাই কমবেশি ড্রিঙ্ক করেছে, বাড়ি ফিরলে কপালে দুঃখ আছে। তাই আমার বাড়িতেই রাতে থাকতে বললাম। আমি চাইছিলাম যাতে আজকের দিনটা যেনো আমি আর রমিল একসাথে থাকতে পারি। ও রীতিমতো নেশায় কাবু। ওরা দুটো রুমে যে যার মতো শুয়ে পড়ল। আমি আর রমিল আমার বেডরুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। অল্প আলোতে কাউকে এত আকর্ষণীয়, এত সুন্দর লাগতে পারে এই প্রথমবারের মত অনুভব করলাম। ওকে দেখতে দেখতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। আমাদের মধ্যের বন্ধুত্বে কখন যে ঘনিষ্ঠতা বাসা বাঁধলো বুঝতেই পারলাম না। ঘোরের মত লাগতে শুরুকরল সবকিছু। রমিলের ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য আমার ছিল না। কিছুক্ষণ সংযত হওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু জয়টা হল ভালোবাসার। রমিলকে শিরায় শিরায় অনুভব করতে শুরুকরলাম। সব বাধা সরিয়ে দুজনে একাকার হয়ে গেলাম । রমিল আমার কানের কাছে এসে বলল, ” তুমি এখন নেশায় রয়েছ – নেশা কাটলেই ভুলে যাবে আজকের মুহূর্তগুলো। কিন্তু আমি কি করে ভুলবো বলতো, আমি তো ড্রিঙ্ক করিনি। আমি তো শুধু অভিনয় করছিলাম যাতে তোমার কাছে থাকতে পারি, তোমায় একবার ছুঁতে পারি। যেদিন থেকে তোমায় দেখেছি, সেদিন থেকে তোমায় ভালো বেসে ফেলেছি। প্রথমে ভেবেছিলাম এটা ক্রাশ কিন্তু এখন ভালোবাসাই মনে হচ্ছে। এটা আমার দেখা সব থেকে সুন্দর স্বপ্ন যেটা সত্যি হতে চলেছে। আমি ভাবিনি তোমায় এই কথাগুলো কোনোদিনও বলতে পারব। কিন্তু তোমায় বললাম দেখো যখন তোমার হুঁশই নেই। আমি তোমায় অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তোমায় সামনাসামনি বলতে ভয় পাই যদি বন্ধুত্বটাও ভেঙে যায়।জানিনা এরপর কি হবে?তুমি আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবে কি না! কিন্তু আজকের রাতটা আমি তোমায় সম্পূর্ণভাবে অনুভব করতে চাই। যদি তুমি আমায় দুরে সরিয়ে দাও তবে এই রাতের স্মৃতিতে কাটিয়ে দেবো সারাজীবন। আমি তোমাকে ভালবাসি আসিফ। শুভ রাত্রি।” রমিল আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, মাঝে মাঝে কপালে চুম্বন এঁকে দিচ্ছে। স্বপ্নের মত লাগছে রাতটা। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই ওকে জানিয়ে দেবো যে আমিও মদ্যপ ছিলাম না। আমিও চেয়েছিলাম তুমি আমার কাছে থাকো সারারাত। আমিও তোমায় প্রথম দেখাতেই ভালো বেসে ফেলে ছিলাম। আমিও আমাদের বন্ধুত্বকে হারানোর ভয়ে তোমায় কিছু বলতে পারিনি।আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি। শুভ রাত্রি রমিল। রমিলের বুকে মাথা দিয়ে চোখ বুঝলাম।

পাঁচ

সকালে উঠে পাশে রমিলকে দেখতে না পেয়ে খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। ফোনটা খুলে দেখলাম রমিলের এসএমএস ‘আমি রিহার্সালে চলে এসেছি, ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠলে রিহার্সালে চলে এস।’ ফোনটা রেখে ফ্রেশ হলাম। রিহার্সালের জন্য বেরোলাম। রাস্তায় একটা ফুলের দোকান দেখতে পেয়ে কাল রাতের মুহূর্তগুলো মনে পড়ে গেল। একটা গোলাপ কিনে দোকান থেকে বেরিয়েই অভিকে দেখতে পেলাম। অভি আমার পাড়ার পরিচিত। কিছুটা মস্তান মত, তাই অতটা পছন্দ করিনা। এক বছরে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছে সে আমায় পছন্দ করে কিন্তু আমি কোনো রকম সম্মতি দিইনি। আমায় রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে আমার হাত থেকে গোলাপটা কেড়ে নিল আর ছিঁড়ে ফেলে দিল। ‘আমি চাই আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হোক। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল মাঝখান থেকে রমিল এসে আমাদের সম্পর্কটা নষ্ট করে দিলো। তোদের ঘনিষ্ঠতা রমিলের জীবন বিষিয়ে দেবে আমি বলে দিলাম।’

এই বলে অভি চলে গেল। অভির এসব কথায় মাথায় জেদ চেপে গেল। আমি রমিলকে ফোন করে বললাম আজ যেন রিহার্সাল বন্ধ রেখে আমার সাথে ঘুরতে বের হয়। ওর কন্ঠস্বর বলে দিল ওর মনের আবেগ। আমি ক্যাম্পাসের সামনে এসে ওকে ফোন করলাম। ফোনটা কেটে দিল। তারপরই কোথা থেকে এসে বাইকের পিছনে উঠে বসে পড়ল। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,’কোথায় নিয়ে যাবে বললে চলো।’ কিছুদুর যাওয়ার পর ওকে বললাম আমায় আরও চেপে ধরতে। ও আমায় ওর প্রশস্ত বাহুর মাঝে বেধে ফেলল। ওকে এবার অনুভব করতে শুরু করলাম। হঠাত্ মনে হতে লাগল এই মুহূর্তগুলোর যেন ফুরোনোর সময় উপস্থিত। ঘোর কাটলো একটা শব্দে, একটা গাড়ি পিছন থেকে আমাদের বাইকে ধাক্কা মারল। বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারালাম – সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।

আবঝা বুঝতে পারছি রমিল আমার মাথার কাছে বসে চিত্কার করছে- কি বলছে বুঝতে পারছি না।

চোখ মেলে দেখলাম রমিলের মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতটা ছেড়া ছেড়া। চারিদিকে কাটা আর ছড়া।ভয়ে চোখ বুঝে নিলাম, ভাবলাম স্বপ্ন দেখছি – এবার চোখ খুললে ওকে আগের মতো সুস্থ দেখতে পাবো। কিন্তু এবারও চোখ মেলে রমিলকে কাটা ছড়া অবস্থায় দেখলাম- দেখলাম ঠিক মাথার কাছটায় বসে আছে । ওর চোখ দুটো রক্তের মতো লাল হয়ে রয়েছে আর সমানে ছলছল করছে, বৃষ্টি নামল বলে। হাত দুটো আমার মাথায় হাত বোলাতে ব্যস্ত। আর ওই ঠোঁটটা অস্পষ্টভাবে আমার জন্য প্রার্থনা করেই চলেছে। আমরা এখন হসপিটালে। বারো ঘণ্টা হয়ে গেছে। অনেক রক্ত বের হওয়ার জন্য ডাক্তার আমায় ঘুমের ইনজেকশন দিয়েছিলেন, তাই এতক্ষণ কেটে গেল। এতকিছুর মধ্যে আমার শুধু একটা কথাই মনে পড়ছে, “তোদের ঘনিষ্ঠতা রমিলের জীবন বিষিয়ে দেবে।” এটা তুমি কি করলে অভি? আমার জন্য তুমি একটা নিরপরাধের ক্ষতি করে দিলে?

ছয়

পরের দিন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলাম। কালকের ঘটনাটা আমায় স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে যে আমাদের কাছে আসা ওর জীবনে আরও বড়ো ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। নিজের করে না পাই দুর থেকে দেখতে তো পাবো, ওতেই আমার শান্তি। তাই ঠিক করলাম ওর প্রতি বন্ধুসুলভ আচরণ দেখাবো, যাতে ও ভাবে ওর প্রতি আমার কোনো অনুভূতি নেই। ওকে তুই বলে ডাকতে শুরুকরলাম, যাতে ও আমার পরিবর্তনটা আরও স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করতে পারে। এসমস্ত বদলে রমিল রীতিমতো কষ্ট পাচ্ছে। ওর কষ্টের ছাপ মুখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমি নিরুপায়। ওর জীবন বাঁচাতে হলে এই কষ্টগুলো ওকে পেতেই হবে। আমার এই পরিবর্তনে রমিলের একটা অস্পষ্ট ধারণা হয়েছে যে সে রাতে আমিও তার মতনই মদ্যপ ছিলাম না। তাই রমিল তার আচার আচরণে বারবার বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তার একটা স্পষ্ট উত্তর চাই। কখনও সংলাপ বলার মধ্যে দিয়ে কখনও বা হাসি ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে সে আমায় বারবার প্রশ্ন করে যে তার প্রতি আমার কোনো অনুভূতি আছে কি না! আমি ওকে ফেরাতে ফেরাতে ক্লান্ত হয়ে যাই, তবু তার মধ্যে কোনো ক্লান্তি নেই। এই কয়েক সপ্তাহে হাজার বার হাজার ভাবে প্রশ্ন করেছে, যার উত্তর আমার কাছে নেই। ধীরে ধীরে রমিল আক্রমণাত্মক হয়ে যাচ্ছে, প্রশ্নের উত্তর না দিলে শক্ত করে ধরছে – আঘাত করছে। আমাকেও ব্যথা দিচ্ছে নিজেও কষ্ট পাচ্ছে। ও কি করে নিজেও জানেনা। একেক সময় এমনভাবে আঘাত করে যে ডাক্তারের কাছে পর্যন্ত যেতে হয়েছে। ডাক্তার আমায় ব্যক্তিগতভাবে এবারে বলে দিয়েছেন এভাবে এগোতে থাকলে ওর মানসিক ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে, তাই এবার থেকে যেন ওর চাহিদাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমিও ওর অবস্থা দেখে ভেঙে পড়েছিলাম। আমার কারণে একটা সুস্থ মানুষ অসুস্থ হতে পারে না। তাই আমি ঠিক করলাম আর ওর সাথে এসব করব না, স্পষ্টভাবে ওর সাথে কথা বলব, ওর প্রশ্নের উত্তর দেব, আমার মনের কথা গুলো জানিয়ে দেবো। ক্যাম্পাসে গিয়ে রমিলকে দেখলাম একা দাড়িয়ে আছে। ওর কাঁধে হাত দিয়ে আমার দিকে ঘোরালাম- দেখলাম হাতে ব্লেড। হাত থেকে ব্লেডটা ফেলে দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললাম,

-কি করছিলে এসব?তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে। এইকথা শুনে ওর মুখে প্রাপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে।

-একটা কথা বলব আসিফ?

-বলো।

-আমায় আজকে বাইকে করে ঘুরতে নিয়ে যাবে?

-এতদিন এত প্রশ্ন করছিলে,আজ আমি উত্তর দিতে এলাম আর তুমি কোনো প্রশ্ন করছো না কেন?

-আজ আমার সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয়ে গেছে, তাই তো ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার আবদার করছি। বলনা নিয়ে যাবে?

-ঠিক আছে তুমি দাড়াও,আমি বাইকটা নিয়ে আসছি।

সত্যি আজ রমিল কত শান্ত, কত স্থিত।কোনো উন্মাদনা নেই ওর মধ্যে। ওকে অসুস্থ দেখার থেকে এটাই বেশি ভালো, যে কদিন বাঁচবো একসাথে থাকবো।

সাত

আজকের আবহাওয়ার মধ্যে কিরকম একটা বিষণ্ণতা কাজ করছে। কাউকে যেন সাবধান করতে ব্যস্ত সকলেই। বাতাস রেগে উথালপাতাল করছে – আকাশ মুখ ভার করে রেখেছে – কালো হয়ে রয়েছে চারিদিক – গাছগুলোরও শরীর যেন খুব একটা ভালো নেই। পরিবেশ যেন জানিয়ে দিচ্ছে এ সময় ভালোবাসার নয় – এ সময় সাবধানতার। কিন্তু ইতিহাস যেন ফিরে ফিরে আসে। আজ আবার আমরা দুজন বাইকে রয়েছি।

আজকেও রমিল আমায় ওর দুহাতে বেধে ফেলেছে।ওকে আবার নতুন ভাবে অনুভব করতে শুরুকরলাম।মনে হচ্ছে ওর দুহাতের ভিড়ে হারিয়ে যাই।

হঠাত্ দমটা যেন বন্ধ হয়ে এল – খুব ভয় করতে শুরুকরল। সেই একই রাস্তা। দেখে যেনো মনে হচ্ছে এখনও এখানে আমার আর রমিলের রক্ত লেগে আছে।

আবার সেই শব্দ – কিন্তু এবার শব্দটা অনেক প্রবল – অনেক তীব্র। রমিল আমায় আরও চেপে ধরলো। ওর বাম হাতটা আমার বুকের ঠিক বাম দিকটায় চেপে ধরল। হয়তো শেষ বারের মতো আমার হৃত্পিণ্ডের কম্পনটাকে অনুভব করতে চাইছিলো। আমারও খুব ইচ্ছে করছিলো শেষবারের মতো ওর বুকে মাথা রেখে কাঁদতে – শেষবারের মতো ওর ঠোঁটের স্বাদ নিতে। কিন্তু এতো কিছুর আর সময় নেই। না বলা সেই তিনটি শব্দ আমি রমিলকে বলার চেষ্টা করলাম, “আমি তোমা…………..”। তিনটি শব্দ শেষ হওয়ার আগেই একটা বিশাল গাড়ি আমাদের রাস্তায় মিশিয়ে দিল। কিন্তু এবার কোনো কিছু আবছা হলো না। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি একটা বিশাল ট্রাক আমাদের শরীরের ঠিক উপর দিয়ে চলে গেল। বুকটা ছিড়ে যাচ্ছে। আমি উঠে রমিলকে দেখার চেষ্টা করলাম – কিন্তু উঠতে পারলাম না। শরীরটা ভারী হয়ে গেছে খুব। ওর বাম হাতটা এখনও আমার বুকের উপর লেগে আছে। খুব ভালো লাগছে সবকিছু কারণ রমিল যে আমাতে মিশে গেল- আর কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না – দুজনে যে এক হয়ে গেলাম। একটু একটু কষ্ট হচ্ছে যখন রমিলের হাতটা কেঁপে কেঁপে উঠছে – যেন শেষবারের মত আমায় আলিঙ্গন করতে চাইছে – ছুঁয়ে দিতে চাইছে প্রতিটা অঙ্গ। পাগলটা এখনও বুঝতে পারছে না যে আমি চিরতরে তার হয়ে গেছি। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলেও অভির ভুলের কোনো পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। অতীতের ভুলটাকে সংশোধন করে নিয়ে আগের অসম্পূর্ণ কাজকে সুন্দরভাবে পরিণতি দিয়েছে সে। সে প্রমাণ করে দিয়েছে আমার আর রমিলের ঘনিষ্ঠতা রমিলের জীবনকে সত্যি বিষাক্ত করে দিয়েছে। কিন্তু সে আমাদের ঘনিষ্ঠতা কমাতে পারে নি এতটুকুও। মিলিয়ে দিয়েছে – মিশিয়ে দিয়েছে – একাকার করে দিয়েছে আমাদের দুজনকে চিরকালের মতো। আমাদের সম্পর্ককে গাঢ়তম করে দিয়েছে চিরতরে।

এ যেন এক চিরন্তন মিলন আসিফ আর রমিলের।

…………….

সমাপ্ত

(বি.দ্র. গল্পটির কিছু অংশ অন্য কোনো লেখা থেকে অনুপ্রাণিত এবং কিছু কিছু অংশ অন্য লেখা এবং ওয়েব সিরিজ অনুসরণ করে লেখা)

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.