লাস্টবেঞ্চ

লেখকঃ-ফাহিম হাসান


কলেজে আমাদের ক্লাসের সামনে আদনান দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখে আমার হার্টবিট বেড়ে গেলো। ও কি বুঝছে না? আমার খুবই অস্বস্তি লাগছে।
আদনান হাত নাড়ালো আমার দিকে তাকিয়ে। আর মুখে বললো, “কী খবর, সিয়াম?”
আমি এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম। প্রশ্ন শুনে ওর দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছে আমার গলার কাছে কিছু একটা আটকে আছে। বিশেষ কিছু কথা ওকে বলতে ইচ্ছা করে। বলতে পারি না।
আমি বললাম, “ভালো না। তুমি কেমন আছো?”
আদনান বললো, “আমি তো ভালোই আছি। তুমি ভালো নেই কেনো বুঝলাম না।”
আমি বললাম, “পরশুদিন থেকে জ্বর। এখনও মাথা ব্যাথা করছে।”
জ্বরের কথা এজন্য বললাম যেন আদনান আমার কপালে হাত দিয়ে জ্বর মেপে দেখে। কিন্তু, বাস্তবে সেরকম কিছু ঘটলো না। ও শুধু বললো, “ওষুধ খাচ্ছো না?”
আমি বললাম, “খাচ্ছি তো। তারপরেও।”
আদনান বললো, “আসো। ক্লাসে গিয়ে বসো। ফ্যানের নিচের সিটটায় বসবে।”
আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, “হ্যাঁ যাচ্ছি।”
মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। আমার চারপাশে স্টুডেন্টরা এসে ভরে যাচ্ছে। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। মাথা ব্যাথা আরো বাড়ছে। আদনান কোথায় গেলো?
ক্লাস শুরুর কয়েক মিনিট আগে আদনান ক্লাসে ঢুকলো। গিয়ে বসলো একেবারে শেষ বেঞ্চে। শেষ বেঞ্চের স্টুডেন্টদের সাধারণত খারাপ হিসেবে ধরা হয়। তবে আদনান স্টুডেন্ট হিসেবে খারাপ না। যথেষ্ট ভালো ও পড়াশোনায়। তারপরেও সে পেছনের বেঞ্চেই বসবে। লাস্ট বেঞ্চে বসতেই নাকি সবচেয়ে বেশি মজা।
আমি ওর দিকে তাকালাম। এতো কেনো ভালো লাগে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে? ও ততক্ষণে হাইবেঞ্চের নিচে মোবাইল ফোন রেখে চালানো শুরু করেছে। অথচ, ক্লাসে মোবাইল ফোন আনা নিষেধ।
মোবাইলে ও কী যেন দেখছে আর হাসছে। সেই হাসির মধ্যে নিষিদ্ধ আনন্দ আছে। কারো হাসি এতোটা স্নিগ্ধ হয় কীভাবে?
ক্লাসে স্যার এসে গেছেন। আদনান মোবাইল ফোনটা টুপ করে পায়ের মোজার ভেতর লুকিয়ে ফেলল! ও এরকমই।
স্যার ফিজিক্স পড়াচ্ছেন। খাতায় নোট করতে করতে একবার আদনানের দিকে তাকালাম। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে গল্প করছে তার পাশের ছেলের সঙ্গে। নিচু গলায়। মাঝে মাঝে মুখ টিপে হাসছে। স্যারের কোনো কথাই হয়তো শুনছে না।
আমি খেয়াল করেছি, ও কখনই ক্লাসে মনোযোগ দেয় না। তারপরেও প্রতি পরীক্ষাতেই সে হায়ার ম্যাথ আর ফিজিক্সে সবচেয়ে বেশি নম্বর পায়। খুবই রহস্যময় সে।
আমি আবার স্যারের লেকচার শুনতে লাগলাম।
স্যার বলছেন, “বস্তুর কিনারা ঘেষে আলোর খানিকটা বেঁকে যাওয়াকে অপবর্তন বলে। তোমাদের কেউ অপবর্তনের একটা বাস্তব উদাহরণ দেখাতে পারবে? Anyone?”
*
বাসায় চলে এসেছি। বিকালের দিকটায় ডায়েরি লিখতে বসলাম। কয়েক লাইন লেখার পর আবিষ্কার করলাম আর লিখতে ইচ্ছা করছে না।
ডায়েরিতে আমার আগের লেখাগুলাই পড়তে লাগলাম। ডায়েরিতে কতবার যে আদনানের নাম লিখে রেখেছি! তবে কখনই পুরো নাম লেখি নি। আদনান লিখেছি এইভাবে, BEOBO। ইংরেজি Adnan বানানের অক্ষরগুলোর পরের অক্ষর দিয়ে। ওর রোল আর আমার রোল মিলিয়ে লেখা আছে। কলেজে ওর রোল ২৩৭। আর আমার ২৬৭। ডায়েরিতে লেখা এভাবে “২৩৭+২৬৭=৫০৪”। ডায়েরির বহু জায়গায় ওকে নিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি। একটা লাইনও মাথায় আসে নি। ওর ছবি আঁকারও চেষ্টা করেছি। একেবারেই ওর মতো লাগে না ছবিগুলা। তবুও, আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আমার কাছে আদনানের ফোন নম্বর নেই। আমার আগ বাড়িয়ে নম্বর চাইতে ইচ্ছা করে না। ও একদিন বলবে, ” সিয়াম, তোমার ফোন নম্বরটা দাও তো?” এই আশায় আছি। সেদিন যে খুব কাছে, তাও মনে হয় না।
মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে টেলিপ্যাথির সাহায্যে কথা বলার চেষ্টা করি। আমি বলি, “আদনান কী করছো?”
কল্পনায় ভেবে নেই ও বলছে, “তোমার কথা ভাবছি। তুমি কী করো?”
আমি তখন বলি, “ডায়েরি পড়ছি। আচ্ছা, তুমি কি জানো আমার ডায়েরি জুড়ে তোমার নাম অসংখ্যবার লিখে রেখেছি?”
তখন ওর কাল্পনিক উত্তর এমন হয়, “কীভাবে জানবো বলো তো? তুমি তো আমাকে কখনও তোমার ডায়েরি দেখাও-ই নি।”
ওর সঙ্গে আমার সবসময়ই কথা বলতে ইচ্ছা করে। আমার ছেলেবেলার গল্প ওকে শোনাতে ইচ্ছা করে। ওর সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব তৈরি করতে ইচ্ছা করে।
কিন্তু, ভালো বন্ধুত্ব হয় না। সেই কেমন আছো – পড়াশোনা কেমন হচ্ছে এর মধ্যেই আমাদের কথা সীমাবদ্ধ থাকে। খুব ইচ্ছা করে অন্য কথাগুলো বলতে। যে কথাগুলো হয় নি বলা।
*
কলেজে পিকনিক হবে। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে নাম দিলাম। এই আশায় যে আদনানও হয়তো নাম দিবে। পরে শুনলাম যে ও নাকি পিকনিকে যাবে না। ফলে যা হবার তাই হলো। পিকনিকের দিনটা আমার জন্য আনন্দময় হওয়ার পরিবর্তে বেদনাময় হয়ে গেলো। কতো প্ল্যান করেছিলাম!
আদনানের সঙ্গে আমার কোনো ছবি তোলা নেই। পিকনিকের দিন ক্যামেরা নিয়ে যেতে চাইছিলাম৷ একসাথে কমপক্ষে যেনো একটা ছবি তুলে রাখতে পারি এই আশায়। তা না হলেও লুকিয়ে লুকিয়ে ওর ছবি তুলে রাখতাম।
সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেলো। পিকনিকে যেখানে রান্নাবান্না হচ্ছে তার থেকে কিছু দূরে চেয়ার পেতেছি। একদৃষ্টে চুলার আগুনের দিকে তাকিয়ে আছি। আদনান থাকলে কতো ভালোই না হতো। ও আশেপাশে থাকলেই আমার আনন্দ লাগে। আমার সঙ্গে যদি ও গল্পসল্প নাও করতো, তারপরেও ভালো লাগতো।
পিকনিকের দিনটা পুরোপুরি বিরক্তি দিয়ে পার হয়ে গেলো।
ভ্যালেন্টাইনস ডে এর পরের দিনের কথা। কলেজে গিয়েছি। আদনান মাঠে দাঁড়িয়ে আছে। আমিই জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন আছো?”
আদনান বললো, “ভালোই। তুমি?”
আমি হেসে বললাম, “আমিও ভালো আছি। কাল কয়জন মেয়ে প্রপোজ করলো?”
আদনান বললো, “কী যে বলো না সিয়াম। আমাকে আবার কে প্রপোজ করবে? এই যা ছিরি আমার!”
আমি বললাম, “কেনো? তুমি কি দেখতে খারাপ?”
আদনান হেসে বললো, “খারাপ-ই তো। খারাপ বলেই তো প্রপোজ করলো না কেউ। হাহাহা।”
এর অনেকদিন পর শুনলাম আদনান নাকি আমাদের ক্লাসের সাদিয়া নামের একটা মেয়ের সঙ্গে রিলেশনে গেছে। এসব কবে, কীভাবে হলো আমি কিছুই জানি না। আদনানও কিছুই বলে নি। অবশ্য ওর বলার কথাও না।
ওইদিন ক্লাসে আদনান আর সাদিয়া, দুইজনের ওপরই চোখ রাখলাম। দুইজন ক্লাসের দুইপ্রান্তে বসলেও তারা ইশারায় কথা বলছে। সাদিয়া কী যেন একটা বললো। আর আদনান দুইকানে হাত দিয়ে মাফ চাওয়ার একটা ভঙ্গি করলো। সাদিয়া সেই সময় হাসতে শুরু করলো। আদনান চোখের কোণ দিয়ে সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। ইশ! আদনান এতো সুন্দর কেনো?
টেস্ট পরীক্ষা এগিয়ে আসছিলো। আমি বাসায় সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকি। পড়তে পারি না এক ফোঁটা। রসায়নের সহজ অধ্যায়গুলোও অনেক বেশি কঠিন লাগতে শুরু করলো। বাংলা বই পড়তেও ইচ্ছা করতো না। কেনো সব উল্টাপাল্টা হয়ে গেলো? কেনো?
আদনানের কথা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা শুরু করলাম। কলেজ এমনিতেই বন্ধ। ওর সঙ্গেও নিয়মিত দেখা হয় না। তাই ওকে ভুলে যাওয়ার কাজটা সহজ লাগার কথা হলেও কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। কোনোদিন কি বলতে পারবো না ওকে এসব? আমার ডায়েরিটা ওকে দিয়ে কি কখনই বলতে পারবো না, “পড়ো”?
টেস্ট পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে থেকে বাড়ির বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। যতটা সম্ভব বই নিয়ে পড়ে থাকতাম।
পরীক্ষাগুলো খারাপ গেলো না। তবে দেখলাম আদনানের মুখ শুকনা। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী ব্যাপার, মন খারাপ?”
আদনান হাসার চেষ্টা করে বললো, “আরে নাহ্। কেমন দিলা পরীক্ষা?”
আমি বললাম, “মোটামুটি। তুমি কেমন দিলে?”
আদনান বললো, “ভালো না গো। ওই যে অর্ধায়ুর একটা ম্যাথ আসছিলো না? ওইটা হচ্ছিল না। আরেকটা সেট তো লেখতেই পারি নি।”
আমি বললাম, “ও আচ্ছা।”
আদতে হয়তো ঘটনা অন্য কিছু ছিলো। আদনান আর সাদিয়ার মধ্যে ঝামেলা চলছিল। পরীক্ষার হলে দেখতাম আদনান বারবার কথা বলতে এগিয়ে আসছে। অথচ সাদিয়া পাত্তা দিচ্ছে না। আদনানের মুখের ভাবভঙ্গি দেখে আমারই খারাপ লাগত। আমিই বা কী করতাম!
*
এইচএসসি পরীক্ষার আগে কলেজে ফেয়ার ওয়েল প্রোগ্রাম হচ্ছিলো। আমাদের বিদায় অনুষ্ঠান৷ আমার অবশ্য তেমন উৎসাহ নেই। অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলেই বাঁচি!
আদনানকে দেখলাম সবুজ রঙের একটা টিশার্ট পরেছে। এতো সুন্দর লাগছে ওকে! আদনানের পাশে দেখি সাদিয়াও দাঁড়িয়ে আছে। সাদিয়া পরেছে হলুদ রঙের শাড়ি। শাড়ির পাড় সবুজ। নিশ্চয়ই ওরা প্ল্যান করে পোষাক ঠিক করে রেখেছিলো।
আমি মঞ্চের দিকে তাকালাম। ভালো লাগছে না। একেবারেই ভালো লাগছে না। কখন যে প্রোগ্রাম শেষ হবে!
আদনান কি কখনই জানবে না আমার কথাগুলো? আজকে বলতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু, সে কথা আজ বলাটা বেমানান। তারপরেও প্রোগ্রাম শেষে আদনানের সঙ্গে কথা বলার জন্য এগিয়ে গেলাম। ওর ফোন নম্বরটা নেয়ার ইচ্ছা ছিলো।
অথচ ওর কথার মোড় অন্য জায়গায়। আমি সাহস করে বললাম, “আদনান, আর তো একসাথে কলেজে ক্লাস করা হবে না। আমাদের কথা মনে পড়বে না?”
আদনান বললো, “আরে সমস্যা নেই। এখনও আমরা একসঙ্গে এইচএসসি দিবো। তখনও তো দেখা হবে। এতো ভাবার কিছু নেই তো!”
এসময় সাদিয়া কোথা থেকে এগিয়ে এলো। উচ্ছ্বসিত গলায় আদনানকে বললো, “এই রঙ খেলবে না? চলো চলো। রঙ খেলব। সাদা টিশার্ট আনছো না? ওইটা পড়ো।”
বলেই আদনানের হাত টেনে ধরে সাদিয়া হাঁটতে শুরু করলো। ওই অবস্থাতেই আদনান আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। আমিও হাসলাম।
সবাই রঙ খেলতে শুরু করেছে৷ আর আমি বাড়ি চলে আসছি। কলেজ জুড়ে সবাই আনন্দ করছে৷ আর আমার কাছে সমস্তই অপ্রয়োজনীয় বলে লাগছে।
নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে এলো। হঠাৎ পেছন থেকে আদনানের গলার স্বর শুনলাম, “অ্যাই সিয়াম!”
আমি পেছনে তাকালাম। আদনান এগিয়ে আসছে। ওর হাতের মুঠোভর্তি রঙ। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। আদনান এগিয়ে এসে আমার গালে সবটুকু রঙ মাখিয়ে দিলো। ঠিক ওই সময়েই আমার চোখে জমে থাকা পানি গড়িয়ে গাল বেয়ে পড়লো। গালে মাখানো লাল রঙের কিছুটা চোখের পানিতে ভিজে মুহূর্তের মধ্যে কালচে রঙ ধারণ করলো।
আদনান হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি খুব দ্রুত মুখ ফিরিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। আদনান ওভাবেই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো।
*
পরীক্ষা শুরুর কয়েকদিন আগে বাসার ফোনে আদনান কল দিলো। প্রথমে আমি চিনতে পারি নি। পরে দেখি আদনান। এতো অবাক লাগছিলো তখন!
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমার ফোন নম্বর তুমি কোথায় পেলে?”
আদনান বললো, “তোমার বায়োলজি টিচারের থেকে নিয়েছি।”
আমি বললাম, “ও!”
আদনান জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি কাঁদছিলে সেদিন?”
আমি বললাম, “কই না তো! কাঁদবো কোন দুঃখে?”
আদনান বললো, “কাঁদছিলে। কেনো কাঁদছিল বলো? তোমার কান্না দেখে আমার এতো খারাপ লাগছিল! রঙ খেলতে ভালো লাগছিল না পরে।”
আমি বললাম, “আরে কলেজের জন্য মন খারাপ হচ্ছিল। এইজন্যে মনে হয়।”
আদনান বললো, “ও।”
বলেই সে চুপ করে গেলো। আমিও চুপ করে আছি। এই প্রথম আমরা এরকম অস্বস্তিকর নীরবতার মধ্যে পড়েছিলাম। শেষটায় আমি আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলাম, “পরীক্ষার প্রিপারেশন কেমন তোমার?”
আরো কিছুক্ষণ চুপ থেকে আদনান বললো, “ভালোই।”
আরো কিছু আমি বলতে চাইছিলাম। হয়তো আদনানও তাই। কেউ কিছু বললাম না। একসময় সেই নীরবতা ভেঙে আমি বললাম, “আদনান, তাহলে ফোন রাখি। আচ্ছা? “
আদনান বললো, “হু, রাখো।”
*
প্রথম দিন বাংলা পরীক্ষা ছিলো। হল থেকে বেরিয়ে আদনানকে খুঁজতে লাগলাম। না জানি ওর কেমন হলো পরীক্ষা!
একসময় দেখি ও পরীক্ষার হলের গেটের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। ওর সঙ্গে আছে সাদিয়া। ওরা হয়তো উত্তর মেলাচ্ছে। আর এগুতে ইচ্ছা করলো না ওদিকে। আমি ওদের পাশ কাটিয়ে হল থেকে বেরিয়ে গেলাম।
পরীক্ষার মধ্যেই অন্য একদিন ওর সঙ্গে কথা বলছিলাম। ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো ওকে বলতে ইচ্ছা করতে লাগলো। মজা করেই জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, আদনান! আমাকে তোমার কেমন লাগে?”
প্রশ্ন শুনে আদনান হেসে ফেললো। বললো, “তোমাকে আবার কেমন লাগবে? তুমি তো খুবই লক্ষ্মী একটা ছেলে। চুপচাপ, ভদ্র। এইতো।”
আমি ম্লানমুখে বললাম, “ও।”
আদনান বললো, “হঠাৎ এই প্রশ্ন করছ যে? আমার কিন্তু অদ্ভুত লাগছে।”
আমি বললাম, “না। এমনি। আচ্ছা, তুমি পরীক্ষার আগে আমার নম্বর জোগাড় করে ফোন করেছিলে কেনো বলো তো?”
প্রশ্ন শুনে আদনান স্পষ্ট অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। আমার দিকে না তাকিয়ে চারপাশে তাকাতে লাগলো। আমি তাকিয়ে আছি ওর চোখের দিকে। কী সুন্দর যে ওর চোখ!
ও বললো, “আরে, তুমি ফেয়ার ওয়েলের দিন কাঁদছিলে তাই ফোন করেছিলাম। এইটা আবার পরে জিজ্ঞেস করবে জানলে ফোন করতাম না।”
আদনান রেগে যাচ্ছিল। আমি আরো রাগানোর জন্য মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ফোনে ওরকম নিশ্চুপ ছিলে কেনো বলো?”
আদনান এই পর্যায়ে বললো, “তোমাকে ফোন দেয়াটাই আমার বড়ো ভুল হয়েছে। তুমি যে এতো প্যাঁচঅলা একটা মানুষ জানলে সত্যি তোমাকে কল দিতাম না।”
আদনান কি তখন কাঁদছিলো? আমার কেন জানি না মনে হলো ওরে ডান চোখের কোণে পানি জমে আছে। নাক টানছিল ও। অসম্ভব চেষ্টা করছিলো চোখের পানি আটকাতে। খেয়াল করলাম ও চোখের পলক ফেলা বন্ধ করে দিয়েছে। হয়তো পলক ফেললে আমার সামনে চোখের পানি পড়ে যাবে, এই ভয়ে। কিংবা ওগুলো একান্তই আমার কল্পনা ছিলো। জানি না।
আমাদের কথার এই পর্যায়ে সাদিয়া এসে দাঁড়ালো আদনানের পাশে। সাদিয়া বললো, “কী হয়েছে আদনান?”
আদনান মাথা নিচু করে বললো, “কিছু না।”
সাদিয়া বললো, “একটু এই প্রশ্নের অ্যান্সারটা বলে দিবে প্লিজ? আমার মনে হচ্ছে ভুল হয়েছে।”
আদনান তখন হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বুঝাতে লাগলো। আর আমি?
আমি চলে আসলাম। আদনানের সঙ্গে কথা না বলেই। ফিরে আসার সময় খেয়াল করলাম আদনান বারবার তাকাচ্ছে আমার দিকে। হাত দিয়ে নাক ঘষছে। ওর পাশেই গভীর ভালোবাসাময় দৃষ্টিতে সাদিয়া দাঁড়িয়ে আছে। সাদিয়া মুগ্ধ চোখে আদনানকেই দেখছে।

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.