শেষ কথা

লেখক: রোহিত রায়

স্বাভাবিক ভাবেই বিয়ে বাড়ীর ঝলমলে আলোর ঝাঁচকচকে পরিবেশ। নওবতের শব্দ প্রত্যেক ক্ষনে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, এখানে এখন সুখের সময়।সবাই আনন্দে মেতেছে। যেখানে দুঃখের,বেদনার কোনো যায়গা নেই। তবুও সেই দুঃখ আনন্দের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এবং খুজে চলেছে তার লক্ষ্যকে। হঠাৎ কে যেন তার হাত টেনে ধরে,বলে “কী,তোমার বন্ধুকে খুঁজছ? “

-হ্যাঁ,আন্টি,কোথায় ও? “ম্লান হেসে জিজ্ঞাস করে সে।

-“ওর ঘরে যাও। সেখানেই তৈরী হচ্ছে শ্রাবন। “মহিলা কথাটুকু বলে চলে গেলেন।

সে যাবতীয় শব্দ,আনন্দ,ভেদ করে বড়ীর অন্দর মহলে এসে পৌছায়। সিঁড়ি বেয়ে উপরে আসে তিনতলার ঘরে। লোকজনের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে। বদ্ধ ঘরের দরজারর সামনে সে মুখে অনিচ্ছাকৃত একটা হাসি টানে। আর ভাবে এই ঘরে এই তার শেষ ঢোকা হবে।

*

বাইরের অজস্র গানের লিরিক্সগুলো এই ঘরে হয়ত প্রবেশ করতে পারছে না। এক সর্বগ্রাসী নিরবতা গ্রাস করছে ঘরকে। দরজা ধাক্কা দেওয়ায় প্রত্যাশিত কন্ঠ ভেসে আসে, “দরজা খোলা আছে…।”

খুলে যায় দরজা। ভিতরে আয়নার সামনে বসেছিলো শ্রাবন। সেই আয়নার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে দেখে, দাঁড়িয়ে আছে অপ্রতিরোধ্য এক পুরুষ। মেদমুক্ত, শক্ত শরীরের অধিকারী, আদি…।তার মুখে যেন জোর করে কেউ হাসির কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুড়ো মাখিয়ে রেখেছে। এই ‘কেউ’ এর মালিককে হয়তো চেনে শ্রাবন। শ্রাবন মৃদু হেসে বলে “ও,তুই। দরজা আগলে দাঁড়াস না। ভিতরে আয়। “

আদি বিছানার এককোনায় বসে। মৃদু হেসে বলে”best of luck for your wedding, শ্রাবন। “

-“thank you”বলে শ্রাবন আদির দিকে, ক্ষনিক তাকিয়ে নেয়।

কিছুক্ষন নীরব সব কিছু। শ্রাবন নীরবতা ভেঙ্গে বলে “আমি বিয়ে করছি আদি, তুই খুশি না এতে? তোকে দেখে মনে হচ্ছে না। “আবার সব নীরব।

এবার আদি বলে”আমার কি আদৌ খুশী হওয়া উচিৎ শ্রাবন?”

এর কোনো উত্তর শ্রাবনের কাছে ছিলোনা। অস্বস্তিকর চাঞ্চল্য সৃষ্টি হচ্ছিল ঠিকই।তবে তা বিস্ফারণের অপেক্ষায়। হঠাৎ আদি বিছানা থেকে উঠে কাছে আসে শ্রাবনের আর ঠোট ঠেকায় ওর ঘাড়ে। উষ্ম নিশ্বাস বায়ু ক্রমশই শ্রাবনের গ্রীবা গরম করতে শুরু করে।

*

-“যাস না আমায় ছেড়ে শ্রাবন। আমি সহ্য করতে পারবনা। পারব না আমি শ্রাবন, পারব না আমি। ” গ্রীবার আশপাশ দিয়ে মনে হলো,উষ্ম কথাগুলো পাক খাচ্ছে।

-“ছাড় আদি। প্লীজ!” বিরক্তি ও উত্তেজনায় শ্রাবনের গলা কেপে কেপে উঠছিলো।কিন্তু উন্মাদের মত করছিলো আদি। পাশবিকের মতো।শ্রাবন আবার বলে “its disgusting আদি, leave me alone, আমি আর সহ্য করতে পারছি না এই সমস্ত “

আদির ঠোট যতক্ষনে শ্রাবনের ঘাড় থেকে গলার দিকে যাচ্ছিলো। হঠাৎ শ্রাবন উঠে দাঁড়ায়। সজোরে হাত চালায়। আদিকে উদ্দেশ্য করে।

অপ্রত্যাশিত! অপ্রত্যাশিত! সব, এই চড় অপ্রত্যাশিত। নিজের গালে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে আদি। যে, এই ঘটে যাওয়া ঘটনাটা কি, সত্যিই ঘটল। না তো! ভ্রম না। আর না! গালে হাত দিয়ে চোখ নামিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয় আদি। শ্রাবন হয়ত পরিস্থিতির গম্ভীরতা বুঝতে পেরেছিলো। তাই উঠে আদির পথ আগলে দাঁড়ায় সে।

*

যে গালে মেরেছে সেই গালে হাত ছোঁয়ালো শ্রাবন, বলল “মুখ তোল! তোল মুখ।কী হল?তাকা আমার দিকে। “

আদি মুখ তোলে। চোখের মণি সসম্পূর্ণ নিমজ্জিত ছিলো। সমগ্র সমুদ্র জোড়া দুঃখ যেন, চোখে করে নিয়ে যাচ্ছিলো আদি।

এবার শ্রাবন অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে আদির ঠোটে ঠোট রাখে। ঘড়ী ধরে।হয়তো কয়েক মিলি সেকেন্ড।তারপর চোখেচোখ রেখে কপালে কপাল ঠেকিয়ে। ফিসফিস শব্দে কম্পিত কন্ঠে শ্রাবন বলে “এই শেষবার। আর কোনোদিন না। তোকে বলেছিলাম স্বাভাবিক হতে।আমি তো হতে পেরেছি স্বাভাবিক। দেখ!আমি আজ বিয়ে করতে যাচ্ছি। এটাই বাস্তব। আর ভালো লাগছে না সমাজের সঙ্গে লুকাচুরি খেলতে। হ্যা এটা কঠিন বাস্তব। আর এটা তোকে মেনে নিতেই হবে। আমার কাছে তোকে ভোলা তো অসাধ্য প্রায়। তুইও যানিস সেটা। কিন্তু যেখানে আমরা অপারক সেখানে তো,বাইরের এই খোলশ টাকে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই আদি।” আদির সারা শরীর কাঁপছে। শ্রাবন আবার বলে “তোকে কঠিন বাস্তবের সাথে পালটে নেওয়া যন্ত্রনার। তাও তো নিচ্ছি। নতুন করে গুছিয়ে নিচ্ছি নিজেকে। বল! কীরে?”

-“আমার তোকে বলার মত কিছুই নেই “

-“চুপ করে,গুম মেরে থাকিস না। তোকে এইভাবে দেখতে ভালো লাগে না একদম।” স্থির দৃষ্টি ছিলো পরস্পরের।

– I love you, এই টুকুই বলার।

শোনা মাত্রই শ্রাবনের চোখের জল বাধ ভাঙ্গল।সে বলে “me too but,but,not that way you want. আমার কাছে আমার পরিবার অনেক আশা রাখে। জানিনা তা কোনোদিন সফল হবে কিনা। তবে তোকেও বুঝতে হবে সব যে উপন্যাস নয়।

*

…কিছুক্ষন নীরব সব কিছু। মাথা থেকে পা অবধি আদির দিকে তাকায় শ্রাবন। বলে “এবার বোধ হয় আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো।”

-“পারব না আমি শ্রাবন। যাতে কোনোদিন তোর কোনো কষ্ট না হয়, তোর শরীর আমি ছুয়েও দেখিনি। তোর কাছ থেকে আঘাত পেতে রাজি আছি কিন্তু তোকে ছেড়ে যেতে বলিস না। ” আদি এইটুকু বলে চুপ করে যায়।

শ্রাবন গম্ভীরভাবে বলে “ব্যস আর কী?” দরজা খোলে, আঁড় চোখে তাকিয়ে বলে “দেখ আমার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। একটা কথা অবশ্যই বলব, জীবনে সব কিছুর কন্ট্রাডিকশন থাকে। প্রত্যেকের ক্ষেত্রে অপাওয়া থেকে যায়। তোর ক্ষেত্রে যেমন আমি,আর আমার ক্ষেত্রে তুই। তবে তাতো আবদ্ধ ঘরের মধ্যে, তাই নয় কী? ” কথা গুলো বলছে ঠিকই কিন্তু আদির দিকে তাকাচ্ছে না। আদি স্থির দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে। আবার বলতে শুরু করে “সমাজ অনেক কঠিন রে আদি। সেকেন্ডে নিঃস্ব করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। একবার সে দিকটাও বিচার করে দেখিস।… আর হ্যা, আর একটা কথা, আমার বিয়ের সময় বা পরে তুই আমার সামনে আসবি না।”

-“কেন।”গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাস করে আদি।

-“কারন আমায় শক্ত হতেই হবে। তোর ভালোবাসা টাকে ভুলতেই হবে। তুই যে আমার সব থেকে বড়ো দুর্বলতা। ভালো যদি বেসে থাকিস ছেড়ে দে আমায় রে।তোর ভালোর জন্য বলছি। leave me. স্বাভাবিক হ “

আর সেকেন্ড দাঁড়ালো না শ্রাবন। পিছনে ফিরেও তাকালো না।

আদি শুধু থমকে গেছে। নিজের অস্তিত্বকে একটু একটু করে উবে যেতে দেখেছে সে। ঠিক কেন যানিনা। আর এক ফোঁটা জল আসছিলো না ওর চোখে।

*

..নিজের ঘরের টেবিলের সামনে বসে ছিলো আদি। নিজের লেখা বই,উপন্যাস,পত্র গুলোতে হাত বোলাচ্ছিলো আদি। শ্রাবনকে নিয়ে লেখা কবিতা গুলোয় চোখ বোলাচ্ছিল আদি। একটা গল্প পড়ে সে, সেখানে একটা লাইন ছিলো। ‘কিছু কিছু কিছু সময় পুরুষালি সমকামিরাও প্রতারিত হয়, সবাই ভাবে এটা অসম্ভব।তাই তখন তার চাইতে দুঃখের কিছু নেই। ‘ এখানে নিজের জীবনের মিল পাওয়ায়। হাসি পায় ওর।আবার চোখের কোন থেকে দেখা দেয় জল।চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বোজে আদি। ভেসে ওঠে বাইকের পিছনে বসিয়ে নিয়ে শ্রাবনকে দিগন্ত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। শ্রাবনকে প্রথম সিগারেট খাওয়ানোয় মুখ লাল হয়ে যাওয়া। সেও কি অকৃত্রিম সৌন্দর্য! দুজনের একসাথে বসে মেয়েদের ঝাড়ী মারা।এসবের মাঝে কবে যে তারা স্ট্রেইট থেকে পরস্পরের প্রেমে পড়ল। সেই সময়টা……

পেন হাতে নেয় আদি। লেখে এক লেখা। এক উড়োচিঠি

—তুই আমাকে আর দেখতে চাস না।বুঝি। আর আসব না। আমাকে দেখলেই তোর আর বিরক্তি অনুভব হবে না। আমি যতদিন বেঁচে থাকব। ততদিন আমি নিজেকে তোর সামনে, বা তোকে দেখার থেকে বাধা দিতে পারব না। ওটা অপ্রতিরোধ্য। আমি আমার ভালোবাসার সবটুকুই দিয়ে গেলাম তোকে। আমার এই অনুভূতি গুলো আর আন্য কারোর সাথে ভাগাভাগি করতে পারব না। একেই কি ভালোবাসা বলে শ্রাবন। I love you. নতুন করে বলার কিছু নেই।

সাদা পাতায় সাক্ষর হিসেবে আদির চোখ থেকে পড়া জল থেকে যায়। ড্রয়ার থেকে হঠাৎ এক রিভলভার বেরিয়ে আসে, আদির হাতে। ” আসি শ্রাবন, ভালোবাসি, ভালোবাসতাম, আমৃত্যু ভালোবেসেছি। এই টুকুই তার প্রমান। এই টুকুই শেষকথা।”

ওদের ছবি গুলো। ওর নিজের লেখা গল্প তথা।ওদের নিজেদের এই ঘরটায় চোখ ঘুরিয়ে নেয় আদি। তারপর রিভলভার চলল।……বাকিট

া অন্ধকার। আর জানা যায় নি।

___সমাপ্ত____

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.