স্পর্শে আকাশ ছিল

রচনাঃ রাজ চৌধুরী

উৎসর্গঃ অরণ্য আহমেদ।

( গল্পে বর্নিত সকল বিষয় কাল্পনিক বাস্তব ও জনজীবনের সাথে যার কোনো ভাবেই মিল নাই)

সিলেট যেতে হবে। শুনেইতো মাথায় চক্কর কাটলো। ধুর ঐ অঞ্চলে কেউ যায়। আমি সোজা না করে দিলাম। আমি বললাম ” কেন আমাকেই কেন যেতে হবে বাবা? নাহ কিছুতেই যাবোনা”

যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত না। আমার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিলোনা। অনেক আগে একবার গেছিলাম যা বিরাম্বনার শিকার হয়েছি সেবার।

আমার না করাতে বাবা বেশ মন খারাপ করলো। ওদিকে ফুফু অনেকবার ফোন করেছে।

অগত্য রাজি হলাম যাবো বলে। মনে মনে বললাম ” বাপরে বাপ। কি এমন কাজ আমি না গেলে হবেইনা”

বাবা বললেন ” মিরাজ শোনো তুমি যখন গিয়েছিলে তখন আর এখনকার মধ্যে তফাৎ আছে। ঘুরে এসো ভালো লাগবে”

গেলাম হিলিং এলাকায়। সত্যি অসাধারন। না আসলে মনেহয়। মিস করতাম ট্রাভেলটা। আন্টির বাসায় গেলাম। আপ্যায়ন হলো বেশ।

যাবার পর থেকেই কেমন ঘুরতে ইচ্ছে করছিল। অচেনা যায়গা। আর পাহাড়ি সুরুপথ বেশ রোমাঞ্চকর। কাজের কথাটা ভুলে গেলাম।

আন্টিকে বললাম ” আন্টি ঘুরে দেখতে চাই যায়গাগুলো বিশেষ করে ঝর্ণা আর চা বাগান।”

আন্টি বললেন ” ঠিক আছে দেখ। কিন্তু জারিফেরতো এখন এক্সাম চলে আর আমি ঘুরে দেখাবো সে ক্ষমতা আমার নেই। তবে এখানে অনেক ট্রাভেল/ট্যুর এজেন্সি গাইড আছে ওদের হেল্প নিতে পারিস”

আমি “ওকে “বলে দিলাম। সেদিনেরমত রাত কাটলো।

সকাল সকাল। ট্যুর গাইড পেয়েও গেলাম। গাইড হিসেবে আমার সাথে চলল শান্ত। সত্যি শান্ত ছেলেটা। এখানকার স্থানীয়। ওর সাথে পরিচিত হলাম।

স্ট্যাডি করে শান্ত। সাথে এই কাজ। এভাবেই চলে। ফর্সামত ছেলেটা। অসাধারন সুন্দর দেখতে। কথাগুলোও যেন মিষ্টি। বয়সে আমার চেয়ে বছর তিনেক ছোট হবে। আমি আপনি করে বলাতে শান্ত বলল ” ভাই আমাকে তুমি করে বলতে পারেন যদি অসুবিধা না মনে করেন।”

আমি বললাম ” আচ্ছা বলতে অসুবিধা নেই। তা শান্ত আমরা প্রথমে যাচ্ছি কোথায়?”

—– সাসনে একটা পাহার আছে অসাধারন যদি সেখানে উঠতে পারেন সৌন্দর্যের সাথে সাথে মেঘ ছুঁতে পারবেন।যাবেন ওখানে?

——আমিতো সেভাবে কিছু চিনিনা । তুমি সাথে আছো নিশ্চয় যাবো ।

——ঠিক আছে চলুন। তবে ভয় পাবেন না আমি সাথে আছি যেকোনো অসুবিধায় আমাকে যানাবেন।

শান্ত আর আমি চললাম পাহারের উদ্দেশ্যে। সাথে অনেক অচেনা মুখ। ছোট বড় নানা প্রকারের মানুষ এখানে । বেশ ভালো লাগছিল আমার।

হাটতে হাটতে প্রায় পা ব্যাথা হয়ে গেল।

কিন্তু উপরে আমি উঠবোই। আমার ধির গতি দেখে শান্ত বলল ” এতটুকুতেই হাপিয়ে গেলেন! আরও পথ বাঁকি আছে।” আমি বললাম ” শান্ত শোনো উপরেতো উঠবোই আমি হাল ছাড়ছিনা”

অবশেষে উপরে উঠেই গেলাম।

সত্যি এক অপরূপ দৃশ্য স্বাগতম জানালো যেনো। অসাধারন। সত্যি এখানে মেঘ ছোঁয়া যায়। পাশে থাকা কিছু দ্রব্য সামগ্রী কিনলাম। অনেকটা সময় থাকলাম দুজনে। আমার আসতেই ইচ্ছে করছিলোনা। মনে হতে লাগলো এ যেন অন্য পৃথীবি।

আরও বেশ কিছু যায়গাতে ঘুরলাম। অবশেষে সন্ধ্যা নামলো। বিদায় জানালাম শান্তকে। আসার সময় বললাম ” শান্ত কাল যদি আসি তো পাবো কি তোমায় আমার সঙ্গী হিসেবে।”

শান্ত বলল ” আসলে এখানে একেক জনের সাথে একেক দিন হয়ে যায়। তবে চেষ্টা করবো কাল যদি আসেন। আর সত্যি মিরাজ ভাই। আপনার সাথে সময়টা বেশ কেটেছে আমার। কত কত লোকের গাইড হয়েছি এত সহজেই কারো সাথে মিশতে পারিনি । যাইহোক থ্যাংকইউ”

আমি বললাম ” আরে না। বরং আমার থ্যাংকস দেয়া উচিৎ তোমাকে। সত্যি অসাধারন সময় কেটেছে আজ।”

সেদিনেরমত চলে এলাম।

রাতে অনেকবার ভাবনায় এলো শান্ত। কি সুন্দর দেখতে কি সুন্দর আচরন। একসাথে এমন মানুষ খুবই কম। সকালের জন্য ওয়েট করছিলাম। ঘুমটা যেন ছুটি নিলো। আসছেইনা।

অবশেষে কাঙ্খিত সকাল। ভাগ্যক্রমে পেয়েও গেলাম শান্তকে। সত্যি বলতে ঘুরতে ভালো লাগছে । সাথে শান্ত ওকে যেন ছড়তে ইচ্ছে করছেনা।

বললাম ” শান্ত আজকে কোথায় যাবো বলো”

শান্ত বলল ” আজকে নাহয় ঝর্নাতে যাওয়া যাক। আমার বাড়ির পাশেই ঝর্ণা ছোট থেকেই দেখছি। তবুও যেন সাধ মিটেনা। এটাও বেশ সুন্দর। “

আমি বললাম ” ঠিক আছে তবে তাই হোক”

শান্ত বলল ” মিরাজ ভাই জিন্সটা চেঞ্জ করলে ভালোহয়। পানিতো। হাফ প্যান্টে বা থ্রি-কোয়ার্টার বেটার হয়।”

আমি বললাম ” স্যরি আমিতো আজ ব্যাগ নিয়ে আসিনি, ভিজে ভিজুক। চলোতো “

চললাম ঝর্ণার উদ্দেশ্যে।

ভিজলাম গোসল করলাম। অনেকই দেখলাম একটু উপরে উঠছে। আমারও ইচ্ছে হলো। তাই চেষ্টা করছিলাম।

শান্ত বলল ” সাবধানে উঠুন এখানকার অবস্থা অতটা ভালোনা বলতে গেলে পিচ্ছিল। “

“আমি পারবো” বলেই উঠতে শুরু করলাম। কিন্তু হায়। গড়িয়ে পরলাম।পরেই চিৎকার। হাটুর উপরে কিছু একটা ঢুকে গেছে রক্ত বের হতে আছে।

আমি এমনিতেই রক্তারক্তি দেখতে পারিনা। শান্ত ছুটে এলো।

প্রায় অজ্ঞান অবস্থা। ব্যাথা সাথে রক্ত। কোনো রকমে শান্তর বাসায়। প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট করলো শান্ত নিজেই। প্যান্ট খুলে শুধু হাফপ্যান্ট পরে আছি।

শান্তকে বললাম ” আচ্ছা তুমি কি ডঃ “

—-কেন বলুনতো?

—না মানে যেভাবে ট্রিটমেন্ট দিচ্ছো ডঃ মনে হচ্ছে তাই বললাম।

—-হুম ধরে নিন এখন ডঃ একটু চুপ করে থাকবেন এখন একটা লিকুইড লাগাবো। জ্বলবে!

—আচ্ছা।

—–আচ্ছা আপনার গায়ে এত লোম কেন।

—-তোমারতো কম তুমি তুলে নাও।

শান্তর সাথে অনেকটাই ফ্রি হয়ে গেছি দু দিনে। হাটতে পারছিলাম না। সন্ধ্যায় আন্টিকে ফোন করে বলেদিলাম যেতে পারবোনা বলে।

রাত কাটলো শান্তর সাথেই। এত ভালো মানুষ হয় কি করে ভাবতে থাকলাম। না ঘুমিয়ে, শান্ত আমাকেই দেখছিলো আমি ঠিক আছি কিনা।

সকাল হলো নাস্তা করলাম এক সাথে।

আসার সময় বলল ” মিরাজ ভাই। কেন যেন আপনাকে অনেকটা আপন মনে হচ্ছে। খুব ভালো লাগলো আপনার সাথের সময়টা।”

” আমারও তাই শান্ত”

—–আচ্ছা আপনি যাবেন কবে?

—-কাজ শেষ হলেই চলে যাবো। তবে এখন যা অবস্থা আমার কয়েকটা দিন পরেই যাবো।

—আচ্ছা ঠিক আছে।

শান্তর কাছে থেকে চলে এলাম ফুফুর বাসায়। বকা কিছুটা খেলাম।

কয়েকটা দিন চলে গেলো। এই কয়েক দিনে। অনেকবার শান্ত ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছে আমার কি অবস্থা। কি খবর।

জানিনা কেন এক অচেনা মায়া কাজ করছিলো শান্তর জন্য। কেমন আপন আপন মনে হচ্ছিল। ইচ্ছে করছিলো ভালোবাসি।

যে ভালোবাসার নাম হয়না। যে ভালোবাসার স্বার্থ নেই। কি জানি এতটা কেন ইচ্ছে করছিলো জানিনা।

রাতে ভাবলাম। সকালে একবার বলব যা ভাবার ভাববে। শান্ত যাইহোক না কেন। যেমনই হোকনা কেন। আমার ইচ্ছেটা প্রকাশ করব।

সকালে গেলাম। পেলাম না শান্তকে। বাসায় গেলাম নেই। হঠাৎ কোথায় গেলো। ভাবলাম স্ট্যাডির জন্য হয়তো যেতে পারে কোনো কাজে। কিন্তু আরও কয়েকদিন কাটলো পেলাম না।

হতাশ হয়ে গেলাম। এর মধ্যে বাবা ফোন করেছে। যে কাজের জন্য এখানে আসা তা আর হয়নি। পরের মাসে হবে বলে জানলাম।

একটা মেসেজ পেলাম শান্তর

“আর দেখা করা হলোনা আমার। বহুদিন আগে এমনি কারো প্রেমে পরেছিলাম। ঠিক আপনারইমত। তবে সে আপনারমত এত ভালো ছিলোনা। জেদী ছিল। কোনো এক কারনে। ঐ পহাড় থেকে ঝাপ দেয়। আর কখনো চাইনা আমি ফের কোনো ঘটনা ঘটুক। আপনি আগন্তুক মায়া বাড়ানোর আগেই সরে গেলাম। ভালো থাকবেন”

আমি “থ” হয়ে রইলাম। আমার উদীয়মান প্রেমের সমাপ্তি এভাবে ঘটবে বুঝতে পারিনি।

মনের কোনো থেকে গেলো শান্ত। থেকে গেলো শান্তর সাথে কাটানো সময়গুলো।

মনে মনে বললাম – ভাগ্য বলেও একটা ব্যাপার আছে। সেটা হয়তো আমার নেই।

———————–সমাপ্ত—————–

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.