হিমু সিরিজের চতুর্থ গল্প -প্রিয়দর্শী


লেখকঃ-পৃত্থুজ আহমেদ
উৎসর্গঃ-ফুয়াদ হাসান ফাহিম


গাড়িতে উঠেই সিটে হেলান দিয়ে গা এলিয়ে দিলাম।আজকে অফিসে প্রচুর কাজের চাপ ছিল।সারাদিনের ব্যস্ততার অবসাদ নিমেষেই চোখে ঘুম নামিয়ে দিল।ভাগ্যিস,ড্রাইভারকে বলে রেখেছিলাম আজকে যেন আসে,নাহয় এই শরীরি অবস্থায় গাড়ি চালানো মুশকিল হয়ে পড়ত।

একটা ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল।ড্রাইভার ডেকে বলল,বাসায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা।গাড়ি থেকে নেমে বাসায় ঢুকে পড়লাম।সবাইকে ড্রয়িংরুমে দেখলাম বসে আছে।আমি কোন কথা না বলে তাদের পাশ কাটিয়ে এসে নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলাম।রুমে ঢুকে দেখলাম হিমু টেবিলের উপর উদাস দৃষ্টিতে বসে আছি বাইরের দিকে তাকিয়ে।আমাকে দেখে এক লাফে টেবিলের উপর থেকে নেমে দৌঁড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।আমার প্রচন্ড ক্লান্তি লাগছিল।হিমুকে বললাম,হিমু এখন ছাড়ো আমাকে।আমার ভাল লাগছেনা।হিমু আমাকে না ছেড়ে বরং আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে।সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষেই বিরক্তিতে পরিণত হল।আর সেই বিরক্তি ঝাঁড়লাম হিমুর উপর হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে।হিমুকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে ধমক দিয়ে বললাম ছাড়তে বলছি ছাড়োনা কেন?হিমু কোনরকম বাক্য ব্যয় না করে রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেল।হিমু যাওয়ার সাথে সাথে আমি অফিসের ফর্মাল জামাকাপড় সহ আমি বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।কতক্ষণ পার হয়েছে জানিনা।ঘুমের ঘোরে খেয়াল করলাম কেউ একজন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।এটা যে হিমুর স্পর্শ আমার বুঝতে একটুও কষ্ট হল না।আমার ঘুম আরও গভীর থেকে গভীরতর হল।
*
ঘুম থেকে জেগে দেখি রাত ১১ টা বাজে।বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলাম।হিমুর কথা মনে পড়ল।পাগলটা নিশ্চয়ই মন খারাপ করে আছে।দাদির রুমে এখনও আলো জ্বলছে দেখলাম।নিশ্চয়ই হিমুটা দাদিকে এখনও ঘুমোতে দেয়নি।এই বাড়িতে হিমু আমার পরে দাদি ঘেঁষা বেশি।আমি বাসায় না থাকলে হিমুর দাদির কাছে গিয়ে দাদিকে জ্বালাতে থাকে।যাকে বলে হাঁড়মাংস কালি করা।হা হা হা!হিমু দাদির কাছে সবসময় যেই আবদার করে তা হল আমার ছোটবেলার গল্প শোনানো তাকে।আর কিছু নয়,সেই একটা গল্পই শোনে।বারবার,হাজারবার শোনে।তবুও এই গল্পটা তাকে শুনতেই হবে।তাও আবার দাদির মুখে।এতে নাকি সে ছোট্ট ফাহিমকে মানে আমাকে চোখের সামনে দেখতে পায়।দাদির রুমে ঢুকতেই দাদি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।হিমুকে দেখলাম শুয়ে আছে।ঘুমোচ্ছে নিশ্চয়ই।
কী ব্যাপার দাদি?পাগলটা আজ আবার গল্প শুনতে আসল?
তার আর কাজ কী?গল্পই শুনতে আসে।
কোন গল্পটা দাদি?
কোনটা আবার?সেই একটাই গল্প।
আমি হাসলাম।ছোটবেলায় আমি অনেক দুষ্টু ছিলাম।আমাকে কোন খেলনা দিলে আমি সেটা নিয়ে খেলতাম না।একমাত্র বড় আপুর কিংবা মায়ের লিপস্টিক অথবা নেইলপালিশ দিতে হত।সেগুলো দিয়ে আমি নিজের সারা গায়ে আঁকিবুঁকি করতাম।আর লিপস্টিক কিংবা নেইলপালিশ না দিলে সেই রকম কান্না জুড়ে দিতাম।আর আমার মহামান্য হিমু সাহেব এই একটা গল্পই শুনে আসছে এতবছর যাবত।এটা তার শুনতেই হবে।মাঝেমধ্যে তো এই বুড়ো ফাহিমকে উলঙ্গ করে সে লিপস্টিক নয়তো নেইলপালিশ দিয়ে রাঙায়।এতে নাকি সে ছোটবেলার ফাহিমকে খুঁজে পায়।ভাবলেই হাসি পায় আমার।
তোদের দুটোর কী হয়েছে রে?দাদির কথায় ভাবনায় ছেদ পড়ল।
কিছু হয়নি দাদি।এমনিই একটু মনোমালিন্য হয়েছে আর কী।
হ্যাঁ রে ফাহিম,তুই আজকের দিনে ছেলেটাকে বকতে পারলি?
আজকের দিন বলতে?ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আজকের তারিখটা চোখে পড়ল।ও মাই গড!এটা আমি কী করলাম!
হিমুকে ডেকে তুলতে হবে তাড়াতাড়ি।তাকে ডেকে তুলতে গিয়ে দেখলাম একটা ছবি বুকে নিয়ে শুয়ে আছে।সেই ছবিটা!হিমুর চোখের কোণে জল শুকিয়ে আছে।বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল এটা দেখে।আমার এখন নিজের উপরই জেদ চেপে বসল।আজকের তারিখটা আমি কী করে ভুলে যেতে পারলাম!হিমুকে ডেকে তুলে রুমে নিয়ে আসলাম।তারপর তার চোখেমুখে জল দিয়ে বিছানায় এনে বসিয়ে মুখ মুছে দিলাম।তাকে জিজ্ঞেস করলাম,কিছু খাওনি নিশ্চয়ই?
হিমু কিছু বলল না।তবুও আমি জানি হিমু কিছু খায়নি।আমাকে ছাড়া হিমু অতি বিপাকে না পড়লে খায় না।এটা বাসার সবাই জানে।তাই তাকে কেউ খাওয়ার জন্য ডাকেনি।আমি কিচেনে গিয়ে খাবার নিয়ে আসলাম।বাসার সবাই খেয়ে নিয়েছে আগেই।দাদি ছাড়া বাকি সবাই ঘুমিয়ে গেছে।হিমুর প্রতি আমার আলাদা টান আছে সেটা সবাই জানে বাড়ির।বাসার সবার থেকে যে আমি হিমুকে বেশি ভালবাসি এটা সবাই মানতে বাধ্য বিনাবাক্যে।তবে আমাদের ভালবাসার যে আলাদা একটা রূপ,রঙ আছে সেটা কেউ জানেনা।সময় আসুক,আমি নিজ থেকেই জানিয়ে দেব।খাবার নিয়ে রুমে এসে হিমুকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে নিজেও একটুখানি খেয়ে নিলাম।তারপর রুমে এসে দেখলাম হিমু ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে।তার গুরুতর মন খারাপ।আমি গিয়ে হিমুর পাশে দাঁড়ালাম।খুব বেশি মন খারাপ করছে?কান্না পাচ্ছে হিমু?
হিমু মাথা নেড়ে না সূচক সম্মতি জানাল।তারপর,হুট করে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল।হিমুর কান্না!কতটা হৃদয়বিদারক তা আমি জানি শুধু।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।আমি হিমুকে পাঁজাকোলে করে রুমে নিয়ে আসলাম।হিমুকে শুইয়ে দিলাম।তারপর নিজে শুয়ে হিমুকে বুকে টেনে নিলাম।হিমুকে কষ্ট দেয়া ঠিক হয়নি মোটেও।তার কষ্টে আমার নিজেরই বুক ফেটে যাচ্ছে।আজ রাতে আর ঘুম আসবেনা আমার।হিমু আমার বুকেই শুয়ে আছে।আমি তাকিয়ে আছি ছাদে ঝোলানো পাখাটার দিকে।দুইটা টিকটিকি একে অপরকে তাড়া করছে।হিমুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেও টিকটিকি দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে।কারো মুখে কোন কথা নেই।অন্য সময় হলে হিমু এতক্ষণে পুরো ঘর মাথায় তুলে নিত টিকটিকি দুটোকে নিয়ে।অথচ আজ চুপচাপ।তখন থেকে একটা কথাও বলেনি।আমিও আর ঘাঁটাইনি।
*
আজ আমার অফিস নেই।আসলে আজ অফিসে যাব না।গতরাতে ঘুম হয়নি।হিমু শেষরাতের দিকে ঘুমিয়েছিল।একটু আগে উঠে গেল।ক্লাশে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে।আমি উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে,সেখান থেকে ফিরে এসে বিছানার কাছে দাঁড়ালাম।হিমু রেডি হয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
ফাহিম!
বলো হিমু।কী হয়েছে? তোমার কাছে টাকা নেই তো!টাকা লাগবে তো বলছ না কেন?আমি এক্ষুণি দিচ্ছি টাকা।
না ফাহিম।টাকা লাগবেনা।আমার কাছে টাকা আছে।আচ্ছা আমি আসছি।এই বলে হিমু চলে যাচ্ছিল,আমি হিমুর হাত ধরে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে নিলাম।প্রায় মিনিট পাঁচেকের মত তাকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম।তারপর,হিমুকে ছাড়িয়ে তার মুখে অনেকগুলো চুমু খেলাম।হিমুর ঠোঁটের কোণে তখন একটুখানি হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল।কী নির্মল হাসি।শব্দ ছাড়া হাসি।ঠিক ছোট বাচ্চাদের মত।
*
হিমু ক্লাশে গেল অনেকক্ষণ হল।বুকটা কেমন খালি খালি লাগছে সে চলে যাওয়ার পর থেকে।কখন আসবে হিমু!আচ্ছা আজ হিমুর ভার্সিটিতে গিয়ে তাকে চমকে দিলে কেমন হয়!তাকে নিয়ে আসার বাহানায় তার মন ভাল করে দেওয়ার একটা সুযোগ পাব।যেই ভাবা সেই কাজ।তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম হিমুর ভার্সিটির উদ্দেশ্যে।
ভার্সিটির সামনে যেতেই হিমুর বন্ধু অনিমেষের সাথে দেখা।হিমু সবসময় অনিমেষের সাথেই থাকে।তবে আজ নেই কেন?তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম হিমুর কথা।সে বলল,হিমু এখনও ক্লাশেই আছে।একটুপর আসবে বলল।আমি বুঝতে পারলাম,গতরাতের প্রভাবটা এখনও আছে হিমুর উপর।তাই দেরি না করে হিমুর ক্লাশের দিকে ছুটলাম।হিমুর ক্লাশ চিনতে বেশি বেগ পেতে হলনা।কারণ আমি আরও কয়েকবার এসেছি হিমুর ক্লাশরুম পর্যন্ত হিমুর সাথে।এসেই দেখলাম,হিমু বের হচ্ছে রুম থেকে।আমাকে দেখে মনে হয় অবাক হয়েছে।তবে নিজের চেহারায় সেই ভাবটা ফুটে উঠতে দেয়নি।এমন একটা ভাব নিয়ে আমার দিকে তাকাল,যেন আমার আসার কথা ছিল এটা সে জানত।সে বেরোতে বেরোতে বলল,চলো যাই।আমি তার পিছুপিছু তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম।
*
আমি গাড়ি চালাচ্ছি আর একটু পরপর হিমুর দিকে তাকিয়ে দেখছি।চোখাচোখি হয়ে গেলেই মুখ ফিরিয়ে নেই তার দিক থেকে।একবার তো হিমু বলেই বসল,সামনের দিকে মনোযোগ দাও।নাহয় দুর্ঘটনা ঘটবে।আমি বাধ্য ছেলের মত গাড়ি চালানোতে মনোযোগী হলাম।
এ কী?তুমি কোথায় যাচ্ছ ফাহিম?এটা তো বাসার দিকে যাওয়ার রাস্তা নয়।
জানি।কোন কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকো।আমার সাথে যেতে ভয় করছে?
হিমু কিছু বলল না।আসলে বলার প্রয়োজন মনে করেনি তাই।হিমু আমাকে কতটা বিশ্বাস করে সেটা আমি এবং হিমু দুজনেই জানি।তাই সেটা সারাক্ষণ ঢোল পিটিয়ে বলতে হয় না।
*
গাড়ি এসে থামল,আনন্দলোক অনাথাশ্রমের সামনে।এটা আসলে অনাথাশ্রম এবং বৃদ্ধাশ্রম দুটোই।পাশাপাশি।বুড়ো মা বাবাদের কে শেষ বয়সের সন্তানের স্নেহ আর ছোট শিশুদের অঙ্কুরেই মা বাবার ছায়া দেওয়ার একটা অভিনব প্রচেষ্টা।আমরা এখানে আরও অনেকবার এসেছি।হিমুও এসেছে বহুবার।এখানকার প্রত্যেকটা মানুষের সাথে হিমুর হৃদ্যতার সম্পর্ক।গাড়ি থামতেই হিমু আমার আগে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে।নেমেই ভোঁ দৌঁড় দিল।অনাথাশ্রমের গেইট পেরিয়ে সে মূহুর্তেই আশ্রম প্রাঙ্গণে গিয়ে হাজির হল।যাওয়ার আগে একবার অবশ্য আমার দিকে ফিরে কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়েছিল।আশ্রম প্রাঙ্গণে যেতেই ছোট বাচ্চারা এসে তাদের হিমু ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরল।যেন কয়েক যুগ পর তাদের দেখা।এই ছোট্ট বাচ্চারা,বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধ,বৃদ্ধারা তাকে অনেক ভালবাসে।যেন তাদের আরেকটা পরিবার হিমু।আমার হিমু এমনই।যখন যেখানে যে তার সাথে মিশেছে।সেই তাকে ভালবাসতে বাধ্য হয়েছে।হিমুর মোহটা এমনই।আমিত রোজ হিমুকে দেখে অবাক হই।মানুষ এবং প্রকৃতিকে জয় করার অসম্ভব ক্ষমতা হিমুর মাঝে আছে।যেটা আমি এতগুলো বছরে একটু একটু করে উপলব্ধি করেছি।আমি রূপকথার সেই জাদুকরদের দেখিনি,যারা মানুষকে বশ করে নিত মায়াবলে।কিন্তু হিমুকে দেখেছি,যে তার মায়ায় সমগ্র সৃষ্টিকে আয়ত্ত্ব করতে পারে।না,এটা জাদুবিদ্যা নয়।এটা আমার হিমুর আত্মিক মায়া।মানবিক গুণ,এই মায়া ভালবাসার মায়া।যা দিয়ে জয় করা যায় পুরো বিশ্বটাকে।

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.