হিমু সিরিজের দ্বিতীয় গল্প – বিবাহ সমাচার।

লিখেছেনঃ পৃত্থুজ আহমেদ।

উৎসর্গঃ-ফুয়াদ হাসান ফাহিম

রাত ২টা।

আমার চোখে ঘুম নেই।আজকাল প্রায়ই এমন হয়।ঘুম আসেনা।কোন কারণ ছাড়াই তাকিয়ে থাকি না ঘুমিয়ে।হিমু আমাকে জড়িয়ে ধরে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে।ঘুমোলে ওকে ছোট বাচ্চাদের মত মনে হয়।ঠিক যেন দুধের বাচ্চা।কী নিষ্পাপ মুখশ্রী আমার হিমুর!কখনও কখনও পুরোটা রাত হিমুর মুখের দিকে চেয়ে পার করে দেই।ভাল লাগে।কোন ক্লান্তি আসেনা।

হিমুর হাতটা আমার শরীরের উপর থেকে সরিয়ে ওর ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলাম।রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ কফি বানিয়ে এনে পড়ার রুমে এসে আসন পেতে বসলাম।গোছানো বইয়ের তাক থেকে অগোছালো হিজিবিজি ডায়েরিটা বের করলাম।এখন ডায়েরি লিখব আমি।আমার আর হিমুর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো আমি ডায়েরি বন্দি করে রাখি।হিমু অবশ্য জানেনা আমি যে ডায়েরি লিখি।আসলে আমি চাইনা হিমু ব্যাপারটা জানুক।আমি এখন হিমুকে এই ডায়েরিটা দেখাব না।তাকে আমি ডায়েরিটা তখন দেব যখন ওর চামড়ায় ভাঁজ পড়বে,চুল,দাঁড়ি সাদা হয়ে যাবে।বেঁচে থাকার আশাগুলো যখন ক্ষীণ হয়ে যাবে তার।ঠিক তখন আমি ডায়েরিটা তার হাতে তুলে দেব।যেন বেঁচে থাকার প্রেরণা পায়।হিমু যেন কখনও নিজের তারুণ্যকে ভুলে প্রৌঢ়ত্বের আবেশে হারিয়ে না যায় সেজন্য আমার এই ডায়েরি লেখার ক্ষুদ্র প্রয়াস।তাই খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ আমি আমাদের জীবনটাকে ডায়েরির পাতায় তুলে ধরার চেষ্টা করি।যেমন আজ আবার লিখতে বসলাম…

*

গত কয়েক সপ্তাহ আগে আমার এক খালাত ভাইয়ের বিয়ে ছিল।বিয়ের কথা শোনামাত্র আমি বিয়েতে যাব না বলে অলিখিত ধারা জারি করে দিলাম।সবাই এসে একে একে রাজি করানোর চেষ্টা করল আমি যাব না মানে যাবই না।গোঁ ধরে বসে রইলাম।আমার আসলে এসব বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে ভাল লাগেনা।কেমন এতিম এতিম লাগে নিজেকে।সবাই যে যার মত আনন্দ করে অনুষ্ঠানে অথচ একমাত্র আমিই একজন যে কী না অনাথ শিশুদের মত বসে থাকি এক কোণায়।

রাতের খাবার শেষ করে বেলকনিতে এসে বসলাম।ঘুম আসছিল না তাই।হিমুকে অনেকক্ষণ যাবত দেখতে পাচ্ছিনা।আমাকে না বলে সাধারণত কোথাও যায় না।এখন কোথায় গেল কে জানে।কাউকে জিজ্ঞেস করেও লাভ নেই।কারণ কেউ আমাকে কিছু বলবেনা।সবাই বিয়েতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের শোধ নেবে এখন।তাই নিজেই খুঁজতে লাগলাম।ছাদে গিয়ে দেখি একা একা বসে আছে সে।রাতের বেলা ছাদে?তা আবার হিমু!অবাক লাগল ব্যাপারটা।নিশ্চয়ই কোন কারণে মন খারাপ তাই একা ছাদে এসে বসে আছে।আমি ছাদের দরজা লাগিয়ে হিমুর পাশে গিয়ে বসলাম।এক হাত দিয়ে হিমুকে টেনে নিয়ে তার মাথাটা আমার বুকের কাছে রাখলাম।আর হিমু দু হাত দিয়ে সামনে এবং পেছন উভয় দিক দিয়ে জড়িয়ে ধরল।

আমি বিয়েতে যাবনা বলেছি বলে মন খারাপ হিমু?

হিমু কিছু বলল না।চুপচাপ আরও শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

ফাহিম!

হুম বলো হিমু।

চলো না আমরা বিয়েতে যাই।আগে তো আমি ছিলাম না তাই তোমার খারাপ লাগত।এখন তো আমি সারাক্ষণ তোমার পাশে থাকব।চলো যাই।

হিমু কথাটা এমনভাবে বলল যে আমার হাসি পেয়ে গেল।তবে রাজি না হয়ে উপায় ছিল না মোটেও।তারপর,মুখে একটা স্বাভাবিক ভঙ্গি এনে বললাম,আচ্ছা যাব।

হিমু এতটাই খুশি হয়েছিল যে আমার বুক থেকে মাথা তুলে গুণে গুণে দশটা চুমু দিল আমার ঠোঁটেে।

*

হিমুর মন রক্ষার্থে দুদিন পর তল্পিতল্পা গুছিয়ে বাড়ির সবার সঙ্গে চললাম বিয়েতে।আমার খালার বাড়ি আমাদের এখান থেকে খুব বেশি দূরে না।তাই বাড়ির গাড়িতে করেই চললাম সকলে মিলে।আমি আর হিমু আমার গাড়িতে।আর বাকিরা আলাদা গাড়িতে যাচ্ছে।আমি গাড়ি চালাচ্ছি আর হিমু অনবরত কথা বলেই যাচ্ছে।যেটা গাড়ি চালানোর মত বিরক্তিকর কাজকে প্রাণবন্ত করে তুলছে।কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে হিমু আমার গালে একটা করে চুমু দিচ্ছে।

প্রায় ত্রিশ মিনিট ভ্রমণ করে পৌঁছে গেলাম খালার বাড়িতে।চারিদিকে হৈ চৈ রমরমা পরিবেশ বলে দিচ্ছে এটা একটা বিয়ে বাড়ি।পরিবারের বাকি সবাই আগেই পৌঁছে গিয়েছে।দেখলাম সবাই হলুদ অনুষ্ঠানের জন্য তোড়জোড় করছে।আর কিছুক্ষণ পরই শুরু হবে হলুদ অনুষ্ঠান।

হলুদ অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল।সবাই একে একে এসে ভাইয়াকে হলুদ লাগিয়ে যাচ্ছে।আর একজন খুব নিখুঁতভাবে সবটা ক্যামেরা বন্দি করছে।এখন আমি আর হিমু ভাইয়ার দুইপাশে দুইজন বসে হলুদ লাগাচ্ছি।হলুদ লাগানো শেষ করে উঠে যাওয়ার সময় দেখলাম একটা মেয়ে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।ব্যাপারটা কেমন অস্বস্তিকর লাগছিল।আমি আর হিমু গিয়ে একটা নিরিবিলি জায়গায় বসে হলুদ অনুষ্ঠান উপভোগ করছিলাম।হঠাৎ কোত্থেকে সেই মেয়েটা এসে যেচেই পরিচিত হতে লাগল।মেয়েটার নাম অঞ্জলি।হিমুর ব্যাচেরই।একটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে।ভাইয়ার শ্বশুর বাড়ির পক্ষ থেকে এসেছে মেয়েটা।মেয়েটাকে লক্ষ্য করলাম কথা বলতে বলতে কেমন কাছে ঘেঁষছিল।যেটা মোটেও সুবিধের মনে হচ্ছিল না।হিমুকে দেখলাম ব্যাপারটা খেয়াল করেছে।চুপচাপ ফোঁস ফোঁস করছে।আমি জানি হিমু এখন কিছু করবেনা মেয়েটাকে।আমার সম্মান নষ্ট হয় এমন কিছু সে করবেনা।তবে হিমু যে মেয়েটার থেকে শোধ নিয়েই ছাড়বে সেটা আমি নিশ্চিত।

*

পরেরদিন বিয়ে।সকাল থেকেই দেখলাম হিমু রান্নার লোকদের সাথে বেশ খাতির জমিয়ে গল্প করছে।আমার এসব দেখে হাসি পেল।

দুপুরে বিয়ের সময় সেই মেয়েটা আবার এসে আমার পাশে দাঁড়াল।

এই কথা সেই কথা বলে আবার আমার সাথে খাতির জমানোর চেষ্টা করতে লাগল।হিমু এবারেও আমার পাশে থেকে সবটা লক্ষ্য করল চুপচাপ।

বিয়ের কাজ শেষ করার পর কনেপক্ষের সবাই যখন খেতে বসল,তখন হিমুকে দেখলাম সবাইকে খাবার পরিবেশন করছে।মানে এসব কী!আমি অবাক হলাম হিমুর কর্মকান্ড দেখে।খাবার পরিবেশন করার জন্য অনেক লোক আছে।এসব হিমু কেন করবে।এখন কিছু বললে হিমু রেগে যাবে।তাই চুপচাপ দেখে যাওয়া শ্রেয়।আমি দেখছি ও কী করছে।হিমু খুব সুন্দরভাবে খাবার পরিবেশন করছে।কিন্তু হঠাৎ দেখলাম,একটা মাংসের বাটি সেই মেয়েটা মানে অঞ্জলির মাথায় ঢেলে দিয়েছে।হিমু ঘটনাটা এমনভাবে ঘটিয়েছে যেন সবাই মনে করে যে দুর্ঘটনাক্রমে এটা হয়ে গেছে।মেয়েটা উঠে কিছুক্ষণ চিল্লাচিল্লি করে চলে গেল ওয়াশরুমে।হিমু তার আগেই কেল্লাফতে।

আমি ঘটনাটা দেখে যতটা না অবাক হয়েছি তার চেয়ে বেশি হেসেছি।হঠাৎ হিমু কোত্থেকে হাসতে হাসতে দৌঁড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

*

গতরাতে কোনভাবে ঘুমিয়ে কাটিয়েছি দুজনেই।কিন্তু আজ রাতের সমস্যা হল জায়গা সংকুলান।আমি আর হিমু যে কোথাও গিয়ে আলাদা ঘুমাব সেই ব্যবস্থা নেই।কী আর করা দুজন মিলে ভাবলাম সারারাত জেগে কাটাব।যেই ভাবা সেই কাজ।আমি আর হিমু খালার বাড়ির পাশেই একটা মাচায় বসে আছি।বসে আছি বলতে,আমি বসে আছি হিমু আমার কোলে শুয়ে আছে।ঝকঝকে চাঁদের আলোয় আশেপাশের পরিবেশ অনেক সুন্দর লাগছে।হঠাৎ কারো পায়ের আওয়াজ শুনে চমকে গেলাম।হিমুও শুনতে পেয়ে উঠে বসে পড়ল।কিছুক্ষণ পর দেখলাম কেউ একজন আসছে আমাদের দিকে।আরেকটু কাছে আসতেই বুঝতে পারলাম এটা সেই মেয়েটা মানে অঞ্জলি।আমাদের নাকি সবাই ডাকছে।কিন্তু কেন ডাকছে!

বাড়ি এসে দেখলাম আমার সব কাজিনরা মিলে আসর বসিয়েছে।খুব সম্ভবত গান কিংবা নাচের আসর।আমি আর হিমু গিয়ে বসলাম একসাথে।আর সেই মেয়েটা আবার আমার পাশেই এসে বসল।

তো ট্রুথ অর ডেয়ার খেলায় এক পর্যায়ে আমার ডেয়ার আসল।আমাকে এখন নাচতে বলা হয়েছে।মানে সিরিয়াসলি!মেয়ে হলে যেভাবে সেভাবে নাচা যায়।কিন্তু একজন ছেলে মানুষ কী করে নাচবে পার্টনার ছাড়া!?

আমার এক মেয়ে কাজিন আছে।প্রচুর ধূর্ত।সে কীভাবে যেন বুঝে গেছে ঐ অঞ্জলি যে আমার পিছে ঘুরছে।তো কারসাজি করে আমাকে আর অঞ্জলি কে নাচতে বলল।এখন ডেয়ার হয়েছে মানা করতে পারছিনা।এদিকে হিমুর দিকেও তাকানো যাচ্ছেনা।বেচারা কিছু বলতে পারছেনা আবার সইতেও পারছেনা।

অগত্যা ঐ মেয়ের সাথে নাচতে হল।নাচ শুরু করার কিছুক্ষণ পর দেখলাম অঞ্জলি পূর্ণোদ্দমে নাচ শুরু করছে।আর আমি ব্যাঙের মত হাত পা নাড়াচ্ছি।আসল কথা হল আমি নাচতে পারিনা।আমি হিমুর দিকে তাকাচ্ছি।ওর মুখ দেখে মনে হল কিছু একটা করবে এখন।ভাবতে না ভাবতেই ও একটা মাকড়সা ছুঁড়ে মারল মেয়েটার গায়ে।মেয়েটা যতক্ষণে পুরোপুরি মাকড়সা চিহ্নিত করতে পারল নিজের গায়ে তৎক্ষনাৎ সে চিৎকার করে লাফালাফি শুরু করল।এই লাফালাফির মধ্যে হিমুর পা দেখলাম মেয়েটার পায়ের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে।ব্যস,এরপর মেয়েটা পড়ে গিয়ে পা মচকে ফেলল।আমি শুধু হিমুর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলাম।

কিন্তু কথা হল হিমু মাকড়সা পেল কোথায়?

*

মেয়েটাকে পার্মানেন্টলি একটা শাস্তি দিতে পেরে হিমু মোটামুটি স্বস্তি পেল।এর পরেরদিন বিয়ে বাড়িতে কোনমতে কাটিয়ে আমি আর হিমু পরিবারের সবার আগেই বাসায় চলে এসেছি।তারা আরও দুদিন পর আসবে।আমি বাড়িতে ঢুকেই রুমে গিয়ে জামা কাপড় পরিবর্তন করে বিছানার উপর ধপাস করে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম।শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম বিয়ে বাড়ির ঘটনাগুলো।হিমু সত্যিই পাগল একটা।আমার আশেপাশে সহ্য করতে পারেনা।ঘটনাগুলো মনে পড়তেই মৃদু হাসলাম।এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই।

চোখ খুলতেই পিঠের উপর কারো নিঃশ্বাস আর হৃদস্পন্দন টের পেলাম।বুঝতে বাকি রইল না মানুষটা কে।হিমু কখন এসে আমার পিঠের উপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল টের পাইনি।আমি আবার চোখ বন্ধ করলাম।দ্বিতীয়বারের মত চোখ খুলে দেখলাম রাত হয়ে গেছে।হিমুকে রুমে দেখলাম না।উঠে ওকে খুঁজতে গিয়ে দেখি ও রান্নাঘরে।আমি চুপিচুপি পেছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরতে যাব এমন সময় হিমু আমার দিকে না তাকিয়েই বলল,আমাকে ধরবেনা তুমি।আমি হাসলাম,পাগলটা আমার উপস্থিতিও না দেখে টের পায় এটা আমি বারবার ভুলে যায়।হাসতে হাসতেই ওকে জড়িয়ে ধরলাম।জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ে ঠোঁট ডুবালাম।হিমু বরফের মত জমে গেছে।একটুও নড়ছে না।আমি এদিকে আমার কাজ করেই যাচ্ছি।একটু পর আমার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমার দিকে ফিরে আমার বুকে মাথা রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরল।আমিও কিছু না বলে চুপচাপ ওকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম।

*

ঘটনাগুলো খুব সুন্দর করে ডায়েরির পাতায় লিখে রাখলাম।যেন জীবন্ত একটা ভিডিওচিত্র।

ডায়েরটিটা জায়গামত রেখে হিমুর কাছে গেলাম।এখনও ঘুমোচ্ছে।ভোর হয়ে এলো।আমার অবশ্য আর ঘুম আসবেনা।একটুপর আযান দেবে।তারপর হিমুকে ডেকে তুলে নামাজ পড়ে ঘুমোতে যাব।যতক্ষণ না আযান দিচ্ছে ততক্ষণ হিমুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছি।আমি হিমুর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওর ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে খুব অস্ফুটস্বরে বললাম,ভালবাসি হিমু।খুব ভালবাসি।

হিমু যেন একটু নড়েচড়ে উঠে আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।যেন আমাতে মিশে যেতে চাইছে।

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.