হুতামে পেয়ার কারছু(আমি তোমাকে ভালোবাসি)

লেখকঃ শ্যাম চন্দ্র

উৎসর্গ:আমার মনের মানুষ সোহাগের নামে।

*

২৬/০৯/১৬

আহমেদাবাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে আছে শ্যাম।গুজরাটে সে নবাগত।তাই খানিকটা মোহাচ্ছন্নের মতোই দাড়িয়ে আছে সে।তার মানসপটে ভেসে ওঠে অতীতস্মৃতি।সে অনুভব করতে পারে সহস্র বছরের পুরোনো সংস্কৃতির হাতছানি।মোহভঙ্গ হতেই সে লাগেজ নিয়ে ধীরপদবিক্ষেপে বেরিয়ে গেল এয়ারপোর্ট হতে।

*

আমি শ্যাম।পুরো নাম রুবাইয়াৎ আহমেদ শ্যাম।জন্ম উত্তরবঙ্গের প্রানকেন্দ্র রাজশাহীতে।তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট আমি।বলাই বাহুল্য যে আদর ও শাসন দুটোরই বড় ভাগিদার আমি।সবার শ্যেনদৃষ্টি থাকে আমার প্রতি।তাছাড়া আমি একটু চঞ্চলও বটে।তাই মায়ের কড়া নজরদারীতে থাকতে হতো আমাকে।আমার বিচরনক্ষেত্র বলতে শুধু আমার বাড়িটাই।মা বাড়ি থেকে বের হতে দিতেন না।তাই বসে বসে কার্টুন দেখতাম।হিন্দি কার্টুন দেখে বেশ ভালোই হিন্দি বুঝতাম।এভাবেই পরিচিত হই কমেডি শো “তারাক মেহতা কা উল্টা চাশমা”র সাথে।বিভিন্ন সম্প্রদায় আর ধর্মের মিলরেখা তুলে ধরার জন্য শোটা খুব ভালো লাগতো।এভাবেই গুজরাটি সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হই।নবরাত্রি এই সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।তাই নবরাত্রি পালনেরও এক আবাল্য ইচ্ছা ছিল আমার।

২০১৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করলাম।মেধা ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত।তাই অবলীলাক্রমেই চান্স পাই মেডিকেল কলেজে।বহুদিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়না।তাই বাবাকে পটিয়ে ভারতীয় পাসপোর্টআর ভিসা করিয়ে নিই।২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ রওনা দিই নেহরু এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।নেহরু এয়ারপোর্টে নেমে চেপে বসলাম আহমেদাবাদগামী বিমানে।সেই গুজরাট।মহাত্মা গান্ধী,মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মভূমি গুজরাট।সাত পাঁচ ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

এয়ারপোর্টথেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করলাম।ড্রাইভারের কাছ থেকে একটা মধ্যমমানের হোটেল ও এর আদ্যোপান্ত জানতে পারি।এখানকার হোটেলে উঠতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র,আঁধার কার্ড,অথবা পাসপোর্টদেখাতে হয়।তবে ম্যানেজার ভদ্রলোক আমার মুসলিম পরিচয় জেনে একটু নাক সিঁটকালেন।কেনই বা সিঁটকাবেননা নাক?জাতপাত আর ধর্মের ভেদাভেদ এখনো এ রাজ্যের লোকেদের মনে লালিত হচ্ছে সযত্নে।তাইতো একবিংশ শতাব্দীতেও এখানে ঘটে গেছে কিছু বড় দাঙ্গা।যাইহোক,অ

নেক ক্লান্ত ছিলাম।তাই হালকা খাবার খেয়ে ঘুমোতে গেলাম।ভোরবেলা এক ভিন্ন রকম আমেজ নিয়ে ঘুম ভাঙল।নবরাত্রি কড়া নাড়ছে দরজায়।আর এই নবরাত্রিকে কেন্দ্র করে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে গুজরাট জুড়ে।কচ্ছ থেকে জামনগর,কাথিয়াবাড় থেকে জুনাগড় সর্বত্রই নবরাত্রির আগমনী বার্তা বিরাজমান।আমিও সেই রঙে নিজেকে রাঙাতে গেলাম গারবা নাচের প্রয়োজনীয় পোষাক কিনতে।বেশকিছু পোষাক আর ডান্ডিয়া কিনে ফিরে এলাম।প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে।অগত্যা একটা খাবার হোটেলে গেলাম।ঢোকলা নামের একটা গুজরাটি খাবারের বেশ সুনাম আছে।তাই অর্ডার দিলাম ঢোকলার।মুখে দিয়েই মুগ্ধ হয়ে গেলাম।আহ!কি স্বাদ খেতে।তবে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি যে আমি গুজরাটে আছি।

*

উফ!সারাদিন বেশ ঝক্কি ঝামেলার মধ্য দিয়েই কেটে গেলো।একটা গারবা ডান্স সেন্টারে এন্ট্রির জন্য টিকেট কাটলাম।ভেতরে ঢুকেই চক্ষু চড়কগাছ।আম্বা দেবীর প্রতিমা,ঘট,বিভিন্ন ধরনের প্রদীপ আর বাহারী রংয়ের আলোকসজ্জা মন ছুয়ে গেলো।মনে মনে ভাবলাম”যাক,৫০০ রুপী গচ্চা যায়নি তাহলে।”সবকিছুই ছিলো বেশ উন্নতমানের।তবুও ভেতরে একটা ভয় কাজ করছিলো।কোনো দিন তো গারবা,ডান্ডিয়া নাচ নাচিনি।যা একটু দেখেছি তাও তথৈবচ।একজন স্পীকারে নাচ শুরুর ঘোষনা করলেন।রুপাল ডোশী,কীর্তি গিরিশ প্রমুখের কন্ঠে গাওয়া গান শুরু হলো।শুরু হলো গারবা নাচও।সবাই নাচছে।কিন্তু আমি তো হতবিহ্বল।নাচের বদলে হাত ছোড়াছুড়ি করছি।এভাবেই নাচ শেষ হলো।দেবীপ্রণাম করে সবাই বের হতে লাগল।আমিও বের হবো।এমন সময় কেউ পেছন থেকে ডাক দিল।পেছন ফিরতেই দেখি একটা ছেলে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।এসেই হড়বড় করে জিজ্ঞাসা করলো”সু তামে মুসালমান ছো?”বাংলায় যার অর্থ”তুমি কি মুসলিম?”বুকটা ধক করে উঠল ওর প্রশ্ন শুনে।কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাড়িয়ে রইলাম।আমার অবস্থা দেখে ও হো হো করে হেসে উঠলো।বলল”ভয় নেই,আমি বাঘও নই সিংহও নই।”আমি মিনমিন করে বললাম”আপনার নাম কি?”

ওমনি ও বকবক শুরু করলো”আমি রঞ্জন।পুরো নাম রঞ্জন মেহতা।গুজরাট ইউনিভার্সিটিতে অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়ি।এবার থার্ডইয়ারে।তোমার পরিচয়?”ওর মিশুক স্বভাব দেখে কিছুটা ভরসা পেলাম।বললাম”আমি শ্যাম।রুবাইয়াৎ আহমেদ শ্যাম।”রঞ্জন ফোঁস করে উঠলো।বাব্বাহ,এতকথার জবাব মাত্র এতটুকু?”আসলে আমি ওকে দেখছি আর মনে মনে ভাবছি ও কি স্বর্গের দেবদূত।উচ্চতায় পাঁচ ফুট ৭ ইঞ্চি হবে।বেশ নাদুস নুদুস,খোঁচা খোঁচা দাড়ি আছে।মাথাভরা ঘন কালো চুল।চোখদুটিতে যেন মাদক গোলানো আছে।একবার দেখলে চোখ ফেরাতেই ম৭ চায়না।ওর ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।রঞ্জন বলল”কি হলো জবাব দাও?”আমি বললাম”তুমি কিভাবে বুঝলে যে আমি মুসলিম?”ও বলল”তোমার নাচ দেখে।আর সবাই দেবীকে প্রণাম করল,কিন্তু তুমি করলে নাতো তাই।”

মনে মনে বললাম”কি CID অফিসারের হাতে যে পড়লাম।মাথা ব্যথা করিয়েই ছাড়বে এবার।যাইহোক ওকে বললাম”অনেক রাত হয়েছে।আমার ঘুম পাচ্ছে,এখন যেতে হবে।ও মুখ ভার করে বলল”যাও,তবে ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাও।নাম্বারটা দিয়ে হোটেলে ফিরলাম।যেই ঘুমের বাহানা দিয়ে ফিরে এলাম।সেই ঘুমই উধাও দুইচোখ থেকে।কোনোরকম এপাশ ওপাশ করে রাত কাটালাম।

*

আজ জুমাবার।জুমা পড়তে গেলাম আহমেদাবাদ বড় মসজিদে।নামাজ শেষে ফেরার পথে কেউ পেছন থেকে ডাক দিলো আমায়।পিছু ফিরে দেখি রঞ্জন।হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল”তোমার সাহসের প্রশংসা না করে পারছিনা।এখানে এসেছো নামাজ পড়তে?আরএসএস সদস্যরা দেখলে তো চিরে চ্যাপ্টা করে দিত।”আমি নির্বিকার চিত্তে হেঁটে চলেছি।ও বলল”ভরসা হচ্ছে না আমাকে?আমি কিন্তু ভরসাযোগ্য।”আমি মনে মনে ভাবছি যে”ছেলেটা একেবারে আজব পাবলিক।তবে আমার মনটা জয় করে নিয়েছে।ইস!যদি ও আমার মতোই হতো তাহলে কত ভালোইনা হতো।”আর এদিকে শ্যামকে দেখে রঞ্জন ভাবছে”কি মায়াবী দেখতে ছেলেটা।ছোট ছোট দুটো চোখ।গোল মুখ আর গোলাপী ঠোঁট।সবচেয়ে আকর্ষনীয় ওর ভ্রু দুটো আর ঠোঁটের নিচের তিঁল।ও যদি আমার মতো সমপ্রেমী হতো!আজীবন বুকে আঁকড়ে রাখতাম।”তখন রঞ্জন বলল”আমি কি বোকার মতো তোমাকে এখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছি।চলো কফিশপে যাই!”আমার মতের তোয়াক্কা না করেই হাত ধরে একটা কফিশপে নিয়ে গেল।কফিশপে বসেই প্রথম ওর সাথে এত কথা বললাম।আমার পুরো পরিচয় জেনে ওর তো চোখ কপালে উঠে গেছে।আমাকে বলল”বাংলাদেশ থেকে গারবা নাচের জন্য গুজরাটে এসেছো?তার পরে আবার মেডিকেলের ছাত্র।”

তারপর থেকে আমাকে শুধু ডাক্তারবাবু বলে রাগাতে লাগল।

প্রথমে ডাকটা শুনে বিরক্ত লাগলেও পরে বেশ উপভোগ করছিলাম।আর এও বুঝতে পারছিলাম যে আমি ওর ওপর অনেক বেশী পরিমানে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি।মৌনতা ভেঙে হঠাৎ করেই ও বলল”আমার বাসায় চলো।”আমি বললাম”আমি যে মুসলিম?তোমার বাবা মা কিভাবে গ্রহন করবেন আমাকে?”ও মৃদু হেসে বলল”আমার বাবা মা এরকম সাম্প্রদায়িক মানসিকতার না।তাদের আপ্যায়ন দেখলে তাদের ছেড়ে আসতে চাইবে না।”আমি সম্মতি দিলেও মনে মনে বেশ ঘাবড়ে গেলাম।কি হবে এই চিন্তায় মুখটা মিইয়ে গেল।যাইহোক অবশেষে পৌছলাম ওদের বাসায়।রঞ্জন কলিংবেলে চাপ দিতেই এক মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুলে দিলেন।ভেবেছিলাম ওর মা রাশভারী টাইপের হবে।কিন্তু আমাকে চমকে দিয়েই হাসিমুখে স্বাগত জানালেন আমাকে।বললেন রঞ্জনের বাবা একটু বাইরে গেছেন।তোমরা বোসো।আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসি।বসামাত্রই রঞ্জনের বাবা ফিরে এলেন।উনিও একেবারে মাটির মানুষ।আমার পরিচয় জানার পরও খুব ভদ্রভাবেই কথাবার্তা বললেন।আমার আর আমার দেশের প্রতি উনাদের আগ্রহের কমতি নেই।চা খাওয়ার পর উঠতে চাইলাম।কিন্তু উনারা তো খাবার না খেয়ে আসতেই দেবেনা।কি আর করা?বাধ্য হয়েই খেতে বসতে হলো।খেতে বসে তো ভিরমি খাবার পালা আমার।উপমা,থেপলা,খাখরা,পাকোড়া কিছুই বাদ দেননি।সকল মমতা ঢেলে রেধেঁছেন।

বহুদিন পর তৃপ্তি করে খেলাম।মনে হচ্ছে যেন আম্মার হাতে রান্না করা খাবার।আমার প্রতি উনাদের আদর যত্ন দেখে চোখের কোনা ভারি হয়ে এল।যাই হোক,খাওয়া শেষে বিদায় নিলাম ওদের বাসা থেকে।আসার সময় রঞ্জন ফিসফিস করে কানে বলল”কি ডাক্তারবাবু,কেমন লাগল আমার বাবা মাকে?”আমি মৃদু হেসে উত্তর দিলাম।

*

এভাবেই কেটে গেল একটি মাস।আহমেদাবাদের প্রতিটি গলি আমাদের পদচারনায় মুখরিত হলো।দুই যুবক মিলে পুরো শহর চষে বেড়ালাম।কিন্তু পৃথিবীতে কোন কিছুই চিরন্তন নয়।তাই আমারও দেশে ফেরার সময় হয়ে গেল।দেশে ফিরব শুনেই তো রঞ্জনের মুখ গোমড়া হয়ে গেছে।অত সুন্দর হাসিমুখটাতে যেন শ্রাবনের মেঘ ভর করেছে।পরদিন সকালে দেখি ওর চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে।বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে ও গতরাতে অনেক কেঁদেছে।ওর এই অবস্থা দেখে বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল।ওর বাবা মাও খুব মন খারাপ করলেন আমার দেশে ফেরার কথা শুনে।তবুও ফিরতেই হবে যে আমাকে।

আজকে সন্ধ্যা সাতটায় আমার ফ্লাইট।ওর বাবা মার কাছে বিদায় নিতে গিয়ে অশ্রু সংবরণ করতে পারলামনা।মাও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন খুব।এই কয়দিনেই যেন আমাকে কত আপন করে নিয়েছেন তাঁরা।অবশেষে বিদায় নিলাম।

রঞ্জন আমার সাথেই ছিল।দুজনেই প্রবেশ করলাম এয়ারপোর্টে।

এখন সাড়ে ছয়টা বাজে।একটু পরেই বিমানে উঠতে হবে আমাকে।কিন্তু রঞ্জন হঠাৎ উধাও।যাত্রীদের বিমানে উঠার অনুরোধ করা হলো।হঠাৎ করেই রঞ্জন হাজির।হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ।হাঁটু গেড়ে বসেই আমাকে বলল

“হু তামে পিয়ার কারছু শ্যাম”আমি ফুলগুলো হাতে নিয়েই বিমানে উঠলাম।

সাশ্রুসজল নয়নে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।দেখলাম ও হাত নাড়াচ্ছে।আস্তে আস্তে সবকিছু অদৃশ্য হয়ে গেল।কাঁন্না থামাতেই পারছি না।কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।কিন্তু স্বপ্নেও সেই সুমিষ্ট কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম

“হু তামে পিয়ার কারছু শ্যাম”

“হু তামে পিয়ার কারছু.. ___সমাপ্ত___

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.